জনক

জনক

তাড়াহুড়া করে খেতে যেয়ে বিষম খেলাম।সাথে সাথেই রিয়া ওর ছোট্ট হাতটা দিয়ে আমার মাথায় বাড়ি দিতে লাগল।আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। বাবা পানির গ্লাস টা এগিয়ে দিতেই আমি ঢকঢক করে পুরো গ্লাসের পানিটা শেষ করে ফেললাম।রিয়া তখন আমার দিকে চোখ মোটা করে ড্যাপড্যাপ করে তাকিয়ে আছে। আর হাত নেড়ে নেড়ে বলছে

তোমাকে কত করে বলেছি খাওয়ার সময় দুষ্টুমি করবেনা।দেখলেত কি হল?
আমি আর বাবা মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম।রিয়া সবকিছু নকল করে।বিশেষ করে আমার সব কথা ও আমাকেই ফিরিয়ে দেয়।

বাবা রিয়ার গালে আলতো করে আদর করে বলল
নানুমনি ত ঠিকই বলেছেরে দিয়া।খাওয়ার সময় এত তাড়াহুড়া করিস কেন?
বাবা আজ অফিসে অনেক কাজ।দেরি হলে বিপদে পড়ব।
তুমি কি কাজ কর মামনি?
তোমাকে একদিন অফিসে নিয়ে যাব মা।তখন দেখ।

রিয়ার মুখটা খুশিতে ভরে উঠল।আমি জানি আমাকে ছাড়া ওর সারাটা দিন খুব খারাপ কাটে।তবুও মেয়েটা যাওয়ার সময় হাসিমুখে আমাকে বিদায় জানায়।ওর হাসিমুখটায় আমাকে সারাদিন কাজের উৎসাহ দেয়।

অফিসে এসে একবার কাজের মধ্যে ডুবে গেলে আমি সবকিছু ভুলে যাই।আর কারো সাথে আড্ডা দেয়াও আমার খুব একটা পছন্দ না।প্রথম প্রথম অনেকেই এসেছিল গায়ে পরে আলাপ জমাতে।কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তারা বুঝতে পেরেছে আমি সেই ধাচের না।

নিজের মত কাজ করছিলাম।হঠাত কারও কথায় আমার মনোযোগ নষ্ট হল।আমি প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে তাকাতেই দেখি একজন অচেনা লোক।যতটা সম্ভব নিজেকে সম্বোরন করে বললাম কিছু বলবেন?

আমি আবির। এই অফিসে আজই জয়েন করেছি। বলেই সে হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল।
লোকটার চেহারায় কি যেন একটা ছিল।আমিও কোন কিছু না ভেবে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিলাম।
আবির ভিষন হাসিখুশি একটা ছেলে।যে সব সময় চায় তার চারপাশের মানুষগুলো ও হাসিখুশি থাকুক।আর তাই ওর পাশে থাকলে চুপচাপ থাকা যায়না।না হলে আমার মত মেয়েকে ও এই কয়দিনেই আড্ডাবাজ বানিয়ে ফেলেছে।ইদানিং আমি কাজের বাইরেও সবার সাথে সময় কাটাই।এতদিন আমি ইচ্ছা করেই নিজের চারপাশে একটা অদৃশ্য দেয়াল তুলে রেখেছিলাম।তাই হয়ত অফিসটাকে শুধু কাজের জায়গাই মনে হয়েছে।

খুব অল্পদিনেই আবিরের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল।আবির এখন অফিসের প্রাণ।ও না থাকলে যেন কারোরই কাজে মন বসেনা।এখনো পর্যন্ত আবির আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে জানতে চাইনি।তাই আমিও আগ বাড়িয়ে কিছু বলিনা।

ছুটির দিনটা আমি বাড়ির সবার সাথে সময় কাটাই।পারত পক্ষে এই দিনে আমি বাইরে বের হইনা।কিন্তু আজ আবির ফোন করে কফি সপে ডাকল।প্রথমে ভেবেছিলাম না করব।কিন্তু পরে মনে হল আমার যাওয়া উচিৎ।
কফিসপে পৌছে দেখি আবির আমার আগেই এসেছে।এই ছেলের সময় জ্ঞান খুব বেশি।আমি বসতেই বলল
রিয়াকে নিয়ে এলেই পারতে।
আমি ভিষন অবাক হলাম।
তুমি রিয়ার কথা জান?

হ্যা তোমাকে না জানিয়ে একদিন ওকে দেখে এসেছি।আমার মনে হল আবিরের আমার প্রতি কৌতুহল প্রয়োজনের চাইতে বেশিই।ওর কৌতুহল না মেটালে পরে আমিই বিপদে পড়ব।

আবির আমার দিকে তাকিয়ে আছে।আমিও দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকলাম।
বাবা মায়ের পছন্দে আমার আর সোয়েবের বিয়ে হয়।বিয়ের পর আমরা খুব ভাল ছিলাম।সোয়েবের সাথে আমার বোঝাপড়া ভাল ছিল।আমাদের দেখে সবাই খুব ঈর্ষা করত।বিয়ের তিন বছরের মাথায় আমি কনসিভ করি।সন্তানের আগমন বার্তা শুনে সোয়েব একদম বদলে যায়।আগের চাইতেও বেশি করে আমাকে সময় দিতে থাকে।আমার মনে হত খুব ভাগ্য না করলে এমন হাসবেন্ড পাওয়া যায়না।

কিন্তু ভাগ্য আমার সহায় ছিলনা।হটাৎ একটা খবরে আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল।সোয়েবের ক্যান্সার ধরা পরে।তাও লাস্ট স্টেজ।ওকে চিকিৎসার জন্যে সবখানে নেয়া হল।কিন্তু কিছুই করা যায়নি।আমি একটা দিনও ওকে ছাড়া থাকিনি।আমার সাথে বাবা মাও সবখানে গেছে।রিয়ার জন্মের একমাস পর সোয়েব মারা যায়।

এরপর থেকেই আমি বাবা মায়ের সাথে আছি।চাকরি করছি।কিন্তু বন্ধু বান্ধবী কারো সাথে যোগাযোগ রাখিনি।আমার জীবনে সোয়েব ছাড়া আর কেউ নেই।ও ছাড়া আমার কোন ভাললাগার অনুভুতিও নেই।তাই আমি বৃষ্টিতে ভিজিনা।জ্যোৎস্নায় ছাদে উঠিনা।কখনো কোন আনন্দের অনুষ্ঠানেও যাইনা।

আমার সব অনুভুতি জুড়ে ওই একজনই আছে।
ও যেখানেই থাকুক আমি সব সময় ওর উপস্থিতি বুঝতে পারি।
আমার কথাগুলো শুনে আবির কিছুক্ষন চুপ করে থাকল।তারপর বলতে থাকল,
দেখো দিয়া, তোমার জীবনে যেটা ঘটেছে সেটা একটা দূর্ঘটনা।আমি বুঝতে পারছি।কিন্তু তুমি এখন যেটা করছ সেটা কি ঠিক?যে চলে গেছে তার জন্যে কেন নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ?
দেখো আবির,জীবনটা আমার।তাই এই জীবনটা কিভাবে কাটাব সেটা একান্তই আমার ইচ্ছা।
তুমি কে আমাকে এত কথা বলার?
বন্ধু আছ,বন্ধু হয়েই থাক। ভুলেও এই দূরত্ব অতিক্রম করার চেষ্টা করনা।

কথাগুলো ভিষন জোর দিয়ে বললাম।খেয়াল করলাম আবিরের মুখটা বিবর্ণ হয়ে গেছে।এতটা কঠিন না হলেও হয়ত পারতাম। কিন্তু আমার কিছুই করার নেই।আজ না হোক কাল কথাগুলো ওকে বলতেই হত।

পরদিন অফিসে যেয়ে খুব অবাক হলাম।আবির ছুটি নিয়েছে।অথচ আজ অব্দি ওকে ছুটি নিতে দেখিনি।কেন জানি ওর জন্যে খুব খারাপ লাগছিল।কিন্তু ব্যাপারটাতে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে নিজের কাজ করতে লাগলাম।

পরদিন আবার অফিসে আবিরের আগমন।সব আগের মত।শুধু মনে হল আমাকে যেন একটু এড়িয়ে চলছে।অবশ্য সেটা আমার মনের ভুল ও হতে পারে।এরপর আবির আর কখনো আমাকে বাইরে দেখা করতে বলেনি।ছুটির দিন পুরোটা বিকেল ও আমাদের বাড়িতে কাটায়।মাঝে মাঝে রাতে খেয়ে যায়।এখন আমার চাইতে রিয়ার সাথেই ওর ভাব বেশি।বাবা মাও ওকে খুব পছন্দ করে।রিয়া এখন আর আমার সাথে খেলার জন্যে বাইনা করেনা।আবির ওকে মাঝে মাঝেই বাইরে ঘুরতে নিয়ে যায়।

আবিরের আমাকে এড়িয়ে চলাতে কেন জানি আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু আমার ত খুশি হওয়ার কথা।আমি ত এটাই চেয়েছিলাম।

রিয়াও দিন দিন আবিরের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।একদিন ওকে না দেখলে মেয়েটা ভিষন অস্থির হয়ে পড়ে।আমি এটা নিয়ে খুব দুঃশ্চিন্তাই আছি।আজ না হোক কাল আবির ওর নিজের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে।সেটাই ত স্বাভাবিক। কিন্তু তখন আমার মেয়েটার কি হবে?ওতো এতকিছু বোঝেনা।যে মেয়ে কোন দিনও বাবার আদর পাইনি।সে বাকি জীবন না পেলেও ক্ষতি ছিলনা।ওটাই ওর ভাগ্য।কিন্তু একবার কোন কিছু পেয়ে সেটা হারানোর যন্ত্রনা আমি বুঝি।আমি চাইনা আমার মেয়েটাও সেই একই কষ্ট পাক।

আবিরকে সরাসরি নিশেধ করাটা ঠিক হবেনা।তাই ঠিক করলাম আপাতত রিয়াকে কোন আবাসিক স্কুলে ভর্তি করে দেব।এর মধ্যে আমি অন্য কোথাও চাকরির চেষ্টা করব।এই অফিস ছেড়ে গেলে আবির আর এ বাড়িতে আসবেনা।তখন না হয় রিয়াকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনব।যদিও ততদিন রিয়াকে ছেড়ে থাকা খুব কষ্টের।ওই আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন।কিন্তু মেয়েটার ভবিষ্যতের জন্যে এটুকু ত আমাকে করতেই হবে।
বাবা মা আমার কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে কখনো কথা বলেনি।কিন্তু আজ কেন জানি আমার সিদ্ধান্ত টা মানতে পারছেননা।আমি যদিও এর বিকল্প কিছু ভাবতে পারছিনা।

চোখের পানি লুকিয়ে রিয়ার কাপর চোপর গুছাচ্ছিলাম।রিয়া মন খারাপ করে ওর নানা নানীর ঘরে বসে আছে।মেয়েটা আমাকে ছাড়া ঘুমাতে পারেনা।বারবার বলছিল তোমাকে না ছুলে আমি ঘুমাতে পারিনি মামনি ।তুমি প্রতিদিন ঘুমানোর সময় ওখানে যাবে তো?
মিথ্যে করে বলেছি যাব।
তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে দিয়া।
তাকিয়ে দেখি আবির। ওর কোলে রিয়া।
আমি জানি আবির রিয়াকে আটকানোর চেষ্টা করবে।
তোমার যা বলার অন্যদিন বল।আজ আমি একটু ব্যস্ত।
কিন্তু আমার যে আজই বলতে হবে।
আমার উত্তরের অপেক্ষা করলনা আবির।

জানো দিয়া,আমার ছোটবেলা কেটেছে এতিমখানায়।আমার বাবা মা কে আমি জানিনা।ছোট থেকে মানুষের খারাপ ব্যবহার দেখে বড় হয়েছি।কত রাত যে আমি নির্ঘুম কাটিয়েছি।আজকে আমাকে এখানে আসতে অনেক কাটখড় পোড়াতে হয়েছে।এখন আমার পাশে অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী। কিন্তু একসময় আমার পাশে কেউ ছিলনা।একা থাকার কষ্ট আমি বুঝি।আমি সব সময় চেয়েছি চারপাশের মানুষগুলোকে হাসিখুশি রাখতে।আমি জানি সবাই আমার সংগ উপভোগ করে।কিন্তু সত্যি কথা কি জানো?

কেউ আমার কষ্টের কথা কখনো জানতে চায়নি।সারাদিন অন্যকে হাসিয়ে রাতে আমি চোখের পানি ফেলেছি।চারপাশে এত মানুষ।কিন্তু একজন মানুষ ও নেই যে আমার কষ্ট বোঝে।
রিয়াকে দেখার পর থেকে আমার সবকিছু বদলে গেছে।ওই ছোট্ট মেয়েটা আমাকে ভালবাসার বাঁধনে বেঁধে ফেলেছে।আমি আমার সব সুখ ওর মাঝে খুঁজে পেয়েছি।
প্লিজ দিয়া, আমাদের দুজনকে আলাদা করে দিওনা।আমি দিয়াকে ছাড়া বাঁঁচবনা।
কথাগুলো বলতে বলতেই আবির হুহু করে কেঁদে ফেলল।

আমি বাকিটা জীবন শুধু রিয়ার বাবা হয়ে থাকতে চাই।বিশ্বাস কর এর বাইরে তোমার কাছে কিছুই চাওয়ার নেই।রিয়া শক্ত করে আবিরকে জরিয়ে আছে।যেন কোন ভাবেই আমি আবিরের থেকে ওকে আলাদা করতে না পারি। সোয়েব বেঁচে থাকলে ওর কাছ থেকে রিয়াকে আলাদা করতে গেলেও হয়ত একই অবস্থার সৃষ্টি হত।
আমার মনে হল আমি এক অচেনা আবিরকে দেখছি।ওর ভেতরে যে এতটা কষ্ট ছিল তা বুঝতেই পারিনি।এতদিন খুব নিখুঁত ভাবে ও নিজেকে আড়াল করেছিল।

আমি আর ঘরে দাড়িয়ে থাকতে পারছিলামনা।দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম।বাইরে হঠাৎ করে বৃষ্টি শুরু হল।

আমার খুব ভিজতে ইচ্ছা করছে।আজ নিজের সাথে বোঝাপড়া করার সময় হয়েছে।
২ বছর পর

৬ টা বাজতেই রিয়া অধৈর্য হয়ে যায়।তখন ওর বাবার ফেরার সময় হয়।আমি যতই বলি তোমার বাবা চলে আসবে।কিন্তু কে শোনে কার কথা?

৬:৪৫ বাজে।এখনো আবির আসেনি।এখন ত আমারও চিন্তা হচ্ছে।আবির কখনো দেরি করেনা।রিয়া মোবাইল নিয়ে বাবাকে কল দিল।কিন্তু ফোন বন্ধ।এবার রিয়া আরও বেশি অস্থির হয়ে গেল।
আমি জানি এবার ওকে সামলানো মুশকিল হয়ে যাবে।

মেয়েটার বাবা অন্ত প্রাণ।ওর বাবার কথা আর নাইবা বললাম।মেয়েকে নিয়ে তার কান্ডকারখানা দেখলে যে কেউ বিরক্ত হয়ে যাবে।বাবা মেয়ে একসাথে থাকলে আর কাউকে লাগেনা।

কলিংবেলের আওয়াজ হতেই রিয়া দৌড়ে গেল দরজা খুলতে।আমি দাড়িয়ে থাকলাম বাবা মেয়ের মান অভিমান দেখতে।

আবির ঘরে ঢুকল একগাদা বেলুন আর একটা কেক নিয়ে।আমার মেমোরি বরাবরই খুব ভাল বলেই জানতাম।কিন্তু এখন শত চেষ্টা করে ও আজকের দিনের বিশেষত্ব উদ্ধার করতে পারলাম না।অবশেষে নিরুপায় হয়ে আবিবের কাছে গেলাম।বাবা মেয়ে এখন বেলুন দিয়ে ঘর সাজানোই ব্যস্ত।একটু আগে মেয়ের অভিমানের কিছুই এখন আর অবশিষ্ট নেই।

ওদের পাশে দাড়িয়ে আছি মিনিট পাঁচেক হল।অথচ কারোরই কোন খেয়াল নেই।
আচ্ছা আবির আজ কি কোন বিশেষ দিন?
অবশ্যই আজ বিশেষ দিন।
কিন্তু আমার ত ঠিক মনে পড়ছেনা।আজ কি?

আমার মেয়ের সাথে কাটানো যেকোন দিনই বিশেষ দিন।বলেই আবির রিয়ার গালে আলতো করে আদর করল।রিয়া সাথে সাথে বাবাকে জরিয়ে পাল্টা আদর করল।আর বলতে থাকল আমার বাবা সেরা বাবা।

আবিরকে যত দেখি তত অবাক হই।ও বলেছিল রিয়ার বাবা হয়ে থাকবে।তাই আজ পর্যন্ত আমার স্বামী হওয়ার চেষ্টা করেনি।

কিন্তু আমার সন্তানের বাবাই যে আমার কাছের মানুষ সেটা ওকে ২ বছরেও বলা হয়নি।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত