বাবা-মা হারা মেয়ের আর্তনাদ!!

বাবা-মা হারা মেয়ের আর্তনাদ!!

বাবা-মা বিয়েটা ভালোবেসে করলেও 27-05-18 তাদের ডিভোর্স হয়ে যায়!আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে!তখন আমি ক্লাস সেভেন এ পড়তাম! আর এখনও আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি!তাদের বিচ্ছেদটা ঠিক ভাবে মেনে নিতে পারিনি।এখনও পারি না তবে এখন আমি মেনে নিতে বাধ্য!

বিয়ের আগে তিন বছরের বেশি সময় ধরে একে অপরকে জানতো! বাবা-মায়ের মধুর সম্পর্ক ছিলো!
পারিবারিক ভাবেই বিয়ে হয়েছিলো!দাদা-দাদি,না­­না-নানুর সন্মতিতেই কারন তারা দুজনেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিলো!
আম্মু প্রায়মারি স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন আর আব্বু ব্যাংক ম্যানেজার!
ভালোবাসার কমতি ছিলো না তাদের মাঝে।
আমরা নিতান্তই তিন সদস্যের সুখি পরিবারে ছিলাম!
হ্যা!!!

ছিলাম তবে এখন তা অতিত!
নতুন মা, নতুন বাবার ছায়া আমার মাথার উপরে ঠিকই আছে! কিন্তু সেখানে ভালোবাসার বড্ড অভাব!আগে আব্বু আমাকে একদিন না দেখলে থাকতে পারতো না কিন্তু এখন দিনের পর দিন চলে যায় পাশের রুমে থাকা তার নিজের অভাগী মেয়েটাকে দেখার সময় হয় না!
এখন কেউ বলে না-
আজ গরুর মাংস খাবি নাকি রোস্ট খাবি মা!

এখন আর আমার পছন্দের রান্না হয় না!আমাকে না খাইয়ে আব্বু-আম্মু খাইতো না তবে এখন বাড়িতে গরুর মাংসরে সুগন্ধটা ঠিকই নাকে আসে নতুন মা আর আব্বু হাসি-ঠাট্টা করা খায়! শেষ কবে আমাকে খাইতে ডেকেছিলো ঠিক মনে করতে পারছি না!কবে যে মজা করে খেয়েছি মনে নেই আমার কতদিন আমার জর হয়েছে,মাথা ব্যাথা করেছে আমার কাছে কেউ আসেনি!না বাবা আর না মা!অথচ নতুন মা মাথার একটা চুল উঠলে আব্বু ডাক্তার কে ফোন করে বলে কি ঔশুধ খাওয়াইতে হবে!
একসময় বান্ধবীরা বলতো-
“যদি তোর বাবা-মা এর মতো বাবা-মা পাইতাম রে”
আর এখন আজ তারা আমাকে আমার নতুন বাবা-মা এর পাশাপাশি দেখলেই হাসতে শুরু করে!আমার এখন কোন বান্ধবিদের নেই!
আমি একদম কস্ট পাই না!
একটা বড় আপু আমাকে শান্তনা দেয়-“বড়দের নাকি কাঁদতে নেই,আর আমি নাকি বড় হয়ে গেছি!”
ঠিক কতটা বড় হয়েছি জানিনা!
তবে আর আগের মতো নেই আমি!
এখন আর মুখ লুকিয়ে কাঁদি না!
আমার রুমের দরজাটা বন্ধ থাকে না সবসময়,অন্ধকার ঘরে থাকা হয়না বেশ কিছুদিন!অতি কষ্টে লেপ-কাঁথা মুড়ি দিয়ে দুঃখের গানও শুনি না!
আমার পৃথিবী ছিলো আব্বু-আম্মু।এখন পৃথিবীটা বদলে গেছে!আমিও একসময় তাদের পৃথিবী ছিলাম এখন সেই জায়গায় অন্যকেউ!
মাঝে মাঝে বড্ড ইচ্ছে হয় তাদের গিয়ে প্রশ্ন করি-
“তাদের সুখময় পৃথিবীতে আমার স্হান হয় না কেনো??
আব্বুকে দেখতে পাই এখন!
আগের থেকে একটু মোটা হয়ে গেছে!
প্রচন্ড রোদে ঘেমে লাল হয়ে গেছে সবধবে সাদা মুখ খানি!
জানালা দিয়ে দেখেছিলাম অনেক দিন পরে!
কলিং বেলের শব্দতে আমি দৌড়ে গেলাম কিন্তু না এখন দরজা খুলনার,বাবার ভালোবাসা পাবার অধিকারটা অন্য কারোর!
বাসায় ঢুকতেই নতুন মা পানি দিলেন বাবাকে-
ঢকঢক করে পানি খেয়ে উনি নতুন মা কে বললেন-
আজ লাল শাড়িটা পড়ে বের হওয়া ঘুরতে যাবো!
আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নী।
আমাকে একনজর দেখার সময় কারোর হয়না অথচ তারা ঘুরতে যাবে!

এখন পুরো বাসাতে আমি একা!
তারা ঘুরতে গেছে!
আব্বু রাও এখন তিন সদস্যের হ্যাপি ফ্যামেলি!
আম্মুর বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার একমাস অন্তর বাসায় একটা আম্মুর বয়স্ক মহিলা আর একটা চার বছরের পিচ্চি মেয়ে এসেছিলো!

তারা আব্বু-আম্মুর বেড রুমেই থাকতো!ভেবেছিলাম মেহমান হয়তো-
যখন আমি গিয়ে বললাম- আপনাদের জন্য গেস্ট রুম আছে!উনি আমার চুলের খোপা ধরে টেনে নিয়ে একটা রুমে বন্ধ করে দিয়েছিলো!

পরক্ষনেই তাদের হাসির আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলাম!বুঝতে বাকি ছিলো না কিছু!
অনেক দরজা ধাক্কিয়েছি, চিৎকার করেছি কেউ দরজা খুলে নি,খাইতেও দিতো না ঠিক ভাবে!
যখন আমি আধমরা হয়েছিলাম ঠিক দুইদিনের মাথায় দুটো শুকনা রুটি আর সবজি জুটে ছিলো!এখন কাজ করলে দিনে একবার ভাত আর রুটি পাওয়া যায়!তখন শুধু একটি কথায় মনে হতো-
” আব্বু আমাকে না দেখে,না খাইতে দিয়ে কিভাবে তুমি এতটা সুখে আছো?”
বদ্ধ ঘরে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতো!
আমার মোবাইল ছিলো আম্মুকে অনেকবার কল করেছিলাম কিন্তু
রিসিভ হয় নি!

কিছুক্ষন পরে যখন কল আসে চোখের পানি ছেরে বলেছিলাম-
“মা আমাকে নিয়ে যাও,আমার এখানে অনেক কষ্ট হচ্ছে”!
কিন্তু তখন বড় মামীর বিকট হাসির শব্দ শুনতে পাই!
কল কেটে যায়!

পরে জানতে পারি সেদিন রাতেই মায়ের বিয়ে হয়ে যায়!
নানুভাই-নানীমা কে কল করেছিলাম কিন্তু যা শুনেছিলাম তারপর আর ইচ্ছা হয়নি কখনও তাদের ভয়েস শুনার!
আগে কখনও একা ঘুমোতে পারতাম না আর এখন নাকি অন্ধকার ঘরই আমার চিরস্থায়ী ঠিকানা!
ভেজা চোখে আকাশ দেখি!
শেষ যেদিন জানালার গ্রিল দিয়ে আম্মুকে অন্য একটা বয়স্ক লোকের সাথে পাশাপাশি রিকশাতে হাসতে হাসতে যাইতে দেখি অনেক খুশি হয়েছিলাম!
মা অনেক ভালো আছে তাহলে!
এরপর আর এই একবছরে দেখা হয়বি, মা কখনও হয়তো আমার সাথে যোগাযোগ করতেও চায় নি!
প্রথমে রুম থেকে বের হইতাম না এখন হই বাসার কাজের জন্য!
বাসায় কাজের লোক বলতে একটা আন্টি ঠিকই আছে তবুও আমাকে করতে হয়!
এখন আমি কাপড় ধুই,বাচ্চাটাকে সমলায়,প্লেট মাজি,ঘর মুছি,জুতা পালিশ করে দেই আরোও কত্ত কিছু!
সবই পারি না পারলে নতুন মা আমাকে লাঠি দিয়ে আদর করে দেয় নতুবা চুলের মুঠি ধরে বলে-
” মুখ পুরি তুই মরতে পারিস নাহ”
আমি কিচ্ছু মনে করি না!
আমাকে আমার বাবার সামনে যেতে দেয় না তবে আড়াল থেকে যে দেখতে পাই তাতেই শান্তি লাগে বেশ!
নতুন মা আমাকে একটা নাম দিয়েছে, পরিচয় দিয়েছে-
আমার অনেক পছন্দও হয়েছে!
এতটাই আনন্দিত যে খুশিতে কঁেদে দিয়েছিলাম সেইদিন!
মেহমান আসলেই মূলত আমাকে এই নামে ডাকা হয়!

কিছুদিন আগেই আমার নতুন নানা-নানি এসেছিলো তাদের সামনে নিজের আব্বু বলেছিলো এ-ই কাজের মেয়ে আমার শশুর-শাশুরির আপ্যায়ন ঠিকভাবে করো তাহলে ঈদে নতুন কাপড় কিনে দিবো!সেই যে এভাবে বদলে গেছিলো না শুনলে বুঝতামই না!
প্রচন্ড খুশি হয়েছিলাম সেদিন!

একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম! আর আজই সেই মস্ত বড়ো সুযোগটাহ পেয়েছি! বাসাটা যে এখন ফাকা! নতুন মাঝে এ-র ইচ্ছেটা আর কিছুক্ষন এ-র মধ্যেই পূরন করবো! সেই আর আমাকে মুখপুরি ডাকতে পারবে না! নতুন কাজের মেয়ে খুজে নিবে!

অস্ত করে হাতটা কেটে আমার রুমের আয়নাতে গিয়ে লিখেতে শুরু করলাম-
“চোখের পানি ঝড়ানোর থেকে রক্তগুলো ঝড়ালেই তো আপদটা বিদেই হতো!সুখে থাকতে পারতে!!”

এবার আব্বুর রুমের আয়নাতে লিখতে শুরু করলাম-
“নিজের যত্ন নিও আব্বু,
অনেক ভালোবাসি!
সুখে থেকো তোমরা!”

আর একটা চিঠি লিখেছি তবে সেটা কলম দিয়ে-

মা!- বাবা-
তোমায় আজও ভালোবাসি!
তবে আর কখনও শুনবে না শুনতে পাবে নাহ!
আমার চিৎকার কান্না কোন কিছুই তুমি নামক ভালোবাসা পর্যন্ত পৌছায় নি!! তোমরা তোমাদের নতুন জীবন নিয়ে এতটাই হাসি-খুশি আর ব্যাস্ত যে আমিও যে তোমাদেরই ভালোবাসার ফসল সেটা ভুলে গেছো! তোমাদের পৃথিবীতে আমার জায়গা নেই বলেই আমাকে চলে যেতে হচ্ছে তোমাদেরকে না দেখেই নয়তো বড্ড ইচ্ছে ছিলো তোমাদের সাথে বাঁচার!
শুধু ইচ্ছেগুলো অপ্রাপ্তির তালিকায় নেই কো মা তোমাদের ভালোবাসাটাও এখন অপ্রাপ্তি হয়ে উঠেছে!
আমিও ভালো থাকবো আব্বু অনেক ভালো থাকবো তবে পার্থক্য একটায় তোমরা এ-ই দুনিয়াতে আর আমি অন্ধকারে! দশ মাস দশ দিন পেটে ধরে কি এমন হলো মা বলো যদি এতো কষ্টই দিলে!!তোমার হাসি মুখটা খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তবে উপায় নেই!
যাই হোক ভালো থেকো।
অযত্নে চলে যাবার সময় হলেও বলছি-
“নিজেদের খেয়াল রেখো মা!

আম্মুর বিয়ের ওরনাটা আমার রুম থেকে নিয়ে ডাইনিং রুম এ-র ফ্যানের সাথে পেঁচিয়ে দিলাম, খেয়ালই করি নি যে আমার রক্তে ফ্লোর লাল হয়ে গেছে!

একটা টুল এ-র উপর পা দিয়ে হাসি মুখে ওরনাটা গলায় পেঁচিয়ে নিয়ে টুলটা ফেলে দিয়ে যখন আমার জীবনটা চলে যাচ্ছিলো,শরীর ব্যাকা হয়ে আসছিলো, চোখ থেকে পানি পড়ছিলো,ছটফট করছিলাম দেখলাম মা দৌড়ে আসছিলো!
কিন্তু ততক্ষনে না ফেরার দেশে সবাইকে মুক্তি দিয়ে চলেই যাচ্ছিলাম!!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত