বিবাহভঙ্গ

বিবাহভঙ্গ

আব্বা এবার বিয়ে করিয়ে ছাড়বেন৷ এবার আর রক্ষা হবে না ধরেই নিয়েছি৷ পাশের বাসার আন্টিটাও নেই আজ৷
পাত্রী দেখে আসার পরই আন্টিকে ফোন দিয়েছিলাম৷ আন্টি রিসিভ করলো৷ ভীষণ হইহুল্লোড় চারিপাশে৷
ফোন ধরতেই বলল,
চাচাত ভাইয়ের বৌ এর খালাতো বোন এর দেবরের বিয়েতে এসেছি৷ এখন মুখে মেকাপ মাখছি৷ পরে ফোন দিস বাপ!”
আন্টির কথাশুনে থ হয়ে ছিলাম আমি৷ মানে একটা মানুষ এমনভাবে কেমনে বিয়ে খায়তে পারে আমি বুঝে উঠতে পারিনা৷

এদিকে আব্বা তোড়জোড় শুরু করেছে৷ আজ পাত্রী দেখে এসেছি৷ কাল পাত্রীর সাথে সারাটা দিন ডেটিং করতে হবে৷
পরশু আগদ পরিয়ে দেয়া হবে৷
সেই হিসেবে আজই করতে হবে যা করার৷ আন্টিকে আজ আর পাওয়া যাবে না৷
যা করার নিজে নিজেই করতে হবে৷ যে করেই হোক বিয়ে রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না৷
আমি বিয়ে রুগী হয়ে শুয়ে বসে খেয়ে দেয়ে বাঁচতে চাই৷

নির্ধারিত সময়ের ১০মিনিট পরেই পৌঁছালাম৷ সময় জ্ঞানটা আমার একদম নেই৷ ভার্সিটি লাইফে খুব কম দিনই আছে, যেদিন আমাকে দৌঁড়াতে হয়নি ক্লাসে ঢুকার জন্য৷
দেখা করার কথা ছিল রেষ্টুরেন্টে৷ রেষ্টুরেন্টের বিলটাাও আব্বা আমার পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েছিল৷
এদিকে আমি কন্যাকে রেষ্টুরেন্টের এসির হাওয়া সাথে আরো কয়েকটা অপকারিতা বুঝিয়ে পার্কে দেখা করার কথা বলেছি৷ লেমন জুসের বদলে ৫টাকার বাদাম দিয়ে চালিয়ে দিবো৷
বেশি বাড়াবাড়ি করলে বড়জোর ফুচকা গেলাবো৷
কন্যার ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে উনিও রাজি৷ কিন্তু আমি কিছুতেই বিয়ে করতে চাই না৷
আমি চুপচাপ বসে আছি কন্যার পাশে৷ আর অপেক্ষা করছি, কবে কন্যা কাঁদো কাঁদো গলায় বলবে,
“শুনুন আবার বয়ফ্রেন্ড আছে! ওকে ছেড়ে আপনাকে নিয়ে কিছুতেই সংসার করা সম্ভব না আমার দ্বারা!”
কিন্তু তার কিছুই হলো না৷ আমার মনে পরলো এসব গল্পে বা নাটকে হয়৷

মিনিট দশেক পর কন্যাকে বললাম,
-আপনি কি রাজি?
-জ্বী৷ আপনি?
লজ্জামাখা কন্ঠে বলল৷
-হ্যা আমিও রাজি৷ কিছু কথা বলি?
-হ্যা বলুন৷
-একসাথে সংসার করতে গেলে, কিছু জিনিস সেক্রিফাইস করতে হয় জানেনতো?
-জ্বী জানি৷
-আমার কিছু বদঅভ্যাস আছে৷ মেনে নিতে পারবেন?
-সমস্যা নেই৷ বিয়ের আগে সবাই দু’চারটা গফ আর পকেটে সিগারেট নিয়ে ঘুরে৷ বন্ধুদের আড্ডাতে দু’এক প্যাক খাওয়াই যায়৷ আমি মানিয়ে নিবো!”
কন্যার এহেন কথা শুনে আমি ঢোক গিললাম৷ কাচুমাচু গলায় বললাম,
-না না এসব কিছু না৷ সাধারন বদঅভ্যাস৷
-বলুন শুনি৷
-এই ধরুন, রাত ৩টায় আমার হুট করে মাথা ব্যাথা উঠে৷ ঠিক তখনই আমার মনে পরে আগেরদিন সকালের চা টা আমি মিস করেছি৷ তখন আমার চা খেতেই হবে৷ বানিয়ে দিতে পারবেন?
-হ্যা পারবো৷ পরেরটা বলুন৷
-৪০॰তাপমাত্রার কাটফাঁটা রৌদ্দুরের খা খা ময় একটা দিনের শেষে যখন ঘরে ফিরি৷ গা দিয়ে ঘামের প্রচুর গন্ধ বের হয়৷ তাও আমার গোসল করতে আলসেমি লাগে৷ ওরকমই ঘুমিয়ে পরি৷ এবার বলুন,পাশে থাকতে পারবেন?

-ইয়ে মানে! পরেরটা বলুন৷

-সপ্তাহের একদিন আয়নার সামনে যাই আমি৷ চুল ঠিক করতে করতে দাঁতগুলো একবার দেখে নিই আয়নায়৷ ঠিক তখনই আমার মনে পরে, গত ৪দিন ব্রাশ করা হয়নি!”
কন্যার মুখের দিকে তাকালাম৷ চেহারাটা ঘিনঘিন করছে তার৷

-পরেরটা বলবো?
জিজ্ঞেস করি আমি৷
-হ্যা বলুন৷
-পাশের বাসার টিনা মেয়েটার কান্না আমি একদম সহ্য করতে পারি না৷ ওর বয়ফ্রেন্ড আছে একটা৷ শালা মাঝে মাঝে সুন্দরী টিনাকে ছ্যাকা দিয়ে বসে৷ টিনা তখন কাঁদে৷ টিনা আমার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদে৷ টিনা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে৷ আমি টিনাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে শান্তনা দিই! এবার বলুন, সহ্য হবে? পরেরটা বলবো আর?”
কন্যা উৎসাহের সাথে বলল,
-থামেন প্লিজ৷ এগুলো শুনেই আমার বমি এসে যাচ্ছে৷ যখন বাস্তবে দেখবো খুব সম্ভবত আমি বমি করেই মরে যাবো৷”
-আসুন ফুচকা খায়!
-না থাক৷ধন্যবাদ৷
মোটামুটি ধরনের একটা অপমান করে কন্যা প্রস্থান করলো৷ আমি পকেট থেকে আবুল বিড়ির টোঙ্গাটা বের করে হাঁটা দিলাম বাসার দিকে৷

ঘরে ঢুকতেই আব্বার সাথে দেখা৷ বাসায় থমথমে অবস্থা৷ মাথার উপরে সিলিং ফ্যানটা ঘুরছে৷ তারপরও আম্মাকে দেখলাম, আব্বার পাশে দাঁড়িয়ে হাতপাখা নাড়াচ্ছেন৷
মানে সংকেত দিচ্ছেন, তোর আব্বা রেগে আছে৷

আমি আব্বার চোখে চোখে তাকাতে তাকাতে টুপ করে রুমের মধ্যে ঢুকে পরলাম৷ রুমে ঢুকেই দরজা বন্ধ৷ আহ! কি প্রশান্তি৷
চোখ বুজতেই দরজায় টুকটুক শব্দ৷ আমি প্রাণ আত্মা কেঁপে কেঁপে উঠছে৷
আমার ভয়টায় ঠিক হলো৷ দরজার সামনে রুদ্রমূর্তিতে দাঁড়ানো আব্বা৷
খপ করে আমার হাতটা ধরে খাটে বসালেন৷
আমি অসহায় চোখে আব্বার দিকে তাকালাম৷
-তুই মেয়েটাকে কি বলেছিস?
-ইয়ে মানে৷
-রাত ৩টায় মাথাব্যাথা উঠলে চা গিলতে হয় তোমার?
-হ্যা বলেছি৷
-গোলামের ঘরের গোলাম৷ তুই চা খেয়েছিস কবে মনে আছে? তোর মা জোর করেও তোকে চা খাওয়াতে পারে?
-জ্বী না আব্বা৷
-তারপর কি বলেছিস?
-৪০॰তাপমাত্রায় বাইরে থেকে ঘরে ফিরে গোসল করিনা!
-৪০॰গরমে বাসা থেকে বের হয়েছিস কখনো? গরম আসলে আমার রেগুলার পানির মোটর চালাতে হয় শুধু তোর জন্য৷ আর তুই কিনা!ছিহ! তারপরেরটা বল৷
-দাঁত ব্রাশ করি না!
-হারামির বাচ্চা, সেদিন সকালে দেখলাম টুথপেষ্ট শেষ হয়ে যাওয়াতে পুরনো টিউবটাকে রুটির বেলার কুন্তি দিয়ে টেপা শুরু করেছিলি! তুই ছেলে নামের কলঙ্ক৷
যাক,তারপরেরটা বল৷
-পাশের বাসার টিনা মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে শান্তনা দিই৷
-রাহেলা রুটি বেলার বেলনটা আনো৷ মাথা ফাটিয়ে ফেলবো আজকে!
-ক্যান আব্বা?
-পাশের বাসার টিনা মেয়েটা ২বাচ্চার মা৷ স্বামী সহ আমেরিকা থাকে৷ আর তুমি থাকে শান্তনা দাও৷”
আব্বার কথা শেষ হতেই আম্মা বেলনটা এনে দিলো৷ আমি বারি খাওয়ার আগেই বেহুশ হয়ে গেলাম৷ না কুন্তির ভয়ে না৷
টিনা মেয়েটাকে একসময় আমি কাঁধে করে নিয়ে ঘুরতাম৷ পিচ্চি একটা মেয়ে ছিল৷ আজ নাকি ২বাচ্চার মা৷
না এটা মেনে নেয়া যায় না৷

চোখে পানি ছিটিয়ে আব্বা জ্ঞান ফেরালেন৷ আমি উঠে বসতেই শার্টের কলার খপ করে ধরে বললেন,
-তোকে আমি বিয়ে করাবোই৷ টিনার মতো পিচ্চি মেয়েটা ২বাচ্চার মা৷ আর তুই বিয়েই করতে পারলিনা৷ লজ্জা করেনা?”
-হ্যা করে৷
লজ্জার ভং ধরে বললাম আব্বাকে৷
-তাইলে বল কেমন মেয়ে দেখবো?
-বিয়ের পর আমাকে আমেরিকা নিয়ে যাবে এমন মেয়ে দেখো!”
কথা শেষ হতেই আব্বার হাতের বেলনের বারি খেয়ে আবারো অজ্ঞান হয়ে গেলাম৷

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত