ইতি-তোমার রিনি

ইতি-তোমার রিনি

বন্ধু,
অনেকদিন আগে তুমি আমার কাছে একটা জিনিস চেয়েছিলে।খুব সাদামাটা একটা বাক্সে রাখা ছোট্ট একটা জিনিস। অনেক বছর আগে জিনিসটা আমার কাছে খুব দামী বলে মনে হত। প্রতিদিন বাক্স থেকে বের করে তাকে মুছে,অপ্রয়োজনীয়ভাবে হলেও যত্নের আতিশয্য দিয়ে তাকে চকচকে করে আবার বাক্সে রেখে দিতাম। আর ঐ বাক্সটাকে নিজের গায়ের রক্তের মতো আগলাতাম। মনে মনে ভাবতাম—একদিন কাউকে ঐ বাক্সের মধ্যে থাকা জিনিসটা দিয়ে দেব।তবে তাকে এমন একজন কেউ হতে হবে যে কিনা নিজের প্রশ্বাসের সাথে অক্সিজেনের মতো বারবার ঐ জিনিসটাকে গ্রহণ করবে।

কিন্তু এতবছরেও তেমন কাউকে পাইনি।একজন তো তাকে মাদক ভেবে ছুঁড়ে ফেলে দিল। আর তারপর থেকে ঐ জিনিসটাকে সেই যে বাক্সবন্দী করেছি,আর কখনও ফিরেও তাকাইনি সেদিকে। ঘরের এক কোণে পড়ে থাকতে থাকতে ধূলো জমলো তার ওপরে।একদিন হঠাৎ দমকা হাওয়ার মতো তুমি এলে। বাক্সের ওপরে থাকা ধূলোর পুরু আস্তরণকে উড়িয়ে দিতে গিয়ে,সেই ধূলো তোমার চোখেই জল এনে দিল। আমি একবারও তোমার চোখে ফুঁ দিয়ে দেব ভাবিইনি।চোখের জল নিয়েই হাসিমুখে বললে—

“চিন্তা করো না রিনি।আমি ঠিক আছি।”বিশ্বাস করো, আমি সেদিন চিন্তিত ছিলাম না। তবে আজ মনে হয় তুমি সেদিন জানতে যে খুব শিগ্গির তোমার জন্য আমার চিন্তাকে তুমি ঠিক আদায় করে নিতে পারবে।সেদিন তোমাকে ঝোঁকের মাথায় ঐ বাক্সটা দিয়ে দিয়েছিলাম।সেদিন ভাবতেও পারিনি যে বাক্সের ভিতরে থাকা জিনিসটাকে বাক্সবন্দী না রেখে খোলা আকাশের নীচে শিশিরভেজা ঘাসের ওপরে রাখা যায়।প্রকৃতির মাঝে এভাবে তাকে উন্মুক্ত করা যায়,শিশিরে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে তার মলিনতা কাটানো যায়।দীর্ঘ বছর আগলানোর পরও জানতেই পারিনি যে তার থেকে এমন সাতরঙা জ্যোতি ঠিকরে বেরোতে পারে।তুমি তো আমার বাড়ির ইলেকট্রিক কনসাম্পশান্ কমিয়ে দিয়েছ। কিন্তু বিশ্বাস করো,এমন পার্থিব উপকারের জন্য আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ নই। বলা ভালো,তোমার প্রতি আমার কোনো কৃতজ্ঞতাই নেই।কেনই বা থাকবে বল?তুমি তো আমার কোনো “উপকার” করনি যে তোমাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে। যা করেছ তা তোমার নিজস্ব প্রবৃত্তি। আর আমি তোমাকে যদি নিষেধও করি তাও তুমি তোমার প্রবৃত্তি বদলাতে পারবে না।

তোমাকে দেখলে মনে হয় “মাতৃত্ব” নামক বিশেষ্যটির ওপরে আমাদের মেয়েদের একচেটিয়া অধিকার থাকা উচিত নয়।“মাতৃত্ব” তো কেবল শারীরিক নয়,মানসিকও। আমরা মেয়েরা না হয় একটা গোটা মানুষকে গর্ভে ধারণ করতে পারি। কিন্তু একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে সর্বক্ষণ হৃদয়ে ধারণ করার নাম কেন “মাতৃত্ব” হবে না তুমিই বল। আর যেভাবে স্পর্শ না করেও বারবার তোমার স্নেহের ঐ বলিষ্ঠ হাতটা আমার মাথায় আর কাঁধে রাখ,সেটা আমার সমবয়স্ক অভিভাবকের অস্তিত্বকে জানান দিয়ে যায়।খুব জানতে ইচ্ছে করে

—কোথায়,কখন,কীভাবে এতটা স্নেহ করে বসলে আমাকে?আমার মতো বেহিসেবী,বেপরোয়া,ছন্নছাড়া,অগোছালো অপাত্রেই এতকিছু দেওয়ার ইচ্ছেটা তোমার উদারতা নাকি পাগলামি সেটা বুঝে উঠতে পারিনা। আবার আমার এই অদ্ভুত অগোছালো জীবনকে তোমার মতো করে গুছিয়ে নিতেও তোমার ক্লান্তি নেই। জানো,এতকিছুর জন্য নিজেকে তোমার কাছে একবারের জন্যও ঋণী মনে হয় না। তুমিই মনে হতে দাওনি। তোমার প্রশ্রয়ে এই সবকিছুকে বড্ড বেশি নিজের মনে হয়। আরও শোনো,আমি তোমাকে কখনও বলব না যে “আমাকে ছেড়ে যেও না”। কারণ,আমার যত দুর্দশাই হোক না কেন,চালাঘরে থাকতে হলেও সেখানে একটা আয়না থাকবে নিশ্চই। আর আয়নার সামনে দাঁড়ালেই তো নিজেকে দেখতে পাব। তাই তুমি মুক্ত। তুমিই তো মুক্তির সংজ্ঞা শিখিয়েছ আমাকে—ঐ বাক্স থেকে আমার বন্ধুত্বের অনুভূতিকে শিশিরে স্নান করিয়ে,রোদের তাপে ঊষ্ণ করে।

তোমাকে ভালো থাকার শুভেচ্ছা জানাব না। বরং নিজেকে ভালো রাখব। তুমি তো জানো যে আমি কী ভীষণ স্বার্থপর।

ইতি—
তোমার রিনি

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত