লতা ও পুঁইলতার আত্মকথন

লতা ও পুঁইলতার আত্মকথন

এক

আমার মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল বারান্দায় দাঁড়াতেই। সকালটা এমনিতে শুরু হয়েছে ভাজির লবন বেশি দিয়ে। ভাজি নিয়ে লাভলুর ভ্যাজর ভ্যাজরে এমনি আমার মন ভাল নেই। বিয়ের চার বছর পরও এই একটা ব্যাপারে আমি ঠিক এখনো অভ্যস্ত হতে পারিনি। শারীরিক অভ্যস্ততা বোধ হয় মানসিক অভ্যস্ততার চেয়ে সহজ। নতুবা ডাল বাগাড়ের রসুন পুড়ে যাওয়া আর ভাত ঝরঝরা না হওয়া নিয়ে বাবলুর কটাক্ষ এখনো কেন তীক্ষভাবে লাগে বুকের ভেতর। এতদিন পরও?

এই এক দোষ আমার কি সে মেজাজ খারাপ হল তা না বলে আমিও ভ্যাজর ভ্যাজর করছি। আমার মেজাজ খারাপের কারণ হল, রাণু ভাবীর বাগানের পুঁইলতা। সেই কি তার বেড়ে ওঠা! মাচার ঝাপ পুরো ছেয়ে ফেলেছে দুই মাসেই। বয়ঃসন্ধিকালে দু’দিন বাদে বাদে কোন মেয়েকে বা ছেলেকে দেখলে যেমন চমকে যেতে হয় তেমনি রোজ একবার বারান্দার গ্রিল গলে ভাবীর বাগানের পুঁইলতার দিকে চোখ গেলেই চমকে যেতে হয়। শুধু কি পুঁইলতা! করলা, সীম, লাউ। সব কেমন তরতর করে উঠে যাচ্ছে! রাণু ভাবীর মত নদীসমৃদ্ধ গড়ন তাদের। অফিসার্স কোয়ার্টারের এই ইউনিটের সামনের এক চিলতে জমির দখলদার রাণু ভাবী। শীত-গীষ্ম-বর্ষা সব সময়ের চলতি সবজি এ বাগানে থাকে। প্রথম মাটির গাঁথুনি কামলা এনে করালেও রোজ ভোরে ভাবীর নিঃশব্দ পদচারনায় বাগানটি ক্রমান্বয়ে ভাবীর মতই মোহময় হয়ে উঠছে। রাণু ভাবী শহুরে মেয়ে তবু আমি অবাক হয়ে দেখি মাটির সাথে তার নিপুণ বন্ধুতা। তাও আবার ঢাকার নিষ্ঠুর মাটিতে!

আমার বাসার সামনের খানিকটা ফাঁকা জায়গায় ভাবীর কাছ থেকে বীজ এনেই আমিও পুঁই বুনেছি, যেগুলো গাছই রয়ে গেছে লতা আর হয়নি। আর ভাবীর পুঁইলতা? কি তার টসটসে শরীর! ভারী ভারী সবুজ পাতা। যেন বৃষ্টির ফোঁটাতেও গাঢ় সবুজ পাতায় নিশ্চিত আঘাত লাগবে। রাণু ভাবীর গড়নের সাথে যেন সেই পুঁইলতার অকৃত্রিম মিল। পাশের ব্যালকনিতে কে এসে দাঁড়াল। রাণু ভাবী বোধ হয়। আমরা এই বিল্ডিং এর পাশাপাশি ইউনিটে থাকি। সংসারের নিত্যদিনের কাজের ফাঁকে বহুবার আমরা মুখোমুখি দাঁড়াই। তবু ভাবী একা বারান্দায় দাঁড়াতেই পাশের ঘর থেকে আমি টের পাই।

রাণু ভাবীর শরীরের একটা নিজস্ব মায়াবী গন্ধ আছে। সন্ধ্যার সময় কোনো হিন্দু দোকানীর জুয়েলার্সে ঢুকলে যেমন সন্ধ্যা আরতির একটা মায়া লাগানো গন্ধ থাকে। ঠিক তেমনি। আচ্ছা, এটা কি শুধু আমিই টের পাই? নাকি অন্য কেউও পায়? পুরুষেরা? লাভলু? কি জানি ওর তো লবণবোধ ছাড়া সব ধরনের গন্ধ বোধই নিস্ক্রিয়।

-লতা, কি করছ? রান্না শেষ?
উত্তর দিতে ইচ্ছে হয় না আমার। তবু ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমি আমার গলা খুব আন্তরিক করার চেষ্টা করি,
-না ভাবী, এই তো সকাল হল। আপনার?

এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা। রাণু ভাবী খুব গোছানো, পরিপাটি। শুধু আমি কেন এই যে পাশাপাশি তিনটি অফিসার্স কোয়ার্টারের ভাই মহল, ভাবী মহল, সবাই জানে কখনোই ভাবীর কোন কাজ পড়ে থাকে না। যেন সেই গল্পের রাজার মতন, যা কিছুতেই হাত দিবে তাই সোনা হয়ে যায়! নতুবা তার ঘরে পরী আছে। উড়ে উড়ে সব কাজ করে দেয়। আমি ভাবীর কথা এমন ভাবে বলছি যেন একযুগ ধরে বিশদ বর্ণনা করলেও তার গুনকীর্তন শেষ হবে না!
-এ্যাই লতা। সারাদিনতো দু’জন ঘরে বসে থাকি। চল না আজ একটু ঘুরে আসি। অন্তুকে শাশুড়ির কাছে রেখে চল।
আমার রাগ হয় যার তীব্রতা আড়াল করে আমি পাল্টা প্রশ্ন করি,
-কোথায় ভাবী?

যেন আমার সীমাহীন আগ্রহ! আগ্রহ না ছাই। ঘরে রাজ্যের কাজ। রান্না-বান্না, শাশুড়ির বিকেলের নাস্তা, অন্তুর আবদার, অফিস ফেরত স্বামীর সেবা, টাইয়ের নট ঢিলা করে দেয়া থেকে শুরু করে চা-পাঁপড় ভাজা…। সব ফেলে বেঙ্গল গ্যালারি!

দুই

এস.এম. সুলতানের মত শিল্পীর ডাকনাম যদি লাল মিয়া হতে পারে তবে অন্তুর বাবার নাম লাভলু তো বড্ড বাহারী। বিয়ের আগে যখন ছেলের নাম শুনলাম, ‘ভুলু’, আমার তো মন-শরীর ভেঙ্গে একাকার। আমার ব্যাংকার বাবা সরকারি চাকুরে পাত্র পেয়ে তো শুধু নামের কারণে বিয়ে ভাঙতে পারে না। তাই সেই বিয়ে আমাকে করতেই হল। বরের নাম শুনে আমার বান্ধবীদের সে কি হাসি-ঠাট্টা। গায়ে হলুদের দিন আমি কান্না চাপতে চাপতে ওদের বললাম, ওর মা আদর করে ভুলু ডাকে, ওর নাম লাভলু। সেদিনই আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, আমি ঠিক ঠিক ওকে স্বপ্নবাজ বা শুভময় বলে ডাকব। পারলে নামের এফিডেভিটও করাবো।

আমার আর ভিন্ন নামে এই মানুষটিকে ডাকা হয়নি। ডাকব কখন? বিয়ের একবছর পর থেকেই লাভলু অন্তুর বাবা হয়ে গেল। আর সংসারের খুনসুটি নতুবা প্রত্যহের কাজের ফাঁকে লুকোচুরি খেলার মানুষ লাভলু না তা আমি বুঝে গিয়েছিলাম প্রথম দর্শনেই। সেই দিন বিকেলের কনে দেখা আলোয় আমার বুকের ভেতর কে যেন বলে উঠল, এ সে নয় লতা… এ সে নয়।

-এ্যাই লতা, ছবিগুলো দেখলে? কি অদ্ভুত না! এ্যাতো বছর পর হঠাৎ আবিষ্কার!
আমার উত্তর না পেয়েও রাণু ভাবী প্রশ্ন করে চলে,

-ভাল লেগেছে না, বল? চারকোলে আঁকা। এই ছবিগুলো শিল্পীর বন্ধুর কাছে ছিল।
রাণু ভাবীর কলকলানি সেই কখন থেকে চলছে। চারকোল? আমি ছবির বুঝি ছাই! আমি তো দেখেছি রাণু ভাবীকে। রাণু ভাবীকে দেখে আজ আমি আরও বেশি অবাক হই, এই মহিলার সিঁথিতে রক্তজবা সিঁদুর, কপালে সূর্যমূখী টিপ। পড়নে মাড় ভাঙা নীল-হলুদ চেকের তাঁতের শাড়ি। সব ঋতু বা দিবসের শাড়ি ভাবীর আলমারিতে বন্দী। শরতের প্রথমদিনে শিউলি আঁকা ধূপ ছোঁয়ানো আটপৌরে শাড়ি থেকে বিজয় দিবসের চিরায়িত লাল-সবুজ। আর আমি! অন্তুকে সত্য-মিথ্যা বুঝিয়ে কোনরকম কামিজ পড়েই ছুট! তাও আবার এক জামার ওড়না আরেকটার সাথে পড়ে এসেছি। চুলের খোঁপাও বার কয়েক খুলে এসেছে। চিরুনীই চলেনি যে! কোথাও বের হওয়ার আগে আমার কত আয়োজন। সব কাজে ভুল আরও বেশি বেশি। তাই সময়ও লাগে বেশি। তার উপর লাভলু আর মাকে এই-সেই বোঝানো। অন্তুর চোখ ফাঁকি। আর রাণু ভাবী? মানিয়ে নেওয়াদের দলের মাঝে ভাবী যেন অচেনা এক গৃহশিল্পী! যার শৈলীতে বা রণকৌশলে খোদ ভগবানও পরাজিত। অথচ রাণু ভাবীর বর অশোক’দা যেন চিরচেনা পথে হেঁটে চলা এক প্রাচীন পুরুষ। লাভলুর মত বৈচিত্র্যহীনও। তাতে কি ভাবীর কোন শূণ্যতা নেই? নাকি কোন গভীর গোপন রেখাহীন শূণ্যতায় ভাবীও ভাসমান থাকে? আমাদের সকলের চোখের আড়ালে?

আচ্ছা ভাবীর মত মেয়ে কিভাবে গৃহবন্দী থাকে ‘হাউজওয়াইফ’ লেবেলে! তবু তার কোন আফসোস নেই। ভগবানের কাছে কোন চাহিদা জানানোর আগেই যেন তিনি তার এই সৃষ্টির আতিথেয়তায় কৃতার্থ। আচ্ছা আমি কি রাণু ভাবীকে হিংসে করি? ভাবীর বাগানের ঐশর্য আর আমার বাগানের দৈন্যতার মত আমার আর ভাবীর মাঝখানের আকাশ সমান ফাঁরাক কি আমার মনের ভেতর ক্ষত সৃষ্টি করছে? তবে কেন নিজের ভেতর জ্বলন টের পাই না! এই যে এস.এম. সুলতানের ‘অদেখা সুষমা’র ক, খ ও যখন আমার মাথায় ঢোকে না তখন বেঙ্গল গ্যালারিতে ঢোকা থেকে বের হওয়া অবধি রাণু ভাবীর সুষমায় আমি কোন সুপুরুষের মতই মুগ্ধ হই। ব্যালকনিতে ভাবীর পায়ের আওয়াজ পড়া মাত্র আমিও সচেতনভাবেই ব্যালকনিতে হাজির। আবার রাণু ভাবী যখন তার পুজোর বেদীর সামনে বসে আরাধনা করে তখন চিনি আনার ছুতোয় আমি তার ঘরে যাই। আমি বসে থাকি। আমার সামনে রাণু ভাবীর জল ধোয়া মুখটি তখন ত্রয়োদশীর চাঁদের মত লাগে।

-লতা, কি ভাবছো এত? ভাই কিছু বলবে? আরে দুর…বাদ দাও তো। বয়েই গেল। আজ একেবারে সময় উসুল করব। আজিজ মার্কেট যাব। সমরেশের বই কেনা হয় না অনেকদিন। ফুচকা…হাওয়াই-মিঠাই…আহা, সব ভুলে যাও।
আমি ভাবীকে দেখি। দেখতেই থাকি। একসময় আমার চোখের সামনে থেকে আমার চির আপন গৃহকোণ অদৃশ্য হয়ে যায়।

তিন

ড্রেসিং টেবিলে সাজিয়ে রাখা প্রসাধনী
আর আলমারির তাকে তাকে শাড়িগুলোকে ছুঁয়ে
ভেবে বসো ট্রয়ের হেলেন হেরে যাবে আজ,
ছুটে আসবে দশ দিগন্তের কবি, ভাস্কর, শিল্পী,
বোকা তুমি, বোঝ না আসলে ডেসডিমোনা হয়েই
আজীবন বাড়াবে তুমি ওথেলোর শোক।

-মা, কি কর মা? এ্যাতো কি লিখ মা রোজ হাবিজাবি? বাবাকে বলে দেব কিন্তু? এটা তো বাবার কম্পিউটার।
-ওরে ব্যাটা…কি বললি? তোর বাবার কম্পিউটার, মায়ের না?

আমি অন্তুকে বুকে টেনে নেই। ছেলেটা একদম বাবার মত হিসাবে ষোলআনা। কান দুটো মলে দেই হাতের আদরে।

-যাও বাবা, খেলতে থাকো। এই তো মা আসছি।
-কি হচ্ছে? মা ছেলেতে?
লাভলু’র সন্ধানী চোখ আমাদের ছেড়ে এবার মনিটরে যায়।
-কি লিখছ আজকাল? অফিস থেকে ফিরেও দেখি। ঘুমোতে যাবার আগেও।
আমার উত্তর দিতে ইচ্ছে হয় না।
-ওহ্ খুব লেখালিখি চলছে। নাকি ফেসবুকিং? ব্লগিং? গাদা গাদা বই কিনছ, বাইরে যাচ্ছ।
আমার চোখের ধৌতপ্রণালী অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে, আমি তাও উত্তর দেই না।
-জীবনটা খুব নিরামিষ হয়ে গ্যাছে, না?

তাচ্ছিল্য মেশানো ঝাঁঝালো গলার স্বরে অভ্যস্ত আমি অবাক হই না। দেখি, উৎসুক আর জিজ্ঞাসু দুই জোড়া চোখ আমার দিকে। বাবা-ছেলে দু’জনের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেই,

-যা ভাবো।

এভাবেই রাণু ভাবীর সংস্পর্শে আমি ক্রমশ পুঁইলতা হয়ে উঠতে থাকি।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত