মা

মা

– মা আমার মাথা ব্যথা হচ্ছে।
– ফোন কোথায়?
– বিছানায়।
– আরো কিছুক্ষণ ফোন চাপো, আশা করি ভালো হয়ে যাবে।

মায়ের এমন উত্তরে বিরক্ত হয়ে রুমে চলে আসলাম, মোবাইল চাপলেই কী মাথা ব্যথা হয়? পৃথীবিতে কত মানুষ মোবাইল চাপে, সবারই কী মাথা ব্যথা হয়? মায়ের কাছে অসুস্থতার একমাত্র কারণ মোবাইল! কপালে মুভ মলম লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলাম, ম্যাসেনঞ্জারের টুংটুং শব্দে আমার বেশ বিরক্ত লাগছে। ফোন সাইল্যান্ট মুডে রেখে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি কে জানে! ঘুম ভাঙ্গতেই দেখি সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে যাচ্ছে, হামি তুলে চোখ খুলতেই দেখি মা পড়ার টেবিল গুছাচ্ছে, আমি হেসে দিয়ে বললাম-

– কয়টা বাজে গো মা?
– আট’টা
– আট’টা!! আমায় ডাকোনি কেন? কাল ক্লাস পরিক্ষা আছে, পড়তে হবে তো!
– সারারাত জেগে অনলাইনে ঘুরাঘুরি করলে এমনি হবে, রাতের ঘুম এমন অবেলায় পূরণ করতে করতেই তোমার পরিক্ষা রসাতলে যাবে। মায়ের কথা শুনে দুই ভ্রুতে বিরক্ত জমেছে। হালকা ছিনছিনে ব্যথা মাথা থেকে এখনো যায়নি। ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে সোজা পড়ার টেবিলে বলে বই নাড়াচ্ছিলাম, মা হাতে করে এক ক্লাস দুধ এনে টেবিলে রেখে আমায় বললো-

– খেয়ে নাও।
– একটু পরে খাচ্ছি,রেখে যাও।
– যদি বলতাম একটু পরে ফেসবুক চালাও তবে কী বলতে?
– আমি তো এখন ফেসবুকে নেই মা!
– গাইটের ভেতর থেকে মোবাইলটা বের করে আমাকে দেখানোর সাহস আছে?
– ইয়ে! মানে! মা…
– আমাকে নয় বরং নিজেকে ঠকাচ্ছো,সময় আছে শুধরে যাও।

মায়ের কথা শুনে জবাব দেওয়ার মতো কোন ভাষা খুঁজে পেলাম না, আমি জোরে শব্দ করে পড়তে শুরু করলাম, পড়া থেমে গেলে যেনো মা জানতে পারে তাই। রাত দশ’টায় খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লাম,মোবাইল টেবিলের ওপর চার্জে। মা আমার পাশে এসে বসে বললো-

– মাথা ব্যথা কমেছে?
– হ্যা মা কিছুটা কমেছে, এখনো হালকা ব্যথা আছে।
– ঔষধ এনে দিচ্ছি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।
– ঠিক আছে মা।

মা আমায় ঔষধ খাইয়ে নিজের রুমে চলে গেলো। আমি ঔষধ খেয়ে শুয়ে পড়লাম। মধ্য রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায়, অসস্তিকর যেনো আমায় ছেয়ে ধরেছে! আসলে ঠিক কী করতে মন চাচ্ছে আমি নিজেও জানি না! মোবাইলের দিকে হেঁটে গেলাম। রাত তখন ২ টার কাছাকাছি। ফেসবুকে ডুকে স্ট্যাটাস দিলাম “আজ কাল কেন এত খারাপ লাগছে জানি না! হয়তো কিছুর পরিবর্তণ আসতে চলছে তাই ভেতরটা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে”। স্ট্যাটাস দিয়ে ঘন্টাখানিক ফেসবুকে ঘুরঘুর করলাম। তাও যেন অসস্তি যাচ্ছে না! মোবাইল রেখে “শাপ মোচন” বইটা পড়া শুরু করলাম। এই বইতে অদ্ভুত কিছু আছে যা বারবার আমাকে আকৃষ্ট করে, কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পর ফের বিরক্ততা ছেয়ে গেলো! বই রেখে মোবাইলটা হাতে নিয়ে গ্যালারীতে ছবি গুলো দেখছিলাম, রুমে আলো জ্বলছে দেখে মা ভেতরে এসেছে, এসে দেখে আমি মোবাইল চাপছি! মা কিছুটা বিরক্ত হয়ে আমায় বললো-

– সেই তখন থেকে এখন পর্যন্ত মোবাইল চাপছো? হুম দেখো মাথা ব্যথা সকাল হলেই চলে যাবে।
– ভুল বুঝো না মা! ফোনটা মাত্রই হাতে নিলাম।
– হ্যা আমরা মায়েরাই সব সময় ভুল বুঝি! তোমরা যেটা বলো সেটায় ঠিক!মা কথাটা বলে দরজা বন্ধ করে আমার পাশে শুয়ে পড়লো, আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম-
– এখানে ঘুমাবে?
– হ্যা
– বেশ তো! আজ লক্ষী মায়ের গায়ে পা তুলে আরাম করে ঘুমাবো।

মা মুচকি হাসলো, আমি মায়ের পেটের ওপর দিয়ে হাত বুলিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকাল হলো,পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেলো,চোখ খুলে দেখি সকাল সাত’টা। গায়ের ওপর থেকে কাঁথা সরাতেই মা বললো “আজ শুক্রবার,আর কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নাও” আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে হেসে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। আমি যখন ক্লাস সেভেনে ছিলাম তখন বাবা ব্রেনস্টোক করে মারা গিয়েছেন, তারপর থেকে মা আমায় নিয়ে একা থাকে,মা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করে, মায়ের স্বপ্ন পড়াশুনা শেষ করে একদিন আমি নাম করা ডাক্তার হবো, বাবা-মা এর একমাত্র সন্তান আমি, বাবা মারা যাওয়ার পর মা কখনো দ্বীতিয় বিয়ের কথা চিন্তাও করেনি, সব সময় আদর-সোহাগ দিয়ে আমায় বড় করেছে,মায়ের পূরিপূর্ণ ভালোবাসায় ভুলতে পেরেছি বাবাকে হারানোর বেঁদনা। কেটে যায় কয়েকদিন। মাথা ব্যথা ক্রোমশ বেড়ে যাচ্ছে, মাকে বলার সাহস পাচ্ছি না কারণ মা শুনলেই বলবে ‘সব কিছু হয়েছে এই মোবাইলের জন্য’।

এই অপবাদ আমার কাছে বিরক্তকর তাই এই ব্যাপারটা মায়ের কাছে লুকিয়ে যাই। আমার বান্ধবীর জন্মদিন, আমাকে এবং মাকে দাওয়াত করেছে, পড়ন্ত বৈকালে রিক্সায় ছড়ে আমি আর মা বেরিয়েছি, মায়ের কাছে আবদার করেছিলাম মোড়ে দাড়িয়ে ফুসকা খাওয়ার, মা আবদার পূরণ করতে রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া দিতে গেলেই মাথা ঘুরে আমি পড়ে যাই! জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে হসপিটালের বেডে আবিষ্কার করলাম, সুন্দর গতরে মা লালচে হয়ে আছে, আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম-

– মা তুমি কাঁদছো কেন? মা কোনো উত্তর দিলো না, ডক্টর রুমে প্রবেশ করলে মা উঠে দাড়ায়, মা ডক্টর কে জিজ্ঞেস করে-

– ব্রেন টিউমারে কোন ভয় নেই তো? পাগলীটা আমার একমাত্র সন্তান,আমার ঘরের একমাত্র প্রদীপ!

– আপনি আমার চেম্বারে আসুন। মা ডক্টরের পেছন পেছন চলে গেলো। আমি নিভৃত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। খানিকক্ষণ বাদে মা আমার পাশে এসে বসলো, আমি মৃদু হেসে বললাম-

– আমার ব্রেন টিউমার রাত জেগে মোবাইল চাপার জন্য হয়েছে মা। মা মুখ চেপে কেঁদে দিলো,আমার দু’টো হাত শক্ত করে ধরে মা বললো-

– পৃথীবির কোন মোবাইল পারবে না মায়ের

বুক থেকে সন্তানকে কেড়ে নিতে। মায়ের কথা শুনে আমি হেসে দিলাম। মা আমার হাত ধরে অঝরে কেঁদে যাচ্ছে..

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত