একদিন স্বপ্নের দিন

একদিন স্বপ্নের দিন

আমার স্বপ্নগুলো সব সময় কেমন যেন আজব ধরনের হয়।

স্বপ্ন মানে ঘুমানোর পর যে স্বপ্ন দেখি সেই স্বপ্ন। আমি একদিন আব্বাস কিয়ারোস্তমির মতো ফিল্ম মেকার হবো, জীবনের সেই স্বপ্ন না।

আজব হয় কারন কেমন করে যেনো ঘুরে ফিরে সব স্বপ্ন ক্যাডেট কলেজে গিয়ে শেষ হয়। এমনকি ক্যাডেট কলেজ থেকে বেরিয়ে আসার এতোদিন পরেও আমার অনেক স্বপ্ন শুরুই হয় ক্যাডেট কলেজে।

অনেকে বিশ্বাস করবে না, কিন্তু এটা সত্যি।

আমি যেদিন প্রথম মোবাইল কিনলাম, ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারে, সেই ঘটনাটাই বলি। টিউশনির বেতন পেয়ে আর মাসুদের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়ে (সেই ধার আজো শোধরানো হয়নি, কোনদিন চেষ্টাই করিনি। বন্ধুদের কাছে আমি চিরঋনীই রয়ে গেলাম) একটা গ্রামীন প্রি-পেইড সিম আর সাজেম সেট কিনে ফেললাম। মাসুদ নিজেই তখনো মোবাইল কিনেনি। কিন্তু তাতে কি! একটা মোবাইল নিয়েই দুজনে খুশিতে নাচতে নাচতে ইউনিভার্সিটির হলে ফিরে এলাম। দুজনে মিলে একটু পর পর একে এসএমএস করি তো ওকে মিসকল দেই। বন্ধু-বান্ধব দু-একজন যাদের মোবাইল আছে তাদের ফোন করে অকারনে বিরক্ত শুরু করলাম।

‘দোস্ত, মোবাইল কিনলাম তো’

‘আরে তাই নাকি মাম্মা’

‘নাম্বার হইলো ০১৭০৬…’

‘নাম্বার উঠছে তো আমার এখানে, সেভ করতেছি’

‘ও উঠছে! তাও খাতায় লিখা রাখ। যদি ভুইলা যাস আর কী’

‘আরে না না ঠিকাসে…’

এইভাবে পুরোটা সন্ধ্যা পার করে মাসুদ বিদায় নিলো আর আমি আমার রুমে ফিরে ঘুমাতে গেলাম। এবং যথারীতি একটা স্বপ্নও দেখালাম।

স্বপ্নের শুরুই হলো প্রিন্সিপাল প্যারেড দিয়ে। প্রিন্সিপাল স্টেজে দাঁড়িয়ে আছেন। এসিস্ট্যান হাউজ প্রিফেক্টের নেতৃত্বে আমাদের জুনিয়র স্কোয়াড তাকে ডানে সালাম দেয়ার জন্য এগিয়ে যাচ্ছে। প্রিন্সিপাল স্যারের সামনে যাওয়ার পর এসিস্ট্যান হাউজ প্রিফেক্ট বললেন ‘স্কোয়াড ডানে দেখবে, ডানে-এ এ এ দেখ।’ আমরা স্যালুট দিয়ে ডানে তাকালাম। এমন সময় আমার মোবাইল বেজে উঠলো। পুরো স্কোয়াডের বাকি সবাই আমার দিকে ঘুরে তাকালো। আমি পকেটে হাত দিয়ে মোবাইলটা বের করে রিংটোন অফ করতে যাবো এমন সময় প্রিন্সিপাল স্যার চিৎকার দিলেন- ‘কামরুল ফল আউট, ফল আউট। ব্লাডি শীট, প্যারেডে মোবাইল নিয়া আসছে।’ আমি ফল আউট হলাম। এডজুট্যান্ট স্যার, কয়েকজন স্টাফ দৌড়ে আসলেন। মোবাইলটা আমার হাত থেকে নিয়ে এডজুট্যান্ট স্যার বললেন ‘ইউ ড্যাম নাট, স্টার্ট ফ্রন্ট রোল।’ তারপর শুরু হলো পাঙ্গা। সব স্টাফ মিলে এমন পাঙ্গা দিলেন যে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো।

আমি উঠে থ। কলেজ থেকে বেরিয়ে এসেছি এতো বছর, তাও স্বপ্নে এসে স্টাফরা পাঙ্গা দিয়ে যান। এতো মহা মুশকিল।

আর স্বপ্নের ক্যাডেট কলেজেও মোবাইল নেয়া যাবে না, তাইলে ক্যামনে কী? স্বপ্নে মোবাইল নিতে দিলে কী এমন ক্ষতি?

এরপরের ঘটনাটা আরো কিছুদিন পরের………

বলা নেই কওয়া নেই আমি ইউনিভার্সিটির এক ক্লাসমেটের প্রেমে পড়ে গেলাম। যেনো তেনো প্রেম না। একেবারে দেবদাস-পার্বতী টাইপ প্রেম। ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট্রির লেকচার আর ভালো লাগে না। স্যার বোর্ডে কী সব হাবিজাবি লিখেন আমার তাতে মন টানে না। আমি পিছনের সারিতে বসে আমার পার্বতীকে দেখি। পার্বতী অবশ্য আমার দিকে ফিরেও তাকায় না। তাকাবেইবা কেন? আমি তো আর বলিনি যে তাকে ছাড়া আমার জীবন কতো অর্থহীন!

ক্লাস শেষ হয়। পার্বতী ক্যান্টিনে যায়, আমিও তার পিছন পিছন ক্যান্টিন যাই! পার্বতী সস দিয়ে সিঙ্গাড়া খায়। সিঙ্গাড়া আমার খুব অপছন্দ। না খেয়ে মরে গেলেও আমি কখনো সিঙ্গাড়া খাওয়ার কথা ভাবি না। কিন্তু পার্বতীর দেখাদেখি আমিও সিঙ্গাড়ার অর্ডার দেই, তারপর সস দিয়ে সিঙ্গাড়া খাই আর পার্বতীকে দেখি! পার্বতী অবশ্য আমার দিকে ফিরেও তাকায় না।

এইভাবে ক্রমশ ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট্রির সব লেকচার শেষ হয়ে যায়, মনে হয় ডিপার্টমেন্টের ক্যান্টিনের সব সিঙ্গাড়াও। কিন্তু পার্বতীকে আমার আর বলা হয় না যে তাকে ছাড়া আমার জীবন কতো অর্থহীন।

অবশেষে একদিন শরতের সুন্দর সকালে, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে নাকি নামতে নামতে ঠিক খেয়াল নেই, দুনিয়ার সব সাহস সঞ্চয় করে আমি পার্বতীকে বললাম ‘ তোমার ভালোবাসা পেলে আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নেবো, দুরন্ত ষাড়ের চোখে বেধে দেবো লাল কাপড়। বলো, আমাকে ভালোবাসো।’

হায় কপাল! মুখ ঝাপটা দিয়ে পার্বতী বললো ‘ বানরের আবার সখ কতো!’

সিনেমার নায়ক যখন দুঃখ পায় তখন নাকি মদের ডিব্বা খুলে বসে। আফসোস, আমার তখন মদ কিনারও পয়সা নেই।

এমন করে কেউ বলে ! না হয় চেহারায় পুর্ব পুরুষের ছাপ একটু রয়েই গেছে, বিবর্তনটা আর সবার মতো আমার পুরোপুরি হয়নি। তাই বলে মুখের উপর এটা বলতে হবে। মনের দুঃখ আমি এখন কারে দেখাই? শহিদুল্লাহ হলের পুকুর পাড়ে মাঝরাত পর্যন্ত বসে থেকে টানা দেড় প্যাকেট গোল্ডলীফ শেষ করে আমি রুমে এসে ঘুম দিলাম। যথারীতি একটা স্বপ্নও দেখালাম।

আবারো ক্যাডেট কলেজ। ক্লাস ইলেভেনে পড়ি। সদ্য ইউনিভার্সিটি পাশ করে আসা এক তরুনী বায়োলজি ম্যাডামের প্রেমে পড়ে গেলাম। বায়োলজিতে আমি খুব দুর্বল। আমার জন্য ইটিডি হলো পারফেক্ট। কিন্তু ম্যাডামের বেশি কাছাকাছি থাকা যাবে, বেশি বেশি ম্যাডামকে দেখা যাবে এই চিন্তা করে আমিও বায়োলজি নিয়ে নিলাম। এবং একদিন হঠাৎ প্রেপ টাস্কের খাতা দেখাতে গিয়ে একা পেয়ে ম্যাডামকে বললাম ‘ম্যাডাম আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে।’

‘সাট আপ, ফাজিল ছেলে। তোমার বেল্ট লুজ কেনো? সু পালিশ নাই কেনো? বদমাশ ছেলে, টার্ন আউট ঠিক নাই, বলে আমাকে ভালো লাগে!!’

ধমক খেয়ে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। আমি বিছানায় উঠে বসে ভাবতে থাকলাম স্বপ্নে কি দেখেছি। আর তখনি আমার কাছে সব কিছু ফিলিপস বাত্তির মতো ফকফকা হয়ে গেলো।

পার্বতীকে আমি যখন ভালোবাসার কথা বলি তখন আসলে আমার টার্ন-আউট ঠিক ছিলো না!

লিখেছেন – -কামরুল ইসলাম |

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত