পাশের বাসার আন্টির উপকারিতা

পাশের বাসার আন্টির উপকারিতা

এদিকে বিয়ে রোগের নাম করে সারাদিন শুয়ে-বসে কাটাচ্ছি৷ কাজের ধারে পাশেও ঘেষছি না৷ আব্বা পারলে গলা টিপে মেরে ফেলেন আমাকে৷ আর আম্মার চেহারাটা দেখার মতো হয়েছিল৷

অবশেষে আমার উপর ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে আজকে মেয়ে দেখতে নিয়ে গেলেন৷ আমার বোনকে শ্বশুর বাড়ি থেকে আনা হলো৷ সেও সাথে গিয়েছে মেয়ে দেখতে৷
হরেক রকমের নাস্তা নিয়ে গেলাম সাথে৷ আব্বার নাস্তা কেনা দেখে মনে হচ্ছিল বিয়ে হয়েই যাবে৷

মেয়ে দেখতে শুনতে খারাপ না৷ মেয়ের বংশও ভালো৷ মেয়ে শিক্ষিত,স্মার্ট কোনোদিকেই কমতি নেই৷ মেয়ের নাম আনিকা৷
ঘরে ফিরতেই বোন জিজ্ঞেস করলো,
-কিরে পছন্দ হয়েছে?
-ভেবে বলবো!”
আমি ভেবে দেখার কথা বলতেই আব্বা চ্যাৎ করে উঠে বলল,
-এতদিন তো বিয়ে রোগ করে করে মরে যাচ্ছিলি৷ এখন আবার ভাবার কি আছে?
-আব্বা সারাজীবনের ব্যাপার৷ ভেবে দেখুক৷”
বলল ছোটবোন৷

আমি রুমের দরজা বন্ধ করে ভাবা শুরু করলাম৷ বিয়ে রোগের অযুহাত দিয়ে ঘুরে ফিরে খেয়েছি৷ আহা কি সুখের জীবন৷
বিয়ে হলেইতো বিয়ে রোগ সেরে যাবে৷ তখন আবার কর্ম করে খেতে হবে৷ বড্ড দোটানায় পরে গেলাম৷
ফোনটা বেজে উঠলো৷ রিসিভ করতেই বন্ধুর কন্ঠে উত্তেজনা৷ কারণ জিজ্ঞেস করতেই বলল,
-রহিমের বৌ পালিয়েছে!
-কাহিনী সত্যি?
-হ৷
-২টা পোলা ছিলো না রহিমের?
-হ৷ ঐগুলারে রেখে পালিয়েছে!”

বন্ধুর ফোনকল শুনে কলিজাটা ধরে গেল৷ রহিমের বৌ এর নাম ছিল জরিনা৷ অমায়িক একটা বৌ ছিল৷ এই মেয়ে এই কাজ কিভাবে করলো? ছেহ ছেহ!
দুশ্চিন্তায় মাথাটা ঝিমঝিম শুরু হয়েছে৷ নাহ এই বিয়ে করা যাবে না৷ আমি বিয়ে রোগী হয়ে থাকতে চাই৷ কিন্তু বিয়ে করতে চাই না৷
ফেসবুকে ঢুকে নিউজফিড উল্টাচ্ছি৷
নাহ কিছুতেই মাথায় ঢুকছেনা৷ কিভাবে বিয়ে ভাঙা যায়৷
ঠিক তখনই একটা ট্রল পেইজের ছবি পরলো সামনে৷
ছবিটাতে লিখা “নামের শেষ অক্ষরে A লিখা কন্যাদের স্বামী রেখে পালানোর সম্ভাবনা বেশি৷”
আমি হাসলাম একটু৷ পোলাপাইন আজকাল বড্ড পাজি হয়েছে৷ সম্ভবত ট্রলটা যে বানিয়েছে, তার প্রাক্তন প্রেমিকার নামের শেষের অক্ষর A ছিল৷

আরও কিছুক্ষণ ফেসবুকে ঘুরলাম৷ টেনশন একটু কমেছে৷ কিন্তু বিয়ে ভাঙার ফন্দি আটতে পারলাম না৷
ছোটবোন ডাকতে আসলো ভাত খাওয়ার জন্য৷ এতদিন বিয়ে রোগের অযুহাত দিয়ে রুমে বসে খেতাম৷ আজ বোন এসেছে তাই টেবিলে যাচ্ছি৷

আমার অপরপাশে আব্বা বসা৷ আম্মাকে আফসোসের স্বরে বলল,
-রহিমের বৌ টা পালিয়েছে৷ ছেলে দু’টোকে রেখে আহারে!”
আব্বার সাথে সাথে আম্মাও আফসোস শুরু করলো৷ সাথে ছোটবোনও যোগ দিয়েছে৷
ভাতের লোকমা গালে দিতেই বিয়ে ভাঙার নিন্জা টেকনিক এসে গেল মাথায়৷
গলায় বিজ্ঞ ভাব নিয়ে বললাম,
-আব্বা আমি বিয়ে করবোনা!”
আব্বা পারলে ভাতের প্লেটটা আমার দিকে ছুঁড়ে মারার অবস্থা৷ ছোটবোন পরিস্থিতি সামলে নিলো৷
তারপর আম্মা বললেন,
-কেন করবিনা বিয়ে?

-কারণ আছে৷

-কি কারণ?

-বৌ পালানোর সম্ভবনা আছে৷

-এ কেমন কথা? জৌতিষী নাকি তুই!

-হ্যা!

তারপর ট্রল পেইজের ছবিটা দেখালাম আব্বা-আম্মা কে৷ যেখানে লেখা আছে “নামের শেষে A থাকা মেয়েরা পালানৈর সম্ভাবনা থাকে৷”
ছোটবোনকে চোখ টিপ মেরে বোঝালাম তুই চুপ থাক৷
আব্বা কে বোঝালাম,
রহিমের বৌ এর নাম জরিনা৷ ইংলিশে লিখলে “JarinA”৷
মিনিট পাঁচেক পর বোঝাতে পারলাম,
রহিমের বৌ পালানোর একমাত্র কারণ নামের শেষে A থাকা৷”
আর আমার জন্য যে মেয়ে দেখা হয়েছে৷ তার নাম আনিকা৷
ইংলিশে লিখলে “AnikA”!
নামের শেষে A আছে৷
তাই এই বিয়ে কিছুতেই করা যাবে না৷”
আমি জানি এই যুক্তি কিছুতেই মানবেনা৷ মানার কথাও না৷ আব্বা এসবে বিশ্বাসী না
বিয়ে ভাঙতে আমি পাশের বাসার আন্টির দ্বারস্থ হলাম৷ বিয়ে ভাঙাতে আন্টির অভিজ্ঞতা দারুন৷
আন্টি যখন কাউকে বলেন,
ভাবি শুনছেন কান্ড!
তখন যেকোনো মহিলা সেটা শুনতে বাধ্য৷
আমার আম্মা আরো এক কাঠি উপরে৷
এই আন্টি আমার আম্মার জানের জান৷ আন্টির কথা আম্মা কিছুতেই ফেলেন না৷
আম্মার সিরিয়াল দেখার পার্টনার আন্টি৷ সেই হিসেবে আন্টি আমাকেও ভালোবাসেন৷
ভালোবাসার আরেকটা কারণ আছে বটে৷
আন্টি যখন সিরিয়াল দেখতে যায় টিভিতে৷
আমি চুপচাপ আন্টির হাতে রিমোর্টটা তুলে দিতাম৷
বিরতির ফাঁকে যাবতীয় সিরিয়ালীয় আলাপ করতাম৷
আম্মা আর আন্টি যখন গ্রাম থেকে আসা স্কুলে না পড়া ব্যারিষ্টার,ডাক্তার টাইপ সোনামণি বৌমাদের দুঃখে কাঁদেন৷
আমিও তখন কান্না শুরু করি৷
আন্টি কান্না থামিয়ে বলতো,
আপনারটা সোনার ছেলে আপা৷ আমারটাতো সারাদিন বসে বসে খেলা দেখে৷ কিন্তু আপনারটা তার উল্টো৷”

সেই হিসেবে আন্টির সাথে আমার খাতির৷ আন্টিকে কিছুক্ষণ বোঝালাম৷ আন্টি আমার মাথায় চটখানা মেরে বলল,
-তোরটা কোনো যুক্তি না বাপ৷ এই যুক্তি দেখালে তোরে ঝাটাপেটা করবে৷
-উপায়?
-সে নিয়ে তোর চিন্তা করতে হবে না৷ তুই বাসায় যা৷”

আন্টির কথামতো বাসায় ফিরে আসলাম৷ যথারীতি আন্টি আসলো সিরিয়াল দেখতে৷ আমার তখনই মনে পরলো আজ রবিবার৷ সিরিয়াল মোটামুটি বন্ধ৷
আন্টি এসেই আব্বা-আম্মাকে ডাকলেন প্রথমে৷ তারপর বললেন,
-ছেলের জন্য বৌ দেখছেন শুনলাম৷ সত্যি নাকি?
-হ্যা বোন৷
আম্মা জবাব দিল৷
-মেয়ে পালানোর ধুম পরছে শুনলাম চারিদিকে আপা৷ কি যে বলি আপা দুঃখের কথা৷ ঐযে সেদিন একটা বিয়ে খাইতে গেছিলাম৷ কি লক্ষী একটা মেয়ে ভেবেছিলাম৷ শেষে কিনা সোনার টুকরো ছেলেটাকে ফেলে চলে গেল৷
আমার ভাইয়ের বৌ এর মামাতো বোনের চাচাতো ভাইয়ের বৌ টাও পালিয়েছে আপা৷
ফুফাতো ভাইয়ের শালার বৌ এর চাচাতো ভাইয়ের বৌটা পালিয়েছে৷ পালানোর সময় কি করেছে জানেন?
-কি?
-ছেলের বংশের প্রদীপটাও নিভিয়ে দিয়েছে শুনলাম!”
আন্টির নিখুত অভিনয় দেখে অবাক হচ্ছিলাম৷ বংশের প্রদীপের কথা শুনে বুক ফেটে হাসি আসছিলো৷ তাও চেপে রইলাম৷
মনে মনে ভাবছি,
প্রদীপ কাটার সময় বেটা দুনিয়াতে ছিল না!
পরক্ষণেই মনে পরলো এটাতো অভিনয়৷
আবারো আন্টির অভিনয়ে মন দিলাম৷”

এবার আম্মা বলল,
-এখন কি করবো বোন?
-দেখেন আপা, ছেলের বৌ ভাগলে বৌ আরেকটা আনা যাবে সমস্যা নেই৷ কিন্তু এখন যা কাবিন ধরে আপা৷ আমাদের ছেলেতো টাকা কামায় না৷ টাকা দিবে কেমনে? শেষে না ছেলেটাও….”
এদিকে আম্মা কেঁদে দিবে কেঁদে দিবে অবস্থা৷ আম্মা একটু ইমোশনাল টাইপের৷
কেঁদে দিবো কেঁদে দিবো গলায় আব্বাকে বলল,
-আমার ছেলে বিয়েরোগীই থাক৷ তাও বিয়ে করাবোনা৷”
আমার মন পাখিটা লাফিয়ে উঠলো৷ আর মনে মনে বললাম,
হাতের ৫টা আঙুল যেমন সমান না৷ সব পাশের বাসার আন্টিরাও সমান না৷
ভালোবাসি পাশের বাসার আন্টি৷
আমি আপাতত আব্বার দিকে তাকাচ্ছিনা৷
দুঃস্বপ্নে চেহারাটা দেখলে ভয় পাবো আবার৷

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত