রাবারের জুতো

রাবারের জুতো

আনিছ সাহেব। তার ধারনা তিনি জীবনে মাত্র দুটু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যার প্রথমটি মেনে চলেছেন ত্রিশ বছর যাবৎ(সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে)- তিনি বেচে থাকবেন। আর দ্বিতীয়টি- এক জুড়া রাবারের চপ্পল কিনবেন। আজই হয়ত বিকেলে বা সন্ধায়।

প্রতিদিনের মত সকাল ৬.১৫ মিনিটে ঘড়ির এলার্ম শুনে ঘুম থেকে জেগেই কথাটা মনে করলেন। তারপর বিছানায় উঠে বসতে বসেতে ‘আলহামদুল্লিাহ …..’ অর্থাৎ ঘুম থেকে জেগে সৃষ্টিকর্তার নিকট কৃতজ্ঞতা জানালেন। এটা চরম কোন বিশ্বাস থেকে নয় বরং একটা অভ্যাস যেমন আর দশটা। টেবিল ঘড়িটার দিকে এক চরম কৃতজ্ঞতাভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন। কিংবা একটু করুনা যেন তার আর কোন প্রয়োজন নেই। খুব দামী এই ঘড়িটা। অনেক বছর আগে মা মারা যাবার পর কেনা। মায়ের মৃত্যুর পর বেচে থাকাটাকে একটা কর্তব্য বলে মনে করতে থাকেন। মা জন্ম দিয়েছেন, অনেক যত্ন করেছেন। এসব কারনে বেচে থাকাটা যেন মায়ের প্রতি একটা কৃতজ্ঞতা।

একটা নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়ার ক্ষমতাটাই এই ঘড়িটার একমাত্র উপযোগ। আজকের পর যেহেতু আর সময়মত জাগতে হবে না, তাই ধরে নেয়া যায় ঘড়িটার উপযোগ শেষ। কিন্তু উনি জানেন না আজকের পর ৬.১৫ বাজার আরো আগেই তিনি জেগে উঠবেন মোটামোটি নির্ঘুম রাত কাটিয়ে।

গোসল করে, দাড়ি কামিয়ে আয়নার সামনে দাড়িয়ে অল্পকয়টা চুল যা আছে তাতে একটু চিরুনি লাগিয়ে দ্রুত পুরাতন জামা কাপড়ে নিজেকে ভরে নিলেন। বত্রিশ বছর আগের একটা দিন স্মৃতিতে ভেসে উঠল যা অনিচ্ছাকৃত কারন তিনি কখনোই স্মৃতিকাতরতাকে প্রশ্রয় দেন না। স্মৃতি বড় এক মায়া, টেনে নিয়ে যায় বন্ধুর মত তারপর একা ফেলে চলে যাবে এক অচেনা স্থানে। তখন তিনি ত্রিশ বছরের যুবক। নতুন চাকরি। শীতের সকাল। কালো একটা কোট পড়তে পড়তে একটা স্বপ্ন দেখে হেসে ফেলেন। ‘ কেউ একজন কোন দিন কোটের বোতামগুলো আটকে দেবে সামনে দাড়িয়ে’। কিন্তু কেউ কোন দিন তার কোটের বোতাম আটকে দেয়নি, মোজাটা বের করে দেয়নি। একট দীর্ঘশ্বাস চেপে যাবার ভান করে দ্রুত বেরিয়ে পড়লেন।

অগ্রহায়নের সকাল। শনপাপড়ির মত হালকা কোয়াশা। প্রায় জন ও যান শূন্য পথ। মর্নিং ওয়াক করতে বের হওয়া কয়েকজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, আশপাশের গাছে দুএকটা পাখির ডাক। যেন তার ভেতরের মত নৈশব্দ। পথের ধারে দুর্বাঘাসে দুএকটা শিশিরকনা আর একটু পরেই যাদের অস্তিত্ব থাকবে না। মিলিয়ে দেখলেন। প্রথমে তার স্বপ্নের সাথে যারা এভাবে বিলিন হয়ে গেছে তারপর গোটা সভ্যতার সাথে। এইসব অকারন ভাবালুতা বাদ দিয়ে এক বৃদ্ধ দম্পতির দিকে তাকালেন। দুজন একসাথে হাটছেন। অথচ বৃদ্ধা ইচ্ছে করলেই এগিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু সঙ্গির সাথে তাল মিলিয়েই হাটছেন।

জীবনের কথা ভাবতে শুধু পতন শব্দটা মাথায় আসে- যেন একটা পাথর, ওজন আর অনমনীয়তা নিয়ে দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। কিংবা একটা মরা পাতা যার পতন প্রলম্বিত হবে বাতাসের করুনায়। কিন্তু এই বাতাস সবসময়, সবার জীবনকে করুনা করে না, ভাদ্রের নিরাগ দিনে ঝড়ে পড়ে অনেক পাতা, সরল রেখায়। তারপর মিশে যায় মাটিতে কিংবা চুলোর উনুনে।

সবসময় শুধু জীবনের অন্ধকার দিকগুলো দেখে এসেছেন তিনি। এই একটানা অন্ধকার দিকগুলো দেখা কখনো তাকে হতাশ করেনি। দিনের পর দিন কারো সাথে হেসে কথা না বললেও কেউ বলবে না তিনি হতাশ। আর দশটা সাধারণ কিংবা বুদ্ধিমান মানুষ হয়ত এভাবে বেচে থাকায় একঘেয়ে হয়ে উঠতেন। বিপরীতে তিনি কখনোই তা হননি। এটাও তার একটা গোপন অপ্রাপ্তি। একঘেয়েমিক, আর কেউ না করলেও শুধু তিনিই মনে করেন মানুষকে সৃষ্টিশীল করতে পারে আর যারা ইতিমধ্যে সৃষ্টিশীল তাদেরকে করে শৈল্পিক। কারন একঘেয়েমি থাকলেই মানুষ তা থেকে বের হতে চায়। তখনই হয়তবা নিজের অজান্তেই কিছু সৃষ্টি হয়ে যায়।

কোয়াশা কেটে খুব দ্রুত সূর্য উঠছে। সকালটা বেশ সুন্দর। তবুও মনটা অস্থিরতা থেকে বের হতে পারছে না। কিন্তু কিসের এই অস্থিরতা? টের পাচ্ছেন কিন্তু ধরতে পারছেন না। যেন তিনি একটা বাগানে হাটছেন। নিদৃষ্ট কোন্ ফুলের না জানলেও ঘ্রাণটা ঠিকই ভেতরে চলে যাচ্ছে। বত্রিশ বছরের একটা অভ্যাস থেকে আজ মুক্তি পাবেন। আজ অবসরে যাবেন। বত্রিশ বছর হলেও শিক্ষকতা করেছেন মাত্র প্রথম পাচটি বছর তারপর শুধু চাকরি করেছেন। এই মুক্ত হওয়াটা তাকে পুলকিত করছে আবার উদ্বিগ্নও। কেমন করে কাটবে দিনগুলি! যে মানুষটার কোন প্রজন্ম নেই, তার ইতিহাস কত দ্রুত বিলিন হয়ে যাবে কে জানে! কিন্তু কোন প্রজন্ম না থাকাটা কেন ঘটতে দিলেন? থাকতে পারত না কয়েকটা সন্তান? কিন্তু না। এভাবে ভাবলে নিয়তি বলে কিছু থাকে না। নিয়তিই তার অভিভাবক, পথ প্রদর্শক।

স্কুলের পাশের চা দোকানের প্লাস্টিক টোলটা খালি। দুর থেকে দেখে একটু পা চালালেন। কেউ বসার আগে উটা দখল করতে হবে। অনেকগুলো বছর ধরে যে ছেলেটি এই সকালে চা খাওয়াচ্ছে আজ অকারনেই তার সাথে ছোট লোকের মত কথা বললেন- এই চা দে। অভাবিত কন্ঠস্বরে বিস্মিত চাওয়ালা তাকাল। এই তাকানো দেখার না, খুজে বের করার- কোন একটা হারানো মূল্যবান জিনিস। নিজের আচরণের অশোভনতা বুঝতে পেরে চেহারায় একটা কুচকানো ভাব তৈরি করলেন যেন ছেলেটা রাগ না হয়ে বরং একটু করুনা বোধ করে। এই অনুকম্পা পাবার আশা হয়ত এখন থেকে নিয়মিত করতে হবে। শরীরের ওজন বাড়ছে, চশমা পড়ছেন প্রায় বিশ বছর। পাপীর প্রায়শ্চিত্য করার মত গলায় যতটা সম্ভব বিনয় এনে বললেন- আজ চারটা নুনতা বিস্কুট নেবে। দুইটা তোমার, দুইটা আমার। আজ শেষ দিনটা এভাবেই চলবে। তিনি আজ সারাদিন হয়ত এ দিনটাকে শেষ দিন বলবেন। কিন্তু কাল যে কেউ দেখবে তিনি আজ যা করছেন কালও তাই করবেন। ছেলেটির এগিয়ে দেয়া হাত থেকে বিস্কুট নিতে নিতে ভাবছেন যদি ছেলেটি তার সাথে দুর্ব্যবহার করত। তার শরীরে এই ছেলেটির সাথে পেরে উঠার মত শক্তি নেই। আসলে ও আর ছেলে না, যুবক। এই ভয় বিষয়টা একেবারে ছোটবেলায় তৈরি হওয়া। পিতার অন্যায্য শাসন, মায়ের বিরক্ত মুখভঙ্গি এ ভয় ব্যপারটাকে মনের মধ্যে গেথে দিয়েছে। তার ধারনা পিতা জিনিসটাই এমন ভিতিকর। কখনো কখনো ছাত্রের বাবাকে মিথ্যে বলেছেন এই ভয়ে যে, ছেলের পড়ালেখায় মন নেয় বললে হয়ত ছেলেকে পিটাবেন। তিনি চান না কোন বাবা তার সন্তানকে আঘাত করুক।

স্কুলের ঘন্টা বাজতে শুরু করেছে। এই ঘন্টা ধ্বনি তাকে আর অনুরণিত করবে না। যে ঘন্টাটা একটু দেরিতে বাজুক এমনটা সবসময় চায়তেন, আজকের পর এই ঘন্টা ধ্বনি শুনার জন্য হয়ত এক আকুলতা থাকবে। স্কুলে ঢুকেই লকার থেকে বের করলেন বহু দিনের পুরাতন ডায়রিটা যাতে মাঝে মাঝে লিখতেন ছোটখাট সব অনুভুতির কথা। কিন্তু কখনো ভাবেননি এটা কোন প্রয়োজনে কোন দিন খুলতে হবে।

ডায়রির পাতা উল্টাতে উল্টাতে যেন নিজেকে তিনি চিনতে পারছেন না। এসব তিনি কীভাবে লিখলেন? কেন লিখলেন? এই প্রশ্নগুলো করতে চেষ্টা করছেন নিজেকে। তিনিও জানেন উত্তর পাবেন না। খুব দ্রুত চোখ বোলালেন সমস্ত ডায়রিটায়। মনে হচ্ছে এটা তার জীবনের ভবিষ্যৎবাণি। এই ডায়রি থেকে একটা সত্য সাদা কাগজে জলছাপের মত ভেসে আছে। বিচ্ছিন্নভাবে লেখা ডায়রিটা সামগ্রিকভাবে কেমন হবে কখনো ভাবেন নি। তার ডায়রির বৃহৎ অংশ জুড়ে তার পরিবারের লোকজন।

এই মুহুর্তে তিনি খুব চিন্তিত ও একটু অস্বস্তি বোধ করছেন। ডায়রিটা বের করেছিলেন এখান থেকে এমন কোন মধুর স্মৃতি বের করবেন যা আজ তার ফেয়ার ওয়েল সভায় বলবেন, একটু হাসবেন, হাসাবেন। কিন্তু কী হচ্ছে এসব? এমন একটা কথাও লেখা নেই তার ডায়রিতে। জীবনে কি আনন্দময় কোন ঘটনায় তবে ঘটেনি? নাকি ইচ্ছে করেই লেখেন নি? তাহলে আজ তিনি কি বলবেন? নাকি এত দিনের মত আজও ভাব গম্ভির ‘ভালো থাকবেন, দোয়া করবেন’ জাতীয় কথা বলে শেষ করবেন? আরও একটা অস্বস্তির বিষয় হচ্ছে এ ডায়রিটা কেউ যদি পড়ে থাকে- ভীষণ এক অসহায়ত্ব চারদিকে।

আমরাও আনিছ সাহেবের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট করতে চাই না অনেক তীব্র ইচ্ছা সত্বেও। কারণ এই লোকটি বিচ্ছিন্ন একজন লোক নন। যে গোপনীয়তা তার তা আমাদেরও, তা একটি পতিষ্ঠিত সামাজিক ও পারিবারিক শৃংখ্যলার, নির্ভরশীলতার, কখনো ভালবাসার, আবার নিছক দ্বায়িত্ববোধের যা ভালোবাসা ও আবেগহীন। তিনি যা পেয়েছেন তার ব্যাখ্যা নিজেই করেছেন। তার মতে ভালবাসার জন্য বিশেষ কোন কারণ থাকতে হয় না কিন্তু ভালো না বাসতে চাইলে অবশ্যয় তার কারণ হতে হবে যথার্থ। তিনি এই কারণ অনুসদ্ধান করেছেন। কিন্তু যখন কারনগুলো পেয়ে যান তখন নিজেকে ঘৃণা করতে থাকেন। ২০/০২/২০২০ তারিখে তার ডায়রিতে আমরা দেখতে পাব তিনি লিখেছেন- নিজেকে ঘৃণা করছি যেন এই ঘৃণার ভাগটা আমার পূর্ব পুরুষরা পান কারণ স্নেহ কেবলই নিম্নগামী তাহলে ঘৃণা অবশ্যয় উর্ধগামী, আগুনের শিখার মত।

যথারিতী ছুটির ঘন্টা বাজে। ছেলেরা দৌড়াচ্ছে। একটা গোপন অভিপ্রায়ে বাইরে এসে দাড়ালেন- হয়ত কেউ কেউ তাকে সালাম করতে আসবে। স্কুলের শেষ ছেলেটি গেট দিয়ে বের হয়ে যাবার পরও তিনি দাড়িয়ে থাকলেন। অবশেষে তাকালেন বড় গাছটার দিকে। অনেক বড় গাছটা অথচ তার কাছ থেকে কেবল একটু ছায়া ছাড়া আর কিছু মেলেনি কারন তার ফল নেই। তার যেন সেই ধিবরের জীবন যার অনেকগুলো বর্শির একটাতেও মাছ আটকায় না। অবশেষে রাগ করে আর বাকি বর্শিগুলো তুলতেও চায় না।

দাপ্তরিক কাজ কর্ম শেষে ছোট্ট একটা বিদায় অনুষ্ঠান। যার যার মত চলে গেলেন সবাই। প্রধান শিক্ষক তাকে বসতে বললেন। ব্যক্তিগত দু একটা প্রশ্ন করলেন- কি করবেন, বাকি দিনগুলো কার সাথে থাকবেন, ইত্যাদি। আমরা জানি তিনি এভাবে ভাবতেন না। নি:সঙ্গতার আনন্দ নিয়ে তিনি বেচে থাকবেন। এক জোড়া রাবারের চপ্পল কিনবেন- কম দাম, বহুল ব্যবহারেও অনেক দিন টিকে যাবে, বৃষ্টিতে ভিজেও পচবে না, রোদে রং নষ্ট হবে না আর মসজিদ থেকে কেউ চুরি করবে না।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত