মানসী তুমি

মানসী তুমি

টেলিগ্রামটা এসেছিল বিকেলের দিকে–সংক্ষিপ্ত তার। টেলিগ্রামে লেখা ছিল : সুকুমার, বিবাহ করেছি। তোমার নতুন বৌদিকে নিয়ে আগামী শনিবার সকালের ট্রেনে পৌছাব। শরদিন্দু।

আগামী শনিবার মানে কাল বাদে পরশুই। মনে মনে হিসাব করে দেখল সুকুমার, হাতে মাত্র একটা দিন তাহলে আর আছে। কোন্ ট্রেনে এবং ঠিক কখন ট্রেনটা পৌছাবে হাওড়া স্টেশনে সেসব কিছুই নেই তারবার্তার মধ্যে।

টেলিগ্রামটা পেয়ে সুকুমার কম বিস্মিত হয়নি। তা বিস্মিত হবারই কথা। শরদিন্দুর যখন প্রায় চল্লিশ বৎসর বয়স তখনই তার প্রথমা স্ত্রী মানসী আকস্মিক ভাবে মারা যায় জলমগ্ন হয়ে সমুদ্রে স্নান করতে গিয়ে। স্ত্রী মানসীকে হারিয়ে শরদিন্দু যখন একা ফিরে এসেছিল পুরী থেকে—সুকুমার চমকে উঠেছিল।

শরদিন্দুর চোখেমুখে যেন একটা সর্বস্ব হারানোর ব্যথা, মাথার চুল উস্কোখুস্কো—চোখ দুটো রক্তজবার মত লাল। সারামুখে খোঁচা কাঁচা-পাকা দাড়ি।

সুকুমার শুধিয়েছিল, কি হয়েছে শরদিন্দুদা, তুমি একা কেন—বৌদি কোথায়?

শরদিন্দু ফ্যালফ্যাল করে শূন্যদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সুকুমারের মুখের দিকে।

ঠোঁট দুটো তার অল্প অল্প কাঁপছে।–মানসী নেই সুকুমার!

নেই? বিমূঢ় দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সুকুমার শরদিন্দুর মুখের দিকে কিছুক্ষণ। সত্যি সুকুমার যেন বোবা হয়ে গিয়েছিল।

সমুদ্রে সাঁতার কাটতে গিয়ে ড়ুবে গিয়েছে মানসী।

সে কি!

অনেক বারণ করেছিলাম রে, সমুদ্রে আমার সঙ্গে স্নান করতে নেমো না কিন্তু শুনল না। আমার কথা।

আত্মীয়-পরিচিতের দল সবাই জানত শরদিন্দু কি প্রচণ্ড ভালোবাসত তার স্ত্রীকে। মানসীকে নিজে পছন্দ করেই বিবাহ করেছিল শরদিন্দু বৎসর দুই আগে।

অমন সুখী দম্পতি বড় একটা চোখে পড়ত না সচরাচর। এক দণ্ড স্ত্রীকে চোখের সামনে দেখলে যেন পাগল হয়ে যেত শরদিন্দু।

প্রথম প্রথম হাসত নীরজা স্বামীর রকমসকম দেখে। পরে কিন্তু তার মনের মধ্যে কেমন যেন একটা ভয় বাসা বেঁধেছিল। সুকুমারকে একদিন মানসী বলেছিল, জান সুকু, আমার কেন যেন বড্ড ভয় করে।

ভয়? ভয় কিসের বৌদি?

ভয় তোমার দাদার ঐ প্রচণ্ড ভালোবাসাকে।

সুকুমার হেসেছে, বলেছে, কি যে বল বৌদি!

না, না সত্যি ভাই, তোমার দাদা কাছে এলেই—আমার যেন মনে হয়—

দাদা চিরদিনই ঐরকম বৌদি। যাকে সে ভালোবাসে, তাকে যেন এক দণ্ড চোখের আড়াল করতে চায় না।

শরদিন্দুর ঔষধ তৈরির একটা কারখানা ছিল বাগমারিতে। কারখানাটা খুব বিরাটও নয়, আবার ছোটও নয়। ঔষধের ব্যাপারটা নিজে ভাল করে যাতে বুঝতে পারে বিলেতে গিয়ে তাই বি-ফারমা পাস করে এসেছিল। কারখানাটা ছিল যেন তার প্রাণ।

সকাল সাড়ে নটায় স্নান সেরে শুরু হত প্রস্তুতি। বরাবর সুকুমার দেখেছে দশটা বাজতেই শরদিন্দুর গাড়িটা বের হয়ে যেত। হেভি ব্রেকফাস্ট করে বেরুত শরদিন্দু, লাঞ্চ কারখানাতেই সারত। ফিরত সেই রাত সাড়ে নটা—কোন কোন দিন রাত দশটা—আবার সাড়ে দশটাও বেজে যেত বাড়িতে ফিরতে।

একরাশ ফাইল নিয়ে ফিরত। বাড়ি ফিরে স্নান করে ঘরে বসত। ভৃত্য গোকুল ইতিমধ্যে টেবিলে স্কচ হুইস্কির বোতল-গ্লাস রেখে যেত, মধ্যে মধ্যে গ্লাসে চুমুক দিত শরদিন্দু আর ফাইল দেখত।

রাত এগারোটা বাজলে গোকুল এসে সামনে দাঁড়াত।–খাবার কি টেবিলে দেব?

আর একটু পরে-বলে শরদিন্দু আবার তার ফাইলে মনোসংযোগ করত। গোকুল চলে যেত।

আবার আধঘণ্টা কি পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে গোকুল এসে সামনে দাঁড়াত।

এবার খাবার দেব টেবিলে?

দিবি—আচ্ছা দে! সুকুমার খেয়েছে?

হ্যাঁ, সুকুদাদা তো কখন খেয়ে শুয়ে পড়েছে।

সুকু আজ কারখানা থেকে কখন ফিরেছিল রে গোকুল? শরদিন্দু শুধাত।

গোকুল বলত, সুকুদাদাবাবু তো সেই সন্ধ্যাবেলাতেই ফিরে এসেছে।

শরদিন্দু হাসত। বলত, সুকুটা জীবনে কোনদিন উন্নতি করতে পারবে না।

গোকুল অনেক দিন আছে ঐ বাড়িতে। হিসেব করলে খুব কম করেও পনেরো বছর তো হবেই। সেই শরদিন্দুর বাবা রজতসিন্ধুর আমল থেকে।

খেতে খেতে প্রভু ও ভৃত্যের মধ্যে কথা হত। গোকুল একসময় বলত, এবারে একটা বিয়ে কর খোকাবাবু!

বিয়ে? খেতে খেতে তাকাত শরদিন্দু ভৃত্যের মুখের দিকে।

হ্যাঁ। এ কি একটা বাড়ি—এ যেন একটা ভূতুড়ে বাড়ি। গোকুল বলত, বয়স তো চল্লিশ হতে চললকবে আর বিয়ে করবে?

তোর মতে এবারে একটা বিয়ে করা দরকার, তাই না রে গোকুল? শরদিন্দু বলত, ঠিক বলেছিস। বিয়ে সত্যিই একটা বোধ হয় করা দরকার এবার। ঠিক আছে, সামনের মাসেই বিয়ে করে ফেলব একটা তুই দেখে নিস।

কিন্তু সে সামনের মাস আর আসত না। অবশেষে সত্যিই একদিন হঠাৎ বিয়ে করে ফেলল শরদিন্দু।

ঘটনাটা আকস্মিকই বলতে হবে।

পরেশ নন্দী কারখানার অনেক দিনের পুরাতন কর্মচারী, অ্যাকউন্টস রাখতেন। ক্রনিক হাঁপানির রোগী, প্রায়ই অসুস্থ হতেন। অফিসে আসতে পারতেন না। একদিন শরদিন্দু বললে, আপনি এবার রিটায়ার করুন পরেশবাবু।

কিন্তু স্যার–

মাসে একশো টাকা করে পেনসন পাবেন, যান এখন সামনের মাস থেকে রিটায়ার করবেন।

ঐ এক ধরনের মানুষ ছিল শরদিন্দু, যা একবার বলবে তা করবেই। পরেশ নন্দী সেটা জানতেন। তাই পরেশ নন্দী বুঝতে পারেন, তাকে রিটায়ার করতেই হবে এবারে।

শরদিন্দু কথাটা বলে আবার নিজের কাজে মন দিয়েছিল—কোম্পানিতে যে নতুন সায়েন্টিস্ট এসেছেন, কমলেশ ব্যানার্জী, তিনি নতুন একটা ফরমুলা বের করেছেন বেবি ফুডের—সেই। কাগজপত্রগুলোই খুঁটিয়ে দেখছিল শরদিন্দু—তাতে মনোসংযোগ করল। পরেশ নন্দী বের হয়ে গেলেন।

দিনতিনেক পরে এক দুপুরে শরদিন্দু যখন তার অফিস কামরায় বসে গত বছরের ব্যালেন্সশীটটা দেখছে, বেয়ারা রামরূপ এসে ঘরে ঢুকল, সাব, একজন মহিলা দেখা করতে চান।

মহিলা? কি চায়?

তা তো বললেন না—কেবল বললেন আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।

বলে দে এখানে চাকরি খালি নেই। আর আমি কাউকে ভিক্ষে দিই না।

হঠাৎ এসময় সুইং ডোর ঠেলে একটি ২০/২১ বছরের তরুণী শরদিন্দুর অফিস কক্ষে প্রবেশ করে বলল, দেখুন, আমি আপনার কাছে চাকরির জন্যে আসিনি আর ভিক্ষে করতেও আসিনি।

শরদিন্দু বললে, তবে কি জন্য এসেছেন?

আপনি আমার বাবাকে হঠাৎ রিটায়ার করতে বলেছেন কেন?

আপনার বাবা–

পরেশ নন্দী—আমার বাবা। জানেন, আজ আপনি বাবাকে রিটায়ার করিয়ে দিলে আমাদের উপোস করে মরতে হবে—মা, আমি, দুটো ছোট ভাইবোন—মার চিকিৎসাটাও বন্ধ হয়ে যাবে।

শরদিন্দু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল মেয়েটির দিকে তখন। রোগা পাতলা চেহারা। গায়ের বর্ণ একটু কালোর দিকেই, কিন্তু চোখেমুখে যেন একটা অপূর্ব শ্রী ও লাবণ্য টানা টানা দুটি চোখ, নাকটি একটু চাপা হলেও মুখখানিতে যেন লাবণ্য ঢলঢল করছে। পরনে সাধারণ একটা কম দামের তাঁতের রঙিন শাড়ি। একটাল চুল এলোখোঁপা করা। দুহাতে দুগাছা ক্ষয়ে যাওয়া সোনার রুলি ছাড়া কোন অলংকার নেই।

আপনি পরেশবাবুর মেয়ে? শরদিন্দু শুধাল, কি নাম আপনার?

আমার নাম দিয়ে আপনার কি হবে? মেয়েটি বললে।

কতদূর লেখাপড়া করেছেন? আবার প্রশ্ন করল শরদিন্দু।

কেন, চাকরি দেবেন? বি. এ. পাস করেছি কিন্তু আপনার এখানে তো বললেন, চাকরি খালি নেই।

দেখুন আমি অনেক ভেবেচিন্তেই ডিসিশনটা নিয়েছি পরেশবাবুর ব্যাপারে। রিটায়ার তাকে করতেই হবে। আপনি কাল একবার পরেশবাবুকে এই সময় দেখা করতে বলবেন।

ঠিক আছে। চলি নমস্কার।

দাঁড়ান দাঁড়ান—আপনার নামটা তো বললেন না!

মানসী। বলে মানসী ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

পরের দিন পরেশ নন্দী এলেন। বস্তুত মনের মধ্যে একটা ক্ষীণ আশা নিয়েই এসেছিলেন। পরেশ নন্দী।

কোনরূপ ভণিতা না করেই শরদিন্দু বললে, কোম্পানি ডিসিশন নিয়েছে আপনাকে মাসে মাসে আড়াইশো টাকা করে পেনসন দেবে—তাতে করে আপনার সংসার চলবে না জানি কিন্তু তার বেশী কোম্পানির ক্ষমতা নেই।

যা দিচ্ছেন দয়া করে আমতা আমতা করে পরেশ নন্দী বললেন।

দয়া নয় ওটা আপনার প্রাপ্য। যে সার্ভিস গত সতেরো বছরে কোম্পানিকে আপনি দিয়েছেন, কোম্পানি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে সেটা স্মরণ করেই ঐ টাকাটা মাসে মাসে আপনাকে দেবে। কাল থেকেই আপনি রিটায়ার করবেন।

আমি তাহলে উঠি সার!

বসুন, আর একটা কথা আছে। শরদিন্দু বললে।

পরেশ নন্দী উঠে দাঁড়িয়েছিলেন আবার বসলেন চেয়ারটায়।

বলছিলাম কি, মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন না কেন?

পরেশ নন্দী কথাটা যেন ঠিক বুঝতে পারলেন না। কেমন যেন বিব্রতভাবে শরদিন্দুর দিকে তাকালেন, আজ্ঞে।

আমি বলছি আপনার মেয়ের কথা। মানসী আপনার মেয়ে, না?

হ্যাঁ আমার বড় মেয়ে, পরেশ নন্দী একটু ইতস্তত করে বললেন।

তার কথাই বলছি। শরদিন্দু বলল, মানসীর বিয়ে দিচ্ছেন না কেন?

টাকা খরচ করে মেয়ের বিয়ে দেব সে সামর্থ্য আমার কোথায় স্যার? কেউ যে দয়া করে মেয়েটিকে আমার গ্রহণ করবে, তেমন পাত্ৰই বা কোথায় পাব?

আমি যদি পাত্রের সন্ধান দিই দেবেন মেয়ের বিয়ে?

কিন্তু স্যার–

টাকাকড়ি কিছু লাগবে না। শুধু শাঁখা, সিঁদুর দিয়ে মেয়ে দেবেন। কি রাজী আছেন? শরদিন্দু বললে।

তেমন পাত্র কি পাওয়া যাবে? পরেশ নন্দী বললেন।

দেখুন পরেশবাবু, কথাটা তাহলে খুলেই বলি—আমি আজও বিয়ে করিনি জানেন তো, যদিও বয়স আমার উনচল্লিশ হল—আমি যদি আপনার ঐ মেয়েটিকে বিয়ে করতে চাই—দেবেন বিয়ে?

বিমূঢ় পরেশ নন্দীর বাক্যস্ফুর্তি হয় না, ভুল শুনছেন না তো তিনি! না কি শরদিন্দু তাঁর সঙ্গে পরিহাস করছেন গরিব বলে।

কি হল, কথা বলছেন না কেন?

আজ্ঞে আমি–

মনে হচ্ছে কথাটা আমার যেন আপনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। শুনুন, জবাব এখনই আপনার কাছ থেকে আমি চাই না বাড়ি যান, আপনার স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করুন, দু-চার দিন পরেও জবাবটা দিলে চলবে। আর হ্যাঁ, শুনুন, আপনার মেয়ের সঙ্গেও পরামর্শ করবেন। আর একটা কথা, কথাটা যেন কেউ না জানতে পারে।

পরেশ নন্দীর চোখে জল এসে যায়। তিনি বললেন, না স্যার, নিশ্চিন্ত থাকুন, কেউ জানতে পারবে না। আ—আমি তাহলে এখন আসি স্যার!

আসুন।

পরেশ নন্দী ছেড়া তালিমারা ছাতাটা তুলে নিয়ে বের হয়ে গেলেন।

পরের দিন দ্বিপ্রহরে শরদিন্দু তার অফিস কামরাতেই লাঞ্চ সেরে একটা আরামকেদারায় ঠেস দিয়ে পাইপ টানছেন, দরজার বাইরে নারীকণ্ঠস্বর শোনা গেল, ভেতরে আসতে পারি?

কে? বিরক্তিতে শরদিন্দুর দুটো কুঞ্চিত হয়ে ওঠে। এ সময়টা তার অফিস কামরায়। কারও আসার কথা নয়—বেয়ারাকে স্ট্রি অর্ডার দেওয়া আছে।

জবাব না নিয়ে মানসী এসে ঘরে ঢুকল, বলল, আমি মানসী!

মানসীর পরনে আজও একটা সস্তা দামের শাড়ি, পায়ে চপ্পল।

আপনি আমার বাবার কাছে যে কথা বলেছেন তা আমি শুনেছি—

শুনেছ? তা দাঁড়িয়ে রইলে কেন মানসী, বোসো–শরদিন্দু বলল।

না, বসতে আমি আসিনি, কেবল একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে এসেছি—আপনি কি আমার গরিব বাপকে দয়া করছেন?

দয়া! তুমি কি আমার সঙ্গে ঝগড়া করতে এসেছ মানসী?

না। আমি জানতে এসেছি ওটা দয়া নয় তো কি!

না, সত্যিই আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।

কিন্তু কেন, জানতে পারি কি? আপনি তো একদিন মাত্র কিছুক্ষণের জন্য আমাকে দেখেছেন, আমার সম্পর্কে কিছুই জানেন না। সেক্ষেত্রে হঠাৎ–

তোমার সম্পর্কে কিছু জানার দরকার আছে বলে আমি মনে করি না।

কিন্তু আমি মনে করি আমার সম্পর্কে আপনার জানার প্রয়োজন আছে।

তা যদি বল তাহলে আমিও তো এতদিন ব্যাচিলর হয়ে আছি, আমার সম্পর্কেও তো তোমার জানা প্রয়োজন। শোন, প্রথম পরিচয়েই তোমাকে আমার ভাল লেগেছে, তাই–

তাই বিয়ে করছেন আমাকে?

অবিশ্যি তোমার যদি আপত্তি না থাকে, প্রায় চল্লিশ বছরের একজনকে—

মানসী আর কোন কথা বলতে পারে না।

মানসী, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?

কি?

তুমি কি কাউকে ভালোবাস?

যদি বাসিই তাহলে নিশ্চয়ই বিবাহের ইচ্ছেটা আপনার আর থাকবে না?

না না, তা কেন, আমি যখন একবার স্থির করেছি তোমায় বিবাহ করব, অবশ্য তোমার আপত্তি থাকলে আবারও বলছি, এ বিয়ে হবে না।

মানসী আবার চুপ।

মানসী, চুপ করে থেকো না। যা বলবার বল। কোন সংকোচ কোরো না।

বাবার কাছে আপনি ব্যাপারটা বলেছেন, বাবার কাছ থেকেই জবাবটা পাবেন। নমস্কার— কথাগুলো বলে মানসী ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

দিন পনেরো পর অতঃপর সব ব্যবস্থা হয়ে গেল গোপনে গোপনে।

শরদিন্দু কাউকে ব্যাপারটা জানতে দেয়নি, এমন কি সুকুমারকেও নয়?

বিবাহের দিনতিনেক আগে অফিসে বেরুবার আগে শরদিন্দু সুকুমারকে তার ঘরে ডেকে। পাঠিয়ে কথাটা বললেন।

সুকু, একটা কথা তোকে এখনও জানাইনি, মনে বলা হয়নি। আমি বিয়ে করছি—

সত্যি! সত্যি তুমি বিয়ে করছ দাদা! সুকুমার সত্যিই উৎফুল্ল হয়ে ওঠে।

নিশ্চয়ই তুই সুখী হয়েছিস্?

সুখী মানে, কথাটা যদি সত্য হয় তো আনন্দের আমার সীমা থাকবে না!

কথাটা সত্যি সুকুমার, কিন্তু কই, জিজ্ঞাসা করলি না তো কোথাকার মেয়ে–কার মেয়ে –কেমন মেয়ে

তুমি বিয়ে করছ সেটাই বড় কথা, তুমি কি না জেনেশুনে বিয়ে করছ?

মেয়েটি কে জানিস? পরেশ নন্দী—যিনি আমাদের অ্যাকাউনটেন্ট ছিলেন এবং কিছুদিন হল রিটায়ার করেছেন—তারই মেয়ে, নাম মানসী।

সুকুমার যেন হঠাৎ একেবার চুপ। একেবারে যেন বোবা হয়ে গিয়েছিল।

কি হল, তোর মনঃপূত হল না নাকি?

অ্যাঁ–না না—কেন হবে না—ম্লান হাসি হাসল সুকুমার, খবরটা সত্যিই সুখের আনন্দের। কিন্তু বিয়েটা কবে?

কবে কি রে, পরশু বাদে তরশুই তো!

মানে সামনের বৃহস্পতিবারে? কিন্তু কিছুই তো যোগাড়যন্ত্র নেই–

সে তোকে ভাবতে হবে না। সব ব্যবস্থাই করা হয়ে গিয়েছে।

ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে। কি বলছ তুমি?

হ্যাঁ, সাত নম্বর বাড়িটা ভাড়া নিয়েছি, আর ডেকরেটার ক্যাটারার সবাইকে অর্ডার দেওয়া হয়েছে তো কবেই। আসলে কি জানিস সুকু, আমার যেন কেমন একটা লজ্জা করছে, তাছাড়া এই বুড়ো বয়সে বিয়ে করছি

তা হোক—খুব ধুমধাম করতে হবে কিন্তু–

রে না, ওসব হাঙ্গামায় কাজ নেই।

শোন দাদা, বিয়ে বলে কথা! ও একবারই হয়, আমি যা করার করব।

সত্যি সুকুমার যেন কোমর বেঁধে লেগে গেল। দুদিনের মধ্যে বাড়িটা আলো দিয়ে সাজিয়ে ফেলল, নহবৎ বসাল—সে এক যেন এলাহি ব্যাপার।

ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল।

কিন্তু বৌভাতের দিন সকাল থেকে সুকুমারের আর পাত্তা নেই। কোথায় গেল সুকুমার–শরদিন্দু ডেকে ডেকে সুকুমারের সাড়া পায় না।

গোকুল ছোট দাদাবাবু কোথায় রে? শরদিন্দু শুধায়।

কেন, একটু আগে তো দেখেছিলাম, ওপরে তার ঘরে। গোকুল বললে।

দেখ তো কোথায়!

কিন্তু গোকুল কোথাও সন্ধান পেল না সুকুমারের।

তখন অনেক রাত। শেষ ব্যাচ খেতে বসেছে। সানাই বাজছে। মানসী বসেছিল ঘরে। ঐ ঘরেই ফুলশয্যা হবে। ফুলে ফুলে ঘরটা যেন ভরে গিয়েছে। ঘরের মধ্যে দ্বিতীয় কোন প্রাণী ছিল না। শরদিন্দু নীচে যেখানে সবাই খেতে বসেছে সেখানে তদারকি করছে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে–

মানসী–

চমকে দরজার দিকে তাকাল মানসী। সুকুমার, তুমি? মানসী বললে।

সুকুমার মৃদু হাসল। খুব অবাক হয়ে গিয়েছ, তাই না?

কিন্তু তুমি এখানে! মানসী বললে।

আমি তো এই বাড়িতেই থাকি। শরদিন্দুদা আমার বড় পিসিমার একমাত্র ছেলে।

সুকুমার—

শোন, একটা কথা বলতে এসেছিলাম—

মানসী চুপ করে থাকে।

আমাদের যে পরস্পরের পরিচয় ছিল তোমাদের বিয়ের আগে, কথাটা যেন শরদিন্দুদা কোন দিন না জানতে পারে। সুকুমার বললে।

কেন? কথাটা বলে তাকাল মানসী সুকুমারের মুখের দিকে।

আমার মনে হয় না জানাই ভাল। তবে এই কথাটা যদি তুমি আমাকে আগে জানাতে, আমি কিন্তু খুশিই হতাম মানসী! সাত দিন আগেও তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল ইডেন গার্ডেনে। তখন তো সবই ঠিক হয়ে গিয়েছিল, তখন তো বললে না কিছু!

মানসী তখনও চুপ করে থাকে।

ভালই করেছ মানসী, আমি তো পর-ভৃত্য, এত ঐশ্বর্য তো তোমাকে আমি দিতে পারতাম। সত্যি তোমাকে কিন্তু চমৎকার মানিয়েছে মানসী এখানে এই ঐশ্বর্যের মধ্যে!

মানসী বলতে পারত, তিন বছর তোমার জন্য অপেক্ষা করেছিলাম সুকুমার, যখনই আমাদের পরস্পরের দেখা হয়েছে, ভেবেছি তুমি বলবে বিয়ের কথাটা, কিন্তু তুমি বলনি। অপেক্ষা করে করে আমি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু সে সব কিছুই বলল না মানসী।

সুকুমার—মৃদু গলায় ডাকল মানসী, বিয়েটা কিন্তু আমার ইচ্ছায় ঘটেনি, তাছাড়া—

তোমার ইচ্ছায় ঘটেনি! সুকুমার হাসল।

বাবার অনুরোধ আমি ঠেলতে পারলাম না সুকুমার। বলতে পার ঠেলা আমার পক্ষে সম্ভবও ছিল না।

পারনি বুঝি! আবার সুকুমার হাসল।

না। কিন্তু কাল রাত্রে এ বাড়িতে এসেছি আমি, এর মধ্যে কি একবারও সময় পাওনি তুমি আমার সঙ্গে দেখা করার?

পাব না কেন, কিন্তু তোমাকে আমি বিব্রত করতে চাইনি।

তুমি তাহলে এই বাড়িতেই থাক সুকুমার?

একটু আগে তো বললাম, তবে তোমার যদি কোন রকম অসুবিধা হয় আমি এ বাড়িতে থাকলে—

না না, আমার অসুবিধা হবে কেন?

না, তাই বলছি, অসুবিধা হলে কিন্তু কথাটা বলতে কোন দ্বিধা কোরো না। আমি চলে যাব। আচ্ছা চলি বৌদি-মানসী বলে নয়, সেই প্রথম সুকুমার ওকে বৌদি বলে সম্বোধন করল।

হঠাৎ ঐ সময় দপ করে সারাবাড়ি অন্ধকার হয়ে গেল। ঘন অন্ধকার গ্রাস করল বাড়িটা। উৎকণ্ঠিত গলায় মানসী বললে, এ কি! আলো—

বোধ হয় ফিউজ হয়েছে, ভয় পেয়ো না, আমি দেখছি—

অন্ধকার ঘর থেকে বের হয়েই সুকুমার কার সঙ্গে যেন ধাক্কা খায়।

কে—কে! শরদিন্দুর গলা।

সুকুমার ঐ মুহূর্তে শরদিন্দুর গলা শুনে থমকে যায়, তারপর সাড়া না দিয়ে অন্ধকারে দ্রুত পাশ কাটিয়ে সিঁড়ির দিকে চলে যায়।

শরদিন্দুর গলা শোনা গেল আবার, সুকু—সুকু নাকি রে!

সুকুমার সাড়া না দিয়ে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে যায়।

পরে অনেকবার ভেবেছে সুকুমার, সেদিন কেন সাড়া দিল না শরদিন্দুর ডাকে সে! অথচ সুকুমার সেদিন ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি আলো নিভে যাওয়ার পূর্বমুহূর্তে ঐ ঘরের একেবারে, দরজার গোড়াতেই দাঁড়িয়েছিল শরদিন্দু এবং সুকুমারের শেষ কথাগুলো কানে গিয়েছিল তার।

আলো জ্বলতে সেরাত্রে আরও আধ ঘণ্টাসময় লেগেছিল। সুকুমারই ছুটোছুটি করে মিস্ত্রী ডেকে আবার বাড়ির আলো জ্বালিয়েছিল।

নিমন্ত্রিতদের প্রায় সকলেরই খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। আলোটা নিভেছিল ঠিক নিমন্ত্রিতরা আহার শেষ করে যখন উঠে পড়েছে, কিন্তু তারা তখনও বিদায় নেয়নি। আলো জ্বেলে ওঠবার পর একে একে তারা বিদায় নেয়।

শরদিন্দু ইতিমধ্যে আবার ওপর থেকে নীচে প্যাণ্ডেলে চলে এসেছিল। শরদিন্দু সুকুমারকে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শুধাল, কোথায় ছিলি রে সুকু?

কেন—আমি তো যেখানে ক্যাটারাররা প্লেট সাজাচ্ছিল সেখানেই ছিলাম।

গোকুল এত খুঁজল কিন্তু তোকে কোথাও দেখতে পেল না তো!

কই! আমি তো কিছু জানি না!

খেয়েছিস?

না, শরদিন্দুদা আমি আজ আর কিছু খাব না।

খাবি না কি রে?

হ্যাঁ। অনেক রাত হয়ে গিয়েছে তাছাড়া শরীরটাও ভাল নেই।

তা তো হবেই, তিন দিন ধরে যে খাটাখাটনি যাচ্ছে, চল, যা পারবি খাবি।

সুকুমারের কোন আপত্তিই শুনল না শরদিন্দু, তাকে নিয়ে দোতলাতে ডাইনিং রুমে গেল। মানসীকে ডেকে নিয়ে এল শরদিন্দু।

তিনজনে খেতে বসল, মাঝখানে মানসী, দুপাশে সুকুমার আর শরদিন্দু। সুকুমার কিছুই খাচ্ছে না। খাবার নিয়ে নাড়াচাড়া করছে ব্যাপারটা শরদিন্দুর দৃষ্টি এড়ায় না। শরদিন্দু বললে, কি রে, তুই যে কিছুই খাচ্ছিস না!

সেই—সেই রাতেই প্রথম সুকুমার শরদিন্দুর দু চোখের দৃষ্টিতে যেন একটা কুটিল সন্দেহের ছায়া দেখতে পেয়েছিল, এবং তার পর যে দেড়টা বছর মানসী বেঁচে ছিল সুকুমার দেখেছে শরদিন্দুর চোখের দৃষ্টিতে একটা সন্দেহ।

অস্বস্তি বোধ করেছে সুকুমার, মনে মনে ভেবেছে ঐ বাড়ি ছেড়ে সে চলে যাবে। কিন্তু পারেনি। একটা অদৃশ্য নাগপাশের বন্ধনে যেন সে বাঁধা পড়েছিল, সে বন্ধনকে ছিড়ে সে কিছুতেই চলে যেতে পারছিল না।

আশ্চর্য একটা পরিবর্তন যেন লক্ষ্য করছিল সুকুমার শরদিন্দুর চরিত্রে। যে মানুষটা কারখানা আর ব্যবসা নিয়ে সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকত, বাড়িতে আসার কোন নির্দিষ্ট সময় ছিল না—সেই মানুষটাই কিছুতেই যেন আর বাড়ি থেকে বের হতে চায় না। কারখানায় গেলেও ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই চলে আসে। সর্বক্ষণ সে মানসীর চারপাশে ঘুরঘুর করে যেন।

মানসী বলে, কারখানায় অফিসে যাবে না?

তোমাকে খুব বিরক্ত করছি, তাই না মানসী? শরদিন্দু বলে—

বিরক্ত—কেন বিরক্ত কেন, তা নয়—লোকে তোমাকে স্ত্রৈণ বলবে!

বলে বলুক। এক কাজ করবে মানসী–তুমিও আমার সঙ্গে অফিসে কারখানায় চল না! ওমা, সে কি!

কেন, ক্ষতি কি? সর্বক্ষণ তোমাকে পাশে পাশে দেখতে পাব?

না, ছি! বিপরীত হয়েছিল কিন্তু সুকুমারের বেলায়। অনেকদিন সকালে সে ব্রেকফাস্ট না করেই কারখানায় চলে যেত, ফিরত সেই রাত দশটা-এগারোটা! সুকুমারকে যেন বাড়িতে দেখাই যেত না।

শরদিন্দুই একদিন সুকুমারকে ব্রেকফাস্ট-টেবিলে বললে, কি রে সুকু, তুই দেখছি হঠাৎ ভীষণ কাজের মানুষ হয়ে গেলি, আগে তো কারখানায় দু-এক ঘণ্টার বেশি থাকতিস না!

সুকুমার আড়চোখে একবার তাকায় শরদিন্দুর দিকে শরদিন্দুর দু-চোখে সেই কুটিল সন্দেহ। সে সন্দেহ যেন আরও প্রখর আরও স্পষ্ট।

কোনমতে চায়ের কাপে চুমুক দিয়েই সুকুমার টেবিল থেকে উঠে পড়ে।

সুকুমার পারতপক্ষে মানসীর সামনেই যেত না। অফিস থেকে ফিরে সে সোজা নিঃশব্দে তিনতলায় নিজের ঘরে চলে যেত।

শরদিন্দুর বিবাহের আগে সুকুমার দোতলাতেই থাকত, বিয়ের পরেই সুকুমার তিনতলার ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল। একমাত্র ব্রেকফাস্টের সময় ছাড়া সুকুমার আর কখনও খাবার ঘরে আসত না। তাও নিয়মিত নয়। লাঞ্চ সে দুপুরে অফিসেই করে নিত, রাত্রের আহার গোকুল তিনতলায় তার ঘরে এনে ঢাকা দিয়ে রাখত!

মধ্যে মধ্যে শরদিন্দুকে ব্যবসার ব্যাপারে বোম্বাই দিল্লী করতে হত। বিবাহের পর শরদিন্দু বোম্বাই দিল্লী যাওয়া কমিয়ে দিয়েছিল এবং যখনই যেত মানসীকে সঙ্গে নিয়েই যেত। ওরা যখন থাকত না তখন কিন্তু সুকুমার রাত সাড়ে আটটানটার মধ্যেই বাড়ি ফিরে আসত।

পুরী যাবার দিন কুড়ি আগে হঠাৎ একটা ব্যবসা-সংক্রান্ত জরুরি কাজে শরদিন্দুকে দিল্লী যেতে হল এক দিনের জন্য এবং আশ্চর্য, শরদিন্দু একাই গেল।

শরদিন্দু দিল্লী গিয়েছে জানত সুকুমার কিন্তু জানত না শরদিন্দু একা গিয়েছে। সেরাত্রে কারখানা থেকে ফিরে সুকুমার বহুকাল পরে তার বেহালাটা ঝাড়পোছ করে বাজাতে বসে। কতক্ষণ বাজিয়েছে মনে নেই, হঠাৎ একসময় চমকে ওঠে সুকুমার—দোরগাড়ায় দাঁড়িয়ে মানসী।

তুমি যে এমন চমৎকার বেহালা বাজাও, জানতাম না তো! মানসী বলল।

তুমি শরদিন্দুদার সঙ্গে দিল্লী যাওনি?

যাইনি যে তা তো দেখতেই পাচ্ছ। কিন্তু থামলে কেন, বাজাও না বলতে বলতে মানসী ঘরের মধ্যে এসে প্রবেশ করল।

মানসী, তুমি যাও–সুকুমার হঠাৎ বলল।

না, আমি যাব না।

মানসী, কেন তুমি বুঝতে পার না—

আজ সারাটা রাত তোমার বেহালা বাজান শুনব। বাজাও—মানসী এগিয়ে গিয়ে খাটের ওপর বসল।

মানসী, তুমি কি সত্যিই কিছু বুঝতে পার না—শরদিন্দুদা চায় না, তুমি আমার সঙ্গে কথা বল!

জানি। মানসী হাসতে হাসতে বলে, ভুলে যাও কেন আমি মেয়েমানুষ! আর তুমিই বা এত ভীতু কেন?

একটা কথার জবাব দেবে মানসী, তুমি কি শরদিন্দুদাকে আমাদের পূর্ব পরিচয়ের কথা বলেছ?

মানসী হাসতে হাসতে বলে, তোমার কি মনে হয়?

সুকুমার মানসীর মুখের দিকে তাকায়। মানসীকে সে যেন ঠিক ঐ মুহূর্তে চিনতে পারে না। যে মানসীর সঙ্গে তার পরিচয় প্রায় তিন বছরেরও বেশী, এ যেন সেই মানসী নয়।

মানসী বলে, অমন করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কি দেখছ সুকুমার?

না, কিছু না। সুকুমার শান্ত গলায় বললে। অমন ভয়ে ভয়ে হাত বাড়ালে কি কিছু পাওয়া যায়? যায় না। তুমি মনে মনে যতই আমাকে দোষী ভাব না কেন, ভাল করে নিজের মনে যাচাই করে দেখ, তা হলেই বুঝবে আমার দিক থেকে যদি কোন দোষ থেকেও থাকে, তার কারণও তোমার ঐ ভীরুতা।

ঠিক ঐ সময় বাড়ির সামনে একটা গাড়ি থামার শব্দ শোনা গেল। সুকুমার বললে, এত রাত্রে আবার কে এল? কথাটা বলে সুকুমার উঠে গিয়ে তিনতলার খোলা জানালাপথে নীচে উঁকি দিল। বাড়ির গেটের সামনে একটা ট্যাক্সি এসে থেমেছে, আর ট্যাক্সি থেকে নামছে শরদিন্দু। সুকুমার তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে বললে, বৌদি, দাদা ফিরেছে!

সে কি! তার তত আগামী কাল ইভনিং ফ্লাইটে ফিরবার কথা দিল্লী থেকে।

যাও-নীচে যাও বৌদি।

অত ব্যস্ত হচ্ছ কেন, তোমার দাদা আসুক না।

তুমি যদি না যাও তো আমাকেই এ ঘর ছেড়ে যেতে হবে বৌদি!

কি তখন থেকে বৌদি-বৌদি করছ। আমার নামটাও ভুলে গিয়েছ নাকি সুকুমার?

আঃ, কেন দেরি করছ! দাদার চোখে তুমি কি সর্বনাশের আগুন দেখতে পাওনি? সুকুমার বললে।

এক শর্তে আমি যেতে পারি সুকুমার, যদি তুমি কথা দাও যে তুমি আগের মত আমার সঙ্গে মিশবে! মানসী বলে ডাকবে!

সুকুমার দরজার দিকে এগিয়ে যায়। বলে, দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়াও, আমাকে যেতে দাও।

মেয়েমানুষ জীবনে একবারই ভালোবাসতে পারে সুকুমার!

সিঁড়িতে ঐ সময় জুতোর শব্দ পাওয়া গেল। মানসী ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

দোতলা ও তিনতলার মাঝামাঝি সিঁড়িতে পৌছাতেই শরদিন্দুর সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। মানসীর। মানসী দাঁড়াল না, সিঁড়ির ধার অতিক্রম করতে করতে বললে, এ সময় কিসে ফিরলে?

প্লেনটা তিন ঘণ্টা লেটে ছেড়েছিল যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য তুমি এখনও ঘুমোওনি? শরদিন্দু বললে।

না, সুকুমার ঠাকুরপোর সঙ্গে গল্প করছিলাম। কথাগুলো বলে মানসী আবার সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল।

সুকুমার আড়াল থেকে লক্ষ্য করল, শরদিন্দু আর মানসী তাদের ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। সুকুমার যেমন দরজার আড়ালে দাঁড়িয়েছিল তেমনি ভাবেই আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

পরের দিন সকালে নীচে নেমে ডাইনিং-হলে ঢুকে সুকুমার দেখল, একাকী এক কাপ চা নিয়ে বসে আছে শরদিন্দু। তার চোখমুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, বাকি রাতটুকু সে ঘুমোয়নি।

সুকুমার নিঃশব্দে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। শরদিন্দু একবার তাকাল সুকুমারের মুখের দিকে, তারপর আবার দৃষ্টি নামিয়ে নিল।

গোকুল এসে ঘরে ঢুকল, ছোট দাদাবাবু, চা দেবো?

বৌদি কোথায় গোকুল, তাকে যে দেখছি না?

বৌদিমণি তো এখনও স্নানের ঘর থেকে বেরোয়নি।

সুকুমার–শরদিন্দু ডাকল।

কিছু বলছ দাদা?

মণির শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। তাই ভাবছি ওকে নিয়ে কটা দিন কোথাও বাইরে থেকে ঘুরে আসব!

বেশ তো, যাও না, কবে যাবে?

দু-একদিনের মধ্যেই বের হয়ে পড়ব ভাবছি-শরদিন্দু বলল।

কোথায় যাবে কিছু স্থির করেছ?

ওয়ালটেয়ার বা পুরী—

স্নান-শেষে প্রসাধন সেরে ঐ সময় ঘরে ঢুকল মানসী। পরনে তার একটা হালকা আকাশনীল রঙের বুটি দেওয়া জামদানী ঢাকাই শাড়ি। ভিজে ভিজে চুলের রাশ পিঠের ওপর ছড়ানো। গা থেকে দামী সাবানের মৃদু গন্ধ ছড়াচ্ছে।

মানসী হাসতে হাসতে বলল, দেখ সুকুমার, আমি অনেক ভেবে দেখলাম, না বাপু, তোমাকে আমি সেকালের মত ঠাকুরপো-ঠাকুরপো বলে ডাকতে পারব না, তোমাকে আমি সুকুমার বলেই ডাকব-কি বল তুমি? কথাটা শেষ করে মানসী শরদিন্দুর মুখের দিকে তাকাল।

শরদিন্দু বলল, বেশ তো, তাই ডেকো।

ও কি, এখনও তুমি চায়ের কাপ সামনে নিয়ে বসে আছ? কখন চা দিয়ে গিয়েছি আমি তোমায়।

স্ত্রীর কথায় শরদিন্দু চায়ের কাপটা টেনে নিতে যেতেই মানসী বাধা দিল, থাক, ও চা আর খেতে হবে না—আমি আবার চা তৈরি করে দিচ্ছি।

গোকুল ঐ সময় ট্রেতে করে টি-পট, মিল্ক-পট ও চিনির পাত্রে চিনি নিয়ে ঘরে ঢুকল।

তোমার বাবুর অমলেট ভেজেছ?

হ্যাঁ।

হঠাৎ শরদিন্দু ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল, তোমরা চা খাও মণি, আমি একটা জরুরি ট্রাংক কল বুক করেছি ঘণ্টাখানেক আগে, দেখি সেটা দেরি হচ্ছে কেন।

শরদিন্দু দাঁড়াল না। ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

সুকুমার বোবা হয়ে বসে থাকে।

কি ব্যাপার সুকুমার—সুকুমার বলে ডাকব বলায় কি রাগ করলে নাকি?

সুকুমার কোন জবাব দেয় না।

কাপে চা ঢেলে চিনি মিশিয়ে দুধের কাপটা এগিয়ে দিতে দিতে সুকুমারের দিকে চেয়ে মানসী বলল, কি হল, অত গম্ভীর কেন?

মানসী, আমি ভাবছি মেসে চলে যাব।

ওমা, সে কি! মেসে কেন যাবে?

তুমি যখন কিছুই বুঝতে চাও না, বোঝবার ইচ্ছেও নেই—

দূরে সরে গেলেই কি আমাকে ভুলতে পারবে সুকুমার?

মানসী, তুমি কি এতটুকু সিরিয়াস হতে পার না!

বিশ্বাস কর সুকুমার, আমার মত সিরিয়াস কম মেয়েই পাবে। তারপর কিছুক্ষণ থেমে বললে, আমিও তো মানুষ সুকুমার। আমারও তো মন বলে একটা পদার্থ আছে!

সুকুমারের মনে হল শেষের দিকে মানসীর গলাটা যেন ধরে এল।

মানসী তাকাল সুকুমারের দিকে। তার দুই চোখে জল টলটল করছে।

আমার বোধ হয় এখান থেকে চলে যাওয়াই ভাল–

আমার শেষ কথা শোন সুকুমার, তুমি যদি এখান থেকে চলে যাও—আমি জেনো ঠিক সুইসাইড করব।

ঐ সময় শরদিন্দু ঘরে এসে ঢুকল।

মানসী, আমরা কালই পুরী রওনা হচ্ছি! শরদিন্দু বললে, সমুদ্র তো তুমি কখনও দেখনি!

দেখেছি।

দেখেছ–? কবে?

কবে কি—অনেকবার আমি সমুদ্র দেখেছি—উত্তাল সেই ঢেউয়ের মধ্যে কত দিন মনের আনন্দে ভেসে বেড়িয়েছি। ঢেউয়ের মাথায় দোদুল দোলায় দুলেছি, মানসী বলে, সমুদ্র আমার অনেক দিনের স্বপ্নের সমুদ্র সমুদ্রের সেই অতল জলের তলায় যেন হারিয়ে গিয়েছি আমি

শরদিন্দু গম্ভীর হয়ে এবারে বললে, ঠিক আছে! এবারে আর স্বপ্ন নয়, তুমি সত্যি সত্যি সমুদ্র দেখবে।

ঐদিনই সন্ধ্যার পর সুকুমারের সেদিন শরীরটা খারাপ। কোথাও বের হয়নি, নিজের ঘরে একটা আরামকেদারায় বসে একটা ইংরেজী বই পড়ছিল। মানসী এসে ঘরে ঢুকল। মানসীর পরনে একটা রক্তলাল তাঁতের শাড়ি। সোনালী জরির চওড়া পাড়। হঠাৎ দেখলে মনে হয় যেন মানসীর সর্বাঙ্গে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। অবাক হয়ে সেদিকে চেয়ে থাকে সুকুমার।

কি দেখছ সুকুমার-মানসী বললে!

দাদা কোথায়? বাড়ীতে নেই?

না। শুনলাম এখনও রিজার্ভেশন পাননি! তাই ছোটাছুটি করছেন। বলছিলেন রিজার্ভেশন পেলে গাড়িতেই পুরী যাবেন-গাড়িতেই যদি যাওয়া হয় তো তুমিও চল না।

না।

জান সুকুমার, আমার মন যেন বলছে, তোমার সঙ্গে জীবনে আর আমার দেখা হবে না, আর তুমিও তো তাই চাও—তাই না?

হঠাৎ ঐ কথা তোমার মনে হল কেন মানসী? সুকুমার বললে।

আবার বড় কষ্ট সুকুমার–

কি হয়েছে মানসী? সুকুমার বললে।

তুমি তো জান—আমি অনেক দিন থেকে ডাইরি রাখি। যেদিন আমি থাকব না সেদিন আমার ডাইরিটা তুমি পড়ে দেখ।

নীচে থেকে ঐ সময় শরদিন্দুর গলা শোনা গেল—গোকুল!

শরদিন্দুর গলা শুনেই মানসী বলল, চলি–

তোমার ডাইরিটার কথা কি বলছিলে?

পরে বলব। মানসী আর দাঁড়াল না। ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

মানসীর সঙ্গে ঐ শেষ দেখা সুকুমারের। পরের দিনই পুরী এক্সপ্রেসে মানসীকে নিয়ে শরদিন্দু চলে যায়। শরদিন্দু ফিরে এল কিন্তু তার সঙ্গে মানসী ফিরে এল না।

যেদিন শরদিন্দু এসে মানসীর মৃত্যুসংবাদটা সুকুমারকে দিল, সুকুমার প্রথমটায় সত্যিই চমকে উঠেছিল। মানসী পুরীর সমুদ্রে সাঁতার কাটতে গিয়ে তলিয়ে গিয়েছে।

মানসী যে কেবল ভাল সাঁতারই জানত তাই নয়—কলেজে পড়ার সময় সাঁতারে সে বিশেষ পারদর্শিনী ছিল। শরদিন্দুর সেকথা জানবার কথা নয়, কিন্তু সুকুমার জানত। তাই কথাটা শুনে কয়েকটা মুহূর্ত শরদিন্দুর মুখের দিকে কেমন যেন একপ্রকার বিস্ময়েই তাকিয়ে ছিল সুকুমার।

কিন্তু শরদিন্দুর তখনকার চেহারা ও চোখের অসহায় দৃষ্টি—যে দৃষ্টির মধ্যে ছিল সর্বস্ব হারানোর এক ব্যথা—সেটাও সে অবিশ্বাস করতে পারেনি।

কটা দিন শরদিন্দু কোথাও বেরুল না। সর্বক্ষণ বাড়িতেই থাকে।

শেষটায় সুকুমারই বলেছিল, যা হয়ে গিয়েছে তার তো আর কোন চারা নেই। শরদিন্দুদা—তুমি বরং দিনকতক কোথাও গিয়ে ঘুরে এস শরদিন্দুদা।

আচ্ছা সুকুমার, মানসীকে তুই অনেক দিন থেকেই চিনতিস, তাই না?

সুকুমার কথাটা শুনে চমকে ওঠে। কি বলতে চায় শরদিন্দু!

কি রে, আমার কথার জবাব দিচ্ছিস না কেন? জানতিস ওকে অনেক দিন থেকেই, তাই না?

চিনতাম।

তা সেকথা আমাকে বলিসনি কেন? তাহলে তো এত বড় ভুলটা করতাম না আমি!

না, তুমি ভুল করছ। তুমি বিশ্বাস করতে পার আমরা পরস্পরকে বিবাহ করব এমন কোন কথা কখনও আমাদের মধ্যে হয়নি। এখন বুঝতে পারছি, একটা ভুলের মধ্যে পড়ে তুমি নিজেও। দুঃখ পেয়েছমানসীকেও দুঃখ দিয়েছ। তবে ভুল আমিও করেছি, তোমার ঐ ধারণার কথা জানা সত্ত্বেও এ বাড়ি ছেড়ে আমার না চলে যাওয়াটা—অনেক দিন আগেই আমার এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত ছিল—আমি কালই চলে যাব।

না না, সুকুমার, তুই চলে যাস না, মানসীকে হারানোর ব্যথাটা সহ্য হলেও তোকে হারানোর ব্যথাটা আমি সহ্য করতে পারব না। কিন্তু শরদিন্দুদা, তুমি বুঝছ না—

বুঝছি—ও চিন্তা মনেও স্থান দিস না, আমার আরও কেন দুঃখ হয়েছে জানিস, মানসী প্রেগনেন্ট ছিল!

শরদিন্দুদা?

হ্যাঁ, চার মাস অন্তঃসত্ত্বা ছিল মানসী, এই কথাটা কোনমতেই আমি ভুলতে পারছি না— সে-ই কেবল চলে যায়নি, সেই সঙ্গে আমার ভবিষ্যৎ বংশধরের সমস্ত সম্ভাবনাটুকুও সে শেষ করে দিয়ে গিয়েছে। মানসীর কথাটা হয়তো আমি ভুলে যাব একদিন, কিন্তু কখনও বোধ হয়। জীবনে ভুলতে পারব না আমার সেই অনাগত সন্তানের কথা।

সুকুমার নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে শরদিন্দুর মুখের দিকে। সত্যিই সে যেন কোন সান্ত্বনার ভাষাই খুঁজে পায় না।

সুকুমারের শেষ পর্যন্ত ঐ বাড়ি আর ছাড়া হল না। শরদিন্দুর কথাটা সে ফেলতে পারল। কিন্তু বাড়িটা যেন অতঃপর সত্যি সত্যিই একটা ভূতুড়ে বাড়ি হয়ে উঠল—কোন সাড়া নেই, শব্দ নেই, নিঃশব্দে সবাই চলাফেরা করে।

মানসী ঐ বাড়িতে এসে অবধি হাসিগানে যেন বাড়িটাকে ভরিয়ে রাখত সর্বদা, এখন যেন সমস্ত বাড়িটাতে শ্মশানের স্তব্ধতা।

কেবল মাঝে মাঝে অনেক রাত্রে শোনা যায় একটা বেদনার সুর। সুর তো নয় যেন কান্না। যেন গুমরে গুমরে কে কাঁদছে।

শরদিন্দু কদাচিৎ কখনও কারখানায় যায়, কিন্তু গেলেও বেশীক্ষণ থাকে না। শোনা যায় সে নাকি তার গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করে বের হয়ে যায়। আর প্রায়ই ৮/১০ দিনের জন্য যেন কোথায় চলে যায়। সুকুমারকেই অগত্যা কারখানাটা দেখতে হয়।

এমনি করেই দিন কাটছিল। তারপরই বৎসরখানেক পরে শরদিন্দু যেমন হঠাৎ হঠাৎ চলে যায় তেমনিই চলে গিয়েছিল, প্রায় দেড় মাস বাদে এল ঐ টেলিগ্রামটা। শরদিন্দু তার নবপরিণীতা বধূকে নিয়ে কোন্ ট্রেনে কখন আসবে কিছুই জানে না সুকুমার, স্টেশনে তাই গাড়ি পাঠাতেও পারে না। তবে সুকুমার সেদিনটা আর বাড়ি থেকে বেরই হল না।

সন্ধ্যার ঘোর নেমেছে তখন চারিদিকে। শীতের সন্ধ্যা, কলকাতা শহরের সেই বিশ্রী ধোঁয়াটা জমাট বেঁধে উঠেছে চারিদিকে। শীতটাও কয়দিন থেকে বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। একটা ট্যাক্সি এসে থামল বাড়ির সামনে।

ট্যাক্সিটা থামার শব্দে গোকুলই গেটটায় ছুটে যায়। দরজা খুলতেই ওর চোখে পড়ল শরদিন্দু ট্যাক্সি থেকে নেমেছে—তার পশ্চাতে এক নারী। গেটের সামনের আলোটা জ্বেলে দিয়েছিল। গোকুল। সেই আলোতেই দেখল পরনে তার দামী শাড়ি, মাথায় ঘোমটা নেই। বব করা চুলগুচ্ছে গুচ্ছে কাঁধের ওপর ঝুলছে। সরু বগলকাটা ব্লাউজ হাতে একটা কালো রংয়ের দামী হ্যান্ডব্যাগ, পায়ে হিলতোলা জুতো। গোকুল কি করবে বুঝতে পারে না। থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

ইতিমধ্যে সুকুমারও তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, সেও দেখছিল নারী মূর্তিটিকে—চোখমুখ তীক্ষ্ণ, গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যাম।

এই যে সুকুমার, আমার টেলি পাসনি? শরদিন্দু বলল।

পেয়েছি।

তোর নতুন বৌদি-তারপর স্ত্রীর দিকে ফিরে বলল, রীণা, এই আমার ভাই সুকুমার, যার কথা তোমায় বলেছি।

রীণা সুকুমারের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

রীণা বললে, আমি কিন্তু তোমাকে সুকুমার বলেই ডাকব ভাই।

তাই বলবেন। সুকুমার বলল।

না, না—তুমি ওসব আপনি-টাপনি বলবে না সুকুমার। তুমি আমাকে তুমি করেই বলবে। শরদিন্দু এবারে বাধা দিয়ে বললে, তুমি যা বলবে রীণা, তাই হবে। চল ভিতরে চল।

অনেক রাত তখন। সুকুমার তার তিনতলার ঘরে বসে বেহালা বাজাচ্ছিল। হঠাৎ রীণা এসে ঢুকল সেই ঘরে। পাতলা সিল্কের নাইটি রীণার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ভাঁজে ভাঁজে যেন লেপটে আছে। সুকুমার লজ্জায় চোখ নামায়।

কি হল সুকুমার, থামলে কেন? তোমার বাজনা শুনতেই তো এলাম। বলতে বলতে রীণা আরও এগিয়ে এল সুকুমারের কাছে। একটা দামী সেন্টের গন্ধ বেরুচ্ছে তার দেহ থেকে।

দাদা—

আরে তোমার দাদা এখন গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন, পেথিডিনের অ্যাকশান–

পেথিডিন!

হ্যাঁ, তোমার দাদা তো রোজ রাত্রে ঘুমের জন্য পেথিডিন ইনজেকশন নেয়। পেথিডিন না। নিলে নাকি তোমার দাদার ঘুমই হয় না! তুমি জান না?

দাদা পেথিডিন নেয়। সুকুমারের কণ্ঠে বিস্ময়।

হ্যাঁ, এখন তো জানলে, এবার বাজাও।

এখন আমি ঘুমাব বৌদি, আপনি আসুন।

তুমি আমায় তাড়িয়ে দিচ্ছ সুকুমার? রীণার গলায় অভিমান।

না, আমি কেবল বলেছি—এবারে আমি ঘুমাব।

বেশ তাহলে ঘুমাও। রীণা আর দাঁড়াল না। ঘরের মধ্যে বাতাসে মৃদু মিষ্টি সুবাসের ঢেউ তুলে বের হয়ে গেল। আর সুকুমার স্তব্ধ অনড় হয়ে বসে রইল যেমন বসেছিল। সে তখন ভাবছে শরদিন্দুদা এ কাকে বিয়ে করে নিয়ে এল!

পরের দিন সকালে সুকুমার তখনও নীচে নামেনি। স্নান সেরে বেরুবার জন্য প্রস্তুত হয়েছে, গোকুল এসে ঘরে ঢুকল।

ছোটদাবাবু, আপনার চা কি এখানে নিয়ে আসব?

তাই দাও গোকুল। দাদা উঠেছেন?

তিনি তো এখনও ওঠেননি। বৌদি একা বসে টেবিলে ব্রেকফাস্ট করছেন।

শরদিন্দুদা এখনও ওঠেননি! বেলা তো প্রায় সাড়ে সাতটা! এত দেরি করে তো কখনও শরদিন্দুদা ওঠে না শয্যা থেকে? মাস দেড়েক ছিল না কলকাতায় শরদিন্দু—এই দেড় মাসের মধ্যে শরদিন্দুর এতখানি পরিবর্তন হয়েছে! মনে পড়ল গতকাল রীণা বলছিল, শরদিন্দু নাকি পেথিডিন নেয়! ওর নবপরিণীতা স্ত্রীর কথায় মনে হল শরদিন্দু পেথিডিন-অ্যাডিকটেড হয়েছে।

চা ও প্রাতঃরাশ গোকুল ওপরেই নিয়ে এল ট্রেতে করে, চা পান করতে করতে হঠাৎ কেন যেন আজ আবার মনে হল সুকুমারের, এ বাড়ি ছেড়ে বোধ হয় তার চলে যাওয়াই ভাল—আজ হোক কাল হোক শরদিন্দুকে কথাটা সে বলবে।

দুজনের আবার দেখা হল বেলা প্রায় পৌনে একটা নাগাদ কারখানায়। জার্মানী থেকে অনেক টাকার নুতন একটা প্ল্যান্ট আনা হয়েছে। সেটারই তদারক করছিল সুকুমার, শরদিন্দু এসে ঢুকল। সুকু!

সুকুমার শরদিন্দুর দিকে ফিরে তাকাল। বললে, এই প্ল্যান্টটা গত মাসে এসেছে শরদিন্দুদা—

শরদিন্দু কিন্তু সেদিকে ফিরেও তাকাল না। সম্পূর্ণ অন্য প্রসঙ্গ তুলল, লাঞ্চে যাবি না?

আমি তো লাঞ্চে বাড়িতে যাই না, এখানেই ক্যানটিনে লাঞ্চ করি।

শরদিন্দু বললে, নতুন একজন সায়েন্টিস্ট দেখলাম এখানে, অনিল গাঙ্গুলী—

হ্যাঁ, ওঁকে তো তুমিই মাস দুয়েক আগে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে গিয়েছিলে—

ও হ্যাঁ–তা তিনি কাজ কেমন করছেন?

মনে তো হয় ভালই।

আচ্ছা চলি—শরদিন্দু বের হয়ে গেল।

সুকুমার একবার ইচ্ছা হয়েছিল প্রশ্ন করে শরদিন্দুকে, সে নাকি আজকাল পেথিডিন নেয়, কিন্তু কেন জানি কথাটা তার মুখ দিয়ে বেরুল না।

তারপর আরও পনেরো দিন চলে গেল—কথাটা জিজ্ঞাসা করতে পারল না শরদিন্দুকে সুকুমার। চলে যাবার যে ইচ্ছাটা তার মনে জেগেছিল, সেটাও প্রকাশ করা হল না।

ঘটনাটা ঘটল আরও মাসখানেক পরে। দীঘায় বেড়াতে গিয়েছিল শরদিন্দু রীণাকে নিয়ে–দিন চারেক পরে ফিরে এল একা।

সুকুমার তিনতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল, হঠাৎ শরদিন্দুর দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়াল। উসকো-খুসকো মাথার চুল, ছোট ছোট দাড়ি। দুচোখে কেমন যেন বিভ্রান্ত দৃষ্টি। নিঃসন্দেহে। চমকে উঠেছিল সুকুমার।–কি হয়েছে শরদিন্দুদা!

রীণা নেই।

নেই? কি বলছ তুমি?

বোধ হয় সমুদ্রের জলে ড়ুবে মারা গেছে।

সমুদ্রের জলে ড়ুবে?

হ্যাঁ, স্নান করতে নেমেছিল-সন্ধ্যার ঘোর নামছে তখন, কত বারণ করলাম শুনল না আমার কথা। জল থেকে আর উঠল না। পরের দিন কত খুঁজলাম—জেলেরা কত চেষ্টা করল

পুলিসে খবর দিয়েছিলে? সুকুমার শুধাল।

হ্যাঁ, তারা এখন ডেড বডিটার অনুসন্ধানে আছে।

সুকুমার কি বলবে বুঝে পায় না, কোন সান্ত্বনার বাণী তার মুখ থেকে বের হয় না।

আরও দিন পনেরো কেটে গেল। রীণার মৃতদেহের সন্ধান করতে পারেনি পুলিস, যেমন পারেনি পুরীতে মানসীর মৃতদেহের কোন সন্ধান।

মানসীর মৃত্যুর ব্যাপারটাও নিয়ে পরবর্তীকালে যেমন শরদিন্দু আর মাথা ঘামায়নি, তেমনি রীণার মৃত্যুর ব্যাপারটাও বোধ করি অনিবার্য একটা দুর্ঘটনা বলে শরদিন্দু মেনে নিয়েছিল।

কিন্তু মানসীর ঐ আকস্মিক মৃত্যুর ব্যাপারটা ভুলতে পারেননি একজন, তিনি মানসীর বাবা পরেশ নন্দী। একটা সন্দেহের কুয়াশা যেন ক্রমশ তার মনের মধ্যে জমাট বেঁধে উঠতে থাকে। মানসী ছিল ভাল সাঁতারু। কলেজ জীবনে সে তার সাঁতারের কৃতিত্ব স্বরূপ অনেক কাপ মেডেল পেয়েছিল। সেই মানসী পুরীর সমুদ্রে স্নান করতে নেমে তলিয়ে যাবে—কথাটা যেন মন থেকে কিছুতেই পরেশ নন্দী মেনে নিতে পারছিলেন না।

কেমন যেন ব্যাপারটা রীতিমত অবিশ্বাস্য মনে হত তার কাছে। মনে হত মানসীর মৃত্যুর মধ্যে কোথাও একটা কোন রহস্য আছে নিশ্চয়ই।

এমনি যখন মনের অবস্থা পরেশ নন্দীর, হঠাৎ একজনের কথা তার মনে পড়ল। মানুষটি সম্পর্কে অনেক কিছু তিনি শুনেছিলেন কিন্তু সাক্ষাৎ পরিচয় ছিল না। অবশেষে অনেক ভেবে সাহসে ভর করে একদিন তিনি গড়িয়াহাটায় তার গৃহে গিয়ে উপস্থিত হলেন।

কিরীটী রায়।

কিরীটী বাড়িতেই ছিল। প্রাতঃভ্রমণ শেষ করে সবে ফিরেছে কিরীটী। বসবার ঘরে বসে ঐদিনকার সংবাদপত্রের পাতাটা ওলটাচ্ছিল কিরীটী, জংলী এসে বললে, একজন বুড়ো বাবু তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায়।

বুড়ো বাবু? কিরীটী বলল, তুই বললি না কেন কারও সঙ্গে আমি দেখা করি না?

বলেছি, কিন্তু শুনছে না

যা এই ঘরে নিয়ে আয়।

একটু পরে জংলীর সঙ্গে পরেশ নন্দী এসে ঘরে ঢুকলেন, পরনে একটা ময়লা ধুতি আর পাঞ্জাবি, চোখে চশমা, পায়ে চপ্পল।

রায়মশাই, আপনাকে বিরক্ত করতে আসতে হল বলে আমি বিশেষ দুঃখিত, কিন্তু আপনি ছাড়া কেউ আমাকে সাহায্য করতে পারবেন না ভেবেই

বসুন। কোথা থেকে আসছেন?

পরেশ নন্দী তার নাম-ধাম বললেন।

আমার কাছে কি দরকার বলুন তো পরেশবাবু? কিরীটী শুধাল।

আমার যা বলবার যদি একটু ধৈর্য ধরে শোনেন রায়মশাই অনুগ্রহ করে—

বেশ বলুন!

পরেশ নন্দী, তখন মানুসীর কাহিনী আদ্যোপান্ত বলে গেলেন ধীরে ধীরে।

আপনি বিশ্বাস করতে পারছেন না নিশ্চয়ই নন্দীমশাই যে আপনার মেয়েটি জলে ড়ুবে মরতে পারে! কিরীটী বলল সবকিছু শুনে।

না। আমার মনে হয় তার যদি মৃত্যুই হয়ে থাকে জলে ড়ুবে, তাহলে সে মৃত্যু স্বাভাবিক নয়।

সমুদ্রে কখনও আপনার মেয়ে সাঁতার কেটেছে?

না।

তাহলে ব্যাপারটা তো আকস্মিক দুর্ঘটনাও হতে পারে নন্দীমশাই।

পরেশ নন্দী বললেন, হতে যে পারে না তা নয়। কিন্তু তবুও মনকে প্রবোধ দিতে পারছি। তাছাড়া একটা কথা ভেবে দেখুন রায়মশাই-শরদিন্দু আবার বিবাহ করল দেড় বৎসরের মধ্যে এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রীর ভাগ্যেও অনুরূপ ব্যাপার ঘটল। আবার সেই সমুদ্র–

আচ্ছা নন্দীমশাই, শরদিন্দুবাবু দ্বিতীয়বার যাকে বিবাহ করলেন—সেই রীণা না কি নাম মেয়েটির—তার পরিচয় কিছু জানেন? কার মেয়ে—কোথায় বিয়ে করলেন তাকে উনি?

না, সেসব কিছুই আমার জানা নেই হয়তো সুকুমার জানে।

সুকুমার মানে শরদিন্দুবাবুর জ্ঞাতিভাই, যিনি এই বাড়িতেই থাকেন?

হ্যাঁ। একটা কথা রায়মশাই কথাটা আমি বলিনি এখনও, কিন্তু বোধ হয় আপনার জানা দরকার, আমার মেয়ে মানসীর সঙ্গে ঐ ছেলেটির একটু যেন হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল একসময়

ভালোবাসা?

বলতে পারেন।

আপনার মেয়ের বিবাহের পূর্বে না পরে?

পূর্বে।

তবু আপনি শরদিন্দুবাবুর সঙ্গে মেয়ের বিবাহ দিয়েছিলেন কেন?

সে কথা তো পূর্বেই আপনাকে বলেছি শরদিন্দু এক সময় আমার মালিক ছিল—তারপর হঠাৎ অকালে শরদিন্দু আমাকে রিটায়ার করাবার জন্য জেদ প্রকাশ করল-মানসী সেকথা জেনে প্রতিবাদ জানাতে যায় শরদিন্দুর কাছে শরদিন্দু ওকে দেখে মুগ্ধ হয়—বিবাহের প্রস্তাব দেয় আমার কাছে, সেই সঙ্গে একটা লোভনীয় পেনসনের লোভ দেখায়। চাকরি গেলে আমার আর্থিক অবস্থার কি হবে ভেবে আমি মানসীকে অনুরোধ জানাই বিবাহে সম্মত হতে। মানসী আমায় অত্যন্ত ভালোবাসত—সে সব কথা শুনে প্রথমটার গুম হয়ে রইল—তারপর একটু পরে বলল, ঠিক আছে, তাই হবে বাবা।

কয়েকটা মুহূর্ত চুপ করে থেকে কিরীটী বললে, আচ্ছা বিবাহের পর শরদিন্দু কি ব্যাপারটা জানতে পেরেছিল—মানে তার স্ত্রীর পূর্বরাগের কথা?

বোধ হয় জেনেছিল।

আপনি জানলেন কি করে?

মানুর ডাইরি থেকে—

ডাইরি?

হ্যাঁ, মানুর একটা ডাইরি ছিল—মধ্যে মধ্যে যে ডাইরি লিখত। সেই ডাইরিটা এখনও আমার কাছে আছে।

আপনি পেলেন কি করে সেই ডাইরি?

ও যেবারে পুরী যায়, তার দুদিন আগে আমার কাছে এসেছিল—বোধ হয় সেই সময়ই ডাইরিটা তার পড়ার টেবিলে বইয়ের মধ্যে রেখে যায়—তার মৃত্যুর পর একদিন তার পড়ার টেবিলের বইগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ ডাইরিটা পাই—ওর পুরী যাওয়ার তিন দিন আগে রাত্রে ডাইরির শেষ পাতা লেখা।

আপনি আমাকে একবার ডাইরিটা পড়াতে পারেন নন্দীমশাই?

কাল এনে দেব।

তাই দেবেন, আগে আমি ডাইরিটা পড়ে দেখি, ডাইরির মধ্যে যদি এমন কিছু পাইযাতে করে আপনার সংশয়টা যুক্তিযুক্ত মনে হয়

পরেশ নন্দী বললেন, বেশ, তাই পড়ে দেখুন কালই আমি দিয়ে যাব। ডাইরিটা—পরেশ নন্দী কথাগুলো বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।

ঐদিনই সন্ধ্যার দিকে পরেশ নন্দী এসে মানসীর ডাইরিটা কিরীটীর হাতে তুলে দিয়ে গিয়েছিল। ১৯৬০ সনের একটা পুরাতন ডাইরি। সেই ডাইরির পাতার মধ্যে মধ্যে মানসী ডাইরি লিখেছে। রাত্রে বসবার ঘরের সোফাটায় বসে কিরীটী ডাইরির পাতাগুলি ওলটাচ্ছিল।

প্রথম তারিখ ১৯৬৩ সনের ৬ই জুলাই। প্রথমে বেশ অনেকগুলো খালি পাতার পর বোধ হয় ঐ ডাইরি লেখা শুরু। মানসী লিখছে, মাত্র কয়েকটি লাইন—আজ আমার জন্মদিন, রথযাত্রার দিনই নাকি আমি জন্মেছিলাম—ঠিক সন্ধ্যা সোয়া সাতটায়, হিসাব করে দেখলে আজ আমার বয়স উনিশ পূর্ণ হল, কুড়ি বছরে পা দিলাম!

পরের ডাইরি লেখা হয়েছে—এক মাস পরে—৭ই আগস্ট। বুধবার।

সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা হয়ে আছে। কাল সারারাত বৃষ্টি পড়েছে। বৃষ্টি আমার খুব ভাল লাগে, বৃষ্টির যেন একটা আলাদা সুর আছে রিম ঝিম রিম ঝিম।

তারপরের যে তারিখটায় ডাইরি লেখা শুরু হয়েছে লাল কালি দিয়ে সে তারিখটা লেখা। তারিখটা ইংরেজী তারিখ নয়, বাংলা তারিখ। ২১শে ফায়ূন, রাত্রি দশটা।

আজ স্নানের পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রথম আবিষ্কার করলাম যেন। বাড়িতে কেউ ছিল না। আমি একাই ছিলাম। সত্যি আমি দেখতে এত সুন্দুর? দেহের কানায় কানায় যৌবন। আমি নিজেই যেন চমকে উঠেছিলাম নিজের সেই ভরা যৌবনের দিকে তাকিয়ে

ঐ পর্যন্তই, তারপর আর কিছু লেখা নেই।

লেখা শুরু আবার সাত মাস পরে।

এবারে পুজো আশ্বিনের মাঝামাঝি। আকাশে এখনও মধ্যে মধ্যে মেঘ জমে ওঠে। দু-এক পশলা বৃষ্টিও হয়। আচ্ছা সুকুমারকে কি সত্যিই আমি ভালোবাসি? কি জানি, জানি না। তবে এটা জানি, সুকুমার আমাকে ভালোবাসে।

বুঝতে পারি দেখা হলে সুকুমার কি রকম মুগ্ধ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর দুচোখের দৃষ্টি যেন আমাকে বন্দনা করে। সুকুমার কিন্তু বড় চাপা। আচ্ছা, মুখ খুলতে ওর এত ভয় কেন, কিসেরই বা ভয়?

আবার দু মাস পরে লেখা ডাইরি।

লেকে আজ বেড়াতে গিয়েছিলাম দুজনে। আমি আর সুকুমার দুজনে একটা বেঞ্চে পাশাপাশি বসেছিলাম, ও আমার একটা হাত দুহাতের মধ্যে নিয়ে খেলা করছিল। সন্ধ্যার অন্ধকারে চারিদিক ঝাপসা হয়ে গিয়েছে, কারও মুখ স্পষ্ট দেখা যায় না। বললাম আমিই, কিছু বলবে সুকুমার?

সুকুমার বললে, কি বলব?

কিছু বলার নেই?

তুমি বল মানসী। সুকুমার বলল।

কেন, তুমি বলতে পার না সুকুমার?

যা বলবার আগেই তো সব বলেছি। কেন, তুমি জান না! শুনতে পাওনি?

কই না তো!

তবে আর শুনে কাজ নেই।

বাবুর অমনি রাগ হয়ে গেল, বেশ, গো বেশ আমি হার মানছি, হল তো?

সুকুমার হঠাৎ দুহাত বাড়িয়ে আমাকে বুকের মধ্যে টেনে নিল।

আঃ, কি হচ্ছে ছাড়—কেউ দেখে ফেলবে, বললাম।

আরও মাস দুই পরে আবার ডাইরি লেখা। কোন তারিখ নেই। তবে লেখা :

দুমাস কোন ডাইরি লিখিনি।

আশ্চর্য, সত্যি আজও যেন সুকুমারকে বুঝতে পারলাম না। ও আমাকে চায়, বুঝতে পারি, কিন্তু বলে না স্পষ্ট করে—এ এক দুঃসহ যন্ত্রণা-ভোগ। এক যন্ত্রণার সাগর উত্তীর্ণ হওয়া। তবে ওর ভালোবাসাটা ও প্রকাশ করতে পারে না। কেন পারে না ও—আমি তো পারি, ও ছাড়া জীবনে আমার অন্য কোন পুরুষ আসতে পারে না।

আবার মাস দুই পরে ডাইরি লেখা হয়েছে :

বুঝতে পেরেছি সুকুমারের মধ্যে একটা কমপ্লেক্স আছে। হীনমন্যতার কমপ্লেক্স। কেবলই ও নিজেকে বলে, পরাশ্রয়ী। শরদিন্দুবাবু না থাকলে নাকি ওর বাঁচাটাই দুষ্কর হত।

আমার কেন যেন মনে হয় শরদিন্দুর কাছে আশ্রয় পাওয়াটাই হয়েছে ওর জীবনের সব চাইতে বড় অভিশাপ। শরদিন্দু যদি ওকে আশ্রয় না দিত, ও বোধহয় অন্য মানুষ হতে পারত। ও মরে গিয়েছে। বিয়ের পর ওকে আমি ঐ শরদিন্দুর কাছ থেকে দূরে—অনেক দূরে নিয়ে যাব।

এবারে মাস আষ্টেক বাদে ডাইরি লেখা হয়েছে। ওপরের তারিখটা ১০ই ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫।

ও কোন দিনই বলবে না। ভাবছি এবারে আমিই ওকে বলব—আচ্ছা সুকুমার, এবার আমরা বিয়ে করলে কেমন হয়? এস, বিয়ে কর আমায়। দূর, তাই কখনও বলা যায় নাকি! ভাবতেই হাসি পাচ্ছে। কিন্তু ওকে যতটুকু চিনেছি, ও কোন দিন হয়তো মুখ ফুটে বলবে না, আমাদের বিয়ের কথা। আমাকে হয়তো ঐ কথাটা শুনবার আশায় এমনি করেই চেয়ে থাকতে হবে।

তারপর আবার—৩১শে অক্টোবর ১৯৬৫।

হঠাৎ কাল সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে বাবা বললেন, ওঁর কারখানার মালিক নাকি ওঁকে রিটায়ার। করতে বলেছেন।

কথাটা শুনে আমার প্রচণ্ড রাগ হল, এ কি অদ্ভুত খেয়াল মানুষটার! মালিক বলে যা খুশি তাই করবে নাকি! আর আমাদের সেটা সহ্য করতে হবে? না, এ হতে পারে না। আমি কাল দেখা করব মানুষটার সঙ্গে, বলব, আপনি যা খুশি তাই করতে পারেন না। একটা সংসারকে আপনি আপনার খেয়ালে নষ্ট করতে পারেন না।

১লা নভেম্বর ১৯৬৫।

গিয়েছিলাম ভদ্রলোকের অফিসে। মানুষটার চোখের দৃষ্টি কি বিশ্রী। সর্বক্ষণ আমার দিকে চেয়ে থেকেছেন, আমার এমন বিশ্রী লাগছিল। কিন্তু তবু মনে হয়, মানুষটাকে বোধ হয় যতটা খারাপ ভেবেছি ততটা খারাপ নয়।

দিন দুই পরে আবার লিখছে মানসী–

বাবার মুখে প্রথমে কথাটা শুনে সত্যিই আমার ভীষণ রাগ হয়েছিল, স্পর্ধা তো কম নয়—আমাকে বিয়ে করতে চায়! বেচারীর বোধ হয় আমাকে দেখে এতকালের কৌমার্যের আসনটা টলে গিয়েছে!

যত ভাবছি কথাটা, ততই রাগ হচ্ছে বটে কিন্তু হাসিও পাচ্ছে। বেচারী শরদিন্দু! কিন্তু যা-ই বলি না কেন, ভদ্রলোকের চেহারাটা কিন্তু পুরুষালী এবং রীতিমত হ্যাণ্ডসাম।

বাবা আজ সকালেই আমাকে ডেকে বললেন সব কথা, তারপর বললেন আমি এখন কি

করি বল্ তো মা? আমি হঠাৎ বললাম কি করে বললাম তা জানি না, বললাম, তুমি যা ভাল বুঝবে তাই করবে। আমার মতামতের জন্য অত ভাবছ কেন?

তুমি আমায় বাঁচালি মা। বেঁচে থাক, শরদিন্দু সত্যি ভদ্রলোক। তুই সুখী হবি আমি বলছি, বাবার সমস্ত মুখ জুড়ে সে এক তৃপ্তির আনন্দ!

দীর্ঘ দেড় মাস পরে আবার ডাইরি শুরু

গত প্রায় মাস দেড়েক সুকুমারের সঙ্গে দেখা হয় নি হয়তো বেশিও হতে পারে। বিয়ের পর এই বাড়িতে এসে প্রথমে যে বিস্ময়ের সম্মুখীন হলাম, সে সুকুমার।

সুকুমারকে দেখলাম। সে এসে আমাদের যে ঘরে ফুলশয্যা রচিত হয়েছিল সেই ঘরে প্রবেশ করল। ভেবেছিলাম জীবনে আর হয়তো সুকুমারের সম্মুখীন হতে হবে না, কিন্তু আমার ভাগ্যবিধাতা বোধ হয় অলক্ষ্যে হেসেছিলেন। সুকুমার এই বাড়িতেই থাকে, ও শরদিন্দুর ভাই।

ঐ পর্যন্ত লিখে ডাইরি যেন শেষ হয়েছে। অনেকগুলো শূন্য পৃষ্ঠা। কিছু লেখা নেই। কিন্তু ডাইরি যে ওখানেই শেষ হয়নি, কিরীটী বুঝতে পারল, ডাইরির শেষের দিকে এসে অনেকগুলো শূন্য পাতার পর আবার ডাইরির শুরু। মানসী লিখেছে।– মানুষের বুকের মধ্যে যে এমন একটা আক্রোশ, এমন জমাটবাঁধা ঘৃণা থাকতে পারেসত্যি যেন আমার ধারণাও অতীত ছিল।

কাল রাত্রে শরদিন্দুর অন্য রূপ দেখলাম। শরদিন্দু নেই, কি একটা ব্যবসার কাজে দিল্লী গিয়েছে, কাল ফিরবে। যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম, তার কামনার উগ্র তাপ থেকে। আমার দেহটা যেন সুতীক্ষ্ণ নখের আঁচড়ে একেবারে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছে। ক্লান্ত—বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছি যেন। সত্যি, আর যেন সহ্য করতে পারছি না।

একদিকে শরদিন্দুর ঐ অত্যাচার, অন্যদিকে সুকুমারের দুচোখের ঘৃণাভরা দৃষ্টি। চুপচাপ অন্ধকার ঘরের মধ্যে অন্ধকার জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম, হঠাৎ কানে এল বেহালার করুণ সুর, কে যেন এই বাড়ির মধ্যেই কোথায় বাজাচ্ছে। কে বেহালা বাজায় এ বাড়িতে? পায়ে পায়ে একসময় ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম। বেহালা কাঁদছে। বেহালার সুর অনুসরণ করে করে তিনতলায় চলে গেলাম। সুকুমার তার ঘরে বেহালা বাজাচ্ছিল।

হঠাৎ কানে এল গাড়ির শব্দ। শরদিন্দুর আগে-আগেই ঘরের মধ্যে ঢুকলাম। শরদিন্দু আমার পশ্চাতে ঘরে ঢুকল, ঘরের দরজার অর্গল তুলে দিল। ঘরে ঢুকেই আমি আলোটা সুইচ টিপে জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম। মনে হল, তার দু চোখের দৃষ্টিতে যেন একটা হত্যা করবার লিপ্সা, শিকারের পূর্ব মুহূর্তে বাঘ যেমন তার শিকারের দিকে তাকিয়ে থাকে তেমনি করে যেন শরদিন্দু তাকিয়ে আছে আমার দিকে। এখুনি বুঝি আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।

বুকটার মধ্যে হঠাৎ যেন কেঁপে উঠল আমার।–কি হয়েছে, অমন করে তাকিয়ে আছ কেন? ভয়ে ভয়ে বললাম।

মানসী, আমার অবর্তমানে তাহলে তুমি সুকুমারের ঘরে রাত কাটাও? কেন, কেন বলনি তুমি আমাকে বিয়ের আগে কথাটা? কেন জানতে দাওনি সত্য কথাটা?

তুমি তো জানতে চাওনি, আমি বললাম। মাথার মধ্যে তখন আমারও যেন আগুন জ্বলছে, আমিও যেন সহ্যের শেষ সীমায় এসে দাঁড়িয়েছি।

আমি জানতে চাই, বিয়ের আগে কতদূর পর্যন্ত তোমরা এগিয়েছিলে, শরদিন্দুর গলার স্বর যেন কাপছিল।

সে কথা তোমায় বলে কোন লাভ নেই বললাম আমি। মৃত্যুর জন্য আমি প্রস্তুত।

স্বৈরিণী–বেশ্যা!

ভদ্রভাবে কথা বলহারামজাদী, ভদ্রভাবে কথা বলব তোর সঙ্গে! কথাগুলো বলেই হঠাৎ দুহাত বাড়িয়ে আমার গলাটা দশ আঙুল দিয়ে চেপে ধরল শরদিন্দু খুন—আজ তোকে খুনই করে ফেলব—চাপা গলায় হিসহিস করে বললে শরদিন্দু।

হঠাৎ ঐসময় গোকুল দরজায় ধাক্কা দিল, দাদাবাবু—দাদাবাবু!

শরদিন্দুর দশ আঙুলের চাপ শিথিল হয়ে গেল। ও আমায় ছেড়ে দিয়ে দরজাটা খুলে দিল। আশ্চর্য! শরদিন্দু তখন একেবারে শান্ত, একেবারে স্বাভাবিক, তার চোখে মুখে ও কণ্ঠস্বরে ক্ষণপূর্বে যে কুটিল হিংসা তাকে ভয়ঙ্কর করে তুলেছিল তার কিছুই যেন নেই। বললে, কিরে গোকুল?

খাবে তো চল, খাবার তৈরী হয়েছে।

পরে সেই রাত্রেই হঠাৎ শরদিন্দু আমার দুহাত ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললে, আর বলতে লাগল, ক্ষমা কর মণি আমাকে ক্ষমা কর, পশুরও অধম ব্যবহার করেছি আজ তোমার সঙ্গে আমি, বল—আমায় ক্ষমা করেছ বল!

ঘৃণায় লজ্জায় আমি যেন তখন একেবারে পাথর হয়ে গিয়েছি।

মণি বল—আমি পশু—আমি একটা পশু।

আমি বললাম, আজ বোধ হয় ড্রিঙ্ক করনি–

না।

আমি তখন বোতল থেকে গ্লাসে ড্রিংক ঢেলে দিলাম।

আমি বুঝতে পারছি ঐ শরদিন্দুর হাতেই আমার মৃত্যু আছে।

এর পর আর ডাইরি লেখা হয়নি। বোঝাই যায়, মানসী আর ডাইরি লেখবার সুযোগ পায়নি। অতল জলধির মৃত্যু তাকে গ্রাস করেছে। ঐ ঘটনার পরেই তো সে পুরী গেল স্বামীর সঙ্গে, ডাইরিটা সঙ্গে নিয়ে যায়নি। নিজেদের বাড়িতে রেখে গিয়েছিল। মানসী কি তাহলে বুঝতে পেরেছিল, আর সে ডাইরি লেখার সুযোগ পাবে না? তাই—তাই কি সে ডাইরিটা সঙ্গে নেয়নি, বাপের বাড়িতে রেখে গিয়েছিল?

কিরীটীর মনে হয়, কলকাতায় নিজের বাপের বাড়িতে তার পড়ার টেবিলে ডাইরিটা রেখে যাওয়ার দুটি কারণ থাকতে পারে—প্রথমত সে সুনিশ্চিত ভাবে বুঝতে পেরেছিল, পুরী থেকে : সে আর ফিরে আসবে না এবং দ্বিতীয়ত, যদি তার মৃত্যু সেখানে হয়ই, তাহলে একদিন না একদিন ঐ ডাইরিই তার মৃত্যুর কারণটা প্রকাশ করে দেবে।

ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল সুকুমারের। অন্ধকার ঘর, আজকাল কেন যেন সুকুমারের কিছুতেই ঘুম আসতে চায় না। কয়েক রাত্রি পর পর সুকুমার ক্যমপোজ খেয়েছে কিন্তু তবু ঘুম আসেনি চোখে।

রাত্রে কখনও সুকুমার ঘরের দরজায় অর্গল দিয়ে শোয় না। অনেককালের অভ্যাস তার। ঘরের জানালা দরজা সব খোলাই থাকে, আর দরজাটা ভেজানো থাকে মাত্র। আজ বোধ হয় অনেকদিন পরে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ একটা মৃদু শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল। চোখ মেলে, তাকাতেই সে দেখতে পেল, আবছায়া অবগুণ্ঠনবতী এক নারীমূর্তি তার শয্যার অল্প দূরে দাঁড়িয়ে।

কে—কে! সুকুমার ততক্ষণে উঠে বসেছে।

আমি চিনতে পারছ না সুকুমার, আমি মানসী!

মানসী!

কি, ভয় পেলে নাকি? মানসী মৃদু হাসল। হাসিটা যেন ঘরের বাতাসে মৃদু একটা কম্পন জাগায়।

সুকুমারের কণ্ঠে কোন শব্দ নেই। সে বোবা, সে পাথর।

ভাবছ বোধ করি মানসীর ভূত, আমি ভূত নই সুকুমার!

তুমি—তুমি বেঁচে আছ মানসী?

তাই তো মনে হচ্ছে—উহুঁ, উঠ না—আমার কাছে আসবার বা আমাকে স্পর্শ করবার চেষ্টা কোরো না।

মানসী–তুমি-সমুদ্রের জলে ড়ুবে তোমার মৃত্যু হয়নি?

না। ভুলে গেলে কেন আমি সাঁতার জানতাম। অনেক দূরে ঢেউয়ে ভেসে গিয়েছিলাম। বটে—কিছু নোনা জল পেটে ঢুকেছিল, তাইতেই বেঁচে গেলাম শেষ পর্যন্ত খানিকটা বমি করে।

বমির সঙ্গেই বোধ হয় বিষটা বের হয়ে গিয়েছিল, নইলে হঠাৎ মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠেছিল কেন—হাত পা সব শিথিল হয়ে এসেছিল কেন?

বিষ! কি বলছ তুমি মানসী?

একটা কথার সত্য জবাব দেবে সুকুমার? সেদিন দুপুরে আমার লেমন স্কোয়াশের সরবতের মধ্যে কে বিষ দিয়েছিল? তোমার তো সেটা না জানার কথা নয়—তবে এও জেনো, আমি ঠিক জানতে পারব—কে সেদিন লেমন স্কোয়াশের সঙ্গে আমায় বিষ দিয়েছিল! আচ্ছা চলি আবার আসব। আর দোহাই আমাকে অনুসরণ কোরো না!

মানসী, শোন, শোন—যেও না—মানসী—সুকুমার চেঁচিয়ে ওঠে নিজের অজ্ঞাতেই বুঝি।

মানসী তখন অদৃশ্য হয়েছে ঘর থেকে। শয্যা থেকে উঠে দরজা পর্যন্ত যেতে যেতে মানসীকে আর দেখতে পেল না সুকুমার। সামনের বারান্দাটা অন্ধকার, শূন্য খাঁ খাঁ করছে। এদিকে ছাদে উঠবার সিঁড়ি সিঁড়িটা ওপরের দিকে ছাদে গিয়ে মিশেছে, নীচের দিকে একতলার ছাদ শেষ হয়েছে—প্রকাণ্ড ছাদ, তারপর নিচের তলা—সর্বত্র ঘুরে দেখল সুকুমার। মানসী কোথাও নেই।

সুকুমারের একবার মনে হয়, তবে কি সবটাই একটা স্বপ্ন? ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে সে উঠে এসেছে? হয়তো তাই, নচেৎ মানসী কোথা থেকে আসবে! আজ প্রায় দুই বছর হল মানসী মারা গেছে পুরীতে সমুদ্র স্নান করতে গিয়ে!

সুকুমার আবার নিজের ঘরে ফিরে এল। কিন্তু বাকি রাতটা সে আর ঘুমাতে পারল না।

সুকুমার মানসীর সেই ডাইরির কথা ভোলেনি। মানসীর মৃত্যুর পর সে ওদের ঘরটা তন্ন তন্ন করে খুঁজেছিল, কিন্তু কোথাও কোন ডাইরি পায়নি। তার মনে হয়েছে, ডাইরিটা হয়তো মানসী পুরীতে সঙ্গে সঙ্গে করেই নিয়ে গিয়েছিল আর মানসীর মৃত্যুর পর হয়তো শরদিন্দু সেই ডাইরিটা নষ্ট করে ফেলেছে–

ডাইরিতে কি লিখেছিল মানসী, সেটা সুকুমার অনায়াসেই অনুমান করে নিতে পারে। সুকুমারকে কেন্দ্র করে শরদিন্দুর মনের মধ্যে যে একটা সন্দেহ ঘনীভূয় উঠেছিল, বিবাহের পর থেকেই, সেটাই বোধ হয় লেখা ছিল।

তবে এটা ঠিকই, মানসীর জলে ড়ুবে মৃত্যুর ব্যাপারটা সহজভাবে সে মেনে নিতে পারেনি। আর মেনে নিতে পারেনি বলেই মানসীর মৃত্যুর দিন কুড়ি পর সুকুমার পুরীতে গিয়েছিল। যে হোটেলে ওরা ৭/৮ দিন ছিল সেই হোটেলে ও নানাভাবে অনুসন্ধান করেছে চার-পাঁচদিন ধরে, এবং মোটামুটি যে সংবাদ সে সংগ্রহ করতে পেরেছে, সেটা হচ্ছে দুপুরে সাগরে স্নান করতে নেমে সাঁতার দিয়ে অনেকটা দূরে চলে যায় মানসী শরদিন্দু ডাকাডাকি করা সত্ত্বেও সে ফেরেনি—শেষটায় সমুদ্রের জলে অদৃশ্য হয়ে যায় মানসী।

পুলিসের লোক ও নুলিয়ারা অনেক অনুসন্ধান করেছে মানসীর, কিন্তু মানসীর চিহ্নমাত্রও খোঁজ পাওয়া যায়নি তার মৃতদেহেরও কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। সবাই ধরে নিয়েছিল মৃতদেহটা ভাসতে ভাসতে অনেক অনেক দূরে চলে গেছে।

পরেশ নন্দীর সঙ্গেও একদিন মানসীর মৃত্যু সম্পর্কে কথা হয়েছিল সুকুমারের।

পরেশ নন্দী স্পষ্টই বলেছিলেন, আমি বিশ্বাস করি না সুকুমার—মানসীর জলে ড়ুবে মৃত্যু হয়েছে। ওটা একটা মিথ্যা রটনা মাত্র!

কেন বিশ্বাস করেন না পরেশবাবু? সুকুমার বলেছে।

একটা কথা ভুলো না সুকুমার, মেয়ে আমার সাঁতারে চ্যামপিয়ন ছিল।

চ্যামপিয়ান সাঁতারুরাও তো জলে ড়ুবেছে এমন নজির আছে।

আছে কি নেই তর্ক তুলতে চাই না, তবে আমি যেমন করে থোক, মানসীর রহস্যটা খুঁজে বের করব। আমার জ্যোতিষী বন্ধু বঙ্কিমনারায়ণ চক্রবর্তীও তার কোষ্ঠী দেখে বলেছেন—ঐ বয়েসে মানসীর মৃত্যুযোগ ছিল না। সে মরতে পারে না, আর কোন দুর্ঘটনায়ও তার মৃত্যুযোগ ছিল না কোষ্ঠীতে।

পরের দিন সুকুমার যখন ফ্যাক্টরিতে তার অফিসঘরে বসে কাজ করছে, পরেশ নন্দী এলেন। সুকুমার, কাল বিকেলের দিকে একবার আমাদের বাড়ি আসতে পার?

কেন পারব না কিন্তু কেন বলুন তো?

এক ভদ্রলোক তোমাকে কিছু প্রশ্ন করতে চান?

ভদ্রলোক! কে?

কিরীটী রায়ের নাম শুনেছ?

শুনেছি। তা তিনি হঠাৎ আমাকে কি প্রশ্ন করতে চান?

কথাটা তাহলে তোমাকে খুলেই বলি সুকুমার, পরেশ নন্দী বললেন, মানু যে জলে ড়ুবে মারা গিয়েছে, সে কথাটা যে আমার মন মেনে নিতে পারেনি সে কথা তো তোমাকে আমি আগেই বলেছি। কিন্তু ভেবে ভেবেও আমি কোন কূল-কিনারা পাইনি এতদিন। ভেবেছি কেবল, একটা কিছু করতে হবে। কিন্তু কি করব? ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ একদিন আমার কিরীটী রায়ের কথা মনে পড়ল। হ্যাঁ, ঐ একটিমাত্র মানুষ যিনি হয়তো আমাকে সাহায্য করতে পারেন। সঙ্গে সঙ্গে গেলাম তার কাছে, অনুনয় করলাম সাহায্য করবার জন্য।

তিনি তাহলে মানসীর মৃত্যুর ব্যাপারটা–

হ্যাঁ, মৃত্যুর মধ্যে রহস্য যদি কিছু থেকে থাকে তবে সেটা জানাবার চেষ্টা করবেন বলে আমায় কথা দিয়েছেন। আজ সকালে তিনি আমায় তার বাড়িতে ডেকে পাঠিয়েছিলেন তারও বিশ্বাস মানুর মৃত্যুটা স্বাভাবিক নয়। মানুকে হত্যা করা হয়েছে।

কি বলছেন আপনি? কে তাকে হত্যা করবে? আর কেনই বা করবে?

কেন তাকে হত্যা করা হয়েছে আমি জানি না তবে কে হত্যা করেছে তা বোধ হয় অনুমান করতে পেরেছি সুকুমার—তোমার ঐ ভাই

না না, এ অসম্ভব। এ হতেই পারে না! ভুলে যাচ্ছেন আপনি পরেশবাবু, মানসীকে সে বিয়ে করেছিল-মানসী তার স্ত্রী মানসীকে দাদা ভালোবাসত।

আমি প্রমাণ দেব সে মানুকে ভালোবাসত না। আর সে কথাটা তোমারও অজানা ছিল না।

আমি-আমি কিছু জানি না। সুকুমার বললে।

কর কিছু জানবার দরকার নেই। তুমি শুধু কিরীটী রায় বা জিজ্ঞাসা করবেন তার জবাব দিও।

এতদিন পর মানসীর ব্যাপারটা আবার খুঁচিয়ে তুললে হয়তা কারোরই ভাল হবে না। ভুলে যাবেন নাআপনিও নিষ্কৃতি পাবেন না!

আমি?

হ্যাঁ। মানসী অন্য একজনকে ভালোবাসত জেনেশুনেও আপনি আপনার স্বার্থের হাড়িকাঠে নিজের সন্তানকে বলি দিয়েছেন বাপ হয়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকাননি। যে মতটা তার সেদিন আপনি আদায় করেছিলেন, সেটা তার সত্যিকারের মত নয়—নিজের বাপের কথা ভেবেই সন্তানের আত্মবলি মাত্র। তাছাড়া আরও একটা কথা ভুলে যাবেন না, শরদিন্দুর অনেক টাকা আছে টাকার খেলায় শেষ পর্যন্ত হয়তো আপনি হেরে যাবেন। আমার অনুরোধ এসব আপনি করতে যাবেন না। পাস্ট ইজ পাস্ট। অতীতকে আজ আর বর্তমানে টেনে এনে কারও কোন লাভ হবে না।

আমার মেয়ের হত্যার প্রতিশোধ আমি নেবই সুকুমার।

আমি—আমি আপনাকে কি সাহায্য করতে পারি?

মানসীর তুমি দীর্ঘদিনের বন্ধু। শুধু বন্ধুই নও, মানু বিয়ের পর যে বাড়িতে গিয়েছিল, সে বাড়িতে তুমিও ছিলে, সর্বক্ষণ তাকে দেখার সুযোগ পেয়েছ, তুমি হয়তো এমন অনেক কথাই জান, যা আমি জানি না বা আর কেউ জানে না, কিরীটীবাবু হয়তো এমন অনেক কিছু জানতে চাইবেন, যা আমি জানি না, তুমি জান।

আপনি বাড়ি যান পরেশবাবু। শরদিন্দুদা আজ কারখানায় এখনও আসেনি, তবে যে কোন মুহূর্তে আসতে পারে।

ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি। তবে তার সঙ্গেও হয়তো রায়মশাই দেখা করতে চাইবেন। আচ্ছা

চলি—পরেশ নন্দী অতঃপর বিদায় নিলেন।

পরেশ নন্দী চলে গিয়েছেন অনেকক্ষণ, সুকুমার তার চেয়ারটার ওপরে চুপচাপ বসে ছিল। গতরাত্রির ব্যাপারটাই আবার সুকুমারের মনে উদয় হয়। কাল রাত্রে যা ঘটে গিয়েছে, সেটা কি। আগাগোড়াই একটা স্বপ্ন না নিষ্ঠুর সত্য?

সত্যি সত্যি যদি মানসী গতরাত্রে ওদের বাড়িতে এসে থাকে, তবে সে এসেছিল প্রথমে খিড়কির দরজাপথে বাড়ির পশ্চাতে বাগানে, তারপর মেথরদের যাতায়াতের ঘোরানো লোহার সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠেছিল। সেখান থেকে তিনতলা এবং সেই পথ দিয়েই আবার ফিরে গিয়েছে।

বাড়িটা অনেকদিনকার পুরানো। পশ্চাৎদিকে অনেকখানি জায়গা জুড়ে একটা বাগানের মত আছে। এক সময় ঐ জায়গায় নানা ফল ফুলের গাছ ছিল, পরবর্তীকালের যত্নের অভাবে সব নষ্ট হয়ে গিয়েছে—এখন ঘন আগাছায় ভরা। ঐ বাগানের সীমানা প্রাচীরের পাশে একটা ফ্যাক্টরি। তারপরে খানিকটা খোলা মাঠ। আরও ওদিকে বজবজ যাবার রেললাইন। রাত্রির দিতে। মোটামুটি ঐ জায়গাটা নির্জনই থাকে।

চৈত্রের শেষ। কদিন থেকেই প্রচণ্ড গরম পড়েছে এ শহরে, অফিসের এয়ারকন্ডিশান করা কামরায় বসে সেটা বোঝবার উপায় নেই। দেওয়ালঘড়ির দিকে তাকাল সুকুমার, ছটা বেজে গিয়েছে।

গ্রীষ্মের দীর্ঘ মন্থর বেলাও পড়ে এসেছে। সুকুমার ভারী পরদা ঝোলানো কাঁচের জানালার সামনে এসে দাঁড়াল। পর্দা সরিয়ে বাইরের দিকে তাকাল—আকাশে ঘন কালো মেঘ করেছে, হয়তো কালবৈশাখী উঠবে ঝড়।

ঘরের টেলিফোনটা বেজে উঠল ক্রিং ক্রিং ক্রিং। সুকুমার ফোনের রিসিভারটা তুলে নিল।

–সুকুমার। আমি শরদিন্দু।

কি ব্যাপার দাদা তুমি আজ অফিসে এলে না?

কতকগুলো জরুরি কাজ ছিল। আর শোন, আমি আজ রাত্রের পুরী এক্সপ্রেসে পুরী যাচ্ছি।

পুরী যাচ্ছ? হঠাৎ?

না মানে একটু ঘুরে আসব এই আর কি, ভাল লাগছে না।

সুকুমার বলল, তা ফিরছ কবে?

দেখি, কিছু ঠিক নেই। জগৎবাবুকে বলে দিয়েছি, আমার কাজগুলো, মানে কাগজপত্রগুলো তোর কাছেই নিয়ে যেতে—তাকে যা পরামর্শ দেবার দিস।

কথাগুলো বলেই শরদিন্দু বোধ হয় ফোনটা নামিয়ে রাখল। তার দিক থেকে আর কোন সাড়া পাওয়া গেল না।

সুকুমার জানত না, গতরাত্রে অনুরূপ একটা ঘটনা দিন দুই আগে ঘটে গিয়েছে শরদিন্দুকে কেন্দ্র করেও।

রাত্রে শরদিন্দুর বড় একটা ঘুম হয় না। মধ্যরাত্রি পর্যন্ত সে বসে বসে মদ্যপান করে, তারপর একসময় শয্যায় এলিয়ে দেয় দেহটা। তখনও চোখে ঘুম আসে না—একটা আচ্ছন্ন ভাব, নেশার ঘোর মাত্র—ঘুম নয়।

তখন বোধ হয় রাত্রি বারোটা হবে, কি কিছু বেশী—হঠাৎ ঘরের মধ্যে ফোনটা বেজে উঠল।

আঃ, এই রাত্রে আবার কে ফোন করে? বিরক্তির সঙ্গে শরদিন্দু ফোনের রিসিভারটা তুলে নেয়।

হ্যালো! অপর প্রান্তে নারীকণ্ঠ।

কে? উঠে বসে শরদিন্দু।

গলা শুনে চিনতে পারছ না! আমি মানসী!

অকস্মাৎ যেন একটা শক খায় শরদিন্দু! তার মদের নেশা যেন ছুটে যায়। মানসী! তু-তুমি!

ভাবছ বোধ হয়, মরা মানুষ আবার ফোন করে কি করে, তাই না? বুঝতেই পারছ, আমি মরিনি সেদিন সমুদ্রের জলে ড়ুবে। কি হল, একেবারে যে চুপ করে গেলে বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি কথাটা?

শরদিন্দু ফোনের রিসিভারটা হাতে প্রস্তর-মূর্তির মত বসে তখন।

বিশ্বাস করতে পারছ না কথাটা, তাই না? কিন্তু সত্যিই আমি মরিনি। দুবছর আগে যাকে বিষ–

বিষ?

হ্যাঁ, বিষ। কিন্তু কেন বিষ দিয়েছিলে বলতে পার? আমাকে তুমি সন্দেহ করেছিলে, তাই না? তোমার সন্দেহ হয়েছিল সুকুমারের সঙ্গে–

না, মানসী–তুমি কোথায়–কোথা থেকে কথা বলছ? তুমি যেখানেই থাক চলে এস, আমি বুঝতে পেরেছি আমি ভুল করেছি–

কিন্তু এখন তো তা আমার পক্ষে সম্ভব নয় শরদিন্দু। দুবছর আগে যার মৃত্যু হয়েছে, আজযদি সে আবার ফিরে আসে—অনেক জটিলতা সৃষ্টি হবে। অনেক প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়াবে তোমার শরদিন্দু।

তবু তুমি ফিরে এস মণি—

বললাম তো, তা আর সম্ভব নয়। কিন্তু বলতে পার শরদিন্দু কেন তুমি আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিলে?

কি বলছ তুমি?

ঠিকই বলছি, মনে করে দেখ, আমার লেমন স্কোয়াশের গ্লাসে সেদিন বিষ মেশানো ছিল–

না না, আর সত্যিই যদি লেমন স্কোয়াশের গ্লাসে বিষ মেশানো হয়ে থাকে—সে আমি মিশাইনি।

বিষাক্ত সেই লেমন স্কোয়াশ খাবার পরেই আমি যখন সমুদ্রে স্নানে যাচ্ছি তুমি বারণ করোনি–কিন্তু কি দুর্দৈব দেখ, আমি মরলাম না, সমুদ্রের তলায় তলিয়েও গেলাম না তুমি কেমন করে জানবে বল যে নিশ্চিত মৃত্যুর মধ্যে থেকেও আমি বেঁচে ফিরে আসতে পারি! তাই আবার বিয়ে করলে আর একজনকে–

মানসী শোন, সব তোমাকে আমি খুলে বলব—তুমি এস। নিজে না আস, তুমি কোথায় আছ বল—এখুনি আমি গাড়ি নিয়ে সেখানে যাব!

ধন্যবাদ, তার কোন প্রয়োজন নেই। তবে এও জেনো, কে আমাকে মারতে চেয়েছিল সেদিন, তা একদিন না একদিন আমি জানতে পারবই—আমি প্রতিশোধ নেব।

মানসী!

কিন্তু শরদিন্দুর সে ডাকের কোন সাড়া এল না। অন্য প্রান্ত তখন নীরব। এক সময় অপেক্ষা করে করে ফোনের রিসিভার নামিয়ে রাখল শরদিন্দু।

এইমাত্র যা সে শুনল, তা কি সত্যি? এও কি সম্ভব? শরদিন্দুর মনে হয়, সত্যিই কি মানসী আজও বেঁচে আছে? তাই—তাই হয়তো এত অনুসন্ধান করেও মানসীর মৃতদেহের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি!

ঐ মুহূর্তে একটা অদ্ভুত কথা মনে হয় শরদিন্দুর, তবে কি রীণাও দীঘার সমুদ্রে ড়ুবে মারা যায়নি? সেও আজও বেঁচে আছে মানসীর মতই? সেও কি একদিন এমনি কোন এক রাত্রে ফোন করে বলবে-শরদিন্দু, আমি মরিনি!

কথাটা যত ভাবে শরদিন্দু ততই যেন একটা অস্থিরতা বাড়তে থাকে। অস্থির অশান্ত শরদিন্দু ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে থাকে।

তারপর অনেক ভেবেই শরদিন্দু স্থির করে, আবার সে পুরী যাবে—আবার সে নতুন করে মানসীর অনুসন্ধান করবে পুরীতে। যে হোটেলে সেবার সে গিয়ে উঠেছিল মানসীকে নিয়ে, এবারও সেই হোটেলেই উঠবে।

মানসী আজও বেঁচে আছে শরদিন্দুর কেমন যেন ধারণা হয়। কিন্তু মানসী তো মিথ্যা বলেনি—মনের মধ্যে তার একটা হত্যালিপ্সা সত্যিই জেগেছিল। বিশ্বাসঘাতিনী স্ত্রীকে কি সত্যিই মনে মনে সে হত্যা করতে চায়নি!

যেদিন সমুদ্রের জলে ড়ুবে যায়, তার আগের দিন রাত্রেই তো সামান্য কি একটা তুচ্ছ কথাকাটাকাটির পর সেই সকাল থেকেই শরদিন্দু কথা বন্ধ করেছিল মানসীর সঙ্গে।

বাইরে অন্ধকার রাত্রি তখন। খোলা জানালা পথে সাগরের হাওয়া আসছে, আর সেই সঙ্গে একটানা সমুদ্রের গুম গুম গর্জন। একটা হিংস্র দৈত্য যেন অন্ধকারে কেবলই ফুসছে। সামনে টেবিলের ওপরে ড্রিংসের গ্লাস—সেই সন্ধ্যা থেকে ড্রিংক করে চলেছে শরদিন্দু সামনে মুখখামুখি কিছুটা তফাতে একটা বেতের চেয়ারে বসে মানসী।

আর খেও না শরদিন্দু–মানসী বললে।

রক্তবর্ণ দুটো চোখ তুলে তাকাল শরদিন্দু—তার পরই যেন চাপা গলায় হিস হিস করে উঠল। শরদিন্দু, শাট আপ!

আমি তোমার মনের দ্বন্দ্ব জানি শরদিন্দু, কিন্তু তুমি বিশ্বাস করতুমি যা ভেবে কষ্ট পাচ্ছ তা সত্য নয়!

সত্য নয়? বিয়ের আগে সুকুমারের সঙ্গে তোমার–

বলেছি তো, আমাদের পরিচয় ছিল ঘনিষ্ঠতাও ছিল, আর হয়তো তাকে ভালোও বেসেছিলাম আমি—কিন্তু–

চুপ, চুপ, একটা স্বৈরিণী, বেশ্যা—আবার উঁচু গলা করে সাফাই গাইছিস! তুই মর মর—মরে আমায় নিষ্কৃতি দে!

আমি কি বুঝতে পারছি না, বুঝতে পারছি—মানসী বললে, তোমার হাতেই একদিন আমায় মরতে হবে–

হ্যাঁ, তোকে—তোকে আমি—

হত্যা করবে তো, বেশ, তাই কর। এ যন্ত্রণার অবসান হোক।

মানসীর দুচোখের দৃষ্টিতে সেদিন কোন ভয়ই ছিল না। সে যেন মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়েই ছিল। মানসী উঠে এসে শরদিন্দুর গলাটা দুহাতে জড়িয়ে ধরে বললে, পারবে—পারবে আমাকে মারতে? কই, মারমার না!

কি হল শরদিন্দুর, সে মানসীকে দুহাতে বুকের উপর টেনে নিয়েছিল।

তোমাকে বিশ্বাস করানো যাবে না শরদিন্দু, কিন্তু এটা তুমি কেন বোঝ না, সত্যিই যদি সুকুমারের প্রতি আমার ভালোবাসা তেমনিই থাকত, তাহলে তোমার সঙ্গে বিবাহে কি আমি মত দিতাম!

মানসী, তুমি কি জানতে না যে সুকুমার আমার ভাই—একই বাড়িতে থাকে সে?

না, বৌভাতের রাত্রে প্রথমে জানতে পারলাম।

সুকুমার তোমাকে কোনদিন কিছু বলে নি?

না, বাড়ির কথা সে কোন দিন আমায় কিছু বলেনি। আমায় কেবল বলেছে, সে পরাশ্রিত, অন্যের আশ্রয়ে জীবনযাপন করে। দেখ আমার কি মনে হয় জান, ওর বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়াই ভাল।

সুকুমারকে আমি ছাড়তে পারব না। কোন দিনই নানা না, তাকে আমি কোন দিনই ছাড়তে পারব না। হঠাৎ শরদিন্দু বললে, সে যত বড় অপরাধই করুক না কেন–

ছাড়তে পারলে বোধ হয় ভালই করতে শরদিন্দু, মানসী বললে।

সুকুমার পরেশ নন্দীর অনুরোধটা শেষ পর্যন্ত ঠেলতে পারেনি। তবে পরেশ নন্দীর গৃহে সে যায়নি। পরের দিনই সে এসেছিল কিরীটীর গৃহে। নিজে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে, বেলা তখন গোটা দশেক হবে।

কিরীটী সদ্য শেষ করা কফির কাপটা টেবিলের ওপরে নামিয়ে রেখেছে, শ্রীমান জংলী এসে ঘরে ঢুকল।–বাবু, একজন ভদ্রলোক দেখা করতে চান।

কোথা থেকে আসছে, কি না কিছু বলেছে?

না, সে সব কথা তো কিছু বলেনি, কেবল বললে নাম–সুকুমার মিত্র।

কিরীটী মৃদু হেসে বললে, যা এই ঘরে পাঠিয়ে দে।

জংলী বেরিয়ে গেল। সুকুমার এসে ঘরে প্রবেশ করল।

আসুন। বসুন সুকুমারবাবু। কিরীটী বললে।

আপনি পরেশবাবুকে বলেছিলেন—

হ্যাঁ, মানসীর ব্যাপারে আপনার সঙ্গে কিছু কথাবার্তা বলতে চাই সুকুমারবাবু, তাই আপনাকে আসতে বলেছিলাম। আপনি তো তাকে অনেক দিন থেকেই, মানে তার বিয়ের আগে থাকতেই চিনতেন—আপনাদের দুজনার মধ্যে ঘনিষ্ঠতাও ছিল—আচ্ছা আপনার কি মনে হয় মানসী দেবী সমুদ্রে ড়ুবে মারা গেছেন?

না, আমি বিশ্বাস করি না। শান্ত গলায় সুকুমার বললে।

কিন্তু কেন মানসী ভাল সাঁতার জানত বলে কি?

না, ঠিক তা নয়, তবে আমি ঠিক আপনাকে বোঝাতে পারব না ব্যাপারটা কিরীটীবাবু—

হুঁ। আচ্ছা সুকুমারবাবু আপনি তো মানসীকে ভালোবাসতেন, তাই না? মানসীও কি—

আগে মনে হয়েছে সেও বুঝি আমাকে ভালোবাসে–কিন্তু পরে মনে হয়েছে, না। কারণ তাই যদি হত, তাহলে সে শরদিন্দুদাকে বিবাহ করত না।

বিবাহটা সম্পূর্ণ তার বাপের কথা ভেবেই হয়তো—মানে তিনি শেষ পর্যন্ত সম্মত হয়েছিলেন বিবাহে।

না, আমার মনে হয় সম্পত্তি আর ঐশ্বর্যের প্রতি তার মনের মধ্যে একটা লোভ ছিল আর সে কারণেই সে মত দিয়েছিল ঐ বিবাহে।

আপনি তাহলে মানসীর মৃত্যুসংবাদে খুশিই হয়েছিলেন বলুন!

না না–তা নয়–

আমার কিন্তু ধারণা সুকুমারবাবু আপনি খুশি হয়েছিলেন, আর তাই মানসীর মৃত্যুর ব্যাপারে আপনার মনের মধ্যে কোন সন্দেহ থাকলেও সেটা আপনি যাচাই করে নিতে চাননি।

কিরীটীর মনে হয়, সুকুমার যেন কেমন বিব্রত বোধ করছে।

যাকগে সে কথা, শরদিন্দুবাবু কি জানতে পেরেছিলেন, আপনাদের উভয়ের মধ্যে একদা ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল?

মনে হয় জানতে পেরেছিল।

তাই যদি হয় তো, কিরীটী বললে, শরদিন্দুবাবু সব কথা জানার পর কি ভাবে ব্যাপারটা গ্রহণ করেছিলেন, সে সম্পর্কে জানেন কিছু কিংবা মানসীর মুখ থেকে কখনও কিছু শুনেছেন?

না, বরং মনে হয়েছে ব্যাপারটায় মানসী কোন গুরুত্বই দিত না। তা হলেও মধ্যে মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করত দাদা, সেটা বুঝতে পারতাম।

কিছু মনে করবেন না সুকুমারবাবু, একটা কথা—আপনি ওঁদের বিবাহের পর শরদিন্দুবাবুর বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন না কেন?

চলে যেতেই চেয়েছিলাম, কিন্তু মানসীই আমাকে যেতে দেয়নি। তাছাড়া শরদিন্দুদাও বোধ হয় যেতে দিতেন না।

কিরীটী বললে, কিন্তু পরের বিপর্যয়টা বোধ হয় তাতে এড়ানো যেত।

আপনি কি বলতে চান, তাহলে ঐ দুর্ঘটনার জন্য আমিই দায়ী?

সবটুকু দায়িত্বই আপনার ঘাড়ে আমি চাপাচ্ছি না সুকুমারবাবু, তবে আপনিও কিছুটা দায়ী বই কি!

কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না-মানসীর মৃত্যু হয়েছে।

তার মানে আপনার ধারণা মানসী এখনও বেঁচে আছেন? তাই যদি হয় তাহলে অন্য দিকটাও নিশ্চয়ই ভেবেছেন মানে মানসী তাহলে কোথায়?

হয়তো কোথাও না কোথাও সে আছে।

কিন্তু কেন? কেন তিনি অজ্ঞাতবাসে থাকবেন? কি কারণ থাকতে পারে?

তা জানি না। আমার যা মধ্যে মধ্যে মনে হয়, তাই আপনাকে আমি বলেছি কিরীটীবাবু-সুকুমার বললে।

তার মানে কি এমন হতে পারে যে তিনি বিশেষ একটি সুযোগের অপেক্ষায় আছেন এলেই তিনি আত্মপ্রকাশ করবেন।

কি জানি, ঠিক বলতে পারব নাসুকুমার যেন কেমন অসহায় ভাবে কিরীটীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।– আচ্ছা সুকুমারবাবু, আমি একবার আপনার দাদার সঙ্গে কথা বলতে চাই—আপনি ব্যবস্থা করতে পারেন?

কেন পারব না কিন্তু দাদা তো কলকাতায় নেই।

কলকাতায় নেই? কোথায় গিয়েছেন?

পুরী।

পুরী! কবে?

গত পরশু রাত্রে—এক্সপ্রেসে।

তা হঠাৎ তিনি পুরী গেলেন কেন?

ঠিক বলতে পারব না।

ঠিক আছে, তিনি ফিরে আসুন—তারপর তাকে মিট করা যাবে। আচ্ছা শরদিন্দুবাবুর দ্বিতীয় স্ত্রীরও শুনেছি দীঘার সমুদ্রে ড়ুবে মৃত্যু হয়েছে আকস্মিক ভাবে তাঁর মৃত্যুটা কি আপনার একটা স্বাভাবিক দুর্ঘটনা বলে মনে হয়, নাকি কোন পূর্ব-পরিকল্পিত ব্যাপার?

তার মানে কি বলতে চান আপনি?

মানে বলতে চাই, মানসীর যে কারণে মৃত্যুর প্রয়োজন হয়েছিল, ঠিক তেমনি কোন কারণেই তারও মৃতুটা ঘটেছে কিনা!

মনে হচ্ছে, আপনি বলতে চাইছেন—দুটো ঘটনার কোনটাই দুর্ঘটনা নয়—দুটোই পূর্বপরিকল্পিত

হ্যাঁ সুকুমারবাবু, আমার তাই মনে হয়, দুটো ব্যাপারের মধ্যেই attempt of murder ছিল!

কিন্তু কেন—কেন তাদের হত্যা করা হবে—আর কি উদ্দেশ্যেই বা হত্যা করা হবে?

উদ্দেশ্য বা মোটিভটা জানতে পারা গেলেই তো সব জানা গেল। একটা কথা ভেবে দেখুন। সুকুমারবাবু, দুজনারই মৃত্যু হয়েছে সমুদ্রে ড়ুবে এবং দুটো ঘটনারই একমাত্র প্রত্যক্ষ সাক্ষী তাদের স্বামী শরদিন্দুবাবু, ঘটনাস্থলে আর কেউ থাকলেও তার অস্তিত্ব এখনও অন্ধকারে। যাই হোক, আপাতত আপনাকে আমার আর কিছু জিজ্ঞাসা নেই। তবে আপনার সক্রিয় সহযোগিতা কিন্তু আমি সর্বদাই আশা করব—

আমি তাহলে এখন উঠি?

আসুন–শরদিন্দুবাবু ফিরে এলে যেন জানতে পারি।

জানাব–সুকুমার বিদায় নিল।

শরদিন্দু পুরীতে ছুটে এসেছিল তার সন্দেহের নিরসন করতেই। সেরাত্রে ফোনে মানসী কথা বলবার পর থেকেই শরদিন্দু যেন কিছুই আর ভাবতে পারছিল না। মানসী তাহলে বেঁচে আছে। সমুদ্রের জলে ড়ুবে শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু হয় নি! কিন্তু বেঁচেই যদি আছে—তা এতদিন সে চুপ করে ছিল কেন?

মানসী অভিযোগ জানাল, তাকে নাকি বিষপ্রয়োগে হত্যা করার চেষ্টা হয়েছিল। তার লেমন স্কোয়াশের গ্লাসে বিষ মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কখন কে তার লেমন স্কোয়াশে বিষ মেশালো? সে তো বিষ মেশায়নি। হ্যাঁ, সে অস্বীকার করবে না, মানসীর প্রতি একটা ঘৃণা ও তিক্ততা তার মনের মধ্যে জমে উঠেছিল, এমন কি মনে মনে মানসীর মৃত্যুকামনাও সে করেছে কত সময় ভেবেছেও মনে মনে, মানসীকে সে হত্যা করবে। কিন্তু পারেনি, মানসীর মুখের দিকে তাকালেই। তার সমস্ত ইচ্ছা কোথায় তলিয়ে গিয়েছে।

কটা দিন হোটেলে থেকে শরদিন্দু তন্ন তন্ন করে অনুসন্ধান করল মানসীর—কিন্তু কোন সংবাদই সংগ্রহ করতে পারল না।

এদিকে কিরীটী আর কৃষ্ণাও পুরীতে এসেছিল। দেড় বৎসর আগেকার ঘটনা—হয়তো কোন সূত্ৰই মিলবে না, তবু কিরীটী সরেজমিন তদন্ত করবার লোভ সম্বরণ করতে পারেনি।

কিরীটীও ঐ একই হোটেলে উঠেছিল, যে হোটেলে শরদিন্দু এসে উঠেছিল। শরদিন্দু ছিল সেই পূর্বেকার কুড়ি নম্বর ঘরে দোতলায়। পরে কিরীটী ও কৃষ্ণা ছিল ঐ দোতলাতেই চৌদ্দ নম্বর ঘরে।

পুরীতে পৌঁছেই পরের দিন বিকেলে কিরীটী গেল থানায়। সেখানে ঘনশ্যাম মোহান্তির সঙ্গে আলাপ হল। ঘনশ্যাম মোহান্তি প্রায় দুই বছর আছেন ঐ থানার ইনচার্জ-এ। বয়স বত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে হবে বলে মনে হয়। বেশ হৃষ্টপুষ্ট চেহারা, মাথায় সামান্য টাক, একজোড়া পুরু গোঁফ, একবারে চেন স্মোকার যাকে বলে।

মোহান্তি কিরীটীর পরিচয় পেয়ে যথেষ্ট সমাদর করলেন। তারপর কিরীটী যখন তার পুরীতে আসার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করল তখন মোহান্তি বললেন, হ্যাঁ, জলে ড়ুবে যাবার একটা কেস ঘটেছিল বছর দুই আগে। এক ভদ্রমহিলা বিকালের দিকে সমুদ্রে সাঁতার কাটতে গিয়ে ঢেউয়ের মধ্যে তলিয়ে যান।

কিরীটী বললে, তার মৃতদেহের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি?

না। চার-পাঁচ দিন ধরে খোঁজ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু মৃতদেহটা শেষ পর্যন্ত ট্রেস করা যায়নি।

ফাইলটা আছে কি আপনার কাছে? কিরীটী বলল।

আছে। বসুন আপনি।

ভিতুরের ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ বাদে ফাইল নিয়ে এলেন মোহান্তি।

ভদ্রমহিলার বয়স ছিল তেইশ। স্বামীর নাম শরদিন্দু বোস। বিজনেসম্যান, কলিকাতা থেকে পুরীতে এসেছিলেন বেড়াতে। দিন পাঁচেক বাদে ঐ ঘটনা ঘটে, শরদিন্দুই থানায় ডাইরি করে।

হঠাৎ কিরীটীর নজর পড়ল, থানায় ডাইরি করা হয় ঐ ঘটনার পরের দিন বিকালে, অর্থাৎ প্রায় ২৪ ঘণ্টা পরে। দুর্ঘটনা ঘটেছে আগের দিন বেলা চারটের পর, পরের দিন বেলা চারটেয় ডাইরি করা হয়। পুলিস থেকে তারপর স্থানীয় জেলে ও নুলিয়াদের দিয়ে অনেক অনুসন্ধান চালানো হয় মৃতদেহের, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। হয়তো মৃতদেহ ভাসতে ভাসতে অনেক দূরে চলে গিয়েছে, না-হয় হাঙ্গরে মৃতদেহ খেয়ে ফেলেছে।

মিঃ মোহান্তি কিরীটী বলল, তাহলে দুর্ঘটনার চব্বিশ ঘণ্টা পরে ডাইরি লেখানো হয়। ভদ্রলোক এত দেরি করে এলেন কেন বলেছিলেন কিছু?

না, তবে ঐদিনই সন্ধ্যায় কিন্তু আমরা রিপোর্টটা পেয়েছিলাম সঙ্গে সঙ্গে আমি নিজেই সী বিচে যাই–

শরদিন্দুবাবুর সঙ্গে হোটেলে দেখা করেননি?

সংবাদ পেয়ে গিয়েছিলাম রাত্র আটটা নাগাদ, কিন্তু ভদ্রলোক ছিলেন না হোটেলে। তার পরের দিনও সকালে হোটেলে যাই কিন্তু তখনও দেখা হয়নি। হোটেলের মালিক মিসেস ভট্টাচার্য বললেন, ঘরে তার তালা দেওয়া—রাত্রে ফিরেছেন কিনা তাও বলতে পারব না। অগত্যা ফিরে এলাম থানায়। তারপর বিকেল চারটে নাগাদ ভদ্রলোক এলেন থানায় ডাইরি করতে। বললেন তিনি নাকি সমুদ্রের ধারে ধারে সারাটা রাত খুঁজে বেড়িয়েছেন তার স্ত্রীর দেহটা।

কি করে তার স্ত্রী জলে ড়ুবলেন সে সম্পর্কে কিছু বলেননি তিনি?

বলেছিলেন বিকেলে যখন তারা হোটেলে বসে গল্প করেছিলেন, তাঁর স্ত্রীর সমুদ্রস্নানের ইচ্ছা হয়।

ঐ সময় কেউ সমুদ্রে স্নান করছিল?

না। লোকজন বড় একটা সে সময় সমুদ্রের আশেপাশে ছিল না। তবে কিছুদূরে এক প্যান্ট ও শার্ট পরিহিত ভদ্রলোক—চোখে চশমা ও মাথায় শোলার টুপি হাতে একটা ক্যামেরা নিয়ে সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়েছিলেন, একবার নাকি তিনি দেখেছেন। তারপর স্ত্রী সাঁতার দিতে দিতে ঢেউয়ের মাথায় মাথায় খানিকটা এগিয়ে যান, ভদ্রলোক মানা করা সত্ত্বেও শোনে না। হঠাৎ একটা ঢেউ এসে তাকে দূরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আর তাকে দেখতে পাওয়া যায় না। উনি সাঁতার জানতেন না বলে চেঁচামেচি শুরু করে দেন।

তারপর?

দুরে দুজন নুলিয়া ছিল—তারা ছুটে আসে কিন্তু ভদ্রমহিলাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

কিরীটী প্রশ্ন করলে, ঐ সময় সেই ভদ্রলোক, যিনি কিছুদূরে ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি সাহায্য করতে এগিয়ে আসেননি?

সে সব কথা ভদ্রলোক বলেননি।

আচ্ছা মিঃ মোহান্তি, সমুদ্রে যারা মাছ ধরে তাদের কাউকে আপনি চেনেন?

একজনকে জানি, সমুদ্রে একসময় সে মাছ ধরত—এখন বয়স হয়েছে। এককালে ভাল সাঁতারুও ছিল এবং তার কাঠের ভেলার মত নৌকাটা নিয়ে সমুদ্রের মধ্যে অনেক দূরে চলে যেত মাছ ধরতে—আড়িয়া লোকটার নাম—জাতে তেলেঙ্গা—এখন অবিশ্যি মাছ টাছ আর ধরে না—আপনি যে হোটেলে উঠেছেন তারই পাশের হোটেলে নুলিয়ার কাজ করে, যাত্রীদের স্নান করায় সমুদ্রে।

আচ্ছা আজ আমি উঠছি—কিরীটী বিদায় নিল থানা থেকে।

হাঁটতে হাঁটতে সোজা চলে এল কিরীটী সমুদ্রের ধারে। সমুদ্রের পশ্চিম দিকটায় লাল আবির ঢেলে সূর্য তখন অস্তে চলেছে, বহু বায়ুসেবী সমুদ্রের ধারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বড় বড় ঢেউগুলো। বেলাভূমির ওপরে এসে আছড়ে আছড়ে পড়ছে মুহুর্মুহুঁ। একটানা সমুদ্র গর্জন বাতাসে ভেসে আসছে।

কিরীটী সোজা মোহান্তির নির্দিষ্ট হোটেলটায় গেল। লোকটার বিশেষ খোঁজ করতে হল না। সহজেই দেখা মিলল। একটা কাল ঢ্যাঙামত প্রৌঢ় লোক। মাথার চুল সবই প্রায় পেকে গিয়েছে, শরীরের পেশীগুলো পাকান দড়ির মত। পরনে একটা লুঙ্গি—হোটেলের সামনে বারান্দায় সিঁড়ির ওপর বসে থাকতে দেখে তারই দিকে এগিয়ে যায় কিরীটী।

এই শোন!

লোকটি উঠে এল।

এখানে এই হোটেলে আড়িয়া বলে কেউ থাকে, জানিস?

সাব, আমারই নাম তো আড়িয়া আছে। তা তোর কি দরকার সাহেব আড়িয়াকে?

আছে দরকার, আয় না, ঐ সমুদ্রের ধারে গিয়ে বসি।

আড়িয়া সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাল কিরীটীর দিকে। কি চায় এই বাঙ্গালীবাবু!

আমার কাজের জন্যে তোকে ভাল বকশিস দেব। বলে কিরীটী পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করে আড়িয়ার হাতে দিল।এই টাকাটা রাখ, কাজটা হয়ে গেলে আরও পঞ্চাশ টাকা দেব।

আড়িয়া খুশি হয়ে টাকাটা হাত বাড়িয়ে নিল। বলল, বোল বাবু, কি করতে হবে আমাকে। আয় আমার সঙ্গে, বলছি–

দেখ আড়িয়া, হাঁটতে হাঁটতে কিরীটী বলল, আমি আমার একজন জানাশোনা মেয়ের সন্ধান করছি—এখানে সে বেড়াতে এসেছিল প্রায় বছর দুই আগে।

দুই বছর আগে?

হ্যাঁ রে। হঠাৎ একদিন সমুদ্রে স্নান করতে নেমে জলে ড়ুবে যায়। আমি যে হোটেলে উঠেছি সেই হোটলেই উঠেছিল মেয়েটি। ভাল সাঁতার জানত জলে ড়ুবে সে মরতে পারে না। আমার ধারণা সে এখানেই কোথাও আছে, তাকে খুঁজে বের করতে হবে।

সন্দেহ জাগে আড়িয়ার মনে। সে বলল, মেয়েটা তোর কে হয় বাবু?

মেয়েটা–মেয়েটা আমার বোন। জেলেপাড়ায় আমি একবার খোঁজ করে দেখতে চাই। তোর তো জেলেপাড়ায় যাতায়াত আছে। অনেককে সেখানে চিনিসও। কাল সকালে তুই আমাকে জেলেপাড়ায় নিয়ে যেতে পারবি?

কেন পারব না বাবু, খুব পারব।

তাহলে কাল সকালে এখানে আসিস—তোর জন্যে আমি অপেক্ষা করব।

সকালে তো হবে না! হোটেলের বাবুদের আমি স্নান করাই তখন।

তবে কখন আসবি বল। আমি এখানে এসে অপেক্ষা করব।

দুপুরে।

বেশ, তাই আসিস।

আড়িয়াকে বিদায় দিয়ে কিরীটী হোটেলে ফিরে এল। নীচের তলায় অফিস ঘরে এসে সোজা ঢুকল কিরীটী। হোটেলের মালিক মিসেস ভট্টাচার্য অফিসঘরে বসে হিসাবপত্র দেখছিলেন। আর

তার অ্যাসিস্টেন্ট দুর্গাবাবু তার পাশে দাঁড়িয়েছিল।

দুর্গাবাবুর সঙ্গে আগেই আলাপ হয়েছিল কিরীটীর। বয়স বছর ২৬-২৭ হবে, রোগা পাতলা চেহারা, গায়ের রঙ ফর্সা, পরনে ধুতি শার্ট। দু-চারটি কথা বলেই কিরীটী বুঝেছিল ছেলেটি সরল ও বোকা টাইপের। যাত্রীদের ধরে নিয়ে এসে হোটেলে তোলাই তার প্রধান কাজ।

মিসেস ভট্টাচার্যর বয়স হয়েছে তা প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। বেশ গোলগাল হৃষ্টপুষ্ট চেহারা। চোখেমুখে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির ছাপ। পরনে দামী তাঁতের শাড়ি। এক হাতে একটা মোটা সোনার বালা, অন্য হাতে একটা জেন্টস রিস্টওয়াচ। ঠোঁটের ওপরে সরু গোঁফের মত আছে। বাহু দুটিও লোমশ। চোখে সোনার চশমা।

ভদ্রমহিলা সধবা, তার স্বামীও ঐ হোটেলেই থাকেন, নিবারণ ভট্টাচার্য। দুর্গাবাবুর মুখেই শুনেছিল কিরীটী, নিবারণ ভট্টাচার্য কোন কাজ করেন না। মিলিটারীতে কাজ করতেন। স্টোর ক্লার্ক ছিলেন। হাত সাফাইয়ের বদভ্যাস ছিল। অনেক দিন হল চাকরি গিয়েছে সেই কারণেই। এখন স্ত্রীর পোয্য।

মিসেস ভট্টাচার্য।

কিরীটীর ডাকে মুখ তুলে মিসেস ভট্টাচার্য বললেন, আসুন আসুন মিঃ রায়।

আপনি কি এখন একটু ফ্রি আছেন? আপনার সঙ্গে কিছু কথা ছিল।

হা হ্যাঁ, বসুন না। দুর্গা, গণেশকে বল দুকাপ চা এ ঘরে দিয়ে যাবার জন্য। কিরীটী চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। দুর্গা চায়ের কথা বলতে চলে গেল।

বলুন মিঃ রায়!

আমি নিছক বেড়াতে কিন্তু এখানে আসিনি মিসেস ভট্টাচার্য! তবে কেন এসেছি সে কথাটা জানাজানি হয় আমি চাই না।

মিসেস ভট্টাচার্য হাসলেন, বললেন, তা কি আর বুঝিনি। বুঝেছি। না, কেউ জানবে না। বলুন এবারে—

যদিও প্রায় দুবছর আগেকার ঘটনা, তাহলেও হয়তো আপনার মনে আছে এক ভদ্রলোক ও তার স্ত্রী এখানে বেড়াতে এসেছিলেন। এসে আপনার এই হোটলের বিশ নম্বর ঘরে উঠেছিলেন? ভদ্রলোকের স্ত্রীটি সমুদ্রে সাঁতার কাটতে গিয়ে ড়ুবে যান!

মিসেস ভট্টাচার্য বললেন, হ্যাঁ, মনে আছে বৈকি। ব্যাপারটা খুবই স্যাড।

আমি সেই সম্পর্কেই সঠিক সংবাদ যোগাড় করতে এসেছি অর্থাৎ সত্যিই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল কিনা। ভদ্রলোক সারাটা রাত সমুদ্রের ধারে সন্ধান করেছিলেন মৃতদেহের, কিন্তু খোঁজ পাননি।

পরের দিন বিকেলে থানায় গিয়ে ডাইরি করেন। পুলিশ এল, অনেক খোঁজাখুঁজি হল, কিন্তু কোন সন্ধান পাওয়া গেল না।

ঐ সময় ভৃত্য গণেশ এসে দুকাপ চা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে গেল।

নিন মিঃ রায়, চা খান।

কিরীটী চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিল।

আচ্ছা, ভদ্রমহিলা জলে ড়ুবে যাওয়ায় ভদ্রলোক নিশ্চয়ই খুব মুষড়ে পড়েছিলেন? কিরীটী প্রশ্ন করল।

তা একটু বোধ হয় পড়েছিলেন, তবে খুব বেশী নয়—

কেন—ও কথা বলছেন কেন?

পরের দিনের একটা ঘটনা বললেই হয়তো ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন মিঃ রায়। অবিশ্যি ব্যাপারটা আমার চোখে পড়েনি, আমার স্বামীর কাছেই শোনা।

কি বলুন তো?

আমার স্বামীর অভ্যাস আছে রাত্রে কিছুক্ষণ একা একা সমুদ্রের ধারে ঘুরে বেড়ানো। কথাটা আপনাকে খুলেই বলি মিঃ রায়, ঐ সময়ে আমার স্বামী স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে না।

স্বাভাবিক অবস্থায় থাকেন না?

না, সন্ধ্যা থেকে ড্রিঙ্ক করে করে বোধ হয় এক সময় নেশার ঘোরেই সমুদ্রের ধারে ঘুরে বেড়াতে বের হয়, তাই বলছিলাম তার কথাটা কাউন্ট করা খুব একটা বোধ হয় উচিত হবে না। মানে গুরুত্ব দেওয়া আর কি—

তিনি কি কিছু দেখেছিলেন?

হ্যাঁ। পরের দিন অনেক রাত্রে সমুদ্রের ধারে নাকি মিঃ বোস জ্যোৎস্নার আলোয় একা একা বসে গান গাইছিলেন—

গান গাইছিলেন মিঃ বোস!

তাহলেই বলুন মিঃ রায়, কথাটা যদি সত্য হয়, তাহলে যে ভদ্রলোকের আগের দিন মাত্র স্ত্রীর জলে ড়ুবে মৃত্যু হয়েছে তার পক্ষে ঐভাবে গান গাওয়াটা–

তা তিনি যে ঐ ভদ্রলোকই আপনার স্বামী বুঝলেন কি করে?

আমার স্বামী গান শুনে এগিয়ে গিয়ে ডাকেন, মিঃ বোস! উনি আমার স্বামীর ডাকে নাকি সাড়াও দিয়েছিলেন। স্বামীর মুখে পরের দিন সব কথা শুনে আমার যেন কেমন একটু আশ্চর্য বোধ হয়েছিল মিঃ, রায়।

আচ্ছা, আপনার স্বামীর সঙ্গে আর কোন কথা হয়েছিল মিঃ বোসের সেরাত্রে?

জানি না। বলতে পারব না। কারণ আমি কোন বিশেষ কৌতূহল প্রকাশ করিনি সেদিন স্বামীর কথায়, ভুলেও গিয়েছিলাম কথাটা। আজ আপনার কথা শুনে হঠাৎ কথাটা মনে পড়ল।

আপনার স্বামীর সঙ্গে কি কথা বলতে পারি?

কেন পারবেন না, সে তো এখন হোটেলেরই একতলায় তার ঘরে বসে বসে ড্রিঙ্ক করছে, চলুন না, যাবেন তো–

চলুন। কিরীটী উঠে দাঁড়াল।

কিরীটীকে সঙ্গে নিয়ে হোটেলের একতলার একেবারে কোণের দিকের একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন মিসেস ভট্টাচর্য। দরজাটা ভেজানো ছিল। কোন সাড়াশব্দ না দিয়েই মিসেস ভট্টাচার্য ভেজানো দরজা ঠেলে কিরীটীকে নিয়ে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলেন।

কিরীটীর নজরে পড়ল ঘরের আলোয়—পরনে একটা মিলিটারীর রং জ্বলে যাওয়া বটলগ্রীন প্যান্ট ও গায়ে একটা গেঞ্জি, বছর ষাট-বাষট্টির একটা লোক চেয়ারে বসে গুনগুন করে একটা ইংরেজি গানের সুর ভাঁজছে! চ্যাপটা লম্বা চেহারা, অনেকটা ঝাকাসের মত শীর্ণ। গাল দুটো– ভাঙা, মুখে খোঁচা খোঁচা কাঁচাপাকা দাড়ি, মাথায় ঝাকড়া ঝাঁকড়া বিশৃঙ্খল চুল। সামনের টেবিলে একটা অর্ধসমাপ্ত দিশী মদের বোতল আর অর্ধেক ভর্তি একটা কাঁচের গ্লাস। শকুনের মত নাক। চওড়া ঠোঁট, চোখ দুটো ক্ষুদে ক্ষুদে।

কি চাই ডার্লিং? লোকটা বললে।

ইনি তোমার সঙ্গে আলাপ করতে চান। মিসেস ভট্টাচার্য বললেন।

হু ইজ হি? কৌন্ হ্যায় ইয়ে আদমী?

মিসেস ভট্টাচার্যের চোখেমুখে একটা বিরক্তির ভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বললেন, মিঃ রায়, বিখ্যাত সত্যসন্ধানী কিরীটী রায়

কিরীটী রায়—মানে দ্যাট ফেমাস ম্যান! ইয়েস–ইয়েস আই নো হিম।

আপনি আমাকে চেনেন? কিরীটী প্রশ্ন করল।

চিনি মানে নাম শুনেছি।

উনি তোমার সঙ্গে আলাপ করতে চান। মিসেস ভট্টাচার্য বললেন।

বাট আই অ্যাম অ্যান অর্ডিনারী পার্সন!

কি যে দিবারাত্র ঐ বিষগুলো গেলো! মিসেস ভট্টাচার্য বিরক্তি-কণ্ঠে বললেন।

বাস, দাস ফার অ্যান্ড নো ফাদার! তুমি যেতে পার।

রোষকষায়িত লোচনে স্বামীর দিকে তাকিয়ে মিসেস ভট্টাচার্য চলে গেলেন।

বসুন স্যার বসুন, বলতে বলতে একটা চেয়ার ঠেলে দিল নিবারণ ভট্টাচার্য।

কিরীটী উপবেশন করল। চলবে স্যার?

না, ধন্যবাদ।

কিন্তু স্যার, আমার মত স্ত্রীর কৃপাপ্রার্থী একটা মাতালের সঙ্গে আপনি কেন আলাপ করতে চান, বলুন তো?

আপনার হোটেলে এলাম অথচ আসল মালিকের সঙ্গে পরিচ্চ্য হবে না, তাই–

নো, নো স্যার, আসল মালিক হার একসেলেন্সি শ্রীমতী সুষমা ভট্টাচার্য। আমার কাজ অনেক দিনই ফুরিয়ে গিয়েছে, চাকরি যাবার পর টাকাটা এনে ওদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম, অ্যান্ড দেয়ার এন্ডস দি ম্যাটার!

তাহলে তো আপনার টাকাতেই এই হোটেল চালু হয়েছিল, মিঃ ভট্টাচার্য!

না না, আমার সে টাকা নাকি অতি সামান্য–খুদকুঁড়ো—যাক সে কথা! আমাকে একটা করে বোতল দিলেই আমি সন্তুষ্ট। আর আমার প্রয়োজনটাই বা কি! এবারে বলুন মিঃ রায়, আপনি হঠাৎ আমার সঙ্গে আলাপ করতে এলেন কেন?

কিরীটী তখন মানসীর মৃত্যুর ব্যাপারটা বর্ণনা করে বললে, সেই সম্পর্কেই আপনাকে আমি কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই!

হ্যাঁ, মনে আছে আজও আমার সেই ভদ্রলোকের কথা কিন্তু সে তো অনেক দিন হয়ে গিয়েছে।

তা তো একটু হয়েছেই—

তবু বেটার লেট দ্যান নেভার!

হুঁ, তাহলে দেখছি আপনার মনেও ব্যাপারটা সন্দেহের উদ্রেক করেছে!

দেখুন মিঃ রায়, সেদিন মিসেস বোসের ঐভাবে জলে ড়ুবে মৃত্যুটা আমার কাছে কেমন যেন একটু গোলমেলেই মনে হয়েছিল—

কেন, গোলমেলে মনে হয়েছিল কেন আপনার?

কারণ মেয়েটি যেরকম সাঁতার জানত বলে শুনেছিলাম, তাতে তার ঐভাবে ড়ুবে যাওয়াটা কেমন যেন একটু অস্বাভাবিক। আরও কথা আছে এর মধ্যে মিঃ রায়—আমার অভ্যাস আছে অনেক রাত্রে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে—একা একা সী বীচে গিয়ে হেঁটে বেড়ানো। ফলে হোটেলের সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, আমি ঘুমাই না। দু-তিন রাত-রাত তখন একটা-দেড়টা হবে—ওদের ঘর থেকে চেঁচামেচির শব্দ শুনেছিলাম আমি–

তাই নাকি?

হ্যাঁ। একদিন তাই কৌতূহলে দোতলায় ওদের ঘরের দরজায় গিয়ে কান পাতি, কতকগুলো কথা সেরাত্রে আমার কানে এসেছিল। শুনলাম মেয়েটি বলছে, তোমার ধারণা ভুল। কারও প্রতিই আমি আকৃষ্ট নই।

ভদ্রলোক বললে, ইটস এ ড্যাম লাই! মিথ্যা, তোকে আমি বিশ্বাস করি না! কলকাতায় আমি ঘুমোলে প্রতি রাত্রে তুই সুকুমারের ঘরে যেতিস—

তুমি যেমন জঘন্য তেমনি নীচ!

তোকে আমি খুন করব—খুন করে ফাঁসি যাব।

সে কি আর আমি জানি না, তা-ই—শেষ পর্যন্ত আমার বরাতে তা-ই আছে।

তারপরই ভদ্রলোকের সে কি হাউমাউ করে কান্না স্যার!

কান্না? কিরীটীর প্রশ্ন।

হ্যাঁ। ভদ্রলোক তারপর বললে, তোকে ছাড়া আমি বাঁচব না মানসী, তুই কি চাস বল–সুকুমারকে তুই ছেড়ে দে।

মেয়েটি বললে, সুকুমারকে ও বাড়ি থেকে চলে যেতে বললেই তো পার—

না, সে হবে না। ও চলে গেলে অন্যত্র প্রেম চালাবার খুব সুবিধা হবে, না? না, তোদের দুজনকেই আমার চোখের সামনে থাকতে হবে।

ভট্টাচার্য একটু থেমে বলতে লাগলেন, কেমন একটা নেশা ধরে গেল আমার। তারপর আরও দুরাত বন্ধ দরজায় কান পেতে ওদের কথা শুনেছি।

গ্লাসটা নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল, নিবারণ ভট্টাচার্য আবার বোতল থেকে গ্লাসে ঢালতে গিয়ে দেখলেন, বোতলটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। বললেন, যাঃ, এর মধ্যেই ফুরিয়ে গেল!

কিরীটী বললে, আমার কাছে আছে, তবে বিলেতী—

বিলেতী আঃ, কত দিন খাই না! কোথায় আছে স্যার?

আপনি বসুন, আমি আনছি।

কিরীটী তার ঘরে গিয়ে একটা VAT 69-এর বোতল নিয়ে এল।

বোতলটা হাতে করে নিবারণ ভট্টাচার্য বললেন, স্যার দেখছি একজন রসিক ব্যক্তি, এ সবও চলে।

কিরীটী মৃদু হাসল।

বোতল থেকে খানিকটা গ্লাসে ঢেলে একটা দীর্ঘ চুমুক দিয়ে ভট্টাচার্য বললেন, আঃ, একটা যুগ পরে তারপরই একটু থেমে বললে, কি জানেন মিঃ রায়, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যদি একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং না থাকে সে দাম্পত্য জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এই নিজেকে দিয়েই তো বুঝতে পারি, একান্ত অনাবশ্যক আজ আমি সুষমার জীবনে—আমি এতটুকু বিস্ময় বোধ করব না ও যদি একদিন বিষপ্রয়োগে আমায় হত্যা করে।

না না, এ কি বলছেন? কিরীটী বললে।

আমার কি মনে হয় জানেন মিঃ রায়, ঐভাবে মিসেস বসুর মৃত্যু হওয়ায় মিঃ বসু মনে মনে খুশিই হয়েছিলেন—নতুবা পরের দিনই সমুদ্রের ধারে বসে কেউ গান গাইতে পারে? আর আমি কাল রাত্রে তাই বলছিলাম ওকে–

কাকে বলছিলেন?

কেন, মিঃ বসুকে, সেই মেয়েটির স্বামীকে!

সেই মেয়েটির স্বামীকে! গতকাল!

হ্যাঁ, তিনি তো এখন এই হোটলেই আছেন। আমার স্ত্রী তাকে চিনতে না পারলেও আমি কিন্তু তাকে দেখামাত্রই চিনতে পেরেছি। আর কি আশ্চর্য জানেন, তিনি আগেরবারের মত সেই বিশ নম্বর ঘরেই এবারেও উঠেছেন। আপনি কোন্ ঘরে আছেন মিঃ রায়?

চোদ্দ নং ঘরে—

তাহলে তো মিসেসের দুখানা ঘরের পরেই—

কি রকম?

১৫, ১৬, ১৭ নম্বরের কোন ঘর নেই—আগে অবিশ্যি আলাদা আলাদা তিনটি ঘর ছিল, এখন ঐ তিনটে কামরায় পার্টিশন তুলে দিয়ে দুটো ঘর করে মিসেস থাকেন।

আর আপনি এইখানে থাকেন?

হ্যাঁ। প্রত্যেক রাত্রে যে ওর তরুণ বন্ধুরা ওকে সঙ্গদান করতে আসে, সব জানি স্যার সব জানি। সবাই জানে আমাকে মোদো মাতাল-কিন্তু সব বুঝি, সব টের পাই আমি। জানেন, সেবারে যখন উনি এসেছিলেন, ওঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পরও দুটো দিন এখানে এই হোটেলে ছিলেন উনি, সে সময় ওঁকেও এক রাত্রে মিসেসের ঘরে যেতে দেখেছি।

সে কি! কিরীটী যেন বিস্ময়ে হতবাক।

জানেন এককালে এই হোটেলে অনেকেই এসে উঠত, কেন জানেন—ঐ সুষমার জন্য। আজই না হয় মুটিয়ে গিয়েছে সুষমা, বয়স হয়েছে, কিন্তু দশ বছর আগে খুব সেক্সি ছিল দেখতে এবং আমার টাকার সাহায্য গোড়ার দিকে নিলেও সুষমা তার সেক্সকেই আসল মূলধন করেছিল এবং ক্রমশ আজ যা দেখছেন এই হোটেল—সেই রূপটি পরিগ্রহ করেছে, ফলাও ব্যবসা হয়ে উঠেছে।

কিরীটী বুঝতে পারছিল যে নেশার ঝোঁকে আজ এই মুহূর্তে মনের মধ্যে এতদিনকার চাপা দুঃখটা প্রকাশ করে চলেছেন নিবারণ ভট্টাচার্য। কিরীটী তাই কোন রকম বাধা দেয় না, নিঃশব্দে শুনে চলে। নিবারণ ভট্টাচার্যের গলাটা যেন ধরা ধরা। মনে হয় লোকটা যেন কাঁদছেন।

আমার কি দুঃখ জানেন মিঃ রায় একদিন ছিল যেটা তার প্রয়োজনের মূলধন, এখন প্রয়োজন মিটে যাবার পর হয়েছে একটা অভ্যাস। জানেন মিঃ রায়, আমি নিঃসঙ্গ একাকী সত্যিই, কিন্তু সুষমা আমার চাইতেও নিঃসঙ্গ একাকী। অনেক টাকা আজ ওর, কিন্তু মনের তৃপ্তি ওর নেই।

কথায় কথায় কখন যে রাত শেষ হয়ে এসেছিল। কিরীটী উঠে দাঁড়াল এবং ঘর থেকে বের হয়ে এল। নিবারণ ভট্টাচার্য তখন বোতলটা অর্ধেক করে এনেছেন। দোতলায় উঠে থমকে দাঁড়াল কিরীটী। মিসেস ভট্টাচার্যের ঘর থেকে একজন বের হয়ে এল।

দুপুরে মিসেস ভট্টাচার্য তার অফিস কামরায় একা একা বসে যখন হোটেলের হিসাবনিকাশ করছিলেন কিরীটী এসে অফিস ঘরে ঢুকল।

মিসেস ভট্টাচার্য।

মিঃ রায়? আসুন আসুন, বসুন।

কিরীটী একটা চেয়ার টেনে নিয়ে মিসেস ভট্টাচার্যের মুখখামুখি বসল।

মিসেস ভট্টাচার্য, কুড়ি নম্বর ঘরে কে ভদ্রলোক আছেন বলুন তো?

কেন বলুন তো? মিসেস ভট্টাচার্য সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালেন কিরীটীর মুখের দিকে।

উনি কি শরদিন্দু বোস?

আপনি ওঁকে চেনেন নাকি?

না, ঠিক চিনি না ওঁকে, তবে অনুমান করছি। উনি কাল রাত্রে আপনার ঘরে গিয়েছিলেন?

আপনি কি করে জানলেন?

জেনেছি। আপনার যদি বিশেষ কোন আপত্তি না থাকে তো যদি বলেন—কেন কাল রাত্রে উনি আপনার ঘরে গিয়েছিলেন?

না না, আপত্তি কি থাকতে পারে, ওঁর ধারণা, সেবারে জলে ড়ুবে ওঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয়নি, তাই আর একবার ভাল করে ব্যাপারটা অনুসন্ধান করার জন্যই এখানে এসেছেন উনি, আর আমার সাহায্য চান বলেছিলেন, সেই ব্যাপারেই।

উনি এই দুই বৎসরের মধ্যে আর এসেছিলেন এখানে?

এলেও আমি জানি না। আমার এখানে ওঠেননি।

তা হঠাৎ দুবছর পরে তার মনের মধ্যে সন্দেহটা দেখা দিল কেন—কিছু বলেননি আপনাকে?

না, সে-সব কিছু বলেননি।

আপনি কি একটা কথা জানেন মিসেস ভট্টাচার্য, প্রথমা স্ত্রীর জলে ড়ুবে মৃত্যু হবার কয়েক মাস পরেই উনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করেছিলেন?

তাই নাকি! না, জানি না তো!

হ্যাঁ, আর সে স্ত্রীরও সমুদ্রে ড়ুবে মৃত্যু হয়েছে একই ভাবে। কাজেই এ থেকে কি সহজেই মনে হয় না, প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যুর কথাটা একেবারেই তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, এমন কি দ্বিতীয়া স্ত্রীর জলে ড়ুবে মৃত্যুর পর যে কথাটা এতদিন তার মনে হয়নি, আজ হঠাই বা সে কথাটা তার মনে হল কেন? তবে কি মৃতদেহটা পাওয়া যায়নি বলে তার হঠাৎ ধারণা হয়েছে যে তাঁর প্রথমা স্ত্রীর জলে ড়ুবে মৃত্যু হয়নি? এবং সেটাই ভাল করে অনুসন্ধান করবার জন্য আবার এতদিন পরে পুরীতে ছুটে এসেছেন? কিরীটীর শেষের কথাগুলো কতকটা যেন নিম্নকণ্ঠে স্বগতোক্তির মত শোনাল।

কাল রাত্রে হঠাৎ—তা রাত তখন প্রায় বারোটা হবে, আমার ঘরের দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দ শুনে দরজা খুলে দেখি উনি বললেন, আমাকে চিনতে পারছেন মিসেস ভট্টাচার্য?

বললাম, আপনাকে সেই দিনই চিনেছি, যেদিন আপনি এই হোটেলে এসে ওঠেন। তখন আমার কিছু কথা আছে আপনার সঙ্গে বলে উনি আমার ঘরে এসে ঢুকলেন। এবং বললেন, আমি যে কারণে এবারে এখানে এসেছি সে কথাটা গোপন রাখতে চাই এবং যাতে জানাজানি না হয় সেই কারণেই আপনার সঙ্গে এত রাত্রে দেখা করতে এসেছি। মিসেস ভট্টাচার্য, আপনার হয়ত মনে আছে বছর দুই পূর্বে আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে এখানে বেড়াতে এসে এই হোটেলেই কুড়ি নম্বর ঘরে উঠেছিলাম—এখানে আসার পাঁচ দিন পরে বিকেলের দিকে সমুদ্রে স্নান করতে গিয়ে আমার স্ত্রী জলে ড়ুবে যান—আমি বললাম, মনে আছে। তখন উনি বললেন, আপনি হয়তো জানেন না আমার স্ত্রী খুব ভাল সাঁতার জানত, তাই প্রথম থেকেই কেন যেন আমার ধারণা হয়েছিল যে, সে হয়তো জলে ড়ুবে যায়নি, আমি সেই কারণে সারাটা রাত ও পরের দিন সমুদ্রের ধারে ধারে তার অনুসন্ধান করি কিন্তু কোন সন্ধান পেলাম না, তখন পুলিসে ডাইরি করি।

উনি আর কি বলেছেন? কিরীটী শুধাল।

বললেন, যেটা আমার মনের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব জাগিয়েছিল সেদিন, পরে সেটাই একটা বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত হয়েছে। মনে হয় সে আজও বেঁচে আছে—তাই আর একবার ব্যাপারটা ভাল করে অনুসন্ধান করবার জন্যই গোপনে আর একবার পুরীতে এসেছি। কিন্তু জায়গাটার সঙ্গে তো আমার বিশেষ তেমন একটা পরিচয় নেই, আপনারা দীর্ঘদিন এখানে আছেন—তাই মনে হল এ ব্যাপারে আপনি হয়তো আমাকে কিছু সাহায্য করতে পারেন।

আমি বললাম, আমি কি ভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি মিঃ বোস?

মিঃ বোস বললেন, বাইরে থেকে এখানে আপনার হোটেলে এসে যারা থাকেন তাঁরা নন—এখানকার যেসব স্থানীয় লোক মধ্যে মধ্যে আপনার হোটেলে আসেন, তাঁদের সঙ্গে আপনার নিশ্চয় পরিচয় আছে তাদের কাছ থেকে আপনি যদি জানতে পারেন এই ফটোর সঙ্গে মিল আছে এমন কোন স্ত্রীলোককে তাঁরা দেখেছেন কিনা-বলে পকেট থেকে তার স্ত্রীর একটা ফটো বের করে আমাকে দেন।

ফটোটা আছে আপনার কাছে? কিরীটী প্রশ্ন করল।

হ্যাঁ, এই যে দেখুন না-বলে মিসেস ভট্টাচার্য ড্রয়ার থেকে একটা ফটো বের করে কিরীটীর সামনে রাখল।

কিরীটী দেখল, ফটোটা মানসীরই ফটো। পরেশ নন্দী তাকে যে ফটোটা দিয়েছেন তার সঙ্গে হুবহু মিল আছে চেহারার।

আপনি আপনার এখানকার পরিচিত কাউকে ফটোটা দেখিয়েছেন?

না, এখনও সেরকম কেউ আসেননি বলে দেখাইনি। তবে আজ অবিনাশবাবুর আসার কথা আছে—আজ তো শনিবার—শনিবার শনিবার উনি সন্ধ্যার পর আমার সঙ্গে গল্প করতে হোটেলে আসেন।

কিরীটী বুঝতে পারে—অবিনাশবাবু হয়তো কোন এক সময় সুষমা ভট্টাচার্যর একজন গুণমুগ্ধ ছিলেন, তার রূপের পূজারী ছিলেন।

অবিনাশবাবু কি করেন?

এখানে মন্দিরের কাছে বাজারে তার বড় একটা কাপড়ের দোকান আছে। অবিনাশবাবু ছাড়াও আর একজনকে জিজ্ঞাসা করব ভেবেছিলাম।

সে কে?

উদয়—একজন মস্ত বড় সিনেমা আর্টিস্ট। ওড়িয়া ছবিতে অভিনয় করে। তার অনেক গুণমুগ্ধও আছে।

বয়স কত ভদ্রলোকের? কিরীটী প্রশ্ন করল।

চল্লিশ বিয়াল্লিশ হবে। বললেন মিসেস ভট্টাচার্য।

আপনার সঙ্গে তার কত দিনের আলাপ?

তা আজ প্রায় কুড়ি-বাইশ বছর তো হবেই-মিসেস ভট্টাচার্য বললেন।

কিরীটী বুঝতে পারে, উদয়ও হয়তো একদিন সুষমার গুণমুগ্ধদের একজন ছিল। এবং আজও সেই টানেই সুষমার কাছে হয়তো আসা-যাওয়া করে।

ঐ সময় একজন সুদর্শন ভদ্রলোক এসে ঘরে ঢুকলেন, হাতে তার একটা খাম।

বৌদি!

আরে এস এস উদয়বাবু—সুষমা ভট্টাচার্য সানন্দ সম্ভাষণ জানালেন।

কিরীটী তাকাল আগন্তুকের দিকে। মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। সুগঠিত দেহ, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ কোঁকড়া চুল সযত্ন-বিন্যস্ত। কিন্তু তার মধ্যে দু-একটা রূপালী চুল যেন চোখে পড়ে। চোখে শৌখীন সোনার-ফ্রেমের চশমা! পরনে দামী ট্রাউজার ও টেরিলিনের হাওয়াই শার্ট!

অনেক দিন পরে এলে উদয়বাবু-বৌদিকে ভুলে গিয়েছিলে বুঝি? মিসেস সুষমা ভট্টাচার্যর মৃদু অভিযোগ।

না না, তা নয় বৌদি, একটা ছবির শুটিং করতে কয়েক দিনের জন্য কোণারক গিয়েছিলাম। কিন্তু একে তো চিনলাম না বৌদি! বেড়াতে এসেছেন বুঝি?

তাই। বিখ্যাত লোক, নাম শুনে থাকবে হয়তো–কিরীটী রায়।

সত্যসন্ধানী কিরীটী রায়! উদয়বাবুর চোখে-মুখে একটা বিস্ময় ঝলসে ওঠে মুহূর্তে। কিরীটীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল উদয়, আপনার নামই এতকাল শুনে এসেছি কিরীটীবাবু চাক্ষুষ এই প্রথম দেখলাম আপনাকে! কিরীটী মৃদু হাসল। কি বইয়ের শুটিং ছিল উদয়? মিসেস ভট্টাচার্য শুধালেন।

কলঙ্ক। জান বৌদি, সেই যে নতুন মেয়েটির কথা বলেছিলাম-কলঙ্ক ছবিতে সেকেন্ড হিরোয়িনের পার্ট করছেন। যদিও বাঙালী কিন্তু চমৎকার ওড়িয়া বলেন।

কথা বললে এবার কিরীটী, বাঙালী মেয়ে ওড়িয়া ছবিতে অভিনয় করছেন?

হ্যাঁ, আর এই তার প্রথম বই। চমৎকার ফটোজেনিক ফেস। আর অভিনয়ও করছেন চমৎকার। এই যে দেখুন না, গোটাকয়েক কপি আছে আমার সঙ্গে-বলে খাম থেকে গোটাতিনেক স্টীল বের করে সামনে এগিয়ে দিল উদয়।

কোণারকের সূর্যমন্দিরের এক অংশে হেলান দিয়ে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। ছবিটার দিকে তাকিয়ে কিরীটীর চোখের পাতা পড়ে না।

মিসেস ভট্টাচার্য ঐ সময় কিচেনের দিকে উঠে গেলেন এবং বলে গেলেন, বোসো, আমি কফির কথা বলে আসি।

ঘরের মধ্যে কিরীটী আর উদয়। কি আশ্চর্য রকমের মিল মানসীর মুখের সঙ্গে!

কিরীটী কিন্তু তার মনের বিস্ময় প্রকাশ করল না। কেবল উদয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, মেয়েটির নাম কি উদয়বাবু?

লক্ষ্মী।

পদবী কি?

তা তো জানি না!

এখানকারই মেয়ে? মানে এই শহরেই থাকেন?

না, ভুবনেশ্বরে থাকেন শুনেছি।

বিবাহিত কি মেয়েটি?

বিবাহিত নন বলেই শুনেছি আর সিঁথিতে সিঁদুর দেখিনি।

আচ্ছা উদয়বাবু মেয়েটির সঙ্গে একবার দেখা করা যায়?

মেয়েটি অত্যন্ত রিজার্ভড় প্রকৃতির। কারও সঙ্গেই বড় একটা কথা বলেন না।

মেয়েটি সম্পর্কে আপনি আর কিছু জানেন উদয়বাবু?

নীলমণি-মানে আমাদের ডিরেক্টরের কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দেখে অ্যাপ্লাই করেছিল, নীলমণি ওঁকে ডেকে পাঠায়—আমিও সেদিন নীলমণির অফিসে উপস্থিত ছিলাম, নীলমণির পছন্দ হয়ে যায় মেয়েটিকে—ওঁর ক্যামেরা টেস্ট ভয়েস টেস্ট নিয়ে নীলমণির ভাল লাগে—সে কন্ট্রাক্ট সই করায়, নীলমণির মুখেই শুনেছি মেয়েটি ভুবনেশ্বরের কোথায় যেন থাকেন।

আপনাদের আবার শুটিং কবে উদয়বাবু?

দশ দিন একটানা শুটিং হয়ে গেল এই তো গত পরশু, আবার শুটিং দিন দশেক পরে।

লোকেশন কোথায়?

পুরীর সমুদ্রের আশেপাশে শুটিং হবে শুনেছি—আউটডোর, এই ছবির বারো আনা অংশই প্রায় আউটডোরে।

কথাটা তাহলে আপনাকে খুলেই বলি উদয়বাবু—কিরীটী বললে, আমার এক বন্ধু আসছে এখানে দুই-তিন দিনের মধ্যে। সে একটা চিত্র পরিচালনা করছে, স্ক্রিপ্ট রেডি, নায়কও ঠিক হয়ে গিয়েছে। এখন সে নায়িকার জন্যে সন্ধান করছে নতুন মুখ। আপনাদের বইয়ের ঐ। মেয়েটির ছবি দেখে মনে হচ্ছে হয়তো তার মেয়েটিকে পছন্দ হয়ে যেতে পারে।

ঠিক আছে, আমি নীলমণিকে বলব। সে নিশ্চয়ই লক্ষ্মীর ঠিকানা জানে।

বলবেন অনুগ্রহ করে। আর মেয়েটির সঙ্গে যদি একটিবার আমার বন্ধুর দেখা হয়ে যায়, তবে খুব ভাল হয়।

নিশ্চয়ই বলব, আমি কালই সকালে এসে আপনাকে জানিয়ে যাব।

সেই রাত্রেই কিরীটী ট্রাঙ্ককলে সুব্রতর সঙ্গে কলকাতায় কথা বলল।

সুব্রত, আমি পুরী থেকে কিরীটী বলছি।

কি ব্যাপার বল তো? সুব্রতর প্রশ্ন?

এখানে এলেই সব জানতে পারবে। গণেশবাবু—আমাদের গণেশ ঘোষকে চেনো তো, রেলে কাজ করেন, তাকে ধরলেই একটা রিজার্ভেশন পেয়ে যাবে। কালই চলে এস।

ঠিক আছে।

কিরীটী রিসিভারটা নামিয়ে রাখল।

পরের দিন সকালবেলা দশটা নাগাদ উদয়বাবু এলেন।

বললেন, সরি কিরীটীবাবু, লক্ষ্মীদেবী ভুবনেশ্বরে নেই!

নেই?

না, নীলমণি বললে তিনি নাকি কলকাতায় গিয়েছেন, ফিরবেন সেই শুটিংয়ের আগের দিন। গতকালই নাকি তিনি নীলমণিকে ফোনে জানিয়েছেন।

ঠিক আছে, আমার চিত্র পরিচালক বন্ধুকে কথাটা জানিয়ে দেব। আর একটা কথা আপনাকে জানিয়ে দিই উদয়বাবু, আপনার কথাও গতরাত্রে আমার বন্ধুকে জানিয়েছি, আপনার সম্পর্কেও সে ইন্টারেস্টেড!

সত্যি? উদয়বাবু সংবাদটায় উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন।

হ্যাঁ, আমার বন্ধুটি সবই নতুন মুখ খুঁজছেন।

কিরীটী উদয়বাবুর দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে সে ঠিকই টোপ ফেলেছে।

উদয়বাবুর কাছে গতকালই ফটোটা দেখার পর থেকে কিরীটী ফটোর মেয়েটার কথাই ভেবেছে। কেন যেন তার ধারণা হয়েছে ফটোর লক্ষ্মী আর মানসী অভিন্ন। অবিশ্যি এও তার মনে হয়েছে, লক্ষ্মী একান্তই যদি মানসী না হয়, কেবলমাত্র আশ্চর্য রকমের একটা মিল উভয়ের মধ্যে—তাহলেও তার কার্যসিদ্ধি হয়ে যাবে। নতুন একটা প্ল্যান তার মাথায় এসেছে।

ঐদিনই রাত্রে, রাত্রি তখন সোয়া এগারোটা হবে। হোটেলের সকলের খাওয়াদাওয়া চুকে গিয়েছে প্রায়। ঘরে ঘরে আলো নিভে গিয়েছে। কিরীটী তার ঘরে বসে একটা উপন্যাস পড়ছিল, বন্ধ দরজায় গায়ে মৃদু টোকা পড়ল। কিরীটী উঠে দরজা খুলে দিল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সুষমা ভট্টাচার্য।

মিসেস ভট্টাচার্য, আসুন!

কথা আছে–মিসেস ভট্টাচার্য ভিতরে ঢুকে বললেন।

বসুন–বলে কিরীটী ঘরের দরজার ভিতর থেকে খিল তুলে দিল।

কাল আপনাকে একটা কথা বলিনি কিরীটীবাবু। মিসেস ভট্টাচার্য বললেন, উদয়বাবুদের কলঙ্ক ছবিতে যে নতুন মেয়েটি অভিনয় করছে—মানে উদয়বাবু যে ফটোটা দেখালেন সেই ফটোর চেহারার সঙ্গে শরদিন্দুবাবু যে ফটোটা দিয়েছেন তার একটা আশ্চর্য রকমের মিল আছে চেহারায়–

লক্ষ্য করেছি। কিরীটী বললে, কিন্তু একটা কথা মিসেস ভট্টাচার্য, শরদিন্দুবাবুকে কি আপনি ঐ মেয়েটির কথা বলেছেন?

না—তবে ভাবছি বলব!

না, বলবেন না। আমাদের অনুমান শেষ পর্যন্ত যদি মিথ্যেই প্রমাণিত হয় ভদ্রলোক মনে অত্যন্ত আঘাত পাবেন। তার চেয়ে আগে আমি ভদ্রমহিলার সঙ্গে দেখা করি কথাবার্তা বলি, তারপর–

আচ্ছা আপনার কি মনে হয় কিরীটীবাবু, মানসী দেবীর সেদিন ঐভাবে অদৃশ্য হয়ে যাবার পিছনে কারও কোন অদৃশ্য হাত ছিল?

ছিলই যে তা বলব না? তবে থাকলেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

তবে কি মিসেস ভট্টাচার্য কিছুক্ষণ কিরীটীর মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বললেন, সেদিন মানসী দেবীকে হত্যা করবার চেষ্টা করা হয়েছিল।

সেটা এখনই সঠিক ভাবে বলা যাচ্ছে না বলে কিরীটী কথাটা এড়িয়ে গেল।

আরও কিছুক্ষণ পরে মিসেস ভট্টাচার্য বিদায় নিলেন কিরীটীর কাছ থেকে।

সুব্রত পুরীতে এসে পৌঁছাল পরের দিন। কিরীটী স্টেশনে গিয়েছিল।

দুজনার দেখা হলে সুব্রত বললে, কি ব্যাপার বল তো, এত জরুরী তলব?

কিরীটী রিকশায় করে আসতে আসতেই পথে তার যা বলবার ছিল বললে।

সুব্রত সব শুনে বললে, তাহলে দুটো ব্যাপারে তুই স্থিরনিশ্চিত! প্রথমত, মানসী দেবী বেঁচে আছেন আজও এবং দ্বিতীয়ত, তাকে সেদিন হত্যা করারই চেষ্টা করা হয়েছিল।

কিরীটী বললে, ঠিক তাই—

কিন্তু কে সে শরদিন্দু, না সুকুমার?

দুজনকেই আমি সন্দেহ করি কিরীটী বললে, সুকুমারকে সন্দেহ করি সে হতাশ-প্রেমিক। বলে—অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত মানসীকে পেল না বলে, আর শরদিন্দু—তার মনে সব কথা শুনে একটা বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গিয়েছিল বিবাহের পরও মানসী সুকুমারকে ভুলতে পারেনি এবং সে দ্বিচারিণী।

দুপক্ষকে ঘিরেই যুক্তি তোর অকাট্য, তবে আমার মনে হয়, শরদিন্দুবাবুই সেদিন স্ত্রীকে কৌশলে হত্যা করবার চেষ্টা করেছিল। কারণ সে সময় শরদিন্দুই পুরীতে ছিল, সুকুমার ছিল না।

সেটাও প্রমাণসাপেক্ষ। কিরীটী বললে।

যাক, বর্তমান নাটকে আমার রোলটা হচ্ছে তাহলে ফিল্ম ডাইরেকটারের!

হ্যাঁ।

কিন্তু আরও ভাল হত, বোধ হয় আমার রোলটা করবার জন্য বিরূপাক্ষ সেনের বন্ধু ফিল্ম ডাইরেকটার শিশির গুপ্তকে নিয়ে এলে।

কিরীটী হেসে ওঠে।

পরবর্তী শুটিংয়ের দিনের আশায় আশায় বসে থাকতে থাকতে কিরীটী আর সুব্রত দুজনেই হাঁপিয়ে উঠেছিল।

যেদিন ওই শুটিং হওয়ার কথা ঠিক, তার আগের দিন সকালে উদয়বাবু এসে বললেন, লক্ষ্মীদেবীর নাকি কোন খবরই নেই। ডিরেক্টার নীলমণি অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে উঠেছে তার কোন সংবাদ না পেয়ে। ভুবনেশ্বরে বার বার টেলিফোন করেও নীলমণি তার কোন সন্ধান পায়নি। ফলে এখন নির্দিষ্ট দিনে শেষ পর্যন্ত শুটিং হবে কিনা সে সম্পর্কে ইউনিটের সকলেই বেশ সন্দিহান। পুরীতে যে শুটিং হওয়ার কথা তার সবটাই প্রায় লক্ষ্মীদেবীকে নিয়ে!

কিরীটী শুধাল, ভুবনেশ্বরের যে ফোন নাম্বার লক্ষ্মী দেবীর, সেটা নিশ্চয়ই তার বাড়ির ফোন নাম্বার?

উদয় বললেন, ঠিক জানি না। কিন্তু কেন বলুন তো?

নীলমণিবাবু কি সে বাড়িটা জানেন? মানে যেখানে লক্ষ্মী দেবী থাকেন?

জানে বই কি।

ঠিকানাটা জেনে আসতে পারেন উদয়বাবু?

কেন পারব না—আমি আজই বিকেলে আপনাকে এসে জানাব।

উদয়বাবু চলে গেলেন।

কিরীটী তার পাইপটায় অগ্নিসংযোগ করে ঘরের খোলা জানালাপথে রৌদ্রঝলকিত সমুদ্রের দিকে তাকিয়েছিল। সুব্রত এগিয়ে আসে। বললে, কি ভাবছ কিরীটী?

ভাবছি এইভাবে অপেক্ষা না করে আগেই আমাদের লক্ষ্মী দেবীর সন্ধানে তার ভুবনেশ্বরের বাড়িতে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কথাটা শেষ করা হল না—কিরীটী হঠাৎ বললে, মনে হচ্ছে যেন সুকুমারবাবু কবে এলেন পুরীতে? কথাটা বলে কিরীটী দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে হোটেলের বাইরে চলে এল। সুব্রতও তাকে অনুসরণ করে।

বেলা তখন প্রায় সোয়া দশটা কি সাড়ে দশটা হবে। সমুদ্রের ধারে স্নানার্থীদের ভিড়। নানাবয়সী মেয়েপুরুষ—কেউ স্নান করছে কেউ সী-বীচের ওপরে বসে বা দাঁড়িয়ে সমুদ্রের ঢেউ নিচ্ছে।

কিরীটী বালুর উপর দিয়ে দ্রুতপায়ে হেঁটে চলে জলের দিকে।

কিন্তু যার সন্ধানে কিরীটী হোটেলে থেকে বের হয়ে এসেছিল সেই সুকুমারবাবুকে দেখতে পেল না। আশেপাশে কোথাও মানুষটার চিহ্নমাত্রও নেই। অনেক দূর থেকে দেখেও কিরীটীর মানুষটাকে চিনতে কষ্ট হয়নি!

সমুদ্রের জলে অনেকে স্নান করছিল, কিরীটী সেই দিকে তাকিয়ে রইল—প্রায় মিনিট কুড়িপঁচিশ, কিন্তু সুকুমার মিত্রকে দেখতে পেল না। মৃদুকণ্ঠে কিরীটী বললে, আশ্চর্য! গেল কোথায়?

পাশে দাঁড়িয়ে ছিল সুব্রত। সে বললে, তোমার ভুল হয়নি তো কিরীটী?

না সুব্রত, ভদ্রলোককে আমার চিনতে ভুল হয়নি।

বেলা সোয়া দশটা সাড়ে দশটা হলেও রৌদ্রের তাপ বেশ প্রখর। দূরে সমুদ্রের জলে সূর্যের আলো চিকমিক করছে। কিরীটী এক সময় ফিরে দাঁড়াল। কিরীটীকে যেন একটু চিন্তান্বিত মনে হয়।

কি ভাবছ কিরীটী? সুব্রত শুধাল।

সুকুমারবাবু যে পুরীতে এসেছেন সে সম্পর্কে আমি নিশ্চিত সুব্রত। তাই ভাবছি, সকলের অজ্ঞাতে হঠাৎ তারও এখানে আসার কারণ কি?

অজ্ঞাতেই বা ভাবছ কেন, হয়তো শরদিন্দুবাবু কথাটা জানেন।

আমার কিন্তু তা মনে হয় না সুব্রত, শরদিন্দুর অজ্ঞাতেই সুকুমারবাবু পুরীতে এসেছেন। অন্যথায় সুকুমারবাবু তাঁর দাদা যে হোটেলে উঠেছেন সেই হোটেলেই এসে উঠতেন। এখন কি মনে হচ্ছে, জান সুব্রত?

কি?

প্রথমত এখানে আসার উদ্দেশ্য উভয়েরই এক—একই কারণে উভয়ে এখানে এসেছেন।

কি কারণ?

কারণ আর কিছুই নয়, ঐ লক্ষ্মী দেবী। লক্ষ্মী দেবীর কথা দুজনেই জানতে পেরেছেন—আর তাই দুজনেই পুরীতে ছুটে এসেছেন।

কথা বলতে বলতে দুজনে হোটেলে ফিরে এল। তারপর সোজা দোতলায় উঠে কিরীটী ঘরে দুজনে প্রবেশ করল। ঘরে ঢুকে কিরীটী কলিং বেলটা টিপে হোটেলের একটা ছোকরা চাকরকে ডাকল।

ডাকুচি বাবু?

তোর কি নাম রে?

মোর নাম জলধর আছি বাবু।

জলধর একটু চা খাওয়াতে পারিস?

এত্তে সময় তো চা পাইবে না বাবু, অর্ডার নেই। ঠিক আছি বাবু, মু দেখি কি করতে পারি। জলধর চলে গেল।

আচ্ছা সুব্রত, জলধরকে তোমার কেমন মনে হয়? ওর ওপরে রিলাই করা যেতে পারে? কিরীটী বলল।

কি ব্যাপারে?

এই আশেপাশে একটু খোঁজখবর নেওয়ার জন্য!

কিসের খোঁজখবর?

সুকুমারবাবু—ভদ্রলোক আশেপাশের কোন হোটেলেই উঠেছেন নিশ্চয়ই!

কিন্তু–

জলধর চেষ্টা করলে বোধ হয় খবরটা সংগ্রহ করে আনতে পারবে। আরও আমার একটা কথা কি মনে হচ্ছে জান সুব্রত লক্ষ্মী দেবীও হয়তো জানতে পেরেছেন ওদের দুই ভাইয়ের এখানে উপস্থিতির কথাটা। সত্যিই যদি লক্ষ্মী দেবী ও মানসী দেবী একই ব্যক্তি হয়, তাহলে যে কোন কারণেই হোক তিনি এই মুহূর্তে ওঁদের সামনে আসতে চান না। তাই তিনি হঠাৎ বেপাত্তা হয়েছেন!

কিন্তু লক্ষ্মী দেবীর কথা ওঁরা জানবেন কি করে?

সেটা অতি সহজ ব্যাপার, কোন পত্রিকায় হয়তো ওঁরা নতুন চিত্রতারকা লক্ষ্মী দেবীর ছবি। দেখেছেন। আর সেই ছবির সঙ্গে সংবাদ পড়েই

কিন্তু তাই যদি হয় তো লক্ষ্মীদেবী কি জানতেন না তার ছবি কাগজে বেরুলে এমন কিছু ঘটতে পারে—তখন তার বেঁচে থাকার ব্যাপারটা ওঁরা দুজনেই জেনে যাবেন।

তুমি একটা দিকই কেবল বিবেচনা করছ সুব্রত, কিরীটী বললে, এমনও তো হতে পারে সুব্রত, ওইভাবে তিনি ইচ্ছা করেই আত্মপ্রকাশ করেছেন। এবং এবারই শুরু হবে আসল নাটক!

ঠিক ঐ সময় সুষমা দেবীর স্বামী নিবারণ ভট্টাচার্য এসে ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ভিতরে আসতে পারি?

আসুন—আসুন মিঃ ভট্টাচার্য।

মিঃ ভট্টাচার্য এসে ঘরে ঢুকলেন।—একটা সংবাদ আছে, মিঃ রায়!

কি বলুন তো?

আপনি লক্ষ্মী দেবীর ঠিকানা খুঁজছিলেন না? ভট্টাচার্য বললেন।

কে বললে আপনাকে?

একটু আগে উদয়বাবু এসেছিলেন—

এসেছিলেন? কিন্তু কই, আমাদের সঙ্গে তো দেখা করলেন না?

লক্ষ্মী দেবী ডাইরেকটার নীলমণি রাউতকে একটা নাকি চিঠি দিয়েছেন—তাতে জানিয়েছেন তিনি আর অভিনয় করতে পারবেন না তাঁর ছবিতে, আর তিনি ভুবনেশ্বর থেকে চলে যাচ্ছেন।

কবে এসেছে সে চিঠি?

আজই সকালে তোক মারফৎ–কথাটা উদয়বাবু আমাকে বলে চলে গেলেন।

উদয়বাবু কখন এসেছিলেন?

মিনিট দশেক আগে। তারপরই একটু থেমে ভট্টাচার্য বললেন, আপনার স্টকে আর আছে। নাকি স্যার? কতদিন বাদে যে সেদিন স্কচ খেলাম!

না, আর তো নেই! কিরীটী বললে।

নেই? ভট্টাচার্যের কণ্ঠস্বরে রীতিমত যেন একটা হতাশা ফুটে ওঠে। একটু থেমে নিম্নকণ্ঠে অতঃপর বললেন, এই নিন তার ঠিকানা–।

আচ্ছা চলি—ভট্টাচার্য ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।

কিরীটীকে একটু যেন চিন্তিত মনে হল সুব্রতর, সে বললে, কি ভাবছ?

ভাবছি উদয়বাবু আমাদের সঙ্গে দেখা করলেন না কেন? ঠিক আছে, চল!

কোথায়?

ভুবনেশ্বর।

এক্ষুনি?

হ্যাঁ, শুভস্য শীঘ্রম, নাও—চটপটে জামাটা বদলে নাও–

একটা ট্যাক্সি যোগাড় করে কিরীটী আর সুব্রত বেলা দেড়টা নাগাদ ভুবনেশ্বরে এসে পৌঁছুল। ট্যাক্সি ড্রাইভারের সাহায্যেই বাড়িটা খুঁজে বের করতে ওদের কোন অসুবিধা হল না, বাড়ির সামনে এসে ওরা ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দিল। ট্যাক্সিটা চলে গেল।

দোতলা বাড়ি। এবং বাড়িটা নতুন তৈরি হয়েছে মনে হয়। দরজা বন্ধ। কলিং বেল টিপতেই একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক এসে দরজা খুলে দিলেন। পরনে পায়জামা আর পাঞ্জাবি। মাথার চুল প্রায় সব সাদা। চোখে চশমা।

কাকে চাই? ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন।

আমরা একটা ফিল্ম কোম্পানি থেকে আসছি, কিরীটী বলল, লক্ষ্মী দেবী কি বাড়িতে আছেন?

না।

তিনি তো এখানেই থাকেন? কিরীটীর প্রশ্ন।

হ্যাঁ থাকতেন, তবে দিনপাঁচেক হল চলে গিয়েছেন। তাছাড়া আমি যত দূর শুনেছি আর কোন ছবিতে তিনি অভিনয় করবেন না।

কেন?

তা কেমন করে বলব বলুন!

তিনি কোথায় গিয়েছেন বলতে পারেন?

ভদ্রলোক বললেন একটু যেন ইতস্তত করেই, না, তা বলতে পারব না। মানে আমাকে সেসব কিছু বলে যাননি।

আচ্ছা এখানে তিনি কতদিন ছিলেন?

তা মাস আষ্টেক হবে।

আপনার নামটা জিজ্ঞাসা করতে পারি কি?

জগন্নাথ সাহু!

এটা বোধ হয় আপনারই বাড়ি? কিরীটীই বললে!

হ্যাঁ, কিন্তু এত কথা জিজ্ঞাসা করছেন কেন বলুন তো! ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বরে এবার যেন বেশ একটু রুক্ষতাই প্রকাশ পায়।

কিরীটী মৃদুকণ্ঠে বললে, লক্ষ্মী দেবীর ঠিকানাটা পেলে বড় ভাল হত। সত্যিই আপনি জানেন

জগন্নাথবাবু?

না। রুক্ষকণ্ঠে কথাটা বলেই জগন্নাথ সাহু ওদের মুখের ওপরই দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন।

দুজনেই হতভম্ব কিছুটা। সুব্রত বললে, অতঃ কিম্?

কিরীটী সুব্রতর কথার কোন জবাব না দিয়ে ঘুরতে গিয়েই হঠাৎ একটা বন্ধ জানালার দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে গেল।

কিরীটীর দৃষ্টি অনুসরণ করে সুব্রতও ঐদিকে তাকিয়েছিল—তার যেন মনে হল জানালার একটা কপাট ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।

চল, সুব্রত!

কোথায়—স্টেশনে তো?

না, কোন একটা হোটেলে। ওড়িষ্যার রাজধানী ভুবনেশ্বর—নিশ্চয়ই এখানে দু-একটা ভাল হোটেল আছে!

কিন্তু হোটেলে কেন? সুব্রত পালটা প্রশ্ন করে।

কিরীটী বললে, করুণ দুটি চোখের মিনতি—যেও না, যেও না বঁধু!

মানে?

চোখ থাকলে দেখতে পেতে। চল—আর এখানে নয়-পা চালাও।

দুজনে হাঁটতে শুরু করে। কিরীটী চিন্তিত।

কিরীটী। জানালায় কার চোখের মিনতি দেখলি?

লক্ষ্মী দেবী ভুবনেশ্বর ছেড়ে যাননি কোথাও! কিরীটী বললে।

কি করে বুঝলি?

নারীজাতির সহজাত কৌতূহল। বুঝলে সুব্রত—সেই কৌতূহলটুকু প্রকাশ করতে গিয়েই ধরা পড়ে গেলেন!

হোটেলে একটা ভাল ঘরই পাওয়া গেল। একপেট আহারের পর সুব্রত একটানা একটা ঘুম দিল। ঘুম থেকে উঠে সুব্রত দেখল কিরীটী ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে।

কি হে, সারাটাক্ষণ পায়চারি করেই কাটালে নাকি?

কিরীটীর দিক থেকে কোন সাড়া এল না। সে একমনে তখনও পাইপটা ঠোঁটে চেপে পায়চারিই করে বেড়াচ্ছে।

বাইরে ইতিমধ্যে অনেকক্ষণ দিনের আলো নিভে গিয়েছে। সুব্রত একটা হাই তুলে শয্যার ওপর উঠে বসল। তারপর বেয়ারাকে চায়ের অর্ডার দিয়ে সুব্রত বললে, রাতটা কি এখানেই কাটানো হবে?

একবার বেরুতে হবে—এখন সাতটা বাজে—এই পৌনে আটটা নাগাদ।

কোথায়?

লক্ষ্মীর ভবনে-সেখানে আর একবার যেতে হবে।

জগন্নাথ সাহুর ঐ কাঠ-কাঠ কথা বলবার পরও?

সে কাঠ থেকেই রস বার করতে হবে সুব্রত!

বাবা, আমি আর সেখানে যাচ্ছিনে।

কেন, গলাধাক্কার ভয়ে নাকি? কিরীটী মৃদু হেসে বললে।

রসিকতা থাক। সত্যিই আবার সেখানে যাবে নাকি?

বাঃ, এতদূর এসে শ্রীমতী লক্ষ্মী দেবী—মানে আমাদের মানসী দেবীর সঙ্গে না দেখা করেই চলে যাব?

তা দেখাটা করবে কেমন করে?

ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়!

জগন্নাথ সাহুর বাড়ির কাছে ওরা যখন পৌছাল তখন জানালাটা বেশ অন্ধকার, লাইটপোস্টটা অনেকটা দূরে—অত দূর পর্যাপ্ত আলোটা পৌঁছয় না, তাই কেমন যেন একটা আলোছায়ার ছমছমানি। হঠাৎ পিছন দিক থেকে একটা মৃদু পদশব্দ কানে আসতেই কিরীটী একপাশে সরে দাঁড়িয়ে সুব্রতর হাত ধরে আকর্ষণ করল।

কি ব্যাপার?

চুপ, ঐ দেখ—কে যেন এই দিকেই আসছে!

সুব্রত দেখল অবগুণ্ঠনবতী এক নারী একটু যেন দ্রুত পদেই ঐদিকে আসছে। অবগুণ্ঠনবতী সামনাসামনি আসতেই কিরীটী মৃদুকণ্ঠে ডাকল, শুনছেন!

অবগুণ্ঠনবতী না দাঁড়িয়ে আরও জোরে গতি বাড়িয়ে দেয়। কিরীটী দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে বলে, শুনুন, দাঁড়ান মানসী দেবী!

হঠাৎ যেন থমকে দাঁড়াল এবার অগ্রবর্তিনী।

মানসী দেবী, আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে—এই শহরে সবচেয়ে বড় যে হোটেলটা, সেই হোটলেরই দোতলায় যোল নম্বর ঘরে উঠেছি আমি। আমার নাম কিরীটী রায়—আপনার জন্য আমি অপেক্ষা করব।

নারীমূর্তির দিক থেকে কোন সাড়াশব্দ এল না।

আমি জানি সমুদ্রের জলে আপনার মৃত্যু হয়নি, আপনি বেঁচে আছেন। যাক, আমি কিন্তু অপেক্ষা করব হোটেলে আমার ঘরে। এস সুব্রত!

কিরীটী আর দাঁড়াল না। হনহন করে এগিয়ে গেল।

কিরীটী চেয়ারে চুপচাপ বসে একমনে পাইপ টানছে। সুব্রত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, রাত এগারোটা বেজে দশ মিনিট।

তোমার ধারণা, সত্যিই তিনি আসবেন? সুব্রত বললে।

কিরীটী কোন কথা বলল না, অন্যমনস্ক ভাবে জানালার ওপাশে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।

আমার মনে হয়—

কিরীটী সুব্রতকে তার কথা শেষ করতে দিল না, বললে, মানসী যদি না—

কিন্তু কিরীটীর কথা শেষ হল না, ওদের ঘরের বদ্ধ দরজার গায়ে মৃদু টোকা শোনা গেল। সঙ্গে সঙ্গে কিরীটী উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল। দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে অবগুণ্ঠনবতী এক নারী।

আসুন—আসুন মানসী দেবী।

আগন্তুক কমধ্যে প্রবেশ করল। কিরীটী দরজাটা আবার বন্ধ করে দিল। গুণ্ঠন মোচন করল অবগুণ্ঠনবতী। স্থির দৃষ্টিতে তাকাল কিরীটী মুখের দিকে।

বসুন, দাঁড়িয়ে কেন?

আপনি আমাকে চেনেন? মানসী প্রশ্ন করল।

কিরীটী একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল মানসীর মুখের দিকে। মনে মনে সে মানসীর ফটোর সঙ্গে ওর চেহারাটা মিলিয়ে নিচ্ছিল।

চিনি বললে যেমন সবটা বলা হবে না, তেমনি চিনি না বললেও সত্যের অপলাপ করা হবে মানসী দেবী। আপনার সঙ্গে পূর্বে সাক্ষাৎ পরিচয় না হলেও আপনার ফটোর সঙ্গে আমার পরিচয় আছে!

আমার ফটো? আমার ফটো কোথায় পেলেন আপনি?

আপনার বাবা পরেশবাবুর কাছ থেকে। আপনার বাবা বিশ্বাস করেননি যে জলে ড়ুবে আপনার মৃত্যু হয়েছে। তাই তিনি আপনার সন্ধানে আমাকে নিযুক্ত করেছেন। কিন্তু আপনি দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, বসুন!

সত্যিই আমি মরিনি সেদিন কিরীটীবাবু, বসতে বসতে বলল মানসী।

আমিও তাই বিশ্বাস করেছিলাম।

কিন্তু কেন আপনি বিশ্বাস করেছিলেন, আমি সাঁতার জানতাম বলে?

কিছুটা তাই বটে, তবে আরও কারণ ছিল, আমি অবিশ্যি জিজ্ঞাসা করব না সেদিন কেমন করে আপনি রক্ষা পেয়েছিলেন।

আপনি হয়তো একটা কথা জানেন না কিরীটীবাবু, আমাকে সেদিন হত্যা করবারই চেষ্টা করা হয়েছিল।

তাও আমি অনুমান করেছিলাম, কিরীটী বলল।

জানেন, সরবতের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে আমাকে হত্যা করবার চেষ্টা হয়েছিল।

বিষ?

হ্যাঁ, কিন্তু নোনা জল কিছু পেটে ঢাকায় বমি করে ফেলি জলের মধ্যে, আমার বিষের ক্রিয়াও একটু একটু করে কেটে যায়। এবং কথাটা বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই আমি সাঁতরে তাদের নাগালের বাইরে চলে যাই। কারণ আমি বুঝতে পেরেছিলাম নাগালের বাইরে না চলে গেলে আবার আমাকে হত্যা করবার চেষ্টা করা হবে।

কার কথা বলছেন?

কার কথা বলব বুঝতে পারছি না, কারণ, আমি দুজনকে সন্দেহ করি—

আপনার স্বামী শরদিন্দুবাবু আর সুকুমারবাবুকে? কিন্তু সেসময় তো সুকুমারবাবু বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন, যতদূর জানি।

ছিল সে—তাকে ঐ ঘটনার আগের দিন আমি সী বীচে দেখেছিলাম।

আপনার স্বামী জানতে পেরেছিলেন?

সম্ভবত না।

আপনি তাকে কিছু বলেননি?

না। কারণ বুঝেছিলাম যে পুরীতে এসেও সুকুমার যখন আমাদের সঙ্গে দেখা করেনি তখন কথাটা গোপন রাখতে চায়।

সেদিন যা ঘটেছিল আমাকে বলবেন?

আমার স্বামী মানসী বলতে লাগল, বিবাহের পর থেকেই সুকুমারকে নিয়ে আমাকে সন্দেহ করত—

আমি জানি।

জানেন?

হ্যাঁ, আপনার ডাইরি পড়েই জেনেছি।

আমার ডাইরি আপনি কোথায় পেলেন?

আপনার বাবা আমায় দিয়েছেন।

জানেন কিরীটীবাবু, পুরীতে একটা কিছু ঘটবে এই আশঙ্কা করেই আমি ডাইরিটা আমাদের বাড়িতে রেখে এসেছিলাম–যাতে সেটা আমার আকস্মিক মৃত্যু ঘটলে এদের মানে স্বামী ও সুকুমারের হাতে না পড়ে।

বিবেচনার কাজই করেছিলেন।

মানসী আবার বলতে লাগল, ঐ ব্যাপার নিয়েই সেদিন সকালের দিকে স্বামীর সঙ্গে আমার কিছুটা তর্কাতর্কি হয়। তারপর অবিশ্যি ইদানীং যেমন প্রায়ই হত শরদিন্দুই ব্যাপারটা মিটিয়ে নেয়। দুপুরের দিকে দুজনে বসে গল্প করছিলাম আর দুজন দুগ্লাস লেমন স্কোয়াশ নিয়ে মধ্যে মধ্যে চুমুক দিচ্ছিলাম। হঠাৎ শরদিন্দু বললে, তুমি সমুদ্রে সাঁতার কেটে কতদূর যেতে পার মণি?

বললাম, অনেক দূর অবধি যেতে পারি—কেন?

না, এমনি জিজ্ঞাসা করছি ভয় করবে না তোমার?

বাঃ, ভয় করবে কেন? বেশ কালই তোমাকে দেখাব–

কাল কেন—আজই চল না, দেখাবে!

বেলা তখন চারটে বেজে গিয়েছে—তুমি বোস, আমি তৈরী হয়ে আসি বলে আমি বাথরুমে চলে গেলাম। ফিরে এসে দেখি শরদিন্দু ঘর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, আমি তাড়াতাড়ি এক চুমুকে গ্লাসটা শেষ করে ঘর থেকে বের হয়ে পড়লাম। তারপর সোজা হোটেলের বাইরে চলে এলাম।

আর শরদিন্দুবাবু? কিরীটী প্রশ্ন করলে।

তাকে দেখলাম বীচের দিকে হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছে। অনেকটা এগিয়েও গিয়েছে সে। তখন—প্রায় বীচের মাঝামাঝি–

কিন্তু তা কি করে সম্ভব মানসী দেবী—অত তাড়াতাড়ি তিনি অত দূরে চলে যাবেন কি করে? আপনি ঠিক দেখেছিলেন তো আপনার স্বামীকে?

নিশ্চয়ই। তার গায়ে একটা সবুজ স্ট্রাইপ দেওয়া বুশশার্ট ছিল আর পরনে পায়জামা। না, আমার ভুল হয়নি।

কিন্তু সময়ের দিক থেকে বিবেচনা করলে ব্যাপারটা যে বিশ্বাসযোগ্য নয়, কিরীটী তা বুঝতে পারলেও মুখে সে কথা প্রকাশ করে না, চুপ করে থাকে।

ছুটতে ছুটতে গিয়ে শরদিন্দুকে ধরলাম, মানসী বলতে লাগল এবং তাকে কোন কিছু বলার অবকাশ না দিয়েই সোজা গিয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। মাথার মধ্যে কেমন যেন হঠাৎ ঝিম ঝিম করে উঠল, কিন্তু কেয়ার করলাম না—ঢেউয়ে গা ভাসিয়ে এগিয়ে গেলাম।

আপনার স্বামী-শরদিন্দুবাবু?

সে তখন সী-বীচে দাঁড়িয়ে।

মানসী বলতে লাগল, হঠাৎ চোখে যেন কেমন অন্ধকার দেখি। গা-টা এলিয়ে যায়—সেই সময়ই বোধ হয় কিছু নোনা জল পেটে ঢুকে গিয়েছিল, গা গুলিয়ে বমি হবার পর একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠলাম। তখনই মনের মধ্যে আমার কেমন যেন সন্দেহ হয় শরদিন্দু আমাকে শরবতের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দেয়নি তো?

হঠাৎ বিষের কথা কেন আপনার মনে হল? কিরীটী প্রশ্ন করল।

শরদিন্দু ঝগড়ার সময় একদিন আমাকে বলেছিল–তুমি বিষ খেয়ে মর! তুমি মরতে পার না—আমি বিষ এনে দেব আমাদের ল্যাবরেটারী থেকে! বলেছিলাম, বেশ তো, আমার মৃত্যুই যদি তোমার কাম্য হয় তো এনে দিও বিষখাব। জানেন কিরীটীবাবু, আরও একটা কথা হঠাৎ সেই সময় মনে পড়ে গিয়েছিল আমার!

কি?

একদিন ওর সুটকেস ঘাঁটতে ঘাঁটতে ছোট একটা হোমিওপ্যাথিকের শিশি পেয়েছিলাম তার মধ্যে সাদা গুঁড়ো ভর্তি ছিল, মনে হয় সেটা বিষ, তাই আমার ঐ মুহূর্তে মনে হয়েছিল—যে সময়টা আমি বাথরুমে ছিলাম সেই অবসরে শরদিন্দু আমার অলক্ষ্যে শরবতে বিষ মিশিয়ে দেয়নি তো৷ কথাটা মনে হবার সঙ্গে সঙ্গেই আমি ডিসিশন নিই—আর ফিরে যাব না!

সাঁতার কাটতে কাটতে অনেক দূরে দৃষ্টির বাইরে চলে গেলাম। এদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে তখন চারিদিকে—সব ক্রমশ আবছা অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সাঁতরাতেও আর পারছিলাম না, বড্ড ক্লান্ত লাগছিল—সেই সময় একটা জেলেডিঙি মাছ ধরে ফিরে আসছিল—আমি চিৎকার করে ডাকতেই তারাই আমাকে তুলে নেয়। তারা তো আমাকে দেখে অবাক। সে রাতটা তাদেরই ঝুপড়িতেই কাটাই আমি এবং তারপর তিনটে দিন আমার ওঠবার ক্ষমতা ছিল না–কাঁপিয়ে জ্বর এসেছিল। সেই জ্বরের ঘোরেই আমি জেলে আর জেলেবৌকে জানিয়েছিলাম আমার সব কথা, বলেছিলাম পুলিশ সমুদ্রের ধারে আমার ডেড বডির খোঁজ করতে পারে—তারা আমার কথা যেন পুলিশকে না জানায়, জানালে পুলিশ আবার আমাকে শরদিন্দুবাবুর হাতে তুলে দেবে। তাই ওরা কাউকে কিছু জানায়নি। আমি প্রায় এক মাস তারপর ঐ ঝুপড়ির মধ্যেই কাটাই।

হাতে আমার সোনার চুড়ি ছিল চার গাছা করে আট গাছা, তারই দুগাছা বেচে জামাকাপড় কিনি আর ওদের বকশিশ দিই এবং তাদের বলি তারা যদি আমার কথা কাউকে না জানায়, তাহলে আরও টাকা দেব। তারপর এক মাস পরে পুরী ছেড়ে এক রাত্রে চলে গেলাম কটকে।

কটকে কেন–কলকাতায় গেলেন না কেন?

তার তিনটি কারণ ছিল—প্রথমত, আমার দৃঢ় ধারণা হয়েছিল সেদিন আমার শরবতের গ্লাসে বিষ মিশিয়ে আমাকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাই কলকাতায় ফিরে গেলে আবার হয়তো আমাকে হত্যা করার চেষ্টা করা হবে। দ্বিতীয়ত, আমি স্থির করেছিলাম আসল ঘটনাটা আমাকে জানতে হবেই, কিন্তু কলকাতায় গেলে সে ব্যাপারে আমার কোন সুবিধা হবে না। এবং তৃতীয়ত, কলকাতায় গেলে কোথায় থাকব, কার কাছে থাকব—তার ওপর অনেক চেনাজানা লোক আছে সেখানে। যদি একবার তাদের চোখে পড়ে যাই আমার সব প্ল্যান ভেস্তে যাবে। তাই স্থির করেছিলাম আপাতত আমার অজ্ঞাতবাস চলুক।

কটকে মাস চারেক ছিলাম আমার এক বান্ধবীর বাড়িতে। হঠাৎ তার সঙ্গে একদিন বাজারে দেখা হয়ে গিয়েছিল, তাকে সব কথা আমি খুলে বলি ও তার ওখানেই ছিলাম।

কলকাতায় যাননি?

গিয়েছিলাম এই মাসের প্রথমে—দিন তিনেকের জন্য।

ও, আচ্ছা, তারপর? কিরীটী বললে।

মাসখানেক আগে হঠাৎ কাগজে দেখলাম একজন চিত্রাভিনেত্রীর জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছে–ফটো ও অ্যাপ্লিকেশন দিলাম পাঠিয়ে, ওরা মানে নীলমণিবাবু ডেকে পাঠালেন আমাকে–কটকেই আমার ক্যামেরা ও ভয়েস টেস্ট নেওয়া হল। কন্ট্রাক্ট সই করলাম ওঁদের ফিল্ম কোম্পানিতে।

কলকাতায় গিয়ে আমি আরও একটা কাজ করেছিলাম কিরীটীবাবু—আমি শরদিন্দু ও সুকুমারকে ফোন করে জানিয়েছিলাম আমি মরিনি বেঁচে আছি আর আমি জেনেছি আমাকে বিষ দেওয়া হয়েছিল!

কি কথা হয়েছিল তাঁদের সঙ্গে আপনার ফোনে?

মানসী তখন ফোন করার ব্যাপারটা আগাগোড়া বলে গেল।

কিরীটী শুনল সব কথা নিঃশব্দে। তারপর বলল, শরদিন্দুবাবু-আব সুকুমারবাবু দুজনেই এখন পুরীতে, আপনি জানেন?

জানি। তারা আমার ফোন পেয়েই পুরীতে ছুটে এসেছে–সত্যি-সত্যিই আমি মরেছি না বেঁচে আছি সে ব্যাপারে নিঃসংশয় হবার জন্য। আর সেটা জানতে পেরেই নীলমণিবাবুকে চিঠি দিয়েছি আমি আর ফিল্মে কাজ করব না বলে।

জগন্নাথবাবুর সঙ্গে আপনার পরিচয় হল কি করে?

জগন্নাথবাবুই তো আমার বান্ধবী শ্রীমতীর বাবা!

তিনিও কি ব্যাপারটা জানেন?

জানেন বৈকি, শ্ৰীমতীই সব বলেছে তাঁকে।

এদিকে রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। বাইরে অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে। কিরীটী বলল, এবার আপনি কি করবেন?

ভাবছিলাম কাল পরশু বাবার কাছে ফিরে যাব।

না না—এখন না। আপনাকে এখনও কিছুদিন জগন্নাথবাবুর বাড়িতেই থাকতে হবে। কারণ আমার মন বলছে হত্যাকারী আপনাকে খুঁজে বের করবেই এবং আবার হত্যা করবার চেষ্টা করবে!

কিন্তু কেমন করে আমার খোঁজ সে পাবে কিরীটীবাবু?

পাবে নয়—এতদিনে হয়তো পেয়েছে। আমরা যেমন উদয়বাবুর কাছ থেকে তাদের ছবির স্টিল ফটো দেখে বুঝতে পেরেছিলাম, সেইভাবে হয়তো সিনেমা কাগজ বলাকায় প্রকাশিত আপনার ছবি দেখে সে বুঝতে পেরেছে লক্ষ্মী দেবীই মানসী দেবী। ফলে সে পুরীতে আবার দুবছর বাদে ছুটে এসেছে।

যাক সে কথা, রাত শেষ হয়ে এল মানসী দেবী—এবার আপনি জগন্নাথবাবুর বাড়ি চলে যান, আর দেরি করবেন না।

আমি যদি কাল আমার বান্ধবীর ওখানেই যাই? মানসী বলল।

না, সেখানে যাবেন না, আমার অনুরোধ। সবাই জানে আপনার বর্তমান ঠিকানা জগন্নাথবাবুর বাড়ি—আমার অনুমান যদি মিথ্যা না হয়, হত্যাকারীকে সেখানে আসতেই হবে— হ্যাঁ, আসবেই এ ব্যাপরে নিশ্চিত। ভাল কথা, জগন্নাথবাবুর বাড়িতে আর কে কে আছেন?

মাসীমা অর্থাৎ তার স্ত্রী ও তিনি।

আর কেউ নেই—কোন চাকরবাকর?

আছে—গোপী চাকর, সেই ঐ বাড়িতে সব কিছু করে।

কত বয়স তার—তাকে বিশ্বাস করা যায়?

চল্লিশ-বিয়াল্লিশ হবে, মনে হয় বিশ্বাসী। অনেক বছর আছে ওঁদের কাছে।

ঠিক আছে। আপনি কিন্তু সন্ধ্যার পর একেবারেই বাড়ির বাইরে যাবেন না। কিরীটী বলল, আচ্ছা নীলমণিবাবু বা অন্য কেউ জগন্নাথবাবুর বাড়িতে এসেছিলেন আপনার সঙ্গে দেখা করতে বা আপনার খোঁজে?

না। নীলমণিবাবু বারতিনেক ফোন করেছিলেন।

ঠিক আছে। আর একটা কথা জিজ্ঞাসা করব আপনাকে—

কি বলুন?

ধরুন শরদিন্দুবাবু যদি নির্দোষ হন, আপনি কি তার কাছে ফিরে যাবেন?

না, ও-বাড়ি আর আমি ফিরব না।

তাহলে কি বাবার কাছে যাবেন?

এখনও ঠিক করিনি, কারণ বাবাই আমার বর্তমান দুর্ভাগ্যের কারণ। বাবার কথা ভেবে সেদিন যদি শরদিন্দুকে বিবাহ না করতাম, তাহলে এই দুর্ভাগ্যের মধ্যে হয়তো আমাকে এইভাবে জড়িয়ে পড়তে হত না! বলল মানসী।

কিরীটী বুঝতে পারে, মানসী তার বাবাকে ক্ষমা করতে পারেনি। একটু থেমে কিরীটী বলল, যান এবার আপনি, আর আপনার ফোন নম্বরটা রেখে যান, দরকার হলে আমি ফোন করব, আর আপনিও প্রয়োজন হলে এই হোটেলে আমাকে ফোন করতে পারেন সুব্রত।

কি, বল? সুব্রত জবাব দিল।

ওঁর সঙ্গে যাও–দূর থেকে ওঁকে অনুসরণ করবে জগন্নাথবাবুর বাড়ি পর্যন্ত।

মানসী ও সুব্রত অতঃপর ঘর থেকে বের হয়ে গেল। যাবার আগে ফোন নাম্বারটা এক কাগজে লিখে দিয়ে গেল মানসী।

ঘণ্টাখানেক পরে হোটেলের ঘরে ফিরে এসে সুব্রত দেখে, কিরীটী পাইপটা দুই ঠোঁটের ফঁাকে চেপে ধরে ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে।

পৌঁছে দিয়ে এলে মানসী দেবীকে? কিরীটী প্রশ্ন করল।

হ্যাঁ, পথ এক রকম ফঁকাই ছিল-সুব্রত বলল।

তোমাকে আজই একবার পুরীতে যেতে হবে সুব্রত।

যাব। কিন্তু কেন?

উদয়বাবু নিশ্চয়ই হোটেলে আসবেন, আর যদি না-ই আসেন, মিসেস ভট্টাচার্যর কাছ থেকে তার ঠিকানাটা জেনে তার সঙ্গে আজই দেখা করে মানসীর কথাটা তাঁকে জানাতে হবে।

তাঁকে জানাতে চাও কেন কথাটা?

জানাতে চাই এই কারণে যে, তিনি জানলে কথাটা কোনক্রমে শরদিন্দুবাবু এবং সুকুমারবাবুও জানতে পারবেন।

তাঁদের তুমি জানাতে চাও কেন?

কারণ তাদের মধ্যে মানসীকে যে হত্যার চেষ্টা করেছে সে মানসীর সংবাদটা পেলে আর সময় নষ্ট করবে না। উদয়বাবু ছাড়াও আর একজনকে মানসীর ঠিকানাটা তোমায় জানাতে হবে।

থানা আফিসারকে বোধ হয়?

হ্যাঁ, আর তাকে বোলো তিনি যেন প্রস্তুত থাকেন, আমার ফোন পেলেই তিনি এখানে চলে আসবেন।

তুমি তাহলে এখানেই থাকছ?

হ্যাঁ, তুমি দেরি কোরো না, কাজ শেষ হলেই সোজা এখানে চলে আসবে।

ঠিক আছে। তবে আমার কিন্তু মনে হয়, শরদিন্দুবাবুই তার স্ত্রীকে হত্যা করবার চেষ্টা করেছিলেন সেদিন।

মানুষের মন বড় বিচিত্র সুব্রত, কখন কোন পথে যে আনাগোনা করে অনেক সময় তা সে নিজেও টের পায় না।

কিন্তু সুকুমারবাবু তো সত্যি সত্যিই ভালোবাসতেন মানসীকে!

ভয় তো আমার সেখানেই। জান তত ভালোবাসা অন্ধ! শুধু তাই নয়, ভালোবাসাটা প্রচণ্ড স্বার্থপর, আর স্বার্থপরতা থেকেই জন্ম নেয় হিংসা। হিংসার কুটিল গতিক, আর দেরি কোরো না, রওনা হয়ে পড়। আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পুরী এক্সপ্রেস ভুবনেশ্বরে আসবে সেই ট্রেনেই পুরী চলে যাও।

সকাল পৌনে নটা নাগাদ একটা সাইকেল রিকশায় চেপে পুরীর হোটেলের কাছাকাছি আসতেই দূর থেকে হঠাৎ সুব্রতর নজরে পড়ল হোটেল থেকে উদয়বাবু আর শরদিন্দুবাবু কথা বলতে বলতে বেরুচ্ছেন। সুব্রত আর এগুলো না। রিকশা থামিয়ে সেখানেই নেমে পড়ে ভাড়া মিটিয়ে দিল।

সুব্রত দেখল, ওঁরা কথা বলতে বলতে ঐদিকেই আসছেন। দুজনে কথার মধ্যে এমনই মশগুল যে কেউ এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন না। ক্রমে ওঁরা দুজনে ওর পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলেন সুব্রতর দিকে তাকালেন না। প্রচণ্ড হাওয়া কিন্তু তা সত্ত্বেও উদয়বাবুর কথার কিছু অংশ ওর কানে এল।

জগন্নাথবাবুর বাড়িতে খোঁজ নিয়েই তো আপনাকে বলছি, লক্ষ্মী দেবী ওখানে নেই—ঐটুকু ছাড়া আর কোন কথা সুব্রতর কানে এল না।

সুব্রত বুঝতে পারে, মানসীর বর্তমান ঠিকানা উদয়বাবুর অজ্ঞাত নয় এবং সে ইতিমধ্যে মানসীর খোঁজে ঘুরেও এসেছে ভুবনেশ্বরে।

এখন কি কর্তব্য? মনে পড়ল, কিরীটী তাকে বলে দিয়েছে লক্ষ্মী দেবী যে বর্তমানে ভুবনেশ্বরেই আছেন কথাটা উদয়বাবুকে জানাতে। সুব্রত হন হন করে হেঁটে চলল যেদিকে উদয়বাবু ও শরদিন্দুবাবু এগিয়ে গেছেন।

বেশী দূর তখনও যায়নি ওঁরা। দুজনে গল্প করতে করতে চলেছেন।

কাছাকাছি গিয়ে সুব্রত পশ্চাৎ দিক থেকে ডাকল, উদয়বাবু, শুনছেন?

সুব্রতর ডাক শুনে উদয়বাবু ঘুরে দাঁড়ালেন।

আরে সুব্রতবাবু যে, কাল সন্ধ্যায় আপনার খোঁজ করেছি, আজ সকালেও এইমাত্র আপনাদের হোটেল থেকে ঘুরে এলাম, শুনলাম আপনি নেই!

হ্যাঁ, লক্ষ্মী দেবীর সঙ্গে ছবির কনট্রাক্ট করতে আমি ভুবনেশ্বরে গিয়েছিলাম।

দেখা পেলেন?

পেয়েছি বৈকি, কনট্রাক্টও সই হয়ে গিয়েছে।

তবে শুনেছিলাম লক্ষ্মীদেবী ভুবনেশ্বরে নেই—নীলমণিবাবুর ছবিতে কাজ করবেন না জানিয়েছেন।

ঠিকই শুনেছিলেন, তিনি ভুবনেশ্বরে ছিলেন না। একটা জরুরি কাজে কলকাতায় গিয়েছিলেন, গতকালই সকালে ফিরেছেন, আমি আজই আবার কলকাতায় চলে যাচ্ছি—চার-পাঁচ দিন পরে ফিরব, তখন আপনার কনট্রাক্ট সই করাব।

সুব্রত আড়চোখে লক্ষ্য করলে, লক্ষ্মীদেবীর কথা শুনে শরদিন্দুবাবুর চোখের দৃষ্টি প্রখর হয়ে ওঠে। সুব্রত আর দাঁড়াল না, বললে, তাহলে চলি উদয়বাবু!

সেই দিনই রাত্রে। রাত তখন বারোটা হবে। নিযুতি রাত। কিরীটীর পূর্বব্যবস্থা মত জগন্নাথবাবু হোটেলে চলে এসেছিলেন কিরীটীর ঘরে। মানসী একা তার বাড়িতে।

জগন্নাথবাবু বলছিলেন, মেয়েটার কোন বিপদআপদ হবে না তো কিরীটীবাবু? আপনার নির্দেশমত বাড়িতে কেবলমাত্র সে আর তার মাসিমা রয়েছে—গোপীকেও ছুটি দিয়ে দিয়েছি!

কিছু চিন্তা করবেন না জগন্নাথবাবু, আশেপাশে সাদা পোশাকে পুলিশ বাড়িটার ওপর সতর্ক দৃষ্টি রেখে সর্বক্ষণ ঘোরাফেরা করছে।

কিন্তু আপনি যে বলেছিলেন, মেয়েটার ওপর অ্যাটেম্পট হতে পারে।

যাতে হত্যাকারী অ্যাটেম্পট নিতে পারে, সেইজন্যই তো ঐ ব্যবস্থা করেছি!

আপনার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না কিরীটীবাবু!

আমি চাই দুবছর আগে পুরীর হোটেলে শরবতের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দিয়ে মানসীকে যে হত্যা করবার চেষ্টা করেছিল, মানসী বেঁচে আছে জেনে আবার সে মানসীকে হত্যা করবার একটা অ্যাটেম্পট নিক আজ রাত্রে। আর তাই আমি আজকের সব প্ল্যান ঠিক করেছি। সে আসুক—আসতে দিন তাকে। বাড়িটা অরক্ষিত আছে জানতে পারলে সে আজ আবার একটা অ্যাটেম্পট নিতে কোন দ্বিধা করবে না।

তা তো বুঝলাম কিন্তু–

ভয় নেই আপনার জগন্নাথবাবু, সেবারে মানসী অরক্ষিত ছিল, তার মনের মধ্যে কোন সন্দেহ ছিল না বলে নিশ্চিন্তও ছিল, কিন্তু এবার সে অরক্ষিত নয়। হত্যাকারীকে আমি হাতেনাতে ধরতে চাই এবং সেইভাবে তাকে ধরতে না পারলে তার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে না।

হত্যাকারীকে কি আপনি সনাক্ত করতে পেরেছেন কিরীটীবাবু?

কিন্তু কিরীটী জবাব দেবার সময় পেল না। ঘরের টেলিফোনটা ক্রিং ক্রিং শব্দে ঘরের স্তব্ধতা বিদীর্ণ করে বেজে উঠল। কিরীটী প্রস্তুতই ছিল। তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে রিসিভারটা তুলে নিল, হ্যালো!

অপর প্রান্ত থেকে সুব্রতর গলা শোনা গেল—কিরীটী, একজন ভদ্রমহিলা, মাথায় ঘোমটা—এইমাত্র বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করল, মানসীই দরজা খুলে দিয়েছে–

ঠিক আছে। তুমি এগোও, আমি আসছি।

কিরীটী ফোনের রিসিভারটা নামিয়ে রেখে বলল, আমার ফিরতে বেশী দেরি হবে না জগন্নাথবাবু, আপনি এখানেই থাকুন। বলে কিরীটী বের হয়ে গেল।

দরজা খুলে সামনে এক ঘোমটা মাথায় ভদ্রমহিলাকে দেখে মানসী একটু যেন থমমত খেয়ে যায়। কিরীটী বলেছিল, সুকুমার বা শরদিন্দু আসতে পারে কিন্তু তারা তো নয়, এ যে এক ভদ্রমহিলা!

কে আপনি, কি চান?

আগন্তুক মহিলা বললেন, আপনি কি মানসী দেবী?

আমি—

আমি জানি আপনিই মানসী দেবী, চলুন আপনার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে।

কে আপনি কোথা থেকে আসছেন?

দেরি করবেন না, আমি পুলিশের কাছ থেকে আসছি—

পুলিশ!

হ্যাঁ ঘরে চলুন—আপনার খুব বিপদ মানসী দেবী!

কি ভেবে মানসী আর আপত্তি জানাল না। বললে, আসুন।

দুজনে এগোয়, মানসী দরজাটা বন্ধ করতেও ভুলে যায়। এবং মানসী লক্ষ্য করে না, সে পিছন ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই একটা ছায়ামূর্তি বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করে।

দুজনে ঘরের মধ্যে এসে ঢুকল। আগন্তুক ঘরের মধ্যে ঢুকেই হঠাৎ ক্ষিপ্র হাতে একটা সিল্কের রুমাল বের করে মানসীর গলায় পেঁচিয়ে দিল। মানসী প্রতিবাদ জানাবার বা চিৎকার করবারও সময় পায় না। রুমালের শক্ত ফাঁস তার গলায় চেপে বসতে শুরু করে।

ঠিক সেই মুহূর্তে আগন্তুক মহিলার মাথায় একটা কাপড় জড়ানো রুল দিয়ে তীব্র আঘাত হানে সুব্রত—অর্থাৎ ছায়ামূর্তি। আক্রমণকারী মাথা ঘুরে পড়ে যায়, তার হাতের ফাঁস শিথিল হয়ে যায়—মানসী তখনও হাঁপাচ্ছে।

পরমুহূর্তেই কিরীটী ও থানা অফিসার এসে ঘরে ঢুকল। ভূপতিত নারীমূর্তির দিকে তাকিয়ে থানা অফিসার বললে, এ কি! এ যে ভদ্রমহিলা?

উনি ভদ্রমহিলা নন বলেই মনে হচ্ছে, কিরীটী বললে।

ভদ্রমহিলা নন! বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন থানা অফিসার।

তাই তো আমার মনে হয়—সুব্রত, মুখ থেকে ঘোমটাটা সরাও তো!

সুব্রত নীচু হয়ে ভূপতিত স্ত্রীমূর্তির মুখ থেকে ঘোমটাটা সরাতেই অস্ফুট মানসী বলে ওঠে পরম বিস্ময়ে, কে! সুকুমার?

হ্যাঁ মানসী দেবী, সুকুমারবাবুই! গলা শুনে চিনতে পারেননি?

না। আশ্চর্য! মানসী বললেন।

আপনি গোড়া থেকেই উত্তেজিত ছিলেন মানসী দেবী, নচেৎ মেয়েলী গলায় কথা বললেও সুকুমারের কণ্ঠস্বরটা হয়তো আপনার মনে সন্দেহ জাগাত। সুকুমার নারীর বেশে এসেছিল। আপনার কাছে, যাতে সহজেই ওকে আপনি বাড়িতে ঢুকতে দেন।

না কিরীটীবাবু, তাহলেও চট করে ওকে আমি সন্দেহ করতাম না। ও অদ্ভুত মেয়েলী গলা নকল করতে পারত। কতদিন মেয়েলী গলায় আমায় সঙ্গে কথা বলে ও মজা করেছে।

ইতিমধ্যে ধীরে ধীরে সুকুমারের জ্ঞান ফিরে আসছিল।

সেদিকে তাকিয়ে কিরীটী বললে, ওর জ্ঞান ফিরে আসছে মিঃ দাশ!!

সত্যি কিরীটীবাবু, আমি কখনও স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি ও আজ আমাকে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করবার চেষ্টা করবে!

দুবছর আগে ঐ সুকুমারই আপনার গ্লাসে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল—

কি বলছেন, আমি যে—

না আপনার স্বামী শরদিন্দুবাবু নন। সেদিন হোটেলে স্নান করতে যাবার আগে যাকে আপনি ঘর থেকে বের হতে দেখেছিলেন তিনি শরদিন্দুবাবু নন, ঐ সুকুমার—সবার অলক্ষ্যে উনি গ্লাসে বিষ মিশিয়ে চলে যাচ্ছিলেন।

সুকুমার ঐ সময় চোখ মেলে তাকাল।

কিরীটী বললে, উঠুন সুকুমারবাবু, বাড়ির বাইরে আপনার জন্য পুলিশ ভ্যান অপেক্ষা করছে।

সুকুমার ফ্যালফ্যাল করে তাকায় কিরীটীর মুখের দিকে।

আপনার বোঝা উচিত ছিল সুকুমারবাবু, কিরীটী বলতে লাগল যে, আপনার প্রেমে সাড়া দেবার জন্যে অত রাত্রে ফোন করেননি মানসী দেবী। মানসী দেবীকে দিয়ে ভুবনেশ্বর থেকে আপনাকে পুরীর হোটেলে ফোন করানো হয়েছিল। তাই যদি করতেন, তাহলে কলকাতা থেকে আপনাকে যখন ফোন করেন তখুনি তিনি তার বর্তমান ঠিকানাটা আপনাকে দিতেন। সুতরাং আপনার বোঝা উচিত ছিল যে তার ফোনের পশ্চাতে বিশেষ কোন উদ্দেশ্য আছে। আমি কিন্তু ভাবিনি, এত সহজে আপনি আমার ফাঁদে পা ফেলবেন!

সুকুমারের দুচোখের বোবা-দৃষ্টি তখন যেন অগ্নিদৃষ্টিতে পরিবর্তিত হয়েছে, মনে হচ্ছিল, সে বুঝি তার চোখের দৃষ্টিতে কিরীটীকে ভস্ম করে দেবে।

মিঃ দাশ, কিরীটী এবার স্থানীয় থানা অফিসারকে সম্বোধন করে বললে, সুকুমারকে মুক্ত রাখাটা বোধ হয় যুক্তিযুক্ত হবে না—লোহার বালা এনেছেন?

মিঃ দাশের ইঙ্গিতে একজন কনস্টেবল এগিয়ে গিয়ে সুকুমারের হাতে লৌহবলয় পরিয়ে দিল।

ঘণ্টাখানেক বাদে ভুবনেশ্বরের হোটেলের ঘরে জগন্নাথবাবু মানসী ও সুব্রতর সামনে কিরীটী তার কাহিনী সবিস্তারে বর্ণনা করছিল–

সমস্ত ব্যাপারটার মধ্যে আদৌ কোন জটিলতা ছিল না। এবং সে কথাটা আমি প্রথমেই। বুঝতে পারি, পুরী হোটেলে লক্ষ্মী দেবীই যে মানসী দেবী কথাটা বুঝতে পেরে। বুঝতে আমার বিলম্ব হয় না যে দুবছর আগে সমুদ্রের জলে ড়ুবে মানসী দেবীর মৃত্যু হয়নি তিনি আজও বেঁচে আছেন। এবং বর্তমানে এই ভুবনেশ্বরেই থাকেন। তারপর মানসী দেবীর মুখে যখন তার সব কাহিনী শুনলাম, বুঝলাম সেদিন তাঁকে হত্যা করবারই চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তখনও সংশয় ছিল কিছুটা হত্যাকারীকে নিয়ে, এটা অবিশ্যি বুঝেছিলাম, তার স্বামী শরদিন্দু বা শরদিন্দুবাবুর ভাই মানসীর পূর্ব প্রণয়িনী সুকুমারবাবু দুজনের একজন দোষী।

কিন্তু কে? কে ওঁদের মধ্যে প্রকৃত দোষী সেটা বুঝতে সামান্য দেরি হয়েছিল আমার। কারণ ঐ হত্যা-প্রচেষ্টার মূলে ছিল কোন এক পুরুষের দীর্ঘদিনের লালিত এক ঘৃণা, যে ঘৃণা থেকে জন্ম নিয়েছিল আক্রোশ এবং সেটা দুজনার পক্ষেই সম্ভবপর ছিল। মানসীকে শেষ পর্যন্ত পেল না সুকুমার, তার প্রণয় অপমানিত হল—সেই অপমানই আক্রোশে পরিণত হতে পারে সুকুমারের পক্ষে; তেমনি শরদিন্দুবাবুর স্ত্রীর প্রতি সন্দেহ, এবং সে সন্দেহ থেকে ঘৃণার জন্ম হয়েছিল, সেই ঘৃণাও আক্রোশে পরিণত হওয়া স্বাভাবিক। কাজেই ঐ দুজনার মধ্যেই একজন দোষী। কিন্তু কে—কে দোষী?

আমি শেষ সীমানার জন্য শরদিন্দুবাবু ও সুকুমারবাবু দুজনকেই জানালাম মানসীর বর্তমান ঠিকানাটা এবং জানালাম মানসী আজও বেঁচে আছে। জানিয়েছিলাম এই কারণে যে সত্যিকারের যে দোষী সে এত বড় সুযোগটা হেলায় হারাবে না—সে ছুটে আসবেই। সুকুমার সংবাদটা পেয়ে দেরি করলেন না, ছুটে এলেন ভুবনেশ্বরে, আমার গণনা যে ভুল নয় সেটা প্রমাণ করবার জন্য। শরদিন্দুবাবুর কোন তাড়াহুড়া ছিল না বলেই ঐ রাতেই তিনি এখানে ছুটে আসেননি। হয়তো কাল সকালে আসবেন।

কিরীটীবাবু, জগন্নাথ বললেন, সুকুমারবাবুকে কি আপনি গোড়া থেকেই সন্দেহ করেছিলেন?

মিথ্যা বলব না, করেছিলাম, পুরীতে তিনি আমাকে দেখতে পেয়েও গা-ঢাকা দেওয়ায় তার প্রতি আমার প্রথম সন্দেহ জাগে। আমার কাছে গোপনতার তো কোন প্রয়োজন ছিল না যদি অবিশ্যি সত্যি তিনি নির্দোষ হতেন। তার গিলটি কনসাস-ই তাঁকে গোপনতার আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিল। তবে এটাও ঠিক, মানসী দেবী এসে যদি গতরাত্রে আমার সঙ্গে দেখা না করতেন, আমি এত তাড়াতাড়ি শেষ মীমাংসায় হয়তো পৌছাতে পারতাম না।

ইতিমধ্যে রাত শেষ হয়ে গিয়েছিল। ভোরের আলো জানালাপথে হোটেলের ঘরে এসে প্রবেশ করে। কিরীটী বলল, শরদিন্দুবাবুকে কি হোটেলে একটা ফোন করে দেব মানসী দেবী?

না। মানসী বলল।

শরদিন্দুবাবু তো নির্দোষ, মা! জগন্নাথ বললেন।

দোষী কি নির্দোষ আমি জানি না মেসোমশাই, মানসী বলল, এইটুকু জানি, সেখানে আর আমার পক্ষে ফেরা সম্ভব নয়।

কিন্তু মা–

জানি মেসোমশাই আপনি কি বলবেন, কিন্তু আমার ধারণা সুকুমার যা করেছিল, শরদিন্দুর পক্ষেও সেটা অসম্ভব ছিল না, তার চোখেও যে আমি হত্যার সংকল্প দেখেছিলাম।

সুব্রত বলল, আর একবার ভেবে দেখলে পারতেন মানসী দেবী!

ভেবেছি, ভেবেই বলছি।

কিন্তু মানসী, তুমি জগন্নাথবাবুর কথাটা শেষ হল না, তার আগেই মানসী হঠাৎ উঠে নিঃশব্দে ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল।

পরের দিনের এক্সপ্রেসে কিরীটী আর সুব্রত কলকাতায় যাবার জন্য উঠে বসল।

মানসী জগন্নাথবাবুর গৃহে যায়নি, পুলিশ তার কোন সন্ধান করতে পারেনি তখন পর্যন্ত।

ট্রেন ছাড়বার পর সুব্রত বলল, মানসী কোথায় গেল বল তো?

কিরীটী মৃদু গলায় বলল, মানসীই জানে সে কথা।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত