জীবন মরনের সীমানা ছাড়িয়ে

জীবন মরনের সীমানা ছাড়িয়ে

“দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না,রইল না সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি…”

নাহ্ নানারঙের দিনগুলি আজ কেবলই অতীত,মনের মধ্যে জমেছে একরাশ বিষন্নতা।কিছুকাল আগের অলীক ঘটনাময়তা আজও আমায় টানে,চোখ বন্ধ করলেই যেন এক লহমায় সব চরিত্র জীবন্ত হয়ে ওঠে।

মুসৌরির সেই মেঘে ঢাকা পাহাড়,সবুজ বনানী,দুরন্ত পাহাড়ি ঝর্ণা আর…আর মনে পরে তোমায় উজান।হ্যাঁ,উজান,আমার মনের সবটুকু জুড়ে থাকা একটা ক্ষণিকের ভালোলাগার অধ্যায়।

এক টুকরো খোলা আকাশ ছিলে তুমি আমার কাছে উজান।

আমার বড়ো হয়ে ওঠা উওর কলকাতায়।মা,বাপি,আমি সুখী পরিবার, বাপি নাম রেখেছিল অনুরাধা।

পড়াশোনা শেষ করে ভি.এইচ গ্রুপ এ ম্যানেজারের পোস্টে চাকরিটা পেলাম,কিন্তু সমস্যা একটাই আমার পোস্টিং হলো সুদূর মুসৌরি তে।

অগত্যা যেতেই হবে,কলকাতা থেকে দুপুর 2টোর ফ্লাইটে দেরাদুন এসে নামলাম তখন ,শেষ বিকেলে র পড়ন্ত আলোয় ধরিত্রী ইষৎ রাঙা হয়ে উঠেছে। গাড়িতে মুসৌরি পৌছে ,ম্যাল রোড এ মুসৌরি গেটওয়ে ইন নামের একটি লজ্ এ চেক ইন করলাম।

দুদিনের মধ্যে অফিস জয়েন করলাম,কলিগরাও বেশ ভালো খুব সহজেই আমার সাথে মিশে গেছে।

সেদিন ছুটিতে আমি আর সুমি মুসৌরির ভিউ পয়েন্ট এ গেছিলাম,সুমি আমার কলিগ কম বন্ধু বেশি।

অসাধারণ সুন্দর নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করলাম,দূরে যতদূর চোখ যায় শুধুই দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়,মাথার ওপর স্নিগ্ধ নীল আকাশ। অসাধারণ,অনবদ্য সেই দৃশ্য।

আমি শুধুই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখছি,হঠাৎ পাশে এসে সুমি বলল ,”কিরে সেই কখন থেকে ডাকছি সাড়া না দিয়ে চুপ হয়ে আছিস কেন?”

“হ্যাঁ বল,সরি রে আসলে এতটাই সুন্দর জায়গাটা তাই,”

“আরে ওদিকে তোকে একজন ভদ্রলোক ডেকে দিতে বললেন।”

“আমায়?কে?”

“তা জানি না ওই দেখ দাড়িয়ে আছেন “।

একজন আমার সমবয়সী ভদ্রলোক দেখলাম দাড়িয়ে আছেন,কেমন চেনা চেনা লাগছে,কোথাও কি দেখেছি?…..

“অনুরাধা?”

“হ্যাঁ,বলুন ।”

“আমায় চেনা যাচ্ছে? আমি উজান,উজান ব্যানার্জি।কলেজে পড়ার সময় আলাপ হয়েছিল?”

“হ্যাঁ তাই তো ,সেই জন্য চেনা লাগছিল,তুমি এখানে?”

“এই অফিসের কাজে আবার বেড়াতে ও বলতে পারো,তুমি?”

“আমি এই অফিসের পোস্টিং এ মুসৌরিতে এসেছি,ভালো ই হলো তোমার সাথে দেখা হয়ে ,কলেজে ওই একটা বছর ই তোমাকে পেয়েছিলাম তার পর তুমি অন্য লাইন এ গেলে সেভাবে যোগাযোগ ছিল না।কাল তাহলে এসো দুজনে গল্প করবো না হয়?ঠিকানা তোমায় জানিয়ে দিলাম।”

“হ্যাঁ নিশ্চই আসব অনু “।

দুদিন পর তুমি এসেছিলে উজান,দক্ষিণা হাওয়ার মতো আমার মনেও এক টুকরো সবুজ বসন্তের সঞ্চার করেছিলে।

তখন আমি গানের দু কলি গুনগুন করছি,”ও যে মানে না মানা,আঁখি ফিরাইলে বলে না,না না……..”

“বাহ্ অনু গান টা কিন্তু বেশ ভালোই করো ঠিক আগের মতো।”

তুমি বরাবরই খুব সহজেই মিশে যেতে পারতে, আমাদের বন্ধুত্ব আর ভালোলাগা দুটোই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।

তুমি না খুব ভালো গিটার বাজাতে উজান,আমায় সময় পেলেই শোনাতে আর বলতে “তোমার জন্যই এ গিটার এ সুর ওঠে অনু ……”

সেই সুরের মাধুর্যে আমায় ভাসিয়ে নিয়ে যেতে বারবার,আমি কেবল মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতাম শুধুই শুনতাম।

আমি বলেছিলাম “উজান তুমি খুব ভালো জানো।”

“তাই বুঝি অনু?”

“একদমই তাই ..।”

পরের সপ্তাহে আমাদের অফিসে কর্পোরেট শাখায় একটা ছোট্ট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে আমায় আর উজান কে একসাথে গান গাইতে হবে,সেইমতো আমি গিয়ে তোমাকে ইনভাইট করে এলাম।তুমি খুব এক্সাইটেড ছিলে এটা নিয়ে।

“অনু,তুমি আমার সব থেকে কাছের বন্ধু।”

“শুধুই কী তাই উজান? আর কিছু নয়?”

“আর?আর হলে আমার মন জুড়ে থাকা একরাশ ভাললাগায় ভরা আবেশ অনুরাধা ”

কিন্তু তুমি যে আমার কাছে এক আকাশ ভালোবাসা উজান।

অনুষ্ঠানের দিন আমিই একটু আগে পৌছেছিলাম। তুমি বলেছিলে ঠিক ছয় টার সময় আসবে কিন্তু এখন তো সাত টা বেজে দশ,কোথায় তুমি উজান?

সেই কখন থেকে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি ,কিন্তু তোমাকে ফোনে পাচ্ছিই না।সময় বয়ে চলে আর তার সাথে সাথে আমার মনে দানা বাঁধতে থাকে ভয়।

নাহ্ এবার আমি নিজেই বেরোলাম তোমাকে খুঁজতে,রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছি গাড়ির জন্য কিন্তু এই পাহাড়ি রাস্তায় হঠাৎ করে গাড়ি পাওয়া যাবে না। হাঁটতে শুরু করলাম,রাস্তার ধার দিয়ে হাঁটছি তাও প্রায় অনেকক্ষণ হলো ,রাস্তা যেন ফুরোয় না যে আর।

পুরো শরীর টা যেন ধীরে ধীরে অবশ হয়ে আসছে …

হঠাৎ ওপার থেকে আসা এক তীব্র আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল,মিনিট দুয়েক পর দেখলাম একটা গাড়ি বেপরোয়া গতিতে এগিয়ে আসছে।

সরে দাঁড়ানোর শক্তি টুকুও যেন হারিয়েছি,আচমকা কেউ যেন আমার হাত ধরে টান দেয়,,,,,,ভ্যাগিস্, নাহলে হয়তো আমি….কিন্তু কে ?কেউ তো নেই কোথাও?

আমি চিৎকার করে ডাকলাম উজান তুমি এসেছ? না কোনো সাড়া পেলাম না… শুধু দূরে কোথাও থেকে আবছা হয়ে যাওয়া গিটারের সুর ভেসে আসছে,ঠিক যেমন টা উজান বাজাত।

চোখ মেলে দেখলাম আমি রুমে শুয়ে আছি আর সুমি আমার মাথার পাশে বসে আছে চুপ করে।

আমায় নাকি কাল রাস্তার পাশে খাদের ধারে খুঁজে পেয়েছে সুমিরা।

“উজান কোথায় রে?”আমি তো কাল ওকে ই খুঁজতে গিয়ে… কোথায় আমার উজান?”

সবাই মাথা নিচু করে বসে আছে, কিন্তু কেন?উজান কোথায় কেন বলছে না আমায়?

নীরবতা ভেঙে সুমি ই আমায় বলেছিল কাল ম্যাল রোড এ একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয় আর তাতেই,ও আর নেই অনু এই সত্যিটা মেনে নে।

“না না এসব কি বলছিস সুমি?তুই ভুল বলছিস তোরা সব্বাই ভুল বলছিস।

কাল রাতে তো উজান ই আমায় বাঁচায়,হ্যাঁ আমার উজান ই এসেছিল কাল ”

সেদিন অ্যাক্সিডেন্ট টা সত্যিই হয়েছিল আর আমার উজান…

এখন আমি কলকাতায় বাপি মায়ের সাথে থাকি।সেই ঘটনার পর দুবছর কেটে গেছে…

ভোরের ক্ষীণ আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে,অন্ধকার গহীন রাতের শেষ এখানেই।

মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল এবার একটু চোখ বন্ধ করে শুয়ে পর অনুরাধা।

পাশে থাকা রেডিওতে তখন বেজে চলেছে,

“জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে,

বন্ধু হে আমার,রয়েছো দাঁড়ায়ে।

এ মোর হৃদয়ের বিজন আকাশে

তোমার মহাসন আলোতে ঢাকা সে,

গভীর কি আশায় নিবিড় পুলকে

তাহার পানে চাই দুবাহু বাড়ায়ে।”

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত