নোনা জলের ক্রেতা

নোনা জলের ক্রেতা

পড়ন্ত বিকেলে জানালার পাশে বসে আকাশ দেখছিলাম। কেনো জানি এই আকাশটা আমার বড় প্রিয়। কখনো কান্না, কখনো হাসি, কখনো রাগ অথবা অভিমান নিয়ে আকাশ দেখি। যখন বিকেল গড়াতে থাকে, তখন আকাশের মাঝে ফুটে ওঠা লাল আভায় আমি নিজেকেই খুঁজে পেতাম। আমি অরুণা। অরুণ শব্দের অর্থ লাল। বাবা বলেছিলো আমার জন্মের সময় নাকি আমার গালদুটো রক্ত লাল হয়ে ছিলো।

এর জন্যই নাকি আমার নাম অরুণা। কিন্তু বাবার ছেলের খুব শখ ছিলো। কিন্তু হয়েছিলাম মেয়ে। বাবা মায়ের প্রথম কন্যা আমিই। প্রথমে মেনে নিয়েছিলো ভেবেছিলো হয়তো পরেরটা ছেলে হবে। কিন্তু পরেরটাও মেয়েই হলো, তার নাম অনন্যা । যদিও এ নিয়ে কখনো বেশি কথা শুনতে হয়নি। কিন্তু কথায় আছে, “কিছু কথা কষ্ট দেয়” । তেমনি ওই কিছু কথাই মনে লেগে ছিলো। সেদিন ভেবেছিলাম বাবা মায়ের ছেলে হয়ে দেখাবো। কিন্তু পারি নি।

কিছু কিছু সময় বাবাকে ডেকে বলতে ইচ্ছে করে, “কেনো আমার এমন নাম দিয়েছে? এই নামের জন্যই কি আমার জীবনে মাঝে মাঝে রক্ত তগবগ করা কষ্ট আসে।” কিন্তু বলার সুযোগ পাই না। কারণ সে এখন নাই আমাদের মাঝে। ছোটদের ভাষায় সে তারা হয়েছে। কারো ভাষায় সে আমাদের দেখছে উপর থেকে। জানি সে সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে। যেখানে গিয়ে তাকে কোনো প্রশ্নই করতে পারবো না। শুধু পারবো বাবার স্মৃতিতে দু ফোটা চোখের পানি ফেলতে। সেই সাথে শুধু পারবো তার জন্য দোয়া করতে।

বাবা যাওয়ার পরও সংসারে বেশি ঝড় আসে নি। তাই তখন প্রথমে কাঁদলেও ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়াটাও শিখেই নিয়েছিলাম। সংসারও চলতো বাবার পেনশনে। বাবার কথা ভেবে স্মৃতির পাতা উল্টাচ্ছিলাম এমন সময় এক আপু পিছনে এসে ডাক দিলো। “কি রে অরুণা? কি দেখিস? আবার কি নিজের আকাশের স্বপ্নে ডুবেছিস?” আমি জবাব দিলাম,”না আপু উপভোগ করছি। বসো বসে দেখো কীভাবে এই রক্ত লাল বর্ণ আকাশের নীল রং-কে গ্রাস করে। কীভাবে লালিমায় মেখে যায় এই দীগন্ত ঘেরা আকাশ।” আপু বললো,”থাক বাবা থাক তুই তোর এসব কাব্যিক কথা নিয়ে।”

“কাব্যিক না আপু। কাব্যিক হলে অনেক কিছু বলতে পারতাম। করতে পারতাম কই পারি?”
“তোর সাথে লাগতে আসাই ভুল। শুন যা বলতে এলাম, পাশের বাড়ির মলির বিয়ে ঠিক হয়েছে জানিস?”
“জানতাম না এখন জানলাম। ভালোই তো।”আমি বললাম।
“হুম এই খবরই দিতে এলাম আর তুই কি আকাশ নিয়ে লেগেছিস। দেখিস সত্যি তোর বরের নাম আকাশ হবে।”

বিনিময়ে হালকা হাসি দিলাম। আপু আর কিছু বললো না। এরকম অনেকে বলেছে।মাঝে মাঝে কিছু ভাই বোন মজার ছলে বলে উঠতো, আমার প্রিয় মানুষটির নামও নাকি আকাশ হবে। তাদের কথায় রাগ করতাম। রাগ বললে ভুল বয়স বাড়ার সাথে সাথে লজ্জা পেতাম। তারা ঠিকই বলতো। আমার জীবনে একজন এসেছিলো। তার নাম আকাশই ছিলো। হয়তো তার এই নামের জন্যই তার প্রতি দূর্বল হয়েছিলাম। সব সম্পর্কের মতো এই সম্পর্কটিও ভালোই কেটেছিলো, কিন্তু ভেঙ্গে গেলো। কথায় আছে, “যা টিকার তা অনেকদিন টিকে আর যা টিকে না শুরুতেই ভেঙ্গে যায়।” তবুও যাওয়ার আগে বলেছিলো, আবার ফিরবে। কিন্তু সময় পেরোলেও তার দেখা এখনো পাই নি। হয়তো আসবে। মন তো মাঝে মাঝেই নির্লজ্জ হয়ে পড়ে, ভালোবাসা পাওয়ার জন্য।

আমার মনটা কী ভিন্ন না হয়ে পারে? আমিও অপেক্ষায় থাকি। জানি হয়তো ফিরবে না, কিন্তু তবুও আকাশের স্মৃতিগুলো আপন করে অপেক্ষায় থাকি। কিছু সময় পর ছোট বোন ঘরে এলো। তার স্মৃতি গুলো মনে করার সামান্য সুযোগ পেলেও তা সামান্য ছিলো। স্মৃতি নয়, স্মৃতিগুলো মনে করার জন্য প্রাপ্ত সময় কম ছিলো। “প্রিয়জনের স্মৃতি নাকি খুব কাঁদায়।” প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাস না করলেও আমি এখন বাধ্য। কারণ আমিও একজনের স্মৃতি জড়িয়ে আছি। হয়তো অন্য কেউ এটাকে বুঝবে না বা শুধু আবেগ বলবে, কিন্তু আমার মনে কি চলছে তা তো আর বুঝবে না। বুঝাতেও পারবো না এটাও জানি। যখন কাছের মানুষ বুঝে নি অন্যরা আরো বুঝবে না।
“আপু কি ভাবছিস ওদিকে তাকিয়ে?” প্রেয়শীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমি নিজের চোখের পানি মুছে ফেললাম।

কারণ আমি জানি কিছু জিনিস, কিছু কষ্ট, আর কিছু ভাবনা কাউকে বলা যায় না। যার মাঝে এটি একটি। গভীর রাতে ফুঁপিয়ে কান্না করলেও, এমন কোথাও কাঁদতে হয় যেখানে কেউ শুনতে যেন না পায়। মাঝে মাঝে নিজের কান্না লুকাতে গিয়ে নিজের কাছেই ধরা পড়ে যাই, কিন্তু সব শেষে অন্যদের আড়ালে রাখি এই নোনাজল গুলো। আকাশের দেওয়া অনেক উপহারের মধ্যে এই নোনা জল একটি। যা যেকোনো সময় চলে আসে। “কি আপু বলো কি ভাবছো কথা বলছো না কেনো?” প্রেয়শীর আবার প্রশ্ন করায় আমি উত্তর দিলাম, “এইতো ভাবছি সামনে মলি আপুর বিয়ে কি পড়া যায়? এই আরকি।” “এই ভাবনা গুলো বড্ড আজব। যখন তখন মাথায় আসে।” এটা ভেবে একটু মুচকি হাসি দিলাম।

“কি হাসছো কেনো?”
“এইতো এমনি এমনি।” আমি জবাব দিলাম।
“আজকাল পাগলি হয়ে যাচ্ছো তুমি আপু।” প্রেয়সি বললো।
“সবাই ভালো হলে পাগলি কে হবে রে?” আমিও জবাব দিলাম।
“তোমার সাথে কথায় পারবো না। বাদ দেও আমি পড়া করি। তোমার ভার্সিটির পড়া নাই?”
“আছে বসতেছি।”

বেশি কথা বাড়ালাম না। কারণ ভাবনার দিকে আবার মনোযোগ দিলে নোনা জল আবারো আমাকে তার কাছে টেনে নিবে।

রাত ২ টা একটা দিনের আবারো ইতি ঘটলো। রাত গভীর হতে লাগলো। রাতের গভীরতা আমাকে কেনো যেন গ্রাস করছে আমি বুঝছি। আজও এখনো ঘুম আসছে না। এ আর নতুন কিছু না। প্রায়ই এমনটা হয়। কারণটাও আমার জানা। প্রিয় মানুষটিকে ছাড়া থাকা তো কষ্টেরই। আকাশ আমাকে ছেড়েছিলো কারণ নাকি তার একটু সময় চাই। একটু সময়ের জন্য নাকি ব্রেকাপ। কয়েক মাস পর নাকি ফিরে আসবে। “কারণ কি?” জিজ্ঞেস করায় বলেছিলো, “তার উপর নাকি কিছু দায়িত্ব আছে। তার এক আত্মীয় নাকি পাগলামি করছে তার জন্য। এই জন্য নাকি কিছু মাস ও দেশের বাইরে থাকবে।” প্রিয়জনের সব কথাই সবার বিশ্বাস হয়। আমিও ভিন্ন নই। তাই এখনো অপেক্ষায়। সেদিনও কেঁদেছি আজও কাঁদি। এটাও জানি না সে কাঁদে কি না?

একটা রাত আরো গেলো। এসব ভাবতে ভাবতেই। কিছু দিন পর, সবার জোড় করায় শাড়ি পড়েই মলি আপুর বিয়েতে গেলাম। “শাড়ি পড়লে নাকি আমাকে ভালো লাগে।” আকাশ বলতো। ওর যাওয়ার পর এই প্রথম শাড়ি পড়লাম। কেনো জানি মন বলছিলো ওর সাথে দেখা হবে। কিন্তু হাজার মেহমানের ভিড়েও প্রিয় মানুষটির দেখা পেলাম না।

“হঠাৎ সবাই বলতে লাগলো বর এসেছে।” কথাটা শুনে আমিও এগিয়ে গেলাম। কিন্তু বরের চেহারা দেখে আমি অবাক। কারণ এ আর কেউ না, আমার প্রিয় মানুষ আকাশ। আমি যতোটা না অবাক, আকাশও অবাক। হয়তো ভাবেই নি এভাবে দেখা পাবে। নোনাজল আবারো চোখের কোণে ভিড় করলো। এতো মানুষের ভিড়ে কারো চোখে পড়লো না এই নোনাজল। সবার থেকে দূরে দাড়ালাম। জানি আজ আমাকে শক্ত হতে হবে, কারণ কিছু করার শক্তি আমার নেই। হঠাৎ আকাশ পাশে দাড়ালো। আমি তাকে দেখেও না দেখার ভান করলাম। কিন্তু নোনাজল যে লুকালো না, উকি দিলোই।

“আমাকে ক্ষমা করে দেও অরুণা। আমি বাবা মায়ের অবাধ্য হতে পারি নি। দয়া করে ক্ষমা করে দিও।”
“বাদ দেন। ভাগ্য চেয়েছে হয়তো এটাই অথবা আপনিই চান নি।”
“অরুণা আমি চেয়েছিলাম।”
“মিথ্যা বলতে হবে না।

সব উজার করে ভালোবেসেছিলাম কিন্তু পরিণতি হয়তো এটাই। কিন্তু সবশেষে আমার মতো দ্বিতীয় কাউকে পাবেন না। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ আমাকে নোনাজলের ক্রেতা করার জন্য আর আমি ক্রেতা কেনো জানো? কারণ তুমি নোনাজলের বিক্রেতা।” এটুকু বলে চলে আসলাম। ঘরে মুখ ফুপিয়ে কিছু সময় কাঁদলাম। জানি আকাশ ভুলে যাবে ধীরে ধীরে আমার স্মৃতি। একটা সময় হয়তো আমিও অনেকটা ভুলবো কিন্তু পুরোপুরি না।

সেদিন রাতে, মা বললো, “তোর জন্য প্রস্তাব আসছে। ছেলে ভালো। আমার ভালো লেগেছে। তোর কোনো সমস্যা?” আমি বললাম, “তোমার যা ভালো মনে হয় করো।” আমি বাঁধা দিলাম না। কারণ কি লাভ কষ্ট বাড়িয়ে। এবার নাহয় আমিও জীবনের নতুন ধাপে পা বাড়াই। জানি তবুও প্রথম প্রথম তার স্মৃতি ভাববো, কিন্তু ভুলবো তো একদিন অনেকটা তাকে। আমি জানি, যে সবশেষে দুজন দু প্রান্তে থাকবো। এটাও জানি যে, সবশেষে আমিও একদিন তাকে ভুলবো। এসব ভেবেও এখনো আমার চোখে নোনাজল। জানি আমি যে, “নোনাজলের ক্রেতা”

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত