পেছনের গল্প

পেছনের গল্প

আমি যে স্কুলে লেখাপড়া করতাম আমার মা সে স্কুলে সামান্য ঝাড়ু দেয়ার কাজ করতো। সেজন্য অাক্ষেপটা আমার ছিলো না, ছিলো আমার বন্ধুদের। বন্ধু বললে ঠিক ভুল হবে, ক্লাসমেটদের। নার্সারি থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত প্রকৃত বন্ধু আমার কোনদিনই হয়নি। কারণ একটাই, আমরা নিচু জাতের মানুষ, আর তারা বিত্তবানের ছেলে-মেয়ে।

আমার অাশেপাশে ঠিক কেউই বসতো না। তাই তো বেঞ্চের এক কোণায় বসে স্যারের কথা শুনতে হতো। মাঝে মাঝে ক্লাসমেটেরা আমাকে ভ্যাংচাতো। আমি ওদের সাথে কথা না বলে চুপচাপ বই দেখতাম। অনেকদিন এমন হয়েছে তারা আমাকে বেঞ্চ থেকে ফেলে দিয়ে মজা নিয়েছে। হাসতে হাসতে বলেছে, ‘দ্যাখ দ্যাখ কী হাল হয়েছে ওর।’

টিফিন টাইমে যখন বড় লোকের ছেলে-মেয়েরা বাহারি স্বাদের খাবার খেত আমি তখন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম। মাঝে মাঝে মা এসে আমাকে বলতেন,
‘আয় বাবা, তোর মাথায় হাত বুলিয়ে দেই।’
মায়ের একথায় সবকিছুই ভুলে যেতাম আমি। স্কুলের এক কোণে বসে মায়ের অাদর খেতাম আর পেট ভরাতাম। মাঝে মাঝে ভাবতাম, ‘এ জগতটা বড়ই নিষ্ঠুর। ছোট ছোট ছেলেরাও উচু-নিচু পার্থক্য করতে শিখেছে।

একদিন মা বললেন,
‘তোকে কি ওরা মারে বাবা?’
আমি মলিন মুখে বললাম,
‘হ্যাঁ মা। ওরা খুব পঁচা। তোমাকে ওরা গালি দেয়। তোমাকে গালি দিলে আমার ভীষণ রাগ হয়। ওদেরও মারতে ইচ্ছে করে।’
মা আমার চুল নাড়তে নাড়তে বলে,
‘না বাবা কখনো এরকম কাজ করবি না। ওরা বড়লোক আর আমরা সামান্য খেটে খাওয়া মানুষ। ওদের সাথে কোনদিন ঝামেলা করিস না বাবা।’
হয়তো মা মনে করতো, ঝামেলা হলে যদি মায়ের চাকরি চলে যাওয়ার সাথে সাথে আমার স্কুল পড়াও বন্ধ হয় সেজন্য।

আর সব ছাত্র-ছাত্রীদের মতো আমার এত কাপড়-চোপর ছিলো না। কাপড় যাতে দ্রুত ময়লা না হয় সেজন্য মা কাপড়ে নীল দিয়ে দিতেন। ময়লা হলে স্কুল ছুটির পর ধুয়ে দিয়ে শুকাতে দিতেন। তারপর সেটা ভাঁজ করে বালিশের নিচে রাখতেন যাতে ইস্ত্রি করার কাপড়ের মতো লাগে।

আজ সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।
ক্লাস সিক্স থেকে টেন পর্যন্ত সবসময়ই ক্লাসে ফার্ষ্ট হয়েছি। এসএসসি পরীক্ষায় বোর্ড স্ট্যান্ড করার কারণে আজ আমাকে সংবর্ধনা দেয়া হচ্ছে। অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত আছেন। আমি মায়ের সাথে পাশে দাঁড়িয়ে আছি। মায়ের গায়ে মলিন একটা শাড়ি। আমারও তেমন ভালো কোনো কাপড় গায়ে নেই।
আমার নাম ঘোষণা করে আমাকে কিছু বলবার জন্য বলা হলো। আমি বলতে শুরু করলাম,
‘আমি গরীর ঘরের সন্তান। খুব অবাক হচ্ছেন তাই না? এত নামীদামী স্কুলে আবার গরীব ঘরের সন্তান পড়তে পারে নাকি? আমার মা এই স্কুলে ঝাড়ু দেয়ার কাজ করে মাত্র। সব ছাত্র-ছাত্রীর মা-বাবা দু’জন, আর আমার মা-বাবা একজনই, আমার জনমদুখিনী মা। ঘরে চাল না থাকলেও কখনো তিনি বুঝতে দেননি ক্ষুধার যন্ত্রনা। উনার মমতা, ভালোবাসা দিয়ে পরম যত্নে সবকিছু ভুলিয়ে দিতেন।
আমি কোনদিন জানতেও চাইনি আমার বাবা কে? যখন আমার মা’ই আমাকে বাবার কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছে বাবার আর কী প্রয়োজন। অনেক সময় প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করলেও করিনি। কারণ যদি আমার মা কষ্ট পায় সেজন্য।
কুপি জ্বালিয়ে আমি পড়তাম। অনেকসময় তেল শেষ হয়ে গেলে আর পড়া সম্ভব হতো না। মাঝরাতে চুপি চুপি রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্টের কোণায় জড়সড়ভাবে পড়তাম। কারণ আমার লক্ষ ছিলো জীবনের প্রথম ধাপটা যেন চমকে যাওয়ার মতো হয়। হয়তো এতটা কোনদিনও আশা করিনি। হয়তো ছোটলোকের বাচ্চা হয়ে একটু বেশিই বলে ফেলেছি। ভুল বলে থাকলে মাফ করবেন।’
মাউথ পিচ রেখে ঘুরে দেখলাম মা নিঃশব্দে কাঁদছেন। ওডিয়েন্সের দিকে তাকিয়েও দেখি অনেকের চোখে পানি। আমি চোখ মুছে মাকে নিয়ে বাড়িতে ফিরলাম।

আজ আমি সরকারী মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েছি। খুশিতে অাত্মহারা হয়ে দৌড়ে মায়ের কাছে যাচ্ছি সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য। চারপাশের মানুষেরা আমার দিকে তাকিয়ে আছে আর আমি দৌড়াচ্ছি। বস্তিতে ফিরে দেখি মা কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। আমি ডাকলাম,
‘মা?’
মা কাশতে কাশতে বললেন,
‘রাহাত? বস বাবা।’
আমি ঠোঁটের কোণায় হাসি টেনে বললাম,
‘মা আমি সরকারি মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েছি। আর কোনো চিন্তা নেই।’
মায়ের কাশিটা বেড়ে গেল। তবুও অনেক কষ্টে সেটা চেপে রেখে বৃথা হাসার চেষ্টা করে বললো,
‘মানুষের মতো মানুষ হও বাবা। তোর জন্য আমার দোয়া থাকবে সবসময়। আর হ্যাঁ তুই জারজ নস। তোর বাবা আছে।’
‘বাবার নাম বলো না মা। তার আমার দরকার নেই। এতদিনে যে আমাদের খোঁজ নেননি, তার কী দরকার।’
আমার অনুরোধে মা আর বলেননি। তার দু’দিন পর মা’কে দাফন করতে হয়েছিলো। পৃথিবীতে আমি একা হয়ে গিয়েছি।

টেবিলের সামনে বৃদ্ধা মহিলাকে দেখেই অতীত স্মৃতি মনে পড়ে গেল। মহিলার মুখের ফেসটা অনেকটাই মায়ের মতো। কত মানুষকে আমি এখন ফ্রি’তে চিকিৎসা দিচ্ছি, দান-খয়রাত করছি। অথচ আমার মা চিকিৎসার অভাবে মারা গিয়েছিল।
আমি এখন দেশের নামকরা ডাক্তার।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত