কেশবতী

কেশবতী

উফফ ! আর পারা যাচ্ছে না মাকে নিয়ে। সারাটা সপ্তাহ অফিসের কাজে হাক্লান্ত থাকে শিল্পা। হাতে সবে মাত্র একটা দিন। রবিবার। কোথায় একটু হাত পা ছড়িয়ে বেলা অবধি ঘুমোবে তা নয়, কোথা থেকে মা জুটিয়ে আনবে এক একটা পাত্র। নমুনা সব। গুষ্টি শুদ্ধ নিয়ে চলে আসবে দেখতে। তাদের জন্য মা ভোর বেলায় তুলে দেবে শিল্পাকে। তারপর সারাটাদিন এটা করো রে ওটা মাখো রে। আর সব থেকে বেশি মা যেটা নিয়ে পড়ে সেটা হল ওর চুল। একঢাল কালো চুল ওর কোমর ছাপিয়ে নেমে গেছে হাঁটু অবধি প্রায়। ঘন কালো সোজা চুল। আই. টি সেক্টরে কাজ। শিল্পা কোনো সময়ই পায় না চুলের যত্ন নেওয়ার। কিন্তু চুলের ধাত ও পেয়েছে ওর ঠাকুমার থেকে। মা বলে ওর ঠাকুমার চুল নাকি অবিকল ওর মত ছিল। তো সেই চুলই হল মায়ের তুরুপের তাস। পাত্র পক্ষের সামনে কিভাবে সেই চুল মেলে ধরলে তারা আর মানা করতে পারবে না, সেই নিয়ে মায়ের যত গবেষণা শুরু হয় সেই দিন সকাল থেকে। নানা রকম সুগন্ধি দিয়ে শিল্পাকে একঘন্টা ধরে চুল ধুতে হয় সেদিন। তারপর মা নিজে হাতে চুলে কিসব মাখিয়ে দেয়।

ধুর ! অফিসে বসে মায়ের ফোনটা পেয়ে মেজাজ বিগড়ে গেল শিল্পার। একটু আগেও ফুরফুরে মেজাজে ডেডলাইন শেষ করছিল সে। কাল রবিবার। বেলা অবধি বিছানায় গড়াতে পারবে, এই আনন্দে কাজের গতি দ্বিগুণ হয়ে গেছিল। মনে হচ্ছিল কখন বাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে গড়িয়ে পড়বে মখমল গদিটায় ! আর এখন মনে হচ্ছে বাড়িই ফিরবে না আর। কে বোঝাবে মাকে, সে এখন সবে মাত্র সাতাশ। আর পুরোদস্তুর কেরিয়ারিস্ট মেয়ে সে। কেরিয়ারে এখনো অনেকগুলো গোল রিচ করা বাকি তার। আগে সেই স্বপ্ন পূরণ করে তবে সে নিজের জীবন সঙ্গী বাছার কথা ভাববে। আর আরেঞ্জ ম্যারেজে খুব একটা বিশ্বাসী সে কোনোকালেই ছিল না। দু’চারটে মায়ের আনা পাত্র দেখার পর তো বিয়ের এই ব্যবস্থাটায় পুরোপুরিই ইচ্ছে উঠে গেছে তার। তবু, মাকে বোঝানো যায় না। বাপি চলে যাওয়ার পর মাও খুব একা হয়ে গেছে। মনটাও দূর্বল হয়ে গেছে মায়ের। আগে বাপির ধমক ধামকে চুপ থাকত। কিন্তু এখন পুরোদস্তুর সনাতনী মাতৃদেবীর ভূমিকায় নেমে পড়েছেন মহিলা। আত্মীয়, প্রতিবেশী কারো বিয়ে হলেই তার আফটার এফেক্ট রূপে আগামী সাত দিনের মধ্যে একটা পাত্র তার বাড়িতেও এসে হাজির হবে ঠিক।

উফফ আর ভাল লাগে না। ঘড়িতে বিকেল পাঁচটা। ভেবেছিল অফিস থেকে সোজা বাড়ি যাবে। কিন্তু নাহ ! সেটা আর করা যাবে না। এখুনি গেলেই মা পাঠশালা খুলে বসবে। ঠোঁট দিয়ে পেন কামড়ে ধরে গভীর চিন্তায় ডুবে যায় শিল্পা।

সন্ধ্যে পার হয়ে ঘড়িতে রাত দশটা এখন। মা অনেক বার ফোন করেছে। ধরেনি শিল্পা। ধরলেই শতেক প্রশ্ন। কোথায় ? কি করছিস ? এত দেরি হচ্ছে কেন ? তার থেকে একদম বাড়ি গিয়েই মায়ের সাথে কথা বলবে সে। সেই মত ধীরে সুস্থে বাড়ি পৌঁছে ডোরবেল বাজাল শিল্পা। মা তৈরিই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে খুলে গেল দরজা। হাকুপাঁকু করে মা কি যেন বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু শিল্পাকে সামনে দেখেই পুরো বোবা মেরে গেল !

“কি হল ! কি দেখছ ?”
“তো…তোর একি অবস্থা রে !”
“কেন ? কি আবার !”
“একি সর্বনাশ করেছিস ! চুলগুলো কোথায় দিয়ে এলি !”
“কোথাও দিয়ে আসিনি তো ! এই তো, সাথে করে এনেছি। এই নাও।” বলে মায়ের হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে সোজা ঘরের ভিতর চলে গেল শিল্পা। জানে, মায়ের পক্ষে একটু বেশিই শকিং হয়ে গেছে ব্যাপারটা। কিন্তু এছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না যে ! ছ’দিন পর একটা ছুটির দিন কাল। আহঃ ! বিছানাটার দিকে তাকিয়ে মনটা ভাল হয়ে গেল শিল্পার। শান্তিতে ঘুমোবে কাল সে। অফিসের প্রজেক্টটাও আজ জমা করে দিয়েছে। কি হালকা লাগছে যে ! আর এখন কিছুদিন এই উটকো অতিথিদের আসাও বন্ধ হবে। এই কাকছাঁট চুল নিয়ে মা আর সাহস পাবে না তাকে ওদের সামনে বসাবার। যাক ! এরোমা বাথ নেবে বলে বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতে শুনতে পেল শিল্পা, মা ফোনটা তুলে বলছে, “হ্যাঁ, কালকে আমাদের আসলে একটু অসুবিধা হয়ে গেছে আপনাদের পরে জানাব”

মুচকি হেসে টাওয়েলটা নিয়ে বাথরুমের ভিতরে ঢুকে যায় শিল্পা। আয়নায় নিজেকে দেখে ভাল করে। নাহ ! বয় কাটে বেশ মানিয়েছে তাকে। বেশ একটা তসলিমা নাসরিন লুকস এসেছে। সেও তো তাঁর মত একরকম বিপ্লবই করল আজ। অনেক ভেবে সাহস করে পার্লারে গেছিল সে অফিসফেরত। তো সেখানেও আরেক ঝামেলা। পার্লারের দিদিকে এত বড় চুল বয় কাট করাতে রাজি করতেই লেগে গেছে এক ঘন্টা। ওরাও যারপরনাই অবাক হয়ে গেছে ওর সিদ্ধান্তে। কিন্তু এ বেশ ভালোই হল সব দিক থেকে। ঝঞ্ঝাট মুক্ত।

শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে ভাবে শিল্পা, ডিনার টেবিলে মা আজ খুব গরম থাকবে। তাই সে ভেবে নেয়, আজ আফটার ডিনার মাকে পাড়ার আইসক্রিম পার্লারটায় নিয়ে গিয়ে মাকে পছন্দের ভ্যানিলা আইসক্রিম ট্রীট দিয়ে দেবে সে… মাতাজি খুশ হো জায়েগি!

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত