দিনদুপুরেই রাতদুপুর

দিনদুপুরেই রাতদুপুর

হাতে কোনও কাজ না থাকলে অমল সোমের বাড়িতে আড্ডা মারার সুযোগ হয়। আর এই সুযোগ মানে অনেক কিছু অজানা তথ্য জেনে নেওয়া। কিন্তু অমল সোম এখন জলপাইগুড়িতে নেই। তিনি আজকাল মাঝে-মাঝেই উধাও হয়ে যান। সত্যসন্ধানে তাঁর তেমন আগ্রহ নেই। এইরকম সময় অর্জুনের খুব খারাপ কাটে। মা এককালে বলতেন, ওসব শখের গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে চাকরিবাকরির চেষ্টা কর। এখন তো তোর সঙ্গে কত বড় বড় লোকের জানাশোনা হয়েছে। এস পি রায়ের ছেলে এ পি রায় তোকে তো খুব পছন্দ করে। ওকে গিয়ে কল, চা-বাগানে চাকরি দিতে। কথাগুলো অর্জুনের কানে ঢোকেনি। বাঁধাধরা চাকরি করা তার পোষাবে না। মাঝেমধ্যে সে যেসব কেস পেয়েছে তার দক্ষিণায় মোটামুটি চলছে। জলপাইগুড়ি বলে সত্যসন্ধানের কাজ বেশি পাওয়া যায় না। যদি সে কলকাতায় থাকত তা হলে অন্য চিন্তা করতে নিশ্চয়ই মা বলতেন না।

অমল সোম না থাকলে রোজ একবার ওঁর বাড়িতে যায় অর্জুন। অমল সোমের পরিচারক বোকালা হাবু তাকে দেখতে পেয়ে খুশি হয়। আজ সকালে নিজের লাল বাইকে চেপে অর্জুন হাকিমপাড়ায় গেল। অমল সোমের বাড়ি বাগানের গেটের পাশে দুজন বসে আছে। একজন তো হাবু, অন্যজন কালো পোশক পরা দাড়িওয়ালা এক প্রৌঢ়। দাড়িতে সাদা ছোপ লেগেছে। দাড়িওয়ালা একনাগাড়ে বলে যাচ্ছিল আর হাবু মাথা নেড়ে যাচ্ছে সমানে। অর্জুনের হাসি পেল। ইশারা ছাড়া যে কোনও কথা শুনতে পায় না বলেই বোঝে না সেই হাবু ওভাবে মাথা নাড়ছে কেন? বাইকের আওয়াজও হাবু শুনতে পেল না, দাড়িওয়ালা কথা বন্ধ করে তার দিকে মুখ ঘোরায়। এবার হাবু তাকে দেখতে পেয়েই তড়াং করে উঠে দাঁড়িয়ে আঁ-আঁ শব্দ তুলে ইশারায় বোঝাবার চেষ্টা করতে লাগল কিছু।

বাইক থেকে নেমে অর্জুন দাড়িওয়ালাকে জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার?

দাড়িওয়ালা বলল, ব্যাপারটা কী তা জানতে-জানতে জীবন কেটে যায় কিন্তু জানা হয় কই? আচ্ছা বলুন তো, আমার বাপ-ঠাকুদা, তাঁর বাবা কেন জন্মেছিলেন?

অর্জুন বলল, তাঁরা না জন্মগ্রহণ করলে আপনি এখানে বসে থাকতে পারতেন না, তাই। হাবুকে কী বোঝাচ্ছিলেন?

বেচার খুব ভয় পাচ্ছে একা থাকে বলে। আমি বললাম তোর কোনও ভয় নেই! তবে ওকে তিনটে জিনিস জোগাড় করতে হবে।

কীরকম?

একটা কালো বেড়াল যার চোখ অন্ধকারে জ্বলে। দু নম্বর হল, একটা কানা কাক। জন্ম থেকেই তাকে কানা হতে হবে, কেউ ঢিল ছুড়ে কানা করে দিলে চলবে না। তিন নম্বর হল, একটা খোঁড়া শকুন। ওই একই ব্যাপার, জন্ম থেকেই খোঁড়া হতে হবে। এই তিনরকম প্রাণী জোগাড় করলে ওর কোনও ভয় থাকবে না আর।

অর্জুনের হাসি পাচ্ছিল। মানুষের বিশ্বাস অন্ধ হলে সে কী না ভাবতে পারে। তবে ওই তিন পশু ও পাখির নির্বাচনে বুদ্ধির ছাপ আছে। কালো বেড়াল, কানা কাক আর খোঁড়া শকুনের কথা শুনলে বেশ ছমছমে পরিবেশ তৈরি হয়।

এদের দিয়ে কী হবে? অর্জুন জিজ্ঞেস করল।

আমরা যা দেখতে পাই না এরা তা দেখতে পায়। এই যে আমাদের চারপাশে অজস্র আত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে আপনি তাদের দেখতে পাচ্ছেন?

না থাকলে কী করে দেখতে পাব?

লোকটি উঠে দাঁড়াল, অর্জুন দেখল ওর কাঁধে একটা বড়সড় ঝোলা রয়েছে। লোকটি শান্তমুখে জিজ্ঞেস করল, আপনাকে একটা প্রশ্ন করব বাবু?

নিশ্চয়ই।

আপনার মা বাবা বেঁচে আছেন? মা আছেন। বাবা নেই।

ও। তা তিনি যখন গত হয়েছিলেন তখন তাঁর শ্রাদ্ধ হয়েছিল?

হ্যাঁ।

তা হলে? শ্রাদ্ধ কেন করা হয়? মৃত মানুষের আত্মাকে মুক্তি দিতে। ওই যে পিণ্ডদান করা হয় তা তো আত্মার উদ্দেশেই। তাতেও যাদের মন ভরে না তারা গয়ায় গিয়ে পিণ্ডদান করে। এর পর আপনি বলবেন আপনার বাবার আত্মা ছিল না, সবাই মিছিমিছি শ্রাদ্ধ করেছে?

অর্জুন ভাল করে দেখল। লোকটি অবশ্যই বুদ্ধিমান। কিন্তু কী উদ্দেশ্যে ও হাবুর মাথা খাওয়ার চেষ্টা করছে তা ধরা যাচ্ছে না। লোকটি বলল, চুপ করে থাকবেন না, জবাব দিন বাবু।

এটা হিন্দুদের প্রচলিত বিশ্বাস। কোনও প্রমাণ নেই। যেহেতু যুগ যুগ ধরে করে আসা হচ্ছে তাই সবাই করে।

যার পেছনে কোনও যুক্তি নেই তা যুগ-যুগ ধরে চলতে পারে না বাবু। আত্মা নেই একথা আপনি প্রমাণ করতে পারবেন না বলেই ব্যাপারটা মেনে নিচ্ছেন। তা যা বলছিলাম, সেই তেনাদের ওই বেড়াল, কাক আর শকুন

দেখতে পায়।

চমৎকার!

আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না?

কালো বেড়াল প্রচুর দেখা যায়, বাকি দুটো পাখির খবর আপনি জানেন?

অবশ্যই। সেনপাড়ায় বলাই মিত্তিরমশাইকে আপনি চেনেন? ব্যবসা করতেন। তিন বছর হল গত হয়েছেন। শ্রদ্ধশান্তি হয়েছে, গয়ায় গিয়ে পিণ্ডি দিয়ে আসা হয়েছে, কিন্তু তবু তাঁর আত্মার শান্তি হয়নি। ও বাড়ি ছেড়ে তিনি কিছুতেই যাচ্ছেন না। শেষপর্যন্ত আমার কথায় মিত্তিরমশাই-এর ছেলে ওই তিনটে প্রাণীকে জোগাড় করেছেন আজ। আমি সেই উদ্দেশ্যেই এসেছিলাম। আগে এসে পড়েছি বলে ভাবলাম, যাই, একবার বড়বাবুর সঙ্গে দেখা করে আসি। লোকটি হাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, চলি ভাই, যা বললাম খেয়াল রেখো। দ্যাখো, ভয় করলেই ভয়, নইলে কিছুই নয়।

কথাগুলো বলে লোকটি অমল সোমের বাড়ির দিকে তাকাল। তারপর গেট খুলে কয়েক পা হেঁটে একটা টগর গাছের পাশে দাঁড়িয়ে সেখানকার মাটিকে প্রণাম করল। অর্জুন দেখল লোকটার দেখাদেখি হাবুও সেই জায়গাটার মাটিকে প্রণাম করল। এবার লোকটি প্রসন্ন মুখে হাঁটা শুরু করতেই অর্জুন বলল, আচ্ছা, এইসব বিশ্বাস নিয়ে আপনারা একটা আলাদা জগৎ তৈরি করে বেশ আছেন, না?

লোকটি বলল, তা আসুন না আজ।

কোথায়?।

ওই যে, যেখানে আমি যাচ্ছি। সেনপাড়ার মিত্তিরমশাইয়ের বাড়িতে। নিজের চোখে সব দেখেশুনে নেবেন। বড়বাবু শুনলে বলবে, ঠিক করেছ গোরক্ষনাথ। চলি।

গোরক্ষনাথ! যে নাম রেখেছিল তার তারিফ না করে পারল না অর্জুন। এদের কী করে বোঝানো যাবে যে, এইসব কুসংস্কার দূর করা দরকার। এখন একটু একটু করে শ্রাদ্ধের প্রচলিত অনুষ্ঠান উঠে যাচ্ছে। মৃতের আত্মীয়বন্ধুরা সেই দিনে একত্রিত হয়ে তাঁর আত্মার শান্তি প্রার্থনা করেন, তাঁর প্রিয় গান গাওয়া হয়।

অর্জুন দেখল বাগানে হাবু কেমন জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাবুর গায়ে যে শক্তি আছে তার ব্যবহার ও যদি ঠিকঠাক করতে পারে তা হলে কোনও কিছুতেই ভয় পাওয়া ওর উচিত নয়। সেই হাবু ভয় পেয়েছে কেন? সে সামনে গিয়ে ইশারা করে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? হাবু মাথা নেড়ে বোঝাল তার কিছু হয়নি। অর্জুন ইশারায় বোঝাল ওই লোকটাকে বাড়িতে ঢুকতে না দিতে। হাবু একটু ভাবল, তারপর আঙুল তুলে টগর গাছের পাশের মাটি দেখাল। অর্জুনের মনে পড়ল ওই জায়গাটার দিকে তাকিয়ে লোকটা প্রণাম করেছে, দেখাদেখি হাবুও। কিন্তু ঘাসমাটি ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না। লোকটা বড়বাবু বলল কাকে? অমলদাকে? প্রশ্নটা হাবুকে করতেই সে ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল। অর্জুন বেশ অবাক হল। তার পক্ষে অমল সোম বাড়িতে থাকলে কে আসছে না আসছে তা জানা সম্ভব নয়, যদি অমলদা না বলেন। এ লোকটার কথা সে কখনও শোনেনি। ইদানীং অমল সোম একটু অন্যরকম হয়ে গিয়েছেন। ইদানীং বলা ভুল হল, কয়েক বছর ধরে তিনি সত্যসন্ধানের কাজ আর করেন না। সারাক্ষণ হয় বই পড়েন, নয় চুপচাপ ভাবেন। আবার হঠাৎ-হঠাৎ উধাও হয়ে যান হাবুর ওপর বাড়ি ছেড়ে দিয়ে। কিন্তু চিরকাল যে মানুষ বিজ্ঞানের সপক্ষে কথা বলে এলেন, তাঁর পক্ষে এই লোকটাকে কী করে মেনে নেওয়া সম্ভব? অর্জুনের মনে পড়ল, অমলদার শেলফে বেশ কিছু পরলোক-সংক্রান্ত বই সে দেখেছে।

অর্জুন এগিয়ে গিয়ে হাবুর দেখানো মাটিতে পা রাখতেই হাবু দ্রুত তাকে টেনে সরিয়ে দিল। তারপর চোখ পাকিয়ে রাগত ভঙ্গিতে ওরকম করতে নিষেধ করল। অর্জুন খুব অবাক হয়ে গেল। এরকম আচরণ হাবু কখনও তার সঙ্গে করেনি। এখন ওকে দেখে মনে হচ্ছে প্রয়োজন হলে শক্তিপ্রয়োগ করতে ও দ্বিধা কবে না। ব্যাপারটা বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছিল অর্জুনের। সে খুব বিমর্ষ ভঙ্গিতে ঘুরে দাঁড়াল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাবু শান্ত হয়ে গেল। তারপর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। অর্জুনের মনে হল ওখানকার জমি ভাল করে দেখা দরকার।

সে ইশারা করে হাবুকে ডাকতেই হাবু মাথা নিচু করেই এগিয়ে এল। পকেট থেকে টাকা বের করে অর্জুন হাবুকে দিয়ে ইশারায় বলল সিগারেট কিনে আনতে। এই কাজটা হবু এর আগেও করেছে। কোন ব্র্যান্ড, তাও জানে। টাকা নিয়ে সে বেরিয়ে গেল। দোকান থেকে ফিরে আসতে হবুর মিনিট দশেক লাগবে। অর্জুন দ্রুত বাগানের এককোণে রাখা কোদাল নিয়ে এসে জায়গাটা খুঁড়তে লাগল। সামান্য গর্ত খুঁড়তেই খট করে শব্দ হল। হাত ঢুকিয়ে জিনিসটাকে বের করল অর্জুন। একটা আট ইঞ্চি চওড়া স্টিলের বাক্স। বাক্সর ঢাকনা খুলতেই একটা লকেট দেখতে পেল সে। চেন ছাড়া লকেটটি চকচক করছে। একটা কালো সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে লকেটের চেহারা নিয়েছে। মুখটা সামান্য উচুতে, ফণা তোলা। খুব হালকা গালা বা ওই জাতীয় পদার্থে লকেটটা তৈরি।

অর্জুন দ্রুত বাক্সটাকে পুঁতে ফেলে মাটি চাপা দিল। কোদাল সরিয়ে রেখে চেষ্টা করল যতটা সম্ভব মাটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু সেটা সম্ভব হচ্ছিল না কিছুতেই। টগর গাছ থেকে পাতা ছিঁড়ে খোঁড়া জায়গাটার ওপর ছড়িয়ে দিয়ে সে গেটের পাশে চলে এল লকেটটাকে হাতে নিয়ে।

এই সময় টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হল।

জলপাইগুড়িতে এ-সময় একবার বৃষ্টি নামলে আর রক্ষে নেই। অর্জুন দেখল হাবু দৌড়ে আসছে। সিগারেটের প্যাকেট হাতে নিয়ে রেখে দিতে ইশারা করতে হবু দৌড়ে চলে গেল বাগান পেরিয়ে বারান্দায়, বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচতে। অর্জুন তাকে ইশারা করে বাইকে উঠে বসল। তার মনে হচ্ছিল বৃষ্টি আরও জোরে নামলে বাঁচা যায়। হাবুর পক্ষে বোঝা সম্ভব হবে না মাটিটা খোঁড়া হয়েছিল।

বাড়িতে এসে জামাপ্যান্ট ছেড়ে অর্জুন লকেটটাকে নিয়ে বসল। যিনি বানিয়েছেন তাঁকে শিল্পী হিসেবে উচুদরের বলতেই হবে। নিটোল সাপ। কালনাগিনী? এমনকী চোখ দুটো ভীষণ রকমের জীবন্ত। এখন কথা হল, এই সাপের লকেটকে কেন টগর গাছের নীচে পুঁতে রাখা হয়েছে? লোকটা এবং হাবু যখন প্রণাম করেছে তখন ওরা এর অস্তিত্ব জানে। লকেট রাখা ছিল স্টিলের বাক্সে, যাতে জল-মাটি এর কোথাও ক্ষতি করতে না পারে। অমলদা কি জানেন? অর্জুনের বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিল না অমল সোম এরকম অবৈজ্ঞানিক কাজকে প্রশ্রয় দেবেন? এটাকে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছে কেন? কোথায় যেন পড়েছিল অর্জুন, তান্ত্রিকরা মন্ত্রপূত লোহার সাপ মাটিতে পুঁতে দেয়, যাতে গৃহস্থের বাড়িতে অকল্যাণ প্রবেশ করতে না পারে। অসম্ভব। অমলদা এটা কিছুতেই করতে পারেন না। নিশ্চয়ই ওই লোকটা হাবুকে ম্যানেজ করে এ করেছে।

টেবিলের ওপর লকেটটা রাখতেই মা ঘরে ঢুকলেন, ্যাঁ রে, শুনেছিস, সেনপাড়ার এক বাড়িতে খুব ভূতের উপদ্রব হয়েছে।

অর্জুন হে-হো করে হাসল, মা! তুমিও?

না রে! সবাই বলছে। তোর খোঁজে সুধাদি এসেছিলেন। উনিও গিয়েছেন দেখতে।

সুধামাসি গিয়েছেন ভূত দেখতে?

যে বাড়িতে উপদ্রব হচ্ছে সেই বাড়ির লোকদের তিনি চেনেন।

তা হলে ভূতকেও চিনতে পারবেন।

ইয়ার্কি মারিস না। সুধাদি বলছিলেন তোর সঙ্গে জরুরি দরকার আছে। এই, এটা কী? মা এগিয়ে এলেন টেবিলের কাছে।

লকেট।

কী ভয়ঙ্কর লকেট! কোথায় পেলি?

ভয়ঙ্কর কেন?

জানি না। দেখেই কেমন গা ছমছম করছে। ফেলে দে, ফেলে দে। ওরকম অমঙ্গল জিনিস বাড়িতে রাখিস না।

সুন্দর সাপের মূর্তি, অমঙ্গল বলছ কেন?

না বাবা, চোখ দুটো দ্যাখ, গিলে খাবে। কিনেছিস?

নাঃ। পেলাম।

দূর করে দে। চলে যাওয়ার আগে মা বললেন, সুধাদির সঙ্গে দেখা করিস।

সঙ্গে-সঙ্গে অর্জুনের মনে হল এখনই সেনপাড়ার বলাই মিত্তিরের বাড়িতে গেলে হয়! সুধামাসির সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে, সেইসঙ্গে গোরক্ষনাথের ভেলকিও।

সুধামাসি মায়ের বন্ধু। জলপাইগুড়ির অভিজাত পরিবারের বউ। ওঁর একমাত্র মেয়ে এখন আমেরিকায়। স্বামী মারা গিয়েছেন কয়েক বছর আগে। এখানে তিনি একাই থাকেন। সুধামাসি বই পড়তে খুব ভালবাসেন। মায়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল বাবুপাড়া পাঠাগারে। মাকে উনি বলেন অর্জুনকে ওর মতো থাকতে দিতে। বলেছিলেন, সবাই তে চাকরি করে কিন্তু কেউ-কেউ সত্যসন্ধানী হয়। সেটা শোনার পর থেকে ভদ্রমহিলাকে শ্রদ্ধা করে এসেছে অর্জুন।

বাড়ির সামনে পৌঁছে অর্জুন বুঝল জলপাইগুড়ি শহরের অনেকেই খবর জেনে গেছেন। শপাঁচেক লোকের ভিড় জমেছে বাড়ির সামনে। উলটোদিকে কিছু ছেলে চিৎকার করে বলছে, ভূত বলে কিছু নেই! এসব বুজরুকি, আপনারা বিশ্বাস করবেন না।

থানার সেকেন্ড অফিসার তাঁর বাহিনী নিয়ে এসে ভিড় সামলাচ্ছেন। অর্জুনকে দেখে বললেন, এখানে কীসের সন্ধানে? ভেতরে যাবেন? যান।

বাড়ির ভেতরেও লোজন কম নেই। তবে তাঁরা আত্মীয়বন্ধুজন। অর্জুন দেখল শ্রাবাড়িতে যেমন আয়োজন হয় তেমনই ব্যবস্থা হয়েছে। একজন প্রবীণা মহিলা আসনে বসে আছেন মাথায় ঘোমটা দিয়ে। তাঁর সামনে নিলডাউন হয়ে গোরক্ষনাথ বিড়বিড় করে যাচ্ছে। একসময় গলা খুলল সে, বাবু, আপনি তো মানুষ ভাল ছিলেন। তা হলে এরকম করছেন কেন? গিন্নিমা যে কষ্ট পাচ্ছেন বুঝতে পারছেন না? আমি আপনাকে বলছি পিণ্ড গ্রহণ করে এখান থেকে চলে যান। আপনি হ্যাঁ বলুন। ওই ডালটাকে সরিয়ে দিন। ও, দেবেন না? বেশ। তবে মনে রাখবেন, খারাপ হতে চাইলে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না। যাই কে আছিস? নিয়ে আয় ওদের।

বলমাত্র একজন প্রৌঢ় এবং একজন যুবক তিনটে খাঁচা নিয়ে এল। অর্জুন বাড়ির ভেতরে যমন আয়োজ-মাথায় ঘোম দেখল খাঁচা তিনটেতে বসে আছে কালো বেড়াল, কানা কাক আর খোঁড়া শকুন। গোরক্ষনাথ বলল, গিন্নিমা, আপনি বিশ্রামে যান। সন্ধে না হলে কাজ শুরু করা যাবে না। ততক্ষণ এরা পাহারায় থাকুক।

বৃদ্ধা উঠে ভেতরে চলে যেতেই অর্জুন দেখল সুধামাসি এগিয়ে আসছেন ওর দিকে। সে জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার সুধামাসি?

সুধামাসি বললেন, এই, তুই আমাকে আমেরিকায় নিয়ে যাবি?
অবাক হয়ে গেল অর্জুন, তুমি আমেরিকায় যাবে?

হ্যাঁ রে, এবার না গিয়ে উপায় নেই। জামাইয়ের অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। মেয়ে ফোন করেছিল, অবস্থা ভাল নয়। ওকে সংসার দেখতে হচ্ছে, হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে দু বেলা। বলল, মা, যদি পারো চলে এসো।

সুধামাসি একদমে কথাগুলো বলে গেলেন।

সুধামাসির মেয়ে বছর দুয়েক আগে এসেছিলেন তাঁর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে। একদিন দেখাও হয়েছিল। আমেরিকায় যাঁরা থাকে তাঁদের মতো চেহারা। মায়ের কাছে শুনেছে সে, অনেক অনুরোধ করা সত্ত্বেও সুধামাসি দুর্ঘটনার খবরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, এটা অস্বাভাবিক নয়।

কীসের দুর্ঘটনা হয়েছে ওঁর?

ফোনে তো মেয়ে কিছুই বলল না। তারপর থেকে আমি স্বস্তি পাচ্ছি না।

এখানে এসেছ কেন

ওই যে শুনলাম, একজন তান্ত্রিক নাকি ভূত তাড়াবে। এসব তো কখনও বিশ্বাস করিনি তাই ভাবলাম নিজের চোখে দেখে আসি। তা সন্ধেবেলার আগে তো কিছু হবে না। এসব থাক, ততার সঙ্গে আমার কথা আছে। তুই আমার বাড়িতে যাবি?

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ওরা পৌঁছে গেল। সুধামাসির বাড়ি অনেকটা জমিজমা গাছগাছালি নিয়ে। মেসোমশাইয়ের বাবা রায়বাহাদুর ছিলেন। প্রচুর সম্পত্তি রেখে গিয়েছিলেন তিনি। মেসোমশাই এখানকার কলেজে পড়াতেন। পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। হঠাৎই দু দিনের অসুখে মারা গিয়েছিলেন তিনি। এখন এত বড় বাড়িতে সুধামাসি থাকেন বিশ্বস্ত কর্মচারীদের নিয়ে। ব্যাঙ্কের সুদ বাবদ যা পান তা এসব খরচ চালানোর পক্ষে পর্যাপ্ত।

বাইরের ঘরে পূর্বপুরুষদের ছবি টাঙানো। দেওয়াল জুড়ে স্মৃতি আর স্মৃতি। পুরনো আমলের সোফায় বসে সুধামাসি বললেন, আমাকে যেতেই হবে রে! মুশকিল হল, আমি তো একা কখনও কোথাও যাইনি তাই সঙ্গে তুই গেলে ভাল হয়।

আমার কথা মনে পড়ল কেন? অর্জুন হাসল।

তুই তো এর আগে একবার গিয়েছিলি। রাস্তাঘাট চিনিস। তোর মাকে বলেছিলাম, সে বলল তোর সঙ্গে কথা বলবে। এখন তোর হাতে জরুরি কাজ আছে?

এই মুহূর্তে নেই।

তা হলে চল বাবা। সেরকম হলে আমাকে পৌঁছে দিয়েই চলে আসবি।

অর্জুন আবার হাসল, তুমি এমনভাবে বলছ যে, দার্জিলিং মেলে কলকাতায় তোমাকে পৌঁছে দিয়ে সেই সন্ধেবেলায় ট্রেন ধরে ফিরে আসা। কবে যেতে চাও?

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

কিন্তু তোমার পাশপোর্ট আছে?

হ্যাঁ। দু বছর আগে মেয়ে এসে জোর করে দরখাস্ত করিয়েছিল, মাসতিনেক বাদে ডাকে সেটা এসেছিল। পাশপোর্ট ছাড়া তো যাওয়া যায় না। তুই এখন বল, চেনাজানা কার পাশপোর্ট আছে বুঝব কী করে? তুই গিয়েছিলি বলে জানি তোর আছে।

অর্জুন বলল, শোনো, যাব বললেই যাওয়া যাবে না কিছু নিয়মকানুন আছে। কলকাতায় গিয়ে ভিসার জন্যে আবেদন করতে হবে আমেরিকান কনস্যুলেটে। তারপর কবে টিকিট পাওয়া যাবে তার ওপর যাওয়া নির্ভর করছে।

সুধামাসি মাথা নাড়লেন, এসব মেয়ে আমাকে ফোনে বলেছে। ওর চেনা একটা অফিস আছে কলকাতায়, যারা সব ব্যবস্থা করে দেবে। আমি নাম-ঠিকানা লিখে রেখেছি। তুই বললে আজকালের মধ্যে এক লাখ টাকা ব্যাঙ্ক থেকে তুলে ফেলব।

অত টাকা কেন?

মেয়ে যে বলল ওইরকম লাগবে।

তা হলে ট্রাভেলার্স চেকে নিয়ো। আমি মায়ের সঙ্গে কথা বলছি।

তোর মা বলেছে তার আপত্তি নেই। আমরা আগামীকালই কলকাতায় রওনা দিই। সেখানে কয়েকদিন থেকে যত তাড়াতাড়ি পারি প্লেনে উঠব।

হাঁ?

বেশ।

বাড়িতে ফিরে মাকে সে জিজ্ঞেস করল, আমেরিকায় যাওয়ার ব্যাপারটা জেনেও তুমি আমাকে কিছু বলেনি কেন?

মা হাসলেন, যে যেতে চাইছে তার মুখ থেকে শোনাই তো ভাল। কী বলেছিস?

কাল যেতে চাইছেন উনি।

ঠিক আছে।

তুমি একা থাকতে পারবে?

আহা কী কথা! যখন তুই এখানে-ওখানে যাস তখন কে থাকে আমার সঙ্গে।

বেশ। আমি চেষ্টা করব দিন সাতেকের মধ্যে ঘুরে আসতে।

হ্যাঁ রে, ভূত দেখেছিস?

না। দিনের বেলায় নাকি হবে না, সন্ধের অন্ধকার নামলে তবে ভূত নামবেন ওবাড়িতে। যতসব বুজরুকি।

তুই কী কী নিয়ে যাবি বল, সুটকেসে গুছিয়ে রাখব।

তুমি তো জানো। গতবার যা-যা নিয়ে গিয়েছিলাম, তাই দিয়ো।

গোরক্ষনাথ চিৎকার করে মন্ত্র পড়ছিল।

এখন সন্ধে পেরিয়ে গেছে। বিরাট উঠোনের মাঝখানে আসনে বসে আছে গোরক্ষনাথ। তার সামনে সেই বৃদ্ধা বাবু হয়ে বসে আছেন মাথায় সাদা কাপড়ের ঘোমটা টেনে। নানারকমের শ্রাদ্ধের উপচার ছাড়াও তিন-তিনটি খাঁচা রাখা হয়েছে সামনে। আর ওদের ঘিরে বৃত্তাকারে জমজমাট ভিড় নিশ্ৰুপ হয়ে রয়েছে। অর্জুন সেই ভিড়ের সামনে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে গোরক্ষনাথকে লক্ষ করছিল।

মন্ত্র পড়া আচমকা থামিয়ে গোরক্ষনাথ বলল, মানুষের চেয়ে আত্মারা অনেক বেশি বুদ্ধিমান হয়। মানুষ নিজেকে লুকোতে পারে না কিন্তু আত্মা পারে, এটাই ওদের সুবিধে। কিন্তু মা, আপনার স্বামী ছিলেন বিষয়ী মানুষ। মারা যাওয়ার পরেও তিনি বিষয়ের মায়া ত্যাগ করতে পারছেন না। আমরা যে তাঁর মুক্তির ব্যবস্থা করেছি এখানে, এটা তাঁর সহ্য হচ্ছে না বলে তিনি দূরে-দূরে আছেন এখন। কিন্তু তাঁকে আসতেই হবে। আর তিনি এলে তাঁকে দেখতে পাবে ওরা। ওই কালো বেড়াল, কানা কাক আর খোঁড়া শকুন। ফাঁকি দিতে পারবে না।

এবার অর্জুন কথা বলল, কিন্তু কাক শুনেছি কানাই হয়।

গোরক্ষনাথ মুখ ঘুরিয়ে অর্জুনকে দেখে হাসল, ও, আপনি এসে গিয়েছেন। ভালই হল, ভগবানে যারা বিশ্বাস করেন ভূতে তাদের অবিশ্বাস হবে কেন? হ্যাঁ, আপনি যা শুনেছেন তা অর্ধসত্য। কাক একসঙ্গে দু চোখে দেখতে পায় না বলে মাথা ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দ্যাখে। এ-চোখ যখন দ্যাখে তখন অন্য চোখ দৃষ্টিরহিত হয়ে যায়। কিন্তু এই কাকটি সত্যিকারের কানা। কানা বলে ওর দৃষ্টিশক্তি বেশি। অত দূরে কেন, আপনি এখানে আসুন না!

না, ঠিক আছি।

গোরক্ষনাথ বলল, এবার এখানকার সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হোক।

সঙ্গে সঙ্গে উঠোন, বারান্দা এবং ঘরগুলোর আলো কেউ নিভিয়ে দিল। গোরক্ষনাথ বলল, মা, আপনার সামনে কলাপাতায় পিণ্ড রাখা আছে। তুলে নিন, পেয়েছেন?

মহিলার নিচু গলা শোনা গেল, হ্যাঁ।

বেশ! আমি বলামাত্র ওই পিণ্ড সামনে ফেলে দেবেন। তারপরেই তার গলা থেকে সংস্কৃত শব্দ বের হতে লাগল। অর্জুন যার বাংলা করল এভাবে, হে প্রেত, তুমি অশান্ত। তোমার এই অতীত বাড়িতে ফিরে আসছ যে টানে তা অবাস্তব। তোমার আবিভাব এখানে কাম্য নয়।

অর্জুন দেখল অন্ধকারে বেড়ালের চোখ জ্বলছে। হঠাৎ কাকের ডাক শোনা গেল এবং সেইসঙ্গে পাখা ঝাপটানোর আওয়াজ। সেটা যে শকুন করছে তা অনুমান করা গেল। গোরক্ষনাথ চিৎকার করে উঠল, আমি জানি তুমি এখানে উপস্থিত হয়েছ। ওই কালো বেড়াল, কানা কাক আর খোঁড়া শকুন নিশ্চয়ই তোমাকে দেখতে পাচ্ছে। তুমি ধরা পড়ে গিয়েছ। অতএব হে প্রেত, এই পিণ্ড গ্রহণ করে তুমি বাসনামুক্ত হয়ে যাও। মা, পিণ্ডটা ফেলুন এবারে।

কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ। তারপর গোরক্ষনাথ হাঁকল, কে আছ, আলো জ্বালো।

দপ্ করে চারপাশ আলোকিত হতে দেখা গেল বৃদ্ধা উপুড় হয়ে রয়েছেন। নিজের আসনে খাড়া হয়ে বসে আছে গোরক্ষনাথ। অর্জুন দেখল, বেড়াল

অথবা শকুন এখন শান্ত হয়ে খাকলেও কাকটা কাত হয়ে পড়ে রয়েছে।

গোরক্ষনাথ আসন ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে ঝুঁকে দেখল মাটিতে পড়ে থাকা চালকলার পিণ্ডটিকে। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করল কিছু।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, কী হল?

অতি শয়তান প্রেত। পিও গ্রহণ করেনি।

কী করে করবে? আপনি সংস্কৃতে যা বলছিলেন তা ওর পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়? বেঁচে থাকতে সাধারণ বাঙালির মতো সংস্কৃত বুঝতে উনিও নিশ্চয়ই পারতেন না।

আপনি রসিকতা করছেন বাবু?

মোটেই না। ভেবে দেখলে বুঝতে পারবেন আমি সত্য বলছি। অর্জুন বলল, আগে লোকে সংস্কৃত পড়ত, তাদের প্রেতরা তাই মন্ত্র বুঝতে পারত।

গোরক্ষনাথ কাত হয়ে পড়ে থাকা কাকটাকে দেখাল, ওর এই অবস্থা কী করে হল?

অর্জুন এগিয়ে গিয়ে কাকটাকে দেখল। ঘাড় মটকে গিয়েছে।

গোরক্ষনাথ বলল, এ প্রেত স্বাভাবিক প্রেত নয়। আজ কাকের ওপর ওর ক্রোধ মিটিয়েছে। কিন্তু এখানেই আছে সে। বলমাত্র একটা ঝাঁটা তুলে নিয়ে গোরক্ষনাথ বারংবার মাটিতে মারতে লাগল, সেইসঙ্গে বিড়বিড় করে মন্ত্রপাঠ চলল। হয়তো সেই ঝটার শব্দেই খাঁচায় বসা শকুনটা নড়েচড়ে উঠল। বারংবার ন্যাড়ামাথা ঘোরাতে লাগল। গোরক্ষনাথ ছুটে গেল। চিৎকার করে বলল, খবরদার। ওর গায়ে হাত দিলে তোর সর্বনাশ হয়ে যাবে। হাতের ঝাঁটা দিয়ে একটা জায়গায় দ্রুত বৃত্ত আঁকল যেন গোরক্ষনাথ। তারপর বলল, থাক এখানে বন্দি হয়ে।

গোরক্ষনাথকে এখন কিছুটা প্রসন্ন দেখাল। চিৎকার করে বলল, আপনারা এখন চলে যান। আত্মা বন্দি হয়ে আছে। ছাড়া পেয়ে গেলে আপনাদের ক্ষতি করতে পারে। যান আপনারা। সঙ্গে সঙ্গে দুমদাম করে মানুষজন পালাতে আরম্ভ করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাড়ি ফাঁকা।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, আপনি ওঁর আত্মাটাকে বন্দি করেছেন?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

কিন্তু ওখানে আত্মা আছে তা বুঝব কী করে?

একটা মাটির পাত্র থেকে কালো তিল মুঠোয় নিয়ে সেই জায়গাটায় ছুড়ে-ছুড়ে মারতে লাগল গোরক্ষনাথ, কী, চলে যাবি? আর আসবি না তো? কথা দিচ্ছিস? বেশ, যাওয়ার আগে ওই পিণ্ডর দুলাটাকে ভেঙে দিয়ে যা। ঝাঁটা নিয়ে উলটোদিক থেকে বৃত্ত আঁকল গোরক্ষনাথ। তারপর একদৃষ্টিতে তাকাল মাটিতে পড়ে থাকা চালকলার পিণ্ডটির দিকে। গোরক্ষনাথের মুখে হাসি ফুটল, দেখুন বাবু, ওটা ভেঙে দিয়ে গেল। বলে আর দাঁড়াল না। গোরক্ষনাথ। উঠোন পেরিয়ে পাশের একটা ঘরে ঢুকে গেল।

অর্জুন এগিয়ে গিয়ে পিণ্ডটাকে দেখল। সত্যি চিড় ধরেছে মাঝখান থেকে। কিন্তু এই চিড়টা যে আগে থেকে ছিল না তার কোনও প্রমাণ নেই। মাটিতে পড়ে থাকতে-থাকতে অনেকসময় আপনা থেকেই চিড় ধরতে পারে। সে কাকের খাঁচাটার কাছে গেল। ঘাড় ভেঙে রক্ত বেরিয়ে এসেছে।

বৃদ্ধাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হল। চোখের সামনে যা ঘটে গেল তার সত্যতা অস্বীকার করে লাভ নেই। প্ৰেত এসে কাকের গলা টিপে মেরেছে এ খবরটা চাউর হবেই। অর্জুন বারান্দায় উঠে যে ঘরে গোরক্ষনাথ ঢুকেছিল সেখানে গেল। মেঝের ওপর পাটি পেতে গোরক্ষনাথ শুয়ে পড়েছে এর মধ্যে। অর্জুন পাশের তক্তপোশে বসল, প্রেত আছে কিনা তা প্রমাণ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু আজ এখানে প্রেত আসেনি।

আপনি বললে তো হবে না, সবাই দেখেছে। গোরক্ষনাথ হাসল।

পকেট থেকে সাপের লকেটটা বের করল অর্জুন। সামনে ধরে বলল, এ জিনিস মাটির নীচে পোঁতা থাকলে যদি বাড়িতে কোনও অশুভ ব্যাপার না ঘটে তা হলে মাটির ওপর পকেটে থাকলে কোনও প্রেতের আসা উচিত নয়। তাই না?

গোরক্ষনাথের চোখ জ্বলে উঠল। তড়বড়িয়ে উঠে বসে বলল, এ কী! এ জিনিস আপনি কোথায় পেলেন?

আপনি আমার প্রশ্নের জবাব দিন।

লকেটটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে গোরক্ষনাথ বলল, হ্যাঁ, সেই জিনিস। পৃথিবীতে মাত্র দুটো আছে। একটা আমার গুরু আমাকে দিয়েছিলেন। বড়বাবুর মঙ্গলের জন্যে আমি তাঁর বাড়ি বেঁধে রেখেছিলাম একে দিয়ে। আপনি মাটি খুঁড়েছেন বাবু?

আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।

গোরক্ষনাথের মাথা নেমে গেল, হ্যাঁ, আজ আমাকে অভিনয় করতে হয়েছিল। কিন্তু এ বাড়ির কাছেই সেই দুষ্ট আত্মা আছে। অনেক চেষ্টা করেও তাকে না আনতে পেরে মানুষকে বোঝাতে অভিনয় করতে হয়েছিল আমাকে।

আপনার ভান হাত তুলুন তো?

গোরক্ষনাথ তার হাত তুলতেই বোঝা গেল রক্ত শুকিয়ে রয়েছে আঙুলে। গোরক্ষনাথ বলল, আপনি ঠিকই ধরেছেন, কাকটাকে আমিই মেরেছি। না মারলে লোকে বিশ্বাস করত না। এখন বুঝতে পারছি ওই লকেটটার জন্যে প্রেত এই বাড়িতে পা দেয়নি। ওটা আমাকে দিন।

কেন?

ওটা আমার জিনিস। ভয়ঙ্কর জিনিস। মাটিতে পোঁতা না থাকলে প্রচণ্ড ক্ষতি হয়ে যাবে। অস্তিমুনির ক্রোধ ধ্বংস করে দেবে আপনাকে।

আবার গল্প শোনাচ্ছেন?

না বাবু। নীলার কথা শোনেননি? অনেকের সহ্য হয় না, ধ্বংস হয়ে যায়!

দেখা যাক। আপনি তো মাটির তলায় পুঁতে দিয়েছিলেন, আপনার আর কোনও দাবি থাকতে পারে না। এখন বলুন তো, এটা কে বানিয়েছিল?

গোরক্ষনাথ বলল, আমার গুরুদেব আমাকে মারা যাওয়ার আগে দিয়েছিলেন। তিনি যৌবনে জাহাজে চাকরি করতেন। আফ্রিকার এক বন্দরে কীভাবে জানি না ওটা ওঁর হাতে আসে। খবরটা জানাজানি হয়ে যাওয়ায় একদল আফ্রিকার মানুষ ওঁর পেছনে ধাওয়া করে জিনিসটা ফেরত নেওয়ার জন্যে। গুরুদেব জাহাজে ফিরে এসে রক্ষা পান। পথে জাহাজ ঝড়ের মুখে পড়ে। জাহাজড়ুবি হয়। একটা কাঠ আঁকড়ে তিনদিন ভেসে থাকার পর অন্য জাহাজের লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে। সেই ভেসে থাকার সময় গুরুদেবের শরীর যখন অসাড়, জ্ঞান লোপ পেয়ে যাচ্ছে, তখন তিনি অনুভব করতেন একটা বিশাল সাপ তাঁর আঁকড়ে থাকা কাঠটাকে ভাসিয়ে রাখছে। সেই থেকে উনি প্রতিদিন ওই লকেটটাকে নিয়ম করে দুধকলা ভোগ দিতেন। আমাকে তিনি বলেছিলেন, নিয়মের ব্যতিক্রম যেন না হয়। হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে অনেক ভোগ দিয়ে মাটিতে পুঁতে রাখতে। আমি তাই করেছিলাম। দিন বাবু।

দিতে পারি। কিন্তু আপনাকে এটা দিলে আমি সবাইকে ডেকে বলব কাকটাকে আপনি মেরেছেন, কোনও প্রেত যে আসেনি তা আপনিই স্বীকার করেছেন।

না বাবু! দয়া করে অমন কাজ করবেন না। এ বাড়ির চারপাশে প্রেত আছে। আমি আজ সামান্য ছলনার আশ্রয় নিয়েছি ঠিক, কিন্তু–।

আমি চললাম। অর্জুন দরজার দিকে এগোল।

গোরক্ষনাথ ককিয়ে উঠল, যাবেন না বাবু। ওটা সঙ্গে রাখলে আপনার সর্বনাশ হয়ে যাবে। ভয়ঙ্কর জাগ্রত সর্পদেবতা।

অর্জুন বেরিয়ে এসে তার বাইকে চাপল।

দার্জিলিং মেল ঠিক সময়েই শেয়ালদায় পৌঁছেছিল। সূর্য সেন স্ট্রিটের একটা হোটেলে ওরা দুটো ঘর ভাড়া করল। স্নান-খাওয়া শেষ করে সুধামাসির পাশপোর্ট সঙ্গে নিয়ে অর্জুন চলে এল থিয়েটার রোডে। এর আগে কলকাতায় কিছুটা পরিচিত হয়েছিল রাস্তাঘাটের সঙ্গে। কিন্তু ভিড় বাসে উঠতে একদম ইচ্ছে করে না ওর। ফলে ট্যাক্সি নিয়েছিল সে। সুধামাসির মেয়ে যে কোম্পানির নাম ফোনে বলেছিলেন তা তিনি লিখে রেখেছিলেন। নাম্বার মিলিয়ে সে যে অফিসটিতে পোঁছল সেটি একতলায়। লম্বা ঘরের দু পাশে মানুষজন কাজ করছেন। ঘরের একপ্রান্তে বড় টেবিলের ওপাশে সৌম্যদর্শন এক প্রৌঢ় বসে আছেন। অর্জুনকে দেখে হেসে বললেন, বলুন।

মিস্টার লাহিড়ী একটু বেরিয়েছেন, আমিই শিবাজি সিন্হা। কোত্থেকে আসছেন?

জলপাইগুড়ি থেকে। অর্জুন বলল, আমরা আমেরিকায় যেতে চাই।

খুব ভাল কথা। পাশপোর্ট এনেছেন?

হ্যাঁ। এই সময় লম্বা ছিপছিপে এক ভদ্রলোক ঢুকতেই শিবাজি সিনহা বললেন, এই যে অরূপ এসে গেছে। অরূপ দ্যাখো তো।

নিজের চেয়ারে বসে অরূপ লাহিড়ী বললেন, বলুন ভাই।

অর্জুন বলল, আমরা জলপাইগুড়ি থেকে আসছি। আমেরিকায় যেতে চাই।

আমরা মানে?

আমি আর একজন বয়স্কা মহিলা।

অরূপ লাহিড়ী অর্জুনের মুখের দিকে তাকালেন একটু, তারপর হাত বাড়ালেন, দিন, পাশপোর্টটা দেখি। অর্জুন দুটো পাশপোর্ট টেবিলে রাখল।

সুধামাসিরটা দেখার পর দ্বিতীয়টা হাতে নিয়ে ছবির সঙ্গে মিলিয়ে অরূপ লাহিড়ী বললেন, এবার কী হবে? ম্যানহাটনে হানটান?

তার মানে?

আরে ভাই, আপনি তো সেই অর্জুন? লাইটারের অর্জুন? আপনার কথা অনেক শুনেছি আমি। এই চা দাও এখানে। বিখ্যাত লোকদের কেন যে তোমরা বুঝতে পারো না। হাতে হাত মেলালেন অরূপ লাহিড়ী।
অবিশ্বাস্য দ্রুততায় কাজ শুরু হয়ে গেল। পার্ক স্ট্রিটের একটা ফোটোর দোকান থেকে বিশেষ সাইজের ছবি তুলতে হল আমেরিকার ভিসার জন্যে। সুধামাসিকে নিয়ে সকাল নটার মধ্যে আমেরিকান কনসুলেটে হাজির হয়ে অর্জুন দেখল, অরূপ লাহিড়ী নিজে দাঁড়িয়ে আছেন। কথা ছিল ওঁদের কোনও কর্মচারী অর্জুনদের সাহায্য করতে আসবেন।

সুধামাসির সঙ্গে পরিচিত হয়ে অরূপ লাহিড়ী বললেন, একটা কথা বলা হয়নি, আমেরিকানরা ওদের দেশে অবিবাহিতদের যেতে দিতে আদৌ ইচ্ছুক নয়। একলা কোনও মানুষ ওদেশে গেলে ওখানেই থেকে যাবে বলে এদের খুব ভয়।

সে কী! খামোকা থাকতে যাবে কেন?

পৃথিবীর গরিব দেশগুলোর প্রচুর মানুষ মনে করে ওদের দেশে যেতে পারলে একটানা-একটা কাজ ঠিক জোগাড় হয়ে যাবে। এই কারণে ভিসা দেওয়ার ব্যাপারে এখন কড়াকড়ি আরম্ভ হয়েছে। ওরা নিজেদের দেশের জনসংখ্যা বাড়াতে চায় না।

সুধামাসি বললেন, আমরা কেন থাকতে যাব? জামাইকে দেখতে কদিনের জন্যে যাচ্ছি। এখানে আমাদের সবকিছু ফেলে ওখানে থাকতে যাব কেন?

অরূপ লাহিড়ী বললেন, সেটাই ওঁদের বোঝাতে হবে। অর্জুনবাবুর তো বিয়ে হয়নি, তাই তো? আপনি বলেছেন চাকরিবাকরি করেন না। আপনার প্রফেশন সার্টিফাই করবে এমন কোনও কাগজ কাছে আছে?

অর্জুন মাথা নেড়ে না বলল।

তা হলে কিন্তু আপনি ওদের চোখে অবিবাহিত বেকার। এমনিতে এক্ষেত্রে ভিসা ওরা দেবে না। তবে আপনার পাশপোর্টে আমেরিকান ইমিগ্রেশনের ছাপ আছে। ওটা প্রমাণ করছে আপনি ওদের দেশে গিয়েছিলেন এবং ফিরেও এসেছেন।

ও তো আমাকে পৌঁছে দিতে যাচ্ছে! সুধামাসি বললেন।

সেটাই ওদের বোঝাতে হবে।

তা যদি বলো, আমিও তো কাজকর্ম করি না।

হ্যাঁ। মেসোমশাই যখন জীবিত নন তখন কোনও পিছুটান নেই যে এদেশে ফিরে আসবেন। ওরা বলতেই পারে একথা। আপনার যেসব বিষয়সম্পত্তি আছে তার বিশদ বিবরণ দাখিল করলে ওরা ভাবতে পারে আপনি ফিরে আসবেন।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, তা হলে কী হবে? আমরা তো সত্যি ওদেশে থাকতে বা বেড়াতে যাচ্ছি না। প্রয়োজনটা যে জরুরি তাতে তো সন্দেহ নেই!

না নেই। গতকাল বিকেলে আমি আপনার মেয়েকে ফোন করেছিলাম। ওঁকে বলেছিলাম দুর্ঘটনার কথা লিখে আপনাকে এবং অর্জুনবাবুকে অবিলম্বে ওখানে যাওয়ার জন্যে অনুরোধ জানিয়ে ফ্যাক্স করতে। আজ সকালে সেই ফ্যাক্স এসে গেছে। বলুন, এই ফ্যাক্স নিশ্চয়ই কাজে দেবে।

অরূপবাবু নিজে উদ্যোগী হয়ে ফ্যাক্স না আনলে সত্যি ভিসা পেতে অসুবিধে হত। ভিসা অফিসার প্রথমে আপত্তি তুলেছিলেন। শেষপর্যন্ত ফ্যাক্সটি নিয়ে ভেতরে গিয়ে মিনিট দশেক ওদের অপেক্ষায় রেখে বলেছিলেন ভিসার টাকা জমা দিতে। বিকেলবেলায় পাশপোর্ট ফেরত দেওয়া হবে ভিসার ছাপ মেরে।

সেদিনই দমদম থেকে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের প্লেনে উঠে বসল ওরা। এত দ্রুত সবকিছু হয়ে গেল যাঁর জন্য তাঁকে সুধামাসি প্রাণভরে আশীবাদ করলেন। বেল্ট বাঁধার পর সুধামাসি রললেন, আমার খুব ভয় করছে।

কেন? কী হয়েছে?

আমি এর আগে কখনও প্লেনে উঠিনি।

দার্জিলিং মেলে বসে থাকলে যতটা বিপদ হতে পারে এখানে তার থেকে বেশি বিপদ হবে না সুধামাসি। আমি তো পাশে আছি।

সুধামাসি হেসে ফেললেন।

হাসলে যে?

রবীন্দ্রনাথের বীরপুরুষ কবিতার কথা মনে পড়ল।

অর্জুন হাসল। সত্যি, এখন আকাশে প্লেন বিপদে পড়লে তার কিছু করার নেই। অথচ কী সহজে সে সুধামাসিকে বলল, আমি তো পাশে আছি। অর্জুন চারপাশে তাকাল। এই প্লেন সরাসরি কলকাতা থেকে ছাড়ে বলে যাত্রীদের অনেকেই বাঙালি। মাসিমা বসেছেন জানলার ধারে, ও তাঁর পাশে। তারপরেই যাতায়াতের পথ, পথের পাশের সিটে থান পরা একজন মহিলা চোখ বন্ধ করে আছেন। অর্জুনের মনে হল, ইনিও ভয় পেয়েছেন। অর্জুন একটু ঝুঁকে বলল, কোনও অসুবিধে হচ্ছে?

বিধবা মহিলা খিঁচিয়ে উঠলেন, দেখছে আহিক করছি, তবু ঝামেলা।

অর্জুন সোজা হয়ে বসল।

প্লেন যখন তিরিশ হাজার ফুট উঁচুতে তখন অর্জুন টয়লেটে গেল। সে লক্ষ করল ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের হোস্টেসরা সবাই বেশ লম্বা, সুন্দরী এবং প্রত্যেকের মুখে হাসি লেগে রয়েছে। গতবার আমেরিকা থেকে ফেরার সময় কিছুদিন মেজরের সঙ্গে লন্ডনে এবং আশেপাশে চমৎকার কেটেছিল তার। মেজর এখন কি আমেরিকায় আছেন? বিষ্ণু সাহেব? অর্জুনের হঠাৎ মনে হল, বিদেশবিভুঁই নয়, সে পরিচিত মানুষদের কাছেই বেড়াতে যাচ্ছে। সিটে ফিরে এসে সে দেখল ইতিমধ্যেই এয়ারহোস্টেসরা ট্রলি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে খাবার পরিবেশন করতে। অরূপ লাহিড়ী টিকিট করার সময় বলে দিয়েছিলেন সুধামাসির জন্যে নিরামিষ খাবারের ব্যবস্থা করতে। ওরা তাই দিল। পাশের বিধবা মহিলা কিন্তু খাবার নিলেন না। বাঁ হাত নেড়ে না বলে দিলেন নিঃশব্দে। খাওয়া শেষ করার পর অভিনব কাণ্ডটি দেখল অর্জুন। বিধবা মহিলা তাঁর ব্যাগ খুলে একটা বড় কৌটো বের করলেন। কৌটো খুলতেই দেখা গেল তাতে লুচি এবং আলুর হেঁচকি এবং সন্দেশ রয়েছে। তৃপ্তমুখে তিনি সেগুলো খেতে লাগলেন। ট্রেনে এই দৃশ্য খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু প্লেনে কেউ বাড়ির খাবার নিয়ে ওঠে কিনা অর্জুন জানে না। বিধবা মহিলার খাবার দেখে ওঁর ডানপাশে বসা বিদেশিনী ঝুঁকে কিছু বলতেই তিনি সিঁটিয়ে এপাশে সরে এলেন। অর্জুন মন্তব্য শুনল, শান্তিতে খেতেও দেবে না। ভিখিরির দেশ নাকি?

হিথরো এয়ারপোর্টে নেমে সুধামাসি জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের জিনিসপত্র?

অর্জুন বলল, চিন্তা কোরো না। ওগুলো নিউ ইয়র্কে সোজা চলে যাবে। আমরা ওখানে গেলে পেয়ে যাব। হাঁটতে-হাঁটতে অন্য যাত্রীদের সঙ্গে ওরা যখন ট্রানজিট লাউঞ্জের দিকে এগোচ্ছে তখন বিধবা মহিলা অন্য রাস্তা ধরলেন। অর্জুন বুঝতে পারল উনি লন্ডনেই থেকে যাবেন এবং এই পথে আসা যাওয়ার অভ্যেস আছে। একটাও ইংরেজি শব্দ না জেনেও বাঙালি বিধবা মহিলারা কীরকম বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন আজকাল।

ডিউটি ফ্রি দোকানগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে সুধামাসি জিজ্ঞেস করলেন, রে, আমরা তা হলে বিলেতের মাটিতে এসে দাঁড়িয়েছি?

অর্জুন হাসল, মাটি এখান থেকে অনেক নীচে। বিলেতের এয়ারপোর্টে বলো।

তোর মেলোমশাই কলেজে পড়ার সময় এখানে এসেছিলেন। সে কতদিন আগের কথা। আমাকে তখনকার গল্প করতেন। টেক্স না কী একটা নদী আছে এখানে?

টেম্‌স।

বিশাল কাচের দেওয়ালের ওপাশে দেখা যাচ্ছে অনেক প্লেন দাঁড়িয়ে আছে। সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ সুধামাসি প্রশ্ন করলেন, সিরাজের সময় তো প্লেন ছিল না, সমুদ্র বেয়ে যেতে হত। কতদিন লাগত কলকাতায় যেতে?

দু মাসের ওপর।

তখনকার একটা জাহাজে কত লোক ধরত?

ঠিক বলতে পারব না। তবে পাঁচ-সাতশো হবে।

এখান থেকে ইংরেজরা অতদূরে গিয়ে আমাদের দেশ দখল করল কী করে রে? আমি ভাবতেই পারছি না। সমুদ্রে অতদিন থাকলে কত বিপদের সামনে পড়তে হয়। নিশ্চয়ই শয়েশয়ে জাহাজ গিয়েছিল।

না সুধামার্সি। সরকারি সৈন্যরা তো যায়নি, গিয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকজন। তাদের জাহাজের সংখ্যাও খুব বেশি হওয়ার কথা নয়।

তা হলে? সিরাজের তো অনেক সৈন্য ছিল, সমুদ্রযাত্রা করে ইংরেজরা নিশ্চয়ই কাহিল ছিল, তবু তারা জিতে গেল কী করে?

মিরজাফরদের জন্যে। ভারতবর্ষে চিরকাল একদল মানুষ বিশ্বাসঘাতকতা করে এসেছে। কিন্তু এসব অতীতের কথা। এখনকার ইংরেজদের অতশত মনেও নেই। কিন্তু লন্ডন শহরে গেলে তোমার মনে হবে তুমি ভারতবর্ষের কোনও বড় শহরে আছ।

কেন?

সব চেনা-চেনা লাগবে। ডাবলডেকার বাস, রাস্তার নামগুলো। এমনকী শেক্সপিয়রের বাড়ি, ডিকেন্সের বাড়ির কথা বইয়ে এত পড়েছে সবাই যে, অচেনা বলে মনে হবে না। রাস্তায় চলার নিয়মগুলোর সঙ্গে আমাদের দেশের কোনও পার্থক্য নেই। আমেরিকায় আবার সব উলটো। ইংরেজরা যা-যা করে, ওরা তার উলটো করে। এমনকী সুইচ টিপে যে আলো জ্বালানো হয় তার পদ্ধতিও বিপরীত করে রেখেছে ওরা। কিন্তু আমাদের সবকিছু ব্রিটিশরা নিজেদের মতো তৈরি করেছে বলে লন্ডনে এলে ভারতীয়দের কোনও অসুবিধে হয় না।

সুধামাসি বললেন, না বাবা। ছেলেবেলা থেকে জেনে আসছি ইংরেজরা আমাদের শত্রু। ক্ষুদিরামকে ফাঁসি দিয়েছিল, সুভাষ বোসকে বন্দি করে রেখেছিল, কত বিপ্লবীকে মেরে ফেলেছে।

অর্জুন হেসে ফেলল।

অ্যাই, হাসছিস কেন?

তোমার শ্বশুরমশাই ছিলেন ইংরেজ আমলের রায়বাহাদুর।

তো কী হয়েছে?

কে না জানে, ইংরেজরা কোনও শিক্ষিত ভারতীয়দের ওপর সন্তুষ্ট হলেই রায়বাহাদুর উপাধি দিত। তা সন্তুষ্ট কেন হত?

সুধামাসির মুখ গম্ভীর হয়ে গেল, এইজন্যেই তো তোর মেলোমশাই-এর সঙ্গে তাঁর বাবার কোনও মিল ছিল না। নিজের বাবাকে তিনি একটুও পছন্দ করতেন না। মায়ের জন্যে তিনি বাড়ি ছেড়ে যেতে পারেননি। জলপাইগুড়ির কলেজে চাকরি নিয়ে নিজের মতো ছিলেন। বলতেন, রায়বাহাদুরের ছেলে বলে ভাবতেই লজ্জা লাগে। শুধু ভাবতেনই না, বিশ্বাসও করতেন।

হিথরো এয়ারপোর্ট ঘণ্টা পাঁচেক কাটাতে হবে। সুধামাসিকে টয়লেটে পাঠিয়ে অর্জুন সিগারেট ধরাল। রোজই ভাবে এই সিগারেট খাওয়া বন্ধ করে দেবে। যাকে বলে নিয়মিত খাওয়া তা সে খায় না। কিন্তু হঠাৎ কোনও অলস মুহুর্তে মনে হয় একটা রাই। ঠিক নয়। আমেরিকায় গিয়ে সে একটাও সিগারেট খাবে না বলে ঠিক করল। পৃথিবীর সব ডাক্তাররা যখন বলছেন স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর তখন তা অমান্য করা আর আগুনে আঙুল দেওয়া একই ব্যাপার।

চেয়ারে বসে অর্জুনের মনে হল এ-যাত্রায় কোনও উত্তেজক কিছু ঘটবে না। শুধু যাওয়া-আসা, সুধামাসির কথা রাখা। মা বলেন, তোর কপালে সবসময় কোনও না কোনও গেরো লেগেই থাকে, না? তুই কোথাও বেড়াতে গেলেও ঠিক কেউ সেখানে বদমায়েশি করে বসে। এবার বাড়ি থেকে বেরোবার সময় সে ঠাট্টা করে বলেছিল, তোমার কোনও চিন্তা নেই। এবারের যাত্রা একেবারে নিরামিষ।

মা বলেছিলেন, দ্যাখো, পেঁকি স্বর্গে গিয়েও ধান কোটে। দ্যাখো, কোথা থেকে কী হয়ে যায়। তবে দয়া করে জড়িয়ো না।

হিথরো এয়ারপোর্টের চেয়ারে বসে অর্জুন মনে-মনে বলল, তেমন হলে তো ভালই হত। কিন্তু মনে হচ্ছে এবারের যাত্রা নেহাতই আলুনি হবে।

সুধামাসি ফিরে এলে অর্জুন গেল পরিষ্কার হতে। পুরুষদের টয়লেটে লজ্জার বালাই বেশ কম। যারা কমোড়ে বসেছে তাদের জুতো পা বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে। বেসিনগুলোর সামনে নানা দেশের মানুষ। পরিষ্কার হওয়ার পর চুল আঁচড়ে আয়নায় নিজেকে দেখতে গিয়ে অর্জুনের চোখে পড়ল পাশের বেসিনের কলে সন্তর্পণে দাঁত ধুচ্ছে একটা লোক। বাঁধানো দাঁতের পাটি এর আগেও দেখেছে সে। রাত্রে জলে ভিজিয়ে রেখে সকালে পরিষ্কার করা হয়। এই লোকটির সেই সুযোগ না থাকায় কলের জলেই ধুয়ে নিচ্ছে। হঠাৎ অর্জুনের চোখে পড়ল ধোয়ার সময় দাঁতের ভেতরের দিকে টুক করে সাদা রঙের কিছু আটকে ফেলল লোকটা। লম্বা লেবুর কোয়ার মতো বেঁকানো জিনিসটা কি প্লাস্টিকের তৈরি? লাগিয়েই মুখে পুরে ফেলে হাঁ করে দাঁতটা ঠিক বসেছে কিনা আয়নায় দেখল। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে নিশ্চিত হয়ে গরম বাতাস বেরনো মেশিনের নীচে হাত রেখে শুকিয়ে নিল। অর্জুন লোকটাকে দেখল। গায়ের চামড়া সাদা, রুমালে মুখ মুছে বেরিয়ে এল লোকটা।

অর্জুনও ওর পেছনে চলে এল। লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে অর্জুনকে দেখল, দেখে হাসল, পাকিস্তানি?

নো। ইন্ডিয়ান।

আ, ইন্ডিয়ান। গুড়। হোয়ার আর ইউ গোয়িং?

আমেরিকা।

আ। মি ট্র। টুরিস্ট?

ইয়েস।

আই স্টে দেয়ার।

লোকটার গলার স্বর জড়ানো। উচ্চারণে জড়তা আছে। এমনিতে বেশ হাসিখুশি কিন্তু ও যে দাঁতের ভেতর কিছু লুকিয়েছে তাতে অর্জুনের কোনও সন্দেহ নেই। লোকটা চলে যেতেই অর্জুন ফিরে এল সুধামাসির কাছে। সুধামাসি বললেন, কী চমৎকার বানিয়েছে রে। দোকানগুলোতে কতরকমের জিনিস, কিন্তু বড় বেশি দাম।

কিছু খাবে?

পাগল। প্লেনে যা খাইয়েছে তাতে গলা বন্ধ হয়ে গেছে।

এখানে যারা আছে তাদের কেউ লন্ডনে যাবে না?

না। এটাকে বলে ট্রানজিট লাউঞ্জ। যে যার গন্তব্যে যাওয়ার জন্যে প্লেন ধরবে এখান থেকে। তাই এখানে নামলে বিলিতি ভিসার দরকার হয় না। অর্জুন কথা শেষ করতেই রোগামতো এক মহিলা সামনে এসে দাঁড়ালেন। মহিলার বয়স বেশি নয়, দেখলেই রাগী মেমসাহেব বলে বোঝা যায়।

এক্সকিউজ মি জেন্টলম্যান। ইওর পাশপোর্ট প্লিজ! হাত বাড়ালেন মহিলা। সেইসঙ্গে নিজের আইডেনটিটি কার্ড দেখালেন তিনি। ঝটপট কিছুই পড়তে পারল না অর্জুন। সে পাশপোর্ট বের করে মহিলার হাতে দিল। তিনি কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে দেখলেন। তারপর ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ওই

লোকটিকে কী করে চিনলেন?

অবাক হয়ে গেল অর্জুন, কোন লোকটি?

যার সঙ্গে টয়লেট থেকে বেরিয়ে কথা বলছিলেন?

ও। ওকে আগে আমি চিনতাম না। টয়লেটেই প্রথম দেখি।

কী বলল লোকটা?

এমনি, সাধারণ কথাবার্তা। কোত্থেকে আসছি, কোথায় যাচ্ছি, এইসব।

আর ইউ শিওর, ওকে আগে কখনও দ্যাখেননি?

না। কিন্তু কেন এসব জিজ্ঞেস করছেন জানতে পারি?

ভদ্রমহিলা এবার হাসলেন, তেমন কিছু নয়। ইনি আপনার সঙ্গে আছেন?

হ্যাঁ। ইনি আমার মাসিমা।

ভদ্রমহিলা সুধামাসির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন ঈষৎ হেসে। তারপর বললেন, অজানা লোকের সঙ্গে বেশি কথা না বলাই ভাল, বিশেষ করে যারা গায়ে পড়ে ভাব জমাতে আসে। ওয়েল? মাথা নাড়লেন মহিলা, এইসব কথা আর কাউকে না বললেই ভাল করবেন। ভদ্রমহিলা চলে গেলেন।

ইংরেজিতে কথা হলেও সুধামাসি কিছু কিছু বুঝতে পারছিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কে রে? কার সঙ্গে কথা বলেছিস?

একটা লোক আমাকে জিজ্ঞেস করছিল আমি পাকিস্তানি কি না!

তাতে দোষ কী হল? এ কি মেয়ে-পুলিশ?

ওইরকমই কেউ হবে।

সময় কাটতে চায় না। সুধামাসিকে বসিয়ে রেখে অর্জুন সামনের দোকানে ঢুকল। কাচের দেওয়ালে আলো পড়ায়, ঝকঝক করছে। একদিকে চকোলেটের এগজিবিশন, অন্যদিকে নানান ধরনের সিগারেটের কার্টুন আর মদের বোতল।

এ-দোকান থেকে ও-দোকানে ঘুরতে-ঘুরতে একটা কফিশপে চলে এল সে। কফিশপ হলেও কোল্ড ড্রিঙ্কস বিক্রি হচ্ছে সে জানল এক কাপ কফির দাম এখানে দেড় পাউন্ড। তার মানে ভারতীয় টাকায় প্রায় চুরাশি টাকা। দোকানে ঢুকে না কিনে বেরিয়ে যেতে সঙ্কোচ হচ্ছিল। কলকাতা থেকে আসার সময় সুধামাসির টাকায় কিছু ভুলার দুজনের নামে কিনে দিয়েছিলেন অরূপ লাহিড়ী। দাঁত মাজার পর চা বা কফি না খেলে খারাপ লাগে। অর্জুন এককাপ কফি নিয়ে চুমুক দিতেই শুনল, হাই!

সে দেখল ওই লোকটি হাত নেড়ে কাছে এল, কফি?

অর্জুন মাথা নাড়ল, ইয়েস। ড়ু ইউ লাইক ইট? ইচ্ছে করেই অর্জুন জিজ্ঞেস করল।

ওঃ, নো নো। নো হট ড্রিঙ্ক! সরি! লোকটা হাসল।

ওর বাঁধানো দাঁতের দিকে তাকিয়ে অর্জুনের মনে পড়ল প্লাস্টিকের থলের কথা। গরম জিনিস মুখে গেলে সেই থলে কেটে যেতে পারে বলেই কি ও খাচ্ছে না। এই সময় দুজন লোক হঠাৎ লোকটার দুপাশে চলে এসে তাদের কার্ড দেখিয়ে টানতে-টানতে দেওয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড় করিয়ে দিল। একজন ওর জ্যাকেট, শার্ট প্যান্ট থেকে শুরু করে সর্বাঙ্গ সার্চ করতে লাগল। ওর জুতো খুলেও দেখল ওরা। জ্যাকেটের ভাঁজও পরীক্ষা করা হল। শেষপর্যন্ত কিছুই না পেয়ে ছেড়ে দিয়ে চলে গেল। লোকটা কিন্তু একটুও রাগল না। ফিরে এসে অর্জুনের পাশে দাঁড়িয়ে বলল, এরা কী ভাবে বলো তো? সবাই ক্রিমিনাল?
শেষপর্যন্ত নিউ ইয়র্কগামী প্লেনের যাত্রীদের বলা হল, তেইশ নম্বর গেটের দিকে এগিয়ে যেতে, প্লেন এখনই ছাড়বে। সুধামাসিকে নিয়ে এগোল অর্জুন। সুধামাসি বললেন, জানিস, অনেক বাঙালি এই এয়ারপোর্টে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একজনকে দেখলাম আমার চেয়ে বয়স্কা, ছেলের কাছে যাচ্ছেন।

অর্জুন হাসল, ইচ্ছে করলে তুমি একাই আসতে পারতে।

অসম্ভব। এই দ্যাখ না, আমরা কোথায় বসেছিলাম আর প্লেনে উঠতে কোথায় হেঁটে যেতে হচ্ছে। সুধামাসি তাল রাখতে একটু দ্রুত হেঁটে চলেছিলেন।

কথাটা ঠিক। এয়ারপোর্টটা এত বড়, চোখ খোলা রেখে না চললে ঝামেলা হবেই। অর্জুনের মনে হচ্ছিল সমস্ত পৃথিবী থেকে মানুষ এই ট্রানজিট লাউঞ্জে এসে একটা মিনি পৃথিবী তৈরি করে ফেলেছে। সে ঘাড় ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে লোকটাকে দেখতে চেষ্টা করছিল। কফির দোকান থেকে সেই যে লোকটা উধাও হয়েছে আর দেখা পায়নি সে। লোকটা অবশ্য ক্রিমিনাল। ওর দাঁতের ভেতরদিকে কিছু একটা বেআইনি জিনিস লুকিয়ে রেখেছে। তার উচিত ছিল নিরাপত্তাকর্মীদের খবরটা দিয়ে দেওয়া। কিন্তু সুধামাসি তাকে বারংবার নিষেধ করেছেন, না বাবা, দেশের বাইরে এসে তুই ওসব ঝামেলায় জড়িয়ে পড়িস না। আমরা একটা কাজে যাচ্ছি, এইটে মনে রাখিস।

নতুন প্লেনে উঠে সুধামাসির পাশে আরাম করে বসল সে। স্থানীয় সময়ের সঙ্গে ওদের ঘড়ির ভারতীয় সময়ের যে ব্যবধান বেড়ে চলেছে তার কারণ ব্যাখ্যা করতে হল সুধামাসিকে। এখানে সকাল হলেও কলকাতায় প্রায় বিকেল। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পিছিয়ে গেছে তারা ইতিমধ্যে। আমেরিকায় গেলে আরও পিছিয়ে যাবে। সুধামাসি অবাক হয়ে বললেন, তাই! এতক্ষণে বুঝলাম এ দেশে এসে বাই এত চটপটে কী করে হয়! প্রত্যেকের বয়স কমে যায় যে!

অর্জুন হাসল। এখন বেশ কয়েক ঘণ্টা আকাশে উড়ে যাওয়া। খাওয়াদাওয়ার পর সিনেমা দেখানো হবে। অনেকেই ঘুমোবে। প্লেন আকাশে ওড়ার পর সে টয়লেটের দিকে এগোল। খানিকটা যাওয়ার পর অর্জুন লোকটাকে দেখতে পেল। মাঝখানের সিটে বসে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে, হাই। সে মাথা নেড়ে টয়লেটে ঢুকে গেল। এই লোকটা ক্রিমিনাল হলেও তার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করছে। এ তো করবেই। যে-কোনও ক্রিমিনাল হয় কারও বাবা অথবা ছেলে কিংবা স্বামী। অর্থাৎ একজন মানুষ।

কেনেডি এয়ারপোর্টে যখন প্লেন নামল তখন সূর্যদেব বহাল আছেন আকাশে। যাত্রীদের লাইন দিতে হচ্ছে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে। অনেক কাউন্টারের পেছনে কম্পুটার নিয়ে বসে আছেন গম্ভীর মুখের কর্মচারীরা।

প্লেনে তাদের একটি ফর্ম দেওয়া হয়েছিল যাতে নাম-ধাম, পাশপোর্ট নাম্বার ইত্যাদি লিখতে হয়েছিল। সেই ফর্ম এবং পাশপোর্ট ওঁরা পরীক্ষা করে সন্তুষ্ট হলে তবে আমেরিকায় ঢোকার অনুমতি দেওয়া হবে।

সুধামাসি লাইনে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হলেন, এ কী রে! যেন কেরোসিনের লাইন দিয়েছি। আমরা কি এত খারাপ লোক যে, লাইনে দাঁড় করিয়ে পরীক্ষা নেবে?

অর্জুন বলল, যারা বিদেশ থেকে আসে তাদের এই পরীক্ষা আমাদের দেশেও করা হয়ে থাকে সুধামাসি। কে ভাল কে মন্দ তা তো মুখ দেখে বোঝা যায় না।

যাই বলিস, ওরা যেন আমাদের কৃপাপ্রার্থী হিসেবে দেখছে। ওই দ্যাখ, কীরকম ধমকাচ্ছে।

অর্জুন দেখল একজন যাত্রী লাইন ছেড়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন তাঁকে নিরাপত্তাকর্মী ধমক দিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দিল। সত্যি, জলপাইগুড়িতে কেরোসিনের অভাব হলে দোকানে যে লাইন পড়ে তার কথা এখন মনে পড়ে যাচ্ছে। আসলে প্রতি মিনিটে গোটা পৃথিবী থেকে লোক এই এয়ারপোর্টে নামছে আমেরিকায় ঢুকবে বলে। সুতরাং লাইন অে পড়বেই।

শেষ পর্যন্ত ওদের সামনে কেউ নেই এবং একই সঙ্গে পাশাপাশি দুটো কাউন্টার খালি হওয়ায় ওরা এগিয়ে গেল। অর্জুন পাশপোর্ট আর ফর্ম এগিয়ে দিল। লোকটি ফর্মের লেখায় টিক মেরে পাশপোর্টের ভিসার ছাপ দেখল। দেখে জিজ্ঞেস করল, কেন এসেছ?

অর্জুন বলল, আমি ওই মহিলার এসকর্ট হিসেবে এসেছি।

আর?

আর কিছু নেই।

লোকটি একটি যন্ত্রের ওপর পাশপোর্টের একটা পাতা চেপে ধরল। তারপর নাম্বারটা কম্পিউটারে টাইপ করে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। চট করে মুখ তুলে অর্জুনকে একবার দেখে নিয়ে লোকটি একটা বোতাম টিপল। সঙ্গে সঙ্গে একজন সাদা পোশাকের অফিসার দ্রুত চলে এলেন কাছে। পাশপোর্ট আর ফর্মটা দেখলেন তিনি। কম্পিউটারের দিকে তাকালেন। অর্জুন বুঝতে পারছিল না কী এমন গোলমাল হয়েছে। ওদিকে সুধামাসির পাশপোর্টে ছাপ মেরে ওরা ছেড়ে দিয়েছে। তিনি সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে চিৎকার করে ডাকলেন, এই যে আমি এখানে, চলে আয়।

সাদা পোশাকের অফিসার ইংরেজি বলল কিন্তু জড়ানো উচ্চারণ, আমার সঙ্গে এসো।

অর্জুন চেঁচিয়ে সুধামাসিকে বলল, আপনি অপেক্ষা করুন, আমি আসছি।

সুধামাসি কিছু বলার সুযোগ পেলেন না। অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, ওই মহিলা তোমার সঙ্গে?

হ্যাঁ। আমরা একসঙ্গে আসছি। আমি ওঁর এসকর্ট। কিন্তু কী হয়েছে? আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?

একটু পরেই জানতে পারবে।

দোতলার একটি ঘরে ওকে বসতে বলল অফিসার। সুদৃশ্য কয়েকটি চেয়ার ছাড়া ঘরে কিছুই নেই। অফিসার ভেতরে চলে গেলে অর্জুন চেয়ারে বসল। সে বুঝতে পারছিল, ওরা তাকে আটক করেছে কিন্তু সে ভেবে কোনও কারণ খুঁজে পাচ্ছিল না। আমেরিকান সরকারের পক্ষে অপ্রীতিকর কোনও কাজ সে করেনি এবং প্রশ্নও ওঠে না। সুধামাসির জন্যে খারাপ লাগছিল। উনি নিশ্চয়ই খুব নার্ভাস হয়ে পড়েছেন। এই সময় আর-একজন অফিসার ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি জিমকে কতদিন ধরে চেনো? কী সম্পর্ক তোমাদের?

একসঙ্গে কাজ করো?

কে জিম? আমি ওই নামের কাউকে চিনি না।

মিথ্যে কথা বলে কোনও লাভ হবে না মিস্টার অর্জুন।

আমি মিথ্যে কথা বলছি না।

তুমি একজন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটার। এর আগে আমাদের দেশে এসেছিলে কেন?

বেড়াতে।

হুঁ। তুমি জিমকে চেনো না?

না।

ফলো মি। লোকটি ইঙ্গিত করতে অর্জুন তাকে অনুসরণ করতে বাধ্য হল। দ্বিতীয় ঘর পার হওয়ার পর তৃতীয় ঘরে পৌঁছে সে অবাক হয়ে গেল। সেই লোকটাকে চেয়ারে বসিয়ে দুজন অফিসার কথা বলছে। ওকে কখন ইমিগ্রেশনের লাইন থেকে ধরে নিয়ে এল কে জানে!

লোকটিকে তৃতীয় অফিসার জিজ্ঞেস করল, একে তুমি চেনো?

লোকটি মাথা নেড়ে হাসল, হাই।

এবার অফিসার ঘুরে দাঁড়াল, তা হলে তুমি মিথ্যেবাদী।

কখনও না। ওর নাম যে জিম তাই আমি জানি না। এয়ারপোর্টের টয়লেটে আমার সঙ্গে হেসে দু-একটা কথা বলেছিল। আমি ওর নাম জিজ্ঞেস করিনি। তারপর ওখানকার নিরাপত্তাকর্মীরা আমাকে ওর ব্যাপারে প্রশ্ন করে এবং সস্তুষ্ট হয়ে চলে যায়।

এবং তারপরেও তোমরা কফির দোকানে কথা বলেছ।

হ্যাঁ। সেখানে হঠাৎই দেখা হয়ে যায়। আমি আবার বলছি ওকে আমি চিনি না, এর আগে কখনও দেখিনি, নামও এই প্রথম শুনলাম। আমার সঙ্গে আলাপ করেছিল, সাধারণত লোকে যেরকম করে। তা ছাড়া আমার কাজ অপরাধীকে খুঁজে বের করা, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব নয়। অর্জুন বলল।

তার মানে একে অপরাধী ভেবে বন্ধুত্ব করতে চাওনি?

অবান্তর কথা। পথ চলতে আলাপ হওয়া সহযাত্রী সম্পর্কে কোনও ধারণা তৈরি হয় না, যদি না বিশেষ কোনও ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে সেরকম কিছু হয়নি।

অফিসাররা নিজেদের মধ্যে কথা বলার পর একজন এগিয়ে এলেন, আপনাকে একটু কষ্ট করতে হল বলে দুঃখিত। আশা করি আপনার আমেরিকায় থাকতে ভাল লাগবে। আসুন।

অফিসারটি পাশপোর্টে ছাপ মারিয়ে অর্জুনকে ফেরত দিল।

সুধামাসি একমুখ ভয় নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অর্জুনকে আসতে দেখে দ্রুত আসার চেষ্টা কলেন, কী ব্যাপার? তোর এত দেরি হচ্ছিল কেন? ভয়ে আমার হাত-পা কাঁপছিল। কী হয়েছিল?

তেমন কিছু নয়। মাঝে মাঝে এক-একজনকে ওরা প্রশ্ন করে। তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি?

না। কী বলল বুঝতে পারলাম না। আমি বললাম মেয়ের কাছে এসেছি। জামাই হাসপাতালে। তো এই পাশপোর্টে ছাপ মেরে ইশারা করল এদিকে চলে আসতে।

ওরা সামান্য এগোতেই দেখল বেল্টে সুটকেস ঘুরছে। যাত্রীরা এর মধ্যে যার-যার লাগেজ নিয়ে চলে গিয়েছে। শুধু চারটে সুটকেস পাক খাচ্ছে। অর্জুন তাড়াতাড়ি তিনখানা নামিয়ে নিল। চতুর্থ সুটকেস ওদের নয়। ওপাশে দেওয়ালের ধারে সার দিয়ে ট্রলি রাখা আছে। তার একটাকে টেনে বের করতে না পেরে অর্জুনের মনে পড়ল এ-দেশে পয়সা না দিলে ট্রলি ব্যবহার করা যায়। পকেটে দশ ডলারের নীচে নোট নেই অথচ ডলার জমা দেওয়ার গর্তের ওপর লেখা আছে এক ডলার দিতে হবে। কাছাকাছি কেউ নেই যে, জিজ্ঞেস করবে কী করা যায়। এই সময় সে অবাক হয়ে দেখল লোকটা যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে হেঁটে আসছে। তা হলে ওরা ওকে ছেড়ে দিয়েছে? নিশ্চয়ই ওর সম্পর্কে খবর এসেছিল কিন্তু কোনও প্রমাণ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। লোকটি বাঁ হাত দিয়ে সুটকেস তুলে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল, হাই! প্রব্লেম?

আমার কাছে চেঞ্জ নেই কিন্তু ট্রলি দরকার।

কত ডলারের নোট আছে?

দশ।

ওটাই ভেতরে ঢোকাও।

অর্জুন অবাক হয়ে চ্যাপটা সরু গর্ত দিয়ে দশ ডলারের নোট ঢোকাল। তারপরেই ঝনঝন করে কয়েন পড়তে লাগল। পঞ্চাশ সেন্টের আঠারোটা কয়েন। খট করে শব্দ হল। ট্রলিটা টানতেই সেটা বেরিয়ে এল দঙ্গল থেকে। এগিয়ে গিয়ে সুটকেসগুলো তুলল অর্জুন। লোকটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে কেন? ওরা নিশ্চয়ই ওর ওপর নজর রাখছে। সে সুধামাসিকে বলল, চলো।

অরূপ লাহিড়ী বলেছিলেন, আমি টেলিফোনে আপনার মেয়েকে বলে দিয়েছি কোন ফ্লাইটে আপনারা যাচ্ছেন। উনি এয়ারপোর্টে থাকবেন। সুধামাসির মেয়ে নিশ্চয়ই গাড়ি নিয়ে আসবে। এ-দেশে গাড়ি ছাড়া থাকাই যায় না।

অর্জুন দেখল সামনেই কাস্টমসের অফিসাররা দাঁড়িয়ে আছেন। সবুজ এবং লাল, দুরকম গেট রয়েছে বাইরে যাওয়ার জন্যে। যারা কোনও বেআইনি জিনিস সঙ্গে আনেনি তারা স্বচ্ছন্দে সবুজ গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। লাল গেটে একটাও লোক নেই। অর্জুন সুধামাসিকে নিয়ে সবুজ গেটের দিকে এগোচ্ছিল। ওপাশে যেসব কাস্টমস অফিসার দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁদের একজন এগিয়ে এসে পাশপোর্ট দেখতে চাইলেন। অর্জুন নিজেরটা বের করে দিতেই তাতে চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি নিশ্চিত যে, ডিক্লেয়ার করার মতো কোনও জিনিস তোমার কাছে নেই? একটু ভেবে বলো।

অর্জুন ঘাড় নাড়ল, না। আমরা কোনও বেআইনি জিনিস আনছি না।

ঠিক আছে, তোমরা ওই টেবিলের সামনে যাও।

ওরা সুটকেস খুলতে বলল। অর্জুন বাধ্য হল তার সব জিনিস দেখাতে। সেখানে কোনও বেআইনি জিনিস নেই। লোকগুলো তার সুটকেস ইকে-টুকে দেখে সুধামাসির দুটো সুটকেস খুলতে বলল। কিছু জামাকাপড়, তারপর প্যাকেট বের হতে লাগল। বিভিন্ন ধরনের বড়ি, নাড়, মিষ্টি, চিড়ে, মুড়ি, সরষের তেলের টিন। কাস্টমসের অফিসার প্রত্যেকটির নাম এবং কী কাজে লাগে জেনে নেওয়ার পর সব বাজেয়াপ্ত করে নিল। আমেরিকায় বিদেশ থেকে খাবার নিয়ে আসার অনুমতি নেই। সুধামাসি খুব রেগে গিয়ে ভাঙা ইংরেজি এবং বাংলায় ওদের বোঝাতে চাইছেন এসব তিনি নিজের হাতে বানিয়েছেন। সাহেবরা কোনওদিন খায়নি বলে বুঝতে পারছে না। ইচ্ছে হলে তাঁর মেয়ের বাড়িতে গিয়ে খেয়ে আসতে পারে। মেয়ে এসব খুব পছন্দ করে বলে তিনি অনেক কষ্ট করে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু এতে বরফ গলল না। এর ওপর সুধামাসির কাপড়ের ভাঁজে ন্যাপথলিনের গোল বল পেয়ে ওঁদের মুখ চকচক করে উঠল। প্রবল উৎসাহে সেগুলো সংগ্রহ করে খবর পাঠাতে আর একজন অফিসার ভেতর থেকে এলেন। সামান্য পরীক্ষা করে তিনি হেসে মাথা নাড়লেন, ন্যাপথলিন। ছেড়ে দাও। ভদ্রলোক ফিরে গেলেন।

এবার একজন অফিসার অর্জুনকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে সার্চ করতে চাই।

যা ইচ্ছে করুন। দুটো হাত দুদিকে বাড়িয়ে দিল অর্জুন।

পা থেকে ঘাড় পর্যন্ত আতিপাতি করে খুঁজে কিছুই না পেয়ে জামার তলায় লুকিয়ে থাকা লকেটটি চেপে ধরে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী?

লকেট।

অর্জুন বাধ্য হল লকেটসুদ্ধ হার মাথা থেকে বের করে নিতে। সাপের লকেটের দিকে তাকিয়ে অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী ধরনের লকেট?

এটা একটা সাপের লকেট।

সেটা দেখতে পাচ্ছি। মেটালটা কী?

মনে হয় গলা বা ওই জাতীয় কিছু। অর্জুন জবাব দিল।

সুতো ধরে লকেট ঝুলিয়ে ভদ্রলোক সহকর্মীদের দেখালেন। তাঁদের তিনজন বলল, বিউটিফুল, নাই, গুড়।

এটা তুমি কেন পরেছ?

যারা আমার সঙ্গে বিনা কারণে শত্রুতা করবে, সাপের দেবতা তাদের ধ্বংস করবেন।

মাই গড। লোকটি লকেট ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, প্যাকআপ করে চলে যান।

সুটকেসে ভাঁজ করে জামাপ্যান্ট ঢুকিয়ে দেওয়ার পর তা আবার খুলে বের করলে নতুন করে ঢোকানো খুব কষ্টকর। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনও উপায় নেই। অর্জুন সুধামাসিকে বোঝাল, কাস্টমস অফিসারদের অধিকার আছে জিনিসপত্র তল্লাশ করার দেশের স্বার্থেই করে ওরা। লকেট গলায় পরে মালপত্র সুটকেসে কোনওমতে ঢুকিয়ে ওরা আবার ট্রলি নিয়ে বাইরের দিকে এগোল। একটা এলাকার পর অনেক মানুষ নজরে পড়ল। দেশ থেকে আসা অতিথিদের নিয়ে যেতে এসেছেন ওঁরা। অর্জুন দেখল সুধামাসির মেয়ে হাত নাড়ছেন ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে। সে হাত নেড়ে সুধামাসিকে বলতেই তিনি সেখান থেকে চিৎকার করলেন, কী অসভ্য দেশ রে এরা। তোর জন্যে যাএনেছিলাম সব কেড়ে নিল! নিশ্চয়ই নিজেরা খাবে অথচ তোদের জন্যে নিয়ে আসতে দেবে না।

অর্জুন বলল, সুধামাসি, অত জোরে জোরে বলবেন না।

ততক্ষণে ওরা বেরিয়ে এসেছে। সুধামাসির মেয়ের নাম অঞ্জনা ব্যানার্জি। তাঁর পরনে জিন্স এবং হালকা পুলওভার। চুল কাঁধ পর্যন্ত ছাঁটা। মায়ের হাত ধরে বললেন, তুমি এসেছ তাই যথেষ্ট।

জামাই কেমন আছে, সেটা আগে বল!

এখন একটু ভাল। তবে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেতে দেরি আছে।

তোর সঙ্গে এর আলাপ আছে? আমাদের জলপাইগুড়ির গর্ব, অর্জুন।

হ্যাঁ, চিনতে পেরেছি। ওয়েলকাম। অঞ্জনা একগাল হাসলেন।

এখান থেকে তোর বাড়ি কত দূরে? সুধামাসি জিজ্ঞেস করলেন। বেশি সময় লাগবে না। এই তিনটে সুটকেস তো? তোমরা বাইরে অপেক্ষা করো, আমি পার্কিং থেকে গাড়ি নিয়ে আসি। এখানে এত দূরে গাড়ি রাখতে হয়!

ওরা অঞ্জনার পেছন-পেছন বাইরে আসতেই চমৎকার ঠাণ্ডা আবহাওয়া পেল। কড়া শীত নয়, কিন্তু তার আমেজ রয়েছে। অঞ্জনা চলে গেলেন।

সুধামাসি বললেন, এই প্রথম আমি মেয়েকে প্যান্ট পরতে দেখলাম।

ওঁকে কিন্তু চমৎকার মানিয়েছে। অর্জুন বলল।

এর আগেরবার যখন সে লাইটারের সন্ধানে নিউ ইয়র্কে এসেছিল তখনকার কথা মনে করার চেষ্টা করছিল সে। মেজর এখন এখানে আছেন কিনা কে

জানে! অনেকদিন যোগাযোগ নেই ওঁর সঙ্গে। তার ডায়েরিতে ওঁর নাম্বার লেখা আছে কিন্তু সেই নাম্বারে উনি আছেন কিনা কে জানে।

এই সময় সে লোকটিকে আবার দেখতে পেল। সুটকেস নিয়ে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। লোকটা তো আগেই সবুজ গেট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, তা হলে এখনও চলে যায়নি কেন? এই লোকটার জন্যে তাকে দু-দুবার ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। অর্জুন দেখল লোকটি এগিয়ে আসছে। কিন্তু হাঁটার ভঙ্গি বেশ আড়ষ্ট, কেমন ভয়-ভয় ভাব। অর্জুন চোখ সরিয়ে নিল। অঞ্জনাদি গাড়ি নিয়ে চলে এলে বাঁচা যায়।

সার? কাঁপা কণ্ঠস্বর কানে আসতে মুখ ফেরাল অর্জুন।

লোকটি দাঁড়িয়ে আছে আড়াই হাত দূরে।

সার। যদি কিছু মনে না করেন তা হলে একটা অনুরোধ করতে পারি?

বলুন!

আপনি যে লকেটটা পরে আছেন সেটা একবার দেখাবেন?

লকেট?

হ্যাঁ, খুলতে হবে না, দূর থেকে দেখালেই হবে। প্লিজ।

আপনি আমাকে মিছিমিছি বিরক্ত করছেন।

আমি খুবই দুঃখিত। কিন্তু সার, একবার, প্লিজ।

অর্জুন বিরক্ত ভঙ্গিতে জামার নীচ থেকে লকেটটা বের করে সামনে তুলে ধরল। সেটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে অদ্ভুত শব্দ করে উঠল লোকটা। তারপর হাউমাউ করে ঘঁটু মুড়ে বসে পড়ল অর্জুনের সামনে। সুধামাসি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ও কী, ও কী করছে রে?

অর্জুনও বুঝতে পারছিল না। এখন এ দিকটা বেশ ফাঁকা বলে লোকজন দৃশ্যটা তেমন উপভোগ করছে না। বিড়বিড় করে কিছু বলে লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে বারংবার মাথা ঝাঁকাতে লাগল। অর্জুনের হাসি পাচ্ছিল। এই সময় অঞ্জনা গাড়ি নিয়ে একেবারে পাশে চলে এলেন। ডিকি খুলে তিনি এগিয়ে আসতেই অর্জুন সুটকেস তাতে তুলে দিয়ে দেখল লোকটা তখন পরম শ্রদ্ধায় মাথা দুলিয়ে চলেছে।

মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চাপল। দু পা এগিয়ে গিয়ে অর্জুন বলল, তোমার দাঁতের ভেতরে একটা প্যাকেট আছে, ওটার কথা কিন্তু আমি এদের বলিনি।

কথাটা শোনামাত্র লোকটা সুটকেস তুলে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়তে লাগল। সুধামাসি পেছনের আসনে বসে ছিলেন। অর্জুন ড্রাইভিং সিটের পাশে বসতেই অঞ্জনা জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে? ও পালাল কেন? ভূত দেখল নাকি?

বোধ হয় তাই। অঞ্জনাদি, আপনি একটু ঘুর রাস্তায় গাড়ি চালাবেন? আমরা কোথায় যাচ্ছি তা যদি কেউ ফলো করে দেখতে চায়, তা যেন না পায়। অর্জুন বলল।

সর্বনাশ। চেঁকি দেখছি স্বর্গে গিয়েও ধান ভানছে। পরে গল্পটা শুনব, আগে তুমি সিটবেল্ট বাঁধে। নইলে আমাকে ফাইন দিতে হবে। অঞ্জনা গাড়ি চালু করলেন।
অনেক রাস্তায় চক্কর খেয়ে হাডসন নদীর ওপর ব্রিজ পার হয়ে নিউ জার্সির রাস্তা ধরলেন অঞ্জনা। অর্জুন প্রায়ই লক্ষ করছিল পেছনে কোনও গাড়ি আসছে কিনা তাদের অনুসরণ করে। একটা সময় সে নিঃসন্দেহ হল, না, কেউ নেই। এখন দুপাশে জঙ্গল, কিন্তু সুদৃশ্য জঙ্গল, মাঝখানের মসৃণ রাস্তা ধরে গাড়ি এগিয়ে চলেছে। অঞ্জনা বললেন, জানো মা, আগে আমরা কুইন্সে থাকতাম। আটতলার ফ্ল্যাটে। চারপাশে লোকজন সবসময় ক্যাচম্যাচ করছে। এখন একেবারে ফাঁকা জায়গায় চলে এসেছি। কিন্তু বাড়িটা বোধ হয় অলুক্ষুনে, নইলে ওর অ্যাকসিডেন্ট হল কেন?

অ্যাকসিডেন্টের সঙ্গে বাড়ির কী সম্পর্ক রে? তোরা এখানে এসে দেখছি আরও সংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিস। যে-কোনও একটা ভুল অথবা গোলমালের জন্যে অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল। এখন তো ও ভাল আছে বলছিস। ছেলে কোথায়? সুধামাসি জিজ্ঞেস করলেন।

ও এতদিন ছিল। আর কামাই করা যাবে না বলে হস্টেলে চলে গিয়েছে।

একমাত্র ছেলে, তাকেও নিজের কাছে রাখিস না?

কী করব বলো? আমরা দুজনেই সকাল আটটায় বেরিয়ে সন্ধে ছটায় ফিরি। ও কার কাছে এতদিন থাকত? তোমাকে বলেছিলাম চলে এসো, তুমি

আসোনি। একা-একা জলপাইগুড়িতে যে কোন মায়ায় থাকো কে জানে?

মা এবং মেয়ের এসব কথাবার্তা অর্জুনের কানে ঢুকছিল না। সে জামার নীচে পরে থাকা লকেটটাকে ওপর থেকে স্পর্শ করল। এই লকেট দেখে জিম নামের লোকটা ওইরকম শ্রদ্ধা দেখাল কেন? এই লকেটের সঙ্গে ওর কী সম্পর্ক? জিম নিশ্চয়ই কোনও বেআইনি জিনিস দাঁতের ভেতর আটকে এদেশে নিয়ে এসেছে। সে ইচ্ছে করলে যে-কোনও নিরাপত্তাকর্মীকে খবরটা দিতে পারত। কেন দেয়নি তা অর্জুনের নিজের কাছেও স্পষ্ট নয়। যদি জিম ওটা ইতিমধ্যে সরিয়ে ফেলত তা হলে খবরটা দিয়ে সে বেশ বেকায়দায় পড়ে যেত। লোকটা শক্ত হয়ে গেলে তার কী লাভ হত! কিন্তু লকেটটা দেখার পর জিমের আচরণের কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছিল না অর্জুন। কিন্তু এটা যে মূল্যবান জিনিস তাতে সন্দেহ নেই। অথচ এই জিনিস গোরক্ষনাথ অমল সোমের বাগানে গাছের তলায় পুঁতে রেখেছিল। অমলদা নিশ্চয়ই এর গুরুত্ব সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন না।

আমরা এসে গেছি অর্জুনবাবু। অঞ্জনা বললেন।

অর্জুন লক্ষ করছিল গাছপালা মাঠজঙ্গল পেরিয়ে মাঝে-মাঝেই গাড়ি জনবসতির পাশ কাটিয়ে এতক্ষণ ছুটে যাচ্ছিল। কোথাও ঘিঞ্জি বাড়িঘর নেই, মানুষের ভিড় নেই। এবার একটা পেট্রল পাম্প চোখে পড়ল। এরা অবশ্য বলে গ্যাসস্টেশন। তারপরেই রেললাইন পেল্লিয়ে দুপাশে সুন্দর ছবির মতো একতলা দোকান শুরু হয়ে গেল। বড়জোর দেড়শো গজ রাস্তার দুপাশে দোকান অথবা বার এবং রেস্টুরেন্ট। তারপর বাগানওয়ালা বাড়ি শুরু হয়ে গেল। এই সময় ফুটপাথে দু-একজন মানুষকে হাঁটতে দেখা গেল। অঞ্জনা ঘোষণা করলেন, এই আমাদের শহরের বাজারহাট করার জায়গা।

সুধামাসি বললেন, সে কী রে! আমার তো মনে হচ্ছিল ভৌতিক জায়গা, লোকজন নেই।

অঞ্জনা হাসলেন, শনি রবিবার এসে দেখো লোক গিজগিজ করছে। এদেশে সোম থেকে শুক্র কেউ অফিস আর বাড়ি ছাড়া কোথাও যায় না। বাঁ দিকের নীলচে বাড়িটা আমাদের।

অর্জুন দেখল বাগান সামনে নিয়ে একটা দেড়তলা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ইংরেজি ছবিতে যেসব বাড়ি দেখা যায় ঠিক সেইরকম। অঞ্জনা গাড়ি থামিয়ে গেট খুলতে যেতেই সিট বেল্টের ফাঁক থেকে নিজেকে মুক্ত করে অর্জুন নীচে নামল। নুড়ি বিছানো প্যাসেজের দুপাশে সুন্দর ছাঁটা ভাল ঘাস। রাস্তার দুপাশে বড় বড় গাছ রয়েছে কিন্তু তার শুকনো পাতা ঘাসের গালিচার ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নেই। অর্জুন কয়েক পা হেঁটে এগিয়ে গিয়েছিল ঘাসের ওপর পা ফেলে, অঞ্জনা তাকে ডাকলেন, এই যে, এপাশে চলে আসুন। ওই বর্ডারটা ক্রশ করবেন না।

বর্ডার? অর্জুন হকচকিয়ে গেল।

আজ্ঞে সার। ওই অবধি আমাদের এলাকা, ওর ওপাশে পাশের বাড়ির। আপনি যেহেতু ওদের এলাকায় দাঁড়িয়ে আছেন এবং আপনাকে ওরা চেনে না অতএব কোনও মতলব আছে কিনা বুঝতে পারছে না, তাই এখনই পুলিশকে খবর দেওয়ার অধিকার ওদের আছে। আর খবর পাওয়ামাত্রই ছুটে আসা এ-দেশের পুলিশের প্রাথমিক কর্তব্য।

অর্জুন দ্রুত ফিরে এল, সে কী : আপনাদের প্রতিবেশীদের মধ্যে সম্ভাব নেই?

থাকবে না কেন? তাই বলে অন্যের জমিতে দাঁড়িয়ে থাকব কেন বিনা কারণে? অঞ্জনা গাড়ি ভেতরে নিয়ে গেলেন। অর্জুন দেখল দুটো বাড়ির মাঝখানে কোনও পাঁচিল নেই। শুধু ঘাস এমনভাবে কাটা আছে যে, রেখা তৈরি হয়ে জমি চিহ্নিত হয়েছে।

সুটকেস ভেতরে নিয়ে এলে সুধামাসি জিজ্ঞেস করলেন, পুরো বাড়িটা কি কাঠের?।

হ্যাঁ মা। ওদের কাছে গিয়ে পছন্দমতো বাড়ির অডার দিলে ওরা তৈরি বাড়ি রাস্তা দিয়ে টেনে এনে জমির ওপর বসিয়ে দিতে পারে। আমরা অবশ্য পছন্দমতো তৈরি করিয়ে নিয়েছি।

দীর্ঘ পথ উড়ে এলেও শরীরে যে ক্লান্তি জমে, তা টের পাচ্ছিল না অর্জুন। সুধামাসি একটু কাহিল হয়ে পড়লেও জামাইকে দেখতে তখনই হাসপাতালে যেতে চাইছিলেন। কিন্তু অঞ্জনা তাঁকে নিষেধ করলেন! আজ বিশ্রাম নিয়ে আগামীকাল গেলেই হবে। ওদের সব ব্যবস্থা করে দিয়ে অঞ্জনা নিজে হাসপাতালে চলে গেলেন।

অর্জুন বাড়িটা ঘুরে দেখল। মাটির নীচের ঘরটিকে বলা হয় বেসমেন্ট। ওয়াল টু ওয়াল কার্পেটে মোড়া ঘরটি পছন্দ হল তার। কিন্তু এখানে নয়, তার থাকার জন্যে অঞ্জনা ওপরে যে ঘরটি ছেড়ে দিয়েছেন সেটি সুন্দর সাজানো। জানলার পরদা সরালে গাছগাছালি দেখা যায়। ঘরে দামি মডেলের টিভি এবং টেলিফোন আছে। এখানকার বাথরুমের মেঝেতেও কার্পেট পাতা থাকে। স্নানের জন্যে ছোট কাচের ঘরের ব্যবস্থা। আধুনিক সবরকম সুবিধে হাতের কাছে সাজানো।

ঘরে ফিরে গিয়ে স্নান সেরে বিছানায় শুয়ে পড়ল অর্জুন। না, একটুও সম্ভাবনা নেই ঘুমের। এখন কলকাতায় প্রায় ভোর হয়ে আসছে। সময়ের হেরফের মানিয়ে নিতে হয়তো একটু দেরি হবে। সে রিমোট টিপে টিভি খুলল। এত চ্যানেলে একসঙ্গে অনুষ্ঠান হচ্ছে, লোকে দ্যাখে কী করে?

রাত্রে খাওয়ার টেবিলে বসে জানা গেল অঞ্জনাদির স্বামীর আর একটা অপারেশন হবে। সুধামাসি মাস তিনেকের মধ্যে ফিরতে পারবেন বলে মনে হয় না। অর্জুন হেসে বলল, আমার দায়িত্ব শেষ, এবার আমি ফিরে যাই সুধামাসি।

অঞ্জনা হাঁ হাঁ করে উঠলেন, এ কী! বাড়িতে পা দিয়েই চলে যাওয়ার কথা বলছ কেন? এই দেশ ঘুরে দ্যাখো। এর আগের বার কি লস অ্যাঞ্জেলিসে গিয়েছিলে? তবে? ডিজনিল্যান্ড আর হলিউড না দেখে কেউ ফিরে যায়। তুমি কিছু চিন্তা কোরো না, আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।

পাতলা কাঠের বাড়ি কিন্তু যারা থাকে তাদের কোনও দুশ্চিন্তা নেই। প্রতিটি বাইরের দরজায় চোর-ডাকাতের জন্যে অ্যালার্ম সেট করে অঞ্জনা শুয়ে পড়লেন সুধামাসির সঙ্গে। অর্জুনের ঘুম আসছিল না। একটার পর একটা চ্যানেল ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে মনের মতো ছবি খুঁজছিল সে। হঠাৎ একটা চ্যানেল টিপতেই একজন বৃদ্ধ কালো আমেরিকানকে দেখা গেল কথা বলছেন, সাপ সম্পর্কে আমাদের সাবধান হতে হবে। পৃথিবীতে অবশ্য যেসব সাপের খবর পাওয়া গিয়েছে তার অধিকাংশেরই বিষ নেই। যদি বিষ থাকত তা হলে আজকের পৃথিবীতে মানুষ খুঁজে পাওয়া যেত না। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বিষধর সাপের নাম কী? বলতে বাধ্য হচ্ছি সবচেয়ে বিষধর সাপটি আজ পৃথিবীতে নেই। বিবর্তন তাকে গ্রাস করে নিয়েছে। আফ্রিকার উগান্ডায় সেই মহাবিষধর সাপের রাজত্ব ছিল। কথিত আছে মানব সভ্যতার প্রথমদিকে একজন আফ্রিকান শিল্পী সেই সাপের অবিকল মূর্তি এমন হালকা কালো পাথরে নির্মাণ করেছিলেন যাকে কোনও ধাতু বলে ভুল হবে। তিনি মাত্র দুটো মূর্তি তৈরি করেন। সেই মূর্তির চোখে পাথর দেওয়া ছিল। অনেকের ধারণা, ওই পাথরের নীচে তিনি বিষধর সাপটির এক ফোঁটা বিষ রেখে দিয়েছিলেন। হয়তো এ সবই বানানো গল্প, কিন্তু যে কথা সত্যি, তা হল সাপ সম্পর্কে আমাদের সাবধান হতে হবে। সঙ্গে-সঙ্গে পরদায় লেখা ফুটে উঠল, বিষধর সাপের সন্ধান করুন। সাপটির নাম ব্লু-কোবরা।

এটা বিজ্ঞাপন না টিভি কোম্পানির ঘোষণা, বোঝা গেল না। তারপরেই পরদা জুড়ে ব্লু কোবরার ছবি দেখানো হল। কোনও শিল্পীর আঁকা ছবি। কিন্তু সেই ছবি দেখে চমকে উঠল অর্জুন। সে বুকে হাত দিল। মনে পড়ল স্নানের সময় লকেটটাকে খুলে রেখেছিল সে। দ্রুত বাথরুমে ঢুকে টয়লেট বক্সের ওপর সে লকেটটাকে দেখতে পেল। লকেটটা হাতে নিয়ে আলোর সামনে আসতেই সে বুঝতে পারল অনেকটা মিল থাকলেও টিভির ছবির হুবহু কপি এটা নয়। টিভির ছবিতে সাপের লেজ কুণ্ডলী পাকিয়ে ডান দিকে পড়ে ছিল, এটার বাঁ দিকে। এর গায়ে উঁচু-উঁচু আঁশের মতো ছড়ানো, টিভির ছবিতে সেটা ছিল না। কিন্তু ভঙ্গি আর আকৃতিতে কোনও পার্থক্য নেই। অর্জুন টিভির দিকে তাকাল। সেখানে নাচগান শুরু হয়ে গেছে। অনেক যন্ত্র নিয়ে একজন কালো আমেরিকান গায়িকা চিৎকার করে গান গাইছে।

হাতে ধরা সাপের লকেটের দিকে তাকাল অর্জুন। এটা কি ব্ল্যাক কোবরা! গোরক্ষনাথ তাকে যে গল্প বলেছিল সেটাকে নেহাতই বুজরুকি বলে মনে হয়েছিল তার। এই লকেট পরে থাকা ড়ুবন্ত মানুষকে বিশাল সাপ সমুদ্রে ভাসিয়ে রেখেছিল এমন গল্প বিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই। কিন্তু টিভির ভদ্রলোক দর্শকদের কোন বিষধর সাপের সন্ধান করতে বলছেন? ব্লু-কোবরা তো অনেকদিন আগেই পৃথিবী থেকে লুপ্ত হয়ে গিয়েছে এবং সেটা বলাও হল। তা হলে কোন সাপকে খুঁজবে মানুষ? গোখরো, কেউটে, শঙ্খচূড় বিষধর সাপ এবং তাদের সঙ্গে মানুষ দিব্যি বেঁচে আছে। তাদের খুঁজতে নিশ্চয়ই ঘোষক উৎসাহ বোধ করেননি। ব্যাপারটা দুবোধ লাগছিল। এই সময় গান শেষ হতেই আবার সেই এক ঘোষণা শোনা গেল। যেভাবে টিভিতে বিজ্ঞাপন বারংবার দেখানো হয়, এও তেমন। বিষধর সাপের সন্ধান করুন, সাপটির নাম রু-কোবরা, বলার পর টিভির পরদায় কিছু সংখ্যা ফুটে উঠল। ওটা যে টেলিফোনের নাম্বার তা বুঝে অর্জুন দ্রুত একটা পত্রিকার পেছনে টুকে রাখল।

আবার গান শুরু হতে অর্জুনের মনে হল বিশেষ উদ্দেশ্যে এই ঘোষণা প্রচারিত হচ্ছে। যারা বুঝতে পারবে তারা নিশ্চয়ই এই চ্যানেলটির দর্শক। কিন্তু এখন তার মাথা আর কাজ করছিল না। টিভি বন্ধ করে আলো নিভিয়ে

সে শুয়ে পড়ল।

শরীর যে কাহিল ছিল তা বোঝা গেল দরজায় শব্দ হওয়ার পর। এখন নটা বেজে গেছে। ধড়মড়িয়ে বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলতেই দেখল সুধামাসি বাইরে যাওয়ার জন্যে তৈরি হয়ে গেছেন।

কী রে? শরীর খারাপ লাগছে?

না, না। লজ্জিত হল অর্জুন।

তুই তা হলে বিশ্রাম নে। তোর জলখাবার তৈরি করে মাইক্রোওভেনের সামনে রাখা আছে, গরম করে নিস। পারবি না? খুব সোজা রে। আমরা দেশে কত ঝক্কি সামলে রান্না করি, আর এরা কত সুবিধে পায়। তা হলে আমি অঞ্জনার সঙ্গে হাসপাতাল থেকে ঘুরে আসি?

ঠিক আছে। আমি না হয় বিকেলে যাব।

দাঁত মেজে পোশাক পালটে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে অর্জুন দেখল বাড়ি বালি, ওরা বেরিয়ে গেছে। খিদে পাচ্ছিল না তেমন। রান্নাঘরে ঢুকে দেখল একটা ট্রের ওপর তার ব্রেকফাস্ট সাজানো আছে। এক প্যাকেট অরেঞ্জ জুস, একটা আপেল, ডিমের পোচ, দুটো টোস্ট, কর্নফ্লেক্স, দুধ, জ্যাম এবং চিনি সুন্দর করে সাজানো। তার পাশে একটা চিরকুটে লেখা, দুধ গরম করে নিয়ো। চা খেলে জল গরম করে টি ব্যাগ ব্যবহার কোরো।

কয়েক মিনিটের মধ্যে সে খাবার শেষ করে ফেলল। জুস এবং আপেল বাদ দিল। দেশে তার ওসব খাওয়ার অভ্যেস নেই, অসুস্থদেরই খেতে দেখেছে। কাপপ্লেট ধুয়ে পরিষ্কার করে সে নিজের ঘরে ফিরে এসে বিছানা ঠিক করল। আমেরিকায় প্রচুর বড়লোকও বাড়িতে কাজের লোক রাখে না। প্রথমত, তার খরচ খুব বেশি; দ্বিতীয়ত, অন্যের ওপর নির্ভর করে থাকা ওরা পছন্দ করে না। তাই কলকাতায় যে কুটোটি নাড়েনি, আমেরিকায় গিয়ে তার সব কাজ না করে কোনও উপায় নেই।

বন্ধ টিভির দিকে তাকাতেই গতরাতের ঘটনা মনে পড়ল। অর্জুন পত্রিকার পেছনে লিখে রাখা নাম্বারটা পড়ল। এখানে একটা ফোন করলে কেমন হয়? সে পত্রিকাটা নিয়ে লিভিং রুমে চলে এল। টেলিফোনের নাম্বারগুলো টিপতেই ওপাশে রিং হল, গুডমর্নিং সার।

আপনারা কাল রাত্রে সাপের বিষয়ে যা বলেছেন তার বিশদ জানতে চাই।

কী জানতে চান?

আপনারা বলেছেন ব্লু-কোবরা পৃথিবীতে নেই। তা হলে কোন সাপ খুঁজবেন?

আপনার পরিচয়?

আমি সাপ নিয়ে গবেষণা করছি।

আমরা ব্লু-কোবরার যে ছবি টিভিতে দেখিয়েছি সেটা অনেকটা শোনা কথা এবং অনুমানের ওপর নির্ভর করে আঁকা। ব্লু-কোবরার কোনও ফোটোগ্রাফ থাকার প্রশ্ন নেই। জানা গিয়েছে তখনকার শিল্পী এই সাপের দুটো মূর্তি তৈরি করেছিলেন। আমরা সেই মূর্তির সন্ধান করছি।

দুটো মূর্তির সন্ধান করছেন?

একটি মূর্তি আমরা পেয়েছি। কিন্তু সেটা সত্যি কিনা প্রমাণিত হবে দ্বিতীয় মূর্তি পেলে।

কিন্তু সেটা যে আমেরিকায় থাকবে এমন ধারণা হল কেন?

ধারণা হওয়ার কারণ ঘটেছে।

তা হলে সাপ সম্পর্কে আপনারা সাবধান করছেন কেন?

ওই বিষধর সাপের মূর্তিটি কাছে রাখলে ভয়ঙ্কর বিপদ হতে পারে বলেই সাবধান করা হচ্ছে। কিন্তু মহাশয়, অনুগ্রহ করে আপনার টেলিফোন নাম্বারটা বলবেন কী?

আমি একটা পাবলিক টেলিফোন বুথ থেকে কথা বলছি। লাইন কেটে দিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ল অর্জুন। এ-দেশে কি কোত্থেকে টেলিফোন এল চট করে খুঁজে বের করা যায়? যদি যায়, তা হলে তো ওরা এখানে পৌঁছে যেতে পারে। এই লোকগুলো ভাল না মন্দ তার কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তার মনে হল টেলিফোনটা এখান থেকে করা উচিত হয়নি। লোকগুলো যদি মন্দ হয় তা হলে সুধামাসিদের বিপদে ফেলা হবে।

কিন্তু এসব ছাপিয়ে ওর মনে যে ভাবনা প্রবল হল তা ওই সাপটিকে নিয়ে। সে ঘরে ফিরে সাপটিকে দেখল। নিশ্চয়ই দীর্ঘকাল ধরে এই সাপটির হদিস ওরা পায়নি। হয়তো এর কথা শুধু শুনে এসেছে। কারণ গোরক্ষনাথ এবং তার গুরুদেবের কাছে এই সাপটির মূর্তি পৌঁছেছে নিশ্চয়ই অনেক হাত ঘুরে। এয়ারপোর্টের সেই লোকটি যে এই সাপের লকেট দেখে ভক্তিতে গদগদ হয়েছিল তার কাছ থেকেই খবরটা পেতে পারে এরা। তা হলে সেই লোকটি এবং এরা একই দলের। আর লোকটা যখন বেআইনি জিনিস দাঁতের ভেতর নিয়ে এ-দেশে এসেছে তখন দলটা ভদ্রলোকের নয়। এখন কী করা যায়? অঞ্জনাদি এলে কি সব কথা বলে পুলিশকে জানিয়ে দেবে? অর্জুন আবার টেলিফোনের কাছে গেল। সেখানে অনেক টেলিফোন ভাইরেক্টরি সাজানো আছে। তার একটার পাতা খুলে লোক্যাল টেলিফোন অফিসের নাম্বার বের করে ডায়াল করল। ওপাশে সাড়া পেতে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, কিছু মনে করবেন না, একটু আগে আমাকে কেউ টেলিফোন করেছিল, উড়ো ফোন, কোন ফোন থেকে ওটা করা হয়েছিল সেটা আপনারা কি বলতে পারবেন?

অপারেটার বললেন, আগে থেকে আমাদের না জানানো থাকলে বলা সম্ভব নয়। আপনার যদি তেমন সমস্যা থাকে তা হলে এই নম্বরে ফোন করুন।

স্বস্তি হল কিছুটা। কিন্তু মন খুঁতখুঁত করতে লাগল। সে আবার ঘরে ফিরে গিয়ে লকেটটা নিয়ে বসল। সাপের মূর্তির পেছনদিকটাও মসৃণ নয়। খুব যত্নে তৈরি হয়েছে এটা। সে চোখদুটো দেখল। প্রথম থেকেই অন্য পাথর বসানো চোখদুটো তাকে আকর্ষণ করেছিল। এই চোখের ভেতরে সেই মহাবিষধর সাপের বিষ রাখা আছে? একখনও সম্ভব। যদি এর ভেতর গর্ত করাও থাকে তা হলে সেই তরল বিষ, এতদিনে উবে যাওয়ার কথা। চোখের পাথরটাকে খোলার ইচ্ছে হচ্ছিল খুব। কিন্তু নিজেকে সংবরণ করল অর্জুন।

আর তখনই তার মেজরের কথা মনে পড়ল। মোটাসোটা দাড়িওয়ালা অনেকটা টিনটিনের হ্যাডকের মতো চেহারা, যে মানুষটি বিয়ে না করে সারাজীবন অভিযান করে বেড়াচ্ছেন। সেই কালিম্পং-এ সীতাহরণ রহস্য সমাধান করতে গিয়ে ওঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। লাইটার রহস্য সমাধান করতে ওঁর সঙ্গে প্রথমবার আমেরিকায় এসেছিল সে।

ডায়েরি থেকে নাম্বার বের করে ডায়াল করল সে। সঙ্গে সঙ্গে হেঁড়ে গলায় ইংরেজি, স্প্যানিশ এবং ফরাসিতে সম্ভবত একই প্রশ্ন উচ্চারিত হল, সাতসকালে আপনি কে?

অর্জুন হেসে ফেলল, কেমন আছেন আপনি, আমি অর্জুন।

অ্যাঁ। ও ভগবান! আমি কি ঠিক শুনছি? অর্জুন? মধ্যম পাণ্ডব?

হ্যাঁ।

কোত্থেকে কথা বলছ?

নিউ জার্সি থেকে।

অ্যাঁ? আমেরিকায় এসেছ? আমাকে না জানিয়ে আমেরিকায়? এটা কেমন কথা হল? না, না, আমি কৈফিয়ত চাই।

হঠাৎ আসতে হয়েছে। জানাবার সময় পাইনি।

এক্ষুনি চলে এসো। এক্ষুনি।

কীভাবে যাব?

ও ভগবান! তুমি তো গাড়ি চালাতে পারবে না। কোথায় আছ? কোন শহরে?

ক্লোস্টার।

অ। বাস ধরে চলে এসো ওয়াশিংটন স্টেশনে। আমি সেখানে থাকব। ওখান থেকে আসতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগবে। তা হলে আমি একঘণ্টা বাদে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি।

না, না। এই মুহূর্তে বের হওয়া সম্ভব নয়। বাড়িতে আমি একা।

তাতে কী হয়েছে! এদেশে কেউ বাড়ি পাহারা দেয় না। মেজর বললেন, দুটো কাগজে একই নোট লেখো। বিশেষ কাজে আমার কাছে আসছ। আমার টেলিফোন নাম্বার লিখে দিয়ে। দেখবে ছোট চিরকুটের প্যাড আছে টেবিলে। প্রত্যেক বাড়িতেই থাকে। কাগজের মাথায় আঠা লাগানো আছে। সেটা ফ্রিজে আর দরজায় সেঁটে দিলেই ওরা দেখতে পাবে। কুইক। রিসিভার নামিয়ে রাখলেন মেজর।
ক্লোস্টার শহরটা বেশ ছোট, কিন্তু ছবির মতো সুন্দর।

অঞ্জনাদির বাড়ির সামনে যে পরিষ্কার নির্জন রাস্তা, সেটা গাড়ি-চলাচলের জন্যে। মানুষ সেই রাস্তায় হাঁটে না। রাস্তার পাশে অনেকটা ঘাসজমি এবং সেই ঘাসের ঠিক মাঝখানে হেঁটে যাওয়ার জন্যে সরু বাঁধানো পথ রয়েছে। আমেরিকায় গাড়ি রাস্তার ডান দিক ঘেঁষে যায় বলে অর্জুনের একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি দুর্ঘটনা ঘটল। মোড়েই একটা গির্জা। খুব শান্ত চেহারা। এখন সেখানে মানুষজন নেই। অর্জুন বাঁ দিকে ঘুরল। গতকাল অঞ্জনাদি ওই পথেই তাদের নিয়ে এসেছিলেন। মিনিট তিনেক হাঁটতেই দোকানপাট শুরু হল। এখন বেশ হাওয়া বইছে। একটু শীতশীত ভাব। দোকানগুলো গায়ে-গায়ে ঠাসা নয়। বাড়িগুলোও একতলা। প্রথমে একটা সেলুন চোখে পড়ল। তারপরই কেক-পাউরুটির দোকান। পরেরটি পাব। পোশাকের দোকানটিতে ঢোকার ইচ্ছে হলেও অর্জুন ঠিক করল, এখন সময় নষ্ট করবে না। বাসস্টপ লেখা থামটার পাশে গিয়ে দাঁড়াল সে। তারপরেই খেয়াল হল পুরনো অভ্যাসে সে বাঁ দিক দিয়ে হাঁটছে। রাস্তার ডান দিকে না গেলে সে নিউ ইয়র্কের বাস পাবে না। গতকাল তারা তো নিউ ইয়র্ক থেকে বাঁ দিক দিয়ে এসেছিল। সে রাস্তা পার হয়ে বাসস্টপে গিয়ে দাঁড়াতে লক্ষ করল, এতক্ষণ যেটাকে বাঁ দিক মনে হচ্ছিল সেটা এখন ডান দিক হয়ে গিয়েছে। আসলে তুমি যেদিকে মুখ করে দাঁড়াচ্ছ দিকটা সেইমতো নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে।

বাস এল। ড্রাইভারের পাশের দরজা বোধ হয় বোতাম টিপতেই খুলে গেল। অর্জুন সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, এটা কি নিউ ইয়র্ক যাবে?

ড্রাইভার মাথা নাড়ল, না। জর্জ ওয়াশিংটন পর্যন্ত যাবে। ওখান থেকে তুমি টিউব পেয়ে যাবে। এক ভলারকুড়ি সেন্ট দাও।

গতকাল অনেক পঞ্চাশ সেন্টের কয়েন পেয়েছিল ট্রলি নিতে গিয়ে। অর্জুন তার তিনটে দিতে ড্রাইভার ব্যালান্স এবং টিকিট দিয়ে বোতাম টিপতেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল। অর্জুন দেখল বাসটা বেশ বড় কিন্তু মাত্র গোটা চারেক লোক বসে আছে। জানলার ধারের সিটে বসে বাইরে তাকাতেই বাস চলতে শুরু করল। খুব আরামদায়ক সিট। এক ডলার কুড়ি সেন্ট মানে ভারতবর্ষের টাকায় অনেক। লোকাল বাসে চল্লিশ টাকার ওপরে ভাড়ার কথা কেউ চিন্তা করতে পারে? অবশ্য এদের কাছে এক টাকা কুড়ি পয়সা মাত্র। ডলার সেন্টকে টাকা এবং পয়সায় ভাবতে পারলে কোনও সমস্যা থাকে না। একশো পয়সায় এক টাকা আর একশো সেন্টে এক ডলার। সুধামাসির টাকায় ডলার কেনা হলেও ওটা যে কিছুতেই ভাবা যাচ্ছে না।

বাস বেশ জোরেই ছুটছে। মাঝে-মাঝে সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছে, ড্রাগ-ফ্রি জোন। অর্থাৎ এই এলাকায় কেউ ড্রাগ নেয় না। এ থেকে বোঝা যায় অনেক এলাকা আছে যেখানে ড্রাগের চল রয়েছে। আমেরিকান সরকার চেষ্টা করেও বন্ধ করতে পারছে না? পরপর দুটো স্কুল চোখে পড়ল। ছেলেরা বাস্কেটবল খেলছে। কোনও কোনও বাড়ির সামনে বাস্কেটবলের স্ট্যান্ড দেখা যাচ্ছে। একটা নির্জন মাঠের মধ্যে বিশাল সাজানো বাড়ির ওপর লেখা রয়েছে কে মার্ট। সামনের পার্কিং লটে প্রচুর গাড়ি। এতবড় বাড়িটা দোকান?

শেষপর্যন্ত জর্জ ওয়াশিংটনে বাস পৌঁছে গেল। বাস থেকে নেমে জিজ্ঞেস করতেই টিউব স্টেশনের হদিস পেয়ে গেল অর্জুন। সিঁড়ি ভেঙে নীচে নেমে টানেল দিয়ে সে যখন স্টেশনের দিকে হাঁটছে তখন অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল। দশ হাত দূরে-দূরে বিশাল চেহারার নিগ্রো দাঁড়িয়ে আছে। তাদের প্রত্যেকের পরনে জিন্স এবং জ্যাকেট। দাঁড়িয়ে আছে ঠিক স্ট্যাচুর ভঙ্গিতে, সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় গম্ভীর এবং জড়ানো গলায় বলছে, হে ম্যান, গিমি এ ডলার! শুনলেই বুকটা কীরকম করে ওঠে। দিনদুপুরেই যদি এই অবস্থা হয়, সন্ধের পরে যে কী হবে কে জানে! কিন্তু লোকগুলো নড়ছে না। পাশে হেঁটে বিরক্তও করছে না।

টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকে ট্রেনে উঠতে কোনও অসুবিধে হল না। কিন্তু ট্রেনটায় বেজায় ভিড়। যারা বসে আছে তারা ভাগ্যবান, অর্জুন কয়েকজন সাদার পাশে হাতল ধরে দাঁড়িয়ে পড়তেই নজরে এল। প্রায় সাত ফুট লম্বা এবং তেমনই মোটা একটি কালো যুবক পা ছড়িয়ে সিটের ওপর ঘুমোচ্ছে। তার মাথা এবং পায়ের কাছে খানিকটা জায়গা ছেড়ে যাত্রীরা বসে আছে। যারা দাঁড়িয়ে তারা লোকটাকে কিছু বলছে না। এত লোক যখন কষ্ট করে যাচ্ছে, তখন নিগ্রো ছেলেটা ওভাবে সিট দখল করে ঘুমোচ্ছে কেন এই প্রশ্ন কেউ করছে না। মুখ দেখে অসুস্থ বলে মনেও হচ্ছে না। অর্জুন সহযাত্রীদের দিকে তাকাল। এরা সবাই সাদা। সাদা বলে যে আমেরিকান তা নাও হতে পারে। অর্জুন তার পাশে দাঁড়ানো মধ্যবয়সী ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করল কারণটা। লোকটি ইশারা করল চুপ করতে। তারপর নিচু গলায় বলল, তুমি কি নতুন?

অর্জুন মাথা নাড়তেই লোকটি বলল, আমি এসেছি পাঁচ মাস হল। আমার বাড়ি বেলগ্রেডে। এখন এখানে ধাতস্থ হয়ে গেছি। খবরদার এই কালো মানুষগুলোকে চটিও না। এরা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে।

পরের স্টেশনে ট্রেন থামতে কিছু লোক যেমন নামল, অনেক বেশি উঠল। চাপ বাড়ছে। হঠাৎ এক্সকিউজ মি, এক্সকিউজ মি বলে এক বৃদ্ধা ভিড় কাটিয়ে অর্জুনের সামনে এসে কোনওমতে দাঁড়ালেন। মহিলাটি কালো এবং রোগা। পাঁচ ফুটের বেশি লম্বা নন। তাঁর এক হাতে একটা চামড়ার হাতব্যাগ, অন্য হাতে ভাঁজ করা খবরের কাগজ সামনে শায়িত যুবককে দেখে তিনি বলে উঠলেন, এ কী! এ এখানে শুয়ে আছে কেন? দেখে তো অসুস্থ বলে মনে হচ্ছে না। অ্যাই ছোকরা, ওঠো, উঠে বোসো। ভদ্রতাবোধগুলো কি বাড়িতে রেখে এসেছ?

যুবকটি কোনও কথা বলা দূরে থাক, চোখও খুলল না।

বৃদ্ধা বললেন, আচ্ছা তাদড় তো। কালা নাকি? বলে লম্বা করে ভাঁজ করা কাগজটাকে লাঠির মতো করে মারতে লাগলেন যুবকের শরীরে। শব্দ হচ্ছিল। এবার যুবক চোখ খুলল। অত্যন্ত বিরক্ত সে। বৃদ্ধা বললেন, অ্যাই, ওঠ! এটা তোর বাড়ি পেয়েছিস? মেরে হাড় গুঁড়িয়ে দিতে হয় তোর মতো হতচ্ছাড়াদের। ওঠ বলছি।

পাশের যুগোস্লাভ লোকটি নিচু গলায় বলল, এইবার বুড়ি মরল।

লোকটা উঠল। উঠতেই বৃদ্ধা বসে পড়লেন সিটে, বসুন আপনারা, আরাম করে বসুন। শেষের কথাগুলো অর্জুনের দিকে তাকিয়ে বললেন তিনি। তৎক্ষণাৎ সিটটা ভরে গেল। যুবক দরজার দিকে এগোল। পরের স্টেশনে ট্রেন থামতেই নেমে গেল সে নিঃসাড়ে। সিটে বসে পাশের বৃদ্ধার দিকে তাকাল অর্জুন। যে কাজটা করতে কোনও সাদা সাহস পাচ্ছিল না, সেই কাজ ইনি অবলীলায় করলেন কোন সাহসে? ভদ্রমহিলা এত রোগা যে, যুবক একটা আঙুলের চাপেই ওঁকে কাহিল করে দিতে পারত। সিটে বসে মহিলা তখন কাগজ খুলে সামনে ধরেছেন। অর্জুন না জিজ্ঞেস করে পারল না, আচ্ছা, কিছু মনে করবেন না, আপনি এমন সাহসী কী করে হলেন?

সাহসী? আমি? দুর, আমি মোটেই সাহসী নই। আমাকে প্যারাসুট নিয়ে প্লেন থেকে নামতে বললে আমি ভয়েই মরে যাব। একটা আরশোলা দেখলে আমি তো প্রায় ভিরমি খাই।

তা হলে ওই বিশাল চেহারার লোকটাকে মারলেন কী করে?

ও, এর কথা বলছ? ও তো অন্যায় করেছিল। কেউ অন্যায় করলে সে মনে-মনে দুর্বল হয়ে যাবে। আর অন্যায় দেখলেই আমার খুব রাগ হয়ে যায়। তোমাদের উচিত ছিল অনেক আগে ওকে উঠিয়ে দেওয়া। বৃদ্ধা আবার খবরের কাগজে মন দিলেন।

পোর্ট অথরিটি স্টেশনে নেমে ফোনের বুথ খুঁজছিল অর্জুন। হঠাৎ একটা রোগা ঢ্যাঙা নিগ্রো এগিয়ে এল সামনে, তুমি কোনও হেলপ চাও?

হ্যাঁ। টেলিফোন বুথ–!

এসো দেখিয়ে দিচ্ছি। বলেই ছেলেটা হাঁটতে লাগল। ওকে অনুসরণ করতে না করতেই দেওয়ালে সার-সার টেলিফোন দেখতে পেল অর্জুন। সে ছেলেটাকে ধন্যবাদ দিতে গিয়ে দেখল ও হাত বাড়িয়ে রেখেছে।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার?

আমার পারিশ্রমিক। আমি তোমার জন্যে পরিশ্রম করেছি।

সে কী! আঁতকে উঠল অর্জুন। এমন ভাব করছ যেন তুমি আমাকে টেলিফোনের কথা বলেনি। ওসব কায়দা ছেড়ে আমাকে একটা ডলার দাও। নইলে আমি সবাইকে ডেকে বলব তুমি কাজ করিয়ে আমাকে ডলার দিচ্ছ না। দাও।

অর্জুন বাধ্য হল লোকটাকে দুটো পঞ্চাশ সেন্টের কয়েন দিতে। লোকটা যেন কাজ করে পয়সা পেল এমন ভঙ্গিতে চলে গেল। অর্জুন কিছুক্ষণ ওর যাওয়া দেখল। পোর্ট অথরিটি স্টেশন এবং বাস টার্মিনাস বিশাল এলাকা জুড়ে একটি বাড়িই বলা যায়। যে বাড়ির মাটির নীচে এবং ওপরে অনেক তলা আছে। প্রতিটি তলায় বিভিন্ন গেট থেকে লোকাল এবং দূরগামী বাস ছাড়ছে। টিউবরেলও এর নীচ দিয়ে চলে গিয়েছে। এই সময় যাত্রীরা ব্যস্ত পায়ে যে যার কাজে গেলেও বহু নিগ্রো ছেলে ছড়িয়ে আছে এখানে-ওখানে, অলস ভঙ্গিতে। বোঝাই যাচ্ছে এদের কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। ওয়াশিংটন স্টেশনে এদের রূপ দেখেছে সে, এখানে অন্য রূপ।

টেলিফোন করতেই মেজর রিসিভার তুললেন, কে? অর্জুন? কোত্থেকে বলছ?

পোর্ট অথরিটি থেকে।

বাঃ। এসে গেছ। আমি যাচ্ছি।

কিন্তু এটা তো বিশাল জায়গা, আমাকে খুঁজে পাবেন কী করে?

দ্যাটস ট্র। তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছ তার সামনে কিছু আছে?

অর্জুন তাকাল। উলটোদিকেই একটা রেস্টুরেন্ট, যার ওপরে লেখা রয়েছে পিজা।

অর্জুন বলল, পিজা বিক্রি হয় এমন রেস্টুরেন্টের উলটোদিকে টেলিফোনের সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি। কতক্ষণ লাগবে আপনার?

দশ মিনিট।

কয়েক পা সরে এসে অর্জুন অপেক্ষা করতে লাগল। যে ছেলেটি তার কাছে ডলার চেয়েছিল তাকে দেখতে পেল এক এশীয় ভদ্রলোকের পাশাপাশি কথা বলতে বলতে হেঁটে যেতে। ভদ্রলোকের আঙুলে সিগারেট ছিল। যেই তিনি হাত তুলেছেন ওই সিগারেটে টান দিতে, অমনই ছেলেটি ঝট করে তাঁর কবজিতে আঘাত করল। সঙ্গে-সঙ্গে সিগারেটটা ছিটকে ওপরে উঠে গেল। ছেলেটি অত্যন্ত দক্ষ ফিল্ডারের মতো সেটা লুফে নিয়ে টানতে-টানতে অন্যদিকে চলে গেল। ভদ্রলোক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ওর যাওয়া দেখলেন, তারপর দ্রুত নিজের পথে চলতে লাগলেন।

বোঝাই যাচ্ছে এই কালো ছেলেগুলো খুব গরিব। চাকরি পায়নি। কোথায় যেন পড়েছিল এরা পড়াশুনা করতে তেমন আগ্রহী নয়। গরিব মানুষ আমাদের দেশেও আছেন। কিন্তু তাঁরা পরিশ্রম না করে এইভাবে নিজের প্রয়োজন মেটান না। অথচ ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় অর্জুন আঙ্কল টমস কেবিন পড়েছিল। পড়তে-পড়তে সে কেঁদেছিল। আঙ্কল টম তার বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। সেই কালো মানুষটির ওপর যেসব সাদা অত্যাচার করেছিল তাদের জন্যে ঘৃণা তৈরি হয়েছিল। আফ্রিকা থেকে কালো মানুষের দলকে ক্রীতদাস করে নিয়ে এসে সাদারা কী ভয়াবহ অত্যাচার করে গিয়েছে বছরের পর বছর। ফলে কালো মানুষদের প্রতি সহানুভূতি এবং ভালবাসা তৈরি হয়েছিল অর্জুনের মনে। অথচ আজ এদের আচরণ দেখে আতঙ্ক হচ্ছে। ওই বিশাল চেহারা। নিয়ে তারা তো যে-কোনও কাজ করতে পারত। তা না করে এভাবে ঠকাচ্ছে অথবা দেওয়ালে ঠেস দিয়ে ভিক্ষে চাইছে? সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল অর্জুনের।

হাই! হেঁড়ে গলায় চিৎকারটা ভেসে আসতেই অর্জুন মুখ ফিরিয়ে দেখল মেজর দুহাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসছেন। আর একটু মোটা হয়েছেন ভদ্রলোক। প্যান্টের ওপর টাইট গেঞ্জিশার্ট পরায় ভুড়ি আরও প্রকট হয়েছে। মুখ ঢাকা জসুলে দাড়িতে সাদা ছোপ ছড়িয়ে পড়েছে। কাছে এসে দুহাতে তিনি এত জোরে জড়িয়ে ধরলেন যে, হাঁসফাস করতে লাগল অর্জুন। প্রাথমিক উচ্ছাস কমে গেলে মেজর বললেন, ব্যাপার কী হে? পাচার মতো অন্ধকারে আমেরিকায় উড়ে এলে? আগাম একটা খবরও দাওনি?

হঠাৎই আসতে হল। পরিচিত এক বয়স্কা মহিলার মেয়ে এখানে থাকেন। তাঁর স্বামী দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে আছেন। ভদ্রমহিলাকে নিয়ে আসতে হল।

অ। এসকর্ট। তিনি এখন কেমন আছেন?

আগের থেকে ভাল।

তা হলে এবার কোনও রহস্য সমাধানের দায়িত্ব নেই? অর্জুন হাসল, না। আপনি কেমন আছেন?

ভাল। খুব ভাল। মাস তিনেক আগে প্রশান্ত মহাসাগরের নীচে গিয়েছিলাম নতুন ধরনের শ্যাওলা খুঁজতে। আবার দুমাস বাদে যাচ্ছি উত্তরমেরুতে।

তাই?

ইয়েস ব্রাদার। তোমার মিস্টার সোম কেমন আছেন?

আছেন। একটু সন্ন্যাসী সন্ন্যাসী ভাব এসে গেছে।

তাই নাকি! এ আবার কী কথা। চলো আমার ওখানে চলো। একজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। মেজর হাঁটা শুরু করতেই অর্জুন তাঁকে অনুসরণ করল। পোর্ট অথরিটির বাইরেই ম্যানহাটান। সেই বিখ্যাত ম্যানহাটান, যার নাম সিনেমা এবং বইয়ের কল্যাণে অনেক বাঙালির জানা। ফুটপাথ ধরে হাঁটতে গিয়ে সেই দৃশ্য আবার দেখতে পেল অর্জুন। বিশাল বিশাল চেহারার নিগ্রো হয় দেওয়ালে ঠেস দিয়ে, নয় ফুটপাথে পা ছড়িয়ে বসে আছে। সামনে দিয়ে কেউ গেলেই পয়সা চাইছে। এদের কারও চেহারা দেখে মনে হয় না অনাহারে আছে। অর্জুন কথাটা বলতেই মেজর খেপে গেলেন, এই পাজি শয়তান আহাম্মক হিপোদের কথা আমাকে বোলো না তো! আমেরিকার কলঙ্ক এরা। প্রত্যেকে বেকার ভাতা পায়। সেটা পেয়েই ড্রাগ কেনে আর উড়িয়ে দেয়। দশদিন বাদে হাত খালি হতেই সারাদিন এখানে দাঁড়িয়ে থাকে নবাবপুকুরের মতো। ভিক্ষে হল তো ভাল, নইলে সন্ধে নামলেই ছিনতাই শুরু করে।

পুলিশ কিছু বলে না?

নিশ্চয়ই বলে। কিন্তু মুশকিল হল এরা জেলে যেতে ভালবাসে।

সে কী! অর্জুন অবাক!

এখানকার জেলে কয়েদিরা জামাই আদরে থাকে হে। রীতিমতো ভাল খাবার, টিভি, ব্যায়াম, কী নেই! ভেতরে ঢুকে ওখানকার কয়েদি-নেতাকে সেলাম করলে একদম নিশ্চিন্ত। শুনেছি জেলে বসে ড্রাগও পেয়ে যায় ওরা।

পার্কিংলটের দিকে এগিয়ে গেলেন মেজর। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, কিন্তু এভাবে চললে কালোদের প্রজন্ম শেষ হয়ে যাবে না?

খুব স্বাভাবিক। তবে এরাই সব নয়। প্রচুর কালো মানুষ আছেন যাঁরা পড়াশুনা করে ভাল চাকরি বা ব্যবসা করছেন। এই নিউ ইয়র্ক শহরের মেয়র একজন কালো মানুষ ছিলেন। এঁদের মধ্যে থেকে খেলোয়াড়, অ্যাথলেট, ক্সার, অভিনেতা এবং কবি উঠে এসেছেন। তাঁরা না থাকলে আমেরিকার গৌরব বাড়ত না। অতএব এই যাদের দেখলে, তারাই সব নয়। মেজর গাড়ির দরজা খুললেন।

গাড়িতে বসে অর্জুনের মনে হল, কথাটা ঠিক। জনসন নামেই দুজন বিখ্যাত অ্যাথলেট আছেন, একজন পৃথিবীবিখ্যাত বাস্কেটবলার। আমেরিকার যে দলটা ওলিম্পিক বা ওয়ার্ল্ড কাপে অংশ নেয় তার অধিকাংশই কালো মানুষ। পৃথিবীর অন্যতম শ্রদ্ধেয় মানুষ মার্টিন লুথার কিং অথবা গায়ক পল রবসন কালো মানুষ। তা হলে?

মেজর থাকেন যে বাড়িতে সেটি পনেরো তলা। গাড়ি পার্ক করে ওরা লটের দিকে এগোচ্ছিল। হঠাৎ অর্জুনের মনে পড়ল লকেটটার কথা। সে জিজ্ঞেস করল, মেজর, আপনি তো পৃথিবীর অনেক দেশ, বিশেষ করে আফ্রিকায় অনেকবার গিয়েছেন। সেখানে এমন কোনও লকেটের কথা শুনেছেন যেটা সাপের আকৃতি নিয়ে আছে এবং যার চোখের পাথরের নীচে মারাত্মক বিষ রাখা ছিল।

নো। নেভার। শুনিনি তো। তুমি দেখেছ?

অর্জুন জামার ভেতর থেকে লকেট বের করে মেজরকে দেখাল। মেজর কুঁকে ওটা দেখতে-দেখতে বললেন, ফ্যান্টাস্টিক। কী দিয়ে তৈরি এটা?

বলতে পারব না।

ঠিক আছে। এবাড়িতে একজন আফ্রিকান-আমেরিকান থাকেন। খুব পণ্ডিত মানুষ। আফ্রিকার আদিবাসীদের ওপর অনেক কথা জানেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে হয়তো কিছু জানা যাবে। ঘড়ি দেখলেন মেজর, মিস্টার আলাম্বাকে বোধ হয় এখন ওঁর ফ্ল্যাটেই পেয়ে যেতে পারি।

লিফটের পাশে ঝোলানো টেলিফোনে কথা বললেন মেজর। তারপর রিসিভার রেখে বললেন, চলো, আমি দশতলায় আর উনি আটতলায়।

আটতলায় লিফট থামতেই মেজর বেরিয়ে একটা দরজার কাছে পৌঁছতেই সেটা খুলে গেল। অর্জুন দেখল বেশ বৃদ্ধ একজন মানুষ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। মেজর মুখ খোলার আগেই তিনি বললেন, ওয়েলকাম। ভারতীয় ভদ্রলোকদের জন্যে যদি কিছু করতে পারি তা হলে গৌরবান্বিত বোধ করব।

মিস্টার আলাম্বার বয়স সত্তরের ওপরে। মাথায় পাকা চুল, রোগা এবং মুখে মিষ্টি হাসি লেগেই রয়েছে। আফ্রিকার মানুষ বলে গায়ের রং কালো কিন্তু আজ নিউ ইয়র্কে যেসব ভয়ঙ্কর চেহারার কালোকে অর্জুন দেখেছে, তাদের সঙ্গে কোনও মিল নেই। মিস্টার আলাম্বার পরনে ফুলপ্যান্ট এবং ফতুয়া গোছের রঙিন জামা। অত্যন্ত আন্তরিকভাবে তিনি ওদের বসতে বললেন।

মেজরের সঙ্গে পাশাপাশি সোফায় বসল অর্জুন। উলটোদিকে মিস্টার আলাদা। অর্জুন দেখছিল এই ঘরটি আফ্রিকার বিভিন্ন রকমের শিল্পদ্রব্যে সাজানো। কাঠের সরু অথচ প্রায় সাত ফুট দুটি নারী-পুরুষ মূর্তি চোখে পড়ার মতো।

মেজর পরিচয় করিয়ে দিলেন, এ হল আমার জুনিয়ার বন্ধু অর্জুন। ইন্ডিয়ার পূর্বপ্রান্তে হিমালয়ের নীচে একটি শহরে থাকে। অর্জুন একজন সত্যসন্ধানী। অনেকবার আমি ওর সঙ্গে কাজ করেছি।

মিস্টার আলাদা চোখ বড় করলেন, তাই নাকি? এ তো খুব ভাল খবর। আপনি ভগবানে বিশ্বাস করেন অর্জুন?

অর্জুন হাসল, যাঁরা বিশ্বাস করেন তাঁদের অমর্যাদা করি না।

ভদ্রলোককে খুব চিন্তিত দেখাল, ও, আই সি।

অর্জুন বলল, আমাকে আপনি ভুল বুঝবেন না। আমি নাস্তিক নই। যখন আমাদের পুজো হয় তখন ভগবানের প্রতীক হিসেবে যে মূর্তিগুলো পূর্বপুরুষরা তৈরি করেছেন তাঁদের দিকে হাতজোড় করে মস্কার করতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। কিন্তু কোনও কাজে সফল হওয়ার জন্যে নিজে উদ্যোগী না হয়ে ভগবানের ওপর ভরসা করে বসে থাকাটাকে আমি ঘৃণা করি। আপনি নিশ্চয়ই মাদার টেরিজার নাম শুনেছেন। অসহায় মানুষের উপকার করার জন্যে তিনি প্রতিনিয়ত ভগবানকে স্মরণ করেন। মানুষের উপকার যদি ভগবানকে স্মরণ করলে সম্ভব হয় আমি নিশ্চয়ই সেটা করতে রাজি আছি। তবে আমার কাছে মাদার ভগবান।

মিস্টার আলাম্বার মুখ এবার হাসিতে ভরে গেল। মাথা নাড়লেন তিনবার, তারপর বললেন, আপনি সত্যসন্ধানী। আফ্রিকা আমার মহাদেশ। একদিকে মোজাম্বিক আর জিম্বাবোয়ে, অন্যদিকে অ্যাঙ্গোলা, জাইরে আর তানজানিয়া, মাঝখানে আমার দেশ জাম্বিয়া। লিভিংস্টোন নামের এক শহরের কাছে আমার বাড়ি। প্রায় প্রতি বছর আমি আমার দেশের বাড়িতে গিয়ে এক মাস করে থাকতাম। কিন্তু গতবছর যেতে পারিনি। এবারও যাওয়া হবে না।

মেজর জিজ্ঞেস করলেন, কেন?

দুবছর আগে দিনপাঁচেক বাড়িতে থেকে বসওয়ানা গিয়েছিলাম। আফ্রিকার উপজাতিদের শিল্প নিয়ে অনেক পড়াশোনা করেছি। বসওয়ানার। গ্যাবর্নেতে পৌঁছে দুদিন ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। পাশেই কালাহারি মরুভূমি। মরুভূমি পেরিয়ে বেদুইন, যাযাবরের দল গ্যাবর্নে আসে বিশ্রামের জন্যে। সেই সুযোগে কেনাবেচা চলে। কালাহারিতে এখনও কিছু হিংস্র উপজাতি রয়েছে। তারা সাধারণত শহরে আসে না। একদিন বাজারে এলোমেলো ঘুরছি, একটি লোককে দেখলাম কাঁধে ব্যাগ নিয়ে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে। লোকটা যে মরুভূমির উপজাতিদের একজন তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। লোকটি একটি কিউরিও শপে ঢুকে যেতে আমি তাকে অনুসরণ করলাম। সম্ভবত দোকানদার তখন দোকানে ছিল না। একটি বাচ্চা ছেলে কাউন্টারে ছিল। লোকটি তাকে নিচু গলায় কিছু বললে সে জিনিসটা দেখতে চাইল। আমি তখন দোকানের অন্য জিনিস মন দিয়ে দেখার ভান করছিলাম। আড়চোখে দেখলাম লোকটা একটা কালো চকচকে জিনিস দেখাচ্ছে। ছেলেটার সেটা ঠিক পছন্দ হল না। লোকটা একটু অনুরোধ করায় ছেলেটা যা দাম বলল তা শুনে জিনিসটা ব্যাগে ঢুকিয়ে বেরিয়ে গেল রাস্তায়। আমি সঙ্গে-সঙ্গে ওকে অনুসরণ করে একটু নির্জন জায়গায় গিয়ে ধরে ফেললাম। বললাম, তুমি যে জিনিস বিক্রি করতে চাইছ তা যদি আমার পছন্দ হয় তা হলে কিনে নিতে পারি। জিনিসটা দেখাও।

লোকটা জিজ্ঞেস করল, আপনার পরিচয় জানতে পারি?

বললাম, আমার নাম আলাদা। আমি লিভিংস্টোন শহরের কাছে থাকি। বিরল জিনিস সংগ্রহ করার শখ আছে বলে দেখতে চাইছি।

লোকটা বলল, যে জিনিস আপনাকে দেখাব তা খুব মূল্যবান। শহরের লোক এর মূল্য ঠিক বুঝবে না। কিন্তু গ্রাম জঙ্গল, মরুভূমির লোক এই জিনিসকে ভয় যেমন করে, ভক্তিও।

সে ব্যাগ থেকে যা বের করল তাকে আমি সহজেই চিনতে পারলাম। ওটা একটা ব্ল্যাক কোবরার মাথা এবং শরীরের অংশ। বাকিটা, লেজের দিকটা নেই। কালো পাথরজাতীয় কোনও বস্তু খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে। এক সময় এই অঞ্চলের মানুষের কাছে সাপ, বিশেষ করে এই সাপ ভগবানের প্রতিনিধি ছিল। যখন আমেরিকার জন্যে শ্রমিক সংগ্রহ করতে ক্রীতদাস করে এদের নিয়ে যাওয়া হয় তখন ওই ধারণাটাই চালু ছিল। পরবর্তীকালে স্বাধীন আমেরিকার কিছু কালো মানুষ ওই সাপকে কেন্দ্র করে একটি সঙ্ঘ তৈরি করে বলে শুনেছি। তা লোকটির সঙ্গে দরাদরি করে আমি পাথরের সাপটিকে কিনে ফেললাম। ইঞ্চি আটেকের ওই পাথুরে বস্তুটির ওজন বেশি নয়। বড়জোর দেড় পাউন্ড।

পরদিন কাগজে দেখলাম সেই লোকটি খুন হয়ে গেছে। যে ডেরায় সে উঠেছিল সেখানে এসে কেউ তাকে খুন করে গেছে। লোকটার ছবি ছাপিয়ে পুলিশ অনুরোধ করেছে কেউ যদি কোনও হদিস জানে তা হলে অবিলম্বে যোগাযোগ করলে ভাল হয়। লোকটির মৃতদেহের পাশে একটা কাগজে লেখা ছিল, ভগবানকে যে চুরি করে কাছে রাখবে তারই এই দশা হবে।

আমি সেদিনই বত্‌সওয়ানা ছেড়ে জাইরেয় ফিরে এলাম।

মিস্টার আলাম্বা থামতেই অর্জুন জিজ্ঞেস করল, ওরা কিছু জানতে পেরেছে?

আমি ঠিক জানি না। তবে সেবার দেশের বাড়িতে থাকার সময়েই টের পেলাম অচেনী কিছু লোক গ্রামের আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গ্রামের লোকজন তাদের তাড়িয়ে দিলেও তারা শাসিয়ে গিয়েছে আবার ফিরে আসবে বলে। আমি আর ঝুঁকি নিলাম না। রাতের অন্ধকারে গাড়ি ভাড়া করে সোজা চলে এলাম লুসাকায়। সেখান থেকে হারারে পৌঁছে প্লেন ধরলাম। জাম্বিয়ার কোনও এয়ারপোর্টে যাওয়ার ভরসা পাইনি।

সেই সাপটি আপনার এ-ফ্ল্যাটে এখনও আছে?

হ্যাঁ আছে। আমি তোমাদের বিশ্বাস করেছি, কারণ তোমরা হিন্দু, ভারতবর্ষের মানুষ। তা ছাড়া তুমি সত্যসন্ধানী। আশা করি এসব কথা তোমরা গোপনেই রাখবে। আমি খুব বিব্রত হয়ে আছি। কারও সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ পাইনি। তোমাদের এ কথা বলার কারণ সেটাও। এসো আমার সঙ্গে।

মিস্টার আলাম্বা তাদের পাশের ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরে ঢুকতেই দৃশ্যটি দেখতে পেল ওরা। টেবিলের ওপর একটি কাচের বাক্সে আলো জ্বালা রয়েছে। তার মধ্যে সেই লেজ খসে যাওয়া সাপটিকে রেখেছেন মিস্টার আলাম্বা। সাপের মুখের কাছে একটা ছোট বাটিতে দুধ দেওয়া হয়েছে।

সাপটিকে খুঁটিয়ে দেখছিল অর্জুন। মেজর জিজ্ঞেস করলেন, পাথরের সাপকে দুধ দিয়েছেন কেন? ও দুধ খাবে নাকি? হা হা হা!

মেজরের হাসি থামলে মিস্টার আলাম্বা বললেন, বেশ কিছুদিন আগে টিভিতে দেখেছিলাম ভারতবর্ষের এক হিন্দু দেবতা যাকে হাতির মতো দেখতে তাঁর পাথরের মূর্তি নাকি দুধ খেয়ে নিচ্ছে অবলীলায়। এটা কি সত্যি?

মেজর হকচকিয়ে গেলেন, হ্যাঁ, আমিও শুনেছি। তবে ব্যাপারটা বুজরুকি।

আপনি বুজরুকি মনে করলেও যারা দুধ খাইয়েছিল তারা মনে করেছে যে, ভগবান তুষ্ট হয়ে দুধ খেয়েছেন। মরুভূমিতে সাপকে যারা ভগবান মনে করে তারা নিয়মিত উটের দুধ দিয়ে পুজো করে। এক বাটি দুধ দিলে যদি তাদের ওই সংস্কারটাকে মান্য করা যায় তাতে কোনও দোষ তো আমি দেখি না।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, আপনি যে আমেরিকায় থাকেন তা নিশ্চয়ই আপনার গ্রামের মানুষজন জানেন। আপনার আত্মীয়স্বজনের ওপর চাপ দিলে এই ফ্ল্যাটের ঠিকানা পেতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এই দু বছরে ওরা এখানে যখন পৌঁছয়নি তখন বোঝা যাচ্ছে সেই ক্ষমতা ওদের নেই।

আপনি ভুল করছেন মিস্টার অর্জুন। এই দু বছরে আমি ঠিক পাঁচবার ফ্ল্যাট পালটেছি। কোথায় কোন ফ্ল্যাটে যাচ্ছি তা বলে আসিনি। এখানে এসেছি মাস পাঁচেক হল। আমি এখন অবসরে আছি। কাগজে প্রবন্ধ লিখে যা পাই আর জমানো টাকার সুদে ভালই চলে যায় আমার। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে যাই না। ওঁর সঙ্গে আমার আলাপ হয় লিফটে। একটি সাদা ছেলে মাতাল হয়ে আমাকে খারাপ কথা বলছিল লিফটে ওঠার সময়। উনি সতর্ক করেন তাকে। সেকথা কানে না নিয়ে আরও খারাপ গালাগাল করলে উনি তাকে উত্তমমধ্যম দেন। শেষপর্যন্ত ছেলেটি ক্ষমা চাইলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই সময় আমাদের পরিচয় হয়। কোনও ভদ্রলোক দীর্ঘকাল এইভাবে প্যাঁচার মতো বাস করতে পারে না। আমরা দুবার পরস্পরের ফ্ল্যাটে গিয়েছি। উনি অভিযাত্রী। পৃথিবীর রহস্য উদ্ধার করতে এই বয়সেও কত আগ্রহ ওঁর। যাই হোক, ওদের ক্ষমতাকে ছোট চোখে দেখা ঠিক নয়। ধর্মবিশ্বাস যখন অন্ধ হয় তখন মানুষ পারে না এমন কাজ নেই।

মেজর জিজ্ঞেস করলেন, আপনি পুলিশকে জানাচ্ছেন না কেন?

আমি প্রথমে ভেবেছিলাম জানাব। কিন্তু পরে মনে হল, তাতে কোনও লাভ হবে না। পুলিশ আমাকে কতদিন পাহারা দিয়ে থাকবে? বরং, তারা উদ্যোগী হলে লোকে আমার অস্তিত্ব জেনে যাবে। হ্যাঁ, এখানে যদি ওরা এসে পড়ে তখন পুলিশকে জানাতেই হবে। মিস্টার আলাম্বাকে বিমর্ষ দেখাচ্ছিল।

মেজর ভরসা দিলেন, সেটা কখনওই ঘটবে না মিস্টার আলাম্বা। কালাহারি মরুভূমির কিছু মানুষের পক্ষে এই নিউ ইয়র্ক শহরে এসে আইনবিরুদ্ধ কাজ করা সম্ভব হবে না। এ নিয়ে কোনও দুশ্চিন্তা করবেন না।

মিস্টার আলাদা মাথা নাড়লেন, ওদের এখানে আসার দরকার নেই। এই আমেরিকায় খ্রিস্টান হয়ে যাওয়া অনেক কালো মানুষের রক্তে ওই ধর্মবিশ্বাস এখনও সক্রিয়। যে-সমস্ত কালো মানুষকে জাহাজে তুলে ক্রীতদাস হিসেবে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল তাদের উত্তরপুরুষদের কেউ কেউ এখনও মনে করে আফ্রিকাই তাদের দেশ। ক্রীতদাস প্রথা লোপ করে যখন কালোদের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া হল তখন অনেকেই পূর্বপুরুষের দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এখানকার স্বাচ্ছন্দ্য ওখানে পাওয়া যাবে না, এখানকার রোজগার ওখানে হবে না, তাই আফ্রিকায় ফিরে যেতে অনেকেই চায়নি। যায়নি। কিন্তু আফ্রিকানদের যাওয়া-আসা আরম্ভ হয়ে গেল। এবার নিশ্চয়ই আপনারা আমার বক্তব্য বুঝতে পারছেন।

এবার অর্জুন মাথা নাড়ল, বুঝলাম। কিন্তু মিস্টার আলাদা, আপনি কালাহারি মরুভূমি থেকে বেশি দূরে থাকেন না। ওখানকার মানুষের ধর্মবিশ্বাস থেকে আপনি মুক্ত হয়ে আছেন কী করে?

আমি পড়াশোনা করেছি বিদেশে। ফিরে গিয়েছিলাম গবেষকের চোখ নিয়ে। যা দেখেছি তা বিশ্লেষণ করেছি বাস্তবের ওপর দাঁড়িয়ে। তারপর এখানে অধ্যাপনা করার সময় বারংবার গিয়েছি সেখানে। কুয়ো থেকে বেরিয়ে এসে পুকুরে স্নান করলেই বোঝা যায় পার্থক্য কী! সেটা বুঝেছিলাম বলেই ওই অন্ধবিশ্বাস আমাকে প্রভাবিত করতে পারেনি।

আছা, ওই সাপের মূর্তি যাদের সম্পত্তি তাদের কাছে ফেরত পাঠানো যায় না?

আমি সেকথাই বলতে চাইছি। স্রেফ কৌতূহলে আমি ওটা কিনেছিলাম। ভেবেছিলাম ওটাকে কিউরিও হিসেবে রাখব। পরে যখন পরিস্থিতি এরকম হল তখন ফিরিয়ে দিতে চেয়েছি। আমার কাছে ওটাকে রেখে জীবনের ঝুঁকি নেওয়া তো বোকামি। কিন্তু সমস্যা হল, কাকে ফেরত দেব? মরুভূমির কোন উপজাতি ওর সত্যিকারের মালিক? এ প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।

মেজর বললেন, আপনি ওটাকে আমেরিকান মিউজিয়ামে দিয়ে দিতে পারেন। ওরা ইতিহাস জানলে সাগ্রহে নেবে।

মিস্টার আলাদা বললেন, ঠিক। কিন্তু চিরজীবনের জন্যে হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় আমার ওপর ওদের রাগ আরও বেড়ে যাবে। ভদ্রলোক হাসলেন, মিস্টার অর্জুন। আপনার বয়স অল্প? আফ্রিকা সম্পর্কে আপনার কতটুকু ধারণা আছে তা আমি জানি না। কিন্তু আপনি তো সত্যসন্ধানী। আমার জন্যে এই সত্যটির সন্ধান করে দিতে পারেন? ওই মূর্তির প্রকৃত মালিক কারা?

মেজর বললেন, তার জন্যে তো আফ্রিকায় যেতে হবে?

হ্যাঁ। সে সমস্ত খরচ আমি বহন করব। আর আপনি যদি সফল হন তা হলে উপযুক্ত পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হবেন না।

অর্জুন বলল, এই মুহূর্তে আপনাকে আমি কোনও কথা দিচ্ছি না। আমাকে ভাবতে হবে। অন্তত একটা দিন আমার সময় চাই।

বেশ। তাই হবে। এই নিন আমার কার্ড। আগামীকাল যে-কোনও সময়ে ফোন করবেন। নিতান্ত বাধ্য না হলে আমি বাইরে যাই না। যাক গে, অনেক কথা বলেছি। এবার বলুন, কী খাবেন? চা, না কফি?

অর্জুন কিছু বলার আগেই মেজর বললেন, অনেক ধন্যবাদ। অর্জুন আজ প্রথমবার আমার কাছে এসেছে। ওকে আমিই খাওয়াব। ইচ্ছে হলে আপনি আমাদের সঙ্গে আসতে পারেন।

মিস্টার আলাম্বা বললেন, আজ থাক। অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু, এই দেখুন, আসল কথাটাই আমি জিজ্ঞেস করিনি। আমার কাছে ওঁকে কীজন্যে নিয়ে এসেছিলেন? কোনও প্রয়োজন?

মেজর বললেন, সে তো বটেই। কিন্তু আপনার সমস্যা এত তীব্র যে, আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম কথাটা। অৰ্জুন বলো!

অর্জুন গলা থেকে লকেটটা খুলে সামনে ধরল, এরকম জিনিস আগে দেখেছেন?

মিস্টার আলাম্বার চোখ ছোট হয়ে এল। অর্জুন লক্ষ করল একটু-একটু করে তাঁর ঠোঁটে কাঁপুনি শুরু হল। শেষপর্যন্ত তিনি বলে উঠলেন, মাই গড!

মেজর জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার?

প্রায় ছোঁ মেরে লকেটটা হাতে নিয়ে ঝুঁকে পড়লেন ভদ্রলোক। উলটেপালটে খুঁটিয়ে দেখে তাকিয়ে উঠে গেলেন দেওয়ালজোড়া র্যাকে সাজানো বইয়ের সামনে। তিন-চারটে বই হাতড়ে পাতা ওলটাতে লাগলেন। তাঁকে খুব উত্তেজিত দেখাছিল। শেষপর্যন্ত একটি পাতায় তিনি স্থির হলেন। খানিকটা পড়ে আবার লকেট দেখে ঘুরে দাঁড়ালেন মিস্টার আলাম্বা, এই লকেট আপনি কোথায় পেয়েছেন?

অর্জুন গোরক্ষনাথের ব্যাপারটা বলল। গোরক্ষনাথের গুরুদেব আফ্রিকার কোনও বন্দর থেকে এই লকেটটি সংগ্রহ করে। সেটা জানাজানি হয়ে যাওয়ায় লোকটির প্রাণসংশয় হয়। কোনওমতে পালিয়ে জাহাজে ওঠে সে। কিন্তু সেই জাহাজ সমুদ্রে ড়ুবে যায়। তবে লোকটি কোনওরকমে বেঁচে যায়। ওর শিষ্য গল্প বলেছে যে, কাঠ ভেবে সাপকে জড়িয়ে ভেসে ছিল লোকটা। এটা আমি বিশ্বাস করি না। যা হোক তারপর থেকে এই লকেটটাকে খুব পুজো করেছে। লোকটা। এইটুকু আমি জানি।

মিস্টার আলাম্বা এগিয়ে এলেন বই আর লকেট নিয়ে। এই দেখুন, এই স্কেচটার সঙ্গে লকেটের কী মিল!

ওরা দেখল। সত্যি, এই লকেটের সাপের সঙ্গে স্কেচের সাপের পার্থক্য নেই বললেই চলে। মিস্টার আলাম্বা বললেন, অদ্ভুত ব্যাপার। আমার কাছে যে সাপের মূর্তি রয়েছে সেটাও এই শ্রেণীর সাপ। মুখের গঠন এক। কিন্তু ভঙ্গি আলাদা। এরা অত্যন্ত বিষধর সাপ।

অর্জুন বলল, কাল রাত্রে টিভিতে বারংবার সাপের কথা বলা হচ্ছিল। আমি যখন এয়ারপোর্টের কাস্টমসকে লকেটটা দেখাই তখন একটা লোক এটাকে দেখতে পায়। পরে লোকটা কাছে এসে ভাল করে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আমি জানি না তার কাছ থেকে খবর পেয়েই হয়তো টিভিতে বারংবার আবেদন করা হয়েছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে।

হয়তো। কারণ এই বইতে লেখা হয়েছে আফ্রিকার নীচের দিকের দেশগুলোর উপজাতিরা একসময় এই সাপকে ভগবান বলে মনে করত। ওদের এক দলের সদার স্বপ্নে আদেশ পায় সর্পদেবতা মাটিতে পোঁতা আছেন। সেই সাপটিকে তিনি উদ্ধার করেন। অদ্ভুত ধাতব বস্তুতে তৈরি সেই সাপ। ওটা পাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে সেই সর্দার এবং তার দলের উন্নতি হতে শুরু করে। অন্য দলগুলো ঈর্ষা করছে বুঝে সদার ঠিক এর ড়ুপ্লিকেট সাপ তৈরি করে। কিন্তু সেটি স্লেট পাথরের তৈরি বলে পার্থক্য বোঝা যায়। মূল সাপের মূর্তির চোখের তলায় একটি গর্ত আছে, যার মধ্যে কোবরার বিষ সঞ্চিত ছিল। ওই আসল মূর্তি চুরি হয়ে যায় সর্দারের মৃত্যুর পর। নকলটির মালিকানা নিয়েও ঝামেলা হয়। কিন্তু আসলটিকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা তখন আর একটি বড় পাথরের সাপ তৈরি করে পুজো শুরু করলেও আসলটিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা অব্যাহত থাকে। পড়া শেষ করে লকেটটাকে ওপরে তুলে মিস্টার আলাম্বা বললেন, এই সেই আসল সাপ।
মেজরের ফ্ল্যাট মাত্র দোতলার ওপরে কিন্তু ওই ফ্ল্যাটে পা দেওয়ামাত্র সমুদ্রের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। নিউ ইয়র্কের গায়ে যে সমুদ্র তার আওয়াজ নীচের ফ্ল্যাটে না গিয়ে ওপরের ফ্ল্যাটে এত জোরে আসছে কী করে?

মিস্টার আলাম্বা মেজরের অনুরোধে সঙ্গে এসেছিলেন। অর্জুনের প্রশ্ন শুনে হেসে বললেন, ওটা সমুদ্রের আওয়াজ নয়। হাওয়ার শব্দ। এই দিকটায় সারা দিনরাত প্রবল বাতাস বয়ে যায় এই সময়। একটা সোফায় বসে পড়লেন তিনি।

মেজর অর্জুনকে বললেন, এই ফ্ল্যাটে আগেরবার আসোনি তুমি। কেমন লাগছে বলো? একজন অভিযাত্রী যখন ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম খোঁজে তখন এখানে এসে কদিন জিরিয়ে যায়। এখানে আমি সত্যি আনন্দে থাকি। তবে ওই ম্যাক্সিমাম তিন-চার মাস। ওয়েল মিস্টার আলাম্বা, আপনি আপসেট হয়ে পড়ছেন কেন? অর্জুনকে যখন আপনার কেসটা দিয়েছেন তখন নিশ্চিন্তে গল্প করুন।

নিশ্চিন্ত আমার পক্ষে হওয়া সম্ভব নয়। ধর্মবিশ্বাস মানুষকে কী ভয়ঙ্কর করে দেয়, তা আমি জানি। যুক্তি লোপ পেয়ে যায়, ভদ্রতা, মানবতাবোধ উধাও হয়ে যায়। সে তখন একটা বীভৎস রোবট মাত্র। মিস্টার আলাদা অসহায় গলায় বললেন।

মেজর বললেন, আপনার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। আপনি যদি কিছু মনে না করেন তা হলে আমার এখানে কিছুদিন থাকতে পারেন।

আপনার এখানে? তাতে কী লাভ?

ওরা চট করে আপনাকে খুঁজে পাবে না। আর আপনারও একা মনে হবে না।

যারা এবাড়িতে আমার সন্ধানে একবার আসবে, তারা এখানে পৌঁছতে পারবে না এমন ভাবা ভুল হবে। তা ছাড়া এখানে আমি কী নিয়ে বাঁচব? আমার সমস্ত বইপত্র ওই ফ্ল্যাটে! আমার প্রিয় সংগ্রহগুলো এখানে। ওদের ছাড়া আমার পক্ষে থাকা অসম্ভব। না, না। আপনারা যে আমার সম্পর্কে আগ্রহ দেখিয়েছেন তাতেই আমার ভাল লাগছে। রোজ যদি দয়া করে একবার ফোন করেন তা হলে একটা উপকার হবে। ফোন না তুললে জানবেন আমি মরে গেছি। তখন যা করার। হঠাৎ মিস্টার আলাম্বা একদম অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন, আমি একটু চা খাব।

নিশ্চয়ই। মেজর কিচেনের দিকে চললেন।

টিব্যাগের চা নয়। আমি শুনেছি পূর্ব ভারতের মানুষজন চায়ের পাতা জলে ভিজিয়ে খেতে ভালবাসেন। সেটা তাঁরা এখানে দেশ থেকে আনিয়েও রাখেন।

মেজর মাথা নোয়ালেন, ঠিকই শুনেছেন। আমার সংগ্রহে দার্জিলিং জেলার বিখ্যাত চা আছে। একটু সময় দিন, আপনারা কথা বলুন। মেজর চোখের আড়ালে চলে যেতেই মিস্টার আলাম্বা খপ করে অর্জুনের হাত ধরে বললেন, আপনি আমার কাছে এসে থাকলে আমার প্রাণের ভয় থাকবে না।

আমি? অর্জুন হকচকিয়ে গেল।

হ্যাঁ।

কিন্তু আমার পক্ষে কদিন এখানে থাকা সম্ভব?

তা হলে ওই লকেটটা আমাকে দিন। অন্তত কিছুদিনের জন্যে। ওই লকেট আমার গলায় থাকলে ওরা কিছুতেই খুন করতে পারবে না। মিস্টার আলাম্বার চোখ চকচক করতে লাগল।

অর্জুন ফাঁপরে পড়ল। মিস্টার আলাম্বা যখন কথা বলছিলেন তখন তাঁর চোখ কেবলই চলে যাচ্ছিল কিচেনের দরজার দিকে। অর্থাৎ উনি মেজরকে এ-ঘর থেকে সরিয়ে প্রস্তাবটা দিলেন। কেন?

অর্জুন বলল, আমি একটু ভেবে দেখি।

এতে নতুন কিছু ভাবার নেই মিস্টার অর্জুন। ওই লকেটটা আপনার কাছে কিছু নয়। একটা খেলনা। আপনার ধর্মের সঙ্গে এর কোনও মিল নেই। অথচ এই আমেরিকায় অনেক কালো মানুষ ওটাকে দেবতা বলে এখনও মনে করে। আপনি তো আমার কেস নিয়েছেন। বেশ, আপনার পারিশ্রমিক আমি বাড়িয়ে দেব। আবার হাত ধরতেই মেজরের গলা পেয়ে নিজেকে সংযত করলেন বৃদ্ধ।

চায়ের ট্রে দুহাতে নিয়ে এসে টেবিলে রাখলেন মেজর। রেখে বললেন, এখন আমরা স্বচ্ছন্দ আমার যৌবনের দার্জিলিং শহরকে মনে করতে পারব। কুয়াশা উঠে আসছে গাছ থেকে, ছায়ামাখা সাপের মতো পথ, ঘোড়ার ওপর গহাড়ি মেয়ে, ক্যাভেন্ডার্স রেস্তরাঁর খোলা ছাদে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে দেখতে চায়ের কাপে চুমুক—আঃ। পট থেকে চা ঢেলে দুজনের হাতে কাপ তুলে দিলেন মেজর। সঙ্গে-সঙ্গে ঘরটা দারুণ মিষ্টি চায়ের গন্ধে ভরে গেল। মেজর বললেন, মিস্টার আলাম্বা, চুমুক দিন, প্লিজ।

কাপে ঠোঁট ছুঁইয়েই মিস্টার আলাদা বলে উঠলেন, সত্যি বিউটিফুল।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, আপনি চা নিলেন না?

নো। প্রত্যেক মানুষের উচিত তার নিজস্ব নিয়মকানুন মেনে চলা। আমি রোজ ভোর পাঁচটার সময় এক কাপ চা খাই। নো মিল্ক, নো শুগার। একেবারে চা-পাতার নির্যাস। এবং ওই একবারই। আর নয়। তারপর তুমি সন্ধে পর্যন্ত যতবার বিয়ার খেয়ে যেতে বলবে, খাব। কিন্তু সন্ধে নেমে গেলে মরে গেলেও বিয়ার খাব না। তখন হুইস্কি। ওয়েল মিস্টার আলাদা। স্টে উইথ আস, ইউ উইল বি হোমলি। আজ অর্জুনের ফোন পাওয়ামাত্র একটা টার্কি এনে জম্পেশ করে প্রসেসিং শুরু করে দিয়েছি। বেশ বড় প্রাণী। আপনি আমাদের সঙ্গে ডিনার করুন। কী, আপত্তি আছে?

মিস্টার আলাম্বা কিছু বলার আগেই অর্জুন বলল, আমার একটু অসুবিধে হবে। সুধামাসিকে বলিনি কিছু। ওঁরা নিশ্চয়ই রান্না করে রাখবেন।

ফোন করে দাও। বলল, আজ রাত্রে ফিরবে না।

অসম্ভব! মা জানতে পারলে গালাগাল দিয়ে ভূত ভাগিয়ে দেবে।

মা? তোমার মা? এই নিউ ইয়র্কে?

না। নিউ ইয়র্কে না। আপনি ঠিক বুঝবেন না।

নিউ জার্সির নাম্বারটা দাও তো।

পকেট থেকে নাম-ঠিকানা টেলিফোন নাম্বার লেখা কাগজটা বের করে এগিয়ে দিল অর্জুন। ছোট্ট তারবিহীন টেলিফোন পকেট থেকে বের করে নাম্বার ডায়াল করে জিজ্ঞেস করলেন, ভদ্রমহিলার নাম কী বললেন যেন? কী মাসি?

সুধামাসি। কিন্তু উনি ইংরেজি জানেন না। ওঁর মেয়ে–।

ততক্ষণে মেজর কথা বলতে শুরু করেছেন, হেলো। আমি যে নাম্বারটি ডায়াল করলাম সেটি রিপিট করছি। গুড। আমি, লোকে আমাকে মেজর বলে ডাকে, ওটাই এখন নাম হয়ে গিয়েছে, সুধামাসি নামে যিনি এ বাড়িতে জলপাইগুড়ি থেকে এসেছেন তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই। মেজর এতক্ষণ খুব কায়দা করে ইংরেজিতে বলছিলেন। এবার অর্জুনের দিকে একটা চোখ টিপে পরিষ্কার বাংলায় বললেন, নমস্কার সুধামাসি, আমি মেজর। আরে আপনি কী করে চিনবেন? জলপাইগুড়িতে যখন গিয়েছি তখন শ্রীমান অর্জুন ভূতের মতো খাটিয়েছে। হ্যাঁ, আঁ, ঠিক ধরেছেন, পুরনো বন্ধু তো, নিউ ইয়র্কে এসেই আমার কাছে চলে এসেছে। আজ রাত্রে একটু খাওয়াদাওয়া। আঁ, কী বললেন? সর্ষে ইলিশ, মানে ভাপা ইলিশ? ভাপা নয় সর্ষে? চিংড়ি পোস্ত। ওরে বাবা রে! ফুলকপির দিশি কোপ্তা? আমি যাব? নিশ্চয়ই যাব! এখনই যাচ্ছি। হ্যাঁ, অর্জুনকে নিয়েই যাচ্ছি। সেইজন্যে ফোনটা করা।

অ্যাঁ, পায়েস আর পাটিসাপটা, মরে যাব। না, না। কিন্তু মাসিমা, আমাদের আর এক বন্ধু মিস্টার আলাদা সঙ্গে আছেন। কম পড়ে যাবে না তো? ঠিক আছে। চলে আসছি। টেলিফোন অফ্ করে দাড়িতে হাত বোলাতে লাগলেন মেজর। অর্জুন কোনও কথা বলছিল না। মেজরই মৌনতা ভাঙলেন, আসলে, ওইসব খাবারের নামই ভুলে গিয়েছিলাম। শোনামাত্র নাভিকুণ্ডলীতে টান লাগল যেন। আর রেজিস্ট করতে পারলাম না।

বেশ তো, চলুন। অর্জুন হাসল।

আরে ওই টার্কিফার্কি তো রোজই খাই। এ খোদ বাংলামায়ের হাতের রান্না। এই যে সার, চলুন। মিস্টার আলাম্বার দিকে তাকালেন মেজর।

আপনি একা রাঁধবেন না। আমিও আপনার সঙ্গে আছি।

ওখানে রান্নার কথা বলা মানে যিশুকে বাইবেল পড়ানো। আমরা এখানে ডিনার করছি না। অর্জুনের বাড়িতে, ঠিক অর্জুন যদিও নয়, তবে ও নিয়ে মাথা ঘামাতে আর রাজি নই আমি। মেজর বললেন।

নো, নো! অসম্ভব। অন্য কোথাও যেতে পারব না আমি।

কেন?

তোমরা বুঝতে পারছ না আমার জীবন–।

মিস্টার আলাম্বাকে থামিয়ে দিল মেজর, আপনি বুঝতে পারছেন না। আজ যে ডিনার করবেন তা না করে বেঁচে থাকা মানে আপনার জীবন বৃথা। তা ছাড়া আমরা সঙ্গে আছি অর্জুন আছে ওই লকেট পরে। নো ভয়।

সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। একেই রাস্তা জনমানবশূন্য তার ওপর ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। তবু মুখ-মাথা চাপা দিয়ে মিস্টার এমন ভঙ্গিতে গাড়িতে উঠলেন যে, সাধারণ লোকই তাঁকে সন্দেহ করবে। মেজরের পাশে অর্জুন, পেছনে মিস্টার আলাদা।

মিস্টার আলাদা জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কোনদিকে যাচ্ছি?

নিউ জার্সি। ক্লোস্টার টাউনে। ওখানে ব্ল্যাক নেই। তাই তো অৰ্জুন?

আমি আজ দেখিনি। মিস্টার আলাম্বা বললেন, অর্জুন, একটু অনুরোধ করতে পারি?

নিশ্চয়ই।

সামনের উইন্ডস্ক্রিনের ওপরের হুকে তুমি লকেটটা টাঙিয়ে দাও।

কেন?

তা হলে লোকে সহজে দেখতে পাবে।

মেজর এবার গলা তুললেন, আপনি এত ভয় পাচ্ছেন কেন? চুপটি করে বসুন। আঃ, আজকের দিনটাই আলাদা। ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। তিনি গান ধরলেন, ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ে লাগছে ভারী মিষ্টি।

অর্জুন সংশোধন করে, ওটা মেঘলা ভাঙা হবে।

একই ব্যাপার। রবীন্দ্রনাথ কী খেতে ভালবাসতেন হে?

দুধকা সন্দেশ একসঙ্গে মেখে খেতে খুব ভালবাসতেন।

আমি খেলে ব্লাডগার হয়ে যেত। আমরা এখন হাডসনের নীচ দিয়ে যাব। মাথার ওপর নদী আর আমরা যাচ্ছি সুড়ঙ্গ দিয়ে। কেমন লাগছে?

দারুণ। অর্জুন বলল। সুড়ঙ্গ কিন্তু সিনেমার মতো আলো ঝলমলে। হুহু করে গাড়ির পর গাড়ি ছুটে যাচ্ছে সুড়ঙ্গপথ দিয়ে। এই সময় পেছনে সাইরেন বেজে উঠল। মেজর বললেন, কোন নির্বোধ আজ ধরা পড়ল কে জানে!

ধরা পড়ল মানে?

মামার ডাক শুনতে পাচ্ছ না। মেজরের গাড়ি সুড়ঙ্গ থেকে বের হতেই দুরন্ত গতিতে একটি পুলিশের গাড়ি তাঁকে ওভারটেক করতে গিয়েও পারল না। কোনওমতে সঙ্ঘর্ষ বাঁচিয়ে মেজর চিৎকার করে উঠলেন, ছুঁচো, ইঁদুর, পাচা, হিপোপটেমাস! পুলিশ বলে পাবলিকের মাথা কিনে নিয়েছিস নাকি? ডিনার খেতে দেবে না এমন প্ল্যান ছিল। হুঁ। ১,

পুলিশের গাড়ি পেছনে পড়ে গেছে। বীরদর্পে গাড়ি চালাচ্ছিলেন মেজর। হঠাৎ হাইওয়ের ওর দাঁড়ানো পুলিশের গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ানো অফিসার হাত বাড়িয়ে দাঁড়াতে বলল। অতএব মেজর পাশের পার্কিং-এর জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় গাড়ি দাঁড় করালেন। অর্জুন দেখল, দুজন পুলিশ অফিসার রিভলভার উঁচিয়ে ধরে পায়ে-পায়ে এগিয়ে আসছে। মেজর বললেন, নোড়ো না। হাত মাথা স্থির রাখো। ওরা এত ভিতু যে-কোনও সময় ভয় পেয়ে গুলি ছুড়তে পারে। আরশোলার ঘিলুও নিউ ইয়র্ক পুলিশের কাছে লজ্জা পাবে।

ততক্ষণে দুজন অফিসার দুই জানলায় এসে গেছেন। নির্বিকার গলায় মেজর জিজ্ঞেস করলেন, ইয়েস অফিসার, আপনাদের জন্যে কী করতে পারি?

ডোন্ট মুভ। স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করবেন না। পেপার্স?

মেজর একটা খাম বের করে দিয়ে দিলেন। অর্জুন দেখল তার দিকে যে পুলিশ অফিসার বন্দুক তাক করে আছে তার নিশ্বাসে রসুনের গন্ধ। এবার প্রথম অফিসার পেছনে তাকাল, হু ইজ হি?

হি ইজ প্রোফেসর; প্রোফেসর আলাম্বা। বিল নোজ হিম।

হু ইজ দ্যাট বিল?

মেজর অফিসারের দিকে তাকালেন, হাই ম্যান, তুমি তোমার নাম ভুলে যেতে পারো, কিন্তু বিলের নাম ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

তোমরা পুলিশ স্টেশনে এসো।

কেন? আমাদের অপরাধটা কী?

সেখানে গেলেই জানতে পারবে।

অগত্যা একটি পুলিশের গাড়িকে অনুসরণ করতে হল। ডেস্কে পৌঁছেই মেজর বললেন, মিস্টার আলাম্বা, আফ্রিকার লোকশিল্প এক্সপার্ট, একটা ফোন করতে চান অফিসার। তাকে সেটা কি করতে দেওয়া হবে?

নিশ্চয়ই। কাকে করতে চান?

মেজর পেছনে এসে দাঁড়ানো অফিসারকে দেখিয়ে বললেন, ওঁকে বললাম, উনি বুঝতেই পারলেন না। উনি হোয়াইট হাউসে ফোন করে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলতে চান।

মাই গড়। আপনি বিল বললেন, সেই বিল—? অফিসার এগিয়ে এলেন সামনে, এক মিনিট। আমরা একটু আগে একটা কল পেয়েছি আপনার গাড়িতে একজন ভয়ঙ্কর লোক যাচ্ছে, যার উদ্দেশ্য আফ্রিকা থেকে আসা কালো মানুষের মধ্যে দাঙ্গা বাধিয়ে দেওয়া। মনে হচ্ছে মিস্টার আলাম্বাই সেই মানুষ। ওয়েল, মিস্টার আলাম্বা, আপনার কিছু বলার আছে?

মাথা নাড়লেন মিস্টার আলাম্বা, হা। ওরা আমাকে মারতে চায়।

কারা?

যাদের ধর্মীয় মূর্তি আমি না জেনে সংগ্রহ করেছি।

আপনি যদি সেটা মিউজিয়ামে দান করে দেন, তা হলে?

তা হলেও আমি নিষ্কৃতি পাব না। আপনার সঙ্গে যে কালো ছেলেটি ছিল সে কোথায়? তাকে নিয়ে আসুন মিস্টার আলাম্বা বললেন।

কয়েক মিনিটের মধ্যে সেই কালো অফিসার এগিয়ে এসে বলল, ইয়া।

তুমি আফ্রিকায় গিয়েছ? মিস্টার আলাদা প্রশ্ন করলেন। নো। কখনও না।

তোমার পূর্বপুরুষ ও-দেশ থেকে এসেছেন? কোত্থেকে? নাম বলো।

আই ডোন্ট নো। আমি আমেরিকান, সেটাই শেষ কথা।

যে ফোন করে পুলিশকে বলে আমাদের আটকাতে, তার নাম কী?

অদ্ভূত। আমি কী করে জানব? মিস্টার আলাদা অর্জুনের দিকে তাকালেন, অর্জুন। ওকে দেখান।

অর্জুন চট করে ভেবে নিল। নিউ ইয়র্কে কেউ যদি সন্দেহ করে পুলিশকে ফোন করে জানায়, তা হলেও নিউ জার্সির মাটিতে দাঁড়িয়ে কোনও পুলিশ অফিসারের পক্ষে সেটা অনুমান করা সম্ভব নয়।

সে বলল, দেখিয়ে লাভ হবে না।

আমি দেখতে চাই সেটা।

অগত্যা অর্জুনকে জামার ভেতর থেকে লকেটটাকে বের করতে হল, দেখুন তো, এই লকেটটা আপনার কাছে অর্থবহ কিনা।

কালো অফিসার লকেট দেখলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী?

অর্জুন মিস্টার আলাম্বাকে বলল, তা হলে দেখলেন—!

ইয়েস।

প্রায় মিনিট পনেরো আলোচনা করল অফিসাররা। তারপর সেই প্রথমজন এসে বলল, আমরা খুব দুঃখিত। তোমরা কোথায় যাচ্ছিলে?

মেজর ঠিকানা বললেন। অফিসার বললেন, ওখানে রাত্রে থাকবে?

না। ডিনার খেয়ে ফিরে আসার ইচ্ছে ছিল।

তা তোমরা আসতেই পারো। আমাদের একটা গাড়ি তোমাদের সঙ্গে থাকবে। তোমরা যখন ফিরে আসবে তখন হাডসন পর্যন্ত এসকর্ট করবে। এটা আমাদের কর্তব্য, বুঝলে?

ঠিক তখনই সমস্ত চরাচর কাঁপিয়ে বিস্ফোরণের আওয়াজ হল। সেই আওয়াজে কেঁপে উঠল সবাই। একজন অফিসার ছুটে এসে বলল, এদের কার উড়ে গেল।
দাউ দাউ করে জ্বলছে মেজরের গাড়ি থানার বাইরে দাড়িয়ে সমানে মেজর চিৎকার করে গেলেন, ওরে ছুঁচো, ইঁদুর, পেঁচা, হিপো, তোকে যদি হাতের কাছে পেতাম তা হলে, ওঃ, মনের সুখে কিমা বানাতাম।

রাত দশটা নাগাদ পুলিশ ওদের সুধামাসিদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেল। যাওয়ার আগে মেজর যে কথা পুলিশের লোককে বলেছিলেন তা জীবনে ভুলবে না অর্জুন। মেজর বলেছিলেন, এই অবধি পৌঁছে দেওয়ার জন্যে অনেক ধন্যবাদ অফিসার। এর পর আপনাকে থাকতে বলছি না, কারণ সরষে ইলিশ অথবা চিংড়ি পোস্ত শেয়ার করা আর আমার পক্ষে সম্ভব নয়। গুড নাইট।

অফিসার কিছুই বুঝতে না পেরে বলেছিলেন, পার্ভন?

সেটা তো করেই দিয়েছি। গুড নাইট।

অর্জুন এগিয়ে গিয়ে বোতাম টিপল।

ভেতর থেকে দেখে নিয়ে অঞ্জনাদি দরজা খুললেন। অর্জুনকে কিছু বলতে গিয়ে সামলে নিয়ে অত্যন্ত শিক্ষিত গলায় মেজর এবং মিস্টার আলাম্বাকে স্বাগত জানালেন। ওঁদের বসার ঘরে নিয়ে এসে সোফায় বসিয়ে বললেন, আমি অঞ্জনা, সুধামাসি আমার মা।

প্রাথমিক পরিচয় হয়ে যাওয়ার পর অঞ্জনাদি জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের বাড়িতে পুলিশের গাড়িতে চেপে কেউ প্রথমবার এল। কোনও অসুবিধে হচ্ছিল?

মেজর তাঁর কঁচা প্রায় নেই, পাকা দাড়িতে আঙুল ঢোকালেন, হ্যাঁ। একটু।

কী হয়েছিল? অবশ্য জানাতে যদি আপত্তি না থাকে।

বিন্দুমাত্র নেই। না জানানো ছাড়া কোনও উপায় নেই। কী বলো, অর্জুন? আমার গাড়িটা উড়ে গেছে। মানে টাইমবোম বা ওই জাতীয় কিছু নিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে কেউ।

সে কী? কোথায়? কখন?

একটু আগে। খোদ পুলিশের ডেরায় পার্ক করে রাখা গাড়ি উড়ে গেল। নিজের গাড়ি বলে বলছি না, ঠিক ফিল্মের গাড়ির মতো সিন তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দেখুন, রাত অনেক হয়েছে। আমরাও ক্ষুধার্ত। মিস্টার আলাম্বাও স্বাভাবিক নন। যদি ডিনার পরিবেশন করেন তা হলে এখনই তোড়জোড় করুন। তবে তার আগে ড্রিঙ্ক সার্ভ করতে পারেন।

আমাদের ডিনার তৈরি।

ও হো। তা হলে একটা স্কচের বোতল চটপট এনে দিন। আপনি যদিও বাঙালি মহিলা, তবে আমেরিকায় বেশ কিছুদিন আছেন বলে কথাটা বলা গেল। গ্লাস নিয়ে আসার দরকার নেই। অর্জুন খায় না, অন্তত আগে খেত না বলেই জানি। মিস্টার আলাম্বার ইচ্ছে হলে বোতল থেকেই চুমুক মারবেন। মেজর দাড়ি চুলকে যাচ্ছিলেন।

অঞ্জনাদি কিন্তু যেভাবে পরিবেশন করতে হয় সেইভাবেই করলেন। মিস্টার আলাদা এক পেগ হুইস্কি নিয়ে গম্ভীর মুখে চুমুক দিলেন। মেজর পুরো গ্লাস ভর্তি করে চুমুক দিতেই সুধামাসি বেরিয়ে এলেন হাত জোড় করে।

অর্জুন আলাপ করিয়ে দিল। গ্লাস টেবিলে রেখে মেজর বললেন, আপনার রান্নার নাম শুনে ছুটে এসেছি। কিন্তু এই একটা অভ্যেস, অভ্যেসটা বল, জানি, মানে কিছু খাওয়ার আগে একটু এটা খেয়ে নেওয়া।

শুনলাম কে নাকি বোমা মেরে গাড়ি উড়িয়ে দিয়েছে।

হ্যাঁ। তবে ক্ষতি তেমন হয়নি। ইনস্যুরেন্স করা ছিল। তবে সরষে ইলিশ–।

এক মিনিট, ওসব জিনিসের স্বাদ পেতে গেলে জিভ পরিষ্কার রাখতে হয় যে! মেজর গ্লাস তুলে চুমুক দিতে গিয়ে কথাগুলো শুনে থমকে গেলেন, অ্যাঁ?

হ্যাঁ। প্রত্যেকটি জিনিসের আলাদা স্বাদ আছে। চিংড়ির স্বাদ আলাদা, আবার ইলিশের স্বাদ তার নিজের। যে মশলা পড়ছে তার নিজের স্বাদ আছে। আমার শ্বশুরমশাই রায়বাহাদুর সাহেব ওই জিনিস খেতেন। শুনলাম উনি নাকি খাবারে কোনও স্বাদ পাচ্ছেন না।

সুধামাসি বলামাত্রই গ্লাস টেবিলে নামিয়ে মেজর উঠে দাঁড়ালেন, চলুন সবাই, ডিনারে যাই। মিস্টার আলাম্বা, এক পেগ মদ তাও শেষ করতে পারছেন না!

এই রাত্রের খাওয়ার টেবিলের স্মৃতি অর্জুনের অনেককাল মনে থাকবে। একেবারে শিশুর মতো খেয়েছিলেন মেজর। ফুলকপির প্রিপারেশন এত ভাল হয়? ভাতের সঙ্গে আলু সেদ্ধ সরষের তেলে মেখে দিয়েছিলেন সুধামাসি। কাঁচালঙ্কা পাশে। তাতেই তিনি প্রথমে উদ্বুদ্ধ হন। প্রতিটি খাবার খাচ্ছেন আর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হচ্ছেন। এমনকী মিস্টার আলাম্বার হাঁড়িমুখে হাসি ফুটল যখন চিংড়িপোস্ত খেতে লাগলেন। মিষ্টিতে পৌঁছে মেজরকে রোখা গেল না। চিৎকার করে বললেন এরকম খাবার পেলে আমি মদ্যপান ছেড়ে দিতে পারি। আহা।

সুধামাসি বললেন, আজ আমার জামাই-এর জন্মদিন।

আচ্ছা! তিনি কোথায়? ওহে, অর্জুন, গলা নামিয়ে বললেন, কী যেন হয়েছে?

অ্যাক্সিডেন্ট। তবে এখন অবস্থা ভাল। হাসপাতালে আছেন। অঞ্জনাদি বললেন।

ওঁর স্বাস্থ্য চটজলদি ফিরে আসুক। জলের গ্লাস ওপরে তুলে বললেন মেজর, গলা পর্যন্ত খেয়ে ফেললাম। এখন একটা বালিশ না পেলেই নয়।

অঞ্জনাদি বললেন, বালিশ কেন? বিছানাই তৈরি।

ওঃ, এর চেয়ে সুখবর আর কী হতে পারে! এই যে আফ্রিকা বিশেষজ্ঞ, বাঙালি মেয়ের গুণ দেখতে পাচ্ছ? বাংলায় প্রশ্নটি করা বলে কিছু না বুঝে পায়েস খেতে-খেতে হাসলেন মিস্টার আলাম্বা।

কিন্তু ডিনার টেবিল থেকে উঠে মিস্টার আলাম্বা রাত্রে এবাড়িতে থাকতে চাইলেন না। তাকে ওই রাত্রে নিউ ইয়র্কে ফিরে যেতে হবেই। মেজর অনেক বোঝালেন। তাঁর তখন শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। সঙ্গে গাড়ি নেই। যদি থাকত, এত খাওয়ার পর অতদূরে চালিয়ে যেতে ইচ্ছে করত না বলে তাঁর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, উড়ে গিয়ে তাঁর ভালই হয়েছে। শেষপর্যন্ত মিস্টার আলাম্বার ইচ্ছাই মান্য করা হল। টেলিফোন করলেন অঞ্জনাদি। মিনিট তিনেকের মধ্যে ট্যাক্সি এসে গেল দরজায়। মিস্টার আলাম্বা ঘড়ি দেখলেন। প্রায় মধ্যরাত। তিনি অর্জুনকে বললেন, আপনি আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন তো?

ও কেন যাবে? মেজর আপত্তি করলেন, ও বাড়ি থেকে আমাদের পৌঁছতে চলল, আমরা একবার ওকে পৌঁছতে আসলাম, সারারাত এই চলুক আর কী।

কিন্তু মিস্টার আলাম্বার অবস্থা দেখে মায়া হচ্ছিল অর্জুনের। একেবারে নার্ভাস হয়ে গিয়েছেন। সুধামাসির সঙ্গে কথা বলে গাড়িতে উঠল অর্জুন। মিস্টার আলাম্বাকে মাঝখানে রেখে সে এবং মেজর দুদিকে বসল। ট্যাক্সিওয়ালা ঠিকানা জানতে চাইলে মেজর সেটা বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু মিস্টার আলাম্বা দ্রুত বলে উঠলেন, জ্যাকসন হাইট।

মেজর অবাক হয়ে ঘুরে তাকাতে ইশারায় জানালেন চুপ করে থাকতে।

দিনের বেলায় যে-পথ নির্জন, রাতের বেলায় সেখানে শব্দ খুঁজেও পাওয়া যাবে না। শুধু হুস-হাস গাড়ি ছুটে যাচ্ছে মাঝে মাঝে। মেজরের চোখ বন্ধ, নাক ডাকছে। মানুষটি কত অল্পে সন্তুষ্ট থাকেন।

হাডসন পেরিয়ে জ্যাকসন হাইটে ট্যাক্সি পৌঁছে গেলে মিস্টার আলাদা ভাড়া মিটিয়ে নেমে পড়লেন। মেজর তখনও ঘুমোচ্ছেন। মিস্টার আলাম্বা বললেন, ঝটপট ওকে ডাকুন? এরকম জায়গায় বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না।

মেজরকে ঘুম থেকে তুলে রাস্তায় নামাতে প্রচুর পরিশ্রম করতে হল। সোজা হয়ে দাড়িয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমি কোথায়?

জ্যাকসন হাইটে! অর্জুন বলল।

কী? এই ভিতু লোকটাকে নিয়ে মুশকিলে পড়া গেল। ট্যাক্সিটা চলে গিয়েছিল, দ্বিতীয় একটা ট্যাক্সি সামনে এসে পঁাড়াতেই মেজর চেঁচিয়ে উঠলেন, আরে শুটকি মাছ, তুমি?

আসেন দাদা, কী সৌভাগ্য। পেছনের দরজা খুলে দিল ড্রাইভার।

কোথায় ছিলা ভাই? তোমারে ছাড়াই সরষে ইলিশ খাইলাম আজ। ট্যাক্সির ভেতর শরীর চালান করে দিয়ে ইশারায় বললেন আলাম্বাকে ডেকে আনতে।

মিস্টার আলাদা একটু দূরে ঠিক লাইটপোস্টের মতো দাড়িয়ে ছিলেন। অর্জুন গিয়ে তাঁকে বলতেই এদিকে তাকালেন। অর্জুন বলল, মেজরের চেনা ট্যাক্সিওয়ালা।

শোনামাত্র দৌড়ে ফিরে এসে ট্যাক্সিতে উঠলেন তিনি। অর্জুন আশেপাশে তাকিয়ে দেখল, দৃশ্যটি দেখার মতো কেউ এখানে নেই।

ট্যাক্সি চলছিল। ড্রাইভারের সামনে রেডিয়োতে সমানে খবরাখবর এবং নির্দেশ ঘোষিত হয়ে চলেছে। ট্যাক্সিওয়ালা জিজ্ঞেস করল, এই রাইতে

জ্যাকসন হাইটে কী করতে ছিলেন? দাওয়াত ছিল নাকি?

মেজর বললেন, হ। মরণের বাসায়।

আপনি কী যে কন! ট্যাক্সিওয়ালা একটু জোরেই বলল।

হঠাৎ মিস্টার আলাদা চেঁচিয়ে উঠলেন, সাইলেন্স, সাইলেন্স প্লিজ।

কয়েক সেকেন্ড সব চুপচাপ। শুধু রেডিয়ো বেজে যাচ্ছে। ট্যাক্সিওয়ালা বলল, অ। ওই সাপের কথা। বিকাল থিকা প্রায়শই বলতেছে। পাগল।

মিস্টার আলাম্বা মেজরকে বললেন, বাড়ির সামনে ট্যাক্সি ছাড়বেন না। দূরে রেখে হেঁটে যাব আমরা। বুঝতে পারছেন?

কোনও চান্স নেই। এই ছোকরা আমার ফ্ল্যাট পর্যন্ত জানে। তবে বিশ্বস্ত। মেজর হাত নাড়লেন, অর্জুন জিজ্ঞেস করল, আপনি বাংলাদেশের?

হ। দাদার লগে অনেকবার পরিচয় হইছে। আমার নাম রতন রহমান।

এখানে ট্যাক্সি চালাতে অসুবিধে হচ্ছে না?

প্রথম-প্রথম হইত। তবে পুলিশ তো খুব ভাল, তাদের সাহায্য পাওয়া যায়। দাদারে কইছিলাম শুটকি খাওয়ামু, লইট্যা শুটকি, উনি সেটা ভোলেন নাই।

রাস্তাটা চিনতে পারছে অর্জুন। এই পথেই মেজর তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। মেজরের ফ্ল্যাট যে অট্টালিকায়, তার সামনে পৌঁছেই সে দুটো গাড়ি দেখতে পেল। গাড়িদুটো অদ্ভুতভাবে রাস্তার দুপাশে দাড়িয়ে আছে। ট্যাক্সি থামতেই দুটো গাড়ির দরজা প্রায় একসঙ্গে খুলে গেল। অর্জুনের মনে হল বিপদ সামনে। সে রতন রহমানকে বলল, বিপদ। তাড়াতাড়ি গাড়ি চালিয়ে ওদের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে যান।

রতন যে এত দ্রুত সেটা করবে, অনুমান করেনি অর্জুন। যারা গাড়ি থেকে নেমেছিল তারাও ভাবতে পারেনি। ছিটকে রাস্তার দুপাশে সরে গেল ওরা। ট্যাক্সিটা সোজা চলে এল আর-একটি বড় রাস্তায়। রতন বলল, বলেন?

অর্জুন মেজরের দিকে তাকাল। তিনি তখন ঘুমোচ্ছেন। মিস্টার আলাদা সিঁটিয়ে বসে আছেন। অর্জুন বলল, ভাই রতন, ওরা আমাদের শত্রু, ওদের হাত থেকে আমাদের বাঁচান।

তাই কন। অরা বাঙ্গালিরে চেনে না। জয় বাংলা। কী দুরন্ত গতিতে গাড়ি ঘুরিয়ে আবার ছুটে গেল রতন রহমান, তা বিশ্বাস হত না চোখে না দেখলে। দুটো গাড়ি তখন সবে চলা শুরু করেছিল, ওই গতিতে ট্যাক্সিকে ছুটে আসতে দেখে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু তার আগে নিজেরাই রেলিং-এ ধাক্কা খেল। বেরিয়ে এল ট্যাক্সিটা। মেজর চোখ মেলে বললেন, কতদূর?

একটুও চিন্তা করবেন না দাদা, আমি আছি। এইসব ফাইটিং সিন আমি হিন্দি সিনেমা দেইখ্যা শিখছি।

আরে, আরে! তুমি ছুটছ কেন? মেজর উঠে বসলেন। অর্জুন দ্রুত তাকে ঘটনাটা জানিয়ে দিল। মেজর বললেন, যাঃ বাবা! এর মধ্যে টের পেয়ে গেল?

অর্জুন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল দুটো গাড়ি প্রবল গতিতে ছুটে আসছে তাদের পেছনে। রতন তখন তার ওয়্যারলেসে বলছিল, ক্যাব নাম্বার এক্স ওয়াই জেড থ্রি নট থ্রি, হেল্প হেল্প প্লিজ। বলেই সেটা বন্ধ করে বলল, আমি লেফটে টার্ন নিয়া থামাব। আপনারা জলদি গাড়ি থিকা নামতে পারবেন?

শিওর। কিন্তু আমি ওদের ফেস করতে চাই।

ওনারা আর আসতেছেন না। পুলিশের বাঁশি শুইন্যাই ভাগছেন। পুলিশে ইলে কী সব হয় না, তাই নামতে কইলাম।

বাঁ দিকে ঘুরে গাড়ি দাঁড়াতেই ওরা দ্রুত নেমে পড়তেই রতন ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে গেল। ওরা দৌড়ে একটা কাফের মধ্যে ঢুকে পড়তেই শুনল, গুড মর্নিং সার। আপনাদের বসতে অনুরোধ করছি।

মেজর বললেন, আই অ্যাম সরি সার। কিন্তু আপনাদের টয়লেটের জন্যে এখানে ঢুকতে হল, অবশ্য যদি আপত্তি থাকে।

ওঃ, নো, নো। প্লিজ। ভদ্রলোক ডান দিকে হাত প্রসারিত করলেন। অর্জুন দেখল রাত প্রচুর হলেও কাফে একেবারে খালি নয়। ওরা তিনজনেই টয়লেটে পৌঁছলেন। একসঙ্গে দুজনের বেশি যাওয়া যাবে না। বয়স্কদের যেতে দিয়ে অর্জুনের মনে হল, তার প্রয়োজন নেই, খামোকা যাচ্ছিল। সে কাফের বাইরে যাওয়ার জন্যে পা বাড়াতে সেই মালিক অথবা ম্যানেজারের খপ্পরে পড়ল, ইটস আ নাইস মর্নিং সার। হাউ অ্যাবাউট এ কাপ অব কফি উইদ লিকার?

সরি। আই ডোন্ট ওয়ান্ট দ্যাট।

লুক সার, ইফ ইউ স্টার্ট দ্য ডে উইথ কফি–

ইটস নট ডে, ইটস মিডনাইট।

ইটস ওয়ান থার্টি এ এম। সো উই ক্যান কল ইট মর্নিং।

ঠিক তখনই দরজা ঠেলে একৰ্টি লোক এবং একজন মহিলা ঢুকলেন। দুজনেরই বেশ নেশা হয়ে গেছে বোঝা যাচ্ছিল। লোকটি মহিলার হাত ধরে একটা খালি টেবিলের দিকে যেতে-যেতে বলল, আমি জানি আমি মারা যাব। আর আমি যে এটা জানি তা কেউ জানে না।

ম্যানেজার বা মালিক হাত নাড়ল, হাই জিম, আফটার আ লং গ্যাপ।

লোকটা তার বান্ধবী বা স্ত্রীকে ছেড়ে এগিয়ে এল ম্যানেজারের কাছে, মেড মানি, লট অব মানি, ড়ু ইউ নো? চলতে চলতে লোকটা অর্জুনের দিকে তাকাতেই অর্জুন চমকে উঠল। লোকটা বলল, হেই ম্যান, আই হ্যাভ সিন ইউ সামহোয়ার। হু আর ইউ?

আই অ্যাম ইওর ফ্রেন্ড। অর্জুন হাসার চেষ্টা করল।

ওঃ। দেন জয়েন আস। কাম, কাম প্লিজ। হাত ধরে টানতে টানতে জিম অর্জুনকে নিয়ে গেল সেই টেবিলে, যেখানে মহিলা একা বসে ছিলেন। এই সময় মেজর এবং মিস্টার আলাদা টয়লেট থেকে বেরিয়ে আবার ম্যানেজার বা মানিকের খপ্পরে পড়লেন। মেজর হাত তুলে চালিয়ে যেতে বলে মিস্টার আলাম্বাকে নিয়ে অন্য একটি টেবিলে গিয়ে বসলেন।

মহিলা বললেন, ইউ আর অলরাইট, জিম?

অ্যাবসোলিউটলি। লুক, ডার্লিং, হি ইজ মাই ফ্রেন্ড।

মহিলা মাথা নাড়লেন, গ্ল্যাড টু মিট ইউ? তোমরা অনেকদিনের পরিচিত?

না, না। তিনদিন আগে আলাপ হয়েছে।

তিনদিন? মহিলা অবাক হয়ে জিমের দিকে তাকালেন, সে চোখ বন্ধ করে আছে। মহিলা বললেন, তিনদিন আগে জিম বিদেশে ছিল, তাই না জিম?

ইয়েস ডার্লিং।

আমার সঙ্গে এয়ারপোর্টে আলাপ হয়। প্রথমে হিথরোতে, পরে জে এফ কে-তে। উনি আমাকে চিনতে পারছেন না। দাড়ান, মিস্টার জিম? আমি যদি কাস্টমস অফিসারকে বলে দিতাম যে আপনি দাতের নীচে লুকিয়ে কিছু নিয়ে আসছেন তা হলে কী হত? জেলে থাকতেন এই সময়, তাই না? তা হলে না বলে বন্ধুর কাজ করেছি আমি, তাই না?।

জিম ছোট চোখে তাকে কিছুক্ষণ দেখল। হঠাৎ শরীরের সব রক্ত তার মুখে উঠে এল। এয়ারপোর্টর স্মৃতি মনে পড়ে যাওয়ায় সে বোধ হয় চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল কিন্তু অর্জুন বলল, একটা শব্দ করলে তুমি খুন হয়ে যাবে। আমার সাপ তোমাকে মারবে।

সঙ্গে-সঙ্গে ভেঙে পড়ল জিম, নো, নো। প্লিজ। আমাকে বাঁচাও। প্লিজ।

তুমি খুব খারাপ লোক। তাই না?

আমি মানছি। আমি খুব খারাপ।

এয়ারপোর্টে তোমাকে ধরিয়ে দিইনি কেন জানো? আমি বলার পর যদি ওরা তোমার মুখে ব্যাগ না পেত তা হলে আমি বেইজ্জত হয়ে যেতাম। অর্জুন বলল।

আমি ভেবেছিলাম, তুমি বলবে। তাই পেটে চালান করে দেব ভেবেছিলাম। কিন্তু ভাগ্যিস করিনি। ওরা আমার পেটের ভিতরটা পরীক্ষা করেছে, দাতের নীচটায় কেউ দ্যাখেনি। এক লাখ ডলারের মাল। আমি পেয়েছি দশ হাজার।

আমার কথা কজনকে বলেছ?

কাঁধ নাচাল জিম, উত্তর দিল না।

তুমি কি আফ্রিকান? অর্জুন জিজ্ঞেস করল।

ইয়েস। আমি মুল্যাটো। বাবার সাদা চামড়া নাকমুখ পেয়েছি।

কজনকে বলেছ আমার কথা?

শুধু বসকে। আর কাউকে বলিনি।

কে তোমার বস্? অর্জুন গলা নামাল।

প্লিজ, ডোন্ট আস্ক মি। লোকটা সরে গেল কিছুটা।

অর্জুন পকেট থেকে লকেটটা বের করে জিজ্ঞেস করল, এটার দিকে তাকিয়ে বলল, কে আমাদের খুন করতে আজ এত ব্যস্ত হয়েছে? বলো?

লকেটটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকমে জিমের মুখের চেহারা অবিশ্বাস্য রকমের বদলে গেল। সে দ্রুত মাথা নাড়তে লাগল, জানি না। জানি না।

তুমি মিথ্যে কথা বলছ।

নো। মিথ্যে বলছি না। তারপর জিম খুব জোরে মাথা নেড়ে বলল, বসকে একটা ফোন করলেই জানতে পারব।

তুমি তোমার বসকে বলবে না আমি এখানে আছি।

ঠিক আছে।

পকেট থেকে ছোট্ট রিসিভার বের করে নাম্বার ডায়াল করল জিম। কয়েক সেকেন্ড বাদে বলল, আমি জিম। বস-এর সঙ্গে কথা বলতে চাই।

ওপাশ থেকে বোধ হয় নেতিবাচক কিছু বলা হয়েছিল, জিম রেগে গেল, ইউ পিপল ডোন্ট নো হোয়াট ইজ হোয়াট। দিস ইজ মি হু গেভ ইনফরমেশন দ্যাট দ্য লকেট হ্যাজ অ্যারাইভড অ্যাট লাস্ট অ্যাট ইউ এস এ। ড়ু ইউ নো? ও, থ্যাঙ্ক ইউ! হ্যালো, ও বস, দিস ইজ জিয়। ডিড ইউ ফাইন্ড জিম? নো! আই হার্ড সামথিং, অ্যাঁ, আই অ্যাম টকিং ফ্রম এ কাফে! ছোঁ মেরে ওর হাত থেকে যন্ত্রটা কেড়ে নিয়ে অফ করে দিল অর্জুন, এমন কথা ছিল না।

মহিলা বললেন, হা, জিম, এখানকার ঠিকানা বসকে না বলার কথা ছিল।

অর্জুন উঠে দাঁড়াল, আমি তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চেয়েছিলাম, তুমি বিশ্বাসঘাতকতা করার চেষ্টায় ছিলে। এর জন্যে তুমি ঠিক সময়ে শাস্তি পাবে। অর্জুন জামার তলা থেকে লকেট বের করে দেখাল।

সঙ্গে-সঙ্গে টেবিলের ওপর শুয়ে পড়ল জিম, ওঃ নো। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করো। সাপের দেবী আমাকে মেরে ফেলবে। উনি তোমার বুকে আছেন, তোমার কথা শুনবেন।

তা হলে আমাকে সাহায্য করো। লকেটটাকে আবার জামার তলায় ঢুকিয়ে দিল অর্জুন।

কী সাহায্য চাও?

তোমার বুসকে আবার ফোন করে জিজ্ঞেস করো আমার খবর সে পেয়েছে কিনা?

বস নিশ্চয়ই খেপে গেছে। আগেরবার কথা বলতে দাওনি তুমি!

একটা কিছু বানিয়ে বলবে। যন্ত্রটা ফেরত দিল অর্জুন।

আবার জিম নাম্বার টিপল। তার পরের কথাবার্তা এইরকম, হেলো। যা, জিম বলছি। সরি বস। একটা বাজে লোক সামনে এসে গিয়েছিল। হা, সেই লোকটার খবর পেয়েছেন? ওঃ। না তবে শুনলাম আফ্রিকার কোনও একটা ব্যাপার নিয়ে মাডার হবে আজকালের মধ্যে। না, না। আমার কোনও দরকার নেই। আমি কথা বলছি রাস্তা থেকে। এই সময় কাকের ম্যানেজার অথবা মালিক এগিয়ে এসে বললেন, ইয়েস লেডি অ্যান্ড জেন্টলম্যান, আপনাদের কী ড্রিঙ্ক দেব তা যদি অনুগ্রহ করে বলেন?

জিম চট করে অফ করে দিল যন্ত্রটা। তারপর চিৎকার করে বলল, তুমি আর এখানে আসার সময় পেলে না গাধা? এর কথা শুনে বল বুঝে যাবে আমি মিথ্যে কথা বলছি। আর গলা যদি চিনতে পারে! উঃ। এখনই ঠিক খবর নিয়ে নেবে কোত্থেকে ফোন করেছি। চলো কেটে পড়ি। এখানে থাকলে মারা পড়ব আমি। মহিলাকে নিয়ে উঠে দাঁড়াল জিম। তারপর মালিক অথবা ম্যানেজারকে বলল, এই যে, কেউ যদি এসে তোমাকে প্রশ্ন করে জিম এসেছিল কিনা তা হলে বলবে এক মাস দ্যাখোনি। ড়ু ইউ অ্যান্ডারস্ট্যান্ড? ওকে বয়। নইলে মরার আগে তোমাকে মারব।

অর্জুন ওদের পেছন পেছন কাকের বাইরে চলে এল। মেজর আর মিস্টার আলাম্বাও বেরিয়ে এলেন। অর্জুনকে দেখে জিম বিরক্ত হল, আঃ, তুমি কোথায় যাচ্ছ?

তোমার সঙ্গে?

কেন?

তোমার বসকে জিজ্ঞেসু করব কেন আমাদের খুন করার চেষ্টা হয়েছে?

ওঃ। বস এখনও তোমার সন্ধান পায়নি। হয়তো অন্য কাউকে মারতে গিয়ে, বুঝতেই পারছ, অ্যাকসিডেন্টালি—! আমাদের ছেড়ে দাও।

তুমি কোথায় থাকো? আমি তোমার ক্ষতি করব না, প্রমিস।

ক্ষতি তুমি ইচ্ছে করলেই করতে পারো।

এই সময় মেজর একটা ট্যাক্সি ডাকলেন, অর্জুন, এবার বাড়ি যাব।

অর্জুন জিমকে বলল, তুমি, তোমরা আমাদের সঙ্গে যেতে পারো।

জিম মহিলার দিকে তাকাতেই মহিলা তাঁর ব্যাগ খুলে একটা কার্ড বের করে এগিয়ে দিল অর্জুনকে, এটা আমার ঠিকানা। আমাকে ফোন করলেই আপনি জিমের খবর পেয়ে যাবেন। ও ওর বসকে ভয় পাচ্ছে। আমাদের আলাদা যাওয়াই উচিত।

কার্ড নিয়ে অর্জুন ট্যাক্সিতে উঠল। গাড়িটা সামান্য গতি নিয়েছে কি নেয়নি, পেছনে গুলির আওয়াজ হল। অর্জুন দেখল জিম মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, মহিলা হতভম্ব। রাজপথ শূন্য। দৃশ্যটা চোখের আড়ালে চলে গেল ট্যাক্সি বাঁক নিতেই।

মেজর বললেন, কী হল?

মিস্টার আলাম্বা ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন কোনও গাড়ি অনুসরণ করছে কিনা! নিঃসন্দেহ হয়ে তিনি বললেন, আমরা প্রধান দরজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকব না!

তা হলে? মেজর অবাক হলেন।

পেছনের দরজাটা দিয়ে দোতলায় আসা যায়। ওখানে লিটু, ওঃ, ওখানে আবার লিট থামে না। দোতলা থেকে তিনতলায় ওঠার সিঁড়িও নেই। কী হবে?

আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আছি।

কিছু মনে করবেন না মেজর, এই সময়টুকু যদি দয়া করে না ঘুমোন।

ঠিক আছে, ঠিক আছে।

একেবারে বাড়ির দরজায় এসে ট্যাক্সি ছেড়ে দেওয়া হল। এই মুহূর্তে যে-কোনও দিক থেকে গুলি ছুটে আসতে পারে এমন সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে ওরা দ্রুত চলে এল বাড়িটির সিঁড়িতে। অর্জুন দেখল, আগে মিস্টার আলাদা, তাঁর পেছনে মেজর, ভূতে তাড়া করলে মানুষ যেভাবে ছোটে বলে গল্পে পাওয়া যায়, সেইভাবে ছুটছেন। কাচের দরজা ঠেলে লিটের সামনে পৌঁছে মেজর একটু ধাতস্থ হলেন চেনা পরিমণ্ডল পেয়ে, হ্যাঁ, কত রাত হল? উঁঃ অনেক হয়েছে। অ্যাদ্দিন কোনও চার্ম ছিল না লাইফে। বুঝলে অর্জুন? মাংসের ঝোল উইদাউট সল্ট! ওহে, সর্ষে ইলিশটা দারুণ ছিল হে। তা আজ রাত্রে বেশ জমকালো ব্যাপার ঘটল। লোকটা মরে গেল নাকি?

কোন লোকটা?

ওই যে কাফের ভেতর যার সঙ্গে কথা বললে। বেরিয়ে এসেও–।

বুঝতে পারছি না। লিফট এসে গেল। মেজর বললেন, চলো, যতক্ষণ ঘুম না আসছে এ নিয়ে গল্প করা যাক?

কিন্তু নিজের ফ্লোরে লিফট দাঁড়ানোমাত্র মিস্টার আলাম্বা অর্জুনের হাত চেপে ধরলেন, প্লিজ, আমার সঙ্গে এসো। আমি একা থাকতে সাহস পাচ্ছি না।

মেজর বললেন, এখানে কে আসতে সাহস পাবে?

পেতে কতক্ষণ? ওরা কী করে জানল আপনার গাড়িতে আমি বসে আছি?

তা অবশ্য। কিন্তু এ বাড়ির সিকিউরিটি, লিফটে উঠবে কী করে কার্ড পাঞ্চ না করলে? তবু বলছেন যখন, আচ্ছা, অর্জুন গুড নাইট। মেজর নিষ্প্রভ গলায় বললেন।

অর্জুন বলল, আপনিও আসতে পারেন মেজর।

না, না। আমার অত ভয়ডর নেই। সেবার একদল ম্যানইটারের সঙ্গে পাঁচ ঘণ্টা একা ছিলাম। ড়ু ইউ নো? তা ছাড়া যার ফ্ল্যাট তিনি না বললে যাই কী করে?

তা ঠিক। আচ্ছা, গুড নাইট। অর্জুন লিফট থেকে নেমে দাঁড়াতেই লিফট ওপরে চলে গেল। মিস্টার আলাম্বা জিজ্ঞেস করলেন গলা নামিয়ে, সঙ্গে অস্ত্র আছে?

না নেই। কেন?

আমার সঙ্গে আছে। কিন্তু উত্তেজিত হলেই আমি নার্ভাস হয়ে পড়ি, হাত কাঁপে? ডান দিক বাঁ দিক হয়ে যায়। পকেট থেকে একটা ছোট পিস্তল বের করে অর্জুনকে দিলেন তিনি, আমার ভয় হচ্ছে, ওরা আগেভাগে ফ্লাটে ঢুকে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। তুমি কি ভারতবর্ষে জেমস বন্ডের কোনও ছবি দেখেছ?।

দেখেছি। অর্জুন হাসল।

ফলো হিম। জেমস যেমন করে সতর্ক ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকত ঠিক তেমনিভাবে তুমি ঘরে যাও। পরীক্ষা করো কেউ আছে কি না। মিস্টার আলাম্বা দরজা নিঃশব্দে চাবি ঘুরিয়ে খুলে দিলেন।

কোথাও কোনও শব্দ নেই। অর্জুনের মনে হচ্ছিল মিস্টার আলাম্বার সন্দেহ করা নিরর্থক নয়। দেওয়াল ঘেঁষে ভেতরে ঢুকে সে যখন আলো জ্বালতে পারল তখন কয়েক মিনিট চলে গিয়েছে। ফ্ল্যাটে নেউ নেই। দরজা ভাল করে বন্ধ করে মিস্টার আলাম্বা বললেন, আর কোনওদিক থেকে খুনি এখানে ঢুকতে পারবে না, শুধু বাথরুমের ওই জানলাটা ছাড়া। বড্ড পলকা, জোরে ধাক্কা দিলেই ভেঙে যাবে।

অর্জুন সেদিকে উঁকি মেরে দেখল অনেক নীচে রাস্তা। অর্থাৎ এদিক দিয়ে ওপরে উঠে আসার কোনও পথ নেই। মিস্টার আলাম্বাকে আশ্বস্ত করল সে।

বাইরের ঘরের সোফায় শুয়ে পড়া পছন্দ করল অর্জুন। মিস্টার আলাম্বার এতে আপত্তি ছিল। শেষ পর্যন্ত তর্ক না করে বালিশ চাদর এনে ব্যবস্থা করে দিলেন। তারপর গুডনাইট বলার আগে পিস্তল ফেরত চাইলেন, আসলে ওটা বালিশের নীচে না নিয়ে আমি ঘুমোতে পারছি না।

আলো নিভিয়ে নিজের ঘরে মিস্টার আলাম্বা ফিরে গেলেন। এই ফ্ল্যাটের সর্বত্র আফ্রিকার শিল্পনিদর্শন ছড়ানো। অন্ধকারেও মনে হচ্ছিল সে আজ আফ্রিকাতেই আছে। অর্জুনের খেয়াল হল মিস্টার আলাম্বা অনেকক্ষণ আর লকেট নিয়ে কোনও কথা বলছেন না। এটা চাইবার সময় ওঁর মধ্যে যে আকৃতি দেখতে পেয়েছিল তা উধাও হয়ে যাবে এত সহজে? হয়তো এই ভয় পাওয়ার কারণে তাকে এখানে শুতে বলা এটার পেছনে ওই লকেট-প্রাপ্তির আকাঙক্ষা কাজ করছে? কোনও বিশেষ কিছু সংগ্রহ করা যাদের নেশা তারা খুব খ্যাপাটে হয়। না-হলে রাজার চারমাথাওয়ালা একটা কয়েন ভুল করে মিন্ট থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল আর সেটির দর উঠেছিল এক কোটি পাউন্ড?

অর্জুন লকেটটাকে গলা থেকে খুলে বের করল। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে টেবিলের একপাশে দাঁড় করানো কাঠখোদাই করা একটি আফ্রিকান কলসির মধ্যে সেটা ঢুকিয়ে রাখল। গলা থেকে সেটাকে খুলতেই কীরকম অস্বস্তি আরম্ভ হল। অর্জুন হেসে ফেলল, তার মধ্যেও ওই আদিম ভাবনাচিন্তা ঢুকে পড়েছে নাকি লকেট পরার পর? সোফায় শুয়ে তার মনে পড়ল জিমের কথা। লোকটা মরে গেল নাকি? এত তাড়াতাড়ি ওকে বিশ্বাসঘাতক চিহ্নিত করে খুঁজে পেয়ে গেল ওরা? কী এফিশিয়েন্ট অর্গানাইজেশন। জিম এই লকেটটাকে প্রবল ভক্তি করেছে। ওর বান্ধবী সাদা মেয়ে, তার মধ্যে ওসব ভক্তিটক্তি দেখা যায়নি। কিন্তু এই আমেরিকার কিছু মানুষ যে লকেটটার ব্যাপারে ক্রমশ উন্মাদ হয়ে উঠছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এখন কী করা যায়? সুধামাসিকে পোঁছে দিতে এসেছিল সে। এখনও হাসপাতালে গিয়ে ওঁর জামাইয়ের সঙ্গে দেখা করা হয়নি। খুব অভদ্রতা হয়েছে এটা। সুধামাসিকে সময় না দিয়ে এসব গোলমালে না জড়িয়ে পড়ে লকেটটাকে নিউ ইয়র্কে মিউজিয়ামে জমা দিয়ে দেওয়াই ভাল।

হঠাৎ নিশ্বাসের কষ্ট হতে আরম্ভ করল। বাতাস ভারী হয়ে গেছে খুব। এ-ঘরের ভেন্টিলেশন কি এত খারাপ? অর্জুন ওঠার চেষ্টা করতে লাগল। তীব্র একটা গন্ধ নাকে ঢুকছে। কীসের গন্ধ। তার মাথা ঘুরতে লাগল। অন্ধকারে চারপাশে তাকিয়ে সে কিছুই দেখতে পেল না। এবং এই দেখার সক্রিয় ভাবনাটাও আচমকা মাথা থেকে বেরিয়ে গেল। অর্জুন শুয়ে পড়ল। সোফায়। তার জ্ঞান ছিল না।

টেলিফোনের আওয়াজে ঘুম ভাঙল। ভাঙল বটে, কিন্তু সমস্ত শরীরে তীব্র আলস্য এবং মাথায় টিপটিপে যন্ত্রণা অর্জুনকে কাহিল করে দিচ্ছিল। সে উঠে গিয়ে রিসিভার তুলতেই অজানা অচেনা ভাষায় একটি নারীকণ্ঠ কিছু বলল। একবর্ণ না বুঝতে পেরে অর্জুন ইংরেজিতে বলল, আপনি কাকে চাইছেন?

এবার মেয়েটি জানতে চাইল, এটা মিস্টার আলাম্বার ফ্ল্যাট, আশা করি।

হ্যাঁ।

ওঁকে বলুন সিম্বা এসেছে।

অর্জুন টেলিফোন রেখে ভেতরের ঘরে গেল। দুটো ঘর। একটি ঘরে শিল্পসংগ্রহের প্রদর্শনী, অন্যটিতে মিস্টার আলাদা থাকেন। তাঁর দরজায়

দাঁড়িয়ে সে বলল, মিস্টার আলাম্বা, ফোন আছে আপনার?

ফোন? অসম্ভব। আমাকে কেউ ফোন করবে না।

মেয়েটি বলছে ওর নাম সিম্বা।

ও, সিম্বা। সিম্বা আমার মেয়ে। ও বোধহয় নীচ থেকে ফোন করছে। দেখছি আমি। মিস্টার আলাম্বাকে খুশি-খুশি দেখাল।

কেউ নীচের গেটে এসে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের বোতাম টিপলেই রিসিভার আওয়াজ করে। তখন ফোনে নিজের পরিচয় দিলে যার কাছে এসেছে সে রিমোট টিপলে নীচের দরজা খুলে যায়। লিফট চালু হয়। দ্বিতীয়বার বোতাম টিপলে যে-ফ্লোরে লিফট দাঁড়াবে তার দরজা খোলে। কত সহজে ঝামেলা এড়িয়ে যেতে পারছে ওরা। আমাদের দেশে হলে বলতে হত, দ্যাখ তো কে বেল বাজাচ্ছে। অর্জুন ভাবল, বেশিদিন নেই, এব্যবস্থা চালু হল বলে!

মিস্টার আলাম্বাই দরজা খুললেন। প্রায় অর্জুনের মাথায় লম্বা ছিপছিপে একটি কালো মেয়ে ঘরে ঢুকল। তার কাঁধে দুটো স্ট্র্যাপ দেওয়া ব্যাগ, পরনে জি। বাবা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আদর করলেন। মেয়ে ঘুরে তাকাল, আপনি আমার সঙ্গে কথা বলছিলেন?

অর্জুন মাথা নাড়ল, হ্যাঁ।

মিস্টার আলাম্বা মেয়ের সঙ্গে অর্জুনের পরিচয় করিয়ে দিলেন।

সিম্বা জিজ্ঞেস করল, কীরকম লাগল বাবার ফ্ল্যাট?

ভাল। বেশ ভাল।

রাত্রে ঘুম হয়েছিল?

হ্যাঁ। কিন্তু–!

কিন্তু? মনে হয়নি ওইসব আফ্রিকান মূর্তিগুলো জীবন্ত হয়ে আপনাকে ঘিরে ফেলছে। বিশেষ করে ওই সাপটা—? সিম্বা চোখ বড় করল।

না। তা হয়নি। কারণ শোয়ার কিছুক্ষণ পরেই একটা তীব্র গন্ধে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। অর্জুন হাসল।

জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন? সিম্বা অবাক, গন্ধে?

হ্যাঁ।

তা হলে এটা বাবার কীর্তি। আফ্রিকার জঙ্গলের অনেক কিছু বাবার সংগ্রহে আছে, মাঝে-মাঝে বাবা সেগুলো ঠিক আছে কিনা যাচাই করেন। আমি হস্টেলে থাকি। এখানে থাকলে পাগল হয়ে যেতাম। ব্যাগ টেবিলে রেখে ভেতরে চলে গেল সিম্বা।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, তা হলে আপনি পরীক্ষা করেছিলেন কাল রাত্রে?

ঠিক পরীক্ষা নয়। একটা গাঙ্কে কাঠ কিছুক্ষণ ঘষলে গন্ধ বের হয়। অনেকটা চন্দনের মতো গন্ধ, কিন্তু হাতিকেও অজ্ঞান করে ফেলে। কেনিয়াতে পাওয়া যেত আগে। কাল ভাবলাম দেখি, ওগুলো কেমন আছে?

আপনি নাকে মাস্ক পরে নিয়েছিলেন নিশ্চয়ই?

হ্যাঁ!

আর আমার কথা ভুলে গিয়েছিলেন, তাই তো?

একদম ঠিক।

আর তারপর যখন দেখলেন আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছি তখন আমার বুক থেকে লকেটটা খুলে নিতে কোনও অসুবিধে হয়নি, তাই না?

না। ভুল হল।

তার মানে?

তোমার গলায় লকেটটা ছিল না।

সে কী!

হ্যাঁ ছিল না। হয় তুমি খুলে রেখেছ, নয় কোথাও পড়ে গেছে।

খুলে কোথায় রাখতে পারি? আমি তো আপনার সঙ্গেই এসেছি।

হ্যাঁ। তাই খুব অবাক হয়ে গিয়েছি আমি। কিন্তু বিশ্বাস করো তোমাকে অজ্ঞান করে লকেট নেওয়ার কোনও পরিকল্পনা আমার ছিল না। আর কাঠ আমি ঘষেছিলাম পাশের ঘরে। এখানে ওটা করলে তুমি মারা যেতে।

অনেক ধন্যবাদ মিস্টার আলাম্বা। আমি একটা ফোন করতে পারি?

নিশ্চয়ই।

অর্জুন কার্ড বের করে নাম্বার টিপল। সেকেন্ড চল্লিশেক বাদে একটি নারীকণ্ঠ জানান দিল, ইয়েস।

মিসেস স্মিথ?

ইয়েস।

কাল রাত্রে কাফেতে আলাপ হয়েছিল। জিম কেমন আছে?

ওঃ। ও মারা গিয়েছে। আপনি কোথায়? আমার খুব দরকার। আপনি একবার আসতে পারবেন?এক্ষুনি? মহিলা কাতর গলায় বললেন।
অর্জুন বলল, আমাকে মাফ করবেন, এই মুহূর্তে আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। প্লিজ! মহিলা কাতর গলায় বললেন। দেখুন আপনি আমাকে চেনেন না, আমার সমস্ত জানেন না। একই কথা আপনার সম্পর্কে প্রযোজ্য। তাই না? অর্জুন জিজ্ঞেস করল।

ঠিকই। কিন্তু মরার আগে জিম আমাকে বলেছে আপনাকে সব বলতে। যেহেতু লকেটটা আপনার কাছে আছে তাই আপনাকে ও গুরুত্ব দিয়েছে।

কী বলতে চেয়েছে, তা আপনি জানেন?

হ্যাঁ। জানি।

আপনি পুলিশের কাছে যাচ্ছেন না কেন?

গেলে আমিও খুন হয়ে যাব। মহিলা বললেন, আমি এই ফ্ল্যাটে থাকতে ভরসা পাচ্ছি না। কীভাবে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব ভেবে না পেয়ে অপেক্ষা করছিলাম যদি জিমের খবর জানতে আপনি এখানে ফোন করেন। আমি এখনই আমার এক মাসির বাড়িতে চলে যাচ্ছি।

আমার নাম অর্জুন। কোথায় যেতে হবে আমাকে?

জ্যাকসন হাইটে যে অফ ট্র্যাক বেটিং সেন্টার আছে সেটা ছাড়িয়ে গেলেই বাঁ দিকে একটা সিঁড়ি নীচে চলে গেছে। সেখানে নেমে একটা কাগজের স্টল দেখতে পাবেন। সেই স্টলে আমার নাম জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবেন মাসির ফ্ল্যাটটা কোথায়! আমার নাম তো কার্ডেই পেয়ে যাবেন।

ঠিক আছে। আমি ভেবে দেখি। অর্জুন ফোন নামিয়ে রাখল। মিস্টার আলাম্বা জিজ্ঞেস করলেন কী ব্যাপার?

জিম মারা গিয়েছে। ওর সঙ্গে যে মহিলা ছিলেন তাঁকে বলে গেছে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

সিম্বা অর্জুনের হাত থেকে কার্ড নিয়ে নামটা পড়ল, গ্যাব্রিয়েলা! শি ইজ স্প্যানিশ। ব্যাপারটা কী?

অনেক ঘটনা। মিস্টার আলাম্বার কাছে শুনে নেবেন। আমাকে এখন মেজরের ফ্ল্যাটে যেতে হবে। অর্জুন বলল।

কিন্তু তোমার লকেটটা কোথায় গেল? মিস্টার আলাদা জিজ্ঞেস করলেন। তাঁকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিল, তোমার সঙ্গে নেই যখন, তখন কি রাস্তায় পড়ে গেছে? ওইরকম লকেট তুমি অবহেলায় হারিয়ে ফেললে?

অর্জুন তাকাল। সোফার পাশে সেই খোদাই করা কাঠের কলসির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে লকেটটাকে বের করে গলায় পরে নিল, আমি খুব দুঃখিত মিস্টার আলাদা। এখানে যদি এটাকে না রাখতাম তা হলে আপনার সংগ্রহশালা আরও মুল্যবান হত এবং আমি কখনওই এটাকে ফেরত পেতাম না। বাই— অর্জুন সোজা দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।

মেজরের ফ্ল্যাটের দরজার বেলের বোতাম টিপতেই সেটা খুলল না, তিনবার বাজানোর পর ঘুম-ঘুম চোখে দরজা খুলে মেজর হাই তুললেন, এই মাঝরাতে

এসে ভোর হলে আসতে পারলে না?

অর্জুন ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখল সবকটা জানলায় ভারী পরদা টানা থাকায় বাইরের আলো একফোঁটা ঢুকছে না। সে বলল, এখন সকাল আটটা। আপনার কাছে স্পেয়ার টুথব্রাশ আছে?

আটটা? মাই গড! ওঃ, কালকের ডিনারটা আমাকে! এইজন্যেই রাত্রে লাইট ডিনার করা উচিত। আছে। টুথব্রাশ কেন, এক্সট্রা সাবান, দাড়ি কামাবার স্টিক সব পেয়ে যাবে ওখানে। মেজর দাড়ি চুলকোতে লাগলেন।

আটঘণ্টা বাদে দুজনে পরিষ্কার হয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে টোস্ট, ডিমের পোচ আর চা খাচ্ছিল। মেজর চোখ বড় করে বললেন, এ তো স্রেফ বিশ্বাসঘাতকতা। তোমাকে অজ্ঞান করে লকেট চুরি করবে আলাম্বা, এটা আমি ভাবতে পারছি না। এই পৃথিবীতে দেখছি কাউকে বিশ্বাস করা যাবে না।

ওঁর লোভ হওয়া স্বাভাবিক।

হুম্‌। মাঝে-মাঝে এমন ভঙ্গিতে কথা বলো যে, মনে হয় তুমি, কোনও তিব্বতি লামা। হাঁটুর বয়সী ছেলে তুমি অথচ একেবারে জ্ঞানবৃদ্ধ। মেজর মচমচ করে টোস্টে কামড় দিলেন, আর এইজন্যেই তোমার ফ্যান আমি।

অর্জুন বলল, আমি ভাবছি গ্যাব্রিয়েলার সঙ্গে দেখা করব।

নিশ্চয়ই করবে। ওই ব্যাটা জিম মরার আগে কী বলে গেছে সেটা না শুনলে এই টোস্ট হজম হবে না আমার।

আপনি সঙ্গে যাবেন?

তুমি তো নিউ ইয়র্কের রাস্তাঘাট কিছুই চেনো না। আমি না নিয়ে গেলে কীভাবে পৌঁছবে?

তা ঠিক। তবে আপনার বাড়ির পাশেই কাল টিউব স্টেশন দেখেছি, জ্যাকসন হাইটে, যেতে নিশ্চয়ই সমস্যা হবে না।

তারপর?

ওখান থেকে নিউ জার্সিতে ফিরবে কী করে? ওখানে তো টিউব নেই।

তা অবশ্য। কিন্তু আপনার স্ব কাজ ফেলে আমার সঙ্গে যেতে কী করে বলি? আপনার নিশ্চয়ই অসুবিধা হবে।

তা হবে। দাড়ি চুলকোলেন মেজর, আজ মিস্টার স্টিভেনসনের সঙ্গে ব্যাপারটা ফাইনাল করার কথা। ওঁর ইচ্ছে আফ্রিকার জঙ্গলে এক মাস থেকে মাকড়সাদের লাইফ ভিডিওতে তুলে আনা। আর আমি বলছি আর একবার ইয়েতি খুঁজতে হিমালয়ে যেতে। হিলারী সাহেব খুঁজে পাননি মানে এই নয় হিমালয়ে ইয়েতি নেই। না থাকলে ইয়েতি শব্দটার জন্মই হত না।

আপনার মিটিং কখন

দুপুরে।

তা হলে চলুন এখনই বেরিয়ে পড়ি।

সঙ্গে অস্ত্র আছে?

না তো!

যদি এটা ট্র্যাপ হয়? কিছুই বলা যায় না। তুমি বরং, ওই লকেটটা আমার ফ্ল্যাটে রেখে যাও। ওটা হারানো উচিত হবে না।

অর্জুন হেসে বলল, এটার কোনও মূল্য আমার কাছে নেই। তবে যেসব আফ্রিকান একে ভয় বা শ্রদ্ধা করেন তাঁদের অসম্মান আমি করছি না। অবশ্য সঠিক জায়গায় যদি এটা পৌঁছয় তার চেষ্টা করা উচিত।

কারেক্ট। এক কাজ করি। ওর ড়ুপ্লিকেট বানিয়ে নিই।

কোথায় পাবেন?

চলো।

তৈরি হয়ে ওরা যখন বেরোতে যাচ্ছে তখন দরজার ওপারে সিদ্ধাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। সিম্বা অত্যন্ত কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে বলল, আমি আমার বাবার হয়ে ক্ষমা চাইতে এসেছি। আসলে কোনও বিরল জিনিস দেখলে ওঁর মাথায় ন্যায়-অন্যায় বোধ কাজ করে না।

মেজর বললেন, এটা উনি নিজে না বলে তোমাকে কেন পাঠিয়েছেন?

বাবা আসতে লজ্জা পাচ্ছেন। সিম্বা ম্লান গসল।

অর্জুন বলল, ওঁকে বলবেন সমস্যাটা আমি বুঝেছি। কিন্তু এখন আমরা বের হচ্ছি। আপনাকে তাই ভেতরে আসতে বলতে পারছি না।

সিম্বা বলল, আমি স্পানিশ জানি।

তার মানে? অর্জুন অবাক।

যে ভদ্রমহিলার সঙ্গে তখন টেলিফোনে কথা বললেন তাঁর কাছে যদি যান তা হলে আমি সঙ্গে থাকলে উপকার হবে।

আপনি ভুলে যাচ্ছেন। ভদ্রমহিলার সঙ্গে আমি ইংরেজিতে কথা বলেছি।

ও, তাই তো! সিম্বা মাথা নাড়ল।

আর মেজর স্প্যানিশ ভালই জানেন।

সিম্বা আর কথা না বাড়িয়ে ওদের সঙ্গে লিফটে নীচে নেমে এল। বাড়ির বাইরে এসে মেজর বললেন, চলো হে, টিউব নিতে হবে।

টিউব শব্দটি কানে যেতে সিম্বা জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার? আপনারা গাড়ি নিচ্ছেন না?

মাই ডিয়ার বেবি, আমার গাড়িটাকে তোমার বাবার বন্ধুরা কাল রাত্রে বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে। মেজর ঘুরে বললেন।

ও মাই গড! সিম্বা বলল।

তোমার সঙ্গে গাড়ি আছে? মেজর জিজ্ঞেস করলেন।

হ্যাঁ। নিশ্চয়ই।

আমাদের জ্যাকসন হাইটে নামিয়ে দিতে পারবে? টিউবে উঠতে আমার খুব খারাপ লাগে। মেজর বললেন।

স্বচ্ছন্দে। আসুন। সিম্বা যেন খুশি হল।

নিউ জার্সির রাস্তায় লোকজন দেখা যায় না, কিন্তু কুইন্সের চেহারাটা আলাদা। এখন সকাল। গাড়ির ভিড় এখনও শুরু হয়নি। কিন্তু যা আছে তা কলকাতাতেও দেখা যাবে না। অর্জুনের মনে পড়ল কোনও একটা কাগজে পড়েছিল, শুধু নিউ ইয়র্কে যত গাড়ি চলে তার সংখ্যা সমস্ত ভারতবর্ষের গাড়ির সংখ্যা ছাপিয়ে গিয়েছে।

জ্যাকসন হাইটে যেখানে গাড়ি পার্ক করল সিম্বা, সেটাকে ভারতীয় পাড়া বলে মনে হল অর্জুনের। কিন্তু গাড়ি থেকে নামতেই ফুটপাথে হেঁটে যাওয়া মানুষদের বাংলায় কথা বলতে শুনে সে আরও অবাক হল। মেজর বললেন, যখনই বাংলা শুনতে ইচ্ছে করে তখনই চলে আসি এখানে। বাংলাদেশিরা এই পাড়াটা প্রায় দখল করে ফেলেছে। ওদের কম্পিটিটার হল কিছু গুজরাতি ব্যবসায়ী। ওই দ্যাখো, রয়াল বেঙ্গল রেস্টুরেন্ট, দারুণ ইলিশ মাছ রাঁধে। মুখ তুলে একটা সাইনবোর্ড দেখে অর্জুনের মন জুড়িয়ে গেল। বাংলা হরফে লেখা রয়েছে, মুক্তধারা। সমস্ত বাংলা বই এবং বাংলা গানের ক্যাসেট পাওয়া যায়।

ও টি বি অথবা অফ ট্র্যাক বেটিং সেন্টার হল জুয়া খেলার কেন্দ্র। এই পূর্ব-উপকূলে যত রেসকোর্স আছে তার রেসের ছবি এখানকার ভিডিওতে দেখানো হয়। এখন অবশ্য দোকানটি বন্ধ। ও টি বির পাশ দিয়ে খানিকটা এগোতেই চোখে পড়ল সিঁড়িটাকে। বাঁ দিক দিয়ে নীচে নেমে গেছে। অর্থাৎ গ্যাব্রিয়েলা টেলিফোনে যা বলেছে তা মিলে যাচ্ছে। মাথার ওপর দুমদুম শব্দ করে ট্রেন চলে গেল। অর্জুন বলল, এদিকে যেতে হবে।

সিম্বা ওদের সঙ্গে আসেনি। গাড়ি পার্ক করে সেখানেই থেকে গেছে। অর্জুন চেয়েছিল মেয়েটাকে ছেড়ে দিতে কিন্তু মেজর ওকে অনুরোধ করেছেন ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। মেয়েটার কথাবার্তা খারাপ নয়। অন্তত ও কোনও ক্ষতি করবে না বলেই অর্জুনের মনে হয়। অর্জুন হেসে ফেলল। সে ক্ষতির কথা ভাবছে, এখন পর্যন্ত মেয়েটা তো তাদের উপকার করেই যাচ্ছে।

নীচে নামতেই কাগজের স্টলটাকে দেখতে পেলে অর্জুন। একটি বয়স্কা মহিলা কাগজ বিক্রি করছেন। অর্জুন এগিয়ে গিয়ে বলল, এক্সকিউজ মি?

মহিলা ফিরেও তাকাল না। আর একজন খদ্দেরের সঙ্গে কথা বলতে লাগল। লোকটা কাগজ নিয়ে চলে যেতেই মহিলা আঙুল তুলে কাগজগুলো দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল। ওয়ান্ট পেপার?

নো।

দেন গেট লস্ট। মহিলা অন্যদিকে তাকাল।

এবার মেজর এগিয়ে এল, হাই। হি ইজ আস্কিং ফর গ্যাব্রিয়েলা। মেজরের উচ্চারণ আমেরিকানদের মতো জড়ানো। মহিলা চট করে তাকাল, হোয়াট ইজ হিজ নেম?

অর্জুন। মেজর একই গলায় উচ্চারণ করলেন।

মহিলা চট করে পকেট থেকে একটা কাগজের টুকরো বের করে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, সরি। শি ইজ নট হেয়ার।

হোয়ার ইজ শি?

গ্যাবি আটলান্টিক সিটিতে গিয়েছে।

হতেই পারে না। ও ওর মাসির বাড়িতে থাকবে বলেছিল।

তাই ইচ্ছে ছিল ওর। কিন্তু জানোই তো, পরিস্থিতি পালটায়। ও অর্জুনের জন্যে তাজমহল ক্যাসিনোতে অপেক্ষা করবে।

আমরা ওখানে যে যাব তা ও আশা করল কী করে? ননসেন্স!

আমি জানি না। ও বলেছে দুপুর একটা থেকে দুটো তাজমহলের এক ডলারের সট মেশিনের সামনে বসে থাকবে। এখন কেটে পড়ো।

এই খবরটা তুমি কতজনকে দিয়েছ?

তুমি কী বলতে চাও? আমি কাগজ বিক্রি করি, বন্ধুত্ব নয়। গ্যাবি আমার খুব ভাল বন্ধু। ও ওই ছেলেটার চেহারার বর্ণনা দিয়ে গিয়েছিল।

মেজর হাঁটতে শুরু করলেন, অদ্ভুত ব্যাপার! অর্জুন জিজ্ঞেস করল, জায়গাটা কোথায়? কীভাবে যাওয়া যায়?

সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হল এখানে দেখা করতে বলে মেয়েটা পালাল কেন? তোমাকে জ্বালাচ্ছে না তো।

তাতে ওর কী লাভ?

তা ঠিক। তুমি যদি না যাও তা হলে ওর কী লাভ হবে? আর গেলেই বা কী লাভ করবে ও, তাও বুঝতে পারছি না। মেজর দাড়ি চুলকে বললেন, জায়গাটা অতলান্তিক সমুদ্রের ধারে। লোকে জুয়া খেলতে যায় কিন্তু দেখার মতো জায়গা। লস ভেগাসের নাম শুনেছ? লস অ্যাঞ্জেলিসের কাছে মরুভূমির ওপর আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের জিন যেন একটা শহর বানিয়ে দিয়েছে যা দিনে ঘুমোয় রাত্রে জাগে। তারই মিনি সংস্করণ এই ইস্টকোস্টে আটলান্টিক সিটি। যেতে ঘণ্টা আড়াই লাগবে।

তাজমহল কি কোনও হোটেলের নাম?

না। ক্যাসিনোর। জায়গাটা জুড়ে শুধু ক্যাসিনো। মুশকিল হল, আমার গাড়ি নেই। বাসে অবশ্য যাওয়া যায়, কিন্তু চলো দেখি।

পার্কিং প্লেসে ফিরে আসামাত্র সিম্বা হাসল, কাজ হয়েছে?

না। মেজর দাড়ি চুলকোলেন, আমাদের একটু আটলান্টিক সিটিতে যাওয়া দরকার। দিনটা অবশ্য যাবে। তোমার কি মনে হয়, যেতে পারবে?
সিম্বা যে এককথায় রাজি হয়ে যাবে কে জানত! মেজরের প্রশ্ন শুনে বলল, গ্রেট। আমি অনেকদিন আটলান্টিক সিটিতে যাইনি। চলো, মজা করে আসা যাক।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, তোমার কোনও কাজ ছিল না?

ছিল। একটা টেলিফোন করে দিতে হবে। কাজটা খুব জরুরি নয়।

এখানে রাস্তার পাশে গাড়ি পার্ক করলে মেশিনে পয়সা ফেলতে হয়। মেশিনের কাঁটা বলে দেয় কতক্ষণ গাড়ি দ্বিতীয়বার পয়সা না ফেলে রাখা যাবে। ব্যবস্থাটা বেশ ভাল। তবে ফুটপাথের পাশে সর্বত্র গাড়ি রাখা যাবে না। দমকল যেখান থেকে জলের কানেকশন নেয় অথবা প্রতিবন্ধীদের জন্যে যে পার্কিং চিহ্ন রয়েছে সেখানে সুস্থ লোকের গাড়ি রাখা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই দ্বিতীয় জিনিসটা গতবারেও দেখেছিল, এবারেও চোখে পড়ছে। আমেরিকায় প্রতিবন্ধীদের জন্যে যে সুযোগসুবিধে রয়েছে তা সারা পৃথিবীর অনুকরণ করা উচিত। একটা রেস্টুরেন্টও শুধু সিঁড়ি বানিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। তাদের প্রতিবন্ধীদের হুইল চেয়ার সহজে ওঠার জন্যে মসৃণ ঢালু প্যাসেজ তৈরি করে রাখতে হবে। বাসে ট্রেনে তো বটেই, পার্কিং লটে প্রতিবন্ধীদের জন্যে আলাদা পার্কিং-এর ব্যবস্থা আছে। সুস্থ মানুষ গাড়ি রাখার জায়গা খুঁজে না পেলেও সেই বরাদ্দ জায়গায় গাড়ি রাখার কথা ভাবতেও পারে না।

সিম্বা গাড়ি চালাতে-চালাতে বলল, আমার বাবা জানতে পারলে খুব রেগে যাবেন। উনি কিছুতেই খুশি নন। এই যে আমি একা গাড়ি চালিয়ে শহরে ঘুরি, এটাও ওঁর অপছন্দ। উনি যাদের শত্রু বলে মনে করেন তারা নাকি আমারও ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু কেন? আমার সঙ্গে তো তাদের শত্রুতা নেই।

মেজর বললেন, জস্তুজানোয়াররা এই ভদ্রতাটা মেনে চলে খুবই, কিন্তু মানুষ বড় ভয়ানক জীব। তারা সন্তানকে মেরে বাপকে শাস্তি দিতে চায়। কিন্তু মিস্টার আলাদা যদি পছন্দ না করেন তা হলে তোমার আটলান্টিক সিটিতে যাওয়া উচিত নয়।

ওঃ নো! আমার বয়স আঠারো অনেকদিন আগে হয়ে গিয়েছে। বাবার কথা শুনলে আমাকে বেডরুমের দরজা বন্ধ করে দিন কাটাতে হয়। আমি ওটা করতে পারব না। সত্যি কথা বলছি, এখন পর্যন্ত কেউ আমাকে ভয়ও দেখায়নি। সিম্বা বলল।

হঠাৎ বাঁ দিকের একজিট নিতে বললেন মেজর। ওরা এতক্ষণ হাইওয়ে দিয়ে চলছিল। এখানকার হাইওয়েগুলো একেবারে নিয়মে বাঁধা। ড্রাইভার কতটা স্পিডে গাড়ি চালাবে সেটা পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করছে। সেটা না মানলে মোটা ফাইন দিতে হবে। হাইওয়ে ধরে এগোলে কোন-কোন জায়গা পড়বে তা রাস্তার ওপরে হোর্ডিং-এ লেখা আছে। এ ছাড়া সামনের রাস্তায় গাড়ির ভিড় জমে গেছে কিনা তাও জানিয়ে দেওয়া হয় ইলেকট্রনিক বোর্ডের মারফত। এ ছাড়া চা খাবার অথবা হোটেলের সন্ধান দেওয়া বোর্ড প্রায়ই চোখে পড়ে। আর তার গায়ে একজিট সাইন। ওই পথে তুমি হাইওয়ে থেকে বেরিয়ে যেতে পারো। মজার কথা, হাইওয়ে দিয়ে যাওয়ার সময় দুপাশে বাড়ি আছে বলে টেরই পাওয়া যায় না। এই যে সিম্বা একজিট দিয়ে খানিকটা ভেতরে ঢুকল, অমনই একটা শহর দেখতে পেল ওরা।

গাড়ি থামাতে বলে মেজর অর্জুনকে বলল, চলো আমার সঙ্গে। আর সিম্বা, ওখানে বুথ আছে, তোমার টেলিফোনের কাজটা সেরে নিতে পারো।

সিম্বা মাথা নাড়ল।

দরজা খুলে ভেতরে পা দিতেই একজন সাদা আমেরিকান কাউন্টারের ওপাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠল, গুড মর্নিং! অনেকদিন পরে দেখা হল!

মেজর কাঁধ ঝাঁকালেন, গুড মর্নিং মিস্টার টমসন। আমার হাতে সময় খুব কম। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি পুরো আমেরিকায় আপনিই এই উপকারটা করতে পারেন।

ব্যাপারটা কী?

মেজর অর্জুনকে বললেন, লকেটটা দাও।

অর্জুনের মনে পড়ল। সে লকেট খুলে কাউন্টারের ওপর রাখল। টমসন সেটা তুলে বলল, বাঃ। বেশ ভাল। মেটালটা কী? পাথর? পাথর বলে মনে হচ্ছে না। এত হালকা হবে না। কী ব্যাপার?

মেজর বললেন, এটা কী জিনিস আমারও জানা নেই। আপনি এর ড়ুপ্লিকেট বানিয়ে দিন।

কিন্তু এটা কী জিনিস না জানলে হুবহু হবে কী করে? অবশ্য এর রঙের এফেক্ট গালা দিয়ে আনা যায়।

তাই আনুন। আর একটা কথা, আপনার ফ্যাক্টরিতে কোনও আফ্রিকার মানুষ কি কাজ করে? মেজর জিজ্ঞেস করলেন।

না, কেন?

তা হলে ঠিক আছে।

কিন্তু সার, আপনি ছাঁচ তৈরি করার সময় দেবেন তো! একটাই লকেট যখন হবে তখন মোম ব্যবহার করলেই চলবে। অন্তত এক ঘণ্টা সময় দিন।

টমসন বোতাম টিপল, আর শ্যা, পঞ্চাশ ডলার দিতে হবে এর জন্যে।

মেজর রাজি হয়ে অর্জুনকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন। দূর থেকে দেখা গেল সুদৃশ্য টেলিফোন বাক্সের পাশে দাঁড়িয়ে সিম্বা কথা বলে যাচ্ছে। মেজর চাপা গলায় বললেন, আজকাল আমার সব ব্যাপারেই সন্দেহ হয়।

কীরকম?

এই যে মেয়েটা টেলিফোনে কার সঙ্গে কথা বলছে কে জানে?

ওর সঙ্গে যার কাজ ছিল তাকে জানিয়ে দিচ্ছে আজ যাবে না।

তার জন্যে এতক্ষণ কথা বলতে হয় না। ধরো, ও কাউকে জানাচ্ছে যে আমাদের নিয়ে আটলান্টিক সিটিতে যাচ্ছে গ্যাব্রিয়েলার সঙ্গে দেখা করতে। খবরটা যাকে দিচ্ছে সে হয়তো গ্যাব্রিয়েলার খোঁজে আছে। অতএব সে পেছন-পেছন গিয়ে হাজির হবে।

আপনি ভুলে যাচ্ছেন যারা গ্যাব্রিয়েলার সন্ধানে আছে তারা ওর বাবার শত্রু। ও নিশ্চয়ই তাদের সাহায্য করবে না।

সেটা অবশ্য ঠিক। হয়তো ও ওর বাবাকে বলছে।

মিস্টার আলাদা নিশ্চয়ই সেখানে যেতে সাহস পাবেন না।

তাও ঠিক। কিন্তু ওঁর ফোন যদি ট্যাপ করে ওরা?

এখানে এসব হয়?

এদেশে কী হতে পারে আর হয় না তা আমি আজও বুঝতে পারলাম না। এরা প্রেসিডেন্টের শোয়ার ঘরের ছবিও তুলে আনতে পারে।

কথা বলতে বলতে ওরা গাড়ির কাছে পৌঁছেছিল। ওদের দেখে টেলিফোন রেখে দিয়ে সিম্বা এগিয়ে এল, আমার বান্ধবী খুব রেগে গেছে।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, কেন?

ওকে ফেলে আমি আপনাদের সঙ্গে আটলান্টিক সিটিতে যাচ্ছি।

আপনার বান্ধবী কী করেন?

ও ডক্টরেট করছে। জাপানের মেয়ে।

মেজর বললেন, বাঁচা গেল!

সিম্বা জানতে চাইল, কী বললেন?

মেজর ইংরেজিতে বললেন, তুমি নিশ্চয়ই আর কাউকে এ কথা বলোনি?

না। কেন?

আমরা চাই না এই যাওয়ার কথা পাঁচজনে জানুক। তোমার বন্ধু যেহেতু জাপানি তাই তাকে নিয়ে কোনও চিন্তা নেই। আচ্ছা, এখন একটু কফি খাওয়া যাক। সামনেই ম্যাকডোনাল্ড, চলো, ওখানে যাই।

ঝকঝকে রেস্টুরেন্টে এখন একটুও ভিড় নেই। চমৎকার সাজানো কাউন্টারের পেছনে রঙিন বোর্ডে ছবির সঙ্গে খাবারের মেনু লেখা আছে। মেজর তিনটে কফি নিয়ে জানলার পাশের টেবিলে চলে এলেন। অর্জুন দেখল একটা সাদা মেয়ে দুপায়ে চাকা লাগিয়ে পাখির মতো উড়ে যাচ্ছে ফুটপাথ দিয়ে।

সিম্বা কফির গ্লাসে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, আমি কি জোর করে আপনাদের সঙ্গে এসেছি?

মেজর কফিতে চুমুক দিতে গিয়ে তাকালেন, এ-কথা কেন?

কারণ আমি কথা বলতে খুব ভালবাসি। অথচ আপনারা প্রয়োজন না হলে কথা বলছেন না বলে আমাকে চুপ করে থাকতে হচ্ছে। আপনারা জ্যাকসন হাইটে আমাকে সঙ্গে যেতে বললেন না, এখানেও তাই। কেন জানি না, আমার মনে হচ্ছে আমি জোর করে আপনাদের সঙ্গে এসেছি অথবা আপনারা আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। সিম্বা কথাগুলো বলে ব্যাগ খুলল, আমি একটা সিগারেট খেতে পারি?।

মেজর বললেন, খাও।

অর্জুন দেখল টেবিলে একটা চ্যাপটা টিনের অ্যাশট্রে আছে। সে শুনেছিল আমেরিকায় কেউ সিগারেট খায় না। সত্যি বলতে কি, সিগারেট খাচ্ছে এমন কাউকে চোখে পড়েনি তার। সে নিজে মাঝে-মাঝে সিগারেট খেলেও ঠিক করেছিল ইচ্ছে হলেও সিগারেট কিনবে না। কিন্তু সিম্বা এখানে স্বচ্ছন্দে সিগারেটে টান দিচ্ছে? ওর বয়স তো খুবই কম। সিম্বা সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়লে মেজর বললেন, দ্যাখো আমরাই তোমার কাছে লিফট চেয়েছিলাম। আটলান্টিক সিটিতে যেতে চাও কিনা সেটা আমরাই জিজ্ঞেস করেছিলাম। অতএব তুমি জোর করে সঙ্গে যাচ্ছ এমন ভাবার তো কোনও কারণ নেই। কী বলল অর্জুন?

নিশ্চয়ই। তা ছাড়া তুমি নিশ্চয়ই তোমার বাবার কাছে শুনেছ কেন আমি গ্যাব্রিয়েলার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। জিমকে যারা মেরেছে তারা ভয়ঙ্কর লোক। আমাদের সঙ্গে দেখলে তুমিও ওদের শত্রু হয়ে যেতে পারো। তাই তোমাকে দূরে রাখা ভাল।

এটা কীরকম কথা হল? গাড়িতে আমার সঙ্গে আপনারা যাচ্ছেন এটা তো ওরা দেখতেই পাবে, অবশ্য দেখতে যদি চায়। আসলে আমার বাবার ব্যবহারের জন্যে আপনারা আমাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারছেন না। ঠিক কি না? সিম্বা তাকাল।

অর্জুন হাসল, আমার জায়গায় থাকলে তোমার কী মনে হত?

সরাসরি বলতাম।

এবার মেজর বললেন, ঠিক আছে। সিম্বা, একটু তো মনে দ্বিধা ছিলই। কিন্তু তোমার কথা শোনার পর সেটা চলে গেছে।

বাবা বলেছে আপনার কাছে এমন একটা লকেট আছে যার দাম নাকি ডলার দিয়ে মাপা যায় না। আর সেই লকেটটা আফ্রিকানদের।

এদেশে আসার আগে ওই লকেটের কোনও মূল্য আমার কাছে ছিল না। ওটা আমার পরিচিত এক ভদ্রলোকের বাগানে গাছের নীচে পুঁতে রেখেছিল একজন বুজরুক। এখানে এসে শুনছি এটা খুব মূল্যবান। একদল আফ্রিকান এটা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছে। অথচ তারা এর মালিক নয়। বেশিরভাগ সরল আফ্রিকান যারা বাপঠাকুদার কাছে ওই লকেটের গল্প শুনে এসেছে তাদের কজা করতে এই লোকগুলো লকেটের দখল চাইছে। আর তোমার বাবা যেহেতু একজন সংগ্রাহক তাই তিনি আমাকে অজ্ঞান করে এটা পেতে চেয়েছিলেন।

লকেটটা কি আপনার সঙ্গে আছে?

হ্যাঁ। তবে এখানে দেখতে চেয়ো না। গাড়িতে বসে দেখতে পারো।

কেন? এখানে তো কোনও লোকজন নেই।

না। কাউন্টারে যে ছেলেটি অডার নিচ্ছে সে কালো ছেলে।

সিম্বা ঘাড় ঘুরিয়ে কাউন্টারের দিকে তাকাল, দুর। ওর বাবা মায়ের কেউ স্প্যানিশ নিশ্চয়ই। কোনওদিন আফ্রিকায় গিয়েছে বলে মনে হয় না।

হতে পারে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না।

এর পর মেজর অন্য প্রসঙ্গ তুললেন। ওঁর বিভিন্ন অভিযানের গল্প শুনলে সময় চমৎকার কেটে যায়। অর্জুনের সেসব শুনলেই মনে হয় ঘনাদা বা টেনিদার মুখে গল্প শুনছে। এমন সব উদ্ভট ঘটনা যে মেজর ঘটাতে পারেন বিশ্বাসই হয় না!

ঠিক এক ঘণ্টা বাদে ওরা ম্যাকডোনাল্ড থেকে বেরিয়ে দোকানটার দিকে এগোল। সিম্বা বলল, তোমরা একটু অপেক্ষা করবে? আমি টয়লেটে যাব।

মেজর বললেন, তা হলে তুমি গাড়ির কাছে চলে এসো, আমরা ওই দোকানটা থেকে ঘুরে আসছি।

সিম্বা চলে যেতে মেজর বললেন, বাঁচা গেল! লকেটের ব্যাপারটা তৃতীয় কারও না জানাই ভাল। ওকে অবিশ্বাস না করেও বলছি।

মিনিটপাঁচেক অপেক্ষা করতে হল। টমসন দুটো লকেট কাউন্টারের ওপর রেখে বললেন, দ্যাখো, কাজ দ্যাখো। আর কেউ এমন কপি করতে পারবে না।

অর্জুন দেখল নতুনটা অবিকল আগেরটার মতো। শুধু একটু বেশি চকচকে। সে দুটো লকেট হাতে তুলেই পার্থক্যটা বুঝতে পারল। নতুনটা বেশি হালকা। কথাটা বলতেই টমসন মাখা মাড়লেন, ইস্পসিবল। ওটা এক ধরনের পাথর। ওই পাথর আমি কোথায় পাব? ওজনের পার্থক্য তো হবেই। কিন্তু হাতে না নিলে কেউ ওই তুফাতটা বুঝতে পারবে কি?

অর্জুনের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও মেজর পঞ্চাশ ডলার পেমেন্ট করলেন। অর্জুন লক্ষ করল টমসন এর জন্যে কোনও রসিদ দিল না। এদেশে এটা চলে? মেজর বললেন, টমসনের লকেটটা তুমি গলায় পরে নাও।

ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে অর্জুন আসল লকেটটাকে পকেটে ঢোকাল।

গাড়ির দিকে যাওয়ার সময় মেজর বললেন, ওটা পকেটে রাখা বোধ হয় ঠিক হবে না। গাড়িতে উঠে তোমার মোজার মধ্যে ঢুকিয়ে রেখো।

মোজার মধ্যে?

আপাতত ওটাই নিরাপদ জায়গা।

সিম্বা স্টিয়ারিং-এর সামনে বসে ছিল। এবার মেজর সামনে বসলেন। পেছনের সিটে বসে অর্জুন গলা থেকে লকেটটাকে খুলে সিম্বাকে দিল, সাবধানে দ্যাখো। কেউ যেন টের না পায়।

সিম্বার চোখ বড় হয়ে গেল, আঃ। ফ্যান্টাস্টিক। এর দাম অনেক।

তোমার মনে কোনও প্রতিক্রিয়া হচ্ছে না?

না তো। আমি তো ওসব গল্প শুনিনি। লকেটটা আমি পরতে পারি?

না। ওটা ঠিক হবে না।

প্লিজ। আটলান্টিক সিটিতে পৌঁছবার আগেই ফিরিয়ে দেব।

অর্জুন কিছু বলল না। গাড়ি চলতে শুরু করলে সে পকেট থেকে আসল লকেট বের করে সন্তর্পণে ডান পায়ের মোজার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখল। একজিট দিয়ে হাইওয়েতে পৌঁছতেই কাণ্ডটা ঘটল। পেছন থেকে একটা গাড়ি এমন জোরে ছুটে এল যে, সিম্বা কোনওমতে বাঁ দিকে সরে না গেলে ভয়ঙ্কর অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যেত। ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে সিম্বা বলল, মাই গড! লোকটা কি পাগল? আর একটু হলে…! তারপর বুক থেকে লকেটটা বের করে বলল, এটা আমাদের বাঁচিয়ে দিল বোধ হয়, তাই না?
আটলান্টিক নগর। এমন বিস্ময়কর জায়গা এর আগে দ্যাখেনি অর্জুন। আসার পথে, নগর যখন এসে পড়েছে তখন রাস্তার দুপাশে ছোট-ছোট মোটেল অথবা হোটেলের বিজ্ঞাপনে যে আমন্ত্রণ, তা এমন কিছু আকর্ষক নয়। কিন্তু দূর থেকে সারি-সারি রঙিন উঁচু বাড়িগুলো পলকেই চোখ টেনে নেয়। মেজর বলছিলেন, সন্ধের পর এখানে আলোর খেলা শুরু হয়ে যায়। নানা রঙের আলোর ফোয়ারা আকাশে ছিটকে ছিটকে ওঠে হেকিন্তু জায়গাটা ভয়ঙ্কর।

সিম্বা গাড়ি চালাচ্ছিল। বাংলা ও বুঝতে পারছে না এবং মেজর তা নিয়ে একটুও মাথা না ঘামিয়ে মাতৃভাষায় বলে যাচ্ছিলেন।

ভয়ঙ্কর কেন? অর্জুন জানতে চাইল।

ওই যে বাড়িগুলো দেখছ, ওগুলো হল ক্যাসিনো। প্রতিটি ক্যাসিনোর বিভিন্ন তলায় জুয়ো খেলার ব্যবস্থা আছে। হরেকরকম জুয়ো। লোকে এখানে তাই আসে। যে কখনও জুয়ো খেলেনি সে-ও এখানে এলে লাক ট্রাই করে। কিন্তু দশ হাজারে একজন হয়তো হাজার ডলার জিতে ফিরে যায়। তা হলে বাকি নহাজার নিরানব্বই জনের পকেট খালি হয়ে যায় এখানে। বুঝতে পারছ? মেজর নড়েচড়ে বসলেন।

তাজমহলের কথা বলা হয়েছিল সিকে। সে পেছনের রাস্তা দিয়ে গাড়ি নিয়ে এল যেখানে, সেখানেই পার্কিং লটে ঢোকার পথ। ওদের ওখানেই গাড়ি ছেড়ে দিতে হল। গেটের মুখের গুমটি থেকে সিম্বাকে একটা রসিদ দিয়ে ওদের লোক গাড়ি চালিয়ে নিয়ে চলে গেল। সিম্বা বলল, এখানে পার্কিং ফি লাগে না।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, কেন?

ওরা ধরে নেয় যে গাড়ি রাখছে সে এখানেই গ্যাম্বলিং করবে। তাই এটুকু সুবিধে তাকে দেওয়া দরকার। সিম্বা হাসল, কিন্তু আমরা আগে ক্যাসিনোতে ঢুকব, না সমুদ্র দেখব? সমুদ্র দেখতে আমার খুব ভাল লাগে।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, সমুদ্র এখান থেকে কতদূরে?

মেজর বললেন, দুপা হাঁটলেই দেখতে পাবে।

ওরা ক্যাসিনোর পাশ দিয়ে এগিয়ে আসতেই একটু উচু চওড়া রাস্তা দেখতে পেল। রাস্তাটা নির্জন। আর সেই রাস্তায় পা দিতেই অর্জুন বলে উঠল, বাঃ।

সামনেই সমুদ্র। রাস্তার ঠিক উলটোদিক থেকে বালি নেমে গিয়েছে জলে। স্থির সবুজ জল চুপচাপ নিঃসাড়ে পড়ে রয়েছে যেন। একটুও ঢেউ নেই, কোনও গর্জন নেই। তাই এত কাছে এসেও এই সমুদ্রের অস্তিত্ব টের পায়নি অর্জুন। সে জিজ্ঞেস করল, এই অতলান্তিক?

ইয়েস মাই বয়। মেজর গদগদ গলায় বললেন!

কিন্তু আমি পড়েছিলাম অতলান্তিক খুব ভয়ঙ্কর। প্রচণ্ড ঢেউ। এ তো দেখছি একেবারে দিঘির মতো শান্ত। অর্জুনের গলায় বিস্ময় চাপা ছিল না।

মেজর বললেন, এখন বোধ হয় ভাটার সময়। রাত্রে একবার দেখেছি প্রচণ্ড গর্জন করছে ঢেউগুলো। সমুদ্রের তো অনেক রূপ থাকে।

অর্জুন দেখল, রাস্তা থেকে কাঠের লম্বা একটা প্ল্যাটফর্ম চলে গিয়েছে সমুদ্রের গায়ে। সেখানে সিঁড়ি দিয়ে নেমে নৌকোয় চড়ার ব্যবস্থা আছে। সিম্বা জিজ্ঞেস করল, আমি যদি একটু বোটিং করি তা হলে নিশ্চয়ই তোমরা আপত্তি করবে না?

অর্জুনেরও ইচ্ছে করছিল কিন্তু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে মাথা নাড়ল, ঠিক আছে। তুমি যাও। আমরা পরে তোমাকে ডেকে নেব।

সঙ্গে সঙ্গে সিম্বা পাখির মতো পা ফেলে হাঁটতে শুরু করল প্ল্যাটফর্মের দিকে।

তাজমহল ক্যাসিনোর সঙ্গে সাজাহানের তাজমহলের কোনও মিল নেই। কিন্তু দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে অর্জুনের মনে হল কুবেরের বাড়িতে চলে এসেছে। চারপাশে বৈভবের ছড়াছড়ি। নানা রঙের আলোয় ভেতরটায় হাজার দেওয়ালি একত্রিত। পরপর স্লট মেশিনগুলো লাইন দিয়ে সাজানো। তাদের সামনে টুলে বসে এইসময়েও টুরিস্টরা খেলে যাচ্ছেন। সে একটি মেশিনের সামনে দাড়িয়ে খেলা দেখল। মেশিনটির ওপর লেখা রয়েছে, পঁচিশ সেন্ট। যিনি খেলছিলেন তিনি একটা চাকতি গর্তে ফেলে হ্যান্ডেল ধরে টানছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সামনের কাচের নীচে নম্বরগুলো বাই বাই করে ঘুরতে-ঘুরতে স্থির হয়ে গেল। পাশের ফ্রেমে ছবি টাঙানো রয়েছে। কোনও-কোনও নম্বর অথবা ছবি যদি পাশাপাশি আসে তা হলে ওই এক চাকতির বিনিময়ে কত ডলার পাওয়া যাবে তা ওখান থেকে জানা যাচ্ছে। পঁচিশ সেন্টের মেশিন যখন, তখন এক ডলার দিলে চারটে চাকতি পাওয়া যাবে এদের কাউন্টার থেকে। অর্জুন দাড়িয়ে দেখল, লোকটা দশটা চাকতি ফেলল কিন্তু কোনও ডলার পেল না।

ওরা আর একটু পা ফেলতেই চারধার থেকে ঝনঝন শব্দ ভেসে এল। জলতরঙ্গের সুর বাজছে বিভিন্ন মেশিন থেকে। ঝনঝনিয়ে কয়েন পড়ছে মেশিন থেকে। কেউ এক ডলার, কেউ পঞ্চাশ। অর্জুন দেখল প্রাপ্তিতে উল্লসিত নয় অনেকেই। কী নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কয়েন পড়া শেষ হলে সেগুলোকে একটা ছোট প্লাস্টিকের বাকেটে ঢেলে আবার নতুন করে খেলা শুরু করছে তারা। এদের বোধ হয় অল্পে খুশি হওয়ার দিন চলে গিয়েছে। লোকগুলোর জন্যে কীরকম মায়া হচ্ছিল অর্জুনের। পেয়েও যারা আনন্দ করতে ভুলে যায় তাঁরা কীজন্যে বেঁচে থাকে?

ক্যাসিনোর বিশাল হলঘরটিতে অনেক ধাপ। স্লট মেশিনে যেমন খেলা চলছে, তেমনই বসেছে তাসের আসর। সেখানে চড়া হারে জুয়ো খেলা হচ্ছে। সেদিকটায় গেল না অর্জুন। একটা বড় বোর্ডকে ঘিরে বেশ ভিড়। বোর্ডের ভেতর চাকা ঘুরছে। চাকার গায়ে একটা লম্বা হাতল। ঘুরতে ঘুরতে চাকাটা স্থির হলে হাতলটি যে নম্বরের ওপর পৌঁছবে সেই নম্বরে যারা বাজি ধরেছিল তারা ডলার পাবে। মেজর অর্জুনের হাত ধরে টেনে ইশারা করতে সে দেখল বিশাল লম্বা একটি লোক ময়লা পাজামা আর ঝুল পাঞ্জাবি ধরনের জামা পরে কোনওদিকে না তাকিয়ে হেঁটে আসছে। তার দুপাশে সুট পরা দুটো লোক এবং পেছনে ব্যাগ হাতে একটি মানুষ হেঁটে আসছে তাল রেখে। কোনওদিকে না তাকিয়ে লোকটা যে মেশিনের সামনে গিয়ে দাড়াল তার ওপর লেখা একশো ডলার। অর্থাৎ ওখানে এক-একটি একশো ডলারের চাকতি ফেলতে হবে। লোকটি হাত বাড়াতেই ব্যাগ হাতে সহকারী কয়েকটা চাকতি বের করে সেই হাতে রাখল। লোকটি সেই চাকতি মেশিনে ফেলে হ্যাণ্ডেল ঘোরাল। ভেতরের নাম্বারগুলো পাক খেল কিন্তু কোনও লাভ হল না। অর্জুন দেখল দশবার চাকতি দেওয়ার পরও যখন মেশিন থেকে কিছু বেরিয়ে এল না, তখন লোকটি অন্যদিকে এগিয়ে গেল। বাকিরা যে তার দেহরক্ষী এবং সেক্রেটারি তা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না। কয়েক মুহূর্তে হাজার ডলার চলে গেলেও লোকটির কোনও কিার হল না, অথচ ওর পোশাক মোটেই ধোপদুরস্ত নয়।

মেজরও ভদ্রলোককে দেখছিলেন। চলে যাওয়ার পর বললেন, সত্যিকারের ধনী মানুষেরা পোশক সম্পর্কে কীরকম উদাসীন হয়, দেখলে?

দেখলাম।

এইজন্যেই বলে শূন্য হাঁড়ি থেকে বেশি শব্দ হয়।

অর্জুন এসব কথায় কান দিচ্ছিল না। একশো ডলারের মেশিন আছে মানে সেখানে খেলার লোকও আছে। জলপাইগুড়িতে কালীপুজোর রাত্রে ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ কঁচা টাকা হাতে পেয়ে জুয়ো খেলে। বিশ পঞ্চাশ হাজার টাকা খেলতে তাদের দ্বিধা হয় না। এই লোকটার কাছে একশো ডলারের মূল্য একশো টাকার বেশি নয়। তবে যারা কষ্ট করে রোজগার করে তারা অবহেলায় টাকা ওড়ায় না। এই লোকটার রোজগার নিশ্চয়ই সাদা পথে নয়। এটুকু ভেবেই হেসে ফেলল অর্জুন। অন্যের ব্যাপারে অযথা সে মাথা ঘামাচ্ছে। সে এই ক্যাসিনোতে এসেছে যে কাজে, সেটাই এখনও করা হয়নি।

মেজরকে সেকথা মনে করিয়ে দিতেই খোঁজা আরম্ভ হয়ে গেল। স্লট মেশিনের ভিড়ে খুঁজে পাওয়াও মুশকিল। শেষপর্যন্ত ওরা এক ডলারের মেশিনগুলোর সারিতে ভদ্রমহিলাকে টুলের ওপর বসে থাকতে দেখল। দূর থেকে তাদের দেখেই মহিলা উঠে দাঁড়ালেন। ওঁর মুখ দেখে বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না যে, উনি একটু ধন্দে আছেন।

অর্জুন এগিয়ে গিয়ে বলল, আমি অর্জুন, আপনি নিশ্চয়ই গ্যাব্রিয়েলা?

ভদ্রমহিলার মুখে হাসি ফুটল, হ্যাঁ। আপনাদের আমি খুব কষ্ট দিলাম। এই এতদূরে টেনে আনা খুব অন্যায়। কিন্তু আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আপনাদের নিশ্চয়ই খুব অসুবিধে হয়েছে।

মেজর বললেন, তা তো হয়েছেই। আপনি টেলিফোনে অর্জুনকে বললেন জ্যাকসন হাইটে যেতে, সেটা আমার বাড়ির কাছে। কিন্তু আটলান্টিক সিটি ইজ টু ফার।

অর্জুন বলল, না, না। এখানে না এলে এসব ব্যাপার অজানাই থেকে যেত। এখন গ্যাব্রিয়েলা, আপনি কী বলতে ডেকেছেন সেটা বলতে পারেন।

গ্যাব্রিয়েলা চারপাশে তাকালেন। তারপর বললেন, এখানে নয়। সমুদ্রের ধারে একটা রেস্টুরেন্টে বসে কথা বলব, চলুন।

ভদ্রমহিলা আগে আগে হাঁটতে লাগলেন। মেশিনগুলোর পাশ কাটিয়ে মূল দরজার দিকে এগোনোর সময় মেজর বললেন, আবার বাইরের রেস্টুরেন্টে যাচ্ছি কেন? ক্যাসিনোর ভেতরের রেস্টুরেন্টে অর্ধেক দামে খাবার পাওয়া যায়।

অর্জুন বলল, সে কী!

শুধু তাই? এদের হোটেলে থাকলে একশো ডলারের ঘর চল্লিশ ডলারে পাওয়া যায়। এমনি এমনি এত শস্তা কেউ দেয়? দিচ্ছে তুমি এখানে জুয়ে খেলবে বলে।

কিন্তু জুয়ো খেলে কেউ যদি জিতে যায়?

এইসব মেশিন কম্পিউটারের নির্দেশে চলে। কম্পিউটার ঠিক করে রাখে কখন কত ডলার মেশিন থেকে বের হবে। ভাগ্যবানদের সংখ্যা ধরে নাও কুড়ি <জারে একজন, যে বড়জোর হাজার ডলার পেতে পারে। এখানে ঢুকলে জিতে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ব্যাপারটা কী বলো তো? ভদ্রমহিলা বললেন আর আমরা এতদূরে চলে এলাম। ওঁর হাবভাবে কীরকম রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি। মেজর নাক টানলেন।

উনি কী বলবেন তা না শুনলে ব্যাপারটা বুঝব কী করে?

ক্যাসিনো থেকে বেরিয়ে ফুটপাথ দিয়ে হাঁটছিলেন গ্যাব্রিয়েলা। পাশের ক্যাসিনোর নাম সিজার। জুলিয়াস সিজারের বিরাট মার্বেল মূর্তি বসানো আছে ক্যাসিনোর সামনে। সেটার সামনে দিয়ে রাস্তা পার হয়ে সমুদ্রের দিকে চলে গেলেন মহিলা। ওঁকে অনুসরণ করার সময় অর্জুন লক্ষ করছিল, ভুলেও ভদ্রমহিলা একটিবারও পেছন ফিরে তাকাচ্ছিলেন না। ব্যবধানটা হাতদশেকের বলে দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না ওদের মধ্যে কোনও সম্পর্ক আছে।

বালির ওপর বেশ উঁচুতে রেস্টুরেন্ট। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে জানলার পাশে বসল গ্যাব্রিয়েলা। ওরা উলটো দিকে বসতেই সমুদ্র দেখতে পেল। শান্ত সমুদ্রে প্রচুর নৌকো ভাসছে। সিম্বা নিশ্চয়ই ওর একটায় রয়েছে।

গ্যাব্রিয়েলা বললেন, জায়গাটা বেশ সুন্দর। তাই না?

মেজর বললেন, তা তো বটেই। কিন্তু আমি ভাবছি ওই নৌকোগুলোর কোনটায় আমাদের সিম্বা আছে! তুমি দেখতে পারছ অর্জুন?

অর্জুন হেসে ফেলল, না, সেই চেষ্টা করা বোকামি।

সিম্বা কে?

আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে যে মেয়েটি, তার নাম সিম্বা।

নাম শুনে মনে হচ্ছে আমেরিকান ময়।

না। ওর বাবা মেজরের প্রতিবেশী। আফ্রিকার মানুষ। বিশেষজ্ঞ।

সর্বনাশ।

সর্বনাশ কেন বলছেন?

মেয়েটি নিশ্চয়ই লকেটটার কথা জানে।

জানে।

আপনারা এখানে কেন এসেছেন তাও কি জানে?

বিস্তারিত কিছু ওকে বলা হয়নি।

কিছু মনে করবেন না, এই লকেটটার ব্যাপারে আমি কোনও কালো। মানুষকে বিশ্বাস করি না। গ্যাব্রিয়েলা কথা শেষ করতেই ওয়েটার এল অর্ডার নিতে।

মেনুকার্ড হাতে নিয়ে গ্যাব্রিয়েলা বললেন, আপনাদের নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়ে গিয়েছে। আমি লাঞ্চের অর্ডার দিচ্ছি।

মেজর কাঁধ ঝাঁকালেন। ভঙ্গি দেখে অর্জুন বুঝল মেজর খুব খুশি হলেন। অর্ডার নিয়ে লোকটি চলে গেলে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, আপনি ফোনে বললেন, আমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। আপনাকে খুন করা হতে পারে বলে ভয় পাচ্ছেন। ব্যাপারটা কী?

গ্যাব্রিয়েলা বললেন, হ্যাঁ, কথাটা সত্যি। জিমের বান্ধবী হিসেবে আমি চিহ্নিত হয়ে গিয়েছি। ওরা জিমকে গুলি করামাত্র সে মারা যায়নি। মরার আগে আমাকে কিছু কথা বলেছিল। আর ওরা সেটা অনুমান করেছে। আজ সকালে আপনার টেলিফোনের পর আমার ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসার একটু পরেই ওরা সেখানে হাজির হয়। আমাকে না পেয়ে খারাপ গালাগাল দেয়। আমি তখন জ্যাকসন হাইটে এক মাসির বাড়িতে চলে গিয়েছিলাম। আমার পাশের ফ্ল্যাটের মহিলা সেখানে ফোন করে ওই ঘটনা জানানো মাত্র আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ওখানে আপনার সঙ্গে দেখা করব না। ওরা ঠিক খুঁজে বের করবে আমি কোথায় আছি। যে কাগজের স্টল থেকে আপনারা আমার খবর পেয়েছেন সেটা আমার মাসতুতো বোন চালায়। সে আমাকে পরামর্শ দিল এই আটলান্টিক সিটিতে চলে আসতে।

কেন?

কারণ, এখানে পুলিশ থাকলেও শহরটাকে নিয়ন্ত্রণ করে মাফিয়া নেতারা। টুরিস্টরা যাতে বেশি আসে তাই কোনও গোলমাল ওরা এখানে বরদাস্ত করে না। এখানে কেউ কাউকে ছিনতাই করলে মাফিয়াদের জানালে সঙ্গে সঙ্গে তারা ব্যবস্থা নেয়। দোষীকে শাস্তি দেয়। এই জায়গায় তাই চট করে কেউ গুণ্ডামি করতে সাহস পায় না। আপনাদের এইজন্যেই এখানে ডেকেছি।

জিমের সঙ্গে আপনার কতদিনের আলাপ?

বেশিদিনের নয়। ও কালো হলেও খুব হাসিখুশি মানুষ ছিল। আমার ওকে সরল বলে মনে হত। কিন্তু সে স্মাগলার তা আমার জানা ছিল না। সেসব কথা আমাকে কখনও বলেনি। মাঝে-মাঝে সে উধাও হয়ে যেত। কখনও কখনও খুব মনমরা হয়ে থাকত। তখন ওর হাতে টাকা থাকত না। আমার সঙ্গে সে-সময় দেখা করত না ও। আমরা নেহাতই বন্ধু ছিলাম, তার বেশি কোনও সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু এবারে বিদেশ থেকে ফিরে সে মাঝে-মাঝেই বলত সাপের দেবতার জন্যে এ-যাত্রায় বেঁচে গেছে। নাহলে সে এয়ারপোর্টে বিপদে পড়ত। রাত্রে প্রচুর ড্রিঙ্ক করে সে নিজের কথা বলতে আরম্ভ করে। আমি তখন জানতে পারলাম ওর ব্যবসা কী। প্রথমে ভেবেছিলাম, ছেড়ে চলে যাই। সেটা করলেই ভাল ছিল। কিন্তু আমি ওর উপকার করতে চেয়েছিলাম। ওকে ওই লাইন থেকে ফিরিয়ে আনতে সঙ্গে থেকে গেলাম। তারপর তোমার সঙ্গে আলাপ হল। উঃ। গ্যাব্রিয়েলা দুহাতে মুখ ঢাকল।

তারপর?

মরে যাওয়ার আগে জিম বলেছিল পুলিশকে বোলো ওর টেলিফোন নাম্বার হল টু ওয়ান টু ফাইভ জিরো ফাইভ টু।

কার নাম্বার এটা?

যে লোকটা তোমাকে খুন করতে চায়। যার সাপের লকেট দরকার। যে আমার কাছে জানতে চায় মরার আগে জিম কী বলেছিল। কথা বলতে বলতে জানলা দিয়ে বালির দিকে তাকিয়ে গ্যাব্রিয়েলার মুখ নীরক্ত হয়ে গেল।
গ্যাব্রিয়েলার মুখের চেহারা দেখে অর্জুন চোখ ফেরাল। বালির ওপরে নারী-পুরুষেরা হেঁটে যাচ্ছে। ভদ্রমহিলার নজর যার দিকে সে দাঁড়িয়ে আছে পেছন ফিরে। যেন সমুদ্রের ঢেউ দেখতেই ব্যস্ত মানুষটি।

আপনি ওকে চেনেন? অর্জুন জিজ্ঞেস করল।

হ্যাঁ। জিমের কাছে আসত ও। ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললেন গ্যাব্রিয়েলা।

জিমের বন্ধু?

না। জিম ওকে সহ্য করতে পারত না! কারণটা প্রথমে আমাকে বলেনি জিম। তবে ওরা যে একসঙ্গে কাজ করে এটা বুঝতে পারতাম। আর এখন জানি ওরা একসঙ্গে কী কাজ করত। কিন্তু ও এখানে কী করছে?

হয়তো বেড়াতে এসেছে।

অসম্ভব। ধান্দা ছাড়া এরা এক পা-ও বাড়ায় না। আমার খুব ভয় করছে। জ্যাক নিশ্চয়ই জানতে পেরেছে আমি এখানে এসেছি।

ইতিমধ্যে লাঞ্চ এসে গেল। জ্যাক দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রের গা ঘেঁষে। ওখান থেকে তার পক্ষে এত উঁচু রেস্টুরেন্টের ভেতরটা দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু ওই ভঙ্গি বলছে রেস্টুরেন্ট সম্পর্কে ও আদৌ কৌতূহলী নয়। আর তা না হলে গ্যাব্রিয়েলার অস্তিত্ব ও জানে না।

খাবার খেতে মন্দ লাগছে না। সামুদ্রিক চিংড়িকে ঝাল ছাড়া মশলা প্রায় না দিয়ে রান্না করা হয়েছে। কিন্তু খেতে-খেতেও নজর রাখছিল অর্জুন। লোকটা এবার একটু-একটু করে কাঠের ব্রিজের দিকে এগোচ্ছে। তখনই সিদ্ধাকে দেখতে পেল ওরা। সিম্বা তার নৌকো নিয়ে ফিরে আসছে। নৌকোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সিম্বাকে ছিপছিপে কালো বেতের মতো দেখাচ্ছিল। খুশিতে হাসছে সিম্বা। এত দূর থেকেই তার দাঁতগুলো মুক্তোর মতো ঝকঝকে দেখাচ্ছে।

অর্জুন দেখল লোকটা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এখন আর সমুদ্র নয়, তার নজর সিম্বার দিকে। তার মানে লোকটা সিম্বাকে অনুসরণ করে এখানে এসেছে নিউ ইয়র্ক থেকে? না। তা হলে ওদের পেছনেও লোক লেগে যেত। সিম্বাকে ও দেখেছে এখানেই। কিন্তু লোকটার মতলব কী? মিস্টার আলাম্বার ওপর প্রতিশোধ নিতে যদি সিম্বার ক্ষতি করতে চায় তা হলে!

অর্জুন উঠে দাঁড়াল, এক্সকিউজ মি। আমাকে উঠতে হচ্ছে।

কেন? মেজর জানতে চাইলেন।

আমার মনে হচ্ছে সিম্বা এখনই বিপদে পড়বে। জ্যাক মিস গ্যাব্রিয়েলার জন্যে এখানে আসেনি। দেখুন ও কাঠের প্ল্যাটফর্মের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ওই পথেই সি ফিরে আসবে। অর্জুন বলল।

গ্যাব্রিয়েলা বললেন, এত ব্যস্ত হবেন না। আমি তো বলেছি এই শহরটাকে কন্ট্রোল করে মাফিয়ারা। জ্যাকের সাহস হবে না ওই মেয়েটির কোনও ক্ষতি এখানে প্রকাশ্যে করার। উলটে ওখানে গিয়ে আপনি নিজেকে জাহির করে বিপদ ডেকে আনবেন।

কিন্তু রাস্তায় নেমে মেয়েটা তো আমাদের খুঁজবে।

এখানে কাউকে খুঁজে পেতে চাইলে পাঁচ মিনিটেই পাওয়া যায়, অবশ্য, যাকে খুঁজছেন সে যদি সহযোগিতা করে। খাবারটা শেষ করুন, প্লিজ।

খেতে-খেতে অর্জুন দেখল সিম্বা কাঠের প্ল্যাটফর্মের ওপর দিয়ে হেঁটে আসছে বেশ স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতে। এবং তখনই ওর মনে পড়ল নকল লকেটটা যেটা আজই বানানো হয়েছিল সেটা সিম্বার কাছেই রয়ে গেছে। ওই লকেট যদি জামার বাইরে ঝুলিয়ে রাখে তা হলে জ্যাক সহজেই দেখে ফেলবে। এতদূর থেকে লকেটটাকে দেখার কোনও উপায় নেই। অর্জুন ঝটপট জল খেয়ে বলল, আমি যাচ্ছি, আপনারা এখানেই অপেক্ষা করুন। সে দ্রুত রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এল।

এই সময় সমুদ্রের ধারের এই উঁচু রাস্তায় কিছু টুরিস্ট ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাওয়া বইছে এখন। তাই সমুদ্রের বুক জুড়ে ভাঙা-ভাঙা ঢেউ উঠছে। যেন জলের ওপর আঁচড় কাটছে বাতাস। প্ল্যাটফর্মের যেখানে শুরু সেখানে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাক। সিজারের মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে লক্ষ করছিল অর্জুন। সিম্বা এগিয়ে আসছে। মুখোমুখি হতেই জ্যাক তাকে কিছু বলল। সেটা শুনে সিম্বা হাত নেড়ে হেসে কিছু জবাব দিল। এত দূর থেকে কথা না শোনা গেলেও অর্জুন দেখতে পেল সিম্বার জামার ওপরে লকেটটা নেই। সে স্বস্তি পেল। কিন্তু জ্যাক সিম্বার সঙ্গে কথা বলছে কেন? ওদের ভাবভঙ্গিতে বোঝাই যাচ্ছিল এর আগে কখনও পরিচয় ছিল না।

অর্জুন দেখল ওরা কথা বলতে বলতে রাস্তার মাঝখানে এসে দাঁড়াল। এবার সিম্বা ঘাড় নাড়ছে। যেন জ্যাকের কোনও প্রস্তাবে অসম্মতি জানাচ্ছে। সে হাত তুলে ক্যাসিনোগুলো দেখিয়ে দিল। জ্যাক দূরের রেস্টুরেন্টটাকে দেখাল। মরেছে! ওখানে এখনও গ্যাব্রিয়েলা এবং মেজর রয়েছেন!

কিন্তু সিম্বা রাজি হচ্ছে না। ওরা কথা বলতে বলতে হাঁটছিল। সিম্বা খুব কায়দা করে কথা বলছে। বলতে বলতে হঠাৎ তার আঙুল চলে গেল জামার নীচে। এবং অর্জুন আতঙ্কিত হয়ে দেখল কথা বলার সময় অন্যমনস্কভাবে সিম্বা আঙুলে লকেটের চেন ঘোরাচ্ছে। জ্যাক কিছু বলতে গিয়ে মুখ তুলে সেটা দেখতে পেয়েই দাঁড়িয়ে গেল। তারপর একটু ঝুঁকে কিছু বলতেই সিম্বা দ্রুত লকেটটাকে জামার মধ্যে চালান করে দিল।

এর পরেই ওদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। জ্যাক যা বলছে সিম্বা তা শুনতে রাজি নয়। সে কিছুতেই জ্যাকের সঙ্গে যাবে না। রেগেমেগে সিম্বা তাজমহল ক্যাসিনোর সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে সেলুলার টেলিফোন বের করে বোতাম টিপে কথা বলতে লাগল জ্যাক।

অর্জুন দৌড়ল। যে করেই হোক জ্যাকের আগে সিম্বার কাছে পৌঁছতে হবে। খবরটা পাঠিয়ে জ্যাক নিশ্চয়ই সিম্বার খোঁজে ক্যাসিনোতে ঢুকবে। ক্যাসিনোতে পৌঁছেই সিম্বাকে দেখতে পেল অর্জুন। কাছে গিয়ে বলল, যত তাড়াতাড়ি পারো পার্কিং থেকে গাড়ি বের করে রাস্তায় নিয়ে এসো। আমরা ওখানে যাচ্ছি।

কেন? সিম্বা জিজ্ঞেস করল অবাক হয়ে।

খুব বিপদ আসছে। কথা না বলে বাঁ দিকের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাও। অর্জুনের কথা শেষ হতেই সিম্বা বাধ্য মেয়ের মতো ছুটল। ও চোখের আড়াল হতেই জ্যাক ডান দিকের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে চারপাশে তাকাতে লাগল। অর্জুন দ্রুত একটা স্লট মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখার ভান করতে লাগল।

জ্যাককে একটু বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিল। তার চোখ তন্নতন্ন করে সিদ্ধাকে খুঁজল। একটু-একটু করে জ্যাক এগিয়ে যাচ্ছে ক্যাসিনোর মধ্যে। তারপর পকেট থেকে সেলুলার বের করে কিছু বলল। এখন অর্জুন ওর পেছনে। নিশ্চয়ই জ্যাক দলের লোকদের সাহায্য চাইছে। অর্জুন খুব নিরীহ ভঙ্গিতে ক্যাসিনোর বাইরে চলে এল।

মেজর এবং গ্যাব্রিয়েলা ততক্ষণে রেস্টুরেন্ট থেকে রাস্তায় নেমে এসেছেন। অর্জুন ইশারা করল দ্রুত তাকে অনুসরণ করতে। যে পথ দিয়ে তারা সমুদ্রের দিকে এসেছিল সেই পথে সে জোরে হাঁটতে লাগল। মাঝে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেছে মেজর তাকে অনুসরণ করছেন, গ্যাব্রিয়েলাও সঙ্গে রয়েছেন।

পার্কিং-এর গেটে পৌঁছনো মাত্র সিম্বা তার গাড়ি নিয়ে চলে এল সামনে। অর্জুন ঝটপট সামনের সিটে উঠে বসে বলল, ঝটপট এখান থেকে বেরিয়ে চলো।

কেন? আমি তো কোনও কারণ বুঝতে পারছি না। সিম্বা খুব অবাক হচ্ছিল।

যে-লোকটার সঙ্গে কথা বলছিলে সে খুব মারাত্মক দলের লোক। তোমার ওই লকেটটার জন্যে খুন করতেও দ্বিধা করবে না। অর্জুন কথা শেষ করা মাত্র মেজররা চলে এলেন। পেছনের সিটে বসে হাঁফাতে হাঁফাতে মেজর জিজ্ঞেস করলেন, কী হল হে? এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছ?

সিম্বা গাড়ি চালাচ্ছিল। অর্জুন সংক্ষেপে বাংলায় ঘটনাটা বলতে মেজর ইংরেজিতে সেটার তর্জমা করলেন। গ্যাব্রিয়েলা বললেন, সর্বনাশ। আমি এই ভয়টাই করছিলাম। আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?

নিউ ইয়র্ক।

অসম্ভব! আমরা পৌঁছতে পারব না।

গাড়ি তখনও ক্যাসিনোগুলোর পেছনের পথ দিয়ে ছুটছিল। গ্যাব্রিয়েলা বললেন, ওই ফাঁকা হাইওয়ে দিয়ে ঘণ্টা দুয়েক যেতে হবে। তার মধ্যেই ওরা আমাদের শেষ করে দেবে। মাই গড!

মেজর বললেন, তা হলে পুলিশস্টেশনে চলো।

গ্যাব্রিয়েলা বললেন, যেতে পারবেন কিন্তু ওখান থেকে যখন বের হবেন তখন কে আপনাকে সিকিউরিটি দেবে? গাড়িটা ডান দিকে ইউ-টার্ন নিলে ভাল হয়।

অর্জুন সিম্বাকে বলল, উনি যা বলছেন তাই করো।

সিম্বা ইউ টার্ন নিতেই রেসিডেন্স এলাকায় গাড়ি ঢুকে পড়ল। দুপাশে ছোট-ছোট কটেজ প্যাটার্নের বাড়ি। সেগুলো ছাড়াতেই রাস্তাটা সমুদ্রের গা ঘেঁষে চলতে থাকল। মাঝে-মাঝে বাংলো বাড়ি চোখে পড়ছে বাঁ দিকে, ডান দিকে সমুদ্র। এরকম একটি বাড়ির গেটে গাড়ি থামালেন গ্যাব্রিয়েলা।

এ বাড়ির সামনে কোনও বাগান নেই। ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত সিঁড়ির মতো লম্বা কতগুলো ধাপ নীচে নেমে এসেছে। গ্যাব্রিয়েলা গাড়ি থেকে নেমে গেটের গায়ে লাগানো একটা বোতাম টিপলেন। তিরিশ সেকেন্ড বাদে সেখান থেকেই আওয়াজ ভেসে এল। বেশ জড়ানো গলায় আমেরিকান ইংরেজি যা অর্জুনের কাছে স্পষ্ট নয় তবে আন্দাজ করা যায়। গ্যাব্রিয়েলা বললেন, আমি গ্যাব্রিয়েলা। আপনার মেয়ের সঙ্গে আমি একবার এই বাড়িতে এসেছিলাম। ও আমার সঙ্গে স্কুলে পড়ত।

কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ। তারপর গেট খুলে গেল। সমস্ত ব্যাপারটি চমকপ্রদ ভারতীয়দের কাছে কিন্তু ইলেকট্রনিক সিস্টেমের কল্যাণে এদের কাছে জলভাত। ডান দিক দিয়ে ওপরের ওঠার রাস্তা ধরে গাড়ি নিয়ে গেল সিম্বা। বাড়িটার সামনে গাড়ি থামতেই একজন স্বাস্থ্যবান লোক বেরিয়ে এল। লোকটার চেহারায় বেশ কাঠখোট্টা ভাব রয়েছে।

গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে লোকটা জিজ্ঞেস করল, গ্যাব্রিয়েলা কে?

আমি।

কেন এসেছেন?

মিস্টার মরিসন আমার বন্ধুর বাবা, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই।

কিন্তু কেন?

সেটা ওঁকেই বলব।

নো ম্যাডাম, আপনাকে এখনই বলতে হবে।

গ্যাব্রিয়েলা ইতস্তত করলেন, আমরা একটা বিপদে পড়েছি।

কীরকম বিপদ?

কিছু লোক আমাদের চেজ করছে।

কারা?

তাদের আমরা জানি না।

এঁরা কারা?

আমার বন্ধু।

লোকটা কিছুক্ষণ তাকিয়ে বলল, তোমার বন্ধুদের নেমে আসতে বলো।

গ্যাব্রিয়েলা ইশারা করতে ওরা গাড়ি থেকে নামল। লোকটা জিজ্ঞেস করল, তোমাদের কারও কাছে কোনও ধরনের অস্ত্র আছে?

মেজর বললেন, অস্ত্র থাকবে কেন?

লোকটা এগিয়ে গিয়ে মেজরের কোমর এবং পকেট ওর থেকে হাতড়ে দেখে অর্জুনের কাছে গেল। তারপর সন্তুষ্ট হয়ে বলল, আশা করি মহিলারা আমার সঙ্গে মিথ্যে কথা বলছে না। এবার ভেতরে এসো। মেজর চাপা গলায় বললেন, ইনসাল্টিং।

ওরা যে-ঘরে বসল তার চারপাশে কাচের দেওয়াল। লোকটি চলে গেলে মেজর জিজ্ঞেস করলেন, আপনার বন্ধুর বাবা কী করেন?

আমি ঠিক জানি না। এর আগেরবার যখন এসেছিলাম তখন এমন কড়াকড়ি ছিল না। এর মধ্যে বেশ পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, আপনার বন্ধু এখন কোথায়?

অনেকদিন তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই।

এই সময় পাশের দরজা খুলে গেল। সিল্কের পোশাক পরা এক বৃদ্ধ এগিয়ে আসতেই ওরা উঠে দাঁড়াল। গ্যাব্রিয়েলার দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ বললেন, হ্যাঁ। আমি তোমাকে আগে একবার দেখেছি। বোসো।

ওরা বসতেই দেখল সেই লোকটা পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে সতর্ক ভঙ্গিতে। উলটোদিকের চেয়ারে বসে জিজ্ঞেস করলেন, কারা চেজ করছে?

গ্যাব্রিয়েলা অর্জুনের দিকে তাকালেন। অর্জুন চুপচাপ বসে ছিল। গ্যাব্রিয়েলা যতটুকু পারলেন গুছিয়ে ঘটনাটা বললেন।

বৃদ্ধ চুপচাপ শুনছিলেন। ওঁর সাদা চুল, চুপসে যাওয়া গাল সত্ত্বেও একটা ঋজু ব্যাপার বসার ভঙ্গিতে ছিল।

কথা শোনার পর বৃদ্ধ বললেন, লকেটটা দেখি।

সিম্বা গলায় হাত দিল। লকেটটাকে খুলে সে গ্যাব্রিয়েলাকে দিল।

গ্যাব্রিয়েলা ওটা বৃদ্ধের দিকে নিয়ে যাওয়ার আগেই সেই লোকটা এগিয়ে এসে ওটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে বৃদ্ধের হাতে তুলে দিল।

লকেটটাকে দেখতে-দেখতে বৃদ্ধ বললেন, তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে। এটি মহামূল্যবান বস্তু। এটা থাকার কথা এই ইন্ডিয়ান ছেলেটির কাছে। কিন্তু তা না থেকে এই আফ্রিকান মেয়েটির গলায় ছিল কেন?

সিম্বা বলল, আমি দেখতে নিয়েছিলাম।

দেখতে নিয়েছিলে, দেখে ফেরত দাওনি কেন?

মনে ছিল না। পরে ছিলাম—!

তোমার মনে না থাকতে পারে কিন্তু যার জিনিস তার তো এটাকে হাতছাড়া করার কথা নয়। তাই না?

অর্জুন বলল, আমি ভেবেছিলাম ওর কাছে থাকলে কেউ ওকে সন্দেহ করবে না। এখান থেকে যাওয়ার আগে আমি ফেরত নিয়ে নিতাম।

কিন্তু ও যদি না দিত।

তার মানে?

ও একজন আফ্রিকান মেয়ে, ওর সমর্থন স্বদেশিদের ওপর থাকবেই। অবশ্য এটা যদি ওরিজিন্যাল লকেট না হয় তা হলে এমন ঝুঁকি নেওয়াই চলে। যাকগে, আমার মেয়ের বন্ধু তুমি। কিন্তু তুমি কি জানো আমার মেয়ে মরে গেছে? বৃদ্ধের কথায় হতভম্ব হয়ে গেলেন গ্যাব্রিয়েলা।
গ্যাব্রিয়েলা খুব অবাক হয়ে বৃদ্ধের দিকে তাকালেন। তাঁর বান্ধবী যে মারা গিয়েছে এ-খবর যে জানতেন না সেটা মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল। বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন, তোমরা বিশ্রাম করো। খবরাখবর পাওয়ার পর কী করতে হবে তা তোমাদের জানানো হবে।

বৃদ্ধ চলে গেলে সেই লোকটি তাদের অনুসরণ করতে ইঙ্গিত করল। ঘর থেকে বেরিয়ে, খানিকটা প্যাসেজ দিয়ে হাঁটার পর ওরা যে ঘরে ঢুকল সেটা দিয়ে ভেতরের আর একটা ঘরে যাওয়া যায়। ওদের পৌঁছে দিয়ে লোকটা দরজা বন্ধ করে চলে গেল। মেজর বললেন, বাঃ, তোফা আরাম করা যাবে। মেয়েরা ভেতরের ঘরে চলে যান, এখানে আমরা একটু বিশ্রাম নিই।

গ্যাব্রিয়েলা চিন্তিত মুখে ভেতরের ঘরে চলে গেলেন। অর্জুন চারপাশে তাকাল। হোটেলের ঘরের সঙ্গে কোনও পার্থক্য নেই। একপাশে ভারী পরদা। সে পরদা সরাতেই বন্ধ কাচের জানলার ওপারে সমুদ্র দেখতে পেল। এই জানলা সম্ভবত খোলা হয় না। পরদাটা আগের মতো করে দেওয়ার সময় তার চোখে বস্তুটা ধরা পড়ল। পরদার পেছনে ছোট্ট মাইক্রোফোন লাগানো আছে। তারবিহীন। খুব দ্রুত, যেন সে কিছুই দ্যাখেনি এমন ভান করে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল সিম্বা তখনও মাঝখানের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি অর্জুনের ওপর।

অর্জুন হাসল, কী হল, ও-ঘরে গেলে না?

লকেটটা কি ড়ুপ্লিকেট? সরাসরি প্রশ্ন করল সিম্বা।

অর্জুন শক্ত হল, হঠাৎ এই প্রশ্ন?

কারণ আমি সরলভাবে নিয়েছিলাম। ওই ভদ্রলোক বলার পর মনে হয়েছে আপনি আমার সারল্য নিয়ে খেলা করেছেন। বলুন, ঠিক কি না? সিম্বার মুখ শক্ত।

অর্জুন বলল, উনি বলেছেন লকেটটা যেহেতু এখানকার কারও কারও কাছে খুব মূল্যবান তাই ওটা আমি তোমার হাতে নিশ্চিন্তে ছেড়ে দিতে পারি না। তাই তো?

কথাটা তো ঠিকই।

দ্যাখো, লকেটটা আর কারও কাছে মূল্যবান হতে পারে, আমার কাছে তো নয়। তা ছাড়া তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই ওটা দেখতে বা রাখতে দিয়েছিলাম এমন ভাবতে পারছ না কেন?

আপনি আমাকে বিশ্বাস করেছিলেন?

অবিশ্বাস করার মতো কোনও কাজ কি তুমি করেছ? উলটে নিজের সব কাজ ফেলে আমাদের সাহায্য করার জন্যে এতটা পথ গাড়ি চালিয়ে এসেছ।

অর্জুনের কথা শুনে একটু সহজ হল সিম্বা। তার মুখে সামান্য হাসি ফুটল। পাশের ঘরে চলে গেল সে।

মেজর ততক্ষণে বিছানায় শরীর ছেড়ে দিয়েছেন। বাংলায় বললেন, তুমি ওকালতি করলে নাম করতে হে। কীরকম লাঠি না ভেঙে সাপ মেরে ফেললে। যাকগে, শুয়ে পড়ো। একটু আরাম করা যাক।

অর্জুন বলল, যে ব্যক্তি অকারণে নিদ্রামগ্ন হয় তাহার ভাগ্যও জাগ্রত হয়।

মেজর চোখ বড় করলেন। দাড়ির জঙ্গলে আঙুল বুলিয়ে বললেন, একেবারে পৌরাণিক ভাষায় কথা বলছ। ব্যাপারটা কী?

অর্জুন বলল, এই কক্ষে অনেক কর্ণ সংস্থাপন করা হইয়াছে। চক্ষু আছে কিনা তাহা এখনও আবিষ্কার করিতে পারি নাই।

মেজর বললেন, মাই গড!

ফিরিঙ্গি ভাষায় বাক্য বলিবেন না।

অ। কিন্তু মুশকিল হল, তোমার ওই ভাষা আমি বলতে পারব না। মেজর উঠে বসলেন, এরা বাংলা জানে বলে মনে হয় না।

উহাই স্বাভাবিক। বাঙালি কর্মচারী এই প্রাসাদে না থাকিবার সম্ভাবনাই বেশি। যাহোক, আমরা ডাঙার বাঘকে এড়াতে গিয়ে জলে নেমে কুমিরের কাছে পৌঁছে গিয়েছি বলে মনে হচ্ছে।

তার মানে, গ্যা—, না নাম বলব না, বড় দিদিমণি আমাদের প্ল্যান করে এখানে নিয়ে এসেছেন নাকি? ওই যা! প্ল্যান শব্দটা তো ইংরেজি। আমরা কথায় কথায় এত ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে থাকি যে, বাদ দেওয়া মুশকিল।

আমার মনে হয় না উনি ইচ্ছে করে এখানে নিয়ে এসেছেন। অর্জুন বলল।

উঁহু। এটা ঠিক কথা হল না। তোমার উচিত সবকিছুকে সন্দেহ করা। এত জায়গা থাকা সত্ত্বেও ভদ্রমহিলা জ্যাকসন হাইট থেকে আটলান্টিক সিটিতে আমাদের নিয়ে এলেন কেন? আমরা আসামাত্র জ্যাক কী করে এখানে হাজির হবে? আর তার ভয়ে উনি আশ্রয় নিতে এই বাড়িতে যে চলে এলেন এটা আগে থেকে প্ল্যা, না, পরিকল্পনা করা নয় তাই বা ভাবব না কেন?

হ্যাঁ। আপনার কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু ওভাবে ভাবতে আমার ভাল লাগছে না। তা হলে তো সিম্বাকেও সন্দেহ করতে হয়। সব কাজ ফেলে সে কোন স্বার্থে আমাদের এতদূরে নিয়ে এল?

হুঁ। আচ্ছা, এই যে আমরা কথা বলছি এটা ওরা শুনতে পাচ্ছে?

হ্যাঁ। শুনতে পাচ্ছে তবে বুঝতে পারছে কিনা তা জানি না।

তা হলে তো এরা ডে-ডে, না, ভয়ঙ্কর লোকজন।

একটু আগের কথাবার্তা শুনে আপনার তা মনে হয়নি? আমি শুধু খুঁজছি এই ঘরে কোথাও ক্যামেরা লুকনো আছে কিনা। যাকগে, এখন কথা হল, কতক্ষণে এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া যাবে! অর্জুন দেখল সিম্বা আবার এসে দাঁড়িয়েছে ভেতরের ঘরের দরজায়, আপনারা কি এখানেই থেকে যাবেন?

অর্জুন বলল, কখনওই নয়।

কিন্তু আমাকে এখনই নিউ ইয়র্কে ফিরতে হবে।

গ্যাব্রিয়েলা কী করছেন?

ওঁর বান্ধবীর মারা যাওয়ার খবর শুনে খুব আপসেট হয়ে পড়েছেন?

ওঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই। অর্জুন বলল।

সিম্বা মাথা নেড়ে ভেতরে চলে গেল। অর্জুন পকেট থেকে কলম বের করে এক টুকরো কাগজে লিখল, অনুগ্রহ করে মুখে উত্তর না দিয়ে ইশারায় জবাব দেবেন।

একটু বাদেই গ্যাব্রিয়েল সিম্বার সঙ্গে এই ঘরে এলে ও ইশারায় চুপ করতে বলে চিরকুটটা এগিয়ে দিল। গ্যাব্রিয়েল সেটি পড়ে ইশারায় কারণ জানতে চাইলেন। অর্জুন নিঃশব্দে পরদাটা সরিয়ে মাইক্রোফোন দেখাল। ওটা দেখতে পেয়ে গ্যাব্রিয়েলা এবং সিম্বার মুখের চেহারা পালটে গেল।

অর্জুন কাগজটা ফিরিয়ে নিয়ে লিখল, আপনার বান্ধবীর বাবাকে আপনি অনেকদিন থেকে চেনেন? গ্যাব্রিয়েলা সেটা পড়ে মাথা নাড়লেন, না।

এই সময় দরজায় শব্দ হতেই অর্জুন ইশারা করল মেয়েদের পাশের ঘরে চলে যেতে। তারা যাওয়ামাত্র সেই লোকটাকে দরজায় দেখা গেল, আপনাকে একটু আসতে হবে।

কেন? অর্জুন জিজ্ঞেস করল।

সেটা গেলেই জানতে পারবেন। ঠোঁট কামড়াল লোকটা।

অর্জুন এগোতেই মেজর ধড়মড়িয়ে উঠে ওকে অনুসরণ করলেন। লোকটা ঝটপট বলে উঠল, না। আপনাকে আমাদের প্রয়োজন নেই।

অর্জুন বলল, আমি ওঁকে ছাড়া কোথাও যাই না।

এবার যাবেন।

সরি। আপনারা আমাদের ওপর জোর খাটাতে পারেন না। অর্জুন বেঁকে বসল। লোকটা পকেট থেকে টেলিফোন বের করে চাপা গলায় দুটো কথা বলে কাঁধ ঝাঁকাল, ঠিক আছে, চলুন।

বৃদ্ধ বই পড়ছিলেন। ওরা ঘরে ঢুকতেই জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা তো ইন্ডিয়ান। ইংরেজরা কি আপনাদের মাতৃভাষা কেড়ে নিয়েছে?

মেজর বললেন, তার মানে?

আপনারা চমৎকার ইংরেজি বলেন। আগাথা ক্রিস্টির নাম শুনেছেন?

যে-কোনও শিক্ষিত লোক শুনেছে।

না। শোনেনি। একজন শিক্ষিত ফরাসি, স্প্যানিশ, জাপানি, চিনা, ইতালিয়ান ওঁর নাম না শুনেও চমৎকার শিক্ষিত থাকতে পারেন। অথচ আপনি যেভাবে বললেন, তাতে মনে হচ্ছে আপনার ভাষায় ভদ্রমহিলা এই বইগুলো লিখেছেন। বৃদ্ধ হাসলেন।

অর্জুন বলল, আমরা বাঙালি। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। কিন্তু পৃথিবী সম্পর্কে খবরাখবর রাখতে আমরা ইংরেজিও শিখি। আর আমরা যে নিজেদের মধ্যে বাংলা বলি না সেটা আপনিও জানেন।

কীরকম?

ঘরে আমরা দুজনে যেসব কথা বলেছি তা আপনার কানে গিয়েছে কিন্তু আপনি তার কিছু আগে বুঝতে পারেননি। তাই না?

বৃদ্ধ অর্জুনের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন, তুমি দেখছি সত্যি বুদ্ধিমান। তোমার প্রয়োজন কী?

মেজর বললেন, ও সত্যসন্ধানী।

তাই নাকি? বৃদ্ধের ঠোঁটের কোণে হাসি চলকে উঠল।

ওদের বসতে বলা হয়নি। অর্জুন এবার বিরক্ত হল, আমি একটা কথা বুঝতে পারছি না। এই শহরে এসে আমরা বিপদে পড়েছিলাম বলে গ্যাব্রিয়েলা আপনার বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার জন্যে আমাদের এখানে এনেছিলেন। কিন্তু আপনাদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে আমরা কোনও আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেতার বাড়িতে ঢুকে পড়েছি। ওই লোকটা যেভাবে আমাদের সঙ্গে কথা বলছে তাতে নিজেদের বন্দি ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যাচ্ছে না।

বৃদ্ধ হাসলেন, আচ্ছা, বলুন তো, আপনাদের আশ্রয় দিয়ে আমার কী লাভ হবে? বিশেষ করে কিছু লোক তো আমার শত্রু হয়ে যাবে।

অর্জুন বলল, আমরা নিজের ইচ্ছেয় এখানে আসিনি। গ্যাব্রিয়েলা ভেবেছিলেন ওঁর বান্ধবীর বাড়িতে আশ্রয় পাওয়া যাবে।

বৃদ্ধ বললেন, শোনো, জীবন আমাকে একটা সত্যি শিখিয়েছে। কোনও কিছু পেতে গেলে তার দাম দিতে হয়। আমি কিছু না দিয়ে যেমন কিছু নিই না, তেমনই কিছু না পেলে দেওয়ার কথাও ভাবতে পারি না।

আপনি কী চাইছেন?

লকেটটা।

ওটা নিয়ে কী করবেন?

খুব সহজ উত্তর। যারা এটা খুঁজে বেড়াচ্ছে তাদের কাছে বিক্রি করে দেব। যে লকেটটা ওই কালো মেয়েটি পরে ছিল সেটা জাল।

ওটা আপনার অনুমান।

যখন তোমরা প্রথম এলে তখন অনুমান করেছিলাম। এখন জেনে গেছি। অনুমানটাই সত্যি। দ্যাখো, আমার বাজে কথা বলার সময় নেই। দাও।

আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না।

তৎক্ষণাৎ বৃদ্ধের মুখ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। কিন্তু সেটা লহমার জন্যে। তারপরেই সহজ গলায় বললেন, নিউ ইয়র্ক থেকে এখানে আসার পথে মাত্র একটি দোকান আছে। ওই দোকানে আমার লোক গিয়েছিল। দোকানদারের নাম টমসন। সে বলেছে নতুন লকেটটা একটু বেশি চকচকে আর কিঞ্চিৎ হালকা। আশা করি আমার কথা বুঝতে পারছ।

মেজর বললেন, অদ্ভুত ব্যাপার। আপনার লোক এর মধ্যেই টমসনের দোকানে পৌঁছে গেছে। কী কাণ্ড! কিন্তু টমসন কি বলেনি আমাদের এক বন্ধু সঙ্গে ছিল, যে আসল লকেটটাকে নিয়ে ফিরে গেছে নিউ ইয়র্কে।

তোমাদের সঙ্গে আর একজন ছিল?

হ্যাঁ। মেজর মাথা নাড়লেন।

কী নাম তার?

মিস্টার আলাম্বা।

আলাম্বা? আফ্রিকার লোক?

হ্যাঁ। কিন্তু দেশের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই।

কোথায় থাকে সে?

কুইনসে।

তোমরা মিথ্যে কথা বলছ।

ঠিক আছে, একটা টেলিফোন দিন।

বৃদ্ধ ইশারা করতে লোকটি একটা কর্ডলেস ফোন এগিয়ে দিল। মেজর খুব স্বচ্ছন্দে নাম্বার টিপলেন। অর্জুন বুঝতে পারছিল না মেজর কী করতে চাইছেন। মিস্টার আলাম্বা তো সরাসরি অস্বীকার করবেন।

মেজর খানিকক্ষণ রিসিভারটা কানে চেপে এগিয়ে ধরলেন, সরি। মিস্টার আলাদা তার ফ্ল্যাটে নেই।

লোকটি রিসিভার নিয়ে রিডায়াল টিপল। রেকর্ডেড মেসেজ শুনে বলল, মিস্টার আলাম্বা বলছে যে সে লাঞ্চে গিয়েছে।

লোকেট করো। বৃদ্ধ বলতেই লোকটি পাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। বৃদ্ধ হাসলেন, তোমাদের সঙ্গে আমার শত্রুতা নেই। কিন্তু যারা তোমাদের পেছনে লেগেছে তারা খুব ভয়ঙ্কর মানুষ। আমার সাহায্য ছাড়া মেরা এই আটলান্টিক সিটি থেকে বের হতে পারবে না। অবশ্য শহরের মধ্যে যতক্ষণ আছ ততক্ষণ কোনও ক্ষতি হবে না তোমাদের। কথা শেষ হওয়ামাত্র বৃদ্ধের পাশে রাখা টেলিফোন বেজে উঠল। চাপা গলায় কিছু কথা বলে বৃদ্ধ রিসিভার রাখলেন, জল দেখছি অনেকদূরে গড়িয়েছে। ওরা বোর্ডের কাছে আপিল করেছে তোমাদের জন্যে।

আপিল করেছে মানে?

যেহেতু এই শহরের প্যারালাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সমস্ত ব্যাপার নিয়ন্ত্রণ করে তাই কাউকে আক্রমণ করলে বোর্ড তাকে নিরাপত্তা দিতে বাধ্য। বোর্ডের কাছে ওরা অ্যাপিল করেছে যাতে তোমাদের এই শহর অথবা আমার বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। আধ ঘণ্টার মধ্যে বোর্ড মিটিং-এ বসছে। আমি একজন মেম্বার। আমাকে যেতে হবে ওখানে। তোমরা এবাড়িতে নিশ্চিন্তে থাকো। আমি তোমাদের হয়ে কথা বলব। আশা করি তার মধ্যে ওই মিস্টার আলাদা তাঁর লাঞ্চ সেরে ফিরে আসবেন। বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন।
ওদের আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। খানিক বাদেই গাড়ির শব্দ কানে আসতেই বোঝা গেল বৃদ্ধ বেরিয়ে গেলেন বোর্ডের মিটিং-এ যোগ দিতে। মেজর বললেন, তাজ্জব ব্যাপার! এতকাল আমেরিকায় আছি, জানতাম পুলিশই শেষ কথা। এক-একটা শহরের ভার একজন শেরিফের ওপর থাকে, পুলিশ তাঁর নির্দেশে চলে। কিন্তু এই আটলান্টিক সিটিতে শান্তিশৃঙ্খলা দেখার জন্যে গুণ্ডাদের একটা বোর্ড আছে তা জানতাম না। পুলিশ কী করে অ্যালাউ করছে। কথাগুলো বলেই তিনি জিভ কাটলেন, যাচ্চলে, অ্যালাউ বলে ফেললাম, ইংরেজি শব্দ।

মুখভর্তি কাঁচা-পাকা দাড়ি নিয়ে জিভ বের করলে মানুষকে যে কিভূত দেখায়, তা অর্জুনের জানা ছিল না। মেজরের এতক্ষণে খেয়াল হয়েছে। বললেন, অবশ্য এখন ওরা নেই এ বাড়িতে, শুনতে পাচ্ছে না।

টেপ রেকড়ার চালিয়ে যেতে পারে। অর্জুন বলল।

সিম্বা চুপচাপ একটা চেয়ারে বসে ছিল। তাকে খুব বিরক্ত এবং উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল। হঠাৎ সে ঝুঁকে পড়ল, তোমাদের মতলবটা কী?

মতলব? অর্জুন অবাক হল।

তখন থেকে তোমরা নিজেদের ভাষায় কথা বলে যাচ্ছ। আমরা বুঝতে পারছি কিনা তা নিয়ে একটুও ভাবছ না তোমরা। কিন্তু আমি কোনও অন্যায় করিনি। তোমরা অনুরোধ করেছিলে বলে তোমাদের এই আটলান্টিক সিটিতে নিয়ে এসেছিলাম। এখন আর আমার পক্ষে এখানে থাকা সম্ভব নয়। আমি চলে যাচ্ছি। দরকার হলে আমি পুলিশকে ফোন করব। কথা বলতে বলতে উঠে দাঁড়িয়েছিল সিম্বা।

অর্জুন বলল, তুমি কি বুঝতে পারছ না? আমরা এখানে বন্দি হয়ে আছি।

আই ডোন্ট কেয়ার। আমি কোনও অন্যায় করিনি যে, কেউ আমাকে বন্দি করে রাখবে। আমি এখান থেকে সোজা বেরিয়ে যাব। তোমাদের যদি ইচ্ছে হয় আমার সঙ্গে আসতে পারো। সিম্বা এগিয়ে গেল দরজার দিকে। দরজা ঠেলতে বুঝতে পারল ওটা বাইরে থেকে বন্ধ। স্ট্রেঞ্জ! ওরা ভেবেছে কী? সে ঘুরে দাঁড়াল গ্যাব্রিয়েলার দিকে মুখ করে, তুমি! তুমি তোমার বান্ধবী মারা গিয়েছে বলে কাঁদছিলে, কিন্তু কোথায় নিয়ে এসেছ আমাদের?

গ্যাব্রিয়েলা খুবই দুঃখিত হয়ে বললেন, আই অ্যাম সরি। সত্যি আমি জানতাম না আমার বান্ধবীর বাবা একজন মাফিয়া নেতা। এখানে না জেনে তোমাদের নিয়ে এসে খুব অন্যায় করেছি আমি।

সিম্বা কাঁধ ঝাঁকাল। তারপর অর্জুনকে বলল, কিন্তু এখানে বসে থাকব না আমরা। এসো, চেষ্টা করি এখান থেকে বেরিয়ে যেতে।

ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। পরদা সরিয়ে জানলা দেখা হল। সেগুলো গ্রিলে বন্দি। এই ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ নেই। পাশের ঘরের অবস্থা একই রকম! মেজর কাঁধ দিয়ে বেরোবার দরজায় আঘাত করলেন। দরজাটায় শব্দ হল, দেওয়াল কাঁপল। অর্জুনের খেয়াল হল। এখানকার বাড়ির দেওয়াল ইটের নয়। কাঠের। মেজর ধাক্কা দেওয়ায় সেই কাঠে কাঁপন লেগেছে। অর্জুন মেজরকে আর একবার ধাক্কা দিতে বলল। এবার আর একটু জোরে। সঙ্গে সঙ্গে পাশের ঘরে আওয়াজ হল। সিম্বা ছুটে গেল সেখানে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল। অর্জুন দ্রুত সেখানে পৌঁছে দেখল একটা কাঠের বিমের মধ্যে ঢোকানো আর একটি কাঠ ঈষৎ খুলে এসেছে। তিনজনের মিলিত চেষ্টায় সেটাকে খুলে ফেলার পর দেওয়ালের একটা অংশকে সরানো সম্ভব হল। বাইরের আলো ভেতরে ঢুকল। গ্যাব্রিয়েলা গালে হাত দিয়ে এতক্ষণ দেখছিলেন, বললেন, থ্যাঙ্ক গড!

ফাঁক দিয়ে বাইরে পা বাড়াতেই অর্জুন দেখল সে বারান্দায়। লন থেকে অনেক উঁচুতে এই বারান্দা। বাড়িতে কেউ নেই নাকি? এতটা শব্দ হল অথচ কাউকে ছুটে আসতে দেখা যাচ্ছে না। চারজন বাইরে আসতেই সিম্বা প্রথমে তার গাড়িটাকে দেখতে পেল। সে চাপা গলায় বলল, লেটস গো!

ঠিক তখনই অর্জুন কুকুরটাকে এগিয়ে আসতে দেখল। তারপর আরও তিনটে। চারটেরই লেজ কাটা। হিংস্র চোখে বারান্দার দিকে মুখ উঁচু করে তাকিয়ে আছে। একজন মুখ খুলতে বোঝা গেল, ওই দাঁত একটা বাইসনের ঠ্যাং চিবিয়ে ফেলতে পারে। এরা যে ভয়ঙ্কর শিকারি তা বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। পুরো বাড়িটা এদের জিম্মায় ছেড়ে ওরা চলে গেছে নিশ্চিন্তে। বারান্দা থেকে মাটিতে পা দিলে আর দেখতে হবে না।

বাকি তিনজনের নজর কুকুরগুলোর ওপর পড়েছিল। মেজর বললেন, ডেঞ্জারাস। তবে আফ্রিকায় আমি এই ধরনের বুনো কুকুরের মোকাবিলা করেছি।

অর্জুন বলল, মালিক আর যে খাবার দেয় তারা ছাড়া পৃথিবীর সব মানুষ ওদের শত্রু। কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। ওদের ট্রেনিং নেই, তাই এই বারান্দায় উঠে আসছে না।

মেজর হতাশ গলায় বললেন, তা হলে আমরা এখান থেকে যাব কী করে?

ওদের না সরালে কোনও উপায় নেই। অর্জুন বলল।

মেজর একটু ঝুঁকে গলায় চু চু শব্দ তুললেন। কুকুর চারটে নড়ছে না। মেজর আরও একটু ঝুঁকলেন, কাম অন ব্রাদার্স। তোদের সঙ্গে আমাদের কোনও শত্রুতা নেই। যুধিষ্ঠিরের সঙ্গী ছিল তোদের পূর্বপুরুষ। প্রায় স্বর্গে পৌঁছে গিয়েছিল। অর্জুন, আমি ঠিক বলছি তো? সেই অবস্থায় ঘুরে তাকাতে গিয়ে মেজর নীচে পড়ে যাচ্ছিলেন ব্যালান্স হারিয়ে, কিন্তু অর্জুন শেষ মুহূর্তে তাঁকে ধরে ফেলতে তিনি রক্ষা পেলেন। আর তিনি বারান্দা থেকে মাটিতে পড়ছেন দেখে চারটে কুকুর বিদ্যুতের মতো ছুটে এসেছিল সামনে।

উঠে দাঁড়িয়ে পেছনে সরে এলেও থরথরিয়ে কাঁপছিলেন মেজর, ইম্পসি। অর্জুন চারপাশে তাকাল। তারপর খানিকটা হেঁটে দরজার হুড়কো বাইরে থেকে খুলে ভেতরে ঢুকল। দরজার পাশেই একটা ছোট শেফ রয়েছে। সে মেজরকে অনুরোধ করল সাহায্য করতে। মেজর হাত লাগালে সেটাকে ঠেলতে ঠেলতে বারান্দায় বের করে সদ্য-ভাঙা কাঠের ফোকরের পাশে নিয়ে এল। তারপর বলল, আপনারা ঘরের ভেতর চলে যান। দরজাটা বন্ধ রাখুন। আমি বলামাত্র ছুটে বেরিয়ে আসবেন বারান্দায়।

কথাগুলো ইংরেজিতে বলায় সিম্বা জিজ্ঞেস করল, তুমি কী করতে চাও?

কুকুরগুলোকে বারান্দায় তুলতে চাই। তোমাদের প্রত্যেকের রুমালগুলো আমাকে দাও। সে হাত বাড়াতে প্রত্যেকেই রুমাল দিল।

কারও কাছে নেল কাটার আছে?

গ্যাব্রিয়েলা ব্যাগ খুলে সেটা এগিয়ে দিতেই অর্জুন নেলকাটারের ভেতরে ঢোকানো ছোট্ট ছুরির ফলা বের করে বাঁ হাতের ওপর দিকে চাপ দিতেই কয়েক ফোঁটা রক্ত বেরিয়ে এল। মেজর চেঁচিয়ে উঠল, কী করছ?

কয়েক ফোঁটা রক্ত। কিস্যু হবে না। আপনারা ঘরের ভেতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিন। কুইক। আমি বলামাত্রই দরজা খুলে বাইরে চলে আসবেন। অর্জুনের কথায় বিস্মিত মুখ নিয়ে তিনজন ভেতরে চলে যেতে অর্জুন চারটে রুমালে রক্তের ফোঁটাগুলো মাখিয়ে নিতেই নতুন রক্ত বের হওয়া বন্ধ হল। ছুরির ডগায় রক্ত লেগে রয়েছে তখনও। সে নেলকাটারটা উঠোনে ছুড়ে ফেলতেই চারটে কুকুর একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওটার ওপর। প্রথমজন গন্ধ শুকে জিভ দিয়ে ছুরিটা চাটল। অর্জুন এবার প্রথম রুমাল গোল করে পাকিয়ে ওদের কাছাকাছি ছুড়তেই কুকুরটা ছুটে গেল।রুমালে নাক ঢুকিয়ে গন্ধ শুঁকতেই সে গোঁ গোঁ আওয়াজ তুলল। বাকি তিনজন তখন রুমাল শুকছে। এবার দ্বিতীয় রুমাল ছুড়ল বারান্দার সিঁড়িতে। কুকুরটা লাফিয়ে সেখানে পৌঁছে রুমালের ঘ্রাণ নিতে শুরু করতেই তৃতীয়টিকে বারান্দার ওপর ছুড়তেই ওরা সমস্ত শিক্ষা ভুলে লাফিয়ে উঠে এল বারান্দার ওপর। অর্জুন আর এক মুহূর্ত নষ্ট না করে কাঠের ফোকর দিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় চতুর্থ রুমালটি ভাঙা কাঠের ফাঁকে খুঁজে দিয়ে দৌড়ে বাইরের ঘরে চলে আসতেই কুকুরগুলো হুড়মুড়িয়ে ফোকর দিয়ে ঢুকতে লাগল। অর্জুনের চিৎকারে ওরা তিনজন দরজা খুলে বাইরে যেতেই অর্জুন অনুসরণ করল। এক ইঞ্চির জন্যে প্রথম কুকুরটা ওকে ধরতে পারেনি। একেবারে ওর মুখের ওপর দরজা বন্ধ করতেই সে দেখল মেজর শেলফটাকে ঠেলছেন ফোকর বন্ধ করতে। ওকে সাহায্য করছে সিম্বা। কিছু না বলতেই ওঁরা বুঝে গিয়েছেন বলে ভাল লাগল অর্জুনের। সে ছুটে গিয়ে হাত লাগাতে ফোকরটা শেলফের আড়ালে চলে গেল।

ওপাশের বন্ধ দরজা থেকে ফিরে এসে কুকুরগুলো ফোকর দিয়ে বেরোবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হল। ওদের চাপে শেলফ নড়ছে। অর্জুন বলল, জলদি।

ওরা দ্রুত নীচে নেমে গাড়ির কাছে ছুটে গেল। চাবিটা যে ড্যাশবোর্ডে ঝুলতে দেখবে, ভাবেনি অর্জুন। ওরা গাড়িতে উঠে বসতেই সিম্বা এঞ্জিন চালু করল। আর তখনই শেলফটা সামান্য সরে যেতে কুকুরগুলো বারান্দায় নেমে ঝাঁপিয়ে পড়ল নীচে। অর্জুন চিৎকার করল, কাচ তুলুন, কাচ তুলুন।

দ্রুত কাচ তুলে দিতে সিম্বা গাড়ি ঘুরিয়ে গেটের দিকে নিয়ে গেল। গেট বন্ধ। গাড়ি থেকে নেমে গেট খোলার চেষ্টা করা এখন পাগলামি করা হবে।

অর্জুন বলল, স্পিড বাড়াও, সোজা গেটে ধাক্কা মারো।

ধাক্কা লাগতেই যেমন গেট খুলে গেল তেমনই কান ফাটিয়ে সাইরেন বেজে উঠল। গ্যাব্রিয়েলা আতঙ্কিত গলায় বললেন, এখনই পুলিশ চলে আসবে। ওা বার্গলার অ্যালার্ম লাগিয়ে গিয়েছে।

গাড়ি তখন রাস্তায় পড়ে তীব্রভাবে ছুটছে। মেজর বললেন, নিজেরা মাফিয়া গুণ্ডা হয়ে গেট অ্যালার্ম লাগিয়েছে। চলো, সোজা থানায় গিয়ে রিপোর্ট করি। ওরা কিছুটা এগিয়ে যেতেই পুলিশের গাড়ি আসতে দেখল পরপর দুটো। ওদের পাশ কাটিয়ে গাড়িদুটো বেরিয়ে গেল।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্স সঙ্গে আছে?

নিশ্চয়ই। কিন্তু কেন? মেজর তাকালেন।

আমি আর সিম্বা নেমে যাচ্ছি। যারা আমাদের খোঁজ করছে তারা নিশ্চয়ই জানে সিম্বা আমাদের গাড়ি চালিয়ে এখানে এনেছে। আমরা যে চারজন আছি তাও নিশ্চয়ই ওদের জানা হয়ে গিয়েছে। তাই আপনি আর গ্যাব্রিয়েলা সোজা নিউ ইয়র্ক চলে যান।

অসম্ভব! তোমরা এখানে পড়ে থাকবে আর আমি চলে যাব, এ হতে পারে না। মেজর গ্যাব্রিয়েলার দিকে তাকালেন, ড্রাইভিং লাইসেন্স সঙ্গে আছে? বাঃ, বেশ। আপনি চালান, সিম্বা আপনার সঙ্গে চলে যাক। বাঁ দিকে গাড়ি দাঁড় করাও।

সিম্বা গাড়ি থামাতে মেজর নেমে পড়লেন, কুইক অর্জুন। গ্যাব্রিয়েলা, আপনি সামনে এসে স্টিয়ারিং-এ বসুন।

গ্যাব্রিয়েলা দরজা খুলে এগিয়ে আসতেই সিম্বা আসন পরিবর্তন করতে করতে বলল, তোমরা ফিরবে কী করে?

মেজর বললেন, আমাদের নিয়ে ভেবো না। যদি পারো রাস্তা থেকে ফোনে তোমার বাবাকে বোলো, অচেনা কোনও লোকের সঙ্গে আমাদের ব্যাপারে কথা না বলতে। উইশ ইউ হ্যাপি রিটার্ন।

গাড়িটা বেরিয়ে গেল। মেজর বললেন, এইজন্যে এ-দেশের মেয়েদের আমার ভাল লাগে। যে-কোনও বিপদের সামনে ওরা সাহস করে দাঁড়াতে পারে।

সামনেই একটা রেস্টুরেন্ট। পাশে পেট্রল পাম্প। অর্জুন লক্ষ করেছে এখানকার পাম্পের গায়ে দাম লিখে বোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়। পাম্পের শোরুমে রুটি থেকে সিগারেট সবকিছু পাওয়া যায়।

ওরা রেস্টুরেন্টে ঢুকল। এখন বিকেল হয়ে গিয়েছে। অবশ্য এখানে রাত নামে অনেক দেরিতে। দরজার পাশেই টেলিফোন বুথ। অর্জুন মেজরকে বলল, টু ওয়ান টু ফাইভ জিরো ফাইভ টু নাম্বারটা ধরে দেবেন?

কার নাম্বার? মেজর চোখ ছোট করলেন।

নাম্বার কার তা আমি জানি না। গ্যাব্রিয়েলা বললে মারা যাওয়ার আগে ওই নাম্বার জিম তাকে বলেছে পুলিশকে দিতে।

ও হ্যাঁ, হ্যাঁ। তোমার তো বেশ স্মরণশক্তি, আমার মনেই ছিল না। এটা লং ডিসট্যান্স কল হবে। মেজর টেলিফোন তুললেন।

আমেরিকার পাবলিক টেলিফোনের সিস্টেম খুব মজার। পকেটে কার্ড থাকলে সাধারণ একটা বুথ থেকে পৃথিবীর যে-কোনও প্রান্তে ফোন করা যায়। কিন্তু ওটা না থাকলে বিপদ। নিউ ইয়র্ক থেকে লস অ্যাঞ্জেলিস ফোনে কথা বলতে গেলে কোয়ার্টার দিতে দিতে প্রাণ বেরিয়ে যাবে। পঁচিশ সেন্টে ভারতীয় সিকির মতো ওদের কোয়াটার হয়। অত কোয়াটার কেউ পকেটে রাখে না। ফলে কার্ড ছাড়া ফোন করা ঝকমারি।

মেজর বললেন, কুইক, রিং হচ্ছে।

অর্জুন এগিয়ে গিয়ে রিসিভার তুলল। ওপাশ থেকে কেউ সেই মুহূর্তে গম্ভীর গলায় বলল, হেলো? কে বলছ?

বস-এর সঙ্গে কথা বলতে চাই।

কে বলছ। তোমার নাম এবং কোড নাম্বার বলো।

আমি জিমের বন্ধু, আমার কোড নাম্বার হল সাপের লকেট।

কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ, তারপর প্রশ্ন ছুটে এল, কে?

একটু আগে পরিচয় দিয়েছি বস।

কোত্থেকে বলছ?

সেটা বলা যাবে না। আপনি জিমকে খুন করলেন কেন? ও তো কোনও অন্যায় করেনি। আপনার দলের লোকের ওপর এমন অকারণে অত্যাচার করলে ওরা তো আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে।

তুমি কে?

আমি সেই সাপের মালিক, যে সাপ আপনাকে ধ্বংস করতে পারে। শুনুন, গাড়িটা ফিরে যাচ্ছে নিউ ইয়র্কে। আপনার লোকজনকে এখনই নির্দেশ দিন যাতে কেউ ওদের ক্ষতি করতে না পারে।

কোন গাড়ি?

দেখুন, আমি আর কথা বাড়াচ্ছি না। শুধু দেখতে চাই হাইওয়েতে কোনও অ্যাকসিডেন্ট হচ্ছে না। রিসিভার নামিয়ে রাখতেই অর্জুন দেখল একটা পুলিশের গাড়ি সামনে এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নামল দুটো বিশাল চেহারার পুলিশ। দুজনেই কালো। অর্জুন দ্রুত মেজরকে নিয়ে একটা থামের আড়ালে চলে যেতে পুলিশ দুটো এগিয়ে এল।
পুলিশদুটো হেলতেদুলতে খানিকটা তফাতে এসে দাঁড়াল। এত বড় শরীরের পুলিশ অর্জুন কখনও দ্যাখেনি। প্রথমজন বলল, রেস্টুরেন্টের ভেতরটা একবার দেখে এসো।

দ্বিতীয়জন পা বাড়াতেই বিপ বিপ শব্দ বাজল। প্রথম পুলিশ কানে রিসিভার তুলল, মাইক স্পিকিং। নো, নো ট্রেস। বাট এভরিথিং ইজ ফাইন হিয়ার। ওকে।

দ্বিতীয় পুলিশটি ফিরে আসতেই প্রথমজন বলল, লেটস গো।

পুলিশের গাড়িটা বেরিয়ে যেতেই মেজর কথা বললেন, আমি বুঝতে পারছি, মাফিয়াদের হয়ে পুলিশ আমাদের খোঁজ করছে নাকি?

গেট ভেঙে বেরিয়েছি, সাইরেন বেজেছে, পুলিশ তো চারপাশে খোঁজ করবেই। চলুন ভেতরে যাওয়া যাক।

রেস্টুরেন্টের যে দিকটায় বসলে রাস্তা পরিষ্কার দেখা যায় সেদিকের টেবিল নিল ওরা। দুপুরে যা খাওয়া হয়েছিল, এতক্ষণের উত্তেজনায় তা কখন হজম হয়ে গিয়েছে। মেজর নিজের জন্যে একটা বিগম্যাক, অনেকটা লম্বা আলুভাজা আর বেশ বড় গ্লাসের চকোলেট মিল্ক কেক নিলেন ওই মিল্ক কেক খেতে খুব ভাল। চকোলেটের গন্ধমাখা ঘন ক্ষীরের মতো। কিন্তু খেলেই পেট ভারী হয়ে যায়। ওজন বাড়বেই। কথাটা মনে করিয়ে দিলে মেজর বললেন, সমুদ্রে দুবালতি জল ঢাললে কী এমন ক্ষতি হবে? অর্জুন চিকেন ফ্রাই আর কফি নিল।

খাওয়ার সময় মেজর কথা বলা পছন্দ করেন না। শেষপর্যন্ত তৃপ্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী বুঝলে?

কোনটা?

আরে টেলিফোনে কথা বলে কী মনে হল?

বুঝতে পারলাম না। তবে ওরা নাড়া খাবে।

হুঁঃ। মুশকিল। গাড়িটাকে ছেড়ে দেওয়া হল, এখন এখান থেকে বের হবে কী করে? এই শহর থেকে ওদের চোখ এড়িয়ে বের হওয়া প্রায়।

অসম্ভব।

এখান থেকে বাস বাইরে যায় না?

যায়। মেজর বললেন, বাসে ওঠার জন্যে টার্মিনালে যেতেই তো ওদের নজরে পড়ে যাবে।

রাস্তায় হাত দেখালে বাস থামবে না?

নো, নো, নন। মাথা নাড়লেন মেজর।

অর্জুন হতাশ ভঙ্গিতে মুখ ঘুরিয়ে রেস্টুরেন্টের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রোগা শীর্ণ চেহারার একটি লোক তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখাচোখি হতেই লোকটি হাসবার চেষ্টা করল। অর্জুন গম্ভীর হয়ে আছে দেখে এবার বাঁ হাত সামান্য উচুতে তুলে নাড়ল। অর্জুন ইশারায় লোকটাকে কাছে ডাকতেই সে প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে চলে এল।

আপনারা খুব বিপদে পড়েছেন, তাই না? ফিসফিসিয়ে বলল লোকটা। বলছে ইংরেজিতে কিন্তু আমেরিকানদের মতে ইংরেজি নয়। কিন্তু এর গায়ের রং সাদা, চোখ কটা, চুল বাদামি।

তোমাকে কে বলল? মেজর সন্দিগ্ধ হলেন।

হুঁ হুঁ বাবা। আমি টের পাই। কেউ বিপদে পড়তেই বুঝতে পারি।

তুমি মেক্সিকান?

হ্যাঁ। কিন্তু আমাকে একটা মিল্ক কেক খাওয়াবে?

মেজর কিছু বলার আগেই অর্জুন ডলার বের করে লোকটাকে দিল। লোকটা সুড়ত করে কাউন্টারের দিকে চলে যেতে মেজর বলল, না, না, এদের প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। ভিখিরি দলের একজন। পয়সা নষ্ট।

অর্জুন হাসল, মিল্ক কেকটা তো আপনার মতো আমিও খেতে পারতাম।

ইতিমধ্যে গ্লাস নিয়ে লোকটা ফিরে এল টেবিলে। চেয়ার টেনে বসে স্ত্র ঢুকিয়ে বিরাট একটা টান দিয়ে চোখ বন্ধ করে গিলল। তারপর বলল, প্রব্লেমটা কী? পুলিশ দেখে থামের আড়ালে লুকোলে কেন?

অর্জুন মেজরকে এক পলক দেখে নিয়ে বলল, আমরা চোর-ডাকাত নই।

সেটা তো চেহারা দেখেই বুঝে নিয়েছি। আবার ঐ ঠোঁটে নিয়ে টানল লোকটা, পুলিশের হাত থেকে বাঁচা খুব মুশকিল ব্যাপার। এক, কোনওক্রমে যদি আমেরিকা ছেড়ে যেতে পারো। এখান থেকে সেটা সম্ভব নয়। অবশ্য যদি রাতারাতি কানাভা বর্ডার পার হতে পারো।

আমেরিকা ছাড়ার দরকার নেই। এই আটলান্টিক সিটি থেকে কী করে চুপচাপ বেরিয়ে যাওয়া যায় বলতে পারো? মেজর জিজ্ঞেস করলেন।

লোকটা তাকাল। ওর মুখ আঁ হয়ে গেল। তারপর নিচু গলায় সে বলল, তার মানে পুলিশ নয়। তোমরা ভয় পাচ্ছ ওদের?

ওদের মানে? অর্জুন জিজ্ঞেস করল।

যারা এই শহরটাকে চালায়। মাই গড। আগে জানলে এটা খেতাম না। আমি ঠিক বলছি, তাই না?

মেজর জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী করো?

কিছু না। আমার কিছু করার ক্ষমতা নেই। ওরা সমস্ত ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে।

কারা?

না। আমি মুখ খুলব না। তোমরা কারা?

অর্জুন বলল, আমরা ভারতবর্ষের লোক। ইন্ডিয়া। ইন্ডিয়ার নাম শুনেছ?

তোমরা তোমাদের প্রাইম মিনিস্টারকে গুলি করে মেরেছিলে। তাই না?

আমরা মারিনি। কয়েকজন নির্বোধ মেরেছিল।

হ্যাঁ, শুনেছি। এখানে কী করতে এসেছ তোমরা?

বেড়াতে।

কী করে বিশ্বাস করব?

অর্জুন পাশপোর্ট বের করে দেখাল। আমেরিকার ইমিগ্রেশনের স্ট্যাম্প দেখে লোকটা যেন চিন্তায় পড়ল। মেজরের কাগজপত্র দেখতে চাইল না সে। তারপর চারপাশ তাকিয়ে নিয়ে বলল, এখানে কথা বলা ভুল হবে।

তা হলে?

আমি এখান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি। তোমরা কিছুটা দূরত্বে থেকে আমাকে ফলো করো। যদি বিপদে পড়ো তা হলে চেঁচিয়ে দয়া করে ডেকো না। লোকটা উঠে দাড়াতেই মেজর বলল, ওহে, তোমার নামটা এখনও বলনি।

আমার নাম মারিও। গ্লাস শেষ করে লোকটা ওটাকে গারবেজ বাক্সে ফেলে দিয়ে বেরিয়ে গেল। মেজর জিজ্ঞেস করলেন, কী করবে? ওরকম বাউন্ডুলে লোকের কথায় বিশ্বাস করবে?

বিশ্বাস না করা ছাড়া কোনও উপায় নেই।

কিন্তু ও যদি ওদের লোক হয়?

কিছু করার নেই। অর্জুন উঠে পড়ল।

মারিও হেলতে-দুলতে আগে-আগে যাচ্ছে। অর্জুন মেজরের পাশাপাশি হাঁটতে-হাঁটতে লক্ষ করল মারিও গলি বা নির্জন রাস্তা ধরে এগোচ্ছে। এসব রাস্তায় গাড়ি তেমন নেই, মানুষজনও কম। মিনিট সাতেক হাঁটার পর পেছনদিকে না তাকিয়ে মারিও হাত নাড়ল এগিয়ে যেতে। ওরা কাছে পৌঁছতে মারিও বলল, বাঁ দিকের বাড়িটা জনসনের। ব্যাটা এখন নেশা করে আউট হয়ে আছে। দরজা খোলা। তোমরা ওর বসার ঘরে গিয়ে অপেক্ষা করো।

আমি দশ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসছি। পাখির মতো উড়ে গেল লোকটা।

অর্জুন দেখল পাশের বাড়ির দরজা আধা-ভেজানেনা। সেখানে কোনও লোক আছে বলে মনে হচ্ছে না। মেজর বললেন, নো অর্জুন। আমার মনে হচ্ছে এটা একটা ট্র্যাপ। ওই বাড়িতে আমাদের ঢুকিয়ে দিয়ে ও মাফিয়াদের খবর দিতে গিয়েছে।

অর্জুন বলল, আমার তা মনে হয় না।

অত ভালমানুষি এখন কাজ দেবে না অর্জুন!

দেখুন, ও যদি মাফিয়াদের খবর দিতে চাইত তা হলে আমাদের রেস্টুরেন্টে বসিয়েই সেটা করতে পারত। চলুন, দেখা যাক।

দরজা ঠেলে ভেতরে পা বাড়াতেই নাক ডাকার আওয়াজ কানে এল। কোনও মানুষ এমন বীভৎস শব্দে নাক ডাকতে পারে তা না শুনলে বিশ্বাস করা কঠিন। ঘরটি সাধারণ। জরাজীর্ণ একটি সোফা আর টিভি রয়েছে দেখল। অর্জুন ভেতরের ঘরে উঁকি মারল। সেই ঘরে খাটে চিত হয়ে শুয়ে একটি প্রৌঢ় অঘোরে ঘুমোচ্ছে। পাশের টেবিলে হুইস্কির বোতল, গ্লাস।

ভেতরের দরজা বন্ধ করে সোফায় বসতেই অর্জুনের পাশে এসে বসে মেজর বললেন, সর্বনাশ, আমাকেও দেখছি হারিয়ে দিচ্ছে।

অর্জুন হেসে ফেলল। মেজরও সশব্দে নাক ডাকেন। কিন্তু সে কথা বলতে ইচ্ছে হল না।

তুমি বলছ মারিওকে বিশ্বাস করা যেতে পারে?

না করে উপায় কী?

আমি নিউ ইয়র্কে ফিরে গিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসে চিঠি লিখব। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের জানা উচিত মাফিয়ারা কীরকম বেড়ে উঠেছে। ডেঞ্জারাস। বলতে বলতে টিভির দিকে তাকালেন মেজর। তারপর উঠে গিয়ে সেটাকে চালু করলেন। নব ঘোরাতেই খবর চালু হল। পাকিস্তানে উগ্রপন্থী আততায়ীদের হাতে মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন। পাক প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, যত শিগগির সুম্ভব খুনিদের গ্রেফতার করা হবে। আজ বিকেলে এক সড়ক দুর্ঘটনায় দুজন মহিলা নিহত হয়েছেন। অনুমান করা হচ্ছে তাঁরা আটলান্টিক সিটিতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার সময় তাঁদের গাড়িকে একটি ভারী ট্রাক পেছন থেকে ধাক্কা মারে। গাড়িটি ঘটনাস্থলেই চুরমার হয়ে যায়। মহিলা দুজনকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার ডাক্তাররা মৃত বলে ঘোষণা করেন। ট্রাকের ড্রাইভার ট্রাক নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেলেও ট্রাকটিকে পরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। ড্রাইভারের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ঘোষকের কথার পাশাপাশি ছবি দেখানো হল।

মেজর চিৎকার করে উঠলেন, মাই গড!

অর্জুন ঠোঁট কামড়াল। তার চোখের সামনে সিম্বা এবং গ্যাব্রিয়েলার মুখ ভেসে উঠল। সে ফোন করে অনুরোধ করা সত্ত্বেও ওরা ওদের খুন করল। সিম্বা আজই ফিরতে চেয়েছিল নিউ ইয়র্কে। ওদের অনুরোধে বেচারা এসেছিল আটলান্টিক সিটিতে। গ্যাব্রিয়েলার কোনও প্রয়োজন ছিল না, শুধু জিমের কথা ভেবে তিনি যোগাযোগ করেছিলেন, এখানে এসেছিলেন, অর্জুন দেখল ঘরের এক কোণে টেলিফোন রয়েছে।

সে উঠে ডায়াল করল। ওপাশ থেকে কেউ বলল, হেলো।

আমি বস-এর সঙ্গে কথা বলতে চাই?

তোমার কোড নাম্বার?

লকেটের সাপ।

বলমাত্র সব চুপচাপ হয়ে গেল। তারপর ভারী গলা শুনতে পেল অর্জুন, হেলো!

আমি তোমাকে অনুরোধ করা সত্ত্বেও মেয়েদের খুন করলে কেন?

আমি খুন করিনি।

কিন্তু এর পরিণাম খুব খারাপ হবে।

আমি যার জন্যে দায়ী নই তা কেন আমার খারাপ করবে।

আমি এখনও লকেটটার মালিক। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ। তারপর লোকটা বলল, হে ম্যান, তোমার মতো আমিও জানি ওইসব সাপের গল্প অর্থহীন। কবে কখন যে গল্প তৈরি হয়েছিল তা আফ্রিকার নিবোধ মানুষ বিশ্বাস করে চলেছে এখনও এবং তা থেকে তুমি ফায়দা লুঠতে চাইছ। আমারও একই ধান্দা। তোমরা বোর্ডের একজন রেসপেক্টেড মেম্বারের বাড়ি ভেঙে পালিয়ে গেছ। ওই গাড়িতে তোমরা আছ মনে করে অ্যাকসিডেন্ট করানো হয়েছে। এর পেছনে আমার কোনও ভূমিকা নেই। আমার ওই লকেটটা চাই। তার বদলে কী চাও তুমি?

ওয়েল। এ নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু তুমি আটলান্টিক সিটি থেকে কিছুতেই বেরিয়ে আসতে পারবে না। ওখানে তোমার সঙ্গে কথা বলতে গেলে আমার শত্রু বেড়ে যাবে। দ্যাখে, যদি বেরিয়ে আসতে পারে তা হলে আগামীকাল সকাল দশটায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সামনে অপেক্ষা কোরো। হঠাৎ রিসিভার হাতছাড়া হয়ে গেল। অর্জুন ঘুরে দেখল মারিও লাইনটা কেটে দিয়ে রিসিভার নামিয়ে রাখছে।

কী হল? অর্জুন রেগে গেল। তুমি কি ওদের সঙ্গে কথা বলছিলে?

হ্যাঁ।

তোমরা যে এত নিবোধ তা ভাবিনি। কথা বলে সময় নিয়ে ওরা এতক্ষণে ট্রেস করে ফেলেছে কোন টেলিফোন থেকে কলটা গিয়েছিল। পালাতে চাও তো ফলো মি, কুইক। মারিও দরজার দিকে এগোল।

সরু গলি দিয়ে খানিকটা হাঁটতেই ওরা সমুদ্র দেখতে পেল। তীর থেকে বেশ কিছুটা দূরে একটা ছোট বজরা ভাসছে। দূরে প্রচুর লোক নৌকো নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নৌকোগুলো শৌখিন। মারিও জিজ্ঞেস করল, সাঁতার কাটতে পারো?

মেজর বললেন, সাঁতার? হ্যাঃ। একবার প্রশান্ত সাগরের নীচে–।

মারিও তাকে থামিয়ে বলল, এখানে জল কম। সাঁতরে ওই বজরায় উঠতে হবে। কুইক। বলে লোকটা জামা-জুতে সুষ্ঠু জলে নেমে পড়ল। জলপাইগুড়ির করলা নদীতে একসময় সাঁতার শিখেছিল অর্জুন। কিন্তু জুতো-প্যান্ট পরে সে কখনও সাঁতার কাটেনি। কিন্তু বিপদ যখন পেছনে তাড়া করে আসছে তখন আর দ্বিধা করে লাভ নেই। সে প্রায় স্থির জলে সাঁতার কাটতে কাটতে শুনল জলে বিকট শব্দ হল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল মেজর জল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলছেন, হেঁটেই যাওয়া যায়। জল বেশি নেই। ভদ্রলোক শেষপর্যন্ত বেশ নাকানিচুবুনি খেয়ে বজরায় উঠলেন। ভিজে জামা-প্যান্টে শীত করছে। এই সময় ভেতর থেকে একটি নারীকণ্ঠ ভেসে এল, মারিও ওদের ভেতরে আসতে বলে। আমি চাই না কেউ বাইরে থেকে ওদের দেখতে পাক।
মারিও ওদের বজরার ভেতরে নিয়ে গেল।

একটা সুন্দর সাজানো ঘর। কার্পেটে মোড়া। ঘরের এক কোণে সোফায় যে মহিলা বসে আছেন তিনি অত্যন্ত স্ফীতকায়া। এককালে যে সুন্দরী ছিলেন, তা মুখের আদলে বোঝা যায়। পরনে দামি স্কার্ট, চোখে সোনার ফ্রেমের চশমা। এই সময় একটা শব্দ পেছন থেকে কানে আসতে অর্জুন অবাক হয়ে ফিরে তাকাল। শব্দটা বেরিয়েছে মেজরের দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে ঢাকা মুখ থেকে, হা! ম্যাডাম মন্টেগোমারি।

মহিলার চোখ ছোট হল। তারপর বিচিত্র অভিব্যক্তি ফুটে উঠল মুখে। একগাল হেসে তিনি সস্নেহে চিৎকার করলেন, ও মাই ডিয়ার মেজর! হোয়াট এ সারপ্রাইজ! বলতে বলতে তিনি দুহাত বাড়িয়ে দিলেন সোফায় বসেই।

সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলেন মেজর, আই কান্ট বিলিভ। পৃথিবীটা কি ঠিকঠাক ঘুরছে? বলতে বলতে মহিলার হাত দুটো ধরে নিজের দাড়ি-গোঁফের ওপর চেপে ধরলেন। সঙ্গে সঙ্গে মহিলা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। সে হাসি আর থামতে চায় না। মেজর একটু স্কচকিয়ে বললেন, ওঃ, আপনি ঠিক আগের মতো আছেন।

সুড়সুড়ি—ওঃ–কী সুড়সুড়ি মরে যাব। আমার দুই তপসে মাছ। হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলেন মেজর? হাসি শেষপর্যন্ত সামলাতে পারলেন তিনি।

মেজর বললেন, বলছি, বলছি। এই বজরা আপনার?

আর কার হবে? আমাদের মন্টেগোমারি ফ্যামিলির ফ্ল্যাগ দ্যাখেননি? ওটা নিশ্চয়ই ওপরে উড়ছে। ম্যাডাম সোজা হয়ে বসলেন।

ওহে। লক্ষ করিনি। আসলে জলে ভিজে–।

হ্যাঁ, বিশ্রীরকমের ভিজে গিয়েছেন আপনারা। ম্যাডাম হাততালি দিতেই ভেতরের দরজায় একটি প্রৌঢ় এসে দাঁড়াল, জন, এদের দুজনকে শুকনো পোশাক দাও। আর বজরা ছেড়ে দিতে বলো।

আমরা কোনদিকে যাব ম্যাডাম?

নিউ জার্সি।

জনের পেছন-পেছন ওরা পোশাক ছাড়ার ঘরে এল। জন বলল, স্যার, আমার স্টকে আপনাদের মানাবে এমন কোনও শার্ট-প্যান্ট নেই। তবে দুটো আলখাল্লা আছে। আপনাদের জামা প্যান্ট যতক্ষণ না শুকোচ্ছে ততক্ষণ কি ওটা পরে থাকতে অসুবিধে হবে?

মেজর বললেন, আলখাল্লা? চমৎকার!

আলখাল্লা দুটো দিয়ে জন চলে গেলে বজরা দুলে উঠল। অর্জুন পোশাক পালটাতে-পালটাতে জিজ্ঞেস করল, আপনার সঙ্গে অনেকদিনের আলাপ?

অফ কোর্স। নাইনটিন সেভেনটি টু। আমি স্থির করেছিলাম প্রশান্ত মহাসাগরের তলায় যেসব ঝিনুকে মুক্তো পাওয়া যায় তাদের মুভমেন্ট দেখব। বুঝতেই পারছ বেশ খরচসাপেক্ষ ব্যাপার। আমাদের অভিযাত্রী সঙ্ঘ থেকে আবেদন করা হয়েছিল সাহায্যের জন্যে। সেই সময় এডওয়ার্ড আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

এডওয়ার্ড কে?

ওঃ। এডওয়ার্ড হল ম্যাডামের ভাই। যেমন মোটা তেমনই জমাটি লোক। বলল, টাকা-পয়সা নিয়ে কোনও সমস্যা হবে না, তবে ও আমাদের সঙ্গে যেতে চায়। উটকো লোককে সঙ্গে নেওয়া ঠিক নয় বলে প্রথমে আমি রাজি হইনি। তারপর অন্য সবার চাপে রাঙ্গি হতে হয়। তা আমরা যখন প্রশান্ত মহাসাগরে জাহাজ দাঁড় করিয়ে রেখে কাজ শুরু করেছি ঠিক তখন আর-একটা বড় লঞ্চে সেখানে হাজির হন ম্যাডাম। এডওয়ার্ড তাঁর একমাত্র ভাই, যদি জলে কোনও বিপদ হয় তাই তিনি তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছেন। অথচ এডওয়ার্ড ফিরে যাবে না। শেষপর্যন্ত সদ্য তোলা একটা ঝিনুকের বুক থেকে পাওয়া দারুণ মুক্তো আমি ম্যাডামকে উপহার দিই। সেটা পেয়ে উনি খুব খুশি হন। আমার কাছ থেকে কথা আদায় করে নেন যে আমি ওঁর ভাই-এর দেখাশোনা করব। তারপর আমাদের বেশ দেখাশোনা হত। হঠাৎ কাগজে পড়ি এডওয়ার্ড অতি ওজনের জন্যে মারা গিয়েছে। মনখারাপ হয়ে গিয়েছিল। আমি আর যোগাযোগ রাখিনি।

কিন্তু উনি তো আজ ভাইয়ের কথা কিছু বললেন না?

তাই তো দেখলাম। উনি বললেন না বলে আমিও জানতে চাইলাম না। হয়তো ওই প্রসঙ্গ উঠলে ওঁর মনখারাপ হয়ে যাবে।

সাজগোজ করে ওরা আবার ম্যাডামের সামনে গিয়ে বসল। তখন বজরা চলছে। দূরে স্থলভূমি সরে-সরে যাচ্ছে। মেজর অর্জুনের পরিচয় দিলেন।

মাদাম চোখ তুললেন, তাই নাকি? তুমি এই বয়সে ওসব করো?

মেজর বললেন, ও কিন্তু অনেকদিন ধরেই করেছে। এখন বিখ্যাত।

আমি তোমাকে একটা কেস দিতে পারি।

বলুন।

কেসটা শুনে হয় বলবে পারবে, নয় পারবে না। আমি স্পষ্ট শুনতে পছন্দ করি। ম্যাডাম জানলা দিয়ে জনের দিকে তাকালেন। তীরভূমি দূরে সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ তারা আটলান্টিক সিটি থেকে বেরিয়ে আসছে। অর্জুন কাছেপিঠে মারিওকে দেখতে পেল না। সে বলল, আপনি স্পষ্ট উত্তরই পাবেন।

আমার ভাইয়ের নাম এডওয়ার্ড। মেজর তাকে চেনেন। গত বছর কাগজে বেরিয়েছিল বেশি খেয়ে ওজন বেড়ে যাওয়ায় এডওয়ার্ড মারা গিয়েছে।

হ্যাঁ। আমি খবরটা পড়েছি। মেজর বললেন।

কিন্তু সে মারা যায়নি। ম্যাডাম গম্ভীর মুখে বললেন।

সে কী! মেজর অবাক!

তাকে বাঁচিয়ে রাখতে মেরে ফেলতে হয়েছে। ব্যাপারটা খুলে বলি। আমার ভাইয়ের সমস্যা হল সে কিছুতেই ওজন কমাতে পারছে না। অবশ্য সে তার জন্যে ব্যায়াম বা ডায়েটিং করতে নারাজ। বিভিন্ন রকম ওষুধ খেয়ে সে ওজন কমাবার চেষ্টা করছিল। এই সময় তাকে কেউ বলে আফ্রিকায় একধরনের প্রাকৃতিক চিকিৎসা আছে যা করালে হু হু করে ওজন কমে যায়। সেই শুনে সে আফ্রিকায় গিয়েছিল। সেখান থেকে ফিরে এসে একজন আফ্রিকান ভদ্রলোকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ওই ভদ্রলোক নাকি তাকে রোগা করে দেবেন। কিন্তু আমরা দেখলাম লোকটার দেওয়া শেকড় খেয়ে ওর মস্তিষ্ক স্থির থাকছে না। ভদ্রলোক ওকে দিয়ে যা ইচ্ছে করাতে পারতেন। এমনকী আমাদের পারিবারিক সম্পত্তিও ওকে লিখে দিতে বলেন। আমি ভদ্রলোককে শাসানোর পর ওর ওপর দুবার হামলা হয়। টেলিফোনে শাসানো তো ছিলই। শেষপর্যন্ত ও আমাকে প্রস্তাব দেয় ওকে মৃত বলে ঘোষণা করতে। ফিনল্যান্ডে গিয়ে আমরা ওকে একটা নির্জন স্যানাটোরিয়ামে রেখে আসি। ও মারা গেছে জানার পর ওরা শান্ত হয়ে যায়। আমার ভয় ওরা ওকে দিয়ে কিছু লিখিয়ে নিয়েছে। এখন পর্যন্ত কেউ কোনও দাবি করেনি কিন্তু আমি স্বস্তি পাচ্ছি না। তুমি কি সত্যিটা জানতে পারবে?

আমি চেষ্টা করব।

বেশ। খরচের কথা ভেবো না। আমি সেই লোকটার নাম ঠিকানা দেব।

কিছু মনে করবেন না, ওই আফ্রিকান বিশেষজ্ঞের নাম কি মিস্টার আলাম্বা? অর্জুন সরাসরি প্রশ্ন করল।

মাই গড! তুমি জানলে কী করে? চোখ বড় হয়ে গেল ম্যাডামের।

মেজর তখন সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। ওরা যে প্রাণ হাতে করে মারিওর সঙ্গে পালিয়ে এসেছে তা জানার পর ম্যাডাম বললেন, তোমরা খুব ভাগ্যবান। মাফিয়াদের ভয় করে না এমন কেউ আমেরিকায় নেই। ওদের ওপর মারিওর রাগ আছে। তাই তোমরা বেঁচে গেলে। কিন্তু মিস্টার আলাম্বার সঙ্গে ওদের কোনও সম্পর্ক নেই বললে?

হ্যাঁ। এব্যাপারে আমি নিশ্চিত। তা ছাড়া আমরা গাড়িতে আছি ভেবে ওরা মিস্টার আলাম্বার মেয়ের গাড়িটাকে টার্গেট করেছিল। নিরপরাধ মেয়েটি আর এক ভদ্রমহিলা সেই দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন।

ম্যাডাম কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কী চাও? ওদের সঙ্গে লড়াই করতে তোমরা পারবে না।

মেজর বললেন, কিন্তু ওদের শাস্তি দেওয়া উচিত।

ম্যাডাম বললেন, ওপাশে একটা শোয়ার ঘর আছে। তোমরা ওখানে বিশ্রাম করো। একটা মোটরবোটের আওয়াজ পাচ্ছি। তোমাদের কেউ দেখে ফেলুক তা আমি চাই না।

জন ওদের নিয়ে গেল ভেতরে। ততক্ষণে জামাপ্যান্ট শুকিয়ে ভাঁজ করে রেখেছে বজরার লোকজন। পোশাক বদলে নিল ওরা। এমনকী যে জুতোজোড়া ভিজে সপসপ করছিল তা এখন খটখটে।

মেজর বললেন, আর চিন্তা করে কোনও লাভ নেই। আমি একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। ভদ্রলোক সরু বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলেন।

অর্জুন শুনল মোটরবোট বজরার পাশে এসে থামল। কে এসেছে জানার কৌতূহল হচ্ছিল খুব। কিন্তু এখান থেকে বের হলে বিপদ ডেকে আনবে সে। কী করা যায়? অর্জুন ভাবছিল। সুধামাসি যদি এখন মেয়ের কাছে আরও কিছুদিন থেকে যান তা হলে সে স্বচ্ছন্দে দেশে ফিরে যেতে পারে। লকেটটা হাতছাড়া না করে জলপাইগুড়িতে ফিরে গিয়ে ওটাকে না হয় অমলদার বাগানের মাটিতে পুঁতে দেবে সে। এখানে তার কোনও সমস্যা সমাধানের দায় নেই। দায়ের কথা ভাবতেই মনে হল সে একটু আগে ম্যাডামকে কথা দিয়েছে তাঁর ভাইয়ের ব্যাপারটা সমাধান করতে চেষ্টা করবে। কী করা যায়?

হঠাৎ তার খেয়াল হল। ভেজা জামাপ্যান্ট ছাড়ার সময় সে মোজা খুলেছিল। মোজার মধ্যে লকেটটাকে রেখেছিল সে। সে দেখল জুতো আছে কিন্তু মোজা নেই। মেজরের মোজা কিন্তু ঠিকঠাক রয়েছে।

সে দ্রুত দরজা খুলে প্যাসেজে উঁকি মারল। কোনও লোকজন নেই যেখানে ওরা জামাপ্যান্ট বদলেছিল, সেখানে পৌঁছে দেখল মোজা বা লকেট পড়ে নেই। নিজের নির্বুদ্ধিতায় নিজের ওপর রেগে যাচ্ছিল অর্জুন। সে ওপাশে উঁকি মারল। এটা রান্নাঘর। সেখানে একজন কোরিয়ান যুবক রান্না করছে। আর তার বুকে লকেটটা ঝুলছে। খাবার ট্রেতে সাজিয়ে লোকটা ঘুরে দাঁড়াতেই চোখাচোখি হল। যুবকটি বলল, ফর দি নিউ গেস্ট সার।

অর্জুন হাত বাড়াল। যুবক অবাক! অর্জুন এগিয়ে এসে ওর গলা থেকে লকেটটাকে খুলে নিয়ে নিজের ঘরে ফিরে গেল। এবং তখনই মারিয়া এল, ওরা এসেছে!

কারা?

মাফিয়াদের লোক। জিজ্ঞেস করছে তোমাদের ম্যাডাম দেখেছেন কিনা! ম্যাডাম অস্বীকার করেছেন। ওরা খেতে চাইল, খাবার দেওয়া হয়েছে।

অর্জুনের মনে হল সে বেঁচে গেছে। আর একটু পরে লকেটের খোঁজ করতে গেলে ওরা কোরিয়ান যুবকের গলায় ওটাকে দেখতে পেত। ব্যস। কয়েক মুহূর্ত লাগত ওদের আবিষ্কার করতে।

একটু বাদে মোটরবোটের শব্দ হল। ওরা যে চলে গেল তা বোঝা যাচ্ছে। মারিয়া বেরিয়ে গেলে অর্জুন খাটে শুয়ে পড়ল। মেজর এখন প্রচণ্ড শব্দে নাক ডেকে চলেছেন।

নিউ জার্সির এক স্টিমারঘাটায় বজরা যখন পৌঁছল তখন মধ্যরাত। ম্যাডাম প্রচণ্ড সাজগোজ করে বজরা থেকে নামলেন। জন এবং মারিয়া ওঁর জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে পেছনে। অর্জুন আর মেজর সবশেষে। একটি লিমুজিন দাঁড়িয়ে আছে সামনে। ম্যাডাম বললেন, আমার মনে হয় এখান থেকে একসঙ্গে যাওয়াই ভাল।

ওরা গাড়িতে উঠল। ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা এখন কোথায় যাবেন?

মেজর বললেন, কুইন্সে।

কিন্তু ওখানে তো আপনাদের জন্যে ওরা অপেক্ষা করতে পারে।

মেজর অর্জুনের দিকে তাকালেন। অর্জুন বলল, ঠিকই। কদিন আমাদের গা-ঢাকা দিয়ে থাকা উচিত। ওরা একটু ভাবুক।

ম্যাডাম বললেন, আমার একটা অ্যাপার্টমেন্ট আছে কুইন্সে। ওয়েল ফার্নিল্ড। সেখানে থাকতে পারো তোমরা। পোশাক নিয়ে সমস্যা হতে পারে। ক্রেডিট কার্ড দেখিয়ে মেজর সেসব কিনে নিতে পারেন।

মিনিট পঁয়তাল্লিশ পরে ম্যাডাম মারিয়ার হাতে চাবি দিয়ে একটা সম্রান্ত অ্যাপার্টমেন্ট হাউসের সামনে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে ওঁর কার্ড অর্জুনের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, টাকার জন্যে ভেবো না। কাজটা যদি করতে পারো ওটার সমস্যা হবে না।

রাত তখন আড়াইটে। মেজর ফুটপাথে দাঁড়িয়ে বললেন, আচ্ছা ঝামেলায় পড়া গেল! চলো জামাপ্যান্ট কিনে আনি।

সে কী? এই রাতে।

এখানে একটা দোকান সারারাত খোলা থাকে।

ওটা আগামীকাল করবেন। প্লিজ।

ম্যাডামের এই খালি অ্যাপার্টমেন্ট বেশ সুন্দর। গোটা পাঁচেক ঘর এবং ফ্রিজভর্তি খাবার আছে। যদিও ওরা ডিনার বজরাতেই করে গিয়েছিল। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, এখান থেকে আপনার ফ্ল্যাট কতদূর?

জামা ছাড়তে ছাড়তে মেজর বললেন, এক কিলোমিটার।

মারিয়াকে ঠিকানাটা বলে দিন। আর চাবিটা।

কেন? তুমি কি সেখানে যাবে?

আপনার ফ্ল্যাটে যাব না।

সর্বনাশ! শুনলে না, ওরা আমাদের জন্যে অপেক্ষা করতে পারে।

ওরা দেখতে পাবে না।

আমি তোমার সঙ্গে যাব?

না। আপনি সঙ্গে থাকলে ধরা পড়ে যেতে পারি।

তুমি আমাকে আল্ডার এস্টিমেট কছ অর্জুন।

না। আপনার চেহারা লুকোতে পারবেন না। বরং এখন এখানে বিশ্রাম নিন। আমি ভোরের আগে ঘুরে আসব।

ট্যাক্সিটা ছেড়ে দিয়ে অর্জুন মারিয়াকে বলল, তুমি এখানে অপেক্ষা করো। আমি জায়গাটা চিনতে পেরেছি।
নিউ ইয়র্ক শহরের যেসব অঞ্চলে দিনের বেলায় ফুটপাথে মানুষকে হাঁটতে দেখা যায়, তাদের মধ্যে কুইন্সের নাম করা যায়। ম্যানহাটান যেমন সকাল নটা থেকে বিকেল ছটা পর্যন্ত কলকাতার এসপ্ল্যানেড হয়ে থাকে এবং তার আগে ও পরে শ্মশানের শূন্যতা, কুইন্স তেমন নয়। তবু রাত আটটার পর লোকজন গোনা যায়। আর অর্জুনরা যখন সেখানে পৌঁছল, তখন হুসহাস গাড়ির ছুটে যাওয়া ছাড়া কোনও প্রাণের চিহ্ন নেই।

নিউ ইয়র্কের রাতের রাস্তায় হাঁটলেই ছিনতাই হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। স্প্যাস্কি, সংকর রক্তের মানুষ এবং অবশ্য কালোদের রাজত্ব তখন। পুলিশের গাড়ি দেখলেই তারা গলির মধ্যে গা ঢাকা দেয়, নইলে ফুটপাথ ওদের দখলে। মারিওর সঙ্গে হাঁটতে-হাঁটতে অর্জুন দেখল, দুটো বিশাল চেহারার কালো লোক সামনের লাইট পোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের পাশ দিয়ে তাদের যেতে হবে। লোক দুটোর উচ্চতা এবং স্বাস্থ্যের কাছে টাইসন, প্যাটার্সন ইত্যাদি বিখ্যাত বক্সারদের শিশু বলে মনে হবে।

অর্জুন চাপা গলায় মারিওকে কথাটা বলতেই সে মাথা নাড়ল। তারপর নিচু গলায় বলল, জাস্ট ফলো মি।

ওদের এগিয়ে আসতে দেখে লোক দুটো ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। মারিও একটু এগিয়ে গিয়ে দুজনের সামনে হাত পাতল, গিম মি এ ডলার মিস্টার, নো ফুড, ভেরি হাঙরি। গিম মি এ ডলার।

অর্জুন হতভম্ব হয়ে কী করবে বুঝতে না পেরে দুবার মাথা নেড়ে মারিওর বক্তব্য সমর্থন করার চেষ্টা করল। লোকদুটো জুলজুল করে মারিওকে দেখল, তারপর অর্জুনকে। শেষ পর্যন্ত দুজনেই একসঙ্গে হো হো করে হাসতে লাগল। ওই বিশাল চেহারার দুটো মানুষ যে কী মজা পেয়েছে বোঝা যাচ্ছিল না, কিন্তু হাসতে-হাসতে একজন অন্যজনের হাতে চাঁটি মারছে, ফুটবলে গোল করে যেভাবে খেলোয়াড়রা মেরে থাকে। তারপর ওরা রাস্তা পেরিয়ে অন্যদিকে চলে গেল।

মারিও হাসল, দেখলে তো। ওরা নিজেদের আমাদের চেয়ে বড়লোক ভাবল।

অর্জুন মারিওর বুদ্ধির প্রশংসা করল।

বাকি পথটুকু আসতে কোনও অসুবিধে হল না। মেজরের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে অর্জুন বলল, আমি একশো ভাগ নিশ্চিত ওরা ওখানে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। বাড়িটার সামনে যেতে পারলে ভাল হত।

মারিও মাথা নাড়ল, তাতে ওদের চোখে পড়ে যাবে তুমি। দাঁড়াও। তখন ফুটপাথের লাগোয়া দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু একটা নিয়ন সাইন জ্বলে-নিভে জানাচ্ছিল সেখানে এখনও প্রাণ আছে। মারিও অর্জুনকে নিয়ে সেখানে ঢুকল। দোকানটা একটা ফ্যামিলি পাব। অর্থাৎ এ-পাড়ায় যারা থাকে তারা সন্ধের পর এখানে এসে পানভোজন করে, একটু আড্ডা মারে। এদের অবস্থা সাধারণ। অর্থবানরা এরকম জায়গায় আসে না।

লম্বা বার কাউন্টারের সামনে টুলের ওপর কয়েকজন বসে পান করছে। সামনের গোটাদশেক টেবিলে খদ্দেররা কথা বলছে, খাচ্ছে। মারিও সেই কাউন্টারের সামনে পৌঁছে অর্জুনকে একটা টুলে বসতে ইঙ্গিত করে নিজে আর একটায় বসল। তৎক্ষণাৎ কাউন্টারের উলটো দিকে একটি তরুণ এসে হেসে বলল, কল মি চার্লি। কী দেব তোমাদের?

মারিও বলল, তার আগে বলো তোমরা কতক্ষণ খোলা রাখো।

চার্লি বলল, রাত একটা পর্যন্ত।

মারিও বলল, ভালই হল। আমার এই ইয়ং বন্ধু একটু বসবে। আমি তাড়াতাড়ি ঘুরে আসছি। তারপর খাওয়াদাওয়া করব।

চার্লি মাথা নাড়ল, ওকে। ততক্ষণ তুমি একটা বিয়ার খেতে পারো।

অর্জুন মাথা নাড়ল। এরকম জায়গায় ঢোকার কথা সে জলপাইগুড়িতে বসে কল্পনাও করতে পারত না। ইচ্ছেও হত না। পানীয়ের গন্ধ পাবের বাতাসে ভাসছে আর তাতেই তার খুব অস্বস্তি হচ্ছে। গা গুলোচ্ছে। মারিও

অর্জুনের দিকে তাকাল, তুমি ড্রিঙ্ক করো না?

অর্জুন বলল, আমাদের দেশের নব্বই ভাগ মানুষই করে না। চার্লি বলল, তা হলে তুমি একটা আইসক্রিম সোডা যেতে পারো। চার্লি চলে যেতে মারিও বলল, আমি চট করে দেখে আসছি। মনে হয় এখানে যদি কেউ থাকে সে আমাকে চিনতে পারবে না।

মারিও বেরিয়ে গেলে অর্জুন দেখল কাউন্টারের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় চরকির মতো ঘুরে চার্লি ড্রিঙ্কের গ্লাস এগিয়ে দিচ্ছে। এই সময় পাবের দরজা ঠেলে একজন মহিলা ঢুকলেন। মহিলার শরীর বেশ ভারী, পঞ্চাশের কাছে বয়স, মাথায় রুমাল বাঁধা 1 চারপাশে তাকিয়ে মহিলা অর্জুনের পাশের টুলে এসে বসলেন। তারপর ব্যাগ খুলে প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে লাইটার জ্বেলে ধরালেন। চার্লি ছুটে এল, গুড ইভিনিং ম্যাডাম, বেশ কিছুদিন পরে আপনাকে দেখতে পেলাম!

আমি এখানে ছিলাম না। ধোঁয়া ছাড়লেন মহিলা।

আপনাকে জ্যামাইকান রাম দেব, তাই তো?

তোমার স্মরণশক্তি ভাল।

চার্লি দুহাতে দুটো গ্লাস নিয়ে ফিরে এল। অর্জুন দেখল তার গ্লাসে আইসক্রিম সোডার মধ্যে বরফের টুকরো রয়েছে কয়েকটা। এভাবে সে কখনও আইসক্রিম সোডা খায়নি। চুমুক দিতে আরাম লাগল।

ওয়াটার প্লিজ। ভদ্রমহিলার কথা শুনে অর্জুন অবাক হয়ে দেখল তিনি গ্লাসে পানীয় শেষ করে ফেলেছেন এক চুমুকে। চার্লি সেই গ্লাসে জল দিতেই সেটা গলায় ঢাললেন। চার্লি বলল, এবার জল মিশিয়ে দেব, তাই তো?

তুমি খুব ভাল ছেলে।

চার্লি হাসল, আপনার পাশে বসে আমাদের নবাগত অতিথি আইসক্রিম সোডা খাচ্ছেন। এই পাবে এরকম খদ্দের খুব কম আসে।

চার্লি চলে যেতে মহিলা অর্জুনের দিকে তাকালেন, তুমি এশিয়ান?

ইন্ডিয়ান।

ইন্ডিয়ার লোকেরা তো ড্রিঙ্ক করে।

সবাই করে না। আমার নাম অর্জুন।

আমি লুসি।

আপনি এ-পাড়ায় থাকেন?

না। তুমি?

আমি টুরিস্ট। এখানে একটা কাজে এসেছি।

তা কাজটা না করে পাবে বসে আছ কেন?

একটু অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

অপেক্ষা! সেটা তো আমি রাতের পর রাত করে যাচ্ছি।

আপনার কথা বুঝলাম না। ভদ্রমহিলা জবাব না দিয়ে চার্লির দেওয়া দ্বিতীয় গ্লাসটি ধরলেন।

অর্জুন লক্ষ করেছিল অপেক্ষার কথা বলার সময় ভদ্রমহিলার মুখ-চোখ কীরকম শক্ত হয়ে গিয়েছিল। এখনও গ্লাস হাতে নিয়ে তিনি ওই মুখ নিয়ে কিছু ভেবে চলেছেন। সে জিজ্ঞেস করল, আপনার দেশ নিশ্চয়ই আফ্রিকায়?

লুসি তাকালেন, আমার গায়ের চামড়াই তো সে কথা বলছে।

আফ্রিকার কোথায়?

জাম্বিয়া। লিভিংস্টোনে আমি জন্মেছি। নাম শুনেছ?

নিশ্চয়ই। জিম্বাবোয়ে, অ্যাঙ্গোলা, জাইরে আর তানজানিয়ার মাঝখানে জাম্বিয়া। তাই তো? অর্জুনের মাথার ভেতর একটা আলো চলকে উঠল।

ভদ্রমহিলা চোখ বড় করে দেখলেন, আশ্চর্য! তুমি আফ্রিকার এত খবর রাখো? এদেশে বেশিরভাগ মানুষই এইসব নাম জানে না।

অর্জুন হাসল, আরও জানি। পাশেই বসওয়ানা। তার ছোট্ট শহর গ্যাবর্ন থেকেই প্রায় কালাহারি মরুভূমি, শুরু। সেখানে মরুভূমির উপজাতিরা এসে কেনাবেচা করে। ঠিক বলেছি?

লুসি ঘুরে বসলেন, তুমি এসব জানতে গেলে কেন?

আমাদের স্কুলে এসব পড়ানো হয়।

তুমি কী করো?

একজন বয়স্কা মহিলার এই প্রশ্নের জবাবে মিথ্যে কথা বলতে পারল না অর্জুন। উত্তরটা শোনামাত্র ভদ্রমহিলার চোখ ছোট হল, গ্যাবন সম্পর্কে তুমি আর কী জানো? আমার মন বলছে তুমি সেখানে গিয়েছিলে?

না। বিশ্বাস করুন আমি কখনওই আফ্রিকায় যাইনি।

কথাটা বিশ্বাস করলেন লুসি। গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললেন, ওকে যদি একবার গ্যাবর্নে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া যেত তা হলে আমার চেয়ে খুশি কেউ হত না। ওর শরীরটাকে ওরা মরুভূমিতে পুঁতে ফেলত।

কেন?

ওদিকের মানুষরা অনেক বছর আগে মাটির তলা থেকে একটি ধাতব বস্তুতে তৈরি সাপকে উদ্ধার করেছিল। সেই সাপটি ওদের ভাগ্য খুলে দিয়েছিল। তার অধিকার নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে লড়াই হত। একদিন সেই সাপ চুরি হয়ে যায়। সেটাকে আর পাওয়া যায়নি। তখন ওরা আর একটি অবিকল ওই সাপ তৈরি করে। কিন্তু সেটা একটা ব্ল্যাক কোবরার মাথা আর খানিকটা শরীর। এই সাপটিকেও একজন চুরি করে বিক্রি করেছে কিছু বছর আগে। যে বিক্রি করেছে সে মারা গিয়েছে কিন্তু যে কিনেছে সে এদেশে আছে।

আপনিও কি ওই সাপকে ভগবান বলে মনে করেন?

না। আমি খ্রিস্টান। ওসব আমি মানি না। কিন্তু যে ওটা কিনে এদেশে পালিয়ে এসেছে সে আমার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আমার কোনও দোষ না থাকা সত্ত্বেও আমাকে ত্যাগ করে আর একজনকে বিয়ে করেছিল সে।

আপনি কি এখানে প্রতিশোধ নিতেই আসেন?

মাথা নাড়ালেন লুসি, কীভাবে নেব? এর মধ্যে ও যে কটা ফ্ল্যাট পালটেছে আমি তার সন্ধান পেয়েছি। একদিন এই পাব থেকে বেরোতে দেখেছিলাম তাকে। তারপরই মাঝে-মাঝে চলে আসি। যদি সামনাসামনি দেখতে পাই…! লুসি কথা শেষ করলেন না।

আপনি ওঁর কথা দেশে জানিয়ে দিচ্ছেন না কেন?

কাকে জানাব? ভেবেছিলাম কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে ওর ঠিকানা জানিয়ে দেব। ওদের ভয়ে সে অনেককাল নিজের দেশে যায় না।

এই সময় মারিও পাবে ফিরে এল। লুসিকে দেখে নিয়ে অর্জুনের এ-পাশের টুলে বসে চার্লিকে বলল, বিয়ার।

চার্লি বিয়ার দিয়ে গেলে তাতে চুমুক দিয়ে চাপা গলায় মারিও বলল, বাড়ির সামনে পার্ক করা গাড়িতে পাঁচজন বসে আছে।

ভেতরে ঢোকা যাবে না?

না। অন্তত ওদের চোখ এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

কিন্তু আমাদের সেই চেষ্টা করতে হবে।

দাঁড়াও, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে।

অর্জুন ঘুরে বসল, আপনি আমার সঙ্গে সহযোগিতা করবেন?

কীরকম?

অর্জুন লকেটটা বের করল। করে টেবিলে রাখল, চিনতে পারেন?

হঠাৎ ভদ্রমহিলা প্রায় পাথর হয়ে গেলেন, এটা—এটা–?

সেই সাপের লকেট, যেটা বহু বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল।

মাই গড!

আমরা এখন মিস্টার আলাম্বার ফ্ল্যাটে যাচ্ছি। মাফিয়ারা ওর ফ্ল্যাট আবিষ্কার করে ফেলেছে। মিস্টার আলাম্বার বাড়ির সামনে পাহারা দিচ্ছে ওরা। আপনি শুনে নিশ্চয়ই দুঃখিত হবেন ওঁর মেয়েকে ওরা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মেরে ফেলেছে। বেচারা নির্দোষ, কিছুই জানত না।

তুমি মিস্টার আলাদাকে চেনো? লুসির মুখে বিস্ময়!

হ্যাঁ। এটা খুব কাকতালীয় ব্যাপার যে, আপনার দেখা পেয়েছি।

তোমরা কী করতে চাও?

মিস্টার আলাম্বাকে বাঁচাতে চাই। আমাদের এক বন্ধু ওঁর ফোন নাম্বার ওদের দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। নইলে ওরা ওঁকে ধরতে পারত না।

কিন্তু আমি তো ওঁকে বাঁচাতে চাই না।

কিন্তু উনি মারা গেলে আপনি প্রতিশোধ নেবেন কী করে?

বেশ। কী করতে হবে আমাকে?

আপনি আমাদের সঙ্গে চলুন। কাছেই।

তার মানে তুমি যে কাজটা করতে এসেছ সেটা…।

হ্যাঁ, এই ব্যাপার। ইনি আমাদের বন্ধু, মারিও।

মারিও মাথা নেড়ে বিয়ার শেষ করল।
পাব থেকে বেরিয়ে খানিকটা এগিয়ে মারিও একটা টেলিফোন বুথের সামনে দাঁড়িয়ে কাউকে ফোন করল। তারপর রিসিভার নামিয়ে রেখে বলল, একটু আড়ালে অপেক্ষা করতে হবে। এখনই পুলিশ আসবে।

পুলিশ কেন? লুসি জিজ্ঞেস কল।

না হলে ওদের সরানো যেত না।

এই সময় সাইরেনের আওয়াজ হতেই ওরা দ্রুত একটা থামের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। একসঙ্গে গোটা তিনেক গাড়ি দ্রুত ছুটে গিয়ে মেজরের বাড়ির সামনে দাঁড়াল। ঝটপট পুলিশ অফিসাররা গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গেল বাড়িটার দিকে। তৎক্ষণাৎ একটি গাড়ি তীব্রগতিতে বেরিয়ে এসে রাস্তায় পড়ল। দুটো গুলির শব্দ হল। তারপর পুলিশের গাড়িগুলো ছুটল ওটার পেছনে। মারিও হাসল, কীরকম প্ল্যান করেছিলাম বলো, চলো।

এখন ব সুনসান। মেজরের বাড়ির সামনে কেউ নেই। অর্জুন মেজরের কাছ থেকে নেওয়া চাবি দিয়ে দরজা খুলল, ভেতরে ঢুকল। তারপর ওরা তিনজনে লিফটে উঠে প্রথমে দশতলার বোতাম টিপল। দরজা খুলে ওরা ধীরে-ধীরে মেজরের ফ্লাটের সামনে পৌঁছল। দরজা বন্ধ থাকার কথা, আছেও। অর্জুন চাবি দিয়ে দরজা খুলে দেখল ভেতরে আলো জ্বলছে। ফ্ল্যাটে কেউ নেই, কিন্তু তাণ্ডব হয়ে গিয়েছে এখানে। জিনিসপত্র ভাঙা, ছড়ানো। ফ্ল্যাটটা তছনছ করে গিয়েছে কারা। মেজর সঙ্গে থাকলে চিৎকার করতেন এবং পৃথিবীর যাবতীয় গালাগালি উগরে দিতেন।

লুসি জিজ্ঞেস করলেন, এরকম হল কেন?

আমাদের না পেয়ে রাগ দেখিয়ে গিয়েছে ওরা।

কারা?

আটলান্টিক সিটির মাফিয়ারা।

তারা কেন রাগ দেখাবে?

সে অনেক বড় গল্প। মিস্টার আলাম্বা বেঁচে আছেন কিনা কে জানে?

মারিও বলল, ওঁকে একটা ফোন করতে পারো?

আমি ওঁর নাম্বার জানি না। মেজর জানেন। উনি থাকেন দশতলায়। নেমে গিয়ে দেখা যেতে পারে। অর্জুন বলল।

দরজা বন্ধ করে ওরা সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসছিল। দশতলার করিডোরে পড়ার আগেই লিটের আওয়াজ হল। তিনজন লোক কথা বলতে বলতে লিট থেকে নেমে দরজার দিকে এগোল। শেষ ধাপে পা দেওয়ার আগেই অর্জুন এবং বাকি দুজন দাঁড়িয়ে গিয়েছিল সিঁড়িতেই। মিস্টার আলাদা দরজা খুলতে খুলতে বললেন, তোমরা আমার যে ক্ষতি করলে…উঃ। আমি সহ্য করতে পারছি না। গাড়িতে কে আছে কে চালাচ্ছে তা দেখার প্রয়োজন হল না?

লোকগুলো ঢুকে গেল, দরজা বন্ধ হল। লুসি বলল, ও তা হলে ওই ফ্ল্যাটে থাকে?

হ্যাঁ। মারিও, বাকি দুজনকে চেনা গেল?

হ্যাঁ। ওরা দুজনেই আটলান্টিক সিটির বোর্ডের মেম্বার।

অদ্ভুত ব্যাপার তো! অর্জুন বিড়বিড় করল।

মারিও বলল, ওদের দেখে তো মনে হল না মিস্টার আলাম্বার কোনও ক্ষতি করতে এসেছে। তাই না?

অর্জুন লুসির দিকে তাকাল, আপনি বেল টিপুন। দরজা খুলে বলবেন মিস্টার আলাম্বার সঙ্গে কথা বলতে চান। প্লিজ, মাথা গরম করবেন না। সময় নিয়ে যতক্ষণ পারেন ওঁর সঙ্গে কথা বলে যাবেন।

তোমরা?

আমরা একটু পরে আসছি।

বেল টেপার পর মিস্টার আলাদা দরজা খুলে খুব অবাক হয়ে বললেন, তুমি? এখানে? কী চাই তোমার?

লুসি বললেন, তোমার সঙ্গে কথা আছে।

সরি। আমি এখন খুব ব্যস্ত।

কিন্তু কথা তো বলতেই হবে।

আমি বলেছি এখন ব্যস্ত। আমার একমাত্র মেয়ে কার অ্যাক্সিডেন্টে মারা গিয়েছে। এই মুহূর্তে তোমার সঙ্গে কথা বলার মতো অবস্থায় আমি নেই। তা ছাড়া তুমি এখানে ঢুকলে কী করে? এ বাড়ির সিকিউরিটি সিস্টেম নষ্ট হয়ে গেছে নাকি! ডোন্ট ডিস্টার্ব মি লুসি।

সরি। আমাকে কথা বলতেই হবে। লুসির গলা চড়ল।

আমি যদি শুনতে না চাই?

তা হলে তোমার ঠিকানা ওদের হাতে পৌঁছে যাবে।

আচ্ছা। তা হলে তো তোমাকে ভেতরে আসতে বলতে হয়।

লুসি ভেতরে ঢুকে গেলে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

অর্জুন মারিওকে বলল, ভদ্রমহিলার জন্যে আমার ভয় হচ্ছে। কোনওভাবে পুলিশকে ফোন করা যায়?

ওপরের ফ্ল্যাটের চাবিটা আমাকে দাও।

চাবি নিয়ে মারিও চলে গেলে অর্জুন এক মুহূর্ত চিন্তা করল। মিস্টার আলাম্বাকে মোটেই ভীত বা সন্ত্রস্ত বলে মনে হচ্ছে না। অথচ মাফিয়া বাহিনী যদি তাঁর পেছনে লাগে তা হলে সেটাই ওঁর হওয়া উচিত ছিল।

সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বেল টিপল।

দরজা খুললেন মিস্টার আলাদা। অর্জুনকে দেখে প্রচণ্ড অবাক যে হয়েছেন তা বোঝা গেল। কিন্তু সামলে নিলেন ঝটপট, আরে! আপনি?

আমি খুব দুঃখিত, আপনার মেয়ে আমার নির্দেশ শুনে মারা গিয়েছে।

সঙ্গে-সঙ্গে শক্ত হয়ে গেল আলাম্বার মুখ, ও একটা ইডিয়ট। নইলে আপনাদের আটলান্টিক সিটিতে নিয়ে যেত না। কী চান?

আমি আপনাকে বলতে এসেছি যে আপনার জীবন বিপন্ন।

তাই নাকি?

হ্যাঁ। মেজর বাধ্য হয়ে আপনার ফোন নম্বর মাফিয়াদের দিয়েছেন। ভেতরে গিয়ে কথা বলতে পারি?

মাথা নাড়লেন আলাদা, আসুন।

ভেতরে ঢুকেই অবাক হয়ে গেল অর্জুন। ঘরের মাঝখানে একটি চেয়ারে মাথা নিচু করে বসে আছেন লুসি। তাঁর ঠোঁটের কোণ থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। ঘরের একপাশে সোফায় বসে আছেন দুজন লোক।

আলাম্বা বললেন, আপনাদের ভাগ্য খুব ভাল ভদ্রমহোদয়রা। ইউনাইটেড স্টেটকে যে লোকটি সেই হারানো সাপ দিতে এসেছে সে এখন এই ঘরে আপনাদের সামনে।

লোক দুটি উঠে দাঁড়াল। আলাদা বললেন, অর্জুন, লকেটটা দেখি।

কোন লকেট?

যেটার ড়ুপ্লিকেট আপনি করিয়েছেন।

আপনি কী করে ভাবলেন ওটা নিয়ে আপনার কাছে আসব?

কেন এসেছেন?

আপনাকে সতর্ক করতে।

অনেক ধন্যবাদ। আলাম্বা ইশারা করতেই দুজন লোক এগিয়ে এল। একজন তার হাত পেছন মুড়ে ধরল। অন্যজন তার শরীরে খুঁজতে লাগল। লকেট পেতে দেরি হল না তার। আলাম্বার গলা থেকে যুদ্ধজয়ের আনন্দ ছিটকে বের হল। লকেটটা হাতে নিয়ে বললেন, দ্যাট ইট। এত সহজে যে এটা পাব, ভাবতে পারিনি। আমার মনে হচ্ছে লুসি তুমি অর্জুনকে চেনো। তোমরা একই সঙ্গে এসেছ। তাই না?

তুমি মরো। তুমি মরলে আমি খুশি হব।

হা হা করে হাসলেন আলাদা। তারপর অর্জুনের সামনে এসে বললেন, তুমি ইন্ডিয়ান। এই সাপে তোমার দরকার নেই। কিন্তু তোমায় নিয়ে কী করি? আমার সন্দেহ হচ্ছে পুলিশ ডেকে আমার বন্ধুদের তুমি এখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করেছ।

যারা নীচে ছিল তারা আপনার বন্ধু?

হ্যাঁ, বন্ধু। এই মহিলার সঙ্গে কীভাবে পরিচয় হল?

হয়েছে।

আলাম্বা তখন বাকি দুজনের দিকে তাকালেন, বন্ধুগণ, এই লোকটিকে নিয়ে কী করা যায়?

ওর জন্যে যা বরাদ্দ হয়েছে তাই হবে।

তবে তাই হোক।

এই সময় আবার বেল বাজল। আলাম্বা খুব বিরক্ত হয়ে দরজার দিকে তাকালেন। তারপর এগিয়ে গিয়ে দরজা খুললেন। অর্জুন মারিওর গলা পেল, অর্জুন এসেছেন এখানে?,

আপনি কে?

ওর বন্ধু।

না। নেই।

আপনি মিথ্যে বলছেন।

কী চান আপনি?

অর্জুনকে।

অর্জুন দেখল মারিওর শরীরটাকে মুঠোয় ধরে ভেতরে নিয়ে এলেন আলাম্বা, এই তিনটেকে একই জায়গায় পাঠাও।

দুজনের একজন বলল, আরে! এ তো মারিও।

উঠে দাঁড়িয়ে মারিও বলল, তুমি! তুমি! তুমি আমার বউকে মেরেছ। আমার ছেলেকে মেরেছ! আই উইল কিল ইউ! ছুটে গেল মারিও। লোকটা অবলীলায় তাকে ধরে আছাড় মারল।

মারিওর শরীরটা মাটিতে পড়ে নিস্পন্দ হয়ে গেল।

আলাম্বা বললেন, এদের এমন জায়গায় ফেলে দাও যাতে পুলিশ চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে খুঁজে না পায়।

দ্বিতীয় লোকটি বলল, ব্রঙ্কসের গারবেজ ড্রেনে ফেলে দেব।

আলাম্বা লকেটের সাপের মুখটা সামনে ধরলেন। পরীক্ষা করে চোখের পাথরে চাপ দিতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর মুখে হাসি ফুটল। আলাদা বললেন, ইয়েস। এটাই সেই সাপ।

আলাদা এগিয়ে এলেন, জিভ বের করো।

অর্জুন মাথা নাড়ল, আমার ইচ্ছে নেই।

দ্বিতীয় লোকটি ঝটপট এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে অর্জুনকে এমনভাবে ধরল যে, সে নড়তে পারল না। প্রথম লোকটি এবার অর্জুনের গাল এমনভাবে টিপে ধরল যে, অর্জুন জিভ বের না করে পারল না। এবার মিস্টার আলাদা সাপের চোখের গর্তের বিষ অর্জুনের জিভে ঘষতে গেলেন। অর্জুন প্রাণপণে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। শেষ পর্যন্ত সে বাঁ পা শূন্যে তুলে আলাম্বার হাতে আঘাত করতে পারল। সঙ্গে-সঙ্গে সাপের লকেট ছিটকে আলাম্বার হাত থেকে দরজার সামনে গিয়ে পড়ল। আলাদা দৌড়ে সেটাকে তুলে নিতে যেতেই বেল বাজল। সাপটাকে তুলে দরজা খুলতেই দুজন পুলিশ অফিসার ঘরে ঢুকলেন।

সুধামাসি মেয়ের কাছে আরও কিছুদিন থেকে যাবেন। তাঁর জামাই এখন সুস্থ। অর্জুন একাই জলপাইগুড়িতে ফিরে যাচ্ছিল। সুধামাসির মেয়ে অঞ্জনাদি তাকে হিথরো এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়ে গেলেন। ভেতরে ঢোকার আগেই অর্জুন দেখতে পেল মারিও এবং লুসি এগিয়ে আসছেন।

মারিও বলল, তোমার সঙ্গে দেখা করতে এলাম।

অনেক ধন্যবাদ। অর্জুন বলল। আমাদের ভুলে যেয়ো না।

কখনও নয়।

এবার লুসি বললেন, আমি তোমাকে একটা কথা বলতে পারি? আমি খুব। সিরিয়াস।

বলুন।

আমি তোমার দিদি হতে পারি?

নিশ্চয়ই। যদি কখনও ভাইফোঁটায় দেখা হয় আপনি আমাকে ফোঁটা দেবেন। ব্যাপারটা আপনি বুঝবেন না কিন্তু সুযোগ পেলে বুঝিয়ে দেব।

লুসি বললেন, আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।

প্লেনে বসে দেশের পথে ফিরতে ফিরতে অর্জুনের মনে হল, কে ভেবেছিল, আলাম্বাই যত নষ্টের গোড়া। আসলে বদ মানুষ কখনওই ভাল হয় না।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত