২৫ বছর পরে

২৫ বছর পরে

একগাদা চিঠির মধ্যে চোখে পড়ল একটা পুরোনো খাম। অন্তত সাত-আট বছর আগের তৈরি
তো বটেই। খামটার গায়ে কাপ কাপা হাতে লেখা আমার নাম দেখে রীতিমতো কৌতুহলী হয়ে
উঠলুম। তাড়াতাড়ি খামটা খুলে চিঠি পড়তে শুরু করলুম।
কাগজটাও ময়লা। নীচে নাম লেখা সুমিত চন্দ্ৰ’। খুব পরিচিত মনে হল নামটা কিন্তু কিছুতেই
মনে করতে পারলুম না, সুমিত চন্দ্রের সঙ্গে আমার কবে কোথায় পরিচয় হয়েছিল। ভাবলুম চিঠিটা
পড়ি—যদি বোঝা যায়।

ভাই মনোজিৎ,
নির্বান্ধব অবস্থায় পড়ে আছি বছরের পর বছর। আমি খুব অসুস্থ। সব সময় মাথার যন্ত্রণা হয়।
শিমুলতলার এই বিশাল বাড়িটায় থাকার মধ্যে শুধু আমি আর আমার বোন। তাও বোন মৃত্যুশয্যায়।
আমার পাশে এই দুর্দিনে কারোর থাকা দরকার। কিন্তু কে থাকবে? হঠাৎ তোমার কথা মনে পড়ে
গেল। চিরকালই তুমি ডানপিটে-ভয়ডর বলে তোমার কিছু নেই। তুমি এই সময় আমার পাশে
থাকলে আমি অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করব। আমাকে চিনতে পেরেছ তো? আমি..মোটা….”

এইটুকু পড়েই চিনতে পারলুম সুমিতকে। আমার স্কুলের বন্ধু। আমাদের দুজনের মধ্যে খুব ভাব
ছিল। সুমিত ছিল ফর্সা গোলগাল নাদুসনুদুস ভালোমানুষ। ওকে আমরা বন্ধুরা নাম দিয়েছিলুম “মোটা” ”।
সেই নামেই ও আমাদের কাছে পরিচিত ছিল বলেই সুমিত নামটা চট করে মনে করতে পারিনি।
খামটা ভালো করে দেখতে অবাক হয়ে গেলুম। চিঠিটা শিমুলতলা থেকে পোষ্ট করা হয়েছে।
এক বছর আগে। খামের দামটা বেড়েছে। কিন্তু সেভাবে স্ট্যাম্প দেওয়া হয়নি। ভাবলুম—তাই
হয়তো পড়েছিল ডাকবিভাগে। তারপর দয়া করে কেউ সেটা পাঠিয়েছে। এতদিনে সুমিতের কি
অবস্থা হল কে জানে ?

ঠিক করলুম কালই রওনা হব। ক্ষতি কি? বন্ধুর উপকারও করা হবে, বেড়ানোও হবে। কদিনের
ছুটি নিয়ে যাত্রা করলুম শিমুলতলার দিকে। পৌছতে বিকেল হয়ে গেল। চিঠির তলায় ঠিকানা ছিল,
স্টেশনে নেমে একটা রিকশাওলাকে ঠিকানাটা বলতেই সে কেমন করে যেন আমার দিকে তাকাল।
তারপর বলল, ঐ যে বাবু অটো দাঁড়িয়ে আছে ওদের বলুন।
অগত্যা অটো ধরে নির্দিষ্ট স্থানে পৌছলুম যখন তখন প্রায় সন্ধে হয় হয়। অটো থেকে নেমে
সুটকেসটা হাতে নিয়ে ভাড়া চুকিয়ে দিলুম। অটো চলে গেল।

আমি দেখলুম আমার সামনে এক
বিশাল বাড়ি। বাড়ির চারধারে পাথর, মরা গাছ, শুকনো কুয়ো। মাঝখানটা একটা টিপির মতো।
তার ওপর বাড়িটা। কি রং ছিল বাড়িটার এককালে আজ আর বোঝা যায় না। বাইরের অন্ধকার
নেমে আসছে বাড়িটার ওপর, ছাতের পাঁচিলে বিরাট ফাটল। তার গা চিরে বিশাল অশ্বখ গাছের
কেত নেমেছে। মনে হচ্ছে বুঝিবা ভেঙে পড়ল, গা ছমছম করতে লাগল। এ কোথায় এলুম!
নাকে ভেসে এল একটা অশুভ রহস্যময় গন্ধ।

একবার মনে করলুম ফিরে যাই। কিন্তু ছোটবেলা থেকে সাহসী বলে আমার একটা সুনাম ছিল—
সেই কথা মনে পড়তেই দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গেলুম বাড়িটার দিকে। সদর দরজা ভেজানো ছিল,
হাত দিয়ে খুলতে যাব, নিজে থেকেই খুলে গেল। সামনে একটা লোক দাঁড়িয়ে। বোধহয় কাজের
লোক বললুম—সুমিত আছে? আমি ওর বন্ধু।

লোকটা স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমার সুটকেসটা তুলে নিয়ে এগিয়ে
চলল। ওর পিছু নিলাম। মনে হল লোকটা বোবা। দালানের পর দালান, ঘর ফেলে এগিয়ে চলেছি
তো চলেছি। শেষে একটা প্রায় অন্ধকার ঘরে ঢুকে পড়ল লোকটা। আমিও ঢুকলুম। ইলেকট্রিকের
আলো নেই। মোমবাতিও জ্বলেনি। দেখলুম একটা ইজিচেয়ারের ওপর একটা মানুষের দেহ। এতক্ষণে
চোখটা অন্ধকারে সয়ে গেছে দেখলুম চেয়ারের গায়ে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে একটা কঙ্কালসার
দেহ। এই কি সুমিত? সেই কঙ্কালসার দেহে ঠোটটা নড়ে উঠল। বলল—মনোজিৎ এসেছ?

২৫ বছর আগে দেখা সেই সুমিতের সঙ্গে এই সুমিতের কত তফাৎ। সমস্ত চূল উঠে গেছে,
চোখের কোল ঢুকে গেছে, সেই ফুলো গাল ভেঙে চুকে গেছে গর্ত তৈরি করে। বললুম-সুমিত?
এ তোর কি চেহারা হয়েছে রে ?
সুমিত হাসল। দেখলুম সে হাসিতে দাঁতহীন সুমিত আরও বীভৎস হয়ে উঠল।

বলল—-আজ
দশ বছর ধরে ভুগছি। মাথার যন্ত্রণায় পাগল হতে বসেছি।

বললুম-চিকিৎসা করাসনি ?

সুমিত বলল–করিয়েছি—কোনো কাজ হয়নি।

কলকাতায় আমার কাছে চলে গেলি না কেন?

পারিনি বোনের জন্যে। বিয়ের পরই নিঃসন্তান অবস্থায় সে ফিরে আসে। তারপরই কঠিন রোগে
পড়ে। তাকে একা ফেলে যেতে পারিনি।

বললাম-“কোথায় সে? কেমন আছে?

সুমিতের গলাটা কেঁপে উঠল, বলল—পাশের ঘরে। ঘন্টাখানেক আগে তার মৃত্যু হয়েছে।

গায়ের মধ্যে শিরশির করে। উঠল। এই প্ৰায় অন্ধকার ঘরে একটা মৃতপ্রায় মানুষ আর পাশের
ঘরে একটা মৃতদেহ-—কি করে রাত কাটাব?

বললুম— তোমাদের হ্যারিকেন নেই?

ও বলল—জোর আলো আমি সহ্য করতে পারি না, চোখে যন্ত্ৰণা হয়। ঐ টেবিলের ওপর
একটা সরু মোমবাতি আর দেশলাই আছে, একটু কষ্ট করে জেলে নাও।

পেছন ফিরে লোকটাকে খুঁজলুম। সুমিত বলল—চলে গেছে। ওরা কেউ রাতে থাকে না।
উঠে গিয়ে ঘরের কোণে সরু মোমবাতিটা জ্বাললুম। ঘরটায় সামান্য আলো হল। চোখ চলে
গেল পাশের ঘরের দিকে। সেই ক্ষীণ আলোতে পরিষ্কার দেখা গেল পাশের ঘরের খাটের ওপর
সাদা চাদর ঢাকা একটা দেহ।

বললুম-সৎকার করতে হবে তো?

সুমিত বলল–কাল সকালের আগে হবে না। এত রাতে লোকজন পাব কোথায়? তুমি যাও,
হাত-মুখ ধুয়ে কাপড়জামা ছেড়ে ঐ টেবিলে খাবার ঢাকা আছে, খেয়ে নাও।

বললুম-তুই খাবি না?

ও বলল—আমার হজম হয় না বলে ডাক্তার বিকেলের মধ্যে খেয়ে নিতে বলেছে। আমার খাওয়া
হয়ে গেছে। তুমি খেয়ে নাও।

সব কাজ সেরে খাটে এসে বসলুম। সুমিতও এসে বসেছে খাটে। কিন্তু ওর সঙ্গে কথা বলব
কি, সমস্তক্ষণ চোখটা ঐ পাশের ঘরে চলে যাচ্ছে। আমার সামনেই মধ্যিখানের দরজা। তাই সোজাসুজি
ঐ দিকেই চোখটা আটকে যাচ্ছে। প্রচও অস্বস্তি হতে লাগল। বুঝতে পারছি না কি করব, এমন
সময় সুমিত বলল দেখো আমরা এ ঘরে কথা বলছি—ও ঘরে সুনীতির বোধহয় শান্তিভঙ্গ হচ্ছে।
এক কাজ করি, দরজাটায় একটা তালা দিয়ে দি।

অবাক হয়ে বললুম, তালা কেন ?

সুমিত বলল-ওটা ভালো বন্ধ হয় না। বহুদিনের দরজা তো, ফাক হয়ে থাকবে। একটা তালা
লাগিয়ে দিলে খুলে যাবে না।

সত্যি বলতে কি খুব খুশি হলুম। মনে মনে সুমিতকে ধন্যবাদও দিলুম। সুমিত উঠল, একটা
বিরাট তালা দিল দরজাটা বন্ধ করে। চাবিটা এনে রাখল বালিশের তলায়। কিন্তু দরজাটা বেশ
ফাক হয়ে রইল। কি করা যাবে। পুরোনো দরজা। মনটাকে অন্যমনস্ক করার চেষ্টা করতে লাগলুম।

এমন সময় খসখস শব্দ। কানখাড়া করে শুনল সুমিত। কে যেন আসছে মনে হল।
সুমিত তড়িৎবেগে উঠে দাঁড়াল খাট থেকে নেমে। পাশের ঘরের দিকে দৃষ্টি পড়তে আমার হৃৎপিণ্ড
বন্ধ হবার উপক্রম ঘটল। পরিষ্কার দেখলুম—সাদা চাদর ঢাকা সুনীতির মৃতদেহটা খুব ধীরে ধীরে
এগিয়ে আসছে বন্ধ দরজার দিকে। সুমিত চিৎকার করে বলে উঠল—এ তো সুনীতির পায়ের শব্দ। এ শব্দ আমি চিনি। সে আসছে। আমি জানতুম সে আসবে, তাই তো দরজাটা বন্ধ করে রেখেছি।

আমার মুখ দিয়ে কথা বেরুচ্ছে না। আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি অন্ধকারের মধ্যে সাদা চাদর।
ঢাকা দেহটা দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। সুমিত পাগলের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে ঘরের মধ্যে। বলছে—সুনীতি,
কালই আমি তোমার সৎকার করব বোন-তুমি একটু শান্ত হও।

আমি খাটের পেছনে নেমে দাঁড়িয়েছি। পালাতে চাইছি, পা দুটো আটকে গেছে ভারী হয়ে, নাড়াতে
পারছি না। সুনীতি ক্রমাগত দরজা নাড়াচ্ছে। পরিস্কার দেখলুম দরজার তালাটা ভেঙে পড়ল।
হট করে দরজা খুলে গেল। দমকা বাতাসে নিভন্ত মোমবাতি দপদপ করে নিভে গেল। আর
ঠিক সেই মুহুর্তে সুনীতির চাদরে ঢাকা শবটা ঝাপিয়ে পড়ল সুমিতের ওপর। একটা চিৎকার।

তারপর সব শেষ।

ততক্ষণে ঘরের দরজা খুলে আমি ছুটতে আরও করেছি। পাগলের মতো ছুটছি তো ছুটছি।
কতক্ষণ ছুটেছি জানি না। দিনের আলো চোখে পড়তে জ্ঞান এল। দেখলুম একটা বড় মাঠের মধ্যে
আমি একা শুয়ে আছি। বুঝতে পারলুম এখানেই কালকে অটোটা আমাকে নামিয়ে দিয়েছিল। পাশে
সুটকেসটা পড়ে আছে। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখি সেই বিশাল বাড়িটা আর নেই– তার বদলে
পড়ে আছে ইট-কাঠ-পাথরের বিরাট ধ্বংসস্তুপ।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত