রাত নিঝুম (১)

রাত নিঝুম (১)

কিরীটী

কি বিশ্ৰী বর্ষা।

ঝর-ঝর-অবিরাম ঝরিছে তো ঝরছেই-থামবার শীগগিরী কোন সম্ভাবনাই নেই।

তাই আজ কয়দিন থেকেই কিরীটীর মনটাও ঐ বর্ষার মেঘলা আকাশটার মতই যেন ভার ভার হয়ে আছে। হাতে কোন কাজকর্মও নেই। বিশ্ৰী একঘেয়ে—কারও এ ধরণের অবসর ভালো লাগে নাকি?

সারাটা দিন ধরে একটা রহস্য উপন্যাস পড়েছে কিরীটী-বিকেলের দিকে আর ভাল লাগছিল না পড়তে। বইটা মুড়ে হাতের মধ্যে নিয়ে বসবার ঘরে একটা সোফার উপর, খোলা জানােলা পথে বাইরের মেঘাচ্ছন্ন বৃষ্টি ঝরা আকাশটার দিকে ক্লান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে বসে ছিল।

এমন সময় টেলিফোনের বেল বেজে উঠলো, ক্রিং! ক্রিং! অনাচ্ছিার সঙ্গেই হাত বাড়িয়ে ফোনের রিসিভারটা তুলে নিলো। হ্যালো। মিঃ কিরীটী রায়? কথা বলছি—বলুন। আপনি কে? আমাকে তো আপনি চিনবেন না

কোথা থেকে কথা বলছেন? আমি শ্ৰীপুর স্টেট থেকে বলছি, জমিদার শশাঙ্ক চৌধুরীর ভাই মৃগাঙ্ক চৌধুরী।

বলুন। আমাদের বাড়িতে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে সেইজন্য আপনার সাহায্য চাই–

কি রকম দুর্ঘটনা?

দেখুন, আমাদের বাড়ির অনেকদিনকার পুরানো করালীচরণকে আজ সকালে হঠাৎ তার ঘরে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। ব্যাপারটা কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। স্থানীয় থানা থেকে দারোগীবাবু এসেছিলেন—তারা অবিশ্যি যা করবার করবেন–আর কি যে তারা করবেন তাও আমরা জানি। করালীচরণ এ বাড়ির বহুদিনকার পুরানো লোক-বলতে গেলে সে এ বাড়িরই একজন হয়ে গিয়েছিল—তাই ব্যাপারটা আমাদের কাছে খুবই মর্মান্তিক হয়েছে। আমরা চাই সত্যিকারের ব্যাপারটা জানতে। তাই বলছিলাম। আপনি যদি দয়া করে আমাদের এখানে একবার আসেন। তবে বড় ভাল হয়। আমাদের মনে হয়। আপনি হয়ত এ ব্যাপারের একটা কিনারা করতে পারবেন। অবিশ্যি আপনার ফিস সম্পর্কে–

কিরীটী বলে, ফিসের কথা থাক— আমি যাবো, কিন্তু আপনাদের ওখানে কি করে যেতে হবে। যদি বলে দেন–

মৃগাঙ্কবাবু বলেন–ইচ্ছা করলে আপনি গাড়িতেও আসতে পারেন-ট্রেনেও আসা যায় এখানে তবে একটু ঘুরে আসতে হয়। তবে যদি স্টীমারে আসেন তাহলে একেবারে ঘাটে এসে নামতে পারেন।

স্টীমার!

হ্যাঁ–আহিরীটোলা ঘাট থেকে সকাল-দুপুর ও সন্ধ্যায় তিনবার স্টীমার আসে।

স্টীমারেই তাহলে যাবো।

আজই আসবেন কি?

কাল যাবো।

বেশ-কোন স্টীমারে আসবেন বলুন-ঘাটে আমাদের লোক রাখব।

আপনিই বলুন না কোন স্টীমারে যাবো—

সকাল দশটা দশের সীমারে আসতে পারেন

বেশ তাই যাবো।

জেটিতে লোক থাকবে।

আচ্ছা। আর একটা কথা।

বলুন।

মৃত দেহটা কি ময়না তদন্তের জন্য পাঠান হয়েছে?

না–

তাহলে ওটা আমি যাওয়া পর্যন্ত রাখবার ব্যবস্থা করবেন। করবো।

নমস্কার |

কিরীটী হাঁক দিল, জংলী।

ভৃত্য জংলী ঘরে প্রবেশ করল; বাবু?

দেখ, কাল সকলে আমাকে একবার শ্ৰীপুরে যেতে হচ্ছে। ফিরবো কখন ঠিক করে বলতে পারছি না। কেউ যদি আমার খোঁজ করতে আসে। তবে তাকে বলিস সন্ধ্যার পরে যেন আসে।

কিরীটী জংলীর সঙ্গে কথা বলে ফোনটা আবার তুলে নিল।

হ্যালো 3033 বড়বাজার।

হ্যালো, কে কিরীটী নাকি? রিসিভারে জবাব এল।

কে সুব্রত? হ্যারে। আমি।

কী ব্যাপার?

শ্ৰীপুর চলেছি, যাবি নাকি? —তা হলে তোকে ওখান থেকে কাল সকালে pick up করে নিই।

হঠাৎ শ্ৰীপুর–

আপাততঃ বিশেষ কিছুই জানিনা। সেখানকার জমিদার মিঃ শশাঙ্ক চৌধুরীর বাড়িতে তাদের এক পুরানো চাকর নিহত হয়েছে, তারই তদন্তের আহ্বান এসেছে। তাই ভাবলাম এক এক যাব, যদি সঙ্গে যাস।

যাবো মানে-নিশ্চয়ই যাবো।

কিরীটী হাসতে হাসতে ফোনটা নামিয়ে রাখল।

পরের দিন সকালে।

সাজপোশাক সেরে নিয়ে কিরীটী জংলীকে একটা ট্যাক্সি ডাকতে বললে। ট্যাক্সিতে চেপে কিরীটী সোজা সুব্রতদের বাড়ি আমহাস্ট স্ট্রীটের দিকে চালাতে আদেশ দিল। সুব্রত একপ্রকার প্রস্তুত হয়েই দরজার সামনে অপেক্ষা করছিল। কিরীটী যেতেই সুব্রত চায়ের আদেশ দিল। কিছুক্ষণ পরে ভূত্য চা, নিয়ে এল। চা পান করেই ওরা বের হয়ে পড়ে। এবং ওরা যখন স্টীমার ঘাটে এসে পৌঁছল, কিরীটী রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে দেখে সকাল ৭-১০ এর স্টীমার ছাড়তে আর মাত্র মিনিট পাঁচেক বাকী।

ট্যাক্সিটাকে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে ওরা বুকিং অফিসের দিকে এগিয়ে চলল।

কিরীটী স্টীমারে উঠে পড়ল।

সিটি বাজিয়ে স্টীমার ছেড়ে দিল।

বর্ষার গঙ্গা। গৈরিক জলধারা তার দুকুলপ্লাবী।

ইলিশ মাছের নৌকাগুলো ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাঝেমাঝে দুএকটা লঞ্চ বা ফেরী স্টীমার এদিক ওদিক যাতায়াত করছে। দুজনে এসে রেলিংয়ের ধারে দাঁড়াল।

এই শ্ৰীপুর স্টেটের জমিদারের সঙ্গে তোর আগে কোন আলাপ ছিল নাকি কিরীটী? সুব্রত জিজ্ঞাসা করল।

না-কিরীটী বললে, তবে এদের নাম শুনেছি। মস্ত বড় ধনী লোক, অগাধ পয়সা, দুদুটো মিলের মালিক—

ব্যাপারটা কি মনে হচ্ছে তোর?

বাড়ির পুরানো চাকর অনেকদিনকার লোক—হয়ত জমিদার বাড়ির অনেক কিছুই সে জানত, যে কারণে আকস্মিক মৃত্যুটা তার চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে–আর তাতেই আমার স্মরণাপন্ন হয়েছে

তাই তোর ধারণা?

নচেৎ জমিদার বাড়িতে সামান্য একটা চাকরের মৃত্যু এমন বিশেষ কোন important বা notice করবার মত ব্যাপার নয় যাতে করে আমার মত একজন বেসরকারী সত্যানুসন্ধানীর প্রয়োজন হতে পারে, তাদের। তাই মনে হয়। এই মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চয়ই কোন জটিলতা আছে যার জন্য হয়ত ওরা আমার সাহায্য চেয়ে পাঠিয়েছে।

তোর তাই মনে হয়?–

হ্যাঁ–নিশ্চয়ই এই হত্যা ব্যাপারের মধ্যে-অবিশ্যি যদি হত্যাই হয়-তাহলে কোন জটিল রহস্য জট পাকিয়ে আছে

কিন্তু–

বুঝতে পারছি তুই কি বলতে চাস সুব্রত–জমিদার বাড়ি-প্রচুর অর্থ–অনেক লোকজন। আত্মীয়-স্বজন কে কোন মতলব মনে মনে পোষণ করছে কে জানে। কার interest–স্বর্থ কিসে কে বলতে পারে?

কাজেই ওখানে কেউ যদি ঐ হত্যার ব্যাপারটার মীমাংসার জন্য আগ্ৰহান্বিত হয়েই থাকে তাহলে আশ্চর্যের কিছুই নেই-বলতে বলতে কিরীটী মৃদু হাসে।

সত্যি–সুব্রত বলে, এত তলিয়েও তুই সব ব্যাপার ভাবতে পারিস কিরীটী–

জলের তলে ডুব না দিলে কি রত্ন মেলে রে?—তাছাড়া ডুব দিয়ে খুঁজে খুঁজে রত্ন তোলারও একটা বিচিত্র উত্তেজনা আছে বৈ কি-তাই এই রহস্য ভেদ করার ব্যাপারটার মধ্যে ঠিক তেমনি একটা বিচিত্র উত্তেজনা ও আনন্দের আস্বাদ আমি পাই–

কিন্তু আমি আশ্চর্য হই–

আশ্চর্য হোস-কেন?

তোর এই যুক্তি, বিশ্বাস ও বুদ্ধি দিয়ে তোকে কঠিন হতে কঠিন রহস্যও উদঘাটন করতে যখন দেখি–

কিরীটী প্ৰত্যুত্তরে মৃদু হেসে বলে, মানুষেরই রচিত রহস্য তা মানুষ ভেদ করবে। এতে তো আশ্চর্যের কিছু নেই সুব্রত। একটা জিনিষ ভুলিস কেন-মানুষ তো, সে তার সহজাত দুর্বলতা বাদ দেবে কি করে? তা হয় না, মানুষ মানুষের কাছে চিরদিনই হার মানতে বাধ্য হয়েছে। মানুষই জটিল প্ৰব্লেম তৈরী করে আবার মানুষই তা solve করে। এ-ই। দুনিয়ার নিয়ম। বলতে বলতে কিরীটী তার চশমাটা চোখ থেকে খুলে রুমালের মধ্যে ঘাসতে লাগল।

বেশী পথ নয়-ঘণ্টা আড়াইয়ের মধ্যেই ঘাটে স্টীমার লাগে।

জমিদার বাড়ির গাড়ি ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল। বেলা খুব বেশী হলে সবে সাড়ে বারোটা তারই মধ্যে মেঘের আড়াল থেকে হঠাৎ সূর্যের ঝালকানি জেগেছে।

স্টীমার ঘাট থেকে জমিদার বাড়ি প্রায় ক্রোশটাক পথ হবে। গঙ্গার কোল ঘেঁষে জমিদারের প্রকাণ্ড চক মিলান বাড়ি। ওদের স্টীমার স্টেশনে রিসিভ করতে এসেছিল, স্টেটের প্রাইভেট সেক্রেটারী অশোক সেন।

ছেলেটির বয়স অল্প। বছর তেইশ চব্বিশ হবে, হালে বি. এ. পাশ করে স্টেটের চাকুরী নিয়েছে। আলাপ পরিচয়ের পর একসময় কিরীটী জিজ্ঞাসা করল, পোস্ট মর্টেমের কোন ব্যবস্থা হয়েছে, জানেন কিছু?

আজ্ঞে যতদূর শুনেছি। মৃগাঙ্কবাবু থানা অফিসারকে আপনার কথা বলায় লাস এখনো ময়না তদন্তে পাঠান হয়নি। জমিদার বাড়িরই মালীর ঘরের পাশের ঘরে পুলিশ প্রহরায় রয়েছে। আপনার দেখা হয়ে গেলে লাস ময়না তদন্তে যাবে।

কথাটা মিথ্যে নয়-কিরীটী অনুরোধ করায় গতকাল মৃগাঙ্ক চৌধুরী ঐ ব্যবস্থাই করেছিল?

বিরাট চকমিলান জমিদার বাড়ি, প্রাসাদ বললেও বুঝি অত্যুক্তি হয় না।

গেটে প্রহরারত বন্দুকধারী শিখ দারোয়ান।

গেট দিয়ে গাড়ি ঢুকে গাড়ি বারান্দার সামনে এসে দাঁড়াল। অশোকই ওদের সাদর অভ্যর্থনা করে বাইরের ঘরে নিয়ে গেল।

মৃগাঙ্ক বৈঠক খানাতেই অপেক্ষা করছিল। অদূরে একটা চেয়ারে বসে পুলিশের দরোগা। মাঝে মাঝে তারা কী সব কথাবার্তা বলছে। কিরীটী আর সুব্রত এসে ঘরে প্রবেশ করতেই মৃগাঙ্কবাবু ও দারোগ উঠে দাঁড়ালেন। অশোকই পরিচয়টা করিয়ে দিল, ইনি আমাদের ছোটবাবু মৃগাঙ্ক মোহন চৌধুরী। আর ইনি হচ্ছেন মিঃ কিরীটী রায়।

মৃগাঙ্ক মোহন হাত তুলে নমস্কার করলেন। কিরীটী লক্ষ্য করলে মৃগাঙ্ক মোহনের ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুলের পরের আঙ্গুলটি নেই। একেবারে গোড়া থেকে কাটা।

ডান হাতের দু-আঙ্গুলের ফাঁকে একটি জ্বলন্ত সিগারেট। আঙ্গুল দুটোর মাথায় নিকোটিনের হলদে ছাপা গাঢ় হয়ে উঠেছে।

চোখে এক জোড়া কালো গগলস। গগলসের কালো কাঁচের আড়াল থেকেও দু’জোড়া চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন গায়ে এসে বেঁধে।

উঁচু লম্বা গড়ন। দেখলে বেশ বলিষ্ঠ বলেই মনে হয়। আপনিই কাল সন্ধ্যায় আমায়। ring করেছিলেন? মৃগাঙ্ক মোহনের মুখের দিকে তাকিয়ে কিরীটী জিজ্ঞাসা করল।

হ্যাঁ–মৃগাঙ্ক জবাব দেয়। তারপর করালীচরণের মৃত্যুর ব্যাপারটা আদ্যোপােন্ত শোনে মৃগাঙ্ক মোহনেরই মুখ থেকে কিরীটী।

গতকাল প্ৰত্যুষে করালীচরণের মৃতদেহ ভৃত্যদের মহলে তার ঘরে আবিষ্কৃত হয়।

অনেক দিনকার পুরানো চাকর করালী-এ বাড়িতে তাঁর যে একটা কেবল আধিপত্যই ছিল তাই নয়-সবাই সমীহ করেও চলত। তাকে বেশ।

ভৃত্যদের মহলে একটা আলাদা ঘরে সে থাকত।

দারোগা সাহেবের ধারণা-ব্যাপারটা হত্যা।

কিন্তু মৃগাঙ্কমোহনের ধারণা অন্যরূপ।

তার ধারণা আত্মহত্যা।

কিরীটী প্রশ্ন করে, কেন হলো আপনার এ ধারণা মৃগাঙ্কবাবু?

বোতাম

মৃগাঙ্কমোহন বলে, করালীচরণ যে ঠিক খুন হয়েছে, তা আমার মনে হয় না। মিঃ রায়। কেউ তাকে হত্যা করেনি, সে নিজেই আত্মহত্যা করেছে। দারোগীবাবুর মত অবিশ্যি তা নয়।

আমাকে ব্যাপারটা আগাগোড়া বলুন মৃগাঙ্কবাবু।

মৃগাঙ্কমোহন আবার বলতে শুরু করে, দাদার শরীরটা আজ কিছুদিন থেকে খারাপ যাচ্ছিল। তাই তিনি ও বৌদি শিলং বেড়াতে গেছেন। এই সময় এই বিপদ।। দাদাকে টেলিগ্ৰাম করেছি, হয়ত আজ কালই তিনি এসে পৌঁছবেন। করালী আজ আমাদের বাড়ীতে প্ৰায় কুড়ি বছরেরও উপর আছে-যেমন বিশ্বাসী তেমনি অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির। তার মত লোকের যে এ সংসারে শত্রু থাকতে পারে এইটাই আশ্চর্য।

কান্নায় মৃগাঙ্কমোহনের স্বর বুঁজে এল।

কিন্তু আপনি যে বলছেন আত্মহত্যা করেছে সে, তাই বা কেন বলছেন? কিরীটী প্রশ্ন করে এবার।

তা ছাড়া আর কি হতে পারে বলুন। হাতে ভেজালী ছিল ধরা।

সেটা এমন কিছু একটা বড় কথা নয়।

কিন্তু আত্মহত্যারও তো একটা কারণ থাকা দরকার। সেরকম কিছু–

না। সে রকম কিছু অবিশ্যি আমি দেখতে পাচ্ছি না—

তবে?

তবে একটা কথা আছে মিঃ রায়।

কি বলুন?

ইদানীং মাস দুই ওকে যেন কেমন বিষন্ন, চিন্তিত মনে হতো।

কারণ কিছু কখন জিজ্ঞাসা করেছেন?

করেছিলাম—

কি জবাব দিয়েছিল?

কিছুই বলেনি। আমাকেও না দাদাকেও না। দাদা ওকে সঙ্গে করে শিলং নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, তাও ও গেল না।

হুঁ। আচ্ছা চলুন-মৃতদেহটা একেবার দেখে আসা যাক।

চলুন।

সকলে তখন মালির ঘরে পাশে ছোট ঘরটায় যার মধ্যে মৃতদেহ পুলিশ প্রহরায় রাখা ছিল সেখানে এসে দাঁড়াল।

ওরা আসতেই প্রহরী সরে দাঁড়ায়, ওরা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে।

ছোট একটা ঘর।

করালীর মৃতদেহটা মেঝের ওপরে একটা চাদর ঢাকা ছিল। চাদরটা তুলে নেওয়া হলো কিরীটীর নির্দেশে।

ষাটের কাছাকাছিই প্রায় বয়স বলে মনে হয়। মাথার চুল পাতলা এবং সবই প্ৰায় পেকে সাদা হয়ে গিয়েছে।

দুটো চোখ খোলা এবং সে দৃষ্টি স্থির হয়ে থাকলেও মনে হয় তার মধ্যে একটা ভীতি রয়েছে যেন।

ভয়ে বিস্ফারিত।

চিৎ করে শোয়ান ছিল মৃতদেহ-কিরীটীর নির্দেশেই আবার দেহটা উপুড় করে দেওয়া হলো ক্ষত চিহ্নটা পরীক্ষা করে দেখবার জন্য।

ঘাড়ের ডান দিকে কানের তল ঘেঁষে আড়াই ইঞ্চি পরিমাণ একটা গভীর ক্ষত চিহ্ন।

ক্ষত চিহ্নের দুপাশে কালো রক্ত শুকিয়ে আছে। নীচু হয়ে মৃতদেহ পরীক্ষা করতে করতে হঠাৎ মৃতের মুষ্টিবদ্ধ ডান হাতটার প্রতি নজর পড়ল কিরীটীর।

মুঠিটা পরীক্ষা করতে গিয়ে ভাল করে দেখা গেল তার ভিতর কি একটা বস্তু যেন চক চক করছে।

কিরীটী তারপরও আরো কিছুক্ষণ মৃতদেহটা পরীক্ষা করে উঠে দাঁড়াল এবং বলল, চলুন, যে ঘরে ওকে মৃত পাওয়া গিয়েছিল সেই ঘরে চলুন।

অতঃপর সকলে ভৃত্যদের মহলে যে ঘরে করালীচরণ থাকত ও যে ঘরে তাকে নিহত অবস্থায় গতকাল প্ৰত্যুষে পাওয়া গিয়েছিল সেই ঘরে সকলে এসে প্রবেশ করল—ঘরের দরজায় তালা দেওয়া ছিল, সেই তালা খুলে।

ঘরের মেঝেতে প্রথম দৃষ্টি পড়ে কিরীটীর। ছোট একটা তক্তপোশের সামনে মেঝেতে তখনও চাপ চাপ রক্ত কালো হয়ে শুকিয়ে আছে।

দারোগা সাহেব স্থানটা দেখিয়ে বলেন, ঐখানে করালীচরণকে মৃত পড়ে থাকতে দেখা যায় মিঃ রায়–

কিরীটী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার ঘরটার চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিল। ছোট্ট অল্প পরিসর একখানি ঘর। ঘরের মধ্যে মেটমাট দুটি জানালা। জানালার মধ্যে একটা ভিতর থেকে বন্ধ। অন্যটার একটা পাল্লা খোলা–বাকীটা বন্ধ।

জিনিসপত্রের মধ্যে একটা পুরানো ট্রাঙ্ক ও একপাশে একটা বিছানা তক্তপোশের উপর গোটান অবস্থায় রয়েছে। কিরাট তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারিদিক দেখতে লাগল।

কিরীটী দারোগাবাবুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, কোথায় ঠিক মৃতদেহ ছিল দারোগা সাহেব?

ঠিক যেখানে দেখছেন মেঝেতে এখনো রক্ত কালো হয়ে জমাট বেঁধে আছে ঐখানেই ছিল–

হুঁ-আচ্ছা ঠিক আছে-এক সেকেণ্ড আমি একটু বাইরে মানে ঐ যে জানালাটা ঘরের বন্ধ আছে সে জায়গাটা বাইরে গিয়ে দেখে আসি।

কথাটা বলে কিরীটী ঘর থেকে বের হয়ে গেল। কিন্তু যেখানে যাবে বলেছিল। সেখানে গেল না। গেল সোজা যে ঘরে মৃতদেহ রয়েছে সেই দিকে।

কনেস্টবলটা দরজার বাইরে তখনো দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। কিরীটীকে ফিরতে দেখে বিস্মিত হয়ে ওর মুখের দিকে তাকাল।

কিরীটী মৃদু একটু হেসে বললে, জেরা মেহেরবাণী করকে কেয়ারী ঠো খোল দিজিয়ে সাব। হামারা একঠো চিজ ঘরকা অন্দরামে গির পড়া।

কনেস্টবল দরজাটা খুলে সরে দাঁড়াল।

কিরীটী ঘরের মধ্যে ঢুকে ক্ষিপ্ৰ হস্তে মৃতের মুষ্টিবদ্ধ হাতের মধ্য থেকে সেই একটু আগে দেখা রঙিন চকচকে বস্তুটি খুলে নিল।

সেটা একটা রঙিন কাঁচের সুদৃশ্য বোতাম।

তাড়াতাড়ি সেটা পকেটে ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। কিরীটীকে পুনরায় ঘরে এসে ঢুকতে দেখে দারোগা সাহেব শুধালো, কিছু দেখতে পেলেন?

হ্যাঁ।

কি? একটা কাঁচের বোতাম—

বোতাম! কথাটা বলে দারোগা সাহেব যেন বোকার মতই কিরীটীর মুখের দিকে তাকায়।

কিরীটী বলে, চলুন এবার, যা দেখবার দেখা হয়েছে, বাইরে যাওয়া যাক।

চলুন।

সকলে এসে বাইরের ঘরে জমায়েত হলো পুনরায়।

দারোগা সাহেবই এবার প্রশ্ন করে, সব তো দেখলেন, আপনার কি মনে হচ্ছে কিরীটীবাবু?

মনে হচ্ছে ব্যাপারটা হত্যাই–

হত্যা! মৃগাঙ্কমোহন কিরীটীর মুখের দিকে তাকাল।

হ্যাঁ–করালীচরণকে যতদূর মনে হচ্ছে আমার, হত্যাই করা হয়েছে মৃগাঙ্কবাবু। অর্থাৎ আপাততঃ আমার অনুমান তাই।

কিন্তু-মৃগাঙ্কমোহন কি যেন বলতে চায় কিন্তু দারোগা সাহেব বাধা–

বলে, না মৃগাঙ্কবাবু, এর মধ্যে আর কোন কিন্তু নেই। কারালীচরণকে কেউ হত্যাই করেছে। আমি তো আগেই আপনাকে বলেছিলাম।

মৃগাঙ্ক বলে, আপনারা বলছেন বটে, কিন্তু আমার এখানো বিশ্বাস হয় না-প্রথমতঃ, কে তাকে হত্যা করবে-আর কেনই বা করবে।–দ্বিতীয়তঃ, তার হাতের মধ্যে ভেজালী যে ধরা ছিল সে ব্যাপারটা আপনারা কেউ ভাবছেন না কেন?

কে বললে ভাবছি না-কিরীটী বলে, কিন্তু ক্ষত চিহ্ন দেখে কেউ বলবে না ঐ ভাবে কেউ নিজের গলায় ভেজালী বসাতে পারে। absurd–অসম্ভব।

কিন্তু—

না-মৃগাঙ্কবাবু, করালীচরণ আত্মহত্যা করেনি—তাকে কেউ নিষ্ঠুরভাবে হত্যাই করেছে।

দারোগা সাহেব মাথা দুলিয়ে নিঃশব্দে যেন কিরীটীকে সায় দেয়।

আরো কিছুক্ষণ পরে।

দারোগা সাহেব মৃতদেহ ময়না তদন্ত করবার ব্যবস্থা করে ফিরে গিয়েছেন।

ঘরের মধ্যে মৃগাঙ্কমোহন, সুব্রত ও কিরীটী।

কিরীটী বলে, বেলা সাড়ে তিনটার স্টীমারেই আমি ফিরে যেতে চাই মৃগাঙ্কবাবু।

চলে যাবেন?

হ্যাঁ।

কিন্তু যে জন্য আপনাকে ডেকে এনেছিলাম। সে সম্পর্কে কোন কথাই তো আমাদের হলো না মিঃ রায়।

একটা কথা মৃগাঙ্কবাবু, সত্যি সত্যিই করালীচরণ আত্মহত্যা করেনি–তাকে হত্যা করা হয়েছে জেনেও ব্যাপারটির একটা নিস্পত্তি চান?

বাঃ! নিশ্চয়ই, সেই জন্যই তো আপনাকে ডাকা—

বেশ-তবে তাই হবে। দু-একদিনের মধ্যেই হয়। আবার আমি আসব না হয় কি করছি না করছি। খবর আপনি পাবেন।

আপনার পারিশ্রমিকের ব্যাপারটা–

সে একটা স্থির করা যাবে পরে—এখন ও নিয়ে মাথা ঘামাবেন না।

ফিরবার পথে স্টীমারে কিরীটী বোতামটা হাতের উপর নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল।

সুব্রত হঠাৎ প্রশ্ন করল, তখন কি যেন বলছিলি-বোতাম না কি?

কিরীটী মৃদুকণ্ঠে বলল, হ্যাঁ একটা জামার বোতাম।–এই বোতামটার কথাই বলছিলাম—

কোথায় পেলি?

জানালার বাইরে কুড়িয়ে। বোতামটি বেশ, না সুব্রত?

সত্যই বোতামটা দেখতে ভারী সুন্দর। রঙিন কাঁচের বোতামটা, একদিকে গোল ডিম্বাকৃতি। অন্যদিক চ্যাপ্টা।

সাদা বোতামটার গা থেকে একটা ঈষৎ লালচে আভা ঠিকরে বেরুচ্ছে।

কি ভাবছিস বলত? সুব্ৰত জিজ্ঞাসা করল।

কই? কিছুনা।

মৃদু হেসে কিরীটী বোতামটা জামার পকেটে রেখে দিল।

অপরাহ্নের স্নান আলোয় চারিদিক কেমন যেন বিষণ্ণ মনে হয়।

আকাশে আবার মেঘ করছে।

পানু ও সুনীল

কিরীটী তখনো বুঝতে পারেনি-করালীচরণের মৃত্যুটা একটা সামান্য দুর্ঘটনা নয়। তার পশ্চাতে একটা কার্যকরণ ছিল।

কিন্তু তার আগে পানু ও সুনীলের ব্যাপারটা জানা দরকার।

পানু আর সুনীল—

রিটায়ার্ড জজ পরমেশবাবুর মেয়ে বিধবা রমার দুটি ছেলে।

পানুর চাইতে সুনীল বছর চারেকের বড় বয়সে।

পানু শান্ত, ধীর।

সুনীল অশান্ত, অধীর।

সুনীলের বয়স, ষোল থেকে আঠারোর মধ্যে হবে। ম্যাট্রিক পাশ করে সে বর্তমানে শ্ৰীরামপুর কলেজেই আই-এ পড়ছে সেকেণ্ড ইয়ারে। অস্থির, চঞ্চল সুনীল একটি মুহূর্তের জন্যও বাড়ি থাকে না। একটা সাইকেল আছে। সেটায় চড়ে দিবারাত্ৰ টো টো করে কোথায় যে ঘুরে বেড়ায় তা সেই জানে।

আর পানুর বয়স বছর পনের-কিশোর বালক।

সুনীলের গায়ের রঙ ফর্সা-টকটকে একেবারে গোলাপের মত, আর পানু কালো।

কিন্তু সেই কালোর মধ্যেও যেন অপরূপ একটা শ্ৰী আছে।

অপূর্ব একটা লালিত্য-লাবণ্য।

রোগা লিকলিকে চেহারা সুনীলের। হাওয়ায় হেলে পড়ে। একমাথা রুক্ষ এলোমেলো চুল। সাতজন্ম তেলের সম্পর্ক নেই বললেই চলে। কত রকমের উদ্ভট খেয়ালই যে শ্ৰীমান সুনীলচন্দ্রের ছোট মাথাটার মধ্যে ঘূর্ণির পাকের মত পাক খেয়ে খেয়ে ফেরে তা সেই জানে।

পানু-স্কুল ছাড়া সৰ্বক্ষণ প্ৰায় বাড়িতেই থাকে। নিজের বই-খাতা-পত্ৰ পড়াশুনা নিয়ে ডুবে থাকে।

আর সুনীল—

প্রায়ই সে তার সাইকেল চেপে দুচার দিনের মত কোথায় যে ডুব দেয়। আবার হয়ত হুট করে একদিন ধুলি ধূসরিত দেহে হাঁপাতে হাঁপাতে আসে ফিরে বাড়িতে।

রমা দুরন্ত খেয়ালী ছেলেটিকে নিয়ে সদাই অস্থির।

মা হয়ত জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় ছিলি সুনু এ দুদিন।

ঘুরে এলাম মা মণি, ঘুরে এলাম সাইকেলে আসানসোল, ধানবাদ, upto কাত্ৰাসগড়।

কী যে তোর খেয়াল সুনু? মা বলেন, একটা আপদ বিপদ না ঘটিয়ে আর তুই ছাড়াবিনে দেখছি। দেখত পানু কত স্থির, কত ধীর।

আর কি রক্ষা আছে? আমনি হাত পা নেড়ে সুনীল বক্তৃতা শুরু করে দিল। জান মা, আমাদের বিশ্বকবি কি বলেছেন?

“দেশ দেশান্তর মাঝে যার যেথা স্থান
খুঁজিয়া লইতে দা’ও করিয়া সন্ধান।
পদে পদে ছোট ছোট নিষেধের ডোরে,
বেঁধে বেঁধে রাখিওনা ভাল ছেলে করে।

শীর্ণ শান্ত সাধু তব পুত্রদের ধীরে
দাও সবে গৃহ ছাড়া লক্ষ্মীছাড়া করে।
সাতকোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী
রেখেছো বাঙালী করে মানুষ করেনি।”

বুঝলে? ওগো আমার জননী, বুঝলে কিছু।

মা মুখটাকে গম্ভীর করে বললেন, জানিনে বাপু তোদের বিশ্বকবি টবি। যেমন হয়েছে ছেলেগুলো, তেমনি হয়েছে সব কবিতা। যা ইচ্ছা করগে যা।

সুনীল হাঃ হাঃ করে মার কথায় হেসে ওঠে। তারপর একসময় মার দিকে আব্দারের সুরে বলে, কিন্তু খিদে যে বড্ড পেয়েছে মাশীগগিরী কিছু খেতে দাও।

মা আবার খাবার আনতে গেলেন।

সুনীল ঘরের মধ্যে ঘুরে ঘুরে গুণ গুণ করে গান গাইতে থাকে।

“কোন পাস্থ এ চঞ্চলতা?
কোন শূন্য হতে এলো কার বারতা।”

শান্ত পানু হয়ত তখন তার নিজের ঘরে বসে বইয়ের মধ্যে ডুবে আছে।

এবারে ও প্রবেশিকা পরীক্ষা দেবে।
খুব ভাল ছেলে পানু লেখায় পড়ায়।
মাস্টারদের অনেক আশা ওর উপর।
সুনীল এসে পানুর ঘরের মধ্যেই যেন একটা দমকা হাওয়ার মতো ঢুকে পড়ে। তারপর পানুর মাথাটা ধরে একটা বঁকি দিয়ে বলে ওঠে, দেখা পানু, তুই একটা প্ৰকাণ্ড ফুলস্টপ। একটা দাঁড়ি, একটা পরিপূর্ণ পূর্ণচ্ছেদ। এই অনন্ত জীবন-দিকে দিকে যার হাতছানি-এ তোকে বিচলিত করেনা? মাথার উপর সীমাহীন ঐ সুনীল আকাশ-অসীম থেকে ভেসে ভেসে আসে পাখীর কলগীতি। এ-সবের কোন মূল্য তোর কাছে নেই? কি রে তুই—

পানু সুনীলকে অত্যন্ত ভালবাসে, ওর মুখের দিকে চেয়ে মিটমিটি হাসে।

সুনীল বলে চলে, অদেখা সমুদ্রের ডাক তোর কানে পৌঁছায় না? সীমাহীন মরু তোর প্রাণে স্বপ্ন জাগায় না? তুই একটা মানুষ!

পানু দাদার কথায় হাসে-বলে, তবে কি দাদা?

তুই, তুই মার একটা ছোট্ট খোকন মণি সোনা। তোমায় কে মেরেছে ঠোনা। আদর করে চুমো দেবো, গড়িয়ে দেবো দানা।

মা এসে ঘরে ঢোকেন। সুনু আবার পানুর মাথা খাচ্ছিস। নিজের তো খেয়ালের অন্ত নেই, আবার ওকে নাচাস কেন?

ভয় নেই মা। তোমার ও money bagটি লুট করব না। বলতে বলতে স্যাণ্ডেল ফটু ফটু করতে করতে সুনীল দরজার বাইরে পা বাড়ায়।

আবার এই অবেলায় কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি? মা বলেন। খাবার আনতে বললি–

এখন নয়। মা-এখন নয়, একটু ঘুরে আসছি—বলতে বলতে সুনীল অদৃশ্য হয়।

কাল থেকে কলেজে গ্ৰীষ্মের ছুটি শুরু।

সকালবেলা উঠে চেয়ারে বসে টাইমটেবিলটা খুলে সুনীল আপন মনে পাতা উল্টে চলেছে, এই লম্বা ছুটিটায় কোথায় কোথায় যাওয়া যেতে পারে? কতদূর পর্যন্ত? পেশোয়ার গেলে মন্দ হত না। তবে একটু বেশী দূর এই যা।

একপাশে বসে পানু কী একটা বই পড়ছে।

জলখাবারের প্লেট হাতে মা এসে ঘরে প্রবেশ করলেন।

সকল বেলাতেই টাইম টেবল নিয়ে বসেছিল কেন?

সুনীল গভীর কণ্ঠে জবাব দিল—

জননীগো, অনেক চিন্তার পর এই স্থির করি,
সুদুর পেশোয়ার ব্যারেক আসব ঘুরি।

রমা সন্দিগ্ধ হয়ে উঠল, না, না-ওসব মতলব ছাড়-সামনের বছর না। তোর পরীক্ষা–

জানি-পরীক্ষা অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে কিন্তু জীবনের এই মুহূর্তগুলো একবার গেলে আর আসবে না। বাধা দিও না জননী–প্ৰসন্ন মনে বলো, যাও-পুত্র-পেশোয়ায়-যাও।

রামা বলেন, না—

সুনীল বলে, হ্যাঁ—

পানু মৃদু মৃদু হাসে।

অদ্ভুত চিঠি

দিন দুই পরের কথা।

দুপুরের দিকে কিরীটী তার শয়ন ঘরে চুপচাপ বসে আছে।

দুআঙ্গুলের ফাকে ধরা একটা জ্বলন্ত সিগ্রেট।

জংলী এসে ঘরে ঢুকলো, বাবু একটা চিঠি।

জংলী, এককাপ চা আন তো। কিরীটী চিঠিটা হাতে নিতে নিতে বলে।

জংলী ঘর থেকে বের হয়ে গেল। চিঠিখনি উল্টে পাল্টে কিরীটী দেখতে লাগল। চিঠির উপরে ছাপা বড়বাজার পোস্ট অফিসের।

সযতনে খাম ছিঁড়ে কিরীটী চিঠিটা টেনে বের করলে।

চিঠিটা ইংরাজীতে টাইপ করা। চিঠিটা পড়তে পড়তে ঘন অন্ধকারের মধ্যে যেন একটা আশার আলোর হঠাৎ ঝালকানি দেখতে পায়।

একবার দুবার তিনবার চিঠিটা পড়ল, তারপর প্রসন্ন মনে, চিঠিটা সযতনে পকেটে ভাঁজ করে রেখে কিরীটী চিন্তা সাগরে ডুব দিল।

জংলী এসে চা দিয়ে গেল, কোন খেয়াল নেই। হাতের সিগ্রেটটা শুধু মুখের কাছে তুলে নিয়ে মাঝে মাঝে টান দিচ্ছে।।

সুব্রত এসে ঘরে প্রবেশ করল। কি একটা বলতে গিয়ে সহসা কিরীটীর দিকে নজর পড়তেই চুপ করে গেল। সে জানত কিরীটী যখন চিন্তা করে তখন হাজার ডাকলেও সাড়া পাওয়া যায় না, অতএব সে একটা সোফায় বসে সেদিনকার দৈনিকটায় মন দিল।

একসময় কিরীটীরই খেয়াল হতে সুব্রতর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে সুব্রত—কতক্ষণ–

অনেকক্ষণ-তারপর শ্ৰীপুর হত্যা রহস্যের কোন আলোক সম্পাত হলো—

আলোক সম্পাত?

হ্যাঁ–

না-তেমন কিছু না, তবে একটা চিঠি পেয়েছি কিছুক্ষণ পূর্বে।

চিঠি!

হ্যাঁ।

সুব্রত প্রশ্ন করে, কার চিঠি?—

শোন–

কিরীটী পকেট থেকে চিঠিটা বের করে খুলে পড়তে লাগলো-ইংরাজীতে লেখা, তবে চিঠিটার বাংলা তর্জমা করলে এই দাঁড়ায়।–

প্রিয় কিরীটীবাবু

শুনলাম। আপনি শ্ৰীপুরের চৌধুরী বাড়ির পুরানো ভৃত্য করালীর হত্যা রহস্যের মীমাংসার ভার নিয়েছেন। সেই কারণেই কর্তব্য বোধে আপনাকে কয়েকটা প্রয়োজনীয় কথা জানাতে চাই ঐ চৌধুরী বাড়ি সম্পর্কে। অর্থাৎ এই চৌধুরী পরিবার সম্বন্ধে।

জমিদার অনঙ্গমোহন চৌধুরীর একমাত্র পুত্র হচ্ছে শ্ৰীপুরের বর্তমান জমিদার শশাঙ্কমোহন চৌধুরী। অনঙ্গ চৌধুরীর জীবিতকালে তার পুত্র শশাঙ্কমোহনের কোন সন্তান হয়নি—যাই হোক অনঙ্গ চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার উইলে দেখা গেল।–লেখা আছে-তাঁর মৃত্যুর পর মানে অনঙ্গ চৌধুরীর মৃত্যুর পর যদি শশাঙ্কমোহনের ছেলে হয় তবে তার সমস্ত সম্পত্তি সেই ছেলে পাবে। আর ছেলে না হয়ে যদি মেয়ে হয় তবে তার মৃত্যুর পর অর্ধেক সম্পত্তি পাবে সেই মেয়ে আর বাকী অৰ্দ্ধেক পাবে তার খুল্লতাত পুত্ৰ মৃগাঙ্কমোহন বা ঐ মৃগাঙ্কমোহনের পুত্র বা তাঁর পরবর্তী ওয়ারিশগণ। সে আজ ১৮ বছর আগের কথা।

তারপর সবাই জানল অনঙ্গমোহনের মৃত্যুর দু-বছর পরে শশাঙ্কমোহনের একটি কন্যা সন্তান জন্মাল অর্থাৎ ঐ শ্ৰীলেখা। কিন্তু আমি জানি আসল সত্য তা নয়, শশাঙ্কমোহনের ছেলেই একটি জন্মেছিল আজ থেকে ষোল বছর আগে এক দুর্যোগের রাত্রে এবং আতুড় ঘরেই শশাঙ্কমোহনের নবজাত পুত্ৰ চুরি যায়। এবং যারা চুরি করে তারাই সেই ছেলের বদলে মেয়েকে রেখে যায়। আপনার কাছে আমার এই অনুরোধ যে, সেই চুরি যাওয়া ছেলেকে আপনার খুঁজে বের করে দিতে হবে এবং যদি বের করে দিতে পারেন বা বর্তমানে সে কোথায় আছে সে সন্ধানটুকুও এনে দিতে পারেন তাহলে আপনাকে নগদ দশ হাজার টাকা দেবো। আপনি যদি আমার প্রস্তাবে সম্মত থাকেন তাহলে দয়া করে আপনার বাড়ির দরজায় ‘হ্যা’ অক্ষরটি খড়ি দিয়ে লিখে রাখবেন এবং আমি আপনাকে পরদিনই পারিশ্রমিকের পাঁচ হাজার টাকা অগ্রিম পাঠিয়ে দেবো। বাকী কাৰ্য উদ্ধারের পর পাবেন।

একটা কথা-জন্মের সময় শিশুর ডান ত্রুর ঠিক উপরেই একটা লাল জরুল (১ ইঞ্চি পরিমাণ) ছিল।

আমি কে, তার পরিচয় আপনাকে আমি দিতে চাইনা। শুধু জেনে রাখুন আমি চৌধুরীদের একজন পরম শুভাকাঙ্খী–বর্তমানে কোন কারণে পরিচয় দিতে অনিচ্ছুক। নমস্কার,

ইতি অপরিচিত।

চিঠিটা পড়ে শেষ করল কিরীটী।

আশ্চর্য তো! সুব্রত বলে।

এখন দেখছিস করালীর হত্যা ব্যাপার যতখানি সহজ ভেবেছিলাম আসলে ঠিক ততখানি নয়। মানে অগাধ জল। কিরীটী হাসতে হাসতে বললে।

চিঠিটার ওপরে পোস্ট অফিসের ছাপটা কোথাকার?

সুব্রতর প্রশ্নের জবাবে কিরীটী বলে, আছে অবিশ্যি একটা পোস্ট অফিসের ছাপ কিন্তু তাতে তার কোন মুশকিল আশান হবে না–

কেন?

কারণ যে আতখানি সতর্কতা অবলম্বন করতে পেরেছে, ওটুকু বুদ্ধি তার কাছে থেকে আমি আশা করি।

তারপর একটু থেমে বলে, চিঠিতে বড়বাজার পোস্ট অফিসের ছাপ রয়েছে—কিন্তু অপরিচিত বন্ধু আমার যত চালাকিই খেলুন গলদ একটু বেরিয়ে পড়েছে। তবে তার জন্য তাকে দোষ দিই না। মানুষ সব সইতে পারে, পারে না শুধু সইতে নিজের স্বার্থে আঘাত। তখন তার হিতাহিত জ্ঞানটুকু পর্যন্ত লোপ পেয়ে যায় এমন দৃষ্টান্তেরও এ-দুনিয়ায় অভাব নেই।

সুব্রত এবারে প্রশ্ন করে, কে ঐ চিঠিটা লিখেছে বলে তোর মনে হয় কিরীটী?

নিঃসন্দেহে কোন interested party অর্থাৎ যার এ ব্যাপারে স্বার্থ রয়েছে। এবং সে হয়ত স্বার্থ থাকলেও কোন কারণে সামনা সামনি এসে আত্মপ্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু সে যাই হোক-করালীচরণের ব্যাপারটা যে হত্যাই সেটাও যেমন এখন সুনিশ্চিত বলে মনে হচ্ছে তেমনি সেই হত্যার মূলে একটা গভীর রহস্যও আছে বলে মনে হচ্ছে।

তা হলে?

তঃপর কিরীটী সুব্রতর দিকে তাকিয়ে বললে, ব্যাপারটা একটু বেশী রকম প্যাচ খেয়ে গেল আর সেই প্যাচ খুলতে একটু বেগ পেতে হবে। তা হোক, তার জন্য আমি ভয় পাইনা। আপাততঃ অপরিচিত বন্ধুটির কথাই সত্যি বলে মেনে নিয়ে আমরা কাজে অগ্রসর হবো।

কিভাবে শুরু করবি ভাবছিস? কালই জলে নেমে প্রথম ডুব দেবো। দেখি কতদূর কি হ’ল?

সুব্রত হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করল, কোথাকার জলে? সাগরের, না গঙ্গার?

কিরীটী হেসে ফেললে, না ভাই সাগরের জলে ডুব দিতে সাহস নেই। শোনা যায়। তার নাকি তল নেই। আর মা গঙ্গা? অতি পুণ্য কি আর আমার মত পাপীর সইবে? তার চাইতে দেখি শ্ৰীপুরের এঁদো পুকুরে একটা ডুব দিয়ে। ধনরত্ন না মিলুক দু’চারটে শামুক বা গুগলি-ও তো হাতে ঠেকতে পারে।

দেখিস, শেষে কাদা ঘটাই যেন না। সারা হয়।

দেখি।

ইতিমধ্যে মৃগাঙ্কমোহনের তার পেয়ে জমিদার শশাঙ্ক চৌধুরী শিলং থেকে শ্ৰীপুরে ফিরে এসেছিলেন।

কবুলতি

দ্বিপ্রহরে শশাঙ্ক চৌধুরী সাধারণতঃ তাঁর প্রাইভেট রুমে বসে স্টেটের যাবতীয় কাজকর্ম দেখাশুনা করেন। সে সময়টা সাধারণতঃ বড় একটা কারো সঙ্গে তিনি দেখাশুনা করেন না।

একান্ত প্রয়োজনীয় হলে অবিশ্যি আলাদা কথা।

করালীর মৃত্যুর দিন চারেক পরে। সে দিনও দুপুরে যখন তিনি প্ৰাইভেট রুমে বসে কাগজপত্র দেখাশুনা, করছিলেন, এমন সময় চাকর মধু এসে জানােল একজন পুলিশের লোক কি একটা বিশেষ জরুরী কাজে তীর সঙ্গে দেখা করতে চান, এখুনি।

শশাঙ্কমোহন বললেন, তাকে আমার বসবার ঘরে বসাগে যা, আমি আসছি। অশোক পাশেই একটা চেয়ারে বসে শশাঙ্কমোহনকে কি আবশ্যকীয় কাগজপত্ৰ বুঝিয়ে দিচ্ছিল, শশাঙ্কমোহন ওর দিকে তাকিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, তুমি একটু অপেক্ষা কর অশোক। দেখে আসি পুলিশ আবার কেন এলো এ সময়—

একজন ছাব্বিশ সাতাশ বৎসর বয়সী যুবক-ব্যাক ব্ৰাস করা মাথার চুল, ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি। সরু বাটার ফ্লাই গোঁফ।

চোখে কালো কাঁচের চশমা। সাধারণ ধুতি পাঞ্জাবী পরা। ড্রয়িং রুমে একটা সোফার উপর ঠেস দিয়ে বসে সেদিনকার খবরের কাগজটা পড়ছিল। শশাঙ্কমোহনের জুতোর আওয়াজ পেয়ে কাগজটা নামিয়ে মুখ তুলে তাকাল।

আপনি?

আমারই নাম শশাঙ্ক চৌধুরী।

নমস্কার, আমি সি, আই, ডি থেকে আসছি, কারালীচরণের হত্যার ব্যাপারে কয়েকটা কথা আমাদের জানা দরকার–

বলুন, কি কথা?

আপনি বসুন। দেখুন, বলছিলাম কি, কথাটা একটু গোপনীয়, এ ঘর…

আচ্ছা আসুন, আমার অফিস রুমে চলুন।

শশাঙ্কমোহনের পিছু পিছু আগন্তুক ভদ্রলোক দোতলায় নিজের অফিস ঘরে এসে ঢুকলেন। ঘরে প্রবেশ করে শশাঙ্কমোহন অশোককে ইঙ্গিতে ঘর ছেড়ে যেতে বললেন। অশোক ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল।

ঘরটাকে সত্যিই নির্জন বলা যেতে পারে।

ঘরটা আকারে মাঝারি রকমের হবে।

ঘরের একটি মাত্র দরজা।

ঘরের নীচেই বাগান। সেই দিকে গোটা দুই জানালা। জানালায় সবুজ পর্দা ঝোলান।

ঘরের মধ্যে একটা গোল টেবিল। টেবিলের এক পাশে ফোন। গোটা দুই চেয়ার ও গোটা চারেক আলমারী। প্রত্যেকটি আলমারী ঠাসা ইংরাজী বাংলা সব বই। ইঙ্গিতে একটা চেয়ারে বসতে বলে, নিজে অন্য চেয়ারটা অধিকার করে শশাঙ্কমোহন বললেন, এইবার বলুন আপনার কি জিজ্ঞাস্য।

ভদ্রলোক শশাঙ্কমোহনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, বুঝতেই পারছেন আপনাদের পুরানো ভৃত্য করালীচরণের হত্যার ব্যাপারে এখানে আমি এসেছি। তাই চৌধুরী বাড়ির পুরাতন ইতিহাস আমার কিছু জানা দরকার। তারপর একটু থেমে বললেন, আচ্ছ একথা কি সত্যি যে আজ থেকে ষোল বছর আগে আপনার পিতা অনঙ্গ চৌধুরী মশাই মারা যাওয়ার পর তার উইলে জানা যায় আপনার কোন পুত্ৰ সন্তান না হলে সম্পত্তির অর্ধেক মাত্র আপনি পাবেন এবং বাকী অর্ধেক আপনার খুল্লতাত ভাই মৃগাঙ্কবাবু পাবেন?

কোথা থেকে জানলেন কথাটা। বিস্ময়ে যেন হতবাক শশাঙ্কমোহন।

জেনেছি।–সত্যি কিনা বলুন।

সত্যি-কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি একান্ত গোপনীয়, ঐ ব্যাপারটা যা একমাত্র আমি ছাড়া কেউ জানে না, সে কথাটা আপনি কোথা থেকে কেমন করে জানলেন।

ভদ্রলোক মৃদু হাসলেন। আমরা যে অনেক কিছুই জানতে পারি— জানতে আমাদের হয়, নচেৎ এই খুন-জখম ইত্যাদির রহস্যকে উদঘাটন করবো কি করে।

অতঃপর শশাঙ্কমোহনকে মনে হলো যেন বেশ একটু চিন্তিত।

যাক সে কথা, আচ্ছা। আপনি বলছেন কথাটা কেউ জানে না-মৃগাঙ্কবাবুও কি জানেন না?

জানো না বলেই তো এতকাল ধারণা ছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে—

কি-বলুন?

না, কিছু না।

মিঃ চৌধুরী—

বলুন।

আপনার পিতার মৃত্যুর দু-বছর পরে আপনার সন্তান হয়, তাই না?

হ্যাঁ–

আর সে সন্তান কি সত্যিই একটি মেয়েই হয়েছিল?

হ্যাঁ–শ্ৰীলেখা আমার মেয়ে–

কিন্তু, আমি যদি বলি–

কি?

ঐ শ্ৰীলেখা আপনার সন্তান আদৌ নয়—

মানে! চমকে শশাঙ্কমোহন আগন্তুকের মুখের দিকে তাকান।

তার মানে মেয়ে নয়, আসলে হয়েছিল আপনার একটি পুত্ৰ সন্তান এবং জন্ম মুহুর্তে সে অপহৃত হয়েছিল এবং আজো সে বেঁচে আছে বলেই আপনি জানেন।

শশাঙ্কমোহন সত্যিই একেবারে স্তম্ভিত-নির্বাক! আজি দীর্ঘ ষোল বছর। ধরে যে কথা কেউ জানে না-সেই কথাটা কি করে ঐ ভদ্রলোক জানতে পারলেন।

ধীরে ধীরে এক সময় আবার ভদ্রলোক মুখ তুললেন। বললেন, বুঝতে পারছি আমরা যা জেনেছি তা মিথ্যা নয়, সত্যি–

না, মিথ্যা নয়-সত্যি–সব সত্যি–

ভদ্রলোক আবার বললেন, হয়ত এ ভালই হলো মিঃ চৌধুরী-আপনার যে পুত্ৰ সন্তান হয়েছিল এবং যে পুত্র সন্তানকে কেউ না কেউ চক্রান্ত করে তার জন্মের পর তার মায়ের বুক থেকে তঁর অজ্ঞাতে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং আজও যখন সে জীবিত তাকে হয়ত আবার আমরা খুঁজে বের করতে পারব।–কিন্তু আমি ভাবছি, একটা কথা। আপনি যদি জানতেনই ব্যাপারটা তো-পুলিশের সাহায্য নেন নি কেন-কেন এতদিন চুপ করে মুখ বুঁজে আছেন–

তারা-তারা আমায় ভয় দেখিয়েছিল—

ভয়!

হ্যাঁ–বলেছিল যদি তাকে খোঁজ করবার কোন রকম চেষ্টা করি তো—তারা তাকে হত্যা করবে। তাই-তাই পারিনি-পাছে তাকে জন্মের মত হারাতে হয় বলে-বলতে বলতে শশাঙ্ক মোহন যেন কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।

আচ্ছ মিঃ চৌধুরী-আপনার স্ত্রী-আপনার স্ত্রী জানেন কথাটা?

না।

জানেন না তাহলে তিনি?

না।

ঠিক আছে। এবারে আমি আজকের মত উঠবো শশাঙ্কবাবু–

ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন।

শশাঙ্কমোহনের চিন্তা

একটা কথা, আপনি—আপনি পরিচয় দিলেন। আপনি পুলিশের লোক—

আপনার নামটা–শশাঙ্কমোহন প্রশ্ন করলেন।

আমার নাম–ধুর্জটী প্ৰসাদ রায়—

ধূর্জন্টী বাবু, একটা কথা আপনাকে আমি সত্যি বলিনি–

কি কথা?

আমার সেই অপহৃত ছেলের খোঁজ করিনি-কথাটা সত্য নয়-আর–

আর–

আর আসল ব্যাপারটা আমি জানতে পারি মাত্র চার বৎসর আগে-তার আগে কিছুই জানতাম না।

কেমন করে জানলেন?

একটা উড়ো অজ্ঞাতনামা লোকের চিঠিতে–

তারপর?

সেই চিঠিতেই লেখা ছিল যেন সে ছেলের খোজ আমি না করি। তবু—তবু— আমি খোঁজ না করে তাকে পারিনি-এবং–

বলুন, থামলেন কেন?

খুঁজতে খুঁজতে জানতে পারি হরমোহিনী অনাথ আশ্রমে সে গোত্র পরিচয়হীন-সুধীর নামে যে ছেলেটি রয়েছে সেই ছেলেটি–

তারপর–

খোঁজ পেলেও কি করব ঠিক করতে তখনো পারছিলাম না-পত্ৰ প্রেরক যেরকম ভয় দেখিয়েছে যদি সত্যি সত্যিই ছেলেকে আমার হত্যা করে-তাছাড়া-সমস্ত প্ৰমাণাদি তখনো জোগাড় করে উঠতে পারি নি—এবং ঠিক সেই সময়

কি?

একদিন লোভ সম্বরণ করতে না পেরে যখন তাকে একটিবার দেখবার জন্য হরমোহিনী আশ্রমে গিয়ে হাজির হলাম-শুনলাম—

বলুন–

মাত্র কয়েকদিন আগে এক রাত্ৰে নাকি অত্যন্ত রহস্যজনক ভাবে সেই ছেলেটি আশ্রম থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। সেই থেকে কত জায়গায় কত ভাবেই না চারবছর ধরে আমার সেই হারান ছেলের খোজ করেছি। কিন্তু তার সন্ধান পেলাম না। আজ পর্যন্তও। শশাঙ্কমোহনের কণ্ঠস্বর শেষের দিকে যেন অশ্রুভারে জড়িয়ে আসে।

আশ্রম থেকে ছেলে অদৃশ্য হয়ে গেল। এতো ভারী আশ্চর্য ব্যাপার, আচ্ছা আশ্রম থেকে সেই ছেলে যখন অদৃশ্য হয়ে যায় তখন তার বয়স কত ছিল?

বার বছর। শশাঙ্কমোহন উত্তর দিলেন।

আচ্ছা সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলে সংক্রান্ত কোন পরিচয়ের নিশানা কি আপনার কাছে আছে? ভদ্রলোক প্রশ্ন করে।

হ্যাঁ আছে, ঐ আশ্রমেই পাওয়া। আশ্রমের ছেলেদের একটা গ্রুপ ফটো, তার মধ্যে ঐ ছেলেটিরও ফটো ছিল। সেটা আমি আলাদা করে এনলার্জ করে রেখে দিয়েছি। খুঁজবার সুবিধা হবে বলে। তাছাড়া ছেকুলটির গায়ের রং ফর্সা। ডান ভ্রূর ঠিক উপরেই একটা লাল জরুলের চিহ্ন আছে। রোগা ছিপছিপে গড়ন।

কিন্তু একটা কথা। এই ছেলেই যে আপনার সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলে তার আর কোন সঠিক প্রমাণ পেয়েছেন কি?

এ্যাঁ, তা হ্যাঁ। মানে আমার ছেলে যেদিন জন্মায় সেইদিন ও আশ্রমে সুধীরের যে জন্ম তারিখ দেওয়া ছিল, সে দুটোই একই দিন। আর তা ছাড়া যারা যড়যন্ত্র করে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল তাদের মধ্যে একজন….।

ভদ্রলোক শশাঙ্কমোহনের মুখের কথাটা একপ্রকার প্রায় লুফে নিয়েই হাসতে হাসতে বললেন, আপনাদের… আচ্ছ একটা কাগজ দিন তো, বলে ভদ্রলোক শশাঙ্কমোহনের মুখের দিকে তাকালেন।

শশাঙ্কমোহন একান্ত বিস্মিত হয়েই একখণ্ড স্লিপ পেপার ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে দিলেন।

টেবিলের উপর থেকে শশাঙ্কমোহনের খোলা ঝর্ণ কলমটা তুলে নিয়ে ভদ্রলোক খস খস করে কি একটা লিখে শশাঙ্কমোহনের দিকে এগিয়ে ধরলেন তীর চোখের দৃষ্টির সামনে।

শশাঙ্কমোহন বিস্ময়ে যেন একেবারে থ’ হয়ে গেছেন। এ শুধু অভাবনীয়ই নয়, একেবারে যাকে বলে অচিন্তনীয়। তিনি নীবাবে পলকহারা দৃষ্টিতে সেই ক্লিপ কাগজটার গায়ে কালি দিয়ে লেখাটার দিকে তাকিয়েই রইলেন।

সত্যই তিনি যেন বোবা হয়ে গেছেন। লোকটা কি অন্তর্যামী? না যাদুবিদ্যা জানে?

ভদ্রলোক শশাঙ্কমোহনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, নমস্কার, এবার উঠবো, বলতে বলতে ভদ্রলোক নিঃশব্দ ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেলেন।

ধীরে ধীরে জুতোর শব্দ বারান্দায় মিলিয়ে গেল।

ভদ্রলোক ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পরও শশাঙ্কমোহন। একইভাবে স্থানুর মতই বহুক্ষণ চেয়ারটার উপর বসে রইলেন।

ইতিমধ্যে অশোক এসে একবার পর্দার ফাঁক দিয়ে ঘরের ভিতরে উঁকি দিয়ে গেল।

মনে হলো শশাঙ্কমোহন কী যেন একটা বিষয় গভীরভাবে ভাবছেন।

সহসা একমাসয় শশাঙ্কমোহন চেয়ার ছেড়ে উঠে আগে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে ঘরের মধ্যস্থলে রক্ষিত একটা বইয়ের আলমারী চাবি দিয়ে খুলে সাজান বইগুলির পিছনে কী যেন অতি ব্যস্ততার সঙ্গে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজতে লাগলেন।

বোধ হল, যা তিনি খুঁজছিলেন তা পেলেন না। একে একে আলমারীর প্ৰত্যেকটি সেলফ থেকে সাজান বইগুলি মাটিতে নামিয়ে আরো ভাল করে। খুঁজতে লাগলেন। ক্রমেই তার সমস্ত মুখের রেখাগুলি গভীর চিস্তায় সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। চোখের দৃষ্টি সন্দিগ্ধ ও খর সন্ধানী। একে একে শশাঙ্কমোহন আলমারীর সমস্ত তাকগুলিই খুঁজলেন।

কিন্তু তার অভীষ্ট বস্তুর কোন সন্ধানই মিলল না।

একে একে তিনি ঘরের তিনটি আলমারীই তন্ন তন্ন করে খুঁজলেন। সহসা তঁর কণ্ঠ দিয়ে গভীর হতাশার একটা অস্ফুর্ট শব্দ বেরিয়ে এল। আশ্চর্য, সেই খামটা উড়ে গেল নাকি? হঠাৎ ঐ সময় শশাঙ্কমোহনের নজরে পড়ে বন্ধ দরজায় কি-হোলের সরু ছিদ্রপথ দিয়ে একটা সরু সূর্যের আলোর রশ্মি ঘরের কাপেটটার উপর পড়েই আবার মিলিয়ে গেল। আবার আলোটা দেখা গেল একটু পরেই। শশাঙ্কমোহন চিন্তিত মনে সেদিকে তাকিয়ে আলোর রশ্মিটাকে অনুসরণ করে দরজার দিকে নজর করতেই কী একটা সন্দেহ যেন তঁর মনে চকিতে উঁকি দিয়ে গেল। আলোটা তখন আর দেখা যাচ্ছে না।

সহসা আলোটা আবার ঘরের মধ্যে জেগে উঠল। এবং পরীক্ষণেই বাইরের বারান্দায় যেন কোন লোকের দ্রুত পলায়ণের শব্দ শোনা গেল।

তাড়াতাড়ি.এগিয়ে এসে ল্যাচুকি-টার চাবি ঘুরিয়ে একটান দিয়ে দরজাটা খুলে ফেললেন।

বৈকালের পড়ন্ত রোদ টানা বারান্দাটায় রেলিংয়ের কোল ঘেঁষে সার বাঁধা টবে সাজান পামট্রি-গুলির সরু চিকন পাতার গায়ে শেষ পরশটুকু বুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল।

বারান্দাটা একেবারে খালি। ত্ৰিসীমানাতেও কাউকে চোখে পড়ল না।

নির্জন বারান্দাটা একেবারে খাঁ খাঁ করছে। সাধারণতঃ দোতলার এদিকটা নির্জন। লোকজনের যাতায়াত নেই। অন্দর মহলের সঙ্গে এদিকটার কোন যোগাযোগ নেই।

বাইরে থেকে সিঁড়ি দিয়ে এদিকে আসা যায়। কিন্তু কি আশ্চর্য।

শশাঙ্ক মোহন বারান্দা দিয়ে এগিয়ে চারপাশে ভাল করে লক্ষ্য করে দেখে এলেন। কিন্তু কিছুই দেখতে পেলেন না। মানুষ তো দুরের কথা, একটি ছায়া পর্যন্ত নয়।—অথচ একথা সত্য যে “কি-হোলের” ছিদ্রপথ দিয়ে নিশ্চই কেউ শশাঙ্কমোহনের কাজ গোপনে লক্ষ্য করছিল। কিন্তু কে সে? কার এতবড় বুকের পটা স্বয়ং কতাঁর ঘরে এমন করে লুকিয়ে আড়ি পাতে? কে? কে?

নতুন চাকর

জমিদার শশাঙ্কমোহন চৌধুরীর সংসারে আপনার জনের মধ্যে স্ত্রী-একমাত্র মেয়ে শ্ৰীলেখা ও তীর খুল্লতাত ভাই মৃগাঙ্ক। শ্ৰীলেখার বয়স ১৬ বছর।

শ্ৰীলেখা স্কুলে পড়ে—এক বছর পরে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেবে। যুঁই, হেনা, রমা, টুনি-ওর এখন কত বন্ধু। বড় লোকের মেয়ে হলে কি হয়। মনে কিন্তু ওর এতটুকু অহঙ্কার নেই।

যেমনি মিশুকে তেমনি হাসিখুশি।

সকলেই ওর ব্যবহারে ভারি সন্তুষ্ট।

ওর সব চাইতে প্রিয় বান্ধবী হচ্ছে যুঁই। যুঁই গরীবের মেয়ে, ত্রিসংসারে ওর একমাত্র বিধবা মা ছাড়া আর কেউ নেই।

ওর মা স্থানীয় মেয়ে। স্কুলে সেলাইয়ের কাজ শিখিয়ে যে কয়টি টাকা পান। তাইতেই ওদের সংসার, মা আর মেয়ের কোন মতে চলে যায়।

স্কুলে যেদিন শ্ৰীলেখা প্রথম যায় সেই দিনই যুঁইয়ের সঙ্গে ওর ভাব হয়।

রোগ ছিপছিপে গড়ন কালো মেয়েটি। মাথা ভর্তি চুল।

বড় বড় ভাসা ভাসা দুটো চোখ। সর্বদাই যেন তাতে জল ভরে আছে। হাতে একগাছি করে সোনার চুড়ি।

শ্ৰীলেখা নিজেই এসে ওর সঙ্গে আগে কথা বলে, কি নাম তোমার ভাই।

যুঁই তার ডাগর দুটি চোখ তুলে বিস্মিত হয়ে শ্ৰীলেখার দিকে তাকায়।

কি সুন্দর শ্ৰীলেখার চেহারা। তার উপরে দামী শাড়িতে শ্ৰীলেখাকে ভারী মানিয়েছিল। মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকতে দেখে মৃদু হাসিতে ঠোঁট দুটি ভরিয়ে শ্ৰীলেখা জিজ্ঞাসা করল, কি দেখছো?

তোমাকে-মৃদু সঙ্কোচভরা কণ্ঠে যুঁই জবাব দেয়।

আমাকে? কেন? আমার বুঝি দুটো মাথা, চারটে চোখ?

না তা তো নয়, কিন্তু তোমার নাম কি ভাই?

শ্ৰীলেখা-তোমার নাম?

আমার নাম যুঁই।

যুঁই? বা, ভারি সুন্দর নামটি তো তোমার।

আর তোমার! যুঁই হাসি মুখে জিজ্ঞাসা করল।

তোমার নামের মত তাই বলে সুন্দর নয় মিষ্টি নয়।

একদিন শ্ৰীলেখা এক প্রকার জোর করেই যুঁইকে নিজেদের বাড়ি ওদের বাড়ির গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে গেল।

ধনী গৃহে ঐশ্বর্যের অফুরন্ত সমারোহ। যুঁই বিস্ময়ে হাঁ করে চারিদিক চেয়ে চেয়ে দেখএত লাগল।

মস্ত বড় প্ৰকাণ্ড বাড়ি।

ঘরে ঘরে সব কাপেট পাতা। দেওয়ালে দেওয়ালে দামী দামী সব বিখ্যাত চিত্রকরদের আঁকা সুন্দর সুন্দর ছবি।

ঘরের কোণে টিপয়ে রাখা কাশ্মীরি টবে পােমট্রি। শ্ৰীলেখার পড়বার ঘরটিই বা কি সুন্দর। একাধারে একটি দামী টেবিল, তাতে শ্ৰীলেখার পড়বার বইগুলি ইতস্ততঃ ছড়ানো, টেবিলের উপর ফুলদানীতে এক গোছারজনীগন্ধা, দেওয়াল আলমারী ঠাসা সব গল্পের বই ও ছবির বই; পাশেই শোবার ঘর। দামী পালঙ্কে দুধের মত সাদা ধবধবে পাখীর পালকের মত নরম বিছানা।

দামী শ্বেত পাথরের প্লেটে করে নানা রকমের খাবার সব সাজিয়ে নিয়ে এল। যুঁই জীবনে এমন সুস্বাদু ও সুগন্ধযুক্ত খাবার আস্বাদনের সুযোগ একেবারে পায়নি বললেও চলে।

শ্ৰীলেখার মা বিভাবতীও এসে যুঁই এর সঙ্গে আলাপ করলেন। যেমন অমায়িক তেমনি হাসিখুশি।

এরপর একদিন শ্ৰীলেখা নিজে যেচে স্কুলেব ছুটির পর যুঁইয়ের বাড়িতে গেল।

দুখানি মাত্র ঘর নিয়ে যুঁইদের সংসার।

একখানায় যুঁই ও তার মা রাত্রে শোন ও যুঁই পড়াশুনা করে। অন্যটায় ওদের গৃহস্থলী ও রান্না খাওয়া দাওয়া হয়।

গোছগাছ ফিটফাট, কোথাও এতটুকু বিশৃঙ্খলা নেই। ছোট্ট একখানি কেরোসিন কাঠের টেবিল। তার উপরে সযত্ন পরিপটি করে যুঁইয়ের পড়বার বই ও খাতাপত্ৰ সাজান গুছান।

সামনেই যুঁইয়ের বাবার ফটো।

কী সৌম্যমূর্তি।

যুঁই হাসতে হাসতে বললে, গরীব বান্ধবী। তোমার মত বড়লোক বান্ধবীকে বসাতে পারি। এমন যোগ্য আসনই বা আমার কোথায়?

শ্রীলেখা কৃত্রিম অভিমানে মুখখানি ভারী করে বললে, বন্ধুত্বের কাছে আবার গরীব বড়লোক কি? তুমি আমার বন্ধু। আমি তোমার বন্ধু। তুমি যেমন আমায় ভালবাস। আমিও তেমনি তোমায় ভালবাসি। সেইটাই তো আমাদের একমাত্র ও সত্যিকর পরিচয়। অন্তরের মিল যেখানে আছে, বাইরের খোলসটার সেখানে কতটুকুই বা দাম।

এমনি করে উভয়ের বন্ধুত্ব দিন দিন গাঢ় হতে থাকে। ক্লাসের অন্যান্য মেয়েরা ওদের দিকে চেয়ে আড়ালে চোখ টিপে হাসাহসি করে।

কিন্তু ওদের যেন কোন কিছুতেই একটুকুও ক্ৰক্ষেপ নেই।

ওরা নিজেদের নিয়ে নিজেরাই বিভোর।

শশাঙ্কমোহন ভাইয়ের তার পেয়ে তাড়াতাড়ি শিলং থেকে ফিরে এসেছিলেন।

করালীর হত্যার ব্যাপারে সত্যই তিনি একেবারে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন যেন। একটা পাখী পুষিলেও মানুষের তার উপরে মায়া পড়ে, তা এ তো মানুষ। এবং একদিন দুদিন নয় একাদিক্ৰমে ২১ বৎসর সে এ বাড়ীতে আছে।

শ্ৰীলেখা তো কেঁদেই খুন।

মৃগাঙ্ক শশাঙ্কমোহনকে বুঝিয়েছেন, করালী আত্মহত্যা করে মারা গেছে।

কিন্তু কেন? হঠাৎ সেই বা আত্মহত্যা করতে গেল কেন?

কিইবা এমন ব্যাপার ঘটতে পারে যার জন্য তাকে পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিতে হলো।

আরো দু’চার দিন পরের কথা।

করালীর মৃত্যুর পর থেকে শশাঙ্ক চৌধুরী যেন একটু গভীর হয়ে গেছেন।

প্রায়ই দেখা যায় তিনি চুপচাপ একাকী বসে কি যেন ভাবেন।

সেদিনও বাইরের ঘরে চুপটি করে বসে আছেন, এমন সময় একজন উড়ে চাকর এসে দরজার উপরে দাঁড়াল-শরবতের গ্লাস নিয়ে।

শশাঙ্কমোহন যেন একুট বিস্মিত হয়েই নতুন চাকরিটার মুখের দিকে তাকান।

কে তুই?

আজ্ঞে, মু রঘুনাথ আছি

রঘুনাথ?

এমন সময় অশোক এসে ঘরে ঢোকে।

অশোকই বলে রঘুনাথকে দিন কয়েক হলো কাজে বহাল করা

হয়েছে— করালীর মৃত্যুর পর শশাঙ্কমোহনের নিজের কাজকর্ম করে দেবার জন্য।

ছায়া না কায়া

রাত্রি অনেক হয়েছে। কিন্তু এখনো শশাঙ্কমোহনের প্রাইভেট রুমে আলো জুলছে। মৃগাঙ্কমোহন হঠাৎ কাল বিকালে একটা জরুরী তার পেয়ে কোথায় যেন গেছে। আজকাল প্রায়ই ঘনঘন সে দু এক দিনের জন্য শ্ৰীপুর থেকে চলে যায়। আবার হঠাৎ একদিন ফিরে আসে।

এক জোড়া তীক্ষু চোখের দৃষ্টি নীচের বাগানে করবী গাছটোব আড়াল থেকে শশাঙ্কমোহনের দিকে চেয়ে চেয়ে কী যেন দেখছে।

হঠাৎ এমন সময় শশাঙ্কমোহনের ঘরের বাতি নিভে গেল। নিমেষে। নিশিছিদ্র আঁধারে সমস্ত ঘরটা ভরে উঠলো।

চোখ দুটো তখনো কিন্তু করবী গাছটা আড়াল থেকে একইভাবে শশাঙ্কমোহনের ঘরের দিকে তাকিয়ে। বাইরে ক্ষীণ চাদের আলো যেন শ্রাবণ আকাশের মেঘস্তর ভেদ করে ঝাপসা ক্ষীণ মনে হয়।

সমস্ত জমিদার বাড়ী একেবারে নিস্তব্ধ নিঝুম আঁধারে ছায়ার মত স্তুপীকৃত হয়ে আছে।

চোখ দুটো দেখতে পায়, শশাঙ্কমোহনের ঘরের মধ্যে একটা অস্পষ্ট সাদা ছায়া এদিক ওদিক নড়ে চড়ে বেড়াচ্ছে।

অন্ধকারে করবী গাছটার আড়াল থেকে বিড়ালের মত নিঃশব্দে। আপাদমস্তক কালীে কাপড়ে ঢাকা একটা ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এলো, তারপর সেই ছায়ামূর্তি কাছাড়ি বাড়ির দিকে এগিয়ে চলল।

জমিদারবাবুর বসবার ঘরের ঠিক পাশ দিয়ে, যেখান থেকে উপরে উঠবার সিঁড়িটা-ছায়ামূর্তি সেই দিকে এগিয়ে চলল, তারপর নিঃশব্দে দুটো করে সিঁড়ি এক এক লাফে ডিঙ্গিয়ে উপরে উঠে গেল।

টানা বারান্দাটা রাতের নিঃসঙ্গ আঁধারে খ খ করে। মাঝে মাঝে ঝোলান কানিশের ফাঁকে ফাঁকে ক্ষীণ অস্পষ্ট চাদের আলো বারান্দার উপরে এসে এখানে একটু ওখানে একটু করে ছড়িয়ে পড়েছে।

চোরের মত পা টিপে টিপে নিঃশব্দে ছায়ামূর্তি শিকারী বিড়ালের মত এগুতে লাগল রেলিং ঘেঁষে।

সহসা খুঁট করে একটা শব্দ শোনা যায়।

আগাগোড়া সাদা চাদরে ঢাকা একটা মূর্তি নিঃশব্দে শশাঙ্কমোহনের ঘর থেকে বাইরে এসে দরজাটা টেনে দিল।

মুর্তি এগিয়ে চলে।

এ বারান্দারই একটা দরজা দিয়ে অন্দর মহলে যাওয়া যায়।

মুর্তি এগিয়ে এসে সেই দরজা খুলে অন্দর মহলে প্রবেশ করল।

প্রথমেই মৃগাঙ্কমোহনের ঘর।

বাইরে থেকে সেই ঘরের দরজায় একটা তালা দেওয়া। ছায়ামূর্তির হাতে একগোছা চাবি ছিল। সে একটার পর একটা চাবি দিয়ে ঘরের তালা খুলবার চেষ্টা করতে লাগল। গোটা পাঁচ ছয় চাবি চেষ্টা করার পর খুঁট করে একটা চাবি ঘুরে যেতেই তালাটা খুলে গেল।

মূর্তি তাড়াতাড়ি ঘরের মধ্যে ঢুকেই দরজা। এঁটে দিল। চাবিটা কিন্তু তালার গায়েই আটকে রইল। মূর্তির হাতে একটা ছোট শক্তিশালী টর্চ ছিল। সেটা টিপে আলো জুলিয়ে ঘরটার চারিদিক একবার ভাল করে ঘুরিয়ে দেখে নিল।

মৃগাঙ্কর যাবতীয় জিনিষপত্র একটা দেওয়াল আলমারীতেই বন্ধ থাকত। মৃগাঙ্কর স্বভাবটা ছিল চিরদিনই ভারী অগোছোল। অথচ তার মনটা ছিল অত্যন্ত সৌখিন।

সমস্ত ঘরময় ইতস্তত সব জিনিসপত্র ছড়ান। এখানে জামা ওখানে কাপড়, সেখানে জুতো ইত্যাদি সব ইতস্তত বিক্ষিপ্ত।

একপাশে একটা চামড়ার সুটকেশ হাঁ করে খোলা।

টেবিলের উপর গোটা পাঁচ সাত ‘ক্যাপসটেন’ সিগারেটের খালি টিন। অ্যাসট্রেটা ভর্তি একগাদা সিগারেটের ছাই জমা হয়ে আছে। ঘরের মেঝেয় একপর্দা ধুলো জমে রয়েছে। এদিক ওদিক সব পোড়া দেশলাইয়ের কাঠি ছড়ান। একপাশে খাটে শয্যাটা ধুলো বালিতে ময়লা।

বিশৃঙ্খলতার যেন একখানি চূড়ান্ত প্রতিচ্ছবি।

ছায়ামূর্তি এগিয়ে গিয়ে আলমারীটার সামনে দাঁড়াল।

মূর্তির ডান হাতের মুঠোর মধ্যে একটা বাঁকানো মোটা লোহার তার। সেটা আলমারীর গা-তালার ফোকরে ঢুকিয়ে দিয়ে গোটা দুই জোরে মোচড় দিতেই আলমারীর কপাট দুটো ফাঁক হয়ে গেল।

আলমারীটা খুলে কি যেন সে খুঁজতে লাগল।

অল্পক্ষণ খুঁজতেই মূর্তি একটা কাগজের ছোট প্যাকেট দেখতে পেল একটা বিস্কুটের খালি টিনের মধ্যে।

তাড়াতাড়ি সেই প্যাকেটটা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

পিছন ফিরে চাবিটা যেমন লাগাতে যাবে সহসা কোথা থেকে ঝুপ করে এসে একটা কালো চাদরের মত মাথার উপরে পড়ল। এবং চোখের পলকে একটা ফাসের মত কী যেন গলার উপর এঁটে গেল।

চঞ্চল সুনীল

সুনীল আর পানুর মধ্যে রামার মেহটা পাণুকে ঘিরেই বেশী করে আবর্ত রচনা করে ফেরে। উদ্দাম ঝড়ো হাওয়ার মত সদাচঞ্চল সুনীল মাকে কাঁদায়।

রামার মনে সর্বদাই আশঙ্কা সুনীলের জন্য উদগ্ৰীব হয়ে থাকে। হাতের কােজ ফেলেই সুনীলকে বুকের মাঝে সস্নেহে টেনে নিয়ে তার রুক্ষ পশমের মতো এলোমেলো চুলগুলির উপর গভীর মমতায় হাত বুলাতে থাকে, সুনু বাবা আমার, দুদণ্ডও কী তুই সুস্থির হয়ে থাকতে পারিস না?

আমার জন্য তোমার বড় ভয় না মামণি? সুনীল তার ডাগর চোখ দুটি মায়ের ছলছল স্নেহ চঞ্চল দৃষ্টির সামনে তুলে ধরে বলে, কেন মা তুমি আমায় বঁধতে চাও? এই চারিদিকে দেওয়াল ঘেরা ঘরের মধ্যে আমার মন হাঁপিয়ে ওঠে। পারি না। আমি থাকতে মামণি, বাইরে কেমন উদার উন্মুক্ত প্রকৃতি। মাথার উপরে সীমাহীন নীল আকাশ। কেমন করে থাক মা তুমি এ ঘরে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, একটিবারও কী তোমার মন চায় না ঘর থেকে ছুটে বাইরে বেরিয়ে যেতে? সুনীলের চোখ দুটো বাইরের আকাশে নিবদ্ধ।

কিসের ভাবে সে স্বপ্নাতুর।

সুনীল বলে চলে, আমাদের দেশের ছেলেগুলো চিরকালটা এমনি করেই মায়ের আঁচলের তলে ঘরের কোণে বদ্ধ রইলো, দেখলো না তার বাইরে বের হয়ে—জানলো না তারা বাইরে ঐ উদার উন্মুক্ত সীমাহীন প্রকৃতি কতবড় ঐশ্বর্যের ভাণ্ডার নিয়ে আপনাকে আপনি দিকে দিকে বিলিয়ে দিয়েছে। শুনলে না তারা দিগন্ত প্লাবিত মুক্ত পাখীর গান। বাঁধন হারা সাগরের জলোচ্ছাস। জান মামণি-ওদের দেশের ছেলেরা একটু ছুটি পেলেই দল বেঁধে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে, তাইতো তাদের দেশে জন্মায় কলম্বাস, লিভিংষ্টোন।

তারপর একটু থেমে আবার হয়ত বলে, আমি ছাড়াও তো তোমার আর একটি ছেলে আছে মা। তোমার পানু, সে তো ঘর থেকে বের হয়না। লক্ষ্মী ছেলেটির মত দিবারাত্র ঘরের মধ্যে বই নিয়ে বসে কাটায়। বাইরের ঐশ্বর্য ওর কাছে অন্ধকার।

পানু এসে ঘরে ঢোকে।

এই যে মা-মণি, তোমার সোনার যাদু এল। সুনীল পানুর দিকে চেয়ে হাসতে হাসতে বলে।

আমার নামে বুঝি, দাদা তোমার কাছে লাগাচ্ছে মামণি? পানু বলতে বলতে এগিয়ে আসে।

মা অন্য হাত বাড়িয়ে পানুকেও বুকের কাছটিতে টেনে নেয়, না রে না, দাদা যে তোকে কত ভালবাসে তাকি তুই জানিস নে পানু?

জানি মা, দাদা আমাকে সত্যি বড় ভালবাসে।

তাহলে তুমি কচু জান। সুনীল গভীর হয়ে জবাব দেয়। তোমাকে কিসসু ভালবাসে না দাদা। দাদার বয়ে গেছে। অমন ঘর-কুণো ভাইকে ভালবাসতে।

মা প্ৰসন্ন দৃষ্টিতে দুই ছেলের ঝগড়া দেখে আর মৃদু মৃদু হাসে। ওদের দাদু, রামার বাবা, বৃদ্ধ পরমেশ বাবু ঘরে এসে ঢুকলেন। কিসের দরবার চলেছে রাম।

তুমি বল দাদু, মার মনে কষ্ট দিয়ে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করা ভাল, না মা যাতে করে সুখী হন, তাই করা ভাল।

আমার মতে কুণো হওয়াটাও ভাল নয়-মার কথা শোনা উচিত।

এ তোমার দাদু, মন রাখা কথা হলো, সুনীল বললে, পরমেশবাবু ও রমা। চোখ চাওয়া চাওয়ি করে হাসতে থাকেন।

রাত্রি দশটা হবে।

সুনীল সেই দুপুরে তার বাইকে চেপে বের হয়েছে, এখনও ফেরেনি।

পড়ার ঘরে পানু একা টেবিল ল্যাম্পটি জেলে পড়ার বই খুলে পড়ছে।

ঝড়ের মতই সুনীল এসে ঘরে ঢোকে। কি, দিন নেই রাত নেই, কেবল পড়া আর পড়া।

কে দাদা? এতরাত পর্যন্ত কোথায় ছিলে? পানু জিজ্ঞাসা করে। পাতা বিছানাটার উপর টান টান হয়ে শুয়ে পড়ে সুনীল বলে, চল পানু কাল রবিবার আছে, বেরিয়ে পড়ি-হাঁটতে হাঁটতে যতদূর পারি চলে যাই।–তারপরই একটু থেমে বলে, উঃ যদি একটা আমার প্লেন থাকত।

পানু সহাস্যে বলে, তাহলে কি হতো দাদা?

ফাকে-উড়ে যেতম দূরে দূরে বহুদূরে—মাটির পৃথিবী অস্পষ্ট ছায়ার মতই-যেন আঁচল পেতে ঘুমিয়ে আছে। কেমন মজা হতো বলত-how thrilling!

সুনীলের চঞ্চল আঁখি দুটি স্বপ্নময় হয়ে ওঠে যেন। সুনীল আপন মনে বলে চলে–

“ওগো সূদুর, বিপুল, সুদূর তুমি যে,
বাজাও ব্যাকুল বাঁশরী।
মোর ডানা নাই আছি এ ঠাঁই
সে কথা যে যাই পাসরি।
আমি উৎসুখ হে,
হে সুদূর আমি প্রবাসী।
তুমি দুর্লভ দুরাশার মতো
কি কথা আমায় শুনাও সতত,
তব ভাষা শুনে তোমার হাদয়
জেনেছে তাহার স্বভাষী
হে সুদূর আমি প্রবাসী।”

আমি মাঝে মাঝে কি স্বপ্ন দেখি জানিস পানু—আমি যেন উড়ে চলেছি প্লেনে —অনেক অনেক হাজার ফুট উঁচু দিয়ে-স্বপ্ন দেখি আমি যেন-গভীর রাতে ঘুমহারা তারার পাশে পাশে আমি আমার প্লেনে উড়ে চলেছি। নীচে ঘুমিয়ে আছে তুষারে আচ্ছন্ন হিমালয়। তুষারের টোপর এক পায়ে ভুতের মত রাত জাগে। পাইন গাছগুলি সবুজ পাতার টোপর মাথায় ঝিমুচ্ছে। কখনও হয়ত উড়ে চলেছি জ্যোৎস্নালোকিত আকাশ পথে, নীচে ধুধু দিগন্ত বিস্তৃত সাহারার মরুভূমি। কখনও নীচে হয়ত গর্জে উঠেছে ফেনিল উত্তাল সাগরের ঢেউ।

পানু অবাক হয়ে সুনীলের কথা শোনে।

ওর দেহের প্রতি রক্তবিন্দুতে, বিন্দুতে যেন ঘর ছাড়া দিক হারার ডাক। হয়ত ও এমনি করেই একদিন সুদূরের পথে ভেসে যাবে। হয়ত ফিরবে, হয়ত বা ফিরবে না। কে জানে? ওর ভয় করে। রীতিমত ভয়ে ভয়ে ডাকে, দাদা?

সুনীলের কিন্তু খেয়াল নেই। বলে চলে, জনিস পানু, এতদিন কবে আমি হয়ত বেরিয়ে পড়তাম। কিন্তু পারিনা, মনে পড়ে মার মুখখানি, তার ব্যথা করুণ চোখের দৃষ্টি, একদিকে দূর দুরান্তের হাতছানি, অন্যদিকে মায়ের নীরব কাকুতি।

অশান্ত চঞ্চল কল্পনা পিয়াসী সুনীল। সত্যিই দাদাকে পানুর ভারী ভাল লাগে।

ছিন্ন সূত্রের গ্ৰন্থি

ছায়ামূর্তির গলার ফাঁসটা আড়াআড়ি ভাবে পড়েছিল এবং ফাসটা লাগাবার সাথে সাথেই পিছনপানে এক হেঁচকাটান খেয়ে ছায়ামূর্তি আর টাল সামলাতে পারলে না। পিছন দিকে হেলে পড়ে গেল এবং পড়বার সময় মাথাটা একটা টবের গায়ে প্রচণ্ডভাবে ঠুকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা ও সমগ্ৰ দেহটা যেন কেমন ঝিম ঝিম করে উঠল। সমস্ত স্মৃতি কেমন অসাড় ও গুলিয়ে একাকার হয়ে গেল। ছায়ামূর্তি ক্ষীণ অস্ফুট একটা শব্দ করে লুটিয়ে পড়ল।

শিথিল হাতের মুঠি থেকে একটা খাম মাটিতে পড়ে গেল। যে আততায়ী এতক্ষণ ছায়ামূর্তিকে অনুসরণ করে তার উপর আচমকা পিছন থেকে চাদর চাপা দিয়ে ফাস লাগিয়েছিল। সে এতক্ষণে এগিয়ে এল।

ক্ষিপ্ৰহস্তে ভূপতিত ছায়ামূর্তির মাথার উপর থেকে ফাসটা খুলে চাদরটা সরিয়ে নিল।

তারপর মাটির উপর থেকে খামটা তুলে নিয়ে নিঃশব্দে সেখান থেকে সরে পড়ল।

ছায়ামূর্তির জ্ঞান যখন ফিরে এল তখনও মাথাটার মধ্যে কেমন যেন বিমঝিম করছে।

মাথাটা উঁচু করতে গিয়ে মনে হল যে সেটা যেন লোহার মতই ভারী। মাথার একটা জায়গা ব্যথায় টন টন করছে। হাত দিয়ে অনুভব করে বুঝল যে বেশ খানিকটা কেটে গেছে। অজ্ঞান হওয়ার আগের সমস্ত ঘটনাগুলি একে একে মনের পর্দার উপর ছায়াছবির মত ভেসে ওঠে।

হাতের উপর ভর দিয়ে লোকটা উঠে বসলো।

মেঘের আড়ালে বোধ হয় চাঁদ ঢাকা পড়েছে। চারিদিকে কালো আঁধার থমথম করে।

টচটা পাশেই পড়েছিল। একটু খুঁজতেই সেটা পাওয়া গেল।

টর্চের বোতাম টিপে আলো জেলে আহত ব্যক্তি চারিদিক খুঁজল।

কিন্তু খামটি কোথাও দেখতে পেলে না।

আশ্চর্য! কোথায় গেল সেই খামটা।

তবে কি।–এতক্ষণে আগাগোড়া সমস্ত ব্যাপারটা একটা ক্ষীণ সন্দেহের আকারে মনের কোণে উঁকি দিল।

কিন্তু কে সে?

ভোরবেলা খবরের কাগজটা পড়তে পড়তে কিরীটী রায় মাঝে মাঝে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে।

সুব্রত এসে ঘরে প্রবেশ করল।

শ্ৰীপুর রহস্যের কিছু কিনারা হলো? কালকের সে বস্তুটি কোন কাজে লাগল?

নিশ্চয়ই–লেগেছে বৈকি-দশ আনা হয়ে গেছে। বাকী ছয় আনা।

তার মানে, তবে তো প্ৰায় মেরে এনেছিস বল?

হ্যাঁ কতকটা। চার ফেলেছি-মাছ টোপ গিলবেই-কিন্তু ঐ যে গাছের ডালে দুটো চিল ধ্বসে আছে, তাদের নিয়েই মুশকিল বেঁধেছে।

চিল।

হ্যাঁ–

সামনেই টিপিয়ের ওপরে একটা সাদা কাগজের গায়ে কয়েকটা কথা বড় বড় অক্ষরে লেখা।

১ নম্বর– বোতাম ‘ম’
২ নম্বর– চার বৎসর ‘ম’ ‘শ’

৩ নম্বর—চিঠি ‘শ’ ‘ম’

সুব্রত টিপয়ের উপর থেকে কাগজটা তুলে নিয়ে চোখ বুলিয়ে লেখাগুলির মাথামুণ্ড কিছুই বুঝতে পারলে না।

কিরীটীর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলে, এটা কি রে? কোন ধাঁধার উত্তর ঠিক করছিলি নাকি?

কিরীটী কাগজটার দিকে চোখ রেখেই জবাব দিল, না-একটা ধাঁধা তৈরি করবার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু মিলাতে পারলাম না।

তাই নাকি? এমন সময় জংলী সকল বেলাকগর ডাক এনে টিপয়ের উপর রাখে। কিরীটী চিঠিগুলি একটি একটি করে পড়ে নামিয়ে রাখতে লাগল।

হঠাৎ একটা চিঠি দেখে সেটা খাম ছিঁড়ে বের করে পড়তে পড়তে কিরীটীর চোখের মণি দুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

সে তাড়াতাড়ি চিঠিটা ভাঁজ করে জামার পকেটে রাখতে রাখতে বললে, সুব্রত, ঐ এক নম্বর অর্থাৎ বোতাম positive-অর্থাৎ হ্যাঁ–

সুব্রত খানিকক্ষণ হাঁ করে কিরীটীর প্রফুল্ল মুখখানির দিকে তাকিয়ে থেকে অবশেষে প্রশ্ন করলে, য়্যাঁ, কী বললি?

বললাম, পয়লা নম্বরে ভুল নেই। ওটার উত্তর মিলেছে।

ঝোড়ো হাওয়া

একদিন সুনীল পানুকে বলে, দেখা পানু, কত লোক কত কি পায়, আমি দৈবাৎ যদি হাজার দেড়েক টাকা পেয়ে যেতম কোন রকমে।

পানু হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করে, আজকাল কি তুমি দেশ ভ্রমণের কথা ভুলে গিয়ে টাকা পাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। দাদা?

রামচন্দ্র। টাকার স্বপ্ন দেখবে সুনীল সেন? Never-অর্থাৎ কোন দিনও দেখেনি, দেখেও না। ভবিষ্যতেও দেখবে না। কিন্তু কি করব বল? দাদুকে এত করে জানালাম, but he is deaf-একেবারে কলা। অথচ টাকার অভাবে একটা মোটর বাইক আমার কেনা হচ্ছে না।

এতক্ষণে পানুর কাছে ব্যাপারটা সহজ হয়ে আসে—

দুটো দিন অপেক্ষা কর না দাদা, দাদুর টাকা তো সব আমাদেরই হবে। আজকাল পানুও যেন একটু একটু করে সুনীলের দলে ভিড়তে শুরু করে দিয়েছে।

হবে? অর্থাৎ হতেও পারে না হতেও পারে? এদিকে সময় যে ফুরিয়ে যাচ্ছে। এ তুই দেখে নিস পানু, সুযোগ যদি একটা মিলে যায়। তবে হেলায় হারাচ্ছি না। সত্যি আর এমনি করে জীবনটাকে অতি যত্নে মুঠোর মধ্যে নিয়ে ঘরের কোনে চুপটি করে শান্ত শিষ্ট হয়ে বসে থাকতে পারছি না।

“দূর হতে শুনি যেন মহাসাগরের গান,
ডাকে যেন-ডাকে যেন সিন্ধু মোরে ডাকে যেন?”

রবি ঠাকুরের সেই কবিতাটা মনে নেই? ঐ যে,

“শিখর হইতে শিখরে ছুটিব
ভূধর হইতে ভূধরে লুটিব
হেসে খল খল গেয়ে কল কল
তালে তালে দিব তালি?
তটিনী হইয়া যাইব বহিয়া,
নব নব দেশে বারতা লইয়া,
হৃদয়ের কথা কহিয়া কহিয়া
গাহিয়া গাহিয়া গান।”

দাদার কথার সুরে সুরে পানুরও সমস্ত হৃদয় অশান্ত হয়ে ছুটে যেতে চায়।

দুর্মদ চলার বেগ, যেন তার দেহের রক্ত বিন্দুতে বিন্দুতে গভীর উল্লাসের উদামতায় ব্যাকুল হয়ে ওঠে।

সুনীল যেন ঝড়ো হাওয়া।

হু হু শব্দে চারিদিক ওলট পালট করে বয়ে যায়। অফুরন্ত প্ৰাণ যেন তার সমগ্ৰ দেহ বয়ে উপচে পড়ে।

কী উল্লাস, কী উদ্দামতা।

হঠাৎ সেদিন সুনীল কোন এক বন্ধুর মোটর বাইকটা চেয়ে নিয়ে এসে হাজির।

পানু খেয়ে দেয়ে কাপড় জমা পরে কলেজে বেরুবার জন্য প্ৰস্তুত হচ্ছে, দমকা হাওয়ার মতই সুনীল এসে ঘরে ঢুকল।

পানু, পানু।

দাদা?

বেড়াতে যাবি তো শীগগির আয়, দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি।

বেড়াতে, এখন? পানু আশ্চর্য হয়ে সুনীলের মুখের দিকে তাকায়।

হাঁ বেড়াতে।

কোথায়?

কোথায়? তা তো জানিনা, যেদিকে দু’চোখ যায়। চলতো বেরিয়ে পড়া যাক।

পানুকে একপ্রকার টানতে টানতেই সুনীল মোটর বাইকে এনে তুলে গাড়ি স্টার্ট দিল।

হু হু শব্দে গ্রাণ্ডট্রাঙ্ক রোড ধরে মোটর বাইক সুনীলের ছুটে চলেছে। দু’পাশের গাছ থেকে খসে পড়া শুকনো পাতাগুলি গাড়ির গতিবেগের সঙ্গে সঙ্গে ছুটে ছুটে আবার পিছিয়ে পড়ে।

কোথায় আমরা চলেছি দাদা? পানু জিজ্ঞাসা করল।

গাড়ীর স্পিডোমিটারের সরু নিড়লটা ৪০।৫০ এর ঘরে ওঠা নামা করছে। সেই দিকে চেয়ে সুনীল বলে, আপাততঃ এই ট্র্যাঙ্ক রোড ধরে, যতক্ষণ না পেট্রোল ফুরায়। অফুরন্ত চলার বেগে আমি আজ ছুটবো।

“হৃদয়ে আমার নাচেরে আজিকে
ময়ুরের মতো নাচেরে।
হৃদয়ে নাচেরে”

কালো কুচকুচে পীচ-ঢালা রাস্তা কখনো সোজা বরাবর কখনো এঁকেবেঁকে কোথায় কোন অজানায় আপনাকে হারিয়ে ফেলেছে। আপন মনে সুনীল ড্রাইভ করে চলেছে।

মাঝে মাঝে দু একটা মালবাহী গরুর গাড়ি কিম্বা লরী বা মোটর পাশ কাটিয়ে যায়। দু একটা পথিক পথের মাঝে হয়ত দেখা যায়।

কোথাও পথের দু’ পাশে অনুর্বর জমি, দু একটা গরু ঘুরে বেড়ায়।

সুনীলের মোটর বাইক ছুটে চলে ঝড়ের বেগে যেন।

দুপুরের দিকে ওরা এসে এক জায়গায় গাড়ি থামাল। একটা ছোট খাবারের দোকান। সামনেই একটা টলটলে দীঘি। কয়েকজন মেয়ে পুরুষ স্নান করছে।

গাড়ি থেকে নেমে সুনীল ও পানু পুকুরের ঠাণ্ডা জলে বেশ করে আগে হাত মুখ ধুয়ে নিল।

দোকান থেকে কিছু দই, মিষ্টি ও চিড়ে নিয়ে দুজনে খেতে বসে গেল।

আঃ কি তৃপ্তি!

ফিরবার পথে আকাশে মেঘ দেখা দিল।

হাওয়া বইতে শুরু হলো। হয়ত ঝড় উঠবে। তা উঠক।

দেখতে দেখতে প্ৰচণ্ড ঝড় জল শুরু হলো।

উঃ সেকি হাওয়া। মোটর বাইক ঠিকভাবে চালানোই কঠিন।

বৃষ্টির ছাঁট সর্বাঙ্গ সাপ সাপ করে ভিজিয়ে দিল।

মাঝে মাঝে মেঘের গর্জন, কড়-কড়-কড়ৎ-কানে তালা লাগার জোগাড়।

পথের দুপাশের গাছগুলো হাওয়ায় মড় মড় করে ওঠে। ক্রমে অন্ধকার হয়ে আসে।

সুনীল গাড়ির হেডলাইট জ্বলিয়ে দিল।

পানু বললে, গাড়ি থামিয়ে একটু কোথাও দাঁড়ালে হতো না দাদা?

সুনীল হাসতে হাসতে বলে, ভয় করছে বুঝি?

চোখের মণি দুটো জ্বল জ্বল করে জ্বলে। পানু বললে, ভয় আমার কোন দিনও নেই দাদা।

সুনীল বললে, That’s like a good boy.

“ওগো আজ তোরা যাসনে গো তোরা
যাসনে ঘরের বাহিরে।
আকাশ আঁধার বেলা বেশী আর নাহিরে।
ঝর ঝর ধারে ভিজিবে নিচোল,
ঘাটে যেতে পথ হয়েছে পিছল,
ওই বেনুবন দুলে ঘনঘন
পথ পাশে দেখি চাহিরে
ওগো অন্ধ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।”

পুরানো দিনের ইতিহাস

ষোল বছর আগেকার এক রাত্রি।

গভীর রাত্রি।

জমিদার শশাঙ্কমোহন তাঁর শোবার ঘরে অস্থির অশান্তপদে ইতস্ততঃ পায়চারি করে বেড়াচ্ছেন।

শশাঙ্কমোহনের দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে, তিনি যেন আজ বড়ই চিন্তিত।

ছোট ভাই মৃগাঙ্ক এসে ঘরে প্রবেশ করল, দাদা?

মৃগাঙ্কের ডাকে শশাঙ্কমোহন মুখ তুলে ভাইয়ের দিকে তাকালেন।

বাড়ির ভিতরের খবর কি মৃগু?

এখনও কিছু হয়নি। তুমি এবারে শুয়ে পড়গে। দাইকে তো বলাই আছে যে ছেলে হওয়া মাত্রই শাঁখ বাজাবে।

কিন্তু আমার যে ঘুম আসছে না ভাই।

চিন্তা করে লাভই বা কি বল? রাত জগলে শরীর খারাপ হবে। আর আমি তো এদিকে আছিই। তুমি শুয়ে পড়গে। কথাগুলো বলে মৃগাঙ্ক ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

শশাঙ্কমোহন শ্ৰীপুরের জমিদার। তার জমিদারীর আয় বছরে প্রায় লাখ টাকা।

যদিও শশাঙ্কমোহনের খুল্লতাত ভাই ঐ মৃগাঙ্কমোহন—তবু সেটা বুঝবার উপায় নেই। ঠিক যেন সহোদর ভাই ওরা।

অত্যন্ত স্নেহ করেন শশাঙ্কমোহন মৃগাঙ্গমোহনকে। মৃগাঙ্কমোহনও দাদা বলতে অজ্ঞান।

বিবাহের পর আট বছর চলে গেল—

সবাই ভেবেছিল বিভাবতীর বুঝি কোন ছেলেপুলে হবেই না—

অনেকেই শশাঙ্কমোহনকে আবার বিবাহ করতে পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু শশাঙ্ক করো কথাতেই কান দেন নি।

তিনি হাসতে হাসতে বলেছেন, ভগবানের যা ইচ্ছা তাই হবে। সন্তান লাভ যদি আমার ভাগ্যে না থাকে। তবে একটা কেন দশটা বিবাহ করলেও আমার ছেলে হবে না।

তারপর দীর্ঘ আট বছর। বাপ অনঙ্গমোহনের মৃত্যুর দুই বছর পরে হঠাৎ একদিন শোনা গেল বিভাবতীর নাকি ছেলেপুলে হবে।

সমস্ত জমিদার বাটীতে আনন্দের স্রোত বইতে লাগল। দিবারাত্র অতিথি, কাঙ্গালী, আতুরের কলধ্বনিতে জমিদার বাটী গামগম করতে লাগল।

দেবালয়ে শঙ্খ-কাঁসির-ঘণ্টা বাজতে লাগল। পুজো—স্বস্ত্যয়ন—হোম—যাগ—যজ্ঞ।

তারপর একদিন এল সেই বহু আকাঙ্খিত দিনটি।

সেদিন আবার বাইরে কি দুৰ্যোগ।

কি ঝড়-কি বৃষ্টি।

বিভাবতী আঁতুড় ঘরে।

এখনো কোন সংবাদ পাওয়া যায়নি।

মৃগাঙ্ক স্বয়ং দাঁড়িয়ে সমস্ত খবরদারী করছে।

রাত্রি তৃতীয় প্রহর। বৃষ্টিটা তখন একটু কমেছে বটে। তবে আকাশ মেঘে মেঘে একেবারে কালো হয়ে আছে। থেকে থেকে সোনালী বিদ্যুতের ইশারা এবং সে সোঁ প্ৰবল হাওয়া। সহসা ঐ সময় শোনা গেল শঙ্খধ্বনি।

শশাঙ্কমোহনও ছুটলেন। অন্দর মহলের শেষ প্রান্তে আঁতুড়ঘর। আঁতুড় ঘরের দরজার গোড়াতেই বলতে গেলে প্ৰায় শশাঙ্কমোহনের মৃগাঙ্গর সঙ্গে দেখা হল।

কি হয়েছে মৃণ্ড-ছেলে না মেয়ে?—

মৃগাঙ্কর মুখখানা হাসি হাসি। সে বলে, ভেবেছিলাম ছেলেই হবে বৌদির কিন্তু–

কিন্তু কি—

মেয়ে হয়েছে–

থমকে যেন দাঁড়িয়ে পড়লেন শশাঙ্কমোহন। বিষণ্ণ স্বরে বল্লেন, মেয়ে?

হ্যাঁ–তাতে কি হয়েছে?

মেয়েই হলো–

ভগবান করুন। এখন ঐ বেঁচে থাক–

শশাঙ্কমোহন আঁতুড় ঘরের দিকে এগোচ্ছিলেন, কিন্তু মৃগাঙ্কমোহন বাধা দেয় না-দাদা। ওদিকে এখন যেওনা। লেডি ডাক্তার যেতে নিষেধ করেছে। ওদিকে এখন কাউকে-কারণ বৌদি এখনো অজ্ঞান হয়ে আছেন।

একটিবার দেখেই যদি চলে আসি মৃগু—

না-এখন যেও না–

কি আর করবেন শশাঙ্কমোহন।

লেডি ডাক্তার ওদিকে এখন কাউকে যেতে যখন নিষেধই করেছে! শশাঙ্কমোহন চিন্তিত মনে আপন শয়ন কক্ষের দিকে ফিরে গেলেন।

তারপর রাত্রি আরো গভীর হয়েছে।

একে দুর্যোগের রাত্রি, তাই আবার টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়েছে। মাঝে মাঝে হু হু করে জোলো হাওয়া গাছের পাতায় পাতায় শাখার শাখায় দোলা দিয়ে যেন শিপ্‌ শিপ্‌ করে ভুতুড়ে কান্না কাঁদছে।

কেউ কোথাও জেগে নেই।–

লেডি ডাক্তার চলে গেছে। বিভাবতী অঘোরে ঘুমিয়ে। ওষুধ দিয়ে তাকে ঘুম পাড়ান হয়েছে।

টুক টুক করে মৃগাঙ্কমোহনের ঘরের দরজায় টোকা পড়ল।

মৃগাঙ্কমোহন জেগেই ছিল, ঘর অন্ধকার-দরজা খুলে দিতেই একটি নারী মূর্তি ঘরে এসে ঢুকল।

কে! মৃগাঙ্ক চাপা গলায় শুধায়।

আমি–

শেষ করে দিয়েছ তো–

না–

সেকি?

হ্যাঁ–প্রয়োজন হয়নি, সত্যি সত্যি মেয়েই হয়েছে—

ঠিক আছে যাও–

নারী মূর্তি চলে গেল। যেমন নিঃশব্দে এসেছিল। তেমনি নিঃশব্দে।

আরো কিছুক্ষণ পরে আঁতুড় ঘরে।

বিভাবতী ঘুমের ঔষধের প্রভাবে তখনো অঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘরের মধ্যে একটি মাত্ৰ মাটির প্রদীপ জ্বলছে–সেই প্ৰদীপের ক্ষীণ আলোয় ঘরের মধ্যে একটা আলোছায়া যেন লুকোচুরি খেলছে।

বাইরে দুর্যোগ তখনো থামেনি-প্রবল হাওয়ার সঙ্গে টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে।

টুক-টুক-টুক।

বদ্ধ দরজার গায়ে মৃদু সতর্ক টোকা পড়ল। ঠিক তিনবার।

দাই মঙ্গলা পা টিপে টিপে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল। অন্ধকার ছায়ার মত যেন কে একজন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।

মঙ্গলা—এসেছি-ছায়ামূর্তি চাপা কণ্ঠে যেন ফিস ফিস করে বলে।

দাঁড়াও আমি আসছি–

মঙ্গলা আবার আঁতুড় ঘরে ঢুকে গেল এবং একটু পরে একটি নবজাত শিশুকে বুকে জড়িয়ে বের হয়ে এল–

তারপর ফিস ফিস করে চাপা কণ্ঠে দুজনার মধ্যে কি কয়েকটা কথা হলো।

আগস্তুক যেমন এসেছিল। তেমনি অন্ধকারে মিলিয়ে গেল নবজাত শিশুটিকে বুকের মধ্যে নিয়ে।

মঙ্গলা আঁতুড় ঘরে ঢুকে আবার দরজায় খিল তুলে দিল। এবার সে যেন নিশ্চিন্ত।

বিভাবতীর একটি কন্যা হয়েছে সকলে জানল।

নবজাত শিশুর কল্যাণে দান ধ্যান-যাগ যজ্ঞ কত কি হলো। কত মিষ্টান্ন জনে জনে বিতরণ করা হলো।

সব ব্যাপারে বেশী উৎসাহী যেন মৃগাঙ্কমোহনই।

দিন যায়-মাস যায়-বছর ঘুরে আসে।

মৃগাঙ্কমোহনই শিশুর নামকরণ করল-শ্ৰীলেখা। ক্ৰ

মে মেয়ে আরো বড় হয়—লেখা পড়া শুরু করে—

মৃগাঙ্কমোহনের বড় আদরের ভ্রাতুষ্পুত্রী।

চৌধুরী বংশের দুলালী–আদরিণী—শ্ৰীলেখা।

হারিয়ে যাওয়া ছেলে

হরিঘোষ স্ত্রীটের একটা মেস বাড়ি।

সকাল সাতটা সাড়ে সাতটা হবে, মধ্যবয়সী একজন লোক সেদিনকার দৈনিকটা খুলে গভীর মনোযোগের সঙ্গে কী যেন পড়ছে। বিজ্ঞাপনের নিরুদ্দেশের পৃষ্ঠায় একটা বিজ্ঞাপন বের হয়েছে।

“হারিয়ে যাওয়া ছেলে। হারিয়ে যাওয়া ছেলে।”

ছেলেটিচুরি হয়ে গিয়েছিল, যেদিন সে জন্মায় সেইদিনই। তারপর ঘটনাচক্রে সে মানুষ হয় এক অনাথ আশ্রমে। এগার বছর যখন তার বয়স তখন সে নিরুদেশ হয়ে যায় আবার সেই অনাথ আশ্রম থেকে আশ্রমের নাম ‘হরমোহিনী আশ্রম”। ছেলেটি দেখতে ক’লো—দোহারা চেহারা—প্রকৃতি চঞ্চল-তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ধরে এবং ছেলেটির ডান ক্রর নীচে একটা জরুল আছে। যদি কেউ নিম্নলিখিত ঠিকানায় ছেলেটির সংবাদ দিতে পারে তবে সে বিশেষ পুরস্কার পাবে।
এস. রায়
নং আমহাস্ট স্ট্রীট,
কলিকাতা

রোগা লিকলিকে একজন লোক এসে ঘরে প্রবেশ করল।

লোকটার গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। একমাথা রুক্ষ চুল। ময়লা ধূতি পরিধানে, গায়ে একটা ময়লা তালি দেওয়া ডোরাকাটা সিস্কের সার্ট।

কিশোরী-রোগা লোকটি ডাকে।

উঁ।

বলি কি ব্যাপার?

উঁ।

বলছি হঠাৎ খবরের কাগজ এমন কি গোপন হীরার সন্ধান পেলি?

এতক্ষণে কিশোরী আগন্তুকের দিকে সংবাদপত্র থেকে মুখ তুলে তাকায়। কে? জগন্নাথ, আয়। আজকের কাগজে একটা বিজ্ঞাপন বের হয়েছে দেখকিসের বিজ্ঞাপন?

একটী ছেলের?

ছেলের?

হ্যাঁ, হারানো ছেলের সন্ধান দিতে পারলে পুরস্কার।

কত দেবে?

তা-কিছু লেখেনি। তবে–

কি তবে–

ব্যাপারটা শাঁসালো মনে হচ্ছে।

কিসে বুঝলি?

বুঝেছি।

দেখি বিজ্ঞাপনটিা।

কিশোরী দৈনিকটা এগিয়ে দিল জগন্নাথের দিকে।

কই? কোথায়?–

এই যে। কিশোরী আঙ্গুল দিয়ে ছেলে হারানোর বিজ্ঞাপনটা দেখায় জগন্নাথাকে।

জগন্নাথ বিজ্ঞাপনটারি উপরে বুকে পড়ল।…

একটা বিড়ি ধরিয়ে কিশোরী ঘন ঘন টান দিতে লাগল পাশে বসে।

জগন্নাথ বিজ্ঞাপনটা আগাগোড়া পড়ে চোখ তুলল।

পড়লি?

হুঁ—আমার মনে হচ্ছে তোর অনুমানটা হয়ত মিথ্যে নয় কিশোরী–তাহলে?

বল কি করতে হবে?

শোন, আজই হরমোহিনী আশ্রমে গিয়ে একটা খোঁজ খবর নিতে হবে। আর এদিকে বাকী-কথাটা কিশোরী জগন্নাথের কানের কাছে মুখ নিয়ে চাপা গলায় বললে।

আনন্দে জগন্নাথের চোখের মণি দুটো অস্বাভাবিক এক উজ্জ্বলতায় ঝাক ঝক করে উঠল।

কিন্তু ভায়া একটা কথা আছে। জগন্নাথ বললে।

কী?

বুঝতে পারছে না?

না। কি বলতে চাস খুলে বল।

মানে, ঐ বিজ্ঞাপন হচ্ছে ফেউ, ওর পিছনে বাঘ আছে।

বাঘ।

হুঁ। বুঝতে পারছে না এখনো। ঠিকানাটা কোথাকার?

আমহাস্ট স্ট্রীট থেকে দেওয়া হয়েছে না?

তা হয়েছে–

নম্বরটা মনে হচ্ছে সুব্রত রায়ের বাড়ি।

বলিস কি?

তাই-অতএব ঐ বিজ্ঞাপনের পশ্চাতে নিৰ্ঘাৎ তিনি আছেন।

কে?

কে আবার। শ্ৰীল শ্ৰীকিরীটী রায়–

কোন কিরীটী?

রহস্যভেদী কিরীটী রায়। আবার কোন কিরীটী রায়–

তা হোক। যা জানাবার আছে তা আজই দুপুরে ঐ লোকটার কাছ থেকে সব জেনে আসবি।

দিন পাঁচেক পরে দুপুরের দিকে বাইরের রোদটা বেশ চড়চড়ে হয়ে উঠেছে।

অসহ্য গরমে বাইরের তপ্ত হওয়া গায়ে জ্বালা ধরায়। দরজা জানালা আটকে সুব্রত দ্বিপ্রহরে একটা সুখনিদ্রা দেবার চেষ্টা করছে, এমন সময় ভৃত্য এসে জানাল কে একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক ওর সঙ্গে একটা জরুরী কাজের জন্য একটিবার দেখা করতে চান।

ভদ্রলোককে বাইরের ঘরে বসা, আমি যাচ্ছি। সুব্রত বলে।

তৃত্য চলে গেল।

সুব্রত বাইরের ঘরে এসে দেখে একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক চুপচাপ একটা সোফা অধিকার করে দরজার দিকে উদগ্ৰীব হয়ে চেয়ে আছেন।

নমস্কার।

নমস্কার, সুব্রত একটা সোফা অধিকার করে বসল।

ভদ্রলোক জামার বুক পকেট থেকে সেদিনকার খবরের কাগজের কাটিংটা বের করলেন, এই বিজ্ঞাপনটা আপনিই দিয়েছেন? মানে আপনার নামই তো এস, রায়?

হ্যা, কিন্তু আপনি?

মানে, আমি বোধহয় আপনাদের সেই হারানো ছেলেটির খোঁজ দিতে পারব।–

আপনার নাম? কোথা থেকে আসছেন?

শ্ৰীীরঘুনাথ ঘোষাল। অবিশ্যি এখানেই এই শহরেই থাকি-মানে চেতলায়।

যে ছেলেটির কথা বলছেন সে ছেলেটি কোথায় আছে?

আমার কাছেই আছে।

আপনার কাছে।

হ্যাঁ–

তা এই যে সেই ছেলে তা আপনি বুঝলেন কি করে?

সে বলতে পারব না-তবে এই ছেলেটির ডান ভ্রূর নীচে একটা জরুল আছে আর–

আর?

আর ছেলেটি আমার কেউ নয়-বছর চারেক ধরে প্রতিপালন করছি মাত্র–

প্ৰতিপালন করছেন!

তাই-রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে দেখে আমি সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে আমার বাড়িতে স্থান দিই। সেই থেকে আমার কাছেই আছে। এবং ছেলেটিকে দেখলে সহজেই বোঝা যায়। সাধারণ ঘরের ছেলে সে নয়-কোন ধনীর সন্তানই হবে। সুন্দর চেহারা–

ছেলেটিকে যখন আপনি পান। তখন তার বয়স কত হবে?

তা ধরুন দশ-এগার তো হবেই–

নাম কি বলেছিল!

সুধীর—

এখুনি আপনার ওখানে গেলে ছেলেটিকে কি একবার দেখা যেতে পারে!

কেন যাবে না-তবে একটা কথা আছে।

কি বলুন!

আপাততঃ সে কলকাতায় নেই–

কোথায় আছে?

ছেলেটি এখন মীরাটে আমার স্ত্রীর কাছে আছে।

কবে তাক এনে দেখাতে পারবেন। ছেলেটিকে

তা মনে করুন দিন দশেক তো লাগবেই।

বেশ-তবে সেই ব্যবস্থাই করুন।

আচ্ছা।

একটা কথা।

বলুন।

ছেলেটির কোন ফটো আপনাদের কাছে আছে?

সুব্ৰত ঘাড় নেড়ে বলে, না–

তবে! তবে ছেলেকে সনাক্ত করবেন কি করে?

সে ব্যবস্থা হবে–

কি করে?

হরমোহিনী আশ্রমে গেলেই সেখানকার হেড মাস্টার চিনতে পারবেন–

বেশ-তবে সেই কথাই রইলো। আমি তাহলে এখন উঠি।

আসুন।

ভদ্রলোককে বিদায় দিয়ে সুব্রত আর এক মুহুর্ত দেরি করে না। সঙ্গে সঙ্গে জামা কাপড় পরে টালীগঞ্জে কিরীটীর বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়ে।

ঘরের ছেলে

কিরীটী বাসাতেই ছিল।

সুব্রত হাসতে হাসতে কিরীটীকে বললে, তোর ও খবরের কাগজের প্যাচ বোধহয় শেষ পর্যন্ত লেগে গেল রে।

কিরীটী একটা পেনসিল দিয়ে কাগজের গায়ে হিজিবিজি কাটছিল, মুখ না তুলেই জবাব দিল, হিসাবের কড়ি বাঘে খায়না রে, বুঝলি? চৌদ্দ আনা মীমাংসা তো প্ৰায় হয়েই আছে। বাকী দুআনার জন্য গোলমাল বেঁধেছিল। দেখি তাও বোধ হয় হয়ে এল।

বলত ব্যাপার কী?

Advertisement টা কতদিন হলো দেওয়া হচ্ছে?

তা প্ৰায় দিন পনের তো হবেই

এমন সময় জংলী এসে ঘরে প্রবেশ করল। কিরীটী ওর মুখের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করল, কি চাস–

চা দেব কী?

নিশ্চয়ই, যা-নিয়ে আয় জলদি।

সুব্রত তখন এক নিঃশ্বাসে একটু আগের দুপুরের সকল ঘটনা সবিস্তারে বলে গেল।

কিরীটী শুনতে শুনতে গম্ভীর হয়ে উঠল।

কি জানি কেন-কিরীটী কিন্তু খুব উৎসাহিত বোধ করে না।

সুব্রত জিজ্ঞাসা করে, কি ভাবছিস?

কিছু না–

তোর কি মনে হয়—ঐ ছেলেই কি—

দেখা যাক–

রঘুনাথ লোকটি আর কেউ নয়-পূর্ববর্ণিত কিশোরী।

কিশোরী আর জগন্নাথ শহরের ভদ্রবেশ ধারী দুটি নাম করা গুণ্ডা। তাদের অসাধ্য কোন কােজ নেই। বিজ্ঞাপনটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই কিশোরীর মনে একটা মতলব খেলে যায়।

পরামর্শ করে তারপর সে জগন্নাথকে সুব্রতর কাছে পাঠায়।

সেখানে যখন জানতে পারে ছেলেটিকে ওরাও চেনেনা এবং চেনে কেবল একমাত্র ‘হরমোহিনী’ অনাথ আশ্রমের সিংহী লোকটা-ওরা গিয়ে গোপনে সিংহীর সঙ্গে দেখা করে, এবং টাকার লোভ দেখিয়েও প্ৰাণের ভয় দেখিয়ে সিংহীকে দলে টানে।

তারপর—

সাত দিন পরে সুব্রতর গৃহে ছেলেটিকে নিয়েই রঘুনাথ ওরফে জগন্নাথ এসে হাজির হলো।

সুব্রত আর কিরীটী ছেলেটিকে নিয়ে তখন টালীগঞ্জে হরমোহিনী আশ্রমে গেল—সেখানকার সুপারিনটেণ্ডেন্ট সনাক্ত করল ঐ ছেলেটিকেই সুধীর চৌধুরী বলে।

অতঃপর কিরীটী ছেলেটিকে নিয়ে শশাঙ্ক চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করাই ঠিক করলে এবং পরের দিন ছেলেটি ও জগন্নাথ সহ শ্ৰীপুরের দিকে রওনা छ्ळीं।

শশাঙ্কমোহন বাইরের ঘরে চুপটি করে বসে সেদিনকার খবরের কাগজটা উল্টে পাল্টে দেখছেন, এমন সময় সেদিনকার সেই ভদ্রলোকটি এসে ঘরে প্ৰবেশ করল।

নমস্কার শশাঙ্কবাবু।

শশাঙ্কমোহন মুখ তুলে চাইলেন।

কিন্তু ভদ্রলোকের পশ্চাতে দাঁড়িয়ে একটি সুশ্ৰী বছর পনেরর ছেলে। একটু পরে কিরীটী ইঙ্গিতে জগন্নাথকে ছেলেটিকে নিয়ে পাশের ঘরে যেতে <ळ्ळ्ञ्।

ধূর্জন্টিবাবু-কি খবর।

একটা বিশেষ জরুরী কাজে এসেছি—

বলুন।

আপনার হারিয়ে যাওয়া ছেলের সন্ধান বোধ হয় পাওয়া গিয়েছে

সত্যি-আনন্দে উৎফুল্প হয়ে ওঠেন। শশাঙ্কমোহন, কোথায়-কোথায় %R-

ব্যস্ত হবেন না-শুনুন একটু।

কিন্তু-?

যে ছেলেটিকে দেখলেন-বলে সংক্ষেপে জগন্নাথ কাহিনী বর্ণনা করে কিরীটী, ঐ-বোধ হয় আপনার ছেলে-।

অতঃপর ছেলেটিকে আবার ঘরে ডেকে আনা হলো।

শশাঙ্কমোহন। একদৃষ্টে চেয়ে আছেন তখনো ঐ ছেলেটির দিকে। সরল গোবেচারী গোছের চেহারা ছেলেটির।

এবং তারপর আবার ছেলেটিকে কিরীটী পাশের ঘরে যেতে বলল। ছেলেটি চলে গেল।

কিরীটী বলে, আপনার সেই ফটোটা থাকলে হয়ত নিশ্চিন্ত ও আমরা স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারতাম—তবে হরমোহিনী’ আশ্রমের সুপারিনটেনডেন্টস্থির নিশ্চিত-বললেন এই সেই নিরুদ্দিষ্ট সুধীর—

বলেছেন—বলেছেন—তিনি!

হ্যাঁ–তবে একটা কথা আছে—

বলুন। ব্যাপারটা আরো কিছু দিন বোধহয় গোপন রাখাই ভাল হবেবেশ-

কিন্তু ছেলেটি—

ইচ্ছা করলে তাকে এখানে আপনি রাখতে পারেন। তবে–ছেলেটি বা কেউ যেন না জানে—আসলে সে কে। কি তার পরিচয়।

বেশ-তাই হবে।

কিরীটী ছেলেটিকে রেখে ফিরে গেল। শশাঙ্কমোহনেরই অনুরোধে। কিন্তু শশাঙ্ক মোহন কথা রাখতে পারলেন না।

এতদিন পরে হারানো ছেলের সন্ধান পেয়ে আনন্দে দিশেহারা হয়ে স্ত্রী বিভাবতীকে ডেকে সব খুলে বললেন।

বিভাবতী যখন এতকাল পরে স্বামীর মুখে শুনলেন—আসলে তার মেয়ে হয়নি—হয়েছে ছেলে এবং সেই ছেলে এতকাল পরে তীর বুকে ফিরে এসেছে-আনন্দে যেন পাগল হয়ে যান।

কি করবেন ভেবে পান না। এবং স্বামীর অনুরোধ সত্ত্বেও কথাটা গোপন রাখতে পারেন না। একটু একটু করে কথাটা জানাজানি হয়ে যায়। সংবাদটা মৃগাঙ্গমোহনও শুনলেন।

মৃগাঙ্কমোহন এসে জিজ্ঞাসা করলেন, এসব কি শুনছি। দাদা? সত্যি। তবে কি আপনার ছেলেই হয়েছিল?

হ্যাঁ। শশাঙ্কমোহন গম্ভীর স্বরে জবাব দিলেন।

তবে এতদিন সেকথা লুকানো ছিল কেন?

প্রয়োজন ছিল।

প্রয়োজন তখন ছিল, না এখন হয়েছে? মৃগাঙ্কমোহনের গলার স্বর কঠিন ও রূঢ়।

শশাঙ্কমোহন চুপ করে রইলেন।

আর এ ছেলে যে সত্য সত্যই জমিদার শশাঙ্ক চৌধুরীর তারই বা প্রমাণ কি? উইলের দাবীকে দাঁড় করাবার জন্য এটা স্বয়ং জমিদারের একটা যে চাল নয়। তাই বা কে বলবে?

তুমি কি বলতে চাও মৃগু?

আমি যা বলতে চাই তা অত্যন্ত সহজ ও সরল।

অর্থাৎ–

অর্থাৎ এ ছেলে আপনার নয়। কস্মিনকালে ও কোন দিন আপনার ছেলে হয়নি। আপনার মেয়েই হয়েছিল, সেকথা গায়ের জোরে আপনি স্বীকার করতে চাইলেও আদালত অস্বীকার করবে না–

আর যদি প্ৰমাণ করতে পারি যে এ ছেলে আমার?

দিনকে রাত করতে চাইলেই তা কিছু সম্ভব হয় না। অতএব পাগলামি বা একটা কেলেঙ্কারী না করাই কি ভাল নয়। কথাগুলো বলে মৃগাঙ্কমোহন ঘর ছেড়ে চলে গেল।

অনাথ আশ্রম

আজ থেকে চার বছর আগেকার কথা।

টালীগঞ্জ গঙ্গার ধারে ‘হরমোহিনী অনাথ আশ্রম’। মা বাপ হারা আতুরের দল, যাদের এ দুনিয়ায় কেউ নেই তাদের জন্য এই আশ্রম।

চারপাশে দু’মানুষ উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা প্ৰকাণ্ড কম্পাউণ্ড। কম্পাউণ্ডের একদিকে হলঘর, অন্যদিকে ছাত্রাবাস ও মাস্টারদের থাকবার ঘর।

অনাথ আশ্রমের সুপারিনটেণ্ডেন্ট মিঃ কে, সিংহ। দেখতে তিনি যেমন কালো, মোটা তেমনি হাতীর মত। আসল নাম কুলদা সিংহ। হাতীর মত না। হলেও কান দুটো মিঃ সিংহের একটু বড়ই ছিল। দিদিমা আদর করে নাম দিয়েছিল, ‘কুলদা’।

শোনা যায় ছেলে বেলায় খেলার সাথীরা কুলদা নামের একটা চমৎকার ভাবার্থ বের করে একটি কবিতাও বানিয়েছিল।
কুলোর মত দুটো যার কান,
কুলদা তাহার নাম।

মিঃ সিংহ ছিলেন যেমন বদরাগী তেমনি সন্দেহ বান্তিকগ্ৰস্থ। কাউকেই তিনি ভাল চোখে দেখতে পারতেন না। সামান্য একটু দোষ ত্রুটি হলে আর রক্ষা ছিল না।

শাস্তির বহরটিও ছিল তার বিচিত্র।

আশ্রমের এক কোণে অন্ধকার ঘর বলে এক কুঠুরী ছিল। সেই কুঠুরীর একটি মাত্র দরজা, আর ছোট ছোট দুটি জানালা। তাও একমানুষ সমান উঁচুতে।

আশ্রমের ছেলেদের মধ্যে যদি কেউ কোন দোষ করত। তবে তাকে দশ ঘা বেত মেরে সেই দিন রাতে না খেতে দিয়ে সেই অন্ধকার ঘরে’ বন্ধ করে রাখা হতো।

অন্ধকার ঘর ছেলেদের কাছে ছিল একটা পরিপূর্ণ আতঙ্ক।

মিঃ সিংহ ছাড়া সেখানে থাকতেন আরো তিনজন মাস্টার, দুজন চাকর, একজন দারোয়ান ও একজন ঠাকুর।

ছাত্রদের সংখ্যা মোটমাট ত্রিশ থেকে পঁয়ত্ৰিশ।

তার মধ্যে পাঁচ ছয় থেকে পনের ষোল বছরের পর্যন্ত ছেলে ছিল। এ আশ্রমের নিয়ম ছিল, ম্যাট্রিক পর্যন্ত পাশ করিয়ে দিয়ে ছেলেদের একটা ব্যবস্থা করে দেওয়া হতো।

সুধীর এই আশ্রমেরই একজন ছেলে।

সুধীর এখন তো বেশ বড় হয়ে গিয়েছে।

এগার বছর বয়স তার। কিন্তু এখানে এসেছিল খুব ছোট যখন সে-মাত্র ছয় বছরের বালক।

মা তাকে এখানে রেখে গিয়েছিল একদিন ঘুমের মধ্যে। ঘুম ভেঙ্গে দেখে এই আশ্রমে ও রয়েছে।

ঘুম ভাঙ্গার পর কেঁদেছে-তারপর আরো কত কেঁদেছে।

কিন্তু মা আর আসেনি। মাকে আর ও দেখতে পায় নি।

সুধীরের গড়নটা ছিপছিপে। গায়ের রঙ কালো, বাঁশীর মত টিকেল নাক। স্বপ্নময় দুটি চোখ। দোহারা চেহারা।

তাহলে কি হবে? সুধীরের মত দুরন্ত ছেলে সমস্ত আশ্রমের মধ্যে আর নেই।

দৌড়, ঝাঁপ, সাঁতার, দুষ্টুমিতে সব বিষয়েই ও সকলকে ডিঙ্গিয়ে চলে, এমন কি, লেখাপড়াতেও কেউ ওর সঙ্গে পেরে ওঠে না।

অন্যান্য ছেলেরা ওকে ভয়ও যেমন করে, ভালবাসেও ঠিক তেমনি।

সুধীরের সব চাইতে গোঁড়া ভক্ত ‘ভিখু’।

ভিখু সুধীরের চাইতে বছর খানেকের হয়ত ছোট হবে।

ভিখু কিন্তু সুধীরের ঠিক বিপরীত।

চেহারার দিক দিয়ে গােটা গোট্টা বলিষ্ঠ চেহারা। খুব ফর্স গায়ের রং। কুতকুতে চোখ দুটি মেলে ফিক ফিক্‌ করে হাসে। এক পাটি মুক্তার মত দাঁত ঝক ঝক করে।

ছায়ার মতই ভিখু সুধীরের পিছন পিছন ঘোরে।

ভিখুর যখন বছর চারেক বয়েস, তখন ওকে কুম্ভ মেলায় এই আশ্রমের এক মাস্টার কুড়িয়ে পান।

ওর পরিচয় জিজ্ঞাসা করা হলেও ও শুধু কঁদতে কাঁদতে বলেছিল, ওর নাম ভিখু। ও আর কিছুই বলতে পারেনি।

মাস্টার এখানে এনে ওকে ভর্তি করে দিল।

সেই থেকে ও এইখানেই আছে।

গ্ৰীষ্মের বেলা দ্বিপ্রহর।

চারিদিকে রোদ ঝাঁ ঝাঁ করছে।

সিংহীর কড়া হুকুম, যে যার ঘরে বসে পড়াশুনা করবে।

আশ্রমের দুজন চাকরের মধ্যে শিবু সিংহীর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র।

লোকটা জাতে উড়িয়া। একটা চোখ কানা। মাথায় তেল চপ চাপে লম্বা টেরী।

সিংহীর সে ছিল গুপ্তচর। আশ্রমের যেখানে যা ঘটে সব গিয়ে সিংহীর কাছে রাত্রে শোবার আগে বলে আসত।

সুধীর ওকে দু’চোখে দেখতে পারত না।

বলত–আমার বন্দুক থাকলে ওকে গুলি করে মারতাম। বেটা কানা শয়তান।

শিবুও কেন যেন ওকে দেখলেই পাশ কাটিয়ে পালাত।

আর সুধীরের নামে সিংহীর কাছে বিশেষ কিছু লাগাতও না।

সব চাইতে শান্ত-গো-বেচারা একটু মোটা বুদ্ধির ছেলে শ্যামল ঐ আশ্রমে।

শ্যামল বাংলা বইটা খুলে দুলে দুলে পড়ছিল।

“আমরা ঘুচাব মা তোর কালিমা,
মানুষ আমরা নাহি তো মেষ।”

ওপাশে বসে কানু, আশ্রমের আর একটি ছেলে রবারের গুলতি তৈরি করছিল। গভীর গলায় বলে উঠলো, মেষ নস, তুই একটা আস্ত গাধা।

ঘরের অন্যান্য ছেলেরা সব হো হো করে হেসে উঠল।

সুধীর বলতে লাগল, দেখ শ্যামল। এখন না হলেও মেষ হয়ত আমাদের শীগগির হতে হবে। দিনরাত পড়া আর পড়া। এই, তোরা এত বোকা কেন বলত। দিবারাত্ৰ গাঁ গা করে বই খুলে চেঁচালেই বুঝি একেবারে বিদ্যে ভুড়ীভূড়ী হওয়া যায়।

পড়ার সময় পড়বে শুধু, খেলার সময় খেলা
সকল সময় পড়লে জেনো বিদ্যা হবে কলা।

বুঝলে গোবৰ্দ্ধন?

গোবৰ্দ্ধন বসে বসে বইটা সামনে খুলে রেখে ঝিমুচ্ছিল। সুধীর তার মাথায় একটা ‘উড়ন চাঁটি’ দিয়ে কথাটা বললে।

গোবৰ্দ্ধন তাড়াতাড়ি চমকে উঠে আবার পড়া শুরু করে দিল।

ত-র-আর-রণী, তরণী, তরণী মানে নৌক।

যে নৌকায় চড়ে আমরা বর্ষাকালে যাতায়াত করি।

ত-র-আর-রণী—

সুধীর ওর সাথে কণ্ঠ মিলাল। তরণী মানে নৌকা। যে নৌকায় চড়ে তুমি গোবৰ্দ্ধন ঘোড়া আর গাধার মত কান যার সেই সিংহী ভব-নদীর পারে যাবে।

ঘরের মধ্যে আবার একটা হাসির ঢেউ জাগল।

গোবৰ্দ্ধন কিন্তু ততক্ষণে আবার ঢুলতে শুরু করেছে চোখ বুজে।

অদ্ভূত ক্ষমতা ওর এমনি করে বসে বসে ঘুমোবার।

সেই জন্যই তো, সুধীর ওর নামের পদবী বদল করে নতুন পদবী দিয়েছে ‘গোবৰ্দ্ধন ঘোড়া।’-

সুধীর এক সময় বলে,–চল সব আজ রাত্রে জেলেদের নৌক চুরি করে গঙ্গার ভিতর খানিকটা ঘুরে আসা যাক। যাবি?

সুধীরের কথায় সকলে আনন্দে লাফিয়ে উঠল।

গঙ্গার বুকে নৌক ভাসিয়ে ঘুরে বেড়াতে সুধীরের বড় ভাল লাগে। যতীন বললে, কিন্তু আশ্রম থেকে বের হবে কি করে? রাত্রে গেট বন্ধ করে দারোয়ান শুয়ে পড়ে।

তুই যেমনি মোটা তেমনি তোর বুদ্ধিটাও দিন দিন মোটাই হয়ে যাচ্ছে। এত করে বলি রোজ রাত্রে অতগুলো রুটি গিলিস না তা শুনাবি নাতো আমার কথা, খা, কত খাবি খা। এরপর নামটাও দেখবি হয়ত মনে করতে পারছিস না। সুধীর বললে।

তারপর যতীনের পিঠে একটা মৃদু চাপড় দিয়ে স্নেহকরুণ স্বরে বললে, আচ্ছা রাত্রে দেখবি কেমন ‘চিচিং ফাক’ তৈরী করে রেখেছি।

আশ্রমে থাকবার ব্যবস্থাটা ওদের ভালই।

ইংরাজী ‘E’ অক্ষরের মত বাড়িটা, মাঝখানে প্রশস্ত আঙ্গিনা।–তার ওদিকে সুপারিনটেনডেন্ট সিংহীর কোয়ার্টার।

তার পিছনে রান্না ঘর-খাবার ঘর ও চাকরীদের মহল।

বাড়িটার পূর্ব দিকে গঙ্গা, ছোট ছোট সব পাটিশন দেওয়া ঘর।

এক একটি ঘরে দুজন করে ছেলে থাকে। সুধীরের ঘরে থাকে সুধীর ও ভিখু।

পলায়ন

সেদিন রাত্রে দুপুরের কথামত আশ্রমের খাওয়া দাওয়া চুকে গেলে সকলে পিছু পিছু এসে সুধীরের ঘরে প্রবেশ করল।

সুধীর সকলকে ঘরে ঢুকিয়ে ভিতর থেকে দরজাটা এঁটে দিল। গঙ্গার দিককার জানালাটায় পরপর পাঁচটা লোহার শিক খাড়া করে বসান, তারই একটা শিক ঈষৎ উপর দিকে একটু ঠেলে নীচের দিকে টানতেইজানালার কাঠের ফ্রেম থেকে খুলে এল। সকলে বিস্ময়ে এতক্ষণ একদৃষ্টি তাকিয়ে সুধীরের কাণ্ড-কারখানা দেখছিল।

সুধীর ওদের দিকে ফিরে হাসতে হাসতে বললে, দেখলি কেমন চিচিং ফাঁক।

ছুরি দিয়ে কাঠ কুরে কুরে ফ্রেমের গর্ত বাড়িয়ে সুধীর শিক খোলবার উপায় করেছিল।

এইবার এই জানলা পথে সবাই আমরা বাইরে যাবো, সুধীর বলে।

প্রকাশ করে তার মতলব!

সকলে তখন সেই শিকের ফাঁক দিয়ে একে একে বাইরে গেল। নিঃশব্দে নীচে হয়ে প্রাচীরের গা ঘেসে সকলে আশ্রমের সীমানা পার হয়ে গঙ্গার ধারে গিয়ে দাঁড়াল।

আকাশে চাঁদ দেখা দিয়েছে। তার আলোয় চারিদিক যেন স্বপ্নময়।

গঙ্গায় তখন জোয়ার দেখা দিয়েছে।

জোয়ারের টানে গঙ্গার ঘোলাটে জল সাদা সাদা ফেনা ছড়িয়ে কলকল ছলছল করে দুপাড় ভাসিয়ে ছুটছে। খানিকটা দূর এগিয়ে যেতেই দেখা গেল কয়েকটা জেলে ডিঙ্গি পাড়ের সঙ্গে দড়ি দিয়ে খোঁটার গায়ে বাঁধা।

জোয়ারের জলে ছোট ছোট ডিঙ্গিগুলো হেলছে আর দুলছে। সামনেই অল্প দূরে জেলেদের বাড়ি।

বঁশের মাচানের গায়ে জাল শুকাচ্ছে।

সুধীর আস্তে আস্তে নীচু গলায় বললে, চুপ, সব গোলমাল করিসনে। জেলেরা টের পেলে কিন্তু আর রক্ষা রাখবে না। তোরা সব আস্তে আস্তে গঙ্গার পাড় দিয়ে খানিকটা এগিয়ে যা, আমি নৌকা খুলে দিয়ে এগিয়ে গিয়ে তোদের তুলে নেব’খন।

পরিপূর্ণ চাঁদের রূপালী আলো গঙ্গার জলের বুকে অসংখ্য ঢেউয়ের গায়ে গায়ে যেন অপূর্ব স্বপ্ন মাধুরী রচনা করে।

সুধীর নিঃশব্দে একটা ডিঙ্গি খুলে নিয়ে এগিয়ে গেল একটু দূরে।

সবাই এসে জমায়েত হয়েছিল একটু দূরে।

সুধীর একে একে সকলকে ডিঙ্গিতে তুলে নিল। সুধীর হালে বসল। আর দুজন দাঁড় টানতে লাগল। জোয়ারের টানে নৌক সামনের দিকে এগিয়ে চলে। মাঝে মাঝে গঙ্গাবক্ষের শীতল হাওয়া এসে চোখে মুখে ঝাপটা দিয়ে যায়।

হঠাৎ সুধীর সকলের দিকে তাকিয়ে বলে, আচ্ছা এমনি করে নৌকা বেয়ে আমরা যদি দুরে—অনেক দূরে পালিয়ে যাই। আর আশ্রমে কোন দিনও না ফিরি কেমন হয় বল তো–

সুধীরের কথায় সকলের মুখ যেন ভয়ে চুপসে এতটুকু হয়ে যায়।

গোবৰ্দ্ধন ভয়ে ভয়ে বলে, ওসব কী কথা সুধীর? সিংহী সাহেব তাহলে আর কাউকে জ্যান্ত রাখবে না।

সুধীর হাসতে হাসতে জবাব দেয়, কোথায় থাকবে তখন সিংহী, আমাদের নাগাল পেলে তো?

পরেশ একটু পেটুক, ঢোক গিলে প্রশ্ন করলে, পালিয়ে যে যাবে কারও কাছে তো পয়সা নেই, খাবে কি ক্ষিধে পেলে?

কেন? নদীর জল আর হাওয়া। অন্নান বদনে সুধীর জবাব দিল। তারপর হাসতে হাসতে বললে, ভয় নেইরে। পালাব না।

সত্যি বলছিস? পরেশ শুধায়।

হ্যাঁ, আর সত্যিই পালাতে যদি কোনদিন হয়ই, তবে একই পালাব সেদিন, তোদের ল্যাজে বেঁধে পালাবো না।

আশ্রম থেকে পালাবার কথা যে এমনি কথায় কথায় বলছিল সুধীর তা নয়।

সত্যিই আশ্রমে ঐ সিংহীর অত্যাচারে ও যেন হাঁপিয়ে উঠেছিল।

কেবলই মনে হতো। ওর আশ্রম থেকে পালিয়ে যায়। যে দিকে দুচোখ চলে যায়।

কথাটা কিন্তু চাপা রইল না। রাত্রে আশ্রম থেকে পালিয়ে গিয়ে নৌকায় বেড়ানোর কথা কেমন করে না জানি সিংহীর কানে গিয়ে উঠল।

পরের দিন সিংহীর ঘরে যখন সকলের ডাক পড়ল, সকলের বুকই ভয়ে দুর দূর করে কেঁপে উঠল।

ভয়ে সকলের মুখ চুপসে আমসির মত হয়ে গেল।

শুধু নির্বিকার সুধীর। তার যেন কিছুই নেই।

গোবৰ্দ্ধন এসে শুকনো গলায় বললে, কি হবে সুধীর? বে

শী আর কি হবে? কয়েকটা দিন অন্ধকার ঘরে বাস ও পিঠের উপর কয়েকটি করে বেত্ৰাঘাত!

সকলে যথা সময়ে বলির পাঠার মত কাঁপিতে কাঁপিতে সিংহীর ঘরের দিকে রওনা হলো।

সিংহী নিজের ঘরে ক্রুদ্ধ সিংহের মতই হাতদুটো পিছন করে পায়চারি করছিল। সকলে ঘরে ঢুকতে সিংহী ওদের দিকে তাকিয়ে কঠোর কণ্ঠে বললে, সব সার বেঁধে দাঁড়াও।

প্ৰথমে বিকাশের পালা। তার পিঠের উপর জোরে জোরে কয়েক ঘা বেত পড়তেই সে যন্ত্রণায় কেঁদে উঠলো।

সহসা এমন সময় সুধীর সিংহীর সামনে এসে গভীর স্বরে বললে, ওদের কোন দোষ নেই। স্যার। সব দোষ আমার। আমিই ওদের পরামর্শ দিয়ে। আশ্রমের বাইরে নিয়ে গিয়েছিলাম, মারতে হয় আমায় মারুন।

সিংহী ত্রুকুটি করে সুধীরের দিকে তাকাল, তারপর ব্যঙ্গ মিশ্রিত কণ্ঠে বললে, ও, তুই পালের গোদা all right —জানতাম, আমি জানতাম।

সিংহী নির্মম ভাবে সুধীরের সর্বাঙ্গে সজোরে বেত চালাতে লাগল।

সুধীর একটি শব্দ পর্যন্ত করলে না।

প্ৰায় পনের মিনিট ধরে বেত মারবার পর, সিংহী বললে, আজ যা কাল তোর বিচার হবে।

সকলে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

রাত্রি গভীর। আশ্রমের সকলেই যে যার বিছানায় অঘোরে ঘুমুচ্ছে।

সুধীর আস্তে আস্তে শয্যার উপর উঠে বসল।

নির্মম বেতের আঘাতে তার সর্বাঙ্গ তখনও বিষের জ্বালার মতই জ্বলছিল।

পাশেই অন্য শয্যায় শুয়ে ভিখু, বোধহয় অঘোরে ঘুমাচ্ছে।

দুপুরেই কারিগর এসে জানালার শিক ফ্রেম বদলে নূতন করে বসিয়ে দিয়ে গেছে। সুধীর একটা পুঁটলিতে কয়েকটা জামা কাপড় বেঁধে আস্তে আস্তে দরজাটা খুলে ঘরের বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়াল।

রাত্রির আঁধার চারিদিকে যেন গভীর মৌনতায় খাঁ খাঁ করছে।

বারান্দা থেকে সুধীর আশ্রমের আঙ্গিনায় এসে দাঁড়াল।

মাথার উপর রাতের আকাশ, শিয়রে তারার প্রদীপ জ্বলিয়ে শুধু একাকী জাগে। সমস্ত আশ্রমটা জুড়ে যেন গভীর ঘুমের চুলুনি নেমেছে। সুধীর একবার দাঁড়াল।

কত স্মৃতি বিজড়িত এতকালের আশ্রমটা যেন এক অদৃশ্য মায়ার বাঁধনে তাকে পিছন থেকে টানে।

এখানকার ঘর দুয়ার সঙ্গী সাখী মনে মনে সকলের কাছ থেকে সে বিদায় নেয়।

চোখের কোল দুটো জলে ভরে ওঠে। হাত দিয়ে সুধীর চোখ দুটো মুছে নিল।

তারপর ধীরে ধীরে সে আঙ্গিনাটা পার হয়ে গেটের দিকে এগিয়ে চলে।

গেটের কাছে এসে পুঁটলিটা মাটিতে নামিয়ে রেখে সে মালকোঁচা আঁটতে যাবে, এমন সময় তার কাঁধের উপর কার যেন হাতের স্পর্শ পেয়ে ও চমকে ফিরে তাকাল, পিছনে দাঁড়িয়ে ভিখু।

সুধীরের বিস্মিত কণ্ঠ চিরে একটা প্রশ্ন বেরিয়ে আসে, একি ভিখু?

হ্যাঁ আমি। কিন্তু তুমি এত রাত্রে কোথায় যাচ্ছ সুধীর?

চলে যাচ্ছি। ভাই এখান থেকে। যাক ভালই হলো? ইচ্ছা ছিল যাবার আগে তোকে বলে যাবো। কিন্তু সাহস হয়নি। পাছে তুই আমায় যেতে কোন রকম বাধা দিস।

তুমি যাচ্ছ? কিন্তু কেন চলে যাবে?

সুধীরের ওষ্ঠ্যপ্ৰান্তে করুণ একটু হাসি জেগে উঠল। বললে, এখানে আর আমি থাকতে পারলাম না ভিখু। দেখি এতবড় পৃথিবীতে এই আশ্রম ছাড়া আমার আর কোথাও স্থান মেলে। কিনা। এই আশ্রমের নিয়ম কানুন, এর অত্যাচারে আমার দম আটকে আসে। এ বন্দী জীবনে আমি অত্যন্ত হাঁপিয়ে উঠেছি। তাই চলে যাচ্ছি।

তারপর হঠাৎ ফিক করে একটুখানি হেসে বললে, সিংহীটা খুব জব্দ হবে, কাল যখন সকলে উঠে দেখবে যে খাঁচার পাখী পালিয়েছে, কি বলিস? আমার ভারী ইচ্ছা করছে তখন ওর মুখের চেহারাটা কেমন হয় একবার দেখবার জন্য। যাক আমার বদলে তোরাই দেখিস।

কোথায় যাবে? ভিখু জিজ্ঞাসা করে।

কোথায় যাবো? তা তো জানিনা। আর ভাবনাই বা কিসের? এতবড় দুনিয়ায় জায়গার অভাব হবে কি?

ভিখু চুপ করে থাকে। কোন জবাব দেয় না।

লোহার গেটের মাথায় সব ঘন সন্নিবেশিত ধারালো লোহার শিক বসান। সেই দিকে তাকিয়ে ভিখু প্রশ্ন করে, কিন্তু গেট পেরুবে কেমন করে?

সুধীর একটু হাসল। তারপর একটু এগিয়ে গিয়ে দারোয়ানের ঘরের পিছনের কামিনী গাছটার তলা থেকে পোল জাম্পের বড় বাঁশের ডাণ্ডাটা নিয়ে এল।

বাঁশটা দেখিয়ে বলে, এই দেখ, সন্ধ্যা বেলা লুকিয়ে এটা এখানে রেখে গিয়েছিলাম।

তারপর পুঁটলিটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে অক্লেশে সুধীর বাঁশের ডাণ্ডাটার উপর ভর দিয়ে গেটের ওপাশে গিয়ে ভল্ট দিয়ে লাফ দিয়ে পড়ল।

গেটের লোহার শিকের ফাঁক দিয়ে একটা হাত গলিয়ে ভিখুর একখানি হাত সস্নেহে চেপে ধরে ও বললে, এখানে দাঁড়িয়ে থাকিসনে, কেউ হঠাৎ দেখে ফেললে বিপদে পড়বি, যা ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়গে যা।

তুই দাঁড়া সুধীর আমিও তোর সঙ্গে যাবো। ভিখু বলে।

পাগলামি করিসনে ভিখু। —কোথায় যাবি আমার সঙ্গে?

তুই যেখানে যাবি।—

না ভাই তুই যা। আচ্ছা আসি-কেমন?

ভিখুর চোখের কোলে দু’ফোটা জল চিকচিক্‌ করে ওঠে।

ছি। ভিখু, তুই কঁদেছিস? কঁদেছিস কিরে বোকা ছেলে দুর—

ভিখু মুখ ফিরিয়ে নেয়।

সুধীর ধীরে ধীরে হাঁটতে আরম্ভ করে।

সহসা তারও চোখের কোল দুটো বুঝি জলে ঝাপসা হয়ে ওঠে।

সামনেই পায়ে চলার পথ রাতের আঁধারে থাম থম করছে।

হাত দিয়ে চোখ দুটো মুছে নিয়ে সুধীর দ্রুত চলতে থাকে। আস্তে আস্তে একসময় রাতের অস্পষ্ট আঁধারে সুধীরের ক্রম চলমান দেহখানি একটু একটু করে একেবারে অদৃশ্য হয়ে যায়।

ভিখু তখনো দাঁড়িয়ে গেটের অপর দিকে।

পথহারা

রাতের আঁধারে পায়ে চলা পথটা যেন প্ৰকাণ্ড একটা ঘুমন্ত অজগরের মত নিঃসাড়া হয়ে পড়ে আছে।

পথের দুধারের বাড়িগুলো ঘুমের কাঠির ছোঁয়া পেয়ে যেন একেবারে নিশ্চল নিঝুম হয়ে পড়েছে।

কেউ কোথাও জেগে নেই।

একাকী শুধু যেন এ জগতে এক সুধীরই জেগে পথ হেঁটে চলেছে। আর মাথার উপরে কালো আকাশে রাতজাগা তারার দল এই গৃহহারা একাকী নিঃশব্দে চলমান বালকটির দিকে নীরবে তাকিয়ে আছে।

মাঝে মাঝে রাতের হাওয়া চুপিচুপি পথের বাঁকে বাঁকে কী কথা বলে যায়?

পথের ধারে একটা কুকুর গুটি শুটি দিয়ে বুঝি ঘুমিয়েছিল। সুধীরের পায়ের সাড়া পেয়ে একবার মুখ তুলে তাকিয়ে আবার পেটের মধ্যে মুখটা গুঁজে ঘুমিয়ে পড়ল।

সুধীর এগিয়েই চলে।

রাস্তার ধারে কয়েকটা রাত জাগা ভিখারী গুণ গুণ করে গল্প করছে।

সুধীর তাদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলল….।

রাত বাড়তে থাকে…।

হাঁটতে হাঁটতে সে রসা রোড, চৌরঙ্গী, হ্যারিসন রোড প্রভৃতি পার হয়ে একসময় হাওড়ার পুলের উপর এসে দাঁড়াল।

রাত্ৰি বুঝি শেষ হয়ে এল। আকাশের রং ফিকে হয়ে আসে।

পুলের নীচে গঙ্গার গৈরিক জলরাশি একটানা বয়ে চলে। নৌকা ও স্টীমারের দুএকটা আলো জলের বুকে থির থির করে কঁপে। মাঝে মাঝে দুএকটা জাহাজ বা স্টীমার চারিদিক প্রকম্পিত করে সিটি দিয়ে ওঠে ভোঁ ও ও! দুএকটা স্টীমলঞ্চ জলের বুকে শব্দ জাগিয়ে ছুটে যায়।

অনেকটা হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত–ক্রমে ওর চোখের পাতা দুটো যেন বুঁজে আসতে চায়।

পা দুটো আর টানতে পারে না-অবশেষে রাস্তারই ধারে একটা গাছের নীচে পুটলিটি মাথার তলায় দিয়ে সুধীর সেইখানেই শুয়ে পড়ল এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘুমে চোখ দুটো তার বুজে এলো।

পরের দিন যখন সুধীরের ঘুম ভাঙ্গল বেলা তখন অনেক হবে। রৌদ্রালোকিত শহর কর্মের সাড়ায় চঞ্চল।

লোকজন, গাড়ি, ঘোড়া, রিক্সা, বাস এক বিরাট ব্যাপার।

সমস্ত শরীরে ব্যথা। অসহ্য ক্লান্তি।

সুধীর অনেকক্ষণ ধরে বসে বসে তাকিয়ে তাকিয়ে আশে পাশে শূন্য দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। তারপর উঠে মুখ হাত ধোয়ার জন্য গঙ্গার ঘাটের দিকে চলল।

পা যেন আর চলতে চায় না।

ক্ষিধেও পেয়েছে প্ৰচণ্ড, ক্ষিধেতে পেটের মধ্যে যেন পাক দিচ্ছে।

সঙ্গে একটি পাই পয়সাও নেই।

শূন্য পকেট একেবারে।

তবু উঠে দাঁড়াল সুধীর।

আবার হাঁটতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে বেলা আটটা নাগাদ বালীতে এসে পৌঁছাল।।

পিপাসায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। গঙ্গার ঘাটের দিকে এগিয়ে চলে সুধীর।

ঘাটে স্নানার্থীদের ভিড়।

ধীরে ধীরে জলে নেমে হাত মুখ ধুয়ে আঁজলা করে এক পেট জল খেল।

শরীরটা অনেকটা জুড়াল। একটু বিশ্রাম করে গঙ্গার ঘাটে আবার হাঁটতে শুরু করে সুধীর গ্রাণ্ডট্রাঙ্ক রোড ধরে।

হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যার দিকে সুধীর শ্ৰীরামপুর এসে পৌঁছল। সারাটা দিন হেঁটে হেঁটে খুব খিদে পেয়েছে। অথচ সঙ্গে একটি পাই পয়সা নেই।

কী করা যায়?

একদিকে তীব্র ক্ষুধার প্রবল জ্বালা। অন্যদিকে ভবিষ্যতের অনাহারে ক্লান্তিকর দুঃস্বপ্ন। কি করবে। সে? বেচারী। এদিকে রাতও ক্ৰমে বেড়ে চলেছে।

আজকের রাতই বা কাটবে কোথায়? রাতের অন্ধকার তো নয়, কত দুঃখ ও বেদনার দুঃস্বপ্ন যেন বাদুরের মত কালো ডানা ছড়িয়ে সুধীরকে গ্রাস করবার জন্য এগিয়ে আসছে।

আশ্রমের সেই ঘর খানির মধ্যে ভিখুর শয্যার পাশে পাতা আপন শয্যাটির কথা মনে পড়ে।

আর একটু পরেই খাবার ঘণ্টা পড়বে।

ছেলেদের দল সব সার বেঁধে খেতে বসে যাবে।

কে জানত যে,..আশ্রমের বাইরের পদে পদে এত দুঃখ, এত কষ্ট। মনের কোণে কোথায় বুঝি একটা গোপন অনুশোচনা ব্যথার দোলা দিয়ে যায়।

হাঁটতে হাঁটতে গঙ্গার যাত্রী ঘাটে গিয়ে হাজির হলো। প্ৰকাণ্ড সিঁড়িগুলি ধাপের পর ধাপে বরাবর গঙ্গার বুকে নেমে গেছে।

একধারে প্রকাণ্ড একটা বটগাছ তার অজস্র শাখা প্ৰশাখা ছড়িয়ে দিয়ে সুদূর কোন অতীতের সাক্ষী দেয়।

রাতের হাওয়ায় পাতাগুলি ফর-ফর পতৃ-পত্ পত্র মর্মর তোলে। ওপারে মিলের সার বাধা আলোগুলি পিটু পিটু করে জুলে আর জ্বলে। গঙ্গায় এখন বোধহয় ভাঁটা।

জল অনেক দূর পর্যন্ত নেমে গেছে।

নরম মাটির আস্তরণ বহুদূর পর্যন্ত চকচক করে।

জলে ঢেউ জাগা ও ভাঙ্গার অস্পষ্ট শব্দ কানে আসে।

পুঁটলিটি মাথার তলে দিয়ে সুধীর শুয়ে পড়ল।

এই খোকা, ওঠ, … ওঠ।…

কার ডাকে সুধীরের ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। ধড়মড় করে সে উঠে বসল।

পূর্বের আকাশে এক অদ্ভুত চাপা লালচে আভা, ভাঙা মেঘের ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে।

মাঝরাতে কখন হয়ত ভাটির শেষে জোয়ার এসেছে. জল এখন একেবারে দুসিঁড়ির নীচে কলকল ছল ছলাৎ করে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

এখানে শুয়ে কেন?

সুধীর কী জবাব দেবে, চুপ করে থাকে।

বাড়ি কোথায়?

বাড়ি নেই!

তা আসছে কোথা থেকে?

কলকাতা থেকে।

কী নাম তোমার বাবা?

সুধীর এতক্ষণে ভাল করে মুখ তুলে চাইলে, পাশেই দাঁড়িয়ে এক সৌম্যমূর্তি বৃদ্ধ।

গরদের ধুতি পরিধানেও গায়ে গরদের উড়নি।… তারই ফাঁক দিয়ে শুভ্র যজ্ঞোপবীত দেখা যায়।

এইমাত্র বোধহয় স্নান করেছেন। সমগ্ৰ মুখখানিতে গভীর স্নিগ্ধ প্রশান্তি।

তোমার নাম কি?

আমার নাম পান্নালাল চৌধুরী।… সুধীর নাম গোপন করলে।

তোমার মা বাবা, কিম্বা কোন আত্মীয় স্বজন নেই?

কেউ নেই।

এতদিন কোথায় ছিলে?

এক ভদ্রলোকের বাড়িতে। এবারেও সুধীর ইচ্ছা করেই আসল কথাটা গোপন করলে।

তা সেখান থেকে চলে এলে কেন?

তারা থাকতে দিল না।

।বললে, বসে বসে খাওয়াতে পারব না।

ভদ্রলোক হাসলেন, কেন? তুমি বুঝি বসে বসে খেতে শুধু?

হ্যাঁ।

তা এখন কি করবে। ঠিক করেছ?

জানিনা।

আচ্ছা এখন আমার সঙ্গে আপাতত আমার বাড়িতে চল। যাবে?

যাবে।

তবে চল। ওঠে।

সুধীর উঠে দাঁড়াল। রাস্তার উপর ভদ্রলোকের গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল।

ভদ্রলোক গাড়িতে নিজে উঠে সুধীরকেও উঠতে বললেন।

ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিল।

যেতে যেতে সে ভাবছিল এতক্ষণ হয়ত আশ্রমের মধ্যে তার পলায়নের ব্যাপার নিয়ে একটা রীতিমত সাড়া পড়ে গেছে।

সিংহী তার কালো মুখখানাকে হাঁড়ির মত করে নিস্ফল আক্ৰোশে ঘরের মধ্যে পায়চারি করে বেড়াচ্ছে।

ছেলের দল হয়ত কত রকমের কানা ঘুষো করছে।

পরমেশবাবুর বাড়িতে সুধীর আশ্রয় পেল। পরমেশবাবুর বিধবা মেয়ে রমা সুধীরকে বুকে টেনে নিল। এক ছেলে ছিল তার সুনীল–হলো দুই ছেলে-পানু আর সুনীল।

পরমেশবাবুর অবস্থা খুবই ভাল। শ্ৰীরামপুর শহরে দুইখানি বাড়ি ভাড়া খাটে। তাছাড়া বিরাট চাল ডালের ব্যবসা ও তেলের কল।

সংসারে ঐ বিধবা মেয়ে রমা ও একমাত্র দৌহিত্র সুনীল।

বিদায়

কত তুচ্ছ ঘটনা থেকে এক এক সময় মানুষের জীবনে আকস্মিক কত বড় পরিবর্তনই না আসে। ঠিক তেমনি–

সুধীর পরমেশবাবুর আশ্রমে এসে একেবারে হঠাৎ যেন রাতারাতি বদলে গেল।

তার সেই দুরন্ত চঞ্চল প্রকৃতি একেবারে শান্ত হয়ে গেল।

অদ্ভুত ঠাণ্ডা হয়ে গেল যেন সে।

পরমেশবাবু তাকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। পড়ায় মন দিল সুধীর।

গভীর মন দিল।

তবু মাঝে মাঝে মনটা যেন কেমন উতলা হয়ে যায়।

একটা শূন্যতা যেন চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে। মনে হয় কি যেন তার ছিল—

কি যেন সে হারিয়েছে। আর মধ্যে মধ্যে মনে পড়ে সেই হামমোহিনী আশ্রমের কথা—ভিখুর কথা বিশেষ করে।

এক এক সময় কিন্তু ভাল লাগে না। পড়ার বই-পরমেশবাবুর এই গৃহ, কিছু ভাল লাগে না। চলে যায় সুধীর গঙ্গার ঘাটে।

বঁধান সিঁড়িতে চুপটি করে বসে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আবার কখন কখন মনে হয় বের হয়ে পড়ে সে এখান থেকে।

এই ঘর আর স্নেহের বাঁধন তার জন্য নয়।

ভগবান শৈশব থেকেই যে ঐ বঁধন থেকে তাকে মুক্তি দিয়েছেন।

গঙ্গার ঘাটে জোয়ারের জল এসে পুরাতন ভাঙ্গা সিঁড়িগুলো ডুবিয়ে দেয়। মৃদুমন্দ বাতাসে গঙ্গার বুকে ছোট ছোট ঢেউগুলো সিঁড়ির গায়ে আছড়ে আছড়ে এসে পড়ে। অধীর ব্যাকুল আগ্রহে বারংবার মনের কোণ ছুয়ে যেন কাদের অস্পষ্ট হাতছানি ভেসে ওঠে।

করা যেন ডাকে, আয় আয়।

সঙ্গে সঙ্গে আবার মনে পড়ে মায়ের ব্যাকুল সদা শঙ্কিত মুখচ্ছবি।

অশান্ত মনও গুটিয়ে আসে।

নানারঙের পাল তুলে নৌকাগুলি জলের বুকে ভেসে চলে, দেশ দেশান্তরে। কোথায় তাদের যাত্রা শুরু কোথায় বা তার শেষ, কে জানে।

কোন হট্টমালার দেশে চলেছে তাদের তরী।

বাতাসে ঘাটের ধারে বট গাছের পাতায় সিপি সিপি করে জাগে দোলন।

পাতায় পাতায় কী যে কথার কানাকানি।

ওপারের মিলের চিমনীর ধোঁয়া আকাশের বুকে ছড়িয়ে পড়ে।

আজ কয়দিন থেকেই সুনীল যেন বেজায় অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।

সদা চঞ্চল মন যেন তার হঠাৎ অত্যন্ত গভীর হয়ে উঠেছে।

বাইরে বাইরে কাটাবার সময়টা যেন ক্ৰমে দীর্ঘতর হয়ে উঠেছে।

সুনীলের এই পরিবর্তন কিন্তু পানুকে বিচলিত করে। এ তো স্বাভাবিক সুনীল নয়। হাসির সেই অফুরন্ত উচ্ছাসই বা কোথায়। কোথায় সেই দুর্মদ চলার বেগ।

এ বুঝি আসন্ন এক ঝড়ের অবশ্যম্ভাবী পূর্ণ সঙ্কেত। শেষ পর্যন্ত হলোও তাই।

অকস্মাৎ সত্য সত্যই সুনীল একদিন কোথায় চলে গেল। মায়ের স্নেহের বঁধন, ঘরের মায়া কিছুই তাকে পিছুটান দিয়ে বেঁধে রাখতে পারলো না।

যাযাবর মন তার নীড়ের বাঁধন ছিঁড়ে ফেলে চলে গেল।

সকাল বেলায় ঘুম ভেঙ্গে পানুপাশের খাটের দিকে চেয়ে দেখলে বিছানার চাদরে একটি কুঞ্চন পর্যন্ত নেই। নিভাঁজ শয্যা কেউ বুঝি স্পর্শও করেনি।

একই ঘরে ওরা দুটি ভাই পাশাপাশি শয়ন করত।

বিস্মিত পানু উঠে দাঁড়াল। হঠাৎ নজরে পড়ে পানুর, সুনীলের পড়বার টেবিলে মহীশূরের চন্দন কাঠের ছোট্ট হাতীটা দিয়ে চাপা সুনীলের প্যাডের সবুজ কাগজ একখানি ভাঁজ করা। উপরে বড় করে লেখা “মা”।

কম্পিত হাতে পানু ভাঁজ করা কাগজটা খুলে ধরল।

ভোরের প্রথম সোনালী আলো খোলা জানালা পথে ওধারের নিমগাছটার ফাকে ফাঁকে প্রথম প্ৰণতি জানাচ্ছে।

সুনীল লিখেছে।

মা! মাগো আমার, আমার মা-মণি।

আমি চল্লাম।

এমনি করে আর আপনাকে গুটিয়ে ঘরের কোণে বসে থাকতে পারলাম না।

দেশে দেশে নগরে নগরে সমুদ্রের কুলে কুলে যে স্বপ্ন আছে ছড়িয়ে দিক দিগন্তে, ঘুমের মাঝে, জাগরণে দিবানিশি তারা হাতছানি দেয়, আয়, ওরে অশান্ত, ওরে আপনি ভোলা, ওরে খেয়ালী চঞ্চল আয়…আয়।

আপাতত বিলেত চললাম-জাহাজে খালাসীর কাজ নিয়ে।

আমার জন্য ভেবো না, দুঃখ করো না, মা-মণি।

এমনি করে ঘরের মধ্যে আমি বন্দী থাকতে পারলাম না। ঘরের বাইরে যে জীবন প্রতি মুহূর্তে সেই জীবন আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে।

কিন্তু তুমি ভেবো না মা।

তোমার সুনীল আবার তোমার কোলে ফিরে আসবে।

তোমার চির অবাধ্য সন্তান

সুনু

পানুর চোখের সামনে ভেসে ওঠে : সুনীল, সীমাহীন সমুদ্র পথে সুনীলদের জাহাজ ভেসে চলেছে।

কত দেশে-কত বন্দরে ভিড়বে হয়ত জাহাজ।

কত সমুদ্র পার হবে সে—

সেও যদি পারত আজ আমনি করে সুনীলের মত ভেসে পড়তে।

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনের পাতায় ভেসে ওঠে মারি বিষণ্ণ মুখখানি—

সুনীল চলে গেছে মাকে সে কেমন করে বলবে।

কেমন করে দেবে সংবাদটা।

গোপন কথা

সংবাদটা চাপা রইলো না। ক্ৰমে একান ওকান হতে হতে শ্ৰীলেখাও একদিন শুনল যে সে শশাঙ্ক চৌধুরী ও বিভাবতীর নিজের মেয়ে নয়।

এতদিন চোরের মতই চুরি করে তাদের স্নেহ ও ভালবাসা ভোগ করে এসেছে।

এই বিশাল জমিদারী, মূল্যবান ঝকঝকে তকতকে আসবাবপত্র, কাপড় জামা, খেলনা, গয়নাগটি কিছুতেই তার অধিকার নেই, সে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। একদিন যাকে প্ৰাণ ভরে মা বলে ডেকে ডেকে আশ মেটেনি, সে মাও তার নিজের মা নয়। তার উপরে আজ তার কোন অধিকার নেই।

এ বাড়ীর সামান্য একটা ভূত্যেরও যে অধিকার এখানে আছে তার আজ সেটুকুও নেই। শ্ৰীলেখা স্তব্ধ হয়ে গেল। বোবা হয়ে গেল যেন।

একটা বিদ্যুৎ প্রবাহ যেন তার ভিতর দিয়ে ছুটে গিয়ে দেহের সমস্ত কলকব্জাগুলো মুহুর্তে বিকল করে দিয়ে গেছে।

দুপুরের পড়ন্ত রোদে বাগানের পাতাবাহারের গাছগুলো যেন ঝিমুচ্ছে। একটা পড়বার বই খুলে শ্ৰীলেখা নিজের ঘরে চুপটি করে বসে ছিল।

খোলা জানালা পথে দেখা যায় গেটের ধারের প্রকাণ্ড কৃষ্ণচুড়া গাছটায় যেন লাল আগুনের আভা ছড়িয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে দ্বিপ্রহরের ক্লান্ত নির্জনতায় অশান্ত ঘুঘুর একঘেয়ে সুর ভেসে আসে।

ফট্‌ফট্‌ করে জাপানী চপ্পলের সাড়া জাগিয়ে সুধীর এসে ঘরে প্রবেশ করল,

আজকের সুধীরকে যেন আর চেনাই যায় না। দামী সিস্কের বেশভূষায় ও জমিদার বাটির দুধ, ঘি-সারে পনের দিনেই তার ভোল গেছে সম্পূর্ণ বদলে। সিস্কের সার্ট গায়ে। পরিধানে সিল্কের ঢোলা পায়জামা।

কিরে শ্ৰী কি করছিস?

শ্ৰীলেখার পরিপাটি করে বিছান শয্যায় নিজের দেহভার ছড়িয়ে দিতে দিতে সুধীর প্রশ্ন করল।

মাথার কাছে টিপয়ে একটা সুদৃশ্য কারুকার্যখচিত রূপার বাটীতে চকলেট রয়েছে, তার থেকে কয়েকটা তুলে মুখে দিয়ে বলল, এসব কিনে পয়সা নষ্ট করিস কেন? এ বয়সে পয়সা নষ্ট করবার বাতিকটা বড্ড খারাপ।

শ্ৰীলেখার চোখে জল এসে পড়ে।

শ্ৰীলেখার মনে পড়ে কখনো মা বাবার কাছে কোন দিন কোন দাবী জানায় নি বলে মা বাবার কাছে কত অনুযোগ তাকে শুনতে হয়েছে, চকলেট খেতে ভালবাসে বলে মা নিজেই রোজ চকলেট এনে রেখে যান।

আজ তার কৈফিয়ৎ দিতে হচ্ছে। দিতে তো আজ তাকে হবেই কৈফিয়ৎ, কে সে এখানকার, কি তার দাবী?

সুধীর বলে চলে, এমনি করে আর পয়সা নষ্ট করা চলবে না, আর এমনি করে পয়সা নষ্ট করলে কয়দিন জমিদারী চলবে? দুদিনেই তচনচ হয়ে নষ্ট হয়ে যাবে।

শ্ৰীলেখা চুপ।

গায়ে তোর ওটা কিসের জামা রে? মুর্শিদাবাদ সিল্কের বুঝি? এত বাবুগিরী কেন? সাধারণ ছিটের জামাই তো যথেষ্ট।

গভীর রাত্রে বিছানায় শুয়ে শ্ৰীলেখা ছটফট করে। যে মাকে সে কোনদিন দেখেনি, জ্ঞান হওয়া অবধি যার কথা কোন দিনের জন্য একটিবারও শোনেনি, সেই অদেখা, অচেনা, অজানা মার জন্য চোখের কোল বেয়ে আজ তার অশ্রু ঝরে। মা, মাগো কোন অপরাধে এমনি করে আজ আমায় নিঃস্ব একাকী সংসার সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়ে গেলে মা।

শ্ৰীলেখা যেন চোরের মত বাড়িতে আছে। নিঃশব্দে যেন সকলের দৃষ্টি থেকে নিজেকে সর্বক্ষণ আড়াল করে রাখতে সচেষ্ট। এমন কি বিভাবতীর কাছেও যায় না। পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়।

সেদিন বিভগবতী ধরে ফেলেন শ্ৰীলেখাকে।

শ্রী–

শ্ৰীলেখা সাড়া দেয় না। মাথা নীচু করে থাকে।

বিভাবতী শ্ৰীলেখাকে আপনি বুকের উপরে টেনে গভীর মেহমাখা সুরে জিজ্ঞাসা করেন, কি হয়েছে মা তোর? দিনরাত গম্ভীর হয়ে থাকিস কেন?

কই কিছুই তো হয়নি, শ্ৰীলেখা জবাব দেয়।

তোর আগেকার সেই হাসি কোথায় গেল মা।

কেন মা? আমি তো হাসি, শ্ৰীলেখা ম্লান কণ্ঠে জবাব দেয়।

ওরে তুই আগেও যেমন আমার মেয়ে ছিলি এখনও তেমনিই আছিস…।

শ্ৰীলেখার পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে বিভাবতী বলেন।

হঠাৎ আচমকা শ্ৰীলেখা প্রশ্ন করে বসে, আমার-সত্যিকারের মা বাবার কি কোন খোঁজই জান না মা তোমরা?

না।…

শ্ৰীলেখা চুপ করে থাকে।

কিন্তু কেন, ওকথা জিজ্ঞাসা করছিস কেন? কি হবে তোর সে কথা জেনে? আমরাই তোর মা বাপ।

রাত্রি বোধ করি। অনেক হবে।

সুধীর জেগেই ছিল, কে যেন তার শয়ন ঘরের বন্ধ দরজার গায়ে মৃদু টোকা দেয়, টুক্‌ টুক্‌।…

সুধীর কান খাড়া করে শোনে, আবার শব্দ হয়… টুক… টুক।

এবারে সুধীর নিঃশব্দে উঠে দরজার খিল খুলে দেয়। আপাদমস্তক ভারী চাদরে ঢাকা এক ছায়ামূর্তি এসে ঘরে ঢোকে।

মূর্তিই ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দেয়।

কিরে, কিছু জোগাড় করেছিস?

হ্যাঁ, শ পাঁচেক টাকা মাের ক্যাসবাক্স থেকে চুরি করে রেখে দিয়েছি।

বিছানার তলা থেকে দশটাকার পঞ্চাশখানি নোট সুধীর বের করে মূর্তির হাতে নিঃশব্দে গুজে দেয়।

লোকগুলো সব কেমন? ছায়ামূর্তি প্রশ্ন করে।

ভয়ানক বোকা। সুধীর জবাব দেয়।

মেয়েটা? আবার ছায়ামূর্তি জিজ্ঞাসা করে।

গোলমাল করেনি। আর করবেও না বোধ হয়।

কিন্তু সুধীর ও সেই ছায়ামূর্তি জানতেও পারে না, তাদের সব কিছু লক্ষ্য করছে। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আর এক ছায়ামূর্তি, ওদের সব কথাই তার কানে যায়।

এক সময় প্রথম ছায়ামূর্তি ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

মায়ের প্রাণ

রমা যখন সুনীলের গৃহত্যাগের সংবাদ পেল। তখন একটি শব্দও তার গলা দিয়ে বের হল না। শুধু ফোঁটায় ফোটায় অশ্রু তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগিল গভীর বেদনায়।

পানু এসে মার কাছে দাঁড়াল, দুঃখ করো না মা–দাদা আবার ফিরে আসবে।–

গভীর স্নেহে রমা পানুকে বুকের কাছটিতে টেনে নিল, আমি জানতাম এমনি করে একদিন আমায় সে কী দিয়ে যাবেই। তাকে ঘরে বেঁধে আমি রাখতে পারব না।

আবার দুফোঁটা জল গাল বেয়ে নেমে আসে।

হঠাৎ যেন একটা দমকা হাওয়ার ঝাপটায় এবাড়ির হাসির প্রদীপটা নিভে সব কিছু আঁধারে ভরে গেছে।

সুনীল নেই।

জীবনের সেই সদা চঞ্চল সহজ উচ্ছলতার ঝর্ণাধারাও যেন শুকিয়ে গেছে।

পানু আরো গম্ভীর হয়ে উঠেছে।

এমন সময় আচম্বিতে পানুর জীবনে একটা ঝড় বয়ে গেল।

সেদিন রমা দুপুরে অলস নির্জনতায় মেঝের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে তার পলাতক পুত্রের জন্য চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছে। পরমেশবাবু এসে ঘরে প্ৰবেশ করলেন। হাতে তার অনেকদিনকার একখানি পুরাতন সংবাদপত্র।

রমা, পরমেশবাবু ডাকলেন।

কে, বাবা? রমা ধড়ফড় করে উঠে বসল।

আবার তুই কঁদেছিলি মা। … এতে যে তোর ছেলেরই অমঙ্গল হয় মা। কেন দুঃখ করিস? কারও ছেলে কি বিদেশে যায় না? ওদের দেশের ছেলেরা যে মায়ের আঁচল ছেড়ে ওর চাইতেও অল্প বয়সে দেশ দেশান্তরে ঘুরে বেড়ায়। আকাশের বুকে পাড়ি জমায়। নতুন দেশের সন্ধানে বের হয়। কই, তাদের মায়েরা তো এমনি করে চোখের জল ফেলে না। বরং হাসি মুখে ছেলেকে বিদায় দেয়, বিপদের মাঝে ছুটে যেতে। আজ তোরাই তো মায়ের দল স্নেহের গণ্ডী দিয়ে বাংলা দেশের ছেলে মেয়েগুলোকে পঙ্গু করে তুলেছিস। অথচ একদিন তোদেরই দেশের মা জনা প্রবীরকে অৰ্জ্জুনের বিরুদ্ধে নিজহাতে রণসাজে সাজিয়ে যুদ্ধে পাঠিয়ে ছিলেন। তাঁরাও তো মা ছিলেন।

বাবা—

তাঁদের বুকেও তোদের মতই মাতৃ-স্নেহের নিরন্তর ফন্তুধারা বয়ে যেত।

সবই তো বুঝি বাবা, কিন্তু মন যে মানে না। রমা জবাব দেয়।

সে তো আবার তোরই বুকে ফিরে আসবে মা। আমি বলছি সে আবার আসবে। আমাদের ভুলে কি সে থাকতে পারে? তোর বৃকভরা মেহের আকর্ষণই একদিন আবার তাকে শত আপদ বিপদের বেড়াজাল ডিঙিয়ে তোর কাছে এনে পৌঁছে দেবে। শেষের দিকে বৃদ্ধের কণ্ঠস্বরও যেন অশ্রু সজল হয়ে ওঠে।

জানি না। বাবা সে আর আসবে কিনা, তবে আমি তার জন্যে অপেক্ষা করব, রমা। শুধু স্নান স্বরে বলে।

শোন, তোকে একটা জিনিষ দেখাতে এসেছিলাম মা, বলতে বলতে পুরাতন সংবাদ পত্ৰখানি পরমেশ বাবু মেয়ের সামনে ধরলেন।

এটায় কি আছে বাবা? রমা জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে পরমেশবাবুর মুখের দিকে তাকায়।

লাল পেনসিল দিয়ে দাগ দেওয়া একখানি ছেলে হারিয়ে যাওয়ার বিজ্ঞাপনের দিকে পরমেশবাবু রামার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।

রামা আগ্রহে বিজ্ঞাপনটা আগাগোড়া পড়ল।

তুমি কি বলতে চাও বাবা? রমা সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে পিতার মুখের দিকে তাকাল। বছর পাঁচেক আগে পানুকে আমরা কি ভাবে পেয়েছিলাম গঙ্গার ঘাটে, মনে আছে নিশ্চয়ই মা তোমার? পরমেশবাবু বললেন।

রামা স্তব্ধ হয়ে গেল।

পরমেশবাবু মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, তুমি বোধ হয়। লক্ষ্য করেছে, পানুর ডান ভ্রূর নীচে একটা লাল জরুল আছে। এবং তার গলায় যে কবচটা তোমার কাছে আছে হয়ত তাতেই তার পরিচয় পত্রটাও পাওয়া যাবে। সত্যি যদি পানু জমিদার শশাঙ্কমোহন চৌধুরীর হারিয়ে যাওয়া ছেলেই হয়, তবে তো আমাদের উচিত তাকে তার মা বাবার হাতে তুলে দেওয়া। তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ থেকে তাকে তো আমরা বঞ্চিত করতে পারি না মা।

বাবা। আর্তস্বরে রমা চিৎকার’করে উঠল।

জানি মা সব জানি। বুঝি সব। পরমেশবাবু বলতে লাগলেন, পুত্রের মতই এ-কয় বছর তাকে তুমি বুকে করে আগলে এসেছে। আজ তাকে বিদায় দিতে বুক তোমার ভেঙে যাবে, কিন্তু আজ যদি তুমি সেই লালন-পালনের মেহের দাবীতে তাকে তোমার কাছে আটকে রাখতে চাও সে কি অন্যায় হবে না? ভেবে দেখ, তোমার মঙ্গল স্নেহ দাবী তাকে তার জীবনের সব চাইতে বড় পাওয়া থেকে বঞ্চিত করছে।

কিন্তু যে মা তাকে তার জন্ম মুহুর্তে-রমা বলতে লাগল, —তার স্নেহ থেকে বঞ্চিত করে একদা এক অচেনা অনাথ আশ্রমে পাঠিয়ে দিতে পেরেছিল-আজ এই দীর্ঘ ষোল বছর পরে তার স্নেহ যদি তার সেই হারান ছেলের উপরে জেগেই থাকে। তবে তার কতটুকু মূল্য আছে? না, আমি পানুকে ছাড়তে পারব না। বাবা। সুনুকে হারিয়ে ওর মুখ চেয়েই যে আমি বাঁচবার চেষ্টা করছি বাবা।

ভেবে দেখ রমা, বড় হয়ে ও যদি কোনোদিন একথা জানতে পারে। য়ে ও এক মাস্তবড় জমিদারের ছেলে হয়েও জন্ম গরিবই রয়ে গেল এবং সেদিন যদি ওর মনে হয় এর জন্য তুমি আর আমিই দায়ী?

না বাবা-না-ও কখন তা ভাববে না—

শোন মা। তোমার কথা ভেবেই এতদিন মুখ বুজে ছিলাম। গত সপ্তাহে ওই বিজ্ঞাপন যখন চোখে পড়ে সেই দিনই দুপুরে একান্ত কৌতুহল বশেই আমার বাক্স থেকে পানুর গলার সেই কবচটা খুলে নিয়ে ওই বিজ্ঞাপন দাতার সঙ্গে দেখা করি। এবং তঁর কাছেই পানুর পূর্বজীবন সম্পর্কে সব শুনে এসেছি।

বাবা—

হ্যাঁ মা, পানুর বাবা শ্ৰীপুরের মস্ত।বড় জমিদার। কিন্তু এসব জানার পর আর তো ওকে আমাদের কাছে ধরে রাখা যায় না। এবারে ওকে ওর মা বাবার কাছে পৌঁছে দেওয়াই কর্তব্য আর তুমি ওর মা সম্পর্কে যে দোষারোপ করছে, আসলে তিনি নির্দোষ। ওর জন্ম মুহুর্তে একটা প্ৰকাণ্ড ষড়যন্ত্রই ওর এই ভাগ্য বিপর্যয়ের কারণ।

জন্মবৃত্তান্ত সম্পর্কে যা যা শুনেছিলেন সব রমার কাছে খুলে বললেন।

এবারে কিন্তু রমা চুপ করেই রইল। বরং পানুর প্রতি পূৰ্বস্নেহ তার আরো গভীর হলো। আহা বেচারী, শিশুকালে মা থাকতেও মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

কিন্তু একটা কথা। পরমেশবাবু বলতে লাগলেন, পানুকে তার পূর্ব জীবনের সব কথা তোমাকেই খুলে বলতে হবে এবং একথাও বলতে হবে যে শীঘ্র তাকে সেখানে ফিরে যেতে হবে।

আমি! শরাহত পাখীর মতই রমা চীৎকার করে উঠলো, ক্ষমা করো বাবা, আমায় ক্ষমা করো, আমায় এ অনুরোধ করো না, বরং তুমিই বলে।

অগত্যা পরমেশবাবুই পানুকে সকল কথা খুলে বলতে রাজী হলেন।

আসল নকল

পরমেশবাবুর মুখে নিজের সমস্ত জন্মবৃত্তান্ত শুনে পানু। কিন্তু পাথরের মত স্তব্ধ হয়ে রইল।

রামা সেই ঘরেই জানালার একটা শিক ধরে নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

—আজ তার চোখের জলও বুঝি শুকিয়ে গেছে। নিঃশব্দ পদসঞ্চারে পানু। মার কাছে উঠে এল।

দুই হাতে মাকে জড়িয়ে ধরে শুধু বললে, না মা, জন্ম থেকে মার কোন পরিচয় পাইনি এবং শিশু বয়সে যে পালিতা মার সামান্য কয়দিনের জন্য ভােলাবাসা পেয়েছিলাম, সেও একদিন অক্লেশে আমায় ভুলে গেল। তাই আজ বুঝতে পারছি কেন সে আমায় ভুলে গিয়েছিল… সে আমার নিজের মা নয় বলেই। জ্ঞান হবার পর জীবনে সত্যিকারের মাতৃস্নেহ তোমার কাছে থেকেই পেয়েছি। তুমিই আমার সত্যিকারের মা। তোমায় ছেড়ে কোথাও যাব না মা। তার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই–

কিন্তু পানু-তারা যে তোর আপনজন—

না। কেউ নয়। তারা আমার। কেউ আজ আমাকে তোমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না।

রুমার দু’চোখের কোল বেয়ে ফোটা ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।

নীরবে গভীর স্নেহে রমা পানুর মাথায় হাত বুলোতে লাগল।

পরমেশবাবুরও চোখে জল।

দুতিন দিন ধরে ক্রমাগত পরমেশবাবু পানুকে সমস্ত ব্যাপারটা বোঝাতে লাগলেন। এবং আরো বললেন বিবেচনার যে আরো একটা দিক আছে। আইন। সেটাকে যে সকলেরই মেনে চলতে হবে। অগত্যা পানুকেও মত দিতে হলো।

অশ্রু সজল চোখেরমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পানু একদিন পরমেশবাবুর সঙ্গে কিরীটীদের ওখানে এসে উঠল।

শশাঙ্কবাবুকে আসবার জন্য কিরীটী আগে থেকেই ফোন করে রেখেছিল।

শশাঙ্কবাবু এলে কবচসহ আসল ছেলেকে কিরীটী তার হাতে তুলে দিল।

কবচটি পানুর হাতে বাঁধা ছিল-রূপার চ্যাপটা কবচ। কবচের ভিতরেই ছোট্ট একটা কাগজে লেখা ছিল–সুধীর শ্ৰীপুরের জমিদার শশাঙ্কমোহন চৌধুরীর ছেলে।

শশাঙ্কমোহন ছেলেকে বুকে টেনে নেন।

তারপর পুত্রসহ শশাঙ্ক চৌধুরী শ্ৰীপুর ফিরে এলেন।

শ্ৰীপুর জমিদার গৃহে হুলস্থূল পড়ে গেল।

আত্মীয়স্বজন, দাসদাসী, গোমস্ত কর্মচারী সকলেই ফিসফিস করে কােনাকনি করতে লাগল। এই সেদিন একজনকে এনে বললে, জমিদারের মেয়ে হয়নি। ছেলে হয়েছিল। ঐ তার ছেলে। আজ আবার বলছে সে ছেলেও নকল। আসল ছেলে এই।

শ্ৰীলেখাও চমৎকৃত হল।

মৃগাঙ্গমোহন ক্রুর হাসি হেসে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন।

আর আগেকার সুধীর।

স্তব্ধ হয়ে পানু একটা ঘরে বসে তার আকস্মিক ভাগ্য বিপর্যয়ের কথাই ভাবছিল।

আসন্ন সাঁঝের আঁধারে ধরণীর বুকখানি আবছা হয়ে আসছে।

ঐ বাড়ির সকলেই যেন তাকে সন্দেহের চোখে দেখছে, একমাত্র শশাঙ্ক চৌধুরী ও বিভাবতী ছাড়া।

নিঃশব্দে পানুরই সমবয়সী ফিট্‌ফটু একটি ছেলে ঘরে এসে ঢুকল।

পানু চমকে মুখ তুলে তাকাল, কে?

আমি এক নম্বর সুধীর। একটা চাপা হাসির শব্দ শোনা গেল। তারপর যাদু, কোন গগন থেকে নেমে এলে মাণিক। দুই নম্বর–

বলতে বলতে ছেলেটি হাত বাড়িয়ে সুইচটা টিপে ঘরের আলোটা জেলে দিল। মুহুর্তে ঘরের আবছা অন্ধকার সরে গিয়ে আলোর ঝরণায় ঘরটি হেসে উঠল।

কিহে চুপ করে আছ কেন? ছেলেটি আবার প্রশ্ন করলে, বল না সোনার চাঁদ। তা’ দেখ বাপু। এসেছে বেশ করেছে। কিছু নিয়ে রাতারাতি সরে পড়। না হলে প্ৰাণ নিয়ে কিন্তু টানাটানি হবে। শোন বলি-ফটিকচাঁদ সব সহ্য করতে পারে, শুধু ভাগের বিখরা সহ্য করতে পারে না।

পানু ফ্যাল ফ্যাল করে ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এখানে আসবার আগে ওর নাম ভাঁড়িয়ে আর একটি ছেলে যে এখানে এসেছে তাও আগেই শুনেছিল, তাহলে এই সে।

কিহে, চুপ করে রইলে কেন? জবাব দাও। অসহিষ্ণু ভাবে ফটিকচাঁদ বললে।

বাইরে শশাঙ্কমোহনের চটির শব্দ শোনা গেল।

ফটিকচান্দ পালাবার চেষ্টা করলে কিন্তু পারলে না। থমকে শশাঙ্ক মোহনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল।

দেখ তোমার নাম কি বলত? শশাঙ্কমোহন প্রশ্ন করলেন।

আজ্ঞে সুধীর চৌধুরী, ভয়ে ভয়ে ফটিকচাঁদ জবাব দিল।

থাম ছোকরা। শশাঙ্কমোহন বিরাট এক ধমক দিয়ে উঠলেন, আমি তোমার আসল নাম জানতে চাইছি।

আজ্ঞে ওটাই তো আসল নাম। মানুষের নামের আসল নকল থাকে নাকি?

বাঃ? এর মধ্যেই যে বেশ পরিপক্ক হয়ে উঠেছে দেখছি।

আজ্ঞে–

যাক-শোন, তোমার কোন ক্ষতি আমি করতে চাই না। শুধু যারা তোমাকে এখানে সুধীর সাজিয়ে এনেছিল তাদের সত্যকার নামধামটা জানতে চাই–

আমি জানিনা কিছু–

জান-আর এখানে ভালয় ভালয় সব কথা না বললে থানায় গিয়ে সবই বলতে হবে জেনো—

থানা?

ফটিকচাঁদের চোখ গোল গোল হয়ে ওঠে।

তা থানা ছাড়া কোথায় তুমি যাবে। জোচুরী করে মিথ্যা পরিচয়–

আজ্ঞে-দোহাই আপনার আমাকে পুলিশে দেবেন না-সব কথা আমি বলব।

বেশ চলে। তবে আমার ঘরে।

ফটিকচাঁদকে নিয়ে শশাঙ্কমোহন ঘরে থেকে বের হয়ে গেলেন।

দুর্যোগের মেঘ

ফটিকচাঁদ ভয়ে ভয়ে সত্যি কথাই বললে।

বললে, কিশোরীমোহন আর জগন্নাথই তাকে এখানে সুধীর সাজিয়ে এনেছে। তাদের সঙ্গে কথা ছিল যতদিন না সত্যিকারের পরিচয়টা তার প্রকাশ হয়ে পড়ে—মধ্যে মধ্যে যা পারে হাতিয়ে দেবে তাদের এখান থেকে।

হুঁ-আজ পর্যন্ত কত দিয়েছে?

তা হাজার তিন-চার টাকা ও গহনায় হবে।

শশাঙ্কমোহন ফটিকচাঁদকে আর ঘটালেন না।

তবে থানায় অশোকের হেফাজতে পাঠিয়ে দিলেন।

পানু নিজেই পর দিন যেচে এসে শ্ৰীলেখার সঙ্গে ভাব করলে। শ্ৰীলেখা নিজের ঘরে একটা উলের কী বুনছিল। পানুকে ঘরে প্রবেশ করতে দেখে ও মুখ তুলে চাইল।

তোমার নামই বুঝি শ্ৰীলেখা? পানু জিজ্ঞাসা করল।

হ্যাঁ–

বেশ নামটি তোমার। তুমি তো বয়সে আমার সমানই। বড় ইচ্ছা ছিল মনে মনে একটি বোনের। ভাই ফোটার দিনটা এমন বিশ্ৰী লাগত। দাদার তো এই বোন না থাকার জন্য অভিযোগের অন্ত ছিল না।

দাদা কে? শ্ৰীলেখা জিজ্ঞাসা করল।

পানু সুনীলের সব কথা তখন শ্ৰীলেখার কাছে আগাগোড়া বললে, শেষের দিকে তার চোখে জল এসে গেল এবং চেয়ে দেখলে শ্ৰীলেখার চোখেও জল। অল্প সময়ের মধ্যে দুজনার খুব ভাব হয়ে গেল।

পাথুরিয়াঘাটার একটা এঁদো গলির মধ্যে বহুদিনকার একটা পুরাতন বাড়ি।

তারই একটা স্বপ্নালোকিত ঘরে বসে কয়েকজন লোক কী সব গোপন পরামর্শে রত। ঘরের এক কোণে একটা ভাঙা হ্যারিকেন। আলোর চাইতে ধূমোগ্‌দীরণই হচ্ছে বেশী।

চুনবালি খসা চিত্ৰ বিচিত্র দেওয়ালের গায়ে হ্যারিকেনের ক্ষীণ অস্পষ্ট আলোর ছায়া কী এক ভৌতিক বিভীষিকায় কেঁপে কেঁপে উঠছে। দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ। বাইরে যেন দরজার গায়ে শব্দ হলো খট্‌খট্‌। একজন উঠে দরজাটা খুলে দিল।

খোলা দরজা দিয়ে ভিক্ষুকবেশী কে একটা লোক ঘরে এসে প্রবেশ করল। লোকটার পরণে এক শতছিন্ন ময়লা নোংরা ধূতি। মাথার চুলগুলি রূক্ষ্ম এলোমেলো। একটা চোখ ন্যাকড়া দিয়ে বাঁধা। পায়েও একটা পট্টি জড়ান।

দলের একজন এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল, কি খবর সর্দার?

খবর ভাল, লোকটা চাপা গলায় বললে। তারপর মাথায় পরচুলটা খুলতে খুলতে দলের একজনকে বললে, আলোটা একবার এদিকে নিয়ে আয়ত সোনা।

একটা ছেঁড়া ন্যাকড়ায় বাঁধা কী একটা বস্তু লোকটা গিঁট খুলে বের করতে লাগল।

এক টুকরো কাগজ। তাতে কয়টি কথা লেখা। সকলে লেখাটার দিকে ঝুঁকে পড়ল।

সর্দার তাড়াতাড়ি কাগজটা সকলের চোখের দৃষ্টি থেকে সরিয়ে নিল, কি দেখছিস সব হাঁ করে? যা ভাগ।

বলে সর্দার কাগজটা ভাঁজ করে ট্যাকে গুঁজে রাখল।

তারপর কিছুক্ষণ ধরে সকলে মিলে কি সব পরামর্শ করল। রাত্রি যখন দেড়টা তখন সকলে একে একে বিদায় নিল। শুধু সর্দার গেল না। শরীরটা আজ তার বড় ক্লান্ত। সারা সকাল দুপুর যা দৌড় ঝাঁপ গেছে।

সর্দার দরজাটায় খিল তুলে দিয়ে মেঝের উপর লুটিয়ে পড়ল।

রাত্রি তখন অনেক গভীর। বিশ্ব চরাচর নিস্তব্ধ নিঝুম।

দরজায় গায়ে শব্দ শোনা গেল, টক্‌টক।

সর্দারের ঘুমটা ভেঙে গেল, কে? সর্দার গভীর গলায় প্রশ্ন করলে।

উত্তর এল চাপা গলায়, সর্দার, সোনা।

সর্দার উঠে দরজাটা খুলে দিল, এতরাত্রে কি খবর?

সোনা টলতে টলতে মাটির উপর শুয়ে পড়ল।

বড্ড ঘুম পেয়েছে সর্দার, পথেই ছিলাম, বাড়ি যাইনি। বড় সর্দি লেগেছে। কোন মতে কথাটা জড়িয়ে বলে সোনা চুপ করলে।

সর্দার ও আর বাক্য ব্যয় না করে আবার শুয়ে পড়ল এবং দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে নাক ডাকতে শুরু করে দিল।

রাতের অভিসার

শ্ৰীপুরেই একটা বাড়িতে দিন কয়েক হলো কিরীটী ও সুব্ৰত আশ্রয় নিয়েছিল।

সেই বাড়ির একটি ঘরে রাত। তখন প্ৰায় এগারটা।

হঠাৎ কিরীটী উঠে পড়ে শয্যা থেকে।

সুব্রত শুধায়, উঠলি যে?

তৈরি হয়ে নে তুইও—

তৈরি হয়ে নেবো!

কিরীটী একটা কালো প্যান্টের উপর কালো সাটীনের সার্ট চাপাচ্ছিল।

সুব্রতর দিকে না তাকিয়েই জবাব দিল, হ্যাঁ, এখুনি চৌধুরী বাড়িতে যেতে হবে।

এই এত রাতে?

উপায় নেই।–রাঘব বোয়াল টোপ গিলেছে। দেখবি চল। ডাঙ্গায় কেমন তুলি খোলয়ে খেলিয়ে।

হেঁয়ালী রেখে কথাটা ভেঙ্গেই বল না।

আজকের রাতটা কটুক, শুভক্ষণ আসতে দে—

অল্পক্ষণের মধ্যেই কিরীটী আর সুব্রত বেরিয়ে পড়ল, প্রস্তুত হয়ে।

কিরীটীর কোমরে ঝোলান টর্চ। আর, পকেটে একটা সিল্ক কর্ড।

গভীর রাত্রি। কালো বাদুরের ডানার মত যেন নিঃশব্দে ছড়িয়ে আছে।

মাঝে মাঝে গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে রাতের মন্থর হাওয়া সিপি সিপ করে বয়ে যায়। মনে হয়, বুঝি রাতের অন্ধকারে কারা সব গা ঢাকা দিয়ে অশরীরী নিঃশ্বাস ফেলে ফেলে বেড়ায়।

কিরীটী আর সুব্রত শ্ৰীপুরের জমিদার বাড়ির বাগানে বড় একটা বকুল গাছের আড়ালে চুপচাপ দাঁড়িয়ে।

কিরীটী সুব্রতর গায়ে মৃদু একটা ঠেলা দিল, কটা বেজেছে? সুব্রত রেডিয়াম দেওয়া হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে ঘড়িটা কিরীটীর চোখের সামনে উঁচু করে ধরল।

রাত্রি একটা বেজে পঁচিশ মিনিট। আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকী।

কিন্তু এক একটা মিনিট যেন আর কাটতে চায় না।

প্ৰকাণ্ড জমিদার বাড়িটা যেন নিঃশব্দে ভূতের মত অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ঝিমুচ্ছে।

এমন সময় সহসা একটা সবুজ আলো অন্ধকারের বুকে জেগে উঠল। জমিদার বাড়ির দোতলায়-একটা জানালা পথে।

আর দেরী নয়। ফিসফিস করে কিরীটী বলে।

কিরীটী সুব্রতর হাতে এক চাপ দিয়ে এগিয়ে চলল।

সুব্রতও তাকে অনুসরণ করল।

ওরা এসে পশ্চাতে অন্দর মহলের দরজার সামনে দাঁড়াল।

অন্দর মহলের সিঁড়ির দরজাটা খোলাই ছিল সেটা একটু ঈষৎ ঠেলা দিতেই খুলে গেল। কিরীটী আর সুব্ৰত ভিতরে ঢুকে বারান্দা অতিক্রম করে সামনেই উপরে উঠবার সিঁড়ি দেখতে পেল।

সিঁড়ির আলোটা টিম টিম করে জুলছে। সমস্ত সিঁড়িটায় একটা যেন আলো-আঁধারীর সৃষ্টি হয়েছে।

পা টিপে টিপে নিঃশব্দে কিরীটী সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল।

সামনে একটা টানা বারান্দা-দোতলায়—একতলার মতই জমাট আঁধার, কিছুই দেখবার উপায় নেই।

কিরীটী পা টিপে টিপে এগিয়ে চলে।

বারান্দা যেখানে বেঁকেছে তারই সামনে যে ঘর, সেইটাতেই পানু শোয়।

মৃদু একটা ঠেলা দিতেই দরজাটা খুলে গেল। ওরা ঘরে পা দেয়।

ঘরের বাগানের দিককার জানালাটা খোলা।

রাতের হাওয়ায় খাটের উপর টাঙানো নেটের মশারিটা দুলে দুলে উঠছে আবছা আবছা অন্ধকারেও দেখা যায়।

কিরীটী এগিয়ে এসে নিঃশব্দে মশারিটা তুলে হস্তধৃত টর্চের বোতামটা টিপতেই বিছানাটার উপর টর্চের আলো গিয়ে ছড়িয়ে পড়ল।

সুব্রত সভয়ে দেখলে, একটা বাঁকানো তীক্ষ্ণ ভোজালী পাশ বালিশটার গায়ে অৰ্দ্ধেকটার বেশী ঢুকে রয়েছে, শয্যা খালি।

কিরীটী হাসতে হাসতে বালিশের গা থেকে ভেজালীটা টেনে তুলে নিল। ভোজলীটার হাতলটিা হাতীর দাঁতের নানা কারুকার্য খচিত এবং সেই হাতলের গায়ে মীনা করে লেখা ‘S.C’.

এমন সময় খুঁট করে একটা শব্দ শোনা যেতেই টুক করে কিরীটী হাতের টৰ্চটা নিভিয়ে দিল।

নিমিষে নিকষ। কালো আঁধারে ঘর গেল ভরে।

পর মুহুর্তেই মনে হলো আশে পাশেই কোথাও কোন দরজা খুলে কে বুঝি নিঃশব্দে চোরের মত চুপি চুপি ঘরে ঢুকছে।

ওরা উদগ্ৰীব হয়ে ওঠে।

সহসা এমন সময় আবার কিরীটীর হাতের টর্চ জ্বলে উঠলো।

সেই আলোয় সুব্রত ও কিরীটী দেখলে তাদেরই সামনে অল্প দূরে দাঁড়িয়ে শ্ৰীপুরের জমিদার স্বয়ং শশাঙ্কমোহন চৌধুরী।

তাঁর দুই চোখ দিয়ে বিহ্বল ও আতঙ্কপূর্ণ চাউনি যেন ফুটে বের হচ্ছে।

ধাঁধার উত্তর

কিরীটীর ডাকে সুব্রতর ঘুমটা ভেঙ্গে গেল-ওঠ হে সুব্রত রায়। জাগো, আঁখি মেল।

ওঠ বন্ধু মুখ ধোও পর নিজ বেশ।
গরম চায়েতে মন করাহ নিবেশ।

সুব্ৰত চোখ মেলে দেখলে কিরীটীর হাতে এক কাপ ধূমায়িত গরম চা, মাঝে মাঝে সে আরাম করে চুমুক দিচ্ছে।

সুব্রত তাড়াতাড়ি সলজ একটু হোেস শয্যা ছেড়ে উঠে বসল।

একটু পরে দুই বন্ধু তখন বাইরের ঘরে বসে গত রাত্রির ঘটনার আলোচনা করছে। সিঁড়িতে জুতার শব্দ শোনা গেল।

কিরীটী হাসতে হাসতে বললে, শ্ৰীধর ওরফে আমাদের রাজু আসছেন—

সত্যি সত্যিই রাজু এসে ঘরে প্রবেশ করল।

উৎকণ্ঠায় সে যেন হাঁপাচ্ছে। ঘরে ঢুকেই একটা চেয়ারের উপর ধাপ করে বসে পড়ে বলে। তারপর? এখন সব বল।

কি ধাঁধার উত্তর তো?

হ্যাঁ।

এই নে। কিরীটী একটুকরো ভাঁজ করা কাগজ রাজুর সামনে এগিয়ে ধরল। অধীর আগ্রহে ভাঁজ করা কাগজটা রাজু খুলে ফেলল।

১ নম্বর—বোতাম : –ম +

২ নম্বর-ছয় বৎসর : –শ’ +

৩ নম্বর–চিঠি ও ফটো : শ + ম

৪ নম্বর–চিঠি : —শ—ম +

৫ নম্বর–কাটা আঙ্গুল : -ম + +

৬ নম্বর–পোড়া সিগারেট :–ম + +

(ক) করালী চরণ : শ+ / ম++
(খ) ছেলে চুরি : শ + / ম + + / ?

খানিকক্ষণ কাগজটার উপর চোখ বুলিয়ে রাজু বিস্মিতভাবে কিরীটীর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলে, এ আবার কী?

ঐ তো তোমার আগাগোড়া সমস্ত রহস্যের মীমাংসা।

ধাঁধার উত্তর।

বুঝিয়ে দে।

তবে বলি শোন, কিরীটী সিগারেটের টিন থেকে একটা সিগারেট নিয়ে তাতে অগ্নি সংযোগ করতে করতে বলতে শুরু করল।

শশাঙ্কমোহনের খুড়তুত ভাই হচ্ছে মৃগাঙ্কমোহন। আমরা উইলের ব্যাপারে জানি যে শশাঙ্ক মোহনের বাপ যে উইল করে যান তার অর্থ এই, শশাঙ্কমোহনের যদি ছেলে হয় তবে সে সম্পত্তি পাবে আর যদি মেয়ে হয় তবে অর্ধেক পাবে সেই মেয়ে আর বাকী অর্ধেক পাবে মৃগাঙ্গমোহন নিজে কিম্বা তার ওয়ারিশগণ। মৃগাঙ্গমোহন যেদিন জানতে পারলেন যে দাদার সন্তান হবে তিনি মনে মনে এক অভিসন্ধি করলেন, যদি ছেলে হয় তবে সে ছেলেকে হত্যা করে অন্য একটি মেয়েকে সেখানে বদলে রাখতে হবে। আর যদি মেয়ে হয় তবে তো কোন কথাই নেই। সব ল্যাটা চুকে যায়। কারালীচরণ ছিল চৌধুরী বাড়ির পুরাতন চাকর। সে একদিন সহসা সন্ধ্যার অন্ধকারে মৃগাঙ্গমোহনের ঘরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে মৃগাঙ্কমোহনকে একজন লোকের সঙ্গে চুপিচুপি পরামর্শ করতে শোনে এবং সব কথাই তার কানো যায়।

মৃগাঙ্কমোহনের সঙ্গে ইতিপূর্বে আরো দু’একবার সেই লোকটি এসে পরামর্শ করেছে। তাও করালীচরণের নজর এড়ায়নি। কারালী কোন দিন মৃগাঙ্কমোহন কে দু’চোখে দেখতে পারত না। মৃগাঙ্ক যে সে কথা জানত না তা নয়। পুরানো চাকর হিসেবে চৌধুরী বাড়ির উপরে করালীর বেশ একটু আধিপত্যই ছিল। শশাঙ্ককে ঐ করালীই কোলে পিঠে করে একপ্রকার মানুষ করেছিল। সেইজন্যই মৃগাঙ্ক করালীর প্রতি সন্তুষ্ট না থাকলেও কিছু বলতে সাহস করত।

এই পর্যন্ত বেশ সোজা-সরল একটি ষড়যন্ত্র। তারপরেই ব্যাপারটা জটিল হয়ে গেল।

কি রকম? সুব্রত প্রশ্ন করে।

সেই কথাই এবারে বলব, কিরীটী বলতে লাগল।

স্থানীয় লেডী ডাক্তার ডাঃ মিস মল্লিকা সরখেলের সঙ্গে মৃগাঙ্কমোহনের রীতিমত একটা হৃদ্যতা ছিল, মল্লিকা মৃগাঙ্গকে বিয়ের জন্য তাকে বহুবার বলেছে কিন্তু মৃগাঙ্ক কান দেয় নি। অবশেষে মৃগাঙ্ক বললে-বিভাবতী তার বৌদি, সন্তান সম্ভাবিতা। ছেলে হবার সময় সুনিশ্চিত তার ডাক পড়বে। সেই সময় যদি একটি পুত্ৰ সন্তান হয়—এবং মল্লিকা সদ্যজাত সেই শিশুটিকে কোন মতে হত্যা করে সরিয়ে দিতে পারে তাহলে তাদের পথ পরিষ্কার। তাদের বিয়ে হতে পারে।

বলিস কি?

তাই, তবে মল্লিকা তখনো জানতে পারেনি মৃগাঙ্ক লোকটা কতবড় শয়তান!

তা একথা জানালি কি করে তুই?

মল্লিকাই জানায়!

মল্লিকা!

হ্যাঁ–একটা চিঠি দিয়েছিলাম তাকে-।

তারপর।

সে এখন শিলংয়ে ডাক্তারী করে। যাই হোক তারপর শোন-মৃগাঙ্কমোহন ডাঃ মল্লিকার সঙ্গে পরামর্শ করলেন ছেলে হলে মেরে ফেলতে হবে আর অন্যদিকে করালী দাঁইয়ের সঙ্গে গোপন পরামর্শ করে স্থির করে মৃগাঙ্কের দৃষ্টি থেকে বাঁচাবার জন্য সে দাইয়ের সাহায্যে সেই নবজাত শিশুটিকে আঁতুড় ঘর থেকে সরিয়ে ফেলবে-হত্যা করতে কিছুতেই দেবে না। যদি শশাঙ্কমোহনের ছেলে হয়, আর মেয়ে হলে তো ল্যাটাই নেই কোন।

তারপর?

এদিকে মৃগাঙ্কমোহনের প্রস্তাবে সম্মত হলেও ডাঃ মল্লিকা হাজার হলেও স্ত্রী-লোক মায়ের জাত-মনে মনে সে স্থির করে যদি ছেলেই হয় তো হত্যা করবে না, তাকে সরিয়ে ফেলবে-আর তাকে সাহায্য করবার জন্য দাইকে বলবে। দাই-মঙ্গলার ঐ কথা শুনে তো ভালই হলো। কারালীর সঙ্গে যে পরামর্শ হয়েছে সে কথা তাকে সে তখন বললে।

হাতের সিগ্রেটটা নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। একটা নতুন সিগ্রেটে অগ্নি সংযোগ করে আবার কিরীটী তার অর্ধসমাপ্ত কাহিনী শুরু করে।

যথা সময়ে সন্তান হলো-দাই মঙ্গলা ডাঃ মল্লিকার সঙ্গে পরামর্শ করে পূর্বাহ্নেই স্থির করে রেখেছিল ছেলে হলে সরিয়ে ফেলবে। কিন্তু ভগবানই হলেন ওদের সহায়-মেয়ে ও ছেলে দুই হলো।

তার মানে?

শ্ৰীলেখা, পানুর যমজ বোন।

সে কি!

হাঁ—আগে পানু পরে শ্ৰীলেখা জন্মায়। পানুর জন্মের প্রায় পয়ত্রিশ মিনিট পরে শ্ৰীলেখা জন্মায়। মৃগাঙ্গকে ডাঃ মল্লিকা জানাল শশাঙ্কর মেয়ে হয়েছে আর ছেলেটিকে সে সরিয়ে দিল দাইয়ের সাহায্যে মঙ্গলারই ঘরে।

মঙ্গলার ঘরে।

হাঁ, মঙ্গলার কোন সন্তানাদি ছিল না। সেই পানুকে বুকে তুলে নিল এবং মঙ্গলার বুকের মধ্যে পানু বড় হতে লাগল করালী ও মঙ্গলার তত্বাবধানে–

তারপর–

কিন্তু করালী বেশী দিন পানুকে মঙ্গলার কাছে রাখতে সাহস পায় না-সে তখন সরিয়ে দেয় পানু অর্থাৎ সুধীরকে হরমোহিনী আশ্রমে ডাঃ মল্লিকারই সাহায্যে। এবং সেখানে দিয়ে আসবার সময় করালী বুদ্ধি করে একটা কবচের মধ্যে ওর সত্যিকারের নাম ও পরিচয়টা লিখে হাতে বেঁধে দেয়। ঐ ঘটনার কিছুদিন পরেই মঙ্গলার মৃত্যু হয়। কারালীচরণ মধ্যে মধ্যে যেত হরমোনিহী আশ্রমে এবং সুধীরের খোঁজ খবর নিয়ে আসত—। পানু বা সুধীর বড় হতে লাগল অনাথ আশ্রমে আর শ্ৰীলেখা মা-বাবার কাছে। এমনি করেই চলছিল—তারপরই আকাশে দেখা দিল দুর্যোগের কালো মেঘ।

কি রকম? সুব্রত শুধায়।

কিরীটী আবার বলতে শুরু করে : ডাঃ মল্লিকা তারই ঠিকানা দিয়ে অনাথ বলে করালীর সাহায্যে পানুকে নিয়ে গিয়ে আশ্রমে ভর্তি করে দিয়েছিল আগেই বলেছি। হঠাৎ একদিন সুধীর আশ্রম থেকে অদৃশ্য হলো—সঙ্গে সঙ্গে আশ্রমের সুপারিনটেনডেন্ট চিঠি দিয়ে মল্লিককে কথাটা জানাল। ইতিমধ্যে মল্লিকার সঙ্গে মৃগাঙ্কর সমস্ত সম্পর্ক ছেদ হয়ে গিয়েছিল। মল্লিকা শিলংয়ে চলে গিয়েছিল সেও বলেছি। ডাঃ মল্লিকা সংবাদটা পেয়ে ভয় পেলে গেল এবং শ্ৰীপুরে সবকথা জানিয়ে করালীকে চিঠি দেয়।

চিঠি?

হ্যাঁ—সেই চিঠি দুৰ্ভাগ্যক্রমে পড়ল গিয়ে মৃগাঙ্কর হাতে সম্ভবতঃ ছয়বছর পরে অকস্মাৎ একদিন আর এই প্রথম মৃগাঙ্কের মনে সন্দেহ জন্মায় ঐ চিঠি পড়ে।

মৃগাঙ্ক করালীকে চেপে ধরে।

প্রথম লোভ দেখায়-তারপর ভয়-কিন্তু কিছুতেই মৃগাঙ্ক করালীকে যখন বাগে আনতে পারল না-সেই সময় শেষ চেষ্টা করার জন্য মৃগাঙ্ক এক রাত্রে করালীর ঘরে গিয়ে হাজির হলো।

মৃগাঙ্কর গায়ে ঐ সময় একটা কালো রঙের ওভারকোট ছিল—পাছে তাকে কেউ না দেখে হঠাৎ চিনে ফেলে।

তারপর আমার অনুমান দুজনার মধ্যে কথা কাটাকাটি হয় ও উত্তেজনার মুহূর্তে হয়ত ভোজালি দিয়ে করালীচরণকে আঘাত করে মৃগাঙ্কমোহন। এবং সম্ভবতঃ আঘাত খেয়ে পড়বার সময় করালী মৃগাঙ্ককে জাপটে ধরতে যায় বা কিছু, মৃগাঙ্কর জামার একটা বোতাম ছিঁড়ে করালীর মুঠির মধ্যে থেকে যায়।

করালীকে ঐ ভাবে নিষ্ঠুরের মত হত্যা করবার ইচ্ছা মৃগাঙ্কমোহনের ছিল কি ছিল না কে জানে, তবে করালীচরণ নিহত হলো মৃগাঙ্কমোহনের হাতেই, মৃত্যু ছিল বোধহয় তার মৃগাঙ্কমোহনের হাতেই। কিন্তু করালীর মৃত্যুতে মৃগাঙ্কমোহন ভয় পেয়ে গেল। এবং ভয় পেয়ে ব্যাপারটা হত্যা নয় আত্মহত্যা বলে চালাবার চেষ্টা করল। সেই কারণেই মৃতের হাতে ভোজলীটা গুজে দেয় এবং বারবার বলতে থাকে ব্যাপারটা হত্যা নয় আত্মহত্যা।

সুব্রত প্রশ্ন করে, মৃগাঙ্কমোহনকে কি তুই আগেই সন্দেহ করেছিলি?

হ্যাঁ—তবে প্রথমটায় নয়-কিছুদিন তদন্ত চালাবার পর–ওর প্রতি সন্দেহটা বদ্ধমূল হয়।

কেন?

চারটি কারণে তার উপরে আমার সন্দেহ জাগে। (১) করালীর হাতের মুঠিতে বোতাম-ঐ বোতামটার ব্যাপারে আমি রাজুকে অনুসন্ধান করতে বলি-বোতামটা ওকে দিয়ে। (২) রাজু খুঁজতে খুঁজতে মৃগাঙ্কমোহনের জামাটা আবিষ্কার করে,-মৃগাঙ্কমোহনেরই ঘরে একটা বইয়ের আলমারীর মধ্যে দালামোচড়া অবস্থায়। নিশ্চয়ই বইয়ের আলমারী জামা রাখার, বিশেষ করে অত দামী গরম কোট একটা রাখবার জায়গা নয়, সেটাও যেমন একটা সন্দেহের কারণ তেমনি বোতামটাও অবিশ্যি প্ৰথমে আমার মনে সন্দেহের উদ্রেক করেছিল–দামী সৌখীন বোতাম সচরাচর বড় একটা চোখে পড়ে না। (৩) মৃগাঙ্কমোহনের করালীর মৃত্যুটা আত্মহত্যা প্রমাণ করবার বিশ্ৰী চেষ্টাটা। (৪) মৃগাঙ্কর চিঠির ভাঙ্গা ‘S’ ও ‘b’ টাইপ দুটো।

তারপর? এরপরে সুধীরের ইতিহাসে আসা যাক। সুধীর বা পানুর বাপ শশাঙ্কমোহন জানতেন না দীর্ঘদিন পর্যন্ত তার ছেলের ব্যাপারটা। প্রথম জানতে পারলেন পাঁচবছর আগে সুধীর অকস্মাৎ হরমোহিনী আশ্রম থেকে নিরুদ্দিষ্ট হবার পর। এবং জানতে পারেন তিনি ডাঃ মল্লিকার চিঠিতে। ডাঃ মল্লিকাই একটা চিঠিতে সব কথা—এমন কি কবচোর কথাটাও জানায় ও একটা গ্রুপ ফটো ওদের পাঠিয়ে দেয়। বলাই বাহুল্য শশাঙ্কমোহন এবার রীতিমতো বিচলিত হলেন এবং নিরুদ্দিষ্ট ছেলের সন্ধান করতে লাগলেন গোপনে গোপনে। পাছে মৃগাঙ্ক ব্যাপারটা জেনে ফেলে এই ভয়ে গোপনে অনুসন্ধান করতে লাগলেন-এমনি করে ছয়টা বছর আরো কেটে গেল-তারপর অকস্মাৎ একদিন দৈবক্রমে মল্লিকার চিঠিটা মৃগাঙ্কর হাতে পড়ল। মৃগাঙ্ক এই প্রথম আসল ব্যাপারটা জানতে পারেন-সো করালীকে চেপে ধরল-যার ফলে করালী ঘটনাচক্রে হলো মৃগাঙ্কর হাতে নিহত।

অতঃপর আমাদের অকুস্থানে আবির্ভাব। করালীর মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে শশাঙ্কমোহন ফিরে এলেন শ্ৰীপুরে… বুঝলেন মৃগাঙ্ক সব জেনে ফেলেছে। অতএব কি করবেন স্থির করতে না পেরে–একেবারে বোবা হয়ে গেলেন যেন।

কিন্তু মৃগাঙ্কমোহন তখন মরিয়া-সে চিঠি দিল আমাকে ইংরাজীতে টাইপ করে-মৃগাঙ্ক তার নিজের টাইপ রাইটিং মেসিনে টাইপ করে চিঠি দেয়—যে মেশিনের দুটো অক্ষর বড় হাতের ‘S’ ছোট হাতের “b” টা ছিল ভাঙ্গা-মৃগাঙ্কমোহনের বিরুদ্ধে মোক্ষম ও সর্বশেষ প্ৰমাণ। মৃগাঙ্ক বুঝেছিল অন্য কেউ না পারলেও আমরা হয়ত সুধীরের সন্ধান করতে পারব। আমার ক্ষমতা সম্পর্কে তার এতটুকুও সন্দেহ ছিল না-আর সেই কারণেই সে আমাকে করালীর হত্যার ব্যাপারেও অনুসন্ধান করবার জন্য ডেকে নিয়েছিল। অর্থাৎ আমাকে ডাকা ও পরে চিঠি দেওয়া দুটোর মূলেই ছিল সুধীরের অনুসন্ধান পাওয়া।

কিন্তু কি করে তুই নিঃসন্দেহ হয়েছিলি যে মৃগাঙ্কই চিঠি দিয়েছে তোকে?

বললাম তো-কিরীটী বলতে থাকে, হত্যানুসন্ধানের ব্যাপারে মৃগাঙ্ক মোহনের অত্যধিক আগ্রহ দেখে-তাছাড়া ঐ চিঠির মধ্যে উইলের কথা ছিল সেটাও মনে আমার সন্দেহের উদ্রেক করে। অতঃপর বুঝতে পারি ঐ ছেলে চুরি, উইল ও সর্বশেষ করালীচরণের হত্যা—সব এক সূত্ৰে গাঁথা। একটি অখণ্ড মালা। তবু নিশ্চিন্ত হবার জন্য ধূর্জন্টীর ছদ্মবেশে শশাঙ্কমোহনের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম শ্ৰীপুর এবং শশাঙ্কমোহনের সঙ্গে কথার ভাবেই আমি বুঝলাম যে, মৃগাঙ্কমোহনই আমায় চিঠি দিয়েছে। কেননা ষড়যন্ত্রকারী একজনের নাম জানতে গিয়ে আমি মৃগাঙ্কর নাম একটা ক্লিপে লিখে ওঁকে দেখিয়েছিলাম। সেই নাম দেখে শশাঙ্কমোহনের মুখের ভাব একেবারে বদলে গেল।

এদিকে আমি চলে আসবার পর রাজু শশাঙ্কমোহনের দরজায় আমার ইসারা মত ‘কি হোল’ দেখতে গিয়ে শশাঙ্কমোহনের আলমারী তন্নতন্ন করে খোঁজা ও মুখের একটা অস্ফুট কথা শুনতে পায়। সেটা হচ্ছে, আশ্চর্য। চিঠির এই advertisement (বিজ্ঞাপন) ব্যাপার নিয়ে যে নানা রকম গোলমাল বাঁধতে পারে তা আমি জানতাম। পরিচয়ের আসল নিদর্শন কবচটি ও তার মধ্যেকার পরিচয় লিপি জোগাড় করা সম্ভব হবে না। হলও তাই। যে একজন ঠকাতে এল সে ঐখানেই ঠিকে গেল। আমি প্রথম থেকেই প্রথম সুধীর ‘জাল’ জেনেও কোন উচ্চবাচ্য করিনি—তার কারণ মৃগাঙ্কর মনে সুধীরকে পাওয়ায় কী পরিবর্তন দেখা দেয় সেটা পরীক্ষা করে দেখবার জন্য।

তারপর যা যা ঘটে এবং শ্ৰীরামপুর থেকে আসল সুধীরকে কেমন করে পাওয়া যায়। তাতো তোমরা জানাই।

সুধীর ফিরে এলে মৃগাঙ্কমোহন যে ক্ষেপে উঠবে তা আমি আগে থেকেই জানতাম এবং এও জানতাম। এবারে সে মরিয়া হয়েই হয়ত শেষ চেষ্টা একবার করে দেখবে। তাই রাজুকে বললাম, মৃগাঙ্কর উপর কড়া পাহারা দিতে।

মৃগাঙ্ক নকল ও আসল সুধীরের গোলমালে পড়ে প্রথমটায় একটু হকচকিয়ে গেল। কিন্তু মীমাংসার সমাধান যখন হয়ে গেল, সে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে এল।

একদিন হঠাৎ এক খোঁড়া ভিখারী জমিদার বাড়িতে ভিক্ষা করতে এল। মৃগাঙ্কমোহন দয়া পরবশ হয়ে একটা গোটা কাপড় ভিক্ষুককে দান করে বসলেন, যার হাত দিয়ে ইতিপূর্বে কখনও একটা আধলাও গলেনি।

রাজুর মনে কেমন একটু সন্দেহ হওয়ায় সে ভিক্ষুককে অনুসরণ করল। ভিক্ষুক বরাবর স্টীমার ঘাটে এসে টিকিট কিনে স্টীমার চেপে বসল।

রাজুও কাল বিলম্ব না করে স্টীমারে গিয়ে চাপল।

এই পর্যন্ত বলে কিরীটী থামল। বললে : এখন এই পর্যন্ত। বাকী দুপুরে বলব।

বিশ্লেষণের শেষ

দুপুরের দিকে খাওয়া দাওয়ার পর সকলে এসে কিরীটীর ড্রইং রুমে একত্রিত হলো।

একটা সিগারেট ধরিয়ে কিরীটী বলতে লাগল :

হ্যাঁ, তারপর রাজু ভিক্ষুককে অনুসরণ করে বরাবর এসে পাথুরেঘাটার এক আড্ডায় উঠলো। পথিমধ্যে ভিক্ষুক এক জায়গায় সেই কাপড়ের খুঁটি থেকে খানিকটা কাপড় ছিঁড়ে জমার নীচে গুজে রেখেছিল। তাতে রাজুর সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়।

পাথুরেঘাটার আড়ায় দরজার আড়াল থেকে সবই রাজু কান পেতে শুনল। এবং শুনে মনে মনে এক মতলব এটে দাঁড়িয়ে রইল।

লোকগুলি যখন বের হলো, সে কথাবার্তায় সহজেই দলের মধ্যে সোনাকে চিনে নিল। তারপর বরাবর নিজের পুরানো আড়ায় গিয়ে অনেকটা সোনার মতই দেখতে একজনকে সোনা সাজিয়ে এনে গভীর রাত্রে সর্দারের ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত সর্দারের ট্যাক থেকে কাগজটা চুরি করে আমার কাছে পাঠিয়ে দিল।

চিঠি–

সেই চিঠি পেয়েই তো আমার মুখ সেইদিন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু চিঠিতে কি ছিল—

ছিল দুটো কথা। প্রথমতঃ—ষড়যন্ত্র টের পাওয়া গেল এবং দ্বিতীয় মৃগাঙ্কমোহনই যে দোষী, তাও একেবারে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়ে গেল হাতে লেখা দেখে সেই চিঠি থেকেই। এই সেই চিঠি, দেখ।

বলতে বলতে কিরীটী একটা ভাঁজকরা কাগজ টেনে বের করল। কাগজটায় পেন্সিল দিয়ে লেখা : শুক্রবার রাত্রি দেড়টায় সবুজ আলোর নিশানা পাবে। এই চিঠির হাতের লেখা থেকে আরো একটা জিনিস বুঝলাম; লক্ষ্য করে দেখ, তোমরাও হয়ত বুঝতে পারবে, লেখাগুলি কাগজের উপর একটু যেন জোরে জোরে বসেছে. অনেক জায়গায় দুপিঠ কাগজের গা ফুটো হয়ে গেছে।

এর থেকে বুঝতে পারা যায়, যে চিঠি লিখেছে সে কোন কারণে জোরে চাপ দিয়ে লেখে।…তোমরা লক্ষ্য করেছে। কিনা জানিনা মৃগাঙ্কর ডান হাতের প্রথম আঙ্গুলটা নেই। ভেবে দেখা পেন্সিল তাহলে দ্বিতীয় আঙ্গুলোর উপর চেপে লিখতে হবে, যদি লিখতে হয়। তাহলে চিঠিটা যে মৃগাঙ্কর হাতের লেখা সে বিষয়েও কোন সন্দেহ আর থাকে না।

অবিশ্যি আমি বুঝেছিলাম। এ সুযোগ মৃগাঙ্ক ভালভাবেই নেবে। তাই আমি আগে থাকতেই রাজুর সাহায্যে পানুকে অন্য ঘরে শুতে বলি শুক্রবার রাত্রে এবং তার বিছানা পেতে বালিশ দিয়ে মশারি ফেলে রাখতে বলি। আততায়ীরা এসে আলোর নিশানা পেয়ে আঁধারে পানু ভেবে বালিশের উপরেই ছোরা বসিয়ে চলে যায়।

কিন্তু শশাঙ্কমোহনকে সে ঘরে আমরা দেখলাম কেন? শশাঙ্কমোহনের মনেও হয়ত সন্দেহ হয়েছিল; শশাঙ্কমোহন গুপ্ত দ্বারপথে ছেলের খবর নিতে এসে আমাদের কাছে ধরা পড়ে গেলেন। পরদিন আমার অনুরোধে আগাগোড়া সমস্ত ব্যাপার খুলে বললেন। ওভার কোটের কথা জিজ্ঞাসা করাতে তিনি বললেন, বোতামটা তারই একটা ওভার কোটের। মৃগাঙ্ক দাদার কোট গায়ে দিয়ে মুখোশ এঁটে করালীর সঙ্গে দেখা করতে যায়, এই ভেবে, যদি ধরাই পড়ে তবে কেউ তাকে চিনতে পারবে না। আর কোটটা থেকে যদি কোন কিছু ধরা পড়ে তবে সেটাও দাদার ঘাড়েই পড়বে। আমরা যখন ছাদে গেলাম। সেই রাত্ৰে মৃগাঙ্ক তার আগেই গা ঢাকা দিয়েছিল। কিন্তু টর্চের আলোয় একগাদা পোড়া কাপসটেন সিগারেটের টুকরো ছাদে পাওয়া গেল।

মৃগাঙ্ক যে ভীষণ সিগারেট খায়, তা আমি প্রথম দিনই মৃগাঙ্কর হাতে নিকোটিনের দাগ দেখেই বুঝেছিলাম।

এখন সব মিলিয়ে দেখা। ধাঁধার উত্তর মিলে কি না?

১নং বোতাম : ম + অর্থাৎ ‘ম’ র মৃগাঙ্কর পরে সন্দেহ জাগে।

২ নং ছয় বৎসর :–শ + ছয় বৎসরের আগেকার ব্যাপারও শশাঙ্ক জানত। কিন্তু মুগাঙ্ক জানত না।

৩নং চিঠি ও ফটো :–শ + যার দ্বারা মৃগাঙ্ক সব জানতে পারে।

৪নং চিঠি : — শ+ শশাঙ্কর নয় মৃগাঙ্করই লেখা।

৫নং কাঁটা আঙ্গুল :–ম + যার জন্য প্রমাণ চিঠি। মৃগাঙ্করই হাতের লেখা।

৬নং পোড়া সিগারেট :–ম + মৃগাঙ্করই হাতে নিকোটিনের দাগ ছিল। অতএব বোঝা যাচ্ছে করালীকে হত্যা করে মৃগাঙ্কই। ছেলে চুরি করে শশাঙ্ক, মৃগাঙ্ক নয়। করালী ডাঃ মল্লিকার সহায়তায়। যাক, শ্ৰীপুর রহস্যের সমাধান হয়েছে তো।

ক্রিং, ক্রিং টেলিফোন বেজে উঠল, কিরীটী ফোন ধরল, হ্যালো।

হ্যাঁ, আমি কিরীটী। কী বল্লেন, নিমন্ত্রণ? বেশ, বেশ, যাবো নিশ্চয়ই যাবো।

ফোনটা নামিয়ে রেখে কিরীটী ওদের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলে, ওহে আজ রাত্রে শ্ৰীপুরে সকলের নিমন্ত্রণ।

সুব্ৰত চেচিয়ে উঠল-হিপ হিপ হুররে।

হতভাগ্য মৃগাঙ্কমোহন—শেষ পর্যন্ত বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করলা লজ্জায় অপমানে পরের দিনই রাত্রে।

পানু কিন্তু নতুন এই আবেষ্টনীতে হাঁপিয়ে উঠতে লাগল। যে স্নেহ থেকে সে তার জীবনের প্রথম মুহূর্তেই বঞ্চিত হয়েছিল, আজ সেই স্নেহই যখন অপৰ্যাপ্তভাবে বন্যাস্রোতের মত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইলে–ও অন্তর থেকে তাকে কোন মতেই যেন গ্ৰহণ করতে পারে না।

‘হরমোহিনী আশ্রমে’ আসবার আগে যে মেহের আস্বাদ সে দুচার বছরের জন্য পেয়েছিল সেটা তার মনে তেমন দাগ কাটতে পারেনি। কেননা সে বয়সে কোন একটা কিছুকে সহজভাবে একান্ত করে নেওয়া ও আবার একান্ত করে ভুলে যাওয়াটাই হচ্ছে ধর্ম এবং তারপর “হরমোহিনী আশ্রমে’ তার জীবনের যে কাঁটা দিন কেটেছে সেটা সহজ স্মৃর্তির মধ্যে দিয়ে নয়—তাই একদিন রাত্রে অত্যন্ত দুঃসাহসিক ভাবেই সে আশ্রমের গেট ডিঙ্গিয়ে সে চলে এসেছিল—তাকে সে অতি সহজেই ভুলতে পেরেছিল।

তারপর এলো এক নতুন মা-পরমেশবাবুর মেয়ে রমা ওর জীবন পথে। পরিপূর্ণ স্নেহ ও ভালবাসা নিয়ে যেন মুহুর্তে তাকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে আপন করে নিয়েছিল রমা।

পানুর চিরশুষ্ক স্নেহ-ব্যাকুল সমগ্র অন্তর সে স্নেহের ধারায় গেল জুড়িয়ে। সে নিঃস্ব হয়ে আপনার অতীত ও ভবিষ্যতকে ভুলে আপনাকে বর্তমানের মধ্যে বিলিয়ে দিল। আজ তাই এই ঐশ্বর্যের চাকচিক্যের মধ্যে এসেও সেই মা’র কথাই বার বার তার অন্তরকে কাঁদিয়ে ফিরতে লাগল।

মাঝে মাঝে শ্ৰীলেখা এসে জিজ্ঞাসা করে : কী হয়েছে দাদা?

কে শ্ৰী? আয় বোস। পানু ওর দিকে ফিরে বলে, কই কিছু তো ভাবছি না?

দিনরাত ঘরের মধ্যে বসে থাক কেন দাদা? তার চাইতে চল বাগানে ঘুরে আসি। না হয় মোটরে করে খানিকটা ঘুরে আসি।-চল পানসীতে করে না হয়। গঙ্গায় বেরিয়ে আসি।

যায় বটে। শ্ৰীলেখার ডাকে বাইরে পানু। কিন্তু মন তার যেন ভরে না। একটা শূন্যতা যেন মনের মধ্যে কেঁদে কেঁদে মরে। মধ্যে মধ্যে মনে পড়ে দাদা সুনীলের কথা।

সেই চির দুর্দান্ত …পথহারা অফুরন্ত সুনীল। কে জানে এখন সে কোথায়?

বিভাবতী এসে বলেন : এদিক ওদিক একটু ঘুরে আয় দুজনে। এমনি করে দিবারাত্র ঘরের মধ্যে বসে থাকলে যে অসুখ হয়ে যাবে।

দিনরাত পানু স্বপ্ন দেখে, শ্ৰীরামপুরের মা যেন দিবারাত্র তারই জন্য কাঁদছেন।

পানু ফিরে আয় বাবা, সুনু আমায় ছেড়ে চলে গেল, তুইও যাসনি।

শেষের কথা

পানুর ঘুম ভেঙে যায়। নিঃশব্দ নিঝুম জমিদার বাড়ি।

আঁধারে বাগানের গাছপালা গুলি রাতের চোরা হাওয়ায় যেন মাঝে মাঝে কেঁপে কেঁপে ওঠে। ওই দুরে শুকতারা। একাকী বোবা পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে জেগে থাকে, ঘুম আসছে না পানুর, শয্যার উপর উঠে বসল।

শয্যার উপরে বসে বসে কিছুক্ষণ যেন কি ভাবল।

সুইচ টিপে আলো জুলিয়ে দেখলে, রাত্রি দেড়টা।

পানু শয্যা থেকে উঠে নীচে নেমে দাঁড়াল।

সেই রাত্রে নৌক ভাড়া করে পানু জোয়ারের টানে শ্ৰীরামপুর এসে যখন পৌঁছল তখন রাত্রি শেষ হতে আর দেরী নেই। পূব গগনে উষার অরুণ আলোর আভাস জেগেছে।

প্রাচীর টপকে পানু তীর পরিচিত গৃহে গিয়ে ঢুকল… মেঝের উপরে রমা উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে।

পানু ধীর পদে গিয়ে তার মাথার কাছটিতে বসল।

মা? ও, মা। পানু তার হাতটি রমার মাথার উপরে রাখলে।

মাগো।

কে, ধড়ফর করে রমা উঠে বসে।

আমি পানু।–

পানু এসেছিস বাবা। দুহাতে গভীর স্নেহে রমা পানুকে বুকের মধ্যে টেনে নেয়। দুজনের চোখের কোল বেয়ে অশ্রুধারা নামে।

পানুর গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে গভীর স্নেহে রমা বলে, এত রোগা হয়ে গেছিস কেন বাবা?

পানু নীরবে মায়ের বুকে মুখ গুজে মাথাটা ঘষতে থাকে। তারপর কত কথা যে দু’জনে বলে—কখন একসময় পরমেশবাবু চৌকাঠের উপরে এসে দাঁড়িয়েছেন-কারুরই তা খেয়াল নেই।

একি পানু?

পানু চমকে চেয়ে দেখে ভোরের প্রথম আলোয় ঘরের অন্ধকার কখন দূর হয়ে গেছে। চৌকাঠের উপর দাঁড়িয়ে দাদু।

হ্যাঁ দাদু আমি। আমি আবার তোমাদের কাছেই চলে এলাম, মাকে ছেড়ে থাকতে পারলাম না। বলতে বলতে সস্নেহে পানু দুহাতে রামার গলা জড়িয়ে ধরে।

পরমেশবাবুর চোখের কোল দুটি জলে ভরে উঠল।

সকালবেলাই পরমেশবাবু ডাকঘরে গিয়ে শশাঙ্কমোহনকে ‘তার’ করে দিলেন : পানু আমার এখানে এসেছে, চিন্তার কোন কারণ নেই।

বেলা-বারোটায় ‘তারের’ জবাব এলো, নিশ্চিন্ত হলাম। সে নিরাপদ জেনে, আর সুখী হলাম, সে স্নেহ ও ভালবাসাকে ভুলতে পারেনি জেনে, বিকেলের দিকেই আমরা যাচ্ছি। তারপর অন্যান্য ব্যবস্থা হবে।

শশাঙ্ক মোহন।

পাশের ঘরে তখন রমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পানু তার জীবনের এ কয়টা দিনের বিচত্ৰ অভিজ্ঞতার কাহিনীই বলছিল।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত