ইচ্ছাগুলো পূরণ করা হয় নি

ইচ্ছাগুলো পূরণ করা হয় নি

এই রাত্রী শুনছো?? শুনছি তো!! রাগ করেছো?? করা উচিত না বলো?? আমি তোমার কাছে কিছু চাই কখনো? ইফাদ উঠে যায় স্ত্রীর পাশ থেকে। তার খারাপ লাগছে এই ভেবে বিয়ের ২ বছর হয়ে গেছে কিন্তু রাত্রীর ইচ্ছাগুলো পূরণ করা হয় নি!ইচ্ছা খুব বেশিও না!!সমুদ্র দেখতে চায় মেয়েটা। যেতে চায় ছুটিতে। কিন্তু ঘরে অসুস্থ মা।আর আয়ও আহামরি না।তবু ইফাদ চাইলে যেতে পারতো যদি অফিস থেকে ছুটি নিতে পারতো।তার ছুটি চাইতে ইচ্ছা করে না। অফিসের সবাই যেখানে বড় অংকের ঘুষ খেয়ে বাড়ি গাড়ি করেছে। ইফাদ দুই টাকা বাঁচাতে হেটেই বাড়ি ফেরে। না সে অভাবী নয়। কিন্তু এই দূর্মূল্যের বাজারে ছোট ছোট জমানো টাকাও কাজে দেয়। ইফাদ সিগারেট খাওয়া পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছে। ঠিক সময় মত বাড়ি ফেরে।

এবার রাত্রীকে কথা দিয়েছিলো বাইরে নিয়ে যাবে। কিন্তু দেশের অবস্থা খুব খারাপ। তাই সে সাহস করছে না। কিন্তু রাত্রী জেদ করে বসে আছে।মেয়েটা জেদ করে না।কিন্তু এবার অনেক আশা করেছিলো মেয়েটা। কদিন আগেই অফিস থেকে ফিরে রাত্রীকে নিয়ে ফুসকা খেতে গিয়েছিলো। সামনের বিলাস বহুল হোটেল থেকে রাত্রীর কোন এক বন্ধু বেড়িয়ে খেয়াল করেছিলো রাত্রীকে। রাত্রী বেশ হেসেই কথা বলছিলো। পরিচয় শেষ হতে রাত্রীদের বাড়ি পর্যন্ত লিফট দিতে চেয়েছিলো মানুষটা। সেদিন নিজের অক্ষমতা ইফাত কে কষ্ট দিয়েছিলো।সে না করার আগেই রাত্রী না করেছিলো। ইফাদ চুপ চাপ হাটতে শুরু করেছিলো। পেছন থেকে রাত্রী এসে ধরেছিলো হাত। সেই স্পর্শে মেখে ছিলো অসম্ভব ভালোবাসা। সে রাতে অনেকক্ষন হেটেছিলো দুজন।

রাত্রী বারবার এভাবেই বুঝিয়ে দিতো কতটা ভালোবাসে। এমনকি বাবার এত টাকা পয়সার তোয়াক্কা করে নি।সব ছেড়ে এসেছে। কারণ সে ইফাদকে ভালোবাসতো আর তার সততাকে করতো শ্রদ্ধা। দিনে দিনে তা কেবল বেড়েছে। কিন্তু তারও তো ইচ্ছা আছে!! সততা দিয়ে বিলাস করা যায় না। রাত্রী এসে কখন পিছনে দাড়িয়েছে খেয়ালই করেনি ইফাদ।এসে আস্তে করে ইফাদের গলা ধরে গালে চুমু একে বলেঃ আকাশ দেখছো? হুম। আকাশে মেঘ জমে কিন্তু থাকে না চিরদিন। আচ্ছা আমি একটা চাকরী করি? কেন? তোমার তো অভ্যাস নেই! বাবার অফিসে করবো! :ইচ্ছা করলে করো।তবে দেখ কষ্ট হলে দরকার নেই। রাত্রী জড়িয়ে ধরে স্বামীকে, মানুষটা তাকে না করতে পারে না।

এমনকি ওভারটাইম করেও রাত্রীকে ভালো রাখার চেষ্টা করে। মানুষটা এত ভালো কেন?? রাত্রী যখন ইফাদকে এভাবে ধরে ইফাদ এক মুহূর্ত এর ব্যবধানে ভূলে যায় সব। আজ রাত্রী আর ইফাদের এনিভার্সারী। ইফাদ আর রাত্রী দুজনই সারপ্রাইজ প্লান করেছে। ইফাদই আগে বলেঃ আজ সমুদ্র দেখতে যাবো। ব্যাগ গুছিয়ে ফেলো। মা যাচ্ছে ভাইয়ার কাছে।কিন্তু এক সপ্তাহের ছুটি মিলেছে।আর দুটো শুক্রবার মিলিয়ে নয়দিন। বলে মুখটা ফ্যাকাসে করে রাখে। রাত্রী বলেঃ আমার কাছেও তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে। এটার চেয়ে বড়। পৃথিবীতে এর চেয়ে বড় সারপ্রাইজ হয় না।

ইফাদ জোর করলে রাত্রী বলবে না।তাই হেসে বলেঃ বলতে ভুলে গেছি।ট্রেন সন্ধ্যা চারটায় কিন্তু। ট্রেনে উঠেই রাত্রী জেদ করে জানালার পাশে বসবে।অনেক দিন পর ছুটি আজ। রাত্রী ইফাদের কাধে মাথা রাখে আর ইফাদও জড়িয়ে রাখে রাজকন্যাকে। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলো খেয়াল করেনি। জেগে ওঠে আগুনের আচে। নিজের গায়ের আগুন নিয়েই পাশে দেখে রাত্রী চিতকার করছে।রাত্রীর পুরো শরীর জ্বলছে। ইফাদ কাদতে কাদতে চিতকার করে। কেউ আছেন?? তারপর রাত্রীকে জড়িয়ে গড়াগড়ি দিতে চায়। জড়িয়ে নিতেই রাত্রীর শরীরের পোড়া গন্ধ পায়। ইফাদদের ট্রেনের কামড়া জ্বলছে। ধোয়ায় নিজেও জ্ঞান হারায়। ওদের ট্রেনের দরজা লাগিয়ে কারা যেন কয়েকটা পেট্রোল বোমা মেরে পালিয়েছে।

মানুষ খুন করে দাবী আদায় তাদের উদ্দেশ্য!! জ্ঞান ফিরে দেখে হাসপাতালে শুয়ে আছে ইফাদ। পাশে রাত্রী নেই। ইফাদকে জেগে উঠতে দেখেই নার্স এগিয়ে আসে। ইফাদের শরীর জুড়ে ব্যান্ডেজ। তবু উঠতে চায় কিন্তু পা পুড়ে গেছে। দাড়াতে পারে না।সে কেবল নার্সকে রাত্রীর বাবার নাম্বার বলে। কিন্তু সারা শরীর জ্বলছে। তবু রাত্রীকে তার দেখতে হবে। নার্স বলেঃউনার অবস্থা ভালো না। ৭০ ভাগ পুড়ে গেছে। রেয়ার চান্স টু সারচাইভ।আপনি শান্ত হোন। ডাক্তাররা চেষ্টা করছেন।

রাতেই দুজনকে আলাদা এম্বুলেন্স করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। দুদিনে ইফাদ কিছুটা সুস্থ হয়। ইফাদের পাশের বেডেই রাত্রী। সারা শরীরের সাথে রাত্রীর মুখ পুড়ে গেছে।কেবল বড় চোখে তাকিয়ে থাকে। সে চোখে অসম্ভব ভালোবাসা।আর পোড়া মুখের ভরা চোখে নামে জল। পুড়ে গেছে চোখের ভ্রুও ইফাদের গলার কাছে পুড়ে ফেছে। কথা বলতে কষ্ট হয়। ইফাদ তবু ডাকেঃ রাত রি রাত্রীর বাবা শুধু কাঁদেন। কিছু বলতে পারেন না। হঠ্যাত রাতে রাত্রী শব্দ করে।ইফাদ তাকিয়ে দেখে আঙুল দিয়ে ইশারা করে ডাকছে তাকে। বাবাকেও ইশারায় ডাকে।

ইফাদকে ঊঠতে সাহায্য করে রাত্রীর বাবা। পাশের হুইল চেয়ারে বসিয়ে কাছে নেয়। রাত্রী বলতে চায় কিছু কিন্তু পারে না। দেয়ালের দিকে আঙুল দিয়ে দেখায় একটা বাচ্চার ছবি। ইফাদ খানিকটা আচ করে। থেমে বলেব তু..মি মা… রাত্রী কেঁদে ফেলে।হঠ্যাত ব্যথায় খিচুনি ওঠে রাত্রির। বাবা ছুটে যায় ডাক্তার ডাকতে। ইফাদ বহুকষ্ট নিয়ে হাত ধরে রাত্রীর। মেয়েটা চোখ বন্ধ করে রাখে। ইফাদের কেন যেন মনে হয় রাত্রী তাকে ছেড়ে যাচ্ছে।সে চিতকার করে বলেঃ রাত্রী প্লিজ কেঁদো না।

আমি সমুদ্র দেখাতে নিয়ে যাবো। আমাদের বাবুটার নাম হবেঃ ইরা। ইফাদের ঈ আর রাত্রীর রা। রাত্রী চোখ খোলে।কিন্তু আর পাতা বন্ধ হয় না। ইফাদের গলা দিয়ে রক্ত ঝরছে।ডাক্তার রাত্রীর পালস মেপে চোখের পাতা বন্ধ করে দেয়। রাত্রীর বাবা বসে পড়েন মেঝেতে। আর ইফাদ রাত্রীর নাম ধরে চিৎকার করতে থাকে।ডাক্তার নার্সের হাজার বারণ তোয়াক্কা করে রাত্রীর নামটা উচ্চারিত হয়ে হাসপাতালের দেয়ালে প্রতিধ্বনি তোলে কেবল।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত