গল্প:খুকি

গল্প:খুকি

ছোট বোনের সাথে কথা হয়না আমার অনেকদিন৷ আমি লজ্জায় বলি না৷ সে বলে না হয়তো রাগে৷
প্রতিবার বাবার সাথে কথা শেষে লাইন কাটার আগে বলি,
“বাবা খুকি কেমন আছে?”
আমি জানি বাবা বলবে,
“ভালো আছে খুব৷”
তারপরও আমি জিজ্ঞেস করি৷

আমার স্মার্টফোন থাকাকালীন গ্রামের বাড়ি ফোন করে কথা শেষ হতেই,
ফ্যামিলির ছবিটাতে হাত বুলোতাম ফোনের স্ক্রিনের উপর৷
ছবিটাতে বাবা-মা মাঝখানে৷
ডানপাশে দাঁড়ানো খুকির মুখে দুষ্টুমাখা হাসি৷
ছবিটা তুলেছিলাম আমি৷
তাই ছবির ফ্রেমে বন্দি হতে পারিনি৷

মনটা ফুরফুরে আছে ক’দিন ধরে৷ টিউশনের টাকাটা সময়মতো পেয়েছি এবার৷
আব্বার জন্য পান্জাবী আর আম্মার জন্য শাড়ি৷ খুকির ঈদের ড্রেসের টাকাটা বাবাকে পাঠিয়ে দিবো৷
খুশিমতো কিনে নিবে৷ আমার পছন্দে অরুচি খুকির৷ কলেজ পেরিয়ে ভার্সিটিতে উঠেছে এবার৷ আমি খুকি ডাকাটা ছাড়িনি এখনো৷
মাঝে মাঝে মেকি রাগ করতো৷
আমি নাম ধরে ডাকতাম তখন৷ পরক্ষণেই গলা জড়িয়ে ধরে বলতো,
খুকি না ডাকলে গাল ভেঙে দিবো তোর৷”
আমি হাসতাম পাগলামী দেখে৷

টিউশনের অগ্রিম মাসের বেতনের সাথে বোনাসটা মিলিয়ে মানিব্যাগটা মোটা হয়েছে একটু৷ সিলিংয়ের বাতাসগুলো এসির হাওয়া মনে হচ্ছে আমার৷
এবার পান্জাবীর সাথে শার্ট-প্যান্ট ও কেনা হবে এবার৷ পরক্ষণেই মনে পরলো, খুকিতো বড় হয়েছে৷ স্মার্টফোন দরকার৷ স্মার্টফোন কথাটা আসতেই আমার মনের আকাশে মেঘ জমে হুট করে৷
আমার বুকটা একটু ব্যাথায় কাতরে উঠে৷
গত ছুটিতে বাবা যখন বলল,
খুকির টাকা লাগবে৷”
আমি নিরুপায় ছিলাম৷ টিউশনের টাকাটা শেষের পথে৷ ডাল ভাত খেয়ে বাঁচানোগুলো ও উধাও তখন৷
মামার দেয়া স্মার্টফোনটা বেছে দিয়েছিলাম৷ বন্ধুর কাছ থেকে ভাঙাচোরা একটা দিয়ে চালিয়ে দিচ্ছিলাম৷
বাড়ি যেতেই ফোনের খোঁজ করলো খুকি৷
আমি জবাব দিতে পারি না৷
বাড়িতে গেলেই আমার ফোনটা নিয়ে পরে থাকতো বোনটা৷
সেবার আর বোনের হাতে ফোনটা দিতে পারিনি৷
বান্ধবীর জন্মদিনে যাওয়ার সময়ও ফোনটা চেয়েছিল মেয়েটা৷
আমি দিতে পারিনি৷
মায়ের হাতে রান্না খেয়ে মায়ের কোলে মাথা রেখে চাঁদ দেখির ইচ্ছে থাকলে আমার বেশিদিন থাকা হয় নি৷
ছোটবোনের সামনে নিজের মুখটাকে নিয়ে যেতে পারছিলাম না আমি৷
সারাক্ষণ খুঁনসুটিতে মেতে থাকা বোনটার সামনে নিজেকে অপরাধী মনে হয় আমার৷
টুপ করে মুখ লুকিয়ে চলে এসেছিলাম এই নিঃসঙ্গ শহরে৷
সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম এক আকাশ দীর্ঘঃশ্বাস৷”
অতীত মনে পরতেই খারাপ লাগা ছুঁয়ে যায় আমাকে৷ বালিশের পাশে রাখা স্বাস্থ্যবান মানিব্যাগ দেখে স্বস্থির নিশ্বাস ফেলি আমি৷
লাইট জ্বালিয়ে বন্ধুর পাশে গিয়ে বসি৷ ফিসফিস করে বন্ধুকে বললাম,
-বন্ধু গত ঈদের পান্জাবীটা ধার দিবি একটু? এই ঈদে গায়ে দিবো! পুরনোটা পরলে বাবা-মা,বোন মন খারাপ করবে৷
ফিরে আসার সময় নিয়ে আসবো আবার৷
দিবি?”
-নিয়ে যাইস৷
জবাব দেয় বন্ধু৷
আমি নিশ্চিন্ত হই একটু৷ সুখে আমার চোখ দু’টো বন্ধ হয়ে আসে৷

ঈদটা ঘনিয়ে আসছে৷ বাবার পান্জাবী, মায়ের শাড়িটা কিনে ফেলেছি৷ এবার বোনের ফোনটা কেনা শেষ হলেই, স্বপ্ন আমার যাবে বাড়ি৷
ফোন কেনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি আমি৷
মোটামুটি দামের একটা কিনে ফেলেছি৷ ঘরে বলা যাবে না৷
ঈদের সালামী হিসেবে দিবো খুকিকে!
আচ্ছা খুকি আসবেতো আমার কাছে!
প্রতিবারের মতো সালামীর বায়না ধরবেতো!
আমার মনে হাজারো প্রশ্ন উখি দেয়৷
পরক্ষণেই সব ঝেড়ে ফেলি৷

ঈদটা ঘনিয়ে এসেছে একদম৷ বাড়ির পথ ধরেছি৷ মনটা ফুরফুরে বেশ ক’দিন যাবৎ৷
আজ চাঁদরাত৷
বাবাকে পান্জাবী আর মায়ের শাড়িটা দিয়েছি তাদের৷ খুকির পছন্দের জামাটা কিনেছে৷ মা হুট করে আমার পান্জাবী দেখার আবদার করে বসে৷
অগত্যা বের করি বন্ধুর কাছ থেকে ধার নেয়া পান্জাবীটা৷
মা নেড়েছেড়ে দেখে একটু৷ কপাল কুচকে বাবাকে বলল,
শুভ’র বাপ পান্জাবীটা কেমন জানি পুরান মনে হইতাছে না?”
-হ সেটাইতো মনে হইতাছে৷”
তারপর রুমে ঢুকে খুকি৷
আমি টুপ করে মায়ের হাত থেকে পান্জাবীটা ছিনিয়ে নিই৷
মা আফসোসের স্বরে বলল,
দেখেছো কারবার৷ আমার বাচ্চাটাকে কিভাবে ঠকিয়েছে!”
আমি স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলি৷
চারিদিকে মেহেদী লাগানোর ধুম পরেছে৷
আগে প্রতি ঈদে খুকি আমার হাতে মেহেদী লাগিয়ে দিতো৷ এবার নিজেই নিজেরটা দিচ্ছে৷
আমার দিকে খেয়াল নেই৷
আমি মনে মনে হাসি৷ পিচ্চিটা অভিমান করেছে৷ কাল সব ভাঙিয়ে দিবো৷

খুব ভোরে ঘুমটা ভাঙে আমার৷ নামাজের তাড়া৷ আমার ভেতরটা শিহরণ বয়ে যায়৷ এই সময়টা এমনই৷ ঈদের দিনটাতে যত দুঃখ থাকুক৷ মনটা আপনাআপনিই হালকা লাগে৷
হাতের শুষ্ক মেহেদী দেখে অবাক হলাম৷
খুব বেশি কিছু নেই৷
হৃদয় চিহ্নের মাঝখানে ছোট করে আমার আর খুকির নামের প্রথম অক্ষরটা লিখা৷
আমি হাসি৷ ভালোলাগাটা আরেকটু বাড়ে৷

বাবার দেয়া নতুন লুঙ্গিটা পরি আমি৷ পান্জাবী বের করতেই অবাক হই আমি৷
পুরনো পান্জাবীটা নেই৷ তার জায়গায় কালো রঙের পান্জাবীটা৷
কালো রংটা আমার বড্ড পছন্দের৷
শখের সাইকেল থেকে শুরু করে শার্ট,গেন্জী প্রায় জিনিসই কালো৷
পান্জাবীটা মেলতেই চিরকুট গড়িয়ে পরে মাটিতে৷
আমি হাতে নিই৷ ঘুটঘুটে করে খুব ছোট করে লিখা৷ খুকির হাতের লিখা চিনতে ভুল হলো না৷
“তোর খুকি রাগ করেনি৷ অভিমান করেছি৷ ফোনটা তুই আমাকে না বলে আমার জন্যই বিক্রি করেছিস৷
তাই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তোকে ফোন কিনে দিয়েই তোর সাথে কথা বলবো হুহ৷
আর পান্জাবীটাও আমি কিনেছি৷ খুকির ভাইটা পুরনো পান্জাবী পরে ঈদ করবে! খুকি থাকতে” সেটা হবে না কখনো৷”

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত