প্রত্যর্পন

নাজিম সাহেব জীবনে অনেক বার কেঁদেছে কিন্তু আজকে যে কারণে কাঁদতে হচ্ছে সে কারণে তাকে কাঁদতে হবে তা নাজিম সাহেব কখনও ভাবেননি। তার স্ত্রীও খাটের অন্য কোণায় বসে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছেন। অনেক্ষণ ধরে দু’জন খাটের দুই কোণায় বসে কাঁদছে কিন্তু কেউ কারওর সাথে কথা বলছে না। গতকাল ঈদ গেছে পরিবারের সকলে মিলে কালকে প্রচন্ড আনন্দ করেছে কিন্তু আজকে কাঁদতে হচ্ছে। যে মেয়ের জন্য আজকে কাঁদছে এই মেয়ের জন্মের দিন নাজিম সাহেব কেঁদেছিল কিন্তু সেইদিন তিনি সুখে কেঁদে ছিলেন। নাজিম সাহেবের মনে পড়ে-তার স্ত্রী যখন প্রসব বেদনায় প্রচন্ড ছটফট করছিল সেই অবস্থায় তাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। নাজিম সাহেব ও তার শাশুড়ী অপারেশন থিয়েটারের বারান্দায় বসে অপেক্ষা করছিলেন। নাজিম সাহেব উত্তেজনা ভয় সব মিলিয়ে বসতে পারছিলেন না। এদিকওদিক ঘুরাফেরা করছিলেন। হঠাৎ করে খেয়াল হলো তার প্রচন্ড বাথরুম পেয়েছে তারপর উত্তেজনার কারণে বাথরুমে যেতে চাইছিলেন না। কিন্তু আর ধৈর্য্য ধরতে পারছিলেন না। বাথরুমে ঢুকে গেলেন। দ্রুত বাথরুম সেরে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখলেন তার শাশুড়ী যে জায়গাটিতে বসে ছিলেন তিনি সে জায়গায় নেই। এদিক ওদিক তাকাতে থাকলেন। একটু দূরে তাকিয়ে দেখলেন একটা সদ্যজাত শিশু নিয়ে তার শাশুড়ী একটি চেয়ারে বসে আছেন। নাজিম সাহেব তার শাশুড়ীর দিকে তাকালেন শাশুড়ীও তার দিকে তাকালেন কিন্তু কোন কথা বললেন না।

-বাচ্চাটা কে মা? নাজিম সাহেব তার শাশুড়ীকে প্রশ্ন করলেন কিন্তু তিনি কোন কথা বললেন না। বাচ্চাটাকে আদর করতে লাগলেন।
-বাচ্চাটা কে মা? আবার জিজ্ঞেস করলেন।
-এইতো মেয়ের বাপ এখানে। একজন আয়া বলে উঠল। আমাদের বকশিশ দাও। নাজিম সাহেব বুঝলেন বাচ্চাটা কে। এই অবস্থায় নাজিম সাহেব কি করবেন বুঝতে পারছেন না। তার মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত সুখেরা তার ঘরে চাঁদের হাট বসিয়েছে। দ্রুত গিয়ে নতুন একটি তোয়ালেতে পেঁচানো বাচ্চাটা কোলে তুলে নিলেন।
-মা দেখুন আমার মেয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে। তারপর অনেক্ষণ আর কোন কথা বলতে পারেননি। চোখ দিয়ে অঝরে পানি ঝরছিল। নাজিম সাহেব যখন লক্ষ্য করলেন তিনি কেঁদে ফেলেছেন তিনি খুব অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন।
-বাবা আমাদের বকশিশ দাও।
-কত টাকা দেব বল।
-ছেলে হলে ৫শ টাকা নিতাম মেয়ে তো ২শ টাকা দিলেই হবে।
আয়ার এই ৩শ টাকা ডিসকাউন্ট নাজিম সাহেবকে কষ্ট দিল। তার মনে হলো-মেয়ে মানেই করুনা, কোঠা, নিরাপত্তাহীনতা, যৌতুক এইসব নিয়ে তাকে বেড়ে উঠতে হবে। তারপরও তার আনন্দ প্রকাশে কোন ঘাটতি হয়নি।
-এই নিন ৫শ টাকায় দিয়ে দিলাম।
-না বাবা মেয়ের জন্য অত দিতে হবে না।
নাজিম তার মেয়ে নিয়ে যেখানটিতে বসে ছিলেন তার পাশেই আর-একটি ছেলে শিশু নিয়ে একজন মহিলা বসে ছিলেন। তারা হয়তো নাতি-নানির সম্পর্কের হবে।
-কই ছেলের বাবা কই।
চুপ চাপ বসে থাকা এক কোণে ছেলের বাবা বসে ছিলেন। তাকে দেখিয়ে একজন বল্লেন। ঐ যে, ওখানে বসে আছে।
-কৈগো দাও বকশিশ দাও।
-কত দিতে হবে?
-৫শ টাকা।
-ওনার কাছ থেকে তো ২শ টাকা নিলেন।
-ওনার তো মেয়ে, তোমার তো ছেলে। লোকে বলে না সোনার আংটি বাঁকাও ভালো। ৫শ টাকার কম দিলে হবেনা।

নাজিম সাহেব ভাবছিলেন, আয়াটি তার উদাহরণ দিয়ে বলবে মেয়ের বাবা হয়ে উনি ৫শ দিতে চাচ্ছে, তুমি ছেলের বাবা হয়ে…………….।
কিন্তু আয়াটি তা বলল না।
-৩শ টাকার এক টাকাও বেশী দিতে পারব না। নিলে নাও না নিলে নিওনা। যত্তসব-ধান্দাবাজী।
তাদের কথপোকথন শুনে নাজিম সাহেবের খুব মন খারাপ হলো। কিন্তু বাবা হওয়ার আনন্দে নাজিম সাহেবর কোন দুঃখই স্পর্শ করতে পারছেনা। আনন্দের অশ্রু এখনও নাজিম সাহেবের চোখে লেগে আছে।

-বাবা দাও। তোমার মেয়েকে আমার কাছে দাও। তুমি আমার মেয়ের খোঁজ নিয়ে আস। শুধু তোমার মেয়ের খোঁজ নিলেই হবে। আমার মেয়ের খোঁজ নিতে হবে না। তোমার মেয়ে পেয়ে কি আমার মেয়েকে ভুলে যাবা? কথা শেষ করে নাজিম সাহেবের শাশুড়ী নানু ভাই নানু ভাই করে তার নাতনি কে কোলে তুলে আদর করতে লাগলেন।

নাজিম সাহেবের স্ত্রী খাটটির অন্য পাশে বসে কাঁদতে কাঁদতে শুয়ে পড়েছে। ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা নাজিম সাহেব ঠিক বুঝতে পারছেন না। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে নাজিম সাহেব তার স্ত্রীকে যে ভাবে চেনেন তাতে ঘুমিয়ে পড়েছে নাজিম সাহেবের কাছে তা মনে হচ্ছে না। নাজিম সাহেব দুঃখে ও দুশ্চিন্তায় ঘুমিয়ে পড়লেও তার স্ত্রী কখনও তা করেন না। একবার মনে আছে-তাদের মেয়ের বয়স যখন পাঁচ বছরের মত, তখন দিনে তাদের মেয়ের প্রচন্ড জ্বর আসে, ডাক্তারে পরমার্শে ঔষধ খাওয়ানো এবং তার স্ত্রী বারবার ভেজা কাপড় দিয়ে মেয়ের শরীর মুছিয়ে দেওয়ার ফলে সন্ধ্যা নাগাদ প্রায় জ্বর সেরে গিয়েছিল। সেই গিবাগত রাত্রির প্রথম প্রহরে নাজিম সাহেব ঘুমিয়ে পড়লেও তার স্ত্রী ঘুমাননি। রাত ২ টার দিকে উঠে দেখেন তার স্ত্রীর তার মেয়ের পাশে বসে আছেন।

-কি ব্যাপার তুমি ঘুমাওনি?
-তুমি ঘুমিয়ে পড়, কথা বলনা। মেয়ের ঘুম ভেঙ্গে যাবে।
-মেয়েরতো জ্বর সেরে গেছে। মেয়ে গায়ে হাত দিয়ে নাজিম সাহেব বললেন।
-বলছি আস্তে কথা বল। মেয়ের ঘুম ভেঙ্গে যাবে।
-আচ্ছা এক কাজ কর আমি তো অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছি। তুমি এখন ঘুমাও আমি মেয়ের পাশে বসে থাকছি।
-তুমি কালকে অফিস করবেনা। তোমার রাত জাগতে হবে না। ঘুমিয়ে পড়।
-মেয়েতো এখন ভাল আছে, তুমিও ঘুমাও না।
-ঐ দেখ তোমার চেঁচামেচিতে মেয়ে নড়ছে, দেখেছো?
নাজিম সাহেব লক্ষ্য করলেন তার মেয়ে সত্যিই নড়াচড়া করে উঠল। তাই আর কথা বাড়ালেন না। নাজিম সাহেব শুয়ে পড়লেন।
নাজিম সাহেব মনে মনে ইতিহাস চারণ করলেন এবং অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝলেন তার স্ত্রী ঘুমাননি শুয়ে পড়েছে মাত্র।

নাজিম সাহেব এইবার হুহু শব্দ করে কেঁদে উঠলেন।
-আমার কথা না হয় নাইবা ভাবলি, তোর মা’র কথাতো ভাবতে পারতিস। কি করে তুই এমন কাজ করলি মা। কি করে করলি মা। নাজিম সাহেব আপন মনে বলে উঠলেন।

নাজিম সাহেব ভাবলেন তার কান্না শুনে হয়তো তার স্ত্রী কিছু বলবেন কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার তার স্ত্রী’র কোন শব্দ করলেন না। ভাবলেন, সত্যিই হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমাচ্ছে ঘুমাক। উঠলেই সমস্যা।

নাজিম সাহেবের মনে আছে তার মেয়ের বয়স তখন হয়তো দেড় বছরের মত হবে। তখন তার স্ত্রী অফিস করা কালীন সময় তাকে ফোন করেছিলেন।
-নাজিম সাহেব আপনার ফোন এসেছে। নাজিম সাহেবের সিনিয়র কলিগ বললেন।
-কে ফোন করেছে?
-মহিলা কন্ঠ, কে আমি জিজ্ঞেস করিনি।
-আমার তো ফোন করার মত কেউ নেই, আর তাছাড়া মহিলা তো নেইই। কে ফোন করতে পার। মনে মনে বলতে বলতে নিজের চেয়ার থেকে উঠে ফোনের কাছে গেলেন।
-হ্যাঁলো, কে বলছেন?
-আমি লাবণ্য বলছি। অপর প্রান্ত থেকে।
-লাব্যন্য কোন লাবণ্য?
-আমি প্রমির মা বলছি।
-কি ব্যাপার তুমি কি মনে করে? মেয়ের শরীর খারাপ নাকি? কি হয়েছে? তুমি কোত্থেকে ফোন করছ?
-না, মেয়ে সুস্থ্য আছে। আর ফোন দিচ্ছি ফোনের দোকান থেকে।
-মেয়ে ভাল আছে, তাহলে ফোন দিলে কেন?
-শুনলে তোমার খুব খারাপ লাগবে।
-কি হয়েছে বলবে তো।
-শুনলে তোমার মেয়ের উপর তোমার খুব রাগ হবে।
-মেয়ের উপর রাগ করার মত ক্ষমতা কি এখনও আমার হয়েছে? হয়নি। অতএব, তুমি বল। ও যাই করুক ওর উপর আমার রাগ হবেনা।
-শোন তোমার মেয়ে তোমার শখের রেডিওটা জ্বলন্ত চুলার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
-আমার রেডিওটা চুলার মধ্যে ফেলে দিয়েছে?…………..।
-হ্যাঁ। তোমার শুনে খুব খারাপ লাগছে তাই নাগো?
নাজিম সাহেব হো হো করে হেসে উঠলেন। হাসতে হাসতে নাজিম সাহেবের চোখে পানি চলে আসল।
-তোমার অত শখের রেডিওটা পুড়িয়ে ফেল্ল আর তুমি হাসছ। তুমি ওটা ছয় মাস ধরে টাকা জমিয়ে জমিয়ে কষ্ট করে কিনেছিলে। তোমার মনে আছে?
-তা আর থাকবে না।
-তাহলে হাসছ কেন?
-শোন রেডিওটা না হয় আবার ছয় মাস ধরে টাকা জমিয়ে কিনব। কিন্তু তোমার মেয়ের দুষ্টুমিটা কি ছয় মাস ধরে অপেক্ষা করে দেখতে পাব? ঐ রেডিওটা না থাকলে কি ওর এই দুষ্টুমির ব্যাপারটা জানতে পারতাম?
লাবণ্যও হাসতে লাগল।
-তাহলে রাখি
-আচ্ছা রাখ।

নাজিম সাহেব আবার কাঁদতে লাগলেন। এই মেয়ে আমাদের এত দুঃখ দেবে ভাবতেও পারিনি। মসজিদ থেকে এশার আযান ভেসে আসছে। নাজিম সাহেব প্রায় ত্রিশ বছর যাবৎ ঈদের নামাজ ছাড়া নামাজ পড়েননি। আজ তার খুব নামাজ পড়তে ইচ্ছা করছে।

-মসজিদে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলবে হে আল্লাহ তুমি কেন আমাদের এত দুঃখ দিলে? ৫৫ বছর বয়স হলো চাকুরী করতে গিয়ে তেমন কোন অন্যায় করিনি, সব সময় দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করার চেষ্টা করেছি। খুব কমই অন্যায় করেছি। তাই হয়তো কখনও দুঃখ পাইনি। তাহলে আজ কেন?

-কিন্তু এতদিন পরে নামাজ পড়তে গেলেও লোকে সন্দেহ করতে পারে। জিজ্ঞেস করতে পারে কি হয়েছে? এতদিন পর নামাজ পড়তে আসছ? তখন তিনি কি জবাব দেবেন?

ড্রেসিং টেবিলের উপর পড়ে থাকা নতুন কেন পার্সের দিকে তার চোখ পড়ল। নতুন এবং পুরাতন পার্স দুইটি নিয়ে পুরাতন পার্সের কাগজ-পত্রগুলো ও টাকাগুলো নতুন পার্সে ভরতে শুরু করলেন। পার্সের ভেতরের পকেটে থাকা একটি চিঠি। চিঠিটা অনেক দিন আগের লেখা। চিঠিটার ভাজে ভাজে প্রায় ছিড়ে গেছে। নাজিম সাহেব চিঠিটা হাতে নিয়ে চমকে উঠলেন। চিঠিটার ভাজ খুলতে খুলতে তার চোখের ফোটা ফোটা পানি চিঠির উপর পড়ল। সেই পানি, পরণে থাকা কাপড়ে মুছে নিলেন। আজ থেকে প্রায় ৮ বছর আগে লেখা চিঠি। তিনি যত্ন করে চিঠিটা পার্সে রেখে দিয়েছেন। চিঠিটা তার হাতে পিয়ন যেদিন দিয়ে যায় তারপর অনেকগুলো পার্স তিনি পরিবর্তন করেছেন এবং এক পার্স থেকে অন্য পার্সে চিঠিটা যত্ন করে স্থানান্তর করে রেখেছেন। কখনও চিঠিটার তিল পরিমাণ ক্ষতি হোক তিনি তা চাননি। সযত্নে চিঠি টার ভাজ খুললেন এবং পড়তে লাগলেন।

বাবা, আমি জানি তুমি ভাল নেই। আমি জানি আমি ছাড়া তুমি ভাল থাকতে পারনা। তুমি আমাকে খুব মিস করছ। আমিও তোমাকে খুব মিস করছি। আমি আর মা দাদি বাড়ী চলে আসলাম তোমাকে রান্না করে খেতে হচ্ছে এই জন্য তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা। তুমি চিন্তা করোনা বাবা আমরা সপ্তাহ খানেক পরেই বাসায় চলে আসছি। আর আমাকে মিস করতে হবেনা। আমি জানি বা তুমি আমাকে খুব মিস করছো।

মেয়ের লেখা সেদিনের সেই চিঠি নাজিম সাহেবের হাতে পৌঁছানোর আগেই মেয়ে বাসায় পৌঁছে গিয়েছিল। পোস্ট অফিসগুলোর করুণ দশা নিয়ে মেয়ে আর বাবার মধ্যে অনেক আলোচনা হয়েছিল। এখনও সেই স্মৃতি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। এখন আর মেয়ে কোথাও গেলে বাবাকে ঘন ঘন ফোন দেয়, নয়তে মেইল দেয় নয়তো এসএমএস দেয়। এখন আর মেয়ে-বাবার মধ্যে চিঠি লেখার প্রয়োজন হয়না।তাই হয়তো মেয়ের লেখা সেই চিঠি আজও নাজিম সাহেব সযত্নে রেখে দিয়েছেন।

হ্যাঁ মা আমি তোকে খুব মিস করছি মা, তোকে খুব মিস করছি। তুই এ কি করলি মা? তুইতো আমাকে সব খুলে বলতে পারতিস। আমি তোর সবকিছু মেনে নিতাম। সেই দিনের সেই চিঠি আর আজকের লেখা মেয়ের চিঠি দু’টোতেই নাজিম সাহেবকে কাঁদাচ্ছে একটা ভাল লাগায়, আর একটা…..।

কম্পিউটারের টাইপ করা আজকের লেখা চিঠিটা নাজিম সাহেব আবার হাতে নিয়ে পড়তে লাগলেন-
মা ও বাবা আমি জানি আজ আমি যা করতে যাচ্ছি তা কোন ভাবেই ক্ষমা করার যোগ্য বিষয় নয়। আমি যা করতে যাচ্ছি এটা খুবই অন্যায়। আমি জানি আমি যা করতে যাচ্ছি তোমাকে বললে তুমি হয়তো মেনে নিতে কিন্তু সেটা কখনই মন থেকে মেনে নিতে না। আমার প্রতি তোমার যে ভালবাসা সেই ভালবাসার চাপেই হয়তো তুমি সেটা মেনে নিতে। কিন্তু তোমাদের দেওয়া শিক্ষার কারণেই আমি আজ তোমাদের সামনে দাঁড়াতে পারলাম না। আমি এও জানি আমার এই ঘটনা জানা-জানি হয়ে গেলে সামাজিক ভাবে তোমাদের খুব মর্যাদাহানী ঘটবে। এত বছর ধরে গড়ে তোলা সামাজিক অবস্থান আমার একটা ঘটনায় সেটা ধুলোয় মিশিয়ে দেবে। আমি জ্ঞান পাপির মত সবকিছু জেনেও কেন এই পাপ করছি আমি নিজেই সেটা জানিনা। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি। কেন পারছিনা জানিনা। তোমরা আমাকে যত ভালবাসা দিয়ে বড় করেছো তার চেয়ে পৃথিবীতে আর কোন ভালবাসা বড় হতে পারেনা কিন্তু আমি কোন ভালবাসার টানে তোমাদেরই মহান ভালবাসা উপেক্ষা করছি তাও আমি বলতে পারব না। আমি যে অন্যায় তোমাদের সাথে করছি তার কোন ক্ষমা হয়না। আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইছিনা কিন্তু আমি জানি তোমরা আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবেনা তাই আমাকে এবং আমার ভালবাসা হয়তো বরণ করে নিবে। ইতি তোমাদের আত্বজা।

চিঠি পড়তে পড়তে নাজিম সাহেবের চোখের পানি আবার টপ টপ করে পড়তে লাগল। নাজিম সাহেব লক্ষ্য করলেন তার স্ত্রী লাবণ্য এখনও ঘুমিয়ে আছে। নাজিম সাহেবের কাছে যেটা অবিশ্ব্যাস্য মনে হলো।
-লাবণ্য, লাবণ্য, শুনতে পাচ্ছ?
নাজিম সাহেবের স্ত্রী কোন সাড়া শব্দ করল না। নাজিম সাহেব ভয় পেয়ে গেলেন। দ্রুত কাছে গিয়ে গায়ে হাত দিয়ে ডাকতে শুরু করলেন।

-শুনতে পাচ্ছ। তিনি লক্ষ্য করে দেখলেন তার স্ত্রী অজ্ঞান হয়ে গেছে। তিনি ভেবে পাচ্ছেন না কি করবেন। কাউকে ডাকবে কিনা বুঝতে পারছে না। ডাকলে সব জানা-জানি হয়ে যাবে। আবার ভাবছেন ঘটনা যা ঘটেছে তা কোন ভাবেই লুকানো সম্ভব হবেনা। জানা-জানি হবেই। জানা-জানি হবেই যখন তখন বাড়ীর সকলকে বলে দেওয়ায় ভাল।
-মা, মা শুনতে পাচ্ছ, নাজিম সাহেব তার বৃদ্ধা মাকে ডাকতে শুরু করলেন।
-তুই তোর কোন মাকে ডাকছিস? আমাকে না তোর ছোট মাকে? এই পরিস্থিতে এই কথা শুনতে নাজিম সাহেবে মোটেই ভাল লাগল না।
-মা, তুমি এদিক এসো, দেখ তোমার বাউমা…..
-মার কি হয়েছে? বাবা মার কি হয়েছে?
নাজিম সাহেব রীতিমত হতভম্ব হয়ে গেলেন, নিজের চোখকে এই মুহূর্তে তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। কিছুক্ষণ আগে মেয়ের লেখা যে চিঠিটা পড়ল সেটা কি সত্যি? না এখন যা দেখছেন সেটা কি সত্যি? এই ঘর বাড়ী, স্ত্রী, মা এটা কি সতি? তিনিই কিছুই বুঝতে পারছেন না।

-তুই, লাবণ্য তুই, নাজিম সাহেব মেয়েকে সব সময় মা বলে ডাকেন। সর্বশেষ কবে তার মেয়েকে নাম ধরে ডেকেছেন নাজিম সাহেবের মনে পড়ছে না। আজ তার নাম ধরে ডাকছে।
-হ্যাঁ বাবা, আমি ফিরে এসেছি। আমি তোমাদের সাথে অত বড় অন্যায় করতে পারিনি বাবা। নাজিম সাহেব মেয়েকে সজোরে একটা চড় কষে দিলেন তার মেয়ে গালে। কাঁদতে কাঁদতে বললেন
-এ তুই কি করছিলি মা? তোর জন্য তোর মা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।
-মা, মা, বলে প্রমি তার মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে আর বলছে তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও মা। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। মেয়ের কান্নার শব্দে নাজিম সাহেবের স্ত্রী জ্ঞান ফিরে পেলেন।

-লাবণ্যও প্রমিকে দেখে কাঁদতে কাঁদতে পর পর কয়েকটা চড় মারলেন আর বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে লাগলেন। আজ বাবা ও মায়ের থাপ্পড় হজম করার মাধ্যমে মা ও বাবার ভালবাসা যে ভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে তা আর কোনদিন প্রমি পারেনি।

-মা আমি তোমাদের সাথে কোন অন্যায় করিনি মা, তোমাদের দেওয়া ভালবাসার সাথে আমি বিশ্বাস ঘাতকতা করতে পারিনি মা।
-তোরা এসব কি বলছিস? নাজিম সাহেবের বৃদ্ধা মা জিজ্ঞেস করলেন।

সবাই চুপ-চাপ রইল। নাজিম সাহেবের মায়ের কোন প্রশ্নের কেউ কোন উত্তর করলেন না। সকলেই নিরব রইলেন।
সকলের এই নিরবতার মধ্যে প্রমির করতে যাওয়ার বড় একটা ভুলের মর্যাদাহানীর শঙ্কাটা বাবা-মা’র ভালাবাসার চাপে চাপা পড়ে রইল।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত