মায়ার কান্না

মায়ার কান্না

ছোট্ট একটা যান্ত্রিক শহর সিলেট।ছোট্ট বললে ভুল হবে।তেমন ছোট না।

বাসার বেলকনিতে দাড়িয়ে এই শহরের মানুষজন, গাড়ির চলাচল দেখছি।আকাশে অনেক মেঘ জমে আছে।

যেকোনো সময় তা বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়বে।মেঘের জন্য সূর্যটা ভাল করে দেখা যাচ্ছে না।কিছুক্ষন পর আযানের ধ্বনি ভেসে আসলো।

বুঝলাম সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বাবা বাবা তুমি এখানে কি করছো?
মেয়ের ডাকে ওর দিকে তাঁকালাম।ও আবার বলল,কি করছো বাবা এখানে?
কিছু নাতো মামনি।কেন ডাকছো?
-মা ডাকছে চা খাওয়ার জন্য।দিদা, মা বসে আছেন।
আমি মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘরের ভেতর চলে এলাম।মা এবং মিষ্টি বসে আছে আমার অপেক্ষায়।এক সাথে চা খাবে বলে।
আমিও এটাই চাই।সবাই একসাথে মিলেমিশে থাকবো। পরিবারে থাকবে এক জনের প্রতি আরেকজনের অফুরন্ত ভালবাসা।
.
আমি শুভ।সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।মা,মেয়ে,স্ত্রী এদের নিয়ে আমার সংসার।মেয়ের নাম অথৈ আর স্ত্রীর নাম মিষ্টি।
.
অফিসে চাকরীর জন্য অনেক আবেদন এসেছে।ডকেট গুলো চেক করে আমার কাছে আনা হয়েছে।প্রায় একশোর মত ডকেট টিকেছে।

আমি ডকেট গুলো দেখছি,হঠাৎ একটা ডকেটের ছবি এবং নাম দেখে আমার চোখটা আঁটকে গেলো।

ছবিটা আমার খুব চেনা আর নাম “বৃষ্টি রানী দাশ”।খুব পরিচিত নাম।ও ছিল আমার কলেজ জীবনের ভালবাসা।কিন্তু ওকে এখন আর ভালবাসিনা।

স্বার্থপর মানুষকে ভালবাসতে এই।ওর কথা মনে হতেই আমার অতীত মনে পড়ে গেল।

যে অতীতে আমি এমন একজনের ভালবাসা পেয়েছি তা কখনো শেষ হবে না।আর ওনার ঋন কখনো
শোধ করতে পারবো না।
.
দশ বছর আগে,
আমি তখন ইন্টার ২য় বর্ষে পড়ি।মা আর বাবাকে নিয়ে ছিল আমার সুন্দর,হাঁসি-খুঁশি ও ছোট্ট একটা পরিবার। কোন অভাব ছিল না।

এক কথায় সুখি পরিবার বলতে যা বোঝায়। বোর্ড পরীক্ষার আট থেকে নয় মাস বাকি।
ক্লাসে একটা মেয়েকে ভাল লাগতো। ক্লাসে প্রতিদিন ওকেই দেখতাম ও হয়তো তা বুঝতে পারতো।

একদিন ওকে মনের কথা বলে দিলাম।ও রাজিও হয়ে গেলো।
এরপর শুরু হল আমাদের প্রেম।অনেক কেয়ারিং শেয়ারিং ছিল সম্পর্কে।

সারাদিন ঘোরাফেরা করা,ফুচকা খাওয়া,গিফট দেয়া এগুলো ছিল প্রতিদিনের রুটিন।খুব ভালোই চলছিল আমাদের সম্পর্ক।
.
বোর্ড পরীক্ষার মাএ পনেরো দিন বাকি। হঠাৎ একদিন রাতে বাবা মারা গেলেন হার্ট এটাকে।

সেদিন যত কান্না করেছিলাম জীবনে এর এক ইঞ্চি পরিমান ও কান্না করিনি।সেদিন মাকেও দেখেছিলাম আমাকে জড়িয়ে ধরে সেকি কান্না।

আমার জম্নের পর এই প্রথম দেখেছি মাকে কাঁদতে।সেদিন রাতে বাবার লাশ নিয়ে বাড়িতে চলে গিয়েছিলাম।

সেখানেই বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করি।প্রায় এক সপ্তাহ পর বাসায় আসি।মাকে নিয়ে।চাকরীর জন্য এদিক- ওদিক অনেক চেষ্টা করতে লাগলাম।

কিন্তু চাকুরী পাওয়া অনেক কষ্টের ব্যাপার।এর মধ্যে পরীক্ষা শুরু হল।পরীক্ষা দিলাম।পরীক্ষা খারাপ হল। সাথের সবাই ভাল করেছে।

আমি সেদিন রেজাল্ট নিয়ে ভাবিনি।শুধু একটা চাকরীর জন্য প্রার্থনা করতে লাগলাম।যাতে মাকে নিয়ে দুবেলা ভাত খেতে পারি।

কিন্তু চাকরী হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।অনেক কষ্টে মাকে নিয়ে দিন কাঁটাতে লাগলাম।
.
বৃষ্টির সাথে যোগাযোগ কমে গেছে। কিন্তু আমার ভালবাসা কমেনি।একদিন বৃষ্টি ফোন দিয়ে বলল ওর সাথে দেখা করতে।

বসে আছি একটা পার্কে।ও এখানেই দেখা করতে বলেছে।অপেক্ষা করছি ওর জন্য।একটু পর বৃষ্টি আসলো।
-বলো কি জন্য ডাকলে?(আমি)
-তোমাকে আমার কিছু কথা বলার ছিল?
-বলো
-তোমার সাথে আমি আর সম্পর্ক রাখতে পারবো না।
-কেনো?
-কি আছে তোমার? টাকা পয়সা কিছুই তো নেই। পরীক্ষায় ওতো ফেল করেছো।
-তাতে কি হয়েছে? আজ নেই কাল হবে। আর পরীক্ষা পরেরবার দিবো।
-তোমার সাথে আমার যায় না।
-কেন? আমিতো তোমাকে ভালবাসি। নিজের মন থেকে ভালবাসি।
-কিন্তু আমি বাসি না।তুমি আমার সাথে আর কোনোদিন যোগাযোগ করবে না।
বলেই ও চলে যাচ্ছিল।আমি ওর হাত ওকে অনেক বার বলেছি ছেড়ে না যেতে।কিন্তু ও শুনেনি তারওপর হাত ছাড়ছিনা দেখে একটা ছড় মেরেছে।
পার্কের সব মানুষ আমার দিকে তাঁকিয়ে ছিল।তখন নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছিল।

ছেড়ে দিয়েছিলাম ওর হাত।জীবনে দ্বিতীয়বারের মত কান্না করলাম।কিন্তু এই কান্না ও দেখেনি।ওর দেখেই কি লাভ।

ও তো আর আমায় ভালবাসেনি।আর যে টুকুই বেসেছিল তা ছিল মিথ্যা।
.
চাকরী পাওয়া যে এত কঠিন তা আগে বুঝিনি।কিন্তু এখন বুঝতে পারছি।

বুঝতে পারছি জীবন কি।কিন্তু কিছুই করার নেই।ভাগ্যের লিখন না যায় খন্ডন।

কিছুদিন পর কলেজে নোটিশ দিয়েছে যারা যারা গত বছর খারাপ করেছে তারা যদি এই বছর পরীক্ষা দিতে চায় তাহলে আবার ভর্তি হতে হবে।

মোট পাঁচ হাজার টাকা লাগবে।সময় মাএ সাত দিন। কি করবো কিছুই ভেবে পেলাম না।ভাববোই বা কি?

যেখানে এক বেলা খেলে আরেকবেলা খেতে পারছি না সেখানে এত টাকা যোগাড় করবো কিভাবে?
মা কিছু আত্বীয়-স্বজনদের বলেছিলেন টাকার কথা।কিন্তু কেউ দেয়নি।সবাই বলেছিল তাদের কাছে টাকা নেই।

আমি জানি ওদের কাছে টাকা আছে কিন্তু কেউ দেবেনা।কারন একটাই ফেরত দিতে পারবো কি না তা তো ঠিক নেই।

শুধু শুধু ওদের টাকা গুলো যাবে।

তখন মা শুধু নীরবেই কেঁদেছিলেন।শেষ পর্যন্ত মা বলেছিলেন “শুভ তর মনে হয় আর লেখাপড়া হবে না।তোকে নিয়ে অনেক স্বপ্নছিলো তর বাবার।

আমারও কম ছিল না। কিন্তু ভাগ্য যে এত নিষ্ঠুর হয়ে যাবে তা আগে বুঝিনি।যদি বুঝতাম তাহলে এই সুখের স্বপ্ন দেখতাম না”।

কিন্তু আমি আশা ছাড়িনি।কলেজের প্রিন্সিপালকে সব কথা খুলে বললাম।তিনি বললেন আমার কিছু করার নেই।

তখন আমারও আশাটা ধীরে ধীরে ক্ষীন হয়ে যাচ্ছে।
.
সকাল ১০টা।কলেজ থেকে ফোন দিয়ে বলেছে আজকে শেষদিন টাকা জমা দেয়ার।

আমার তখন মনে হচ্ছিল আমার স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে আমার কাছ থেকে।

যে স্বপ্নগুলোকে সত্যি করার দায়িত্ব নিয়েছিলাম তা বুঝি আজ শেষ হতে চললো।আমার স্বপ্নগুলো এখানেই শেষ।

মন খারাপ করে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম।তখন হঠাৎ একজন লোক আমাকে ডাক দিলো।পেছনে তাঁকাতেই দেখি পাশের বাসার চাচা।

বাবার সাথে ওনার ভালো সম্পর্ক ছিলো। আমরা হিন্দু আর ওনি মুসলমান।কিন্তু বাবার সাথে অনেক ভাল সম্পর্ক ছিল।

ওনি খুব রাগী মানুষ।ওনাকে আমি একটু ভয়ই পাই।আমাকে বললেন কি হয়েছে? আমি সবকিছু ওনাকে বললাম।

তারপর ওনি আমাকে ওনার সাথে ওনার বাসায় নিয়ে গেলেন।ওনি একাই থাকেন বাসায়।

স্ত্রীর সাথে কি এক ঝামেলা হয়েছিল,তারপর তাদের ডিভোর্স হয়ে যায়।ওনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা।অনেক বড় বড় মানুষের সাথে ওনার পরিচয় আছে।

ঘরের ভিতর ঢুকেই ওনি আমাকে সোফায় বসার জন্য বললেন।

আমি বসলাম আর উনি ভিতরে চলে গেলেন।প্রায় পাঁচ মিনিট পর তিনি ভেতর থেকে আসলেন।আমার পাশে বসলেন।
-এই নে টাকা
-কিন্তু চাচা…..
-কোনো কথা না।টাকা দিয়েছি টাকা নিয়ে কলেজ যা।
আমি আর কিছু বলিনি।শুধু চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়েছে।

যে মানুষটাকে চেনার পর থেকে রাগী মানুষ হিসেবে জেনে এসেছি সেই মানুষটার ভিতরে যে মন বলে একটা জিনিস আছে তা বুঝিনি।আজ বুজলাম।
.
টাকা নিয়ে প্রথমে মায়ের কাছে গেলাম।মা সবকিছু শুনে কান্না আর থামাতে পারলেন না।

সেদিন কেঁদেছিলেন নীরবে কিন্তু আজ আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেক জোরো কান্না করছেন। যে কান্নাতে আছে আবেগ আর খুঁশি।

তারপর কলেজে গিয়ে টাকা জমা দিলাম। তারপর থেকে প্রায়ই চাচার বাসায় যেতাম।খবরাখবর নিতাম।

ওনার যদি কিছু লাগতো তাহলে এনে দিতাম।ওনার অনেক বড় বড় মানুষের সাথে পরিচয় ছিল।

ওনাকে একটা চাকরী যোগাড় করে দেওয়ার কথা বললাম। তিনি বললেন ঠিক আছে আমি দেখছি
.
কিছুদিন পর কলেজে আবার নোটিশ দিল রেজিষ্ট্রেশন ফির।যাদের এক বা দুই বিষয় তারা ১৪০০ টাকা।আর যারা সব বিষয় তারা ২৬০০ টাকা।

যেহেতু আমার কোনো বিষয় তেমন ভাল হয়নি তাই সব বিষয় দেয়ার চিন্তা করলাম।কিন্তু টাকা কোথায় পাবো?

সেই টাকার চিন্তা আবার মাথায় এলো। মায়েরও চিন্তা বাড়লো।একবার না হয় চাচা দিয়েছিলেন। এখন তো আর ওনার কাছে চাওয়া যাবে না।

বিবেক বলে তো একটা জিনিস আছে।মা আবার আত্বীয়- স্বজনদের কাছে টাকা চাইলেন কিন্তু কোনো লাভ হল না।

বিষন্ন মনে ফিরে এলেন মা।রাতে আমি আর মা বসে আছি ঘরে।তখন হঠাৎ চাচা আমাদের ঘরে এলেন।
-আসুন চাচা।বসুন(আমি)
-না বসবো না।এই টাকাটা রাখ।কাল তর রেজিষ্ট্রেশনের লাস্ট ডেট।জমা দিয়ে আসিস।
এই বলে চাচা চলে গেলেন।আজও নিজের অজান্তেই চোখ থেকে অশ্রু ঝরলো।এটা সুখের অশ্রু।

মা বললেন ওনার কাছে চির ঋনি হয়ে থাকলাম রে শুভ।
.
পরেরদিন কলেজে টাকা জমা দিয়ে আসার সময় ওনার বাসায় উঠলাম।কলিংবেল দিতেই ওনি দরজা খুলে দিলেন।
-চাচা আপনাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দেবো সে ভাষা আমার নেই।(আমি)
-তকে কি আমি বলেছি আমাকে ধন্যবাদ দিতে? এত বেশি বুঝিস কেনো?(চাচা)
-না মানে চাচা
-এখন বাসায় যা রাতে আসিস।
-আচ্ছা চাচা
তারপর সেখান থেকে চলে আসলাম।
বাসার দিকে যাচ্ছি আর ভাবছি হায়রে মানুষ।কত রং তোমার।

যাকে এত ভালবাসলাম সেই আমার খারাপ সময়ে চলে গেছে আমার থেকে দুরে সরে।

আর যে মানুষটাকে রাগী ভাবতাম সেই মানুষটা আজ আমার জন্য এত কিছু করছেন।কেন? ওনি তো আমার আপন কেউ নন।

তাহলে কি ভালবাসার টান? ওনি তো আমার বাবাকে খুব ভালবাসতেন।তাহলে কি আমাকেও ভালবাসেন? অবশ্যই ভালবাসেন।

তা না হলে আমার জন্য এত কিছু করতেন না। আজ কেনো জানি চাচাকে খুব আপন মনে হচ্ছে।
আজ চাচার প্রতি জম্ন নিল ভালবাসা,শ্রদ্ধা
.
বাসায় যেতেই মা বললেন চাচা নাকি বাজার করে পাঠিয়েছেন।

আমি মনে মনে বললাম আমাদের ভাগ্যটা অনেক ভাল যে এরকম একজন মানুষকে পেয়েছি।

রাতে চাচার বাসায় গেলাম।চাচা বসতে বলে নিজের রুমে গেলেন।কিছুক্ষন পর চাচা আবার আমার কাছে আসলেন।

হাতে একটা করা আর প্লেটের মধ্যে কিছু বিস্কুট।আমাকে বললেন খেতে। খাওয়ার পর আমার হাতে এক হাজার টাকা দিয়ে বললেন এটা রাখতে।

আমি কিছু বলতে যাবো তখনই চাচা বললেন শুভ তুই কাল আমার সাথে সিটি কর্পোরেশনে যাবি। আমি বললাম কেন চাচা?

চাচা বললেন পরে বুঝতে পারবি।আর তর শিক্ষাগত যোগ্যতার সব কাগজ পএ তর সাথে নিবি।এখন বাসায় যা।কাল সকালে আসবি।

আমি চলে এলাম।বাসায় এসে মাকে সব বললাম।মা অনেক খুঁশি হলেন।
….
পরেরদিন সকালে চাচার বাসায় গেলাম। চাচা আমায় সাথে নিয়ে সিটি কর্পোরেশনে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি নির্বাহী স্যারের রুমে ঢুকলেন আমাকে নিয়ে।
-আসতে পারি
-আসুন।বসুন।কি খাবেন? চা বা কফি?
-না না কিছু খাবো না।একটা প্রয়োজনে এসেছি আপনার কাছে,
-বলুন
-এই যে ছেলেকে দেখছেন(আমাকে দেখিয়ে) কয়েকদিন আগে ওর বাবা মারা গেছেন।ওদের পরিবারে ওর বাবাই একমাএ উপার্জনকারী ছিলেন।

তিনি হঠাৎ মারা যাওয়ায় তারা খুব কষ্ট করে দিন অতিবাহিত করছে।

তাই ওকে যদি আপনাদের অফিসে একটা চাকরী দেন তাহলে ওর জন্য অনেক ভাল হত।
-ওর যোগ্যতা?
-এসএসসি পাশ।এবার এইচএসসি দিবে
-ঠিক আছে আপনি কাগজ পএ সব জমা দিয়ে ডকেট নম্বর নিয়ে যান।আর কদিন পর যোগাযোগ করবেন।
-ঠিক আছে।ধন্যবাদ।আসি
-ঠিক আছে
.
এরপরও চাকরীটা হয়নি এত সহজে।সরকারী চাকরী কি এত সহজে হয়?

তিনি অনেক কষ্ট করে তিন মাস পর সিটি কর্পোরেশনে আমার চাকরীর ব্যবস্থা করে দেন।চাকরীর পোষ্টটা ছিল পিয়ন।

তাতেও আমি খুঁশি।চাকরী তো পেয়েছি। ওনার কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ।কিন্তু তাতেও কম হবে।উনি যা করেছেন তা আপন মানুষও করে না।

আমি মনে মনে ঠিক করেছি প্রথম মাসের বেতন দিয়ে ওনাকে একটা পাঞ্জাবী কিনে দেবো। ৫ তারিখ বেতন দেবে।

৩ তারিখ খুব সকালে মাইকের শব্দে ঘুম ভাঙল।কি বলা হচ্ছে তা শোনার চেষ্টা করলাম।মাইকে বলা হচ্ছে চাচার কথা।

ওনি গতরাতে বারোটার সময় মারা গেছেন।আমার মনে হল আমি ভুল কিছু শুনছি।আমার মাও অবাক হয়ে গেছেন।

আমি দেরি না করে দৌড়ে ওনার বাসায় গেলাম।গিয়ে দেখি ওনি সাদা কাপরে শুয়ে আছেন।

একজন বলল প্রেসার একেবারে লো ছিল,ডায়বেটিকস নীল হয়ে গিয়েছিল।ফলে স্টোক করেছেন।

সেদিন যতটুকু কেঁদেছিলাম বাবা মারা যাওয়ার পরও এত কাঁদিনি।

আমার বার বার মনে হচ্ছিল আমি আমার খুব কাছের একজন মানুষকে হারালাম।

যে আমাকে বাবার মত স্নেহ করেছে,নিজের সন্তানের মত দেখেছে, মুখে খাবার তুলে দিয়েছ।

কিন্তু বিধাতার কি লীলা,যারা মানুষের উপকার করে,মানুষকে আপন করে তারা বেশিদিন বাঁচচে না।

আর যারা মানুষকে অবহেলা করে তারা দিব্বি আছে।
.
আজ বেতন পেয়েছি।জীবনের প্রথম বেতন। কিন্তু এই বেতন পাওয়ার কোন আনন্দ নেই। যার এই বেতন দেখার কথা ছিল তিনি তো নেই।

আছেন না ফেরার দেশে।কিন্তু আমি জানি ওনার দোয়া সবসময় আমার উপরে আছে।মাঝে মাঝে খুব কান্না করি ঐ মানুষটার জন্য।

কদিন পর এইচএসসি পরীক্ষা দিলাম। পরীক্ষায় ভালোও করলাম।অফিসে প্রমোশন হল।
তারপর এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স শেষ করলাম। তারপর বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে টিকে গেলাম।

আর ভাগ্য ক্রমে নিয়োগ পেলাম সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদে।

একদিন এখানে চাকরীর জন্য আমি এসেছিলাম আর আজ আমি চাকরী দেই।আর আমার এই এগিয়ে যাওয়াতে সম্পূর্ণ অবদান আমার চাচার।
.
-স্যার কাঁদছেন কেন?
হঠাৎ একাউনটেন্ট সাহেবের কথায় বাস্তবে ফিরলাম।
চাচার কথা মনে হলে চোখ থেকে এমনিতেই পানি পড়ে।মনে পড়ে সেই পাঞ্জাবী কিনে দেওয়ার কথা।যা দেয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি।
একাউনটেন্ট সাহেবকে বললাম কিছু না। তারপর ওনাকে বললাম এই ডকেটগুলোর মধ্যে বৃষ্টি রানী দাশ নামে একটা ডকেট আছে।

ওনি যে পোষ্টে আবেদন করেছেন ওই পোষ্টে ওনাকে একটা চাকরী দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
এই বলে অফিস থেকে চলে এলাম।বাসায় এসেও মনটা ভাল হয়নি।চাচাকে আজ খুব মনে পড়ছে।
চোখ থেকে পানিও পড়ছে।মনে পড়ছে ঐ মানুষটার আমার প্রতি ভালবাসা, স্নেহের কথা।

যিনি দুঃখের দিনে আমার সাথে থেকে আমায় সুখের দিন দেখিয়েছেন।কিন্তু তিনি আমার এই সুখের দিনটা দেখতে পারলেন না।

যিনি আপন না হয়েও আমার জন্য যা করেছেন তা কেউ কোনো দিন করে না।আমার এই বাড়ি,গাড়ি,অবস্থান সবকিছুতেই রয়েছে ওনার অবদান।

শুধু অবদান নয়,রয়েছে ওনার ভালবাসা। ওনি বেঁচে আছেন আমার মনে,আমার হৃদয়ে,আমার নিঃশ্বাসে।কোনদিনও ভুলবোনা ওনাকে।

আমি জানি ওনার প্রতি আমার ভালবাসাটা ওনার ভালবাসার কাছে তুচ্ছ।জানি ওনার মত ভালবাসতে পারবো না।

কিন্তু চেষ্টা করতে ক্ষতি কি? চেষ্টা তো করতেই পারি ওনার মত সবাইকে ভালবাসার।
ওনার জন্য আমার মাও মাঝে মাঝে কাঁদেন।আমার স্ত্রী ও কাঁদে।

আর এই কান্নাই হল ওনার প্রতি আমাদের “মায়ার কান্না”।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত