আজ তাহার জন্মদিন

আজ তাহার জন্মদিন

— মা আমি স্কুলে যাচ্ছি, আমাকে পঞ্চাশ টাকা দাও।

মা নাস্তা খেতে বসেছিলেন। আমার কথা শুনে তিনি আমার দিকে তাকালেন। এমনভাবে তাকাচ্ছেন যে মনে হচ্ছে আমি পঞ্চাশ টাকা চাইনি, পঞ্চাশ হাজার টাকা চেয়েছি। আম্মু হাতে থাকা রুটি প্লেটে রেখে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন,

— পঞ্চাশ টাকা দিয়ে কি করবি?
— টিফিনের জন্য লাগবে।
— তাই বলে পঞ্চাশ টাকা?
— হুম পঞ্চাশ টাকাই লাগবে। আজ আমরা সব বন্ধুরা মিলে !
— হয়েছে হয়েছে আর বলতে হবে না। এই নে পঞ্চাশ টাকা, আগামী তিনদিন কোন টাকা পাবি না।
— এ্যা….
— হ্যা, এবার স্কুলে যা। আমিও আসছি একটু পরে।

পকেটে পঞ্চাশ টাকা নিয়ে মুখ গম্ভীর করে হাঁটতে লাগলাম স্কুলের দিকে। মোটে সাড়ে তিনশ টাকা হলো। সাড়ে তিনশ টাকায় কি জন্মদিনের কেক পাওয়া যাবে? কখনো এইসব কিনিনি, তাই অনুমান করতে কষ্ট হচ্ছে। তবে আমার বন্ধু জীবন, যার ডাকনাম রুচি চানাচুর। এসব ব্যাপারে সে খুবই চতুর। তাকে জিজ্ঞেস করলে হয়তো একটা সুরাহা হতে পারে।

–আচ্ছা রুচি চানাচুর, একটা ছোটখাটো জন্মদিনের কেকের দাম কতো হতে পারে?
— শালা, আমাকে রুচি চানাচুর বললি কেন? দেব মাথায় গাট্টা।
— দোস্ত রাগ করিস না, বলনা দাম কতো হতে পারে?
— আগে বল কার জন্মদিনের কেক?
— কার জন্মদিনের কেক সেটা দিয়ে তোর কাজ নেই। তুই শুধু দাম বল, তাহলেই হবে।
— তাহলে তোকেও কেকের দাম বলে কাজ নেই। যাহ ভাগ।
— দোস্ত দাঁড়া বলছি।

জন্মদিনের কেকের ব্যাপারটা কাউকে জানাতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু কেকের দাম জানতে হলে ব্যাপারটা জীবন ওরফে রুচিকে জানাতেই হবে। তাই একটু দম নিয়ে বলেই ফেললাম।

— দোস্ত পরশু দ্বীপার জন্মদিন। তাই ওর জন্মদিন উদযাপন করতে চাচ্ছিলাম। কেকের দাম নিয়ে খুবই ঝামেলায় আছি। বাজেট একেবারে কম। আম্মু কিছুতেই টাকা দিতে চায় না।

একদমে কথাগুলো বলে দম নিলাম। জীবন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। মানুষ যেমন অদ্ভুত কোনকিছু দেখলে চোখ বড়বড় করে তাকায় ঠিক তেমনি জীবন আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

— তানভির তুই কোন দ্বীপার কথা বলছিস রে? ক্লাস এইটের দ্বীপার কথা বলছিস?
— হ্যা দোস্ত ক্লাস এইটের দ্বীপা।
— তাহলে শেষমেশ দ্বীপাকে পটিয়েই ফেললি?
— হুম ফেললাম। এবার ত্যানা না পেঁচিয়ে আসল কথা বলে ফেল।
— তোর কাছে কত টাকা আছে?
— মাত্র সাড়ে তিনশ টাকা।
— হুম হয়ে যাবে। সাথে ছোটখাটো একটা গিফট কিনতে পারবি মনে হচ্ছে।
— তাহলে কালকে পরশু স্কুল ছুটির পর কিনে আনবো।
— ওকে ডান।

স্কুলের ঘন্টা পড়ে গেল। সাথে সাথেই ক্লাসে ঢুকলেন আমাদের ক্লাস টিচার অনামিকা জাহান। একাধারে আমাদের স্কুলের বাংলার শিক্ষক এবং আমার মা।

আমি তানভির, ক্লাস টেনে পড়ছি, আর দ্বীপা আমাদের স্কুলেই ক্লাস এইটে পড়ে। দ্বীপাকে প্রথম দেখি আমাদের স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানে। যেমন খুশি তেমন সাজো খেলায় বেগম রোকেয়া সেজে এসেছিল সে। সেদিনই প্রথম দ্বীপাকে দেখা।

তারপর দ্বীপাকে দেখি আমার মায়ের সাথে একটা ছবিতে। ছবিতে ও হেসে ঢলে পড়ছিল আমার মায়ের উপর। তার টোলপড়া হাসি দেখে আমি দ্বীপার প্রেমে পড়েছিলাম। এরপর থেকে স্কুলে গেলেই দ্বীপাকে খুঁজতাম, কিন্তু কখনো কথা বলার সাহস হয়নি। কারনটা অবশ্যই আমার মা। আমি আমার মাকে জমের মত ভয় পাই।

ছোটবেলা থেকে মায়ের কড়া শাসনে বড় হয়েছি। আম্মুর তুলনায় আব্বুকে আমি খুব কমই ভয় পাই। আসলে ধরতে গেলে আব্বুকে আমি ভয়ই পাইনা।

যাক আব্বু আম্মুর কথা বাদ দেই, দ্বীপার কথায় ফিরে আসি। স্কুলে তো দ্বীপার সাথে কথা বলা একপ্রকার হারাম ছিল, তাই চেষ্টা করতাম স্কুল ছুটির পর রাস্তায় যেতে যেতে দ্বীপার সাথে কথা বলার। কিন্তু সেখানেও বাগড়া দিত দ্বীপার বান্ধবীরা। সবাই একসাথে হইহুল্লোড় করতে করতে বাসায় ফিরতো। আমি দ্বীপাকে একা পাওয়ার অপেক্ষা করতাম, কিন্তু সবসময় ভাগ্য অসহায় থাকতো।

এভাবে একমাস কেটে গেল কিন্তু দ্বীপার সাথে কথা বলার কোন সুযোগ পেলাম না।
দ্বীপাদের বাড়ির পেছনে একটা প্রকান্ড খেলার মাঠ আছে। আমার প্রায় সব বন্ধুরাই বিকেলে সেখানে ক্রিকেট খেলতো। আমি খেলাধুলা পছন্দ করি না, তাই বিকেলবেলা ঘরে বসে বই পড়েই কাটিয়ে দিতাম। কিন্তু দ্বীপাকে দেখার কিছুদিন পর থেকেই সেই মাঠে বিকেলবেলা আমার আনাগোনা বাড়তে লাগলো। মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে ক্রিকেটও খেলতাম।

সন্ধ্যা হওয়ার কিছুক্ষন আগে খোলাচুলে দ্বীপা ছাদে উঠতো এবং প্রতিদিন তারসাথে তার বান্ধবী আফিয়া থাকতো।
ওই সময়টায় যদি আমি ব্যাটিংয়ে থাকতাম তাহলে ইচ্ছে করেই আউট হয়ে চলে যেতাম একেবারে ওদের বাড়ীর কাছাকাছি। আড়চোখে তাকিয়ে দেখতাম দ্বীপাকে।

তারপর হঠাৎ বুঝতে পারলাম দ্বীপার সাথে কথা বলতে হলে আগে দ্বীপার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী আফিয়ার সাথে ভাব জমাতে হবে। তাহলেই দ্বীপার সাথে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে।

এরপর থেকে আফিয়ার সাথে ভাব জমাতে শুরু করলাম, কথা বলা শুরু করলাম। তবে সবকিছুই চলতো গোপনে। কারন আম্মু জানলে খবর আছে। একসময় ভালমত ভাব জমিয়েই ফেললাম। ক্লাসের ফাস্ট বয় হিসেবে আমার খুব ভাল সুনাম ছিল, তার উপর টিচারের ছেলে। তাই ব্যাপারটা সহজেই হয়ে গেল।

তারপর একদিন আফিয়াকে বললাম দ্বীপার প্রতি আমার ভাললাগার কথা। তারপর একদিন দ্বীপার সাথে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছিল আফিয়া। সেদিন দ্বীপা একা একা বাড়ী ফিরছিল, সাথে আফিয়া। আমার স্পষ্ট মনে আছে সেদিন আমার হাঁটু কাঁপছিল, কন্ঠ জমে গিয়েছিল। ঠিক মত কথা বলতে পারছিলাম না। মোটামুটি ভয়াবহ অভিজ্ঞতা যাকে বলে।

এভাবেই একসময় আমার সাথে দ্বীপার হয়ে যায় আরকি।
অনেক অতীত ঘাটলাম, এবার বর্তমানে আসা যাক। এখন আমি দাঁড়িয়ে আছি বেঞ্চের উপর। কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে আমায়, আর যথারীতি আমার মা আমাকে শাস্তি দিচ্ছেন। কারন হচ্ছে আমি আজকে ক্লাসে অমনোযোগি। আর হবোই বা না কেন? আজকে দ্বীপার জন্মদিন, স্কুল ছুটির পর কেক কিনতে হবে, গিফট কিনতে হবে। কত কাজ হাতে। আজকে কি ক্লাসে মনযোগ দিলে হবে?

স্কুল ছুটির পর আমি আর জীবন কেক কিনে আনলাম আর একটা ঘড়ি কিনলাম দ্বীপার জন্য। টাকা কিছু কম পড়েছিল, জীবনের কাছ থেকে একশো টাকা ধার নিয়ে কাজ চালিয়ে দিলাম। কেক কিনে জীবনদের বাসায় ফ্রীজে রেখে আমি বাসায় ফিরলাম। খাওয়া দাওয়া, গোসল শেষ করে বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষন ঘুমানোর ভান করে তারপর ছুট দিলাম জীবনের কাছে।

ওর বুদ্ধিমতো আমাদের স্কুলের একটা ক্লাশরুমের চাবি দপ্তরীর কাছথেকে চেয়ে রেখেছিলাম। একজনের জন্মদিন পালন করবো বলেই চাবিটা নিয়েছিলাম। প্রথমে দপ্তরী চাচা চাবি দিচ্ছিলো না। অনেক অনুনয় বিনয়ের পর চাবি আদায় করলাম। তবে শর্ত ছিল অতি তাড়াতাড়ি যেন সবকাজ শেষ হয়।

তো অাফিয়াকে বলেছিলাম দ্বীপাকে নিয়ে সোজা স্কুলে চলে আসতে। কিন্তু দ্বীপা যেন কিছুতেই জন্মদিনের ব্যাপারটা টের না পায়। আমরা কেক টেবিলের উপর রেখে চুপচাপ বসে রইলাম বেঞ্চের আড়ালে। এমনভাবে বসলাম যেন হুট করে কেউ রুমে ঢুকলে আমাদেরকে দেখতে না পায়। সবার আগে যেন কেক দেখতে পায় । বসে থেকে এখন শুধু অপেক্ষার পালা কখন দ্বীপা আসবে?

দ্বীপাকে নিয়ে আফিয়া হাজির হলো আসরের আজানের কিছু পরে। আমরা ঘাপটি মেরে বসে রইলাম বেঞ্চের আড়ালে। ক্লাসরুমে ঢুকেই দ্বীপা কেক দেখে কিছুটা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তারপর ক্লাসের এদিক সেদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজতে লাগলো। হঠাৎ আমি উবু হয়ে বসা থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলাম,

— হ্যাপি বার্থডে টু ইউ দ্বীপা।

আমি বলার পরমূহুর্তেই জীবন আর আফিয়ে একসাথে হ্যাপি বার্থডে বলে উঠলো। দিপা মনে মনে খুশি হলেও উপরে উপরে কপট রাগ দেখিয়ে বললো,

— এসবের মানে কি? আপনাকে কে বলেছে কেক কিনতে, যত্তসব।

আমি দ্বীপার কথায় কিছু না বলে আমার পকেটে থাকা কয়েকটা চকলেট বের করে দ্বীপার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। অগ্নিদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে দ্বীপা চকলেটগুলো হাতে নিল এবং পরক্ষনেই আমার দিকে আলতো করে ছুড়ে মারলো।

তবে কিছুক্ষন পর মাটির দিকে তাকিয়ে দ্বীপা হাসতে শুরু করলো। তারপর দ্বীপাকে আহ্বান করলাম কেক কাটতে আসার জন্য। দ্বীপার হাতের উপর আলতো করে হাত রেখে কেক কাটলাম। এটাই ছিল দ্বীপাকে প্রথম ছুঁয়ে দেয়া। আমি কেঁপে উঠেছিলাম কিছুটা, ঠিক তেমনি হয়তো দ্বীপাও কেঁপে উঠেছিল।

কেক কাটা শেষ হলে জীবন পার্টিস্প্রে দিয়ে পুরো ঘর ঘোলাটে করে দিল। তারপর শুরু করলাম কেক মাখামাখি।
সবার শেষে আমি দ্বীপার হাত ধরে তার জন্য কিনে আনা ঘড়িটা পরিয়ে দিলাম। ঘড়িটা পরিয়ে দেয়ার পর দ্বীপা হেসেছিল। শেষ বিকেলের আলোয় গালে টোল পড়া সেই হাসি আমাকে আবারো দ্বীপার প্রেমে ফেলে দিল।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত