অপেক্ষা

অপেক্ষা

যে সময়ের কথা বলছি সে সময়ে ইলেভেন- টুয়েলভে কলেজে পড়া যেত।অনেকেই মুখিয়ে থাকত কতদিনে কলেজে ভর্তি হয়ে একটু স্বাধীনতা উপভোগ করবে।ডানা মেলে উড়বে প্রজাপতির মত।আবার অনেকের মা-বাবারা চাইতেন যতদিন ছেলে-মেয়েকে স্কুলে আটকে রাখা যায় ততদিনই মঙ্গল কেননা কলেজে গেলেই তো পাখনা গজাবে তখন আর ছেলেমেয়েদের সামলানো দায় হয়ে উঠবে।এই বয়েসটা বড় দুর্বার।এই বয়েসেই তো দুঃসাহসেরা উঁকি মারে আর বাবা মায়েরা সেজন্যই আরও সতর্ক হয়ে যান।কিন্তু আঠেরো বছরের দুর্দমনীয় গতিকে আটকাবার সাধ্য কার!তার মধ্যে মধ্যবিত্ত বাবা মা দের মধ্যে কো -এড কলেজের প্রতিও একটা তীব্র অনীহা থাকত।তাই আমরা যারা সদ্য স্কুল থেকে কলেজে পা রেখেছিলাম তারা যেন হাতে চাঁদ পেয়েছিলাম।যারা বাড়ীর শাসনে স্কুলেই থেকে গেছিল আরও দুবছর তাদের বন্দীদশা দেখে বড় অনুকম্পা জেগেছিল।আহা! একটু মনের মত দিন কাটাতে পারবে না বেচারারা।

যাইহোক সব শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে আমরা বেশ কয়েকজন বন্ধু ভর্তি হয়ে গেলাম বিখ্যাত স্কটিশ চার্চ কলেজের কলা বিভাগে।সকলের মনটা বেশ খুশি-খুশি আর কলেজের পরিবেশটাও সকলের খুব পছন্দ হয়েছে।বিরাট-বিরাট ক্লাস রুম, চওড়া বারান্দা,সিঁড়ি,বিরাট লন,বাগান,

ক্যান্টিনে আড্ডা,চিপুদার বইয়ের দোকান সব মিলিয়ে চাঁদের হাট যাকে বলে। পিয়ালী, রঞ্জনা,গীতশ্রী,তপতী আর চন্দ্রিমা এই পাঁচ বন্ধু আর আমি।বেশ হৈ-হৈ করে দিন কাটছিল।খাওয়া আড্ডা দেওয়া কলেজ থেকে সিনেমা যাওয়া বেশ রোমাঞ্চকর লাগছিল।যখন-তখন কলেজ থেকে বেরিয়ে যাওয়া যায়।যখন ইচ্ছে আসাও যায় এ যেন এক সবুজ- তরুণ বিপ্লব।

রক্ষণশীল পরিবারের গন্ডী ছাড়িয়ে এই যে মুক্তির অনাবিল আনন্দ সে কাউকে বলে বোঝাবার নয়।চন্দ্রিমা খুব তাড়াতাড়ি প্রেমে পড়ল।দ্বিতীয় বর্ষের সাগ্নিকের সাথে গভীর প্রণয়লীলা চলল।পড়াশোনা মাথায় উঠল।প্রথম একটা বন্ধু প্রেমে পড়েছে সেই আবেগ উচ্ছ্বাস আর নতুন-নতুন প্রেমের অভিজ্ঞতা শুনতে-শুনতে যেন আমরা স্বর্গসুখ লাভ করতে লাগলাম ।মনে হল যার জীবনে প্রেম নেই তার জীবনটা জীবনই নয়।পিয়ালীর বিয়ে অনেক ছোটবেলা থেকে ঠিক করা।তাই সে হিসেবে ও অঞ্জনের বাগদত্তা তাই ও বেচারী আর কারো দিকে তাকাতে পারে না।অঞ্জন বিদেশে পড়াশোনা করে সেখান থেকে ফিরলে পিয়ালী মোটামুটি গ্র্যাজুয়েট হলেই ওর বিয়ে হয়ে যাবে।সে যাইহোক পলাশ রাঙা জীবন জুড়ে তখন আমাদের প্রেমের উৎসব।

একাদশ শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণীতে উঠছি তখন সবে।একদিন তৃতীয় বর্ষের তনয়াদি এসে আমাকে বলল-

”তোকে একটা জিনিস দেওয়ার আছে।”

আমি বললাম-

”কি গো তনয়াদি?”

তনয়াদি বলল-

”আমাদের ক্লাসের অরণ্য তোর জন্য একটা কাগজে কি লিখে পাঠিয়েছে।”

অরণ্য বসু কেমিষ্ট্রির ছাত্র।আমরা সবাই জানতাম।পড়াশোনাতেও দারুণ।এছাড়া গান গায় ভাল, লেখে, কলেজের সব ব্যাপারে সকলেই ওকে খুব গুরুত্ব দেয়।আর ভীষণ হেল্পফুল। সেইতো সেবার চিপুদার দোকানে বইয়ের টাকা কম পড়েছিল আমার,অরণ্যদা নিজে থেকে বাকী টাকা দিয়ে দিয়েছিল।পরের দিন কিছুতেই আর সে টাকা ফেরৎ নেয়নি।ব্যস্ এইটুকুই।তারপর মাঝে- সাঝে অ্যাসেম্বলীতে দেখা হলে বা ক্যান্টিনে দেখা হলে বলে-ভাল আছিস তো?পড়াশোনা হচ্ছে?কিছু অসুবিধে হলে বলিস।এইটুকুই কথা অথচ কি বিনয়,মিষ্টি ব্যবহার।আর দেখতেও তেমন সুপুরুষ।সে যাইহোক।আলাদা করে আমি কখনও অরণ্যকে নিয়ে ভাবিনি।সেই অরণ্য কি লিখে পাঠাল?প্রায় দিনই তো দেখা হচ্ছে কলেজে টুকটাক কথাও হচ্ছে।কিছু দেওয়ার হলে নিজেই তো দিতে পারতো।এইসব সাতপাঁচ ভাবছি যখন তখন তনয়াদি,

”ক্লাস আছে রে।এই নে ধর।”

বলে তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল।আমিও হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম হাতে ধরা চিরকূটটা নিয়ে।সেদিন ঐসময় আমি বাইরের সিঁড়িটায় একাই বসে ছিলাম।চন্দু মানে চন্দ্রিমা-সাগ্নিক সিনেমা গেছে।পিয়ালী আসেনি।রঞ্জনাও আসেনি শরীর খারাপ আর গীতশ্রী আর তপতী ক্লাসে।কি করব এইসব ভেবে কাগজটা খুলে ফেললাম।একটা লাল গোলাপের ছাপ-ছাপ পাপড়ি আঁকা সাদা খাম।তাতে চন্দনের সুগন্ধ।কেমন বুকের ভেতরটা দুরু-দুরু করছিল।কি জানি এর ভেতর থেকে না জানি কি বেরোবে!মনের ভেতর কেমন একটা অদ্ভূত আশঙ্কা।খামটা খুলব না কি খুলব না।এক আমি বলছে খুলে ফেলতে আর এক আমি বলছে না থাক। ওরা আসুক।শেষপর্যন্ত খুলেই ফেললাম খামটা।খামের ভেতর একটা চিঠি।সেই চিঠির যে কি অপূর্ব ভাষা তা বলে বোঝাতে পারব না।হৃদয়ের ভেতরটা কেমন দুলে-দুলে উঠল।মনে হল নীল সাগরের চঞ্চল ঢেউ যেন ভিজিয়ে দিয়ে গেল আমার মন।চিঠিটা একবার পড়লাম- দুবার পড়লাম-বার-বার পড়লাম।পড়তে-পড়তে কোন এক স্বর্গীয় অনুভূতিতে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল দুফোঁটা।আজও চোখের সামনে উজ্জ্বল চিঠির অক্ষরগুলো। অনুভূতিটাও বয়ে চলেছে ফল্গুধারার মত।কোনো চিঠি পড়ে এমন অনুভূতি জীবনে আর কখনও হয়নি।চিঠিটা এইরকম-

প্রিয় বন্ধু
অপর্ণা,

 দুএক ফোঁটা বেদনা আজ বৃষ্টির ফোঁটার মত যেন ঝরে পড়ল মনের উঠোনে।উঠোনে ছড়ানো ছিল একরাশ কল্পনা,নানা ভাব,কত কথা,অজস্র গান, নানা রঙের কাব্য।পাশাপাশি প্রাত্যহিকের ছোট-ছোট সুখ-দুঃখের অনুভূতি।সুখ কি দুঃখ সব সময় চেনা যায় না জানিস!সেদিন সকালের সূর্যের মত ঝলমলে আলো-আলো হাসি নিয়ে বললি সুপ্রভাত।আবার একদিন কালো মেঘ-মেঘ মন নিয়ে মুখ গুমরে বসে রইলি ঘরের কোণে।সেই আলোর-আদরে সুপ্রভাত পাঠালি না।আমি কিন্তু অনেক দূর থেকেও বুঝে গেলাম গভীর ভাবনায় কিকরে যেন ব্যাঘাত ঘটেছে।প্রতিদিনের যন্ত্রজীবনে ধাক্কা খেয়ে মনটা ব্যথা পেয়েছে তোর।কিন্তু বাইরে থেকে তোকে দেখে বোঝার উপায় নেই।ঠিক যেমন প্রকৃতিতে মেঘ কালো দিনও সুন্দর; আর সূর্য ওঠা সকালও ।এইরকম সময়ে কেবল খুব কাছের মানুষের হৃদয়ে একটা তরঙ্গ ওঠে।তোর হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা দুঃখগুলো ডুব সাঁতার কেটে আমার কাছে চলে আসে।আমার উঠোনে সাজানো সব উপকরণগুলো সেই ফোঁটা-ফোঁটা বেদনায় ভিজে যায়।আচ্ছা! সকলের মনেই কি উঠোন আছে?কি জানি!মনের আবার উঠোন!হাস্যকর ভাবনা যত!

যে কথা বলছিলাম।ফোঁটা-ফোঁটা বেদনাগুলো মাঝে-মাঝে জমাট বাঁধে।ঝড়ের মত পৃথিবীর বুকে উথলে উঠতে চায়।আবার তেমন বিন্দু-বিন্দু বৃষ্টির জলও ঠান্ডায় জমাট বেঁধে বড়-বড় আকার ধরে ,মেঘের রাজ্য ছেড়ে ধরার বুকে আছড়ে পড়ে,তখন কিছুতেই আর তাকে সামলানো যায় না। তেমনি তুই। কেমন ঝোড়ো হাওয়ার মত অশান্ত অস্থির হয়ে পড়িস।কোনো নিয়ম বাধা মানতে চাস না।তোর প্রাণের মাঝে কেমন এক ছন্নছাড়া বাউল মন জেগে ওঠে।ভাবনার সাথে ভাব কিছুতেই মেলে না।আসলে সব সময় কারণের সাথে জীবনকে মেলাতে ভালবাসিস না তুই।অকারণ অনিয়মে সময় পার করতে মন চায় তোর মাঝে-মাঝে।মনে হয় একটাই তো জীবন এত নিয়ম-নিষেধের বেড়াজাল কেন?ভাবনাগুলো ডানা মেলতে গেলেই খাঁচার তারে আটকে যায়।তখনই খাঁচা আছড়ে ভেঙে দিতে চাস।তা না পেরে কষ্টগুলোকে লুকিয়ে হাসার চেষ্টা করিস।বুঝতে পারি রে আমি!তবে এতেও তো সুখ আছে! না পাওয়ার বেদনায় ভিজে যাওয়ার সুখ।হিসেব না মেলার কষ্টে বিনিদ্র রাত জাগার সুখ।তবু তো আশা নিয়েই বাঁচা। যদি কখনও হিসেব মিলে যায় !যদি না পাওয়া স্বপ্নগুলো কোনোদিনও ধরা পড়ে ঘুমের ঘোরে।সেটুকু তৃপ্তি কেউ তো নিতে পারবে না তোর থেকে।আমি-তুই-আমরা সকলেই সেই না পাওয়ার স্বপ্নে,না মেলা হিসেবের ছেঁড়া পাতার কষ্ট বুকে নিয়ে দিন কাটাই।ঝড় থামাই দুহাত দিয়ে।এসবের মাঝেও চাঁদের আলো আনমনে যখন জানলা দিয়ে একবার এসে পড়ে মনের উঠোনে ঘরের দরজায় তখন তাকে ভালবেসে ফেলি।হাজার দুঃখেও তাকে অস্বীকার করতে পারি না যে।
ইতি
অচেনা আকাশপারের বন্ধু
অরণ্য।

কেমন একটা ভাব হল মনে জানিনা।সব কথার মানে বুঝতে পারিনি সেদিন ভাল করে।কিন্তু বুঝেছিলাম।মনের ঘরে কিছু একটা অনুভূতি জমা হয়েছে। হয়তো সেটাই প্রেম।অরণ্য বসুর সাথে অপর্ণা চক্রবর্ত্তীর প্রেমের সৌরভ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল বাসন্তী আবীরের মত দিকে-দিকে।অসংখ্য কবিতা চিঠি আর এক আকাশ ভালবাসায় ভাসতে-ভাসতে অরণ্য ছাড়াও যে জীবন চলে একথাটা ভাবনার মধ্যে কখনও স্থান পায়নি আমার।রক্ষণশীল বাড়ীতে জানাজানি হল অশান্তি হল।পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেল আমার।এম এ পড়া শেষ হলনা।অরণ্য তখন বিদেশে।গবেষণা করছে।আমাকে বলে গেছে আমি যেন অপেক্ষা করি।ও ফিরে এসেই বিয়েটা করবে।তাই বাড়ীর শত চাপাচাপিতেও আমি বিয়ে করিনি।ওর সমস্ত কবিতা চিঠিগুলো রাখা আছে যত্ন করে।

বাড়ীর লোকের সাথে অনেক তিক্ত সময় কাটিয়ে বর্তমানে একটা ছোটদের স্কুলে পড়াই আমি।কিন্তু অরণ্য ফিরে এলনা কেন?আমি তো আজও অপেক্ষায়।অরণ্য লিখেছিল আমাকে-

আমার জন্য মনের চিলেকোঠায় এক চিলতে রোদ্দুর তুলে রাখিস—

অপেক্ষা।

অপেক্ষারাও অপেক্ষা করে,
হিমরাতে ঝরে যাওয়া কান্নার মত,
চোরা স্রোতের মত-
অপেক্ষারা বয়ে যায়।তবু এই অপেক্ষার অন্তিম সমাপ্তি দেখার জন্য
কত সময় তো দিয়েছো অকাতরে।

কত বিনিদ্র রাত কাটিয়েছো
সৃষ্টির যন্ত্রণায়,অপেক্ষারা বুঝেছে তো?
জ্ঞানের প্রদীপ শিখা তোমার চোখ ঝলসে দিয়েছে মাঝে-মাঝে।অসহ্য হয়েছে সৃষ্টির প্রসব বেদনা।তবু তো অপেক্ষারা বেঁচে ছিল।তোমার সব কান্না তিল তিল করে জমেছে অনেক-অনেক উঁচু পাহাড়ের শিখরে।যেখানে ঘনীভূত বরফে আজ সোনা -সোনা প্রতিফলিত রঙের বিচ্ছুরণ।সেই রঙের বিচ্ছুরণে ভিজে যাওয়া তাই সার্থক।হৃদয় জুড়ে অপেক্ষার সার্থক অনুভব, আর সারা জগত জুড়ে তাই আজ স্বর্ণালী উৎসব।

অরণ্য বসু।

কিন্তু সে অপেক্ষার আজও শেষ হয়নি যে।অরণ্যের সবুজ দেহে-মনে মেখে পায়ে-পায়ে পাতা ঝরার দিন এগিয়ে এল।চিরহরিৎ রা পৌঁছে গেল পর্ণমোচীর রাজ্যে।সেখানে মেঘের আড়ালে এক আকাশ মন খারাপ করা বৃষ্টি।অরণ্য কোথায় তুমি?এ অপেক্ষার শেষ হবে কবে?কবে আমার কানে-কানে এসে বলবে অপু আমি এসেছি।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত