পাঠকপৃষ্ঠ

পাঠকপৃষ্ঠ

রেড রোজ নামের এক রেস্টুরেন্টে যেতে যেতে মনে হলো অনেকদিন পর কোন মেয়ে দেখতে যাচ্ছি। বাবা মা বেশ কিছুদিন বিয়ের চেষ্টা করে হাপিয়ে উঠেছিল আর তাই মাঝের একবছর কোন মেয়ে এরকম ঘটা করে এসে দেখা হয়নি। সেদিন সাহিনা আন্টির মেয়ে শুভ্রা আপু আমাদের বাসায় এসেছিল। শুভ্রা আপুর সাথে অনেক ভাল সম্পর্ক আমার। নিজের বোন নেই তাই তাকেই বোন হিসেবে দেখি। ও এসে মা বাবার থেকে আমার নামে হাজারটা অভিযোগ শুনলো। সন্ধ্যার পরে যখন আমি অফিস থেকে ফিরলাম তখন আপু আমার রুমে আসলো। আমি একটা ব্লগ পড়ছিলাম যেটার নাম ছিল নিশাচর। এটা লিখেছেন ক্যামেলিয়া জাহান অথৈ।

আপু এসেই বলল, তা ব্লগার নিজেও তাহলে মানুষের ব্লগ পড়ে। পেছনে ঘুরে ওকে দেখে হাসলাম। বললাম, কেমন আছিস? দুলাভাই কে পেয়ে তো ভুলেই গেছিস। ও মাথায় একটা ঠুকো মেরে বলল, তুই বুঝি বোনকে খুব মনে রেখেছিস? বিয়ের পরে একবারও এসেছিস আমাকে দেখতে? আমি হেসে বললাম, বিয়ে করলি তুই আর দেখতে যাবো আমি? তুই বিয়ে করে একজনকে পেয়েছিস আর আমরা তোকে বিয়ে দিয়ে একজনকে হারিয়েছি, তো এখন বল কে কাকে দেখতে যাবে? এটা শুনে আপু কেমন যেন চুপ হয়ে গেল। ওকে রাগানোর জন্য আমি আবারও বললাম, আগে তো প্রায় প্রায় আসতি।

এখন বিয়ে করে কতদিন পর আসলি সে হিসেব আছে? আপন স্বামী পেলে যা হয় আরকি! এটা শুনে আপু রেগে না গিয়ে পেছন থেকেই আমার মাথাটা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। সেই কান্না থামার কোন নাম নেই। পেছনে ঘুরে আমিই হাসতে হাসতে বললাম, এই আমি মজা করছিলাম। তুই কান্না থামা। আচ্ছা আর এভাবে বলবো না যা তাও কান্না থামা। কাঁদতে কাঁদতে ও বলল, বিয়ে করেছি বলে কি তোদের পর করে দিছি নাকি? আমার কি আসার ইচ্ছে হয় নি? ওখানে কি ওরা আসার কথা না বললে আসতে পারি। তুই ও তো আমার বাসায় একবারও গেলি না আমায় দেখতে। আমি হেসে হেসে বললাম, আচ্ছা বাবা সরি, এখন এই কান্নাটা থামাবি দোয়া করে, এই পেত্নির মত চেহারাটা আর দেখতে ইচ্ছে করছে না। ও বলল, কান্না থামাবো তবে আমাকে এখোনি আইসক্রিম আর চকলেট কিনে দিতে হবে।

আমি মুখে ভেংচি এনে বললাম, এ্যাহ, ওমনি উনার পুরনো আবদার শুরু হয়ে গেলো তাই না? হবে না এসব। তোর বর খাওয়ায় না? এতোদিন আমাদের ভান্ডার শেষ করেছিস এখন তোর বরের পালা। বিয়ে দিয়েও বাপের বাড়ির সম্পত্তি নষ্ট করার কোন মানেই হয় না। তুই ফুট এখান থেকে। এটা শুনতেই আবারও ও চিৎকার করে কান্না করা শুরু করলো। মাথায় একটা গাট্টি মেরে বললাম, ওই তুই থাম। থাম বলছি। ভেদ কান্দুরীর মতো কাঁদতে পারলেই সব পেয়ে যাবি তাই না? এর আগেও এভাবে অনেক কিছু আমার থেকে আদায় করেছিস এবার আর নয়। এটা শুনতেই কান্নার মতিগতি আরও বেড়ে গেলো। আমি দুহাতে মাফ চেয়ে ওর জন্য নিয়ে আসা ক্যাটবেরী আর দুটো কোন্ আইসক্রিম ওর সামনে রাখলাম। এসব দেখে ওর কান্না নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো।

ওকে বলতে দেরি ও সাটাম করে নিয়ে নিল সব। আমি আবারও অবাক। এতো নিখুত অভিনয় অস্কার পাওয়া নাইকারাও পারবে না। কাঁদতে কাঁদতে ওর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে কিন্তু চকলেট মুখে নিয়ে ও হাসছেও। আমি মাথা দুলিয়ে বলছি, না না, এ হতে পারে না। ও উঠে এসে কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল, আমার বেষ্ট ভাইয়া। আমি বললাম, তুই আমাকে আবারও বোকা বানালি? তোর এখানে আসাই ঠিক হয়নি। তুই যাতো, তোর বরের মাথা খা গিয়ে। ও হেসে বলল, আমার ভাইটা রাগ করেছে বুঝি, ওওও…। আচ্ছা রাগ করিস না যা, তোর জন্য রাজকুমারী নিয়ে আসবো আমি। আমি বললাম, ছোট থেকে বলে আসছিস এটা। এখন পর্যন্ত একটা রাজকুৃমারী তো দুরের কথা, একটা কাজের মেয়েও নিয়ে আসতে পারলি না। ও বলল, কেন আংকেল আন্টি তো অনেক দেখলো একটাও তো তোকে বিয়ে করতো রাজি হয় নি। এরকম হলে কাজের মেয়ে কেন, কপালে ছেলেও জুটবে না। আমি হেসে বললাম ভালই তো, তোকে জালিয়ে সারা জিবন পার করে দেবো।

ও মাথায় একটা ঠুকনা মেরে বলল, আমি তো তোকে রাজকুমারী দিবই তার আগে বল এতোদিন ধরে বিয়ে করছিস না, কোন রাজকুমারীকে কি আগে থেকেই মন দিয়ে রেখেছিস? নিজের মধ্যে একটু সাহিত্যিক ভাব নিয়ে বললাম, তুমি দেখে যাও, মনের মাঝে বাস করা অব্যেক্ত অনুভুতিগুলো লিখে যাও, মনের ভেতর অজস্র দেয়ালের মাঝে ভাজ পরা গল্পগুলোকে ধুয়ে মুছে নতুন রুপ দাও তবুও কোন মেয়েকে মন দিও না। কারন মেয়েরা মনের ভেতরের এমন কোন সিন্দুক নেই যেটা জালিয়ে ছারখার করে দিতে পারে না। এটা শুনে ও কোমরে হাত দিয়ে বলল, নিজের ব্লগে এসব লিখে মেয়েদের বদনাম করা ছারা আর কোন কাজ আছে তোর? ভাল হো বুঝলি। পরশু তোর অফিস ছুটি না? মাথা নারিয়ে বললাম, না তো। কেন? ও খানিকটা রেগে বলল, কেনো, সরকারী ছুটির দিনে কোন অফিস খোলা থাকে তোর, হুম? বাপের হোটেলে খাওয়া ফ্রি আবার মায়ের সেবা ফ্রি।

এভাবে আর কতোদিন? একটু শান্ত হয়ে ও বলল, দেখ ভাই তোর যদি কোন পছন্দ থেকে থাকে তবে সেটা বল। আন্টি সবসময় একা থাকে এটা বুঝিস না কেন তুই? আমি ওর কামিজে আঙ্গুল পেঁচাতে পেঁচাতে বললাম, নির্দিষ্ট কোন পছন্দ নেই তবে তোর বিয়েতে অনেক সুন্দরী মেয়ে দেখেছিলাম। কিন্তু সমস্যা হল কাকে ছেড়ে কাকে নিবো এটা ঠিক করতে পারিনি। আপু তখন কপালে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে বলল, কোন যেনো এক মহাপুরুষ বলেছিল, লেখকরা তাদের কাব্যিকতা তাদের লুচ্চামিতে খুঁজে পায়। তোকে দেখে নিশ্চিত হলাম। পরশুদিন রেড রোজ রেষ্টুরেন্টে ঠিক দুপুর দুইটায় চলে আসবি। একজনের সাথে দেখা করাবো আর তোর দুলাভাইও থাকবে। আমি বললাম, আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পরে লেগেছিস কেনো বলতো? আর কার সাথে দেখা করাবি তুই? ও বলল, সেদিন আমার মাথাটা আর খাইস না।

মেয়েটা তোর দুলাভাইর দুরসম্পর্কের খালাতো বোনের বান্ধবী। আমি এটা শুনে হেসে ফেললাম। বললাম, একটু বেশিই দুরে হয়ে গেলো না? যাই হোক, ওকে মেকাপ করে আসতে নিষেধ করবি আর শাড়ি পরতে বলিস, পারলে কালো শাড়ি। চেয়ারে বসেছিলাম কিন্তু আপু চেয়ারটা পেছন থেকে নিচু করে ধরে বলল, ওই মেয়েটাও লিখালিখি করে। ওর লিখা পত্রিকাতেও আসে। তোর থেকে অনেক ভাল লিখে জানিস। আমার সমস্যা তোকে নিয়ে না, সমস্যাটা ওকে নিয়ে যে ও তোকে পছন্দ করবে কিনা? আমি এবার তার দিকে তাকিয়ে হেসে বললাম, দেখ আবার দেখা করার পর বাসায় এসে পরে কিনা! নাকটা মৃদু টেনে বলল, এ্যাহ, মগের মুল্লুক সব তাই না? আয়, খেতে আয় বলেই ও মুচকি হেসে চলে গেলো। আর তাই আজ যাচ্ছি দেখা করতে। যেতে যেতে মনে হল, যাকে দেখতে যাচ্ছি তাকে তো চিনিই আমি। এটা অবশ্য আপু জানে না। তাই যাওয়ার পথে দুটি ফুলের তোরা নিলাম।

রেড রোজ রেষ্টুরেন্টে ঢুকেই একেবারে কর্নারে দেখলাম আপু দুলাভাই বসে আছে আর পাশে উনিও। উহুম, উনি কথামত কাপড় পরে আসেনাই। কাছে যেতেই দুলাভাই বলল, বাব্বাহ, আমার সালা তো দেখি সব প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। সালাম দিয়ে আমি আপুকে আর দুলাভাইকে দুটি ফুলের তোরা দিয়ে দিলাম। আর বললাম, অভিনন্দন আপনাদের।

ওরা অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, হঠাৎ আবার কি হল তোর? আমি হাসিমুখে বললাম, আরে দুলাভাই আপনার একমাত্র সালার বিয়ে হতে চলেছে তাই ফুল দিলাম। দুলাভাই দেখলাম একথা শুনে মৃদু কেশে ফেলল আর আপু পাশে বসা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে। আপু বসা থেকে উঠে মাথায় গাট্টি মেরে বলল, সব সময় ফাজলামো ভাল না বুঝলি, তারপর দুলাভাইকে বলল, এই চলো আমরা একটু ঘুরে আসি ততোক্ষনে ওরা একটু কথা বলুক। এবার পাশে বসে থাক মেয়েটি বলল, আপনারা থাকুন না আপু। কোন সমস্যা হবে না। উনার কথা কেরে নিয়ে আমি বললাম, সমস্যা হবে না মানে। উনারা থাকলে তো আপনার সাথে ফ্রি হয়ে কথাই বলতে পারবো না। এটা শুনে উনার মুখে কেমন যেনো রাজ্যের বিরক্তি ফুটে উঠলো। আপু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দুলাভাইকে বলল, চলো আমরা একটু হেঁটে আসি।

আপু দুলাভাইরা চলে গেলে আমি মেয়েটির সামনাসামনি বসলাম। কিছুক্ষন কথা বললাম না কেউই। একটু পরে অনেকটা ঠান্ডা গলায় আমি বললাম, এখনো রেগে আছেন কি মিস ক্যামেলিয়া? ও এবার মাথা উচু করে আমার দিকে তাকালো। আমি আবারও বললাম, মনের ভেতর এতো জেদ পুষে রাখতে নেই বুঝলেন তো। কখনও নিজেকে মুক্ত বাতাসে ছড়িয়ে দেখুন জিবনটা আরও অনেক বেশি সুন্দর। হ্যা, বলতে পারেন আপনার গল্পের চেয়েও সুন্দর।

মেয়েটি এবার কাঁপা গলায় বলে উঠলো, কে আপনি? সবাই অথৈ জানলেও আমার নাম ক্যামেলিয়া এটা কে বলেছে আপনাকে? আমি একটু হেসে বললাম, আপনার ব্লগের নিয়মিত পাঠক আমি। ব্লগে তো সম্পুর্ন নামটাই দেন তাই না? উনি এবার বললেন, তো আমিই যে সেই ব্লগার সেটা কিভাবে বুঝলেন? আবারও হাসলাম আমি। বললাম, ফেসবুকে দেখেছিলাম একটা সময়। এবার উনি কিছুটা থমকে বললেন, আমার ফেসবুকে কোনও ছবি নেই। আমি বললাম, এখন হয়তো নেই তবে একসময় ছিল যখন আপনি কারও গল্পের নিয়মিত পাঠক ছিলেন। উনি এবার কিছু বলছে না। একটু চুপ থেকে বললেন, আপনি কে? এতসব কিভাবে জানেন? মৃদু হেসে বললাম, আমি মামুন, আর একটা পরিচয় হলো আপনার নিয়মিত পাঠক। আমার দিকে তাকিয়ে উনি বললেন, আপনার সাথে কি এর আগে কখনও দেখা হয়েছিল আমার? আপনি কিছু লুকোচ্ছেন। দয়া করে সবটা বলুন। আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে বললাম, আমি কিছুই লুকোচ্ছিনা মিস ক্যামেলিয়া।

আপনিই কেমন যেনো গম্ভীর হয়ে আছেন। হঠাৎ উনি উনার পার্সটা নিয়ে চেয়ার থেকে উঠে বলল, আমার ভালো লাগছেনা, আমি আসছি। তখনই আমি বললাম, আমরা সবাই আমাদের অতীতকে অনেক ভয় পাই তাই না? এটা শুনে উনি বললেন, যারা ভয় পায় তারা সবকিছুতে তাদের ভয়ের পদচিন্হ রেখে যায়। আর আমার অতীতে এমন কিছু নেই যে ভয় পাবো। আমি হেসে বললাম, প্রথম বাক্যটা কপি করা। আর ভয় যদি নাই বা পান তবে চলে যাচ্ছেন কেন? উনি বললেন, আপনার সব কথা শুনতে আমি বাধ্য নই। আপনার আপু এলে বলবেন, আপনার আমাকে পছন্দ হয় নি বলেই যেই চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াবে তখনি আমি বললাম, আমার পাওনাটা তো মিটিয়ে যান। উনি থেমে গেলেন। প্রশ্নসুচক দৃষ্টিতে তাকালেন। আমি বললাম, যদি বলি আমি সেই মামুন যার লিখার আপনি অনেক বড় ভক্ত ছিলেন। যদিও সে কোন নাম করা কিছুই ছিল না তবে আপনি তার লিখা সবসময় পড়তেন।

যাকে একটাবার খুব দেখার ইচ্ছে ছিল আপনার। এসব শুনে উনি অনেকটা তাড়াহুরো করে আমার সামনে এলেন। বড় বড় নিঃশ্বাস নিচ্ছিলেন উনি। আস্তে করে বললাম, আমার ওপর রাগ করে যখন নিজেও লিখা শুরু করলেন তখন গুরুদক্ষিনা তো আমারও প্রাপ্য তাই না? আমার ওপর রাগ করেই তো লিখা শুরু করেছিলেন তাই না? তাছাড়া হাজার লিখেও কি আমার লিখা কথাগুলোকে ভুলতে পেরেছেন? উনি শুধু এটুকু বললেন, কেন? কেন আমার সাথে এমনটা করেছিলেন আপনি? আপনি তো এমনটা কারও সাথেই কখনও করেন না। তবে আমার সাথেই কেন? জানেন আপনাকে কতটা মন থেকে চেয়েছিলাম আমি? সেদিন কি একটু কথা বলা যেতো না ভালভাবে আমার সাথে? সব প্রশ্ন শুনে আমি শুধু এটুকু বলেছিলাম, আমার কাছে কোন উত্তর নেই এসবের তবে আমি মানছি আমার ভুল হয়েছে।

আপনার সাথে আমার এরকম ব্যবহার করা উচিৎ হয়নি। তবে আমি চাই আপনি আর রাগ করে নিজের জেদ বারিয়ে নিজেকে কষ্ট না দেন। এটা শুনেই আমার কলার চেপে ধরে ও বলল, আপনার মতো মানুষকে এখন অনেক ঘৃনা হয় আমার। আপনার ছায়াটাও যেনো আমার কাছে না আসে। যাদের লিখা পড়ে মানুষ বাঁচতে শেখে তারা বাস্তবে এতোটা খারাপ কিভাবে হয়? এই অবস্থাতেই আমি বললাম, তাহলে আমার গল্প পড়া যে ছেড়ে দিতে হবে আপনাকে? এখন যে অমানুষ নামে ব্লগারের গল্প পড়েন ওটাও আমিই। কলার টা ছেড়ে ধাক্কা মেরে চেয়ারে ফেলে দিয়ে ও ছলছল চোখে তাকিয়ে বলল, আপনি সত্যিই একটা অমানুষ। এরপর আর কিছু না বলেই চোখের পানি মুছতে মুছতে ও চলে গেলো।

ফেসবুকে প্রায়ই গল্প লিখা হতো তখন। অনেক মানুষ গল্প অনেক পছন্দও করতো। উদ্দেশ্য ছিল না যে আমাকে বড় কোন লেখক হতে হবে। শুধু গল্পের মাধ্যমে মানুষের কাছে ভাল একটা ম্যাসেজ পাঠানোই মুল উদ্দেশ্য ছিল। নিজের গল্পের মাঝে এসব ফুটিয়ে তুলাটাই আমার কাজ। তাই মানুষের বিভিন্ন মন্তব্য আমার জন্য অনেক দরকারী ছিল। সবার মন্তব্যেই আমি সমান ভাবে উত্তর দেই। একদিন লক্ষ্য করলাম আমার প্রতিটা গল্পে ক্যামেলিয়া জাহান অথৈ নামে একজন মন্তব্য করে। আমিও প্রতিটা গল্পেই তার মন্তব্যের উত্তর দেই। একদিন সেই আইডি থেকে আমার কাছে ম্যাসেজ আসলো। আমিও উত্তর দিলাম। বিভিন্ন কথার মাঝে তার সাথে অনেক ভাল একটা বোঝাপড়া হয়ে গেলো। বরাবরই আমি পাঠকদের সাথে অনেক ভালভাবেই কথা বলি। তবে সেদিন আমার তৃতীয় বর্ষের রেজাল্ট এর দিন ছিল।

আমার সব কাছের বন্ধুরা যেখানে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিল সেখানে আমি ফেইল করেছিলাম। তাই আশেপাশের কিছু কানাঘুষোর কারনে নিজের প্রতিই অনেক খারাপ লাগছিলো। মনের মাঝে সুইসাইডের চিন্তাও এসেছে তবে আমি একটু অন্যরকম ছিলাম কিনা। তাই নিজেকে শান্তনা দেওয়ার জন্য সুইসাইড নিয়ে একটা গল্প লিখে পোস্ট করি। যার মুল কথা ছিল সুইসাইড কখনই কোন সমস্যার সমাধান হতে পারেনা এটা শুধুই একটা জিবনকে নষ্ট করা মাত্র। পোস্ট দেওয়ার কিছুক্ষন পর সেই আইডি থেকে ম্যাসেজ চলে এলো। বলল, কি হয়েছে? হঠাৎ এরকম পোস্ট কেন? আমি কিছুনা বললাম। তবে সে নাছোড়বান্দা। আমি ভাবছিলাম একটা মেয়ে পাঠককে তো আর বলতে পারিনা পরিক্ষায় ফেল করে এই পোস্ট দিয়েছি। তো আমি তখনও বললাম যে কিছু হয়নি। এমনিতে নিজেরই মন মেজাজ ভাল নেই সেদিন।

তখন ও বলল, জানেন আজ আমারও মন ভালো নেই। আমার পরিক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে আজ। সব বন্ধুরাই ভাল করেছে শুধু আমিই খারাপ করেছি। এটা দেখে আমি রিপ্লাই দিয়েছিলাম, তো আমি কি করবো? ও বলল, আজ কি আমার সাথে একটু কথা বলবেন? আপনার সাথে কথা বললে হয়তো ভাল লাগতে পারে। মেজাজটা বিগড়ে গেলো এটা শুনে। যতসব ন্যাকা। ভালমত চিনিনা জানিনা উনার সাথে কথা বলতে হবে। রিপ্লাইও দিয়েছিলাম সেভাবে। বলেছিলাম, আপনি কি এমন যে আপনার সাথে কথা বলে মন ভালো করাতে হবে? কি মনে করেন নিজেকে? লেখক হয়েছি বলে কি আমরা মানুষ না? এতো ন্যাকা কথা কোথায় পান আপনি? ফাজলামোর আর জায়গা পান না তাই না? সব এখানেই এসে মরতে বসে। এসব বলে নিজের রাগটা সম্পর্নভাবে তার উপর ঢেলে দিয়েছিলাম।

ও শুধু বলল, আপনি এভাবে কেনো বলছেন? আমি শুধুই একটু কথা বলতে চেয়েছি? আপনার প্রতিটা গল্পই আমি পড়ি। অনেক ভাল লাগে আপনার গল্প পড়ে। তাই একটু কথা বলতে চাচ্ছিলাম। আমি বললাম, গল্প ভাল লাগে তো গল্পই পড়ুন না। আমার মাথা খেতে এসেছেন কেনো? একটা তিরিক্ষি রিপ্লাই এসেছিল । বলল, নিজেকে কি ভাবেন? একটু ভালো লিখেন বলেই কি এভাবে কথা শোনাচ্ছেন? একটু ভালোভাবে কথা বললে কি হয়? ভেবে দেখুন তো আমরা পাঠকরা ছাড়া আপনারা কি? এরকম একটা রিপ্লাই দেখে ওকে বলেছিলাম, আপনি নিজে একটা লিখে দেখান আগে তারপর এসব বলতে আসিয়েন। যতোসব ন্যাকা। একটু পরেই দেখি মেয়েটা ম্যাসেজ ব্লগ করে দিয়েছে।

ঐদিন ওসব নিয়ে আর ঘাটালাম না। পরেরদিন মাথা ঠান্ডা হতেই ভাবলাম, কাল কি করেছি? ভাবতেই পারছিনা আমি এতোটা খারাপ ব্যবহার কারও সাথে করেছি। জলদি করে আইডিতে গিয়ে দেখি ওটা ডিয়েক্টিভ। কদিন যাওয়ার পর অনেক কষ্ট করে তার আইডি খুজে পাই। অন্য একটা আইডি থেকে তার সাথে কানেক্ট হই। এর মধ্যেই দেখি সেও কয়েকটা গল্প লিখে পোস্ট করেছে। কিন্তু তাকে ম্যাসেজ দেওয়ার কোন অপশন পেলাম না। তাই তার গল্পগুলো যেগুলো প্রায়ই আমি বিরোধী, সেগুলো রেগুলার পড়তাম। তারপর কিছু বন্ধুর সাহায্যে তার সব খোঁজ নেই। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, তাকে আমার সরি বলা উচিৎ। অনেকদিন চলে গেলো এভাবে। পরাশুনা শেষ করে চাকরী করছি। কিছুদিন আগে শুভ্রা আপুর বিয়েতে ওকে দেখেছিলাম আমি। দুলাভাইর আত্মীয় হয়। আর এ থেকেই আজকের এই কাহিনী। শুভ্রা আপু হয়তো জানেই না যে আমার প্লানেই আজ এই মেয়ের সাথে আমার দেখা হয়েছে।

একটু পরে আপু দুলাভাই আসলো। আমাকে একা দেখে বলল, অথৈ কোথায়। আমি হেসে বললাম, মুখের ওপর না বলে দিয়ে চলে গেলো কেমন মেয়ে এটা তোমাদের। এই প্রথম কেউ এভাবে রিজেক্ট করলো। শুভ্র আপু রেগে গেলেন অনেকটা কিন্তু কিছু বললেন না। শুধু বলল, চল বাসায় চল। বাসায় এসে আমি ফ্রেশ হয়ে খাবার খেয়ে রুমে চলে আসলাম। কেউ কোন কথাই বললনা কেনো যেন। আমি রুমে এসেই দিলাম ঘুম। পরেরদিন সকালে উঠেই দেখি বাইরে শুভ্রা আপু কার সাথে যেনো কথা বলছে। ঘুমঘুম চোখে বাইরে গিয়ে দেখলাম, দুলাভাই, আপু বাবা মা আর সাথে অথৈ বসে গল্প করছে।

মনটা ভাল হয়ে গেলো। আজ আবার ও কালো শাড়িই পরে এসেছে। দরজায় দাড়িয়ে বললাম, দেখলি আপু বলেছিলাম না এতোটা পছন্দ হবে যে বাসায় পর্যন্ত চলে আসতে পারে। এটা শুনে সবাই আমার দিকে তাকালো। শুভ্রা আপু টিটেবিলে থাকা ফুলদানিটা নিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসতেই আমি দরজা লাগিয়ে ভেতরে চপাট হয়ে আছি। বাইরে থেকে আপু বলল, দরজা খুল তুই হারামজাদা, আজ তোকে খুন করব। সবসময় ফাজলামো ছাড়া কিছুই পারিস না তাই না? কিরে তুই খুলবি না আমি দরজা ভাঙবো? আমি ভেতর থেকে বললাম, তুই দরজাই ভাঙ আমি কষ্ট করে খুলতে পারবো না। এটা বলতেই ধামধাম শব্দ শুরু হলো দরজায়। মনে হয় ঠিকি ভেঙ্গে ফলবে। এবার আমি বললাম, ওই তোর শশুড়বাড়ি গিয়ে ভাঙ সব। এখানে কেন? ও দুলাভাই, আপনি কি এই কয়দিনে আপুকে দরজা ভাঙ্গা শিখিয়েছেন নাকি? এটা বলতেই সবকিছু শান্ত হয়ে গেলো। আমি কিছুক্ষন চুপ করে থাকলাম।

একটু পরে যেই না দরজা খুলে বেরিয়েছি বাইরে কি হচ্ছে দেখার জন্য অমনি খোপ করে শুভ্রা আপু আমার চুল ধরে ফেলল। এলোপাথাড়ি পিটাতে শুরু করল। কোন রকমে চুলটা ছাড়িয়ে আমি দৌড়ে বেড়াচ্ছি। পেছন থেকে আপুও তেড়ে আসছে ধরার জন্য। অনেকক্ষণ হল এই দৌড়। একটু পরে আমি আর আপু দুজনেই ক্লান্ত। ওকে হাঁপাতে দেখে বললাম, একটু বস, জিড়িয়ে নে। হাঁপিয়ে গেলেও রাগটা কমেনি। এতোক্ষন বাবা মা দুলাভাই আর অথৈ আমাদের এসব দেখছিল। তারা তাকিয়ে হাসতে লাগলো। আপু কাছে এসে কান ধরে বলল, তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আয় অথৈ কে নিয়ে বাইরে যাবি ঘুড়তে। ওর একটা চুল টেনে বললাম, তা তো যাবই।

রেড রোজ রেষ্টরেন্টে আবারও এসেছি। অনেক কিছু অর্ডার করা হয়েছে শুধু কেউ কোন কথা বলছি না। আমিই বললাম, দেখুন মিস ক্যামেলিয়া, এটা বলতেই ও বলল, আমার ডাকনাম অথৈ। আমি হেসে বললাম, আমার সেই তখন থেকেই ক্যামেলিয়া বলে ডাকতেই ভালো লাগতো। এই নামে ডাকলে কোন সমস্যা নেই তো? উনি মাথা নাড়িয়ে না করল। আমি আবারও বললাম, দেখুন আগে যা হয়েছে তার জন্য আমি সরি। আমি বলতে চাই না সেদিন কেন এরকমটা করেছিলাম তবে পেছনে কারন তো একটা ছিলই। তবে ভুলটা আমার। আমি ওসব ব্যাপারে কথা বলতে চাচ্ছি না। আপনার ব্যাপারে খোঁজ নিতে গিয়ে অনেক কষ্ট করেছি। তাই আজ আমরা এই জায়গায়। আমি জানতাম আপনি আসবেন। আপনাকে আজ নিজের ব্যাপারে কিছু জানাতে চাই। আপনি আমাকে যেরকম দেখছেন যে, আমি অনেক চঞ্চল টাইপের সবসময় হাসিখুশি থাকি, আমি আসলে এরকমটা না। সামনের মানুষগুলোকে খুশিতে রাখার জন্যই আমি এভাবে থাকি। তবে আপনাকে বলছি, আমি নিজের মাঝেই একা, বড় একা। এই একাকিত্ব আমাকে কখনও নিজের সত্ত্বাকে উপরে উঠতে দেয় নি।

নিজের কোন চাওয়া পাওয়া কে গ্রাহ্য করেনি। সবার সাথেই বলতে গেলে নিজের উপরের হাসিমুখটা দিয়েই ভাল থাকার চেষ্টা করেছি। তবে নিজের জিবনসঙ্গীর সাথে আমি এমনটা চাই না। আমি চাই আমার জিবনসঙ্গী আমার ভেতরের একাকিত্বকে কাটিয়ে তুলুক। আমার মনে তার সাজানো সংসারটাকে রাঙ্গিয়ে তুলুক। এর বেশি কিছু চাই না। আমি আমার সবটাই মনে করেন আপনাকে জানিয়ে দিলাম। এখন বাকিটা আপনার উপর।বলছিনা আপনাকে আমি ভালবাসি তবে আমি ভালবাসতে চাই কাউকে। আপনার জেদের থেকেই হয়তো একটু ভালোলাগার সৃষ্টি তাই বলছিলাম। আর আপনি জানেন যে লেখকরা একটু অন্যরকম হয় তবে আপনিও তো লেখিকা, একটু নাহয় মানিয়ে নিলেন।

এতসব বলে যখন থামলাম তখন ও আমার দিকে তাকিয়ে বলল, বিয়ের পর কি লিখালিখি চালিয়ে যাবেন নাকি ছেড়ে দিবেন? আমি একটুও অবাক না হয়ে বললাম, আমার লিখা থেকেই তো আপনার সাথে পরিচিতি তাই আপনাকে পেলে সেটা চালিয়ে যেতেই পারি তবে সেটা নির্ভর করবে আপনার উপর। যদি আমি আপনার থেকে ছাড় পাই তবে লিখতে পারি। ও বলল, আপনার লিখা পড়েই আপনার প্রতি ভালবাসা জন্মেছিল। তাই সেদিন আপনার খারাপ ব্যবহারটা মেনে নিতে পারিনি। সুইসাইড নিয়ে গল্পটা লিখেছিলেন তাই সেটাও করতে পারিনি। তাই অনেকটা জেদের বসেই লিখা শুরু করি। তবে বিয়ের পর আমি কিন্তু সময় দেবো না লিখার আপনাকে। তখন সম্পুর্ন সময় আমায় দিতে হবে। তবে এর মাঝেও আমাকে ভালবেসে লিখতে হবে।

আর বিয়ে করতে হলে কিন্তু আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। আমি হাসলাম, বললাম, ইচ্ছে তো একটাই যে কেউ আমার দায়িত্ব নিবে আর আমি তার মত করেই চলবো তবে সেটা কি হবে আদৌ? ও বলল, হয়তো রাগ বা অভিমান যেটাই হোক ছিল তবে তার থেকেও বড় সত্য হল ভালবাসাটাও তো ছিল। নাহলে কেনো আপনার লাইন কপি করব বলেন। ভালবেসে ফেলেছি তবে কি একটু ভালবাসবেন? আমি কিছু বলছিনা শুধু চাচ্ছি ও এভাবে বলতেই থাকুক। হঠাৎ ও আমার এক হাতে হাত রেখে বলল, চলেন, বাইরে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি। আমি বললাম, খাওয়ার অর্ডার দিয়েছি যে। ও বলল, আরে রাখেন তো। আমি তখন তার হাতটি শক্ত করে ধরে বললাম, আইসক্রিম খাওয়াবেন তাহলে যেতে পারি। ও হেসে বলল, আপনি ফুচকা খাওয়ালে ভেবে দেখতে পারি।

পথের মাঝে ছোটখাটো ময়লা তবে পরিস্কার করে বুঝতে পারলাম সেটা পিচঢালা রাস্তা ছিল। আর এই রাস্তার একপাশে হেঁটে চলেছি দুজন। গন্তব্য জানিনা কোথায় তবে ক্যামেলিয়া হাতে এই সন্ধায় অবশেষে কোন ঘুমন্ত একাকিত্বের অবসান।

বিঃদ্রঃ লিখাটা শুধুমাত্র পাঠকদের উদ্দেশ্যে যারা সবসময় পাশে থেকে আমাদের উৎসাহিত করেন। যদিও এই লিখাটা খুব একটা মানসম্মত না তবে এটাই বুঝাতে চেয়েছি যে পাঠক, আপনারা ছাড়া আমি বা আমরা কিছুই না। সবসময় পাশে থাকবেন এটাই আশা করছি। আর গল্পের চরিত্র সম্পুর্ন কাল্পনিক।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত