রুপার কাঁকন

রুপার কাঁকন

রুমানার সাথে পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিকে। প্রথম বর্ষের ওরিয়েন্টেশন ক্লাসে। উল্লোসিত অনেক অপরিচিত মুখের মাঝে চোখ ঘুরতে ঘুরতে একটা পানপাতা মুখের ডাগর ডাগর চোখের দৃষ্টির কাছে চোখ আনত হলো। ঘুরে ফিরে সেই ডাগর ডাগর দৃষ্টির কাছেই চোখ যাচ্ছে। সেও যেন আড়চোখে আমার দৃষ্টি অনুসরণ করছে। দু’জনের দৃষ্টি কোন এক অজানায় গিয়ে মিলিত হচ্ছে। সাগরের ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ছে। ঢেউয়ের কিছু ঝাপটা আছড়ে পড়ছে এসে আমার বুকে। কিছু হয়ত তার বুকে। এই দৃষ্টি বিনিময়ের পর আমি কিছুটা অবাক হলাম। স্কুল, কলেজ জীবনে কখনও কোন মেয়ের দিকে সরাসরি চোখ তুলে তাকানোর সাহস হয়নি। সেই আমি কিনা আজকের এই দিনে নতুন একজোড়া চোখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে নির্লজ্জভাবে তাকাচ্ছি। দুপুর পর্যন্ত কয়েকজন ক্লাসমেটের সাথে পরিচিত হয়ে ডিপার্টমেন্ট থেকে উদাস মনে বাসায় ফিরলাম।

এরপর একদিন, দুইদিন, তিন দিন। দিনে দিনে সপ্তাহ পেরিয়ে সবার সাথে ভাব বিনিময় হয়। আড়ষ্টতার কারণে রুমানার কাছে গিয়েও কথা বলা হয় না। চেষ্ঠা যে করিনি তা না। ক্লাসের মধ্যে তার কাছাকাছি বসেছি, বসে বসে উসখুস করেছি। তার পায়ের কাছে কয়েকবার কলম ফেলে নিজে নিজেই তুলেছি। রুমানা একদিন হাত বাড়িয়েছিল কলম তোলার জন্য। পরক্ষণে কোন এক অজানা শঙ্কায় বা অহমিকায় হাত গুটিয়ে নিয়েছে। ব্যর্থ মনোরথে গুমরে অনেক কেঁদেছি। এতদিনে বেশ কিছু ক্লাসমেটের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। কিন্তু তার সাথে যেন অঘোষিত কথাবন্ধ যুদ্ধ চলছে।

ইতোমধ্যে দু’মাস পেরিয়ে গেছে হাতের আংগুল গুনে বর্ষাকাল এসে পড়েছে। একদিন সোমবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত প্রাকটিক্যাল ক্লাস হলো। দুপুর থেকে একটানা বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি থামার কোন লক্ষণ নেই। ক্লাস শেষে যে যার মত করে বাসায় চলে গেছে। যাত্রী ছাউনীতে শেষ যাত্রী হিসেবে আমি আর রুমানা আটকা পড়লাম। সে অদূরে একটা বটগাছের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন জীবনে এই প্রথম বটগাছ দেখছে। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ পায়চারী করার পর শুকনো গলায় কিছুটা সতেজতা আনার চেষ্ঠা করলাম। এখন কি করবেন?—সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম। জিজ্ঞেস করে নিজের গলা শুনে নিজেই হতভম্ব হলাম। গলাটা এরকম ফ্যাশফ্যাশে শোনাচ্ছে কেন?

কি করবো মানে? রিকসা পেলে সোজা বাসায় চলে যাবো।–তার নিরুত্তাপ উত্তর।

বুঝলাম, গলায় তাপ থাকলেও কিছুটা আদ্রতা অবশিষ্ট আছে। তাই প্রথমবার পিটুনী খাওয়ার পর ভিকটিমের সাহস বেড়ে যাওয়ার মত আমারও সাহস কিছুটা বেড়ে গেল। বললাম, চলেন বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাসায় চলে যাই।

আচ্ছা আমাকে আপনি আপনি করছেন কেন? ক্লাসমেটকে কেউ আপনি করে ডাকে?-রুমানার কন্ঠে আরও কিছুটা উষ্ণতা টের পাওয়া গেল। কৌতুক মেশানো কন্ঠে বললাম, তুমিওতো আমাকে আপনি আপনি করছো।

রুমানা খিলখিল করে হেসে উঠলো। তার উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ পানপাতা মুখ। হাস্যোজ্জ্বল বিকশিত দন্তশ্রীতে সৌন্দর্য যেন কয়েকগুন বেড়ে গেল। বেড়ে গেল আমার হৃদয়েরও চঞ্চলতা।

আচ্ছা তোমার নাম রুমন না?

কোন সন্দেহ আছে?

মানে অন্যের মুখ থেকে শোনা আর নিজের মুখ থেকে শোনার মধ্যে আলাদা মাহাত্ম্য কাজ করে।

হুমম বুঝলাম। তোমার নাম রুমানাতো?

আবারও খিলখিল করে হাসা শুরু করলো সে।

হাসি সংযত করে রুমানার অনুসন্ধিৎসু জিজ্ঞেস, তোমার বাসা কোথায়?

মোহাম্মদপুর।–তোমার?

কলাবাগান।

বাহ! ভালই হলো। আমরা একই পথের পথিক তাহলে। আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। দেখি কোন রিকসা পাওয়া যায় কিনা। না পাওয়া গেলে আমরা হেঁটেই যাত্রা শুরু করবো।–রুমানা বললো।

বললাম – ওকে ঠিকাছে। কিন্তু মন বলছিল ভিন্ন কথা। রুমানার সাথে প্রথম পরিচয়ের দিনটা সোনার অক্ষরে স্মরনীয় হয়ে থাকুক। আমরা বৃষ্টিতে ভিজেই বাসায় যাই। সেই শৈশবের বৃষ্টিমূখর দিনগুলোতে পলিথিনে বই পত্তর ভরে সবাই মিলে যেমন করে বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে বাসায় ফিরতাম। সেরকম একটি দৃশ্যের কথা কল্পনা করতে লাগলাম। রুমানা হয়ত আমার মনের কথা পড়তে পারলো। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলো, পা থাকতে কিসের রিকসা, কিসের অপেক্ষা, চলো তবে শুরু হোক। আনন্দে লাফ দিয়ে উঠলাম।

শুরু হলো আমাদের একসাথে পদযাত্রা। সেদিন কোথাও কোন কাক ভিজেছিল কিনা খেয়াল করিনি। আমরাই হয়েছিলাম বৃষ্টিভেজা কাক। কাক শব্দটি বড্ড হেয়ালী লাগছে। আমরা বরং শালিক ভেজা হয়েই বাসায় ফিরেছিলাম। পথে থেমে যাওয়া মানুষদের কৌতুহলী দৃষ্টি উপেক্ষা করে আমাদের কথার বৃষ্টিমালা ঝড়েছিল। সেই বৃষ্টিতে বস্তুত আমি আর রুমানা ভিজে যাচ্ছিলাম। ভিজে ভিজে কলাবাগানে রুমানার বাসার কাছে এসে থমকে গেলাম। দু’জন বেশ অবাক হলাম। যাত্রা পথটা এত সংক্ষিপ্ত কেন হলো?

বাসায় এসে গোসল করে শুয়ে পড়লাম। শুরু হলো কাঁপুনী দিয়ে জ্বর, সাথে সর্দি। মা আমাকে নিয়ে অস্থির হয়ে পড়লেন। তার যেন দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। যতই বলছি সামান্য সর্দি জ্বরে কিচ্ছু হবেনা। তার এক কথা, তুই বৃষ্টিতে ভিজতে গেলি কেন? বৃষ্টি থামলে রিকসা নিয়ে আসতি। তাকে কিভাবে বলি? আজকে আমার জন্য বিশেষ একটি দিন। হাজার দিনের একটি দিন। সুখের বাহক বৃষ্টিমুখর একটি দিন।

আমার পাঁচ বছর বয়সে বাবা-মা মিলে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাই। কয়েক দিন গ্রামে ঘুরে ফিরে বাবার কর্মস্থল ঢাকায় ফেরার পথে রোড এক্সিডেন্টে বাবা-মা মারা যায়। বেঁচে যাই হতভাগা এই আমি। এই সন্তানহীনা রমনী দাদীকে অনেক বুঝিয়ে আমাকে তার বাসায় নিয়ে আসেন। তিনি মায়ের দূর সম্পর্কের বোন। স্বল্প বেতনভোগী স্বামী। সংসারে অনেক টানাপোড়ন। তারপরও তিনি কখনও আমার ছোটখাটো চাওয়া অপূর্ণ রাখেননি। একজন প্রকৃত মায়ের চেয়েও তার কাছ থেকে যেন অধিক স্নেহ-ভালবাসা পেয়েছি, পাচ্ছি। তার নিবিড় শুশ্রূসায় জ্বর যেন অনেক আগেই সেরে গেল। কিন্তু চোখের তারায় ঘুমন্ত মেয়েটির জন্য ব্যাকুল হয়ে গেলাম।

তিন দিন জ্বরে ভুগে শরীরের অবস্থা কাহিল। চতুর্থ দিনে জ্বর সারার উপক্রম হলে সামান্য জ্বর নিয়েই ইউনিভার্সিটিতে উপস্থিত হলাম। রুমানার জন্য উৎকন্ঠা কাজ করছে। সে আবার অসুস্থ হয়নি তো? প্রথম ক্লাস ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। স্যারের পার্মিশন নিয়ে ক্লাসে ঢুকলাম। শেষ বেঞ্চে প্রার্থিত চোখ জোড়ার দিকে নজর গেল। তার কাছে গিয়ে বসলাম। এই কয়েকদিনে সেও শুকিয়ে কাষ্ঠাকার। চোখের নিচে রাজ্যের কালী পড়েছে যেন। ফিসফাস করে কথা চলতে থাকলো। আমাদের ভাব বিনিময় মাত্রাতিরিক্ত মনে হলে আহমেদ স্যার দু’জনকেই দাঁড় করালেন। বললেন, “তোমাদের কথা বলার প্রয়োজন হলে ক্লাসের বাইরে গিয়ে কথা বলবা। আমার ক্লাস চলাকালীন আমি যা বলবো তাই মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। দয়া করে এখন দু’জনে বেড়িয়ে যাও।” ক্ষনিক অপমানিত বোধ করলেও বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই সব ভুলে গেলাম। ভুলে গেলাম পার্থিবতা। অপার্থিবতায় ভর করে সারাদিন টিএসসি আর বকুলতলায় বসে গল্প করলাম। রুমানার তৎপরতায় ক্যাফেটেরিয়ায় কয়েকবার লেবু চা খেলাম।

আহমেদ স্যার বের করে দেয়াতে আমরা অখুশী হইনি। বরং তার রূঢ়তা আমাদের জন্য টনিক হিসেবে কাজ করেছে। আমরা পণ করেছি, এখন থেকে নিয়মিত ক্লাস করবো। ডিপার্টমেন্টে ক্লাসের ফাঁকে অবসর সময়গুলোকে পড়াশুনার কাজে লাগাবো।

দুপুর গড়িয়ে তিনটা বেজে গেলে দুজনে রিকসা করে বাসায় রওয়ানা দিলাম।

হলোও তাই। যে আমি সপ্তাহে তিনদিন ক্লাসে যাই তো বাকী দিনগুলো গায়ে ইউনিভার্সিটির উষ্ণ হাওয়া লাগাই। সেই কিনা সারা সপ্তাহ ক্লাস করছি। মূলত: আমরা ক্লাস আর পড়াশুনায় নিয়মিত হয়ে গেলাম। ক্লাস লেকচারগুলো ফলো করি। অবসরে লাইব্রেরীতে যাই। দু’জনে মিলে রেফারেন্স বুক ঘেটে ঘেটে পরীক্ষার জন্য নোট তৈরী করি। নোট তৈরী হয়ে গেলে, পুরোদমে পড়াশুনায় মনোনিবেশ করলাম।

ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা সমাগত। পরীক্ষার কারণে তিন দিনে একদিন ইউনিভার্সিটি যাওয়া হয়। বাকী দিনগুলোকে মনে হয় হাজার বছর। পরীক্ষার পর একঘন্টা কাটাতাম বকুলতলায়। সামান্য দু’চার মার্কসের জন্য রুমানার কান্নাকাটির অন্ত ছিল না। এই একঘন্টা ছিল রুমানার শোক প্রকাশের সময়।

দেখতে দেখতে পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাস শুরু হয়ে গেল। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে একদিন রেজাল্ট বের হলো। সিনেমার মত শুনালেও সবাইকে অবাক করে দিয়ে রুমানা হলো ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট আর আমি হলাম ফার্স্টক্লাস সেকেন্ড। এতদিন যারা আমাদের দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে চাইতো তারাও আজ ঈর্ষার চোখে চাওয়া শুরু করলো। আহমেদ স্যার তার রুমে দু’জনকে ডাকলেন। আমাদের নিয়ে যাওয়া মিষ্টি খেলেন। আমার কাঁধ চাপড়ে বাহবা দিলেন আর দুজনকে দুটো কলম উপহার দিলেন। আবেগী রুমানার চোখ দিয়ে বৃষ্টিধারার ন্যায় পানি পড়া দেখে আমিও থাকতে পারলাম না। এই রেজাল্টই শেষ রেজাল্ট না, তোমাদের ফাইনাল ইয়ার পর্যন্ত পড়ালেখার সাথে যুদ্ধ করতে হবে। আমি মনে করি তোমরা তা পারবে।—আহমেদ স্যার বললেন। আমরা যেন আবারও পণ করে স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিলাম।

ডিপার্টমেন্টে রুমানা-রুমন জুটি আগের চেয়ে আরও সুপরিচিতি পেল।

ঝড়ো হাওয়ার ন্যায় বেড়ে গেল আমাদের উৎসাহ উদ্দীপনা। পূর্ণ উদ্যোমে সেকেন্ড ইয়ারের পড়াশোনা শুরু হলো। পরীক্ষা হলো, রেজাল্ট হলো। সেকেন্ড ইয়ারেও রুমানা ফার্স্ট আমি সেকেন্ড। তবে এবার উভয়েরই প্রত্যেকটি সাবজেক্টে মার্কস বেড়েছে।

অতি আগ্রহী হয়ে রুমানার সাথে সম্পর্কের বিষয়টা মাকে জানালাম। তিনি আমার ডায়েরীতে লেখা সাম্প্রতীক কবিতাগুলো পড়ে সম্পর্কের গভীরতাও টের পেয়েছেন হয়ত। তাই রুমানাকে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। একদিন সময় করে রুমানাকে বাসায় নিয়ে আসলাম। রুমানাকে দেখে মা অনেকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন। আদর আপ্যায়ন করালেন সারাদিন ভর। রুমন ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করতে চায় না। যে রোগা চেহারা, এই বয়সে ঠিকমত খাওয়া দাওয়া না করলে শরীর টিকবে কেমন করে? রুমানার কাছে অনুযোগ করলেন। মনে মনে, বিয়ের পর রুমানার উপর সমস্ত দায়িত্ব অর্পন করে মা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

পরিশেষে জুড়ে দিলেন আমাকে কুড়িয়ে পাওয়ার কাহিনী, যে কথাগুলো আমার সামনে তিনি কখনো কাউকে বলেন নি। সেই গুপ্ত কাহিনী মা অকস্মাৎ বলবেন আমি কল্পনাও করিনি। রুমানা ছোট মানুষের মত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাদলো অনেকক্ষণ। কেদে কেটে চোখ ফুলে লালচে আকার ধারণ করেছে। সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পড়েছে এতক্ষণে। ড্রয়িং রুম থেকে ডান দিকে মুখ করে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে রুমানা। সূর্যের শেষ আলো গাছের পাতা বেয়ে রুমানার চোখে মুখে আলো-ছায়ার খেলা খেলছে যেন। সেই আলোতে রুমানাকে অচেনা ঐশ্বরিক কেউ মনে হচ্ছে। রুমানা উঠি উঠি করছে। বললাম, মা চা বানাতে গেছে। চা খেয়ে নাও। তারপর বাসায় পৌঁছায় দিবো। না আমি এখনই যাবো। চা খেয়ে না গেলে মা মন খারাপ করবে। এতদিন হলো, অথচ তোমার মা-বাবা যে নেই তা বলোনি কেন? বলোনি কেন? বলোনি কেন? আমি ঠিক করে রেখেছিলাম বিয়ের আগে তোমাকে বলবো। ও তাই না? সব কিছুতেই এত প্লান না? এই বলে অকস্মাৎ আমার বুকে ঝাপিয়ে পড়লো। রুমানার উত্তপ্ত দীর্ঘশ্বাসগুলো আমার বুকের অলিগলি বেয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়লো। তার মেঘকালো চুল দু’হাতে সরিয়ে ললাট, নেত্র, কপোলের মেঘ তাড়িয়ে অধরের কাছে চলে আসলে এই মা আসবে বলে দশ নম্বর বিপদ সংকেত দেখানোর ন্যায় এক ঝটকায় আমাকে দূরে ঠেলে দিলো।

দেখতে দেখতে থার্ড ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা হলো। আমাদের রেজাল্টের তেমন হেরফের হয়নি। তবে রুমানার মন মানসিকতায় বেশ পরিবর্তন দেখা গেল। তার বাবা কামাল হোসেন ব্যাংকার্স, মা রেহানা খানম গৃহিনী। সংসারে পরপর তিন মেয়ের জন্ম। একদম ছোটটা ছেলে। রুমানাই সবার বড় মেয়ে। রুমানার ইমেডিয়েট ছোট বোনটা অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। মেঝো এইবার এসএসসি দিবে। ছোট ভাইটা ক্লাস টুতে। কন্যা দায়গ্রস্থ পিতা-মাতা মেয়ের বিয়ের জন্য বেশ উদগ্রীব হয়েছেন। একজন সুপাত্র আগেই ঠিক করে রেখেছেন। কেবল দিনক্ষণ ঠিক করার অপেক্ষায়।

রুমানার বাবা কামাল হোসেন বেশ রাগী মানুষ। তাই রুমানার যত কথা মায়ের সাথেই শেয়ার করে। একদিন সময় সুযোগ বুঝে আমার কথা তার মাকে জানালেন। মা বললেন, তোর বাবা যে রাগী মানুষ আমার কথা শোনে কিনা। তাছাড়া তোর বাবা পাত্র হিসেবে সাব্বির কে অনেক আগেই ঠিক করে রেখেছেন। তুইতো জানিসই সাব্বির বেশ সুদর্শন ছেলে। প্রতিষ্ঠিত এবং নামকরা ইঞ্জিনিয়ার। তারপরও তোর বাবাকে বলে দেখি।

রাতের বেলা খাওয়ার পর রুমানার মা কথাটা স্বামীর কানে উঠালে তিনি বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে যান। তিনি হুলস্থুল কান্ড বাধিয়ে বসলেন। চাল-চুলোর খবর নেই এরকম এতিম ছেলের হাতে মেয়েকে সপে দিয়ে তার জীবনটা বরবাদ করতে পারিনা। তাছাড়া ছেলেটা এখনও ষ্টুডেন্ট। কবে পাশ করবে, কবে চাকুরী পাবে তার নেই ঠিক। দেশে চাকুরীর যে আকাল। সেই তুলনায় সাব্বির বহুগুনে ভাল পাত্র। এরকম পাত্র হাতছাড়া হলে দশ রাষ্ট্র খুঁজেও মিলবে না। শোনো আগামী জুনের প্রথম সপ্তাহে সাব্বির এমেরিকা থেকে দেশে ফিরছে। জুনের শেষের দিকে তাদের বিয়ের বন্দোবস্ত হবে। কথাগুলো ড্রয়িং রুম মারিয়ে রুমানার কান অবধি পৌঁছালো। শুধু রুমানা কেন পাড়া-প্রতিবেশীরাও বোধয় বাদ যাননি।

ছায়ায় ছায়ায় বেলা গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। সারাদিন ঝুম বৃষ্টিতে টেরই পাইনি। পশ্চিম আকাশে মেঘের কোলে সূর্যকিরণের উকিঝুকি, বাসার পশ্চিম দিকের চালতা গাছের কচি সবুজ পাতা মাড়িয়ে আমার জানালার কার্নিশ গড়িয়ে মুখের উপর এসে ঝুকে পড়লো। একটা মায়ামাখা মোলায়েম অনুভূতি মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরে বয়ে গেল। অনেক ঘুরে ফিরে অনুভূতিটা বুকের ঠিক বাম পাশে স্থির হলো। মনে হচ্ছে রুমানা তার এলোকেশ ছড়িয়ে আমাকে অবাক নয়নে দেখছে। এই দৃশ্যটা যেন চিরকাল স্থির থাকে এরুপ আকাঙ্খা জাগ্রত হওয়ার সাথে সাথে কোথ্থেকে একটা কালোমেঘ এসে সূর্যটাকে গ্রাস করলো, গ্রাস করলো রুমানাকেও।

বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছি। সেই সকাল বেলার গুড়িগুড়ি বৃষ্টি শুরুর দিকেই বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়েছি। মনে মনে চাচ্ছিলাম আকাশ ফেটে অনন্তকাল বৃষ্টি হোক, আর দিনটার পরিব্যাপ্তি হোক সারাজীবন ভর। সৃষ্টিকর্তা যেন সদয় হলেন। কিছুক্ষণ পর কালবোশেখীর তান্ডব শুরু হলো। ঝড় থামলে অঝরধারায় বৃষ্টি নামলো। গাছের শরীর আর পাতা বেয়ে নেমে আসা বৃষ্টিরছন্দে কখন ঘুমিয়ে পরেছিলাম টেরই পাইনি। ঘুমঘোরে বারবার এপাশ ওপাশ করছিলাম। রুমানার কাঁচা হলুদমাখা মুখই বন্ধ চোখের পর্দায় দোল খাচ্ছিল। কাছে এসে আবারও দূরে সরে যাচ্ছিল।

আজকে সন্ধ্যায় রুমানার বিয়ে। বিয়ের অনুষ্ঠানে রুমানা নিজেই দাওয়াত করেছে। যাওয়া উচিত কিনা ভেবে ভেবে দিশেহারা। আবার কখনও দেখা হয় কিনা মনে করে রুমানার কাঁচা হলুদ মাখা মুখটা শেষবারের মত দেখতে ইচ্ছে করছে। এক ঝটকায় বিছানায় কাঁথাটা ফেলে উঠে আসলাম। বেসিনের সামনে এসে মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হলাম। সাতপাঁচ ভেবে ভেবে গত ক’দিন আয়নাতে মুখ দেখা হয়নি। দাঁড়ি-গোফ গজিয়েছে আগাছার ন্যায়। স্যালুন ছাড়া সেভ করা সম্ভব না। কালো জিন্সের প্যান্ট আর একটা কালো হাঁফ হাতা শার্ট গলিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। এই গেটআপ রুমানার জন্য শোক প্রকাশ না, নিজেকে আড়াল করার জন্য। পথে কোন রিকসা পেলাম না। না পাওয়াটাই স্বাভাবিক। ব্যস্ততম নগরী যে হারে লোকারন্য হচ্ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সৌখিন লোকদের সংখ্যা। যারা দুমিনিটের পথ রিকসা ছাড়া এগোন না। তার উপর যদি হয় বৃষ্টি, তাহলে তো কথাই নেই। আর অধিকাংশ রিকসাওয়ালা তিন বা ততোধিক রমনী নিয়ে যে হারে ভরবেগ প্রাপ্ত হন। আমাদের মত ধূলোমাটির পুরুষ দেখলে তার দ্বিগুণ হারে সেধিয়ে যান। মাথা চুলকান, নাক চুলকান, কান পরিস্কার করা শুরু করেন। তাদের নাক, কান চুলকানোর পিক আওয়ারে অগত্যা পায়ে হেঁটেই যাত্রা শুরু করলাম।

রুমানার কাঁচা হলুদ মাখা মুখটাই ঘুরে ফিরে চোখের কোনে উঁকি দিচ্ছে। চেনা মুখটাকে মনে হচ্ছে কত অচেনা। বারবার আকড়ে ধরতে ইচ্ছে করছে মুখাবয়বটা। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য সত্তা কাঁচা হলুদমাখা মুখছবিটা বারবার কেড়ে নিচ্ছে যেন। এরুপ দোদুল্যমান মুখচ্ছবি মনের পর্দায় টেনে রাখতে রাখতে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে কমিউনিটি সেন্টারের গলির মুখে এসে পৌঁছলাম। গলির মুখে বসে আছি আর একটার পর একটা চা সিগারেট গিলছি। অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হতে চায় না। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হচ্ছে এক দৌঁড় দিয়ে তাকে দেখে আসি। একটা সিনেমাটিক দৃশ্যের অবতারণা করে ফেলি। তাকে নিয়ে পালিয়ে যাই অজানার উদ্দেশ্যে।

রাত দশটার মত বাজে। কমিউনিটি সেন্টারে নিচে রাখা বরপক্ষের গাড়ীগুলোর নড়াচড়া শুরু হলো। শুরু হলো আমার বুকের কাঁপুনি। এতক্ষণ একটু স্বস্তিতে ছিলাম এই ভেবে যে রুমানা এই কমিউনিটি সেন্টারের দেয়ালবন্দী আছে, ধারেকাছে আছে। ইচ্ছে হলেই সবার অলক্ষ্যে ছুঁয়ে দিয়ে আসতে পারবো। কিন্তু এখন সে চলে যাবে সুদূর ময়মনসিংহে। তার মামা আফাজউদ্দীনের বড় ছেলে সাব্বিরের ঘরোনী হয়ে। কিছুদিন পর স্বয়ং ঈশ্বরের দেশ এমেরিকায়।

সোয়া দশটার দিকে বরের গাড়ী এসে গলির মোড়ের কাছে ডানে মোড় নেয়ার জন্য কিছুক্ষণ থামলো। বামপাশে বসা রুমানা জানালা দিয়ে বিষন্ন দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছে। মুহুর্তের জন্য তার চোখে চোখ পড়লো। তার ফোলা রাঙা চোখে আগুন দৃষ্টি দেখলাম । চৈত্রের খরতাপের মাঠে আগুনের হলকা বয়ে গেল। সেই আগুনে জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেলাম। একটু পরেই ধোঁয়া ছেড়ে গাড়ী চলে গেল ক্রমশ দূরে। সেই ধোঁয়ায় আমার পুরে যাওয়া হৃদয়ের উড়ন্ত অঙ্গারের ঝড় বয়ে গেল। ডুকরে কেঁদে উঠলাম, রুমানা তোমাকে রক্ষা করতে পারলাম না।

১০

মায়ের শরীরের অবস্থা ভাল না। গত ছয় মাস আগে শরীরের অবস্থা ক্রমশ ফ্যাকাশে হওয়া শুরু করলে ডাক্তার দেখানো হয়। ডাক্তার অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানালেন মায়ের শরীরে মরণব্যাধী লিউকেমিয়া বাসা বেঁধেছে। তাকে অতিশিগ্রী সিঙ্গাপুরে নিয়ে যেতে হবে। সিঙ্গাপুরের মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না। বাবার স্বল্প বেতনের চাকুরী আর আমার দুটো টিউশনীর কোন রকমে টেনেটুনে চলা সংসার। ব্যাংক ব্যালান্স বলতে যা সামান্য ছিল, তা অনেক আগেই শেষ হয়েছে। বাবার সারাজীবনের পুঁজি বলতে দু’কাঠা জমি ছিল। সেটাও বিক্রি করে দেশেই চিকিৎসা চলছে। মায়ের শরীরের অবস্থা দিনকে দিন খারাপের দিকে ধাবিত হচ্ছে। হয়ত আগামী কয়েকমাস তার প্রস্থানের জন্য অপেক্ষা ছাড়া বিকল্প কোন পথ খোলা নেই। তিনি সেই যে পাঁচ বছর বয়স থেকে একটু একটু করে নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন সে বন্ধন ছেড়ে চলে যাবেন, ভাবতেই শরীর অবস হয়ে যাচ্ছে। তিনি যেন প্রকৃত মাকে ছাড়িয়ে একজন ঐশ্বরিক রুপে আবির্ভূত হয়েছেন আমার পৃথিবীতে।

মা এক দিন দুপুর বেলা মিইয়ে যাওয়া কন্ঠে ব্যাকুল চিত্তে রুমন রুমন করে ডাক দিলেন। কাছে গেলাম। বললেন, আলমিরাতে কাপড়ের নীচে একটা ছোট্ট লাল কাপড়ের বাক্স আছে নিয়ে আসো। দ্রুত নিয়ে আসলাম। বাক্সটা খুলে অতি প্রাচীন রুপার কাঁকন বের করলেন। বললেন, তোমার দাদী এটা দিয়েছেন। আমি এতদিন সযত্নে রেখেছি। এখন তুমি এর দায়িত্ব নাও। তোমার মাকে তোমার দাদী দিয়েছিলেন। তোমার মা এটা তোমার দাদীর কাছেই রেখে দিয়েছিলেন। তোমার দাদী তার শ্বাশুড়ীর কাছ থেকে পেয়েছেন। সেই হিসেবে এটা রুমানারই পাওয়ার কথা। রুমানাই এর প্রকৃত উত্তরাধীকারিনী।

রুমানার বিয়ে হওয়ার কথা মাকে বলিনি। পাছে পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার আগে মনোকষ্ট নিয়ে যান। মাকে খুশী করার জন্য হাসিমুখে কাঁকন টা দু’হাতের তালুতে পুরে নিলাম। গভীর রাতে নগরীর শেষ প্রান্তে নদীর ধারে এসে দাঁড়ালাম। এদিকটায় ষ্ট্রিটলাইট না থাকায় অন্ধকার বেশ জাকিয়ে ধরেছে পৃথিবীকে। আকাশে মিটি মিটি তারা জ্বলছে আর নিভছে। দূরে ষ্টিমার আর বড় নৌকোগুলোর আলো টিমটিম করে জ্বলছে। রুমানার শেষ কথাগুলো মনে পড়ছে। চলো পালিয়ে যাই। চলো পালিয়ে যাই। দূরে বহুদূরে নীল অজানায় পালিয়ে গিয়ে আমরা স্বপ্নের ঘর বাঁধি। পাহাড়ের বুকে স্বপ্নঘর বেঁধে পৃথিবী রাঙাই নতুন করে। সেই স্বপ্নের কূঁড়েঘরই হবে আমার সুখের নীড়।

ডান হাতে উচিয়ে ধরা মায়ের দেয়া রুপার কাঁকন। অনেক ভাবনার ভীরে ইচ্ছে হচ্ছে, সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে কাঁকনটি নদীবক্ষে নিক্ষেপ করি। সমস্ত ভাবনা দূরে রেখে নিক্ষেপ করবো, ঠিক এই সময় পিছন থেকে কে জানি রুমন রুমন করে মৃদুকন্ঠে ডেকে উঠলো।

লিখেছেন – সায়েম মুন |

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত