খালি জাহাজের রহস্য

খালি জাহাজের রহস্য

খবরের কাগজটা হাত থেকে নামিয়ে রেখে কাকাবাবু বললেন, কী রে সন্তু, একটু বেড়াতে যাবি?

কথাটা শুনেই সন্তুর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কাকাবাবুর একটু বেড়াতে যাওয়া মানে তো হিমালয় কিংবা আন্দামান। কিংবা আরও দূর বিদেশেও হতে পারে। কয়েকদিন ধরেই কাকাবাবু দক্ষিণ আমেরিকার কথা বলছিলেন।

সন্তু বলল, হ্যাঁ যাব। কোথায় কাকাবাবু?

কাকাবাবু মর্নিং ওয়াক করতে যান, সেই জন্য জামা-জুতো পরেই ছিলেন। ক্রাচটা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, চল না, ট্রেনে করে একটু ঘুরে আসি।

প্লেনে নয়, ট্রেনে যেতে হবে শুনে সন্তু একটু দমে গেল। তা হলে তো বিদেশে যাওয়া হবে না। অবশ্য ট্রেনে চেপে বেড়াতেও সন্তুর ভাল লাগে।

সে বলল, কটার সময় ট্রেন? বাক্সটোক্স গুছিয়ে নিই তা হলে?

কাকাবাবু বললেন, ওসব কিছু নিতে হবে না। চল এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ি, স্টেশনে গেলে একটা কোনও ট্রেন পেয়ে যাব। তুই শুধু ওপরের ঘর থেকে আমার হ্যান্ডব্যাগটা নিয়ে আয়, আর বৌদিকে বলে আয় যে, আমাদের ফিরতে একটু রাত হতে পারে।

সন্তু সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়ে নিল। কিন্তু জোজোকে খবর দেওয়া গেল না। ছুটির দিন, জোজো অনায়াসে সঙ্গে যেতে পারত।

বাড়ির বাইরে এসে কাকাবাবু বললেন, দ্যাখ দেখি, একটা ট্যাক্সি পাওয়া যায় নাকি?

মিনিট পাঁচেক রাস্তা দূরে ছোট পার্ক আছে, সেইখানে ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে থাকে। সন্তু ছুটে গেল সেদিকে। মনে তার বেশ খটকা লেগেছে। একদিনের জন্য ট্রেনে করে বেড়াতে যাওয়া? কাকাবাবুর তো আগে কখনও এরকম শখ হয়নি। কিংবা কাকাবাবু কখনও একদিন দুদিনের জন্য কোথাও গেলেও সন্তুকে তখন সঙ্গে নেন না। অনেক দূরে গেলেই সন্তুকে তাঁর দরকার হয়।

স্ট্যান্ডে একটা মোটে ট্যাক্সি দাঁড়িয়েছিল, সন্তু সেটার কাছে পৌঁছবার আগেই এক ভদ্রলোক ধাঁ করে সেটায় উঠে বসলেন। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী আর ছোট-ছোট পাঁচটি ছেলেমেয়ে। সন্তু একটু নিরাশ হল। আবার কতক্ষণে ট্যাক্সি আসবে কে জানে!

তক্ষুনি একটা সাদা রঙের গাড়ি থামল সন্তুর গা ঘেঁষে। জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বিমান বলল, কী রে সন্তু, কোথায় যাবি? উঠে পড়, গাড়িতে উঠে পড!

বিমানের রং খুব ফস আর মাথাভর্তি বড় বড় চুল, পাতলা লম্বা চেহারা। বিমানের ডাকনাম সাহেব। ছোটবেলায় তাঁকে সবাই সাহেব-বাচ্চা বলে ভুল করত। সবচেয়ে মজার কথা হল, বিমান প্লেন চালায়, এয়ার ইন্ডিয়ার পাইলট। নামের সঙ্গে কাজের এমন মিল খুব কম দেখা যায়। সন্তু বলল, না বিমানদা, আমি একটা ট্যাক্সি খুঁজছি। বিমান বলল, তুই আবার এত সকলে ট্যাক্সিতে কোথায় যাবি? চল, আমি পৌঁছে দিচ্ছি।

সন্তু আমতা আমতা করতে লাগল। কোথায় যাবে তা তো সে নিজেই জানে না। তারপর ট্রেনে যাবার কথা মনে পড়ায় বলল, কাকাবাবুর সঙ্গে হাওড়া স্টেশনে যাব।

বিমান বলল, কাকাবাবু যাবেন? আমি নিয়ে যাচ্ছি, এখন আমার কোনও কোজ নেই। আমার দুদিন ছুটি।

কাকাবাবুর নানারকম পছন্দ-অপছন্দ আছে, বিমানদার সঙ্গে যেতে রাজি হবেন কি না কে জানে! কিন্তু বিমানদাকে তো আর ন বলা যায় না। সন্তু তাই উঠে পড়ল গাড়িতে।

বাড়ির সামনে পৌঁছেই সন্তু বলল, একটাও ট্যাক্সি পাওয়া যাচ্ছে না। কাকাবাবু। সেইজন্যে বিমানদাকে বলে-

কাকাবাবু বললেন, তা বেশ তো, বিমান, তুমি আমাদের একটু শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে দেবে নাকি?

বিমান বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আসুন। শিয়ালদা যাবেন? সন্তু যে বলল হাওড়া?

কাকাবাবু বললেন, না, আমরা শিয়ালদা দিয়ে একটু ক্যানিং যাব।

বিমান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ক্যানিং যাবেন? সেখানে কী আছে?

কাকাবাবু কখন কোথায় যেতে চান সে সম্পর্কে সন্তু কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস পায় না। সে ভাবে, সময় হলে তো জানতেই পারবে!

কাকাবাবু একটু হেসে বললেন, তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে ক্যানিং-এ কোনও মানুষ যায় না! অনেকেই তো। ওদিকে বেড়াতে যায়। আমরা ভাবছি ক্যানিং থেকে সুন্দরবন ঘুরে আসব।

বিমান বলল, সুন্দরবন? সে তো খুব সাংঘাতিক জায়গা। কবে ফিরবেন? আপনাদের সঙ্গে মালপত্র কিছু নেই।

আজই? সুন্দরবন এত কাছে নাকি? আমার ধারণা, সে তো অনেক দূর, সেখানে গভীর জঙ্গল, বাঘ-ভালুক থাকে-

বিমান, তুমি প্লেন চালিয়ে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াও, অথচ নিজের দেশের খবর রাখো না। সুন্দরবন কলকাতা থেকে মাত্র সত্তর-আশি মাইল দূরে।

এত কাছে? তা হলে তো গাড়িতেই যখন-তখন যাওয়া যায়। তা হলে আমি কখনও সুন্দরবন দেখিনি কেন? আমার চেনা শুনো কেউই সুন্দরবন যায়নি।

গাড়ি করে পুরোটা যাওয়া যায় না, কারণ মাঝখানে দুএকটা নদী পার হতে হয়, সেখানে ব্রিজ নেই। ক্যানিং বা নামখানা থেকে যেতে হয় লঞ্চে, সেইজন্যই বেশি সময় লাগে।

বিমান তবু বিস্মিত চোখে কাকাবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, সুন্দরবন এত কাছে? সেখান থেকে বাঘ-ভালুকরাও তো যে-কোনও সময় কলকাতায় এসে পড়তে পারে?

কাকাবাবু বললেন, সুন্দরবনে ভালুক নেই, বাঘ আছে। খুব খিদে পেলে ওখানকার বাঘেরা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে কাছাকাছি গ্রামে উৎপাত করে। কলকাতা পর্যন্ত আসার দরকার হয় না। বাঘেরা শহর পছন্দ করে না।

বিমান বলল, কাকাবাবু আমিও আপনাদের সঙ্গে যেতে পারি? এই সুযোগে তাহলে সুন্দরবনটা দেখে আসা হবে।

কাকাবাবু বললেন, যেতে পারো কিন্তু তোমার গাড়িটা কী হবে? শিয়ালদা স্টেশনে তোমার গাড়িটা সারাদিন ফেলে রাখবে?

কেন, গাড়ি নিয়েই ক্যানিং পর্যন্ত চলে যাই। ট্রেনে যাওয়ার দরকার কী? কোন রাস্তা দিয়ে ক্যানিং যাওয়া যায় বলুন তো?

আগে গড়িয়ার দিকে চলো। তারপর নরেন্দ্রপুরের রাস্তা ধরবে। বিমান গাড়ি ঘুরিয়ে নিল। বিমান সঙ্গে যাচ্ছে বলে বেশ খুশি হল সন্তু। বিমানদা খুব আমুদে ধরনের মানুষ। হঠাৎ যদি বিমানদার সঙ্গে দেখা না হত কিংবা সন্তু প্ৰথমেই একটা ট্যাক্সি পেয়ে যেত, তাহলে এরকমভাবে গাড়ি করে বেড়াতে যাওয়াও হত না।

যাদবপুর ছাড়িয়ে গাড়িটা একটু ফাঁকা রাস্তায় পড়বার পর কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, বিমান, তুমি যে চললে, তোমার আজ ডিউটি নেই?

বিমান বলল, আমার আজ আর কাল ছুটি, পরশু একটা নিউইয়র্কের ফ্লাইট আছে। আপনি ঠিকই বলেছেন কাকাবাবু, আমরা সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াই, অথচ নিজের দেশের অনেক কিছুই দেখা হয় না। কিন্তু সুন্দরবনে যাচ্ছেন, সঙ্গে বন্দুক-টন্দুক কিছু নিলেন না?

কাকাবাবু বললেন, আমরা তো শিকার করতে যাচ্ছি না। তাছাড়া বাঘ মারা এখন নিষেধ।

কিন্তু হঠাৎ যদি সামনে একটা বাঘ এসে পড়ে? বাঘ কি আমাদের ছাড়বে?

সুন্দরবনে সব জায়গাতেই তো বাঘ নেই। এ যাত্রায় আমার বাঘের কাছাকাছি যাবারও ইচ্ছে নেই। আমি যাচ্ছি একটা মোটরলঞ্চ দেখবার জন্য।

মোটরলঞ্চ দেখতে যাচ্ছেন? কিনবেন নাকি?

না লঞ্চ কিনব কেন? একটা ফাঁকা লঞ্চ সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে সুন্দরবনের কাছে এসে ঠেকেছে না?

ও, সেইটা?

কদিন ধরেই এই লঞ্চটা নিয়ে খবরের কাগজে খুব লেখালেখি হচ্ছে। সন্তুও পড়েছে। একটা বিদেশি লঞ্চ এসেছে সুন্দরবনে। কিন্তু তার ভেতরে কোনও মানুষ নেই। লঞ্চটি দেখতে ভারী সুন্দর, ভেতরটা খুব সাজানো-গোছানো। শয়নঘর, রান্নাঘর আছে। খাবারের টেবিলে দুটো সসেজ, খানিকটা চিজ আর দু পিস পাউরুটি, পাশে আধিকাপ কফি ছিল, কেউ যেন খেতে খেতে হঠাৎ উঠে গেছে। একটা রেডিও বাজছিল। কিন্তু লঞ্চের মালিকের কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এমনকী কাগজপত্রও কিছু নেই।

কেউ-কেউ বলছে, ঐ লঞ্চে কোনও বিদেশি গুপ্তচর ছিল, কোনও কারণে হঠাৎ লঞ্চ থেকে নেমে সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে আছে। কেউ বলছে, ঐ লঞ্চটা ছিল স্মাগলারদের, সমুদ্রের বুকেই অন্য কোনও স্মাগলারদের দল এদের আক্রমণ করে সব জিনিসপত্র কেড়ে নিয়েছে, লোকগুলোকেও মেরে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছে। আরও অনেক রকম কথাই শোনা যাচ্ছে।

বিমানের গাড়িতে একটা ইংরেজি খবরের কাগজ রয়েছে। সে সেটা তুলে বলল, আজকের কাগজে লঞ্চটার একটা ছবি বেরিয়েছে। পুলিশ এটাকে আটকে রেখেছে।

সন্তু সকালবেলায় খবরের কাগজ পড়েনি। সে বিমানদার কাছ থেকে কাগজটা নিয়ে ছবিটা দেখতে লাগল। সাদা ধপধাপে লঞ্চটা। কাছেই কয়েকটা খালি-গায়ে বাচ্চা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সুন্দরবন তো দেখা যাচ্ছে না।

বিমান বলল, আমার মনে হয়, স্পাইটাই সব বাজে কথা। আজকাল কোনও সম্পাই লঞ্চে করে ঘোরে নাকি? অতি সময় কোথায় তাদের? তারা প্লেনে ঘোরাফেরা করে। আমার কী মনে হয় জানেন, ওটা কোনও ফিশিং বোট। জাপান বা কোরিয়া থেকে দুএকটা মাছ ধরার লঞ্চ ঝড়ের মধ্যে পড়ে এদিক-সেদিক চলে যায়। ভেতরের লোকজন বেচারারা নিশ্চয়ই ঝড়ের সময় ছিটকে জলে পড়ে গেছে!

কাকাবাবু বললেন, তা হতে পারে। কিন্তু খাবারের টেবিলে খাবার পর্যন্ত সাজানো আছে, অথচ ভেতরে লঞ্চের লাইসেন্স কিংবা মালিকের পাসপোর্ট বা অন্য কোনও কাগজপত্র কিছুই নেই কেন? সবই কি ঝড়ে উড়ে গেল? তাছাড়া ফিশিং বোটের চেহারা অন্যরকম হয়?

বিমান বলল, স্মাগলারদের ব্যাপার অবশ্য হতে পারে। পৃথিবীর সব দেশেই সমুদ্রের ধারে চোরা-চালানিদের কাণ্ডকারখানা চলে। এখানে তো আবার জঙ্গল রয়েছে, আরও সুবিধে!

কাকাবাবু হঠাৎ চেঁচিয়ে বললেন, আরে, আরে, করছ কী? এটা কি তুমি এরোপ্লেন পেয়েছ নাকি?

একটু ফাঁকা রাস্তা পেয়েই বিমান গাড়িতে এমন স্পিড দিয়েছে, যেন সেটা এক্ষুনি মাটি ছেড়ে আকাশে উড়বে!

বিমান গাড়ির গতি কমিয়ে দিয়ে হেসে বলল, মনে থাকে না! জানেন, একদিন চৌরঙ্গিতে খুব জ্যামের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলুম। তখন আমার ইচ্ছে করছিল, আমার গাড়িটা টেক অফ করে অন্য গাড়ির ওপর দিয়ে উড়ে চলে যাই।

কাকাবাবু খুব হাসতে লাগলেন।

সন্তু বলল, এরকম গাড়ি বার করলেই হয়, যা মাঝে-মাঝে উড়ে যেতেও পারবে। মাটিতেও চলবে, আবার জলের ওপর দিয়েও ভেসে যাবে।

বিমান বলল, হবে, হবে! বিজ্ঞানের যা উন্নতি হচ্ছে, আর দুচার বছরের মধ্যেই এরকম গাড়ি বেরিয়ে যেতে পারে?

সন্তু জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, বিমানদা, তুমি যে এতদিন প্লেন চালাচ্ছ, তোমার প্লেন কোনওদিন হাইজ্যাকিং হয়নি?

বিমান বলল, আমার প্লেনে কখনও হয়নি। কিন্তু হাইজ্যাকিং দেখার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে?

কাকাবাবুও-কৌতূহলী হয়ে বললেন, তাই নাকি? কবে?

বিমানের পাশে সন্তু বসেছে। কাকাবাবু বসেছেন পেছনের সিটে। বিমান এবারে মুখ ঘুরিয়ে বলল, বলছি। তার আগে, কাকাবাবু, আপনার কাছে একটা পারমিশান চাই। আপনার সামনে আমি সিগারেট খেতে পারি?

কাকাবাবু মুচকি হেসে বললেন, না! আমার সামনে খাওয়া চলবে না!

বিমান বেশ অবাক হয়ে গেল। এরকমভাবে পারমিশান চাইলে সবাই বলে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, খেতে পারে, নিশ্চয়ই পারো। অথচ কাকাবাবু না বলছেন!

কাকাকাবু বললেন, শোনো, আগে আমার পাইপ খাবার দারুণ নেশা ছিল। পাইপ কিংবা চুরুট মুখে না দিয়ে থাকতেই পারতুম না। সেবারে, হিমালয়ে গিয়ে এই নেশাটা প্ৰতিজ্ঞা করে ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু এখনও কেউ আমার সামনে সিগারেট কিংবা চুরুট বা পাইপ খেলে সেই ধোঁয়ার গন্ধে আমার মনটা চনমান করে। সেইজন্যই বলছি, আমার সামনে খেও না, আড়ালে খেতে পারো। এখন যদি খুব ইচ্ছে করে, গাড়ি থামাও, আমি নেমে বাইরে দাঁড়াচ্ছি!

বিমান লজা পেয়ে বলল, না, না, না, আমার সেরকম নেশা নেই, মাঝে-মাঝে এক-আধটা খাই। আমিও একেবারে ছেড়ে দেব ভাবছি।

সন্তু জিজ্ঞেস করল, কবে তুমি হাইজ্যাকিং দেখলে বিমানদা?

বিমান বলল, বছর দুএক আগে। আমি তখন ছুটি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমেরিকার ডেনভার এয়ারপোর্ট থেকে একটা প্যান-অ্যামের প্লেনে উঠেছি, একটা ডি. সি. টেন, যাব ক্যানাডার এডমান্টন শহরে এক বন্ধুর কাছে। সেই প্লেনের কমান্ডারের নাম টেড স্মিথ, আমার সঙ্গে তার আগে থেকেই চেনা ছিল। ককপিটে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে গল্প করছি। এমন সময় দাড়াম করে দরজা খুলে দুটো ছেলে আর একটা মেয়ে সেখানে ঢুকল। ছেলেমেয়েগুলোর বয়েস হবে বাইশ-তেইশের মতন, দেখে মনে হয় মেক্সিক্যান। দুজনের হাতে দুটো রিভলভার, একজনের হাতে একটা গ্রিনেড। মেয়েটাকেই মনে হল দলের লিডার, সে ভাঙা ভাঙা ইংরিজিতে বলল, প্লেন ঘোরাও, কিউবার হ্যাভানা এয়ারপোর্টে চলো? আমার দিকে তাকিয়ে মেয়েটা ধমকে বলল, তুমি এখানে দাঁড়িয়ে কী করছ? যাও, ভেতরে যাও! তারপর-

গল্পে বাধা পড়ল। রাস্তার মাঝখানে কিসের যেন একটা ভিড়। দুটো গোরুর গাড়ি আর একটা লরি থেমে আছে রাস্তা জুড়ে।

বিমান বলল, এই রে, অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে মনে হচ্ছে!

বিমান তার গাড়িটা রাস্তার পাশে মাঠে নামিয়ে ফেলল।

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ও কী করছ?

পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি!

না, না, তা হয় নাকি? গাড়ি থামাও, দেখি এখানে ব্যাপারটা কী হয়েছে? গাড়ি থেকে ওরা নেমে পড়ল তিনজনে।

একটা গোরুর গাড়ির সঙ্গে একটা জিপগাড়ির ধাক্কা লেগেছে। জিপগাড়িটাই পেছন থেকে এসে মেরেছে। ধাক্কাটা। তার ফলে গোরুর গাড়িটা উল্টে গিয়ে গোরু দুটোর গলায় ফাঁস লেগে যায়। গোরু দুটো মরে যায়নি অবশ্য, কিন্তু নিশ্চয়ই খুব আহত হয়েছে, তারা প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করছে।

সন্তুর বুকটা মুচড়ে উঠল। গোরুর এরকম কাতর আর্তনাদ সে কখনও শোনেনি।

গোরুর গাড়ির গাড়োয়ানের অবশ্য বিশেষ কিছুই হয়নি। জিপগাড়িটাও রাস্তার পাশে মাঠের মধ্যে আধখানা নেমে পড়েছে, কিন্তু ড্রাইভার অক্ষত। ড্রাইভারের পাশে একজন লোক ছিল, প্রথম ধাক্কাতেই সে ছিটকে বাইরে পড়ে যাওয়ায় মাথায় খুব চোট লেগেছে। সেই লোকটাকে কেউ তুলে এনে রাস্তার মাঝখানে শুইয়ে দিয়েছে, মাথা একেবারে রক্তে মাখামাখি।

একদল লোক সেখানে ভিড় করে দাঁড়িয়ে নানা রকম মন্তব্য করছে শুধু।

কাকাবাবু ব্যাপারটা বুঝে নিয়েই আহত লোকটার কাছে এগিয়ে গেলেন। হাঁটু গেড়ে বসে লোকটার এক হাত তুলে নাড়ি দেখে অস্ফুট ভাবে বললেন, এখনও বেঁচে আছে।

তারপর ভিড়ের দিকে তাকিয়ে বেশ কড়া গলায় বললেন, আপনারা এখানে দাঁড়িয়ে কি মজা দেখছেন সবাই? থানায় খবর দিয়েছেন? এখানে কাছাকাছি হাসপাতাল কোথায়? এই লোকটিকে হাসপাতালে পাঠাবার ব্যবস্থা করতে পারেননি? চিকিৎসা করলে এখনও ও বেঁচে যাবে।

ভিড়ের মধ্য থেকে কয়েকজন লোক বলল, এখান থেকে থানা অনেক দূরে, হেলথ সেন্টারও বেশ দূরে।

কাকাবাবু বললেন, দূরে বলে কি খবর দেওয়া যায় না? আপনাদের কারুর সাইকেল নেই? মানুষ বিপদে পড়লে শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা দেখতে নেই, একটা কিছু করতে হয়। বিমান, ধরে তো, এই লোকটিকে আমাদের গাড়িতে তুলে নিই! জিপগাড়ির ড্রাইভারটি এসে কাকাবাবুর পাশে দাঁড়াল। দেখে মনে হয় সে বেশ মারধোর খেয়েছে। জামা-কাপড় ছেড়া। সে বলল, স্যার, আমার গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে না। আমিও আপনাদের সঙ্গে যাব।

কাকাবাবু বললেন, আসুন।

লোকটিকে ধরাধরি করে তোলা হল গাড়িতে। পেছনের সিটে তাকে শুইয়ে দেওয়া হল, জিপের ড্রাইভার বসল। তার মাথাটা কোলে নিয়ে। কাকাবাবু সামনের সিটে চলে এলেন।

গাড়ি ছাড়বার পর বিমান জিজ্ঞেস করল, অ্যাকসিডেন্ট হল কী করে? শুধু শুধু একটা গোরুর গাড়িকে ধাক্কা মারতে গেলেন কেন?

জিপের ড্রাইভার বলল, ব্যাড লাক, স্যার, আমার কোনও দোষ নেই। গোরুর গাড়িটা রাস্তার পাশ দিয়ে চলছিল, হঠাৎ চলে এল মাঝখানে। এই সব গোরুর গাড়িগুলোর এই দোষ, কখন যে কোন দিকে যাবে, তার ঠিক নেই। গোরু তো আর ইঞ্জিন নয় যে, সব সময় মালিকের কথা শুনবে! এদিকে আমার হল কী স্যার, আমি খুব জোরে ব্রেক চাপলুম, কিন্তু ব্রেক নিল না। ব্রেক ফেল। আপনি গাড়ি চালাচ্ছেন, আপনি জানেন যে, ব্রেক ফেল করলে আর করার কিছু নেই।

কাকাবাবু বললেন, তাহলে দেখা যাচ্ছে, শুধু গোরু কেন, ইঞ্জিন কিংবা যন্ত্রপাতিও সব সময় মানুষের কথা শোনে না! আপনারা আসছেন কোথা থেকে?

জিপের ড্রাইভার বলল, ক্যানিং থেকে। আমার গাড়ির কন্ডিশান ভাল নয়, অনেকদিন সারভিসিং করানো হয়নি। আমি আসতে রাজি হইনি, স্যার, কিন্তু এই লোকটা দুশো টাকা অফার করে বলল, এক ঘন্টার মধ্যে বারুইপুর পৌঁছে দিতে হবে।

সন্তু পেছন ফিরে আহত লোকটিকে ভাল করে দেখল। অতি সাধারণ একটা শার্ট আর ধুতি পরা। মুখখানা দেখলেও মনে হয় না যে, এই ধরনের লোক দুশো টাকা দিয়ে জিপ ভাড়া করে এক ঘন্টার মধ্যে বারুইপুর পৌঁছতে চাইবে। সন্তু ভাবল, আহা রে, লোকটা অত তাড়াতাড়ি নিশ্চয়ই কোনও জরুরি কাজে বারুইপুর পৌঁছতে চাইছিল। এখন না বারুইপুরের বদলে স্বর্গে পৌঁছে যায়!

পাঁচ-ছ কিলোমিটার যাবার পরেই রাস্তার ধারে একটা হেলথ সেন্টার চোখে পড়ল। আহত লোকটি আর জিপ-ড্রাইভারকে নামিয়ে দেওয়া হল সেখানে।

কাকাবাবু পকেট থেকে একটা নোটবুক বার করে জিপ-ড্রাইভারকে বললেন, আপনাদের দুজনের নাম আর ঠিকানা এতে লিখে দিন।

জিপ-ড্রাইভারের কাছে কলম-টলম নেই। কিন্তু আহত লোকটির বুক পকেটে একটা ডট পেন রয়েছে, ড্রাইভার সেটা তুলে নিয়ে লিখতে লিখতে বলল, স্যার, আমার নাম সুরেনচন্দ্ৰ সাঁপুই, আমার ঠিকানা লিখে দিচ্ছি, কিন্তু এর নাম তো আমি জানি না। স্যার। আমার সাথে চেনা নেই। স্যার। বলল তো বাসন্তী জাহাজঘাটার কাছে বাড়ি।

কাকাবাবু বললেন, ঠিক আছে।

কাকাবাবুর কালো ব্যাগটার মধ্যে ছোট্ট ক্যামেরা থাকে। সেটা খুলে তিনি আহত লোকটির মুখের কয়েকটা ছবি তুললেন। জিপ ড্রাইভারেরও একটা ছবি নিয়ে বললেন, আচ্ছা, এবার আমরা চলি, অ্যাঁ?

গাড়ি আবার চলতে শুরু করার পর বিমান জিজ্ঞেস করল, কাকাবাবু, আপনি লোক দুটোর ছবি নিলেন কেন?

কাকাবাবু বললেন, অ্যাকসিডেন্ট কেস তো, হয়তো পুলিশ এর পরে আমাদের সাক্ষী দেবার জন্য ডাকতে পারে। লোকদুটোর চেহারা ততদিনে বোধহয় ভুলেই যাব। আচ্ছা, বিমান, যে-লোকটা আহত হয়েছে, তাকে তোমার খুব ইন্টারেস্টিং মনে হল না?

বিমান বলল, কোনদিক দিয়ে বলুন তো?

লোকটির চেহারা বা পোশাক দেখে মনে হয়। সাধারণ একজন গ্রামের লোক। ক্যানিং থেকে ট্রেনে বারুইপুর যেতে দুতিন টাকা লাগে। অথচ লোকটা দুশো টাকা দিয়ে জিপ ভাড়া করে এক ঘন্টার মধ্যে যেতে চেয়েছিল, এটা কি ওকে মানায়?

সন্তু উৎসাহের সঙ্গে বলল, আমার ঠিক এই কথাই মনে হয়েছিল, কাকাবাবু!

বিমান বলল, এমনও তো হতে পারে যে, এখন কোনও ট্রেন নেই ক্যানিং থেকে। ঐ লোকটা কোনও অসুস্থ লোককে দেখতে যাচ্ছে!

কাকাবাবু বললেন, সে রকম যে হতে পারে না তা নয়! তবে, লোকটার নাড়ি দেখবার জন্য আমি বাঁ হাত ধরেছিলাম। সে হাতে একটা ঘড়ি পরা। অত্যন্ত দামী সুইস ঘড়ি। সুন্দরবনের একজন গ্রামের লোকের হাতে এরকম ঘড়ি যেন মানায় না।

সন্তু বলে উঠল, স্মাগলার!

বিমান বলল, গ্রামের কিছু-কিছু লোক কিন্তু খুব বড়লোক হয়! জোতদার না কী যেন বলে তাদের। অনেক সময় আমাদের প্লেনে এরকম কিছু প্যাসেঞ্জার ওঠে, তারা ইংরিজি বলতে পারে না। কোনওরকম আদব-কায়দা জানে না, কিন্তু পকেটে গোছা-গোছা নোট!

কাকাবাবু বললেন, ক্যানিং থানায় গিয়ে ঘটনোটা রিপোর্ট করতে হবে।

সন্তু জিজ্ঞেস করল, বিমানদা, তারপরে কী হল? সেই যে তোমাদের প্লেনটা হাইজ্যাকিং হল…

গল্পে একবার বাধা পড়লে আর ঠিক সেইরকম জমে না।

বিমান বলল, তারপর আমাদের প্লেনটাকে কিউবার দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য করা হল। আমি দাঁড়িয়ে রইলুম ককপিটেই। একজন হাইজ্যাকার টেড স্মিথের ঘাড়ের কাছে রিভলভার উঁচিয়ে রইল। আমার এক-একবার ইচ্ছে করছিল, ছেলেটাকে এক ঘুষি মারি। কিন্তু মেয়েটির হাতে গ্রিনেড, ওটা যদি একবার ছুঁড়ে মারে, তাহলে গোটা প্লেনটাই ধ্বংস হয়ে যাবে আকাশে, তাই সাহস পেলুম না।

কাকাবাবু বললেন, একবার অ্যারিজোনায় এরকম একটা প্লেন ধ্বংস হয়ে সব যাত্রী মারা গিয়েছিল।

বিমান বলল, হ্যাঁ। তারপর আমরা হ্যাভানায় নামলিম। ছাঁ ঘন্টা প্লেনের মধ্যে বসে থাকার পর আমাদের বাইরে যাবার অনুমতি দেওয়া হল। কিউবার সরকার খুব চালাক। হাইজ্যাকারদের সব কাটা শর্ত মেনে নিল, তারপর তারা প্লেন থেকে নেমে আসতেই বন্দী করা হল তাদের। কিউবার সরকার আমাদের ভাল করে খাইয়ে-দাইয়ে আবার ফেরত পাঠিয়ে দিল।

সন্তু বেশ হতাশ হল। সে খানিকটা গুলি-গোলা চালানো, মারামারির গল্প আশা করেছিল। সে বলল, মোটে এই!

রাস্তার দুপাশে বাড়ি-ঘর দেখেই বোঝা গেল ক্যানিং শহর এসে গেছে।

বিমান জিজ্ঞেস করল, ক্যানিং কি বেশ বড় জায়গা?

কাকাবাবু বললেন, এককালে এর নাম ছিল ক্যানিং পোর্ট। এখানে জাহাজ এসে থামত। এখন জাহাজ আসে না বটে, কিন্তু প্রচুর যাত্রী-লঞ্চ ছাড়ে এখান থেকে। শহরটা খুব বড় নয়, তবে জায়গাটার খুব গুরুত্ব আছে। ক্যানিংকে বলা হয় সুন্দরবনের গেটওয়ে।

সন্তু জিজ্ঞেস করল, জায়গাটার নাম ক্যানিং কেন? এখানে কি টিনের কৌটো তৈরি হয়?

কাকাবাবু বললেন, না, সেই ক্যানিং নয়। ব্রিটিশ আমলে ভারতের এক বড়লাট ছিলেন লর্ড ক্যানিং। তার নাম থেকে হয়েছে। সন্দেশ-রসগোল্লা-লেডিকেনির মধ্যে লেডিকেনির নামও হয়েছে। এই লর্ড ক্যানিং-এর বউয়ের নাম থেকে।

বিমান বলল, আচ্ছা কাকাবাবু, একটা কথা আমি তখন থেকে ভাবছি। এই যে খালি লঞ্চটা ভেসে এসেছে, এটা স্পাই কিংবা স্মাগলারদের ব্যাপার। যাই হোক না কেন, তা নিয়ে পুলিশ খোঁজখবর করবে। আপনি তো কখনও এসব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামান না। আপনি তা হলে এত দূরে ছুটে এলেন কেন?

কাকাবাবু বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ, স্মাগলার কিংবা স্পাই ধরা আমার কাজ নয়। তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। আমি এসেছি অন্য কারণে। লঞ্চটা সম্পর্কে আমার একটা অন্যরকম সন্দেহ হচ্ছে, সেটা মিলিয়ে দেখার জন্যই যাচ্ছি।

কী সন্দেহ?

আগে লঞ্চটা দেখি একবার। তারপরে বলব।
ইংরেজ বড়লাটের নামে শহর, তাই সন্তু আশা করেছিল, ক্যানিং বেশ সাজানো-গোছানো, সুন্দর, ছিমছাম জায়গা হবে। গাড়িটাকে একটা পেট্রোল পাম্পে রেখে ওরা খানিকটা হটবার পরেই বোঝা গেল, সেরকম কিছুই না। বেশ নোংরা আর ঘিঞ্জি শহর, কাদা-প্যাচপেচে ভাঙ রাস্তা, তার দু পাশে অসংখ্য ছোট-ছোট দোকান। সব জায়গায় কেমন যেন আঁশটে গন্ধ!

রাস্তার কাদায় কাকাবাবুর ক্রাচ বসে যাচ্ছে বলে তাঁর হাঁটুতে অসুবিধে হচ্ছে। তিনি বললেন, বছর সাতেক আগে আমি শেষবার ক্যানিং এসেছিলুম, তার চেয়েও জায়গাটা আরও খারাপ হয়ে গেছে। তবে, লঞ্চে ওঠার পর তোমাদের ভাল লাগবে। তার আগে থানাটা কোথায় চলো খোঁজ করা যাক।

লোকজনকে জিজ্ঞেস করে ওরা থানায় পৌঁছে গেল।

কাকাবাবু জিপগাড়ি আর গোরুর গাড়ির দুর্ঘটনার কথা জানালেন। থানার বড় দারোগা বললেন যে, তিনি একটু আগেই টেলিফোনে ঘটনাটা জানতে পেরেছেন। ছোট দারোগাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে।

একটা খাতা টেনে নিয়ে বড় দারোগা বললেন, যাই হোক, আপনাদের নাম-ঠিকানা লিখে দিয়ে যান। পরে দরকার হতে পারে। উণ্ডেড লোকটাকে আপনারা ভর্তি করে দিয়েছেন তো?

সেই খাতায় নাম-টাম লিখে দেবার পর কাকাবাবু বললেন, দারোগীবাবু, আপনাকে আর-একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই। বিদেশি যে-লঞ্চটা সমুদ্রে ভেসে এসেছে, সেটা এখন কোথায় আছে?

ভদ্রলোক চোখ তুলে কাকাবাবুকে একবার আপাদমস্তক দেখলেন। তারপর কড়া গলায় বললেন, কেন, সেটা আপনি জানতে চাইছেন কেন?

কাকাবাবু বললেন, একবার সেই লঞ্চটা একটু দেখতে চাই।

কেন? আপনারা কি কাগজের রিপোটার?

আজ্ঞে না। এমনই একটা কৌতূহল।

সেই লঞ্চটা দেখবার জন্য আপনারা কলকাতা থেকে এসেছেন?

হ্যাঁ।

এই কৌতূহলের কারণ জানতে পারি কি?

একটা বিদেশি লঞ্চ সমুদ্র দিয়ে ভাসতে ভাসতে চলে এসেছে, সেটা দেখার জন্য তো কৌতূহল হতেই পারে, তাই না? লঞ্চটা দেখার কি কোনও বারণ আছে? অনেকেই তো দেখেছে, কাগজে কাগজে ছবি পর্যন্ত বেরিয়ে গেছে!

দারোগাবাবু কাকাবাবুর মুখের দিকে আর একবার ভাল করে দেখে নিয়ে বললেন, আপনার কী নাম বললেন? রাজা রায়চৌধুরী…মানে…সেই সবুজ দ্বীপের রাজা নামে বইটায়…

সন্তু পাশ থেকে বলে উঠল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ইনি সেই কাকাবাবু!

দারোগা আমনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ও, তাই বলুন! আমার প্রথম থেকেই মনে হয়েছিল…আপনার কত বড় বড় লোকের সঙ্গে চেনা…আপনি ইচ্ছে করলেই…কী খাবেন, স্যার, বলুন! চা? ডাবের জল?

কাকাবাবু বললেন, এখন কিছু খাব না। লঞ্চটা কোথায় আছে বলুন, আমাদের আজ রাতের মধ্যেই ফিরতে হবে।

বসুন, স্যার, বসুন আপনারা! একটু চা অন্তত খান। আমি সব বুঝিয়ে দিচ্ছি। সুন্দরবন অঞ্চলটা ভাল করে চেনেন কি? নইলে বুঝতে পারবেন না!

বড় দারোগা একটা ম্যাপ বিছিয়ে ফেললেন টেবিলের ওপরে।

একটা পেন্সিলের উল্টোপিঠ দিয়ে বোঝাতে লাগলেন, এই যে দেখুন, ক্যানিং, আপনারা এখানে আছেন। তারপর বাসন্তী, তারপর এই গোসাবা। এখান থেকেই আসল সুন্দরবনের শুরু। জঙ্গলের পাশ দিয়ে এই চলে গেছে দত্তর গাঙ, সেটা গিয়ে পড়েছে হরিণভাঙা নদীতে। এদিকে দুপাশেই গভীর জঙ্গল কিন্তু। হরিণভাঙা নদী এখানে অনেক চওড়া হয়ে গিয়ে সমুদ্রে পড়ল। এ পাশটায় বাঘমারা ফরেস্ট। এইখানটায় এসে আটকে ছিল লঞ্চটা।

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, আটকে ছিল বলছেন কেন? এখন নেই?

লঞ্চটাকে ওখান থেকে গোসাবায় নিয়ে আসার কথা। এর মধ্যে পৌঁছে গেছে কি না সে খবর আমরা পাইনি। আপনারা এক কাজ করুন। পুলিশের একটা লঞ্চ যাচ্ছে ওদিকে। কলকাতা থেকে দুজন বড় অফিসার এসেছেন। মিঃ ভট্টাচার্যি আর মিঃ খান, তাঁরা যাচ্ছেন এস. পি. সাহেবের লঞ্চে। আপনার নাম শুনলে নিশ্চয়ই নিয়ে যাবেন ওঁরা।

কাকাবাবু বললেন, ভটচার্যি মানে…অ্যাডিশনাল আই. জি.?

হ্যাঁ, হ্যাঁ!

ওঁকে আমি ভাল করেই চিনি। তা হলে ওঁদের লঞ্চে গেলেই তো ভাল হয়!

এক্ষুনি জেটিঘাটে চলে যান স্যার। ওঁদের লঞ্চ তাড়াতাড়ি ছাড়বে। মানে, আমারও তো জেটিঘাটে যাবার কথা ছিল, বুঝলেন না, বড়সাহেবরা সব এসেছেন, কিন্তু আমার কলেরার মতন হয়েছে, প্ৰতি দশ মিনিট অন্তর বাথরুমে.সেইজন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি…

থানা থেকে বেরিয়ে ওরা রওনা দিল জেটিঘাটের দিকে। কাকাবাবু বললেন, আমি তো আর এ-রাস্তায় তেমন তাড়াতাড়ি যেতে পারব না। বিমান, তুমি আর সন্তু আগে আগে চলে যাও। পুলিশের লঞ্চ ছেড়ে চলে যেতে পারে। তোমরা গিয়ে আমার নাম করে একটু অপেক্ষা করতে বলো?

বিমান আর সন্তু ছুটি লাগাল। ওরা তো চেনে না, তাই লোককে জিজ্ঞেস করতে লাগল জেটিঘটি কোন দিকে। এমন সরু আর পিছল রাস্তা, তাতেও বেশ ভিড়। রাস্তােটা বড় পুকুরের পাশ দিয়ে নদীর ধারে বাঁধের উপর উঠেছে। এই বাঁধের ওপর দিয়ে আবার অনেকটা যেতে হয়।

জেটিঘাটের কাছে অনেকগুলো লঞ্চ দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে কোনটা যে পুলিশের লঞ্চ, তা বোঝবার উপায় নেই।

টিকিট ঘরের কাছে গিয়ে বিমান জিজ্ঞেস করল, পুলিশের লঞ্চ কখন ছাড়বে বলতে পারেন?

টিকিটবাবুটি গোমড়া মুখে প্রায় ধমক দিয়ে উত্তর দিল, পুলিশের লঞ্চ কখন ছাড়বে, তার আমি কী জানি! বন-বালা ছাড়বে পাঁচ মিনিটের মধ্যে, যদি টিকিট কাটতে চান তো বলুন!

বিমান বলল, না, আমাদের পুলিশের লঞ্চটাই দরকার। সেটা কোনখানে আছে, একটু দেখিয়ে দেবেন?

লোকটি বলল, আচ্ছা মুশকিল তো! আমি পুলিশের লঞ্চের খোঁজ রাখতে যাব কোন দুঃখে? আমি কি চোর না ডাকাত?

সন্তু এগিয়ে গেছে। জলের দিকে। তারই বয়েসি একটি ছেলে মাথায় করে কোনও যাত্রীর সুটকেস বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তার পাশে গিয়ে সন্তু জিজ্ঞেস করল, ভাই, বলতে পারো, এর মধ্যে পুলিশের লঞ্চ কোনটা?

ছেলেটি থেমে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর বলল, হেথা নাই গো বাবু!

তারপর নদীর মাঝখানে একটা চলন্ত লঞ্চ দেখতে পেয়ে আবার বলল, হুই যে পুলিশের লঞ্চ। হুই যে যায়, মন-পবন।

বিমান ততক্ষণে সেখানে চলে এসেছে। ছেলেটির কথা শুনে সে বলল, এই রে, ছেড়ে চলে গেছে? কী হবে! লঞ্চটাকে থামানো যায় না?

মালবাহক ছেলেটি বলল, কোন যাবে না? আপনি বন-বালার সারেঙসাহেবকে গিয়ে বলেন না, হুইসিল বাজিয়ে থামিয়ে দেবে?

সারেঙকে এখন কোথায় পাব?

ঐ যে ডেকের উপরে চেক-লুঙ্গি পরে দাঁড়িয়ে আছে। উনিই তো সারেঙ সাহেব!

লঞ্চের ওপর থেকে একটা লম্বা কাঠের পাটাতন ফেলে দেওয়া হয়েছে। জেটির ওপর। একজন লোক পাশে একটা বাঁশ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সেই বাঁশ ধরে, পাটাতনের সিঁড়ি দিয়ে লঞ্চে উঠতে হয়।

বিমান সেই পাটাতনের সিঁড়ির কাছে গিয়ে চেক-লুঙ্গি-পরা লোকটিকে ডেকে বলল, সারেঙসাহেব, হুইস্ল বাজিয়ে ঐ পুলিশের লঞ্চটা থামাবেন? আমাদের বিশেষ দরকার।

গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরা সারেঙসাহেব একমনে গোঁফে তা দিচ্ছিলেন, বিমানের কথাটা শুনে একটা অদ্ভুত হাসি দিয়ে বললেন, অ্যাঁ? কী বললেন, পুলিশের লঞ্চ থামাব? কেন? কোথাও ডাকাতি হয়েছে?

বিমান একটু থতমত খেয়ে গিয়ে বলল, না, মানে সেসব কিছু নয়, এমনিই আমাদের খুব দরকার

সারেঙসাহেব বললেন, আপনার দরকার হয়, আপনি নিজেই হাঁক পাড়ুন। আমায় এর মধ্যে জড়াচ্ছেন কেন?

তারপর সারেঙসাহেব। আর একখানা অবজ্ঞার হাসি দিয়ে ঢুকে গেলেন নিজের কেবিনে। পুলিশের লঞ্চ মন-পবন ততক্ষণে আরো দূরে চলে গেছে।

নিরাশ হয়ে সন্তু আর বিমান এল টিকিটঘরের দিকে।

বিমান বলল, আমি প্লেন চালাই আর এই সারেঙ সামান্য একটা লঞ্চ চালায়, কিন্তু সারেঙের কীরকম পাসোনালিটি দেখলি? আমাকে একেবারে আউট করে দিল।

সন্তু বলল, সারেঙসাহেবের গোঁফটা দেখেছি? ঠিক কাকাবাবুর মতন!

টিকিটঘরের ছোকরা বাবুট বলল, আপনারা কি বন-বালায় যাবেন? নইলে এখান থেকে একটু সরে দাঁড়ান।

বিমান বলল, কী ব্যাপার রে সন্তু? এখানে সবাই যে ধমকে কথা বলে।

সন্তু জিজ্ঞেস করল, এর পরের লঞ্চ আবার কখন ছাড়বে?

আবার আড়াই ঘন্টা বাদে। আমি এক্ষুনি কাউন্টার বন্ধ করে দিচ্ছি।

বন-বালা লঞ্চ ছাড়ার টং টং শব্দ হল। পাটাতনের সিঁড়িও তুলে নেওয়া হল ওপরে।

সন্তু বলল, এই রে, কাকাবাবু তো এখনও এলেন না? তা হলে কি আমাদের এখানে আড়াই ঘন্টা বসে থাকতে হবে?

দূরে বাঁধের ওপর দেখা গেল কাকাবাবু আস্তে আস্তে আসছেন। বাঁধের ওপরেও মাঝে মাঝে কাদা জমে আছে, ক্র্যাচ ফেলার খুবই অসুবিধে।

বিমান টিকিটবাবুকে বলল, না, না, আমাদের এটাতেই যেতে হবে। আপনি বন-বালাকে একটু থামান অন্তত

টিকিটবাবু বলল, বন-বালাকে থামাব? কেন?

বিমান বলল, একজন লোক ঐ যে আসছেন। তাঁকে এটাতেই যেতে হবে!

একজন লোক আসছে বলে আমায় লঞ্চ লেট করাতে হবে? এ কি আবদার পেয়েছেন?

সন্তু বলল, একজন তো নয়, তিনজন। উনি এসে পৌঁছলে আমরাও যাব।

ও, তিনজন। তাই বলুন! তিনজনের জন্য থামানো যেতে পারে!

এই বলে টিকিটবাবু একটা হুইসলফ-র-র-র করে বাজালেন বেশ জোরে। বন-বালা। ততক্ষণে জেটি ছেড়ে গেছে। আবার ঘ্যাস-ঘ্যাস, টং-টাং শব্দ করে ধারে ভিড়ল।

কাকাবাবু এসে পৌঁছতেই সব কথা জানাল বিমান। কাকাবাবু বিশেষ বিচলিত হলেন না। তিনি বললেন, কী আর করা যাবে, এই লঞ্চেই গোসাবা পর্যন্ত যাওয়া যাক।

পকেট থেকে টাকা বার করে তিনি সন্তুকে দিয়ে বললেন, তিনখানা টিকিট কেটে নে?

পাটাতনের সিঁড়ি দিয়ে সন্তু লঞ্চে উঠে গেল সহজেই। বিমানেরও কোনও অসুবিধে হল না। মুশকিল হল কাকাবাবুকে নিয়ে। অত সরু পাটাতনের ওপর ক্র্যাচ ফেলা মুশকিল, তার ওপর আবার এক হাতে বাঁশের রেলিং ধরে ব্যালান্স রাখতে হবে। একটু এদিক-ওদিক হলেই নীচের জলকাদার মধ্যে ধপাস।

কাকাবাবু কী করে ওঠেন, সেটা দেখার জন্য একদল যাত্রী ডেকের ওপর ভিড় করে এল। যেন এটা একটা মজার ব্যাপার।

কাকাবাবু পাটাতনের ওপর এক পা দিয়ে একটুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ক্র্যাচ দুটো লঞ্চের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, সন্তু, ধর!

এবারে তিনি এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে সেই সিঁড়ি দিয়ে চলে এলেন।

একদল যাত্রী হাততালি দিয়ে উঠল। যেন এটা একটা সার্কাসের খেলা।

সন্তুর খুব রাগ হয়ে গেল। কিন্তু কিছু বলাও যায় না।

লঞ্চটা একেবারে যাত্রীতে ঠাসা। একতলায় একটুও জায়গা নেই। ছাদের ওপরে খোলা জায়গায় রোদ্দুরের মধ্যে ওদের দাঁড়িয়ে থাকতে হল। বিমান একটু চলে গেল সারেঙসাহেবের কেবিনের দিকে, তাঁর সঙ্গে ভাবি জমাতে, আর এই সুযোগে কাকাবাবুর চোখের আড়ালে গিয়ে একটা সিগারেট টানতে।

সন্তু জিজ্ঞেস করল, কাকাবাবু, এটা কী নদী?

কাকাবাবু বললেন, এই নদীর নাম মাতলা। এক সময় খুব বিরাট আর দুদন্তি নদী ছিল। এখন মাঝখানে চড়া পড়ে গেছে! সব নদীগুলোরই অবস্থা এখন কাহিল।

পারের দিকে একটা পুরনো আমলের মস্ত বড় বাড়ির দিকে আঙুল তুলে কাকাবাবু বললেন, ঐ যে বাড়িটা দেখছিস, ওটা ছিল হামিলটন সাহেবের কাছারিবাড়ি। হ্যামিলটন সাহেব ছিলেন জমিদার, সুন্দরবনের এদিককার অনেক উন্নতি করেছেন। গোসাবায় গিয়ে আরও দেখতে পাবি।

বিমান ফিরে এসে বলল, সারেঙসাহেবের নাম হাসান মিজা। আমায় কোনও পাত্তাই দিল না। আমি বললুম, আমি প্লেন চালাতে জানি, আমার একটু লঞ্চ চালাতে শিখিয়ে দেবেন? তা শুনে মিজাসাহেব বললেন, আপনার পেট গরম হয়েছে আপনি চা খাওয়া একদম বন্ধ করে দিন। সকালবেলা কুলখ ভিজিয়ে খান? কুলখ কলাইকী জিনিস, কাকাবাবু?

কাকাবাবু খুব হাসতে লাগলেন।

সন্তু বলল, বিমানদা, তুমি প্লেন চালাও শুনে সারেঙ ভেবেছে তুমি গুল মারছ, কিংবা পাগল হয়ে গেছ?

বিমান বলল, কী ঝঞ্ঝাট! যারা চালায়, তারা বুঝি সুন্দরবনে বেড়াতে আসতে পারে না? আর সুন্দরবনে বেড়াতে এলে তো এই সব লঞ্চেই চাপতে হবে।

তারপরেই নদীর দুধারে তাকিয়ে বিমান বলল, কই, জঙ্গল দেখতে পাচ্ছি না তো!

কাকাবাবু বললেন, আসল জঙ্গল এখনও অনেক দূর! তবে মাঝে-মাঝে এমনি জঙ্গল দেখতে পাবে।

বিমান বলল, বেশ লাগছে কিন্তু। ভাগ্যিস এসেছিলুম। আপনাদের সঙ্গে! সেই কলেজে পড়ার সময় একবার গঙ্গায় চেপেছিলুম, তারপর আর কখনও লঞ্চে করে বেড়াইনি।

সন্তু বলল, তুমি আজ সুন্দরবনের নদীতে বেড়াচ্ছ, আবার দুদিন বাদেই নিউ ইয়র্কে চলে যাবে। তোমার বেশ মজা, না বিমানদা?

বিমান বলল, রোজ রোজ প্লেন চালাতে আর অত ভাল লাগে না রে! নিউ ইয়র্কে আমি অন্তত একশো বার গেছি। তার চেয়ে এই বাড়ির কাছেই নতুন জায়গায় বেড়াতে বেশি ভাল লাগছে।

কাকাবাবু বললেন, সন্তু, তুই এক কাজ কর তো। এখানে না দাঁড়িয়ে তুই বরং সারা লঞ্চটা একবার টহল দিয়ে আয়। যদি কোথাও শুনিস যে, লোকেরা সেই বিদেশি লঞ্চটা নিয়ে আলোচনা করছে, তাহলে মন দিয়ে শুনবি।

সন্তু চলে যেতেই গেরুয়া কাপড় আর গেরুয়া পাঞ্জাবি পরা, মুখে কাঁচাপাকা দাড়িওয়ালা একজন লোক কাকাবাবুর সামনে এসে দাঁড়াল। দু হাত তুলে বলল, নমস্কার, রায়চৌধুরী মশাই! এদিকে কোথায় চললেন?

কাকাবাবু বেশ অবাক হলেন। ভুরু কুঁচকে বললেন, আপনাকে চিনতে পারলুম না তো! আপনিই বা আমায় কী করে চিনলেন? আপনি কে?

লোকটি বলল, আমার নাম ছোট সাধু। আমার আর অন্য কোনও নাম নেই। আমার বাবাকে সবাই বলত বড় সাধু, সেই হিসেবে আমি ছোট সাধু।

আপনি আমায় চেনেন? আপনাকে কখনও দেখেছি বলে তো মনে হয়।!

আপনি আমায় মনে রাখেননি। কিন্তু আমি মনে রেখেছি। আপনি খোঁড়া মানুষ, আপনাকে একবার দেখলেই চেহারাটা মনে থাকে।

বিমান বিরক্ত হয়ে সাধুটির দিকে তাকাল। সত্যিকারের খোঁড়া লোককে কেউ মুখের ওপর খোঁড়া বলে? এ আবার কী রকমের সাধু?

কাকাবাবু, কিন্তু না রেগে গিয়ে হাসলেন। লোকটির চোখের উপর চোখ রেখে বললেন, হ্যাঁ, আমাকে একবার দেখলে মনে রাখা সহজ। কিন্তু আমারও তো স্মৃতিশক্তি খারাপ নয়। মানুষের মুখ আমি চট করে ভুলি না। আপনার সঙ্গে আমার কোথায় দেখা হয়েছিল, বলুন তো?

কথাটার উত্তর না দিয়ে ছোট সাধু এদিক-ওদিক তাকালেন। আরও অনেক লোক কাকাবাবুর দিকে কৌতূহলী চোখে চেয়ে আছে। লঞ্চের যাত্রীরা আর-সবাই স্থানীয় লোক, কাকাবাবু আর বিমানকে দেখলেই বোঝা যায়, ওঁরা কলকাতা থেকে এসেছেন।

অন্যরা যাতে শুনতে না পায় এই জন্য ছোট সাধু কাকাবাবুর কানের কাছে মুখ এনে ফিস ফিস করে বললেন, জেলখানায়! ব্যাস, ও সম্বন্ধে আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। আপনি কি রাঙাবেলের মাস্টারবাবুর কাছে যাচ্ছেন? তা হলে আমার আশ্রমে একবার আসবেন। আমিও রাঙাবেলেতেই থাকি।

এই সময় একটা বাচ্চা ছেলে এসে বিমানের জামা ধরে টেনে বলল, ও দাদা, সারেঙসাহেব আপনাকে ডাকছেন।

বিমান ছেলেটির সঙ্গে চলে গেল।

ছোট সাধু বললেন, রায়চৌধুরীসাহেব, আপনার মতন মানুষ এই রকম সাধারণ লঞ্চে যাচ্ছেন কেন? আপনি চাইলেই গবরমেন্টের এসপেশাল বোট পেতে পারতেন। এই ভিড়ের মধ্যে আপনার কষ্ট হচ্ছে।

কাকাবাবু বললেন, কিসের কষ্ট? তবে একটু বসতে পারলে ভালহ লগত। গোসাবা যেতে কতক্ষণ লাগবে?

তা ধরেন, তিন সাড়ে-তিন ঘন্টা তো বটেই। এদিকে থাকবেন বুঝি কিছুদিন?

না, আজই রাতে ফিরব।

আজ আপনার ফেরা হবে না।

তার মানে? কেন ফেরা হবে না?

আপনারা তো সাধু-সন্ন্যাসীতে বিশ্বাস করেন না। কিন্তু দেখবেন, আমার কথাটা ফলে কি না। আজ আপনি ফিরতে পারবেন না।

আমি রাঙাবেলিয়া যাচ্ছি না। শুধু গোসাবা পর্যন্ত যাব।

দেখুন কী হয়।

বিমান ফিরে এসে উত্তেজিতভাবে বলল, আমাদের খুব গুড লাক, কাকাবাবু, পুলিশের লঞ্চটা মাঝ-নদীতে দাঁড়িয়ে পড়েছে। এখন এই লঞ্চটা ওর পাশে ভিড়তে পারে। সারেঙসাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, পুলিশের কর্তারা আমাদের চিনতে পারবেন তো?

কাকাবাবু বললেন, অ্যাডিশনাল আই. জি. রণবীর ভট্টাচাৰ্য আছেন ঐ লঞ্চে, তিনি আমায় ভালই চেনেন।

একটু বাদেই দুটো লঞ্চ পাশাপাশি হয়ে গেল। পুলিশের লঞ্চের ওপরের ডেকটা একদম খালি, শুধু সারেঙ-এর পাশে বসে আছে। একজন পুলিশ অফিসার।

কাকাবাবু সেই পুলিশটিকে চেঁচিয়ে বললেন, রণবীর ভট্টাচার্যকে বলুন, আমার নাম রাজা রায়চৌধুরী। খুব জরুরি দরকারে এক্ষুনি তাঁর সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই।

পুলিশটি জিজ্ঞেস করল, আপনি কি খবরের কাগজের লোক? গোসাবায় গিয়ে দেখা করবেন। সাহেব এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন!

কাকাবাবু ধমক দিয়ে বললেন, আপনার সাহেবকে গিয়ে আমার নামটা বলুন! এখন বেলা এগারোটা বাজে, এখন বিশ্রাম নেবার সময় নয়।

এই লঞ্চের কিছু লোক এই কথায় হেসে উঠল। ঐ লঞ্চের ভেতর থেকে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এলেন একজন খুব লম্বা মানুষ। নীল রঙের প্যান্ট সাদা হাওয়াই শার্ট পরা। মুখের ভাব দেখলেই বোঝা যায় তিনি একজন বড় অফিসার।

মুখে সরাসরি রোদ পড়েছে বলে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে তিনি বললেন, কী হয়েছে? আরে, কে? কাকাবাবু নাকি? আপনি এখানে…চলে আসুন, চলে আসুন, এই লঞ্চে চলে আসুন।

দুটো লঞ্চ একেবারে গায়ে-গায়ে ঘেঁষে দাঁড়াল। সন্তু ততক্ষণে উঠে এসেছে ওপরে। একে একে ওরা যেতে লাগল। অন্য লঞ্চটাতে। কাকাবাবু ছোট সাধুকে বললেন, চলুন, আপনিও আমাদের সঙ্গে চলুন।

ছোট সাধু হঠাৎ যেন ভয় পেয়ে বললেন, না, না, আমি কেন যাব!

কাকাবাবু বললেন, আপনি গোসাবা পর্যন্ত যাবেন তো? ঐ লঞ্চটা আগে পৌঁছবে, সেখানে আপনাকে নামিয়ে দেব। আপনার সঙ্গে গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে।

গোসাবায় না, আমি আগে বাসন্তীতে নামব, সেখানে আমার অন্য কাজ আছে।

বেশ তো সেখানেই আপনাকে নামিয়ে দেওয়া যাবে।

না, তার দরকার নেই। আমি এই লঞ্চেই নিয়মিত যাই, সবাই আমায় চেনে–

কাকাবাবু ছোট সাধুর কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরে বললেন, চলুন, চলুন, আপনার সঙ্গে আমার কথা আছে?

খুব অনিচ্ছার সঙ্গেই ছোট সাধু এলেন পুলিশের লঞ্চে। অন্য লঞ্চটা আবার দূরে চলে গেল।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য হাসতে হাসতে কাকাবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, মহাকাশ থেকে কোনও উল্কা সুন্দরবনে খসে পড়েছে। নাকি? কিংবা জঙ্গলের মধ্যে কোথাও কণিষ্কর মুণ্ডু পাওয়া গেল? নইলে আপনি এদিকে.

কাকাবাবু বললেন, এদের নিয়ে সুন্দরবনে বেড়াতে এসেছি। সন্তুকে তো তুমি চেনো, আর এ হচ্ছে বিমান, আমাদের পাড়ার ছেলে। আর এই সাধুটির সঙ্গে নতুন পরিচয় হল।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, চলুন, চলুন, নীচে চলুন, ওপরে যা রোদ।

বিমান জিজ্ঞেস করল, আপনাদের লঞ্চটা হঠাৎ থেমে গেল কেন?

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, একটা মাছ ধরার নৌকে যাচ্ছিল, তাতে বেশ বড় বড় পার্শে মাছ রয়েছে। তাই আমি খালাসিদের বললুম, নৌকোটাকে ডেকে দুতিন কিলো মাছ কিনে নাও। এরকম টাটকা মাছ তো কলকাতায় পাওয়া যায় না।

বিমান বলল, ভাগ্যিস লঞ্চটা থেমেছিল, নইলে তো আপনাদের ধরতেই পারতুম না!

নীচে একটা টেবিলের চারপাশে অনেকগুলো চেয়ার। সেখানে আরও দুজন পুলিশ অফিসার বসে আছেন। টেবিলের ওপর তাস বেছানো। তিনজন খেলোয়াড়, অথচ চার জায়গায় তাস দেওয়া হয়েছে।

রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, আমরা কাটগ্রেট ব্রিজ খেলছিলুম। আপনার গলা শুনে আমি ওপরে উঠে গেলুম। ইনি হলেন চব্বিশ পরগনার এস. পি আকবর খান, ইনি এখানকার এস. ডি. পি. ও. প্রশান্ত দত্ত। আর ইনি কাকাবাবু, তোমরা চেনো তো? কাকাবাবুর নাম রাজা রায়চৌধুরী, কিন্তু এখন তো সবাই কাকাবাবু বলেই ডাকে। আমি দিল্লি গিয়েছিলুম, হোম সেক্রেটারি পর্যন্ত জিজ্ঞেস করলেন, কাকাবাবু কেমন আছেন? কনভে মাই রিগার্ডস টু হিম!

অন্য দুজনের মধ্যে আকবর খানকেই শুধু জাঁদরেল পুলিশ সাহেবের মতন দেখতে। ফসর্গ রং, মুখে পাকানো গোঁফ আর খুব শক্তিশালী চেহারা। রণবীর ভট্টাচার্যকে দেখলে কিন্তু পুলিশের কতা বলে মনেই হয় না, মনে হয় যেন কোনও কলেজের প্রফেসার। আর প্রশান্ত দত্তের বয়েস অন্য দুজনের তুলনায় বেশ কম, মনে হয় ক্রিকেট-খেলোয়াড়।

ছোট সাধুর দিকে তাকিয়ে প্রশান্ত দত্ত কাকাবাবুকে জিজ্ঞেস করল, একে আপনি কোথায় পেলেন? আগে থেকে চিনতেন?

কাকাবাবু বললেন, আমি চিনি না, কিন্তু ইনি আমাকে চেনেন বললেন। এবার বলুন তো, সাধুমহারাজ, আপনার সঙ্গে আমার জেলখানায় কেন দেখা হয়েছিল? আপনি জেলখানায় কী করছিলেন? আমিই বা সেখানে গিয়েছিলুম কেন?

ছোট সাধু বললেন, সে প্রায় সাত-আট বছর আগেকার কথা। আমি তখনও সাধু হইনি, একটু অন্য লাইনে গিয়েছিলুম। এখন আর স্বীকার করতে লজ্জা নেই, চুরি-জোচুরিতে হাত পাকিয়েছিলুম। অসৎ সঙ্গে পড়লে যা হয়! ছ। মাস জেল খেটে শায়েস্তা হয়ে গেছি। তারপর থেকেই ধর্মে-কর্মে মন দিয়েছি। দেখুন স্যার, ঋষি বাল্মীকিও তো আগে ডাকাত ছিলেন, পরে সাধু হন।

রণবীর ভট্টাচার্য হো-হো করে হেসে উঠে বললেন, বাঃ! বাঃ! তা আপনিও কি এখন রামায়ণের মতন কোনও কাব্য-টাব্য লিখছেন নাকি?

ছোট সাধু বললেন, না, স্যার! অত বিদ্যে আমার নেই। তবে ভগবান আমাকে দয়া করেছেন। স্বপ্নে আমি একটা ওষুধ পেয়েছি, সেই ওষুধে যাবতীয় পেটের রোগ নিঘাত সেরে যায়। এই এলাকার অনেক লোক আমার কাছে ওষুধ নিতে আসে।

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোন জেলে ছিলেন? সেখানে আপনার সঙ্গে আমার দেখা হল কী করে?

ছোট সাধু বললেন, আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। সেখানে শোভনলাল বলে একজন ফাঁসির আসামী ছিল। ফাঁসির আগের দিন সে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিল। আপনি দেখা করতে গিয়েছিলেন। শোভনলাল আপনার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদল খুব। অতবড় একজন দুদন্তি খুনে যার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদে, সেই মানুষকে কি ভোলা যায়? সেইজন্যই আপনার কথা আমার মনে আছে।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, ও, সেই শোভনলালের কেস? সে আপনাকেও খুন করতে গিয়েছিল না, কাকাবাবু?

কাকাবাবু ছোট সাধুকে বললেন, তা। আপনি জেল থেকে ছাড়া পাবার পরেই সাধু হয়ে গেলেন?

ছোট সাধু বললেন, আঞ্জে হ্যাঁ স্যার। বিশ্বাস করুন, তারপর আর আমি কোনওদিন খারাপ লাইনে যাইনি। তাছাড়া আমার বাবাও স্বর্গে গেলেন, আমাকে আশ্রমের ভার নিতে হল।

প্রশান্ত দত্ত বলল, এই সাধু সম্পর্কে আমার কাছে কিন্তু অন্যরকম রিপোর্ট আছে। সুন্দরবনের দিককার বড় বড় স্মাগলাররা গভীর রাত্রে এই সাধুর আশ্রমে যাতায়াত করে। তারা কেন আসে বলুন তো!

আকবর খান বললেন, হ্যাঁ, আমিও শুনেছি এর কথা।

ছোট সাধু বললেন, তারা পেটের রোগের ওষুধ নিতে আসে, স্যার। যে আসে, তাকেই দিই। তাদের মধ্যে কে স্মাগলার আর কে ভাল লোক তা আমি কী করে চিনব বলুন তো?

প্রশান্ত দত্ত বলল, আপনি প্রত্যেক সপ্তাহে দু তিনবার কলকাতায় যান, সে খবরও পেয়েছি। আশ্রম ছেড়ে এত ঘনঘন কলকাতায় যান কেন আপনি?

আমার ওষুধ বানাবার জন্য মালপত্র কিনতে যেতে হয়। অনেক রকম গাছের শেকড় লাগে, সেগুলো কলকাতা ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।

সেজন্য সপ্তাহে দু তিনবার যেতে হয়? আজও কলকাতা থেকে ফিরছেন?

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, আরে, আমারও তো নানান রকম পেটের রোগ, কোনও ওষুধেই সারে না। এবারে তাহলে আপনার ওষুধ খাব। দিন দেখি, সাধুবাবা, আমায় কিছু ওষুধ দিন।

ওষুধ তো সঙ্গে নেই, স্যার নেই?

তাহলে কলকাতা থেকে কী সব গাছের শেকড়-বাকড় কিনে আনলেন, সেগুলো একটু দেখান তো! কবিরাজি ওষুধের ওপর আমার খুব বিশ্বাস আছে। কই, দেখান?

ছোট সাধু আমতা আমতা করে বললেন, না, স্যার, এবারে কোনও শেকড়-বাকড় আনিনি। হাতিবাগান বাজারে একটা দোকানে অর্ডার দিয়ে এসেছি, পরের বার গিয়ে নেব।

আপনার জামাটা একবার খুলুন তো!

রণবীর ভট্টাচার্যের হঠাৎ এই কথায় ছোট সাধু একেবারে হকচকিয়ে গেলেন। ভুরু দুটো কপালে তুলে বললেন, কী বলছেন স্যার, জামা খুলিব? কেন?

রণবীর ভট্টাচার্য হাসিমুখে বললেন, আরে, খুলুন না মশাই, দেখি, আপনার স্বাস্থ্যখানা কেমন! জানো প্রশান্ত, সাধুদের স্বাস্থ্য খুব ভাল হয়। ভাল ঘি-দুধ খায় তো! কই, খুলুন, খুলুন।

ছোট সাধু বললেন, দেখুন, স্যার, আমি এই লঞ্চে আসতে চাইনি। রায়চৌধুরীসাহেব আমাকে জোর করে ধরে নিয়ে এলেন। তা বলে আপনারা আমাকে হুকুম দিয়ে জামা খোলাবেন? এ ভারী অন্যায়!

রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, হুকুম দিলাম কোথায়? জামাটা খুলবেন, আপনার বুকের ছাতির মাপটা একটু দেখব। এতেই আপনার আপত্তি?

ছোট সাধু বললেন, হ্যাঁ স্যার, আমার আপত্তি আছে। বাসন্তী বোধহয় এসে গেল, আমায় সেখানে নামিয়ে দিন।

আকবর খানের চেয়ারের পায়ের কাছে একটা কাল রঙের ছোট সুটকেস রয়েছে। সেটা তিনি তুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। সুটকেসটি খুলে তার মধ্য থেকে একটা রিভলভার বার করে প্রথমে নলটায় দুবার ফুঁ দিলেন, তারপর সেটা সোজা ছোট সাধুর কপালের দিকে তাক করে খুব ঠাণ্ডাভাবে বললেন, শুনুন, সাধুবাবা, একখানা গুলি ছুঁড়লেই আপনি অক্কা পাবেন। তারপর আপনার ডেডবডিটা জলে ফেলে দেব। এখন ভাটার সময়। জলের টানে আপনার বডিটা সোজা চলে যাবে। কেউ কোনওদিন কিছু জানতেও পারবে না। সেটা আপনি চান, না জামাটা খুলবেন?

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, আরো আকবর, তুমি শুধু শুধু সাধুবাবাকে ভয় দেখাচ্ছ। উনি এমনিতেই খুলবেন জামাটা। কী, তাই না?

কাকাবাবু বললেন, কী কুক্ষণেই আপনি যেচে আজ আমার সঙ্গে আলাপ করতে এসেছিলেন! নইলে আপনাকে এরকম বিপদে পড়তে হত না। আর উপায় নেই, এবারে জামাটা খুলে ফেলুন!

কাকাবাবুর দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে ছোট সাধু আস্তে আস্তে জমাটা খুলে ফেললেন। তখন দেখা গেল, তাঁর সারা বুকে ব্যাণ্ডেজ জড়ানো।

এবারে প্রশান্ত দত্ত উঠে গিয়ে সেই ব্যাণ্ডেজ ধরে এক টান দিতেই তার ভেতর থেকে ঝরঝর করে ঝরে পড়তে লাগল একশো টাকার নোট।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, প্রশান্ত, টাকাগুলো গুনে রাখো কত আছে।

তারপর সন্তুর দিকে ফিরে তিনি বললেন, বুঝলে তো সন্তু, এই সাধুবাবা স্মাগলারদের চোরাই মালপত্তর কলকাতায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে। সাধুর পোশাকে থাকে তো, তাই ওকে কেউ সন্দেহ করে না। তবে, এ অতি ছোটখাটো ব্যাপার!

বিমান বলল, মাই গড়। লোকটিকে দেখে আমি একবারও সন্দেহ করিনি!

এই সময়ে ওপরে যে পুলিশটি ছিল, সে দুদ্দাড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে বলল, স্যার, স্যার, নদী দিয়ে একটা লাশ ভেসে যাচ্ছে। কী করব, লঞ্চ থামাব?
এর পর এক ঘন্টা সময় চলে গেল, সেই মৃতদেহটির জন্য। পুলিশ-লঞ্চের খালাসিরা একটা লম্বা বাঁশের আঁকশি দিয়ে মৃতদেহটাকে টেনে আনল কাছে। কিন্তু সেটাকে এ-লেঞ্চে তোলা হল না। ঠিক সেই সময় ইরিগেশান ডিপার্টমেন্টের একটা খালি লঞ্চ যাচ্ছিল, সেটাকে থামানো হল।

কাকাবাবু সন্তুকে বললেন, সন্তু, তুই ভেতরে বসে থাক, এইসব দৃশ্য তোর না দেখাই ভাল।

সন্তু ওপরে না গেলেও একতলার জানলা দিয়ে দেখতে চেষ্টা করল ব্যাপারটা।

কাকাবাবু আর রণবীর ভট্টাচাৰ্যও বসে রইলেন সেখানে।

রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, এই প্ৰশান্ত সঙ্গে থাকাতেই তো যত গণ্ডগোল। আমি যাচ্ছি। অন্য কাজে, নদী দিয়ে লাশ কেন ভেসে যাচ্ছে, তা আমার দেখার কথা নয়। এখানে সাপের কামড়ে অনেক লোক মরে। সাপের কামড় খেয়ে মরলে সেই মৃতদেহ পোড়ানো হয় না, জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। সুতরাং তাতে পুলিশের কিছু করার নেই। কিন্তু প্রশান্ত রয়েছে সঙ্গে, সে এখানকার এস ডি. পি. ও.; যে-লাশ ভেসে যাচ্ছে, সেটা সাপের কামড়ে মৃত্যু না খুনের ব্যাপার, সেটা তার জানা দরকার।

একটু বাদেই প্রশান্ত দত্ত এসে খবর দিল, মৃতদেহটির বুকে একটা ছুরি বিঁধে আছে। ভাগ্যিস ইরিগেশনের লঞ্চটা পাওয়া গেছে! সেই লঞ্চে, একজন পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে মৃতদেহটি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে ক্যানিংয়ে। সেখানে পোস্ট মর্টেমের ব্যবস্থা হবে।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, ওহে প্ৰশান্ত, ডেডবডিট কার, এই লঞ্চের খালাসিরা কেউ চেনে?

প্ৰশান্ত দত্ত বলল, না, স্যার। কেউ চেনে না। এক কাজ করো না, এই সাধুবাবাকে একবার নিয়ে গিয়ে দেখাও না। সাধু এই অঞ্চলের লোক, চিনতে পারবে হয়তো!

সাধুর হাত-টাত বাঁধা হয়নি। এমনি মেঝেতে এক কোণে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। এই কথা শুনে সে বলল, না, না, আমি যাব না। আমি দেখতে চাই না?

প্রশান্ত দত্ত তার কাছে গিয়ে দুপা ফাঁক করে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল। তারপর প্রচণ্ড এক ধমক দিয়ে বলল, ওঠে!

সেই এক ধমকেই কাজ হল। সাধুবাবা সুড়সুড় করে উঠে গেল। এবারে সন্তু আর বিমানও গেল ওদের সঙ্গে।

মৃতদেহটিকে পাশের লঞ্চের ডেকের ওপর শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। বেশ টাটকা মড়া, শরীরে কোনও বিকৃতি নেই। বছর তিরিশেক বয়েস লোকটির শুধু একটা পাজামা পরা, বুকের বাঁ দিকে একটা ছুরি বিধে আছে, সেই ছুরির হাতলের আধখানা ভাঙা।

সেই দিকে তাকানো মাত্রই ছোট সাধুর মুখখানা ভয়ে কুঁকড়ে গেল। চোখ দুটো বিস্ফারিত করে ফিসফিসিয়ে বলল, কী সর্বনাশ! হায় হায় হায়! কে এমন করল?

প্রশান্ত দত্ত জিজ্ঞেস করল, তাহলে তুমি চেনো একে? কী নাম লোকটির?

ওর নাম হারু দফাদার। আমার আপনি খুড়তুতো ভাই! হারুকে যে দুদিন আগেও জীবন্ত দেখেছি।

এর পর কান্নায় ভেঙে পড়ল সাধু। প্রশান্ত দত্ত ইঙ্গিত করল ইরিগেশনের লঞ্চটাকে ছেড়ে দিতে।

একটু বাদে ছোট সাধুকে যখন নীচে ফিরিয়ে আনা হল, তখনও সে ফুঁপিয়ে কুঁপিয়ে কাঁদছে।

সব শুনে রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, বাঃ সাধুবাবা, আপনাদের পরিবারটি তো চমৎকার। আপনার বুকে ব্যাণ্ডেজ বাঁধা থাকে, সেখান থেকে খসে পড়ে টাকা। আর আপনার খুড়তুতো ভাই বুকে ছুরি বিধিয়ে জলে ভাসে। তা কী কাজ করত। আপনার ভাই?

আকবর খান বললেন, যারা সাধারণ চাষবাস করে, তারা অন্যকে ছুরি মারে না, নিজেরাও ছুরি খেয়ে মরে না।

ছোট সাধু বলল, হারু জঙ্গলে মধু আনতে যেত।

আকবর খান বললেন, যারা জঙ্গলে মধু আনতে যায়, তারা অনেক সময় বাঘের মুখে পড়ে। কিন্তু সেরকম লোককে কেউ ছুরি মারবে কেন?

প্রশান্ত দত্ত বলল, হারু দফাদার নামটা বেশ চেনা-চেনা, কিছুদিন আগেই একটা ডাকাতির কেসে একে খোঁজা হচ্ছিল, যতদূর মনে পড়ছে। জানেন স্যার, কয়েকদিন ধরে এই তল্লাটে স্মাগলার আর ডাকাতদের মধ্যে নানারকম মারামারির খবর পাওয়া যাচ্ছে। নতুন একটা কিছু ঘটেছে বোধহয়।

কাকাবাবু বললেন, সেই বিদেশি লঞ্চের সঙ্গে এই সব ঘটনার কোনও যোগ নেই তো?

রণবীর ভট্টাচাৰ্য মুখ ফিরিয়ে বললেন, সেই বিদেশি লঞ্চ? হাঁ…সম্পর্ক থাকা অস্বাভাবিক নয়। লঞ্চটাতে মানুষজন যেমন ছিল না, তেমনি অন্য কোনও দামি জিনিসপত্রও কিছুই নেই। সেসব গেল কোথায়? এখানকার লোকেরাই লুটেপুটে নিয়েছে! তারপর বখরা নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে তারা।

কাকাবাবু ছোট সাধুর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, সেই লঞ্চের কোনও মালপত্র তোমার কাছে এসেছিল?

ছোট সাধু বলল, লঞ্চের মালপত্র? না, না, স্যার! কোন লঞ্চের কথা বলছেন?

একটা জনশূন্য বিদেশি লঞ্চ সুন্দরবনে এসে ভিড়েছে, সে-কথা তুমি শোনোনি?

কই না তো! কলকাতার এক ব্যবসাদার তার টাকাগুলো এখানকার এক ভেড়িতে আমায় পৌঁছে দিতে বলেছিল, তাই টাকাগুলো আমি সাবধানে লুকিয়ে নিয়ে আসছিলুম। আর আপনারা ভাবলেন আমি চোরাই জিনিসের কারবার করি!

রণবীর ভট্টাচাৰ্য অট্টহাসি করে উঠলেন। তারপর মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এবারে বলুন তো, কাকাবাবু, আপনি এদিকে কেন এলেন। হঠাৎ? এইসব চোর-ডাকাত আর স্মাগলাররা তো নিছক চুনোপুটি, এদের ধরবার জন্য নিশ্চয়ই আপনি আসেননি।

কাকাবাবু বললেন, না, আমি এসেছি। ঐ লঞ্চটা একবার নিজের চোখে দেখতে। আচ্ছ, সুন্দরবনে ঐ লঞ্চটাকে প্রথম কে দেখতে পায় বলো তো?

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, সেটা আকবর সাহেবই ভাল বলতে পারবেন। আকবর খান বললেন, আমরা প্ৰথমে খবর পাই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের কাছ থেকে। দত্ত ফরেস্টের এক রেঞ্জার হরিণভাঙা নদীতে গিয়েছিল টহল দিতে, তখন এক জেলেনৌকো তাকে খবর দেয় যে, খাঁড়ির মুখে একটা লঞ্চ ভাসছে, ভেতরে কোনও মানুষজন নেই। সেই রেঞ্জারের নাম সুখেন্দু বিশ্বাস, সে-ই প্রথম লঞ্চটার কাছে যায়। রেঞ্জার প্রথমে লঞ্চের মধ্যে মানুষজনের গলার আওয়াজ শুনতে পায়। কেউ যেন বিদেশি ভাষায় কথা বলছে। একটু পরে সে বুঝতে পারে, ওটা আসলে রেডিও।

কী ভাষায় রেডিওর প্রোগ্রাম চলছিল, তা রেঞ্জারবাবু বলেছে?

না। সে বুঝতে পারেনি কোন ভাষা।

লঞ্চের ভেতরের আর-সব জিনিসপত্র লুটপাট হয়ে গেল, কিন্তু রেডিওটা কেউ নিল না কেন?

সেটা একটা কথা বটে! একটা বিদেশি রেডিও-র দাম তো নেহাত কম হবে না?

রেঞ্জার লঞ্চটা দেখার পর কী করল?

রেঞ্জার বুদ্ধিমানের মতোই কাজ করেছে। লঞ্চটা যেখানে ভাসছিল, সেখানে জল বেশি গভীর নয়। রেঞ্জার লঞ্চটাকে সেখান থেকে না সরিয়ে

সেখানেই নোঙর ফেলে দেয়। তারপর খবর দেয় থানায়। এর মধ্যে আমি আর প্রশান্ত গিয়ে দেখে এসেছি লঞ্চটা। আজ সেটাকে গোসাবায় নিয়ে আসার কথা আছে।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, এই সাধুজিকে একটা কেবিনে ভরে রাখো। এসো, গোসাবা পৌঁছনো পর্যন্ত আমরা একটু তাস খেলি। কাকাবাবু, খেলবেন নাকি?

কাকাবাবু বললেন, না, তোমরা খেলো। আমি বরং ওপরে গিয়ে নদীর দৃশ্য দেখি। অনেকদিন এদিকে আসিনি।

বিমান আর সন্তুও কাকাবাবুর সঙ্গে উঠে গেল ওপরের ডেকে।

গোসাবা থানার দারোগা বললেন যে, প্রথমে দুজন লোককে পাঠানো হয়েছিল লঞ্চটা চালিয়ে নিয়ে আসবার জন্য। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। সেই লঞ্চটার ইঞ্জিনের কিছু কিছু অংশও নিশ্চয়ই চুরি গেছে। তারপর আর একটা লঞ্চ পাঠানো হল সেটাকে টেনে আনবার জন্য। কিন্তু সেই দ্বিতীয় লঞ্চটাও চড়ায় আটকে গেছে, তারা ওয়ারলেসে খবর পাঠিয়েছে। এখন জোয়ার এলে লঞ্চটা যদি জলে ভাসে তো ভালই, নইলে সেটাকে টানবার জন্য আবার একটা লঞ্চ পাঠাতে হবে!

প্ৰশান্ত দত্ত রেগেমেগে বলল, যাঃ! এখানকার লোকদের দিয়ে কোনও কোজই ঠিকমতন হয় না! এখন উপায়? স্যার, আপনারা এতদূর এলেন—

রণবীর ভট্টাচাৰ্য কিন্তু একটুও উত্তেজিত হলেন না। তিনি বললেন, দাঁড়াও, খিদে পেয়েছে, আগে খেয়ে নিই। দ্যাখো তো, যে-পার্শে মাছগুলো কেন হল, তার ঝোল রান্না হয়েছে কি না?

লঞ্চে বসেই খাওয়া-দাওয়া সেরে নেওয়া হল। ভাত, ডাল, আলুসেদ্ধ, বেগুনভাজা আর মাছের ঝোল। খালাসিরা দারুণ রান্না করে।

বিমান বলল, এমন টাটকা মাছের স্বাদই আলাদা। আমি আগে কোনওদিন এত ভাল মাছের ঝোল খাইনি।

খাওয়ার পর একটা পান মুখে দিয়ে তৃপ্তির সঙ্গে চিবোতে চিবোতে রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, এখন তা হলে কী করা যায়? ওহে প্ৰশান্ত গোসাবার টাইগার প্রজেক্টের একটা স্পিডবোট থাকে না? সেটা পাওয়া যাবে? দ্যাখো না, খোঁজ নিয়ে?

গোসাবা থানার দারোগা বললেন, হ্যাঁ স্যার, পাওয়া যাবে। স্পিডবোটটা আজ সকালেই এসেছে

রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, তবে এক কাজ করা যাক। আমি কাকাবাবু আর এদের নিয়ে স্পিডবোটটায় করে বিদেশি লঞ্চটা দেখে আসি। সেটা এখানে কতদিনে পৌঁছবে কে জানে! আমি সেটা ইনন্সপেকশান করতেই এসেছি। আকবর আর প্রশান্ত, তোমরা এখানে থেকে যাও!

একটু গলা নামিয়ে তিনি আবার আকবর আর প্রশান্তকে বললেন, তোমরা এখানে থেকে যতগুলো পারো চোর-ডাকাত আর স্মাগলারদের রাউণ্ড আপ, করো। ঐ বিদেশি লঞ্চ থেকে যে-সব জিনিসপত্র খোয়া গেছে, তার দুএকটা অন্তত উদ্ধার করা চাই। নইলে লঞ্চের মালিক কে ছিল কিংবা কোন দেশের, তা বার করা শক্ত হবে। এই সাধুবাবাকে একটু চাপ দাও, ও নিশ্চয়ই চোরাই মালের সন্ধান দিতে পারবে।

স্পিডবোটটায় চালক ছাড়া আর তিনজনের জায়গা আছে। রণবীর, কাকাবাবু, বিমান আর সন্তু তার মধ্যে এঁটে গেল কোনওক্রমে। কিন্তু রণবীর ভট্টাচার্যের সঙ্গে সব সময় দুজন সাদা পোশাকের বডিগার্ড থাকে। তাদের কিছুতেই জায়গা হবে না।

রণবীর ভটাচার্য বললেন, ঠিক আছে, ঠিক আছে বডিগার্ড দরকার নেই। ওরা এখানেই থাক। আমাদের আর কতক্ষণই বা লাগবে, স্পিডবোটে বড় জোর যাতায়াতে ঘন্টাতিনেক। নাও, এবার চালাও!

স্পিডবোটটা স্টার্ট নিতে না নিতেই রকেটের মতন একেবারে সাঁ করে বেরিয়ে গেল।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, সন্তু, শক্ত করে ধরে থেকে। একবার উল্টে জলে পড়ে গেলে আর রক্ষে নেই!

বলতে বলতে ঝাঁকুনির চোটে তিনি নিজেই উল্টে পড়ে যাচ্ছিলেন, কাকাবাবু তাঁর কাঁধটা। চট করে ধরে ফেললেন।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, আমি অবশ্য পড়ে গেলেও ক্ষতি ছিল না, আমি ভাল সাঁতার জানি। কিন্তু সন্তু সাঁতার জানো তো?

সন্তু বেশ জোর দিয়ে বলল, হ্যাঁ!

কাকাবাবু বললেন, সন্তুও সাঁতার জানে, বিমানও সাঁতার জানে। কিন্তু মুশকিল তো আমাকে নিয়েই। খোঁড়া পায়ে আমি তো আজকাল আর ভাল সাঁতার দিতে পারি না! আমি পাহাড়ে উঠতে পারি, কিন্তু জলে পড়ে গেলেই কাবু হয়ে যাই।

স্পিডবোটের চালক ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, স্যার, এই নদীতে পড়লে সাঁতার জেনেও খুব লাভ হয় না। এই নোনা জলে কামঠ থাকে, কুচু করে পা কেটে নিয়ে যায়।

বিমান বলল, কামঠ কী? কাকাবাবু বললেন, একরকম ছোট হাঙর। খুব হিংস্র রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, কারুরই জলে পড়ার দরকার নেই। ওহে বাপু, তুমি সাবধানে ঠিকঠাক চালাও!

নদীর দুধারে অনেক লোক জলে নেমে কী যেন খোঁজাখুঁজি করছে। কারুর কারুর হাতে গাঢ় নীল রঙের ছোট ছোট জাল।

বিমান জিজ্ঞেস করল, ওরা কী করছে জলে নেমে!

চালক বলল, ওরা বাগদী চিংড়ির পোনা ধরছে। এটাই সিজন কিনা?

ওখানে কামঠ যেতে পারে না? ওদের ভয় নেই? কী করবে বলুন, মাছ না ধরলে যে ওরা খেতে পাবে না। ভয় আছে বই কী, মাঝে-মাঝে দুএকজনের পা কাটা যায়। তবে এক জায়গায় বেশি লোক থাকলে কামঠু কাছে আসে না।

আর কিছুক্ষণ যাবার পর কাকাবাবু বললেন, ছোট সাধু আমায় দেখে হঠাৎ বলেছিল, আজ রাত্রে আমার বাড়ি ফেরা হবে না। এটাই ভাগ্য, ও নিজেই আজ রাত্রে বাড়িতে ফিরতে পারবে না।

বিমান বলল, ব্যাটা ভণ্ড! আচ্ছা রণবীরবাবু, আপনি হঠাৎ ওর জামা খুলতে বললেন কেন? আপনি কী করে বুঝলেন…

কী জানি, লোকটির মুখ দেখেই আমার কেমন যেন মনে হল, ও একটু টাকার গরমে কথা বলছে! বুকে বাঁধা অতগুলো টাকা, হা-হা-হা।

কাকাবাবু বললেন, ও বেশি সাহস দেখিয়ে আমার সঙ্গে যেচে কথা বলতে এসেছিল। যদি দূরে দূরে থাকত, তাহলে বোধহয় আজ ধরাই পড়ত না।

রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, তবে, কাকাবাবু, ও বোধহয় এই কথাটা ঠিকই বলেছে। আজ রাত্তিরে আপনার না-ও ফেরা হতে পারে।

কাকাবাবু কিছু বলার আগেই বিমান বলল, সে কী! কেন?

জলের ব্যাপার তো! এই সব স্পিডবোট যখন-তখন খারাপ হয়। ধরুন যদি এটা খারাপ হয়ে গেল, তখন কী হবে? দেখছেন তো! দুপাশে জঙ্গল, পাড়ে নামাও যাবে না! তখন কোনও নৌকে ধরতে হবে কিংবা দৈবাৎ কোনও লঞ্চ যদি এদিক দিয়ে যায়-

দৈবাৎ কেন? এদিকে লঞ্চ পাওয়া যায় না?

খুব কম। ওহে মাস্টার, তুমি আবার স্পিডবোটটাকে খাঁড়ির মধ্যে ঢোকালে কেন?

চালক বলল, এদিক দিয়ে শর্টকাট হবে, স্যার!

এই যে দু দিকের জঙ্গল, এখানে বাঘ আছে? তোমরা তো টাইগার প্রজেক্টের লোক?

হাঁ, স্যার, তা আছে। এই তো বাঁ দিকে সজনেখালির জঙ্গল, ওখানে কয়েকটা বাঘ আছে।

বুকুন তা হলে! পাশের জঙ্গলে বাঘ, এর মধ্যে যদি স্পিডবোট খারাপ

বিমান বলল, যদি খারাপ নাও হয়, নদী এত সরু, এখানে এমনিতেই তো বাঘ আমাদের ওপরে লাফিয়ে পড়তে পারে।

যেন এটা কোনও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারই নয়। এইভাবে হাসতে হাসতে রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, তা তো পারেই! বাঘ এর চেয়ে বেশি দূরেও লাফিয়ে যায়! তবে কথা হচ্ছে, কোনও বাঘ এখন এদিকে আসবে না। বাঘেরাও জেনে গেছে। যে, অ্যাডিশনাল আই. জি. রণবীর ভট্টাচার্য এই পথ দিয়ে যাচ্ছে। বাঘেরাও আমাকে ভয় পায়। হা-হা-হা-হা!

কাকাবাবু বললেন, স্পিডবোটে এত শব্দ হচ্ছে, এই জন্যই বাঘ এর কাছে ঘোিষবে না। বাঘেরা শব্দ পছন্দ করে না। মুনি-ঋষিদের মতনই বাঘ খুব নির্জনতাপ্রিয়।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য আগের মতনই হাসতে হাসতে বললেন, কাকাবাবু, আমি পাইলটসাহেবকে একটু ভয় দেখাচ্ছিলুম।

বিমান বলল, ভয় আমি পাইনি। তবে পরশু আমার ডিউটি আছে…

কাকাবাবু বললেন, আমি গোসাবা পর্যন্ত এসে ফিরে যাব ভেবেছিলুম। এত দূর আসতে হল—

বিমান বলল, আমার কিন্তু খুব ভাল লাগছে কাকাবাবু। কাছাকাছি বাঘ আছে জেনে খুব উত্তেজনা হচ্ছে। এরকম অ্যাডভেঞ্চারে তো কখনও যাইনি! শুধু পরশু যদি ডিউটি না থাকত—

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, আজ না হোক, কালকের মধ্যে ঠিক আপনাকে ক্যানিং পৌঁছে দেব। সেজন্য চিন্তা করবেন না। আমাকেও তো কাল বিকেলের মধ্যে চিফ মিনিস্টারকে রিপোর্ট দিতে হবে?

সন্তু অনেকক্ষণ থেকেই চুপ করে আছে আর গভীর মনোযোগ দিয়ে দু পাশের জঙ্গল দেখছে কী গভীর বন! একটুও ফাঁক নেই, মানুষের পায়ে চলার মতনও কোনও পথ নেই। নদীর দুধারে শুধু থকথকে কাদা, তার মধ্যে উঁচু উঁচু হয়ে আছে। শূল।

প্রতি মুহূর্তে সন্তুর মনে হচ্ছে, হঠাৎ যেন জঙ্গলের মধ্য থেকে গাঁক করে ডেকে একটা রিয়াল বেঙ্গল টাইগার বেরিয়ে আসবে।

আর একটা কথা ভেবেও সন্তুর অদ্ভুত লাগছে। এখন দুপুর তিনটে বাজে। সকাল আটটার সময়েও সন্তু জানত না যে, কয়েক ঘন্টার মধ্যে সে এইরকম একটা গভীর জঙ্গলের মধ্যে চলে আসবে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এত কম সময়ের মধ্যে এরকম একটা অ্যাডভেঞ্চারের অভিজ্ঞতা সন্তুর আগে কখনও হয়নি।

সরু নদীটি জঙ্গলের মধ্য দিয়ে চলেছে। এঁকেবেঁকে। প্ৰত্যেকবার স্পিডবোটটা বাঁক নেবার সময়েই সন্তুর মনে হচ্ছে, এইবারে একটা কিছু ঘটবে।

হঠাৎ স্পিডবোটটার স্পিড কমে এল, ইঞ্জিনের আওয়াজও বন্ধ হয়ে গেল।

রণবীর ভট্টাচার্যের একটুখানি তন্দ্ৰা এসেছিল, ধড়মড় করে সোজা হয়ে বসে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী হল, খারাপ হয়ে গেল?

কোনও উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল চালক।

কী হে, কথা বলছি না কেন? খারাপ হয়ে গেছে?

কই, না তো! কিসের আওয়াজ?

শুনুন ভাল করে।

সন্তু, বিমান, কাকাবাবু কেউ-ই এতক্ষণ স্পিডবোটটার মোটরের শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ শুনতে পায়নি। এমনকী একটা পাখির ডাকও না।

এখন মোটরের আওয়াজ বন্ধ হয়ে যেতে নিস্তব্ধ জঙ্গলটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠল। শোনা যেতে লাগল নানারকম পাখির ডাক। একটা পাখি ট-ব্ল-র-র, ট-র-র-র করে ডাকছে। মাথার ওপর দিয়ে দু তিনটে বেশ বড় পাখি কাঁক-কাঁক করে ডেকে উড়ে গেল।

একটুক্ষণ সবাই উৎকৰ্ণ হয়ে বসে থাকার পর শোনা গেল, দূরে, অনেক দূরে, কেউ যেন কাঁদছে। দু তিনজন মানুষের গলা।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, হঁ, কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি বটে। তোমার কান তো খুব সাফ। স্পিডবোট চালাতে চালাতে তুমিই আগে শুনেছ!

চালক বলল, স্যার, গতিক বড় সুবিধে বোধ হচ্ছে না। সঙ্গে জনা দু এক আর্মড গার্ড আনা উচিত ছিল।

কেন?

এই জঙ্গলের মধ্যে তো চোর-ডাকাতের অভাব নেই। আমরা সঙ্গে বন্দুক আনিনি, এই সুযোগে যদি ওরা লুটপাট করতে চায়…স্যার, এই জঙ্গলের রাজত্বে লুট করতে এসে ডাকাতরা একেবারে প্রাণেও মেরে যায়।

বটে? কান্নার আওয়াজ কোন দিক থেকে আসছে? ডান দিক থেকে না?

নদীটা সেখানে তিন দিকে ভাগ হয়ে গেছে। মাঝখানের জায়গাটা বেশ চওড়া। স্পিডবোটটা থেমে আছে সেখানে। কাকাবাবু তাঁর কালো বাক্সটা খুললেন। সন্তু জানে, ওর মধ্যে রিভলভার আছে!

রণবীর ভট্টাচার্য এতক্ষণ ইয়ার্কি-ঠাট্টার সুরে কথা বলছিলেন। এবারে যেন গা-ঝাড়া দিয়ে সেই ভাবটা ঘুচিয়ে ফেলে কঠোর গলায় বললেন, ডানদিকের ঐ খাঁড়িটা দিয়ে চলো, দেখি, কে কাঁদছে।

স্পিডবোটের চালক বলল, স্যার, ওটা দিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না, ওটা বড্ড সরু।

বলছি চলো! ফুল স্পিডে!

তারপর কাকাবাবুর অনুমতি নেবার জন্য রণবীর ভট্টাচাৰ্য জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী বলেন?

কাকাবাবু বললেন, হ্যাঁ, দেখে আসা যাক!

স্পিডবোটের মোটর আবার গর্জন করে উঠল। তারপর ঘুরে গেল। ডান দিকে।

খানিক দূর যাবার পরেই দেখা গেল কিছু দূরে একটা নৌকে। কান্নার আওয়াজটা আসছে। সেখান থেকেই। স্পিডবোটের আওয়াজ পেয়েই বোধহয় নৌকোটা তাড়াতাড়ি ঢুকে গেল একটা ঝোপের মধ্যে।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য উঠে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বললেন, এটা টাইগার প্রজেক্টের এরিয়া। এখানে কাঠ কাটা নিষেধ। ওরা বেআইনি কাঠ কাটতে এসেছে। টাইগার প্রজেক্টের স্পিডবোট দেখে ভয়ে লুকোচ্ছে এখন। কিন্তু ওরা কাঁদছিল কেন?

স্পিডবোটের চালক বলল, স্যার, এটা ফাঁদও হতে পারে। আর্মস ছাড়া ওদের কাছে যাওয়া ঠিক হবে না।

রণবীর ভটাচার্য বললেন, তুমি ঐ নৌকোটার গায়ে গিয়ে লাগাও!

নৌকোটা মাঝারি ধরনের। মাঝখানে ছাঁইয়ে ঢাকা। কোনও লোকজন দেখা যাচ্ছে না। কান্নার আওয়াজও থেমে গেছে।

স্পিডবোটটা গায়ে লাগাবার পর রণবীর ভট্টাচার্য চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ভেতরে কে আছে? নৌকের মালিক কে?

ডাক শুনে একটি উনিশ-কুড়ি বছরের ছেলে ছাঁইয়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। হাত জোড় করে বলল, স্যার, আমার চাচারে সাপে কেটেছে। এখনও প্ৰাণটা ধুকপুক করতেছে। আপনার বোটে করে নিয়ে গিয়ে চিকিচ্ছে করলে চাচা প্ৰাণে বেঁচে যেতি পারে, স্যার। দয়া করুন স্যার

এই জঙ্গলে কী করতে এসেছিল?

আমরা মধুর চাক ভাঙতে আসি, স্যার। পেটের দায়ে আসতি হয়, স্যার। কখনও এমন বিপদে পড়ি নাই। একটু দয়া করেন, আমার চাচারে বাঁচান।

তোমার চাচাকে সাপে কামড়েছে কতক্ষণ আগে?

আজ সকালে, ঠিক সূর্য ওঠার সময়ে।

এখনও জ্ঞান আছে তার?

কথা বলতে-বলতে রণবীর ভট্টাচার্য একবার কাকাবাবুর দিকে তাকালেন। কাকাবাবু কোলের ওপর কালো বাক্সটা নিয়ে স্থির হয়ে বসে আছেন। রণবীর ভট্টাচাৰ্য প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে খুব স্মাৰ্টভাবে উঠে গেলেন নৌকেটার ওপরে। তারপর বললেন, কই দেখি, তোমার চাচা কোথায়?

নিচু হয়ে তিনি ছাঁইয়ের মধ্যে মাথা গলাতেই ভেতর থেকে একজন একটা লাঠি দিয়ে তাঁর মাথায় মারতে গেল।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা সরিয়ে এনে সেই লাঠিটা ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিলে, লাঠিধারি। হুমড়ি খেয়ে এসে পড়ল সামনে। রণবীর ভট্টাচার্য প্যান্টের পকেট থেকে রিভলভার বার করে বললেন, আরে, এ যে দেখছি চ্যাংড়া ডাকাত, দেব নাকি-

রণবীর ভট্টাচাৰ্য কথা শেষ করতে পারলেন না। নৌকের খোলের মধ্যে গুড়ি মেরে আর একটা লোক লুকিয়ে ছিল, সে তক্ষুনি উঠে পেছন থেকে লাঠি দিয়ে মারল রণবীর ভট্টাচার্যের মাথায়, তাঁর রিভলভারটা ছিটকে পড়ে গেল, তিনিও জ্ঞান হারিয়ে ঘুরে পড়লেন সেখানে।

দ্বিতীয় লাঠিধারী এবারে মুখ ফেরাতেই কাকাবাবুর সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। কাকাবাবুর হাতে রিভলভার, তিনি শান্ত গলায় বললেন, লাঠিটা হাত থেকে ফেলে দেবে, না মাথার খুলিটা উড়িয়ে দেব?

লোকটি সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ল নৌকের খোলের মধ্যে। এবারে প্রথম যে-ছেলেটি কথা বলেছিল, সে নৌকোর ছাঁইয়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল, তার হাতে একটা লম্বা নলওয়ালা বন্দুক।

সে বলল, দেখি কে কার মাথার খুলি উড়িয়ে দেয়। এই বুড়ো, তোর হাতের অস্ত্রটা ফেলে দে নৌকের ওপর।

কাকাবাবুর মুখে এখনও মৃদু হাসি। তিনি বললেন, তুমি আঙুল তোলার আগেই ছটা গুলি তোমায় ঝাঁঝরা করে দেবে। সাবধান।

সন্তু একেবারে কাঠ হয়ে বসে আছে। কাকাবাবুর একটা দুর্বলতা সে জেনে গেছে। কাকাবাবু ভয় দেখান বটে, কিন্তু কিছুতেই কারুকে মারবার জন্য গুলি ছুড়তে পারেন না। সেবারে ত্রিপুরায় সেই রাজকুমার ব্যাপারটা বুঝে ফেলেছিল বলে মারুন দেখি আমাকে এই বলে এগিয়ে এসে কাকাবাবুর হাত থেকে রিভলভারটা কেড়ে নিয়েছিল। এই ডাকাতটাও যদি সে-কথা বুঝে যায়? অরণ্যদেব এক গুলিতে অন্যের হাতের বন্দুক ফেলে দিতে পারেন, কিন্তু কাকাবাবু সে চান্সও নিতে পারেন না-যদি লোকটার গায়ে গুলি লাগে!

সন্তু মুখ ফিরিয়ে বিমানের দিকে তাকাতেই দেখল বিমান তার পাশে নেই। দারুণ ঝুঁকি নিয়ে বিমান সেই মুহূর্তে লাফিয়ে নৌকোটার ওপরে উঠে পড়েছে। বন্দুকধারীর বন্দুকের নলটা কাকাবাবুর দিকে তাক করা ছিল, সেটা সে ঘোরাবার আগেই বিমান সেটা খপ করে চেপে ধরল। তারপর দু জনে ঝাঁটাপটি করতে করতে একসঙ্গে ঝপাং করে পড়ে গেল জলে।

ঠিক সেই সঙ্গে-সঙ্গে কাকাবাবুর রিভলভার দুবার গর্জন করে উঠল।

এত তাড়াতাড়ি ঘটে গেল ব্যাপারটা যে, প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। সন্তু। তারপর দেখল যে, অন্য দুজন লাঠিধারী এর মধ্যে আবার উঠে দাঁড়িয়েছিল বলে কাকাবাবু তাদের ঠিক মাথার ওপর দিয়ে গুলি করেছেন। লোকদুটো লাঠি ফেলে দিয়ে নৌকের পাটাতনের ওপর শুয়ে পড়ে ভয়ে কাঁপছে।

কাকাবাবু বললেন, বিমানের কী হল দ্যাখ, সন্তু!

নদীর সেখানটায় জল খুব কম। বিমান এর মধ্যেই উঠে দাঁড়িয়েছে। সে বলল, আমি ঠিক আছি।

বন্দুকধারীর চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলে ঠাস করে এক চড় কষিয়ে বিমান বলল, হতভাগা! জলের মধ্যে আমার হাত কামড়ে ধরেছিল! আর একটু হলে গলা টিপে মেরেই ফেলতুম!

স্পিডবোটের চালক এবার নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে নৌকোটার ওপর গিয়ে ব্যাকুলভাবে ডাকল, স্যার! স্যার!

নৌকের খোলের মধ্য থেকে আস্তে-আস্তে উঠে বসলেন রণবীর ভট্টাচাৰ্য। এত কাণ্ডের পরেও কিন্তু তাঁর মুখে কোনও ভয় বা ব্যথার চিহ্নমাত্র নেই। হালকা গলায় তিনি বললেন, বাপ রে বাপ, এমন জোরে মেরেছে যে, চোখে একেবারে সর্ষেফুল দেখলুম। মাথাটা ফাটিয়ে দিয়েছে নাকি?

মাথার পেছনে হাত ঝুলিয়ে তিনি বললেন, ভিজে ভিজে কী লাগছে? রক্ত?

নৌকের খোলের মধ্যে খানিকটা জল থাকে, তার মধ্যে পড়ে গিয়ে রণবীর ভট্টাচার্যের জামা প্যান্ট খানিকটা ভিজে গেছে, মাথাও ভিজেছে। তাঁর মাথায় রক্তের চিহ্ন নেই।

রণবীর ভট্টাচার্য দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে বললেন, হাত ভেঙেছে? না। বোধহয়। পা দুটোতেও ব্যথা নেই। তা হলে ঠিকই আছে। বুড়ো বয়েসে কি আর মারামারি করা পোষায়?

তারপর ডাকাতদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী রে, হঠাৎ আমাদের ওপর হামলা করতে গেলি কেন? কী চাস তোরা?

স্পিডবোটের চালক বলল, স্যার, গত শীতকালে আমাদের একটা বোট থেকে এরা একটা বন্দুক কেড়ে নিয়েছিল।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, এরাই কেড়ে নিয়েছিল?

ঠিক এই লোকগুলোই কি না তা জানি না! এই রকমই একটা খাঁড়ির মধ্যে লুকিয়ে ছিল সেই ডাকাতরা। সেই বন্দুকটার হদিস আজও পাওয়া যায়নি! যদি এরা আর কিছু না পায়, লোকের জামাকাপড় খুলে নিয়ে তাদের এই জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে চলে যায়।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, আমার সার্ভিস রিভলভারটা কোথায় গেল? সেটা আবার জলে পড়ে গেল নাকি? দ্যাখো তো!

নৌকের খোলের মধ্যেই রিভলভারটা খুঁজে পাওয়া গেল। রণবীর ভট্টাচার্য স্পিডবোটে ফিরে এসে বললেন, এবার এ ব্যাটাদের নিয়ে কী করা যায়? শুধু শুধু সময় নষ্ট হয়ে গেল অনেকটা।

বিমান নদীর জল থেকে ডাকাতদের বন্দুকটা তুলে নিয়ে এল। তারপর সেটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলল, কান্ট্রি মেড গাদাবন্দুক!

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, আপনার তো মশাই দারুণ সাহস! তখন আমার জ্ঞান ফিরে এসেছে, আমি দেখলুম। আপনি খালি হাতে বন্দুকের নলটা চেপে ধরলেন!

বিমান বলল, কী করব, আমি দেখলুম, কাকাবাবু গুলি চালাতে দেরি করছেন.এ লোকটা যদি হঠাৎ আগেই গুলি করে বসে।.এদের তো কোনও

কাকাবাবু বললেন, ওর ওই গাদাবন্দুকের ঘোড়া টেপার আগেই আমি ওর ডানহাতটা উড়িয়ে দিতে পারতুম। তা হলে এই জোয়ান ছেলেটা চিরকালের মতন নুলো হয়ে যেত…। কিন্তু এই জঙ্গলের ধারে বেশিক্ষণ থাকা তো নিরাপদ নয়। হঠাৎ যদি বাঘ এসে পড়ে, তাহলে রিভলভার দিয়ে ঠেকানো যাবে না।

স্পিডবোটের চালক বোটের মোটর চালু করে দিল।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, এই বোকা ডাকাতগুলোকে তো এখন আমার সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারব না। আবার একেবারে ছেড়েও দেওয়া যায় না। তাহলে এক কাজ করা যাক। এদের নৌকোটা জলে ভাসিয়ে দিয়ে এই লোকগুলোকে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে যাওয়া যাক। ওদের জামাকাপড় অবশ্য কেড়ে নিয়ে লাভ নেই, ও দিয়ে আমরা কী করব!

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, জঙ্গলে ছেড়ে দিলে ওরা কি প্ৰাণে বাঁচবে?

রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, সে আশা খুব কম। ওদের বাঁচার দরকার কী? ওরা তো আমাদের সবাইকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল?

সরু চোখে লোকগুলির দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তিনি আবার বললেন, দেখেছেন ব্যাটারা কত পাজি! একটা কথা বলছে না পর্যন্ত। কেঁদোকেটে দয়া চাইলেও না হয়। দয়া করা যেত।

কাকাবাবু বললেন, ওদের নৌকোটা আমাদের সঙ্গে বেঁধে নিয়ে চলো। ওরাও চলুক।

শেষ পর্যন্ত তাই হল, একটা মোটা দড়ি দিয়ে নৌকোটা বাঁধা হল স্পিডবোটের সঙ্গে। লোকগুলোকে বসিয়ে দেওয়া হল তাদের নৌকোয়। তাদের লাঠিগুলো কেড়ে নেওয়া হল।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য স্পিডবোটের চালককে বললেন, এবারে আস্তে আস্তে চালাতে হবে, নইলে ওদের নৌকোটা হঠাৎ উল্টে যেতে পারে।

তারপর ঘড়ি দেখে তিনি বললেন, ইস, প্ৰায় এক ঘন্টা সময় বাজে খরচ হয়ে গেল। মেঘ করে আসছে, এর পর বৃষ্টি নামলে তো পুরোপুরি ভিজতে হবে?

কাকাবাবু বললেন, ভেবেছিলুম। বিদেশি লঞ্চটা একবার দেখেই ফিরে যাব আজ। কিন্তু দিনটা দেখছি ক্ৰমেই ঘটনাবহুল হয়ে উঠছে। আমি শুনেছিলুম বটে যে, সুন্দরবনে ইদানীং বাঘের উপদ্রবের চেয়েও ডাকাতদের উপদ্ৰব বেশি। কিন্তু এতটা যে বেড়ে উঠেছে, তা ধারণা করতে পারিনি।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, সরকারি স্পিডবোট দেখেও ওরা ভয় পায়নি। একেবারে বেপরোয়া হয়ে গেছে। আমার মাথায় চোট মেরেছে, এ-কথা যদি পুলিশ মহল একবার জানতে পারে, তা হলে এ ব্যাটাদের এমন ধোলাই দেবে? বিমান বলল, আপনার মাথায় কি খুব জোরে মেরেছিল না। আপনি ইচ্ছে করে নীচে পড়ে গেলেন?

না, প্ৰথম মারটা বেশ জবাবর কষিয়েছিল। তবে ঘাড়ে লেগেছে। লাঠিটা মাথায় পড়লে মাথা ফেটে যেত। তারপর হেসে ফেলে তিনি বললেন, প্ৰায় দশ বারো বছর বাদে আমি এরকম মার খেলাম!

সন্তু বারবার পেছন ফিরে দেখছে নৌকোটাকে। ডাকাত তিনটে পাশাপাশি চুপ করে বসে আছে। ওদের হাত-পা বাঁধা হয়নি। দেখলে লোকগুলোকে হিংস্ৰ মনে হয় না, ডাকাত বলেও মনে হয় না। এমনি যে-রকম গ্রামের লোক হয়। কিন্তু আর একটু হলেই ওরা রণবীর ভট্টাচার্যের মাথা ফাটিয়ে দিত, কাকাবাবুকেও গুলি করত বোধহয়।

নদীটা ক্রমশ চওড়া হচ্ছে, সামনে দেখা যাচ্ছে আর-একটা বড় নদী। জঙ্গলটা নদীর এক দিকে বেশ পাতলা। একঝাঁক হাঁস বসে ছিল সেই দিকে, স্পিডবোটের আওয়াজ পেয়ে সেগুলো একসঙ্গে উড়ে গেল। তারপরই সন্তু দেখল দুটো মুর্গি কক-কিক করে ডেকে পালাচ্ছে।

সন্তু চেঁচিয়ে বলল, এ কী, মুর্গি? জঙ্গলের মধ্যে মুর্গি?

বিমান বলল, বনমুৰ্গি বনমুর্গা! ওরা জঙ্গলে থাকে। খুব টেস্টফুল।

কাকাবাবু বললেন, না, বনমুর্গি নয়, ওগুলো এমনিই সাধারণ মুর্গি। এখানকার লোকেরা জঙ্গলে ঢোকার সময় বনবিবির পুজো করে, তখন একটা মুর্গি ছেড়ে দেয়।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, তারপর বনে থাকতে থাকতে এক সময় ওরাও বুনো হয়ে যায়। তাদের বাচ্চা হলে সেগুলিই হয়ে যাবে বনমুর্গা!

স্পিডবোটটা ছোট নদী ছেড়ে বড় নদীতে পড়বার ঠিক আগেই ঝপাং ঝপাং শব্দ হল।

পেছনের নৌকো থেকে ডাকাত তিনজন জলে লাফিয়ে পড়েছে।

সন্তু আর বিমান উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়েছে। স্পিডবোটের চালক মুখ ফিরিয়ে ব্যাপারটা দেখেই বোটটা ঘোরাতে গেল ওদের দিকে।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, যাক, যাক, আর সময় নষ্ট করে লাভ নেই।

বিমান বলল, ওদের ধরা হবে না? ইচ্ছে করলেই ধরা যায়!

ডাকাত তিনটে ড়ুবসাঁতার কেটে পারের দিকে এগোচ্ছে, এক একবার তাদের মাথা ওপরে উঠতে দেখা যাচ্ছে।

রণবীর ভট্টাচার্য হাসি-হাসি মুখে বললেন, আমি ভাবছিলুম ব্যাটারা পালাতে এত দেরি করছে কেন? ওদের সঙ্গে করে নিয়ে গেলে ঝামেলা হত আমাদের। এদিকে থানা নেই, লোকবসতি নেই, ওদের রাখতুম কোথায়?

সন্তু জিজ্ঞেস করল, ওরা জঙ্গলে থাকবে? যদি ওদের বাঘে ধরে?

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, ওরা সব জানে, কোন জঙ্গলে বাঘ আছে, কোথায় নেই। ঠিক জায়গা বুঝে লাফিয়েছে।

কাকাবাবু বললেন, কিংবা বোধহয় মুৰ্গি দুটো দেখে ওদের লোভ হয়েছে।

হঠাৎ মত বদলে রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, এদের একটা প্ৰায় পড়ে গিয়ে উঠেছে, বোটটা ওর কাছে নিয়ে চলো তো!

পাড়ের কাছে খুব কাদা, একজন ডাকাত জল ছেড়ে উঠে কাদার মধ্যে হ্যাঁচোড়-প্যাঁচোড় করে দৌড়োবার চেষ্টা করছিল, স্পিডবোটটা তার কাছাকাছি পৌঁছতেই রণবীর ভট্টাচাৰ্য রিভলভার উঁচিয়ে চোখ কাঁটমট করে বললেন, দেব? মাথাটা ফুটো করে দেব?

লোকটি এবারে হাত জোড় করে হাউমাউ করে কাঁদে বলল, দয়া করুন বাবু! এবারকার মতন বাঁচিয়ে দিন। আর কোনওদিন অন্যায় কাজ করব না। নাকে খত দিচ্ছি। বাবু, এবারে মাপ করে দিন।

ঠিক তো? মনে থাকবে?

নাকে খত দিচ্ছি। বাবু! কিরে কেটে বলছি, এরকম আর করব না।

অন্য দুটি লোক জল থেকে মাথা তুলেই আবার ড়ুব দিল।

রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, ঐ দুই স্যাঙাতকেও বলে দিস! মনে থাকে যেন! তবে, তোমাদের নৌকো আর বন্দুক ফেরত পাবে না। ফেরত নিতে চাও তো গোসাবা থানায় যেও!

স্পিডবোটটা আবার স্পিড নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বড় নদীতে পড়ল। আকাশে কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। জলে তার ছায়া পড়েছে, অন্ধকার অন্ধকার একটা ভাব। নদীতে বেশ বড় বড় ঢেউ।

কাকাবাবু বললেন, জোয়ার আসছে মনে হচ্ছে।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য স্পিডবোট-চালককে জিজ্ঞেস করলেন, সেই লঞ্চটর কাছে পৌঁছতে আর কতক্ষণ লাগবে? তুমি একবার গিয়েছিলে তো সেখানে?

হাঁ, সার। আর বেশি দুর নয়। নৌকোটা বাঁধা রয়েছে যে, নইলে আর দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যেতুম।

দ্যাখা, যদি বৃষ্টি নামার আগে পৌঁছে দিতে পারো!

বলতে বলতেই নেমে গেল বৃষ্টি। দারুণ বড় বড় ফোঁটা। বসে বসে ভেজা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, নৌকোর ছাঁইয়ের মধ্যে ঢুকে গেলে মাথা বাঁচানো যায়। কাকাবাবু, যাবেন নাকি নৌকোতে?

কাকাবাবু বললেন, না, থাক। আবার ওঠাউঠি করা এক ঝামেলা। তোমরা যেতে পারো।

কেউই গেল না, বৃষ্টির ঝাপটায় ভিজতে লাগল বসে বসে। খুব জোরে বাতাসও বইছে, পেছনের নৌকোটা ভীষণ দুলছে, সেজন্য স্পিডবোটেরও গতি কমে গেছে।

কাকাবাবু বললেন, এতবড় নদী, অথচ এদিকে একটা নৌকো বা লঞ্চ দেখছি না।

রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, সমুদ্র তো বেশি দূরে নয়। এদিকে সার্ভিস লঞ্চ চলে না। মাছ ধরা নৌকো-টোকো যায় নিশ্চয়ই, আসলে মেঘ দেখে তারা ঘরে ফিরে গেছে।

স্পিডবোটের চালক বলল, কদিন ধরেই এখানে খুব ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে।

সন্তু বলল, কলকাতায় তো একদম বৃষ্টি পড়েনি।

এদিকে একটু বেশি বৃষ্টি হয়। সমুদ্র কাছেই কিনা?

বিমান হঠাৎ বলে উঠল, ওই যে সামনে ঝাপসামতন কী দেখা যাচ্ছে? ওইটাই সেই লঞ্চটা না?

লঞ্চ একটা নয়, দুটো। প্রথম লঞ্চটা চড়ায় আটকে একটুখানি কত হয়ে আছে। দ্বিতীয় লঞ্চটা একটুখানি দূরে, সেটা ধপধপে সাদা রঙের, জলের উপর রাজহংসের মতন ভাসছে।

বৃষ্টির দাপট খানিকটা কমেছে। স্পিডবোটের আওয়াজ শুনেই প্রথম লঞ্চের ডেকের ওপর একজন লোক এসে উঁকি মোরল। এই লঞ্চটার নাম মধুকর। স্পিডবোট মধুকরের পাশেই এসে থামল আগে।

রণবীর ভট্টাচার্য উঠে দাঁড়িয়ে মধুকরের সেই লোকটিকে কিছু জিজ্ঞেস করতে যেতেই লোকটি যেন ভূত দেখার মতন চমকে উঠল। তারপর এক ছুটে চলে গেল ভেতরে।

রণবীর ভট্টাচার্য হেসে উঠলেন।

বিমান জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার, লোকটা পালাল কেন?

স্পিডবোট-চালক বলল, মধুকরের সারেঙ তো মইধরদা! সে গেল কোথায়? ও মইধরদা! মইধরদা!

কেউ কোনও সাড়াশব্দ করে না।

বিমান সন্তুকে জিজ্ঞেস করল, মইধর? এ আবার কী রকম অদ্ভুত নাম?

সন্তু বিমানের চেয়ে ভাল বাংলা জানে। সে বলল, মইধর না। মহীধর!

কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পর একজন মোটামতন লোক কোমরের লুঙ্গিতে গিঁট বাঁধতে বাঁধতে এল রেলিং-এর কাছে। দেখলেই বোঝা যায় লোকটা ঘুমোচ্ছিল।

লোকটি এসে খুব বিরক্তভাবে বলল, গোসাবা থানায় সেই সক্কালবেলা খবর দিয়েছি। তারপরেও কোনও লোক পাঠাল না। আমার লঞ্চে খাওয়া-দাওয়ার কিছু নেই। সারারাত কি এখানে না খেয়ে পড়ে থাকব? কাশেম, এনারা করা?

স্পিডবোটের চালক রণবীর ভট্টাচার্যকে দেখিয়ে বলল, ইনি পুলিশের বড় কত। আর এনারা কলকাতা থেকে এসেছেন। সাহেবদের লঞ্চটা দেখবেন।

মহীধর নামের লোকটি বলল, ওই লঞ্চ দেখতে চান, দেখুন গিয়ে! আমি তার কী করব? আমাদের এখন সারা রাত এখানে পড়ে থাকতে হবে? থানা থেকে কিছু খবর পাঠিয়েছে?

রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, এ লোকটা তো আচ্ছা দেখছি! একটা কাজের জন্য পাঠানো হল, সে কাজ না পেরে নিজের লঞ্চটাই আটকে ফেলল। চড়ায়। এখন আবার গজগজ করছে!

মহীধর বলল, আমি স্যার পুলিশে কাজ করি না। পুলিশ থেকে এই লঞ্চ ভাড়া করেছে। লঞ্চ চড়ায় আটকে গেলে আমি কী করব?

সন্তু তখনও ভাবছে, প্ৰথম লোকটা ওরকম দৌড়ে পালিয়ে গেল কেন?

কারণটা বুঝতে পারা গেল তক্ষুনি। সেই লোকটা পুলিশের কনস্টেবল, কিন্তু সে একটা লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে দাঁড়িয়ে ছিল। সে রণবীর ভট্টাচার্যকে দেখেই চিনতে পেরেছে। ডিউটির সময় বড় অফিসারদের সামনে সাধারণ পুলিশদের সব সময় পুরো পোশাক পরে থাকতে হয়। তাই সে দৌড়ে ভেতরে গিয়ে হাফ-প্যান্ট আর জামা, বেল্ট, জুতো-মোজা সব পরে এসেছে তাড়াতাড়ি।

এবারে সে এসেই ঠকাস করে দুপায়ের জুতো ঠুকে একখানা স্যালুট দিল রণবীর ভট্টাচার্যকে।

রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, তক্তা ফেলো! আমরা এই লঞ্চে আগে একটু জিরিয়ে নিই। ভিজে একেবারে ন্যাত হয়ে গেছি। এক কাপ করে চা খাওয়াতে পারো সবাইকে?

স্যার, চা আর চিনি আছে, দুধ নেই।

ওতেই হবে!

কাকাবাবু বললেন, রণবীর, তোমরা বরং একটু জিরিয়ে নাও আর চা খাও! আমি কষ্ট করে এই লঞ্চে একবার উঠিব, আবার নামব, সে অনেক ঝামেলা। আমি আগে ওই লঞ্চটাতেই চলে যেতে চাই।

রণবীর ভট্টাচার্যতক্ষুনি মত বদলে বললেন, সেই ভাল, চলুন, আমরা সবাই আগে ওই লঞ্চটায় যাই। এরা ততক্ষণে চা বানাক, তারপর ওই লঞ্চেই চা পৌঁছে দেবে।

কাকাবাবু স্পিডবোটের চালককে বললেন, তুমি প্রথমে ওই লঞ্চটার চারপাশে একটা চক্কর দাও! আমি বাইরে থেকে পুরো লঞ্চটা একবার দেখতে চাই।

খুব আস্তে আস্তে লঞ্চটার চারপাশ ঘুরে আসা হল। লঞ্চটা দেখতে খুব সুন্দর। অন্য লঞ্চের মতন লম্বাটে নয়, একটু যেন গোল ধরনের। কিন্তু লঞ্চের গায়ে কোনও নাম লেখা নেই।

এবারে লঞ্চের সামনেটা দিয়ে এক এক করে সবাই ওপরে উঠে এল। কাকাবাবুকে ধরাধরি করে তুলতে হল ওপরে।

রণবীর ভট্টাচার্য বোট-চালককে বললেন, তোমার নাম কাশেম? তুমি ওই লঞ্চে চলে যাও, চা-টা নিয়ে এসো। আর দেখো তো, ওদের ওখানে তোয়ালে বা গামছা-টামছা কিছু পাও কি না! মাথা মুছতে হবে তো!

এই লঞ্চের ডেকে পা দিয়েই সন্তু হ্যাঁচো করে হেঁচে ফেলল।

রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, এই রে, ঠাণ্ড লেগে গেছে। জামা খুলে ফেলো, জামা খুলে ফেলো। নইলে নিউমোনিয়া হয়ে যাবে!

তিনি নিজেই আগে খুলে ফেললেন গায়ের জামা।

বৃষ্টি থেমে আকাশ পরিষ্কার হয়ে এসেছে। কিন্তু সন্ধে হতে আর বিশেষ দেরি নেই।

সিঁড়ি দিয়ে সবাই নেমে এল নীচে। প্রথমেই চোখে পড়ল খাবার ঘরটা। টেবিলের ওপর এখনও কপি-প্লেটগুলো রয়েছে। প্লেটের ওপর পড়ে আছে আধা-খাওয়া খাবার। কাপে অর্ধেকটা কফি। কিন্তু রান্নার অন্য জিনিসপত্র এমনকী কফির কোিটলি, জল খাওয়ার গেলাসেরও কোনও চিহ্ন নেই। সব উধাও।

লঞ্চটার নানান জায়গায় ভাঙচুরের চিহ্ন। এখানে সেখানে হাতুড়ির দাগ। কেউ যেন ভেতরের দেয়ালও পিটিয়ে পিটিয়ে ভাঙবার চেষ্টা করেছে। শোবার ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে একটা ছিন্নভিন্ন বালিশ, কেউ যেন ছুরি দিয়ে সেটাকে ফালা-ফালা করেছে। এক কোণে পড়ে আছে এক পাটি চটি। মনে হয় যেন লঞ্চটার মধ্যে একটা খণ্ডযুদ্ধ হয়ে গেছে।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, আমরা যা রিপোর্ট পেয়েছি, তাতে সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, লঞ্চটার কোনও নাম তো নেই-ই কোন দেশে তৈরি, তারও কোনও প্রমাণ নেই, মালিকের নামে কোনও কাগজপত্র নেই, কিছুতেই বোঝা যায় না। এটা কোন দেশ থেকে এসেছে। তাইতেই সন্দেহ হয়, এর সঙ্গে স্পাইং-এর কোনও সম্পর্ক আছে।

বিমান বলল, এত বড় লঞ্চ নিয়ে একা একা কেউ সুন্দরবনে স্পাইং করতে আসবে? কেন, আমাদের সুন্দরবনে গোপন কী আছে?

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, আমাদের এখানে স্পাই আসবে কেন? মনে হয়, কোনও বিদেশি স্পাই জাপান বা চিনে গিয়েছিল, তারপর হঠাৎ সে কোথাও নেমে যায় কিংবা কেউ তাকে খুন করে জলে ফেলে দেয়। তারপর খালি লঞ্চটা ভাসতে ভাসতে এখানে চলে এসেছে!

কাকাবাবুর কপালটা কুঁচকে গেছে। তিনি গম্ভীরভাবে কিছু ভাবছিলেন। এবার মুখ তুলে বললেন, আমি যা সন্দেহ করছিলুম তা-ই ঠিক! মনে হচ্ছে এই লঞ্চটা কার আমি তা জানি।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য চমকে উঠে বললেন, আপনি জানেন?

কাকাবাবু বললেন, তোমাদের পুলিশদের থিয়োরি তো এই যে, লঞ্চের মালিক খুন বা উধাও হয়ে গেছে অনেক আগেই। এখানে খালি লঞ্চটা ভাসতে ভাসতে এসে ঠেকেছে। কিন্তু যদি এর উল্টোটা হয়?

অৰ্থাৎ?

এমনও তো হতে পারে যে এই লঞ্চের মালিক কোনও কারণে নিজেই এসে পড়েছিল এখানে। হয়তো তার ইঞ্জিনের গণ্ডগোল হয়েছিল কিংবা তেল ফুরিয়ে গিয়েছিল–

হ্যাঁ, কাকাবাবু, সেটা অসম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একটা লোক এক এক এত বড় একটা লঞ্চ নিয়ে সমুদ্রে ঘুরে বেড়াবে কেন? এই লঞ্চে বেডরুম মোটে একটা, বিছানাও একটা, সুতরাং একজনের বেশি লোক ছিল না। অবশ্য, একা একা কেউ কেউ সমুদ্র পাড়ি দিয়ে রেকর্ড করার চেষ্টা করে। ফ্রান্সিস চিচেস্টার যেমন।

চিচেস্টার লঞ্চে যাননি, পাল-তোলা নৌকোয় গিয়েছিলেন।

সে যাই হোক। কিন্তু সে রকম কোনও অভিযাত্রীর কথা তো শিগগির শোনা যায়নি।

সন্তু হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, রেডিওটা কোথায়?।

কাকাবাবু সন্তুর দিকে ফিরে প্রশংসার চোখে তাকালেন। তারপর বললেন, গুড কোয়েশেচন! ছেলেটার বেশ বুদ্ধিাশুদ্ধি হচ্ছে দেখছি। সত্যিই তো, রেডিওটা কোথায়? ফরেস্ট অফিসার যখন প্ৰথম এই লঞ্চটা দেখে, তখন লঞ্চে কোনও মানুষ ছিল না, কিন্তু রেডিও চলছিল। ফরেস্ট অফিসার কি এই লঞ্চ থেকে কিছু নিয়ে গেছে?

না। হি শুড নট। তার রিপোর্টেই দেখা গেছে, তখন লঞ্চে আর কিছু সব লুট টি হয়ে গেছে। স্থানীয় লোকেরাই লুটপুটে নিয়েছে নিশ্চয়ই।

বিমান বলল, অন্য সব কিছু নিল, কিন্তু রেডিওটা নিল না কেন? কাকাবাবু বললেন, রেডিওটা নিশ্চয়ই ইন-বিল্ট। বাইরে থেকে দেখা যায় না। দেয়ালের গায়ে কোথাও সুইচ আছে, সেটা খুঁজতে হবে।

সবাই মিলে খানিকটা খোঁজাখুঁজির পর সন্তুই প্রথম খুঁজে পেল। রান্নাঘরের দেওয়ালেই রয়েছে পর পর তিনটি নিব। তার মধ্যে প্রথম নবটা ঘোরাতেই শুরু হল খুব জোরে বাজনা।

কাকাবাবু খুব মন দিয়ে সেই বাজনা শুনতে লাগলেন।

বিমান বলল, দেখা যাচ্ছে, এখানে কারা যেন হাতুড়ি দিয়ে দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করেছে। কিন্তু রেডিওর আওয়াজ শুনেও তারা রেডিও খোঁজার চেষ্টা করল না? ওই যে ওপরে জালমতন দেখা যাচ্ছে, ওর মধ্যেই বসানো আছে। রেডিওটা।

কাকাবাবু বললেন, এই লঞ্চে ডাকাতি হয়েছে অন্তত দুতিনবার। প্রথমবার এসেছিল বড় ডাকাতরা, যারা লঞ্চের মালিককে মেরেছে আর দামি দামি জিনিসপত্র নিয়ে গেছে। দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার এসেছে ছিচকে ডাকাতরা, তারা যেখানে যা পেয়েছে তাইই নিয়েছে।

বিমান জিজ্ঞেস করল, আপনি কী করে বুঝলেন, দুতিন বার চুরি-ডাকাতি হয়েছে? একবারেই তো সব নিয়ে যেতে পারে?

যে-ডাকাতরা মানুষ মারে, তারা রান্নার বাসনপত্র কিংবা চেয়ার-বেঞ্চি পর্যন্ত নেয় না। একটা জিনিস লক্ষ করেছ, এই লঞ্চে একটা চেয়ার পর্যন্ত নেই। খাবারের টেবিল আছে, তারও চেয়ার নেই। এগুলো সব কোথায় গেল?

রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, আমিও কাকাবাবুর সঙ্গে একমত। খালি লঞ্চ দেখে যে পেরেছে সে-ই একবার উঠে এসে দেখে গেছে, আর হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই নিয়ে চলে গেছে।

বিমান বলল, তাহলে তারা রেডিওটা নিল না কেন?

কাকাবাবু বললেন, এর একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে। এই লঞ্চের মালিককে যখন মেরে ফেলা হয়, তখন রেডিওটা চলছিল। তারপর প্রোগ্রাম বন্ধ হয়ে যায়, রেডিও আপনি চুপ করে যায়। দ্বিতীয় দল যখন আসে, তখন রেডিও চুপ করে ছিল। তাই তারা রেডিও যে আছে তা বুঝতে পারেনি। আমরা অনেক সময় রাত্তিরবেলা রেডিও বন্ধ করতে ভুলে যাই, পরদিন সকালে আপনাআপনি রেডিও বেজে ওঠে!

সন্তু জিজ্ঞেস করল, এখন রেডিওটা বন্ধ করে দেব?

কাকাবাবু বললেন, না।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বাজনা থেমে গিয়ে ঘোষণা শুরু হল। কিন্তু দুবোধ্য কোনও বিদেশি ভাষা, ইংরেজি নয়। সন্তু তার একবৰ্ণও বুঝতে পারল না।

কাকাবাবু বিমানকে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কোন ভাষা বলতে পারো? তুমি তো অনেক দেশে যাও।

বিমান বলল, ঠিক ধরতে পারছিনা। জার্মান নাকি?

রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, না, না, জার্মান নয়, যতদূর মনে হচ্ছে এটা সুইডিশ ভাষা!

কাকাবাবু বললেন, তোমার অনুমানই ঠিক। এটা সুইডিশ ভাষা, স্টকহলম, গোথোনবুর্গ এইসব জায়গার নাম শোনা যাচ্ছে। তা হলে আর কোনও সন্দেহ রইল না। এই বোটের মালিক ইংগামার স্মেল্ট!

তিনি কে?

বাইরে স্পিডবোটের আওয়াজ পাওয়া গেল। কাকাবাবু বললেন, চা এসে গেছে। আগে চা খেয়ে নেওয়া যাক।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, চা ওরা এখানে নিয়ে আসবে। আপনি বলুন ইংগামার স্মেল্ট কে? আপনি তাকে চিনতেন?

কাকাবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, না, তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি কখনও। ইশ, এরকম একজন মানুষের এই বীভৎস পরিণতি হল? সুন্দরবনের কয়েকটা ডাকাতের হাতে ওইরকম একজন মহান মানুষের জীবনটা গেল?

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, ইংগামার স্মেল্ট? মহান মানুষ? অথচ আমি তার নাম শুনিনি? ভদ্রলোক জাতে সুইডিশ?

কাকাবাবু বললেন, পৃথিবীর লোক এই সব ভাল-ভাল মানুষের কথা বড় তাড়াতাড়ি ভুলে যায়। ইংগামার স্মেল্ট সুইডেনের লোক হলেও কিছুদিন আমেরিকায় ছিলেন। বিরাট বৈজ্ঞানিক। যে বছর ভিয়েৎনামে যুদ্ধ শুরু হয়, সেই বছর নোবেল প্ৰাইজের জন্য ওঁর নাম প্ৰস্তাব করা হয়েছিল। উনি সেই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। উনি বলেছিলেন, কোনও বৈজ্ঞানিকের আবিষ্কার যুদ্ধের অস্ত্র তৈরি করার কাজে লাগানো যাবে না। তিনি পৃথিবীর সব বৈজ্ঞানিকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন, যেন কেউ-ই আর কোনও দেশের সরকারকে অস্ত্ৰ বানাতে সাহায্য না করে

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, হ্যাঁ, এই ঘটনা কাগজে পড়েছিলুম। সেই সময়। কিন্তু ভদ্রলোকের নাম মনে ছিল না।

কাকাবাবু বললেন, ইংগামার স্মেল্ট-এর কথা নিয়ে কয়েকটা দিন পৃথিবীর সব কাগজে হৈ-চৈ হয়েছিল, তারপর এক সময় চাপা পড়ে গেল। কিছুদিন পরে লোকে তাঁর কথা ভুলেই গেল। রাগে, দুঃখে, অভিমানে স্মেল্ট নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন।

স্পিডবোটের চালক আর পুলিশ কনস্টেবলটি একটি কেট্‌লি আর কয়েকটা গেলাস নিয়ে এল। তারপর সেই গেলাসে কালো কুচকুচে চা ঢালল।

স্পিডবোটের চালক জিজ্ঞেস করল, স্যার, আপনারা কখন ফিরবেন? রাত হয়ে গেলে তো মুশকিল হবে! আকাশের অবস্থা খারাপ, আবার ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে। ডাকাতেরও ভয় আছে।

চায়ে চুমুক দিয়ে রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, তোমরা বাইরে একটু অপেক্ষা করো! আমি একটু বাদে বলছি। মধুকর লঞ্চটাকে সারা রাত থাকতে হবে কেন? জোয়ার আসছে কখন?

জোয়ার তো আসতে শুরু করেছে, কিন্তু লঞ্চ তবু নড়ছে না। অন্য লঞ্চ এনে ওটাকে টানা দিতে হবে?

একখানা ছোট লঞ্চ উদ্ধার করার জন্য আরও দুটো লঞ্চ লাগবে? ভাল ব্যাপার! যাও, এখন বাইরে গিয়ে বসো। আমাদের দরকারী কথা আছে।

ওরা চলে যেতেই রণবীর ভট্টাচাৰ্য কাকাবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, হাঁ, তারপর? আপনি বুঝলেন কী করে যে, এটা সেই স্মেন্ট সাহেবের লঞ্চ? সুইডেনের অন্য কোনও লোকেরও তো হতে পারে? তা ছাড়া রেডিওতে সুইডিশ প্রোগ্রাম হচ্ছে বলেই যে সেখানকার লঞ্চ, তাও জোর দিয়ে বলা যায় না। গান-বাজনা শোনার জন্য লোকে কাঁটা ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে অন্য অনেক দেশের Ceia. Gosgoi i

কাকাবাবু বললেন, বছর কয়েক আগে আমি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকায় একটা লেখা আর ছবি দেখেছিলুম। ঠিক এই রকম একটা লঞ্চের ছবি। ওরা লিখেছিল, ইংগামার স্মেল্ট সেই লঞ্চে করে সমুদ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পৃথিবীর কোনও দেশের বৈজ্ঞানিকই তাঁর ডাকে সাড়া দেয়নি বলে তিনি ঠিক করেছিলেন, তিনি আর কোনও দেশেরই নাগরিক থাকবেন না। পৃথিবীর বড় বড় সমুদ্রগুলি এখনও ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার, তা কোনও দেশের এলাকার মধ্যে পড়ে না। তিনি ঠিক করেছিলেন, জীবনের বাকি কয়েকটা দিন তিনি সেই জলে জলেই কাটিয়ে দেবেন।

বিমান বলল, অদ্ভুত প্রতিজ্ঞা তো!

পৃথিবীতে দুচারজন মানুষ এখনও এরকম অদ্ভুত হয় বলেই মানুষের জীবনে এখনও বৈচিত্ৰ্য আছে। নইলে সব মানুষই তো একরকম হয়ে যেত।

সন্তু জিজ্ঞেস করল, কিন্তু অতদিন জলের ওপর ভেসে থাকলে ওঁর খাবার ফুরিয়ে যাবে না?

খাবার তো ফুরিয়ে যাবেই, তার চেয়েও বড় সমস্যা হল পানীয় জলের। সমুদ্রের জল তো খাওয়া যায় না! সেইজন্য মাঝে-মাঝে উনি কোনও বন্দরে এসে কিছু খাবার-দাবার আর মিষ্টি জল সংগ্রহ করে নিতেন। একলা বুড়ো মানুষ, ওঁর বেশি কিছু লগত না।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, আপনি ছবছর আগে খবরটা দেখেছিলেন? এতদিন ধরে উনি সমুদ্রের বুকে ভাসছেন? এতদিন যে কেউ ওঁকে মেরে ফেলেনি, সেটাই তো আশ্চর্য ব্যাপার। শেষ পর্যন্ত ভদ্রলোকের মৃত্যু হল। কিনা আমাদের দেশে এসে! যাই হোক, আপনার কথায় তবু একটা সূত্র পাওয়া গেল। এখন সুইডেনে খবর পাঠালে সেখানকার সরকার নিশ্চয়ই কিছু খোঁজ দিতে পারবে। লঞ্চটাও আমরা সেখানে ফেরত পাঠিয়ে দেব! তা হলে এখন ফেরা যাক?

কাকাবাবু বললেন, সেই ভাল। তোমরা ফেরার ব্যবস্থা করো। আমি আজ রাতটা এখানে থাকব।

আপনি এখানে থাকবেন? কেন?

এতদূর যখন এসে পড়েছি, তখন দুএকটা জিনিস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাই। ইংগামার স্মেল্ট-এর মৃতদেহটা পাওয়া যায়নি কেন?

মৃতদেহ পাওয়া যাবে কী করে? এ জায়গাটা সমুদ্রের এত কাছে, এখানকার সব কিছুই সমুদ্রে ভেসে চলে যায়। কিংবা ডেডবডির সঙ্গে যদি ইট-পাথর বেঁধে ফেলে দিয়ে থাকে, তাহলে কোনওদিনই তা ভেসে উঠবে না।

ইংগামার স্মেল্ট পণ্ডিত লোক ছিলেন। এই সব পণ্ডিতরা লেখাপড়া বাদ দিয়ে কিছুতেই থাকতে পারেন না। নিশ্চয়ই তাঁর এই বোটে অনেক দামি দামি বই ছিল, এই ছবছর তিনি হয়তো লিখেছিলেন অনেক কিছু, সে সবই হারিয়ে গেল?

খুবই দুঃখের কথা, কিন্তু কিছুই তো নেই দেখছি। সাধারণ চোর-ডাকাতরা কি ওই সব জিনিসের দাম ঝোঝে? বোধহয় এমনিই সব জলে ফেলে দিয়েছে।

একজন নিরীহ, নিষ্পাপ, জ্ঞানতপস্বী বৃদ্ধ, তাঁকে যারা মারে, তারা কি মানুষ না পশু? কী-ই বা এমন মূল্যবান জিনিস ছিল এখানে?

কাকাবাবুর গলার আওয়াজটা এমন হয়ে গেল, যেন তাঁর খুব আপনজন কেউ মারা গেছে। সন্তুর হঠাৎ কান্না পেয়ে গেল। একজন মানুষ পৃথিবীর সব কিছু ছেড়ে দিয়ে শুধু জলে জলে ভাসছিলেন, তাঁকে লোভী মানুষেরা বাঁচতে দিল না!

একটুক্ষণ সবাই চুপ করে রইল, তারপর রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, একটা যখন কু পাওয়া গেছে, তখন অপরাধীরা ধরা পড়বেই। কালকেই বড় পুলিশ পার্টি আনিয়ে এতল্লাটাপুরো সার্চ করবে। চলুন, কাকাবাবু, আজ আমরা ফিরে যাই। এখন সওয়া ছটা বাজে। এখনও স্টার্ট করলে আমরা রাত দশটার মধ্যে ক্যানিং পৌঁছে যেতে পারব।

তোমরা এগিয়ে পড়ে তা হলে। আর দেরি করে লাভ নেই। বিমানের পরশু ডিউটি, সন্তুর পড়াশুনো আছে-

আপনি এখানে একা থেকে কী করবেন?

কিছুই না। এমনিই থেকে যাই। স্পিডবোটটা পাঠিয়ে দিও কাল সকালে, এদিকে একটু ঘোরাফেরা করব।

না, না, আপনার এখানে একা থাকা চলবে না। খাওয়া-দাওয়ার কিছু নেই। তা ছাড়া এখানে থাকলে বিপদ হতে পারে। চোর-ডাকাতরা যে আবার আসবে না। তাই-ই বা কে বলতে পারে? আমার জন্য চিন্তা কোরো না। আমার কীরকম একটা ধারণা হয়ে গেছে, আমার কেউ ক্ষতি করতে পারবে না। কতবার কত রকম বিপদে পড়েছি। কিন্তু প্ৰাণটা তো যায়নি। এখানে আর কী হবে? আর খাওয়া-দাওয়ার কথা বলছ? এক রাত্তির আমি না খেয়ে চমৎকার কাটিয়ে দিতে পারি।

না, না কাকাবাবু, আপনাকে এখানে একা রেখে যাওয়া অসম্ভব! চলুন, চলুন এবার

শোনো, রণবীর, আজ যদি চলে যাই, কাল আর ফিরে আসা হবে না। ইংগামার স্মেল্ট-এর সত্যি কী পরিণতি হল, তা না জেনেই চলে যাব? এইসব মহান মানুষের কাছে কি আমাদের কোনও ঋণ নেই? কিছু একটা না করলে আমি শান্তি পাব না।

তা হলে এক কাজ করা যাক। আমিও থেকে যাই আপনার সঙ্গে। সন্তু আর বিমানবাবু ফিরে যাক স্পিডবোটটা নিয়ে।

সন্তু আর বিমান একসঙ্গে বলে উঠল, না, না, তা হতেই পারে না! আমরাও তা হলে থাকব।

কাকাবাবু বললেন, কিন্তু বিমানের তো পরশু ডিউটি।

বিমান বলল, আমার কাল যে-কোনও সময় ফিরলেই হবে। এমনকী, পরশু আমার দুপুর দুটোয় রিপোর্টিং, যদি দেড়টার মধ্যে দমদম এয়ারপোর্টে পৌঁছতে পারি, তাহলেই চলবে। এখন আপনাদের ফেলে আমি যেতে পারব না!

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বাঁ হাতের আঙুল দিয়ে থুতনিতে টোকা দিতে দিতে চিন্তিতভাবে বললেন, রাত্তিরে আমরা সবাই মিলে এখানে থাকব? খাবার-দাবার কিছু নেই, তা ছাড়া আমার জরুরি কাজ আছে! কাকাবাবু, আপনি মুশকিলে ফেললেন দেখছি!

আমি তো বলছি, তোমরা সবাই ফিরে যাও! আমি একলা থাকলে কোনও অসুবিধে হবে না।

সে তো আউট অফ কোশ্চেন! তা হলে থাকাই যাক! অনেকদিন এমন কষ্ট করে রাত কাটাইনি। একটা নতুনত্বও হবে?

সিঁড়ির কাছে গিয়ে তিনি হাঁক দিলেন, ওহে, শোনো এদিকে!

স্পিডবোটের চালক ওপর থেকে উঁকি দিয়ে বলল, কী বলছেন, স্যার?

রাত হয়ে গেছে, এখন ফেরা কি ঠিক হবে? আবার যদি ডাকাতরা হামলা করে? তুমি বলো, সে রকম সম্ভাবনা আছে?

বড় নদীর ওপর দিয়ে খুব স্পিডে চলে গেলে কেউ ধরতে পারবে না। আমাদের। অবশ্য দূর থেকে গুলি করতে পারে।

পারে? গুলি করতে পারে? অন্ধকারে জঙ্গলের ভেতর থেকে যদি বন্দুকের গুলি চালায়, তা হলে তো গেছি! না, না, এত কুঁকি নিয়ে রাত্তিরবেলা যাওয়া ঠিক নয়। থেকেই যাওয়া যাক, কী বলো।

আপনি যা বলবেন, স্যার!

খাওয়া-দাওয়ার কী হবে? ওই লঞ্চে চা-চিনি যথেষ্ট আছে তো? সারা রাত শুধু চা খেয়ে থাকব!

পুলিশ কনস্টেবলটি বলল, চা-চিনি আছে, আর কিছু চাল আছে, স্যার।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য উৎসাহিত হয়ে বললেন, চাল আছে? তবে আর কী! নুন নেই? আলু নেই?

নুন আছে, স্যার। আলু নেই।

ইশ। আলু থাকলে ফেনাভাত আর আলুসেদ্ধ চমৎকার খাওয়া যেত। ঠিক আছে। শুধু ফেনাভাতই সই! রাত্তিরে একেবারে খালি পেটে আমি থাকতে পারি না। ওই লঞ্চের সারেংকে বলে। আজ আমাদের ফেনাভাত খাইয়ে দিক, কাল আমি ওদের মুর্গির মাংস খাওয়াব।

ঠিক আছে, স্যার!

আর দ্যাখো তো, ওই লঞ্চে একটা শতরঞ্চি আছে কি না। এই লঞ্চে একটু বসবারও উপায় নেই।

তারপর আপন মনেই হেসে উঠে তিনি বললেন, কে জানে, আমি রাত্রে না ফিরলে আমার খোঁজে আবার একটা লঞ্চ এসে হাজির হয়। কিনা! আসে তো আসুক!
রাত্রে থেকে যাওয়াটা সার্থক হয়েছে, তা খানিকটা বাদেই কাকাবাবু প্রমাণ করে দিলে।

ভাড়া-করা লঞ্চটায় শতরঞ্চি পাওয়া যায়নি, পাওয়া গিয়েছিল দুটো ছেড়া মাদুর। তাই পেতে ওরা বসেছিল ডেকের ওপরে। আকাশ মেঘলা, চাঁদ ওঠেনি। চারপাশটা কী রকম গা-ছিমছমে অন্ধকার। নদীর জলের ছলাৎ ছিলাৎ শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। নদীটা খুব চওড়া হলেও ওদের লঞ্চ রয়েছে এক দিকের পাড় ঘেঁষে। নদীর দুদিকেই জঙ্গল। স্পিডবোটের চালক কাশেম অবশ্য ভরসা দিয়েছে যে, এদিককার জঙ্গলে বাঘ নেই, কারণ এখানে জঙ্গলটা বেশ সরু, তার ওপারেই আর একটা নদীর মুখ। কিন্তু নদীর ওপরের জঙ্গলটায় নির্ঘাত বাঘ আছে। ওই জঙ্গলটার নামই হল বাঘমারা।

বিমান জিজ্ঞেস করেছিল, বাঘ তো সাঁতরে আসতে পারে শুনেছি?

কাশেম আমতা আমতা করে বলেছিল, তা পারে। তবে এত চওড়া নদী, স্রোতের টানও খুব, এতখানি সাঁতরে বাঘ আসবে না।

রণবীর ভট্টাচার্য বলেছিলেন, সুন্দরবনের বাঘকে বিশ্বাস নেই, ওরা সব পারে। এরকম ফেরোশাস বাঘ আর সারা পৃথিবীতে নেই। এখানকার প্ৰত্যেকটা বাঘই নরখাদক।

বিমান জিজ্ঞেস করেছিল, রণবীরবাবু, আপনি কখনও বাঘ দেখেছেন? আপনি তো অনেকবার এসেছেন এদিকে।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, আমি যখন চব্বিশ পরগনার এস. পি. ছিলাম, তখন বেশ কয়েকবার। এদিকে আসতে হয়েছে। তবে বাঘ-টাঘ কখনও দেখিনি। আমি এই সব বিশ্ৰী জন্তুজানোয়ারের থেকে সব সময় দূরে থাকতে চাই।

কাশেম বলল, আমি একবার স্যার প্রায় বাঘের মুখে পড়েছিলুম।

কোথায়?

আপনার ওইদিকটায় হচ্ছে রায়মঙ্গল নদী। সেখানে ছোট মোল্লাখালি বলে একটা গ্রাম আছে। আমার বাড়ি সেখানে। সেই গ্রামে একবার বাঘ এসেছিল। এই তো মোটে দুবছর আগে—

তারপর শুরু হয়ে গেল বাঘের গল্প।

কাকাবাবু কিন্তু এই গল্পে যোগ দেননি। তিনি ওপরেও আসেননি। তিনি লঞ্চের নীচতলাতেই ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন একটা লম্বা টর্চ জেলে। কী যে তিনি খুঁজছেন, তা তিনিই জানেন। তাঁর ক্রাচের ঠক ঠক শব্দ শোনা যাচ্ছে ওপর

রণবীর ভট্টাচাৰ্য কয়েকবার কাকাবাবুকে ডেকেছিলেন ওপরে আসবার জন্য। কাকাবাবু বলেছিলেন, তোমরা গল্প করো না, আমি পরে আসছি।

রণবীর ভট্টাচার্য এমন একটা মুখের ভাব করেছিলেন, যার অর্থ হল, এমন পাগল মানুষকে নিয়ে আর পারা যায় না!

কাশেম তিন-চারটে বাঘের গল্প বলবার পর রণবীর ভট্টাচাৰ্য তাকে বাধা দিয়ে বললেন, মাত্র পৌনে আটটা বাজে, অথচ মনে হচ্ছে যেন নিশুতি রাত। আমার ঘুম পেয়ে যাচ্ছে। ওহে কাশেম, দ্যাখো না, আর এক রাউণ্ড চা পাওয়া যায় কি না?

কাশেম চলে গেল চা আনতে।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে বললেন, মাঝে-মাঝে এরকমভাবে রাত কাটানো মন্দ না। তবে বাঘ-ফাগ না এলেই বাঁচি। আর ডাকাত-ফকাত যদি এসে পড়ে, আমি একদিনে দুবার ডাকাতদের সঙ্গে লড়াই করতে পারব না!

বিমান বলল, এখানে দুটো লঞ্চ মিলে আমরা অনেক লোক, এখানে ডাকাত আসবে কোন সাহসে?

আরো ভাই আপনি জানেন না। যদি একটা ছোট মেশিনগান নিয়ে আসে, তা হলে আমরা সবাই ছাতু হয়ে যাব। বাংলাদেশ ওয়ারের পর এইসব বডর এরিয়ায় অনেকের কাছেই লাইট মেশিনগান ছিল।

সন্তু বলল, নীচে গিয়ে রেডিওটা চালিয়ে দিলে হয় না? এই রেডিওতে নিশ্চয়ই লোকাল স্টেশন পাওয়া যাবে।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, তা পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই, কাঁটা ঘুরিয়ে দাখো। শুনে এসো তো স্থানীয় সংবাদে আমাদের নিরুদ্দেশ সংবাদ শোনায় কি না?

সন্তু সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দেখল, সিঁড়ির ঠিক নীচেই কাকাবাবু দাঁড়িয়ে আছে। এক হাতে টর্চ জ্বেলে অন্য হাতে সিঁড়ির একটা ধাপ ধরে টানাটানি করছেন তিনি।

সন্তু নেমে এসে জিজ্ঞেস করল, আপনি কী খুঁজছেন কাকাবাবু?

কাকাবাবু বললেন, যা খুঁজছিলাম, তা বোধহয় এবারে পেয়ে যাব, রণবীরকে ডাকো তো!

সন্তুর ডাক শুনে রণবীর ভট্টাচাৰ্য আর বিমান দুজনেই নেমে এল।

কাকাবাবু বললেন, এবারে তোমাদের সাহায্য চাই।

বিমান বলল, কী হয়েছে, কাকাবাবু?

তোমরা একটা জিনিস চিন্তা করেনি। লঞ্চের বিভিন্ন দেয়ালে হাতুড়ি কিংবা শাবলের দাগ দেখেছিলে নিশ্চয়ই। ডাকাতরা লঞ্চের দেয়াল ভাঙবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কেন? শুধু শুধু ইস্পাতের দেয়াল ভেঙে তাদের কী লাভ? আমি অনেকক্ষণ ধরে পরীক্ষা করে দেখলুম, এই নীচতলায় সব কাঁটা ঘর আর মেশিনপত্রের জায়গা ছাড়াও চৌকো খানিকটা জায়গা রয়েছে। সেরকম রাখার উদ্দেশ্য বোঝা যাচ্ছে না। ওই জায়গাটা কিসের হবে? সেই জায়গাতে ঢোকার পথই বা কোথায়? ডাকাতরাও নিশ্চয়ই এটা লক্ষ করেছে, তাই তারা সেই চৌকো জায়গাটার দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা পারেনি। আমাদের পারতে হবে!

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, আমরা কী করে এই ইস্পাতের দেয়াল ভাঙব?

আমরা ভাঙব না, আমরা সেখানে ঢোকার রাস্তা খুঁজে বার করব। আমি দেয়ালের সব দিক তন্ন তন্ন করে দেখেছি, কোথাও কোনও ফাটল নেই। বাকি আছে এই সিঁড়িটা। এখন তোমরা দ্যাখে তো, এই সিঁড়িটা এখান থেকে সরিয়ে ফেলা যায় কি না!

সবাই মিলে টানাটানি করেও সে সিঁড়ি আধা ইঞ্চিও কাঁপানো গেল না। সেটা একেবারে পাকাপাকিভাবে নাটবলুন্টু দিয়ে আটা।

রণবীর ভটাচাৰ্য বললেন, নাঃ কাকাবাবু, আপনার ডিডাকশান ঠিক হল না। এই সিঁড়ির তলায় কিছু নেই।

কাকাবাবু তাতেও দমে না গিয়ে বললেন, এইবার দ্যাখো তো, এই সিঁড়ির ধাপগুলো ডিটাচেবল কি না?

এবারে ওরা সিঁড়িটার প্রত্যেক ধাপ ধরে টানাটানি শুরু করল। তার ফল পাওয়া গেল হাতেহাতেই। একদম ওপরের সিঁড়ির দুটো ধাপ খুলে এল সামান্য টানতেই। কাকাবাবু সেখানে টর্চের আলো ফেললেন।

সেখানে সিঁড়ির নীচে দেয়ালে একটা চৌকো বড়ার দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। এক দিকে একটা বোতাম। বিমান সেই বোতাম টিপতেই খুলে গেল একটা চৌকো দরজা।

বিমান চেঁচিয়ে বলল, কাকাবাবু, এর ভেতরে আর একটা সিঁড়ি আছে।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, কাকাবাবু, পায়ের ধুলো দিন। সত্যিই আপনি অসাধারণ! এ-ব্যাপারটা আমার মাথাতেই আসেনি।

কাকাবাবু নীচে থেকে টৰ্চটা বিমানের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, দ্যাখো তো, ভেতরে কী দেখা যাচ্ছে?

বিমান টর্চটা ঘুরিয়ে সেই চৌকো গর্তটার মধ্যে ফেলে উত্তেজিতভাবে বলল, এর ভেতরে অনেক কিছু আছে! একটা বিছানা, প্রচুর বই আর কাগজপত্তর

কাকাবাবু শান্ত গলায় বললেন, আমি জানতুম, আমি জানতুম! সমস্ত বই আর কাগজপত্র ডাকাতরা নিয়ে যাবে, এ হতেই পারে না?

রণবীর ভট্টাচাৰ্য আফসোসের সুরে বললেন, পুলিশ ডিপার্টমেন্টটা একেবারে হোপলেস হয়ে গেছে। আগে যারা এনকোয়ারি করতে এসেছে, তাদের এ ব্যাপারটা একবারও মাথায় খেলেনি!

বিমান বলল, আমি ভেতরে নেমে দেখছি!

কাকাবাবু সিঁড়ির ওপরে উঠে এলেন চৌকো গর্তটার কাছে!

বিমান নীচে থেকে বলল, এখানে প্রচুর বইপত্তর, রীতিমতন একটা লাইব্রেরি। অনেক বই মেঝেতে ছড়ানো..একটা দেয়াল-আলমারিও রয়েছে, তার পাল্লা খোলা…ওমা, একী! মাই গড?

কী হল, বিমান? কী দেখলে?

একজন মানুষ! হাত-পা বাঁধা।

কাকাবাবু এবারে আর শান্তভাব বজায় রাখতে পারলেন না। চিৎকার করে বললেন, মানুষ? ইংগামার স্মেল্ট? তাঁকে আমরা খুঁজে পেয়েছি! বিমান, বেঁচে আছেন তো উনি? বিমান!

বিমান বলল, কিন্তু, কিন্তু…কাকাবাবু, ইনি তো সাহেব নন, এ তো একজন বাঙালি! বেঁচে আছে এখনও!

রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, দাঁড়ান, আমি আসছি!

বেশি তাড়াতাড়ি নামতে গিয়ে তিনি সিঁড়ি দিয়ে স্লিপ খেয়ে পড়ে গেলেন নীচে। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে বললেন, আমার লাগেনি। কই, কই, লোকটা কই!

ভেতরের লোকটি ইংগামার স্মেল্ট নয় শুনে কাকাবাবু যেন দারুণ হতাশ হয়ে পড়লেন। ক্লান্ত গলায় বললেন, আমি আর ওই সরু সিঁড়ি দিয়ে নামব না। লোকটিকে ওপরে তুলে নিয়ে এসো।

এবারে কাকাবাবু ডেকের ওপর উঠে মাদুরে বসলেন। তারপর নিশ্বাস নিতে লাগলেন জোরে জোরে।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য আর বিমান লোকটিকে ধরাধরি করে নিয়ে এল ডেকের ওপরে। হাত-পা-মুখ বাঁধা একটি বছর তিরিশের বয়েসের লোক। গায়ে একটা নীল জামা আর খাঁকি প্যান্ট। লোকটির চুলে আর ঘাড়ে চাপ-চাপ রক্ত শুকিয়ে আছে। ওর জ্ঞান নেই, কিন্তু ক্ষীণ নিশ্বাস পড়ছে।

ঠিক সেই সময় চা নিয়ে উপস্থিত হল স্পিডবোটের চালক কাশেম। স্পিডবোট থেকে ওপরে উঠে এসে সে দারুণ চমকে গেল। এর মধ্যে একজন লোক বেড়ে গেছে!

কাশেম জিজ্ঞেস করল, স্যার, এ কে? কোথায় ছিল এ লোকটা?

রণবীর ভট্টাচাৰ্য জিজ্ঞেস করলেন, তুমি চেনো নাকি লোকটাকে?

কাশেম বলল, না স্যার। কিন্তু… এ লোকটাকে কোথায় পেলেন?

কাকাবাবু বললেন, ছোট সাধুবাবা বোধহয় এসে চিনলেও চিনতে পারত!

লোকটার হাত-পা খুলে দাও; দ্যাখো, যদি ওকে বাঁচাতে পারো?

বিমান বলল, আমি ফার্স্ট এইড জানি। আমি দেখছি।

লোকটির হাত-পা-মুখের বাঁধন খুলে দিয়ে চোখে জলের ঝাপটা দেওয়া হল। বিমান নিজের রুমাল দিয়ে ওর মাথা মুছে দিতে গিয়ে দেখল, খুলিতে অনেকখানি ফাঁকা হয়ে গেছে। কেউ কোনও ধারাল অস্ত্ৰ দিয়ে ওর মাথায় মেরেছে।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, মাথায় এরকম ক্ষত, নিশ্চয়ই ওর অনেক রক্ত বেরিয়ে গেছে। কদিন ধরে ওখানে পড়ে আছে কে জানে। কিন্তু কী কড়া জান দেখেছেন, এখনও মরেনি। লোকটা যদি বাঁচে, তা হলে কাকাবাবু, ও আপনার জন্যই বাঁচল! আজি রাত্তিরে আমরা এখানে থেকে না গেলে ও ওই চোরাকুঠুরির মধ্যেই পচে গলে শেষ হয়ে যেত।

কাকাবাবু বললেন, লোকটার জ্ঞান ফিরলে অনেক কথা জানা যাবে। আমাদের এখানকার চোর-ডাকাতদের বুদ্ধি মোটেই কম নয়। আমার আগেই তারা গোপন কুঠুরিটায় ঢোকার পথ ঠিক বার করে ফেলেছে।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, ওর ভেতরে একটা ছোট্ট সিন্দুক মতন রয়েছে, তার পাল্লা খোলা। সেখানে টাকা-পয়সা, সোনা-দানা যাই হোক দামি কিছু জিনিস ছিল নিশ্চয়ই। তা নিয়ে ডাকাতরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করেছে।

বিমান কাশেমকে বলল, তুমি এক কাপ চায়ে অনেকখানি চিনি মিশিয়ে দাও তো! থুকোজের বদলে চিনি খাওয়ালেই কিছুটা কাজ হতে পারে।

অজ্ঞান লোকটির মুখ ফাঁক করে সেরকম চা জোর করে ঢেলে দেওয়া হল তার গলায়। একটু বাদে লোকটি উঃ উঃ শব্দ করে একটু মাথা নাড়াচাড়া করল কিন্তু তার জ্ঞান ফিরল না।

কাকাবাবু বললেন, থাক, থাক, এখনই ওকে বেশি চাপ দেওয়া ঠিক নয়। তাতে ফল খারাপ হতে পারে। যেটুকু চিনি পেটে গেছে তা যদি বমি না হয়, তবে ওতেই কাজ হবে।

রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, বিমানবাবু, ইউ আর অ্যান অ্যাসেট। আপনি আজ যা সাহায্য করলেন, তার তুলনা নেই। তবে, এই লোকটার হাত আর পা দুটো আবার ওই দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখুন।

সন্তু অবাক হয়ে তাকাতেই তিনি আবার বললেন, বলা তো যায় না! হয়তো মটকা মেরে পড়ে আছে। কিংবা, একটু বাদে ভাল করে জ্ঞান ফিরলেই হঠাৎ জলে লাফিয়ে পড়তে পারে। এদের যা জীবনীশক্তি, কিছু বিশ্বাস নেই।

কাকাবাবু বললেন, সেটা অবশ্য ঠিকই বলেছ। হাত-পা বেঁধে রাখাই ভাল।

ঠিক এই সময় একটা রাতপাখি ওদের মাথার ওপর দিয়ে খ-র-র খ-র-র শব্দে ডেকে উড়ে গেল। তারপরেই শোনা গেল একটা জাহাজের ভোঁ।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, এইবার বোধহয় আমাদের খোঁজে কোনও লঞ্চ আসছে।

সবাই উঠে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। কিন্তু কোনও লঞ্চ দেখা গেল না। চতুর্দিকে জমাট অন্ধকার। খানিকক্ষণ প্রতীক্ষ্ণ করেও কোনও আলো দেখা গেল না।

কাশেম বলল, ওটা স্যার বোধহয় সমুদ্রের কোনও জাহাজের ভোঁ। রাক্তিরবেলা অনেক দূর থেকে আওয়াজ পাওয়া যায়।

রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, দূর ছাই! লঞ্চ এলে নিশ্চয়ই ভাল খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা থাকত! যাও হে, তোমার ফেনাভাত আর নুনই নিয়ে এসো। সারা দিন যা ধকল গেল, বেশ খিদে পেয়ে গেছে!

আধা ঘন্টার মধ্যেই ভাত এসে গেল। লঞ্চের ছাদে বসে সেই শুধু ভাত আর নুনই যেন অমৃতের মতন লাগল সবার। অভাবের সময় যা পাওয়া যায়। তাইই ভাল লাগে। কিছু না খেতে পাওয়ার চেয়ে শুধু গরম ভাতও কত উপাদেয়!

খাওয়া-দাওয়া শেষ হবার পর কাকাবাবু বললেন, এবারে আমি গোপন কুঠুরির কাগজপত্র পরীক্ষা করব। তোমরা আমাকে ওখানে নামতে একটু সাহায্য করো।

এই লঞ্চে নিশ্চয়ই আলো জ্বালার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু চোর-ডাকাতেরা ডায়নামো বা ব্যাটারি সবই চুরি করে নিয়ে গেছে। কাকাবাবু টাৰ্চটা বগলে চেপে ধরে অতি কষ্টে ছোট্ট সিঁড়ি দিয়ে গোপন কুঠুরিটার ভেতরে নামলেন।

একটু বাদেই তিনিই চেঁচিয়ে বললেন, রণবীর, এখানে ইংগামার স্মেল্ট-এর ডায়েরি রয়েছে। অনেক বইতেই তাঁর নাম লেখা। সুতরাং এই লঞ্চটাতে যে তিনি ছিলেন, তাতে আর কোনও সন্দেহই নেই। তোমরা ওপরে থাকো। আমি রাতটা এই ঘরেই কাটিয়ে দেব!
রাত্তিরে কেউ ঘুমোবে না ভেবেছিল, কিন্তু এক সময়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। কে যে আগে ঘুমিয়েছে, কে পরে ঘুমিয়েছে, তার ঠিক নেই। বিমানদা। আর রণবীর ভট্টাচার্যের মধ্যে কী নিয়ে যেন তর্ক বেধেছিল, এই পর্যন্ত সন্তুর মনে আছে। তারপর এক সময় ঘুমে চোখ টেনে এসেছিল তার।

সূর্যের প্রথম আলো চোখে লাগবার সঙ্গে সঙ্গে সন্তুই প্রথম জেগে উঠল। ধড়মড় করে উঠে বসে সে দেখল, বিমানদা আর রণবীর ভট্টাচাৰ্য ঘুমিয়ে আছেন। এক মাদুরে। একটু দূরে সেই হাত-পা-বাঁধা লোকটি। লঞ্চের রেলিং ঘেঁষে বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে পুলিশ কনস্টেবলটি।

ঘুম ভাঙার পর চোেখ কচলে সন্তু বুঝতে পারল, রাত্তিরে অন্তত তিনটে ব্যাপার ঘটেনি। বৃষ্টি আসেনি, বাঘ আসেনি, চোর-ডাকোতও আসেনি। তারপরেই সন্তুর মনে পড়ল কাকাবাবুর কথা। কাকাবাবু কোথায়? সিঁড়ির কাছে ডেকের ওপরেই উপুড় হয়ে শুয়ে সে উঁকি মোরল গোপন কুঠুরিটার মধ্যে। প্রথমে সে কাকাবাবুকে দেখতে পেল না। অমনি তার বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করতে লাগল। কাকাবাবু কোথায় গেলেন! হাঁচোড়-প্যাচোড় করে সে দ্বিতীয় সরু সিঁড়িটা দিয়ে নেমে এল গোপন কুঠুরিতে।

একটা খাতা কোলের ওপর নিয়ে কাকাবাবু বসে আছেন এক কোণে। তাঁর মাথাটা বুকের ওপর ঢলে পড়েছে। তিনিও ঘুমোচ্ছেন। পাশে তাঁর টর্চটা গড়াচ্ছে। কাকাবাবুর সারা মুখে ফোঁটা ঘাম।

সন্তু কাকাবাকুকে জাগাল না। সে পা টিপে টিপে উঠে এল ওপরে।

ডেকে দাঁড়িয়ে সন্তু আকাশ দেখতে লাগল।

একটু দূরে হেলে-পড়া অন্য লঞ্চটাতেও কোনও জাগরণের চিহ্ন নেই। কিন্তু নদীর বুকে কয়েকটা নৌকো চলেছে পাল তুলে। মনে হয়, সেগুলো সমুদ্রের দিকে যাচ্ছে। আকাশের পূর্বদিকে লাল আভা। মেঘ কাটিয়ে এক্ষুনি সূর্যকে দেখা যাবে। কাল রাত্তিরে গা ছমছম করছিল, এখন চারদিকে কেমন পবিত্র পবিত্ৰ ভাব!

একটু বাদেই নীচে থেকে কাকাবাবুর ডাক শোনা গেল, সন্তু! সন্তু!

সন্তু তাড়াতাড়ি নেমে এল নীচে।

কাকাবাবু বললেন, এত সরু সিঁড়ি দিয়ে আমার উঠতে অসুবিধে হচ্ছে, তুই ওপর থেকে আমার একটা হাত ধর তো। ক্রাচ দুটোও ওপরে রেখে দে।

এই সিঁড়িটায় কোনও রেলিং নেই। তাই কাকাবাবু ক্রাচ ছাড়াই সন্তুর একটা হাত ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে ওপরে উঠলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, সেই লোকটার জ্ঞান ফিরেছে?

ঘুমুচ্ছে এখনও। আমি দেখলুম। নিশ্বাসের সঙ্গে ওর বুক ওঠা-নামা করছে।

আর কেউ জাগেনি?

না।

ডেকের ওপর উঠে এসে কাকাবাবু হাত-পা বাঁধা লোকটার পাশে বসে প্রথমে তার নাকের নীচে হাত দিলেন। তারপর তার বাঁ হাতটা তুলে নিয়ে একটুক্ষণ নাড়ি দেখে বললেন, সবই তো প্ৰায় স্বাভাবিক দেখছি। ওর আর প্রাণের ভয় নেই। থাক, আর একটু ঘুমোক।

এই সময় রণবীর ভট্টাচাৰ্য একটু চোখ খুলে বললেন, ভোর হয়ে গেছে? এটা রোদ্দুর না জ্যোৎস্না?

সন্তু ফিক করে হেসে ফেলল।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, আমি কিন্তু ঘুমোইনি, সবে মাত্র একটু চোখ বুজেছি। এর মধ্যেই রোদ উঠে গেল? চা কোথায় চা? সেপাই!

রেলিং-এ ভর দিয়ে যে কনস্টেবলটি ঘুমোচ্ছিল, সে এই হাঁক শুনে হাত-পা ছড়িয়ে জেগে উঠল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট দিল একটা।

চা বানাতে বলো শিগগির! সকালে চা না খেয়ে আমি কথাই বলতে পারি না।

কনস্টেবলটি অন্য লঞ্চটির দিকে ফিরে মুখের পাশে দু হাত দিয়ে চ্যাঁচাল, এ মইধর! এ কাশেম! সাহেব চা চাইছেন। চা বানাও।

ওপাশ থেকে মহীধরের উত্তর ভেসে এল, জাল নেই!

কনস্টেবলটি কচুমাচু মুখ করে বলল, স্যার, চা কী করে হবে, জল ফুরিয়ে গেছে?

রণবীর ভট্টাচাৰ্য উঠে বসে বললেন, অ্যাঁ? বলে কী? এত বড় নদীর ওপরে ভেসে আছি, তাও বলে কিনা জল নেই?

স্যার, এই নদীর পানি ভীষণ নোনা। মুখে দেওয়া যায় না?

তা হলে কী হবে? চায়ের পাতা আছে, চিনি আছে, তবু চা তৈরি করা যাবে না জলের অভাবে, এ কথা কেউ শুনেছে কখনও? অথচ এত জল চারদিকে!

সন্তু বলল, ওয়াটার ওয়াটার এভরি হোয়ার, নট এ ড্রপ টু ড্রিংক!

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, হুঁ, তুমি এটা জানো? জল শুধু জল, দেখে দেখে চিত্ত মোর হয়েছে বিকল? কুচু পরোয়া নেই, এই নোনতা নদীর জলেই চা বানাতে বলো! লেবু আছে, লেবু?

লেবুও পাওয়া গেল না। নোনতা জলে এমন এক বিতিকিচ্ছিরি চা তৈরি হয়ে এল, যা কাকাবাবু এক চুমুক দিয়ে সরিয়ে রেখে দিলেন। সন্তুর তো বমি এসে যাচ্ছিল। বিমানও সেই চা খেতে পারল না। শুধু রণবীর ভট্টাচার্য সবটা শেষ করে তৃপ্তির সঙ্গে বললেন, আঃ! তবু তো চায়ের গন্ধটুকু আছে! এবারে বলুন, কাকাবাবু, আর নতুন কিছু জানতে পারলেন?

কাকাবাবু বললেন, চমকপ্ৰদ নতুন কথা জানতে পেরেছি। গোপন ঘরটায় ইংগামার স্মেল্ট-এর একটা ডায়েরি আছে, টর্চের আলোয় আমি তার খানিকটা পড়ে ফেলেছি। টর্চের ব্যাটারি ফুরিয়ে যাবে বলে আমি শুধু তার শেষ অংশটাই পড়েছি আগে। স্মেল্ট সাহেব প্রথম ডাকাতদলের হাতে মারা যাননি।

তার মানে?

সাহেব বুদ্ধিমান ছিলেন যথেষ্ট। যখন-তখন ডাকাতদের আক্রমণ হতে পারে ভেবে তিনি অত্যন্ত কৌশলে লঞ্চের মধ্যে ওই গোপন ঘরটি বানিয়েছিলেন। তাঁর সমস্ত মূল্যবান জিনিসপত্র ওই ঘরেই থাকত। বিপদ দেখলেই তিনি ওই ঘরে ঢুকে পড়তেন। যাই হোক, সংক্ষেপে বলি, দেড় মাস আগে স্মেন্ট জাপানের এক বন্দর থেকে রসদ সংগ্রহ করেছেন। তারপর ভেসে বেড়াচ্ছিলেন, হঠাৎ তাঁর লঞ্চের ইঞ্জিনটা খারাপ হয়ে যায়। এই সব লঞ্চে সাধারণত ওয়ারলেস সেট থাকে, বিপদে পড়লে কাছাকাছি জাহাজদের উদ্দেশ্যে এস-ও-এস পাঠানো হয়। কিন্তু স্মেল্ট পৃথিবীর কোনও মানুষের কাছ থেকে সাহায্য ভিক্ষা করবেন না বলে ওয়ারলেস সেট রাখেননি।

আশ্চর্য মানুষ। তারপর?

লঞ্চটা আপনমনে ভাসছিল। ভাসতে ভাসতে সেটা এদিকে এসে পড়ে। কম্পাস ও ম্যাপের সাহায্যে স্মেল্ট এই জায়গার অবস্থানও বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন যে, এটা ইণ্ডিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল। ক্যালকাটা পোর্ট কাছাকাছি হবে, সেখানে ইঞ্জিন সারিয়ে নেওয়া যাবে। ইন্ডিয়া হিন্দুদের দেশ, হিন্দুরা অতি শান্তিপ্রিয়, ভদ্র ও নিরীহ জাতি। হিন্দু মানে কিন্তু হিন্দু জাতি নয়। ওই সব দেশের লোকেরা সব ভারতীয়কেই হিন্দু মনে করে। এর দু দিন পরেই অবশ্য স্মেল্ট-এর অন্যরকম অভিজ্ঞতা হল। তিনি লিখেছেন, সন্ধের অন্ধকারে একদল হিন্দু ডাকাত তাঁর লঞ্চ আক্রমণ করে। ডাকাতদের লঞ্চের ওপরে উঠতে দেখেই তিনি খাওয়ার টেবিল ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে তাঁর গোপন কুঠুরিতে ঢুকে পড়েন। সেখানে বারো ঘন্টা ছিলেন। এই লেখার তারিখটা সাতদিন আগের।

তারপর?

তারপর আর কিছু লেখা নেই। এর পরের অংশটা আমাদের অনুমান করে নিতে হবে। বারো ঘন্টা লুকিয়ে থাকার পর স্মেল্ট নিজেই বোধহয় বাইরে বেরিয়েছিলেন। দৈবাৎ সেখানে দ্বিতীয় ডাকাতদলটি তক্ষুনি এসে পড়ে আর স্মেল্টকে খুন করে। কিংবা দ্বিতীয় ডাকাতদল গোপন কুঠুরির দরজা নিজেরাই আবিষ্কার করে সেখান থেকে স্মেলটকে টেনে বার করে আনে। স্মেল্ট নিজের কাছে কোনও অস্ত্র রাখতেন না।

গোপন কুঠুরির মধ্যে ধস্তাধস্তির চিহ্ন আছে।

সেটা স্মেল্টের সঙ্গেও হতে পারে। কিংবা ডাকাতরা নিজেদের মধ্যেও করতে পারে। সিন্দুকের জিনিসপত্র দেখেই সেই লোভে ডাকাতরা নিজেদের মধ্যে মারামারি শুরু করে দেয়। তার প্রমাণ তো এই একজন।

এই লোকটাকে এখন জাগানো যাক। এর পেট থেকে সব কথা বায় করতে হবে।

সন্তু বলল, আমি লোকটাকে একবার চোখ পিটপিট করতে দেখেছি।

রণবীর ভট্টাচার্য লোকটির বুকের ওপর ডান হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, এই, তোর খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই। ফেনাভাত খাবি?

লোকটি কোনও সাড়া দিল না।

বিমান বলল, ওর চোখে জলের ঝাপটা দিলেই ও চোখ খুলবে। নদীর জল তুলে আনব?

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, সে সব কিছু লাগবে না। আমি ঠিক তিন গুনব, তার মধ্যে যদি ও কথা না বলে, তা হলে ওকে চ্যাংদোলা করে ফেলে দেব নদীতে। ওর তো মরে যাবারই কথা ছিল, আমরা শুধু শুধু কষ্ট করে ওকে বাঁচাব কেন, যদি না ও আমাদের সাহায্য করে। এক-দুই-তিন?

লোকটি চোখ মেলে কোনও রকমে চি টি করে বলল, বাবু! আমি কথা কইতে পারতেছি না! মাথায় বড় ব্যথা! একটু পানি দ্যান।

তোর নাম কী?

কালু শেখ!

তোর এই অবস্থা করেছে কে?

হা-রু- দ-ফা-দা-র।

এবারে আবার তার মাথাটা ঢলে পড়ল, চোখ বুজে গেল।

বিমান বলল, লোকটার সত্যিই কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। আর বেশি প্রেশায় দিলে তার ফল খারাপ হবে।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, থাক তা হলে। গোসাবায় নিয়ে গিয়ে খানিকটা চিকিৎসা করার পর আবার জেরা করা যাবে। একজনকে যখন পেয়েছি, তখন ধরা পড়বে সব কটাই।

কাকাবাবু বললেন, শুধু হারু দফাদারকে আর ধরতে পারবে না।

কেন? ওঃ হে! এ নামটা শোনা-শোনা মনে হচ্ছে…সেই নদীতে যে লাশটা ভাসছিল…বুকে ছোরা বেঁধা।

সেই দৃশ্যটা মনে পড়তেই সন্তু চোখ বুজে ফেলল। ইশ, কীভাবে মানুষ মরে!

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, সে-ব্যাটাকেও কেউ খতম করে ফেলেছে। এই সব চোর-ডাকাতদের এই তো হয়। অন্যদের মেরে ধরে যে-সব টাকা-পয়সা নিয়ে আসে, তা নিজেরাও ভোগ করতে পারে না। নিজেরাও আবার মারামারি করে মরে।

বিমান মুখ তুলে বলল, ওই যে একটা লঞ্চ আসছে। রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, এবারে আমার খোঁজে। সত্যিই এসেছে। চলুন এখন ফিরে যাওয়া যাক। ভদ্রগোছের এক কাপ চা না খেলে। এরপর আমার মাথা ধরে যাবে! কাকাবাবু, আর তো এখানে কিছু করার নেই, কী বলুন?

কাকাবাবু চুপ করে রইলেন।

তৃতীয় লঞ্চটিতে রয়েছেন আকবর খান আর প্রশান্ত দত্ত। দুজনেই বসেছিলেন সারেঙ-এর ক্যাবিনে। সেই লঞ্চটি কাছে এসে লাগতেই দুই পুলিশের অফিসার বেরিয়ে এলেন।

আকবার খান দারুণ চিন্তিতভাবে বললেন, কী ব্যাপার স্যার। কাল রাত্রে ফিরলেন না, কোনও খবরও দিলেন না? আমরা এমন অ্যাংজাইটিতে ছিলাম…সারারাত ভাল করে ঘুমোতেই পারিনি।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য চওড়াভাবে হেসে বললেন, বাঃ বেশ, বেশ! রাত্তিরবেলা আমরা ডাকাতের হাতে খুন হতে পারতাম কিংবা বাঘের পেটে চলে যেতে পারতাম, তোমরা খোঁজ নিতে এলে সকালে।

আকবর খান একটু অপ্ৰস্তুত হয়ে বললেন, কী করব, আপনারা ফিরবেন। বলে আমরা রাত এগারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম, তারপর-

তারপর ডাকাতের ভয়ে আর অত রাত্তিরে এলে না, তাই তো? পুলিশ ফোর্সও যদি ডাকাতের ভয় পায়-

না, স্যার, সেজন্য নয়। বোটের সারেঙকে আর তখন খুঁজে পাওয়া গেল না। সে তার গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিল। তারপর তাকে ডেকে আনতে আনতেই ভোর হয়ে গেল-

যাক গে, যা হয়েছে বেশ হয়েছে। তোমাদের লঞ্চে চা বানানোর জল আছে তো?

পুলিশের লঞ্চে অনেক কিছুই মজুত থাকে। সবাই মিলে এবার চলে আসা হল সেই লঞ্চে। হাত-মুখ ধুয়ে ভাল চায়ের সঙ্গে ওমলেট আর টোস্টিও খেয়ে নিল সবাই। — *

এরই মধ্যে পুলিশের লঞ্চের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা হল দ্বিতীয় লঞ্চটাকে। তারপর পুলিশের লঞ্চ চালু করে দু-তিনবার টান দিতেই মহীধর সারেঙ-এর লঞ্চ চড়া ছেড়ে ভেসে পড়ল জলে। এবারে সেই দড়ি দিয়েই বিদেশি লঞ্চটাকে বেঁধে দেওয়া হল পুলিশের লঞ্চের সঙ্গে। ডাকাতদের সেই খালি নৌকোটাকেও বেঁধে দেওয়া হল এর পেছনে।

সবই ঠিকঠাক। এবারে ফেরার পথে রওনা দিলেই হয়।

স্পিডবোটে যে-কজন এসেছিল, তারাই আবার বসেছে। স্টার্ট দেবার আগে রণবীর ভট্টাচাৰ্য জিজ্ঞেস করলেন, কাকাবাবু, আপনি এখনও গম্ভীর হয়ে আছেন, কিছু বলছেন না যে? ব্যবস্থাটা আপনার পছন্দ হয়নি? এখানে আর কিছু করার আছে?

কাকাবাবু বললেন, নাঃ, আর কী করার থাকতে পারে! তবে, মনটা এখনও খচখচ করছে। ইংগামার স্মেল্ট-এর মৃতদেহটার কোনও সন্ধান পাওয়া গেল না। ধরে যদি কোনও উপায়ে তিনি এখনও বেঁচে থাকেন?

এর পরেও তিনি বেঁচে থাকতে পারেন? লঞ্চটায় কি আরও কোনও গোপন কুঠুরি আছে আপনি বলতে চান?

না, তা নেই। সেটা ভাল করেই দেখেছি। তবু স্মেল্ট-এর মৃতদেহ দেখতে পাওয়া যায়নি বলে মন কিছুতেই মানছে না।

তা হলে আপনি এখন কী করতে চান?

এখান থেকে সমুদ্র তো খুব বেশি দূরে নয়, একবার সমুদ্রের মুখ পর্যন্ত ঘুরে এলে হয় না? ওর ডেডবডিটা যদি সমুদ্রে ভেসেও যায়, আবার ফিরে আসতে পারে। সমুদ্র কোনও কিছু একেবারে নিয়ে নেয় না, ফিরিয়ে দেয়।

সে রকম ফিরে পাওয়ার আশা কিন্তু খুবই কম।

তা হলেও একবার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী? ওরকম একটা মানুষের দেহ হাঙরে-কুমিরে ছিঁড়ে খাবে? যদি খুঁজে পাওয়া যায়, তা হলে আমরা সসম্মানে কবর দিতে পারি।

কিন্তু কাকাবাবু, উনি তো সমুদ্রের বুকেই মরতে চেয়েছিলেন!

তার মানে তুমি আর সময় নষ্ট করতে চাও না। ঠিক আছে, ফিরেই চলো।

না, না, আমি সে-কথা বলিনি! সমুদ্রের মুখটা ঘুরে আসতে আসতে কতক্ষণই বা লাগবে! অন্য একটা লঞ্চও আমাদের সঙ্গে চলুক। আমরা নদীর দুদিক দেখতে দেখতে যাব। বলা যায় না, নদীর ধারে কোনও ঝোপঝাড়ের মধ্যে ডেডবডিটা আটকে থাকতেও পারে?

রণবীর ভট্টাচার্য সেইমতন আদেশ দিলেন। পুলিশের লঞ্চটা থেকে দড়ি খুলে ফেলা হল। সেটা চলল। নদীর বাঁদিক দিয়ে। আর নদীর ডান দিক দিয়ে চলল স্পিডবোটটা। ডান দিকেই জঙ্গল বেশি ঘন। সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে এক দৃষ্টিতে দেখতে লাগল নদীর পাড়, কোথাও ঝোপ নেমে এসেছে জলের মধ্যে, সেখানে খুব কাছে নিয়ে যাওয়া হতে লাগল স্পিডবোটটাকে।

এক ধরনের হলদে হলদে ছোপ-লাগা সবুজ ঝোপের দিকে আঙুল উঁচিয়ে রণবীর ভট্টাচাৰ্য সকৌতুকে বললেন, এই সব ঝোপের মধ্যে সাধারণত বাঘ লুকিয়ে থাকে। খুব ভাল ক্যামুফ্ল্যাজ হয়। এগুলোকে বলে হেঁতাল। তাই না হে কাশেম, ঠিক বলিনি?

কাশেম বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার

এখন একখানা বাঘ ঝপাৎ করে আমাদের উপর লাফিয়ে পড়লে তারপর আমাদের লাশ খুঁজতে আসতে হবে অন্য লোককে। হা-হা-হা।

কাকাবাবু, কিন্তু এইসব কৌতুকে একটুও অংশগ্রহণ করছেন না। তাঁর মুখখানা থমথমে।

বিমান হঠাৎ বলল, নদীর মাঝখানে অতগুলো গাছ কেন? আমরা ওদিকটা দেখব না?

সবাই একসঙ্গে বাঁদিকে ঘাড় ফেরাল। নদীর মাঝখানে শুধু গাছ নয়, আট-দশখানা ঘরও রয়েছে। রীতিমতন একটা দ্বীপ। ওরা কেউ সেদিকে এতক্ষণ তাকায়নি, দ্বীপটা অনেকখানি পার হয়ে এসেছে।

কাশেম বলল, এই দ্বীপটা ছ বছর হল জেগেছে স্যার। লোকে এটাকে বলে মনসা দ্বীপ। বড্ড সাপ ছিল ওখানে। এখন জেলেরা থাকে।

কাকাবাবু বললেন, ওই দ্বীপের কাছে চলো।

দ্বীপটির আকার অনেকটা ওল্টানো মাটির প্রদীপের মতন। মাথার দিকটা একেবারে সরু, সেখানে শুধু বালি। কাছাকাছি আসতে দেখা গেল, সেই বালির ওপর দিয়ে একটা আট-ন বছরের নেংটি পরা ছেলে কী একটা বড় জিনিস টানতে টানতে নিয়ে চলেছে।

আরও কাছে যেতে বোঝা গেল, সেটা একটা লোহার চেয়ার।

কাকাবাবু রণবীর ভট্টাচার্যের সঙ্গে চোখাচোখি করলেন। রণবীর ভট্টাচাৰ্য শিস দিয়ে উঠে বললেন, হোয়াট এ লাকি ব্রেক! জেলেদের গ্রামে ডেক-চেয়ার। কাকাবাবু, আপনি কি ম্যাজিক জানেন? কিংবা আপনার ইনটুইশান এত স্ট্রং!

স্পিডবোটটা থামতেই ছেলেটা ভয় পেয়ে ছুটে পালাতে যাচ্ছিল, তার আগেই বিমান লাফিয়ে নেমে গিয়ে ছেলেটাকে ধরল। অমনি ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল ছেলেটা।

রণবীর ভট্টাচার্য নেমে গিয়ে ছেলেটার কাছে গিয়ে বললেন, এই ভয় নেই তোর। আমরা ছেলেধরা নয় রে। তোর বাবা কোথায়?

ছেলেটার কান্না শুনে দুজন বউ বেরিয়ে এল খড়ের চালাঘর থেকে। ভদ্রলোকদের দেখেই তারা ছুটে আসতে আসতে থমকে দাঁড়াল। তারপর একপাশ ফিরে ঘোমটায় মুখ ঢেকে তাদের মধ্যে একজন বলল, পুরুষ মানুষরা কেউ ঘরে নেই, মাছ ধরতে গেছে, আপনারা কে?

রণবীর ভট্টাচার্য এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এই চেয়ারটা কার?

একজন বউ বলল, কী জানি! কেউ এখানে ফেলে দিয়ে গেছে! এই নকু, এদিকে চলে আয়!

নকু সেই বাচ্চা ছেলেটার নাম। সে বিমানের হাত ছাড়িয়ে নেবার জন্য মোচড়া-মুচুড়ি করছে।

বিমান তাকে জিজ্ঞেস করল, এই চেয়ারটা কোথায় পেয়েছিস রে?

ছেলেটা উঁ-উঁ করতে লাগল শুধু।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য এগিয়ে গেলেন ঘরগুলোর দিকে। তিন-চারটে ঘরের মাঝখানে একটা বড় খড়ের গোলা।

একজন বউ ঘোমটায় পুরো মুখ ঢেকে রণবীর ভট্টাচার্যের একেবারে কাছে চলে এসে বলল, পুরুষরা কেউ নেই, আপনারা বিকালে আসবেন!

রণবীর ভট্টাচাৰ্য মাটি থেকে একটা বাখারি কুড়িয়ে নিয়ে সেইখড়ের গাদার মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন। একটা শক্ত কিছুতে বাখারিটা লাগল। তিনি বাখারি দিয়ে সেখানকার খড় পরিষ্কার করতে করতে বললেন, জিনিসপত্র লুকিয়ে রাখবার জন্য খড়ের গাদা খুব ভাল জায়গা। আরও কটা চেয়ার রয়েছে দেখছি, আর একটা ডায়নামো! এগুলো কে রেখে গেছে?

বউটি বলল, আমরা জানি না গো বাবু, কারা যেন ফেলে রেখে গেছে। রাতের বেলা ফেলে দিয়েছে এখানে।

তারপর তোমরা এখানে লুকিয়ে রেখেছ?

আমরা কিছু জানি না।

রণবীর ভট্টাচার্য চেঁচিয়ে বললেন, কাকাবাবু, এখানে অনেক মালপত্র পাওয়া গেছে।

কাকাবাবু স্পিডবোট থেকে নামেননি। তিনি বললেন, পুরো দ্বীপটাই সার্চ করা দরকার।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য মুখ তুলে দেখলেন, বা দিক দিয়ে পুলিশের লঞ্চটা অনেকটা এগিয়ে চলে গেছে।

ঠিক আছে, ব্যস্ততার কিছু নেই। লঞ্চটা ফিরে আসুক, এখানে পুলিশ পোস্টিং করিয়ে দেব।

আরও কয়েকজন মহিলা ঘর থেকে বেরিয়ে ভিড় করে দাঁড়িয়েছে। কয়েকটি খুবই বাচ্চা ছেলেমেয়ে মায়েদের আঁচল জড়িয়ে জুলজুল করে দেখছে। এইসব অচেনা লোকদের।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, দেখলে মনে হয় একটা শাস্তশিষ্ট গ্ৰাম। অথচ এখানেও খুনে-ডাকাত রয়ে গেছে।

বিমান বলল, হয়তো সত্যিই ডাকাতরা চেয়ার-টেয়ারগুলো ফেলে গেছে। এই দ্বীপে। এরা লোভ সামলাতে পারেনি, তাই লুকিয়ে রেখেছে। এই ছেলেটাই ধরিয়ে দিল। ও যদি একটা চেয়ার নিয়ে খেলা না করত, আমরা সন্দেহ করতুম না। ছেলেটাকে ছেড়ে দেব?

কাকাবাবু বোটের উপর থেকে বললেন, না, ওকে ছেড়ে না, ওকে ধরে রাখো।

তারপর কাকাবাবু হাতছানি দিয়ে রণবীর ভট্টাচার্যকে কাছে ডেকে কানে কানে ফিসফিস করে কী যেন বললেন।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য মাথা নেড়ে বললেন, ঠিক বলেছেন, তা তো করতেই হবে?

আবার তিনি ঘরগুলোর দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, ওগো মেয়েরা, আপনারা শুনুন! আপনাদের এখানে চোরাই মাল রয়েছে, পুলিশে আপনাদের ধরবে। এইসব মালপত্তর কে এখানে এনেছে, তার নামটা বলে দিন, তাহলে আপনারা ছাড়া পাবেন। নইলে সক্কলকে পুলিশ চালান করে দেবে!

মেয়েরা কেউ কোনও কথা বলল না।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য আবার বললেন, আপনারা যদি সত্যি কথা না বলেন, তাহলে আমাকে আমার দায়িত্ব পালন করতেই হবে। এই ছোট ছেলেটি চোরাইমাল সমেত হাতে-হাতে ধরা পড়েছে। সুতরাং একে আমরা ছেড়ে দিতে পারি না। একে নিয়ে চললুম।

তিনি এসে ছেলেটির আর-একটা হাত ধরে বললেন, চলুন, বিমানবাবু, ছেলেটাকে বোটে নিয়ে চলুন!

দুজনে মিলে ছেলেটাকে উঁচু করে তুলে ধরলেন। ছেলেটা দুপা ছুঁড়ে চ্যাঁচাতে লাগল প্ৰাণপণে। মহিলারা ছুটে এল সবাই। তারা সবাই মিলে চিৎকার করে কী বলতে লাগল, তা বোঝাই গেল না।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, উঁহু, সরকারি কাজে বাধা দেবেন না। এ ছেলে চোরাইমাল সঙ্গে রেখেছে, একে থানায় নিয়ে যেতেই হবে?

ছেলেটা কান্না থামিয়ে হঠাৎ বলল, আমায় ছেড়ে দাও গো, বাবু! এই সব জিনিস হারু দফাদার ফেলে গেছে!

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, আবার সেই হারু দফাদার! এ ছেলেটা সত্যি কথাই বলছে মনে হয়।

মহিলারা এবার বলল, হ্যাঁ গো, বাবু! ও ঠিক বলেছে, এসব হারু দফাদার ফেলে গেছে। সে আমাদের এ দ্বীপের কেউ নয়। সে অন্য জায়গায় থাকে।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য ছেলেটিকে নামিয়ে দিয়ে বললেন, ঠিক আছে, যা!

স্পীডবোটের কাছে এসে কাকাবাবুকে বললেন, ঘুরে-ফিরে সেই হারু দফাদারের নামই আসছে। সে-ই মনে হচ্ছে পালের গোদা। কিন্তু সে তো খতম হয়ে গেছে। সুতরাং তার ওপরেও একজন আছে।

কাকাবাবু বললেন, ছোট সাধুর কাছ থেকেই বাকি খবর জানতে হবে। আমার কাছে একটা লোকের ছবি আছে, সেও যদি এই ব্যাপারে জড়িত থাকে, তা হলে কিছু আশ্চর্য হব না।

ছবি! আপনার কাছে?

ক্যানিং আসবার পথে একটা লোকের ছবি তুলে রেখেছি। আমার ক্যামেরায়। লোকটির যে-রকম পালাবার গরজ ছিল, তাতে বেশ সন্দেহ হয়।

আসবার পথে সেই গোরুর গাড়ির সঙ্গে জিপের দুর্ঘটনার কথাটা কাকাবাবু সংক্ষেপে জানালেন। তারপর বললেন, লোকটির যে-রকম চোট লেগেছে, তাতে সহজে হেলথ সেন্টার থেকে পালাতে পারবে না?

চলুন তাহলে পুলিশের লঞ্চটাকে ধরা যাক। এদের এই দ্বীপে নৌকো নেই একটাও, এরা এর মধ্যে পালাতে পারবে না কেউ।

সবাই উঠে পড়ার পর স্পিডবোটটা সবে মাত্র ছেড়েছে, অমনি বিমান বলে উঠল, এ কী, সন্তু কোথায়? সন্তু?

কাকাবাবু বললেন, থামাও! থামাও!

সন্তু কোথায় গেল?

সঙ্গে-সঙ্গে দূর থেকে সন্তুর গলা শোনা গেল, কাকাবাবু! কাকাবাবু! তারপরেই একটা গুলির শব্দ! সেই আওয়াজটার যেন প্ৰতিধ্বনি গেল নদীর দুপাড় থেকে।

দুএক মুহূর্ত সবাই থমকে থাকবার পরই বিমান লাফিয়ে নেমে পড়ে ছুটিল আওয়াজ লক্ষ করে।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, আপনি দাঁড়ান! আমি আগে যাচ্ছি, আওয়াজটা রিভলভারের!

কাকাবাবু নেমে পড়লেন স্পিডবোট থেকে। চোখ দুটো জ্বলছে। সন্তু কখনও বিপদে পড়লে তাঁর মুখের চেহারা সাংঘাতিক হয়ে যায়। সন্তুকে কেউ মারলে তাকে তিনি পাগলা কুকুরের মতন গুলি করতেও দ্বিধা করবেন না।

নরম বালির ওপর কাকাবাবুর ক্রাচ বসে যাচ্ছে, তবু তিনি যতদূর সম্ভব এগোতে লাগলেন তাড়াতাড়ি।

গুলির শব্দ শুনে মহিলারা সবাই দৌড়ে ঘরে ঢুকে গেছে। দুতিনজন ভয়ে কাঁদতে শুরু করেছে। যে-ছেলেটা প্ৰথমে ডেকচেয়ার নিয়ে খেলছিল, সে হঠাৎ দৌড়ে এসে একটা ঘরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ওইদিকে?

কাকাবাবু সেদিকে আর একটু এগিয়ে দেখলেন, সেই ঘরটার দুপাশে বিমান আর রণবীর ভট্টাচাৰ্য দাঁড়িয়ে খুব সাবধানে পেছন দিকে উঁকি দিচ্ছে।

কাকাবাবুঘরটার কাছে এসে ডাক দিলেন, সন্তু! সন্তু!

কোনও সাড়া এল না।

কাকাবাবু রিভলভার হাতে নিয়ে বিমানের পাশে এসে দাঁড়ালেন। বিমান ফিসফিস করে বলল, সন্তু ঠিক আছে, কিছু হয়নি।

কাকাবাবু উঁকি দিয়ে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখলেন। মাটির মধ্যে একটা লম্বা গর্ত, সেই গর্তের মধ্যে একজন মানুষ। লোকটির একটা হাত রয়েছে গর্তের বাইরে, সেই হাতে একটি রিভলভার। গর্তটা থেকে খানিকটা দূরে রয়েছে একটা কালো মাটির হাঁড়ি। কিন্তু সন্তুকে দেখা গেল না।

কাকাবাবু ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, সন্তু কোথায়?

বিমান বলল, আমি দেখলুম, সন্তু ইচ্ছে করে গড়িয়ে গড়িয়ে জলের দিকে চলে গেল। গুলি লাগলেও মারাত্মক জখম হয়নি।

গর্তের লোকটার মাথায় টাকা। চোখ দুটো ভয় পাওয়া জন্তুর মতন গোল হয়ে গেছে। ঘন ঘন মাথা ঘুরিয়ে সে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে আর হাতের ভর দিয়ে গর্ত থেকে ওঠবার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না।

কাকাবাবু চেঁচিয়ে বললেন, রণবীর, তুমি ওদিক থেকে এগোও, আমি এদিক থেকে আসছি। এই লোকটা গুলি করার জন্য হাত তুললেই ওর মাথায় দুজনে এক সঙ্গে গুলি করব।

ওদিক থেকে রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, অত কথার দরকার কী! আগেই ওর মাথার খুলটা উড়িয়ে দিই না?

বলেই রণবীর আকাশের দিকে রিভলভারের মুখ করে ট্রিগার টিপলেন। পর পর দুপার।

সেই শব্দ হওয়া মাত্র লোকটা হাত দিয়ে মাথা চাপা দিল। সে বোধহয় ভাবল, তার মাথা ফুটো হয়ে গেছে। তারপর যখন বুঝল, সেরকম কিছু হয়নি, তখন মুখ তুলতেই দেখল, তার সামনে তিনজন লোক দাঁড়িয়ে আছে, তাদের দুজনের হাতে রিভলভার।

লোকটা ফুঁপিয়ে যুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।

লোকটার হাতের রিভলভার একটা লাথি মেরে সরিয়ে দিয়ে রণবীর ভট্টাচার্য বললেন, বিমানবাবু, ধরুন তো, এ হারামজাদাকে টেনে তুলি গর্ত থেকে।।

কাকাবাবু দেখলেন, কুড়ি-পঁচিশ গজ দূরে জলে গা ড়ুবিয়ে বসে আছে সন্তু। এবারে সে ছুটে এল এদিকে।

হাসি-ঝলমলে মুখে সন্তু বলল, আমার কিন্তু একটুও লাগেনি। আমি খুঁজতে-খুঁজতে এসে দেখি, এখানে একটা কালো হাঁড়ি, সেটা একটু একটু নড়ছে। আমি হাঁড়িটা টেনে সরিয়ে দিতেই লোকটা গুলি করল। কিন্তু আমি ওর পিছন দিকে ছিলুম তো, তাই ঠিক টিপ করতে পারেনি।

কাকাবাবু বললেন, তুই হাঁড়িটা না সরিয়ে আমাদের খবর দিলি না কেন?

সন্তু উত্তর না দিয়ে দুষ্ট-দুষ্ট হাসল।

রণবীর আর বিমান টানাটানি করে টাকমাথা লোকটাকে ওপরে তুলে ফেলল। তারপর দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠল, ইশ! এর কী অবস্থা?

লোকটির পেটে একটা বিরাট ক্ষত। একটা ব্যাণ্ডেজ পর্যন্ত করেনি। কী খানিকটা মলম সেখানে মাখিয়ে রেখেছে, সেইজন্য ক্ষতিটা বীভৎস দগদগে দেখাচ্ছে!

লোকটা ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলেছে।

কাকাবাবু বললেন, তোমার এই অবস্থা কে করেছে?

লোকটা বলল, আমি আর বাঁচব না গো, বাবু, বাঁচব না। আমায় তোমরা মেরে ফেলো! আমি আর যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছি না।

কাকাবাবু বললেন, কেন বাঁচবে না? আমরা তোমার চিকিৎসা করবে। স্পিডবোটে এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যাব। তুমি সেরে উঠবে।

লোকটা কান্না থামিয়ে অবাক হয়ে তাকাল কাকাবাবুর দিকে। তারপর অদ্ভুত করুণ গলায় বলল, আমায় বাঁচাবেন? ও বাবু, আমি যে মহাপাপী! আমি যে কালু শেখকে হাত মুখ বেঁধে ফেলে এসেছি! আমি যে…আমি যে…

তুমি সেই সাহেবকেও মেরেছ? লঞ্চে যে সাহেব ছিল?

না, না, বাবু, সেই সাহেবকেও আমি মারিনি। মা কালীর দিব্যি, সে সাহেবকে আমি মারিনি।

কে মেরেছে সাহেবকে?

বাবু, আমাকে একটা গুলি করে মেরে ফেলে দ্যান। আমি আর বেঁচে থাকতে চাই না।

না, তোমাকে আমরা বাঁচাব। ধরো, একে তোলো, স্পিডবোটে নিয়ে চলো!

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, এই, তুই হারু দফাদারের দলে ছিল না? তাকে কে মেরেছে?

লোকটি এবারে খানিকটা দম নিয়ে পরিষ্কার গলায় বলল, তারে মেরেছি আমি। সেই কুত্তার বাচ্চা নিমকহারাম, সে ছিল আমার প্রাণের বন্ধু, এক সাথে কত কাজ করেছি, আর সেই হারু দফাদার কিনা আচমকা আমার পেটে গুলি চালালে! আমিও তারে ছাড়ি নাই, বাবু! বদলা নিয়েছি। ছুরির এক কোপে তার কলজে ফাঁসিয়ে দিয়েছি।

লোকটা এর পর দারুণভাবে হাঁপাতে লাগল।

কাকাবাবু আঙুল দিয়ে তার থুতনিটা উঁচু করে ধরে তার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এবারে সত্যি কথা বলে তো? সেই সাহেবকে কে মেরেছে? তুমি না হারু দফাদার?

লোকটা আস্তে আস্তে বলল, মা কালীর কিরে, বনবিবির কিরে, আমি তারে মারিনি! হারুও তারে মারেনি। কালু শেখ তারে জড়িয়ে ধরেছিল, কিন্তু ছুরি মারবার আগেই সাহেব জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে!
এর পরে যা ঘটল তাকে অসম্ভব বা অলৌকিক বলা যেতে পারে। ঠিক যেন একটা রূপকথা।

ইংগামার স্মেন্ট মারা যাননি, জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, একথা জানিবার পর পুরো পাঁচ ঘন্টা ধরে পুরো এলাকাটা তন্ন-তন্ন করে খুঁজে দেখা হল। নদীর দুধারে প্রতিটি ইঞ্চিও দেখা বাকি রইল না। কিন্তু জীবিত বা মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল না ইংগামার স্মেল্টকে।

এর মধ্যে স্পিডবোটের ডিজেল ফুরিয়ে গিয়েছিল, পুলিশের লঞ্চ থেকে নেওয়া হয়েছিল ডিজেল। ভাড়া করা লঞ্চটাকেও খোঁজার কাজে লাগানো হয়েছিল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না।

বেলা দুটোর সময় রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, নাঃ! লেটুস কল ইট এ ডে! আর খুঁজে লাভ নেই!

বিমান বলল, জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়লেও, এত স্রোত, তাছাড়া এই নদীতে কামঠ আছে। সাহেবের প্রাণে বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম। সাহেবের বয়েসও তো হয়েছিল অনেক, তাই না কাকাবাবু?

কাকাবাবু ক্লান্তভাবে বললেন, হ্যাঁ। প্রায় চুয়াত্তর! চলো, তাহলে ফেরা যাক! সাহেব জলে মরতে চেয়েছিলেন, জলেই প্ৰাণ গেছে।

স্পিডবোটটা তখন প্রায় সমুদ্রের মোহনার কাছে। ফেরার জন্য স্পিডবোটের চালক কাশেম এমনই ব্যস্ত হয়ে গেল যে, প্রচণ্ড স্পিড তুলে দিল। আর মোটরের আওয়াজ হতে লাগল। এত জোরে যে, কারুর কোনও কথা বলার উপায় নেই। সবাই নিস্তব্ধ।

কিন্তু রণবীর ভট্টাচার্য বেশিক্ষণ চুপ করে বসে থাকতে পারেন না। তিনি বুকে পড়ে কাশেমের পিঠে হাত রেখে বললেন, ওহে, একটু আস্তে চালাও! আমাদের মেরে ফেলতে চাও নাকি?

কাশেম মুখ ফিরিয়ে বলল, অ্যাঁ? কী বলছেন স্যার? অ্যাঁ?

একটু আস্তে চালাও!

অ্যাঁ? অ্যাঁ?

তার পরেই কিসে প্ৰচণ্ড এক ধাক্কা লেগে উল্টে গেল স্পিডবোটটা। সবাই ছিটকে পড়ে গেল জলে।

কামঠের ভয়ের চেয়েও সন্তুর বেশি ভয় হল কাকাবাবুর জন্য। কাকাবাবু বলেছিলেন, তিনি সাঁতার কাটতে পারবেন না। সে এদিক-ওদিক চেয়ে কাকাবাবুকে খুঁজতে লাগল।

ওদের মহা সৌভাগ্য এই যে, স্রোতের টান নেই একেবারে। সময়টা জোয়ার আর ভাটার ঠিক মাঝখানে। এই সময়ে জল প্ৰায় স্থির থাকে, কোথাও অবশ্য ঘূর্ণি হয়।

একটা বড় গাছ ভেসে আসছিল, কাশেম অন্যমনস্ক হওয়ায় সেই গাছেই ধাক্কা লেগে উল্টে গেছে স্পিডবোটটা।

একটু দূরে কাকাবাবুর মাথাটা একবার দেখতে পেয়ে সন্তু ড়ুবসাঁতারে কাছে চলে গিয়ে কাকাবাবুকে ধরতে গেল। কাকাবাবু মুখ উঁচু করে বললেন, আমি ঠিক আছি। আমি পেরে যাচ্ছি।

পুলিশের লঞ্চটা কাছেই ছিল। তারা স্পিডবোটটা উল্টে যাওয়া দেখতে পেয়েছে। তারা অমনি আসতে লাগল। এদিকে। লঞ্চের ঢেউয়ে কাকাবাবু আরও সহজে ভেসে যেতে লাগলেন পাড়ের দিকে।

তীর থেকে বোটটা খুব বেশি দূরে ডোবেনি। একটুক্ষণের মধ্যেই সবাই পৌঁছে গিয়ে গাছের শিকড় ধরল।

রণবীর ভট্টাচার্য হেসে বললেন, কেলেংকারি ব্যাপার! আমিই বোধহয় ডোবালাম বোটটাকে, তাই না? আমি যদি কাশেমকে না ডাকতুম—

কাশেম এবারে আর পুলিশের বড়সাহেবকে খাতির করল না। বেশ রাগতভাবে বলল, আপনিই তো স্যার আমায় অন্যমনস্ক করে দিলেন। আমি ঠিকই চালাচ্ছিলুম!

রণবীর ভট্টাচার্য সেইরকম হাসিমুখে বললেন, যাক, এ যাত্রায় অনেক কিছুই তো হল, জলে ডোবাটাই বা বাকি থাকে কেন? সবই হয়ে গেল! আমরা সবাই তো বেঁচে গেছি।

উঠে দাঁড়িয়ে তিনি পুলিশের লঞ্চের উদ্দেশে খুব জোরে চেঁচিয়ে বললেন, আমরা সবাই ঠিক আছি। তোমরা স্পিডবোটটাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করো?

স্পিডবোটটা উল্টো হয়ে ভেসে চলেছে দুলতে দুলতে।

কাশেম কাকাবাবুকে দেখিয়ে বলল, ভাগ্য ভাল, নদীর জলে এখন টান ছিল না। নইলে এই বাবুর খুব অসুবিধে হত।

কাকাবাবু অন্যমনস্কভাবে বললেন, হুঁ!

তারপরই উৎকৰ্ণভাবে বললেন, ওটা কিসের শব্দ? জঙ্গলের মধ্যে তোমরা একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছ?

সবাই একসঙ্গে মনোযোগ দিল। একটা ক্ষীণ আওয়াজ সত্যিই শোনা যাচ্ছে। গাছের পাতায় হাওয়ার শব্দ? তার চেয়ে যেন কিছুটা অন্যরকম। তীক্ষ্ণ শিসের মতন। কিন্তু একটানা আর সুরেলা।

কাশেম বলল, ওটা স্যার সাপের ডাক। মাঝে-মাঝে জঙ্গলে শোনা যায়। গোখরো সাপে ওরকম ডাকে।

কাকাবাবু খাড়া হয়ে বসে বললেন, সাপের ডাক? যতসব গাঁজাখুরি কথা। সাপ কখনও ডাকে নাকি? আমার ক্রাচ দুটো ভেসে গেছে। এখন আমি কী করে যাব?

বিমান বলল, কোথায় যাবেন? এখন?

কাকাবাবু বললেন, ওটা কিসের আওয়াজ দেখতে হবে না? আমার মনে হচ্ছে, রুমানিয়ান বাঁশির আওয়াজ। আমি রুমানিয়ায় গিয়ে এই বাঁশি শুনেছি। দেখতে ছোট হারমোনিকার মতন, কিন্তু ঠিক বাঁশির সুর বেরোয়।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, সুন্দরবনে রুমানিয়ান বাঁশি?

কাকাবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, সন্তু আর বিমান, আমার দুদিকে দাঁড়া তো। তোদের কাঁধে ভর দিয়ে চল যাই, একটু দেখে আসি।

কাশেম কাকাবাবুর হাত চেপে ধরে ভয়ার্তা গলায় বলল, যাবেন না, বাবু! এ জঙ্গল বড় খারাপ! বাঘ থাকতে পারে। সাপ তো আছেই!

কাকাবাবু শান্ত গলায় বললেন, আমায় যেতেই হবে, কাশেম। তুমি এখানে বসে থাকো।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, চলুন, আমিও যাই। এ-যাত্রায় বাঘ আর সাপটাই বা দেখা বাকি থাকে কেন?

ঘন জঙ্গল ঠেলে খানিকটা যেতেই এক অপরূপ দৃশ্য দেখা গেল। একটা বড় গরান গাছের নীচে শুয়ে আছে। একজন মানুষ। লোকটিকে দেখলে হঠাৎ রবীন্দ্রনাথ মনে হয়। মাথায় ধপধপে সাদা চুল মুখেও ধপধাপে সাদা দাড়ি। তবে লোকটি পরে আছে একটি নীলরঙের প্যান্ট আর একটা ঢোল জামা। আপন মনে একটা মাউথ অগানের মতন জিনিস বাজাচ্ছে।

এত লোকের পায়ের শব্দ শুনে বৃদ্ধ বাজনা থামিয়ে চুপ করে চেয়ে রইলেন। খুব একটা অবাক হলেন না, কোনও কথা বললেন না।

কাকাবাবু হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে কম্পিত গলায় বললেন, আপনি নিশ্চয়ই ইংগামার স্মেল্ট! আপনি আমাদের শ্রদ্ধা গ্ৰহণ করুন। আপনি আমাদের দেশে দস্যুদের হাতে পড়েছিলেন। তবু যে আপনি বেঁচে আছেন, সে আমাদের পরম সৌভাগ্য। আমরা আপনাকে উদ্ধার করতে এসেছি। আপনি আমাদের সঙ্গে চলুন।

ইংগামার স্মেল্ট খুব ধীরে ধীরে কোমল গলায় বললেন, হে ভারতীয় বন্ধুগণ, আপনাদের অশেষ ধন্যবাদ। আপনারা এত কষ্ট করে কেন এই গভীর বনে এসেছেন? আমি এখানে বেশ আছি। আমার মেরুদণ্ডে খুব জোর চোট লেগেছে, আমার আর উঠে দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই।

কাকাবাবু বললেন, আমরা আপনাকে বহন করে নিয়ে যাব।

বৃদ্ধ বললেন, না, না, তার কোনও দরকার নেই। আপনারা মহানুভব, আমার জন্য আপনাদের কোনও কষ্ট করতে হবে না।

এবারে রণবীর ভট্টাচার্য এগিয়ে গিয়ে বললেন, না, আপনার কথা শুনব না। আপনি অনুগ্রহ করে আমাদের সঙ্গে চলুন। আমাদের একটু সেবা করার সুযোগ দিন।

বৃদ্ধ বললেন, তবে আপনারা শুধু আমাকে আমার লঞ্চে ফিরিয়ে দিয়ে আসুন।

বিমান আর রণবীর ভট্টাচার্য দুদিক থেকে ধরে বৃদ্ধকে তুলে দাঁড় করালেন। বৃদ্ধের মুখে একবার মাত্র কষ্টের রেখা ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল।

রণবীর ভট্টাচাৰ্য বললেন, কী আশ্চর্য কথা এই জঙ্গলে সাপ আছে, বাঘ আছে, অথচ আপনি এখানে ছদিন ধরে শুয়ে আছেন? মিরাকল আর কাকে বলে?

বৃদ্ধ বললেন, আমি একবার বাঘের ডাক শুনেছি। হয়তো আমি অশক্ত, বৃদ্ধ বলে তারা অনুগ্রহ করে আমায় ভক্ষণ করেনি। আপনারা বিশ্বাস করুন, অনেক মানুষ যত হিংস্ৰ হয়, বনের পশুরা তত হিংস্র হয় না কখনও। তারা অনেক সভ্য আর ভদ্র। বৈজ্ঞানিকদের অস্ত্ৰ যত মানুষ মেরেছে, তার চেয়ে কি পশুরা বেশি মানুষ মারতে পারে! আবার আপনাদের মতন মানুষও তো আছে!

এই কথা বলে তিনি দুঃখ-মেশানো মধুর হাসি হেসে সকলের মুখের দিকে তাকালেন।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত