অর্থহীন সম্পর্ক

অর্থহীন সম্পর্ক

তখন মধ্যদুপুর। প্রতিদিনই এসময় শিহাব তুলিদের পড়াতে আসে। তুলির সাথে ফিমা আর নিপা পড়ে। শিহাব যাদের পড়ায় তাদের মাঝে ছাত্রীর সংখ্যাই বেশি। বার জনের মাঝে একজন ছাত্র কেবল। শিহাব ছাত্রীদের উপর মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে যায়, এত কথা বলে কখনও তাই শিহাব খুব রেগে উঠে। শিহাব মাঝে মাঝে বুঝতে পারেনা সে পড়াতে আসে নাকি গল্প শুনতে আসে। তবে শিহাব কারও গায়েই হাত তুলে না। শিহাবের ছাত্রীরা ভালো করেই জানে শিহাব কখনও তাদের বেত দিয়ে আঘাত করবে না। তাদের কাছে শিহাব খুব নরম মনের দয়ালু একটা মানুষ। তাই কখনও কখনও ছাত্রীরা তার কাছে রুলার এগিয়ে দেয় তাদের মারার জন্য এমনকি হাত পেতে রাখে কিন্তু শিহাব তো শিহাবই যেন তার গায়ে শক্তিই নেই, অতি আস্তে করে একটা আঘাত করে যা তাদের হাতে সুরসুরই সৃষ্টি করতে ব্যর্থ। তবে শিহাব তার ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে এক ভিন্ন ধরনের স্বাদ পায় যা তাকে হাসায়, আনন্দ দেয় আর মনের দুঃখকে ভুলে থাকতে সাহায্য করে।

শিহাবের ছাত্রীরা বসে আছে শিহাবের অপেক্ষায়। ঠিক তখনই কলিং বেলের শব্দ। তুলি দরজা খুলতেই দেখে শিহাব এসেছে। শিহাব পড়ানো শুরু করছে তখন দেখলো ফিমা পড়াশোনার দিকে কোন খেয়াল না দিয়ে কি যেন আঁকছে।
-এই ফিমা কি আঁকছো পড়া বাদ দিয়ে?
-ভাইয়া একটু একটু
-রাখ রাখ। আমি কিন্তু নিয়ে নিব এটা
-প্লিজ ভাইয়া একটু বাকি আছে
শিহাব কিছুক্ষণ সময় দিলো ফিমাকে। ফিমার আঁকা শেষ হলে শিহাবকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করছে কেমন হয়েছে তখন শিহাব ছবি হাতে নিয়ে দেখছে। আর মনে হলো এটা একটা বার্বি ডলের ছবি। ঠিক এরকমই একটা বার্বি ডলের প্রোফাইল ছবি যুক্ত আইডি শিহাবের ফেসবুক বান্ধবী। দুঃখের বিষয় হলো ঐ আইডির মেয়েটার সাথে শিহাব অনেক ভালো সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তার ছবি দেখেনি, এমনকি তাকে বাস্তবেও কোন দিন দেখছে বলে মনে হচ্ছে না। শিহাবের এরকম বার্বি ডলের ছবিতে ডুবে যাওয়া দেখে ছাত্রীরা অবাক হয়ে গেল। অনেকক্ষণ পর কি ভেবে যেন অল্প কিছু পড়িয়ে তাদের ছুটি দিয়ে দিল শিহাব।

-এই যে শিহাব কেমন আছো?
-হুম, ভালোই তুমি?
-হুম ভালো। তো সীমান্ত কেমন আছে?
-জানিনা ও কেমন আছে।
-কেন?
-এমনই
-এক সাথেই তো থাকো তো জানো না কেন?
-সীমান্তের মনের খবর কি আমি জানি?
-না, জানবে কি করে!
-সেটাই
-তাহলে বাসায় যেয়ে সীমান্তকে বলো যে আমি ওর সাথে আর কথা বলবো না।
-কেন? কিছু হইছে?
-কি আর হবে। ও ব্যস্ত মানুষ, আমার সাথে কথা বলার সময় কোথায় ওর বলো। দেখা হলেও এড়িয়ে চলে।
-হুমম….খুবই খারাপ ছেলে ও তাহলে একটা। তোমার মতো একটা কিউট মেয়েকে কি করে এড়িয়ে চলে ও।
-থাক হইছে আর তেল মারতে হবে না
-তো কোথায় যাচ্ছিলে শ্রাবণী এখন
-কোথাও না…একটু হাঁটছিলাম।
-বেশ হাঁটতে থাকো একটু চর্বি কমবে তোমার, দিনে দিনে যে মুটকী হচ্ছো
-তো তুমি হাঁটছো কেন? চিকনু মিঞা
-হুম, বাসায় চলে যাচ্ছি
-যাও
-রাগ করোনা, মজা করছি
-যাও যাও….হইছে

শিহাব চলে গেল বাসায়। বাসায় যেয়ে খেয়ে আরেকটি ব্যাচ পড়িয়ে একটু ফেসবুকে আসলো। অনলাইনে হৃদিতা মানে সেই বার্বি ডলের প্রোফাইল ছবিযুক্ত মেয়েটিকে দেখেই নক করলো।

-ঐ
-হুম
-কোথায়?
-বাসে
-কেন?
-বাসায় যাচ্ছি এখন
-এতো দেরী কেন?
-তাতে তোমার কি? আমি তোমার মতো এখনও ছোট না, ভয় পাইনা বুঝছো।
-জী বুঝছি, তবে আমি ছোট নেই এখন আর।
-ইহহহহহহ….ছোট না, এখনও কাঁদে একটু কষ্ট পেলে।
-কাঁদি না আমি।
-ঐদিনই তো কাঁদলে
-এমনই বলছি কাঁদিনি কখনও
-তো খবর কি? হতাশায় ভুগছো এখন আর।
-তেমন না
-হুম, যেভাবে বলছি সেভাবে চলবে।
-হুম
-তুমি তো একটা ছেলে তাইনা। তোমার একটা ব্যক্তিত্ব আছে। তোমার আলাদা একটা দামও আছে।
-হুম, বুঝছি
-এখন থেকে দাম দেখিয়ে চলবে, আলাদা মুডে চলবে। সবাইকে যে পাত্তা দিতে হবে এরকম না। সবাইকে লাই দেওয়াতেই তো ঐ মেয়ে তোমার সাথে এতো ভাব মারে বুঝছো।
-হুম বুঝছি।
-এখন বাস থেকে নামবো, রাতে কথা হবে। ওকে
-সাবধানে নেম। আবার ঐদিনের মতো ব্যথা পেও না।

হৃদিতা আর মেসেজটি দেখেনি, এর আগেই অফলাইনে চলে গেছে। হৃদিতা অন্য আট-দশটা মেয়ের মতো না। কেমন অদ্ভুত তবে খুব নির্ভরশীল। নিঃস্বার্থভাবে নিজেকে বিলিয়ে দেয় অন্য মানুষের উপকার করার জন্য। তবে ও যখন রেগে যায় তখন রাগ সামলাতে পারে না। রেগে সব শেষ করে দিয়ে চলে যায়। শিহাবকে কখনও কিছু করতে বললে সেটা তখনই না করলে খুব রেগে যায়। এমন অনেক বারই সে রেগে শিহাবকে ব্লক করে দিতো। অনেক দিন পর শিহাবের অন্য কোন একাউন্ট দিয়ে রিকুয়েস্ট করার পর আনব্লক করতো আবার তখন আগের মতো কথা বলতো।

রাতে শিহাব ফেসবুকে শ্রাবণীর সাথে চ্যাট করছিলো তখনই দেখলো হৃদিতা মেসেজ করছে।

-আমি কি তোমার মতো যে বারবার ভুল করবো!
-হুম, তুমি আমার গুরু ভুল করবে কেন।
-তাহলে ভক্তি রেখে কথা বলবে এখন থেকে।
-ওকে মেম
-আজ পর্যন্ত কোন মেয়েকে পটাতে পারলা?
-না, ও কাজ আমাকে দিয়ে হবে না। আমার আর কারও সাথে সম্পর্ক গড়তে হবে না। তুমি আছ না?
-কি আমি আছি? আমি কয়দিন তোমাকে সময় দিবো আর। আমার ট্রেনিং শেষ।
-এ জন্য তুমি ইদানিং আমাকে এড়িয়ে চলছো তাই না?
-আমি তোমাকে এড়িয়ে চলি বললে কেন? তুমি কি জান? আমি তোমাকে যতটা সময় ফেসবুকে দেই কোন মেয়ে বন্ধুকেও ততটা দেই না। যাও আর কথা বলনা তো। মাথা গরম হয়ে গেছে।
-তুমি তো ওর মতোই বললা, কথা না বলতে!
-তুমি আমাকে ওর সাথে তুলনা করলা!

এরপর শিহাব আর রিপ্লাই দিতে পারলোনা, তার আগেই ব্লক। শিহাবের সেই পুরোনো স্বভাব আবার দেখা দিলো। খুব অস্থির হয়ে গেল। জানেনা হৃদিতার জন্য ওর এরকম লাগছে কেন? হৃদিতা শিহাবের দুইটা একাউন্টই ব্লক করে দিছে ওর দুইটা একাউন্ট থেকে। এভাবে কিছুদিন কেটে যাওয়ার পর শিহাব অন্য একটা ফেক একাউন্ট থেকে হৃদিতার সাথে কথা বলতো, এক পর্যায়ে হৃদিতা বুঝতে পারলো এটাই শিহাব। এরপর মাঝে মাঝে কথা হতো হৃদিতার সাথে শিহাবের। কদিন পর হৃদিতা শিহাবের আসল একাউন্ট আনব্লক করছে কিন্তু শিহাবের ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট একসেপ্ট করেই না। শিহাব তাই একদিন হৃদিতাকেই খুব রাগ করে ব্লক করে বসলো। এরপর অবশ্য আবার আনব্লক করছে কিন্তু হৃদিতা এরপর থেকে আর শিহাবের কোন কথার উত্তর আর দেয়নি। হয়তো দুইজনই জ্বলছে একটা অভিমানে যা তাদের মনের অজান্তেই ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে।

একদিন শিহাব হাঁটছিলো বাহিরে তখন শ্রাবণীর সাথে দেখা।

-কি খবর?
-এইতো?
-সীমান্ত কেমন আছে?
-দুষ্টামি করো নাতো ভালো লাগছেনা।
-কি হইছে?
-মনটা খুব খারাপ, আমার খুব কাছের একটা বন্ধু আমার থেকে অনেক দূরে চলে গেছে।
-হুম…
-আচ্ছা সীমান্ত তুমি কি ওকে ভালোবাস?
-জানি না, হয়তো বাসি

এরপর সীমান্ত শিহাব কিছু না বলে চলে গেলো। তেমন একটা কথা বলেনা কারও সাথে। শ্রাবণীর সাথেই মাঝে মাঝে কথা বলে, তাও আস্তে আস্তে কমিয়ে দিচ্ছে। হয়তো শ্রাবণী শিহাবকে ভালোবাসে আবার নাও হতে পারে। তবে শিহাব-শ্রাবণী আর শিহাব-হৃদিতার মাঝে সম্পর্ক কোন ধরনের তা তারা নিজেরাও বলতে পারে না। সবারই হৃদয় জ্বলে অঙ্গার হচ্ছে কিন্তু কেউ কাউকে কিছু বলতে পারছেনা।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত