ভেংচি কন্যা

ভেংচি কন্যা

খুব সকালে ঘুমটা ভেঙ্গে যাওয়ায় একটু ছাদে আসলাম সূ্র্যোদ্বয় দেখার জন্য। ছাদে এসে দাড়াই চোখ পড়লো আমার ছোট ছোট ফুলের গাছ গুলোর দিকে। কিন্তু গাছে একটাও ফুল নেই। বেপার কি এইসবের, প্রতিদিন রাতে দেখি গাছে কলি আছে কিন্তু সকালে ফুল আর ফুটতে দেখি না।তাহলে ওই ফুল গুলো যায় কোথায়? এখন তো পাশের বাড়ির বজ্জাত মেয়ে সুপ্রীতিকে সন্ধেহ হচ্ছে। ওই মেয়েটা কি আমায় শান্তি দিবো না। আমি ওর কোন পাকা ধানে মই দিয়েছি যে সব সময় আমার পিছনে লাগতে হবে। ওদের আমাদের বাড়িটা পাশি দুইটা দুতলা বিল্ডিং। সুপ্রীতির সাথে আমাদের পরিবারের সম্পর্ক খুব ভালো তবে আমার সাথে ওর সম্পর্কটা সাপে নেওলে বলা যায়। যাই হোক, এই ফুল চোর কে হাতেনাতে ধরতেই হবে। দুপুরে বাড়ির সবাই ছোট বোনের কলেজের একটা অনুষ্ঠানে গেছে তাই আমি একা আস্তে আস্তে রুম পরিষ্কার করতে ছিলাম। মেঝেতে পানি দিয়ে ভিজিয়ে মুছতে ছিলাম। যদিও এইসব করার মত জ্ঞান আমার মাথায় নেই তবুও সবাইকে অবাক করার জন্য একটু চেষ্টা করতে ছিলাম। হঠাৎ কলিং বেলটা বেজে উঠলো…….

— ভিতরে আসতে পারো দরজা খুলাই আছে?

একটু পরে কোন মানুষের পরে যাওয়ার শব্দ পেলাম আর তারাতারি গিয়ে দেখি সুপ্রীতি পড়ে গেছে। হায় হায় হয়ত মেয়েটা প্রচুর ব্যাথা পেয়েছে। আমাকে দেখার সাথে সাথে কেমন করে যে তাকালো। তারপর আমি সামনে গিয়ে আমার হাতটা বাড়িয়ে দিলাম কিন্তু ও হাতটা না ধরে ঘরের কাউকে হয়ত খুজছে

— এই যে মিস লঙ্কা আপাতত যদি উঠতে হয় তাহলে আমার হাত ধরেই উঠতে হবে কারন বাসা কেউ নেই। সবাই ছোট বোনের কলেজ গেছে। ও কিছুটা ইতস্তত বোধ করেও আমার হাতটা ধরে উঠলো। আর আমি ওরে একটা চেয়ারে নিয়ে বসালাম।

— সাড়া ঘরে জল দিয়ে এমন করে এলোপাথাড়ি ভিজিয়ে রাখছেন কেন?
— কই ভিজিয়ে রাখছি? আসলে কাজের ট্রেনিং নিতাছি।
— মানে?
— মানে ভবিষ্যৎ এ বিয়ে না করার প্লেন আছে তো। আর বিয়ে না করলে তো এইসব আমায় করতে হবে আর যেহেতু আগামীতে আমি করবো তাই এখন থেকেই শিখে রাখছি।
— ওই আপনার বকবক কমাবেন? কেউ ঘরে ঢুকলে তো পরে যাবে পা পিছলে। যান তো দরজার দিকে শুকনা কাপড় দিয়ে মুছে দেন।
— ওকে

এরপর ঐশি বসে বসে আমায় কিভাবে কাজ করতে হবে বলল আর আমিও সেই মতই করলাম। আর ঘরটাকেও তারাতারি সাফ করে দিলাম। তারপর সব কাজ শেষ করে আমি ওর সামনে গেলাম…..

— কখন থেকে বসে বসে আপনায় কাজ দেখিয়ে দিলাম একটা কাপ চা তো খাওয়াতে পারেন। নাকি এতেও আপনার কিপটামী আছে।
— ওই আমি কিপটা না।
— নীল কিপটা কি কিপটা না পাবলিক এটা খুব ভাল জানে ওকে।
— হইছে আপনে বসেন, আমি আপনার জন্য চা বানিয়ে আনছি। তারপর আমি চা বানাতে চলে গেলাম। হঠাৎ ঐশি আবার চৎকার দিয়ে বলল….
— চায়ের সাথে বিস্কিট আর চানাচুরের একটু ব্যবস্থা হলে মন্দ হয় না।

এই মেয়েটা যে কি বুঝি না। আরে ভাল কথা হলো ও এখানে কেন এসেছে এটাই তো জানা হলো না।তাই তারাতারি চা বানিয়ে ওর সামনে নিয়ে গেলাম। ওর সামনে চা বাড়িয়ে দিলাম….

— এই যে আপনার চা….
— ধন্যবাদ
— আচ্ছা আপনি এখানে এসেছেন কেন? আর এতখন বসে বসে আমায় কাজ দেখিয়ে দিলেন বা কেন?
— যা বাবা আজ বুঝলাম কারো ভাল করতে নেই আর বান্দরের ভাল তো ভুলেও করতে নেই।
— ওই আমি বান্দর না।
— হুহহ জানা আছে ।
— যাই হোক, আপনার এখানে আসার কারন কি?
–আন্টির সাথে দেখা করতে আসছিলাম কিন্তু দেখা না হওয়ার কারনে যে চলে যাবো সেই অবস্থাও তো নেই। পায়ে যা একটা ব্যাথা পেলাম।
–যাক ভালই হলো কয়দিন আমার গাছের ফুল গুলো কেউ চুরি করতে পারবে না।(আস্তে আস্তে)
— কি বললেন?
— না না কিছু না তো। বললাম আছাড় পরা শরীরের জন্য ভালো।
— ও তাই তাহলে কথা মনে রাখলাম। একদিন না হয় আপনার জন্য এই ভাল কাজটা তুলে রাখলাম।
— মানে?
— মানে আপাতত আমার হাতটা ধরে কি বাড়ি দিয়ে আসতে পারবেন।
— ওকে চলেন। এরপর ওর হাতটা ধরে আমি আস্তে আস্তে হাটতে লাগলাম আর ও মনে হয় খুব ব্যাথা পাচ্ছিল। তাই আমি ওরে বললাম….
— কি হলো খুব ব্যাথা করছে?
— হুমম

তারপর যা করলাম তাতে ঐশি অবাক করে দিলাম। আমি ওকে কোলে তুলে নিলাম। কিন্তু ও কিছু বলছে না বরং আমার চোখের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। আমি আমাদের বাড়ির গেট পর্যন্ত ওরে কোলে নিয়ে আসলাম। তারপর নামিয়ে দিলাম। হয়ত এতে আমার কোন সমস্যা না হলেও ওর সমস্যা হতো। তারপর ওরে আস্তে আস্তে হাটিয়ে ওদের ঘর পর্যন্ত দিয়ে আসলাম। এরপর আমি চলে আসছি আর আমায় ডাক দিলো। আমি ওর দিকে তাকাতেই ও বলল……

— কার্টুন (ভেংচি কেটে)

আমি শুধু হাসি দিয়ে চলে আসলাম। ও আমায় সব সময় কার্টুন ডাকে। তবে মেয়েটাকে আমার যে ভাল লাগে না হয়ত তা না। ভাল লাগে ওরে খুব ভাল লাগে তবে যে পরিমান ঝগড়া করে মনে হয় রিনা খান ওর থেকে ঝগড়া শিখতে পারবে। আর আমায় দেখলে তো সব সময় কার্টুন বলে ভেংচি কাটে। রাতে যখন মা,বাবা আর ছোট বোন বাড়ি আসলো তখন তো তারা অবাক হয়ে গেল ঘরে গুছানো দেখে। আর সবাই আমার তারিফ করতে লাগলো কিন্তু আমি তো জানি অর্ধেক তারিফ ঐশির পাওনা কিন্তু যদি সব বলে বলে না দিতো তাহলে হয়ত মা বাবা ও আজ পায়ে ব্যাথা পেয়ে বসে থাকতো। প্রায় ১ সপ্তাহ কেটে গেল কিন্তু ঐশির দেখা নেই আর ফুল গুলোও প্রতিদিন ঠিক মত থাকে। হয়ত এখনো পা ঠিক হয় নি তাই আমি বাধ্য হয়ে ওর বাড়িতে ওরে দেখতে গেলাম।  ওদের বাড়িতে গিয়ে কলিং বেল চাপ দিতেই আন্টি দরজা খুলে দিলো….

— আরে নীল বাবা তুমি?
— জ্বী আন্টি ঐশি বাড়ি আছে?
— হুমম। ওর রুমেই আছে। কই থেকে জানি পায়ে ব্যাথা পেয়ে আসছে। আর এখন শুয়ে শুয়ে দিন কাটায়।
— আমি কি ওর সাথে দেখা করতে পারি…
— হুমম তুমি ওর রুমে যাও। আমি ওর রুমে সামনে যেতে দেখি ঐশি মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে আছে…
— কি বয়ফ্রেন্ডের সাথে চেট করা নিয়ে ব্যস্ত নাকি আমাকে দেখা মাত্র ও উঠে বসলো। আর কিছুটা অবাক হয়ে বলল…
— আপনি আমার ঘরে?
— ভিতরে আসার সময় তো আসতে মানা কোন লেখা দেখি নি।
— আরে আসতে মানা হবে কেন? তবে কখনো আসেন নি তো তাই বললাম।
— আপনি কয়দিন আমার বাড়িতে আসেন নি তো তাই আমিই চলে আসলাম।
— আমি আসি নি বলে কি হয়েছে? মিস করছিলেন বুঝি।
— যদি মিথ্যা বলি তাহলে হয়ত মিস করি নি।
— আর সত্যি বললে?
— এতো কিছু জানি না। আপনি তারাতারি সুস্থ হয়ে যান তো। আপনার মুখে ভেংচি না দেখলে ভাল লাগে না।
— তাই
— হুম
— তারাতারি সুস্থ হবো তবে আমার একটা শর্ত আছে?
— কি???
— আমাকে আপনি নয় বরং তুমি করে বলতে হবে?
— আচ্ছা বাবা তাই হবে তবু তারাতারি সুস্থ হয়ে যাও তো।

তারপর আমি চলে আসি। অনেক দিন পরে ওর সাথে কথা বলতে পেরে মনে কোন জায়গাটাতে যেন একটা ভাল লাগছে। আমি বুঝতে পারি না এই মেয়েটা আমার পিছনে এতো লাগে তবু আমার কেন জানি ওর সাথে কথা বলতে ভাল লাগে। এভাবে সময় খুব ভালই যাচ্ছিল। আর আস্তে আস্তে ওর সাথে কথা বলাও আমার বাড়তে লাগলো। আর ও এখন আমার সাথে ঝগড়া করে যদি আমি না খাই, সময় মত না ঘুমাই এইসব নিয়ে। সকালে রুমে বসে ল্যাপটপে একটএ কাজ করতে ছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম কে যেন আমার রুমে উকিঁ দিয়ে আছে। তাই তাকাতেই মুখটা সরিয়ে নিল আর আমিও বুঝতে পারলাম না। তাই আমি দরজার যেতে দেখি ঐশি দাড়িয়ে আছে। আজ ওর ব্যবহার দেখে আমি ফুল্টু অবাক।

— আরে তুমি এখানে দাড়িয়ে আছো কেন? ভিতরে আসো। ও চুপচাপ ঘরে চলো আসলো…
— হুমম এবার বলো কেন আসছো?
— ভিতরে আসার সময় ভিতরে প্রবেশ নিষেধ কোন লেখা দেখি নি তো।
— এটা কি সুদ নিলে?
— না কথা ফেরত দিলাম।
— ভালো তো।
— আচ্ছা নীল শুনো না আমি তোমাে জন্য ৩ লাইনে একটা ছড়া লেখছি।
— ছড়া তাও আমার জন্য বলো তো…(খুব আগ্রহ সহকারে)
— You are very cool
looking beautiful
nicely with bloo……..
— কি??
— না কিছু না।

ও আর বসলো না বরং আমার দিকেও দেখলো না। সোজা আমার রুম থেকে চলে গেল। আরেকটু হলে তো আজ ব্লাডিফুল বানায় দিতো। একদিন সকালে একটা চাকরীর ইন্টারভিউতে যাবো বলে বাড়ি থেকে বার হলাম। বার হতে দেখি ঐশি মনে হয় ভার্সিটি যাবে বলে রিকশার জন্য দাড়িয়ে আছে। তখন একটা রিকশা এসে আমাদের মাঝে থামলো। তবে ঐশি উঠতে গিয়েও কি ভেবে যেন উঠলো না বরং আমায় বলল….

— আপনি এটা দিয়ে চলে যান?
— কেন তুমি ভার্সিটি যাবে না?
— যাবো তবে আমার ক্লাস থেকে আপনার ইন্টারভিউটা খুব দরকার।
— আমি চাকরীর ইন্টারভিউর জন্য যাচ্ছি তোমায় কে বলল?
— আপনি হয়ত আমার খুজ না রাখলেও অন্য কেউ আপনার খুজ রাখে এটা ভুলে যাইয়েন না।
— বাব্বা চলো এক সাথেই যাই।
— কিন্তু?
— আরে চলো।

এরপর দুইজন এক রিকশায় উঠলাম। কিন্তু ঐশি খুব চুপচাপ হয়ে আছে। কি হলো ওর , ও তো এতো চুপ কখনো থাকে না।

— কি হলো মহারানীর মুখ কালো হয়ে আছে কেন?কি হয়েছে আমি কি জানতে পারি?
–( ও চোখ মুছতেছে)
— আরে বোকা মেয়ে কাদঁছো কেন?
— আমার বিয়ে জন্যে ছেলে দেখা হচ্ছে।
— ও সুখবর মিষ্টি খাওয়াবে না।

আমরা কথাটা শুনা মাত্র ও আমার দিকে অন্যরকম ভাবে তাকালো। কাজল গুলো এলোপাথাড়ি হয়ে গেছে। কাল চুল গুলো গালে লেগে আছে। যেন ওর চোখ গুলো বলছে নীল তুমি এমন কেন? তারপর আমি ওর হাতটা চেপে ধরলাম। এতে ও আমার কাধেঁ মাথা রাখলো। আর আমি বললাম…..

— এই বোকা মেয়ে কাদঁচ্ছো কেন?
— (ও চুপ)
— আমার ভেংচি কন্যা হবে?
— হুম
— আগে বলো নি কেন?
— সাহস হয় নি যদি মেনে না নাও।
— সাহস করে বলেই দেখতে।
— আমি কেন বলো হুহ
— ও তাহলে কি আমায় এখন ভালবাসার কথাটা বলতে হবে?
— হুমম

যাক গ্রীন সিগন্যাল তো আছে। না থাক প্রপোজটা সবাইকে না জানিয়ে করে দিবো নে। আর নীল ঐশির দুজনের মনেই ভালবাসাটা অনেক আগে থেকেই ছিল শুধু কেউ বুঝতাম না। আর হা যে যার মনের মানুষ কে প্রপোজ করে দাও।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত