মুখটি কার?

মুখটি কার?

ঘুমাতে পারছি না আমি। নিদ্রার আলতো জড়িয়ে ধরার বদলে অনিদ্রা আমার চোখকে ভারাক্রান্ত করেছে। শেষবার ঘুম থেকে জাগার পর ঘুমহীন কেটে গেছে তিন তিনটি দিন এবং আজকে রাত্রে যে সে আসবে- এমন কোন লক্ষণও টের পাচ্ছি না। তবে ৭২ ঘণ্টা ঘুমহীন থাকার পরও আজকে রাত্রে শরীর ও মনে অন্তত এতটুকু ক্লান্তিহীনতা বোধ করছি যে “মুখটি কার?” শিরোনামের এই গল্প লেখা শুরু করতে এবং বেশ কিছুদূর এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছি।

অনেক দিন ধরেই আমি প্রাত্যহিক একটা রুটিন অনুসরণ করি- প্রতিরাত্রে বাঁধা একটা সময়ে বিছানায় যাওয়া, পরদিন সকালে একটা সুনির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে জেগে উঠা। বহুদিন পর প্রথম সেই প্রাত্যহিকতায় ব্যাঘাত ঘটল। হলফ করে বলতে পারি, রুমের পরিবেশ এই অনিদ্রার জন্য সামান্য মাত্রায়ও দায়ী নয়। রুমের সব জানালা লোহার চিকন জাল দিয়ে আটকানো থাকায় ভেতরে মশা-মাছি বা কোন ধরনের কীট-পতঙ্গের উৎপাত নেই। সবকিছু পরিপাটি করে সাজানো, মেঝেতে ময়লার একটা কনাও পড়ে থাকে না, মাকড়সা বাসা বাঁধা তো দূরের কথা ভেতরে ঢোকারই সুযোগ পায় না। তোশকের উপর নিপাট শুয়ে থাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্নিগ্ধ রঙের বিছানার চাঁদর আর বালিশের গা জড়িয়ে সদ্য ধোয়া ওয়াড়।

সেলফে বইগুলো সুসংগঠিত সৈন্যবাহিনীর মত থরে থরে সাজানো, আমার কাপড়-চোপড়গুলো দিয়ে নিজেকে পরিপাট্য করে দেয়ালের পাশ ঘেঁষে নিঃস্পন্দ দাঁড়িয়ে সুষম নকশার কাঠের আলনা। দামী ব্র্যান্ডের সুদৃশ্য সিলিং ফ্যানটি প্রায় নিঃশব্দে রুমের স্থবির বাতাসে স্বচ্ছন্দ আলোড়ন তোলে। দেশের গুনী সব চিত্রকরদের আঁকা এবং আলোকচিত্রীদের ক্যামেরায় ধরা পরা ল্যান্ডস্কেপ (ভূদৃশ্য) দেয়ালে ঝুলিয়ে বাহিরের প্রকৃতিকে ভেতরে নিয়ে আসা হয়েছে। রুমের ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় ও ঝুল বারান্দায় কাঁচের বোতল ও বড়, ছোট, মাঝারি আকারের মাটির টবে হরেক রকমের ইনডোর প্ল্যান্ট যেগুলো রুমে সরবরাহ করে টাটকা অক্সিজেন এবং পরিবেশকে রাখে দূষণমুক্ত আর বাতাসকে সজীব এবং প্রানবন্ত। রুমের আসবাবপত্রগুলো সেকেলে ধাঁচের যেগুলো পূর্ব পুরুষদের সাথে অদৃশ্য যোগসূত্র স্থাপন করার মাধ্যমে আমাকে এক অভূতপূর্ব নিরাপত্তার অনুভূতি দান করে- যার ফলে আমি রুমে প্রবেশ করার সাথে সাথেই এক ধরনের নিরাপদ বোধ করি- যা আমার নিশ্চিন্ত ঘুমের জন্য বেশ মাত্রায় সহায়ক। দেয়াল, ইস্ত্রি করা জানালার পর্দা এবং রুমের ভেতরে থাকা অন্যান্য আসবাবপত্রের রঙ দীর্ঘ তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের এবং হালকা যার ফলে চোখের জন্য নিরাপদ ও আরামদায়ক, মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক এবং মন-প্রান স্নিগ্ধকারী। রড লাইটটি নরম-কোমল আলোয় রুমটি ভরিয়ে রাখে, আর সুইচ অফ করার সাথে সাথে সম্পূর্ণ রুমটি যেন পরিণত হয় কৃষ্ণ গহ্বরে; ঘুমের অতলে তলিয়ে যাওয়ার জন্য যা খুবই সহায়ক এবং কার্যকর।

আমার জীবন-যাপনও খুবই নির্বিঘ্ন এবং ঘুমের এই ইদানীং ব্যাঘাতের জন্য কোন মতেই দায়ী নয়। শারীরিক-মানসিক ভালো থাকার জন্য ঘুমকে আমি অত্যন্ত গুরুত্ব দেই। ঘুম আমার কাছে শুধু ঘুম নয়- তা যেন চলে গেছে একধরনের আসক্তির পর্যায়ে। ঘুমকে বাঁধাহীন রাখার জন্য আমার দৈনন্দিন জীবনকে বেঁধেছি আটোসাটো করে। সামান্য মাত্রায়ও ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে বা ঘুম-জাগরণ চক্রকে আক্রান্ত করতে পারে এমন যে কোন কিছুকে আমি খুব সতর্কতার সাথে এড়িয়ে চলি। ঘুমের জন্য সহায়ক কোন উপাদান খুঁজে পেলে প্রাত্যহিকতার সামান্য ফাঁক-ফোকরে সেগুলোকে এমন সতর্কতায় পুরে দেই যাতে জীবনের নিঃস্পন্দতায় সামান্যও অস্থিরতা তৈরী না হয়। কারণ অস্থিরতা- তা যে কোন ধরনের হোক না কেন- ঘুমের জন্য সমূহ ক্ষতির কারণ। পাশাপাশি কোন ধরনের চিন্তাকেই এমন মাত্রায় প্রশ্রয় দেই না যা শেষমেশ দুঃশ্চিন্তা বা অবসাদে পরিণত হয়ে ঘুমের সাথে বিবাদে লিপ্ত হতে পারে। এসব কিছুই করতে হয় সূক্ষ্মভাবে এবং ভারসাম্য বজায় রেখে। কারন তরঙ্গহীন শান্ত পুকুরে সামান্য একটা ঢিল যেমন পুরো পুকুরকে তরঙ্গায়িত করে ফেলতে পারে ঠিক তেমনিভাবে কোন ব্যাপারে সামান্য একটু এদিক-সেদিক হলেই আমার নির্বিঘ্ন জীবন হয়ে উঠতে পারে সম্পূর্ণরূপে অস্থির। সব কিছুই খেয়াল করে চলতে হয় আবার কোন কিছুতে বেশী খেয়াল দিলে যেমন চিন্তা একসময় দুঃশ্চিন্তায় পরিণত হতে পারে ঠিক তেমনি অন্য কিছু হয়ে উঠতে পারে বেখেয়াল। সুতারং জীবনকে পুরোপুরি নির্বিঘ্ন রাখার এমনই কঠিন একটা ব্যাপার যা প্রায় অসম্ভব- কারন জীবন জীবনকে নির্বিঘ্ন কিভাবে রাখা যায় এই বিষয়ক বেশী চিন্তাও জীবনে এক ধরনের অস্বস্তির আমদানী করে।

এই ইদানিং অনিদ্রার পেছনে এখন পর্যন্ত সুনির্ষ্ট কোন কারন আবিষ্কার করতে পারি নি। বিগত কয়েকদিনের মধ্যে এমন ব্যতিক্রম কিছু ঘটেছে বলে মনে করতে পারি না, যা আমার ঘুমের নিথরতায় সামান্য মাত্রায়ও স্পন্দন তৈরী করতে পারে। অন্য সময়ের মত আমি বেশ ফুরফুরে মেজাজেই ছিলাম, ছিল না কোন মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা দুঃশ্চিন্তা। কারো প্রতি কোন ধরনের দায়িত্বশীলতা যেমন কখনই আমার মধ্যে নেই ঠিক তেমনি সম্প্রতি বুকের ভেতর অনুভব করি নি নিজের অথবা অপর কারো জন্য কোন ধরনের উৎকণ্ঠা।

শেষবার শুধু একটা দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুমিয়ে পড়ার কিছুক্ষণ বাদেই জেগে উঠি। আমি হয়ত তখন ঠিক ঘুমিয়েও পড়িনি, ঘুমের আবেশের চৌকাঠ ঠিঙ্গিয়েছি মাত্র। ব্যাপারটাকে দুঃস্বপ্ন বলে সংজ্ঞায়িত করাও বোধ হয় না ঠিক হবে। আমি শুধু একটি ফ্রেমের অভ্যন্তরে বেশ কিছু স্থিরচিত্র দেখেছিলাম। সঠিকভাবে বললে, একটা স্থিরচিত্রই যেন একেক সময় একেক রূপে পরিবর্তিত হচ্ছিল। ঢাকা শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা রাজপথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ডিজিটাল বিলবোর্ডে যেমনটা দেখা যায়। স্থিরচিত্রটি কখনও কখনও এতই ঝাপসা হয়ে উঠে যে কোন কিছুই বোধগম্য হয় না। তারপর রোদ্দুর পড়া মৃদু তরঙ্গায়িত সমুদ্রে দ্বীপ জেগে উঠার প্রক্রিয়াচলাকালীন দীর্ঘ সময়কে দ্রুত গতির করে একটি সংক্ষিপ্ত সময়কালে নিয়ে এলে যেমন ঠিক তেমনিভাবে ঝিরঝির থেকে ক্রমে গড়ে উঠে শুকিয়ে যাওয়া একটা নদীর ছবি; পৃথিবীর বুকে বিশাল, ভয়ানক, বিশ্রী একটা ফুটন্ত ক্ষতের মত বিছিয়ে আছে। এর পর অনুভবে আমার সমস্ত শরীর ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করে।

মস্তিষ্ক হয়ে উঠে পৃথিবীর সম আয়তনের। শুকনো নদীটি আমার মস্তিষ্কে তার বিশালতা এবং বীভৎসতা সহকারে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং তার পরিধি ও গভীরতা বাড়তে বাড়তে জলহীন সমুদ্রে পরিণত হয়( জলহীন সমুদ্র নামে কোন কিছুকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না কারন জলের সাথে সমুদ্রের এত আঙ্গাআঙ্গী সম্পর্ক যে জল না থাকলে তা আর যা হোক না কেন তা আর সমুদ্র নয়, তবুও এই সুবিশাল ক্ষতটিকে এই লেখায় জলহীন সমুদ্র বা সাগর, শুকিয়ে যাওয়া সমুদ্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হবে।)। এর মধ্যেই সেই জলহীন সমুদ্রের সবচেয়ে গভীর স্থানটিতে ফুটে উঠে একজোড়া নর-নারীর সঙ্গম দৃশ্য; আশেপাশের সবকিছু স্থির থাকলেও সঙ্গম দৃশ্যটিই শুধু গতিশীল। আমি সেই মৃত সাগরের বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে সঙ্গম প্রক্রিয়ার সমস্ত খুটিনাটি এত স্পষ্টভাবে দেখতে পাই যেন কম্পিউটার স্ক্রীনে হাই ডেফিনেশন রেজুলেশনের পর্নোগ্রাফি দেখছি, যদিও আমার অবস্থান থেকে ঘটনাস্থল অনেক অনেক দূরে। স্থিরচিত্রটির চোখের সামনে থাকা এবং ঠিক একই সময় মস্তিষ্কের ভেতর শুকিয়ে যাওয়া সমুদ্রের আকারে অবস্থান নেয়া ব্যাপারটি যেন একটা হলোগ্রাফিক থ্রিডি ইমেজের মত। এই স্থিরচিত্রটি আমি দেখতে চাচ্ছিলাম না বলেই বোধ হয় ঘুম থেকে জেগে উঠেছিলাম এবং এখনও দেখতে চাই না বলে চোখের পাতা বন্ধ করে রাখি। তবে ছবিটি ঠিকই আমার চোখের সামনে থেকে মস্তিষ্কের পেছন পর্যন্ত বিস্তার করে রাখে। বিছানায় শুয়ে আমি টের পেতে থাকি আমার শরীর সংকুচিত হতে হতে তার বিশালতা থেকে নিমিষেই চরম মাত্রায় ক্ষুদ্র হয়ে উঠে, বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি। তারপর আবার বিগ ব্যাং এর মত হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে আলোর গতির চেয়েও দ্রুত প্রসারিত হতে শুরু করে। শরীর আমার প্রসারণ ও সংকোচন এই দুই অবস্থার মধ্যে যাতায়াত করতে থাকে খুবই ঘন ঘন এবং দ্রুত।

সারারাত এভাবে নির্ঘুম কাটিয়ে ভোরের আলো ফুটে উঠার পর বিছানা থেকে উঠে পড়তেই শরীরের প্রসারণ ও সঙ্কোচন বন্ধ হয়ে নিজস্ব আকারে স্থিত হয়। তবে এখন পর্যন্ত এক মুহুর্তের জন্যও একেক সময় একেক রূপে পরিবর্তিত হতে থাকা স্থিরচিত্রটি আমাকে পরিত্যাগ করে নি। ব্যাপারটা অনেকটা যেন সেই ঘটনার মত যেখানে একজন অপরাধী ব্যক্তিকে শাস্তিস্বরূপ অশ্লীল, কদর্য, কুৎসিত, ভয়ংকর (বা এমন কিছু যা দেখলে তার অতীত জীবনের দুঃসহ কোন কিছু মনের পর্দায় ভেসে উঠবে) কোন ছবি বা ভিডিও চিত্র দেখতে বাধ্য করা হয় চোখের পাতা সহ পুরো মাথায় এমন একটা যন্ত্র লাগিয়ে যাতে শত চেষ্টায়ও সে তার চোখ বন্ধ রাখতে বা মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিতে না পারে। তবে আমার ব্যাপারটা খানিকটা আলাদা। যদিও আমি মুখ অন্যদিকে ফেরাতে পারি, এমনকি চোখ দুটোও পারি যতক্ষণ ইচ্ছা বন্ধ করে রাখতে( চোখ বন্ধ রাখলেই বরঞ্চ দৃশ্যটির নিবিড়তা বাড়ে), তবে ছবিটি আমি স্পষ্টই ঠিক আমার চোখের সামনে দেখতে পাই এবং‌ মস্তিষ্কের ভেতর অনুভব করতে থাকি সেই বিশাল ক্ষত- সেই বিশাল ক্ষতটি মস্তিষ্কে কোন শারিরীক বেদনার সঞ্চার না করলেও আমাকে একধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে- লোকাল এনেস্থেসিয়া দিয়ে শরীরের কোন জায়গা অবশ করে কোন অপারেশন চালানোর সময় যেমন রুগীটি ব্যথা পাওয়া থেকে মুক্ত হলেও অপরাশেনের ক্রিয়াকর্ম (টান, চাপ, ধাক্কা) ভাসাভাসা বুজতে পারে, যা তাকে একধরনের বিভিষীকার মধ্যে ফেলে দেয়- ব্যপারটা অনেকটা সেরকম। যাহোক, ছবিটি আমার চোখের সামনে এবং ক্ষতটি আমার মস্তিষ্কের ভেতরে থাকা সত্বেও দিনের বেলায় খানিকটা তন্দ্রাচ্ছন্নতা বোধ করি। তবে অসময়ের ঘুম স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণ চক্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বিধায় বিছানায় যাওয়া থেকে বিরত থাকি বা কষ্ট করে নিজেকে জাগিয়ে রাখি।

ঘুম ঘুম শরীরে স্বপ্নাচ্ছন্নের মত কেটে যায় দিনটি। রাত্রে সময়মত বিছানায় যাই এই নিশ্চিন্ততা নিয়ে যে মুহূর্তের মধ্যেই প্রতিদিনের অভ্যাস মত ঘুমিয়ে পড়ব। এবং গত রাতে যেহেতু এক ফোটা ঘুমও হয় নি সুতরাং আজকে রাত্রের ঘুম অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশ গাঢ় এবং গভীর হবে। যথারীতি চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে, চোখের সামনে লটকে থাকা ছবিটাও একটু একটু করে অপসৃয়মান হয় আর মস্তিষ্কের ভেতরের ক্ষতটাও সরিসৃপের বুকে ভর দিয়ে হাঁটার মত করে বুজে আসতে আরম্ভ করে। শুয়ে আছি চিত হয়ে; আদরের কোলবালিশটা ডানপাশে রাখা। যেই মাত্র আমি পাশ ফিরে বাম পায়ের হাটু ভাঁজ করে এনে বালিশের উপর রেখে দুহাতের আবেষ্টনী দিয়ে বালিশটাকে জড়িয়ে ধরতে গেছি, সাথেই সাথেই- বালিশটা আমার বুক স্পর্শ করার আগেই- বুকের মধ্যে প্রচন্ড একটা ধাক্কা অনুভব করি। মনে হল যেন নরম তুলোর কোলবালিশ আলিফ-লায়লার বদ জিনের আছরে পাথরে রুপান্তরিত হয়েছে। ভারী হয়ে নীচের দিকে নেমে আসতে থাকা চোখের পাতা দুটি মুহূর্তেই হালকা হয়ে স্প্রিংগের মত এক ঝটকায় উপরে উঠে যায়। শরীরে আড়ষ্ট হয়ে থাকা ঘুম ভাবটিও ইতিমধ্যেই কখন যেন উধাও হয়ে গেছে; মিলিয়ে যেতে থাকা স্থিরচিত্রটিও ফিরে আসতে শুরু করেছে আবার। এমনকি শরীরের সংকোচন-প্রসারণ অনুভবের ব্যাপারটিও ফিরে আসে সুযোগ বুঝে আর মস্তিষ্কের ভেতরের সেই ক্ষতটাকে তার সেই বিশালতা সহই টের পাই।

পরের দিন এমনভাবে কাটে যেন গত রাতে পর্যাপ্ত ঘুম হয়েছে। না-ঘুম জনিত ক্লান্তি, পরিশ্রান্তি বা মাদকতা মুহূর্তের জন্যও আমাকে স্পর্শ করে নি। দ্বিতীয় দিন রাতেও আমি সময় মত ঘুমাতে যাই। এই রাত্রে আমি অবশ্য খানিকক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম- এই হবে ঘন্টা দুই এর মত, রাত্রি তিনটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত। তবে এটা অবশ্য পুরো ঘুম নয়- ঘুম ও জাগরণের অসমস্বত্ব মিশ্রণ মাত্র। বিছানায় নিঃস্পন্দ শুয়ে থাকা আমার উপর ধীরে ধীরে ঘুমের একটা ভারী আবরণ নেমে আসে। এই আবরণ বিছানার চাদরের মত হালকা যেমন নয় ঠিক তেমনিভাবে দামী কম্বলের মত মসৃণও নয় বরঞ্চ পুরাতন ছেড়া শাড়ি দিয়ে গ্রামীণ নারীদের হাতে সেলাই করা কাঁথার মত খসখসে এবং ভারী- প্রচন্ড গরমের রাতে গায়ের উপর কেউ কাঁথা বিছিয়ে দিলে যেমনটা অনুভব হয় এই সময়ের অনুভূতিও ছিল অনেকটা সেরকম। যাহোক, ঘুমেরই এই ভারী আবরণে শরীর-মনে কেমন একধরণের অস্বচ্ছন্দ বোধ শুরু হয়। শরীরের সংকোচন-প্রসারণ বোধটিও যথারীতি ফিরে আসে।

যাহোক, মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে অবস্থান নেয়া জলহীন সমুদ্রের মত ক্ষতের কারনে তৈরী হওয়া উদ্বিগ্নতা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খুঁটির আকারে শরীরের চতুর্দিক দিয়ে ফুঁড়ে বের হয়। উদ্বিগ্নতার এই খুঁটিগুলো আমার উপর নেমে আসা ঘুমের ভারী, অমসৃণ কাঁথাটিকে শরীরের সাথে পুরোপুরি সম্পৃক্ত হওয়ার পথে নিশ্চিত বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। ব্যাপারটা যেন অনেকটা শরীরের চামড়া ছাড়িয়ে তা দিয়ে শরীর ঢেকে রাখার মত। ঘুম আমার থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেই আমাকে ঢেকে রেখেছে। মাঝে মাঝে কয়েকটা খুঁটির সম্মুখভাগ চোখা হয়ে মোটা কাঁথার(যা আমার শরীরের সাথে সাথে সংকুচিত এবং প্রসারিত হচ্ছিল) আকারের ঘুমের আবরণের কোন কোন জায়গা বিদ্ধ করে। এভাবে আক্রান্ত হয়ে ঘুমের কাঁথা ব্যথায় কুকড়ে যেতে থাকে আর ফলশ্রুতিতে দূরে সরে যেতে থাকে। আবার এমনও হয় যে ঘুমের কাঁথা কোন কোন জায়গা বেশ ভারী হয়ে উঠে উদ্বিগ্নতার দু-একটা খুঁটি ভেঙ্গে ফেলে শরীরের সাথে স্পর্শ লেগে ধীরে ধীরে সম্পৃক্ত হয়ে উঠে। এরকমটা হতে থাকে শুধু মাত্র পায়ের পাতা বা হাতের তালুর দিকে। আমি শুধু তখন মনে প্রাণে কামনা করতে থাকি উদ্বিগ্নতার খুঁটি এক এক করে সব ধ্বসে পড়ুক এবং ঘুমের আবরণ শরীরের সাথে সম্পৃক্ত হোক আর ঘুমের আবরণটি কঠিন থেকে তরল, তরল থেকে বাষ্প এবং শেষমেশ প্লাজমায়*পরিণত হয়ে পুরো শরীরে কোষে কোষে সুবিন্যস্তভাবে পড়ুক ছড়িয়ে।

এর পরের পুরোটা দিন আমার শরীরে একটা যেন চনমনে ভাবই লেগে থাকে। চোখের সামনে ঝুলে থাকা ঐ অপ্রিয় ছবিটি সমস্ত মন-প্রাণ এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে যে, ঘুমে প্রচন্ড ব্যাঘাতের বিষয়টা আমার মনের অভ্যন্তরে ঢুকতে পারে না- কুকুরের মত বাইরে দাঁড়িয়ে ঘেউ ঘেউ করতে করতে অবশেষে ক্লান্ত হয়ে চুপ মেরে বসে ঝিমুতে থাকে। অনিদ্রার বিরূপ প্রভাব ঠিক মত টের পাই কেবল তৃতীয় রাতে। বিছানায় যাওয়ার সময়ের কিছুক্ষণ আগে থেকেই বুঝতে পারি খুলির ভেতরের মস্তিষ্কটি যেন ধীরে ধীরে সিমেন্ট-বালি গুলানোর মত জমে উঠতে শুরু করেছে। বিছানায় শোয়ার প্রক্রিয়ায় প্রথমে বিছানার মাঝে পা মেলে দিয়ে বসে শরীরের উর্ধ্বাংশটাকে ধীরে ধীর নীচের দিকে নামাতে নামাতে এক পর্যায়ে যখন মাথাটা পাখির পালকের বালিশের উপর আলতো ভাবে স্থাপিত হয় তখন জমে গিয়ে সঙ্কুচিত ও কঠিন হয়ে উঠা মস্তিষ্কটি খুলির সাথে ধাক্কা খায়-বিছানায় বসা থেকে শোয়া এই সামান্য সময়ের মধ্যেই মস্তিষ্কটা সম্পূর্ণরূপে কঠিন হয়ে উঠেছে। মস্তিষ্কটার কঠিন হয়ে উঠার এক ধরনের দৃষ্টিভ্রম জনিত ফলশ্রতিতেই কেমন অদ্ভূত রকম ভারী হয়ে উঠে মাথাটাকে বালিশের ভেতরে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশী মাত্রায় দাবিয়ে দেয় এবং নরম জিনিস কঠিনে রুপান্তরিত হওয়ার যে একটা নিজস্ব যন্ত্রণা আছে বলে নিজের কাছে বোধ হয় তা টের পেতে থাকি।

সারা রাত ধরে আমার চোখের সামনে ঐ অপ্রিয় ছবি এবং খুলির ভেতরে ঐ জমাট বাঁধা মস্তিষ্ক নিয়ে ভয়ানক যন্ত্রণাকাতর একটা রাত কাটাই। ঐ রাতে আমার শরীরে নানা ধরনের উপসর্গ দেখা যায়। আমি স্পষ্টভাবে টের পাই আমার শরীরের শিরা-উপশিরার ভেতর দিয়ে বয়ে চলা রক্ত কখনও খুব দ্রুত এবং কখনও খুব ধীরে প্রবাহিত হচ্ছে। মাঝে মাঝে থেমে যাবারও উপক্রম করে। আমি প্রচন্ড অস্থিরতা বোধ করতে থাকি। ঐ রাত্রিটি আমাকে শারীরিক-মানসিকভাবে প্রচন্ড দূর্বল করে ফেলে। যাহোক, ভোরের আকাশ আলোকিত হয়ে উঠার সাথেই সাথেই আমি বিছানা ছেড়ে একটা রেস্টুরেন্টে চলে যাই সকালের নাস্তা সারতে। রুমে ফিরে এসে আবার বিছানায় যাই, কিছুক্ষণ পর আবার উঠে পড়ে চেয়ারে বসে থাকি। অজ্ঞান হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহুর্তের মত অনুভব হতে থাকে। তখন যতটা না চাই ঘুমিয়ে পড়তে তার চেয়ে বেশী চাই অজ্ঞান হতে কারন অজ্ঞান তো ঘুমের চেয়েও অনেক বেশী গভীর, নিবিড় ও গাঢ়। ঘুমকে যদি ভাবি নদী তাহলে অজ্ঞান তো সমুদ্র। তবে অজ্ঞান হই না। বিছানা থেকে চেয়ার, চেয়ার থেকে বিছানা- এভাবে কেটে যেতে থাকে সময়।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত