হয়তো গল্প

হয়তো গল্প

ফ্রেন্ডরা মিলে চক্কর দিচ্ছিলাম বইমেলাতে। হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যথা হয়ে যাওয়াতে বসলাম বাংলা একাডেমীর সিঁড়িতে। ওরা গেল অন্যপ্রকাশে। যাক বাবা, যে ভিড়, আমার শখ নেই এর ভেতরে ঢোকার। বসে বসে দেখছি চারপাশের কোলাহল। আচ্ছা আমরা সবাই কি খুব একা? এত কোলাহল আমাকে তো ছুঁয়ে যাচ্ছে না। ওই তো আমার বন্ধুরা, হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে এক একজন। আবার ওদিকের সাদা জামা পড়া মেয়েটা কি নিয়ে যেন ঝগড়া করছে বয়ফ্রেন্ডের সাথে। আরে, এই ছোট বাবুটা কি কিউট। আচ্ছা আমার যদি একটা বাবু থাকতো ,কেমন হত তখন?

-আপনি, মানে তুমি নিশা না?

ভাবনার জাল ছিড়ে গেল আমার। তাকিয়ে দেখি আবির।

–আরে, তুমি, কেমন আছ?

-এইতো ভালই।অনেক দিন পর দেখা না?

–হুমম, তা ৩/৪ বছর তো হবেই।

-একা একা বসে আছো যে?

–এই তো ফ্রেন্ডরা মিলে এসেছি। ওরা আছে আশেপাশেই। তুমি?

-আমি.এই তো আসলাম একাই,ভাবলাম ঘুরে যাই।

অনেক দিন পর দেখা হওয়াতে একথা-সেকথা বলছিলাম দুজনে। আমার ফ্রেন্ডরা চলে এল । আবিরকে বললাম, যাই তাহলে ।

ঠিক আছে বলে আবির বললো- নিশা, ও কিন্তু এখনো তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছে।

আমি হাসলাম একটু, বললাম পাগলামি সারার জন্য ৮ বছর তো যথেষ্ট সময়।

-তার মানে তুমি স্বীকার করছো ওর ভালবাসা সত্যি,পাগলামি না?

–থাকনা আবির এসব কথা। যাই আমি। ভাল থেকো।

বলে চলে এলাম । আসার সময় রিকশাতে সারা পথই তিথি যথারীতি অনেক বকবক করে গেল। কিন্তু আজ কেন যেন আমার মাথাতে ওর কোন কথাই ঢুকলোনা। বারবার মনের মাঝে ভেসে উঠছিল একটি ছবি-নিলয়, যাকে ৮ বছর আগেই মুছে ফেলেছিলাম নিজের জীবন থেকে।

তখন কতই বা বয়স আমাদের। সামনে এস.এস.সি পরীক্ষা । স্কুলের ফার্স্ট গার্ল আমি । ভাল রেজাল্ট করার জন্য দিনরাত পড়ে যাচ্ছি । একদিন কোচিং থেকে ফেরার পথে আবির ডাকলো আমাকে। বললো তোমার সাথে কিছু কথা আছে । আমি দাঁড়ালাম,কিন্তু আবির কেন যেন নিলয়কে ঠেলে পাঠালো আমার সামনে। আমি একটু চমকালাম ।যে ছেলে কখনো কোন মেয়ের মুখের দিকে তাকায়না, কথা বলা তো অনেক পরের কথা।সে নিলয় আমাকে কি বলবে?

কিন্তু ও যা বললো শুনে আমি স্তব্ধ। আমাকে ভালবাসে ও। একথা অনেক বার অনেকের মুখ থেকে ওই বয়সেই শোনা হয়েছে আমার। সবাইকে যা বলি ওকে ও তাই বললাম । আমার পক্ষে সম্ভব না । বলে চলে এলাম আমি ।

ওইটুকু বয়সে পড়াশোনাই ছিল আমার সবকিছু। সুতরাং এই ব্যাপারটা তেমন পাত্তা দিলামনা আমি । কিন্তু এরপর থেকে প্রতিদিন বিকেলে নিলয় এসে দাঁড়িয়ে থাকতো আমার বাসার সামনে। দুই-তিন দিন খেয়াল করার পর আমি ছাদে যাওয়া ও বন্ধ করে দিলাম । পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল । হলে ঢোকা বা বের হওয়ার সময় দেখতাম নিলয় তাকিয়ে আছে । আমি ভাবতাম ওর কি পরীক্ষা নিয়ে কোন চিন্তা নেই নাকি? যাই হোক,আমার কি।

এভাবে এক সময় পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল ।রেজাল্ট ও হল । যথারীতি আমার রেজাল্ট হল সবচেয়ে ভাল। ভাল কলেজে ভর্তি হলাম । কিন্তু নিলয়ের রেজাল্ট ভাল হয়নি । কস্ট পেলাম শুনে। কারণ ও ছিল সেকেন্ড বয় । আমার জন্যই রেজাল্ট খারাপ করলো হয়তো ।

দিন কাটতে লাগলো । কলেজ পেরিয়ে ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম । একদিন রাতে আবির ফোন দিল আমাকে । বললো নিলয় এখনো আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে । ৩/৪ বছর তো হল । এখন তো আমি ভাবতে পারি ওর কথা । আমি যথারীতি না করে দিলাম । এরপর শুরু হল এক যন্ত্রণা । ওদের একটা ফ্রেন্ড সার্কেল ছিল । সবাই ছিল আমার পরিচিত । প্রতিদিনই দেখা যেত কেউ না কেউ ফোন করে আমাকে নিলয়ের কথা বলছে । বিরক্ত হয়ে গেলাম আমি । নিলয়কে ফোন করলাম। ও ফোন ধরতেই দিলাম এক ঝাড়ি আর বললাম তোমার ফ্রেন্ডরা যেন আমাকে আর তোমার কথা বলে বিরক্ত না করে। কিন্তু ও বললো ও নাকি কিছুই জানে না। সেটা শুনে ওকে মিথ্যাবাদী বলে ঝাড়ি দিয়ে ফোনটা রেখে দিলাম আমি ।

পরে অবশ্য জানতে পেরেছিলাম নিলয় আসলেই কিছু জানতোনা। কিন্তু তখন আর স্যরি বলা হয়নি ওকে । এরপর কেটে গেছে আরও ৪ বছর । যেদিন আমি ওকে না করি সেদিন ও বলেছিল ওর ভালবাসা সত্যি হলে আমি নিজেই ফিরবো ওর কাছে । ও আর কখনো সামনে আসেনি আমার ।আমি ও ব্যস্ত ছিলাম নিজের পড়াশোনা নিয়ে । ভার্সিটি লাইফেও অনেকেই প্রপোজ করেছে । কিন্তু কেন যেন সবাইকেই না করেছি আমি। আমার ফ্যামিলিকে আমি কষ্ট দিতে চাই না। বাবা-মার পছন্দেই বিয়ে করবো ভেবে রেখেছি । তাহলে আজ কেন নিলয়ের কথা এত ভাবছি আমি? আর ওই বা কেন এতদিন অপেক্ষা করবে আমার জন্য ? আমি কি কারো জন্য এত দিন অপেক্ষা করতাম?এখন তো দেখি একটা অ্যাফেয়ার ভাঙার দু-মাসও যায়না, নতুন বাঁধনে জড়ায় সবাই। নিলয় কি তবে সত্যিই ভালবাসে আমাকে? কেন যেন আজ ওকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে…

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত