এক অন্য ভ্যালেন্টাইন্স ডে

এক অন্য ভ্যালেন্টাইন্স ডে

-এক-

বাসে উঠে দেখলাম সব সিটই ভরতি,শুধু লেডিসের একটা সিটে এক মধ্য বয়স্ক লোক বসেছিল।বাসে আমি একাই মেয়ে যে বসার জায়গা পেয়ে উঠিনি।উনি আমায় দেখে উঠতে যাচ্ছিলেন,আমিই বাধা দিলাম।বাসে সেরকম ভিড় নেই,দাড়ানোই যায়।হঠাৎ পিছন থেকে একজন ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন,

-নিজের অধিকার এভাবে ছেড়ে দেওয়াটা কিন্তু কোন মহৎ কাজ নয়, এই সিট গুলো মেয়েদের জন্যই সংরক্ষিত।
-কাকিমা,আমি জানি সেটা,মেয়েদের কে সুরক্ষিত রাখতেই অথবা দাড়িয়ে যেতে যারা নিতান্তই সক্ষম নন তাদের জন্যই বোধহয় এই সংরক্ষণ করা।কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি এখন এর প্রয়োজন বোধ করছি না।যখন আমি দাড়িয়ে যেতে সক্ষম তখন কীভাবে আমার বাবার বয়সী একজন লোককে উঠতে বলি বলুন তো?
বেশ বুঝতে পারলাম আমার উত্তরে খুব অসন্তুষ্ট হলেন।

যাইহোক কিছুক্ষণ পর পেছনের দিকে চোখ যেতেই দেখলাম ভ্যাবলা দাড়িয়ে আছে।ভ্যাবলার আসল নাম কৌশিক।ওকে যখনই দেখি কলেজের প্রথম দিনের কথাটাই মনে পড়ে যায়…আমরা নতুন ক্লাসে এসে যখন সবাই সবার সাথে আলাপ-পরিচয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই একটি ছেলে মাথা ভরতি তেলে, পেতে আছড়ানো চুল নিয়ে,রঙচংহীন একটা শার্টে, সেকেলে ফ্রেমের চশমায়,পায়ে হাওয়াই চপ্পল পরে ঢুকল ক্লাসে।সবাই ওকে দেখে ব্যঙ্গাত্মক হাসি হেসেছিলাম আমরা।সেই থেকে আমরা ওকে ভ্যাবলাই বলি।এমনি ও ভালোই,কিন্তু ও ভীষণ কম কথা বলে,ক্লাসের এক কোণার বেণ্ঞ্চে ও একাই বসে।মাঝে মাঝে কেমন আনমনা হয়ে পড়ে।যাইহোক কলেজের স্টপেজ চলে এসছে দেখে নামলাম।ভ্যাবলাও নামল।আমিই বললাম,

-কিরে এই বাসে এলি যে তোর বাড়ির সামনে দিয়ে তো এ বাস যায় না।
-একজন আত্মীয়ের বাড়ি থেকে সোজা আসছি রে তাই।
বলেই হনহন করে কলেজে ঢুকে পড়ল।

-দুই-

বস্তির গলি দিয়ে বেরোতে যাবো হঠাৎ মনে হল কয়েকজন ছেলে আমার পিছু নিয়েছে।আমি দৌড়েই কোনরকমে একটা মিষ্টির দোকানের সামনে এসে আশ্রয় নিলাম।খুব ভয় করছে, কি করব ভেবে না পেয়ে,ফোন করে ভ্যাবলাকে তাড়াতাড়ি আসতে বললাম এখানে।কিছুক্ষণ পর ও আসতেই আমার ভয়ের কারণটা খুলে বলতে বলতেই বড়রাস্তার দিকে এগোতে লাগলাম।এর মধ্যে বাসও এসেগেছিল আমার।

-চল আমি নাহয় তোকে বাড়ী পর্যন্ত পৌঁছে দিই।
-তার কোন দরকার নেই রে,তোর বাড়ি এখান থেকে সবচেয়ে কাছে তাই তোকে আসতে বললাম,বাসে কোন ভয় নেই,তুই বাড়ি যা।

কে শোনে কার কথা!ও উঠে পড়ল।আমরা বসলাম পাশাপাশি।ও বলল,
-তুই এত রাত করে বস্তির ছেলেমেয়েগুলোকে পড়িয়ে বাড়ি ফিরিস? একা মেয়ে কেন আসিস এখানে?জায়গাটা মোটেও নিরাপদ নয়।

-জানিস,আমার জন্মের পরপরই বাবা মারা যাবার পর,মা আমাকে নিয়ে পড়ে অথৈই জলে, কোনরকমে আশ্রয় পায় আমার মামার বাড়িতে।ছোটবেলা থেকেই দেখেছি মাকে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করে আমাকে বড় করে তুলেছে। মামারা প্রায় বলে আমিই নাকি বাবা কে খেয়েছি,মাঝে মাঝে মাও বলে আমি নাকি ভীষণ অপয়া।আমার জন্যই নাকি আজ এ অবস্হা আমাদের।আমি তাও সব কথা মুখ বন্ধ করে সহ্য করতাম।কিন্তু কিছুদিন পরই বুঝলাম আমার দাম আসলে কারোর কাছেই নেই।

তখন সবে মাধ্যমিক পাশ করেছি,দেখা হল মৈনাকের সাথে ,অল্প দিনের মধ্যেই
আমাদের মধ্যে খুব ভালো বন্ধুত্ব তৈরী হল,সারাদিনে ওর সঙ্গে ঘটে যাওয়া এমন কোনও কথা বাধ রাখত না আমায় বলতে।ভেবেছিলাম আমার মত ওর মনেও একটা অনুভূতি তৈরী হয়েছে।আমি জানালাম ওর প্রতি আমার এই অনুভূতির কথা। আমায় শ্রেফ জানালো আমাকে নাকি শুধুই খুব ভালো বন্ধু ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেনি কোনোদিন।তাছাড়া ও সম্পর্কে বিশ্বাসী নয়,এখন কোনও সম্পর্কে জড়াতে চায়না….কিছুদিন পর জানতে পারলাম একজনের সাথে প্রেম করছে মৈনাক।সেদিন বুঝেছিলাম জানিস আমাকে ওর প্রেমিকা না ভাবতে পারার কারণ টা…..আমার এই শ্যামলা গায়ের রঙ,না পারি সাজগোজ করতে ,না আছে কোনও গুণ।তাই আমার মত কালো মেয়েকে ‘ভালো বন্ধুর’ জায়গা দেওয়া যায়,কিন্তু প্রেমিকার জায়গা দেওয়া যে বড়ই কঠিন।

সেদিন থেকে ঠিক করি নিজের জন্য বাঁচবো। শুরু করি টিউশন পড়ানো।তা দিয়ে যা টাকা বেঁচে থাকে তাতে ওই বস্তির-অনাথাশ্রমের বাচ্চাগুলোর হাতে সামান্য চকোলেট তুলে দিলেই কি খুশি হয় ওরা জানিস।ওদের হাসিটাই আমার বেঁচে থাকার উৎস জানিস,আর ওদেরকে পড়াতেও ভালো লাগে।

তাই ওখানে আমায় যেতেই হয় রে।তুই বুঝবি নারে ভ্যাবলা এইসব।
এইতো চলে এসছে আমার বাড়ি।আসলাম রে।তুই পরের স্টপেজে নেমে বাস ধরে নিস।

-তিন-

কিছুদিন পর আমাদের কলেজের দেড়শো বছর পূর্তি উপলক্ষে এক সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হবে, গোটা কলেজ তার জন্য মেতে উঠেছে। শুনলাম ভ্যাবলা নাকি আবৃত্তি করবে।একটু অবাকই হলাম।ভ্যাবলা তো কথাই বলতে পারে না ঠিক করে,ও আবার আবৃত্তি করবে! ক্যাম্পাসের পিছনের দিকে দেখলাম ভ্যাবলা কুকুর গুলোকে বিস্কুট খাওয়াচ্ছে।জিজ্ঞেস করলাম,
-কিরে ভ্যাবলা, তুই আবৃত্তি করতে পারিস নাকি?বলিস নি তো।
-তুই জিজ্ঞেস করেছিলিস নাকি?শুনতে পায়নি তো।
বলেই ওদিকে চলে গেল।

এই জন্য ওকে আমার সহ্য হয়না।হতচ্ছাড়া একটা!এরপর আর কথা বলিনি ওর সাথে।আগামীকাল অনুষ্ঠান বলে তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়লাম।দেখলাম ভ্যাবলা টেক্সট করেছে….কাল আমার আবৃত্তি শুনিস কিন্তু একটু ধৈর্য ধরে।আমি সিন করে রেখে দিলাম।

************
পরের দিন নাচ-গানের পর ভ্যাবলা এসে দাড়ালো।আজ পাঞ্জাবী পরে কেমন অন্য রকম লাগছে ওকে,ভ্যাবলা তো মোটেও লাগছেনা।ও শুরু করল-

সকল কে শুভ সন্ধ্যা ও আমার প্রণাম জানিয়ে পাঠ করতে চলেছি আমার নিজের লেখা একটি কবিতা-‘আমার নায়িকা’-

“সেই শ্যামবর্ণা মেয়েটা,আমার নায়িকা,সেই মেয়েটা যে বাসে-ট্রামে নিজের অধিকার অনায়াসে ছেড়ে দিতে পারে প্রয়োজনে।

না না আমার নায়িকা জানেনা চোখে কাজল,কপালে লাল টিপ পরতে,কিন্তু সে জানে ওই ক্ষুদার্থ শিশুগুলোর মুখে তুলে দিতে এক টুকরো খাবার।

সে আমার নায়িকা,যে শাড়ি,লাল লিপস্টিকের ব্যবহার জানেনা বলে পুরুষ তাকে ব্যবহারের বস্তু ছাড়া কখনই প্রেমিকা ভাবতে পারে না,সেই মেয়েটাই রাতের অন্ধকারে মানুষ রূপে হিংস্র পশুগুলোকে তোয়াক্কা না করে রোজ চেষ্টা চালিয়ে যায় ওই বস্তির ছেলেমেয়েগুলোকে একটু মানুষ করবে বলে।
হ্যাঁ হ্যাঁ সেই আমার নায়িকা, যখন সবাই তার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে ব্যস্ত,সে সব ব্যথাকে বুকে চেপে রেখে,এগিয়ে চলে তার জগৎ ও ভবিষ্যৎ গড়তে।

আমার নায়িকা হয়ত সানস্ক্রিন লোশনে,জানেনা নিজের রূপকে সূর্যের প্রখর তাপ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে,
কিন্তু সে জানে কি করে তার রোজগার করা টাকা বাঁচিয়ে ,তুলে দিতে হয় ওই গরিব-দুঃখী মানুষ গুলির হাতে।
কেন?বলবেন কেন? আমার নায়িকা কে একটু সাহায্যের হাতটি না বাড়িয়ে দিয়ে আপনারা সবাই তাকে এক ঘরে করতে চাইছেন?

কেন তার না পারা গুলোকে বড় করে দেখছেন?কেন সবসময় তার গায়ের রঙ কে, তাকে বিচার করার চাবিকাঠি বানিয়ে ফেলছেন?

কেন ভুলে যাচ্ছেন সেও রক্ত-মাংস দিয়ে গড়া মানুষ,সেও দুঃখে কাঁদে, আনন্দে হাসে।
সে আমার নায়িকা,শুধু আমার নায়িকা,আমার নায়িকা।”

এরপর আমি আর বসে থাকতে পারিনি।ওয়াশরুমে গিয়ে যখন আমি আর কান্না চেপে রাখতে পারলাম না,তখনও হাততালির আওয়াজ আমার কানে আসছিল।কি অদ্ভুত!সমাজ যাকে বর্জিত করে প্রতিনিয়ত আজ তার গল্প ই যখন বলা হল,তখন…..আমি তারপর ছুটে বেরিয়ে এলাম।বাড়ি যেতে হবে আজ তাড়াতাড়ি।বাসে উঠেই টেক্সট করলাম ‘কাল কলেজের সামনের মাঠে চলে আসিস সাড়ে তিনটেই।’

-অন্তিম পর্ব-

যথা সময় পৌঁছলাম মাঠে।দেখলাম কৌশিক বসে আছে।আমায় দেখে বলল,
-কিরে কাল দেখা না করে বেড়িয়ে গেলি যে,আবৃত্তি কেমন হয়েছে বললি না তো?

-আমায় ক্ষমা করিস পারলে,তোকে কত অপমান,ছোট করেছি সবসময়।তোর গুণ তো দূরের কথা মানুষ বলেই মনে করিনি আমরা। সত্যি আমিও তাদের দলেই পড়লাম যারা শুধু বাইরের সৌন্দর্য্য দেখেই সব কিছুকে বিচার করে থাকে।তোর নায়িকা হওয়ার কোন যোগ্যতাই নেই রে আমার।
আমার হাতটা ওর হাতের মধ্যে নিয়ে বলল,

-আর কথা বলিসনা,আমাকে একটা কথা দিবি,জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাকে তোর হাত ধরে সূর্যাস্ত দেখার অধিকার দিবি,তিথি?

-তুই কবে থেকে আমাকে এত ভালোবাসলি রে,আমি টের পর্যন্ত পেলাম না।
ওর কাঁধে মাথা রেখে বললাম,
-ভাই,একটা কথা রাখবি?
-আমি ভাই!
-ওহ!আচ্ছা, ভ্যাবলা শোননা…
-ভ্যাবলা আবার!….আচ্ছা বেশ ভ্যাবলাই বল,ভ্যাবলারাও তো মানুষ।

-বলছি সামনে তো ভ্যালেন্টাইন্স ডে যদিও আমি মানিনা ভালোবাসার কোন নির্দিষ্ট দিন থাকে,তবুও সবাই তো এই দিনটিকে রেস্তোরায় খেয়ে,গোলাপ-চকোলেট,নানা উপহার দিয়ে নিজেদের মতন করে পালন করে,আমরা যদি এসব কিছু না করে আমাদের কলেজের সামনের ফুটে বসবাস করা ওই বাচ্চাগুলোকে সামান্য কিছু উপহার ও খাবার তুলে দিতে পারি,ওদের ওই নিষ্পাপ হাসিকে সাক্ষী রেখে আমরা আমাদের আগামী দিনগুলো কাটাবো না হয়।কী বলিস তুই?

-আর ঠিক এইজন্যই তুই আমার নায়িকা।
নাঃ এবার সত্যিই মনে হচ্ছে বসন্তের আর বেশী দেরী নেই আসতে।

-সমাপ্ত-

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত