লিলিয়া আর চার পুতুলের গল্প

লিলিয়া আর চার পুতুলের গল্প

রুশ দেশে এক ছুতোর ছিল। সে ছিল ভারী ভুলোমন। একদিন রাজার বাড়ি থেকে কাজের ডাক পেয়ে তড়িঘড়ি সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। সে ভুলেই গেলো বাড়িতে ছিল তার তিন বছরের ফুটফুটে মেয়ে লিলিয়া। বাড়িতে কেউ নেই যে লিলিয়াকে দেখবে।

কিন্তু কিছুক্ষণ আগেই ছুতোর তৈরি করে গিয়েছিল চারটে লাল টুকটুকে মাত্রুস্কা পুতুল। তাদের খুব মায়া হল লিলিয়াকে দেখে।

বড় পুতুল বলল,
“কেঁদোনা গো মেয়ে
এই দেখো চেয়ে
আমি ভাজি পিঠে
খেতে বড় মিঠে
মুচমুচে খাস্তা
করে নাও নাস্তা “

অমনি সে রান্না ঘরে গিয়ে দুধ , ময়দা , চালের গুঁড়ো , গুড় দিয়ে এমন সুন্দর পিঠে করে আনল যে কী বলব!
মেজো পুতুল বলল,

“আমি বুনি মোজা
উল্টো ও সোজা
টুপি , সোয়েটার
কেঁদোনা গো আর”

অমনি সে লিলিয়ার জন্য রংবেরঙের উল দিয়ে নরম আর গরম সোয়েটার বুনে দিল।
সেজো’জন বলল

“আমি গান জানি
আর জানি ছড়া
এদেশের ওদেশের
গল্পও পড়া”

অমনি সে মজার মজার গান, গল্প, ছড়া শুনিয়ে লিলিয়াকে ভুলিয়ে রাখল।
ছোটজন বলল

“আমি জানি খেলা
লুকোচুরি , কানামাছি,
খেলি সারাবেলা ”

ব্যাস লিলিয়ারও খেলার সঙ্গী জুটে গেলো।

এমনি করে লিলিয়া সেই বাড়িতে বড় হতে লাগল। কিন্তু ছুতোর ফিরল না। আগেই বলেছি সে ছিল বড় ভুলোমন।
পুতুলেরা সারাদিন লিলিয়ার সঙ্গে কাটাত তারপর রাত্রে আবার ঘুমিয়ে পড়ত।এক সকালে পুতুলেরা ঘুম থেকে উঠে দেখে লিলিয়া বাড়িতে নেই। চারিদিকে তো ঘন জঙ্গল! পুতুলদের মাথায় হাত! কোথায় গেলো লিলিয়া? কিন্তু গতরাতে খুব বৃষ্টি হয়েছিল। উঠোনে তারা বড় বড় থাবার ছাপ দেখতে পেল।সেই ছাপ উঠোন হয়ে জঙ্গলের মধ্যে মিলিয়ে গেছে।

পুতুলেরা কাঁদতে কাঁদতে লিলিয়ার নাম ধরে ডাকতে ডাকতে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলল,

“ছোট্ট মেয়ে লিলিয়া
কোথায় গেলি মা?
বাঘ নিলো, না ভালুক নিলো
খ্যাঁকশেয়ালের ছা “

অমনি রাস্তায় হালুম হুলুম করে একটা বাঘ এসে হাজির। বাঘ বলল ,

“হারিয়েছে কী ? ছোট্ট খুকি ?
দোষ নেইতো আমার
চুলে ছিল মোরগ ঝুঁটি
হলুদ রঙের জামা ?”

সবাই বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ সেই তো আমাদের লিলিয়া! কে নিয়ে গেছে বল তো?” বাঘ ভয়ে ভয়ে বলল,

“আগুনমুখো ড্রাগন সে এক
চুপকাবরার ভাই
বিশাল ছায়া, বন পাহাড়ে
বাঘ দেখলেও খায় “

এই শুনে তো চার পুতুল আঁতকে উঠল। রাত্রি হওয়ার আগেই তাদের লিলিয়াকে খুঁজে আনতে হবে।আরেকটু পথ যেতে সামনে এলো ভালুক আর খ্যাঁকশিয়াল। তারাও সেই একই কথা বলল।বিকেল হওয়ার মুখে চার পুতুল ক্লান্ত হয়ে একটা বিশাল গুহার সামনে এসে দাঁড়াল।দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেজো পুতুল হঠাৎ সুর করে গেয়ে উঠল,

“আগুনমুখো ড্রাগন সে এক
চুপকাবরার ভাই
বিশাল ছায়া, বন পাহাড়ে
বাঘ দেখলেও খায় “

এই না শুনে গুহার মধ্যে থেকে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে এল সেই বিশাল আগুনমুখো ড্রাগন। রেগে গিয়ে বলল,

“এই তো দিব্যি ঘুমিয়েছিলুম ,
খাটাখাটনির পর,
কে রে এসে ঘুম ভাঙালি?
এবার পুড়ে মর”

বলে সে মুখ থেকে এমন আগুনের হলকা বের করলে যে সেজো পুতুলের মুখটাই পুড়ে গেল।

তখন বড় পুতুল বলল, “এই যে আগুনমুখো শোন না বাপু, একটু আমাদের ওই একরত্তি মেয়েটাকে ফেরত দিয়ে দে। ঐটুকু মেয়েকে খেয়ে তোর পেট ভরবে না। তার থেকে আমি তোকে নুডল খাওয়াব, পাস্তা খাওয়াব, চাইনিজ খাওয়াব। যা যা খেতে খেতে ভালোবাসিস সব খাওয়াব।”

ড্রাগন মুখ ভেটকে বলল,”চায়নাতেই তো থাকতাম। ওসব খেয়ে খেয়ে জিভে চড়া পড়ে গেছে।” তখন মেজো পুতুল বলল, “তোর জন্য সোয়েটার বুনে দেব। শীতে ঠাণ্ডা লাগবে না। লিলিয়াকে ফিরিয়ে দে। ” ড্রাগন এবারে হেসে কুটিপাটি। বলে,”ওরে বোকা পুতুল, আমার মুখ দিয়েই তো আগুন বেরোয়। আমার আবার ঠাণ্ডা লাগবে কেন ? তোরা যা তো এখান থেকে।”

তখন ছোট পুতুল বলল, “তুই তো একটা বোকা ড্রাগন। তুই কি কোনো খেলা জানিস? খেলায় জিততে পারলে তবেই না তোর শক্তি মানব।” ড্রাগন ভেবে বলল,”খেলাটা কী জিনিস ?”

ছোট পুতুল বলল,”এই খেলাটার নাম হচ্ছে লুকোচুরি। তুই লুকোবি আমরা খুঁজব। তোকে খুঁজে পেয়ে ধাপ্পা দিলেই তুই খেলায় হেরে যাবি।” ড্রাগন হা হা করে হেসে বলল,”এ তো খুবই সহজ খেলা।”

“হ্যাঁ। এবারে আমি চোখ বন্ধ করে হাজার গুনব। তার মধ্যে লুকোতে হবে। এই এক , দুই , তিন… “

অমনি ড্রাগন সরসর করে মাটির তলায় সেঁধিয়ে, পাতালে চলে গেল। তখন সব পুতুল একসঙ্গে লিলিয়ার নাম ধরে ডাকতেই সে গুহার মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল। তারপর সবাই হাত ধরাধরি করে বাড়ির দিকে চলল। এর মধ্যে সেই ছুতোর বাড়ি ফিরে এসে মেয়ের সঙ্গে মাত্রুস্কা পুতুলদের দেখে আহ্লাদে আটখানা। জঙ্গলে লিলি ফুল দেখে তার লিলিয়ার কথা মনে পড়ে গেছে। সেজো পুতুলের পুড়ে যাওয়া মুখখানা সে আবার ঘষে মেজে,রং করে দিল। এরপর তারা সবাই আনন্দে পিঠে, পাস্তা খেয়ে থাকতে লাগল।

আর ড্রাগন এখনো পাতালে অপেক্ষায় আছে, কে এসে তাকে ধাপ্পা দিয়ে যাবে। সে বেচারা হাজার অব্দি গুনতেও জানে না।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত