কুমড়ো ফুলের বাসর

কুমড়ো ফুলের বাসর

ঈশান কোণে কালো মেঘের শোকের মিছিল। বাংলার সুনীল সুবিশাল আকাশে মেঘবালিকাদের অবাধ ছুটোছুটি। কিছুক্ষণ পরই হয়তো তাদের যৌবন অমৃতরস হয়ে ঝরে পড়বে তৃষ্ণিত বসুধার বক্ষে। তাইতো বনের পাখিগুলোরনীড়ে ফেরার এত
তাড়া।তাড়া নেই শুধু তারুণ্য দাসের।পাহাড়ের গায়ে হাত-পা ছড়িয়ে আনমনে বনপানে তাকিয়ে আছে।

এক অন্তর্ভেদী দীর্ঘশ্বাস নির্গত হল তার বুক চিরে।উদ্দাম পবন তারুণ্যেরে কাঁচাপাকা এলো চুলে বিলি কেটে চলেছে। এইতো সেই বন যেখানে লতার হাত ধরে তারুণ্যের শৈশব আর কৈশোরের সোনালী দিনগুলো কেটেছে। আজ সেই দুর্দান্ত স্মৃতিগুলো রোমন্থন করেই তারুণ্যের নিঃসঙ্গ দিনগুলো কাটে।

লতা তারুণ্যের মামাতো বোন ছিল।ভয়ানক জলোচ্ছাসে ওর মা-বাবা মারা গেলে তারুণ্যের মা-ই ওকে লালন পালন করে।এমনই ঘনঘোর বর্ষায় মায়েরবজ্রভয় উপেক্ষা করে তারা ছুটে যেত আমতলায়,আমকুড়োতে।এ বেলায় কোনোছাড়াছাড়ি নেই। কে কত বেশি আম কুড়োতে পারে তা নিয়ে হত তুমুল প্রতিযোগীতা। কত ঝগড়া যে হত এ সময় তা মনে করলে এখনো তারুণ্যের হাসি পায়।একবার তারুণ্য ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হল।বাইরে কালো মেঘের ভেলাগুলি যেন ওদের সিংহনাদ করে ডাকছে।তারুণ্য আড়চোখে লতারদিকে তাকাতেই লতা ওকে ভেংচি দিয়ে আমকুড়োতে ছুটলো। রাগে দুঃখে তারুণ্য ঠোঁট কামড়াতে লাগলো,ছটফট করতে লাগলো বিছানায়।ইস্ জ্বর আসার আর সময় পেলনা যেন।একটু পরেই আঁচল ভর্তি কাঁচামিঠা আম নিয়ে কাকভেজা হয়ে ঘরে ঢুকলো লতা।তারুণ্য রাগে অন্যদিকে ফিরলো।লতা মুচকি হেসে আস্তে আস্তে সামনে এসে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলেছিলঃ তরুদা, এসবগুলো আম তোমার জন্য এনেছি।

সেদিন সত্যি তারুণ্য খুব অবাক হয়েছিল।মনের অজান্তে চোখে জল এসে গিয়েছিল। লতার সামনে তা লুকাতে কত বাহানাই যে সেদিন ধরতে হয়েছিল। লতার শ্যামাঙ্গ বেয়ে সেদিন চুইয়ে পড়েছিল বারিধারা।তা থেকে লতার নয়নধারা পৃথক করতে পারেনি তারুণ্য।সারাদিন ছুটোছুটি করে সময় কাটতো ওদের।ধুতুরা ফুলে ছেয়ে যাওয়া শান বাধানো পুকুরে সাঁতার কাটা, বড় নদীতে মাছ ধরা, মায়ের কাছে পাঠশালার নাম করে বন বাঁদারে ঘুরে পাখির বাসা, ছানা, ডিম খোঁজে বেড়ানোই ছিল ওদের কাজ। তারুণ্য যেন ছিল এ বনের তালপাতার মুকুটধারী অঘোষিত সম্রাট। আর সম্রাজ্ঞী? সে আর শ্যামসুন্দরী লতাব্যতিত কে হবে? বনে আসা মাত্রই পাখপাখালিগুলো কিচিরমিচির করে যেন তাদের বনরাজরাণীদের শুভেচ্ছা জানাত।এ বনে কত যে বনভোজন করেছে দুজন তার ইয়ত্তা নেই। লতা ভাল রাঁধতে পারতো।তারুণ্য ‌রাঁধুণী বলে কত ক্ষেপিয়েছে ওকে।প্রকান্ড ধাউস ঘুড়ি আকাশে উড়াততারুণ্য।লতা নুপূর পায়ে ছুটতো সেই ঘুড়ির পিছু। ওর রূপোর নুপূর থেকে যেন ঘুঙুরের মতো আওয়াজ হতো।পূর্ণিমার উজ্জ্বল চাঁদ যখন মাঠে প্রান্তরে ছড়িয়ে দিত অকৃপণ আলোঠিক তখনই সকলের অগোচরে চুপিসারে হাত ধরে বনের ধারে হাসনাহেনা গাছটার কাছে আসতো দুজন।হাসনাহেনার সঘ্রাণ মাতোয়ারা করে দিত দুজনকে।কানামাছি খেলার এটাইতো মোক্ষম সময়। একবার কানামাছি খেলার সময় লতার পা কেটে গিয়েছিল।তারুণ্য দূর্বাঘাস ঢলে লাগিয়ে দিয়েছিলতার পায়ে।সেদিন লতার চেয়ে তারুণ্যই যেন বেশি কেঁদেছিল।আর তা পরবর্তীতে তারুণ্যকে অনুক্ষণ স্মরণ করিয়ে লজ্জা দিতে লতা কখনোই ভুল করতনা।আরেকবার জলপাই পারতে গিয়ে তারুণ্যের গাছ থেকে পড়ে গিয়ে পা ভেঙে যায়। সেদিন বেচারী লতার সে কী কান্না। যেন পা ওরই ভেঙেছে, তারুণ্যের নয়। জাম খেয়ে লতা যখন মুখ রঙিন করে ফেলত কিংবা পাকা করমচায় লালে লালহয়ে উঠতো ওর মুখ তখন যেন ওকে পরীস্থানের নিটোল স্বাস্থের অধিকারী বাদশাহজাদীর মতোই লাগতো। কুমড়োর ফুল ওদের দুজনের কাছেই খুব প্রিয় ছিল।এত বনফুল থাকতে কেন যে কুমড়োর ফুলই ওদের এত পছন্দের হল তা শুধু ওরাই জানে।

বকুলতলায় একদিন তারুণ্যের হাতে মেহেদী লাগিয়ে দিচ্ছিল লতা।তারুণ্য হাস্যচ্ছলে বলে বসলঃ লতা, তুই আমার বৌ হবি?এই কুমড়ো ফুলের বাসর হবে আমাদের। এ বনে ঘর বেধেথাকবো আমরা। লতার মুখ লাজে মেহেদীর মতোই লাল হয়ে গিয়েছিল।আর হবেইতো।ওতো এখন আর সেই খুকিটি নেই যে মাথায় ঘোমটা টেনে বসবে।বললঃ যাঃ তরুদা, সত্যি তোমার লজ্জা নেই। সেদিন তারুণ্যের যা হাসি পেয়েছিল।এভাবেই সবকিছু চলছিল। কিন্তু নারকীয় তান্ডবে একদিন সব কিছুই যেন ধ্বংস হয়ে গেল। যেন ধস নামলো দুজনের স্বপ্নসৌধে।তারুণ্য এখন যে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে একদিন লতাও ছিল তার সাথে। দখিনা বাতাসে লতার বেয়াড়া চুলগুলো বারবার সমুদ্রেরর ঢেউয়েরমতোই আছড়ে পড়ছিল তারুণ্যের মুখে।তারুণ্য নির্বিকার হয়ে তাকিয়ে ছিল অস্তগামী সূর্যের দিকে। হঠাৎ তারুণ্য বলে উঠলোঃ আমাদের বাংলার সৌন্দর্যে আজ শকুনের শ্যেন দৃষ্টি পড়েছেড়ে লতা।আমাদের স্বপ্নসংসার বাঁচাতে হলে ওদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে হবে।লতা সবিস্ময়ে তারুণ্যের শক্ত চোয়ালের দিকে তাকিয়ে বলেছিলঃ কী করবা?

লতার জিজ্ঞাসুনেত্রের দিকে না তাকিয়েই তারুণ্য বলেছিল, যুদ্ধে যাব।

তারুণ্যের কথা শোনে লতা উচ্চস্বরে খিলখিল করে হেসে উঠলো। সে হাসির প্রতিধ্বনি তোপধ্বনির মতোই বেজে উঠেছিল তারুণ্যেরকানে।রাগে ঠাস্ করে এক চড় বসিয়ে দিয়েছিল লতার গালে।কিন্তু লতা হেসেই চলল।সে হাসিতে কষ্টের যে ভ্রুণ নিহিত ছিল তা তারুণ্য লক্ষ্য না করেই রাগ করে চলে এসেছিল।

যখন যুদ্ধের উদ্দেশ্যে তারুণ্য রওনা হয়েছিল তখন লতার সাথে তার শেষ কথা হয়েছিল ঐ বকুলতলায়।: লতা, তোকে আজ এক সত্য কথা বলব?: বলো তরুদা…: আমি সত্যি তোকে খুব ভালবাসি।মূহুর্তেই লতার মুখের মলিনভাব দূর হয়ে গেল।ফুটে উঠলো এক চিলতে মিষ্টি হাসি।তারুণ্যের গলা জড়িয়ে ধরে বলেছিলঃ ইস্ কী আমার সত্যবাদী যুধিষ্ঠির।তুমি কীচক বধ করে ফিরে আস, আমি হলদে সুতোয় বকুলফুল আর ঘাসফুলের মালা গেঁথে তোমায় বরণ করে নিবো।

তারুণ্য হেসে লতার কপালে এক চুমো বসিয়ে দিয়ে বলল, বিদায়বেলা কাঁদতে নেইরে লতা, আমায় হাসি মুখে বিদায় দে।লতা আঁচল দিয়ে মুখ মুছে একটু শুষ্ক হাসি দিতেই তারুণ্য ধূলিধূসারিত পথ ধললো।যতদূর দেখা যায় সে পর্যন্ত পলকহীন নেত্রে তাকিয়ে রইল লতা।অব্যক্ত যন্ত্রণাগুলো যেন অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ছে।

দীর্ঘ নয়মাস যুদ্ধর পর বাংলার স্বাধীন নীল আকাশে ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে সিংহনাদ করতে করতে এক বুক আশা নিয়ে নিজ গ্রামে এসেছিল তারুণ্য।ভেবেছিল এতোদিনে লতা না জানি কত মালা গেঁথেছে আর বাসি হয়েছে বলে ছিঁড়েছে।আবার নতুন মালা গেঁথেছে তার জন্য।আজ তা নিজ হাতে পরিয়ে দিবে তার গলায়।

কিন্তু গ্রামে আসার পর দেখলো আর কিছু অবশিষ্ট নেই।সব ছারখার করে দিয়েছে হায়েনার দল।যারা বেঁচে ছিল ভাগ্যের জোরে কালের সাক্ষী হয়ে তাদের কাছ থেকে তারুণ্য শুনলো সবকথা।পাকিস্তানীরা এসেছিল গ্রামে।পুড়িয়ে ভস্ম করে দিয়েছে পুরো গ্রাম।তারুণ্যের বাবা মা কেউ বেঁচে নেই।সবাইকে গুলি করে মেরেছে ওরা।ওদের কুনজর থেকে রক্ষা পায়নি লতা।জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে মহাউল্লাসে নিজেদের মনোস্কামনা চরিতার্থ করেছে হায়েনার দল।নিজেরকৌমার্য বিসর্জনের শোক সইতে পারেনি লতা।আর তাই পুকুরপাড়ের ধুতুরা ফুলের গাছ থেকে গুণে গুণে পাঁচটি ধুতুরা ফুল খেয়ে নেতানোলতার মতোই নেতিয়ে পড়েছিল সে।আর তারপর তারুণ্যের অভিমানী লতা চিরনিদ্রায় শায়িত হয়।

কেউ সৎকার করেনি ওর দেহ। শেয়াল শকুনগুলো হয়তো কিছু অংশ খুবলে খেয়েছে আর বাকীটা মিশে গেছে ওর প্রিয় বাংলার মাটিতে।তারুণ্যের সিংহনাদ যেন আর্তনাদে রূপ নিল, অন্তরে রাজ্যের হাহাকার পড়ে গেল। হাটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়লো তারুণ্য। তার এক চিৎকারে মড়া ফেলেই উড়ে গেল একপাল শকুনের দল।

প্রচন্ড শোকে তারুণ্য হতবিহ্বল, চোখের জল যেন ভেতরেই মরে গেছে। সেই থেকে সকলের নিষেধ উপেক্ষা করে এ বিরান শ্মশানে সে একাই থাকে। আজ স্বপ্নের আকাশে বেদনার মেঘের অবাধ আনাগোনা। জীবনের বড় বড় স্বপ্নগুলো ভেঙে গেছে, আকাশচুম্বী আশাগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেছে। এখন শুধু প্রিয়জনের স্মৃতিগুলোকে সম্বল করে বাংলার অপরূপ প্রকৃতির মাঝে নিজেকে সঁপে দিয়েছে তারুণ্য।এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখে জল এসে গেল তারুণ্য তা বুঝতেই পারলনা। আকাশও বুঝি কাঁদছে। কিন্তু আকাশ যে উদার। আর তাই তার আখি জল শীতল, মানুষের অশ্রুর মতো বিস্বাদ কিংবা উষ্ণ নয়।

বৃষ্টির জলে কাকভেজা হয়ে কুটিরে ফিরল তারুণ্য। বৃষ্টিতে ভেজার কারণে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে। আজ আর সান্ধ্য প্রদীপ জ্বালানো হলনা, করা হল না সন্ধ্যা পূজা। ছোট্ট বিছানায় গা এলিয়ে দিল। রাজ্যের ঘুম যেন নেমে এল তার দুচোখে।হঠাৎ কেউ ডেকে উঠলোঃ তরুদা,তরুদা…সন্ধানী দৃষ্টি মেলে তাকাল তারুণ্য।

: কে? কে ডাকে আমায়?

: আমি…: আমি কে?

হঠাৎ বিজলীর ঝলকে তারুণ্য দেখতে পেল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে লতা।সেই ভুবন ভুলানো এক চিলতে হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল, কেমন আছ তরুদা? তারুণ্য সবিস্ময়ে তাকিয়ে আছে লতার দিকে। হায়েনাদের পাষাণ চিহ্ন এখনো ওর গালে স্পষ্ট।

: লতা

: হাঁ

: এতদিন পর মনে পড়লো আমার কথা? কতদিন অপেক্ষা করেছি তোকে একনজরদেখার জন্য। হাসনাহেনা গাছের নিচে কত রাত জেগেছি তোর জন্য, তুই আসবি বলে। আর আজ তোর আসার সময় হল? এক রাশ অভিমান যেন ঝরে পড়ল তারুণ্যের কণ্ঠ থেকে।

: আমি তো সবসময় তোমার কাছে কাছেই থাকি তরুদা। কখনো তোমার বুকের মাঝে, কখনো দোয়েল শ্যামার বেশে বাংলার মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়াই,কখনো বা বসন্তর কোকিল হয়ে তোমায় গান শোনাই। তোমার পায়ের নিচের ঘন সবুজ দূর্বাদল যে আমারই প্রতিরূপ। হাসনাহেনার হ্নদয় আকুল করা সুঘ্রাণ যে আমারই হ্নদয় নিংড়ানো ভালবাসার সুভাষ। কুমড়োগাছের কচি ডগা চুইয়ে যে শিশির ফোঁটা তোমার মাথায় পড়ে তা যে তোমার প্রতি আমার ভালবাসারই শ্রদ্ধার্ঘ্য।

: কেনো হারিয়ে গেলি লতা? আমায় একা রেখে কেনো চলে গেলি? কেনো আমায় নিয়ে গেলি না সুদূর পরপারে। এ যাতনা যে আমি আর সইতে পারছিনা! তারুণ্যের কণ্ঠে অসহিষ্ণুতার তীব্র বহিঃপ্রকাশ।

: আমিতো হারিয়ে যেতে চাইনি তরুদা। ও…ওরাই যে আমায় বাঁচতে দিলোনা। তোমার জন্য গেঁথে রাখা বকুল ফুলের মালা ওরা ছিঁড়ে ফেলেছে, লাল ঘাসফুলগুলো পায়ে দলে পিষে দিয়েছে। আমি কিছুই করতে পারিনি তরুদা, কিছুই করতে পারিনি…

: আমাদের স্বপ্নের কুমড়ো ফুলের বাসর আর হল নারে লতা, আর হলনা…

অশ্রুতে ভারি হয়ে এল তারুণ্যের দুচোখ। ঝাপসা চোখে দেখতে পেল পুকুরের কাকচক্ষু জলের মতোই লতা নড়ে উঠল। তারপর মিলিয়ে গেল শূন্যে।ধড়ফড়িয়ে জেগে উঠল তারুণ্য। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল ঠিক ঠাহর করতে পারেনি। হঠাৎ এক ঘুঙুরের আওয়াজ কোথা থেকে যেন ভেসে এল। ওই তো দুয়াড়ে দাঁড়িয়ে কেউ হাতছানি দিয়ে ওকে ডাকছে।

সম্মোহনের মতো বাইরে বেরিয়ে এল তারুণ্য। কোনো স্বর্গীয় অপ্সরী যেন নেচে বন মাতিয়ে রেখেছে। বনের দিকে এগিয়ে গেল সে। সারাদিন বৃষ্টির পর একফালি চাঁদ উঁকি দিয়েছে আকাশে। তা থেকে আলো যেন ঠিকরে বেরুচ্ছে। আর সে আলোয় নেচে যাচ্ছে এক শ্যামসুন্দরী। আরে এ যে লতা! বনের তরুলতা, পাখপখালি যেন মুগ্ধ হয়ে দেখে চলেছে সেই নৃত্য। শো শো শব্দে বয়ে চলা পবন আর পাতার ঘর্ষণে যেন সৃষ্টি হয়েছে অপরূপ বাঁশির সুরমূর্ছনা। জোনাকির নিভু নিভু আলো, নদীর কলকল ধ্বনি, হাসনাহেনার মধুর ঘ্রাণ আর লতার নৃত্য যেন এক অপূর্বদৃশ্যের অবতারণা ঘটিয়েছে। এ যেন স্বর্গীয় দেবতাদের মিলনমেলা। তারুণ্য বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বসে পড়লো কুমড়োর মাচার নিচে সবুজ দূর্বাদলে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে লাগলো লতার উদ্দাম নৃত্য। ঘুঙুরের তালে তালে বনটাও যেন কেঁপে উঠছে। বিস্ময়ের ঘোর তারুণ্যের তখনো কাটেনি।হাসনাহেনার মনমাতানো সুঘ্রাণে সবুজ লম্বা দূর্বাদলে তারুণ্য এলিয়ে দিলো নিজের দেহ। বৃষ্টিভেজা আর্দ্র মাটির গন্ধে সহজেই বুজে এল ওর দুটি চোখ। এ বাংলার মাটি যেন ওকে অদৃশ্য স্নেহডোরে বেঁধে রেখেছে। ঘুমের মাঝে মাথার ঘনকালো চুলে মল্লিকা ফুল গুজে আবার এল সেই শরমকুণ্ঠিতা ষোড়শী পল্লীবালা, লতা। এখন আর তার মুখেহায়েনার পাষাণ চিহ্ন নেই। চারপাশে নেই কোনো ধ্বংসাবশেষ। চিরসবুজগাছগাছালিতে ছাওয়া সেই বনটিতেই তারা দাঁড়িয়ে। লতা যেন চিৎকার করে বলছে, আমি তোমার কাছ থেকে হারিয়ে যাইনি তরুদা, ভেঙে যায়নি আমাদের কুমড়ো ফুলের বাসরঘরের স্বপ্ন। অতঃপর লতা যেন ঝাপিয়ে পড়তেচেয়েছিল তারুণ্যের বুকে। কিন্তু তাদের মাঝে অবস্থান করা এক কঠিনঅদৃশ্য দেয়ালে বাঁধা পেয়ে লতা পিছে সরে গেল। হাজার চেষ্টা করেও লতা ভাঙতে পারলোনা সে দেয়াল। তারুণ্য শুধু শুনতে পেল ওর চুড়ি ভাঙার শব্দ। অধোমুখে অশ্রু বিসর্জন করে লতা চলে গেল। তারুণ্য শতচেষ্টা করেও যেন ওকে আটকে রাখতে পারলোনা।

কুমড়োর কচি লতা চুইয়ে শিশির ফোঁটা মাথায় পড়তেই জেগে উঠল তারুণ্য। কুমড়ো লতার ফাঁক দিয়ে আড়চোখে চিরায়ত বাংলার সৌন্দর্যেরপ্রতীক রক্তিম সূর্যকে একবার দেখে নিল। উঠে দাঁড়ালো তারুণ্য। কোথায় সেই লতা, কোথায় মিলিয়ে গেল সেই ঘুঙুরের মনোমুগ্ধকর আওয়াজ? কিছুই যে নেই। শুধু বাংলার প্রকৃতি তার শ্বাশ্বত অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে রোজকার মতো জেগে উঠেছে। সেদিকে তাকাতেই এক মুচকি হাসি দিলো তারুণ্য। রাতের কথা মনে পড়তেই কিছু পাওয়ার আনন্দ আর কিছু না পাওয়ার কষ্ট মিলিয়ে এক অদ্ভূদ অনূভূতির সৃষ্টি হল তারুণ্যর হ্নদয়ে।

হাটু গেড়ে দূর্বাঘাসে বসে পড়ল সে। এতদিনের অব্যক্ত ব্যথাগুলি যেন শব্দ হয়ে বেড়ুচ্ছে। সে শব্দগুলো মানুষের বুঝার সাধ্য নেই। তা কেবল অন্তর্যামীই বুঝতে পারেন। অঝর ধারায় জল ঝরছে তারুণ্যের নয়ন থেকে। সে জল স্ফটিকের ন্যায় স্বচ্ছ, কিন্তু সফেন সমুদ্রের জলের চেয়েও তিক্ত।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত