অশ্রুধারা

অশ্রুধারা

কালো রঙের গাড়িটা রাহাতের গা ঘেঁষে চলে গেল। একটুর জন্য কিছু হয়নি। রাহাত আগের মতই হাঁটতে লাগল। হাতে বাজারের খালি ব্যাগ। ব্যাগটা কিছুদিন আগে সেলিমের বাসায় ফেলে এসেছিল রাহাত,আজ নিয়ে আসল। কাল বাজার করতে হবে। বাসায় বাজারের ব্যাগ একটাই ছিল। এলাকায় ঢুকতেই প্রথম গলির ডান পাশের চায়ের দোকান থেকে ডাক আসল। রাহাত ইশারায় বুঝিয়ে দিল কিছুদিন পর টাকা গুলো দিয়ে দিবে। রাহাত মাথা নিচু করে হাঁটছে। রানুর জন্য তার চিন্তা হচ্ছে খুব। রানুর সাথে যখন বিয়ে হয়েছিল তখন রাহাতের সবই ছিল। হঠাৎ করে বাবা মারা যায়,তারপর বড় ভাইয়েরা সব সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়। পরিবার থেকে সবসময়ই কোন একটা কারণে অবহেলা পেয়ে এসেছে রাহাত। শেষে এসে এমন কিছু হবে তা সে আশা করেনি। নিজের বাসায় থাকতে পারেনি আর,রাহাত। থাকার জন্য ছোট একটা ঘর পেয়েও যায় দু-একদিনের ভেতর। কিন্তু তার মনে তখন থেকেই একটা অপরাধবোধ কাজ করত। রাহাত ভাবত রানুর জন্য সে কিছু করতে পারেনি,কি দেখে এসেছিল আর কি হয়ে গেল। প্রেম করে বিয়ে হওয়ায় রানুর বাসা থেকে তাকে মেনে নেয়নি,এই জন্য সেখানেও রেখে আসার সুজোগ নেই রাহাতের। ভাবতে ভাবতে বাসায় এসে উঠল রাহাত। বিছানায় বসে বাজারের ব্যাগ খাটের পাশে গুজে দিল। দরজা খোলা ছিল। রাহাত রানুকে কয়েকবার ডাকল,কিন্তু কোন সারা পেল না। বিছানায় বসে কান চুলকাতে চুলকাতে ফার্মেসির কথা ভাবতে লাগল রাহাত। ভাগ্যের জোড়ে একটা ফার্মেসিতে কাজ পেয়েছে সে।

যা টাকা পায় তা দিয়ে চলে যায় কোনরকম। কিছুদিন থেকে মালিকের হাব ভাব ঠিক লাগছেনা রাহাতের। তার মনে হচ্ছে কাজটা টিকবেনা বেশিদিন। মালিক কোনভাবে তাকে বের করে দিবে। সাধারণ ভাবে বলে বের করতে পারবেনা। রাহাতের কাজে এক চুল খুদ নেই। ক্লান্তিতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে তা রাহাতের অজানা। চোখ খুলে বুঝতে পারল সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। রাহাত গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসল। চারিদিকে মশায় ভরে গেছে। কানের কাছে ক্রমাগত পিনপিন শব্দ করে যাচ্ছে। রাহাত বিছানা থেকে উঠে ঘরের লাইট জ্বালাল। ঘরের দরজা খোলা। সব লাইট নেভানো। রাহাত রান্নাঘরে গিয়ে দেখল রানু নেই। পাশের বাসায় রানু যায়না তেমন,তবুও রাহাত খোঁজ নিয়ে দেখল। রানু সেখানেও নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল রাহাত। ভাবল- কোথাও হয়তো গেছে,ফিরে আসবে একটু পর। প্রায় এক ঘন্টা পরেও রানুর কোন খোঁজ পাওয়া গেল না। রাহাতের ফোনটাও নষ্ট হয়ে গেছে। এক ফোন আর কয় বছর চলবে? সবার হাতে এখন দামি ফোন। আঙুলের ইশারায় চলে সেগুলো। রাহাতের হাতে এখনো সেই পুরোনো ফোন। বোতাম চেপে কাজ করাতে হয়। রাহাত ভাবল রানু হয়তো তাকে ছেড়ে চলে গেছে। এই কষ্টের জীবনে আর কত দিন! কোথা থেকে কোথায় এসে নেমেছে। রাহাত মনে মনে ভাবতে লাগল তাদের পুরোনো কথা গুলো। পালানোর আগে বলত ডাল-ভাত দিয়ে খেয়ে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেবে দুজনে। এখন তার ছিটেফোঁটা মিল নেই। সকালে আলু সিদ্ধ। দুপুরে ডাল,আলু ভাজা আর ভাত। রাতেও তাই। মাঝে মধ্যে মাছ আনা হয়। বিশেষ কোন দিনে মাংস আসে হঠাৎ, এটা কি খুবই কম হয়ে গিয়েছিল? মনের কষ্টকে চাপা দিয়ে রাহাত চোখ বুঝে শুয়ে পড়ল। ঘুম আসবেনা এখন। তবুও তার ইচ্ছা করছে ঘুমানোর একটা ব্যর্থ চেষ্টা করার।

পরের দিন রাহাত ঘুম থেকে উঠে হালকা কিছু খেয়ে বাইরে চলে গেল। আগেরদিন রাতে কিছু খাওয়া হয়নি। সকালেও তেমন কিছু খাওয়া হয়নি। রাহাতের পেটে মেঘের মত শব্দ করছে। পেটের ভেতর বৃষ্টি হয়না,নাহলে একটু পরেই পেটে জমা হওয়া পানি রাহাতের চোখ মুখ দিয়ে বের হতো। ফার্মেসিতে গিয়ে রাহাত খাতা খুলে বসল। আগের দিনের হিসাব মেলানো হয়নি। দোকানে আরেকজন আছে। সে শুধু দোকান খোলা আর বন্ধ করে,আর বাকি সময় টিভি দেখে কাটায়। সম্পর্কে সে মালিকের শালা হয়। রাহাত তার সাথে কঠিন গলায় কথা বলতে পারেনা। একটু হলেও উচ্চ স্তরের সে। হিসাব মিলিয়ে রাহাত কাস্টমারদের দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ পর মালিক এলো। স্বাস্থবান চেহারা নিয়ে তার হাঁটতেও কষ্ট হয়। মালিকের নাম সেলিম হোসেন। সেলিম হোসেন ভেতরে না ঢুকেই জোড় গলায় রাহাতকে বাইরে আসতে বলল। তার ভাব দেখে মনে হচ্ছে এখনই কিছু একটা হবে। অনেক বড় কিছু। রাহাত হাসি মুখে বাইরে এসে দাঁড়াল। শান্ত গলায় বলল, পান খাবেন? আপনার জন্য পান আনিয়ে রেখেছিলাম।

দুপুরের দিকে রাহাত বাসায় ফিরল। সে যা ভেবেছিল তাই হয়েছে। আজ চুরির অপবাদে তাকে ফার্মেসি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। ব্যাপারটা নিয়ে রাহাত তেমন চিন্তিত না। সে রানুর কথা ভাবছে। রানু কোথায় যেতে পারে তা বুঝে উঠতে পারছেনা সে। ফার্মেসি থেকে আসার পথে মোবাইল টা ঠিক করিয়ে নিয়েছে রাহাত। স্ক্রিন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এইটুকুতেই তিনশো টাকা খরচ হয়ে গেল। এই সময়ে ফোনটা ঠিক করার তেমন কোন দরকার ছিল না। তবুও একটা নষ্ট জিনিস হাতে নিয়ে ঘুরতে ভালো লাগছিল না রাহাতের। কল ঘরের দিকে পা বাড়াতেই রাহাতের ফোন বেজে উঠল। নাম্বার দেখে বুঝতে পারল সিয়ামের নাম্বার। রাহাত ফোন রিসিভ করে সহজ ভঙ্গিতে বলল, কিরে কেমন আছিস?

ওপাশ থেকে সিয়াম বলল, আছি। তোর সাথে দরকারি কথা ছিল। কয়েকদিন থেকে চেষ্টা করছি তোর সাথে কথা বলার।

ও,ফোনটা নষ্ট ছিল। বাসায় আসলেই পারতি।
তোর ঠিকানা ভুলে গেছি। কোন চিপায় বাসা নিয়েছিস! কথা বাড়াস না। আমার দরকার আছে,এখনই দেখা কর।
কোথায় আসব?

বিসমিল্লাহ এর সামনে আয়।
আচ্ছা। একটু দাঁড়া। ফোনে বলা যায় না..
না,তুই আয়।

রাহাত ফোন রেখে দিল। পেছন ফিরে তালা খুঁজতে লাগলো। ঘর থেকে বের হবার সময় তালা খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়। সারা ঘর খুঁজেও তালা-চাবি পাওয়া যায় না। শেষমেশ টেবিলে বা আয়নার সামনে পাওয়া যায়। অথচ ওই দুই জায়গায় খুঁজতে ভুলে যায় রাহাত।

গেটে তালা দিয়ে বাইরে বের হলো রাহাত। কিছুক্ষণ হাঁটলেই বিসমিল্লাহ ষ্টোর। সিয়াম কি কারণে ডাকছে তা স্পষ্ট না রাহাতের কাছে। বিসমিল্লাহ ষ্টোরের সামনে গিয়ে অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও সিয়ামের দেখা পাওয়া গেল না। আশেপাশে ভালো করে দেখে নিল,সিয়াম অন্য কোথাও দাঁড়িয়েছ আছে কিনা। রাহাত খানিকটা বিরক্তি নিয়ে সিয়ামকে ফোন দিল। প্রথম বারে ব্যস্ত দেখালো। রাহাতের কান্তি ভাব লাগছে। মনে হচ্ছে এখানে একটা খাট এনে দিলে ভালো হতো। আরাম করে শুয়ে শুয়ে ফোনে চেষ্টা করা যেত সিয়ামকে। দ্বিতীয়বার ফোন দিতেই রিসিভ করল। ওপাশ থেকে অন্য কারো গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। ব্যক্তিটি সিয়াম না। রাহাত কথা বলে জানতে পারল সিয়াম একটু আগে এক্সিডেন্ট করেছে। অবস্থা বেশি ভালো না। রাহাত হকচকিয়ে গেল। সবকিছুই তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে এমন মনে হচ্ছে তার কাছে। কোনকিছুই তার মত করে চলছেনা। রাহাত হাসপাতালের ঠিকানা নিয়ে প্রায় ছুটে গেল সিয়ামের কাছে। সেখানে গিয়ে জানতে পারল অবস্থা সত্যিই ভালো না। পা ভেঙে গেছে। হাতের বেশিরভাগ অংশ ছিলে মাংস বের হয়ে গেছে। মাথায় বেশি ব্যথা পেয়েছে। রাহাতের মনে হতে লাগল এর জন্য কোনভাবে সে দায়ী। তার সাথেই তো দেখা করতে আসছিল সিয়াম। রাহাত কোনভাবে চোখের জল আড়াল করল। ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছে দুজন। পরিস্থিতির জন্য হয়তো এখন তেমন দেখা হয়না। কিন্তু ভেতর থেকে টান আগের মতই আছে,হয়তো আগের থেকেও শক্ত করে বসে আছে। সিয়ামের পরিবারের অনেকেই এসেছে। রাহাত মাথা তুলে তাকাতে পারছেনা। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে তাদের কাছে। এমন সময় রাহাতের ফোন বেজে উঠল। সবাই তিক্ষ্ণ চোখে রাহাতের দিকে তাকালো। রাহাত বোকার মত তাকিয়ে রইল। এমন বিবৃতিকর অবস্থায় সে আগে কখনো পড়েছে নাকি তা সে জানেনা। রাহাত মাথা নিচু করে ফোন হাতে বের হয়ে গেল। ফোন তখনো বেজে চলেছে। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে মেয়েলি গলা শোনা গেল।

হ্যালো।
হ্যালো রাহাত ভাইয়া?
হ্যা,কে বলছেন?
আরে আপনি আমার দুলাভাই। প্রথনেই ভাইয়া ডেকে ফেলেছি। চিনতে পেরেছেন?
ও,অমি?
হু,কোথায় আপনি? আপুর অবস্থা তো খারাপ। কি না কি হয়ে যায় চিন্তায় আছি।
রানু তোমাদের ওখানে? কি হয়েছে ওর? আমাকে আগে জানাওনি কেন?
হ্যা আপু তো আমাদের এখানে।
কি হয়েছে ওর?
বলতে পারছিনা। আপনি আসুন তাড়াতাড়ি।
আচ্ছা আসছি।

রাহাত ফোন কেটে দিয়ে সিয়ামের কথা ভাবল। কি করবে বুঝতে পারছেনা সেন দুদিকেই দুজন তাকে ডাকছে। দুজনকেই সে চায়। কিন্তু এটা হয়তো প্রকৃতির খেলা। দুটো জিনিস একসাথে পাওয়া সম্ভব না। রাহাত পেছন ঘুরে হাঁটতে শুরু করল। রানুর কি হয়েছে তা জানা দরকার।

রাহাত কিছু না ভেবে তাড়াতাড়ি করে রানুদের বাসায় ঢুকে পড়ল। ভেবেছিল ঢুকেই কয়েকজনের মুখোমুখি হতে হবে। তেমন কিছু হলোনা। বাসায় ঢুকেই অমির সাথে দেখা হয়ে গেল। অমি চিন্তিত ভঙ্গিতে রাহাতকে উপরে নিয়ে গেল।

রানু চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। ঘর থেকে অদ্ভুত একটা গন্ধ আসছে। গন্ধটা ভালো লাগছে রাহাতের। অমি কিছু না বলে হুট করে চলে গেল সেখান থেকে। রাহাত উঁকি দিয়ে দেখলে ভেতরে অন্য কেও আছে নাকি। ভেতরে আর কেও নেই। রাহাত ধির পায়ে এগিয়ে গেল। রানুর পাশে বসে পড়ল। রাহাত কিছু বলতে পারছেনা। ইচ্ছা করছে রানুকে ডেকে তুলতে। কতক্ষণ হলো তার সাথে কথা হয়না। রানুকে দেখে ঠিকই মনে হচ্ছে। অমির কথা কি তাহলে মিথ্যা? রাহাত হাত বাড়িয়ে রানুর হাতের উপর নিজের হাত রাখল। রানু চোখ মেলে তাকালো। রাহাতের দিকে তাকিয়ে উঠে বসল সে। দু-দিকে তাকিয়ে বলল, চলো বাসায় যাবো।

রাহাত বলল, চলে এসেছিলে কেন?
এমনি।
রানু!
বলো।

কিছুদিন এখানে থেকে যাও তুমি। ইচ্ছা হলে একেবারে থেকে যাও,অন্য কাওকে বিয়ে করতে চাইলে করতে পারো সমস্যা নেই আমার।

এই,কি হয়েছে তোমার? কিসব বলছ এগুলা! একটু রাগ করেছি দেখে এগুলা বলবা?
আমি কোথায় নিয়ে রাখব তোমাকে? ফার্মেসির কাজটা চলে গেছে। বাসার ভাড়া দেওয়া হয়নি। হাতে কোন কাজ নেই,কি দিয়ে খাওয়াবো? মুখের কথা দিয়ে তো আর জীবন চলবেনা,রানু।
কিছু হবেনা। ঠিক হয়ে যাবে সব। দুজন মিলে ঠিক করে নিব।

রানু হুট করে হেসে দিল। তার চোখে জল। রাহাতো হাসার চেষ্টা করল। সে এখনো চাচ্ছে রানু এখানে থাকুক। কিন্তু এটাও চাচ্ছে রানু তার সাথে থাকুক,সারা জীবন। রাহাতের চোখের কোণে জল জমতে শুরু করল। চোখের জল অদ্ভুত জিনিস। কত রকমের কান্না যে হয় তা চোখ নিজেও জানেনা হয়তো। রাহাতের চোখে এখন খুশির অশ্রু। রাহাত রানুর হাত শক্ত করে চেপে ধরল। এমন সময় ফোন আসল। রাহাত ফোন ধরল। কিছুক্ষণ বোবার মত ফোন কানে ধরে রেখে বিছানায় রেখে দিল। সিয়াম মারা গেছে কিছুক্ষণ আগে। রাহাতের চোখ ফেটে কান্না আসছে। সে কোনমতে ঠোট চেপে রেখেছে। তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। কান্না কত জটিল তা বোঝার ক্ষমতা হয়তো সাধারণ মানুষের নেই।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত