প্রতারক

প্রতারক

এবার জন্মদিনে আমি দিয়াকে একটা আংটি দিয়েছি। দীর্ঘ ছ’বছর দিয়া কে আমি ভালোবাসি। সমবয়স্ক হলেও আমার থেকে যথেষ্ট বেশী ও পরিণত এবং পরিপক্ব। একটা কঠিন সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে কিভাবে তাল মিলিয়ে চলতে হয় সেটা দিয়ার থেকেই আমার শেখা লাগে। বাবা মায়ের তৃতীয় সন্তান দিয়া ওর বাবার কাছেই থাকে। ওর মা নেই। বাকি দিদি দের বিয়ে হয়ে গেছে। বিগত বছর গুলোর অসংখ্য সন্ধ্যা বেলা আমি দিয়ার সঙ্গে কাটিয়েছি। হাতে হাত। আঙুলে আঙুল। চোখে চোখ রেখে পার করেছি বৃষ্টি ভেজা বিকেল, মেঘাচ্ছন্ন সন্ধ্যাবেলা। একটা ভীর বাস কিমবা একটা ভীর ট্রেনের একটাই মাত্র সীট খালি থাকলে আমি দিয়া কে সেই সীটে বসিয়ে ওর পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছি ঘণ্টার পর ঘন্টা। ঘুরেছি অনেক অচেনা জায়গা। হাত ধরে ট্রেন লাইনে হেঁটেছি। চেপেছি ট্রাম। খেয়েছি প্লেট ভর্তি বিরিয়ানি। জ্যোৎস্না রাতে খোলা আকাশের নিচে সবুজ ঘাসে মাথা রেখে একসঙ্গে গুনেছি তারা। বারংবার বলেছি তোমাকেই চাই, তোমাকেই ভালোবাসি। আমার কাণ্ডকারখানায় চোখের কোণায় জল জমে যায় দিয়ার। বলে এতো নাইবা ভালোবাসলে আমায়। এতো ভালোবাসা যদি কপালে না সয়। তাহলে কি মেনে নিতে পারা যাবে বলো? আমি হেসে বলেছিলাম কেন এতো চিন্তা করো? সারাজীবন এভাবেই কাটাবো। স্রেফ তুমি আর আমি। সবকিছু জলের মতোই সহজ।

আর একদিন দিয়ার বড়দি যেবার প্রথম সন্তান কে প্রসব করলো তখন ছিল গভীর রাত। সেদিন টায় একটু ক্লান্ত থাকার দরুন আমি একটু তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ দিয়ার ফোনে আমার ঘুম ভাঙে। ফোনটা রিসিভ করতেই ও আমাকে বলে ওর বড়দি কে হাসপাতালে ভর্তি করেছে ওকে এখুনি যেতে হবে। আর আমি যেনো ওর সঙ্গে যাই। আমার চোখে তখন গাঢ় একটা ঘুম ছিল। ঘুমের ঘোর টা ঠিকমতো কাটেনি আমার। আমি দিয়া কে বললাম এখুনি যেতে হবে? দিয়া উদ্বিগ্নচিত্তে বলল “হ্যাঁ এখুনি। দিদির কাছে থাকবার মতো আমি ছাড়া কেউ নেই। তুমি আমাকে একটু সাহায্য করো। তুমি বাড়ি থেকে বের হও। তুমি আমার সঙ্গে গেলে আমিও মনে মনে অনেকটা সাহস পাবো।” আমি বুঝতে পারলাম দিয়া কাঁদছে।

দিদির ব্যথায় ব্যথিত। তবুও আমি খুব একটা বিষয় টাকে গুরুত্ব না দিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে ঘুম চোখেই বলি আচ্ছা, ঠিক আছে দেখছি। তারপর আমি ফোন টা কেটে দিই। দিয়ার বিপদ টাকে আমি খাটো করে রেখে নিজের আরাম আয়েশের ঘুম টাকে বেশী গুরুত্ব দিয়ে আমি আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। কিচুক্ষণের মধ্যে গভীর ঘুমে আমি নিমজ্জিত। দেখছি বলে আমি আর বাড়ি থেকে বের হইনি। সেরাতে তীব্র বজ্রপাত সহ বৃষ্টি হয়েছিল খুব। আবহাওয়া টা আরামদায়ক থাকায় রাতে আমার আর একবারও ঘুম ভাঙেনি। পরেরদিন সকালে যখন ঘুম থেকে উঠলাম তখন আট টা বেজে গেছে। তখনো ফোন টা হাতে নিই নি আমি। ব্রাশ করে হাত মুখ ধুয়ে এসে দেখি দিয়ার ত্রিশ টা মিসড কল। মোবাইল স্ক্রিনে দিয়ার নাম টা দেখে গতকাল রাতের কথাগুলো মনে পড়ে যায় আমার। কথা গুলো মনে পড়ে যেতেই আমি সঙ্গে সঙ্গে দিয়াকে কল ব্যাক করি। কিন্তু ফোন আর লাগে না। সুইচ অফ বলে বারবার।

সকালে পেট ভর্তি ব্রেকফাস্ট করে স্বাভাবিক ভাবে দুপুর পর্যন্ত কাটালাম নিজের রুটিন মাফিক। তারপর হঠাৎ একটা অপ্রত্যাশিত খবরে আমি রীতিমতো চমকে উঠলাম। আমি ঠিক বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না খবর টা। শুনলাম গত রাতে দিয়া ধর্ষিত হয়েছে। আর আজ সকালে দিয়া কে কাছাকাছি একটা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে জরুরী অবস্থায়। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কেননা সারা এলাকাজুড়ে ধর্ষণের খবর টা ফণী ঝড়ের মতো ছড়িয়ে পড়েছে ততক্ষণে। সত্যি কথা বলতে আমি তখনো অবধি দিয়ার কথা একবারও চিন্তা করেনি। কেবল ভাবছিলাম তো নিজেকে নিয়ে। আমিও এই ব্যাপারে জড়িয়ে পড়বো না তো?

জড়িয়ে পড়লে বাবা মায়ের আর কারোরই মান সম্মান থাকবে না। আর দিয়াকে তো এখন আমি আর গার্লফ্রেন্ডের মর্যাদাও দিতে পারবো না। আর আমার ফ্যামিলি মেনেও নেবে না। তাহলে কি এখানেই আমার সবকিছু শেষ করা উচিত? আমি গভীরভাবে ভাবতে শুরু করলাম। ভাবতে ভাবতে এই সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি আর দিয়ার সঙ্গে কোনরকম ভাবে যোগাযোগ রাখবো না। আজকেই সবকিছু শেষ করবো। এরপর আমি দিয়ার ফোন নাম্বার টা ব্লকলিস্টে রাখতে যায়। রাখতে গিয়ে দেখি দিয়া আবার আমাকে ফোন করেছে। আমি দিয়ার কল টা সাহস করে আর কেটে দিতে পারলাম না। পরিপূর্ণ ভাবে রিং বেজে আপনাআপনি ভাবে কল টা কেটে যাওয়া অবধি আমি অপেক্ষা করলাম। তারপর কল টা কেটে যেতেই নাম্বার টা ব্লকলিস্টে পাঠিয়ে দিলাম আমি।

এই ঘটনার পর দুমাস হয়ে গেছে। আমি আজকাল বাড়ির বাইরে বের হই না। এই দুমাসে দিয়ার প্রতি কখনওই আমার সহানুভূতি জাগেনি। শুধু মনে হয়েছে ও যেনো কোনোদিনও আমার কাছে আর ফিরে না আসে। ওর ফিরে আসা মানে আমার কাছে একটা বিরাট ডিপ্রেশনের বিষয়। দিয়ার সঙ্গে আমার রিলেশনের কথা টা কেউই জানে না। বাড়িতেও বলা হয়নি কোনদিন। কয়েকদিন পর বাবার পরিচিত এক ভদ্রলোকের মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো। আমি না করলাম না। বিয়ে ঠিক হবার কয়েক সপ্তাহের ভেতরেই আমি বিয়ে করে নিলাম। বিয়ে করে নতুন একটা জীবন শুরু করলাম আমি।

তিনটে বছর আমি ভীষণ ভালোছিলাম। কিন্তু তারপর থেকেই আমার জীবন টা দুর্বিষহ হয়ে পড়লো। আমার সঙ্গে বৈশাখীর খুব ঝগড়া হতে শুরু করলো। বেশীর ভাগ সময় বাড়িতে রান্না হতো না। ঝগড়া হলেই বৈশাখী আর রান্না করতো না। আমাকে বাইরে গিয়ে খেয়ে আসতে হতো। আমার চোখের সামনে প্রকাশ্যে ও অন্য কাউকে ফোন করতো। কিছু জিজ্ঞাসা করতে গেলেই ঝামেলা শুরু। মা বাবার সঙ্গে ভালো ব্যাবহার করতো না। ঠিকমতো দেখাশোনাও করতো না ওদের। রাত জেগে জেগে চোখের নিচে কালি পড়ে যায় আমার। বৈশাখী কখন কোথায় যায় কিচ্ছু বলে যায় না আমায়। ফোন টাও সুইচ অফ করে রাখে।

এসবের মাঝে আমি দিয়া কে খুব মিস করতে লাগলাম আবার। বুঝতে পারি আমি বিরাট একটা ভুল করে চলে এসেছি যেটার সংশোধন আর মোটেও হয়ত সম্ভব নয়। যার ফলস্বরূপয় আজ আমার এই অবস্থা। আমি মনে করতে থাকি সেবার মোট একত্রিশ বার দিয়া আমাকে ফোন করেছিল। তবুও একটিবার আমি ওর ফোন তুলতে পারিনি। ওর সঙ্গে কথা বলতে পারিনি। আমার ভীষণ কষ্ট হতে শুরু হয় এবার। দিয়ার সঙ্গে কাটানো পুরনো দিন গুলো আমার খুব মনে পড়তে থাকে। মেয়েটাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল আর সে রাতে ও আমাকে বারবার ফোনও করেছিল। নিশ্চয় আমাকে সবকিছু জানাবে বলে, আমাকে ওর প্রয়োজন ছিল বলে। তাসত্ত্বেও ও আমাকে পাশে পায়নি। কাছে পায়নি। আমি অনুশোচনার আগুনে জ্বলতে শুরু করি। আমার চোখের কোণা বেয়ে জল গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে। আমি বুঝতে পারি দিয়ার কাছে ক্ষমা না চাইলে এ জীবনে আমি আর শান্তি পাবো না।

কিছুদিনের মধ্যেই বৈশাখী আমাকে ছেড়ে চলে যায় অন্য আরেক জনের হাত ধরে। জানতে পারলাম ও আমার সঙ্গে একদম হ্যাপি ছিল না। এতে আমার বিন্দুমাত্র আক্ষেপ হল না। শুধু মনে মনে বলেছিলাম যে যার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে সুবিধা হয়, সে তার মতো করেই এই পৃথিবীতে ভালো থাকুক। ভীষণ সুখে থাকুক।

দিয়ার সঙ্গে দেখা করাটা আমার ভীষণ জরুরী ছিল। অনেক খোঁজখবর নেবার পর আমি জানতে পারলাম দিয়া এখন একটা স্কুলে পড়ায়। সেই স্কুলের ঠিকানা জোগাড় করে পরেরদিন আমি সোজা সেখানে হাজির হই। সেখানে পৌঁছে স্কুলের পিছনের একটা আম গাছের ছায়াই আমি দাঁড়িয়ে থাকি। টিফিন হলে ছাত্র রা বাইরে বেরিয়ে আসে। আমি একজন কে কাছে ডেকে অসহায় ভাবে বলি “ভাই দিয়া দিদিমণি কে গিয়ে বল আপনার সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছে। আর সে স্কুলের পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

“আমি বলা মাত্রই ছেলেটা স্কুলের ভিতরে দৌড়ে চলে যায়। আর আমি বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। এরপর পনেরো মিনিট হয়ে যায় কেউই আর ফিরে আসে না আমার কাছে। আমি পকেট থেকে রুমাল টা বের করে ঘামে ভেজা কপাল টা মুছতে শুরু করি। কপাল টা মুছতে মুছতে ঠিক তখনই আমি দিয়া কে দেখতে পাই। দেখি স্কুলের দোতালার কোণার ঘর টার জানালা দিয়ে দিয়া আমার দিকে তাকিয়ে আছে। দিয়া কে দেখামাত্রই মনের অজান্তেই আমার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে পড়ে।

একটা অপরাধবোধ আমার ভিতরে তীব্ররকম ভাবে আঘাত করছিল। আমার চোখদুটো ঝাপসা হয়ে আসে। সবকিছু অস্পষ্ট দেখি। তারপরই দিয়া জানালা থেকে সরে যায়। স্কুল ছুটি হলে দিয়া স্কুল থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। আমিও গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকি। তিনবছরে এই প্রথমবার আমি দিয়া কে এত টা কাছ থেকে দেখছি। রোদ চশমা টা চোখে লাগিয়ে আমার সামনে দিয়েই দিয়া হনহন করে হেঁটে চলে যাচ্ছে, আমাকে কোনরকমভাবে গুরুত্ব না দিয়ে। আমিও পিছন পিছন হাঁটতে শুরু করলাম।

কিছুটা যাবার পর আমি দিয়ার বাম হাত টা ধরে ওকে দাঁড় করিয়ে “দিয়া প্লিজ শোনো” শব্দ তিনটে মুখে উচ্চারণ করার আগেই দিয়া ওর ডান হাত দিয়ে ওর বাম হাতটা আমার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আমার গালে একটা থাপ্পড় মারলো। তারপর কোন কথা না বলে সোজা হেঁটে চলে গেলো আমার দৃষ্টির বাইরে। থাপ্পড় পরা গালটায় আমি আমার বাম হাত রেখে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। আমি জানি না আমাকে থাপ্পড় মারার পর দিয়ার রোদ চশমার আড়ালে দুফোঁটা জল বেরিয়েছিল কিনা তবে আমি দেখেছি দিয়ার বাম হাতের আঙুলে আমার দেওয়া আংটি টা আজও লাগানো আছে। খুব যত্ন করে।

[সমাপ্ত]

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত