চরিত্রে দাগ

চরিত্রে দাগ

মেয়েটা হাসপাতালের বিছানায় মুখটা উলটা দিকে ফিরিয়ে শুয়ে আছে। আমি তার হাত শক্ত করে চেপে ধরে গাঢ় স্বরে বললাম, “আমার দিকে তাকাও, নিতু”

তার শরীর কেঁপে উঠলো। কিন্তু সে ফিরে তাকালো না আমার দিকে।
আমি তার হাত আমার বুকের কাছে টেনে বললাম, “এই মেয়ে!! কেন এমন করছো!! কিচ্ছু হয়নি তোমার, বোকা!!”

ঝট করে মেয়েটা এবার আমার দিকে তাকালো। মুখের বিভিন্ন জায়গায় রক্তজমে কালশিটে পড়ে গেছে, চুল আলুথালু, চোখ দুটি ভাঁটার মত জ্বলছে। এমন চেহারায় কখনও দেখিনি তাকে আগে। বুকের ভিতর মোচড় দিলো আমার।

সে তার হাত একটানে সরিয়ে হিসহিস করে বললো, “কিছু হয়নি আমার? কিচ্ছু না? ওরা ৪জন ছিলো আসিফ!! ৪ জন!!” …তার দুই চোখ বেয়ে পানির ধারা বেয়ে বিছানার চাদরে দাগ ফেলছে, রক্ত মিশে আছে অশ্রুতে!!

“আমি জানি লক্ষি, ঐ চার শুয়োরের বাচ্চাকে ধরতে স্পেশাল মিশনে নেমেছে পুলিশের সবচেয়ে এলিট ফোর্স, জামান আমাকে কথা দিয়েছে, সে পার্সোনালি হ্যান্ডেল করবে… সবকয়টাকে ধরার আগ পর্যন্ত সে রেস্ট নিবে না… আর একবার সেগুলোকে হাতের কাছে পেলে আমি একা তাদের সাথে কিছু সময় কাটাবো… দুনিয়াতে বসে জাহান্নামের স্বাদ তাদের আমি দেখাবো… ”
“না আসিফ!” আমাকে থামিয়ে দিলো নিতু। সে আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফোঁপাচ্ছে।

“কি? তুমি চাওনা আমি নিজ হাতে প্রতিশোধ নেই?” সে মাথা নেড়ে হ্যা বললো।
“তাহলে? ভাগ্যভালো যে হারামজাদারা তোমার কোন ফিজিকাল ড্যামেজ করার আগেই তোমাকে উদ্ধার করা গেছে!”

নিতু টলটলে চোখ নিয়ে আমার দিকে চেয়ে রইলো। আমি আবার বললাম “কি? সামান্য কেটে ছড়ে গেছে, এসব ঠিক হয়ে যাবে তাড়াতাড়িই”

নিতু ঠোঁট কামড়ে ধরে হতাশায় মাথা নাড়লো। কিছুক্ষণ শক্তি সঞ্চয় করে সে আমার চোখে চোখ রেখে বললো “আমার সাথে চারজন কম করে হলেও বারো বার ইন্টারকোর্স করেছে, আসিফ। উইদাউট এনি প্রোটেকশন। যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে আমাকে খুবলে খেয়েছে। আমাদের চার বছরের রিলেশনে তোমাকে আমি চুমু ছাড়া কিচ্ছু করতে দেইনি। অথচ তোমার সুযোগ ছিলো। তাও শুধু আমার ইচ্ছাকে সম্মান করে তুমি কোনদিন জোরাজুরি করোনি। আমি চেয়েছিলাম আমার প্রথম মিলনটা অবৈধ হবে না, যাকে ভালোবাসি তার সাথে, সম্পূর্ণ অধিকার নিয়ে হবে। সেখানে নোংরা, পশুর মত চার ড্রাইভার, হেল্পার আমাকে নষ্ট করে দিলো…” আমি আঙ্গুল দিয়ে নিতুর ঠোঁট চেপে ধরে ফিসফিস করে বললাম, “আই ডোন্ট কেয়ার!”

সে আমার হাত সরিয়ে বললো, “না আসিফ, ইউ উইল কেয়ার!! যে “ভার্জিনিটির” ধোয়া তুলে চারবছর তোমাকে দূরে সরিয়ে রাখলাম সেটাই তো আর নাই!! আর তোমার ফ্যামিলি? আমাদের যতই এংগেজমেন্ট হোক, তারা কি এমন একটা মেয়েকে এখন আর আনবে বাসার বড় ছেলের বৌ করে? তোমার আত্মীয় স্বজন? ঢি ঢি পড়ে যাবে আসিফ, আমাকে বেটার ভুলে যাও! তুমি তোমার বংশের শিরমণি, একথা আমি জানি! তোমার ফ্যামিলি কখনই আমার মত মেয়েকে বাড়িতে উঠাবে না বৌ করে…”

আমার মাথায় হঠাৎ রক্ত উঠে গেলো। প্রচন্ড রাগে শরীর ঝা ঝা করতে লাগলো, আমি আবার তার হাত তুলে দুহাতে শক্ত করে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, “আই ডোন্ট ফাকিং কেয়ার!! আই ডোন্ট!! যেটা হয়েছে সেটা এক্সিডেন্ট!! নাথিং এলস!! তোমার ভার্জিনিটির জন্য তো আমি তোমাকে ভালোবাসিনি!! চার চারটা বছর তুমি আমাকে আগলে রেখেছো, আমার চরম দুঃসময়ে তুমিই ছিলা আমার পাশে! প্রচন্ড হতাশায় যখন যখন সব কিছু হারিয়ে ফেলতাম তুমিই আমাকে সাহস দিয়েছো! তোমার শরীরের জন্য যদি ভালোবাসতাম, কবেই চলে যেতাম হয়তো শরীর চাইতেই দিয়ে দিবে এমন কারো সাথে! আর এখানে তোমার দোষটা কই? কেন তুমি নষ্ট হবা! এসব ঘটনায় কেন মেয়েটা অপবিত্র হবে? কেন তার চরিত্রে দাগ পড়বে? কি হাস্যকর!! ইজ ইট আ ফাকিং জোক??”

নিতু কিছু না বলে আমার হাতটা তার মুখের কাছে নিয়ে হুহু করে কান্নায় ভেংগে পড়ে। আমার হাতে তার চোখের গরম পানির ছ্যাক লাগে।

আমি তার থুতনিতে ধরে মুখটা উপরে উঠিয়ে কালসিটে পড়া ঠোঁটে সাবধানে একটা চুমু খেয়ে বলি, “আই এম ইউরস, অনলি ইউরস!! যতদিন তুমি আমাকে ভালোবাসছো, যা কিছুই ঘটুক, এটাই সত্য… গতকালের ঘটনা তোমার ব্রেইন থেকে আমি সম্পূর্ণ মুছে দিবো। কিচ্ছু হয়নি। সব আগের মতই আছে, থাকবে… আর কেউ যদি কালকের ঘটনা নিয়ে কিছু বলে, তোমার দিকে আঙ্গুল তোলে, তোমাকে বিন্দু মাত্র নীচু করতে চায়- কসম খোদার ঐ আঙ্গুল আমি ভেংগে দিবো, ঐ মুখ আমি ভোঁতা করে দিবো…” আমার গলা নিশ্চয়ই চড়ে গিয়েছিলো, নিতু আমাকে জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ লুকায়, কান্নার দমকে তার পিঠ কেঁপে কেঁপে উঠে, “এটা কি হলো আসিফ! কি হলো!”… তার গোঙ্গানি থামেই না। আমি।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতঘড়ির দিকে তাকাই। এত লেট হচ্ছে কেন?

কিছুক্ষণ পর। কেবিনে আমি, মাশরুর, রুম্মান আর একজন দাঁড়িটুপিওয়ালা লোককে নিয়ে ঢুকি। লোকটার হাতে কিছু কাগজপত্র। নিতু চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলো, আমাদের ঢুকতে শুনে চোখ মেলে অবাক হয়ে তাকালো। আমি একটু নার্ভাস হাসি দিলাম। “কি ব্যাপার আসিফ?” নিতু জিজ্ঞেস করলো শোয়া থেকে উঠে বসতে বসতে।

আমি তার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললাম, “চিন্তা করে দেখলাম, তোমাকে আর দূরে রাখা ঠিক হবেনা, তোমাকে এখন আমার বুকে বুকে রাখতে হবে ২৪ ঘন্টা… কিন্তু মরার সমাজ তো লিভ টুগেদারও করতে দিবে না, তাই আমি রওনা দেওয়ার আগেই ফোন দিয়ে কাজী সাব আর দুই সাক্ষী ও আরো কয়েকজনকে ফোন দিয়ে চলে আসতে বলেছিলাম। হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিলে তুমি আমাদের বাসায় চলে যাবা, আমার সাথে থাকবা। শরীর পুরো সারলে আমরা দূরে কোথাও চলে যাবো। শুধু দুইজন!!”

নিতু বিষ্ময়ে অভিভূত হয়ে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তার অশ্রু শুকিয়ে যাওয়া চোখ আবার ভিজে উঠতে থাকে, হঠাৎ সেখানে দুশ্চিন্তার মেঘ আবার ছায়া হানে, “কিন্তু আমাদের আব্বু আম্মু?”

আমি একটু হেসে সরে দাঁড়াই। আমার ঠিক পিছনে গেট খুলে চারজন মানুষ রুমে ঢুকলেন। তাঁঁরা স্নেহের ছায়াবৃক্ষ হয়ে আমাদের ঘিরে দাঁড়ান।

কাজী সাহেব অলৌকিক স্বরে কুরান তেলওয়াত শুরু করেছেন। আমার আম্মু নিতুর জন্য তুলে রাখা শাড়িটা তার চারপাশে জড়িয়ে ছোট্ট একটা ঘোমটা তুলে দিয়েছেন। নিতু সেই ঘোমটার আড়াল থেকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।

আমি দেখতে পাই তার চোখ থেকে গত রাতের অন্ধকার ধীরে ধীরে কেটে গিয়ে আলো ঝলমলে ভোর হচ্ছে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত