কল্পনাতেই আমার ইচ্ছে

কল্পনাতেই আমার ইচ্ছে

ঘরে বসেই ছিলাম আর পাশের ঘর থেকে আম্মু বারবারই ডাকছিল। তবে তার ডাকে কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ বসেই ছিলাম। আবার ডাকলো। পৃথিবীর কিছু মানুষের ডাক অগ্রাহ্য করে থাকা যায় না। তাদের মধ্যে ‘মা’ জাতি অন্যতম। আমিও পারলাম না। বিরক্তি নিয়েই তার রুমে গেলাম। আমাকে দেখেই আম্মু মুচকি হেসে বললো,

–পাশে বস।

আমি চুপচাপ তার পাশে গিয়ে বসলাম।
আম্মু হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলবে তাই খানিকটা সময় চুপ থেকে নিজেকে প্রস্তুত করে নিলো।

–অভ্র?
–বলো।
–বাবা, এভাবে আর কতদিন?
–কিভাবে কতদিন?
–দেখ আমাদের বয়স তো কম হলো না তাই না? এবার বিয়েটা করে নে বাবা।

আম্মুর কথা শুনেই বিরক্তি খুব বেশিই হয়ে গেলো। বিয়ে নামক শব্দ টা আমার ইদানিং শুনলেই রাগ হয় খুব। তাই বললাম,

–আমি বিয়ে টিয়ে করবো না। আর আমি কি ভালো নেই? আমি তো অনেক ভালো আছি।
–দেখ বাবা, আমাদেরও তো একটা স্বাদ-আহ্লাদ আছে না কি?
— তো আমি কি করবো?
–একটা মেয়ের কথা তোর আপু বললো চল না কাল গিয়ে দেখে আসি?
–আম্মু!

–রাগ করিস না বাবা। আমার মনে হয় এবার তোর বিয়েটা ঠিক হয়েই যাবে শুধু তুই চুপচাপ থাকবি যা বলার আমিই বলবো।

–কিন্তু আম্মু।
–আমার এই শেষ ইচ্ছে টা রাখ বাবা।

আম্মুর এই একটা কথাই আমাকে দূর্বল করতে বাধ্য। তাই আর কিছু বললাম না। চুপচাপ নিজের রুমে চলে এলাম।
প্রচণ্ড রাগ লাগছে আম্মুর উপর। এই দিয়ে

দশ-বারো টা মেয়ে দেখা হয়ে গেলো। তবে সব ঠিকঠাক থাকলেও এক জায়গায় গিয়ে সবাই না করে দেয়। অবশ্য না করারই কথা। কেউই তাদের মেয়ের জন্য এমন জামাই নিশ্চয় পছন্দ করবে না।

আমি অভ্র। বছর চারেক হলো একটা চাকরি করছি। বেতন মোটামুটি ভালোই। এদিকে বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে হওয়ায় চাকরি পাওয়ার পর থেকেই তারা বিয়ে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। তবে সব গুলো সমন্ধ ঠিকঠাক থাকার পরও একটা কারণে বিয়ে হবে হবে করেও আর হয়ে ওঠে না। কারণ টা খুলেই বলি।

বয়স তখন আমার পাঁচ কি ছয় হবে। হঠাৎই আমার কি যেন রোগ ধরা পড়ে। প্রায় মাস খানেক আমাকে হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। যদিও আমার কাছ থেকে রোগটা গোপন করা হয়েছিল তবে সত্য কথা তো আর বেশিদিন চাপা থাকে না, তাই আব্বু-আম্মুর কথোপকথনের সময় একদিন শুনে ফেলি আমার রোগের বিষয়টা। জানার পরও বিষয়টা নিয়ে আমি মোটেও সিরিয়াস ছিলাম না। তবে বড় হওয়ার পর বুঝতে পারলাম সেই রোগটা আমার জীবনের সব’চে বড় স্বপ্নটাই নষ্ট করে দিয়েছে। আমার অপারেশনের জন্য না কি আমার সেক্স ক্রোমোজম চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে তার ফলে আমি একজন বন্ধ্যা পুরুষ। নাম’টা উদ্ভট না?

বন্ধ্যা নারী হলে পুরুষ বন্ধ্যা বলাই যায়। নামটা অবশ্য আমারই দেয়া। চলার পথে এই রোগের জন্য কখনও বাঁধার সম্মুখীন না হলেও নিজের মনের কাঠগড়ায় বারবারই হোচট খেয়েছি। কেঁদেছি বহুবার। তবে ভাগ্যে যা আছে তা তো আর বদলানো যায় না, তাই নিজেকেও সেভাবেই মানিয়ে নিয়েছিলাম। ঠিক করেছিলাম কখনও প্রেম ভালোবাসায় জড়াবো না, বিয়েও করবো না। তবুও একটা মেয়ের সাথে ভালোবাসা হয়ে যায়। ভালোবাসা তো আর বলে কয়ে আসে না।

প্রেম চলার প্রায় দেড় বছরের মাথায় আমরা বিয়ের সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলি। ও রাজিও হয়। আমি ভাবি,
যাকে বিয়ে করবো তাকে সত্য টা না বললে কেমন হয়? তাই আমার রোগের কথা ওকে খুলে বলি। সেদিনটা অনেক বেদনাহত ছিল। ভালোবাসা কত দ্রুত পাল্টে যায়! রঙ গুলো ধূসর হতে সময় লাগে না। সেদিন সেও চলে গেছিলো।
ওহ, তার নামটাই তো বলা হলো না। ফাইজা, ফাইজা ওর নাম।

ধাক্কা কাটিয়ে উঠে মাস ছয়েক পর চাকরি হলো। তারপর থেকে আব্বু-আম্মুর বিয়ের জন্য চাপ। আমি না বললেও তারা তো শুনে না। মেয়ে দেখে। পছন্দও হয়। তবে আমার বিষয় টা উঠতেই সবকিছু কেমন যেন গোলমেলে হয়ে যায়। প্রথম প্রথম কষ্ট হতো খুব। তবে এখন সয়ে গেছে। কোনো বাবা-মা’ই চাইবে না তার মেয়েকে এমন ছেলের বউ করে দিতে। সুখ টাকায় থাকে না। আমি সুখী রাখতে পারবো না। আর সব মেয়েরই অন্তিম ইচ্ছে থাকে ‘মা’ ডাক শোনার। আমি তো ব্যর্থ যে, কাউকে তা শোনাতে পারবো না।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলাম। কাল আবার মেয়ে দেখতে যেতে হবে। আবার আমার বিষয় নিয়ে কথা উঠবে।

দুপুর দুইটা বাজে প্রায়। আম্মু, আব্বু আর বোনের সাথে মেয়ে বাড়ির সোফায় এসে বসে আছি। সবাই খুশি মনে কথা বলছে। বিয়ে টা হয়তো এখনই হয়ে যাবে এমন ভাব। আর আমি মনে মনে হাসছি।
আপুর চিমটি কাটার ব্যাথায় সামনে তাকালাম। দেখি ঘোমটা দিয়ে মেয়ে এসেছে।

–আলহামদুলিল্লাহ, মেয়ে দেখতে অনেক ভালো।

আমি না আমার আপু জোরে করে বললো।

মেয়ের চাচা আমি কি করি না করি তা জানতে চাইলো। চুপচাপ উত্তর দিলাম। মনে হলো তারা এমন পাত্রই চায়। আপুর কথামতো মেয়ে আর আমাকে আলাদা কথা বলার জন্য অন্য রুমে পাঠিয়ে দেয়া হলো।

নির্লিপ্ত ভাবেই মেয়েকে বললাম,
–নাম কি আপনার?
— নওশীন শারমিলি, ডাক নাম মিলি।
–বাহ, খুব সুন্দর নাম। তা আপনার পরিবারের সবার যদি আমাকে পছন্দ হয় তো আপনি কি আমাকে বিয়ে করবেন?
— পরিবারের বড়রা রাজি হলে আমার আর দ্বিমত নেই সেখানে।
–বাহ, শুনে খুশি হলাম।

এভাবে আরও কিছু সময় কথা বলে আবার সবার সাথে ফিরে আসি।

রাতে আপু ঘরে এসে বললো মেয়ের বাড়ির সবার নাকি আমাকে পছন্দ হয়েছে তারা বিয়ে দিতে রাজি। আমি আপুকে বললাম,

–আমার বিষয় টা জেনেও!

–না, তোর বিষয় টা বলা হয় নি। আর এ’কথা বলা হবেও না। বিয়ে হোক বছর খানেক যাক তারপর এটা ওটা বলে পার করা যাবে।

— আপু, এটা কি ঠকানো হলো না ?
–তোর সুখের জন্য এতটুকু কি আমরা করবো না?
–আর মেয়েটার সুখ?
–সবার কপালে সুখ লেখা থাকে না। মেয়েটারও না হয় তেমন হবে।

কথাটি বলেই আপু চলে গেলো। আমিও চুপচাপ বসে রইলাম। মানুষ কত স্বার্থপর! নিজেদের সুখের জন্য অন্যকে বলি দিতেও রাজি।

আপু এসে সেদিন মেয়েটার ফোন নাম্বার হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেলো। ফোনে কথা হলো, দেখাও হলো।
মেয়েটা অনেক বেশিই ভালো। দেখতেও যেমন ভালো তেমনি তার চোখ, কণ্ঠ, চুল সবই ভীষণ সুন্দর। তবে সব’চে বেশি ভালো লেগেছে মেয়েটার মুচকি হাসি টা। প্রতিটা কথার সাথেই একটা করে হাসি ফ্রি। তার হাসির মায়া এসে আমাকে বস করছে যেন।

বিয়ের আর এগারো দিন বাকি। আম্মুর কথাতে আজ আবার মেয়েটার সাথে দেখা করতে লেকের পাড়ে এসেছি। মেয়েটা বসে আছে। আম্মু বলেছিল ওকে নিয়ে শপিং করতে যেতে। তবে আমি এসেছি ওকে কিছু বলতে।
সামনেই মিলি নামক মেয়েটা বসে বসে লেকের পানি দেখছে।

মিলি এ কয় দিনে আমার সাথে অনেকটাই ফ্রি হয়ে গেছে। যতই হোক আমি তার হবু বর বলে কথা।
নিরবতা ভেঙে আমিই বললাম,

–মিলি, বিয়ের পর তোমার ইচ্ছে কী?

কথাটা বলতে না বলতেই দেখি মিলি লজ্জায় মাথা নিচু করে নিয়েছে। তাই আবার বললাম,

–সবার জীবনেই তো সুপ্ত কিছু ইচ্ছে থাকে। তোমার ইচ্ছে কী?
–কেমন ইচ্ছের কথা বলছেন?
–এই ধরো সংসার, স্বামী, ছেলেমেয়ে এসব নিয়ে।
–হ্যাঁ, আমারও ইচ্ছে আছে।
–বলো, শুনি সে ইচ্ছে গুলো।

–সুন্দর একটা সংসার হবে, ছোট্ট সংসার। দু’জনে সুখে দুঃখে সেখানেই থাকবো। টাকার অভাব হোক তবে ভালোবাসার পূর্ণতা থাকতে হবে। সংসারের সব’চে বড় পূর্ণতা বাচ্চা। আমাদের একটা বাচ্চা হলেই হবে। একজন মায়ের কাছে ‘মা’ ডাক শোনার চেয়ে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে?

–তোমার ইচ্ছে গুলো অনেক সুন্দর। এমন ইচ্ছে সবারই থাকে। কিন্তু মিলি, আমি যদি তোমার কিছু ইচ্ছের পূর্ণতা না দিতে পারি তবে কি তুমি রাগ করবে?

–সব ইচ্ছেই যে পূর্ণ হতে হবে তা তো না।
–আমি যদি তোমাকে ‘মা’ ডাক শোনার ইচ্ছে পূর্ণ না করি তো?
–মানে!

–দেখো মিলি, আমি তোমাকে কিছু কথা বলার জন্যই ডেকেছি। চাইলেই আমি কথাগুলো না বলে তোমাকে নিয়ে সুখের সংসার বানাতে পারতাম, চাইলেই তোমার একটা একটা ইচ্ছে আমি পূর্ণতা দিয়ে তোমার মনে জায়গা করে নিতে পারতাম। তবে যখন তুমি সব’চে বড় ইচ্ছেটা নিয়ে আমার কাছে আবদারের ঝুলি খুলতে তখন আমি পারতাম না।

–এসব কি বলছেন! আমি তো কিছুই বুঝছি না।
–মিলি, তুমি বললে না যে, একটা মেয়ের সব’চে বড় পাওয়া হলো ‘মা’ ডাক শোনা। আমি পারবো না কখনোই তোমাকে এই ইচ্ছের পূর্ণতা দিতে। আমার সে ক্ষমতা নেই।

–এসব আগে কেন বলেন নি!

–আসলে মিলি, আমার আব্বু, আম্মু, আপু সবাই চায় আমি খুশি থাকি, ভালো থাকি। তাই তারা তোমার,তোমাদের কাছ থেকে এই বিষয় টা গোপন রেখেছে। তবে আমি তোমার ইচ্ছে, তোমার বিশ্বাসকে নষ্ট করে ঠকাতে পারবো না। তাই সত্য টা বলে দিলাম। আচ্ছা মিলি, এখন এসব শুনেও কি তুমি আমাকে বিয়ে করবে?

— দেখুন, আমি পারবো না। আমারও জীবন, কিছু চাওয়া-পাওয়া আছে। আমি পারবো না আপনাকে বিয়ে করতে। আমাকে মাফ করবেন।

— হি হি, মজা করলাম। তোমাকে বিয়ে করতে হবে না। আমি চাই না আমার ক্ষণিকের ভালো থাকার জন্য কারও সারা জীবনের ভালো থাকা চোখের জলে ভাসুক।

–আমাকে এখন যেতে হবে। কিন্তু বাসায় গিয়ে আমি কি বলবো?
— যা সত্য তাই।
–আমি যাই তাহলে।
–হ্যাঁ, যাও।

মিলি খুব দ্রুততার সাথে আমার পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। হয়তো বাসায় গিয়েই আগে ওর বাবা, মা’কে কথাটি বলবে। তারা শুনে প্রথমেই আমার আম্মুকে ফোন করে বিষয়টা নিয়ে কথা বলবে। সত্য প্রমানিত হলে আমার আম্মুকে কিছু কথা শোনাবে। তারপর মেয়ের বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য শুকরিয়া জানাবে।

মিলির হয়তো ভালো ঘর থেকে আবার সমন্ধ আসবে। আমাদের মতোই কথা হবে। এক সময় বিয়েও হবে। মিলির ইচ্ছে গুলো সেখানে পূর্ণতা পাবে।

বেলাশেষে মিলির মুখে বিজয়ের হাসি দেখা যাবে।

মুচকি হেসে বাসার দিকে হাঁটা শুরু করলাম। রেডি হচ্ছি। বাসায় গিয়ে আম্মু আর আপুর বকা খেতে হবে। তারা বলবে, কেন আমি সব বলে দিলাম।

তবুও আমি খুশি। আমার একটু খারাপ থাকায় যদি কেউ একজন খুব সুখী হয়!
আমার অভাগা ইচ্ছে গুলো আমার কাছেই থাক। আমি না হয় কল্পনাতেই আমার ইচ্ছেদের পূর্নতা দেবো।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত