বাস্তব রক্ত ক্ষরণ

বাস্তব রক্ত ক্ষরণ

১৯৯০ এর জুলাই মাসের ঠিক ১৫ তারিখ, অনার্স সেকেন্ড ইয়ার পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়। আমি তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র। রেজাল্ট পেয়েতো মহা খুশি। পুরা ডিপার্টমেন্টে সেরা ৩ জনের মধ্যে আমিই ১ম জন। সুতরাং সবাই একটু অন্য চোখে দেখে। নিয়মিত ক্লাস করতাম। নোট তৈরি করতাম। একদম আদর্শ ছাত্রই ছিলাম। লেখা পড়া ছাড়া অন্য কোন দিকে একদম মন দিতামনা। যেটুকু সময় ঘরে থাকতাম বইয়ের মধ্যেই ডুবে থাকতাম।

রুমের অন্যরা যেমন গল্প করত, কার্ড খেলতো আমার তাতে একটুও আগ্রহ ছিল না। ওরা অনেক টানাটানি করত কার্ড, দাবা বা নুডু খেলার জন্য। কিন্তু ওদের ডাকাডাকি ব্যর্থই হত।

আমার ক্লাসমেট তিমির মিডেল টাইপ স্টুডেন্ট ছিল। আমার মত এরকম এক রোখা ধরনের ছিলনা। সারা দিন সাহিত্য-সংস্কৃতি এসব নিয়েই পড়ে থাকত। ওর আবার আমাদের ক্লাসের দিয়া’র সাথে ভাব ছিল। ভাব বলতে একেবারে দু’জন দু’জনার কত যে আপন টাইপের।

আমি আবার সেই ছোট বেলা থেকে বাস্তবতা আর ভাগ্যে বিশ্বাস করতাম। প্রেম-ভালবাসা এসব আমার বিশ্বাস হতনা। কারণ প্রেম-ভালবাসা আর বাস্তবতার সমিকরণ কখনই মিলাতে পারতামনা। ভালবাসা আসলেই ভাল বাসা তৈরি করে নাকি মন্দ বাসা তৈরি করে তাও বুঝতাম না। যাক সে কথা, রেজাল্ট পেয়েই ঘরে এসে মাকে চিঠি লিখতে বসলাম।

পরদিন সকালে ইউনিভার্সিটি যাওয়ার পথে চিঠিটা পোষ্ট করে দিলাম। ট্রেন থেকে নামার পড়ই ভার্সিটির গেইটে তিমিরের সাথে দেখা –

– কিরে তিমির এখানে যে, ক্লাসে যাসনি?

– নারে দোস্ত তোর জন্য অপেক্ষা করছি।

– কেনরে কি ব্যপার ?

– তেমন কিছুনা, আচ্ছা দোস্ত আমাদের দুর্বার সংস্কৃতি পরিষদ থেকে সিরাজউদ্দৌলা নাটকটি মঞ্চস্থ হবে, তুই কি একটা চরিত্র নিতে পারবি?

– না না আমাকে দিয়ে নাটক-টাটক হবে না।

– আমরা সব শিখিয়ে দিব।

– না না, আমি তারপরও পারবোনা।

– আচ্ছা ঠিক আছে কি আর করার।

থার্ডইয়ার এর ক্লাস করছি। ভালই লাগছে। ক্লাস শেষে দু’টা টিউশনি আছে। তারপর পত্রিকা অফিসের একটানা কাজ। রাতে ১১টার সময় ম্যাসে ফিরছি। গেইটে দেখি আবার তিমির এসে হাজির।

– আরে তুই এখানে কি করছিস ?

– দোস্ত তোর চরিত্রটা করতেই হবে। তোকে খুব মানাবে। তোর করতেই হবে।

– কি ধরনের চরিত্র ? কি করতে হবে?

– ভুলে গেলি। সকালে বললামনা। সিরাজউদ্দৌলার কেরেক্টার।

– আগে ঘরে আয়, বস, তারপর কথা হবে। তিমির আমার খাটে উঠে আসন পেতে বসতে বসতে বললো- আসলে দোস্ত, সকালে তুই না করার পরে অনেক চিন্তা ভাবনা করার পরেও কাউকে পেলামনা যে, এই চরিত্রটা নিতে পারবে। আমার মনে হয় তুই’ই এই চরিত্রটা ফুটিয়ে তুলতে পারবি। তোর কোন সমস্যা হবেনা, সব আমরা দেখিয়ে দেব। তুই শুধু অভিনয়টা করবি।

মনে মনে ভাবছি তিমির হল নাছোড়বান্দা টাইপের ছেলে। রাজি না হয়ে উপায় নাই।

– ঠিক আছে বন্ধু আমি রাজি তোমার নাটক করবো।

তারপর ক্লাস শেষে নিয়মিত প্রাকটিস করছি নবাব সিরাজউদ্দৌলা হবার। সারাদিন ক্লাস, তারপর টিউশনি তারপর পত্রিকা অফিসের কাজ সব মিলিয়ে হাফিয়ে উঠছিলাম।

জুলাই এর ২৫ তারিখ, খুব বৃষ্টি হচ্ছিল সকালে । এখন অবশ্য সকাল ৯টা। আজ Important Class আছে। ইউনিভার্সিটি যেতে হবে। কেন যেন যেতে ইচ্ছে করছেনা। তারপরও বের হলাম ব্যাগ নিয়ে। ট্রেনে উঠার সাথে সাথে তুমুল বৃষ্টি শুরু হল। ট্রেন থেকে নামার কোন উপায় নেই। কিছুক্ষণ পরে বৃষ্টি খানিকটা কমলো। আমার কাছে সবচেয়ে বিরক্তিকর কাজ হল ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটা। আমার বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে হাঁটতেই ভাল লাগে। তারপরও মা বারণ করেছে বৃষ্টিতে ভিজতে। তাই বাধ্য হয়ে ছাতা মাথায় হাঁটতে হচ্ছে। হঠাৎ পেছন থেকে একটা মেয়ের কন্ঠ শুনতে পেলাম-

– এই যে ভাইয়া একটু শুনবেন?

পেছনে তাকাতেই আমি হতবাক। সত্যিই কি কোন মানবী, নাকি পরিরাজ্যের পরিরানি আমায় ডাকছে, বুঝে উঠতে পারিনি।

-ভাইয়া আর ১০মিনিট পরেই আমার পরীক্ষা শুরু হবে পি¬জ আপনার সাথে আমায় একটু নেবেন কি? বৃষ্টির কারণে যেতে পারছিনা। আপনি যদি আমায় একটু পৌঁছে দিতেন তবে কৃতজ্ঞ থাকতাম। কিছু বুঝে উঠার আগেই জিজ্ঞেস করলাম –

– কোন ডিপার্টমেন্টের ?

– ফাইন আর্টস, ফার্স্ট ইয়ার।

– চলুন যাই।

আমি সেদিন রোবটের মত তার সাথে হাঁটছিলাম কিন্তু অন্য কোন কথাই জেজ্ঞেস করা হয়নি। সেদিন থেকে কেন যেন অন্য রকম লাগছিল। হৃদয়ের মধ্যে অন্য আমেজের বাতাস বইতে লাগলো। যে ভালবাসা আমি বিশ্বাস করিনা সে ভালবাসা কি আজ আমার বিশ্বাস করতে হবে? এই ভেবে রাত কেটে গেল। সকালে ইউনিভার্সিটি গিয়েই তাকে খুঁজতে শুরু করলাম। কলা ভবনের দিকে গেলাম। অদ্ভুততো কাল তার নাম জিজ্ঞেস করা হয়নি। কাউকে যে জিজ্ঞেস করবো সে উপায়ও নেই। তাছাড়া কোন কাজতো নেই কেনইবা একটা মেয়ের কছে অনর্থক যাবো। কি বলবো গিয়ে তাকে? এই প্রশ্ন মাথায় আসতেই সোজা ক্লাসে চলে আসলাম। কিন্তু ক্লাসেও মনযোগ দিতে পারছিনা। মাথার মধ্যে ঘুরছে কি বিষয় বা কি কারণ নিয়ে তার কাছে যাওয়া যায়। রাতে খেয়ে দেয়ে বই নিয়ে পড়তে বসতেই মাথায় চটকরে চলে এল আগামী ১৫ আগস্ট সিরাজউদ্দেলৈা নাটক মঞ্চস্থ হবে। সেখানে তাকে দাওয়াত দেয়া যেতে পারে।

পরদিন ভার্সিটি আসতেই আমার চোখ আতিপাতি করে খুঁজতে লাগলো মেয়েটিকে। কলা ভবনের সামনে সারাদিন দাঁড়িয়ে রইলাম। আজ বৃষ্টি নেই । কিন্তু খাঁ খাঁ রোদের প্রচন্ড গরমের মধ্যেও হাতে একটা ইনভাইটেশন কার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কেন যেন আমার মনে হচ্ছিল আজ তার দেখা পাব। সাড়ে তিনটার সময় দেখি কলা ভবনের বারান্দা থেকে একটা মেয়ে নেমে আসছে। লাল জামা পড়া, সাদা ওড়না, বাতাসে ওড়নার আঁচল দুলছে। মায়াবী হরীনি দুটি চোখ। দৃষ্টি খুবই সুতীক্ষè, ঠোঁঠগুলো কোন প্রসাধন ছাড়াই গোলাপী রঙের চুলের রং হালকা বাদামী। ঠিক বুঝতে পারছিনা প্রসাধন দিয়ে চুলকে বাদামী করা হয়েছে, নাকি অরজিনালই এরকম। তার সুন্দরের বর্ণনা হৃদয়ের পাতায় আঁকছিলাম আপন মনে, কখন যে সে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে তাও টের পাইনি।

হঠাৎ সে বলে উঠল-

– আরে আপনি! কেমন আছেন?

– কিছু বুঝে উঠবার আগেই বলে উঠলাম- ভাল। আপনি কেমন আছেন?

– হ্যাঁ বেশ আছি, তা কি মনে করে এখানে।

– ও আচ্ছা, আগামী ১৫ আগস্ট সিরাজউদ্দৌলা নাকটটি মঞ্চস্থ হবে থিয়েটার ইনেস্টিটিউটে। আপনাকে দাওয়াত করতে আসলাম।

– ও তাই। ধন্যবাদ।

– আসবেন তো?

– অবশ্যই আসবো।

এতটুকু কথা হল সেদিন। তারপর আমি অফিসের কাজ সেরে যখনই একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি, তখনি তার কথা মনে পড়ে গেল। ওফ! আজও তার নাম জানা হয়নি। নিজের উপর খুব রাগ হচ্ছে। এতটা আত্মভোলা হলে চলে নাকি? হঠাৎ তার নামটা খুব জানতে ইচ্ছে করছে। আসলেই তার সৌন্দর্য্য আমায় বিমোহিত করে ফেলেছিল। হঠাৎ কেন যেন মনে হল আমি কবি হতে শুরু করছি। মনে মনে শুধু কবিতা আসছে। আগে শুনেছিলাম মানুষ প্রেমে পড়লে নাকি কবি হয়ে ওঠে। এখন তার বাস্তব প্রমান মিলতে বসছে আমার বেলায়। কয়েকটা কবিতা লিখে ফেললাম। কিছুদিন পর আবিষ্কার করলাম সত্যিই আমি তার প্রেমে পড়ে গিয়েছি ।

খুব বৃষ্টি পড়ছে, বেলা ৩টা অথচ মনে হচ্ছে সন্ধা ৬টা। যেমনি বৃষ্টি তেমনি মেঘ। মেঘে নীল আকাশ কালো বর্ণ ধারণ করেছে। ভার্সিটির প্রায় সব ছাত্রই ক্যাম্পাসে বসে আছে। বৃষ্টির কারণে কেউ বাইরে বেরুতে পারছেনা। হঠাৎ মাথায় কি যেন এসেছিল কে জানে এক দৌঁড়ে পৌঁছলাম কলা ভবনের বারান্দায়। ভেজা শার্ট, পেন্টও প্রায় ভিজে গেছে। একেবারে ভিজে টলমলে অবস্থা। কাক হলে শরীরটা ঝাড়া দিতে পারতাম। আনমনা উদাসী হৃদয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি বারান্দায়। আর চোখ তার কাজ করেই যাচ্ছে। বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর বৃষ্টি যখন থামলো তার দেখা না পাওয়ার ব্যর্থতা নিয়ে যে মুহুর্তেই ফিরে আসার জন্য পা বাড়াই সাথে সাথে পেছন থেকে শুনি –

– রাসেল ভাই…এই রাসেল ভাই…

পেছনে তাকাতেই অদ্ভূত সুন্দর সেই মানবীর দিকে চোখ দুটো আটকে গেল। মনে মনে ঠিক করেই ফেললাম আজ আমার বহু দিনের মনের কথা বলেই দিব।

– রাসেল ভাই হঠাৎ এখানে যে…?

– না এমনি, আচ্ছা আপনার নামটা যেন কি?

– আপনি আমার নাম জানেন না? অথচ কতবার দেখা!

– আসলে নামটা জানতেই আসা

– এই বৃষ্টির মধ্যে! শুধু নামটা জানতে!!

তখন মনে মনে বলছি – শুধু বৃষ্টি কেন তোমাকে পেতে হলে সাত সমুদ্র পাড়ি দিতেও রাজি আছি।

– আমার নাম অর্না

– অর্না! খুব সুন্দর নাম। আপনি যেমন সুন্দর আপনার নামও তেমনি সুন্দর।

– কি যে বলেন রাসেল ভাই! আচ্ছা আজ আসি।

আজ ১৫ আগস্ট রীতিমত সমস্ত চৎধপঃরপব শেষ করে নাটক মঞ্চস্থ হবার দিন। স্টেইজে ওঠার পর একটু ভয় করছিল। পরে সমস্ত ভয় কেটে গেল। অভিনয়ের সময় বুঝতে পারিনি কেমন অভিনয় করছি। কিন্তু নাটক শেষ করার পর যখন দেখলাম শত শত দর্শক আমায় ঘিরে ধরেছে তখন বুঝতে পারলাম হয়ত ভালই অভিনয় করেছি। তারপর থেকে আস্তে আস্তে রাসেল থেকে স্টার রাসেলে পরিণত হলাম।

পরদিন ভার্সিটির ক্যাম্পাসে ঢুকতেই দেখি অর্না, হাতে একগুচ্ছ রজনী গন্ধা।

– রাসেল ভাই কাল খুব ভাল অভিনয় করেছেন তাই শুভেচ্ছা স্বরূপ।

মনে মনে ভাবছিলাম শুভেচ্ছা স্বরূপ না হয়ে যদি ভালবাসা স্বরূপ হত তবেইনা ভাল হত।

– ধন্যবাদ। আচ্ছা অর্না তোমার সাথে কিছু কথা ছিল।

– বলুন।

– এখানে না, চলনা না কোথাও বসে কথা বলি।

– রাসেল ভাই তাহলে আজ না, কাল কথা হবে। আজ আমার Important Class আছে।

– ঠিক আছে। তাহলে কালই কথা হবে।

হাতের ঘড়িতে দেখি রাত ১১টা বেজে ১০মিনিট। চিন্তা করছি কিভাবে কাল তাকে কথাটা বলবো। চট করে মাথায় একটা বুদ্ধি চলে এল, ওকে নিয়েতো অনেক কবিতা লেখা হয়েছে। একটা কবিতা দিলে কেমন হয়। কষ্ট করে আর মুখে বলতে হবেনা। কবিতার ভাষার প্রেম নিবেদন। মসৃন কাগজ আর কলম নিয়ে বসে গেলাম কবিতা তথা প্রেমপত্র লিখতে।

পরদিন ভার্সিটি গিয়েই তাকে খোঁজ শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর ওকে পেয়েও গেলাম। আসলে আজ কেমন যেন ভয় ভয় করছে। যদি সে আমায় মেনে না নেয়। বার বার ঘামতে লাগলাম। মাঝে মঝে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। ইউনিভার্সিটির ঝুপড়িতে গিয়ে বসলাম দু’জন।

– রাসেল ভাই বলেন আপনার কি কথা ছিল।

– আসলে তেমন কিছু না। আজ তোমাকে একটা জিনিস দেব। কাল ঠিক এসময়ে এখানে তুমি আসবে। যদি আসো তবে ভাবে নেব আমার স্বপ্ন সত্যি হতে যাচ্ছে আর যদি না আস তবে …

– আপনি এগুলো কি বলছেন রাসেল ভাই কিছুতো বুঝতে পারছিনা।

– এখন বুঝতে হবেনা বাসায় গিয়ে বুঝলেই হবে। আজ আসি।

সারাদিন আমার কেমন যেন উদ্বিগ্ন লাগছিল। তাই কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারছিনা। সবকিছু যেন এলামেলো মনে হচ্ছিল। অপেক্ষায় ছিলাম আগামী দিনটির । আমার কাছে প্রতিটি মিনিট ঘন্টার মত দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। সারা রাত ঘুমোতে পারিনি। দু ধরনের ফিলিংস হচ্ছিল। যদি তাকে পেয়ে যাই, অথবা যদি হারাই ! আনন্দ আর ভয়ের সমিকরণ মেলাতে মেলাতেই রাতটা কেটে গেল।

পরদিন সকালে ঝুপড়িতে বসে ছিলাম। অর্না আসার কথা ঠিক এই সময়েই। কিন্তু এখনোতো এলোনা। হঠাৎ সিগারেট ধরাতে ইচ্ছা করলো। কিন্তু মায়ের বারণের কথা মনে পড়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে আবিষ্কার করলাম ১৫ মি. এ ৫ কাপ চা খেয়ে ফেলেছি।

হঠাৎ আমার চোখ খুঁজে বের করল নীল শাড়ি পরে অর্না আসছে। আচ্ছা নীল তো ভালবাসা কিংবা বেদনা দু’টিরই প্রতীক। কিন্তু আজ কোন প্রতীক প্রকাশ করবে ভাবতে পারছিলামনা। পকেটে একটা কাগজ ছিল। অর্নাকে দেব ভেবে রাতেই লিখেছিলাম। লেখাটা ছিল এরকম-

“বৃস্টি ভেজা ঘাস পেড়িয়ে দেখা হল তোমার সাথে। সূর্যের হলুদ আভা হঠাৎ তোমার মুখে এসে পড়েছে। হঠাৎই একটা কোমল স্নিগ্ধতা। কেন জানি তোমাকে ভাল লেগে গেল। হৃদয়ের অনুভূতি মেশানো কোমল ভালবাসা রইল সদা তোমারই জন্য”।

ভাবনার দেয়াল ভাঙ্গতে না ভাঙ্গতেই আমার সামনে চলে আসল অর্না। তার চোখে মুখে বিষন্নতা, তাহলে নীলে কি আজ সে শোকের বসন নিয়েছে।

– কি ব্যাপার অর্না তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?

– না এমনি। তবে আমি শুধু এটাই বলতে পারবো যে আপনার আর আমার মধ্যে কখনই সম্পর্ক হওয়ার নয়।

– কিন্তু কেন অর্না। আমার এত দিনের স্বপ্ন সবকিছু কি নষ্ট হয়ে যাবে।

– কেন তা আমি বলতে পারবোনা।

– কেন বলতে পারবেনা। আজ তোমার বলতে হবে অর্না।

– থাক আজ নয় আরেক দিন বলবো। আজ আসি।

– না অর্না তুমি কোথাও যেতে পারবেনা। আজ তোমাকে বলতেই হবে।

– আচ্ছা তবে শুনুন।

অর্নার দু’চোখ বেয়ে অশ্র“ ঝড়ছিল। বাক্যহীন প্রতীমা যেমন নির্বাক অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে উদ্দেশ্যহীন ভাবে। ঠিক তেমনি তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ। তারপর ভাবলেশহীন তার কাজল মাখা দু’চোখ বেয়ে অশ্র“ ঝড়ছিল। তার সুন্দর কপল’দু খানি তখন কাজলের কালিমায় মনে হচ্ছিল ভরা চাঁদের মাসে কয়েক টুকরো মেঘ ভেসে আসছে।

আমি সেদিন তার চোখের অশ্র“ দেখে বিস্মিত হয়নি একটুও। বিস্মিত হয়ে ছিলাম তার চোখের দিকে তাকিয়ে। কেননা কোন মানুষ কাঁদলেও যে এত সুন্দর লাগতে পারে তা আজই প্রথম দেখলাম।

– রাসেল ভাই কথা দিন আজ যে কথাগুলো বলবো তা আর কাউকে আপনি বলতে পারবেননা।

– কথা দিলাম. বল অর্না।

– তাহলে শুনুন, সেদিন ছিল ১২ অক্টোবর, ১৯৭১। যুদ্ধ চলছিল সারা দেশে। বাংলার দামাল ছেলেরা গেরিলা প্রশিক্ষন নিয়ে স্বশস্ত্র যুদ্ধে নেমে পড়েছিল। আমার মায়ের গ্রামের প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন যুবক মুক্তিযুদ্ধে নেমে পড়ল। একদিন তাদের মধ্য থেকে ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা গ্রামে এসেছিল তাদের মা-বাবা ভাই-বোনের সাথে দেখা করতে। ঐ গ্রামের রাজাকারের হেড ছিল আনিস মোল্লা। তার কানে পৌঁছে গেল এই খবর। লোভি কুত্তার মত ছুটে গিয়েছিল পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পে। খবর দিয়ে আসল যে ঐ গ্রামে মুক্তি বাহিনী অবস্থান করছে। সাথে সাথে সেই রাতেই মোল্লা আনিস সহ প্রায় শ’ খানেক আর্মি পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলেছিল। প্রত্যেক ঘরে ঘরে তল্লাশি চালাল। মুক্তিবাহিনীর ৫ সদস্য ধরা পড়ল এবং যে ঘরগুলোতে তারা আশ্রয় নিয়েছিল ঐ সব ঘরের যারা পুরুষ ছিল তাদের সবাইকে, প্রায় ১০০ জনের মত হবে, চোখ বন্ধ করে ক্যাম্পের কাছে এনে ব্রাশ ফায়ার করল। তারপর যেসব ঘরে যুবতি মেয়েরা ছিল তাদের সবাইকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে…….তাদের মধ্যে………

– কি তাদের মধ্যে, বল অর্না?

– তাদের মধ্যে আমার মাও ছিল। আমার মা’র বয়স ছিল তখন ষোল কি সতের। আমার নানা অনেক চেয়েছিল তাদের হাত থেকে বাঁচাতে। কিন্তু পারেনি। আমার দু’জন মামা ছিল তাদেরও গুলি করে হত্যা করেছিল।

– তারপর …! তারপর কি হল বল অর্না?

– তারপর, স্বাধীনতার পর আর্মি ক্যাম্প থেকে ছাড়া পায় আমার মা। কিন্তু এ অবস্থায় মা গিয়ে কোথায় দাঁড়াবেন। কার কাছে যাবেন। কি পরিচয় দেবেন। কিছুই ভেবে উঠতে পারছিলেননা। অবশেষে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু বার বার মরতে গিয়েও মরতে পারেননি। একটা পিছুটান তাকে নতুন করে বাঁচার তাগিদ দিচ্ছিল।

– কি সেই পিছুটান।

– আজ আর বলতে পারবোনা রাসেল ভাই।

– না অর্না, তুমি বল।

– কেননা, কেননা ততদিনে আমি আমার মায়ের গর্ভে জায়গা করে নিয়েছিলাম।

আমি সেদিন আর কিছুই ভাবতে পারছিলামনা। মনে হচ্ছিল স্বাধিনতা যুদ্ধের কোন গল্প শুনছি। কিন্তু তা যে আমার নিজের বেলায়ই ঘটছে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলামনা। নিজের হৃদয়ও এ কথাগুলো বিশ্বাস করতে পারছিলনা।

– তাহলে তোমার পিতাকে অর্না ……….?

– আমার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিনতম প্রশ্নের উত্তর এটা। এর কোন উত্তর আমার জানা নিই।

অর্না লজ্জা আর গ¬ানীতে প্রায় হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। আমি তাকে সান্তনা দেয়ার মত ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলামনা। পৃথিবীর এত সুন্দর একটা মানবী, অথচ সে তার পিতার পরিচয় জানেনা, এমন একটা মেয়েকে আমি কিভাবে সান্তনা দেই ! অর্না কান্ন জড়িত কণ্ঠে বলে উঠল –

– এবার শুনলেনতো রাসেল ভাই আমার জীবনের বাস্তব রক্ত ক্ষরন করা ঘটনা ?

– শোন অর্না আমি তবুও তোমাকে ভালবাসি, শুধু তোমাকেই চাই।

– এতকিছু শুনেও আপনি আমাকে ভালবাসবেন ? সত্যি, সত্যি বলছেন?

– হ্যাঁ সত্যি, সেই প্রথম মুহুর্ত থেকে তোমাকে যেমন ভালবেসেছি। এখনও তেমনি বাসি এবং ভবিষ্যতেও বাসবো।

একথা বলতে বলতে অর্নার কপালে হাত দিয়ে তার চোখের অশ্র“ মুছি দিলাম, আর নিজেকে সামলে নিয়ে অনেক কষ্টে বললাম-

– আর কান্না নয় এবার একটু হাসতো অর্না।

অর্না নির্বাক। তার চোখে সাত সমুদ্রের ঢেউ খেলা করছে।

সেদিন থেকেই মাথার মধ্যে দুশ্চিন্তা নামক পোকারা বাসা বাঁধতে লাগলো। কিভাবে অন্যকে সমাজে তুলে ধরবো। কি তার পরিচয় দেবো। কেউ যখন জিজ্ঞেস করবে তোমার বাবার নাম কি তখন সে কি উত্তর দেবে। তাছাড়া আমার মা কি কখনো অর্নাকে মেনে নেবে? প্রতিনিয়ত এই সব প্রশ্ন আমায় আঘাতে জর্জরিত করছিল অনবরত। তারচেয়ে বড় কথা হল আমি অর্নাকে ভালবাসি। তাকে ছাড়া আমার জীবনে অন্য কাউকে আমি কল্পনাও করতে পারি না।

কিছুদিন পরে মা আর ছোট বোন বিন্দুকে এখানে নিয়ে এলাম। মাঝারি সাইজের একটা ফ্ল্যাট বাসা ভাড়া নিলাম। একদিন অর্নাকে নিয়ে আসলাম মাকে দেখাবো বলে। মা সেদিন অর্নাকে দেখে পছন্দ করেছিলেন। কিন্তু যখনই অর্নার কাছে তার বাবার নাম জানতে চাইলেন তখনই সব শেষ হয়ে গেল। পরে অনেক চেষ্টা করেও মাকে কিছুতেই রাজি করাতে পারলাম না। আস্তে আস্তে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হল। ততদিনে আমি পত্রিকার বার্তা বিভাগের প্রধান হয়ে গেলাম। তাছাড়া নাটকও মাঝে মধ্যে একটা দুইটা করতাম যদিও প্রচুর নাটকের অফার আসতো। মন-মানসিকতা ভাল না থাকার কারণে কিছুতেই মনযোগ দিতে পারতামনা। সব কিছুই জটিল মনে হচ্ছিল।

পরে শোকে-দুঃখে-কষ্টে অর্না দেশ ছেড়ে ফ্রান্সের মাটিতে পাড়ি জমিয়েছিল সেখানকার একটা আর্ট কলেজে। প্রথম কিছু দিন আমার সাথে চিঠি আদান প্রদান হয়েছিল। পরে ওর পক্ষ থেকে আর কোন চিঠি পাইনি। আমি চিঠি পাঠালেও ফেরত আসতো।

মা অনেক চেয়েছে আমি বিয়ে করি। কিন্তু আমিও মাকে বলে দিয়েছি মানুষের হৃদয় একটা, আর একটা হৃদয় একবারই শুধুমাত্র একজনকেই দেয়া যায়। আর সেই হৃদয়টাতো অনেক আগেই অর্নাকে দিয়ে ফেলেছি।

এখন অবশ্য মা’র ভুল ভেঁঙ্গেছে। তিনি নিজেও অনেক চেয়েছেন অর্নার সাথে যোগাযোগ করতে। কিন্তু পারেননি। এখনো আমার মা আমাকে বিয়ে করানোর জন্য পায়তারা করে। কিন্তু আমার মন-প্রান ধ্যান সব কিছুতেই যে অর্না মিশে আছে। যে হৃদয়টা অর্নাকে দিয়ে ফেলেছি তা কি করে অন্য কোন মেয়েকে দেই। অর্না কি জানে এখনো আমি তার জন্য বসে আছি। গভীর আগ্রহ নিয়ে তার অপেক্ষা করছি। তাকে নিয়ে এখনো কবিতা লিখি, যদি সে কখনো আসে তবে তাকে নিয়ে লেখা সব কবিতা দেখাবো, আর বলবো শাহজাহান তার প্রেমিকার স্মৃতি স্বরূপ তাজমহল বানিয়েছিল। আর আমি আমার কবিতা দিয়ে কবিতার তাজমহল বানালাম।

মাঝে মধ্যে খুব জানতে ইচ্ছা করে কেমন আছে অর্না। কি করছে, ওর কি বিয়ে হয়েছে। আমি যেমন ওকে সারাক্ষণ ভাবি ওকি আমায় তেমনি ভাবে?

মাঝ্যে মধ্যে এ সমাজ সভ্যতাকে খুব ঘৃনা হয়। এ কেমন পঁচা আবর্জনায় দুর্ঘন্ধযুক্ত সমাজ যে সমাজ এ সামান্য ব্যাপারটা মেনে নিতে পারে না তা আবার কেমন সমাজ! এ কেমন সভ্যতা, যে সভ্যতা একজন বীরঙ্গনা মায়ের নিস্পাপ একটি কন্যাকে মেনে নিতে পারে না, তারা আবার সভ্য জাতি হিসেবে দাবি করে কিভাবে? আমরা মুখে তাদেরকে বীরঙ্গনা খেতাব দিয়েছি, মন থেকে নয়।

সারাক্ষণ কাজের মধ্যেই ডুবে থাকতে চেষ্টা করি। আর যখনি একটু ফ্রি হই তখনি ডায়রিটা খুলে হয়তোবা নতুন কোন কবিতা লিখি অর্নাকে নিয়ে নতুবা পুরোনো কবিতা গুলোই পড়ি।

শরতের পড়ন্ত বিকেল। সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ার সাথে সাথে আমার দু’চোখ বেয়ে কয়েক ফোটা অশ্র“ও কখন যে গড়িয়ে পড়ছে নিজেও টের পাইনি। হঠাৎ দরজায় কড়াঘাত শুনতে পেলাম। এই অসময়ে কে এল ঘরে ? নিজেকে প্রস্তুত করার আগেই কেন যেন দরজা খুলে দিলাম। আমি হতবাক, আমি বিস্মত! সত্যিই কি অর্না ! নাকি হ্যালোসুলেশন । কিছু বুঝে ওঠার আগেই অর্না বলে উঠল –

– তোমার চোখ এত লাল কেন রাসেল? দেখ আমি ফিরে এসেছি তোমার কাছে। আর কখনো যাব না, এইযে তোমার হাত ধরে বলছি, বিশ্বাস কর আর কখনো যাবনা তোমায় ছেড়ে।

লিখেছেন – অজানা |

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত