স্মৃতিপটে লেখা

স্মৃতিপটে লেখা

বইয়ের তাকগুলো গুছিয়ে রাখছিল মাহি।হঠাৎ করে চোখ পড়লো পুরানো একটা ডায়েরিতে।পাতা উল্টাতে লাগলো সে।প্রতিটা পাতায় লেখা – অনেক ভালোবাসি তোমাকে মাহি। চোখে পানি চলে আসল নিজের অজান্তেই। দশটা বছর পেরিয়ে গেলো। সময় কত তাড়াতাড়ি পেরিয়ে যায়।

দশ বছর আগে নাহিয়ান কে প্রথম দেখেছিলো সে।ওদের বাড়ির দোতালায় ভাড়াটে হয়ে এসেছিল রুমানা আপু।নাহিয়ান তাদেরই পরিচিত। মাহি তখন মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবার জন্য চেষ্টা করছে।আর নাহিয়ান তখন ফাইনাল ইয়ার মেডিকেল স্টুডেন্ট।তো রুমানা আপুই নাহিয়ানকে অনুরোধ করেছিল মাহিকে পড়া বুঝিয়ে দেবার জন্য।

প্রথম দিন নাহিয়ানকে দেখে একটু বিরক্তই ছিল সে।অনেক রাগী আর গম্ভীর মনে হয়েছিল ওকে।ধীরে ধীরে নাহিয়ান কে তার ভালোই লাগতে শুরু করে।ওর কথা বলার ধরণ অনেক সহজ সাবলীল।

একদিন মনোযোগ দিয়ে কি একাটা টপিক যেন বুঝে নিচ্ছিল সে। আর নাহিয়ান ও বুঝিয়ে দিচ্ছিলো।হঠাৎ করে কখন যেন দুজনেই হারিয়ে গিয়েছিল একে অপরের চোখে।অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল মাহি।চোখ নামিয়ে ফেললো সে।নাহিয়ান এর ও একই অবস্থা।এরপর অনেকদিন সে আর মাহির দিকে মুখ তুলে তাকাতো না।

মাহি প্রচুর প্রাণ চঞ্চল একটা মানুষ।প্রথম দিন তাকে দেখেই বুকে হালকা একটা চাপ বোধ করছিল নাহিয়ান।এত সুন্দর মানুষ কিভাবে হয়!!তারপর কয়েকদিন আগে হাবলার মত তাকিয়ে ছিল সে মাহির দিকে।নিজের এমন আচরণে নিজেই বিরক্ত হচ্ছে সে।প্রতিদিনই ভাবে রুমানা আপুকে বলে দিবে যে সে আর মাহিকে পড়াতে ইচ্ছুক না।কিন্ত এক অজানা টান অনুভব করে সে মাহির প্রতি।যেদিন পড়াতে যায়না সেদিন কেমন যেন অস্থির লাগে ওর।নাহিয়ান এসব পাত্তা দিতে চায়না।আজ অনেক ভেবেচিন্তে সে একটা সমাধানে আসলো। আজই সে মাহির বাসায় যেয়ে বলে আসবে ওর পক্ষে আর পড়ানো সম্ভব না।

কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুলে দিলো মাহি।নাহিয়ান আজ অনেক গুরুগম্ভীর মুডে আছে।মাহি বইখাতা নিয়ে সামনে বসতেই বিনা কারণে ঝাড়ি দিয়ে উঠল নাহিয়ান।

-এভাবে পড়লে তো চান্স ই পাবানা।পরে আমার দোষ দিবা।ভালো করে পড়াই নাই তাই চান্স পাওনাই।যাও আন্টিকে ডাকো।কাল থেকে আর তোমাকে পড়াতে আসবোনা।

মাহি নিশ্চুপ।মাথাটা নিচু করে আছে।নাহিয়ানের ব্যবহারে অনেক কষ্ট পেয়েছে সে।তা দেখেও না দেখার ভান করছে নাহিয়ান।

-কি কথা বলোনা কেন?

নাহিয়ান দেখলো মাহির চোখে পানি।এটার জন্য সে প্রস্তুত ছিলোনা।ওর অনেক খারাপ লাগছে এখন।মেয়েটাকে কাঁদিয়ে দিলো!! নিজের ওপরই এখন রাগ লাগছে।তাছাড়া মাহি অনেক ভালো ছাত্রী। ও ভালোই পড়াশুনা করে।এভাবে না বললেও পারত সে।

নাহিয়ান চলে যাবার পর মাহি মন খারাপ করে বসে আছে।মেজাজটা খারাপ লাগছে খুব।নিজেকে কি ভাবে নাহিয়ান!কি এমন হয়ে গেছে সে! এত দেমাগ কেন তার!এসব ভাবছিল সে।

হঠাৎ তার মা শায়লা এসে দেখলেন মেয়ে চুপচাপ ঘর অন্ধকার করে বসে আছে।অনেক আদরের একমাত্র সন্তান তার মাহি।মেয়েকে এভাবে দেখে চিন্তায় পরে গেলেন তিনি।সামনে পরীক্ষা।অসুস্থ হয়ে গেলো নাতো আবার!!

– কি হয়েছে মাহি?শরীর খারাপ তোর?অনেক কষ্ট হয়ে যাচ্ছে না তোর?আর মাত্র কয়েকটা দিনই তো।ভালো একটা জায়গায় চান্স পেয়ে গেলে দেখবি এই কষ্টের কথা মনেই থাকবেনা।

মাহি কিছুই বললোনা।চুপ করে আছে।আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মা।আর সে কেঁদেই যাচ্ছে।শায়লা ভাবলেন মেয়েটা খুবই চিন্তায় আছে পরীক্ষা নিয়ে।তাই হয়ত এমন করছে।

-ধুর পাগল মেয়ে,এভাবে কাঁদছিস কেন?আমার বিশ্বাস তুই ভালো করবি।এভাবে কান্নাকাটি বাদ দে তো।উঠ তাড়াতাড়ি। খাবার দিয়েছি।খাবি চল।

মাহি লক্ষী মেয়ের মত উঠে হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসল।

এদিকে নাহিয়ান এর মেজাজ অনেক খারাপ।মাহির চোখে পানি দেখে তখন থেকেই অনেক খারাপ লাগছে তার।আর ও খারাপ লাগছে এটা ভেবে যে সেইতো মেয়েটাকে কাঁদিয়েছে বিনা কারণে।অনেক ভেবেচিন্তে সে মাহিকে একটা মেসেজ করল।

-আছো না ঘুমিয়ে গেছো? পড়ছিলে???

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত