তাহলে কে

তাহলে কে

সকাল বেলার আগন্তুক

রিভিও অভ রিভিওস-এ আশ্চর্য একটা ঘটনা বর্ণনা করেছিলেন ডব্লিও.টি.স্টিড। ইংল্যাণ্ডের নিউক্যাসলের একটি স্টুডিওতে এটা ঘটে। এই কাহিনিটার সত্যতা সম্পর্কে তিনি জোর গলায় বলতে পারার কারণ ছিল একাধিক মানুষ এতে সাক্ষী হিসাবে ছিলেন। আর একটা নষ্ট ছবিও এক্ষেত্রে প্রমাণ হিসাবে কাজ করে।

৪৩ গ্রেইনজার স্ট্রীটের এই দোকানটির মালিক ছিলেন মি. ডিকিনসন।

১৮৯১ সালের ৩ জানুয়ারি। সকাল আটটার একটু আগেই দোকানে পৌঁছে গেলেন ডিকিনসন। আজ একটু তাড়াতাড়ি চলে এসেছেন, কারণ যে ছেলেটার কাছে সাধারণত চাবি থাকে সে অসুস্থ। বাইরের লোহার গেটটার তালা খুলে ভিতরের ছোট গেটটাও খুললেন। তারপর দোকানে ঢুকে গ্যাস বাতি জ্বাললেন। এসময়ই বুঝলেন একজন আগন্তুক এসেছেন দোকানে। কোট আর মাথায় টুপি পরা একজন মানুষ। রোগা আর দুর্বল মনে হওয়া ছাড়া অতিথির মধ্যে আর কোনো অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ল না ডিকিনসনের।

আমার ছবিগুলো কি নিতে পারব? জানতে চাইলেন আগন্তুক।

আপনি কে? আমরা এখনও দোকান খুলিনি। একটু রূঢ়ভাবেই বললেন মি. ডিকিনসন। আগন্তুক জানালেন তার নাম থম্পসন। ডিসেম্বরে ৬ তারিখ এখানে ছবি তোলেন তিনি। পরীক্ষা করে ডিকিনসন দেখলেন ভদ্রলোকের কথা ঠিকই আছে। ৬ ডিসেম্বর ১৮৯০, শনিবার হেপবার্ন কুয়ারির মি. জে.এস.থম্পসনের নাম লিপিবদ্ধ আছে। ছয় কপি ছবির দামও পরিশোধ করেছেন ভদ্রলোক। ছবিগুলো তৈরি হয়ে যাওয়ার কথা। তাই তাঁকে কয়েক ঘণ্টা বাদে যোগাযোগ করতে বললেন।

পুরো রাত ভ্রমণ করে এসেছি। আবার আসা সম্ভব হবে না আমার পক্ষে হতাশ কণ্ঠে বললেন মি. থম্পসন। যখন দোকান ছেড়ে যাচ্ছেন তখন দোকান মালিক জানতে চাইলেন ছবিগুলো কী তারা ডাকে পাঠিয়ে দেবেন কিনা। কিন্তু কোনো উত্তর এল না অপর তরফ থেকে।

ডিকিনসনের তরুণী, বুদ্ধিমতী সহকারী মিস.সিমন এল নয়টার দিকে। মি. থম্পসনকে অস্বাভাবিক রকম মনমরা লাগছিল। তাই শুরুতেই এই বিষয়টা দেখতে, বললেন মেয়েটাকে।

কেন? গতকালই তো একজন বুড়ো মানুষ গুলোর খোঁজে এসেছিলেন। জবাব দিল সে, আমি তাকে বলেছি খারাপ আবহাওয়ার কারণে এই সপ্তাহে ওগুলো তৈরি হবে না। খারাপ আলো মোটামুটি তিন সপ্তাহ পিছিয়ে দিয়েছে আমাদের সব কাজ। পাঠকদের অনেকেরই হয়তোবা ধারণা আছে আবহাওয়া ছবির একটা ডার্ক রুমের ওপর কেমন প্রভাব ফেলতে পারে। তাও আজ থেকে সোয়াশো বছর আগে। তারপরও সন্তুষ্ট হতে পারলেন না ডিকিনসন। মেয়েটাকে প্লেটটা দেখাতে বললেন তিনি। ওটা উল্টে থাকলেও আজ সকালের আগন্তুককে চিনতে কষ্ট হলো না তার। যখনকার কথা বলা হচ্ছে তখন নেগেটিভ প্রিন্ট করা হত গ্লাস পেটে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রিন্টগুলো নেওয়ার আগেই প্লেটটা ভেঙে গেল। মি. ডিকিনসন দেরি না করে দুঃখ প্রকাশ করে থম্পসনকে চিঠি লিখলেন। সেই সঙ্গে কষ্ট করে আরেকবার এসে ছবি তুলে যাওয়ার অনুরোধ করলেন। তবে নতুন করে এর জন্য আর খরচ গুণতে হবে না তাকে। তারপরই বিষয়টা মাথা থেকে ঝেড়ে, অন্য কাজে, মনোযোগ দিলেন।

৯ জানুয়ারি, ১৮৯১। মিস সিমন এসে জানাল একজন ভদ্রলোক এসেছেন ওই নেগেটিভটার খোঁজে।

কোন্ নেগেটিভ? জানতে চাইলেন তিনি।

গত সপ্তাহে যেটা আমরা ভেঙে ফেলেছি সেটা। বলল মিস. সিমন।

আমি এই মুহূর্তে ব্যস্ত, তাই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারছি না। তবে তুমি আমার প্রস্তাবটা জাগে। তাই যত দ্রুত সম্ভব মি. থম্পসনের সঙ্গে একটা সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করো।

কিন্তু তিনি তো মারা গেছেন।

দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে নীচে নেমে এলেন ডিকিনসন। সেখানে বয়স্ক একজন লোকের সঙ্গে দেখা হলো তাঁর। বিষাদ মাখা কণ্ঠে মি. থম্পসনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করলেন তিনি। কিন্তু এটা খুবই অপ্রত্যাশিত, বললেন ডিকিনসন। গত শনিবারই মাত্র তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে।

আপনি ভুল করছেন, স্যর। বললেন বুড়ো মানুষটি। গত শনিবার মারা গেছে সে।

বুড়ো লোকটি থম্পসনের বাবা। গত শুক্রবার তাঁরই মিস. সিমনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তাঁর ছেলে ছবির জন্য খুব চেঁচামেচি করতে থাকায় বাধ্য হয়েই এখানে এসেছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন ছবি পেলে হয়তো ছেলেটা একটু শান্তি পাবে।

শনিবার সকালে মি. ডিকিনসনের সঙ্গে তবে কে দেখা করেছে তা এক রহস্যই রয়ে গেল। বুড়ো ভদ্রলোক নিশ্চিত করেছেন শরীরের ওই অবস্থায় বিছানা ছেড়ে এখানে আসা তাঁর ছেলের পক্ষে ছিল এবারেই অসম্ভব। ও এখানে আসেনি। বললেন তিনি। কারণ ছেলে আস্তে আস্তে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে তিনি আর তাঁর স্ত্রী সবসময়ই তার পাশে বসে ছিলেন। ডিকিনসন যে সময় তাঁর এখানে মি. থম্পসন এসেছেন বলছেন তখন সে আসলে এখান থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে নিজের বাড়িতে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে।

ঘটনাটিকে যদি আপনি সত্যি হিসাবে মেনে নেন তবে এর যুক্তিসংগত কোনো ব্যাখ্যা নেই। কারণ আর কেউ মি. থম্পসনের ছবি নিতে আসার কোনো কারণ নেই। আর প্লেট দেখে এবং পরে সারাই করা প্লেট থেকে বের করা ছবি দেখে থম্পসনকে চিনতে কোনো ভুল হয়নি দোকান মালিকের। আপনি হয়তো বলতে পারেন সকালে ওভারকোট আর টুপি পরা একজন লোককে দেখে ডিকিনসন ভুল করতে পারেন। হ্যাঁ, এটা হতেই পারে। তবে প্রায় কাছাকাছি চেহারার একজন মানুষ কোন্‌খান থেকে মি. থম্পসনের ছবি দাবি করতে আসবে সে প্রশ্ন রয়েই গেল।

উদ্ধার

এখন যে কাহিনিটি বলব এটা একটা সময় তুমুল সাড়া ফেলেছিল। বিখ্যাত এই বর্ণনাটা পাওয়া গেছে মি. রবার্ট ডেল ওয়েনের কাছ থেকে। এবার তাহলে মূল কাহিনিতে চলে আসা যাক।

কোবার্ট ব্রুস এক স্কটিশ পরিবারের সন্তান। আঠারো শতকের শেষভাগে ইংল্যাণ্ডের দক্ষিণে টরবেতে জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। ছোটকাল থেকেই সাগরের প্রতি টান তাঁকে জাহাজের চাকরিতে যোগ দিতে উৎসাহ জোগায়। ১৮২৮ সালে, ত্রিশ বছর বয়সে একটা বারকু্যর ( তিনটার বেশি মাস্তুল আছে এমন জাহাজ) ফাস্ট মেট হন তিনি। মূলত লিভারপুল আর নিউ ব্রান্সউইকের সেন্ট জোনসের মধ্যে যাতায়াত করে জাহাজটা।

এক অভিযানে পশ্চিমে মোটামুটি, পাঁচ-ছ সপ্তাহ চলার পর নিউ ফাউণ্ডল্যাণ্ডের পুব তীরের কাছাকাছি চলে এলেন তাঁরা। দুপুরের দিকে জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে সূর্যের অবস্থান দেখলেন ক্যাপ্টেন আর মেট। তারপর দিনের কাজের হিসাব-নিকাশ করার জন্য সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলেন দুজনে। ক্যাপ্টেনের ছোট্ট কেবিন জাহাজের স্টার্নের কাছেই। এদিকে মেটের স্টেট রুমটা খুব দূরে নয় কেবিন থেকে। স্টেটরুমের টেবিলটা দরজা লাগোয়া। ওখানে বসে কেউ কাঁধের ওপর দিয়ে তাকিয়ে কেবিনের ভিতরটা দেখতে পাবে।

এদিকে মেট তার রুমে বসে হিসাব মিলাতে গিয়ে মোটামুটি গলদঘর্ম অবস্থায় পড়ে গেছেন। জাহাজের অবস্থানের যে ফলাফল পাচ্ছেন তা মোটেই সন্তুষ্ট করতে পারছে না তাকে। কাজেই এটা নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে ক্যাপ্টেনের দিকে নজর নেই তাঁর। যখন হিসাব শেষ করলেন, না ঘুরেই চেঁচিয়ে উঠলেন, বার বার ল্যাটিচিউড আর ল্যাঙ্গিচিউড নিচ্ছি। এটা কি ঠিক আছে? আপনার হিসাব কী বলে, স্যর?

কিন্তু অপর তরফের থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে আবার একই প্রশ্ন করে ঘুরে তাকালেন। যা ভেবেছেন, ক্যাপ্টেন তার স্লেট নিয়ে ব্যস্ত। কী যেন লিখছেন। তবে এবারও কোনো উত্তর মিলল না। উঠে দাঁড়িয়ে কেবিনের দরজার দিকে এগুলেন মেট ব্রুস। এবার যাকে ক্যাপ্টেন ভেবেছেন সেই ভদ্রলোেক মাথা তুললেন। অবাক হয়ে মেট আবিষ্কার করলেন একেবারেই অচেনা একজন লোকের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি।

ব্রুসকে মোটেই ভীতু বলা চলে না। কিন্তু যখন দেখলেন ক্যাপ্টেনের জায়গায় বসে কস্মিনকালেও দেখেননি এমন একজন মানুষ সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে আছে, আর ওখানে থাকার সাহস করলেন না। আগন্তুককে কোনো ধরনের প্রশ্ন না করেই ডেকের দিকে ছুটলেন। তাঁর মনে হলো সবার আগে এটা ক্যাপ্টেনের নজরে আনা উচিত।

তা, মি. ব্রুস, কী সমস্যা নিয়ে হাজির হয়েছ তুমি? জানতে চাইলেন ক্যাপ্টেন।

সমস্যা, স্যর? আপনার ডেস্কে কে? আমার জানা মতে ওখানে কারও থাকার কথা নয়।

কিন্তু আছে। শুধু তাই না একেবারে অপরিচিত একজন মানুষ। উত্তেজনায় গলা রীতিমত কাঁপছে ব্রুসের।

একজন আগন্তুক! আমার মনে হয় তুমি স্বপ্ন দেখছ। সন্দেহ নেই স্টুয়ার্ড কিংবা সেকেণ্ড মেটকে দেখেছ সেখানে। আর আমার নির্দেশ ছাড়া কারই বা সেখানে যাওয়ার সাহস হবে।

কিন্তু, স্যর, লোকটা দরজার দিকে ফিরে আপনার চেয়ারে বসে আছে। আপনার স্লেটে কী যেন লিখছে। তারপর সরাসরি আমার দিকে তাকাল। আর তাঁকে জীবনে কখনও দেখিনি আমি।

তুমি পাগল হয়ে গেছ, মি. ব্রুস। আমরা ডাঙা ছেড়েছি প্রায় ছসপ্তাহ। এখন জাহাজে একজন অপরিচিত লোক কীভাবে দেখতে পাও?

তারপর আর কথা না বাড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলেন ক্যাপ্টেন। মেট তাকে অনুসরণ করলেন। কিন্তু কেবিনে কেউ নেই। স্টেট রুমেও ঢুকলেন তাঁরা। কিন্তু এখানেও কারও অস্তিত্ব পাওয়া গেল না।

তাহলে, মি ব্রুস, আমি বললাম না তুমি স্বপ্ন দেখেছ? কিন্তু, স্যর, তাকে স্লেটে কিছু লিখতেও দেখেছি আমি!

স্লেটে লিখেছে? তাহলে অবশ্যই ওই লেখা এখানে থাকা উচিত। এই বলে ক্যাপ্টেন ওটা হাতে নিলেন। তারপরই বিস্মিত হয়ে বললেন, হায় খোদা! এখানে আসলেই কিছু লেখা আছে। এটা কি তোমার হাতের লেখা, মি. ব্রুস?

স্লেটটা হাতে নিলেন মেট। এটার লেখা বুঝতে একটুও সমস্যা হলো না তার। এখানে বলা হয়েছে, উত্তর-পশ্চিমে জাহাজ চালাও।

তাঁর ডেস্কে বসে আছেন ক্যাপ্টেন। স্লেটটা সামনে। গভীর চিন্তায় ডুবে আছেন। তারপর স্লেটটাকে উল্টে দিয়ে ব্রুসের দিকে ঠেলে দিয়ে বললেন, এখানে লেখো, উত্তর-পশ্চিমে জাহাজ চালাও।

মেট লিখলেন। এবার দুটো হাতের লেখা মিলিয়ে দেখে ক্যাপ্টেন সেকেণ্ড মেটকে ডেকে আনতে বললেন। তিনি আসলে ক্যাপ্টেনের অনুরোধে ওই একই কথা লিখলেন স্লেটে। তারপর লিখলেন স্টুয়ার্ড। একে একে জাহাজের প্রত্যেক কর্মকর্তা আর নাবিকই কথাগুলো লিখলেন। কিন্তু একজনের হাতের লেখাও রহস্যময় সেই লেখার সঙ্গে মিলল না।

নাবিকরা সবাই চলে গেলে আবারও এক মনে চিন্তা করতে লাগলেন ক্যাপ্টেন। একসময় কথা বলে উঠলেন আনমনে, তবে কি কেউ জাহাজে লুকিয়ে আছে? দেরি না করে গোটা জাহাজ তল্লাশির নির্দেশ দিলেন তিনি।

জাহাজের প্রতিটি কোনা-কানাচ, অন্ধিসন্ধি খোঁজা হলো। কিন্তু লুকিয়ে উঠেছে এমন কারো খোঁজ মিলল না।

তারপরই জাহাজের গতিপথ বদলাবার সিদ্ধান্ত নিলেন ক্যাপ্টেন। যাই থাকে কপালে, স্লেটের নির্দেশিত পথেই জাহাজটা নিয়ে যাওয়া স্থির করেছেন তিনি। একজন লোককে সামনে কিছু আছে নাকি তা নজরদারির দায়িত্ব দেওয়া হলো। একটু পরেই সে একটা আইস বার্গের খবর নিয়ে এল। তার একটু পরেই প্রহরী জানাল একটা জাহাজও নজরে এসেছে তার।

কর্নেলের দূরবীন বিধ্বস্ত একটা জাহাজ আবিষ্কার করল। আস্তে আস্তে বরফ ওটার দখল নিয়ে নিচ্ছে। কাছে পৌঁছতেই নিশ্চিত হওয়া গেল জাহাজটা যাত্রী নিয়ে কানাডার কুইবেক থেকে লিভারপুলের দিকে যাচ্ছিল। এখন ওটা পুরোপুরি বরফে আটকা পড়ে আছে। কয়েকটা সপ্তাহ খুব খারাপ অবস্থাতেই কেটেছে ওটার। এমনকি খাবার শেষ হয়ে পানিও প্রায় শেষ হওয়ার পথে ছিল। জাহাজের নাবিক আর যাত্রীরা বাঁচার সব আশা ছেড়ে দিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুণছে এমন সময়ই এল সাহায্যটা।

বিধ্বস্ত জাহাজটা উদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সবাই। নৌকাতে করে সেখান থেকে লোকদের নিয়ে আসা হতে লাগল এই জাহাজে। তৃতীয় নৌকাটা সবে এসে ভিড়েছে জাহাজের কিনারে। একজন একজন করে লোক উঠছে জাহাজে। এমন সময় একটা লোকের চেহারার দিকে দৃষ্টি চলে গেল ফার্স্ট মেটের। ভয়ে শিউরে উঠলেন তিনি। এটাই সেই মুখ। তিন-চার ঘণ্টা আগেই যেটা দেখেছেন, ক্যাপ্টেনের ডেস্কে বসে এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। এক মুহূর্ত দেরি না ক্যাপ্টেনকে বিষয়টি জানালেন।

বিধ্বস্ত জাহাজের যাত্রীরা একটু সুস্থির হওয়ার পর রহস্যময় সেই আগন্তুকের দিকে ফিরলেন ক্যাপ্টেন। তারপর বললেন, আশা করি, স্যর, আমার আচরণে ব্রিত হবেন না আপনি। কিন্তু দয়া করে যদি এই স্লেটটাতে কয়েকটি শব্দ লিখতেন তবে দারুণ উপকৃত হতাম। তারপর স্লেটের যেদিকটায় রহস্যময় লেখাটা নেই সেদিকটা ওপরে দিয়ে তার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।

আপনি যেটা বলবেন সেটাই লিখতে রাজি আছি আমি। বললেন আগন্তুক, কিন্তু কী লিখতে হবে?

লিখুন, উত্তর-পশ্চিমে জাহাজ চালাও।

সন্দেহ নেই এমন অনুরোধে যাত্রীটি বেশ অবাক হয়েছেন। তবে কিছু না বলে হেসে শব্দগুলো লিখলেন।

এবার ক্যাপ্টেন স্লেটটা টেনে নিয়ে ভালমত পরীক্ষা করলেন লেখাটা। তারপর একপাশে সরে গিয়ে যাত্রীটির থেকে আড়াল করে ওটা উল্টে তার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।

তাহলে, ওটা আপনার হাতের লেখা? জানতে চাইলেন ক্যাপ্টেন।

মনে হয় না এর জবাব দেওয়ার প্রয়োজন আছে। কারণ আপনিই আমাকে লিখতে দেখেছেন। উত্তর দিলেন যাত্রীটি।

আর এটা। এবার স্লেটটা উল্টে দেখালেন ক্যাপ্টেন।

লোকটা প্রথমে একটা লেখা দেখলেন, তারপর আরেকটা। সন্দেহ নেই হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছেন। একসময় কথা বলে উঠলেন, এর মানে কী? আমি কেবল একটা লিখেছি। বাকি লেখাটা তবে কার?

এটা আমারও প্রশ্ন। আমার মেট আজ দুপুরে আপনাকে এটা লিখতে দেখেছে, এই ডেস্কে বসে।

বিধ্বস্ত জাহাজের ক্যাপ্টেন আর যাত্রী অবাক দৃষ্টিতে একজন আরেকজনের দিকে তাকালেন। তারপরই প্রথমজন দ্বিতীয়জনকে জিজ্ঞেস করলেন, এই স্লেটে লিখছেন, এমন কোনো স্বপ্ন কি আপনি দেখেছেন?

না, স্যর, তেমন কিছু মনে পড়ছে না।

আপনি স্বপ্নের কথা বলছেন। আজ দুপুরের দিকে এই ভদ্রলোক কী করছিলেন? জানতে চাইলেন উদ্ধারকারী জাহাজের ক্যাপ্টেন।

ক্যাপ্টেন, গোটা বিষয়টাই খুব রহস্যময় আর অদ্ভুত বলতে শুরু করলেন বিধ্বস্ত জাহাজের ক্যাপ্টেন, আরেকটু ধাতস্থ হওয়ার পর ওটা আমি আপনাকে খুলে বলতে চেয়েছিলাম। এই যাত্রীটির শরীর খুব খারাপ হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে গভীর ঘুমে ডুবে যান তিনি, ওটা দুপুরের কিছু সময় আগের কথা। এক ঘণ্টা কিংবা তার কিছুটা পরে ঘুম থেকে উঠে আমাকে বললেন, ক্যাপ্টেন আজই আমরা উদ্ধার পাব। তিনি কীভাবে এটা বলছেন জানতে চাইলে জবাব দিলেন, স্বপ্নে দেখেছেন একটা বারকুতে আছেন। আর ওটা আমাদের উদ্ধারে আসছে। তারপর জাহাজটা এবং ওটার পাল-মাস্তুল এসবের বর্ণনা দিয়ে গেলেন। আর কী আশ্চর্য, যখন আপনার জাহাজটা দেখা গেল, আমরা আবিষ্কার করলাম তাঁর বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে সব। শুরুতে তাঁর কথার ওপর খুব একটা আস্থা ছিল না আমাদের। তারপরও আশা করেছি এর মধ্যে কিছু একটা আছে। জানেনই তো ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো পেলেও আঁকড়ে ধরতে চায়। তবে সত্যি যখন তার কথা হুবহু ফলে গেল তখন আর সন্দেহ রইল না অদৃশ্য কোনো শক্তির খেয়ালেই এটা হয়েছে।

কোনো সন্দেহ নেই। বললেন বারকুর ক্যাপ্টেন, স্লেটের এই লেখাই আপনাদের জীবন বাঁচিয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমে চলছিল জাহাজ। এই লেখা দেখেই জাহাজের গতি পথ বদলে উত্তরপশ্চিমে চলার নির্দেশ দিই আমি। আর সামনে কী আছে দেখার জন্য একজন প্রহরী দাঁড় করিয়ে দিই। তারপর যাত্রীটির দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু স্লেটে কিছু লেখার স্বপ্ন দেখেননি আপনি?

না, স্যর। কীভাবে এটা হলো সে সম্পর্কে কিছুই বলতে পারব না আমি। আমার কেবল মনে হয়েছে স্বপ্নে যে জাহাজটা দেখেছি সেটা আমাদের উদ্ধর করতে আসবে। কিন্তু এটা কেন মনে হয়েছে এ সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। আর একটা আশ্চর্য বিষয় হলো, এখানের সব কিছু কেমন পরিচিত ঠেকছে আমার। কিন্তু এতে সন্দেহ নেই আগে কখনও আপনার জাহাজে উঠিনি আমি। পুরো বিষয়টাই বিস্ময়কর। কিন্তু আপনার মেট কী দেখেছে?

মি. ব্রুস এবার তার দেখা পুরো ঘটনাটা খুলে বললেন।

রাতের অতিথি

এবারের অভিজ্ঞতাটি লিমেরিকের আর্চডিকন রেভারেণ্ড জে. এ. হেইডেনের। ১৮৭৯ সালের দিকে অ্যালারির একটা চমৎকার গ্রামে বাস করতেন এক ডিস্ট্রিক্ট ইন্সপেক্টর। আমার বাসার থেকে তাঁরা যেখানে থাকতেন তার দূরত্ব আট-ন মাইল। ভদ্রলোকের সঙ্গে দারুণ একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে আমার। যখনকার কথা বলছি তখন তার স্ত্রী তৃতীয় সন্তান জন্ম দেওয়ার অপেক্ষা করছেন। ছোটখাট, হ্যাংলা-পাতলা একজন ভদ্রমহিলা তিনি। আসন্ন ঘটনাটা নিয়ে মানসিকভাবেও খুব দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই আমার বাড়িতে প্রচুর সময় কাটিয়েছেন। এমনকী এর প্রতিটি কামরা, অন্ধিসন্ধিও তাঁদের খুব ভাল চেনা।

১৮৭৯ সালের ১৭ অক্টোবর, বুধবার। বন্ধুর কাছ থেকে একটা চিঠি পেলাম। চিঠিটা পড়ে উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম। কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই গতকাল আবার বাবা হয়েছেন তিনি। আর সব কিছু ঠিকঠাকভাবেই এগুচ্ছে। কয়েকটা দিন কেটে গেল। পরের বুধবার রাত দশটার দিকে বিছানায়, গেলাম। আমার স্ত্রী, বাচ্চা আর ভৃত্য দুজন ওপরতলায় ঘুমিয়ে পড়েছে। এক তলায় স্টাডিতে ছোট্ট একটা বিছানা আছে। কখনও কখনও এখানেই ঘুমাই। অন্ধকারের চাদরে মুড়ি দিয়েছে গোটা বাড়িটা। রাতের নীরবতায় ছেদ টানছে কেবল হলরুমের ঘড়িটার টিক টিক শব্দ।

ঘুম আসবে আসবে করছে এমন সময় হালকা,দ্রুত একটা পায়ের আওয়াজ পেলাম। মনে হলো পলকা দেহের কোনো নারী হল ঘরের দরজা পেরিয়ে ঘরের ভিতর দিয়ে আসছে। তারপর মনে হলো যেন একটু দ্বিধা করল। এবার স্টাডির দিকে আসা বারান্দা ধরে হেঁটে দরজার সামনে এসে থামল। পাতলা, চঞ্চল একটা হাত দরজার হাতল হাতড়াবার আওয়াজ পেলাম। ইতিমধ্যে আমি প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছি, আমার স্ত্রী নীচে নেমে এসেছে। সম্ভবত হঠাৎ কোনো দরকার পড়েছে। বিছানায় উঠে বসে নাম ধরে ডেকে জানতে চাইলাম, কী হয়েছে। কিন্তু অপর তরফ থেকে কোনো সাড়া পেলাম না। বরং মৃদু শব্দটা থেমে গেল। কৌতূহলী হয়ে ম্যাচ ধরিয়ে একটি মোম জ্বাললাম। কিন্তু মোম হাতে দরজা খুলে কাউকে পেলাম না। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এসে দেখলাম সবগুলো দরজা লাগানো, অথৈ ঘুমে তলিয়ে আছে সবাই। বিস্মিত হয়ে স্টাডিতে ফিরে এলাম। দোর টেনে মোমটা জ্বেলে রেখেই আবার বিছানায় গেলাম। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টের পেলাম তার উপস্থিতি। আগের ঘটনাটারই পুনরাবৃত্তি ঘটল যেন। তবে এবার দরজার হাতল চেপে ধরেছে অদৃশ্য হাতটা। অর্ধেক ঘুরালও, তারপর থেমে গেল। বিছানা থেকে নেমে আগের মতই খোঁজাখুঁজি করলাম। কিন্তু একটা জনপ্রাণীর দেখাও পেলাম না। ঘড়িতে এগারোটা বাজল। তারপর সব কিছু থেমে গেল।

শুক্রবার একটা চিঠি পেলাম। এটা পড়েই জানতে পারলাম আমার বন্ধু পত্নীটি বুধবার রাতে মারা গিয়েছেন। দেরি না করে অ্যাডারিতে হাজির হলাম। প্রিয় বন্ধুকে সান্ত্বনা দিলাম, তার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললাম। তবে আলাপচারিতার একটা অংশ আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরব। তিনি জানালেন বুধবার সকাল থেকে তাঁর স্ত্রীর অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। রাতে রীতিমত প্রলাপ বকতে শুরু করেন। অসংলগ্নভাবে এমন ভাবে কথা বলতে থাকে যেন একসময়ে খুব পরিচিত আর চেনা জায়গাগুলোতে আবার হাজির হয়েছে। ভাবছিল ও তোমার বাসায়। বললেন বন্ধুটি, মনে হলো যেন তোমার সঙ্গে কথাও হয়েছে তার। কারণ কখনও কখনও কথায় বিরতি টানছিল, যেন তোমার কথা বা জবাব শুনছে। আমার মাথায় তখন অন্য একটা চিন্তা ঢুকে পড়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, ঠিক কোন সময় আমার সঙ্গে তার এই কাল্পনিক আলাপচারিতার ঘটনা ঘটেছে বলতে পারবেন কিনা? বন্ধুটি জানালেন সময়টা নির্ভুলভাবেই বলতে পারবেন। কারণ ওসময় তাঁর ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়েছিলেন। ওটা সাড়ে দশটা থেকে এগারোটার মাঝখানে। তাহলে আমার অনুমানই ঠিক, ভাবলাম। ওই সময়ই আমার বাসায় পাতলা শরীরের একজন নারীর উপস্থিতি টের পেয়েছিলাম।

রহস্যময় আলো

আয়ারল্যাণ্ডের এক নারী তার নিজের এই অভিজ্ঞতাটি পাঠিয়েছিলেন। এটা উনিশ শতকের শেষদিককার ঘটনা। চলুন মহিলাটির মুখ থেকেই শুনি।

আমার এক বোন ছিল। আমার বাসা থেকে বেশ দূরে তার বাসা। শরীর কখনওই খুব একটা ভাল থাকত না তাঁর। একবার বেশ কিছুদিন দেখা না হওয়ায় আমাকে যাওয়ার জন্য লিখলেন। আমিও সম্মতি জানিয়ে দিলাম। কোন দিন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাব তাও স্থির করে ফেললাম। তখন ফেব্রুয়ারি মাস। যেদিন যাব তার আগের দিন সন্ধ্যায় ছোট্ট বসবার কামরাটায় আগুনের ধারে বসে আছি। ঘড়িতে দেখলাম পাঁচটা বাজে। ফায়ারপ্লেসের আগুন ছাড়া কামরায় আর কোনো আলো নেই। ওটার পাশেই একটা আরাম কেদারা। আমার বানটি যখন এ বাড়িতে আসেন তখন সাধারণত ওখানেই বসে সময় কাটান। এসময়ই হঠাৎ আলোকিত হয়ে উঠল আরামকেদারাটা। আলোটা এত উজ্জ্বল যে মনে হলো যেন ওটার ঠিক নীচে একটা বাতি রেখে দিয়েছে কেউ। অথচ ওটা ছাড়া গোটা কামরাটাতেই আলো আঁধারির খেলা। অবাক হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, কী হলো চেয়ারটার? পরমুহূর্তেই আলোটা অদৃশ্য হলো। চেয়ারটা আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেল।

পরদিন সকালে জানতে পারলাম গত সন্ধ্যায় আমার বোন পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছেন। আর মারা গেছেন ঠিক ওইসময়ই যখন রহস্যময় আলোটা দেখা গিয়েছিল আরাম কেদারাটায়।

দরজার সামনের লোকটা

এই কাহিনিটি প্রকাশ করেছেন গ্রিন পার্কের মিস গ্রীন। আর এটা তাঁকে বলেছিলেন তাঁর পরিচিত এক অভিজাত নারী।

ভদ্রমহিলা তখন তার এক বান্ধবীর সঙ্গে ডাবলিনের শহরতলীর এক বাড়িতে থাকতেন। বাড়ির সামনেই ঘাসে ঢাকা জমি। একে দু-ভাগ করে দিয়েছে কাঁকর বিছানো একটা পথ। রাস্তার দিকে মুখ করা গেটটা পর্যন্ত চলে গেছে পথটা।

সেদিন বাড়ির সামনের দিকের একটা কামরায় বসে সেলাইয়ের কাজ করছেন মহিলা দুজন। এসময়ই গেট খোলার শব্দ পেলেন। জানালা দিয়ে তাকিয়ে পরিচিত একজন বয়স্ক মানুষকে পথটা দিয়ে হেঁটে আসতে দেখলেন। তিনি যখন দরজার দিকে এগিয়ে আসছেন দুজনেই উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠলেন, ওহ

কী সৌভাগ্য, তিনি আমাদের দেখতে এসেছেন।

কিন্তু কিছুক্ষণ পার হয়ে যাওয়ার পরও তাঁকে বসবার কামরায় আসতে না দেখে তাদের একজন বেল বাজালেন। পরিচারিকা মহিলাটি এলে বললেন, তাদের পরিচিত ভদ্রলোকটি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে বলা হলো সে যেন তাড়াতাড়ি তাঁকে ভিতরে নিয়ে আসে। পরিচারিকাটি হলঘরের দরজার দিকে গেল। কিন্তু একটু পরেই সে ফিরে এসে জানাল সেখানে কেউ নেই। পরদিন বান্ধবী দুজন জানতে পারলেন গতদিন যে সময় পথটা ধরে হেঁটে আসতে দেখেছেন ভদ্রলোকটিকে, সেসময়ই মারা গেছেন তিনি।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত