মুখে ভাতে

মুখে ভাতে

ভানু তার কালো জীবন লক্ষীকে ভালোবাসে খুব। তার প্রকাশে কখনো মাতলামি থাকে তো কখনো রাগ, কিন্তু মধ্যে অন্তঃসলিলা টলটলে ভালোবাসার নদী। রাগে যদি দু এক কথা শুনিয়েও দেয়, পরেই সোহাগে ভরিয়ে দেয় শরীর-মন।
পোয়াতি বউটা চাট্টি ভাত চেয়েছে খেতে ভানুর কাছে। শুনে অবধি ভানুর সে কি চিন্তা, ‘ তাইতো, মেয়েছেলেটাকে কিকরে তুলে দিই এমন বড়োলোকি খাবার!’

সময়টা দ্বাবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন। কলকাতা কল্লোলিনী মহাময়ী হওয়ার পরের পর্যায়ে এসে উপস্থিত এখন। মানুষ এখন তাদের পূর্বপুরুষদের ক্রিয়াকর্মের গভীর ফললাভ করেছে। তাদের পাকস্থলী এখন হজম করে নিত্যদিনের প্রধান আহার্য হিসাবে ধুলো-কাদা-পাঁক, কাঁচের গুঁড়া পর্যন্ত। থিকথিক করা জনপ্রাণীতে ভর্তি পৃথিবীর প্রতি স্থান। কলকাতাতে তো বটেই। এমন সময় কিছু মুষ্টিমেয় মানুষ মাঝেমধ্যে ভাত খেয়ে থাকেন বিলাসিতায়,স্বাস্থ্য সচেতনতায় নয়, বরং ধীরে ধীরে আদিমত্ব ফিরে আসার প্রাবল্যে। যারা এই সামান্য যজ্ঞে অংশ নেন, অর্থাৎ যারা এই বিলাসিতার ধান চাষ করেন, তাদের উপর থাকে অতন্দ্র পাহারা, বিনিময়ে পান ভূষি-খড়, খুদ পেলে তা সোনা পাওয়ার সামিল ছিল।

ফিরে এসেছে সময় প্রযুক্তির ব্যবহারের চরম সীমার ঊর্ধে। মানুষ ভুলে গেছে উন্নতি, আরাম, কৌশল। অথবা হারিয়েছে প্রয়োগের উপায়। অবস্থা এমনই, কোথাও মাটি ছুঁয়ে আবার কোথাও আকাশের ঠিক নিচেই, অথচ দুইয়েরই ব্যবহার সঠিকভাবে প্রযোজ্য হয়না।

ভানু কোলের উপর তার কালো লক্ষীর মাথা তুলে নিয়ে চুলের মধ্যে বিলি কাটতে কাটতে বলে, ‘ শোন না বউ, তোকে কাল ডুমুর সেদ্ধ করে দেব, আমি এক জাগায় সন্ধান পেয়েছি তার। বলিসনি যেন একথা কাকেও,’
ভাত চেয়ে ডুমুর পাওয়ার খুশিতে ভর পোয়াতি বউ স্বামীর কোলে পড়ে ঘুমিয়ে।

এ এমন একটা সময় চলছে, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ধানের বীজ বসালেও রাসায়নিক প্রয়োগের মাটি বিদ্রোহ করে চরম। কিছুতেই সেই বীজের ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা প্রাণটাকে আনতে দেয় না বাইরের নিষ্ঠুর পৃথিবীর জল হাওয়ায়। যাদের হাতে হতো, সেখানের মাটি হয় নরম মনের নয় দুঃখ সহ্য করার মত বুকের পাটা আর সেখানের নেই। তাই বীজ সহজলভ্য হলেও মাটি ছিল না।

ভানু চোর। চৌর্যবৃত্তিতেই চলে তার কুঁড়ে সংসার। চুরি করে আনে খড়, পুঁই মাচার শুকনো ডগা, আঁচলশুদ্ধ শুকোতে দেওয়া বাবুদের বাড়ির বউদের কাপড়। কখনো ভাত চুরির কথা ভাবেনি সে। গায়ে চুকচুকে তেল মাখতে মাখতে ভানু ভাবতে শুরু করে পোয়াতি বউটার ইচ্ছাটা কি সে কোনোভাবেই রাখতে পারবে না!

নির্মলবাবু বেশ ভালো অবস্থাসম্পন্ন মানুষ। মাসে দুদিন ভাতে পাত পরে বাড়ির ছেলেদের। ভানু সুযোগ বুঝে একেবারে রান্নাঘরে গিয়ে ঢোকে। সিঁদ কাটতে গিয়ে মাথার উপর ছিঁড়ে পরে শিকে। হাঁড়ি ভর্তি ধানের বীজ। গলার গামছা খুলে মুছে নেয় চোখের জল, আর বেঁধে নেয় সাফল্য; ‘ বউটা ভারী আনন্দ পাবে আজ।’

ভানুর বউ অনেক ভেবে বললে, ‘ এ বীজে আমি একা না, আমার পেটেরটাকেও খাওয়াতে চাই। এই বীজে হবে ধান।’
এবার আরো মুশকিল ভানুর। তা কিকরে সম্ভব। একে চুরির জিনিস, তায় ধান চাষ হচ্ছে শুনলে গ্রামের মোড়ল এসে সব নিয়ে চলে যাবে। অনেক ভাবনা চিন্তা করে কুঁড়ের চাল দিল খুলে। মেঝের মাটি কুপিয়ে কুপিয়ে পুকুর থেকে বালতি করে জল তুলে তুলে ভানু বসালে সেই বীজ খুব সাবধানে, খুব গোপনে । চললো পাহারা।

রাত্রে সেই কুঁড়ের ভিতরে চষা মাটির এককোণে পরে থাকে দুজনে। অপেক্ষা করে বীজ অঙ্কুরের। হঠাৎ একদিন ভানুর বউয়ের পেটে ওঠে ব্যাথা। হাসপাতালের সুবিধা পাওয়া ছিল ‘বরাত জোর’। শহরের মধ্যেই গজিয়ে উঠেছে কুঁড়ে, কুঁড়ের বাইরে কাপড় খাটিয়ে দাই বের করলে ছেলে। অবাক হয়ে বললে, ‘এ আবার কি ভানু, ঘরের ভিতরে হবে ছেলে,তা নয়, বাইরে। কেন রে এমন করে বৌটারে কষ্ট দিচ্ছিস? চালটাও তো ছাইবি নাকি। বলি কবে বুঝবি? আহারে কালোপানা মুখটা আরো কালি হয়ে গেছে’। ভানুর বউ মুচকি হাসে প্রসব বেদনার মধ্যেও।

ভানুর ছেলে হাত ছোড়ে পা ছোঁড়ে, আর ধান গাছের কচি শিসে লাগে গন্ধ। নাকে টেনে নেয় সেই গন্ধ দুজনে। হাতের মুঠোয় ধরে এনে ভানু শুঁকিয়ে দেয় ছেলেকেও।

অঘ্রানের নরম রোদের আমেজ ভানুর গায়ে পিঠে আর মনে। পাকা ধান গুলো তার কুঁড়ের ভিতরে সোনার মত খেলে খাচ্ছে। হাত দিয়ে আদর করে ভানু বলছে, ‘আমার বউটা কত আনন্দে ভাত খাবে, আমার ছেলে খাবে। আমার ছেলের মুখে ভাত হবে।’

ভানুর বউ শুনে আনন্দে কেঁদে বলে, ‘হবে আমাদের ছেলের মুখে ভাত হবে, আমার ছেলে ভাত খাবে। আমরা ভাত খাবো।’

অনেক খুঁজে এতদিন পরে নির্মলবাবু তবে পেয়েছেন সিঁদ কেটে ধান চোরের খোঁজ। পুলিশ সঙ্গে নিয়ে তবে এসেছেন ভানুর বাড়ি। ধান সিদ্ধ শুকনো করার পরে সেইদিনই ভানুর ছেলের মুখে ভাত। ভানু কোলে বসিয়ে মুখে দিচ্ছে তুলে গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের দলা আর বউটা ফুঁয়ে ফুঁয়ে ভরিয়ে তুলছে শাঁখ। কচি চোখেও বয়ে যাচ্ছে অজানা খুশির ঢেউ।

পুলিশ এসে ঘিরে ধরেছে ভানুর ভাঙা কুঁড়ে, খুঁজে পেয়েছে চুরির প্রমাণ। রোদে পুড়ে জলে ভিজে বস্তার উপর ছেলেকে শুয়িয়ে কাটিয়েছে তিনমাস ভানুরা। নির্মালবাবু ভাত দেখেই চিনে ফেললেন তার পূর্বপুরুষের গন্ধ, ‘হ্যাঁ, সাহেব। এই আমার চালের ভাত।’

পুলিশ অফিসার বড় মায়াবী। থালার ভাতের শেষ খাবলটা ভানুর ছেলের মুখেই তুলে দিলেন নিজে আর না খেয়ে। আঙ্গুল চাটতে চাটতে বললেন, ‘ ভানু, তুই অনেক কষ্টে এত সুন্দর ভাত তৈরি করেছিস তোর কুঁড়েয়, বল কি চাই তোর। আমি কথা দিচ্ছি যা চাইবি তোকে দেব তাই, আজ আমি খুব খুশি। আজ আমি খুব খুশি।’

ভানুর বউয়ের হাত থেকে পরে ভেঙে গেছে শাঁখ।ভয়ের কাঁপন চোখে মুখে। কুঁড়ের বাইরে এসে জড়ো হয়েছে দাইমা সমেত আরো অনেকে। ‘তাইতো পেটে পেটে এত। কিচ্চু বুঝলাম না, কবে করলি রে ভানু, তোরা এসব?’ এসব আওয়াজকে চাপা দিয়ে উঠে দাঁড়ালো ভানু। যে কোদাল কুপিয়ে মাটির বুকে বানিয়েছে ধানের ঘর, সেই কোদাল কাঁধে নিয়ে, ক্রোধ রক্তচোখে চিৎকার করে উঠে বলে, ‘সাহেব, আমার সন্তান যেন থাকে মুখে-ভাতে।’

চৌর্যবৃত্তি ভানুর পেশা, কাঁচের টুকরো পর্যন্ত সে নিয়ে আসে চুরি করে। গরাদেও গেছে তার জন্য দু-একবার। পুলিশ এসেছে বাড়িতে, ভানুও চুপিচুপি পুলিশের সঙ্গে গিয়ে ঢুকেছে গরাদে।

এবার ভানুর চোখ-মুখ-বুক একসঙ্গে বলে ওঠে এক ভয়ংকর তেজের আগুনের হলকার মত, ‘ সাহেব, আমার সন্তান যেন থাকে মুখে ভাতে’। অন্য ভানুকে দেখলো পুলিশ সাহেব। তার মুখের আওয়াজ আর চোখের দৃপ্ততা ঘনত্বের জোয়ারে ঢেকে ফেলছে কলকাতার আকাশ। অচেনা ভানু, নিজের সৃষ্টির স্রষ্টা ভানু। পুলিশ নির্মলবাবুকে বললেন, ‘ আপনি তো ভারী আশ্চর্য মশাই, ধান দেখেই মান চিনে গেলেন? চলুন চলুন এখান থেকে।’

বাইরে এসে নির্মলবাবুকে বললেন, ‘ কষ্টের ফল মিষ্টি আর কঠিন হয় নির্মলবাবু, ফিরে যান’। মুখ ভর্তি ভাতের প্রশান্তি নিয়ে পুলিশ অফিসার ফিরে যায়, নির্মলবাবুও।

হাঁড়িতে পরে থাকা অবশিষ্ট ভাতের দানা’কটা এবার ভানু যত্নে কুড়িয়ে তুলে দেয় বউয়ের মুখে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত