কাল সকালে ফুল

কাল সকালে ফুল

মুবিন নামাজে পাবন্দ। সে নামাজে আছে।তার আন্তরিক ভালোবাসার বিষয় একমাত্র নামাজই।বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে।বৃষ্টির ফোটা বেশ সশব্দে পড়ছে।টিনের চালায় বৃষ্টির ফোটার শব্দ বেশ ছান্দিক।নান্দনিকতা আছে বৃষ্টির মাঝেও।বৃষ্টির জলেও আছে বিশুদ্ধতা। আছে রোগ নিরাময়। কিছুক্ষণ পূর্বেই মুবিন দাঁড়িয়ে দেখছিলো।এতো অন্ধকারেও বৃষ্টির ফোটা দেখা যাচ্ছিলো। আকাশে চাঁদ নেই।তবুও মেটে আলোয় চারদিক বেশ ভালো লাগছিলো। এতো মনোহর, এতো মুগ্ধকর প্রকৃতি।

মন অবলিলায় স্রষ্টাতত্ত্ব ভাবতে থাকে। প্রত্যেকটি সৃষ্টিতেই ভাবনা আছে।আছে বিস্ময়। সুরা আর রাহমানে মহান স্রষ্টা এ কথাটি বার বার ব্যক্ত করেছেন। তোমরা তোমার রবের কোন সৃষ্টিকে অস্বীকার করবে। আমরা সেটা পারিনা। শুধু কৃতঘ্ন হৃদয় পারে। সে হৃদয়েরও অভাব নেই সমাজে। এটা এশার নামাজ নয়। ভয় ভীতির নামাজ। ঘুমানোর কথা ছিল তার।ঘুমাতে গিয়েছিল। হঠাৎ বজ্রপাত ধ্বনিতে বসে পড়েছিল। এসময় ঘুম অমঙ্গল। হাদিসে এ ব্যাপারে বেশ শতর্ক বাণী দিয়েছেন রাসূল। চন্দ্রগ্রহণ, সূর্য্যগ্রহন এমনকি প্রচণ্ড ঝড় তুফানে তিনি নামাজের তাগিদ দিয়েছেন। তিনি নিজে তাই করতেন। মুবিনের উচিতকর্ম সেটাই এই মুহুর্তে।বাইরে যাওয়ার অবস্থা নেই। ঘন বৃষ্টি সাথে ঝড়ো বাতাস। মাঝেমাঝে বজ্রপাত। বৃষ্টির জলেই অযু করতে হবে তাকে।

সে মৃদু পায়ে বারান্দায় আসলো। খুব শীতল কিছু পায়ের উপর দিয়ে অতিক্রম করলো মনে হলো। নিচে তাকাতে ইচ্ছে করছেনা মুবিনের।ভয়ে গা জমে গেছে। বৃষ্টিপাতের সময় শাপের উপদ্রব হয় অনেক সময়।গর্তে পানি জমে। আবার বজ্রধ্বনি শুনলেও গর্তের প্রানীরা বেরিয়ে আসে। ওরাও ভয় পায়। হয়তো ভয় নয়। স্রষ্টার নির্দেশিত কাজটিই করে। আমরা বেশির ভাগ মানুষরাই সেটা করিনা। মুবিন তাদের দলভুক্ত হতে চায়না। সেটা নির্বোধের কাজ।মানুষ নির্বোধ প্রানী নয়।তারা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। কিছুক্ষণ মুবিন দাঁড়িয়ে থাকলো। শরীর স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত। ওটা শাপ ই ছিলো। দেরি হলেও মুবিন বুঝতে পেরেছে। নড়াচড়া না করলে ক্ষতি হবেনা ভেবে সে স্থীর হয়ে ছিল। বিপদ কেটে গেছে। বৃষ্টির ক্ষ্যাপামি ক্রমেই বাড়ছে। বারান্দার চাল বেয়ে পানির নহর বয়ে যাচ্ছে।আঞ্চলিক ভাষায় ছঞ্চার পানি বলে একে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই অযু পর্ব সারছে মুবিন। আড়ালে থাকা মেয়েটি সম্মুখে আসতে গিয়েই আবার থমকে দাঁড়ালো। মুবিনকে দেখে পরক্ষনেই পূর্বের অবস্থানে গিয়ে দাঁড়ালো। বাতাসের তোড় মেয়েটিকে বৃষ্টির জলে ভিজিয়ে দিচ্ছে। এমনিতেও সে ভিজে একাকার। কয়েক ঘন্টার প্রবল বর্ষণ তাকে কাক ভেজা করেছে। গায়ের কামিজ ভিজে আছে বলে কিছুটা উষ্ণতা মনে হলেও আসলে তা নয়। বৃষ্টির জল গায়ে লাগতেই মেয়েটি কেপে উঠছে। দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। ভয়ও করছে।রাত বেশ গভীর। ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু এখন ভয়টা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। কারন চারদিকের নিস্তব্ধতা।

মাঝেমাঝে বজ্রধ্বনি। রাস্তাঘাট কাদাটে হওয়ায় স্যান্ডেল ছেড়ে দিয়েছে সে। কাদাটে স্যান্ডেল পায়ে হেটে আগানো যায়না। মনে হয় এক পা আগালে আবার এক পা পিছনে চলে যায়। মুবিনের মনে হলো কেউ উঁকি দিয়ে দৌড়ে পালালো। কিছুক্ষণ আগেই সে একটা ভয় থেকে বেঁচেছে। হয়তো তার প্রতিক্রিয়ায় এমন মনে হচ্ছে।পা বাকি ছিলো তার। পা ধুতে গিয়ে মুবিন প্রায় পড়ে যাচ্ছিলো। এক পায়ে ভর করে অন্য পায় ধুতে হচ্ছে। অযু শেষ করে ঘরে ঢুকলো মুবিন। মুবিন টুপি পাঞ্জাবী পড়ে আয়না দেখল। যথেষ্ট সুন্দর লাগছে তাকে। কিছুক্ষন নীরব হয়ে তাকিয়েই থাকলো সে। চোখের কোনে জল জমেছে। ছলছল করছে।জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটি এক পা দুইপা করে বারান্দায় উঠে এলো। পা এলোমেলো ভাবে পড়ছে। বৃষ্টির জলের সাথে কিছুটা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে উরু সন্ধি হতে।লুকাতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ইচ্ছের প্রকাশকে বাস্তবায়ন করার কলাগুলো কাজ করছেনা। বিকল হয়ে গেছে সব। প্রচন্ড শীতে কাপছে সে। ইজ্জত আব্রুর যতটুকু আছে তা কামিজেই ঢাকা পড়েছে। মানুষ সঙ্গ প্রিয় বলেই সে হয়তো মানুষের কাছাকাছি হতে চায়। এমনকি অসুস্থতায় যখন কাতরায় তখনও কাছে কেউ থাকলে সে সাহস পায়।বেঁচে থাকার অর্থ পায়। অথবা অর্থ খোঁজে। মানুষ জানে তার শেষ রক্ষা হবেনা,তবুও ভরসা পায়। রক্তের ছোপ ছোপ ছাপ পড়ছে বারান্দার মেঝেতে। শরীরের সর্ব শেষ শক্তিটুকু সে খরচ করছে দাঁড়িয়ে থাকতে। মনে হয় তবুও সে তা পারছেনা।

শরীর ঢলঢল দুলছে। কাঁদার সর্ব শেষ স্তরে সে থেমে আছে। পাথর হৃদয় কেঁদে যাচ্ছে অবিরামভাবে। তাতে শব্দ হচ্ছেনা। ইচ্ছের স্তর পেরিয়ে কাউকে জানান দিতে ইচ্ছে করছে,এই প্রকাশে যে সে বেঁচে আছে জীবন মৃত্যুর সর্ব শেষ সীমানায়। কিছুতেই ঘরে ঢুকতে ইচ্ছে করছেনা মেয়েটির। যাকে দেখেছে সেও একটি পুরুষ। হতে পারে সেও পশু পুরুষ। আর কেউ ঘরে আছে কিনা বোঝা যাচ্ছেনা। থাকলে সাড়া শব্দ পাওয়া যেত।সেটা পাওয়া যায়নি। হয়তো পুরুষ একাই বাড়িতে। পুরুষ হয়তো মেয়েদের শরীর বৃত্তের জন্যই পুরুষ হয়ে থাকে। কেন একটি মেয়েকে তাদের শুধু কামনা হিসেবে মনে হয়। ভিন্ন কোন দৃষ্টিভঙ্গি কি এদের হয়না মেয়েদের জন্য? আমার মতো কত বেলী এভাবে নিজের সম্ভ্রম হারায়। শুধু পুরুষের কাছেই।এরা নারীদেহের জন্য পুরুষ। তাই এরা পুরুষ। বেলির ভাবনা স্থবির হয়ে যায়।সামেনের দিকে এক পা বাড়াতেই সে ধপাস শব্দে মেঝেতে পড়ে যায়।নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে কারো সাহায্য চাইতে পারছেনা।শুধু গো গো করে দুয়েকবার শব্দ হলো।

মুবিনের নামাজ এখনো শেষ হয়নি।সে শেষ বৈঠকে বসেছে। শব্দ তার কর্ণকুহরে পৌছলো।স্বাভাবিক নিয়মের চেয়ে একটু এগিয়েই সে নামজ শেষ করলো। এ ধরনের শব্দ না পেলে সে দীর্ঘ মোনাজাত করতো। আজ তা করলোনা। মুবিন ছুটে এলো বারান্দায়। এতো বৃষ্টির মাঝেও মেয়েটির মুখমণ্ডল ঘর্মাক্ত দেখাচ্ছে। সে যে প্রচন্ড ক্লান্ত তাতে সন্দেহ হবেনা কারোই। কামিজের এখানে সেখানে ময়লার ছোপ ছোপ দাগ।দাগ আছে শরীরের অন্যান্য অংশেও। তবে সে দাগ ময়লার নয়। নখের আচড়। মুবিন বাসায় একা থাকে। কাকে ডাকবে। ডাকলেই বা কি থেকে কি হবে কে জানে। পরিবেশ ভালো নেই পূর্বের ন্যায়। মনুষ্য সৃষ্ট পরিবেশ পৃথিবীকে নরকে পরিনত করে ফেলেছে। মুবিনের ভয় করছে।সে বিহ্বল হয়ে পড়েছে।এই মুহুর্তে তার জ্ঞান কাজ করছেনা। বোধও না। আরেকটু এগিয়ে এলো মুবিন।কি করবে ভেবে পাচ্ছেনা সে। রক্তের প্রবাহ দেখে সে আরো ভয় পেয়ে গেলো। কোন মেয়েকেই এতো কাছ থেকে মুবিন দেখেনি আগে। তাকানো ঠিক হবে কিনা এ ভাবনাটিও তাকে থামিয়ে দিচ্ছে বার বার। মেয়েটি এখনো নিঃশ্বাস নিচ্ছে। ডাক্টার ডাকবে কিনা মুবিন বুঝতে পারছেনা। অবশ্য রাত এগারোটায় এখানে ডাক্টার মেলা অসম্ভব। আর ঝড়ের এতো তীব্রতায় কাউকেই পাওয়া যাবেনা। ফাকা গ্রাম। উন্নতি সবে শুরু হয়েছে। তাও ব্যক্তিগত উদ্যোগে। মানুষের টাকা হচ্ছে মানুষ নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্য আনয়নের তাগিদে নিজেরাই গ্রামের উন্নতি করছে। এখানে হাসপাতাল ছিলোনা।

এখন ব্যক্তিগত উদ্যোগে হাসপাতাল হয়েছে। মুবিন জানে এখন হাসপাতাল গিয়ে কিছুই হবেনা। সেখানেও তালা ঝুলানো হয়ে গেছে। এমন তাগিদের সময় আল্লাহর নির্দেশই বা কি? মুবিন এ প্রশ্নের উত্তর জানেনা। তবে মন বলছে এভাবে নির্জিব ভাবনার কোন মানে হয়না।তার সামনে একটি মেয়ে মৃত প্রায় পড়ে আছে।জীবন সেটা। সেটা আল্লাহর সৃষ্টি। এটাই বড় কথা। মুবিন মেয়েটির পালস দেখতে হাত স্পর্শ করলো। হাত বরফ শীতল হয়ে আছে। মুবিন আর অপেক্ষা না করেই মেয়েটিকে ভিতরে নিয়ে গেল। খাটে শুইয়ে দিলো। সংকোচ আর লজ্জাবোধ মুবিনকে আড়ষ্ট করে ফেলেছে। ওর শরীর গরম করা দরকার। ভিজা কামিজ বদলানো দরকার। মুবিন ভাবতে পারছেনা এসব কিভাবে হবে।তবে করা জরুরী। শুধু জরুরী নয় অত্যন্ত জরুরী। রক্ত থামছেনা। কোথা থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে তাও স্পষ্ট নয় সে।চৌদ্দ পনেরো বছরের একটি মেয়ে। ফুটন্ত চেহারা। দীপ্তিময় মুখ। মায়াময় চোখ। পোষাকেই বোঝা যায় সে অসহায়ত্বের মাঝে বড় হয়েছে। মুবিন স্পষ্ট না হলেও রক্তের প্রবাহ সম্পর্কে তার ধারনাই ঠিক।নিজের বিবেকের সাথে মহাযুদ্ধ করছে মুবিন। নিজেকে আল্লাহর স্মরণে রেখে একটা কম্বলে ঢেকে দিলো মেয়েটির দেহ।শুধু হাতের প্রবেশে কামিজ বদল করলো।আর কিছুই নেই। হাতে পায় দ্রুত মালিশ করতে থাকে মুবিন।যতগুলো চাদর, কাঁথা ছিলো সবই দেহের উপর ঝুড়ে দেয়া হলো। কয়েক ঘন্টা চলে গেলে মেয়েটি চোখ খুলে। চোখ সাদা হয়ে গেছে।বরফ জলে ভিজিয়ে দিলে যেমনটি হয়। পুরোপুরি মেলতে পারছেনা চোখ। শরীরে শক্তি পাচ্ছেনা। হাত নাড়াতে চেয়েও ব্যর্থ হচ্ছে। আঙুল নাড়াতে পারছে কিছুটা। মুবিনের কাঁন্না পাচ্ছে। কাঁন্না দেখলে অনেকেরই কাঁন্না পায়। মেয়েটি কাঁন্না করছে। নিঃশব্দ কাঁন্না। শুধু চোখ থেকে জল পড়ছে। ক্রমেই হাত পা শীতল লাগছে আরো।মেয়েটি তা বলতে পারছেনা। মুবিন লক্ষ্য করলো মেয়েটির হাত, মুখ কেমন সাদা ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে। মুবিনের গা জমে যাচ্ছে। কি করবে সে।

রাত তিনটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট।ঝড় থেমেছে।চারদিক স্তব্দ। মেয়েটি একটু শব্দ করলো যেন।মুবিন অস্থির হয়ে উঠলো।”এ বোন তোমার কি হয়েছে? কারা তোমার এ অবস্থা করেছে? নাম কি তোমার? কোন বাড়ি। বলো, আমি তোমাকে পৌঁছে দিবো? মেয়েটি এতো কথার জবাব দিতে পারলোনা।শুধু কয়েকটি কথা বলে আবার চুপ হয়ে গেলো।”আপনি কেন পৌঁছাই দিবেন? আপনিওতো পুরুষ মানুষ ভাই?” মেয়েটি চোখ বন্ধ করে ফেলেছে।সারা মুখ,হাত সাদা ফ্যাকাসে। মুবিন চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেনা।একটি মেয়ের মনে পুরুষ কথাটার মানে এইভাবে গ্রথিত ছিলো।যার জবাবে মুবিন কাঁন্না থামাতে পারছেনা। মুবিন বাইরে চলে আসে।এদিক সেদিক ছুটাছুটি করছে আর চিৎকার করছে।কে কোথায় আছেন বেরিয়ে আসুন। আমার ভিসন বিপদ! রাতের বৈরিতা শেষে সবারই ঘুম ভালো হওয়ার কথা।শেষ সময়ে ঠান্ডা পরিবেশে বেশ পরিতৃপ্তি নিয়ে ঘুমাসবে সবাই,এমনই আশা করা যায়।অনেকে সেই আশার পূর্ণতা দিচ্ছে। আবার যাদের খুব সকালে জেগে ওঠার অভ্যাস,তারা হয়তো এমনিই জেগেছিল।শুধু অলস গড়াগড়ি চলছিলো বিছানাতে। উম ভেঙ্গে উঠতে ইচ্ছে হিচ্ছিলনা। যাদের গাছের ডালা ভেঙ্গেছে তারা মুবিনের আগেই হয়তো উঠেছিলো। মুবিনের আকস্মিক হৈচৈ শুনে তারাই প্রথম এলো। বাড়ি ভর্তি মানুষ জমায়েত হতে বেশি সময় লাগলোনা।ততক্ষণে ঘড়ির কাটাও থেমে থাকেনি। এলাকার সবাই না এলেও মন্দ ভালো সমালোচনার জন্য যথেষ্ট লোক জমায়েত হয়ে গেছে।নানান জনের নানান মন্তব্যে ঠোট ভিজে যাচ্ছে।

মুবিন বিস্ময়ে বিমুঢ়। ঝড় তূফানের এই রাত্রিতে এই মাইয়্যাউগ্যা তোমার কাছে এমনিতেই আইয়্যা পড়লো বাবা মুবিন? তোমারে তো ভালো পোলা হিসাবেই জানতাম! একজন ভালো মানুষের আড়ালে এমন একটা শয়তানি চেহারাও থাকতে পারে? আহা! এমন কচি একটা মাইয়্যা!!! মুখের কাপড় সরিয়ে অনেকেই দেখছে মেয়েটাকে।যে দেখছে সেই আহা হা! বলে বিলাপ করে উঠছে। কেউ কেউ মুখে তালা দিয়ে মুবিনের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা মুবিনের সাথে তাদের চিন্তা ও সন্দেহকে মিলাতে চাইছে। কেউ শ্নেহ মাখা ভঙ্গিতে জানতে চাইছে” বাবা মুবিন কি হয়েছিলো খুলে বলো!” তবে এ সংখ্যাটা এতো সীমিত যে তা মুবিনকে প্রকৃত ব্যাপার বলা থেকে বিরত রাখছে।মুবিন বুঝতে পারছে তার কথার কোন রুপ বিশ্বাস কাউকেই করাতে পারবেনা।তার আকুতি মিনতি বোবা হয়ে গেছে।মহিলারা এসে মেয়েটির দেহ নিয়ে নাড়াচাড়া করছে।আর আহা হা! বলে আফসোস করছে।সারা বিছানা রক্তে লাল হয়ে আছে।রক্ত থামানো হলে মেয়েটা বেঁচে হয়তো যেতো। কিন্তু সে উপায় ছিলোনা মুবিনের।মুবিন কি তাহলে ধর্ষক খুনী হয়ে গেলো।এই মেয়েটা কেন তার সত্যিটা তাকে বলে গেলোনা? তাহলে তো মুবিন কিছু না কিছু বলতে পারতো।যেটা কে অবলম্বন করে কোন কুলু পাওয়া যেতো।এখন সে কি বলবে।শোঁক প্রকাশের স্থলে অনেকেই ক্ষোভে ফেটে পড়ছে।”এ ছেলে ধর্ম পালনের নামে অধর্ম করে চলেছে বলেই আজ আল্লাহ সব প্রকাশ করে দিয়েছে!” মুবিনের নিরব চোখের জল সে অপবাদ থামাতে পারছেনা।মতি মেম্বর খুব হুঙ্কার দিয়ে কথা বলছেন।”এই…. এই ছেলে যেন ঘর থেকে বের হতে না পারে।” সবাই চোখ রাখো। ” মুবিন যাবেনা।অপবাদ নিয়ে পালানো জীবন কোন জীবন হতে পারেনা।কেউ বিশ্বাস করুক না করুক সে শেষ পর্যন্তই থাকবে।গ্রামের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে গেছে তুমুল ভাবে।সেকান্দার ও তার সহযোগীরা খুব সাবধানী মনে মানুষের ভিড় ঠেলে ঘরের ভিতরে এলো।আহা হা! বলে তারাও বিলাপ করছে। চাচাজান,কতো নির্মম হলে এভাবে পারে,চাচাজান…..।

তাদের বিলাপ শুনে কারোরই মনে হবেনা,এরা দূরের কেউ।চাচাজান,ওরে আইনের হাতে তুইল্যা দেন। ওর মতো মানুষেরাই ধর্মের বদনাম ছড়ায়।ধর্ম না হয় গেলো কিন্তু এমন ফুট ফুটে জীবন আর আসবে চাচাজান?আসবেনা চাচাজান আসবেনা।এর একটা বিহিত করতেই হইবো চাচাজান।মুবিন কে কেউ কিছুই বলার সুযোগ দিচ্ছেনা।সে যতই বলতে চাচ্ছে ততই পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে উঠছে।চোর কি কখনো চুরি করে বলে আমি চুরি করেছি? বলেনা।মুবিনও চোর সাব্যস্ত হয়ে গেলো সমাজের মানুষের কাছে।যাদের সুখে দুঃখে,বিপদে আপদে মুবিন দৌড়েছিলো,আজ তারা সামান্য বিশ্বাসও রাখতে পারেনা। সেকান্দার ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।বিচলিত সে তবে বুঝতে দিচ্ছেনা কাউকে।চাচাজান পুলিশকে খবর বলা হয়েছে?”না সেকান্দার,হয়নাই!” সেকান্দার তার সহযোগী রতনকে ডাকে।”এই রতন তুই এইখানে থাক,আমি যাই পুলিশ খবর দিয়া আসি।” খবর দিয়া আসি কি রে! সাথে কইরা নিয়া আসবি।” ফেদুল্ল্যা ভাই যে!” হু আমিই। যা তুই দেরি করিসনা। আমিও আছি। অসিরে আমার কথা বলিস। মুবিন বাকরুদ্ধ! এটা কোন পরিক্ষা সে নিজেও জানেনা। আইনের সুশাসন সমাজ থেকে পুরোপুরি উঠে না গেলেও রাষ্ট্র থেকে উঠে গেছে বলা চলে। যেখানে মুবিনের মতো ছেলের চাকরি চলে গেছে তার পোশাক ও বেশভূষার জন্য, সেখানে এ বিচার তুচ্ছ।এখন দর্বত্রই জেলখানা মনে হয় মুবিনের কাছে। নাহয় কৃত্রিম জেলখানায় যাবে। তাতে তার দুঃখ বা আক্ষেপ ছিলোনা। তার দুঃখ এতো বড় মিথ্যা মাথায় করে যাওয়া।

সকাল ১০.০০ টা নাগাদ পাশের গ্রামের ফরিদ মিয়া হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মুবিনের ঘরে ঢুকে। মেয়ের মুখ দেখে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। মুবিন চোখের জল রাখতে পারছেনা বটে কিন্তু লুকাতে চেষ্টা করছে। কানাকানি চলছেই। ছেলেটা এতো ভালো কিন্তু…..। ছিঃ ছিঃ ছিঃ….। জেলের ভয়,মৃত্যুর ভয় মুবিন কে বিচলিত করছেনা মোটেই। পাঁজর বিদ্ধ করছে ছোট শব্দের ছিঃ। অশ্রু গড়িয়ে পড়ে অলক্ষ্যেই। ভিড় ঠেলে কয়েকজন পুলিশ ভিতরের দিকে এগিয়ে এলো। মুবিন এক পলক চেয়ে পরের পলক তাকালো। সেকান্দার কে সাথে দেখা যাচ্ছেনা। সেকি খবর বলেই কেটে পড়েছে। রতন কে এখানে? রতন জবাব দেয়।”আমি ভাই।” পুলিশেরা কিছুটা অবাক হয় রতনের জবাবে।” পুলিশ তো তোমাদের ভাই ই! তাই তো তোমরা ভাই বলো।”রতন মুচকি হাসে। একজন পুলিশ এগিয়ে এসে রতনকে হাত কড়া লাগিয়ে দিলো। উপস্থিত শত চোখ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সেদিকে।ফেদুল্ল্যা কথা বলে উঠলো। “কি করছেন দারোগা?” কি করছি সেটা যা দেখছেন তারও বেশি টের পাবেন কিছুক্ষন পরে। ফেদুল্ল্যা আবার কথা বলতে চাইলো।তবে পুলিশের ধমক তাকে থামিয়ে দিলো। মেম্বর এতোক্ষন চুপ ছিলেন।

এখন সে কথা বলছে। দারোগা কামডা মনে হয় আপনে ভুল করতাছেন।” চুপ, আমরা জানি কোনটা ভালো কোনটা খারাপ।ভালোয় ভালোয় সোজা হয়ে যান,নচেৎ অচিরেই ধরা পড়ে যাবেন। আমাদের সামান্য দূর্বলতায় আজ মানুষ আইনের প্রতি শ্রোদ্ধা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে কিন্তু আর সেটা হবেনা। জনগন কথা বলবেনা। এখন থেকে কথা বলবে আইন। আইনের শাসন দেখবে জনগণ। আমরা দুঃখিত মুবিন ভাই,আমাদের সাথে আপনাকে একটু থানায় যেতে হবে। আমাদের কিছু তথ্য দরকার। সেকান্দারকে আমরা আটকে রেখেছি। তার আগ্রহ আমাদেরকে সন্দেহে ফেলে দিয়েছিলো তাই, আমরা ওকেই আটকে রাখি। যখন শুনলাম লাশ এখানে তখনই আমাদের ধারনা মোড় নেয়। থানার বারান্দায় রক্তেত দাগ সকালে এসেই আমাদের চোখে পড়ে। তখনই সন্দেহ হয় কেউ এসেছিলো। সেই মেয়ে মৃত্যুর জন্য আবার তার কাছেই কি করে আসে যে তাকে…..দারোগা কেঁদে ফেলেছেন। উপস্থিত লোকেরা হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।কারো মুখে কোন কথা নেই।পুলিশের নির্দেশে লাশ তাদের ভ্যানে উঠানো হলো। উপস্থিত লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। মুবিন পুলিশের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। তার বিশ্বাস পরিবর্তন হতে শুরু করেছে।কারন, পরিবর্তন হতে শুরু করেছে সব…..।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত