সপ্ত সুর

সপ্ত সুর

দুটো শঙ্খচিল তাদের বিশাল ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে সমুদ্রের উপর দিয়ে। পাশাপাশি, একে অন্যের সাথে নির্দিষ্ট সমান্তরাল দূরত্ব রেখে। ওদের ডানায় শেষ রৌদ্রের রশ্মিটুকু মাখিয়ে দিয়ে আজকের মতো সূর্যটাও ডুবে যাচ্ছে একটু একটু করে দিকচক্রবালে। তার রক্তিম আভা গলে গলে মিশে যাচ্ছে সমুদ্রের গভীরে। ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে গুঁড়ো গুঁড়ো লাল জলবিন্দু উচ্ছাসে শুন্যে উঠেই আবার বিলীন হয়ে যাচ্ছে একে অন্যের অস্তিত্বের সাথে। যেন এই এক হয়ে যাওয়াতেই ওদের সুখ। ক্ষনিকের জন্য রাইও হারিয়ে যাচ্ছিল নিজের সব অস্তিত্ব ভুলে ঐ দূরের নীলাম্বুর অসীম ঐশ্বর্যতে। কোথাও যেন কোনো দুঃখ নেই, কষ্ট নেই, সব না পাওয়া, হতাশা, অবসাদ, একাকিত্ব সব কিছুই যেন এক মুহূর্তের জন্য তুচ্ছ মনে হচ্ছিল রাইয়ের। সমুদ্র সফেনের অবিরাম গর্জনে চাপা পড়ে যাচ্ছিল তার সব বোবা কান্না। নির্ঘুম মধ্যরাত্রির আর্তনাদগুলোকে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিল যেন ওই শব্দ। আহ ! এই সুখ সুখ বুক মোচড়ানো ভালোলাগার রেশ কেটে যাওয়ার আগেই যদি চিরঘুমের দেশে পাড়ি দেওয়া যেত… তার থেকে বড় প্রাপ্তি বুঝি আর কিছুই হতো না।

শব্দ করে আলোর সুইচটা অন করে দৃপ্ত। চোখটা ঝট করে বন্ধ করে ফেলে রাই। এক নিমেষে তার ঘোর কেটে যায়। নোনা বিকেলের সমুদ্রকে নিষ্প্রভ করে হোটেল রুমের ব্যালকনির আলোয় ভরে যায় চারিদিক। সমুদ্রের দিক থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে দৃপ্তর দিকে তাকায় রাই।

-কি হলো ? চুপচাপ বসে আছো যে ! ঘুম থেকে উঠে এসে প্রশ্ন করে দৃপ্ত।
-সমুদ্র দেখছি। নিস্পৃহ গলায় উত্তর দেয় রাই।
-গত তিনদিন ধরে ওই এক সমুদ্রই তো দেখছ।
-হুঁ।
-হুঁ কি ? চলো একটু বেরিয়ে আসি।
-কোথায় ? ঈষৎ বিরক্ত হয়ে বলে রাই।
-এই একটু লোকাল মার্কেটে যাই চলো। এখানের ফেমাস পিসগুলো…
-তুমিই যাও। আমি এখানেই বসে থাকবো। দৃপ্তকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বলে ওঠে রাই।
-ওকে। এজ ইয়ু উইশ ! বলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে চলে যেতে গিয়েও হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে যায় দৃপ্ত। ডক্টর লালের বলা কোনো এডভাইস মনে পড়ে গেল কি ওর ! গলাটা যতটা সম্ভব মৃদু করে সে বলল ,
-চলো না রাই, তোমার ভালো লাগবে। কলকাতা থেকে এতো দূরে কি আমরা এসেছি শুধু হোটেলে দিনগুলো কাটিয়ে দেওয়ার জন্য , বলো ? তিনদিন তো হয়েই গেল। আর চারটে দিন আছে হাতে। সব কাজ ফেলে… শুধু তোমার জন্য…
-বললাম তো যাবো না। বারবার এক কথা কেন বলো ? আমার জন্য আমার জন্য… উফ ! ভালো লাগছে না আমার। কিছু ভালো লাগছে না। তুমি যা-আ-আ-আ-ও ! দু হাতে মাথাটা চেপে ধরে চিৎকার করে ওঠে রাই। আর কিছু না বলে নিঃশব্দে চলে যায় দৃপ্ত।

ভালো লাগে না, কিছু ভালো লাগে না রাইয়ের। আঠাশ বছরের তরতাজা, প্রাণবন্ত, ছটফটে একটা মেয়ে দিন দিন কেমন শুকনো, প্রাণহীন হয়ে যাচ্ছে। পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবন রাই আর দৃপ্তর। তিন বছরের ভালোবাসার সম্পর্কের পর দৃপ্ত নিজের কেরিয়ারে সেটেল করে। তারপর দুই বাড়ির মতেই সুচারুভাবে ওদের বিয়েটা সম্পন্ন হয়। বিয়ের পরবর্তী এক দু’বছর তারা একে অন্যকে রঙিন পশমি উলের মতোই জড়িয়ে ছিল। কিন্তু কবে থেকে যেন সব বদলাতে শুরু করলো একটু একটু করে। সম্পর্কের উষ্ণতা হারাতে লাগলো। বিন্দু বিন্দু দুরত্বের বরফ জমতে থাকল সেই জায়গায়। কবে থেকে, ঠিক কি কারণে সে বদল, তা আজ আর মনে করতে পারে না রাই। সে শুধু অনুভব করতে পারে যে তাদের ভালোবাসার সুর তুলতো মনের মধ্যে থাকা যে সেতার, তার একটা তার যেন কেটে গেছে। অবরে সবরে সেই সেতারে সুরধ্বনির ঝংকার তুলতে গেলেই তাতে ঝনন করে আর্তনাদ ওঠে শুধু। রাইয়ের মনের সেতারে আর সুর বাজে না। ধুলো জমে জমে সে পড়ে আছে নিদারুন অভিমানে, মনের এক কোণে। চোখ বন্ধ করে রাই খুব ভাবে ! কোথায় কি অঘটন ঘটল ! কিসের নজর লাগলো তার সুখের সাম্রাজ্যে ? তার সেই সবটুকু জুড়ে থাকা মানুষটা তার সবথেকে কাছে থাকা সত্ত্বেও কি করে তাকে হারিয়ে ফেলল রাই ? তার সেই দৃপ্ত কোথায় যাকে প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছিলো সে ?

উফ ! আর ভাবতে পারে না রাই। দু হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরে। মাথাটা যেন যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। দৃপ্ত এখনো ফেরেনি। হোটেলের রুম অন্ধকার করে শুয়ে আছে রাই। ধীরে ধীরে ঘুম নেমে আসছে তার চোখে। দূরে সমুদ্র গর্জন করে যাচ্ছে একটানা।

উদ্দেশ্যহীন ভাবে রাস্তায় হাঁটছে দৃপ্ত। এতক্ষন একটা কনফারেন্স কল সারছিলো সে। সাতদিনের ছুটি নিয়ে সব কাজ ফেলে রাইকে নিয়ে এখানে পড়ে আছে সে। তাই বলে তার কাজগুলো তো আর পড়ে নেই। কলকাতায় একটা নামী কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর সে। মাত্র তেত্রিশ বছরের মধ্যেই তার কেরিয়ারকে যথেষ্ট উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছে সে। মাঝে মাঝে মনে পড়ে যায় সেইসব দিনগুলোর কথা। পড়াশোনা শেষ করে তখন একটা চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে দৃপ্ত। খাওয়ার ঠিক নেই, পড়ার ঠিক নেই। পরিবারের একমাত্র ছেলে সে। মা বাবার একমাত্র ভরসা। একটা চান্সের জন্য অপেক্ষায় ছিল দৃপ্ত। সে জানতো একবার কোথাও মাথাটা ঢোকাতে পারলেই বাকিটা নিয়ে আর ভাবতে হবে না। নিজের মধ্যেকার ট্যালেন্ট আর সম্ভাবনা নিয়ে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস ছিল তার।

এরকম সময় আকস্মিক ভাবে দৃপ্তর জীবনে চলে এসেছিল রাই। দৃপ্তর এক অন্তরঙ্গ বন্ধুর বোনের বিয়ের রিসেপশন পার্টিতে গিয়ে পরিচয় হয়েছিল ওর সাথে। প্রথম দেখাতেই মিষ্টি, দীঘল চোখের মেয়েটাকে ভালো লেগে গেছিলো দৃপ্তর। মোবাইল, ইন্টারনেটের যুগে বাস করে তাদের সম্পর্ক ভালোবাসায় এগোতে সময় নেয়নি। সেই সময় সম্পূর্ণ বেকার অবস্থায় রাইয়ের মতো একটা মেয়ের সাহচর্য দৃপ্তর আত্মবিশ্বাস বেশ কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছিল। দৃপ্ত আরো একমুখী হয়েছিল তার লক্ষ্যের প্রতি। রাইয়ের হাত ধরেই দৃপ্ত আগামী দিনগুলো চলার ভরসা পেয়েছিল। সেইসব দিনগুলোর কথা মনে পড়লে ভালোলাগার সাথে সাথে আফসোসও হয় দৃপ্তর। রাই বলতো , “দৃপ্ত, তোমায় পেয়ে আমি খুব খুশি। খুব সাটিসফাইড।” কিন্তু কোথাও যেন দৃপ্তর পৌরুষ খুব সূক্ষ ভাবে পিন ফোটাতো তার মনের মধ্যে। স্পেশাল দিনগুলোতে রাইকে একটা ভালো গিফটও কিনে দিতে পারতো না সে। দিতে গেলেও রাই রাগ করতো। তাতে যেন আরো কুঁকড়ে যেত দৃপ্ত। একটা চকোলেট পেয়েই বাচ্চাদের মতো আনন্দে লাফিয়ে উঠত। দৃপ্ত তাতে কুণ্ঠাবোধে আরো কাবু হয়ে যেত। কিছুতেই সহজ হতে পারতো না রাইয়ের নিবিড় সান্নিধ্যে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করতো একদিন পৃথিবীর সব ঐশ্বর্য রাইয়ের পায়ে এনে ফেলে দেবে ও। যে করেই হোক একটা চাকরি তাকে পেতেই হবে।

সামনে একটা বিশাল শাড়ির শোরুম দেখে ভাবনায় ছেদ পড়ে দৃপ্তর। ঠিক করে এখান থেকে সবথেকে দামি কটকির হ্যান্ডলুম শাড়িটা নিয়ে গিয়ে রাইকে ও চমকে দেবে আজ।

ভোরের সমুদ্র কি নরম, কি মৃদু ! এখন ভাটা চলছে। বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ির ভেজা বালিতে পায়ের ছাপ ফেলতে ফেলতে হাঁটতে কি ভালো লাগছে রাইয়ের ! মাঝেমধ্যে ইতস্তত পড়ে থাকা ঝিনুকগুলো কুড়িয়ে হাতের মধ্যে জমা করছিল রাই। সামনের আকাশটায় নরম লাল আভা ছড়িয়ে আছে। সমস্ত প্রকৃতি তীব্র ভাবে অপেক্ষা করছে আসন্ন একটা দিনের। এসময় পুরীর সৈকত অপেক্ষাকৃত নির্জন। আর রাই হাঁটতে হাঁটতে আরো নিরালায় চলে এসেছে। কতো এলোমেলো চিন্তারা ভিড় করছে মনের মধ্যে। বুকের মধ্যেটা অভিমানে রিনরিন করে উঠছে। দৃপ্ত কেন তাকে বোঝে না ? কেন শুধু ওর রাগ ওর চিৎকারটাই দেখে ? ও কি জানে না যে রাই বরাবরই এরকম অভিমানী। সে তো শুধু দৃপ্তর কাছ থেকে ওর ভালোবাসা, ওর বন্ধুত্ব আর সময় চেয়েছে। সময়… হ্যাঁ, সময়েরই বড়ো অভাব দৃপ্তর কাছে। রাইকে নিয়ে সে পুরী ঘুরতে এসেছে ঠিকই। কিন্তু সারাদিনে দশবার সে বুঝিয়ে দেয় যে কতো কাজ ফেলে সে এসেছে। ঘন্টায় ঘন্টায় ফোন আসছে, ল্যাপটপে প্রেসেন্টেশান বানাচ্ছে। এর নাম নাকি ঘুরতে আসা ! তাও রাইই তো জোর করে পুরী নিয়ে এলো দৃপ্তকে। ও তো কোথায় গোয়া, মরিশাস এর প্ল্যান করছিলো।
“ইস, পুরী আবার একটা যাওয়ার জায়গা হলো ! যত্ত মিডল ক্লাসের ভিড়। কোনো ক্লাস নেই।” নাক সিঁটকেছিল দৃপ্ত। অবাক চোখে ওর মুখের দিকে তাকিয়েছিল রাই। এই দৃপ্তর সাথেই বিয়ের সাতদিনের মাথায় মন্দারমনি ঘুরতে গিয়ে শরীরে, মনে তৃপ্ত হয়ে ফিরেছিল রাই ? এই সেই ছেলেটা যে দোকান থেকে ওকে ঝিনুকের মালা কিনে গলায় পড়িয়ে দিয়ে ফিল্মি স্টাইলে গেয়ে উঠেছিল কাহো না প্যায়ার হে…! নিজের অজান্তেই হেসে ফেলে রাই। হাতের মুঠোয় ধরে থাকা ঝিনুকগুলো ঝরঝর করে ফেলে দেয় বালিতে। এবার ফেরা দরকার। দৃপ্ত নিশ্চয়ই ঘুমোচ্ছে এখনো।

হোটেল বয়ের দিয়ে যাওয়া কফি হাতে ব্যালকনিতে বসে আছে দৃপ্ত। আজ একটু আগেই উঠে পড়েছে ও। দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমটাও হয়েছে ছেঁড়া ছেঁড়া। অতো সুন্দর ময়ূরকন্ঠী নীল রঙের শাড়িটা এনে দিল কাল রাতে রাইকে। তাতে যেরকম শীতল দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়েছিল রাই, তাতে দৃপ্তর মাথাটা দপ করে জ্বলে গেছিলো । ধুর ! কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। ডক্টর লালের কোনো এডভাইসই কাজে লাগছে না। আর কত ধৈর্য্য রাখবে সে ! কফিতে চুমুক দিতে দিতে দু’মাস আগের সেই দিনটার কথা হঠাৎ মনে পড়ে যায় দৃপ্তর। অফিস ট্যুর করে রাত করে ফিরেছে সে। ফ্ল্যাটে রাই একা ছিল। ওর মা বাবা ওদের পৈতৃক বাড়ি গেছিল কোনো দরকারে। রাই হয়তো ঘুমিয়ে আছে সেই ভেবে নিজের কাছে থাকা এক সেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে রুমে ঢোকে দৃপ্ত। আর অবাক হয়ে দেখে তাদের বেডরুমে যতো পুরোনো তার দেওয়া উপহার, গ্রিটিংস কার্ড, চকলেটের মোড়ক বের করে তার মাঝে বসে আছে রাই। কখনো এটা দেখছে, ওটা নাড়ছে, নিজের মনেই কি সব বিড়বিড় করছে, হাসছে, কাঁদছে… ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিল দৃপ্ত। আগে থেকেই রাইয়ের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছিল সে। রাই প্রায়ই বলতো তুমি বদলে যাচ্ছ দৃপ্ত। তুমি আর আমাকে আগের মতো ভালোবাসো না। কই ? আমাকে তুমি মজার মজার কথা বলে আর হাসাও না তো ? আমার কষ্ট তোমাকে আর আগের মতো বিচলিতও তো করে না ? প্রথম প্রথম এসব কথা উড়িয়ে দিত সে, আমল দিত না। এটা সেটা উপহার দিয়ে , শপিং মলে নিয়ে গিয়ে, মুভি দেখিয়ে খুশি করার চেষ্টা করতো। কিন্তু না, সেসব করেও রাইয়ের মনের তল পেত না আর দৃপ্ত। তুচ্ছ তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে মান অভিমান হতে লাগল। দৃপ্তর কাজের চাপ যতো বাড়তে লাগলো রাইও ততো অন্যরকম হয়ে যেতে লাগলো। প্রথমদিকে দৃপ্ত বোঝাতো যে তার জগতে কাজের চাপ অনেক। এই জগতে কম্পিটিশন অনেক। কম্পিটিটাররা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। একটু ভুলচুক হলেই এতদিনের ইমেজে কালি ছিটিয়ে চলে যাবে। রাই কখনো বুঝতো কখনো বুঝতো না। কি এক স্বভাব তার। সবসময় অতীত আঁকড়ে পড়ে থাকবে। দৃপ্ত আগে এই করতো ঐ করতো, আর কেন করে না, শুধু এই অভিযোগ ! আরে বাবা দৃপ্ত তো শুধু তারই। এই যে এত পরিশ্রম করে দৃপ্ত, সে তো রাইকে, তার পরিবারকে সুখ স্বাচ্ছন্দে রাখার জন্যই। এখন কি আর সব ব্যাপারে ছেলেমানুষি করলে চলে ? পরপর এরকম ঘটনা ঘটতে থাকল যখন, রাইকে দৃপ্ত নিয়ে গেছিল শহরের নামকরা কাউন্সিলার ডক্টর লালের কাছে। উনার এডভাইসেই তাদের বেড়াতে আসা। জল হওয়ার পরিবর্তন ঘটলে নাকি মনেরও পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু কোথায় কি ! এই ঘুরতে আসা , এই ছুটি হয়তো বিফলেই যাবে।

কালকেই ফিরে যাবে দৃপ্ত আর রাই। টুকিটাকি প্যাকিং করছে রাই। দৃপ্ত যথারীতি লাঞ্চ করে ল্যাপটপে চোখ গেঁথে বসে আছে। ওর দিকে তাকায় রাই। হোটেল রুমের মধ্যেও পরিপাটি হয়ে আছে ও। এমনকি চুলটাও জেল দিয়ে সেট করা। সেদিকে তাকিয়ে ঘটনাটা মনে পড়ে যায় রাইয়ের। একদিন অফিস বেরোনোর সময় রেডি হচ্ছিল দৃপ্ত। স্নান সেরে যত্ন করে জেল দিয়ে চুল সেট করছিল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। রাই হঠাৎ ছুটে এসে ওর চুলগুলো এলোমেলো করে ঘেঁটে দিয়ে খিলখিলিয়ে উঠে বলেছিল, “তোমায় উলকো ঝুলকো চুলেই বেশি মানায় দৃপ্ত, সেই আগে যেমন…” “স্টপ ইট রাই জাস্ট স্টপ ইওর চাইল্ডিস এক্ট। আমি এখন আর আগের বেকার বাউন্ডুলে দৃপ্ত নেই। ট্রাই টু আন্ডারস্টান্ড ফর গডসেক।” থমকে গেছিল রাই। তার অবাক, আহত চোখদুটো জলে ভরে উঠছিল। কালবিলম্ব না করে বেরিয়ে গেছিল দৃপ্ত। মেঝেতে বসে ঝরঝর করে কাঁদছিল রাই। আমি তো সেই বাউন্ডুলে ছেলেটাকেই ভালবেসেছিলাম দৃপ্ত। সে তো আমায় ভুল করলে বোঝাতো, এরকম বকতো না, একা ফেলে চলে যেত না। অভিমানে মুচড়ে উঠছিল তার বুকে। ফুলে ফুলে মাটিতে লুটিয়ে কেঁদেই যাচ্ছিল রাই।

বিপ… ল্যাপটপের শব্দে সম্বিৎ ফেরে রাইয়ের। পায়ে পায়ে দৃপ্তর দিকে এগিয়ে যায় সে। সত্যিই কি খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে ইদানিং রাই ? হয়তো দৃপ্ত তাকে ভালোবাসে তার মতো করে। সে হয়তো নিজের মতো করে পায় না বলে সেই ভালবাসা বুঝতে চায় না। কাল তারা চলে যাবে। এখানে এসে অবধি তাদের মধ্যে কোনো উষ্ণতা বিনিময়ই হয়নি। দৃপ্তর কাছে সরে এসে গাঢ় গলায় রাই বলে ওঠে, “দৃপ্ত, আমায় একটু আদর করো… দৃপ্ত…

” দৃপ্ত একমনে ল্যাপটপের টাচপ্যাডে হাত রেখে কি একটা করে যাচ্ছে। ওই অবস্থাতেই তার বাঁ হাতটাকে বাড়িয়ে দেয় সে রাইয়ের কোমরে। হাত বোলাতে থাকে। প্রাথমিক ভাবে শিহরিত হলেও পরক্ষনেই ছিটকে সরে যায় সে। নিজেকে ওই ল্যাপটপের টাচপ্যাডটার থেকে বেশি কিছু মনে হয় না। দৃপ্ত ঘটনার আকস্মিকতায় থমকে গেছে। রাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে সে,

“কি হলো ? সরে গেলে !”
“কিছু না, যা করছো করো।”
“আরে একটা ইম্পরট্যান্ট মেইল সেন্ড করছি। তারপরই তোমায়…”
“না।”

দুপুরের রোদটা মরে আসছে। দূরের সমুদ্র সূর্যাস্তের আভা লেগে লালের খেলায় মেতে উঠেছে। হোটেল থেকে চিৎকার বেরিয়ে এসেছে রাই। উদ্ভ্রান্তের মতো হাঁটছে সে। বুকের মধ্যে অসহ্য কষ্ট হচ্ছে। শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে ওর। মুখ দিয়ে হাঁ করে শ্বাস নিতে নিতে দিকভ্রান্তের মতো হাঁটছে রাই। এতো অপাংক্তেয়, এতো অপ্রয়োজনীয় সে ! দৃপ্ত কি এক মুহূর্তও তার কাজকে পুরোপুরি ভুলে নিজের সর্বস্ব দিয়ে ভালোবাসতে পারবে না আর রাইকে ? শুধু কাজই ওর জগৎ ! কোথায় হারিয়ে গেল তার আলুথালু, নিজের প্রতি উদাসীন, ভীষণ রোমান্টিক, প্রাণোচ্ছল, কেয়ারিং সেই ছেলেটা ? কবে রাই বলেছিল যে ওর দামি গাড়ি, বাড়ি, গহনা, শাড়ি চাই ? সে তো একটা গোলাপ ফুল, গ্রিটিংস কার্ডেই ভরে উঠত। ঐশ্বর্য, সম্পদ তো মানুষের জীবনযাত্রাকে মসৃণ করার জন্য। কিন্তু তা করতে গিয়ে মানুষটাই এভাবে হারিয়ে যাবে ? কিছুতেই আর আগের সেই প্রেমিক পুরুষকে ফিরে পাবে না রাই ? দৃপ্তই তো ওর ছোট্ট জগতের সবটা জুড়ে আছে। দৃপ্ত না থাকলে তো তারও অস্তিত্ব থাকবে না আর। কতদিন দৃপ্তর চোখে ওর জন্য কাতরতা দেখেনি রাই। আগে তো তার একটা আঙুল কেটে গেলেও দিশেহারা হয়ে উঠত দৃপ্ত। আর এখন ? রাইয়ের ক্ষতবিক্ষত হৃদয়টা কি চোখে পড়ে না ওর ? প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে ওর অবহেলার শীতলতায় দগ্ধ হচ্ছে রাই, তা কি বোঝার ক্ষমতা ওর নেই ? মনখারাপের পর মনখারাপ জমতে জমতে পাহাড় জমে উঠেছে ওর বুকের মধ্যে। দৃপ্ত কিছুতেই সেই পাহাড় ডিঙিয়ে তাকে ছুঁতে পারবে না আর। একরাশ অভিমানে কান্না জড়ো হয় ওর চোখের কোণে। উষ্ণ, তরল কষ্টেরা গড়িয়ে নামে দু’গাল বেয়ে। নিজের সবটুকু দিয়ে দৃপ্ত কতদিন পরিপূর্ণভাবে নিজের কাছে জড়িয়ে নেয়নি রাইকে। কতদিন ওকে ভালোবেসে আবেশে ডেকে ওঠেনি, সবসময়ই কেমন যেন আধাখেঁচড়াভাবে পায় দৃপ্তকে। আর কখনোই হয়তো সে বিয়ের আগের মতো করে দৃপ্তকে পাবে না, কোথায় হারিয়ে গেছে তার জন্য পাগল সেই ছেলেটা ! কোথায় তার সেই উদ্ভ্রান্ত দুই চোখ ! মাঝরাতে সাইকেল চেপে তার বাড়ির নীচে এসে দেখা করা সেই ছেলেটা কই ? জীবন কতো উন্মাদনা কতো সারপ্রাইসে ভরা ছিল ! কতো তীব্র ছিল দুটো মানুষের একে অন্যকে ঘিরে সব অনুভূতি !

তাদের দুজনের ভুল বোঝাবুঝি কি আর কখনোই ঠিক হবার নয় ! রাই খুব দ্রুত গতিতে হাঁটছে। কান্নায় চোখ ভিজে উঠছে ওর। বুকের বাঁ দিকে কি এক অসহ্য কষ্ট ! না, রাই মানতে পারবে না এই দৃপ্তকে। সে শুধু দৃপ্তর ভালোবাসা চেয়েছিল। সবটা। সেটাই যদি না পায় তবে আর দৃপ্তর সাথে থেকে কি লাভ! দৃপ্তকে মুক্তি দিয়ে দেবে সে। তাহলে সেও নিশ্চিন্তে ডুবে যেতে পারবে তার কাজের জগতে। পাগল বউকে নিয়ে আর এম্বারাসড হতে হবে না ওকে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামছে। শোনা যাচ্ছে সমুদ্রের গর্জন। উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে থাকে রাই। খুব ক্লান্ত লাগছে ওর। দুপুরে খাওয়ার পর যে মেডিসিনটা নিয়েছিল তার প্রভাবে খুব ঘুম পাচ্ছে ওর। খুব খুব ঘুম। মাথাটা টলছে। দু’হাত দিয়ে মাথার দু’পাশের রগটা চেপে ধরে রাই। আর হাঁটতে পারে না। সমুদ্র এখন কাছে। তার মাথার উপর খয়া, ফ্যাকাসে একটা চাঁদ উঠেছে। বালিয়ারিতে একটা মাছ ধরার জেলে নৌকা বাঁধা আছে। ভাটার টানে জল নেমে গিয়ে বিস্তীর্ণ বালিয়ারি বুক পেতে যেন অপেক্ষা করছে আসন্ন আগামীর। টলতে টলতে রাই গিয়ে বসে নৌকাটার উপর। আকাশের দিকে তাকায়। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে চাঁদটা যেন ধীর গতিতে কোন অনন্ত পথে যাত্রা করছে। সামান্য কিছু তারার ফুটকি দেখা যাচ্ছে ইতিউতি। সমুদ্র থেকে শব্দ করে নোনা হাওয়া উঠে এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে রাইকে। আর কান্না নেই তার চোখে। কি ভীষণ এক ক্লান্তি নেমে এসেছে তার শরীর জুড়ে। একরাশ অভিমান নিয়ে সে ভাবে আর ফিরবে না দৃপ্তর কাছে। কিছুতেই না। হারিয়ে যাবে সে। মিশে যাবে এই নোনা মাটিতে।

হোটেল বয়কে ইন্টারকমে এক কাপ কড়া কফি দিতে বলে দৃপ্ত। ল্যাপটপটা খোলা রেখেই কখন যেন ঘুমিয়ে গেছিল সে। রাইয়ের কি যে হয় মাঝে মাঝে ! কাল তারা ফিরে যাবে। ডক্টর লালের কোনো পন্থাই কাজে লাগছে না। কি লাভ হলো এখানে ঘুরতে এসে ! রাইয়ের মনের তল আজকাল আর খুঁজে পায় না দৃপ্ত। আগে তো কতো হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল থাকত মেয়েটা। দৃপ্ত বেশিক্ষন কাছে না থাকলেই অভিমানে ঠোঁট ফোলাতো। আর এখন ! এই তো আজ টানা সাতদিন দৃপ্ত শুধু রাইয়ের সাথে আছে। ভেবেছিল এতে ওর সব অভিযোগ দূর হয়ে যাবে। কত ভালো ভালো জায়গা ছেড়ে শুধু রাইয়ের কথায় পুরী এসেছে ওরা। তাতেও কি হল ! এই ফাইভ স্টার হোটেলের এক ফালি ব্যালকনিতে দিনগুলো কাটিয়ে দিলো। দৃপ্ত কোথায় ভেবেছিল এই ক’দিনে সব ঠিক করে নিয়ে কলকাতায় ফিরে ফ্রেশ স্টার্ট করবে সব। তার ড্রিম প্রজেক্টটা নিয়ে সিরিয়াসলি ভাববে এবার। মাঝে মাঝে তার ব্লু প্রিন্টও করে রাখছে সে। রাই যে কেন এত অবুঝ ! এতো বাধা পেরিয়ে কোথায় আজ তাদের জীবনতরী তর তর করে এগিয়ে যাওয়ার কথা, তার জায়গায় কোথায় যেন গেঁথে গেছে সময়। দৃপ্ত চায় তার প্রতিটা সফলতার পর রাইকে পাশে পেতে, তার মুখে সেই গরবিনী হাসিটা দেখতে যেটা ও আগে খুঁজে পেত। তবে কি রাই ওকে আর ভালোবাসে না ! ওদের মধ্যে কি কিছুই আর অবশিষ্ট নেই ! নাহ ! আর ভাবতে পারে না দৃপ্ত। যা হবে দেখা যাবে। উঠে পড়ে ও। রাই এখনো ওঠেনি কেন ? তবে কি আজ দুপুরে ইমার্জেন্সি মেডিসিনটা নিয়েছে ও ? ওটা খেলেই খুব ঘুমোয় মেয়েটা। কফিটা শেষ করে পাশের ঘরে যায় দৃপ্ত। একি ! বিছানাটা তো ফাঁকা !

রাই কোথায় ? দৃপ্ত এক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ছুটে নেমে আসে নীচে। রিসেপশনে কোনো সদুত্তর না পেয়ে বাইরে বেরিয়ে ইতস্তত খুঁজতে থাকে সে। সামনের বিচে দেখে। নাহ ! রাই নেই কোত্থাও। ফোন করা বৃথা কারণ সেটা রুমেই পড়ে আছে। প্রচন্ড রাগ হয় দৃপ্তর। এভাবে তাকে না বলে কোথায় গেল রাই ! তাও ফোনটা না নিয়ে। তাকে জব্দ করার জন্য ? “উফফ !” কেন করো তুমি এরকম রাই ? দৃপ্ত ক্ষোভে ফেটে পড়ে। কি এমন হলো আবার ! হঠাৎ ওর মনে পড়ে যায় দুপুরের ঘটনাটা। দৃপ্ত তখন ল্যাপটপে। রাই এসেছিল তার কাছে। আদর করতে বলেছিল ওকে। আর দৃপ্ত কি করেছিল ? সে তখন অন্যমনস্ক ভাবে ল্যাপটপে কাজ করতে করতে… হায় ! হঠাৎ দৃপ্তর মনে পড়ে যায় অনেককাল আগে ওকে বলা রাইয়ের একটা কথা। একদিন অন্তরঙ্গ নিবিড় এক মুহূর্তে থাকার সময় দৃপ্তর ফোন বেজে উঠেছিল। আদুরে গলায় রাই বলেছিল , “এই , আমায় আদর করার সময় অন্য কোনদিকে মন দেবে না তুমি। এখন শুধু আমি আর আমি।” ফোনটা কেটে রাইকে “তাই হবে সোনা…” বলে আরো কাছে টেনে নিয়েছিল দৃপ্ত। তবে কি ! তাই রাগ করল রাই ? তাই তো ! অনেক অনেক দিন পর রাই নিজে থেকে এসেছিল তার কাছে, তার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য। আর দৃপ্ত কিনা … দু’হাতে মাথার চুল খামচে ধরে দৃপ্ত। রাই কোথায় ? দৃপ্তর প্রতি অভিমানে কোথায় চলে গেল মেয়েটা ! কানে বাজছে রাইয়ের সবসময় বলতে থাকা কথাগুলো… দৃপ্ত আমায় একটু ভালোবেসে দাও। দৃপ্ত আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরবে ? দৃপ্ত কতদিন আমরা সেই আইসক্রিম পার্লারটায় যাইনি। দৃপ্ত আমি শুধু তোমাকে পাশে চাই সবসময়। ইসস ! আজ কত অবহেলা করে ফেলেছে সে রাইকে। শুধু কি আজ ! না না ! এক সমুদ্র ব্যাকুলতা নিয়ে ছুটতে থাকে দৃপ্ত। মাথাটা কাজ করছে না ঠিকঠাক। রাই সান রাইসিং দেখতে যেত যেদিকে সেদিকটা অপেক্ষাকৃত নির্জন। সেদিকেই গেছে হয়তো ও।

সান্ধ্যকালীন সমুদ্রতট ধীরে ধীরে ফাঁকা হচ্ছে এদিকে। শোঁ শোঁ করে ঝোড়ো হাওয়া দিচ্ছে। আকাশে গাঢ় মেঘ। একটু আগের ফিকে চাঁদটাকেও আর দেখা যাচ্ছে না। এই প্রথম খুব অসহায় বোধ করে দৃপ্ত। রাইয়ের বলা একটা কথা কানের মধ্যে আবার যেন ফিসফিস করে শুনিয়ে যাচ্ছে হাওয়া , ” দৃপ্ত যেদিন তুমি আমাকে আর ভালোবাসবে না, সেদিন আমি হারিয়ে যাবো দেখো, আর ফিরবো না।” দৃপ্ত তখন ঠিকঠাক বোঝেনি হারিয়ে যাওয়ার মানে। কতবার রাইকে রেখে অফিস ট্যুরে গেছে সে। কিন্তু এরকম ফাঁকা লাগেনি তো ? আজ এই একাকী সৈকত , নির্জন এই ঝোড়ো রাত আর বাতাসের আর্তনাদ বড্ড একা করে দিচ্ছে দৃপ্তকে। খাঁ খাঁ করছে বুকটা। আজ দৃপ্ত বুঝতে পারছে একটা মানুষের এই ছিল থেকে এই নেই হয়ে যাওয়ার মানে। রাইয়ের প্রতিটা অভিযোগ, প্রতিটা অভিমানের অর্থ বুঝতে পারছে সে। অফিস-ট্যুর-প্রজেক্ট-কম্পিটিশানের দুনিয়ায় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গিয়ে দৃপ্ত তার প্রিয় মানুষটাকে কত অবহেলা করে ফেলেছে ! সত্যিই তো, কতদিন রাইকে ভালো করে চেয়ে দেখা হয়নি ! রাই সবসময় চোখে কাজল পড়ত। এখনো কি পড়ে ? নাহ ! ঠিক মনে করতে পারে না দৃপ্ত। রাইয়ের একঢাল চুল ছিল। এখন কতটা আছে ! রাই এখনো দু’হাতের নখ চিবিয়ে খেয়ে ফেলে ? রাস্তায় কুকুর দেখলে এখনো কি বাচ্ছাদের মতো ভয় পেয়ে চিৎকার করে ওঠে সে ? রাইয়ের কাঁধের নীচে যে লাল তিলটা ছিল কতদিন সেটায় ঠোঁট ডোবায়নি সে! রাইকে নতুন নতুন জামাকাপড় জিনিসপত্র দিয়ে খুশি করতে গিয়ে ওকে ভালো রাখার সহজতম পথটাই যে হারিয়ে ফেলেছিল দৃপ্ত। হঠাৎ বহুকাল পর হা হা করে কেঁদে ফেলে সে। রাইয়ের মুখটা খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। দু’হাতের আঁজলায় ওর গাল দুটো ধরে ঠোঁটের স্পর্শে ভিজিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে ওকে। এতদিনের ডক্টর লালের ওষুধ, এডভাইস, সেশন সবকিছুই খুব অপ্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে দৃপ্তর। তার রাইয়ের যে শুধুই তাকে দরকার। “কোথায় তুমি রাই ? ফিরে এসো। ফিরিয়ে নাও তোমার দৃপ্তকে। একটা শেষ সুযোগ দাও প্লিস।”

দৃপ্তর হাহাকার শুষে নেয় সমুদ্র। রাত নামছে। একাকী বালিয়ারিতে বৃষ্টি নামে আসে ঝিরঝির করে।

“কি সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে দৃপ্ত।” আদুরে গলায় বলে ওঠে রাই। দৃপ্ত আর রাই একটা চাদরে নিজেদের ঢেকে বসে আছে বালির উপর। চারপাশে কেউ নেই। “হুঁ” বলে চাদরের মধ্যে রাইকে আরো গাঢ় করে টেনে নেয় দৃপ্ত। কাঁধে মুখ গুঁজে রাখে। রাইয়ের শরীর শিরশির করছে। শীত শীত করে ওঠে ওর। দৃপ্ত ওর ঘাড়ে গলায় আদর করছে। আর কানের কাছে মুখ রেখে ফিসফিস করে ডাকছে “রাই রাই রাই…”

“রাই রাই…” আস্তে আস্তে চোখ খোলে রাই। স্বপ্ন ভেঙে যায় তার। চোখের সামনে নিকষ অন্ধকার। কিন্তু কেউ ডাকছে তাকে।
“রাই রাই…”
“দৃপ্ত…!”
“হ্যাঁ রাই আমি। আমায় ক্ষমা করে দাও।”
“আমি- আমি কোথায় দৃপ্ত ?”

“তুমি আমায় না বলে কেন চলে এসেছিলে রাই ? এই নির্জনে, এই নৌকার মধ্যে তুমি কি করে এলে ?”
“আমার খুব ঘুম পাচ্ছিল দৃপ্ত। খুউউউব ঘুম।”

“রাই… আমি… আমি … আমি যদি না খুঁজে পেতাম তোমায় রাই ! হঠাৎ আকাশে বিদ্যুৎ চমকে না উঠলে বুঝতেই তো পারতাম না এই নৌকায় ঘুমিয়ে আছো তুমি। বৃষ্টির মধ্যে পড়ে আছো এভাবে।”

কেঁদে ফেলে দৃপ্ত। রাইয়ের হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে শিশুর মতো কাঁদতে থাকে সে। আসতে আসতে বোধ ফিরে আসছে রাইয়ের। মেডিসিনের রিয়াকশন কেটে গিয়ে রাই চেতনায় ফিরছে। বৃষ্টির শীতল কণাগুলো ওর সমস্ত সত্তাকে জাগ্রত করে দিচ্ছে। এই তো ! এই তো তার দৃপ্ত ! তার একান্ত নিজস্ব দৃপ্ত তার কাছে। এখন ওর সবটা জুড়ে শুধু রাই। কণ্ঠে সেই ব্যাকুলতা, চোখে তাকে হারাবার ভয়। একজনের ভয় অন্যজনের কতটা নিশ্চিন্ততার কারণ হতে পারে , তাই না ! রাই চুপ করে থাকে। যেন কথা বললেই সব স্বপ্ন ভেঙে যাবে, মিথ্যে হয়ে যাবে দৃপ্তর এভাবে ওর পাশে থাকা। মিথ্যে হয়ে যাবে এই রাত এই সমুদ্র সব।

অনেকক্ষন পর , যেন কয়েক যুগ পর রাই বলে ওঠে , “দৃপ্ত আমি শুধু তোমাকে চাই।”
“আমি অমানুষ রাই। তোমার মতো একটা মেয়েকে এতো কষ্ট দিয়েছি আমি। আর তুমি শুধু আমাকে পাওয়ার জন্য আমার থেকে হারিয়ে গেছ একটু একটু করে। আজ তোমাকে হারিয়ে বুঝেছি ফিরে পাওয়ার সুখ কতখানি। আমি ফিরতে চাই রাই। আমায় ফিরিয়ে নেবে না ?” কাতর গলায় কথাগুলো বলে ওঠে দৃপ্ত। আকাশে বিদ্যুৎ ঝলসে ওঠে আবার আর দৃপ্তর আকুল চোখদুটো পলকের জন্য দেখতে পায় রাই। ভিজে প্যান্ট, ভিজে শার্ট, পায়ে চটি, ভিজে কপালের উপর লেপ্টে যাওয়া চুল। এই তো তার জন্য পাগল হওয়া সেই উলকো ঝুলকো ছেলেটা। বড্ড মায়া, বড্ড ভালোবাসা জমানো আছে এই ছেলেটার জন্য রাইয়ের বুকে। দু’হাতে দৃপ্তকে আঁকড়ে ধরে রাই। ঠোঁটে ঠোঁট রেখে থরথর করে কেঁপে ওঠে। সমুদ্র ফুলে ফুলে উঠছে। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। ঠান্ডা হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকল পৃথিবীর আদিম দুই সত্তা। আদর ভালোবাসা সোহাগের বৃষ্টিকণা চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়তে লাগল ওদের শরীর বেয়ে। বহুকাল পর রাইয়ের মনের সেতারে ঝংকার উঠল সপ্ত সুরের। জোয়ারের ঢেউয়ে অল্প অল্প দুলতে দুলতে লাগল ডিঙি নৌকাটা আর সমুদ্র সাক্ষী থাকল ওদের পুনর্মিলনের।

আজ তিনদিন হলো দৃপ্তর ফোনটা সুইচ অফ। ল্যাপটপ পড়ে আছে চার্জহীন হয়ে। আছে শুধু এক সমুদ্র আর রাই। নরম , লালচে এক ভোর হয়েছে। বেলাভূমিতে রাই বাচ্ছাদের মতো দৌড়াচ্ছে। “ঐ দেখো ঐ দেখো দৃপ্ত, আরেকটা ঝিনুক।” আঙুলের ইশারায় দেখায় রাই। দৃপ্ত এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। খুঁজে পাচ্ছে না। খিলখিল করে হাসছে রাই। দৃপ্ত খুঁজতে থাকে। আজ রাইয়ের জন্য অনেক ঝিনুক খুঁজে দেবে সে। অদূরে সমুদ্র শান্ত চোখে তাকিয়ে থাকে ওদের ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত