ভালোবাসার নেশা

ভালোবাসার নেশা

“গাঁজার নৌকা পাহাড়তলী যায় ও মিরবাই, গাঁজার নৌকা পাড়াতলী যায়” উচ্চস্তরে গানটি গেয়েই যাচ্ছি সবাই। সবাই বলতে আমরা চার বন্ধু।

কিছু গান শুধু মাত্র আমাদের মতো নেশাখোর ছেলেদের জন্য লেখা হয়েছে মনে হয়। নেশার ঘোরে গান গুলো বলতে সেই ফিলিংস লাগে। যদিও আমাদের গানের সুর তাল কিছুই জানা নেই। তবু যখন গান গুলো নেশার ঘোরে গেয়ে যাই। তখন মনে হয় আতিফ আসলাম, অর্জিত সিং, আদনান সামি, এরা তো কিছুই না। পৃথিবীর সেরা কন্ঠশিল্পী তো আমি নিজেই!!

আমার বা আমাদের পরিচয় দেয়ার মতো কিছু নেই। আমরা ব্যাচেলর নেশাখোর ছাত্র। নিজেকে নেশাখোর বলাতে অবাক হচ্ছেন?! এক সময় নিজেকে নেশা খোর বলতে লজ্জা লাগতো। এখন আর লজ্জা লাগে না। বরং গর্ব হয় নিজেকে নিয়ে। মাঝে মাঝে নিজেকে নেশার জগতের কিং মনে হয়।

ও হ্যাঁ, আমাদের নেশার আইটেম গুলো তো বলা হয়নি। অবশ্য মোটামুটি সব আইটেমর স্বাদ গ্রহন করা হয়েছে। যেমন:- মদ, গাঁজা, ফেন্সি, ইয়াবা, ইত্যাদি মোটামুটি সব কিছুই আয়ত্তে আছে। কিং বলতে কথা!!

আমাদের আজকের আসরটা হলো বোটকা আর সাথে গাজার ধোঁয়া। বেশ ভালোই জমেছে। আমরা এখন সবাই রঙ্গিন আকাশে শূর্ন্যের মাঝে ভাসমান। উঁড়ে বেড়াচ্ছি অচীন পুরের পরীর খোঁজে।

একবন্ধু দাঁত ৩২টা বের করে খিল খিল করে হাসতেছে। অনেক আগ্রহ নিয়ে তাকে জিজ্ঞাস করলাম,’কিরে বন্ধু, হাসছিস কেন?!’
বন্ধু আমার কথা শুনে হাসির ভলিউম আরো বাড়িয়ে দিলো। তখন আমার মনে হলো আমিও একটু হাসি। বন্ধুর সাথে যোগ দিলাম হাসিতে। আমার দেখায় দেখায় বাকি সবাই হাসতেছে। কিন্তু হাসির কারন আমরা কেউ জানিনা।

প্রথম বন্ধুটা হাসি থামিয়ে গঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলো। সাথে আমরাও গম্ভীর হয়ে গেলাম। বন্ধুকে জিজ্ঞাস করলাম_বন্ধু, কাহিনি কি বল। কি হয়েছে!?’

বন্ধু আমার দিকে তাকিয়ে করুন গলায়_ বন্ধু, আমি মনে হয় মরে যাবো রে। আমারে মাপ কইরা দিস!!
আমি বললাম_তারাতারি মর শালা, চল্লিশা খামু খুব খিদা লাগছে।

বন্ধু ভীত গলায় আমাকে উদ্দেশ্যে করে_আচ্ছা,বন্ধু তোর দাওয়াত আমার চল্লিশায়। আসবি কিন্তু। আর পারলে আমার জানেমানকেও নিয়া আসিস।
আমিও তালমিলিয়ে বললাম_বন্ধু, তুই মরার পর তোর জানেমান তো আমার হবে। এটা তুই বলা লাগবে না।

বন্ধু আনন্দের সহিত_যা দোস্ত, দিয়া দিলাম তোকে। তোর কপালে তো মেয়ে নাই। আমারটা নিয়েই সুখি থাকিস। এখন চল রাস্তায় হাঁটবো কিছুক্ষন।
_হুম চল, আজ সারারাত রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবো।

এই কথা বলেই দাঁড়িয়ে গেলাম। আমার দেখাদেখি সবাই দাঁড়ালো। রাত একটা বাজে আমরা রাস্তায় নেমে পড়লাম। নেশা করে রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করতে আলাদা একটা মজা। আশে পাশে যাকে দেখি সবাইকে আমার মতো মাতাল মনে হয়। কিন্তু মাঝে মাঝে পুলিশ মামারা সমস্যা করে। অবশ্য ভার্সিটির নাম আর এলাকার বড় ভাইয়ের লোক বললে বুজিয়ে শুনিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেয়।

রাতের লাল-নীল বাতির শহরে হেঁটে চলেছি আমরা চারজন। রাতের শহরটা অনেক শান্ত। গাড়ির হর্ণের শব্দটা কম কানে আসে। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া এসে গা শীতল করে দেয়। মনে হয় স্বর্গ রাজ্যের দিকে হেঁটে চলেছি। তবে আমরা যতই নেশা করি। আমরা সবাই জাতে মাতাল তালে ঠিক।

হঠাৎ পকেটে মোবাইলটা বেজে উঠলো। এতোরাতে কে কল দিলো আবার। মোবাইলটা বের করে ডিসপ্লেতে তাকিয়ে দেখি ঝাপসা ঝাপসা লাগতেছে। অনেকক্ষন মোবাইলের দিকেই তাকিয়ে আছি। কলটা রিসিভ করবো ঐ ইচ্ছে করছে না। এভাবে এক দুইবার তিনবারের সময় রিসিভ করলাম।

ওপাশ থেকে কোন এক রমনীর মধুর কন্ঠে_হ্যালো, ভাইয়া ফাহিম আছে?! ওর ফোনে কল দিচ্ছি কিন্তু রিসিভ করছে না।

মুহুর্তে চিন্তায় পড়ে গেলাম। ফাহিমের কোন জিএফ নাই। তাহলে এতো রাতে কোন রমনী কল দিয়ে ফাহিমকে চাচ্ছে। বুজতে পারলাম না।

আমি আর মেয়েটার সাথে কথা না বলে ফাহিমকে মোবাইলটা দিলাম কথা বলার। ফাহিম মোবাইল হাতে নিয়ে_ কে রে তুই?!

ঐপাশ থেকে কি বলতেছে শুনা যাচ্ছে না। তবে ফাহিমের কথায় বুজা যাচ্ছে মেয়েটা নাম সীমা। মনে হচ্ছে মেয়েটা ফাহিমের বান্ধবী। গভীর চিন্তায় পড়ে গেলাম। ফাহিমের বান্ধবী আমার নাম্বার পেলো কিভাবে?!

কথা শেষে ফাহিমকে জিজ্ঞাস করলাম। আমার ফোন নাম্বার সীমা না টিমা পেলো কিভাবে। ফাহিম আমার কথার উত্তর না দিয়ে সিগারেট ধরালো। আমিও আর কথা না বাড়িয়ে হেঁটে চলেছি।

হাঁটাহাঁটি শেষ করে বাসায় ফিরলাম রাত প্রায় তিনটায়। এসেই সবাই আউলা ঝাউলা হয়ে ঘুম। ঘুম থেকে উঠলাম পরদিন দুপুর প্রায় একটায়। উঠয়েই দেখি পাশে কেউ নেই। শালার সবাই আমাকে রেখে ঘুম থেকে উঠে কোথায় গেলো চিন্তায় পড়ে গেলাম।

পাশ থেকে মোবাইলটা হাতে নিলাম। নিয়ে ডাটা অন করলাম ফেসবুকের অবস্থা দেখার জন্য।

ডাটা অন করার সাথে সাথে ক্রিং ক্রিং শব্দ শুরু হলো। কয়েকটা গুড মর্নিং মেসেজ আসছে। দুপুর একটায় ওদের আবার গুড মর্নিং মেসেজ রিপলে করলাম।

চোখ গেলো একটি মেসেজ রিকুয়েস্টের দিকে। আইডির নামটা অদ্ভূত ‘পিচ্ছি পাগলী’ মেসেজটা অপেন করলাম। মেসেজে লেখা’ রাতে ভাব না নিলেও পারতেন’
মেসেজটা দেখে বেকুপ হয়ে গেলাম। রাতে কার সাথে আবার ভাব নিলাম বুজতেছি না।

মেসেজের রিপলে করলাম_কে আপনি?! আর আমি কি ভাব নিলাম বুজিনি।

উনি অনলাইনে না থাকাতে সাথে সাথে আর রিপলে আসেনি। এখন পালা টাইম লাইন দেখা। টাইম লাইন নোটিফিকেশন দেখে অবাক হয়ে গেলাম। প্রায় ৫০টা নোটিফিকেশন। তাও আবার পিচ্ছি পাগলীর। আমার টাইম লাইনের কোন পোষ্ট আর বাকী রাখেনি। সব গুলোতে লাইক দিলো। কয়েকটা পোষ্টে কমেন্ট আছে।

একটা পোষ্টে কমেন্ট দেখে থ হয়ে গেলাম। পোষ্টটি রাতেই দেয়া হয়েছে। নেশার আসরে বসার সময় “বালিকার ঠোঁটের স্পর্শের চাইতে সিগারেটের স্পর্শ শ্রেয়” এই লেখাটা পোষ্ট করছিলাম। আর ঐখানে পিচ্চি পাগলী কমেন্ট করছে ‘বালিকার ঠোঁটের স্পর্শ টেস্ট করছেন নাকি?!’

আমি আর কমেন্ট রিপলে না করে পোষ্টটাই ডিলিট করে দিলাম। অহেতু তর্ক বা আলগা পিরিত আমার কেমন যেনো সহ্য হয়না।

যাই হোক, ফেসবুকের অবস্থা দেখা শেষ হয়ে গেলো। ডাটা অফ করে উঠে ফ্রেস হয়ে নিলাম। চিন্তা করছি আজকে ভার্সিটি গিয়ে একটু উঁকি দিয়ে আসবো।

আমার আবার ডে শিফটে ক্লাস। তাই সকালে ঘুম থেকে উঠার কোন প্যারা নাই। আর ভার্সিটিতে মাহশাআল্লাহ মাসে একদিন যেতেও কষ্ট হয়।

তাইরে নাইরে করে ভার্সিটি যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলাম। পথেই আম্মুর কল আসলো। ভদ্র ছেলের মতো ফোনটা রিসিভ করে_ আসছালামু আলাইকুম, আম্মু কেমন আছেন?! শরীর ভালো?!
_ভালো আছি বাবা, তুই কেমন আছিস?! কি করিস?!
_আমিও ভালো, আম্মু ভার্সিটি যাচ্ছি। তোমার সাথে পরে কথা বলবো। আর শুনো আমার কিন্তু কিছু টাকা লাগবে। বিকাশ করে দিও।

_আমি টাকা পাবো কই। তোর বাবাকে ফোন দিয়ে বল টাকা দিয়ে দিবে।

মুহুর্তে টাকার কথা ভুলে গেলাম। কারন বাবাকে ফোন দিয়ে টাকা চাওয়ার মতো আপাতত রাস্তা বন্ধ। কিছুদিন আগেই বাবা টাকা দিছে। এখন যদি আবার টাকা চাই দুনিয়ার কপিয়ত দিতে হবে। টাকার ব্যবস্থা অন্য ভাবে করতে হবে। সিস্টেম জানা আছে তো!!

আম্মুর সাথে আর কথা না বাড়িয়ে ফোনের লাইনটা কেটে দিলাম। ক্লাসে গিয়ে দেখি স্যার ক্লাসে চলে আসছে। আমি দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই স্যার আমাকে লক্ষ্য করে_ভীতরে আসার দরকার নেই। বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকো।

কি আজব ব্যাপার একটু দেরী হলো বলে ক্লাসে ডুকতে দিবে না এ কেমন বিচার। তবুও স্যারকে সরি বলে পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে ক্লাসে ডুকলাম। আমি আবার স্টুডেন্ট হিসেবে নোবেল পাওয়ার যোগ্যতা রাখি। ক্লাসে কখনো বই খাতা নিয়ে যাই না। অবশ্য বই কিনলে তো নিবো। যে টাকা দিয়ে বই কিনবো ঐ টাকা দিয়ে একটা বোতল পাওয়া যাবে। তাহলে কি দরকার বই কিনে টাকা অপচয় করার। ক্লাসে ডুকে বন্ধুদের কাছ থেকে বই ধার করে নিজের সামনে রাখি।

আজকে আর কারো কাছ থেকে বই ধার পেলাম না। পাবো কি করে?! সবাই দেখি আমার মতো ভালো স্টুডেন্ট হয়ে যাচ্ছে। বন্ধুরা শুধু একটি খাতা নিয়ে কলেজে এসেছে।

যাই হোক, এক সাবজেক্ট শেষ হলেই দৌড় দিলাম ভার্সিটির ক্যান্টিনের দিকে। মাথাটা গরম হয়ে আছে তাই সিগারেটে ফুঁকাতে হবে। অবশ্য ক্লাসে সিগারেট আমি একা ফুঁকি না সাথে আরো ৭/৮জন আছে। ক্যান্টিনে বসেই বাকি ক্লাস গুলো সিগারেট খেতে খেতে শেষ করলাম। আর ক্লাস রুমে যাওয়া হয়নি।

সন্ধ্যায় বাসার উদ্দেশ্য রওনা দিলাম। বাসায় গিয়ে দেখি রুমমেট সবাই আমার অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে বসে আছে। কারন আবার আসরে বসবে। আমি আবার অনেক লক্ষী ছেলে। সব কিছুতে না করলেও আসরে বসার বেলায় কখনো না করিনা।

আসরে বসবো এমন সময় বন্ধু ফাহিম বলে উঠলো_মামা, জিনিস (গাঁজা) তো শেষ। আগে জিনিস আনতে হবে।

মুহুর্তে মেজাজটা গরম হয়ে গেলো। শালারা এতক্ষন বসে আছে আর এখন বলে জিনিস নাই। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে একশ টাকার একটা নোট দিলাম জিনিস আনার জন্য। আমার সব কিছুতে কিপ্টেমি থাকলেও এ ব্যাপারে কিপ্টেমি নাই। বিশাল মনের অধিকারী বলতে কথা। ফাহিম জিনিস আনার জন্য বের হলো।

এ সময় ভাবলাম হাতের কাজ গুলো সেরে নিই। আমার হাতের কাজ বলতে একটু ফেসবুকে ঘুরাঘুরি আর জরুরী কোন ফোনে আলাপ আলোচনা। ফোনে আলাপ বলতে টাকার প্রয়োজন হলে এদিক সেদিক কল দিয়ে টাকা মেনেজ করা। এখন পকেট যেহেতু প্রায় খালি আগে টাকার ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রথমে আপুকে কল দিলাম সাথে সাথেই রিসিভ করলো। আমি মিষ্টি মধুর সুরে সালাম দিলাম।
আপু সালামের উত্তর নিয়েই_আমার কাছে কোন টাকা নেই। টাকা চাইলে দিতে পারবো না!!

আমি আপুর কথায় হতাশ বা আশাহত হলাম না। কারন আপুর এটা কমন ডায়লগ আমার আগে থেকেই জানা আছে। আমি টাকা প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে_আপু, আমি তো টাকার জন্য কল দিই নাই। এমনি খবরা খবর নেয়ার জন্য দিলাম।
আপু_ও আচ্ছা, আমি ভালো আছি। তোর কি খবর?!
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে_ভালো না রে বোন। আজ দুইদিন ধরে বিছানা থেকে উঠতে পারছিনা।

আপু_কেন কি হয়েছে?! ভাই।
আমি_তেমন কিছুনা, জ্বর সর্দি এগুলো। আচ্ছা আপু রাখি। দোয়া করবেন।

আপু_এই রাখবি না। ঔষধ নিছস কিনা সেটা বল?!
আমি_নাহ আপু, ঔষধ নেয়া লাগবে না। এমনিতে ভালো হয়ে যাবে।

আপু_এমনিতে ভালো হবে কে বলছে। এখনি গিয়ে ডাঃ দেখিয়ে ঔষধ নিবি। পকেটে টাকা আছে?!
আপু_আচ্ছা দেখি। পকেটে একশ টাকা আছে এটা দিয়ে চলবে।
আপু_আচ্ছা, শুন একটু পর বিকাশে এক হাজার টাকা দিচ্ছি ডাঃ দেখাবি।

আমি আর কথা না বলে লাইনটা কেটে দিলাম। কারন আর কথাটা বাড়ালে ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এক হাজার টাকা দিয়ে তো একদিন চলা যাবে। আরো ব্যবস্থা করতে পারলে ভালো হতো।

যেই ভাবা সেই কাজ, দিলাম দুলাভাইকে ফোন। আমার একটা সুবিধা হচ্ছে আপু টাকা দিলে দুলাভাই জানবে না। আবার দুলাভাই দিলে আপু জানবে না। তাই দুইজন থেকেই ধান্ধা করা যায়। তাদের ছোট ভাই বলতে কথা।
দুলাভাই ফোন রিসিভ করলো খবরা খবর জিজ্ঞেস করলো। একই ঔষধ দুলাভাইকেও দিলাম। সাথে সাথেই কাজ হয়ে গেলো। বিকাশে দুলাভাই দুই হাজার টাকা দিয়ে দিলো। আপুর গুলো একটু পরই আসবে হয়তো।

এমন সময় একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসলো। ভাবলাম আপু বা দুলাভাই হয়তো অন্য কোন নাম্বার থেকে কল দিছে। সাথে সাথে রিসিভ করলাম!!

ওপাশ থেকে অপরিচিত কন্ঠে কোন এক রমনী_আসছালামু আলাইকুম, ভাইয়া কি করেন?!
আমি_ওয়ালাইকুম আসছালাম, আপু আসরে বসছি। আর টাকা জোগাড় করতেছি।

_কিসের আসর আর কিসের টাকা বুজলাম না?!
আমি_বুজবেন পরে। এখন আগে পরিচয়টা দিয়ে আমাকে ধন্য করেন।

_আপনি এভাবে কেনো কথা বলছেন?! আমি সীমা কালকে রাতেও আপনাকে কল করছিলাম। ফাহিমের সাথে কথা বলার জন্য।
আমি_ও আচ্ছা, ফাহিম তো বাহিরে গেছে। আর ওর সাথে মোবাইল আছে। ওর নাম্বারেই কল দেন।

_না, আমি আপনার সাথেই কথা বলার জন্য কল দিলাম।
আমি_ধন্য হলাম, তো বলেন কি খেদমত করতে পারি আপনার?!

_নাহ, কিছুনা। আচ্ছা রাখি, আমি মনে হয় বিরক্ত করলাম আপনাকে।
আমি_বিরক্ত হইনি। কল করছেন ভালোই হয়েছে। আপনি কত দিচ্ছেন তা বলেন?!

_সরি, আমি কত দিচ্ছি মানে?! বুজলাম না।
আমি_আমি তো টাকা কালেকশন করতেছি। এখন আপনার নামে কত টাকা লেখবো তা বলতে বলছি।

_আমি কেনো আপনাকে টাকা দিবো। আজব তো!!
আমি_তাহলে রাখতে পারেন।

একথা বলেই লাইনটা কেটে দিলাম। সাথে সাথেই আবার কল আসলো। আমিও আবার রিসিভ করলাম। রিসিভ করেই_বাজেট করছেন নাকি?! বলেন কত দিচ্ছেন?!

মেয়েটা অনেকক্ষন চুপ থেকে শান্ত গলায়_আপনি টাকা নিবেন আমার কাছ থেকে?!
আমি সিরিয়াস কন্ঠে_হ্যাঁ অবশ্যই নিবো। আমার কাজই তো টাকা কালেকশন আর আসরে বসা।

_ওকে, তাহলে কালকে আমার সাথে দেখা করতে হবে। দেখা হওয়ার পর দিবো।
আমি_ সরি আপু, হোম কালেকশন করার সময় নেই। বিকাশ একাউন্ট আছে ঐখানে ডেলিভারী দিতে পারেন।
_নাহ, কালকে দেখা করবেন তারপর দিবো। আচ্ছা এখন রাখি পরে কল দিচ্ছি আপনাকে।

একথা বলেই লাইনটা কেটে দিলো। মেয়েটার সাথে মজা করে ভালোই লাগলো। মেয়েটা হয়তো টাকার ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নিয়েছে। আমি এতোটা পাগল না যে অপরিচিত কারো কাছ থেকে টাকা নিবো।

এর মাঝে ফাহিম চলে এসেছে। সুতারাং, মোবাইল পর্ব শেষ। এখন যদি বারাক ওবামা কল দেয় তবুও রিসিভ হবে না। আগে খানা-খানি তারপর বাকী সব।

কিছুক্ষনের মাঝেই পুরো রুম ধোঁয়ায় অন্ধকার করে পেললাম। আবারো উঁড়তে লাগলাম শূর্ন্য আকাশে। পৃথিবীটা ঘুরছে সাথে আমিও পৃথিবীর সাথে তাল মিলাচ্ছি। কঠিন সুখে হারিয়ে যাচ্ছি।

আর মনের মাঝে দৌলা দিচ্ছে কিছু অতীতের স্মৃতি। স্মৃতি গুলো অবশ্য মধুর ছিলো। কারো হাত ধরে পথ পাড়ি দেয়া। কারো হাতের স্পর্শে শিহরিত হওয়া। কারো অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থেকে বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে যাওয়া। কারো মুখে মিষ্টি মধুর সুরে একটি শব্দ ‘ভালোবাসি তোমায়’ শুনার প্রতিক্ষা করে যাওয়া।

হঠাৎ তার মুখটা ভেসে উঠলো চোখের সামনে। এই তো আমাকে ডাকছে। এইতো আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে সে। হাতটা বাড়িয়ে আছে আমি ধরবো বলে। আমি হাতটা সামনে নিচ্ছি তো নিচ্ছি, যেই ধরতে যাবো সে অদৃশ্য হয়ে গেলো। আর ধরতে পারলাম না। তার লুকোচুরি খেলায় আমি প্রতিবারই পরাজিত। দীর্ঘ এক বছর ধরে অনেক চেষ্টা করেও আজো পারলাম না তাকে একটু স্পর্শ করতে। স্পর্শ করবো কি করে?! বাস্তবে সে আছে অনেক দূরে। অন্যের রঙ লীলায় রঙিন হয়ে!!

যেদিন সে অন্যের মাঝে সুখ খুঁজে পেলো। আমার সাথে কাটানো তিনটা বছর ভুলে গিয়ে আমাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলো। সেদিনই মাটি দিয়েছি আমার আমিত্বকে। সেদিন থেকে ভুলে গিয়েছি ভালোবাসা কাকে বলে। আবেগ, অনুভূতি স্বপ্ন এগুলো ছুঁড়ে পেলে দিয়েছি কোন এক নর্দামায়।

মৃত্যুর সাথে সেদিন আলিঙ্গন করে নিয়েছি। বেছে নিয়েছি তিলতিল করে মরার একটি পথ। জ্বালিয়ে দিচ্ছি শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।

এখন শুধু অপেক্ষায় আছি সেই দিনটির জন্য। যেদিন জীবন প্রদীপ নিবে যাবে। হারিয়ে যাবো অন্ধকারে। অচীনপুরে বাস করবো প্রিয়ার দেয়া সেই বিষাদের যন্ত্রণা নিয়ে।

অতীত ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলাম তা টেরও পাইনি। ঘুম থেকে জাগলাম রাত প্রায় দুইটায়। প্রচুর খিদা লাগছে কিছু খাওয়া দরকার। কিচেন রুমে গিয়ে দেখি ভাত আর ডাল রান্না করা আছে আর কিছুই নেই। খিদার জ্বালায় থাকতে না পেরে ভাত ডাল সাথে কাচা মরিচ দিয়ে খিদা নিবারণ করলাম।

একটু পর ফাহিমও উঠে গেলো। উঠে আমার সাথে খানায় যোগ দিলো। ফাহিম আমাকে উদ্দেশ্য করে_দোস্ত, তোকে সীমা কল দিছিলো?!
আমি_হও দিছিলো, কাহিনি কি বল তো?! আর তোর কেমন বান্ধবী?! আর কখনো তো তার নাম শুনিনি!!

ফাহিম_কাহিনি কিছু না দোস্ত, ও মনে হয় তোকে পছন্দ করে। অনেক আগেই তোর নাম্বার নিছে আমার কাছ থেকে। আর তোর ব্যাপারে সব কিছুই জানে। ও আমার কেমন বান্ধবী এটা তোর জানতে হবে না!!

আমি অনেকটা অবাক হয়ে_আমার ব্যাপারে কি জানে?! আর আমাকে চিনেই বা কি করে?
ফাহিম_আমার সাথে তোকে দেখছিলো একদিন। তারপর তোকে পছন্দ হয়েছে বললো। আর তোর ব্যাপারে আমার থেকে সব কিছুই জেনে নিছে।

আমি_কি জেনে নিছে?! আর তুই তো কোনদিন তার কথা বললি না!!
ফাহিম_তোর অতীত বর্তমান সব কিছুই। আর তোকে বলতে চাইছিলাম অনেক বার। কিন্তু বলার সুযোগটা পাইনি!!
আমি_ও আচ্ছা, তুই আমি যে নেশাখোর এটাও জানে?!
ফাহিম_হুম, সব কিছুই জানে!! আর শুন কালকে আমরা সীমার সাথে দেখা করতে যাবো। ও বলছে তোকে নিয়ে ওর সাথে দেখা করতে!!

ফাহিমের কথা গুলো শুনে কেমন যেনো খটকা লাগলো। মনে হচ্ছে ও কিছু লুকাচ্ছে আর মিথ্যে বলতেছে। তবুও ফাহিমকে বুজতে দিলাম না। ওর কথায় রাজি হলাম কালকে সীমার সাথে দেখা করবো!!

পরদিন বিকেলবেলা বাসা থেকে বের হলাম। উদ্দেশ্য সীমার সাথে দেখা করা। কোথায় দেখা হবে এটা ফাহিম ভালো জানে। আমার এ নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। বিকেলে এমনিতেই ঘুরতে বের হতাম। তো একসাথে ঘুরা আর দেখা করা দুটোই হবে।

একটি পার্কের সামনে রিক্সা থামলো। পার্কের গেটের ভীতর ডুকে একটু সামনে এগুতে লাগলাম। হঠাৎ পা থমকে গেলো দূর থেকে খুব পরিচিত একটি মুখ দেখে। ফাহিম আমার কাঁদে হাত দিয়ে_সামনের দিকে চল। সীমাকে খুঁজে বের করি।

আমি মেয়েটার দিকে ইশারা করে ফাহিমকে_দোস্ত, এটা মিলি না?! আমার কথায় ফাহিম সামনের দিকে ভালো করে তাকিয়ে ফাহিম চুপ হয়ে যায়।
একটু পর ফাহিম_দোস্ত চল ওর সাথে দেখা করে আসি। প্লিজ আমার একটা অনুরোধ শুধু ও কি বলতে চায় শুনবি!!

একথা বলেই ফাহিম আমার হাত ধরে হাঁটা শুরু করে। আমি আর কিছু না বলেই ফাহিমের সাথে হাঁটা শুরু করি। মিলির সামনে যাওয়ার সাথে সাথেই মাথাটা নিচু করে দাঁড়িয়ে গেলাম। সামনের দিকে তাকানোর আর সাহস হচ্ছে না!!

ফাহিম আমাকে মিলির সামনে রেখেই অন্যদিকে চলে যায়। আমি এই মুহুর্তে কি বলবো বা কি করবো কিছুই বুজতে পারছি না। দীর্ঘ এক বছর পর এভাবে দেখা হবে ভাবতেও পারিনি। ফাহিম আমাকে না বলে এমন নাটক সাজালো যা একটুও বুজতে পারিনি। মিলিকে সীমা চরিত্রে নিয়ে নিলো। সীমার সাথে তো আমিও ফোনে কথা বলছি একটুও বুজতে পারিনি এটা মিলি। দিনদিন স্মৃতি শক্তি এবং শ্রবণ শক্তি মনে হচ্ছে লোপ পাচ্ছে।

চুপচাপ নিছের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। চোখের কোণে মনে হয় জল জমা হচ্ছে। এটা কি বেদনার জল নাকি আনন্দের তাও বুজে উঠতে পারছি না। আর এতোদিন পরে মিলি কেনো আমার সাথে দেখা করার প্ল্যান করলো তাও মাথায় আসছে না। হিসেব মতে মিলিতো সুখের সাগরে ভাসার কথা। তার হ্যান্ডসাম বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে। যাকে পেয়ে আমাকে ছেড়ে দিতে বিন্দু মাত্র দ্ধিধাবোধ করেনি!!

অনেকক্ষন নীরবতা পালন শেষে মিলির মুখ থেকেই কথা বের হলো_ কেমন আছো তুমি?!
আমি_হুম, মনে হয় অনেক ভালো
মিলি_আমার উপর অনেক রাগ আর ঘৃনা। তাই না?! জিজ্ঞেস করবে না আমি কেমন আছি।

আমার কথা বলার তীব্র ইচ্ছে থাকলেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। কি বলবো ভেবে পাচ্ছিনা। খুব কাছের মানুষটি দূরে গিয়ে আবার হঠাৎ সামনে আসলে কথা বলার ভাষা খুঁজে পায়না, তা জানা ছিলো না। আজকে বুজতে পারলাম। আমার থেকে উত্তর না পেয়ে আবার

মিলি_খুব বিরক্ত হচ্ছো?! ভাবছো আমি কেনো এখানে?! শুনতে চাও আমি কেনো এখানে?!
আমি_ কিছুই শুনতে চাচ্ছি না। মৃত ব্যক্তিকে হঠাৎ দেখে একটু অবাক হয়েছি। আর কিছু না!!

মিলি_ওহ, আমি তাহলে মৃত?! সত্যি তো আমি মৃত। আমার অস্থিত্ব থেকেও আমি মৃত।
আমি_আমাকে আর কিছু বলার থাকলে বলো।

মিলির চোখে জল। ঠিক যেমনটি এক বছর আগে আমার চোখেও জল ছিলো।
মিলি কাঁদো কাঁদো গলায়_বিশেষ কিছু বলতে আসিনি। আমি জানি আমি অনেক খারাপ। আর খারাপ মানুষের পাশে কেউ থাকে না। আমি শুধু তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি। পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি ভুল মানুষের প্রেমে পড়ে তোমাকে কষ্ট দিয়েছি।

আমার মাঝে হঠাৎ এতোটা কাঠিন্য আসলো কিভাবে বুজতে পারছি না। মিলির প্রতি রাগ নাকি ঘৃনার জন্য এমন হচ্ছে তাও জানিনা। তবে কেনো যেনো মনে হচ্ছে এই মুহুর্তে আমার এখান থেকে চলে যাওয়া উচিৎ। মিলির কথায় বুজা যাচ্ছে তার হ্যান্ডসাম বয়ফ্রেন্ডের সাথে আর রিলেশন নেই। শিওর কঠিন কোন ধোকা খেয়ে আসছে।

আমার ভাষাগত সমস্যা হচ্ছে। কি বলবো কিছুই বুজে উঠতে পারছি না। তবুও মিলিকে উদ্দেশ্য করে_দেখো মিলি, আমি তোমাকে অনেক আগেই ক্ষমা করে দিয়েছি। আর আমার ভালোবাসায় পরিপূর্ণতা ছিলো না বলেই তুমি অন্য কারো ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হতে চেয়েছো।

মিলি_হুম, পরিপূর্ণ হতে চেয়েছি। কিন্তু আমি পারিনি। আমি ভুল মানুষের কাছে ভালোবাসা চেয়েছি। যার কাছে ভালোবাসার মানে শারীরিক চাহিদা মাত্র।

আমি_চলার পথে অনেক ভুল হয়। আশা করি ভবিষ্যতে আর ভুল করবে না। ভালো থেকো!!
মিলি_আমি পারবো না ভালো থাকতে। আমার ভালো থাকার জন্য তোমাকে চাই। আমাকে কি আর একটি বার আপন করা যায়?!

মিলির শেষের কথার উত্তর না দিয়ে সোজা হাঁটা শুরু করলাম। মৃত আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা আর মায়াকে সজাগ করতে চাইনা। নতুন করে জড়াতে চাইনা মিথ্যে ভালোবাসায়। চোখটা ঝাপসা হয়ে আসছে। একটু পরই টুপ করে একফোঁটা জল মাটিতে পড়বে। কষ্ট গুলো গুলো মুচে যাবে সেই অশ্রুফোঁটায়!!

মিলির গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু মানুষ আবেগ প্রবণ যতই চেষ্টা করুক তার ভীতর আবেগ আসবেই। আমিও আবেগের কাছে পরাজিত হয়ে কিছুদিন পর আত্মসমর্পণ করলাম মিলির ভালোবাসার কাছে। আবারো ফিরে আসলো ভালোবাসা, অনুভূতি আর মায়া। আবারো স্বপ্ন দেখা শুরু হলো।

মদ গাজার নেশা দূর করে আবারো নতুন নেশায় আসক্ত হলাম। এই নেশা কখনো কাটবে না। এই নেশা হলো ভালোবাসার নেশা!

বি. দ্র. : জীবনে চলার পথে অনেকে সঙ্গী হবে আবার মাঝপথে অনেকে থমকে দাঁড়াবে। তখন আপনাকে একাই চলতে হবে, একা একা চলা শিখতে হবে। এই সময়টুকু নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করুন। মদ গাঁজার নেশায় হারিয়ে যাবেন না। ভাবুন পরিবার পরিজনদের কথা। তারা কি চায়?! তাদের ভালোবাসা উপভোগ করার চেষ্টা করুন।

জীবন একটাই, ক্ষনিকের এই জীবন উপভোগ করুন। দুঃখের পরে সুখ আসবে এই বিশ্বাস মনের মাঝে রাখুন। মনে রাখবেন, সুখটা সম্পূর্ণ আপেক্ষিক একটা ব্যাপার, যা কখনো বলে কয়ে আসে না। সবার জীবন সুন্দর এবং মধুময় হোক এই কামনা করি। ‘ধন্যবাদ সবাইকে’

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত