অনীকের প্রেমিকা

অনীকের প্রেমিকা

তো অনেক ভেবেচিন্তে বুকের ধুকপুকানি বাড়িয়ে অনীক মিতালিকে প্রোপোজটা করেই ফেলল। সামনাসামনি বলার সাহস হয়নি যদিও! হোয়াটসঅ্যাপেই অনেক ভেবেচিন্তে ৬৮বার ব্যাকস্পেস ব্যবহার করে, এদিকওদিক থেকে ঝাড়া গুচ্ছের গভীর সব “লাভ কোটস্” দিয়ে একটা জগাখিচুড়ি গরুর রচনার মতন লেখা পাঠিয়ে দিল।

তারপর অন্তহীন অপেক্ষা। বছর যেন ঘুরে যায়, তবু মেসেজ সিন হয়না! চাতকপাখি, তীর্থের কাক সব একে একে এসে ফিরে যায়, তবু বসন্তের বিদায়বেলাতেও অনীকের কপালে বাসন্তী জোটেনা! ওদিকে অনীকের মনে হয় সে বুড়ো হতে হতে মৃত্যুর কোলে এসে… প্লিং…

ঘোর কাটল অনীকের। অন্তহীন অপেক্ষার অবসান ঘটল! ঠিক সতেরো মিনিট পর রিপ্লাই করেছে অনীকের স্বপ্নের ‘মিতু’!

যদিও এরকম স্বপ্ন সে অনেককে নিয়েই দেখেছে আগে, কিন্তু কিছুতেই যেন কাউকে ঠিক পটিয়ে আনতে পারেনি। হয় তার প্রেমিক আছে, নাহয় একটা দজ্জাল বাবা কিংবা গুন্ডা দাদা আছে, আর নাহলে মেয়েটা তাকে স্রেফ পাত্তাই দেয়নি! দুঃখে বেদনায় জর্জরিত অনীকের প্রেমিক মন কিছুতেই শান্তি পায়না! পাতার পর পাতা ভরতে থাকে আগামী প্রেমিকার প্রশংসা আর গুণাবলিতে। শুধু প্রেমিকাটিই আসেনা! ফেসবুকে রোজ কালবৈশাখী ওঠে, লাইক, কমেন্টের ঝড় আসে, কিন্তু কোনও বৈশাখী আসেনা!

চারিদিক যখন ধুধু মরুভূমি, সকল আশা ছেড়ে অনীক সন্ন্যাস গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেবে ঠিক করেই নিয়েছে, ঠিক তখনই হঠাৎ মিতুর সাথে আলাপ একটা জন্মদিনের পার্টিতে।

আলাপেই মিতুর প্রেমে পড়ে যায় অনীক। তার নয়নের দৃষ্টি, তার বাচনভঙ্গি, তার ইতালীয় মূর্তির মতন ছাঁচে ফেলা মুখখানি দেখে সেদিন থেকেই অন্তরে প্রেমের পিয়ানো বাজতে থাকে। ধীরে ধীরে ফেসবুকে স্টক, টুকটাক চ্যাট আর বিভিন্ন জায়গায় কাকতালীয়ভাবে (!) দেখা হয়ে যাওয়াতে হৃদয়ে আবেগের ভান্ডার আরও উপচে পড়তে থাকে।
কিছুদিনের মধ্যেই সে ঠিক করে ফেলে, মিতুকে সে এবার প্রোপোজ করেই ফেলবে! কিন্তু বারেবারে রিজেক্ট হওয়া আর সবার সামনে খিল্লির পাত্র হতে হতে সে তিতিবিরক্ত! কি করবে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না। অবশেষে সে একটা ফন্দি বের করল। যদিও আইডিয়াটা তার নিজস্ব নয়, বরং এটাও ফেসবুক থেকেই ঝাঁপা!

সকালের প্রোপোজালের উত্তরে মিতালি একটা লম্বা, ১৭৩ শব্দের মেসেজ করে তাকে হ্যাঁ বলেছে। অনীক প্রথমে মেসেজটা পেয়ে বিশ্বাসই করতে পারছিল না। খুশির ঠেলায় ফোনটা দু’বার হাত থেকে ফেলেও দিয়েছিল! কপাল ভালো কিছু ক্ষতি হয়নি।

আপাতত তারা ময়দানের সবুজ ঘাসে। একটু আগেই দুপুরে পার্ক স্ট্রিটের এক নামী রেস্তারাঁয় বসে দুজনে বিরিয়ানি সাঁটিয়েছে। তার আগে পি.ভি.আর-য়ে সিনেমাও দেখেছে, কোল্ড ড্রিঙ্কস আর পপকর্ন সহকারে।
অনীক জীবনে প্রথমবার প্রেমিকা পেয়ে কি করবে কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। আটভাট বকে মিতুকে হাসানোর চেষ্টা করতে গিয়ে জঘন্য সব জোকসের ঠেলায় বেচারির প্রেসার বাড়াচ্ছে! তার উপর গরমটাও নেহাত কম নয়।

“ডার্লিং ভিক্টোরিয়া যাবেনা?” গদগদ হয়ে জিজ্ঞেস করল সে।
মিতু সারাদিন ধরে যা করছে, কথায় কথায় বত্রিশটা দাঁত বের করে একটা কষ্টকর হাসি হাসা, সেটাই করে ঘাড় নাড়ল, দু’দিকে। তারপর বলল,”নানানা ভিক্টোরিয়া অনেকবার গিয়েছি। এখানেই বসিনা ”
অনীক আশাহত হল। কতো কিছু ভেবে রেখেছিল সে! সব আশায় হামানদিস্তা!

ওইভাবেই আরও কিছুক্ষণ ময়দানের হাওয়া খেয়ে দুজনে উঠে দাঁড়ালো। মিতু আইসক্রিমের আবদার করে অনীকের আরও কিছু রেস্ত খসালো। তারপর দুজনে নিজেদের বাড়ির পথ ধরল।

অনীক আগামীদিনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে বিয়ের মণ্ডপসজ্জা থেকে শুরু করে বাচ্চার নাম অবধি ঠিক করে ফেলল। এটাও ঠিক করে ফেলল যে বাড়ি ফিরেই ফেসবুকে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দেবে। সত্যি বলতে, এতক্ষণ দেয়নি কেন সেটা ভেবেই অবাক হয়ে গেল সে! আনন্দের চোটে ভুলেই গেছে আর কি!

বাড়ি ফিরেই ঝটপট ফোনটা হাতে নিল। ফেসবুক খুলে স্ট্যাটাস দিতে যেতেই হাত কেঁপে উঠল তার। কি হল?! মিতুর প্রোফাইল শো করছে না কেন?

ঝটপট হোয়াটস্অ্যাপ, ইন্সটাগ্রাম, টুইটার সব খুলে চেক করে সে বুঝল যে সে সব জায়গা থেকে ব্লকড হয়েছে! এমনকি তার নাম্বারটাও ব্লক করে দিয়েছে তার আদরের মিতু!

মাথায় হাজারটা ভিমরুল হুল ফোটাতে লাগল। লাখখানেক কাঠপিঁপড়ে কামড়ে অস্থির করে তুলল। মনে হল যেন কেউ তার সাধের বেগুন সাইজের মাথাটাকে গরম লাভায় পুড়তে দিয়ে দিয়েছে! পরে পেঁয়াজ লঙ্কা সহকারে খাবে! রাগে, দুঃখে, কান্নায় বিধ্বস্ত হয়ে সে অন্য একটা নম্বর থেকে ফোন করল মিতুকে।

কিছুক্ষণ পর ফোন ধরতেই অনীকের গোলাবর্ষণ,”কি ব্যাপার কি হ্যাঁ? সব জায়গায় ব্লক করে রেখেছ কেন?? ফোন করেও পাচ্ছি না! সারাদিন দুজনে মিলে ঘুরলাম, খাওয়ালাম, সিনেমা দেখালাম ”

“চোওওওপ!” অনীকের কথা শেষ হল না। মিতালি পাল্টা গোলাবর্ষণ শুরু করেছে,”বেশ করেছি ব্লক করেছি। তুমি ভাবলে কি করে আমি তোমার প্রোপোজাল অ্যাক্সেপ্ট করব?!”
থতমত খেয়ে অনীক ঢোক গিলে বলল,”তাহলে হ্যাঁ বললে কেন??”

“কেন? এপ্রিল ফুল বানালাম! তুমিও তো সেই মতলবেই আজকের দিনেই প্রোপোজ করেছিলে, তাই না? যে যদি রিজেক্টেড হও, বলবে এপ্রিল ফুল বানালাম!”

হতভম্ব হয়ে গেল অনীক। কি বলবে বুঝে উঠতে পারল না। শুধু কোনওরকম কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,”এ-এটা তুমি ঠিক করলে না!”

“চুপ কর বেয়াদপ ছেলে! লজ্জা করেনা একই প্রেমপত্তর একাধিকজনকে পাঠাতে?”
চমকে উঠল অনীক। মানে? এটা মিতু কি করে জানল??
মিতালি ওদিকে বলে চলেছে,”তুই কি ভাবলি হারামজাদা? কেউ কিছু জানতে পারবে না? ওরে বৈশাখী আমার জেঠতুতো দিদি হয় রে! বিশ্বাস কর, কিছুদিন আগে অবধিও আমার তোকে খুব ভালো লাগত। আমি তো ভাবছিলাম আরেকটু ভালো করে চিনে নিয়ে আমিই প্রোপোজ করবো। ভাগ্যিস! সেদিন দিদির ফোনে ওই একই মিষ্টি মিষ্টি ফ্লার্টিং মেসেজ, কবিতা দেখে বুঝলাম তুই একটা আস্ত লম্পট! পরে তো জেনেছি ওই কবিতাগুলোও ঝাড়া! ছিঃছিঃছিঃ! তারপর আজ দেখলাম একই প্রেমপত্র দুজনকেই পাঠিয়েছিস! আমি হ্যাঁ বলে দিদিকে বলেও হ্যাঁ বলিয়েছিলাম, দেখবার জন্য তুই কি করিস। দেখলাম যা ভেবেছি তাই! “এপ্রিল ফুল বানালাম” বলে সরে পড়লি! নির্লজ্জ শুয়োর একটা! ফোন রাখ। আরেকবার ফোন করলে উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটাবো!” বলেই ফোন কেটে দিলো মিতালি।

অনীক থম মেরে বসে রইল। সে স্বপ্নেও ভাবেনি এই দুজন একে অপরকে চেনে!
হ্যাঁ, বৈশাখী নামের একটা মেয়েকেও তার খুব মনে ধরেছিল। মেয়েটা ফেসবুকে নেই, হোয়াটসঅ্যাপেই তাই কথা হত। আলাপ হয়েছিল এবারের বইমেলায়।

মিতালি আর বৈশাখীকে একসাথে সমানতালে লাইন মেরে যেত সে। সেদিন মিতালিকে মেসেজটা করে ওই একই মেসেজ বৈশাখীকেও পাঠিয়েছিল! প্ল্যানটা এটাই ছিল যে মিতু হ্যাঁ বললে ভালো, নাহলে বৈশাখী হ্যাঁ বললেও চলে যাবে! আর দুজনেই হ্যাঁ বললে বৈশাখীকে কাটিয়ে দেবে!

কিন্তু বিধি বাম! খাটের উপর পচা লাউয়ের মতন মুখ করে বসে রইল অনীক। কিছুক্ষণ নিজেকে ধরে রাখবার আপ্রাণ চেষ্টা করল, শেষে আর সামলাতে না পেরে জোরে গলা ছেড়ে কেঁদেই ফেলল!

তার ঘরে একটা টিয়া ছিল, যে শুধু একটা কথাই শিখেছিল। অনীকের আচমকা কান্নায় চমকে উঠে বাটি থেকে ছোলা ফেলে দিয়ে সেটাই আওড়াতে লাগল,”বেশি চালাক নাআআ বেশি চালাক নাআআ বেশি চালাক নাআআ ”

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত