বিয়ে বেঙে দাও

বিয়ে বেঙে দাও

নিধান ঠিক এই মুহূর্তে বুঝে উঠতে পারছেনা তাঁর কি করা উচিত। ঘরের ভেতরে প্রভা ফ্যানের সাথে দড়ি বাঁধছে।প্রবেশ পথ বন্ধ।জানালা দিয়ে নিধান দেখছ এবং ভাবছে “দরজা ভাঙা ঠিক হবে কি না!” অতঃপর সে বাধ্য হলো।চেয়ারে প্রভা উঠে পড়েছে।এখন গলায় দড়ি পড়া বাকি। সাথে সাথে দরজায় লাথি মেরে নিধান ঘরে প্রবেশ করলো। তারপর প্রভাকে নিচে নামিয়ে গালে ঠাস করে এক চর।

– মাথায় কি জ্ঞান বুদ্ধি নেই?মরতে যাচ্ছিলেন কেন?জানেন আপনার এই এক ভুলের জন্য আমাদের বাড়ি ভাড়া দিতে কত ঝামেলা পোহাতে হতো। প্রভা কান্না করছে,বিরতিহীন কান্না। নিধান পকেট থেকে টিশু পেপার বের করে দিয়ে বললো “আপনার মরা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই।কিন্তু সমস্যা হচ্ছে,আমি ভূতে বিশ্বাসী।তাই আপনি যদি মোটামুটি দেড় দুই কিলোমিটার এড়িয়ার মধ্যে মরেন তাহলে আমার রাত দশটা পর্যন্ত ঘুরাঘুরি বন্ধ হয়ে যাবে।বুঝতে পারছেন,ভূতুরে ব্যাপারস্যাপার।” নিধানের কথা শুনে প্রভা কি বলবে খুজে পাচ্ছেনা।তবে কান্না নামে শব্দটা বিলীন হয়ে গেছে।

– আপনি কি কথা বলতে পারেননা বলে মরতে গেছিলেন?
– এত বেশি কথা বলেন কেন?
– তারমানে গলার পার্স পাতি ঠিক আছে।
– মানে?
– মরতে গেছিলেন কেন?
– আগে বলেন,আমায় মারলেন কেন?আমার আব্বু আম্মু আজ পর্যন্ত ঝাড়ি দিয়ে কথা বলেনি,আর আপনি আমায় মারলেন।
– আমি আপনার আব্বু আম্মু না।চোখের সামনে আবার কখনো এমন করতে দেখলে দ্বিতীয়বার মারতে আমার হাত কাঁপবে না।
– সাহস তো কম না।কোথায় সরি বলবেন তা না করে বড় বড় কথা বলছেন।
– সরি?ম্যাডাম,সভ্যতা অনুযায়ী আপনার ধন্যবাদ দেওয়া উচিত।
– ধন্যবাদ না ছাই।আবাল কোথাকার,যান ভাগেন।

নিধান রেগে গেলো।কিন্তু রাগ প্রকাশের ইচ্ছা তাঁর নেই।সে রাগে গজগজ করতে করতে রুমে এসে টিভির সামনে বসে গেলো। কলিংবেল বাজছে। আওয়াজ পেয়ে শাহেলা বেগম দরজা খুললেন।সামনে হলুড ড্রেসে এক কন্যা দাঁড়িয়ে।মুখে মিষ্টি হাসি।চোখে টানা মাশকারা।ঠোঁটে গোলাপি লিপস্টিক।দুধে আলতো গায়ের রঙ।

– কে মা তুমি?
– আসলে আন্টি!
– বলো।
– আমি নিধানের বউ।
– কি?
– জ্বি,কিছুদিন আগে মতিঝিল কাজি অফিসে আমাদের বিয়ে হয়েছে।
– মানে?
– নিধান আমায় সাথে করে বাসায় আনতে চেয়েছিলো,আপনার ভয়ে আনেনি।আপনি কি রাগ করলেন আন্টি?
– না না,রাগ করবো কেন!
– আমি ভেতরে আসবো?
– হ্যা মা।ভেতরে এসো।
– ঠান্ডা পানি হবে এক গ্লাস?
– তুমি বসো আমি নিয়ে আসছি।
– আচ্ছা আন্টি।

শাহেলা বেগম পানি আনতে গেলেন। অপরদিকে মেহমান এসেছে ভেবে নিধান গেস্ট রুমে প্রবেশ করলো।

– তুই?
– হ্যা।
– আমার বাসায় কি?
– খেতে আসলাম।
– আম্মু কিছু বলেনি?
– সুযোগ দেইনি।বলেছি আমি তোর বউ।
– কিইই?আজ আমি শেষ।
– হিহিহি।
– মজা পাচ্ছিস?
– খুব।

এর মধ্যে আবার কলিংবেল বাজলো। নিধান উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখে প্রভা।

– আন্টি কোথায়?
– জানিনা।
– ডেকে দেন,দরকার আছে।
– আপনি আমার আম্মুকে চেনেন?
– আমার আম্মুর বেষ্ট ফ্রেন্ড।সো,না চেনার কারণ খুজে পাচ্ছিনা।
– পেচিয়ে কথা বলা কি আপনার জন্মগত রোগ?
– পেচিয়ে কথা বললাম কখন?
– আম্মু বাসায় নেই।

ভাগ্যক্রমে ঠিক তখন শাহেলা বেগম রুমে প্রবেশ করলেন। শাহেলা বেগম মিহি’র হাতে পানির গ্লাস দিয়ে বললেন “প্রভা মামনি তুমি?” প্রভাব ভ্রু কুচকে জিজ্ঞাসা করলো “এই মেয়ে কে আন্টি?”

– নিধানের বউ।
– আপনি শিওর?
– হ্যা।
– তাহলে আকিল ভাইয়ার গার্লফ্রেন্ড কে?

মিহি হালকা কেশে উঠলো। শাহেলা বেগম চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞাসা করলেন “ভালোভাবে বলতো মামনি।” প্রভা মিহি’র দিকে একবার তাকিয়ে বললো “আকিল আমার মামাতো ভাই।ভার্সিটি লাস্ট ইয়ার্স।এই আপুটার সাথে আকিল ভাইয়ের সাত বছর রিলেশন।বাসায় সবাই জানে।বিয়েও ঠিক।ভাইয়া বেড়াতে এসে বলেছে।মোবাইলেই আপির ছবি দেখেছি।আমার কাছে দুইটা ছবিও আছে।দেখাবো?” মিহি গ্লাস টেবিলে রেখে “কোনভাবে বললো,আন্টি আমি আসি।দোস্ত কাল ক্যাম্পাসে দেখা হবে।” এরূপ কান্ডকারখানা দেখে প্রভা হেসে ফেললো।নিধান মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলো সে হাসির দিকে। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। শুরু হয়েছে দমকা হাওয়া।প্রভার বাবা-মা কেউ বাসায় নেই।দুজনে অফিস নিয়ে ব্যস্ত। ভয়ে প্রভা কুপোকাত।আর থাকতে না পেরে সে শাহেলা বেগমের নিকট চলে গেলো। ভাগ্যক্রমে শাহেলা বেগম বাসায় নেই। দু’বার কলিংবেল চাপার পর নিধান দরজা খুলে দিলো।

– আন্টি কোথায়?
– নানুর বাসায় গেছে।
– ভেতরে আসতে বলবেন না?
– আমি ফ্লাটে একা।
– সমস্যা নেই,রুমে আমার ভয় লাগছে।
– তাহলে চলে আসুন।
– ধন্যবাদ।

নিধান জবাব দিলোনা। প্রভা সোফায় অনেক্ষণ যাবত চুপচাপ বসে আছে।মুখে টু শব্দ নেই। একটি মেয়ের জন্য এটা খুবই কষ্টের।কথা বলা যেন কিছু মেয়ের প্রাণ।না বললে এই বুঝি মিলিয়ে যাবে। প্রভার মাঝে এক ছটফট ভাব প্রকাশ পাচ্ছে।সে যেন সহ্য করতে পারছেনা। ব্যাপারটা নিধান বুঝতে পেরে কিজ্ঞাসা করলো “কিছু বলতে চাচ্ছেন?” প্রভা কানের কাছে চুলগুলো গুজে দিয়ে বললো “কই নাতো।”

– ও আচ্ছা।
– আপনি জানেন?
– কি?
– না কিছুনা।
– ওকে।
– একটা কথা বলবো?
– বলেন।
– আপনার জিএফ নেই?
– যেটা বলতে চাচ্ছেন সরাসরি বলেন।
– আসলে!
– আপনার আমার বিয়ের ব্যাপারটা?
– আপনি জানেন?
– হুম।
– রাজি হয়েছেন?
– আব্বুর কথার ওপরে কথা বলার ক্ষমতা আমার নেই।
– ওনার মতের বাহিরে আপনার মত কি?
– ‘না’ বলার যুক্তি খুজে পাচ্ছিনা।
– সেদিন সুইসাইড কেন করতে গেছিলাম জানতে চাইবেন না।
– বলতে পারেন।
– আমি এই বিয়েতে রাজি না।
– পছন্দের কেউ আছে?
– না।
– তাহলে?
– আপনায় ভাললাগেনা।
– অপমান করছেন?
– প্লিজ,বিয়েটা ভেঙে দেন।
– শিওর?
– হুম।
– চেষ্টা করবো।ঝড় থেমে গেছে।আকাশ পরিস্কার।আপনি চাইলে এখন আসতে পারেন।
– আর কিছুক্ষণ থাকি?
– না।

প্রভা একপ্রকার রেগে উঠে গেলো। নিধান সোফায় বসে ভাবছে মাত্র ঘটে যাওয়া কর্মকাণ্ড গুলো। বিয়েটা ভেঙে দেওয়া কি আদৌ ঠিক হবে? শাহেলা বেগম গাড়িতে উঠতে যাবেন,ঠিক সেই মুহূর্তে প্রভা ছাদ থেকে জিজ্ঞাসা করলো “কোথায় যাচ্ছেন আন্টি?” শাহেলা বেগম মন খারাপ করে জবাব দিলেন “নিধানের জন্য মেয়ে দেখতে।” বাক্যটা শোনা মাত্র প্রভার মন খারাপ হয়ে গেলো।ব্যাপারটা সে সহজ ভাবে নিতে পারছেনা। মনের অজান্তে চাপা ব্যথা অনুভব হচ্ছে। প্রভা গালে হাত দিয়ে ভাবলো “সে কি নিধানের প্রেমে পড়ে গেছে?” খুবই জটিল বিষয়।বিষয়টা নিয়ে ভাবতে হবে। প্রভা তাই করলো। সারাক্ষণ ভাবতে লাগলো। কিন্তু উত্তর মিলছেনা।

একপর্যায়ে গাড়ি ফিরে এলো।সময় তখন বিকেল পাঁচটা। গাড়ি থেকে এক এক করে সবাই নামছে।শেষে নামলো নিধান এবং নেহা। ব্যাপারটা প্রভার চোখ এড়ায়নি।মনে তাঁর প্রশ্ন জাগ্রত হলো,’মেয়েটা কে?যাবার সময় তো সাথে যায়নি।’ প্রভা নিজে নিজে উত্তর বের করলো ‘সম্ভবত নিধানের বউ।মেয়ে পছন্দ হয়েছে বলে আজকে বিয়ে করে নিয়ে চলে এসেছে।’ সাথে সাথে প্রভার মাথায় চক্কর দিলো।নিজের উত্তরে যে সে নিজেই আহত। ছোট্ট বিষয়টা প্রভা মেনে নিতে পারছেনা। অতঃপর বাধ্য হয়ে সে নিচে নেমে গাড়ির কাছে গেলো।

– আন্টি এই মেয়ে কে?(প্রভা)
– কেন?(শাহেলা)
– যাওয়ার সময় তো আপনাদের সাথে ছিলোনা।(প্রভা)
– আমায় নিয়ে কি কোন সমস্যা হচ্ছে আন্টি?(নেহা)
– না,সমস্যা হবে কেন?(শাহেলা)
– নাম কি তোমার?(প্রভা)
– নেহা।
– কিসে পড়?(প্রভা)
– অনার্স ফাস্ট ইয়ার্স।(নেহা)
– এখনো তো বাচ্চা মেয়ে।বিয়ে করেছো কেন?(প্রভা)
– মানে।(নেহা)
– তারমানে জাস্ট ইংগেজমেন্ট হয়েছে।(প্রভা)
– কি যা তা বলছেন।(নেহা)
– যা বলছি তোমার ভালোর জন্য বলছি।বিয়ে ভেঙে দাও।ছেলে একদম বজ্জাত।নেশা করে,মেয়েদের পেছন পেছন ঘুরে।(প্রভা)
– কোন ছেলে?(নেহা)
– নিধান,আফটার অল আমার পেটে ওর বাচ্চা।

আশেপাশে থাকা সবাই চোখ বড় বড় করে বললো “হোয়াট?” এবার প্রভা হুশ ফিরে পেয়েছে।অজানা চাপে সে কি থেকে কি বলে গেছে নিজে জানেনা। নেহা নিধানের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো “ভাইয়া,আপু যা বলছে তা কি ঠিক?” নিধান মুখ ঘুরিয়ে জবাব দিলো “এই মেয়ের মাথায় সমস্যা।”

প্রভা রেগে গেছে।নিধারের কলার ধরে বললো “সব সমস্যা তোকে নিয়ে।তুই কেন সামনে আসলি?ভাবছিলাম কখনো বিয়ে করবোনা।কিন্তু তোকে দেখার পর সব এলোমেলো হয়ে গেছে।আমি বলাতে কেন বিয়ে ভেঙে দিলি?ভেঙে দিয়ে আবার কেন অন্য মেয়ে ঘরে তুলে আনলি?আর এই মেয়ে কে?” নিধান ছোট্ট করে বললো “আমার খালাতো বোন।যেখানে মেয়ে দেখতে গেছিলাম সেখানে ওরা থাকে।তাই আসার সময় সাথে নিয়ে এসেছি।”

প্রভা কিছুটা লজ্জিত হলো। তারপর সব লজ্জা ছেড়ে আবার কলার ধরে জিজ্ঞাসা করলো “মেয়ে পছন্দ হয়নি তো?” নিধান হাসছে।মুচকি হাসার পর আস্তে করে জবাব দিলো “তোমার এই মায়া মাখা মুখ যতক্ষণ চোখের সামনে ভাসবে ততক্ষণ অন্য মেয়ে মনে প্রবেশ করে কিকরে?”

<সমাপ্ত>

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত