অবগুণ্ঠিতা

অবগুণ্ঠিতা

শীতের সকাল।

রাস্তার ওপাশে কৃষ্ণচূড়ার গাছটা ফুলে ফুলে যেন রক্ত রাঙা হয়ে উঠেছে।

সুব্রত তার শয়নঘরে একটা আরামকেদারায় গা এলিয়ে দিয়ে ঐদিনকার সংবাদপত্রটা খুলে চোখ বোলাচ্ছিল।

কোমর থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ঢাকা একটা গেরুয়া রঙের কাশ্মীরী শাল! পাশের টিপয়ের ওপরে রক্ষিত নিঃশেষিত চায়ের কাপটা।

ভৃত্য এসে একটা চিঠি সামনে ধরে বললে, দারোয়ান চিঠিটা দিলে। চিঠিটা লেটার-বক্সে ছিল।

সুব্রত হাত বাড়িয়ে চিঠিখানা ভৃত্যের হাত থেকে নিয়ে দেখল—আকাশ-নীল রঙের একখানা পুরু খাম!

চিঠিখানা নাড়াচাড়া করতে করতে সুব্রত বললে, তুই যা।

ভৃত্য ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

সুব্রত দেখল, ঘন ভায়োলেট রঙের কালিতে খামের উপরে পরিষ্কার ইংরেজি হরফে সুব্রতর নাম-ঠিকানা লেখা। চিঠিটা নিশ্চয়ই কেউ হাতে করে ডাকবাক্সে ফেলে গেছে।

সুব্রত খামটা ছিঁড়ে ফেলল।

ভিতরে সাদা কাগজে পরিষ্কার করে ঘন ভায়োলেট কালিতে লেখা বাংলায় একখানা চিঠি।

প্রিয় সুব্রতবাবু,

বিখ্যাত জুয়েলার ও ব্যাঙ্কার গজেন্দ্রকুমার সরকারকে নিশ্চয়ই চিনবেন। কারণ কলকাতা শহরে তিনি একজন টাকার কুমীর বললেও অত্যুক্তি হয় না। বহুদিন হল তার স্ত্রী মারা গেছেন। তার দুটি ছেলে। বড় গণেন্দ্র সরকার অনেকদিন হল বাপের সঙ্গে ঝগড়া করে আলাদা হয়ে গেছেন। কলকাতা মহালক্ষ্মী ব্যাংকের এখন তিনি অ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজার। অবিবাহিত। ছোট ছেলে সৌরীন্দ্র বি.এস-সি পাস করে বাপের কাছেই থাকেন ও বাপের ব্যবসা দেখেন। বড় গণেন্দ্রের বয়স প্রায় বছর চল্লিশ হবে। ছোট সৌরীন্দ্র ছাব্বিশ-সাতাশ বৎসরের হবে। সংসারে সৌরীন্দ্র ছাড়াও একটি বোনপো অশোক, মেডিকেল কলেজের ফিফথ ইয়ারের ছাত্র। সংসারে তার আপনার বলতে এক বিধবা মা। গজেন্দ্রের একটিমাত্র ভগিনী পাবনায় দেশের বাড়িতে থাকেন।

অশোক গজেন্দ্রের অত্যন্ত প্রিয়। বোনপো অশোক ছাড়াও গজেন্দ্রের আর একটি পোয্য আছে। সে হচ্ছে বিনয়ে। গজেন্দ্রের বৈমাত্রেয় ভাই!

বিনয়ের একটি পা (বাম) জন্মাবধি একটু খোঁড়া। অত্যন্ত নিরীহ শান্তশিষ্ট, বি. এস-সি পাস করে মেডিকেল কলেজে ঢুকেছিল। কিন্তু সেকেণ্ড ইয়ার পর্যন্ত পড়ে, পড়া ছেড়ে বছর। তিনেক হল নিষ্ক্রিয় হয়ে বাড়িতেই বসে আর্টের চর্চা করেন।

বিনয়েন্দ্রের যখন নয় বৎসর বয়স, তখন হঠাৎ বিসূচিকা রোগে একদিনেই দুঘণ্টার আগেপিছে গজেন্দ্রের পিতা ও বিমাতা মারা যান! ঐ গজেন্দ্রবাবুকেই আজ সকালে হঠাৎ তার শয়নঘরের সংলগ্ন লাইব্রেরি ঘরে মৃত অবস্থায় চেয়ারের উপরে বসে আছেন দেখা গেছে। আমার মনে হয় ওঁর মৃত্যুর সঙ্গে কোন রহস্য জড়িয়ে আছে! অর্থাৎ মৃত্যু তার স্বাভাবিক নয়। তাকে কেউ খুন করেছে বলে আমার ধারণা। আপনি যদি হত্যাকারীকে ধরিয়ে দিতে পারেন, তবে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ হব। নমস্কার।

ইতি–

সরকারবাড়ির জনৈক বন্ধু।

চিঠিখানা আগাগোড়া এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললে সুব্রত। সুব্রত যেন একটু আশ্চর্যই হয়। কে এমন চিঠি লিখতে পারে—ব্যাপারটা কি সত্যি?

চিঠিখানা আরও একবার আগাগোড়া পড়ে ফেলল সে। তারপর কৌচ থেকে উঠে ঘরের কোণে রক্ষিত টেলিফোনের কাছে গিয়ে দেওয়ালের গায়ে লোহার হুকে টাঙানো টেলিফোন গাইডটা হাতে নিয়ে দ্রুত পাতা ওলটাতে লাগল।

সহজেই সুব্রত ব্যাঙ্কার ও জুয়েলার মিঃ গজেন্দ্র সরকারের ফোন নম্বরটা খুঁজে পেল। ডায়েলটা ঘুরিয়ে ওই নম্বরটা লাগাতেই ওপাশ থেকে কিছুক্ষণের মধ্যে জবাব এল, হালো?

এটা কি জুয়েলার ব্যাঙ্কার গজেন সরকারের বাড়ি? সুব্রত প্রশ্ন করলে।

হ্যাঁ, কে আপনি?

সুপার সুব্রত রায়। বাড়ি থেকে কথা বলছি…আপনি কে?

কে, মিঃ রায়? আমি তালুকদার…

কে মফিজউদ্দিন?

হ্যাঁ। আপনি শুনেছেন নাকি কিছু? হঠাৎ আজ সকালে মিঃ সরকারকে তার…

আমি জানি—এখুনি আমি যাচ্ছি। সুব্রত তালুকদারকে আর কোন জবাব দেবার অবকাশ মাত্র না দিয়ে ফোনটা নামিয়ে রেখে, ক্ষিপ্রহস্তে বেশভূষা করে নিয়ে সোজা নীচে এসে গ্যারেজ থেকে গাড়িটা বের করে স্টার্ট দিল।

গাড়ি বড় রাস্তায় এসে পড়ল।

মাঘের মাঝামাঝি। শীতের সকাল। বেলা প্রায় সাড়ে নয়টা হবে, আমহার্স্ট স্ট্রীটের মোড়ে বসন্ত কেবিনে চা-সেবীদের প্রচণ্ড ভিড়।

সোমবার। রেস্টুরেন্টে রেডিও সেটে পংকজ মল্লিকের রবীন্দ্র সংগীত হচ্ছে।

শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন,
আমলকির ঐ ডালে ডালে…

ট্রামে বাসে এর মধ্যেই অফিসমুখো বাবুদের ঠেলাঠেলি শুরু হয়ে গেছে।

মিঃ সরকারের বাড়ি আপার সারকুলার রোডে মানিকতলা বাজারের কাছাকাছি।

মিনিট পনেরোর মধ্যেই সুব্রত মিঃ সরকারের আধুনিক কেতায় নির্মিত প্রাসাদোপম। অট্টালিকার গেটের মধ্যে এসে গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করল।

লোহার গেট। একপাশে শ্বেতপাথরের ফলকে লেখা মর্মরাবাস। অন্য পাশে পিতলের প্লেটে লেখা, মিঃ জি, সরকার।

গেটের সামনেই দারোয়ানের পাশে একজন লালপাগড়ি মোতায়েন ছিল। সুব্রতকে গাড়ি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে দেখে সেলাম দিল এবং পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াল। সুব্রত একেবারে গাড়িবারান্দার নীচ বরাবর এসে গাড়ির ব্রেক কষল।

গাড়ি থেকে নামতেই সামনে দরজার গোড়ায় আরও দুজন লালপাগড়ি। লালপাগড়ি দুজনেই সুব্রতকে বেশ ভালভাবেই চিনত। সেলাম ঠুকে তারাও পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াল।

সুব্রত গিয়ে সামনের ঝুলন্ত দামী পর্দাটা সরিয়ে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল।

প্রশস্ত একটি হলঘর। মেঝেতে পুরু দামী কার্পেট বিছানো। দামী দামী কোচ ও সোফায় ঘরখানি অতি আধুনিক কেতায় সুসজ্জিত। দেওয়ালে দেওয়ালে দামী দামী বড় বড় অয়েলপেন্টিং ঝুলছে।

ঘরের চার কোণে স্ট্যান্ডের ওপরে জয়পুরী পিতলের টবে পামট্রি। ঘরটা খালি।

সুব্রত ইতস্তত তাকাতে লাগল, কি করবে এখন সে? কোন্ পথে যাবে এবার?

এমন সময় হঠাৎ সামনের একটা পর্দা তুলে ছাব্বিশ-সাতাশ বৎসরের একটি অতি সুদর্শন যুবক ঘরের মধ্যে এসে প্রবেশ করল।

বড় বড় দুটি হরিণের মত গভীর কালো ছলছল চোখ। চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠেছে যেন গভীর এক আকুলতা।

একমাথা কোকড়া কোঁকড়া চুল, বিস্রস্ত এলোমেলো। টিকোল নাসা।

পরনে দামী শান্তিপুরী ধুতি। গায়ে গরম পাঞ্জাবি।

ভদ্রলোক হঠাৎ ঘরের মধ্যে সুব্রতকে দেখে থেমে গিয়ে আবার সুব্রতর দিকে এগিয়ে এলেন।

সুব্রত স্পষ্টই লক্ষ্য করল এবার। ভদ্রলোক বাঁ পা-টা যেন একটু টেনে টেনে চলছেন। সুব্রতর আজ সকালে পাওয়া চিঠিটার কথা মনে পড়ে গেল।

সুব্রতই প্রথমে প্রশ্ন করল, আপনি বোধ হয় এ বাড়িরই কেউ হবেন নিশ্চয়ই?

হ্যাঁ।

আপনার নামটা জিজ্ঞাসা করতে পারি কি?

বিনয়েন্দ্র সরকার।

গজেনবাবুর বৈমাত্রেয় ভাই, তাই না?

হ্যাঁ। কথাটা বলে ভদ্রলোক যেন রীতিমত বিস্ময়ের সঙ্গেই কয়েকটা মুহূর্ত সুব্রতর দিকে তার ডাগর চোখের নীরব দৃষ্টি নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে কোনমতে একটা ঢোক গিলে বললেন, কিন্তু আপনি? আপনাকে তো

সুব্রত স্মিতভাবে বললে, চিনবেন না। আমার নাম সুব্রত রায়। সি. আই. ডি. ইন্সপেক্টর মিঃ তালুকদার এখানে আছেন?

আপনি পুলিসের লোক?

হ্যাঁ।

উপরে তারা সব আছেন, চলুন।

মৃতদেহ কোথায়?

উপরে লাইব্রেরি ঘরে।

আমাকে ঘরটা একটু দেখিয়ে দিতে পারেন?

হ্যাঁ, চলুন।

বিনয়েবাবুর পিছনে পিছনে সুব্রত অগ্রসর হল। হলঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে ওরা একটা লম্বা টানা বারান্দায় এসে পড়ল।

বারান্দার শেষ সীমান্তে দোতলায় ও তিনতলায় ওঠবার সিঁড়ি। সিঁড়িটা আগাগোড়া মারবেল : পাথরের তৈরি, প্রশস্ত। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে দোতলায় এল ওরা।

দোতলায়ও একতলার অনুরূপ একটা টানা বারান্দা। বারান্দায় রেলিংয়ের গা ঘেঁষে পিতলের টবে নানা প্রকারের পাতাবাহার। পামট্রি ও সিজন ফ্লাওয়ারের বিচিত্র সমাবেশ।

বারান্দার শেষপ্রান্তে একটা ঘরের পর্দা তুলে বিনয়ে বললেন, এই ঘরে।

সুব্রত ঘরের মধ্যে এসে প্রবেশ করল।

ঘরের মধ্যে ঐসময় কেউ ছিল না। আকারে ঘরখানি বেশ প্রশস্ত। মেঝেতে দামী পুরু কার্পেট বিছানো। ঘরের মধ্যে চারপাশের দেওয়ালের কোল ঘেঁষে সার সার কাঁচের আলমারি। প্রত্যেকটি আলমারির মধ্যে থাকে থাকে সব বই সাজানো। ঘরের মধ্যে দুতিনখানি দামী গদীআঁটা সোফা ও কাউচ। খান দুই ছোট টেবিল।

ঘরের এককোণে একটি ভেনাসের প্রতিমূর্তি। প্রতিমূর্তির ঠিক নীচেই একটি সুবৃহৎ দামী ঘড়ি। দুটো বেজে বন্ধ হয়ে আছে। ঘরের চার দেওয়ালে চারটি অয়েলপেন্টিং।

হঠাৎ সুব্রতর নজরে পড়ল, ঘরের দক্ষিণ কোণে যেখানে বোধ হয় পাশের ঘরের দরজার পর্দা ঝুলছে তারই সামনে ছোট একটি টেবিল। টেবিলের ওপরে একখানা মোটা বই খোলা।

টেবিলের সামনেই একটা আরাম কেদরায় হেলান দিয়ে বসে আছেন এক বৃদ্ধ।

বিনয়ে বললেন, ঐ যে!

সুব্রত এগিয়ে যায়।

বৃদ্ধা মারা গেছেন কে বলবে? যেন চোখ বুজে বসে আছেন। কী ধীর সৌম্য শান্ত বৃদ্ধের চেহারা! শ্বেতশুভ্র চুলগুলি বিস্রস্ত এলোমেলো। দাড়ি-গোঁফ নিখুঁতভাবে কামানো। পরিধানে দামী পায়জামা ও শালের পাঞ্জাবি। নিমীলিত দুটি আঁখি! বাঁ হাতটা আরামকেদারায় হাতলের ওপর দিয়ে নীচের দিকে ঝুলছে, ডান হাতটি কোলের ওপরে। নিস্তব্ধ ঘরের মধ্যে যেন মৃত্যু এসে নিঃশব্দে তার আসন পেতেছে।

ঐসময় সামনের পর্দা তুলে তালুকদার এসে লাইব্রেরি ঘরে প্রবেশ করলেন, এই যে সুব্রতবাবু, এসে গেছেন!

সুব্রত তালুকদারের দিকে মুখ তুলে তাকাল।

মৃতদেহ দেখলেন? ঠিক যেন ঘুমিয়ে আছেন। কোথাও এতটুকু struggle-এর চিহ্ন পর্যন্ত নেই।

সুব্রত মৃদুস্বরে প্রশ্ন করলে, ডাঃ আমেদকে খবর দিয়েছেন, তালুকদার?

হুঁ। এখানে আসবার আগেই। এখুনি হয়তো তিনি এসে পড়বেন। কিন্তু আপনি সংবাদ পেলেন কি করে?

সুব্রত সংক্ষেপে চিঠি-প্রাপ্তির কথা খুলে বললে। তারপর আবার প্রশ্ন করলে, মৃত্যুর কারণ কিছু পেয়েছেন তালুকদার?

না। মৃতদেহ আমি স্পর্শ করিনি, তবে বাইরে থেকে যতটুকু সম্ভব পরীক্ষা করে দেখেছি, কোন আঘাতের চোখে পড়েনি। মনে হচ্ছে, হয়ত কেষ্টা সুইসাইড হতে পারে।

সুব্রত কোন জবাব না দিয়ে মৃতদেহের দিকে এগিয়ে গেল!

মৃত সরকারের পাঞ্জাবির বোতামগুলি ভোলা। পাঞ্জাবির বুকের বাঁদিককার অংশ বাঁদিকে ঝুলে পড়েছে। সুব্রত তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে ঝুঁকে পড়ে মৃতদেহ পরীক্ষা করতে লাগল।

হঠাৎ দেখতে দেখতে নজরে পড়ে, মৃতদেহের বুকে ছোট একটি রক্তবিন্দু শুকিয়ে কালো হয়ে যেন জমাট বেঁধে আছে?

আরও নজরে পড়ল, মৃতের নাকের ওপরে ছোট ঘোট দুটি কিসের দাগ! সুব্রত একটু নীচু হয়ে পরীক্ষা করতে লাগল। হঠাৎ যেন একটা মিষ্টি গন্ধ পায় সুব্রত। মৃতের মুখ থেকে ও গন্ধটা পাওয়া যায়। সুব্রত আঙুলের নখ দিয়ে বুকের রক্তবিন্দু তুলে ফেলতেই দেখতে পেল, একটা সুচাগ্র পরিমাণ ছিদ্র!

মিষ্টি গন্ধটা কিসের হতে পারে? হঠাৎ মনে হয় সুব্রতর, ক্লোরোফরমের গন্ধ নয়তো ক্লোরোফরমের সাহায্যে অজ্ঞান করে তীক্ষ্ণ সঁচের মত কোন অস্ত্রের সাহায্যে একেবারে হৃৎপিণ্ডকে বিদ্ধ করে মৃত্যু ঘটানো হয়নি তো? ঐসময় পুলিস সার্জন ডাঃ আমেদ এসে ঘরে। প্রবেশ করলেন, Good morning মিঃ রায়, মিঃ তালুকদার!

Good morning! ওঁরাও প্রত্যুত্তরে বললেন।

মৃতদেহ কোথায়? ডাঃ আমেদ প্রশ্ন করলেন।

ঐ যে দেখুন। বলে সুব্রত আঙুল তুলে দেখাল।

ডাঃ আমেদ সুব্রতর নির্দেশমত মৃতদেহের দিকে এগিয়ে গেলেন।

ডাঃ আমেদের পরীক্ষা হয়ে গেলে, সুব্রত ডাঃ আমেদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, মিঃ সরকার কতক্ষণ মারা গেছেন বলে আপনার মনে হয়, ডাঃ আমেদ?

রাইগারমর্টিস বেশ ভাল করেই হয়েছে। মনে হয় রাত্রি সাড়ে নয়টা থেকে দেড়টার মধ্যে কোন এক সময় মারা গেছেন—কোন বিষের ক্রিয়ায়। কারণ মৃতদেহের বাঁদিককার fifth intercostal space-এ mamary line থেকে একটু laterally ও below-তে puncture wound দেখা যাচ্ছে–

সুব্রত বলে, হ্যাঁ–

ডাঃ আমেদ বলেন, তাই আমার মনে হচ্ছে, ঐ wound কোন needle জাতীয় instrument-এর সাহায্যে হয়ে থাকবে!

তালুকদার বলেন, স্পষ্ট করে আর একটু বলুন, ডক্টর আমেদ?

মনে হচ্ছে কোন বিষ needle-এর সাহায্যে একেবারে হার্টে প্রবেশ করিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ওঁর মৃত্যু ঘটানো হয়েছে—অবশ্য ময়নাতদন্তে সবই প্রকাশ পাবে

You mean–

ঠিক তাই। এটা suicide বলে মনে হয় না, তালুকদার সাহেব! খুব সম্ভব a case of homicide-হত্যা—মার্ডার!

আপনার কি তাই মনে হয়?

হ্যাঁ। তাছাড়া–

কি?

ঐ সময় সুব্রত কথা বলে, মৃত ব্যক্তির নাকের ডগায় দুতিনটে yellow spots আছে। মৃত ব্যক্তির নাকের কাছে নাক দিয়ে শুঁকে দেখুন, chloroform-এর গন্ধও পাওয়া যায়।

তাই নাকি? দেখি! ডাঃ আমেদ সুব্রতর কথামত মৃত ব্যক্তির নাক, পরীক্ষা করে ও এঁকে দেখলেন, Yes! You are right, ওটা chloroform-এরই দাগ।

আমারও মনে হয় ডাক্তার যে, আগে chloroform করা হয়েছিল। পরে কোন হাইপোডারমিক নি জাতীয় বস্তুর সাহায্যে হার্টকে puncture করতেই shock-এ মৃত্যু হয়েছে।

ডাঃ আমেদ বললে, না তা হতে পারে না! Chloroform দিলে shock হবে কেন? হবে না বুঝি?

না। কোন বিষপ্রয়োগে বলেই মনে হয়!

মৃতদেহ তাহলে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠাবার ব্যবস্থা করি? তালুকদার অতঃপর জিজ্ঞাসা করলেন।

করুন। আমি তাহলে চলি। নমস্কার।

নমস্কার।

ডাঃ আমেদ ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেলেন।

সুব্রত তালুকদারের মুখের দিকে তাকিয়ে এবারে বললে, এখানকার সকলের জবানবন্দী নিয়েছেন? কে কে এখন বাড়িতে আছেন?

না, জবানবন্দী নিইনি এখনও। মিঃ সরকারের বড় ছেলে গণেন্দ্রবাবুকে সংবাদ পাঠানো হয়েছে। এখুনি হয়তো আসবেন তিনি। একমাত্র তিনি ছাড়া ছোট ছেলে সৌরীন্দ্র, ভাগ্নে অশোক, ছোট ভাই বিনয়ে সকলেই আছেন। মিঃ, সরকারের সেক্রেটারি অনিমেষবাবুও আছেন। বাড়ির চাকরবাকরের মধ্যে মিঃ সরকারের বহুদিনকার পুরাতন ভৃত্য গোপাল ও থাকোহরি, ঠাকুর রামস্বরূপ, সোফার কিষণ সিং, দারোয়ান রণবাহাদুর থাপা, মালী হরি, সকলেই আছে।

বেশ। আগে একবার চলুন, মিঃ সরকারের শয়নকক্ষটা দেখে আসি। তারপর লাইব্রেরিটা আর একবার ভাল করে দেখব। হ্যাঁ ভাল কথা, মৃতদেহ সর্বপ্রথমে কার নজরে পড়ে?

সে এক বিচিত্র ব্যাপার মিঃ রায়! এ বাড়ির এক বিশেষ পরিচিত যুবক সুবিমল চৌধুরী। তিনি খুব ভোরে মিঃ সরকারের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। শয়নঘরে মিঃ সরকারকে না পেয়ে লাইব্রেরিতে গিয়ে ঢোকেন। মিঃ সরকারের নাকি খুব ভোরে উঠে লাইব্রেরি ঘরে ঘণ্টাখানেক পড়াশুনা করা অভ্যাস ছিল। তাই তিনি লাইব্রেরিতে যান এবং তিনিই সর্বপ্রথম মিঃ সরকারকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। তখন চিৎকার করে সকলকে ডাকাডাকি করেন এবং পুলিশে সংবাদ দিতে বলেন। ছোট ভাই বিনয়ে বাড়িতে ছিলেন না। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি বরাহনগরে এক বন্ধুর বিবাহে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়েছিলেন। তিনি এই কিছুক্ষণ হল এসেছেন। মোটামুটি এইটুকুই এখন পর্যন্ত আমি জানি।

হুঁ।–বলতে বলতে সুব্রত মিঃ সরকারের লাইব্রেরি সংলগ্ন শয়ন কক্ষে গিয়ে প্রবেশ করল। শয়নকক্ষটি বেশ প্রশস্ত। নরম পুরু গালিচায় ঘরের মেঝেটি আগাগোড়া মোড়া। ঘরের এক কোণে একটি দামী মেহগনি কাঠের পালঙ্ক। পালঙ্কের ওপরে ধবধবে পরিষ্কার শয্যা বিছানো। নিভাজ নিখুঁত শয্যা। শয্যাটি যে গত রাত্রে ব্যবহৃত হয়নি সেটা দেখলে বুঝতে দেরি হয় না।

খাটের শিয়রের ধারে একটি শ্বেতপাথরের টীপয়ের ওপরে ফোন। তার এক পাশে একটি সুদৃশ্য ভাঙা দামী সোনার রিস্টওয়াচ। দুটো বেজে বন্ধ হয়ে আছে। এক পাশে একটি কাঁচের গ্লাসভর্তি জল। জলটিও ব্যবহৃত হয়নি বোঝা যায়।

ঘরের অন্য কোণে একটি আলনায় কয়েকটি জামা কাপড় ও সুট। তারই পাশে একটি লোহার সে ও তার পাশে একটি আয়নাওয়ালা কাঁচের আলমারি ঘরের মধ্যে, আর কোন আসবাবপত্র নেই।

দেওয়ালে গোটা দুই ফটো। একটি ফটো একজন স্ত্রীলোকের—অন্যটি একটি বছর দশেকের ছেলের, একটা কাঠের ঘোড়ার ওপরে চেপে বসে আছে। * শয়নঘরটি দেখে সুব্রত এসে লাইব্রেরিতে ঢুকল। মৃতদেহের সামনে টেবিলের ওপরে রক্ষিত খোলা বইটার দিকে তাকাল! বইটা কৃত্তিবাসের রামায়ণ। হঠাৎ একটা শ্লোকের দিকে সুব্রতর নজর পড়ল, মৃত্যুপথযাত্রী লংকার অধীশ্বর রাবণের খেদএকটি কবিতার চরণের নীচে ডিপ ভায়োলেট কালিতে আনডারলাইন করা এবং আনডারলাইনের পাশেই একই কালিতে দুটি xx চিহ্ন দেওয়া। লাইনটা হচ্ছে :

হেলায় রাখিলে ফেলে কার্য নাহি হয়।

চকিতে কি একটা কথা সুব্রতর মনে পড়তেই সুব্রত চট করে পকেট থেকে আজ সকালে প্রাপ্ত চিঠিখানা টেনে বের করে চিঠিটা খুলে ফেললে।

হ্যাঁ, অবিকল তার সন্দেহই ঠিক। একই কালি। চিঠির কালিই ব্যবহার করা হয়েছে বইয়ের পাতাতেও, দুটো কালি হুবহু একই রংয়ের।

সুব্রত অতঃপতর ব্যাপারটা তালুকদারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

তালুকদার সেই চিঠি রামায়ণের পাতার আন্ডারলাইন করা কালির সঙ্গে মিলিয়ে দেখে বললেন, হ্যাঁ, একই কালি বলে মনে হচ্ছে!

কিন্তু আমি কি ভাবছি, জানেন তালুকদার?

কি?

এই জনৈক বন্ধুটি কে?

দেখা যাক না এঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। জনৈক বন্ধুটির সম্পর্কে এঁরা কেউ কিছু বলতে পারেন কিনা!

এদের জিজ্ঞাসাবাদ করে কিছু জানা যাবে কিনা বলতে পারি না তালুকদার, তবে আমার মনে হচ্ছে, চিঠি যিনি লিখেছেন তিনি সরকার পরিবারের বিশেষ কোন পরিচিতজনই হবেন।

আমার কিন্তু একটা সন্দেহ হচ্ছে সুব্রত!

কি?

চিঠি যিনি লিখেছেন তিনি এই হত্যা-ব্যাপারের সঙ্গে জড়িত না হলেও এই হত্যা-ব্যাপার সম্পর্কে তিনি অনেক কিছুই জানেন।

অসম্ভব নয় কিছু।

নচেৎ তোমার চিঠিপ্রাপ্তি ও ঐ চৌধুরী না কে, তার এখানে আজ সকালে আবির্ভাবের ব্যাপারটা–

একটা অদৃশ্য যোগযোগ হয়তো আছে।

জবানবন্দী কি শুরু করব? তালুকদার প্রশ্ন করলেন।

তার আগে একবার ওপরের তলাটা ভাল করে ঘুরে দেখে নিলে হত না?

বেশ তো চলুন। আমি অবিশ্যি ইতিপূর্বে একবার দেখছি।

উপরের তলায় সর্বসমেত সাতটি ঘর।

সুব্রত তালুকদার সঙ্গে সঙ্গে লাইব্রেরি থেকে বের হয়ে বারান্দায় এল। প্রথমেই যে ঘরখানা পরে সেটা মিঃ সরকারের ছোট ছেলে সৌরীন্দ্রের শয়নকক্ষ।

সৌরীরে ঘর থেকে মিঃ সরকারের ঘরে আসতে হলে বারান্দায় এসে তবে অন্য ঘরে যাওয়া যায়। দুই ঘরের মধ্যবর্তী কোন যাতায়াতের পথ নেই,

সৌরীন্দ্রের ঘরের পরেই মিঃ সরকারের ভাগ্নে অশোকের ঘর। সৌরীন্দ্রের ঘর থেকে যেমন লাইব্রেরিতে যাতায়াতের কোন পথ নেই,—তেমন অশোকের ও সৌরীন্দ্রের পরস্পরের ঘর থেকেও পরস্পরের ঘরে যাতায়াতের কোন পথ নেই।

অশোকের ঘরের পাশেই বিনয়ের ঘর—মিঃ সরকারের বৈমাত্রেয় ছোট ভাই।

অশোক ও বিনয়ের ঘরের পরই মিঃ সরকারের খাসভৃত্য রামচরণের ঘর। রামচরণের ঘরের পাশ্ববর্তী ঘরটি খাওয়ার ঘর বা ডাইনিং হল।

গজেন্দ্রের শয়নকক্ষ, লাইব্রেরি, সৌরীন্দ্র ও অশোকের ঘরের পিছনদিকে এক একটি করে ছোট ব্যালকনি আছে। ঐদিকটাই বাড়ির পশ্চাৎদিক।

বাড়ির পশ্চাৎভাগে একটা সরু গলি। গলির ওপাশে একটা মস্ত বড় পোড় মাঠ। মাঠের ওদিকে খানকয়েক বস্তি-ঘর চোখে পড়ে। গজেন্দ্রের শয়নঘরের পিছনদিকে একটা ঘোরানো লোহার সিঁড়ি বরাবর নীচে চলে গেছে। ওই সিঁড়ি দিয়ে মেথর যাতায়াত করে। গজেন্দ্রের ঘর থেকে ঘোরানো সিঁড়ির দরজাটা সর্বদাই ঘরের ভেতর থেকে বন্ধ থাকে। তখনও ছিল।

অশোক মেডিকেল কলেজের ছাত্র। তার ঘরভর্তি শেলফে সব মোটা মোটা ডাক্তারি বই। ঘরের এক কোণে পার্টিশন দিয়ে সে ছোটখাটো একটা ল্যাবরেটারি মতও করেছে।

এককালে সে কেমেস্ট্রির ছাত্র ছিল। ডাক্তারি পড়তে পড়তে এখনও সে কেমিস্ত্রির চর্চা করে। ইচ্ছা ডাক্তারি পাস করবার পর এম. এস-সিটাও দেবে কেমিস্ট্রিতে।

অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র সে। দিনরাত নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। ছোটখাটো শিশি, বোতল, ফ্লাস্ক, টেস্টটিউব, বুনসেন বার্নার, মাইক্রোসকোপ ইত্যাদিতে তার ছোট ল্যাবরেটারিটি ভর্তি। শিয়রের পাশে ছোট একটা টীপয়। টীপয়ের ওপরে একটা সোনার রিস্টওয়াচদুটো বেজে বন্ধ হয়ে আছে!

সুব্রত একান্ত কৌতূহলবশে অশোকের ল্যাবরেটারিটি দেখতে লাগল।

হঠাৎ তার নজরে পড়ল, ল্যাবরেটারির টেবিলের এক পশে একটি ফাইভ সি. সি.-র রেকর্ড সিরিঞ্জ এবং সিরিঞ্জটার সঙ্গে লাগানো একটা মোটা নিল। সিরিঞ্জটা তুলে পরীক্ষা করতেই দেখা গেল, সিরিঞ্জটার মধ্যে খানিকটা রক্ত জমাট বেঁধে আছে। সূঁচ পরানো সিরিঞ্জটা সিরিঞ্জের বাক্সের ওপরে রাখা।

সুব্রত আস্তে আস্তে সিরিঞ্জ থেকে নিটা খুলে, নিক্স ও সিরিঞ্জটা একটা কাগজে মুড়ে নিজের পকেটে রেখে দিল। একটা কথা চকিতে তার মনে হয়, ঐ সিরিঞ্জ ও নিডলের সাহায্যই নেওয়া হয়নি তো! সিরিঞ্জের মধ্যস্থিত জমাটবাধা রক্তটুকু অ্যানালিসিস করলেই হয়তো ব্যাপারটার ওপরে আলোকসম্পাত হবে। সুব্রত মনে মনে ভাবে, দুটো সূত্র পাওয়া গেল—এক, চিঠির ডিপ ভায়োলেট কালি। দুই, সিরিঞ্জ।

ঐসময় ভৃত্য এসে সংবাদ দিল, মিঃ সরকারের জ্যেষ্ঠ পুত্র গণেন্দ্র সরকার এসেছেন। সুব্রত কিন্তু কোন জবাব দিল না। তার মনের মধ্যে তখন অন্য এক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। সুব্রত লক্ষ্য করেছিল, ঘরের পিছনের ব্যালকনিগুলি এত কাছে কাছে যে একটা ব্যালকনি থেকে অন্য ব্যালকনিতে অনায়াসেই লাফিয়ে যাওয়া যায়। তবে কী হত্যাকারী ঐ ব্যালকনি-পথেই লাইব্রেরিতে কোন এক সময় প্রবেশ করেছিল।

প্রথমেই ডাক পড়ল অশোকের।

লাইব্রেরি ঘরে বসেই জবানবন্দী নেওয়া শুরু হল।

অশোক ঘরে এসে প্রবেশ করল।

বেশ বলিষ্ঠ উঁচু লম্বা চেহারা। পরিধানে ঢোলা পায়জামা ও গরম ফ্লানেলের ঢোলা হাতা পাঞ্জাবি। মাথার চুলগুলি বিস্বস্ত এলোমেলো। চোখের চাউনি যেন ভীত চঞ্চল। রাত্রিজাগরণের সুস্পষ্ট আভাস চোখের কোলে।

বসুন। আপনার নাম অশোক?

আজ্ঞে অশোক সেন।

ঐ সময় সুব্রত হঠাৎ প্রশ্ন করে, আপনার টেবিলের ওপরে রাখা ঘড়িটা লক্ষ্য করেছেন কিদুটো বেজে বন্ধ হয়ে আছে?

না তো!

লক্ষ্য করেন নি?

না।

মিঃ সরকারের ভাগ্নে হন তো আপনি?

হ্যাঁ।

আপনাকে দেখে যেন মনে হচ্ছে, রাত্রে আপনার তেমন ভাল ঘুম হয়নি। কাল রাত্রি জেগে খুব পড়াশুনা করেছিলেন বুঝি?

আজ্ঞে হ্যাঁ। সামনেই ফিফথ ইয়ারের পরীক্ষা।

কাল কত রাত্রি পর্যন্ত জেগেছিলেন?

তা প্রায় রাত্রি একটা হবে।

আপনি তো মিঃ সৌরীন সরকারের ঠিক পাশের ঘরেই থাকেন! কোন প্রকার অস্বাভাবিক শব্দ বা গোলমাল কিছু সৌরীনবাবুর ঘরে বা আপনার মামার ঘরে শুনেছিলেন কি?

না।

আচ্ছা মামাবাবুর সঙ্গে আপনার কি রকম সম্পর্ক ছিল?

তিনি আমাকে খুবই ভালবাসতেন। নিজের ছেলে সৌরীন্দ্রর থেকে কোন অংশেই তিনি আমাকে কম ভালবাসতেন না। তাছাড়া আজ প্রায় ষোল বছর মামার কাছেই তো আছি।

কাল কোথাও বের হয়েছিলেন আপনি?

সন্ধ্যা সাতটার সময় আমি হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে ঘরে ঢুকি। তারপর সারারাত ঘরেই। ছিলাম।

খেতে বের হননি?

না। কয়েকদিন থেকেই আমার খাবার চাকরেরা ঘরেই রেখে যায়। এ বাড়িতে সকলেই নটার মধ্যে খাওয়া শেষ করে। রাত্রি জেগে পড়তে হয় বলে আজ মাসখানেক থেকে আমি ঘরে বসেই খাই। কাল রাত্রে একটার সময় খেয়ে শুতে যাবার আগে গোপালকে ডেকে এঁটো থালাবাসন নিয়ে যেতে বলি। গোপাল এসে নিয়ে যায়।

তাহলে সারা রাত্রি আপনি ঘরেই ছিলেন?

হ্যাঁ।

আপনার মামার তার ছেলেমেয়ের প্রতি ও তাঁর ছোট ভাইয়ের প্রতি ব্যবহার কি রকম ছিল বলতে পারেন?

গণেনদা তো এ বাড়িতে থাকেন না। মামার মতের সঙ্গে তার মত মেলে না, তাই তিনি আলাদা ভাবে ব্যবসা করছেন এবং আজ প্রায় তিন বৎসর আলাদা বাসা ভাড়া করে বালিগঞ্জেই থাকেন। আর ছোট ছেলে সৌরীনদা এখানেই থাকে। মামার ব্যবসা দেখাশোনা করে।

গণেনবাবু আসাযাওয়া করেন না?

আসেন কখনওসখনও। তাও এক আধ ঘণ্টার জন্য।

মিঃ সরকার কাকে বেশী ভালবাসতেন?

আমার মনে হয় মামা তার ছোট ছেলে সৌরীনদাকে যেন বড় ছেলে গণেনদার থেকে একটু বেশী ভালবাসতেন। আর ছোট মামা বিনয়েন্দ্রকেও মামা খুবই ভালবাসতেন।

আপনার মামার কোন শত্রু ছিল বলে আপনার মনে হয়?

মামার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কোন কিছুই আপনাকে আমি বলতে পারব না। তাছাড়া মামা চিরদিনই একটু গম্ভীর প্রকৃতির ছিলেন। কারও সঙ্গে বেশী কথা বড় একটা বলতেন না।

কাল আপনার মামার সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিল?

না। অশোকের গলার স্বরটা যেন একটু কেঁপে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই সেটা সে সামলে নিল এবং বললে, মামা রাত্রে যেমন একটু দেরি করে শুতেন, তেমনি আবার ভোরে উঠতেন। রাত্রে এবং সকালে ঘন্টাখানেক লাইব্রেরি ঘরে কাটাতেন—তারপর প্রায় বেলা সাতটার সময় দোকানে বের হয়ে যেতেন। ইদানিং তিনি ব্লাডপ্রেসার ভুগছিলেন বলে রাত্রে একবাটি দুধ ও ফল ছাড়া বিশেষ কিছুই খেতেন না। সেও নিজের ঘরে বসে খেতেন। সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফিরে স্নান করে লাইব্রেরিতে ঢুকতেন। অনেক রাত্রি পর্যন্ত পড়াশুনা করতেন। এই সব কারণে বাড়ির কারও সঙ্গেই বড় একটা তার দেখাশুনা হত না।

কবে শেষ আপনার মামার সঙ্গে দেখা হয়েছিল?

পরশু রাত্রে। আমি তখন সবে কলেজ থেকে ফিরেছি, রাত্রি প্রায় সাড়ে আটটা হবে, তিনি আমাকে তার লাইব্রেরিতে ডেকে পাঠান।

কেন?

আমার পরীক্ষা সংক্রান্ত ব্যাপারে।

তারপর আর মামার সঙ্গে আপনার দেখা হয়নি?

না। এবারও অশোকের গলার স্বরে যেন একটু দ্বিধা।

আপনার মামার কোন উইল আছে কিনা সে সম্পর্কে আপনি কিছু জানেন?

হ্যাঁ। কিছুদিন আগে একবার তার হঠাৎ রক্তচাপ বৃদ্ধি হওয়ায় মাইলড় একটা হার্ট-অ্যাটাক হয়েছিল। মামার হার্ট-অ্যাটাক হওয়ায় আমি অত্যন্ত ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। আমার চোখে জলও এসে গিয়েছিল। সেই সময় তিনি বলেছিলেন, কঁদিস কেন অশোক! মামা কি কারও চিরদিন বেঁচে থাকে রে! সম্পত্তি ও টাকার এক তৃতীয়াংশ তোর নামে উইলে লিখে দিয়েছি। দুই পুরুষ তোর কোন অভাবই হবে না—যদি বুঝে চলতে পারিস। তাছাড়া আমার টাকা থেকে নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা তুই পাবি!

আর সবাইকে কি দিয়েছেন, সে সম্পর্কে সেদিন কিছু বলেছিলেন?

না।

আচ্ছা আজ সকালে প্রথম কি করে ব্যাপারটা আপনি জানতে পারলেন?

সুবিমলদার চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙে যায়—

এই সুবিমলবাবুটি কে?

সুবিমলদা মামার দূরসম্পৰ্কীয় পিসতুতো ভাই। রাজলক্ষ্মী মিলে চাকরি করেন। অ্যাভিন হোটলে থাকেন।

সুবিমলবাবু কি আপনাদের এখানে প্রায়ই আসাযাওয়া করেন নাকি?

হ্যাঁ। মামাবাবু সুবিমলদাকে খুব পছন্দ করতেন। তবে—

কি, থামলেন কেন বলুন!

মামাবাবু ওকে মধ্যে মধ্যে শুনেছি বকাবকি করতেন—

কেন?

শুনেছি বড্ড বেহিসেবী ও খরচে বলে?

আপনার মামাবাবু বোধ হয় তাকে সাহায্য করতেন?

হ্যাঁ। প্রায়ই মামাবাবুর কাছে সুবিমলদা টাকা চাইতে আসতেন।

সুবিমলবাবুকে আপনার কি রকম লোক বলে মনে হয়?

ভাল বলেই তো মনে হয়।

আচ্ছা এখন আপনি যেতে পারেন। সৌরীনবাবুকে পাঠিয়ে দিন।

একটু পরে সৌরীন্দ্র এসে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল।

সুব্রত আগন্তুকের মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।

সৌরীন্দ্রের বয়স ছাব্বিশসাতাশের মধ্যে হবে, গায়ের রং একটু চাপা। পিতা মিঃ সরকারের। মতই বেঁটেখাটো গোলগাল চেহারা। পরিধানে দামী ধুতি, গায়ে দামী শাল। চোখে সোনার ফ্রেমের চশমা। দেখলেই মনে হয়, একটু বাবু গোছের। চোখের কোল দুটো ফোলা ফোলা–বোধ হয় কাঁদছিলেন।

বসুন। সুব্রত বললে, আপনার নাম সৌরীন্দ্র সরকার?

হ্যাঁ।

কয়েকটা কথা আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে চাই, সৌরীন্দ্রবাবু। আশা করি যথাযথ জবাব পাব।–হ্যাঁ ভাল কথা, আপনার কোন ঘড়ি নেই?

আছে, রিস্টওয়াচ!

ঠিক আছে? মানে ঘড়িটা চলছে?

না—ঘড়িটা রাত্রি দুটোর পরে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সকালবেলা চালিয়ে দিয়েছি আবার। এখন সোয়া দশটা-সৌরীন্দ্র তারপর অশ্রুঝরা কণ্ঠে হঠাৎ বলল, আপনাকে একটা কথা বলতে চাই!

বলুন?

আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, একটা মস্তবড় ষড়যন্ত্র করে আমার নিরীহ বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। খুনীকে ধরে দিন। যত টাকা লাগে আমরা দেব। চিরদিন আমরা সকলে আপনার কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে থাকব।

অধীর হবেন না, সৌরীনবাবু। আমাদের যথাসাধ্য আমরা করব এবং আশা করি খুনীকে ধরতেও পারব। এখন আপনাকে যা জিজ্ঞাসা করি তার জবাব দিন।

বলুন।

কাল সন্ধ্যের পর থেকে আজকের সকাল পর্যন্ত আপনি কোথায় ছিলেন?

কাল সকালে আমি ব্যাংকে চলে যাই। ব্যাংক থেকে ফিরতে প্রায় রাত্রি আটটা হয়। রাত্রি। নটার সময় খাওয়াদাওয়া সেরে যখন শুতে যাচ্ছি,–বাবা আমাকে ডেকে পাঠান বাবা তখন লাইব্রেরিতে বসে বই পড়ছিলেন।

কতক্ষণ সেখানে ছিলেন?

তা প্রায় ঘণ্টাখানেক হবে।

অর্থাৎ রাত্রি দশটার সময় আপনি লাইব্রেরি ঘর থেকে বের হয়ে আসেন?

হ্যাঁ।

আপনার বাবার সঙ্গে যখন দেখা করতে যান, তাঁকে কোনরকম চিন্তিত বা তাঁর ব্যবহারে অস্বাভাবিক কোন কিছু চাঞ্চল্য লক্ষ্য করেছিলেন?

সৌরীন্দ্র এ কথায় যেন বেশ চিন্তিত হয়ে উঠল। তারপর ধীরে মৃদু স্বরে বললে, না।

আচ্ছা, ইদানীং আপনার বাবার ব্যবহারে কোনপ্রকার কিছু চাঞ্চল্য অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ্য করেছিলেন?

না।

আপনার বাবার আপনার প্রতি ব্যবহার কেমন ছিল?

বাবা আমাকে যথেষ্টই ভালবাসতেন।

আপনার দাদার সঙ্গে আপনার বাবার ব্যবহার কেমন ছিল?

দাদার সঙ্গে ইদানীং আজ তিন বৎসর আমাদের বিশেষ কোন সম্পর্কই নেই। তবে বাবা চিরদিন একটু গম্ভীর প্রকৃতির লোক, বিশেষ কিছু বোঝা যেত না। কারও ওপরে অসন্তুষ্ট হলেও মুখে তিনি সেটা কোনদিনই প্রকাশ করতেন না।

আপনার বাবার কোন শত্রু ছিল বলে আপনার মনে হয়?

না। বাবা অত্যন্ত নির্বিরোধী ও শান্তিপ্রিয় লোক ছিলেন। কারও সঙ্গে গোলমাল তার হত না।

শুনেছি ইদানীং আপনি আপনার বাবার সঙ্গে আপনাদের ব্যবসা ও ব্যাংকের কাজকর্ম দেখাশোনা করতেন?

হ্যাঁ।

আপনাদের ব্যবসার অবস্থা কেমন? মূলধন কত?

ব্যবসার অবস্থা ভালই। কোন গোলমাল নেই। মূলধন যে কত তা ঠিক ঠিক আপনাকে বলতে পারব না। অ্যাটর্নী রামলাল মিত্র মহাশয় আপনাকে সঠিক খবর দিতে পারবেন। তবে আন্দাজ উনিশ-বিশ লক্ষ টাকা হবে।

আপনার বাবার উইল সম্পর্কে আপনি কিছু জানেন?

না।

হুঁ। আচ্ছা আপনার পিসতুতো ভাই অশোকবাবুকে আপনার কি রকম মনে হয়?

ভালই। অত্যন্ত সচ্চরিত্র ও মেধাবী ছাত্র। চিরকাল আমাদের বাড়িতেই মানুষ। বাবাও তাকে অত্যন্ত ভালবাসতেন।

আর আপনার কাকা বিনয়বাবু?

কাকাকে বাবা খুবই ভালবাসতেন এবং মনে হয় কাকাও বাবাকে শ্রদ্ধাভক্তি করতেন।

আপনার কাকা যে পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে বসে আছেন তার জন্য আপনার বাবা অসন্তুষ্ট হন নি?

না। শুনেছি প্রথম প্রথম দুএক মাস বাবা কাকাকে অনেক বুঝিয়েছিলেন, কিন্তু কাকা চিরকালই একটু একগুয়ে ও জেদী। কারও কথাই তিনি শুনতেন না। শেষে আর বাবা কিছু বলতেন না।

আপনার বাবার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে আমাকে কিছু বলতে পারেন?

না।

কাল রাত্রে আপনার বাবার সঙ্গে আপনার কি কথা হয়?

ক্ষমা করবেন, সেটা আমাদের ফ্যামিলি সংক্রান্ত, একেবারে আমাদের নিজস্ব কথা। সে সম্পর্কে আপনাকে আমি কিছুই বলতে পারব না। তবে এটা জানবেন তার সঙ্গে এ মৃত্যুর কোন সংস্পর্শই নেই।

সুব্রত কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল। তারপর মৃদুস্বরে বললে, রাত্রি দশটার পর আপনি আপনার বাবার সঙ্গে কথা বলে সোজা নিজের ঘরেই চলে যান। আপনি তো আপনার বাবার পাশের ঘরেই থাকেন। রাত্রে কোনপ্রকার শব্দ বা গোলমাল শুনেছিলেন কি?

আজ্ঞে না। সারাদিনের পরিশ্রমে অত্যন্ত ঘুম পেয়েছিল। ঘরে এসে বিছানায় শোওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ি।

রাত্রে তাহলে কোনরকম কিছু অস্বাভাবিক গোলমাল বা শব্দ শোনেননি?

না। তাছাড়া ঘুম আমার একটু চিরকালই গভীর।

আজ সকালে কখন জানতে পারেন যে, আপনার বাবা মারা গেছেন?

সুবিমলের চিৎকারে চাকর রামচরণ গিয়ে আমার ঘুম ভাঙায়।

সুবিমলকে আপনার কিরকম মনে হয় সৌরীনবাবু?

সৌরীন্দ্র সুব্রতর প্রশ্নে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার মুখের রেখায় রেখায় যেন একটা সুস্পষ্ট ক্রোধ ও বিরক্তির চিহ্ন ফুটে উঠেই আবার পরক্ষণেই মিলিয়ে যায়।

সুব্রত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার সৌরীন্দ্রের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলে, শুনলাম সুবিমলবাবু নাকি প্রায়ই আপনার বাবার কাছ থেকে টাকা নিতেন।

হ্যাঁ। একটা first class বেহিসেবী। তিনশো টাকা মাইনে পায়। তাতেও তার একলার কুলোয় না। শুনি সে জুয়াও খেলে।

অকস্মাৎ এমন সময় সুব্রত তার পকেট থেকে আজ সকালের প্রাপ্ত চিঠিখানা বের করে সৌরীন্দ্রর চোখের সামনে ধরে বললে, বলতে পারেন, এই চিঠিখানা কার লেখা? হাতের লেখাটা চেনেন?

সৌরীন্দ্র চিঠিখানার ওপরে একটিবার মাত্র দৃষ্টি বুলিয়েই যেন অত্যন্ত চঞ্চল ও বিস্মিত হল, হ্যাঁ, এ তো সুবিমলেরই হাতের লেখা। হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। এ সুবিমলেরই লেখা চিঠি। সুবিমলই এ চিঠি লিখেছে। কিছুদিন আগে একবার টাকার ব্যাপারে সুবিমলের সঙ্গে বাবার ঝগড়াও হয়েছিল। বাবা সুবিমলকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। তারপর সে আবার একদিন রাত্রে এসে বাবার পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে মিটমাট করে নেয়।

হঠাৎ এমন সময় কার কণ্ঠস্বরে ঘরের সকলেই চমকে পিছন দিকে ফিরে তাকাল।

কার কথা হচ্ছে শুনি? আমারই কথা হচ্ছে বোধ হয়!

সুব্রত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আগন্তুকের দিকে ফিরে তাকিয়ে প্রশ্ন করলে, কে আপনি?

আমি সুবিমল চৌধুরী। আপনি?

সুব্রত রায়।

যাক ভালই হল, আপনি এসে গেছেন দেখছি, নমস্কার। শুনতে পাই কি, আমার সম্পর্কে কি কথা হচ্ছিল! শুনতে পেলে আমি নিজেই সবকিছু খোলসা করে দিতে পারতাম। কেননা আমার নিজস্ব ব্যাপার অন্যের চাইতে আমি নিজেই বেশী ভাল জানি আশা করি।

সুব্রত এতক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভাল করে সুবিমলের দিকে তাকিয়েছিলেন।

সুবিমল চৌধুরী।

লম্বায় প্রায় ছয় ফুটের কাছাকাছি হবে। রোগা ঢ্যাঙ্গা পাতলা চেহারা। চোখ দুটি টানা টানা। দৃষ্টি যেন দুখানা ধারাল ছুরির ফলার মতই বুদ্ধিপ্রাচুর্যে ঝকঝকে।

টানা উদ্ধত ভ্রূ। নাকটা একটু বোঁচা। সামনের দুটি দাঁত একটু উঁচু। বাঁ গালের ওপরে একটি দুইঞ্চি পরিমাণ ক্ষতচিহ্ন। মাথার চুল ব্যাকব্রাশ করা। বেশভূষা অত্যন্ত পরিপাটী। দামী মারের গরম স্যুট পরিধানে। পায়ে দামী পালিশ করা চকচকে পয়েনটেড টো শু। মুখে বর্মা চুরুট।

সুবিমল একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসতে বসতে বললে, আমি জানতাম, আমাকে আপনার প্রয়োজন হবে। তাই নিজেই চলে এলাম আপনাকে কষ্ট না দিয়ে। সত্যি আমি খুব খুশি হয়েছি মিঃ রায় যে, আপনি নিজেই কেসটা হাতে নিয়েছেন। কেননা আমার ধারণা, এ মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। মিঃ সরকারকে খুন করা হয়েছে!

মিঃ সরকার যে খুনই হয়েছেন, স্বাভাবিক মৃত্যু তার হয়নি বা হতে পারে না এ ধারণা হল কেন আপনার, মিঃ চৌধুরী?

সেই কথা বলতেই আমি এসেছি সুব্রতবাবু। আমার কথা সব শুনলেই হয়তো বুঝতে পারবেন, কেন আমার এ ধারণা হল!

বলুন।

সৌরীন্দ্রর সামনে আমি কোন কথা বলতে রাজী নই। ওকে এ ঘর থেকে আগে যেতে বলুন মিঃ রায়।

কিন্তু আমারও যা বলবার তা বলা এখনও শেষ হয়নি। তাছাড়া যা তুমি বলতে চাও, আমার সামনেই অনায়াসে বলতে পার। সৌরীন্দ্রবাবু বাধা দিলেন।

বলতে যে আমি পারব না তা নয় সৌরীন। কিন্তু তবু আমার ইচ্ছা নয় যে তুমি এখন এ ঘরে থাক। আমার মনে হয় এ সময় তোমার এ ঘরে না থাকাই ভাল। সুবিমলবাবু জবাব দিলেন।

সুব্রত এতক্ষণে কথা বললে, সৌরীনবাবু, আপনি না হয় পাশের ঘরে যান! প্রয়োজন হলে তখন আপনাকে আবার ডেকে পাঠাব!

বেশ যাচ্ছি। একটু রাগত ভাবেই কথাটা উচ্চারণ করে সৌরীন্দ্রবাবু সে ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেলেন।

সুব্রত সুবিমলবাবুর দিকে তাকিয়ে বললে, এবারে বলুন, মিঃ চৌধুরী! আপনি কি বলতে চান?

সুবিমলবাবু তখন বলতে লাগলো, জানি না আপনি জানেন কিনা মিঃ রায়, মিঃ গজেন্দ্র সরকার দূর সম্পর্কে আমার মামাত ভাই ছিলেন। এঁদের বাড়িতে আমার যথেষ্ট যাতায়াত এবং পরিচয়ও সেই সূত্রেই। এ বাড়ির সবকিছুই আমার একপ্রকার নখদর্পণে বলতে পারেন। মিঃ সরকার, মানে গজেনদা বয়সে আমার চাইতে অনেক বড় ছিলেন। তিনি যে সম্পর্কে। কেবলমাত্র আমার মামাত ভাই-ই ছিলেন তা নয়, সত্যিকারের একজন বন্ধুও ছিলেন। বলতে বলতে সুবিমলবাবুর স্বরটা যেন গাঢ় হয়ে এল, আজ তাকে হারিয়ে আমি সত্যিকারের একজন সহায়সম্বল হারালাম।

আমি জানি, গজেনদার বাবা যখন মারা যান, তখন তাঁর সম্বলের মধ্যে বৌবাজারে একটি ছোট সোনারূপার দোকান মাত্র ছিল। সেই দোকান থেকেই তিনি প্রভূত যত্নে ও অদম্য অধ্যবসায়ে আজকের এই এক বড় ব্যবসা ও ব্যাঙ্ক গড়ে তোলেন। গজেনদার বড় ছেলের বয়স যখন মাত্র একুশ বৎসর সেই সময় বৌদি মারা যান। তিনি আর দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন নি। অত বড় ধনী হলেও মনে তার এতটুকুও শান্তি ছিল না। তিনি নিজে ছিলেন অত্যন্ত ধীর, শান্ত ও গম্ভীর প্রকৃতির লোক। তার মনে কেউ হাজার ব্যথা দিলেও মুখ ফুটে কোনদিন কারও কাছে কিছু বলতেন না। নিজের মনের কষ্ট চিরদিন নিজের মনেই চেপে রাখতেন।

যারা তাকে কোনদিন ভাল করে বুঝবার সুযোগ বা সুবিধা পেয়েছে, কেবলমাত্র তারাই তার মুখের দিকে তাকালে বুঝতে পারত কত বড় একটা দুঃখে তার মনটা ভেঙে গুড়িয়ে যাচ্ছে। মনের কথা তিনি কখনও কাউকেই খুলে বলতেন না। তবে আমার কাছে তিনি মাঝে মাঝে দু-একটা কথা বলতেন। আমি জানি—অনেকখানি আশা করেই তিনি গণেনকে মানুষ করেছিলেন। কিন্তু গণেন ছিল অত্যন্ত উদ্ধত প্রকৃতির। একদিন সামান্য কারণে সে গজেনদার সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। তবু তিনি তাঁর পিতার কর্তব্য থেকে বিচলিত হন। নি। টাকাপয়সা দিয়ে তাকে পৃথকভাবে ব্যবসা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছেন। ইদানীং অবিশ্যি আর ছেলের সঙ্গে তার প্রায় কোন সম্পর্কই ছিল না।

তারপর ছোট ছেলে সৌরীন—তাকে তিনি পড়াবার অনেক চেষ্টা করলেন। সৌরীন ছেলেটিও মেধাবী ছিল। হঠাৎ বি. এস-সি পাস করে পড়াশুনা ছেড়ে দিল। গোঁ ধরল আর সে পড়াশুনা করবে না। বছরখানেক সে বাড়িতে চুপচাপ বসে রইল। যত রকমের আড্ডায় ঘুরে ঘুরে বেড়ালো। তারপর সে শুরু করলে রেস খেলা। গজেনদা এ বাড়ির প্রত্যেকের জন্যই মাসিক একটা হাত-খরচ বরাদ্দ করে দিয়েছিলেন। সৌরীন মাসে দুশো, অশোক মাসে আড়াইশো, বিনয়দা মাসে দুশো করে টাকা পেত। সৌরীনের দুশো টাকায় চলত না। প্রায়ই সে গজেনদার কাছ থেকে আজ দুশো কাল একশো, এই রকম করে মাসিক ধার্য হাতখরচ ছাড়াও শ দুই-তিন করে টাকা বেশী নিত। এই সময়ই লৌরীন ব্যবসা দেখাশুনা করতে শুরু করলে। মাস দুয়েক আগে হঠাৎ একদিন সে দোকানের ক্যাশ থেকে গজেনদাকে কিছু না বলে গজেনদার নামে টাকা তুলে নেয়। দিন দুই বাদে হঠাৎ সেকথা গজেনদা দোকানের ক্যাশিয়ারের মুখে শুনতে পেলেন, বাপে ছেলেতে প্রচণ্ড ঝগড়া হয়ে গেল। ঐদিন থেকেই বাপে-ছেলেতে মনোমালিন্য শুরু হল। এবং তারপর থেকেই প্রায়ই দুজনার মধ্যে পয়সা নিয়ে খিটিমিটি চলত।

গজেনদার উইলের ব্যাপারটাও আমি জানি। তার সম্পত্তি সমান দুভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ভাগ, নানা প্রকারের হিতকর প্রতিষ্ঠানে দান করা হবে। দ্বিতীয় ভাগ, সমান অংশে চার ভাগ—একভাগ সৌরীন, একভাগ অশোক, একভাগ বিনয়দা, আর এক ভাগ আমি! উইলের ব্যাপারেও সৌরীনের খুব আপত্তি ছিল। কিন্তু গজেনদা সৌরীনের কোন কথাই শোনেন নি। তাছাড়া আরও একটা ব্যাপার ইতিমধ্যে ঘটেছিল। কিছুদিন আগে সৌরীন তার এক বন্ধুর কাছ থেকে দুহাজার টাকা ধার নেয়। সেই ব্যাপার নিয়ে আজ কয়েকদিন থেকেই সৌরীন ও গজেনদার মধ্যে রাগারাগি চলছিল। এসব থেকে নিশ্চয়ই আপনি বুঝতে পারবেন—মানে আমি কি বলতে চাইছি—

সুব্রত শান্তকণ্ঠে বললে, হুঁ। আচ্ছা সে জন্যই কি আপনি সকালে আজ আমার কাছে চিঠি দিয়েছিলেন মিঃ চৌধুরী?

সুবিমল যেন আকাশ থেকে পড়েছে হঠাৎ। বিস্ময়ে হতবাক। বললে, চিঠি!

হ্যাঁ, আপনিই তো আজ সকালে আমাকে চিঠি দিয়েছেন! এই তো সেই চিঠি, বলতে বলতে সুব্রত পকেট থেকে সেই আকাশ-নীল রংয়ের খামের চিঠিখানা সুবিমলবাবুর হাতে তুলে দিয়ে তার মুখের দিকে তীক্ষ্ণ অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। সুবিমলবাবু সুব্রতর হাত থেকে চিঠিখানা নিয়ে তাকাতে তাকাতে বলে, আশ্চর্য! আশ্চর্য!

চিঠিখানা আপনারই লেখা তো সুবিমলবাবু? সুব্রত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সুবিমলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলে।

আশ্চর্য, অবিকল আমারই হাতের লেখা। কিন্তু আমি শপথ করে বলতে পারি সুব্রতবাবু, বিশ্বাস করুন, এ চিঠিটা আমার লেখা নয়!

আর চিঠির কালিটা?

আরও আশ্চর্য, ঠিক এই ধরনের কালিই আমার কাছে আছে। এটা একটা special কালি। Chinese violet ink. আমার এক বন্ধু আর্টিস্ট কিছুদিন হল চীন থেকে ফিরেছে। সেই আমাকে মাস সাতেক আগে কালিটা উপহার দিয়েছিল। মাঝে মাঝে আমি কালিটা ব্যবহার করি বটে এবং কালিটা প্রায় ফুরিয়েও এসেছে।

আপনার সেই বন্ধুটির নাম কি জিজ্ঞাসা করতে পারি?

নিশ্চয়ই। বন্ধুটির নাম সুবোধ দত্ত। আমহার্স্ট স্ট্রীটে..নং-এ থাকে। তাকে জিজ্ঞাসা করলেই আপনি সব জানতে পারবেন।

সুব্রত নোটবুক বের করে নাম-ঠিকানা টুকে নিল।

সুবিমলবাবু, আপনাকে আমার আরও কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করবার আছে!

বলুন।

গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে আজ সকাল পর্যন্ত আপনি কোথায় ছিলেন?

সুবিমলবাবু সুব্রতর কথায় মৃদু হাসলো, আপনি বোধহয় জানেন না মিঃ রায়, রাজলক্ষ্মী মিলে আমি চাকরি করি। গতকাল সন্ধ্যা সাতটার পর মিল থেকে বাড়ি ফিরেছি। চা খেয়ে Rainbow Club-এ যাই। রাত্রি এগারোটা পর্যন্ত আমি Rainbow Club-এই ছিলাম। তারপর বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়ি। ভোর পাঁচটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে সোয়া ছয়টা নাগাদ গজেনদার এখানে আসি।

কেন?

আমার কিছু টাকার প্রয়োজন ছিল।

তারপর?

আমি জানি তিনি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ঘণ্টাখানেক লাইব্রেরিতে বসে পড়াশুনা করেন। তাই বরাবর তার লাইব্রেরি ঘরে গিয়ে ঢুকি। এবং ঘরে ঢুকেই তাকে ঐ অবস্থায় দেখতে পাই। তখনই ডাকাডাকি করে সকলকে জাগাই এবং পুলিশে খবর দিতে বলে হোটেলে চলে যাই। হোটলে গিয়ে হঠাৎ মনে হল, পুলিশ এলে হয়তো আমাকে তাদের প্রয়োজন হতে পারে—তাই আবার চলে এলাম।

আপনি তাহলে মধ্যে মধ্যে মিঃ সরকারের কাছে টাকা নিতেন?

হ্যাঁ, নিতাম।

আচ্ছা শেষ কবে আপনার মিঃ সরকারের সঙ্গে দেখা হয়?

দিন পাঁচেক আগে সন্ধ্যার পর এখানে এসেছিলাম, সেই শেষ দেখা। তারপর আর দেখা হয়নি।

সুব্রত এবার বললে, আচ্ছা সুবিমলবাবু, আপনি এখন যেতে পারেন। প্রয়োজন হলে আবার আপনার ওখানেই গিয়ে দেখা করব। কখন আপনাকে আপনার হোটেলে পাওয়া যেতে পারে?

সকালে বেলা এগারোটা পর্যন্ত। আর সন্ধ্যা সাতটা থেকে আটটা পর্যন্ত। আটটার পরে Rainbow Club-এ গেলেও দেখা পাবেন। প্রত্যহই আমি সেখানে যাই।

সুবিমলবাবু এবার উঠে দাঁড়ালেন, আচ্ছা তাহলে আসি। নমস্কার।

সুবিমলবাবু ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেলেন।

সুব্রত গণেনবাবুকে এরপর ডেকে পাঠলো।

মিঃ তালুকদারের মুখের দিকে তাকিয়ে সুব্রত বললে, একটা জিনিস লক্ষ্য করেছ তালুকদার, মিঃ সরকারের লাইব্রেরির বড় ওয়াল ক্লকটা, তার হাত-ঘড়িটা, অশোকের ঘরে টীপয়ের ওপরে রাখা রিস্টওয়াচটা, সৌরীনবাবুর রিস্টওয়াচটা—সব কটাই ঠিক রাত্রি দুটোর সময় বন্ধ হয়ে গেছে।

সুব্রতর কথা শেষ হবার আগেই গণেন এসে ঘরে প্রবেশ করে।

মোটাসোটা গোলগাল চেহারা।

মাথার সামনের দিকে দুপাশে টাক দেখা দিয়েছে। কপালের ও রগের দুপাশের চুলে পাক ধরেছে। চোখে পুরু লেন্সের চশমা। দাড়িগোঁফ নিখুঁতভাবে কামানো। পরিধানে অ্যাশকলারের দামী গরম স্যুট। পায়ে পালিশ করা চকচকে শু। বয়েস বোধ করি—চল্লিশ-বিয়াল্লিশের মধ্যে হবে। মুখখানা গম্ভীর।

সুব্রতই প্রথম কথা বললে, আসুন। নমস্কার। আপনারই নাম—

নমস্কার, গণেন্দ্রনাথ সরকার।

বসুন ঐ চেয়ারটায়। সুব্রত অঙ্গুলি-নির্দেশে একখানা চেয়ার দেখিয়ে দিল।

গণেন্দ্র চেয়ারটার উপর উপবেশন করল।

আপনিই মহালক্ষ্মী ব্যাংকের প্রোপ্রাইটার?

না, অ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজার।

ও!

অতঃপর দুজনে কিছুক্ষণ চুপচাপ!

আবার সুব্রত প্রশ্ন করলে, কাল সারা দিনরাত্রিতে আপনি কোথায় ছিলেন?

সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যাংকে ছিলাম। তারপর মার্কেটে যাই। কয়েকটা জিনিসপত্র আমার কেনবার ছিল। জিনিসপত্র কিনতে কিনতে আমার রাত্রি নয়টা বাজে। নয়টার শোতে মেট্রোতে ছবি। দেখতে যাই। এই দেখুন তার টিকিট। বলতে বলতে রাত্রি নয়টার শোর টিকিটের একটা অংশ। গণেনবাবু পকেট থেকে বের করে দেখাল।

সুব্রত হাত বাড়িয়ে টিকিটখানা দেখে বললে, হুঁ। তারপর?

রাত্রি সাড়ে বারোটার শো শেষ হলে বাস্-এ প্রায় রাত্রি সোয়া একটার সময় বাসায় ফিরি। বাসায় ফিরে আজ সকালে সাড়ে নয়টার সময় ফোনে সৌরীনের কাছ থেকে খবর পেয়েই আসছি।

শুনেছি আপনার বাবার সঙ্গে মনোমালিন্য হওয়ায় আপনি আজ বছর তিনেক হল আলাদা হয়ে গেছেন?

একটু ভুল শুনেছেন—মনোমালিন্য কিছুই হয় নি। মতের মিল হয়নি। তাই বাবার অর্থসাহায্যেই আমি আলাদা হয়ে গেছি।

আপনি আলাদা হয়ে যাবার পর প্রায়ই আপনাদের এ বাড়িতে আসতেন?

না, ক্কচিৎ কখনও আসতাম।

শেষ কবে আপনার বাবার সঙ্গে আপনার দেখা হয়?

দিন পনেরো আগে বাবার ব্যাংকে। তা

রপর আর দেখা হয়নি? সুব্রত তীব্র দৃষ্টিতে গণেন্দ্রর মুখের দিকে তাকাল।

একটু ইতস্তত করে আস্তে আস্তে গণেন্দ্র বললেন, না।

আপনার প্রতি আপনার বাবার ব্যবহার কেমন ছিল?

আগে খুবই ভালবাসতেন আমায়। তবে গত তিন বছর আলাদা হয়ে যাওয়ায় বিশেষ কোন সম্পর্ক ছিল না। তবে দেখা হলে ভাল ব্যবহারই করতেন।

আপনার পিসতুতো ভাই অশোকবাবু সম্পর্কে আপনার কি ধারণা?

অশোক মেধাবী ও ধীর শান্ত ছেলে। বাবা তাকে নিজের ছেলের মতই ভালবাসতেন।

আর আপনার ছোট ভাই সৌরীন্দ্রবাবু?

সৌরীন্দ্রও ভাল ছেলে! তবে একটু জেদী ও একগুঁয়ে। তাছাড়া কানাঘুষায় শুনছি, সে নাকি রেস খেলতে শুরু করেছিল ইদানীং। এ ছাড়া আর বিশেষ কিছু তার সম্পর্কে জানি না।

আপনার কাছে কোনদিন সে টাকার জন্য গিয়েছিল?

না।

আপনার বাবা সৌরীন্দ্রবাবুকে কেমন ভালবাসতেন?

মনে হত আমাদের দুভাইয়ের মধ্যে সৌরীন্দ্রকেই একটু যেন বেশী ভালবাসতেন।

আপনাদের জ্ঞাতি সুবিমল সম্পর্কে আপনার ধারণা কি? আপনার বাবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কি রকম ছিল?

শুনেছি সে বাবার কাছ থেকে মাঝে মাঝে অর্থসাহায্য নিত! তাছাড়া তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে আমি বিশেষ কিছুই আপনাকে বলতে পারব না। বাইরে থেকে যেটুকুই জানি তা ভাল বলেই মনে হয়।

আপনার বাবার উইল সম্পর্কে আপনার কোন ধারণা আছে?

না। অ্যাটর্নী রামলালবাবুকে জিজ্ঞাসা করলেই সব জানতে পারবেন।

আচ্ছা, আপনার বাবার কোন শত্রু ছিল বলে আপনার মনে হয়?

না, বাবা চিরদিনই শান্তিপ্রিয় নির্বিরোধী লোক ছিলেন? তার কোন শত্রু থাকা একেবারেই সম্ভব নয়।

আচ্ছা এখন আপনি যেতে পারেন। আপনার ঠিকানাটা দিয়ে যাবেন।

গণেন্দ্র সরকার তার নামঠিকানা ও ফোননাম্বারযুক্ত একখানা আইভরী কার্ড সুব্রতর হাতে দিয়ে ধীরপদে ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল।

সুব্রত বিনয়ে সরকারকে এবার ডেকে পাঠালেন।

সুব্রত আবশ্যকীয় কয়েকটা পয়েন্ট তার নোটবুকে নোট করে নিচ্ছে, এমন সময় হঠাৎ ও শুনল, কিরে সুব্রত?

সুব্রত লেখা বন্ধ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, আরে কিরীটী! কি আশ্চর্য, তুই হঠাৎ কোথা থেকে?

কিরীটী হাসতে হাসতে এগিয়ে এল। তার পশ্চাতে বিনয়েও এসে ঘরে প্রবেশ করল।

কিরীটী বললে, বিনয় মানে মিঃ সরকারের ছোট ভাই কিছুদিন আমাদের সঙ্গে প্রেসিডেন্সিতে বি. এস-সি পড়েছিল। সেই থেকেই ওর সঙ্গে চেনা। হঠাৎ আজ সকালে কিছুক্ষণ আগে ফোনে। আমাকে ডেকে সব কথা বলে আমার সাহায্য চায়। তাই দেখতে এলাম যদি কিছু সাহায্য করতে পারি। তারপর তোর কতদূর?

যাক্, তুই এসেছিস ভালই হল। ব্যাপারটা একটু জটিল বলেই মনে হচ্ছে!

বোসো বিনয়, তুমি দাঁড়িয়ে রইলে কেন?

বিনয়ে একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল।

ব্যাপারটা কি বল তো? কিরীটী প্রশ্ন করে।

কিরীটীর অনুরোধে অতঃপর সুব্রত সংক্ষেপে আগাগোড়া সমস্ত ঘটনাটা বলে গেল।

কিরীটী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট টানতে টানতে সব শুনে গেল। তারপর মৃদুস্বরে বললে, এবারে তাহলে বিনয়ের জবানবন্দী?

হ্যাঁ। সুব্রত জবাব দিল।

বেশ, শুরু কর তোর কাজ। ততক্ষণ আমি একবার চারিদিক ঘুরে দেখে নিই, কেমন?

বেশ তো।

কিরীটী প্রথমেই মৃতদেহের কাছে এগিয়ে গেল। এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মৃতদেহ পরীক্ষা করতে লাগল।

এদিকে সুব্রত ততক্ষণে তার জবানবন্দী শুরু করেছে।

আপনি কাল সন্ধ্যা সাতটা থেকে সারারাত্রি কোথায় ছিলেন বিনয়বাবু?

বরাহনগরে আমাদের এক বন্ধু সমীর সেনের বৌভাতের নিমন্ত্রণ ছিল। আমি সন্ধ্যা সাতটার সময় বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। খাওয়া-দাওয়া শেষ হতে রাত্রি প্রায় দেড়টা হয়ে যায়। তখন আর ফিরবার কোন উপায় নেই দেখে ওখানেই শুয়ে পড়ি। আজ সকালে প্রথম বাস্-এ সাতটায় বাড়ি ফিরেছি।

শুনেছি আপনি মেডিকেল কলেজের সেকেণ্ড ইয়ার থেকে পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে বসে এখন আর্টের চর্চা করছেন?

হ্যাঁ, ছোটবেলা থেকে গানবাজনা ও ছবি আঁকার দিকে একটা টান ছিল। অন্য কোন কাজের থেকে সেটাই আমার বেশী ভাল লাগে, তাই–

আপনার দাদার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল?

দাদা আমাকে খুবই ভালবাসতেন। আমি যে তার সৎভাই, এটা কখনও জানতেই পারিনি।

আপনার সঙ্গে আপনার দাদার কখনও কোন ঝগড়া বা মনোমালিন্য হয়নি?

না।

আপনার দাদার কোন শত্রু ছিল বলে আপনার মনে হয়?

না। আর থাকলেও বলতে পারি না।

সুবিমলবাবুর সঙ্গে আপনার দাদার কি রকম সম্পর্ক ছিল?

সুবিমল মাঝে মাঝে দাদার কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিত। মাঝখানে কিছুদিন আগে একবার দাদার সঙ্গে তার খুব ঝগড়াও হয়েছিল। দাদা তাকে বাড়ি থেকে বেরও করে দেন। পরে আবার সে এসে একদিন দাদার হাতেপায়ে ধরে ক্ষমা চায়। সব মিটমাট হয়ে যায়। তোক যে ঠিক কিরকম তা বলতে পারব না। তবে শুনেছি সে চিরদিনই একটু বেহিসেবী ও উচ্চুঙ্খল প্রকৃতির। Rainbow ক্লাবের সে একজন মাতব্বর ব্যক্তি শুনেছি।

অশোকবাবু সম্পর্কে আপনার ধারণা কি রকম?

অশোক বড় ভাল ছেলে। দাদা তাকে ছেলের মতই ভালবাসতেন।

আপনার দাদার উইল সম্পর্কে আপনার কোন ধারণা আছে?

কানাঘুষায় শুনেছি, দাদার সম্পত্তি দুভাগে ভাগ করা হবে। অর্ধেক public donation-এ। যাবে। বাকি অর্ধেক সমান ভাগে আমি, অশোক, সৌরীন ও সুবিমল পাব।

কাউকে আপনি আপনার দাদার হত্যাকারী বলে সন্দেহ করেন?

সুব্রতর কথায় বিনয়েবাবু কিছুক্ষণ গুম হয়ে চুপ করে বসে রইল। তারপর ধীরস্বরে বলল, না।

এমন সময় কিরীটী ওদের সামনে এগিয়ে এল, একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিস সুব্রত?

সুব্রত মুখ তুলে কিরীটীর দিকে তাকাল, কি?

মৃত ব্যক্তির বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে একটা ছোট্ট পট্টি জড়ানো!

বিনয়েন্দ্রবাবু সঙ্গে সঙ্গে বলেন, গতকাল সকালে কাঁচের গ্লাসে দুধ খেতে গিয়ে দাদার হাত থেকে কাঁচের গ্লাসটা পড়ে ভেঙে যায়। ভাঙা কাঁচের টুকরো টেবিল থেকে সরাতে গিয়ে দাদার বাঁ হাতের কড়ে আঙুলটা কেটে যায়। আমি তখন দাদার সামনেই দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম।

কিরীটী শুধু মৃদুস্বরে বললে, হুঁ।

সুব্রত তখন বিনয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললে, আপনি এখন যেতে পারেন বিনয়বাবু। অনুগ্রহ করে মিঃ সরকারের ভৃত্য রামচরণকে একটিবার পাঠিয়ে দিন।

বিনয়ে ধীরভাবে ঘাড় হেলিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল।

কিরীটী আবার বললে, সব ঘুরে দেখলাম, সু। একটা জিনিস বুঝতে পারছি না।

কি?

মিঃ সরকারের শয়নঘরের সংলগ্ন ঘোরানো লোহার সিঁড়ির সামনের ঘরের মধ্যে যাতায়াত করবার দরজাটা বন্ধ কেন?

ওটা তো শুনলাম সব সময়ই বন্ধ থাকে। মেথর ঐ ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে উঠে ঘরের পিছনের বারান্দা দিয়ে বাথরুমে যাতায়াত করে।

সব সময় বন্ধ থাকলেও আজ তো বন্ধ থাকার কথা নয়। বড় গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। কেন বন্ধ আছে দরজাটা?

কি তুই বলতে চাস কিরীটী?

বলতে চাই দরজাটা বন্ধ কেন? কেন—কেন ওটা বন্ধ থাকবে? তাছাড়া আরও একটি। ব্যাপার, মিঃ সরকারের হাতঘড়িটা ভাঙল কি করে? ভাঙার তো প্রয়োজন ছিল না? দুটোর সময় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাই বলে ভাঙবে কেন?

সুব্রত কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে কিরীটীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বললে, হয়তো পড়ে গিয়ে ভেঙেছে। কিন্তু

এর মধ্যে আবার কিন্তু কি? পড়েই বা যাবে কেন?

সুব্রত কিরীটীর ব্যবহারে এবার যেন একটু বিরক্তই হল, বললে, কিরীটী! আরও একটা কথা আছে, বিনয়বাবুর সামনে আমি সে কথা বলিনি—এই 5 c.c. সিরিঞ্জটা অশোকবাবুর ঘরে ল্যাবরেটারির টেবিলের উপর পাওয়া গেছে।

কিরীটী সুব্রতর হাত থেকে সিরিঞ্জটা নিয়ে একবার ঘুরিয়ে দেখল, হ্যাঁ, Needle বড় সাইজের এবং মোটাও। অনায়াসেই এটা ফুটিয়ে হার্ট puncture করা যায়। আর punctureটাও fifth intercostal space-এ left mamary line-এর laterally ও below-তাতে মনে হয় ভদ্রলোকের enlarged heart ছিল। যদি অবিশ্যি heart-এ puncture করেই হত্যা করা হয়ে থাকে! সিরিঞ্জের মধ্যে জমাটবাঁধা রক্তটা analysis করলে কিছু সন্ধান পাওয়া যেতে পারে–বলতে বলতে সিরিঞ্জটা আবার কিরীটী সুব্রতর হাতে ফিরিয়ে দিল।

কিছু বুঝতে পারলি? সুব্রত আবার প্রশ্ন করল কিরীটীকে।

মৃত ব্যক্তির চেয়ারের positionটা দেখ—এমনভাবে চেয়ারটা place করা-যে কেউ ঐ ব্যালকনির খোলা দরজা দিয়ে বা শয়নঘর থেকে এই লাইব্রেরি ঘরে প্রবেশ করলে মিঃ সরকারের তা জানবার উপায় ছিল না। কিন্তু তা তো নয়, আমি ভাবছি অন্য কথা! মৃত ব্যক্তি চেয়ারে না বসে থেকে শোবার ঘরে খাটের ওপরেই শুয়ে থাকলেই বা কি এমন ক্ষতি ছিল?

কিরীটীর কথাগুলো আজ যেন কেমন-কেমন মনে হয় সুব্রতর।

অদ্ভুত বুদ্ধিপ্রাখর্যে যে চিরদিন সজাগ, তার মুখে আজ এসব কি আবোল-তাবোল কথা? ঘড়িটা ভাঙা কেন? দরজাটা বন্ধ কেন? মৃত ব্যক্তি চেয়ারে বসে কেন? সুব্রত আর একবার কিরীটীর মুখের দিকে তাকাল।

হঠাৎ আবার কিরীটী বলে উঠল, বুঝলি সু, ভাঙা ঘড়ি আর চেয়ারে বসা এ দুটো ব্যাপার যেন কিছুতেই মেলাতে পারছি না।

কিন্তু ঘড়িগুলো যে দুটোর সময় বন্ধ হয়ে গেল? সকলের ঘড়িই!

Quite possible-সোজা! খুনীর ওটা একটা কৌশল মাত্র। কিন্তু ভাবছি, সিরিঞ্জটাও কিভাল কথা, তুই অশোকবারুকে সিরিঞ্জটা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলি?

না।

ভালই করেছিস। জিজ্ঞাসা করবার ওর মধ্যে বিশেষ কিছুই নেই। জিজ্ঞাসা করলে নিশ্চয়ই সে বলত সিরিঞ্জ সম্পর্কে কিছুই জানে না।

কিন্তু সিরিঞ্জের গায়ের আঙুলের ছাপ?

একমাত্র খুনী ছাড়া তিনজন লোকের পাওয়া যেতে পারে—

মানে?

মানে আমার, তোমার ও অশোকের…

এমন সময় ঐ বাড়ির ভৃত্য রামচরণ ঘরে এসে ঢুকল।

সকলেই রামচরণের মুখের দিকে তাকাল একসঙ্গে।

কিরীটী একটিবার মাত্র তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে রামচরণের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ বুজে চেয়ারটার নড়েচড়ে আরাম করে বসল।

সুব্রতই প্রশ্ন করলে, তোমারই নাম রামচরণ?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

রামচরণের বয়স পঞ্চাশের ঊর্ধ্বেই হবে। রোগা লম্বাটে, ঢ্যাঙা চেহারা! মাথার চুলগুলি সাদায়কালোয় মিশানো। চক্ষু দুটি কোটরপ্রবিষ্ট, কিন্তু দৃষ্টি তীক্ষ্ণ ও সজাগ। চোয়ালের দুই পাশের হাড় বিশ্রীভাবে ঠেলে সজাগ হয়ে উঠেছে। লম্বা লম্বা হাড় বের করা আঙুল। হাতের শিরাগুলিও সজাগ।

পরিধানে পরিষ্কার একখানা ধুতি। গায়ে হাতকাটা একটা সাদা পিরান। কাঁধে একটি পরিষ্কার তোয়ালে! পায়ে একজোড়া চটি।

তোমার বাড়ি কোথায়?

আজ্ঞে কর্তা এই বাংলা দেশেই–বর্ধমান জিলার মেমারি গ্রামে।

সংসারে তোমার কে আছে?

কেউ নেই। ছোট বয়সে মা-বাপকে খেয়েছি। এক দূরসম্পর্কীয় কাকার কাছে মানুষ!

কতদিন এ বাড়িতে আছ?

তা আজ্ঞে আঠার বছর—

বাবু তোমাকে খুব ভালবাসতেন, তাই না রামচরণ?

আজ্ঞে হ্যাঁ। রামচরণের চক্ষু অশ্রুসজল হয়ে উঠল।

হঠাৎ এমন সময় কিরীটী একটি প্রশ্ন করল, রামচরণ, তোমার কর্তার ঘুম খুব পাতলা ছিল, না গভীর ছিল?

আজ্ঞে কর্তা খুব কম সময়েই ঘুমাতেন। তবে যতক্ষণ ঘুমোতেন, গভীর ঘুমই হত।

ওঃ! আচ্ছা সুব্রত, তুই যা জিজ্ঞাসা করছিলি আবার কর?

সুব্রত আবার তার জবানবন্দি শুরু করল।

কালকের সন্ধ্যার পর থেকে আজকের সকাল পর্যন্ত ঘটনা আমাকে এতটুকুও গোপন না করে খুলে বলতে পার রামচরণ?

রামচরণ তখন বলতে লাগল, কর্তাবাবু আমাদের দেবতার মত লোক ছিলেন বাবু। চাকর হলেও আজ আঠার বছরের মধ্যে কখনও একটা উচু করে কথা বলেন নি। কাল বিকালে ছয়টার সময় যখন ব্যাংক থেকে বাড়ি ফিরে এলেন, আমি তার ঘরে জামাকাপড় খুলে দিতে গিয়েছিলাম। দেখলাম বাবুর মুখটা যেন গম্ভীর। আজ আঠার বছর বাবুকে দেখছি, বুঝলাম কিছু একটা ঘটেছে যার জন্য কর্তাবাবু গম্ভীর হয়ে আছেন। কেননা বরাবরই দেখেছি, কোন কারণে কর্তাবাবু অসন্তুষ্ট হলে বা রাগ করলে গম্ভীর হয়েই দুতিনদিন থাকতেন। কারও সঙ্গে বড় একটা কথাবার্তা বলতেন না। বাবু চিরকালই একটু গম্ভীর প্রকৃতির ও চাপা ছিলেন। চেঁচামেচি বড় একটা কোনদিনই করতে শুনিনি। বাবু আমাকে বললেন, রামচরণ, শরীরটা আজ আমার খারাপ, কেউ যেন বিরক্ত না করে। আজ আর কিছু খাব না। রাত্রে শুধু এক গ্লাস গরম দুধ দিয়ে যাস। রাত্রি দশটার সময়।

তারপর?

তারপর রাত্রি দশটার সময় যখন দুধ নিয়ে আমি..রামচরণ বলতে বলতে হঠাৎ যেন থেমে গেল।

হ্যাঁ, বল। গরম দুধ নিয়ে যখন যাও—তারপর?

ছোট দাদাবাবু মানে কর্তার ছোট ছেলে তখন লাইব্রেরিতে কর্তার সঙ্গে কথা বলছিল—

হঠাৎ এই সময় কিরীটী তীক্ষ্ণস্বরে প্রশ্ন করলে, তাদের কথা তুমি চুপিসাড়ে শুনতে চেষ্টা করেছিলে রামচরণ…বল, কি তুমি শুনেছ?

বাবু, আমি গরিব চাকরবাকর মানুষ রামচরণ ভেঙে পড়ল।

কিন্তু আড়ি পেতে শোনা তোমার অভ্যাস রামচরণ। কিরীটী বললে, কিন্তু কি শুনেছিলে?

আজ্ঞে ক্ষমা করবেন বাবু, আমার যেন মনে হল বাবু ছোট দাদাবাবুকে বেশ একটু জোর গলাতেই বলছেন, তুমি জাহান্নামে গেছ—একেবারে গোল্লায় গেছ হতভাগা। আমি শীঘ্রই নতুন। উইল করব। একটি পয়সাও তোমাকে দেব না। অপদার্থ! দুটো ছেলেই আমার অপদার্থ। একঘর কুলাঙ্গার নিয়ে আমি বাস করছি।

ছোটবাবু কি জবাব দিলেন তাতে? সুব্রত প্রশ্ন করলে।

মনে হল ছোটবাবুও যেন রেগে বললেন, বুড়ো হয়ে তোমার ভীমরতিতে ধরেছে। উইল যাতে তোমাকে আর না বদলাতে হয়, সে ব্যবস্থাও আমি করছি। বলতে বলতে ছোটবাবু যেন। একপ্রকার ঝড়ের মতোই হঠাৎ দরজা খুলে আমায় পাশ কাটিয়ে এ ঘর থেকে বের হয়ে চলে গেলেন। নিজের ঘরের দিকে।

তারপর?

তারপর আমি দুধ নিয়ে ঘরে গিয়ে ঢুকলাম। কর্তাবাবু আমাকে দুধের গ্লাসটা শোবারঘরের টেবিলের ওপরে রেখে চলে যেতে বললেন।

হঠাৎ আবার কিরীটী প্রশ্ন করলে, রামচরণ, তোমার বাবু কি সব সময়েই ঘড়ি হাতে দিয়ে থাকতেন?

আজ্ঞে বাবু অনেক রাত্রি পর্যন্ত পড়াশুনা করতেন লাইব্রেরি ঘরে। যতক্ষণ না শুতে যেতেন ঘড়িটা হাতেই থাকত। অনেক সময় ঘড়ি হাতেই বাঁধা থাকত, শুয়ে পড়তেন।

হুঁ। তোমার বাবু কি রাত্রে কখনও তোমাকে ডাকতেন?

আজ্ঞে না। তবু সর্বদাই আমি সজাগ থাকতাম। অন্তত যতক্ষণ না তিনি শুতে যান। তবে কাল। রাত্রি যখন দেড়টা, হঠাৎ একটা শব্দ শুনে আমার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম আমার চিরদিনই পাতলা। শব্দটা শুনে প্রথমটা বুঝতে পারিনি। ঘুমের ভাব তখনও চোখে লেগে ছিল। ভাবছি কি করব। তারপর সাতপাঁচ ভেবে উঠে এসে এই ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতেই খুলে গেল। দেখলাম বাবু এখনও ঘুমোতে যাননি। উঁকি মেরে দেখলাম, তখনও বাবু চেয়ারের ওপরে পিছন ফিরে বসে আছেন। সামনে বই খোলা, ঘরে আলো জ্বলছে। বুঝলাম বাবু তখনও পড়ছেন। তাই আবার দরজা ভেজিয়ে দিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।

কিরীটী আবার প্রশ্ন করলে, তোমার বড়দাদাবাবু সব শেষ কবে এ বাড়িতে এসেছিলেন রামচরণ?

আজ্ঞে কেন, কালই তো রাত্রে এসেছিলেন!

সুব্রত যেন ভয়ংকর রকম চমকে উঠে বললে, কাল রাত্রে এসেছিলেন? কখন?

আজ্ঞে রাত্তির তখন এগারোটা হবে। নীচের দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছি, এমন সময় বড় দাদাবাবু দরজায় ধাক্কা দিলেন–

তারপর?

তারপর আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কর্তাবাবু জেগে আছেন কিনা? তিনি তার সঙ্গে দেখা করতে চান। আমি বললাম, কর্তাবাবু জেগে আছেন বটে, তবে তার শরীর খারাপ। তখন তিনি। বললেন, তবে থাক—একটা জরুরি কাজে এসেছিলাম বাবার সঙ্গে দেখা করতে, কিন্তু তার শরীর যখন খারাপ, থাক কাল সকালেই আসব না হয়, বলে তিনি চলে গেলেন। আমিও দরজা বন্ধ করে উপরে চলে এলাম।

কিরীটী মৃদু গম্ভীর স্বরে বললে, হুঁ, টিকিটের কাউন্টার-পার্ট!

তালুকদারের মুখের দিকে চেয়ে সুব্রত বললে, অশোকবাবুকে আর একবার ডাকা দরকার!

তালুকদার অশোকবাবুকে ডাকবার জন্য আর একজনকে পাঠিয়ে দিল।

কিরীটী ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। সুব্রতর মুখের দিকে তাকিয়ে কিরীটী বললে, আমি তাহলে চললাম সু। সন্ধ্যার দিকে একবার আসিস। যদি নতুন কোন কিছু এর মধ্যে জানতে পারিস—তাছাড়া তোর সঙ্গে এ কেসটা সম্পর্কে আলোচনাও করা যাবে।

বেশ যাব’খন।

একজন পুলিস এসে সংবাদ দিল, মর্গের গাড়ি এসেছে মৃতদেহ নিয়ে যেতে। সুব্রত বললে, তাদের বল উপরে এসে মৃতদেহ নিয়ে যেতে।

অশোক এসে ঘরে প্রবেশ করল, আমাকে ডেকেছেন সুব্রতবাবু?

হ্যাঁ, বসুন। আপনাকে আর কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করতে চাই।

অশোক সুব্রতর নির্দেশমত চেয়ারের উপরে উপবেশন করল।

কিরীটী ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল।

সুব্রত অশোকের দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে অশোকের ঘরে ল্যাবরেটারির টেবিলে প্রাপ্ত সিরিঞ্জটা বের করে বললে, এই সিরিঞ্জটা চিনতে পারেন অশোকবাবু? এটা আপনার ঘরে

ল্যাবরেটারির টেবিলের ওপরে আজ সকালে পাওয়া গেছে!

সুব্রতর প্রশ্নে সিরিঞ্জটার প্রতি দৃষ্টিপাত করবার সঙ্গে সঙ্গেই যেন অশোকের মুখখানা সহসা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। চোখের তারায় একটা ভীতিবিহুল দৃষ্টি। সে ফ্যালফ্যাল করে সুব্রতর হস্তধৃত সিরিঞ্জটার প্রতি তাকিয়ে রইল শুধু। একটি কথাও তার মুখ দিয়ে বের হল না।

সুব্রত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অশোকের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার প্রশ্ন করল, সিরিঞ্জটা আপনার?

হ্যাঁ। মানে…কো-কোথায় পেলেন ওটা?

বললাম তো আপনার ঘরে ল্যাবরেটারির টেবিলে! সিরিঞ্জটা দেখলে মনে হয় কিনা যে, আপনি recently কাউকে injection দিয়েছিলেন? কি, চুপ করে আছেন কেন? জবাব দিন?

সুব্রতবাবু! অশোকের কণ্ঠস্বর যেন সহসা কেঁপে উঠল। আমি গতকাল রাত্রি এগারোটার সময় মামাবাবুকে একটা antititenus injection দিয়েছিলাম।

কিন্তু এ কথাটা তো আপনার জবানবন্দীতে আপনি বলেন নি?

না—মানে আমি ভুলে গিয়েছিলাম।

ভুলে গিয়েছিলেন। আশ্চর্য! কিন্তু হঠাৎ antititenus injection বা দিতে গেলেন কেন?

কাল বিকেলে মামাবাবু গাড়ি থেকে নামবার সময় হঠাৎ ফুটবোর্ড থেকে পা slip করে পড়ে যান ও হাঁটুটা ছড়ে যায়। রাস্তার ধুলোবালি লেগেছিল। তাই মামাবাবু যখন বাড়ি ফিরে আসেন, আমাকে সেকথা বলেছিলেন। আমি তাকে একটা antititenus injection-এর কথা বলি। তাতে তিনি রাজি হন এবং বলেন, আমার কাছে ঐ injection আছে কিনা? আমি বলি, নেই। তাতে তিনি বলেন, তাঁর শরীরটা খারাপ। রাত্রি এগারোটায় শোবেন। বেশী রাত্রি জাগবেন না। আমি যেন তাকে তার শোবার আগে রাত্রি এগারোটায় গিয়ে injection দিয়ে আসি। আমি চাকর পাঠিয়ে রাস্তার ধারে ঘোষ ফার্মেসী থেকে ঐ injection কিনে নিয়ে আসি এবং রাত্রি এগারোটায় গিয়ে তাকে injection দিয়ে আসি। কিন্তু আমি সিরিঞ্জ-এ অতবড় needle ব্যবহার করিনি। আর সিরিঞ্জ এ রক্তও ছিল না!

সিরিঞ্জটা injection দেবার পর কোথায় রেখেছিলেন?

আমার ড্রয়ারে। তাও ভাল করে পরিষ্কার করে ধুয়ে alcohol দিয়ে।

হুঁ। তাহলে রাত্রি এগারোটার সময়ও আপনি আপনার মামাবাবুকে জীবিত দেখেছিলেন? কিন্তু এ কথাগুলো কেন আপনি গোপন করেছিলেন? কেন আপনি বলেছিলেন যে, কাল রাত্রে মামাবাবুর সঙ্গে আপনার দেখা হয়নি?

সুব্রতর কঠিন প্রশ্নে অশোক যেন কান্নায় একেবারে ভেঙে পড়ল। অশ্রুভরা কণ্ঠে বললে, কিন্তু সুব্রতবাবু, জানি না আপনি আমাকে বিশ্বাস করেন কিনা সত্যি আমি আমার মামার কোন

অনিষ্টই করিনি। তাকে আমি হত্যা করিনি, হত্যা করিনি। দুহাতে অশোক মুখ ঢাকল।

কিন্তু যতক্ষণ না বলছেন কেন আপনি এ কথাগুলো গোপন করেছিলেন, ততক্ষণ আপনার উপরে সন্দেহ কিছুতেই যাবে না।

আঁ…আ…আপনি কি তবে সন্দেহ করেন যে আমিই মামাবাবুকে খুন করেছি? বিশ্বাস করুন সুব্রতবাবু, যখন জানতে পারলাম যে, মামাবাবু খুন হয়েছেন, তখন কেমন একটা অজানিত আশঙ্কায় ঘাবড়ে গিয়ে ঐ কথাটা গোপন করেছিলাম। অন্য কোন কারণ নেই। আমি ভগবানের নামে শপথ করে বলতে পারি।

কে আপনার ইনজেকশন্টা এনে দিয়েছিল?

গোপাল।

আচ্ছা আপনি এখন যেতে পারেন।

অশোক মুহ্যমানের মত মাথাটা নীচু করে টলতে টলতে ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল।

তারপর গোপালের ডাক পড়ল। গোপাল এসে ঘরে ঢুকল।

গোপালের বয়স ষোল থেকে সতেরোর মধ্যে। নিকষ কালো গায়ের রং। রোগা, লম্বাটে। চেহারা। মুখের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেই যেন মনে হয়, অত্যন্ত নিরীহ গোবেচারী গোছের মানুষ।

সুব্রত গোপালের মুখের দিকে চেয়ে বললে, তোর নাম কি?

আজ্ঞে বাবু, আমি আমার পিসির গোপাল। হেই বাবু, আমি কিছু জানি না। আমি কিছু করিনি…আমায় ধরো না গো!…গোপাল কাঁদতে শুরু করলে, তোমার দুটি পায়ে পড়ি বাবু, আমি কিছু জানি না কিছু দেখিনি…আমায় ছেড়ে দাও। :

সুব্রত গোপালকে এক প্রচণ্ড ধমক দিয়ে উঠল, থাম ছোঁড়া! কাদবি তো এখুনি থানায় পাঠিয়ে দেব। যা জিজ্ঞাসা করি তার জবাব দে!

গোপাল ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগল।

কাল রাত্রে তুই ডাক্তারখানা থেকে অশোকবাবুকে ঔষধ এনে দিয়েছিলি? হ্যাঁ। বাবু বললে.. তুই কোন ঘরে শুস্? আজ্ঞে নীচে চাকরদের ঘরে। কটার সময় কাল রাত্রে শুয়েছিলি?

আজ্ঞে ঔষধটা এনে দিয়েই শুতে চলে গিয়েছিলাম। তারপর অনেক রাত্রে অশোকবাবু আবার ডাকলে, তার এঁটো থালাবাসন নিয়ে আসি।

তারপর আর ঘর থেকে বের হোসনি?

হ্যাঁ..না…

সত্যি কথা বল্ বেটা! সুব্রত আবার ধমক দিলে।

হ্যাঁ, রাত্রে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, তখন একবার বাইরে গিয়েছিলাম—

তারপর?

তখন মিথ্যে বলব না, মনে হল কে যেন সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। লোকটাকে চিনতে পারিনি। আমাকে নীচের উঠানে দেখেই লোকটা আবার হট্‌ করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে চলে গেল। আমিও লোকটার পিছু পিছু সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম। কিন্তু উপরে উঠে আর কাউকেই দেখতে পেলাম না। আমার বড় ভয় করতে লাগল। তাড়াতাড়ি এসে বিছানায় শুয়ে পড়লাম।

লোকটাকে তুই চিনতে পারিসনি, সত্যি বলছিস্?

সত্যি।

লোকটা লম্বা না বেঁটে?

আজ্ঞে লম্বা।

আচ্ছা তুই যা!

গোপাল কাঁপতে কাঁপতে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

সুব্রত তখন অন্য চাকরদের ও দারোয়ান, ড্রাইভার সকলকে একে একে ডেকে প্রশ্ন করতে লাগল।

কিন্তু কারও কাছে আর তেমন বিশেষ কোন সন্ধান বা সূত্র পাওয়া গেল না।

কিরীটী যখন সিঁড়ি দিয়ে নেমে নীচে বাইরের ঘরে এল, দেখলে বাইরের ঘরে একটা সোফায় মাথায় হাত দিয়ে নিঝুম ভাবে বসে আছে বিনয়ে। কিরীটী নিঃশব্দে বিনয়েন্দ্রের সামনে এসে দাঁড়াল, বিনয়! বিনয়ে চমকে মুখ তুলল। তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পার বিনয়। এ রহস্যের কিনারা আমি করবই!

বিনয়ে অশ্রুভরা কণ্ঠে বললেন, আমার দাদা দেবতার মত, ঋষির মত দাদা। আমি তো ভাবতেই পারছি না কিরীটী, কে এই সর্বনাশ আমাদের করতে পারে?

কাউকেই তোমার সন্দেহ হয় না, বিনয়?

না।

কিরীটী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ মৃদু চাপা সুরে বললে, মনে হচ্ছে ব্যাপারটা খুব জটিল নয়।

কিছু বুঝতে পারলে ভাই?

পেরেছি বই কি। খুনীকে মনে হচ্ছে হয়তো বুঝতে পেরেছি। তবে motive যেন এখনও তেমন strong বলে মনে হচ্ছে না।

তুমি জান? জান কে খুনী? উদ্বেগাকুল কণ্ঠে বিনয়ে প্রশ্ন করলেন।

কিরীটী অদ্ভুত একপ্রকার হাসি হাসতে হাসতে বললে, জানি বৈকি!

নিজের আমহার্স্ট স্ট্রীটের বাসায় ও লালবাজারের অফিসে অনেক সময় নানা অসুবিধা হয় বলে সুব্রত মাস দুদিন হল চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনুতে মমতাজ হোটেলের দোতলায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে।

হোটেলের ফ্ল্যাটটি সুব্রত নিজের নাম ভাড়া নেয়নি। ওখানে তার নাম অমিতাভ রায়। শেয়ার মার্কেটের দালাল বলে পরিচিত সেখানে সে।

মিঃ সরকারের সার্কুলার রোডস্থিত মর্মরাবাস থেকে বের হয়ে সুব্রত গাড়ি চালিয়ে বরাবর আমহার্স্ট স্ট্রীটের বাসায় ফিরে এল।

ঘণ্টাখানেক বাদে কিছু খেয়ে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি থেকে বের হয়ে সোজা গিয়ে হ্যারিসন রোড অভিমুখে একটা ট্রামে চেপে বসল।

***

সুব্রত যখন মমতাজ হোটেলে তার ফ্ল্যাটে এসে প্রবেশ করল, বেলা তখন প্রায় দেড়টা হবে। শীতের রৌদ্রে নীলাকাশ যেন ঝলসে যাচ্ছে।

হোটেলটা একেবারে বড় রাস্তার উপরে।

সুব্রত পকেট থেকে চাবি বের করে দরজা খুলে নিজের ঘরে গিয়ে প্রবেশ করল।

ছোট ঘোট তিনখানি ঘর পাশাপাশি! একখানা ঘর শয়নকক্ষ। সেই ঘরে একটা ক্যাম্প খাটে ধোপদুরস্ত নিভাঁজ শয্যা বিছানো। দুখানা সোফা।

আর আছে একটি বুক-সেলফ। বুক-সেফের পাশেই একটি উঁচু টেবিল স্ট্যান্ডের ওপরে ছোট একটি দামী রেডিও সেট! এবং একটি আলমারিতে কিছু কাপড়জামা।

পাশের ঘরটি একটু বিচিত্র।

দু পাশের দেয়ালে দুটি দামী প্রমাণসাইজের আয়না টাঙানো। পাশেই একটি র্যা। তাতে নানা প্রকারের সব বেশভূষা ঝুলছে। পাশেই একটি টেবিলে নানা ধরনের ছোটবড় শিশি। নানা প্রকার ক্রীম, পাউডার। তাছাড়া নানা ধরনের পরচুলা, স্পিরিটগাম, ছুরি, কাঁচি প্রভৃতিও টেবিলের ওপরে সাজানো।

অবশ্য সুব্রতর আমহার্স্ট স্ট্রীটের বাড়িতেও ঐ ধরনের আর একপ্রস্থ সাজ-সরঞ্জাম মজুত আছে।

এই ঘর থেকে সে মাঝে মাঝে গভীর রাতে কখনও ভিখারির বেশে, কখনও গাড়োয়ান, কখনও ঝকামুটে, কখনও ট্যাশ ফিরিংগি, কখনও অন্ধ, কখনও বা খঞ্জ প্রভৃতি নানা প্রকারের ছদ্মবেশে অভিযানে বের হয়।

মমতাজ হোটেলের ম্যানেজার একজন মাড়োয়ারী ভদ্রলোক। তিনি সুব্রতর আসল পরিচয়টা জানেন।

দালালবেশী সুব্রতর বেশ অন্য ধরনের। মাথার সামনের দিকে একটুখানি টাক।

ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, ছুঁচালো পাকানো গোঁফ। চোখে কালো কাঁচের গগলস্।

এই বেশে সুব্রতকে চেনারও উপায় নেই।

সুব্রত কলিং বেলটা টিপে চেয়ারের ওপরে বসল একটা কাগজ-পেনসিল নিয়ে। আজকের সকালের সমস্ত ঘটনাগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিবেচনা করলে দুটো জিনিস সহজেই চোখে পড়ে।

এক নং, মিঃ সরকারকে এমন কোন ব্যক্তি খুন করেছে যে ও বাড়িতে বিশেষ পরিচিত। ও বাড়ির খুঁটিনাটি সব কিছুই তার নখদর্পণে। বাইরের কোন তৃতীয় ব্যক্তি নয়। দু নং, ও বাড়ির প্রত্যেকেরই সমান, মোটিভ বর্তমান।

দরজায় এসে ভৃত্য নক্ করলে।

ভিতরে এস, সুব্রত বললে।

হোটেলের একজন ভৃত্য ঘরে এসে সেলাম দিয়ে দাঁড়াল।

এক কাপ চা পাঠিয়ে দাও।

ভৃত্য চলে গেল।

সুব্রত কাগজটার উপরে আবার পেনসিল দিয়ে লিখতে শুরু করলে :

প্রত্যেকের নাম সন্দেহ কোন্ কোন্ ব্যক্তিকে করা যায়
১০ নম্বর

খুন করা কার কার পক্ষে সম্ভব ছিল?
১০ নম্বর।

উদ্দেশ্য বা Motive
১০ নম্বর

Alibi
১০ নম্বর

খুন করা সম্ভব এমন দেখতে কি?

সবসমেত নম্বর
১। মিঃ সরকারের ছোট ছেলে সৌরীন্দ্র মৃত ব্যক্তির ঠিক পাশের ঘরেই ছিল। অনায়াসে সে খুন করার সুযোগ পেতে পারে, তাছাড়া তার বাপের সঙ্গে টাকার ও উইলের ব্যাপার নিয়ে সেদিন রাত্রে ঝগড়া হয়ে গিয়েছিল।

রাগের মাথায় খুন করা সম্ভব ছিল। এবং সে তার বাপকে শাসিয়েও ছিল।

টাকা
বাপ মারা গেলে সে উইলের টাকা পেত।৮ কোন কিছুই ছিল না, সারারাত্রি সে পাশের ঘরের ছিল।

তেমন কিছু দেখতে নয়।

৩৯
২। ভাগ্নে অশোক স্বীকার করেছে সে, সে রাত্রে মৃত ব্যক্তিকে একটা antitetanus injection; কিন্তু প্রথমে সেকথা স্বীকার করেনি কেন? সন্দেহজনক।
১০

খুবই সম্ভব ছিল, কেননা সেই সর্বশেষ মিঃ সর কারকে জীবিত দেখে। তাছাড়া যদি ধরে নেওয়া যায় যে Poison করে মিঃ সরকারকে খুন করা হয়েছে, তাহলে অশোক ডাক্তারি পড়ে, তার পক্ষেই বেশী সম্ভব খুন করা।
১০

তেমন বিশেষ কিছু নয় কেননা সে জানত টাকা সে পাবেই। তাছাড়া মিঃ সরকার তাকে ভালবাসতেনও খুব।

কোন কিছুই ছিল না তাছাড়া অনেক রাত্রি জেগে সে পড়াশুনা করত।

দেখতে সেরকম
কিছুই নয়।

২৯
৩। গণেন্দ্র সরকার পিতার সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় সে তিন বছর আগে পৃথক হয়ে যায়। দুর্ঘটনার দিন রাত্রে এগারোটার সময়ে ঐ বাড়িতে ও এসেছিল। কিন্তু সিনেমা গিয়েছিল বলে মিথ্যা কথা বললে কেন? এবং কেনই বা সে অত রাত্রে বাপের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। সন্দেহজনক খুবই।

সম্ভব ছিল। কেননা রাত্রি দেড়টায় ও বাড়ি ফেরে। অথচ সিনেমাতেও যায়নি,
কোথায় ছিল রাত্রি দেড়টা পর্যন্ত?

১০

কিছু নেই।

কোন কিছুই নেই।

না
না

২৮
৪। ছোট ভাই
বিনয়েন্দ্র

ভাই তাকে যথেষ্টই ভালবাসত। নির্বিরোধী মানুষ। তাছাড়া রাত্রে সে বাড়িই ছিল না।

সম্ভব ছিল না কেননা রাত্রে সে বাড়ি ছিল না।

টাকা
১০

পুরোপুরি ছিল।

না

১০
৫। মিঃ সরকারের অনায়াসেই সন্দেহ করা যেতে পারে। তাছাড়া সে-ই প্রথমে মৃতদেহ আবিষ্কার করে। সুব্রত যে চিঠিখানা পেয়েছিল তার হাতের লেখা অবিকল সুবিমলের হাতের লেখার মতই। তাছাড়া লেখার কালি? সে অস্বীকার করলে কেন যে লেখা তার নয়।

Rainbow club থেকে সে অনায়াসেই ফিরে এসে খুন করতে পারত। তাছাড়া এ বাড়ির সব তার কাছে খুবই পরিচিত ছিল। হঠাৎ কেউ দেখলেও তাকে সন্দেহ করতে পারত না।

তার অর্থের অভাব খুবই ছিল, কেননা সে ছিল অসংযমী, বেহিসাবী। মাঝে মাঝে মিঃ সরকারের কাছে টাকাও চাইত, জুয়া খেলত।

কিছুই বলতে গেলে নেই।

তার দেহের আকৃতি দেখে মনে হয় তার পক্ষে খুন করা এতটুকুও অসম্ভব নয়।

৪৫
৬। ভৃত্য রামচরণ না

সম্ভব ছিল

টাকা

কিছুই নেই
১০

না

২৪

ইতিমধ্যে এক সময় ভৃত্য এসে চা দিয়ে গিয়েছিল।

চা পান করতে করতে সুব্রত মোটামুটি একটা খসড়া বানিয়ে ফেললে। এবং পরে মনে মনে আলোচনা করতে লাগল এখন তার প্রধান কর্তব্য কী?

সর্বপ্রথম : মিঃ সরকারের অ্যাটর্নী রামলাল মিত্র মহাশয়ের সঙ্গে দেখা করে উইল সম্পর্কে সমস্ত অবগত হওয়া।

দ্বিতীয় : গণেন্দ্র সরকারের এই রাত্রে মুভমেন্টস ভাল করে পর্যালোচনা করা। কেন তিনি সব কথা গোপন করলেন?

তৃতীয় : চিঠিটা ও কালিটা সম্পর্কে আর একটু বেশীরকম বিবেচনা করা।

চতুর্থ : কিরীটীর সঙ্গে দেখা করে আগাগোড়া সমগ্র ব্যাপারটার একটা বিশদ আলোচনা করা প্রয়োজন।

পঞ্চম : ময়না তদন্তের রিপোর্টটা জানা।

কিন্তু মানুষ ভাবে এক, ঘটে আর এক।

সেই রাত্রেই ঘটনার স্রোত সুব্রতকে সম্পূর্ণ অন্যদিকে টেনে নিয়ে গেল।

হঠাৎ বিকেলের দিকে লালবাজার থেকে এক ফোন পেয়ে সুব্রতকে অফিসে যেতে হল। সেখানে অফিসের কাজ শেষ হতে রাত্রি প্রায় সাড়ে সাতটা বেজে গেল।

রাস্তায় বের হয়ে সুব্রত আমহার্স্ট স্ট্রীটে আর্টিস্ট সুবোধ দত্তর ওখানে গেল।

আমহার্স্ট স্ট্রীট থেকে একটা সরু গলিপথ বের হয়ে গেছে। সেই গলির মধ্যেই ৭ নং বাড়ি আর্টিস্ট সুবোধ দত্তের!

দরজার গায়ে পিতলের প্লেটে লেখা শিল্পী সুবোধ দত্ত।

দরজাটা খোলাই ছিল। সামনেই একটি আলোকিত গলিপথ থেকে ঘরখানা বেশ পরিষ্কার দেখা যায়।

উজ্জ্বল পাওয়ারের বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে ঘরের মধ্যে!

ঘরের দেওয়ালে অসংখ্য ছবি ঝুলছে। কোনটা পেনসিল স্কেচ, কোনটা ওয়াটার কলার, কোনটা ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট, কোনটা অয়েল পেনটিং।

ঘরের মধ্যে একজন আধ্যবয়সী সুশ্রী যুবক পরিধানে ঢোলা পায়জামা ও ঢোলাহাতা পাঞ্জাবি। ইজেলের সামনে দাঁড়িয়ে ইজেলের ওপরে রক্ষিত অর্ধসমাপ্ত একটা ছবিতে পেনসিল দিয়ে টাচ দিচ্ছে।

সুব্রত কড়াটা নাড়লে!

কে? ভিতর হতে প্রশ্ন এল।

এটা কি সুবোধবাবুর বাড়ি?

হ্যাঁ, আপনি?

সুব্রত চমকে পিছনের দিকে তাকাল। একটি চব্বিশ পঁচিশ বৎসরের স্ত্রীলোক সুব্রতর পাশে দাঁড়িয়ে তাকে প্রশ্ন করছেন। অদূরে গলির মধ্যেকার গ্যাস পোস্টের খানিকটা আলো ভদ্রমহিলার মুখের ওপরে এসে পড়ছে। কি সুন্দর মুখখানি!

টানা-টানা দুটি চোখ। উন্নত নাসা। কয়েকগাছি চূর্ণ কুন্তল কপোল ও কপালে এসে পড়ছে।

মাথার ওপরে আধ-ঘোমটা টানা, নিরাভরণা হাত দুটি। কিন্তু সিঁথিতে সিঁদুর রেখা, কপালে গোল একটি সিঁদুরের টিপ।

পরিধানে কালোপাড়ের শাড়ি। নিরাভরণা সামান্য এই বেশভূষাতেও যেন ভদ্রমহিলাকে ভারি চমৎকার দেখাচ্ছিল।

ইতিমধ্যে একটু আগে ঘরের মধ্যে দেখা যুবকটিও দরজার ওপরে এসে দাঁড়িয়েছে, এ কি রাণী? কখন এলি?

এই আসছি দাদা। এই ভদ্রলোক বোধ হয় তোমাকে খুঁজছেন—বলতে বলতে ভদ্রমহিলা ওদের পাশ কাটিয়ে বাড়ির মধ্যে চলে গেলেন।

কাকে চান আপনি?

সুবোধবাবু আছেন?

হ্যাঁ, আমারই নাম সুবোধ দত্ত। আপনি?

আমার নাম সুব্রত রায়। আপনার সঙ্গে গোটাকতক কথা ছিল। ভিতরে আসতে পারি কী?

ভদ্রলোক কুঞ্চিত করে কী যেন এক মুহূর্ত ভাবলেন। তারপর বললেন, আসুন।

সুব্রত ভদ্রলোকের পিছনে পিছনে গিয়ে পাশের একটি ছোট ঘরে প্রবেশ করল।

ছোট ঘরটি। খানকতক চেয়ার পাতা, ছোট্ট একটি টীপয়। সুবোধবাবু নিজে একখানি চেয়ারে বসে অন্য একটি চেয়ারে সুব্রতকে নির্দেশ করে বললে, বসুন।

সুব্রত নির্দেশমত চেয়ারে উপবেশন করল।

সুব্রতই প্রথমে কথা শুরু করলে, আমার পরিচয়টা আগেই দেওয়া ভাল মিঃ দত্ত। আমি সি. আই. ডি.-র লোক। ব্যাঙ্কার ও জুয়েলার মিঃ সরকারের খুনের তদন্ত আমি করছি।

সুবোধবাবু নির্বিকারভাবে প্রশ্ন করলেন, কি চাই আপনার আমার কাছে?

কয়েকটি কথা আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে চাই। আশা করি, যথাযথ উত্তর পাব। সুবিমল চৌধুরী নামে কোন ভদ্রলোককে আপনি চেনেন? মহালক্ষ্মী ব্যাঙ্কে চাকরি করেন। শুনলাম, তিনি আপনার বিশেষ বন্ধু। বহুকালের জানাশোনা আপনাদের।

সুব্রত স্পষ্ট লক্ষ্য করলে, সুবোধবাবুর মুখখানা যেন সহসা একটু গম্ভীর হয়েই তখুনি আবার প্রশান্ত ও নির্লিপ্ত ভাব ধারণ করল, সামান্যই তার সঙ্গে জানাশোনা। তাও কিছুদিন আগে ছিল, এখন আর নেই।

ওঃ। আচ্ছা আপনি তাকে কখনও চায়না থেকে আনা চায়নীজ ভায়োলেট রংয়ের একটি কালির শিশি উপহার দিয়েছিলেন কি?

প্রথম কথা, জীবনে আমি চীনে কোনদিনই যাইনি। দ্বিতীয়, আপনার বর্ণনামত কোন কালির শিশিই তাকে উপহার দিইনি।

দেননি!

না। ভদ্রলোক গম্ভীরভাবে জবাব দিলেন।

কিন্তু তিনি যে সেই রকম কথাই আজ সকালে আমায় বললেন!

তিনি যদি বলেই থাকেন যে আমি তাঁকে কালিটা দিয়েছি, সেটাই সত্য হবে, আর আমার কথাটা মিথ্যে হয়ে যাবে?

না, তা নয়। তবে—

আচ্ছা, তিনি বলছিলেন, আপনারা দুজনে ছোটবেলার বন্ধু ছিলেন?

না, কস্মিকালেও নয়। ছোট সংক্ষিপ্ত জবাব।

এরপর একপ্রকার বাধ্য হয়েই সুব্রতকে উঠতে হল।

আশ্চর্য! এভাবে সুবিমলবাবুর মিথ্যা কথা বলবার কি প্রয়োজন ছিল?

সেরাত্রে সুব্রত আর বাড়িতে ফিরল না। সোজা মমতাজ হোটেলের দিকেই চলল। সমগ্র ব্যাপারটা যেন আগাগোড়া কেমন জটিল হয়ে উঠছে।

চিঠিটা সত্যি তবে তাকে কে লিখল? সুবিমলবাবুর হাতের লেখার মতই অবিকল হাতের লেখা। অথচ সে কথাটা স্বীকার করল না কেন?

ঠিক ঐ রংয়ের কালিও তার কাছে আছে। অথচ যে জায়গা থেকে সে কালিটা পেয়েছে বললে, সেটা দেখা যাচ্ছে মিথ্যা!

কাকে সে বিশ্বাস করবে? কোন্ সূত্র ধরে কোন্ পথে ও এখন চলবে?

সুব্রত হোটেলে যখন ফিরে এল রাত্রি তখন প্রায় নয়টা।

অসহ্য ক্লান্তিতে সর্বশরীর অবসন্ন।

বিশ্রামের একান্ত প্রয়োজন।

ফ্ল্যাটে ফিরে প্রথমেই সে বাথরুমে ঢুকে অনেকক্ষণ ধরে ঠাণ্ডাজলে স্নান করলে।

শরীর যেন অনেকটা ঠাণ্ডা হল।

হোটেল থেকে ও ডিনার আনিয়ে খেল।

***

রাত্রি তখন বোধ করি একটা বেজে গেছে।

সুব্রত ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু ঠিক কতক্ষণ যে ঘুমিয়েছিল তাও বলতে পারে না।

হঠাৎ তার ঘুমটা ভেঙে গেল।

অন্ধকার ঘর।

ঘরের নিঃশব্দ অন্ধকারের মধ্যে যেন একটা অস্পষ্ট শব্দ। যেন কে বা কারা ঠিক পাশের ঘরেই নিঃশব্দ পদসঞ্চারে চলে-ফিরে বেড়াচ্ছে।

নাকের ওপরে একটা যেন নরম তুলোর মত স্পর্শ। অথচ কী ভারি মিষ্টি একটা গন্ধ! যেন শ্বাস নিতে কষ্ট বোধ হচ্ছে।

হঠাৎ সে হাত দিয়ে মুখের উপর থেকে টান মেরে কি একটা মেঝেতে ফেলে দিল।

বুঝতে পারলে কেউ তার মুখের ওপরে একটা ক্লোরোফরম স্পঞ্জ দিয়েছিল।

তাড়াতাড়ি ও উঠে বসল।

নিকষ কালো অন্ধকার ঘরের মধ্যে যেন জমাট বেঁধে উঠল।

প্রথমটায় ও কিছুই দেখতে পেল না।

তারপর একটু একটু করে অন্ধকারটা চোখ থেকে সরে গেল। দুঘরের ভাঁজ করা দরজার ঈষৎ ফাঁকে একটা অস্পষ্ট মৃদু আলোর আভাস। বুঝলে, কেউ ওর ফ্ল্যাটে এসেছে।

সুব্রত বিছানা থেকে নিঃশব্দে উঠে পড়ল।

মাথাটার মধ্যে তখনও কিন্তু ঝিঁঝিম্ করছে। বালিশের তলা থেকে সাইলেন্সার দেওয়া রিভলভারটা নিয়ে ও পায়ে পায়ে নিঃশব্দে দরজাটার দিকে এগিয়ে গেল। দরজার ফাকে চোখ রাখতেই ও ভয়ংকর রকম চমকে উঠল। দেখলে, সবুজ ঘেরাটোপ ঢাকা টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছে।

ঘরের মধ্যে দুজন মুখোশধারী লোক! তারা সুব্রতর সিক্রেট ড্রয়ার হাতড়াচ্ছে। কিন্তু সুব্রতর মাথা থেকে ক্লোরোফরমের আমেজটা তখনও যায়নি। হঠাৎ মাথাটা কেমন একটু ঘুরে উঠতেই ও সামলে নিতে গিয়ে ওর হাতের ধাক্কায় সশব্দে দরজাটা খুলে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে লোক দুটো খোলা জানলাপথে পালাবার চেষ্টা করলে। এবং চকিতে ওদের মধ্যে একজন হাত বাড়িয়ে। সুইচ টিপে আলোটা নিভিয়ে দিল।

অন্ধকার। নিচ্ছিদ্র আঁধার।

সুব্রত তবু শব্দ ও দিক লক্ষ্য করে রিভলবারের ট্রিগার টিপল। নিঃশব্দে একটা আগুনের ঝিলিক সাঁ করে অন্ধকারের বুকে ছুটে মিলিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে একটা চাপা আর্তনাদ।

সুব্রত ততক্ষণে আবার সামলে উঠে দাঁড়িয়েছে।

সুব্রত তড়িৎপদে অন্ধকার ঘরের মধ্যে শব্দ ও আর্তনাদ লক্ষ্য করে ঢুকে পড়ল।

যে লোকটা আহত হয়েছিল, তারই ঘাড়ের উপর সুব্রত অন্ধকারে হুমড়ি খেয়ে পড়ল।

হুমড়ি খেয়ে পড়তেই লোকটা অন্ধকারে সুব্রতকে জাপটে ধরে।

তখন শুরু হল দুজনে ঝটাপটি।

লোকটার গায়ে বেশ শক্তি আছে। তথাপি সুব্রত তখন তাকে প্রায় ঘায়েল করে এনেছে, তখন মাথার ওপরে কে একটা প্রচণ্ড ঘূষি বসিয়ে দিল সুব্রতর। সুব্রতর মাথাটা ঝিমঝিম্ করে এল, হাতের মুঠি শিথিল হয়ে গেল।

চোখের পলকে লোকটা সুব্রতর কবল হতে নিজেকে মুক্ত করে নিল এবং দ্রুতপদে সুব্রতর শয়নঘরের দিকে পালিয়ে গেল।

সুব্রত আবার নিজেকে ভাল করে সামলাবার আগেই লোক দুটো অদৃশ্য হয়ে গেল।

প্রথমে সুব্রত ঘরে আলোটা জ্বালাল।

কিন্তু ঘর তখন খালি।

অতঃপর সুব্রত শয়নঘরে এসে ঢুকল। শয়নঘরটাও খালি।

দরজাটা হা-হা করছে খোলা। ও বুঝলে সে যখন ঘুমিয়েছিল, তখন এই দরজা খুলেই সুব্রতর ঘরে আততায়ীরা প্রবেশ করেছিল। সুব্রত দরজাটা বন্ধ করে দিল।

আশ্চর্য! কী নিতে ওরা তার ঘরে প্রবেশ করেছিল?

সুব্রত আবার পাশের ঘরে এসে প্রবেশ করল।

ড্রয়ার দুটো তখনও খোলা!

ড্রয়ারের কাছে ও এগিয়ে গেল। অনেক আবশ্যকীয় গোপনীয় কাগজপত্র ওর ড্রয়ারে থাকে।

হঠাৎ আবার ওর নজরে পড়ল একটা ভাঁজকরা কাগজ মেঝেতে পড়ে। একান্ত কৌতূহলবশেই ও সেটা তুলে নিয়ে আলোর সামনে মেলে ধরতেই চমকে ওঠে। একটা চিঠি সেই ডি ভায়োলেট কালিতে সেই হাতে লেখা!

চিঠিটায় লেখা আছে :

মানকে, গোবরা,

আজ রাত্রেই যেমন করে তোক কাজটা শেষ করা চাই। খবর পেয়েছি, সুব্রত হোটেলেই আজ আছে এবং সেটা… ওর ঘরেই অথবা ওর জামার পকেটে নিশ্চয়ই আছে। রক্তক্ষয় বা প্রাণহানির কোন প্রয়োজন নেই। ক্লোরোফরম দিয়েই কাজ সারবে এবং কোন সূত্র রেখে এস না। ঘরে অনায়াসেই ঢুকতে পারবে। …….তোমাদের সাহায্য করবেন।

চাবির ড়ুপলিকেটটা তার কাছে চাইলেই পাবে। আমার নাম করলেই এবং পাস ওয়ার্ডটা বললেই …না নিয়ে কোনমতেই ফিরবে না। উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাবে। কাজ শেষ হয়ে গেলে রাত্রি দুটো থেকে সাড়ে তিনটের মধ্যে চিৎপুরের খালসা কেবিনে আমার সঙ্গে দেখা করো। অপেক্ষায় থাকব।

ইতি

সুব্রত তার হাতঘড়িটা বালিশের তলা থেকে নিয়ে দেখলে তখন রাত্রি প্রায় দেড়টা। কী এখন করে সে? কী তার করা উচিত?

ও দেখলে, মেঝেতে তখন খানিকটা রক্ত জমে আছে। ও বুঝতে পারল লোক দুটোর মধ্যে একজন নিশ্চয়ই তার পিস্তলের গুলিতে আহত হয়েছে।

হয়তো গুরুতরভাবে আহত হয়নি, পালিয়ে যেতে পেরেছে যখন। এ বিষয়ে কোন সন্দেহই নেই।

কিন্তু চিঠির মধ্যে ঐ ডট্‌-গুলোর অর্থ কী? চকিতে ওর একটা কথা মনে পড়ে গেল। তবে কী—হ্যাঁ, তিনটে ডট মানে চিঠিটা। চিঠিটা ও ড্রয়ারেই রেখেছিল দুপুরের দিকে।

তাড়াতাড়ি ও ড্রয়ারের কাগজপত্রগুলো ঘাঁটতে শুরু করল। না, চিঠিটা নেই। চিঠিটা খুনী চুরি করলে কেন?

প্রমাণ—তার বিরুদ্ধে এটা একটা প্রমাণ। তাই চিঠিটা সরাবার প্রয়োজন হয়েছিল?

কিন্তু কেন সে তখন সাবধান হল না? কেন সে এই ড্রয়ারের মধ্যে চিঠিটা রেখেছিল?

কিন্তু চিঠির মধ্যে ছয়টি ডটের মানে কী? নিশ্চয়ই কোন লোকের নাম হবে যার নিকট হতে পত্রবাহক মানকে ও গোবরাকে তার ফ্ল্যাটে ঢুকতে না পারলে সাহায্য নিতে বলেছে? চাবির ড়ুপলিকেটও তার কাছেই পাওয়া যাবে। কিন্তু কার কাছ হতে তার এই ফ্ল্যাটের চাবির ড়ুপলিকেট পাওয়া সম্ভব?

একমাত্র হোটেলের ম্যানেজারের। কী তার নাম? ঠিক। তার নাম কামতাপ্রসাদ! হ্যাঁ, ছয়টি ডট! তাহলে মিলে যাচ্ছে। হুঁ, কামতাপ্রদাসই তাহলে তার শত্রুদলকে সাহায্য করেছে!

একটা ব্যাপার কিন্তু স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে, প্রকাণ্ড একটা ষড়যন্ত্র আছে মিঃ সরকারের এই খুনের ব্যাপারে। কোন একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি টাকার সাহায্যে অন্য লোকের দ্বারা এইসব কাজ চালাচ্ছে। একটা দল সঙ্বদ্ধভাবে কাজ করছে। তাছাড়া চিঠির প্রথম তিনটি ডট যদি চিঠিটা বলে ধরা যায়, চিঠির শেষ তিনটি ডটয়েরও একই বিশ্লেষণ দাঁড় করানো যেতে পারে। কিন্তু আর এখানে বসে থাকলে তো হবে না। এখুনি একবার চিৎপুরে খালসা হোটেলে যেতে হবে। দেখা যাক, সেখানে যদি কিছুর সন্ধান মেলে।

সুব্রত চটপট জামা বদলে সাধারণ লোকের মত সাজসজ্জা করে নিল।

মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চোখের কোলে কালি। মাথার চুল রুক্ষু, গায়ে সাধারণ একটা ছেড়া ডোরাকাটা টুইলের শার্ট।

পরিধানে মলিন একখানা ধুতি। পায়ে ক্যাম্বিসের জুতো।

সুব্রত তার ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে হোটেল থেকে বের হয়ে নীচের রাস্তায় এসে দাঁড়াল।

মাথার উপরে রাত্রির কালো আকাশ। অসংখ্য তারার মিটিমিটি চাউনি যেন। সমগ্র বিশ্বচরাচর নিদ্রার কোলে ঢলে পড়েছে।

কেউ কোথাও নেই।

ধর্মতলার মোড় থেকে একটা ট্যাক্সি ধরে ড্রাইভার নির্জন রাস্তা পেয়ে ঝড়ের বেগে গাড়ি ছুটালে।

সুব্রত চলমান গাড়ির মধ্যে ব্যাকসিটে হেলান দিয়ে বসে চোখ বুজল।

চিৎপুরের রাস্তাটা বিডন স্ট্রীটের সঙ্গে যেখানে এসে মিলেছে, তারই সামনে খালসা কেবিন।

খালসা কেবিনের সামনে ট্যাক্সিটা ছেড়ে দিয়ে সুব্রত ভাড়া মিটিয়ে দিল এবং তাকে সেখানেই অপেক্ষা করতে বললে।

কেবিনের মধ্যে উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে।

মস্তবড় উনুনটা গল্প করে জ্বলছে। উনুনের ওপরে শিক কাবাব তৈরি হচ্ছে। পাশেই একটা মস্তবড় লোহার কেলিতে বোধ করি চায়ের জল ফুটছে।

ভেতরে কতকগুলো টেবিল ও টিনের চেয়ার পাতা।

দশ-বারোজন নিম্নশ্রেণীর কুলী, মজুর ও গাড়োয়ান বসে চা পান করছে।

ঘরের দেওয়ালে কতকগুলি কুৎসিত ছবি টাঙানো।

কাউন্টারের একপাশে দাড়িগোঁফওয়ালা একজন মোটামত লুঙ্গি পরা মুসলমান বসে বসে বিড়ি ফুঁকছে।

একটা গ্রামোফোনে রেকর্ড বাজছে।

তুমকো মোবারক হো
উঁচে মাহলিয়া—
হামকো হায় পিয়াসী
হামারি গলিঁয়া।

পাশেই একটা কাঁচের আলমারিতে ডিশে সাজানো ডিমসিদ্ধ, ডিমের কারি, মাংসের কারি আর পরোটা।

সুব্রত এসে হোটলে প্রবেশ করে এক কাপ চা দিতে বলে। তারপর একটা লোহার চেয়ারে বসে একটা বিড়ি ধরালো।

একটা ছোকরা এসে ময়লা কাপে এক কাপ চা দিয়ে গেল।

সুব্রত চা খেতে খেতে ঘন ঘন রাস্তার দিকে তাকাতে লাগল। কিছুক্ষণ বাদেই ও দেখলে, দুজন লোক এসে কেবিনে প্রবেশ করল। একজন একটু লম্বা। অন্যজন একটু বেঁটে। দুজনের দেহই বেশ গাঁট্টাগোট্টা, বেঁটে লোকটার হাতে একটা পট্টি বাঁধা। পউিটার খানিকটা রক্তে লাল হয়ে উঠেছে।

দুজনেরই পরিধানে ময়লা পাতলুন ও হাতকাটা হাফশার্ট। দুজনকে দেখলেই মনে হয়, নিম্নশ্রেণীর লোক ওরা।

লোক দুটো কেবিনে প্রবেশ করে দুকাপ চায়ের অর্ডার দিল। এবং সুব্রতরই পাশের একটা টেবিল অধিকার করে বসল।

সুব্রত কান খাড়া করে সজাগ হয়ে রইল।

দুকাপ গরম চা দোকানের ছোকরাটা এনে ওদের সামনে রাখলে।

লোক দুটো চা খেতে খেতে ঘন ঘন রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে।

সুব্রতর চায়ের কাপটা শেষ হয়ে গিয়েছিল। সে আর এক কাপ চায়ের অর্ডার দিল, ইধার আউর এক কাপ চা।

এমন সময় ওদের মধ্যে একজন দেওয়ালে টাঙানো বড় ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বললে, রাত্রি প্রায় পৌনে তিনটে যে!

অন্যজন বলে, এখনও আসবার নামটি নেই। বেটাদের আকেল দেখলে প্রাণ জল হয়ে যায়।–বেটাদের টাকা আছে, তাই ভাবে যতক্ষণ ইচ্ছে আমাদের বসিয়ে রাখতে পারে!

ব্যস্ত হোস নে মানকে, বেশ তো বসে আছি এখানে। দোকান তো আর বন্ধ হচ্ছে না। কালু মিঞার খালসা কেবিন। আহা বেঁচে থাক। কিন্তু তুই ভাল করে ক্লোরোফরম্ দিনি মানকে, নইলে বেটা জেগে ওঠে।

আমার বাবা কোন দিন ক্লোরোফরম্ দিয়েছে? তুলোটা নাকের ওপরে রেখে চলে এসেছিলাম। বেটা যে ক্লোরোফরম্ পেয়েও চাংগা হয়ে উঠবে অমন করে, কে জান তো বল? হাতটা এখনও টনটন করছে।

ভাগ্যে প্রাণে বেঁচে গেছিস! গোবরা বললে।

ঠিক এমন সময় একজন এসে হোটেলে প্রবেশ করল।

লোকটা লম্বায় প্রায় সাড়ে ছয় ফিট হবে। বলিষ্ঠ পেশল গঠন।

পরিধানে সুট, গ্রে কালারের। চোখে গগলস্।

লোকটাকে কেবিনে ঢুকতে দেখেই গোবরা ও মানকে উঠে দাঁড়াল সঙ্গে সঙ্গে।

দুজনারই মুখে অদ্ভুত একপ্রকার হাসি জেগে ওঠে। সুটপরা লোকটা এগিয়ে কোণের একটা টেবিল অধিকার করে বসল। সঙ্গে সঙ্গে গোবরা ও মানকে লোকটার পাশে গিয়ে দুখানা চেয়ার অধিকার করে বসল।

লোকটার দাড়ি নিখুঁতভাবে কামানো। কিন্তু বেশ পাকানো গোঁফ আছে। কপালের দুপাশে একটু করে কাটা।

সুব্রত অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারল না, লোকটাকে কোথাও দেখেছে কিনা।

সেই লম্বা লোকটি এবং গোবরা ও মানকে কী সব ফিস ফিস করে কথাবার্তা শুরু করে। দিয়েছে ততক্ষণে।

সুব্রত তাদের কথাগুলো ঠিক বুঝতে না পারলেও গোবরা ও মানকের মুখ ও হাতনাড়া দেখে বুঝতে পারলে, কোন বিষয় নিয়ে তাদের দুজনের সঙ্গে লোকটার মতের গোলমাল হচ্ছে।

হঠাৎ মানকে বেশ চড়া গলাতেই বললে, কেন? এখনই এখানে দিয়ে দিলেই তো লেঠা চুকে যায়।

গোবরা চড়া চলায় বললে, কী আমার কুটুম্বিতে! দশ জায়গায় দাঁড় করিয়ে হয়রান করা।

লম্বা চশমা পরা লোকটিও ততক্ষণে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। গম্ভীর চাপা গলায় ঘরের দিকে তাকিয়ে বললে, অবুঝের মত চেঁচামেচি করে কোনই লাভ নেই মানকে। আমার সঙ্গে চল। আসল মালিকের হাতে মালটা পৌঁছে দিলেই তোমাদের পাওনা তোমরা তখুনিই পেয়ে যাবে। এক মিনিটও দেরি হবে না, এসো।

বলতে বলতে লম্বা লোকটি কেবিনের বাইরে চলে গেল। ওরাও লোকটাকে অনুসরণ করল।

ওরা খালসা কেবিন থেকে বের হয়ে যেতেই সুব্রত উঠে পড়ে কাউন্টারে এসে চায়ের দাম মিটিয়ে দিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াল। রাস্তার অপর পাশে একটা বড় বটগাছের নীচে অন্ধকারে একটা কালো রংয়ের সিডনবডি গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। লোকগুলো গাড়িটার দিকেই যাচ্ছে দেখা গেল।

লোকগুলো গাড়িতে উঠে গাড়ি ছেড়ে দিতেই, সুব্রত একটু দূরে যেখানে তার ট্যাক্সিওয়ালা দাঁড়িয়েছিল, সেখানে এসে দেখলে ট্যাক্সিওয়ালা সামনের সিটে হেলান দিয়ে ঘুমুচ্ছে।

সুব্রত ট্যাক্সিওয়ালাকে ডেকে তুলে অগ্রগামী গাড়িটাকে অনুসরণ করতে বলে গাড়িতে উঠে বসল।

ড্রাইভার গাড়িতে স্টার্ট দিল।

আগের গাড়িটা চিৎপুর রোড ধরে বাগবাজারের দিকে চলেছে।

প্রায় হাত দশ-পনেরো ব্যবধান রেখে সুব্রতর ট্যাক্সিও আগের চলমান গাড়িটাকে অনুসরণ করে চলল। আগের গাড়িটা বরাবর চলতে চলতে এসে ঠিক চিৎপুর ও বাগবাজারের মোড়ে একটা প্রকাণ্ড চারতলা পুরাতন বাড়ির অল্পদূরে এসে থামল।

সুব্রতও ট্যাক্সিওয়ালাকে গাড়ি থামাতে বললে।

সুব্রত গাড়ির মধ্যে বসে-বসেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে লাগল, বাড়িটার সামনে একটা লোহার গেট। গেটের সামনেই ডানদিকে একটা গ্যাস লাইটপোস্ট–

গ্যাসলাইটের আলো নীচের রাস্তার আশেপাশে এসে পড়েছে। তাতেই চারপাশ বেশ দেখা যায়।

বাড়িটার দোতলা, তিনতলা, চারতলার সমস্ত জানালাই বন্ধ। মানুষের বসতি আছে বলে মনে হয় না। পুরানো পোড়ড়া বাড়ি বলেই মনে হয়।

মানকে, গোবরা ও লম্বা লোকটা তিনজনে গাড়ি থেকে নামে। আগে আগে লম্বা লোকটা ও তার পিছনে মানকে ও গোবরা গেটের মধ্যে প্রবেশ করল।

সুব্রত গাড়ি থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে এগিয়ে গেল বাড়িটার দিকে।

ওরা তিনজন এগিয়ে চলেছে।

সুব্রত বেশ একটু ব্যবধান রেখে ওদের অনুসরণ করে এগিয়ে চলল।

গেট পার হলেই একটা ভোলা জমি। জমিটার দুপাশে টিনের শেড্‌ ঘর।

কতকগুলো লরী দেখা যায়। জমিটা পার হয়েই একটা ভেজানো দরজা ঠেলে লোক তিনটে বাড়ির মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

সুব্রত দরজার সামনে এসে দরজাটা ঠেলে দেখলে, ওরা দরজাটা বন্ধ করেনি, খুলেই রেখে গেছে।

মিনিট দুতিন অপেক্ষা করে সুব্রত দরজার ভিতর দিয়ে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করল। নিকষকালো অন্ধকারে সহসা যেন ওর চোখ দুটো অন্ধ হয়ে গেল। পকেটে যদিও পেনসিল টর্চ আছে, তবু আলো জ্বালবার ভরসা হল না। ক্রমে একটু একটু করে অন্ধকারটা চোখে কতকটা যেন সয়ে গেল। সুব্রত পায়ে পায়ে এগুতে লাগল। আর সঙ্গে সঙ্গে শ্রবণেন্দ্রিয়কে সজাগ করে রাখল, কোন শব্দ শোনা যায় কিনা।

এগিয়ে যেতে যেতে ওর মনে হল, মাথার ওপরে কার যেন পায়ের চলার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ও বুঝলে, লোকগুলো দোতলাতেই গেছে।

কিন্তু দোতলায় যাবার সিঁড়ি কোথায়? যতদূর মনে হচ্ছে নীচের তলায় কেউ নেই। ও পকেট থেকে টর্চটা বের করে বোম টিপে আলোটা জ্বালাতেই দেখতে পেল, যেখানে ও দাঁড়িয়ে আছে সেটা লম্বা একটা বারান্দা।

সামনেই একটা প্রশস্ত জঙ্গলাকীর্ণ আবর্জনাপূর্ণ আঙিনা। বারান্দার মেঝেতে এক ইঞ্চি পরিমাণ ধুলোবালি জমে আছে। বেশ বোঝা যায় যে, বাড়িটায় কেউ বাস করে না। আর বসবাস করলেও এমনভাবেই বাস করে যে, বসবাসের তারা কোন চিহ্নই রাখতে চায় না। নীচের তলায় প্রায় সাত-আটটা ঘর। প্রত্যেকটা ঘরই খালি, আবর্জনাপূর্ণ। দরজাগুলোতে শিকল দেওয়া।

আলো ফেলে ফেলে ঘুরতেই ও দেখতে পেল, উপরে উঠবার সিঁড়ি। আর কালবিলম্ব না করে টর্চটা নিভিয়ে অন্ধকারেই টিপে টিপে নিঃশব্দে ও উপরে উঠতে লাগল।

উপরের তলাতেও ঠিক এমনি একটা বারান্দা। কোণের একটা ঘরের আধ-ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে খানিকটা আলো এসে বারান্দায় পড়েছে। সুব্রত পা টিপে টিপে দরজাটা দিকে এগিয়ে গেল।

কাদের কথাবার্তার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে যেন।

সুব্রত যে ঘরটা থেকে আলো আসছিল, তার পাশের ঘরটাতে গিয়ে প্রবেশ করল।

ঘরটার এক কোণে একটা সবুজ ঘেরাটোপে ঢাকা বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে। ঘরটা খালি! কেউ নেই ঘরে। ভাগ্যক্রমে ও দেখলে, যে-ঘরে লোকগুলো কথাবার্তা বলছিল, সেই ঘর থেকে এই ঘরে আসা-যাওয়ার একটা প্রবেশদ্বার আছে। সেখানে ভারী একটা পর্দা টাঙানো।

সর্বাগ্রে সুব্রত চট্‌ করে ঘরটার চারপাশে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে নিল।

একপাশে একটা লোহার খাটে শয্যা বিছানো। একটা কাঠের আলমারি এক কোণে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড় করানো। এককোণে একটা কুঁজো। কুঁজোর মুখে একটা গ্লাস উপুড় করা।

আর এক কোণে একটা লোহার সিন্দুক। একটা আলনায় গোটাকতক কাপড়ও ঝুলছে। সুব্রত আস্তে আস্তে দুই ঘরের মধ্যবর্তী দরজার ঝুলন্ত পর্দার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

পাশের ঘরের লোকগুলো বেশ জোরে-জোরেই কথা বলছে।

একজনের গলা শোনা গেল, একটু কর্কশ গলার স্বর, তাহলে তোমরা চিঠিটা সত্যি উদ্ধার করে এনেছ?

হ্যাঁ, সর্দার। কিন্তু বেটা গোয়েন্দাটা আর একটু হলেই পিস্তলের গুলি চালিয়ে মানকের প্রাণটা নিয়েছিল আর কি!

আগের লোকটি ঐ কথায় কর্কশ গলায় হেসে উঠল।

চিঠিটা যদি আজ তোরা না আনতে পারতিস—লোকটা বলতে লাগল, তবে আজ বহু টাকা আমাদের হাতছাড়া হয়ে যেত। সাবাস! খুব বাহাদুর!

গোবরা জবাব দিলে, তাতে আর সন্দেহ কি সর্দার। তা চিঠির মালিক সেই টাকা দেনেওয়ালা আজ এখানে এসেছিল কি?

না, আমিই সন্ধ্যার সময় তাজ হোটেলে দেখা করেছি। বলেছে, চিঠিটা উদ্ধার হলে কাল এসে সে নিয়ে যাবে।

কিন্তু আমাদের দেনাপাওনার কি হবে সর্দার?

কুছ পরোয়া নেই। টাকা সে আগাম দিয়ে গেছে।

এমন সময় সেই লম্বা লোকটার কণ্ঠস্বর শোনা গেল, তবে এদের টাকা দিয়ে বিদায় করে দাও সর্দার।

হ্যাঁ, টাকা পাশের ঘরের সিন্দুকে আছে। এখুনি এনে দিচ্ছি। ব্যস্ত কেন?

সুব্রত বুঝলে, এখুনি হয়তো সর্দার এ ঘরে আসবে। ও চটপট বড় আলমারিটার পিছনে গিয়ে দাঁড়াল এবং লুকাবার আগেই সে দেখে রেখেছিল ঘরের আলোর সুইচটা কোথায়।

যেখানে লুকিয়েছে তারই পাশে, অনায়াসেই হাত বাড়িয়ে সুইচটা পাওয়া যায়। আর আলমারির পাশেই সিন্দুকটা। একটু পরেই কে যেন এসে ঘরে ঢুকল। সুব্রত আলমারির পিছনে দাঁড়িয়ে পায়ের শব্দ শুনতে পেল।

আগন্তুক এসে সবে চাবি দিয়ে সিন্দুকটা খুলতে যাবে, সহসা সুব্রত এসে তার সামনে দাঁড়াল। হাতে তার উদ্যত পিস্তল।

লোকটার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে। মোটাসোটা গড়ন। মাথায় ঘন কোঁকড়া চুল। নাকটা চ্যাপটা। চোখ দুটো ছোট ঘোট কুতকুতে। মুখে বিশ্রী বসন্তের দাগ। কুৎসিত।

লোকটা হঠাৎ সুব্রতকে সামনে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় যেন। কিন্তু যেমন সে দাঁড়িয়েছিল তেমনই নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।

টু শব্দটি করেছ কী পিস্তলের গুলি তোমার বুকে গিয়ে তোমাকে যমের বাড়ি পাঠাবে।

একটা কুৎসিত হাসির রেখা লোকটার মুখে যেন বিদ্যুৎ-চমকের মতই খেলে গেল।

সুব্রত জানত না যে, যার সামনে সে পিস্তল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেই লোকটা কত বড় দুঃসাহসী, নৃশংস ও ভয়ংকর! এর চাইতেও সংকটাপন্ন ভয়ংকর মুহূর্তেও সে তার উপস্থিত বিবেচনা, শক্তি ও সাহস হারায়নি। লোকটা তার কুকুতে ভয়ংকর ধারাল ছুরির ফলার মত দৃষ্টি নিয়ে কিছুক্ষণ স্থিরভাবে সুব্রতর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর হঠাৎ হ্যাঁ হ্যাঁ করে কর্কশ হাসি হেসে উঠল!

সুব্রত চমকে উঠল, চুপ!

লোকটার কিন্তু ভ্রূক্ষেপও নেই। তেমনিই হা হা করে হাসছে।

সুব্রত আলোটার ওপরে লক্ষ্য করে একটা গুলি চালাল।

ঝন্‌ঝন্ শব্দ করে মুহূর্তে ঘরটা নিচ্ছিদ্র আঁধারে ভরে গেল।

ইতিমধ্যে ওর হাসি শুনে পাশের ঘরের লোকগুলো অন্ধকার ঘরের মধ্যে ছুটে এসেছে, সর্দার—সর্দার কী হল?

একটা লোক ঘরের মধ্যে!

লোক ঘরের মধ্যে? কোথা থেকে এল? মানকের গলা।

হ্যাঁ, আলমারির দিকে…

সুব্রত ততক্ষণে আলমারির দিক থেকে অন্ধকারে শিকারী বিড়ালের মত দেওয়াল ঘেঁষে এগুচ্ছে দরজার দিকে।

মানকে গম্ভীর গলায় বললে, ওরে শয়তান, শীঘ্র বের হয়ে আয়! সিংহের গুহায় পা দিয়েছিস! বলতে বলতে অন্ধকার তা করে একটা ছুরি ছুঁড়ে মারল মানকে!

ছুরিটা এসে সাঁ করে সুব্রতর ডান হাতে আঘাত হানল। সঙ্গে সঙ্গে রিভলভারটা ওর হাত থেকে ঠন্‌ করে মাটিতে পড়ে গেল।

সুব্রত পিস্তলটা মাটি থেকে কুড়িয়ে নেবার আগেই কে একজন ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ঘাড়ের উপর। সুব্রত এক ঝাকানি দিয়ে লোকটাকে ফেলে দিতেই লোকটা অন্ধকারে সুব্রতর পা চেপে ধরল।

সুব্রত আবার পড়ে গেল।

ততক্ষণে আরও একজন এসে সুব্রতর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল সেই অন্ধকারেই।

সুব্রত একজনের পেটে একটা প্রচণ্ড লাথি বসিয়ে দিল। লোকটা গ্যাক করে শব্দ করে ছিটকে পড়ল।

সুব্রত সবে উঠে দাঁড়িয়েছে, সহসা কে তার মাথার ওপরে অন্ধকারেই একটা প্রচণ্ড আঘাত হানল।

সুব্রত চোখে অন্ধকার দেখে। সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

কতক্ষণ যে সুব্রত অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল তা ও বলতে পারে না। ক্রমে এক সময় একটু একটু করে ওর জ্ঞান ফিরে এল।

মাথাটা তখনও বেশ ভারী। ঝিমঝিম্ একটা ভাব। শরীরটা বরফের মত জমাট বেঁধে গেছে। রক্ত চলাচল একেবারে বন্ধ।

চোখের পাতা দুটো খুলতে তখনও বেশ কষ্ট হয়। কোথায় আছে সে?

কী অন্ধকার! কালো বাদুড়ের ডানার মত অন্ধকার চাপ বেঁধে উঠেছে যেন।

একটা ধুলোবালির সোঁদা গন্ধে নাক জ্বালা করে।

পাশ ফিরতে গেল, সমস্ত শরীরটা যেন একই সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠল। ও বুঝতে পারলে, ওর হাত-পা সব বাঁধা শক্ত দড়ি দিয়ে।

হাত দুটো রাঁধা অবস্থাতেই চোখের কাছে নিয়ে এল। হাত দুটো শক্ত করে বাঁধা, পৃথক করবার উপায় নেই।

অন্ধকার ঘরের মধ্যে ও চেয়ে দেখতে লাগল, ওই মাথার ওপরে দেওয়ালের গায়ে ঘুলঘুলি দিয়ে একটু যেন ক্ষীণ আলোর আভাস পাওয়া যায়।

ও বুঝতে পারলে, ওকে হাত-পা বেঁধে একটা ধূলিমলিন তক্তপোষের ওপরে ফেলে রেখে গেছে ওরা।

এই বদ্ধ ঘরের অন্ধকার থেকে কে তাকে মুক্তি দেবে? বেঁকের মাথায় সহসা অমনভাবে। একটা মাত্র পিস্তলের ওপরে নির্ভর করে চারজন শত্রুর সম্মুখীন হওয়া তার কোনমতেই উচিত হয়নি।

কপালের দুপাশের রগ দুটো যেন বেদনায় দপদপ করছে।

শরীরের সর্বত্র একটা ক্লান্তি, বেদনা।

উঃ, কী অন্ধকার।

চোখের দৃষ্টি বুঝি অন্ধ হয়েই যাবে।

কিছুক্ষণ একান্ত নিঃসহায় ভাবেই ও কান পেতে যেমন পড়েছিল তেমনি পড়ে রইল। যদি কোন শব্দ শোনা যায়।

কিন্তু কোন শব্দই পাওয়া যাচ্ছে না।

মৃত্যুর মতোই জমাট শীতল অন্ধকার যেন অক্টোপাশের মত অষ্ট মৃত্যুবাহু বাড়িয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেছে।

ঘরের মধ্যে বদ্ধবায়ু—যেন শ্বাস নিতেই কষ্টবোধ হয়।

সহসা পাগলের মত সে একবার হাতের বাঁধনটা ছিঁড়ে ফেলতে চেষ্টা করলে, কিন্তু সবই বৃথা। সরু শক্ত দড়িতে এমনভাবে বাঁধা যে, সাধ্য কি তার ছিঁড়ে ফেলে সে বাঁধন? দড়িটা খুলবার চেষ্টা করতে গিয়ে ফল এই হল যে, হাতের ওপরে বাঁধনটা চামড়া ও মাংস কেটে আরও শক্ত হয়ে বসে গেল।

উপায় নেই। এমনি ভাবেই বদ্ধ অবস্থায় এই অন্ধকার বায়ুলেশহীন ধূলিমলিন ঘরের মধ্যে পড়ে থাকতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না বাইরে থেকে কেউ এসে তাকে মুক্তি দেয়।

কিন্তু কেইবা তাকে মুক্তি দিতে আসবে এই অন্ধকার কারাগুহা থেকে? কেইবা জানতে পারবে?

সে কোথায় আছে তা তো সেও জানে না।

এখনও কি সেই চিৎপুরের বাড়িটারই কোন ঘরের মধ্যে বন্দী হয়ে আছে সে? এখন কি রাত্রি, না দিন হয়েছে?

হয়তো এমন কোন পোড়ো বাড়ির এক কুঠুরির মধ্যে তাকে বন্দী করে রেখেছে যার। আশেপাশে মাইলখানেকের মধ্যে হয়তো মানুষের চিহ্নও নেই। মানুষ হয়তো সেখানে মোটেই আসে না।

হয়তো তিলতিল করে তাকে এই বদ্ধ বায়ুলেশহীন অন্ধকার ঘরের মধ্যে এমনি হাত-পা বাঁধা অবস্থাতেই ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হয়ে মরে যেতে হবে। কেউ জানবে না, কেউ শুনবে না তার আর্ত-কাতর চিৎকার।

আর যদি কেউ আসে, সে হয়তো শত্রুপক্ষেরই কেউ হবে। যে তার দুর্দশা দেখে নেকড়ের মত দাঁত বের করে হ্যাঁ হ্যাঁ করে নিষ্ঠুর হাসি হাসবে।

কিন্তু না, এসব কি পাগলের মত ভাবছে ও! যেমন করেই হোক তাকে মুক্তি পেতেই হবে।

মনে পড়ল বহুদিন আগে একবার সে এমনি এক ঘরে বিখ্যাত দস্যু কালো ভ্রমরের চক্রান্তে বন্দী হয়েছিল। কিন্তু সেখান থেকে তো সে পালিয়েছিল। হঠাৎ তার মনে যেন আশার একটা জোয়ার এসে ঝাপটা দিল।

ওর সমগ্র অন্তর যেন বাঁচবার একটা অদম্য প্রেরণায় সহসা আবার নবীন বলে বলীয়ান হয়ে উঠল।

বাঁচতে তাকে হবেই। বিপদে সাহস হারালে চলবে না।

ধীরে ধীরে বহু কষ্টে ও কোনমতে ঐ বাঁধা অবস্থাতেই উঠে বসল।

হঠাৎ তার মনে পড়ল, তার ডান পায়ের জংঘার নীচে একটা তীক্ষ্ণ জাপানী ছুরি বাঁধা আছে।

কিন্তু সে ছুরিটা সে বের করবে কী করে?

নিচু হয়ে দাঁত দিয়ে ও হাঁটুর উপরে কাপড়টা ছিঁড়ে ফেললে। তারপর কোনমতে বাঁধা হাতের আঙুল দিয়ে ছুরিটা টেনে বের করল। তখন তার বাঁধন কাটতে বেশী দেরি হল না।

ছুরিটা দাঁতে চেপে ধরে প্রথমেই হাতের বাঁধন একটু একটু করে সে কেটে ফেললে। তারপর পায়ের ও শরীরের।

সে এখন মুক্ত।

আনন্দে ওর মুখের ওপরে হাসি ফুটে উঠল।

বাঁধন থেকে মুক্ত হয়ে ও খাটের উপর থেকে নীচে নেমে দাঁড়াল।

পকেট হাতড়ে দেখলে তার পেনসিলটর্চটা আছে কিনা?

ধন্যবাদ! ভগবানকে অশেষ ধন্যবাদ, টর্চটা তখনও তার পকেটের ক্লিপে আঁটা আছে। শত্রুরা নিয়ে নেয়নি।

বোতাম টিপতেই একটা সরু আলোর রেখা অন্ধকারের বুক চিরে জেগে উঠল—যেন তীক্ষ্ণ অনুসন্ধানী একটা দৃষ্টি।

প্রথমেই আলো দিয়ে ও খুঁজতে লাগল ঘরে কোন দরজা আছে কিনা।

একদিককার দেওয়ালে একটা বন্ধ দরজা ওর নজরে পড়ল। কিন্তু দরজাতে ধাক্কা দিতে দেখলে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। তাছাড়া, দরজাটা শক্ত সেগুন কাঠের। সাধ্য কী ওর দরজাটা ভেঙে ফেলে পায়ের জোরে!

লোহার মতই শক্ত। তবু একবার ও দেহের সমগ্র শক্তি একত্রিত করে দরজাটার ওপরে চাপ– দিল। কিন্তু বৃথা চেষ্টা।

তখন কতকটা হতাশ হয়েই সে ঘরের দেওয়ালগুলা পরীক্ষা করে দেখতে লাগল।

নিরেট ইট ও সিমেন্টের তৈরি দেওয়াল। কোথাও একটুকু ফাঁক নেই।

দেওয়ালে দেওয়ালে ও টোকা মেরে দেখলে, যদি কোথাও ফাপা থাকে। কিন্তু না, শক্ত। নিরেট দেওয়াল।

পরিশ্রমে ও ক্লান্তিতে ওর কপালের ওপরে তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিয়েছে।

ধুপ করে সুব্রত তখন ধূলিমলিন মেঝের ওপরে বসে পড়ে দুহাতে মাথাটা টিপে ধরল।

না, কোন আশাই নাই। কিন্তু কী করবে ও এখন?

কিন্তু এমনি করে বসে থাকলে তো চলবে না।

মুক্তির একটা কিছু উপায় বের করতেই হবে। আবার তখন দ্বিগুণ উৎসাহে সুব্রত উঠে দাঁড়াল। এবারে সে হাতের টর্চটা জ্বেলে আলো ফেলে ফেলে ঘরের মেঝেটা ভাল করে পরীক্ষা করে দেখতে শুরু করল।

শক্ত সিমেন্টে গড়া মেঝে। লোহার মত কঠিন।

প্রায় এক ইঞ্চি পরিমাণ ধুলো পুরু হয়ে জমে আছে।

ধুলো সরিয়ে সরিয়ে সুব্রত মেঝে ঠুকে ঠুকে পরীক্ষা করে দেখতে লাগল। হঠাৎ এক জায়গায় ওর নজরে পড়ল, একটা লোহার উঁচু বন্টুর মত কী যেন মেঝে থেকে উঁচু হয়ে আছে।

সুব্রত তখন সেটাতে নিয়ে প্রবল উৎসাহে নাড়াচাড়া করতে শুরু করল। কিন্তু সেটা মেঝের সিমেন্টের সঙ্গে একেবারে গাঁথা।

সুব্রত ভাবলে এটা যখন মেঝেতে আছে, এর একটা উদ্দেশ্যও নিশ্চয়ই আছে।

হঠাৎ মেঝেতে একটা লোহার বন্টুর মতই থাকতে যাবে কেন?

সুব্রত আবার আলো ফেলে ফেলে ঘরের মেঝের সর্বত্র খুঁজে দেখলে। কিন্তু আর কোথাও ও রকম লোহার বন্টু তার নজরে পড়ল না।

সুব্রত যখন অনেক চেষ্টা করে ও গায়ের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেও সেটাকে এতটুকু নড়াতে পারল না, তখন সে তার ছুরিটা দিয়ে বন্টুর চারপাশে কুরে কুরে ফেলতে লাগল।

ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই বল্টুটা আরও একটু সজাগ হয়ে উঠল। এবার হঠাৎ কী ভেবে সুব্রত বন্টুটার ওপরে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড একটা চাপ দিল। সঙ্গে সঙ্গে একটা ঘড়ঘড় শব্দ। চোখের। নিমেষে বন্টুটার ঠিক হাতখানেক দূরে মেঝের পাথর সরে গিয়ে একটা গোলাকার গর্ত দেখা গেল। সুব্রত এক লাফ দিয়ে সেখান থেকে সরে দাঁড়াল।

বুকটার মধ্যে তখনও তার উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছে।

সুব্রত এগিয়ে এসে গর্তটার মুখে আলো ফেলল। দেখল মেঝেতে যেখানে পাথর সরে গিয়ে ফাঁক হয়ে গেছে, সেখানে একটা গোলাকার সিমেন্টের ঢাকনা মত নিচের দিকে ঝুলছে। গর্তের মুখে ও আবার আলো ফেলল। ধাপে ধাপে অপ্রশস্ত সিঁড়ি নীচে কোন্ অন্ধকার গহ্বরে নেমে গেছে কে জানে! ও এতক্ষণে বুঝতে পারলে এটা একটা গোপন সুড়ঙ্গ পথ। কোন স্প্রিং বা ওই জাতীয় কিছুর সাহায্যে কাজ করে।

সুব্রত মনে মনে ভাবলে, আশ্চর্য! জানি না এই সিঁড়ি কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে। এই সিঁড়ি ধরে এগোলে শেষ পর্যন্ত কোথায় যেতে হবে কে জানে? হয়তো বা সাক্ষাৎ মৃত্যুর গহ্বর বরাবর। চলে গেছে। এখন এই পথ ধরে অগ্রসর হওয়া উচিত কিনা? কিন্তু অগ্রসর না হয়েই বা লাভ কী? এইখানে এই ঘরের মধ্যে বসে থাকলেও তো মুক্তির কোনই উপায় হবে না। এখানে তাকে এইভাবে বন্দী করে রেখেছে শত্রুপক্ষ, তারা নিশ্চয়ই আরামে বসে থাকবে না। তারা যদি দলে ভারী হয় এবং তাদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র থাকে, তবে মুক্তির পথ আরও দুরূহ হওয়াই স্বাভাবিক। এ অবস্থায় বিবেচনা করে দেখতে গেলে অগ্রসর হওয়াই উচিত। হয়তো বা এই পথের শেষে মুক্তি মিললেও মিলতে পারে। চান্স একটা নেওয়া দরকার।

সুব্রত উঠে দাঁড়াল। হ্যাঁ, সে এই পথ ধরেই অগ্রসর হবে।

সুব্রত গর্তের ভিতরে নামল এবং সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে শুরু করল। উঃ, কী অন্ধকার। গাঢ় কালির মতই শ্বাসরোধকারী জমাট-বাঁধা অন্ধকার।

সুব্রত সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে একবার থমকে দাঁড়াল। কোন শব্দ শোনা যায় কিনা?

না, কিছুই শোনা যায় না।

সুব্রত আবার সিঁড়ি ভাঙতে লাগল। এক, দুই। এমনি করে প্রায় বারোটা সিঁড়ির ওপরে ওর পা সমতলভূমিতে ঠেকল।

ও দাঁড়াল। হাতের টর্চটা জ্বেলে ও চট করে একবার তার আশপাশ আলোতে দেখে নিল। সরু অপ্রশস্ত গলিপথ। কিন্তু কোথায় গিয়ে যে ঐ পথ শেষ হয়েছে কিছুই তার বোঝবার উপায়। নেই। যেন বিরাট একটা কালো অজগর মুখব্যাদান করে আছে।

সুব্রত আবার অগ্রসর হল।

বোধ হয় দশ পাও সে অগ্রসর হয়নি, সহসা কার তীব্র কণ্ঠস্বর নির্ঘোষে ওর কানে এসে। বাজল, থাম!

তারপরেই একটা তীব্র আলোর রশ্মি ওর চোখেমুখে এসে সুতীব্র ঝাপটা দিল।

কিহে মাস্টার, চলেছ কোথায়?

বিস্ময়ে ও ঘটনার আকস্মিকতার সুব্রত থমকে দাঁড়িয়ে গেল।

ও দেখলে গলিপথ কখন প্রশস্ত হয়ে গেছে, সামনে যমদূতের মত দুজন লোক তাদের দুজনেরই হাতে উদ্যত পিস্তল।

সুব্রত তার হাতের টর্চটা জ্বাললে এবং নিঃশব্দে লোক দুটোর মুখের ওপরে প্রতিফলিত করল। শান্ত অবহেলার ভঙ্গিতে লোক দুটি দাঁড়িয়ে আছে। মুখে তাদের কঠোর সংকল্পের নিষ্ঠুর অভিব্যক্তি।

সুব্রত নিরস্ত্র। সম্বল মাত্র জাপানী ছুরিটা! দুটো পিস্তলের কাছে ওটা কিছুই নয়।

সুব্রত চকিতে তার আশেপাশে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে দেখে নিল। সামনের গলিপথটা প্রশস্ত হয়ে গেছে। সামনেই দেখা যায় দুদিককার দেওয়ালে দুটো দরজা। একটার কবাট বন্ধ, অন্যটার খোলা। খোলা কবাটের সামনেই লোক দুটো দাঁড়িয়ে।

তিনজনেই নিস্তব্ধ, নিঝুম। কারও মুখে কোন কথা নেই। যেন একটা বরফের মত ঠাণ্ডা নিস্তব্ধতা—অন্ধকারে কণ্ঠনালী চেপে ধরেছে। সহসা আবার সুব্রত তার টর্চের আলো একজনের মুখের ওপরে প্রতিফলিত করলে। লোকটা হঠাৎ চোখটা বুজে ফেললে মুহূর্তের জন্য। আর সেই মুহূর্তের অবকাশে সুব্রত চোখের পলকে মরিয়া হয়ে বিড়ালের মত নীচু হয়ে বসে পড়ে লোকটার পায়ে এক লাথি মারলে।

লোকটার হাতে টর্চ ছিল। সে হঠাৎ ঐভাবে আক্রান্ত হয়ে একপাশে ছিটকে পড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে একটা আর্ত চীৎকার করে উঠল। লোকটার হাত থেকে টর্চ ও পিস্তলটা ছিটকে পড়ল মাটিতে।

অন্য লোকটা ততক্ষণে সুব্রতর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সুব্রত তাকে জাপানী যুযুৎসুর প্যাচে মুহূর্তে ধরাশায়ী করল।

অন্য লোকটার পায়ে বেশ চোট লেগেছিল। কিন্তু তবু সে উঠে বসেছে। সুব্রত তাকে আক্রমণ করবার সুযোগমাত্র না দিয়ে আবার যুযুৎসুর পাঁচে ধরাশয়ী করলে এবং পরক্ষণেই সে আলো জ্বেলে প্রথমেই পিস্তল দুটো করায়ত্ত করে নিল।

একটা পিস্তলের লোহার বাঁট দিয়ে উঠে বসা লোটারই মাথায় প্রচণ্ড এক আঘাত করতেই লোকটা অস্ফুট কাতর শব্দ করে তখুনি আবার জ্ঞান হারিয়ে ঘুরে পড়ে গেল। দ্বিতীয় লোকটা

তখন উঠে বসে সুব্রতর দিকে পিটপিট করে চাইছে।

সুব্রত লোকটার দিকে এগিয়ে এসে তার মাথায় পিস্তলের নলটা দিয়ে একটা মৃদু খোঁচা দিয়ে ব্যঙ্গ করে বললে, কি হে বন্ধু, কেমন মনে হচ্ছে এখন! লক্ষ্মী ছেলের মত উঠে দাঁড়াও তো দেখি।

লোকটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

শোন সোনার চাঁদ, যা বলব আমি তাই কর তো দেখি। নইলে আমার হাতে পিস্তল—

লোকটা দেখতে যেমন মোটা, তেমনি লম্বা-চওড়া।

মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। মাথায় ঝড়া আঁড়া চুল—বিস্ত, এলোমেলো।

ডান দিককার কপালে একটা গভীর ক্ষতচিহ্ন। চোখ দুটো গোল কুতকুতে। দৃষ্টি নিষ্ঠুর ধারাল ছুরির ফলার মতই। রক্তলালসায় হিংস্র যেন।

পরিধানে সাধারণ কুলিদের মত ময়লা ধুতি ও একটা কোর্তা।

লোকটা তার কুতকুতে দৃষ্টিতে সুব্রতর মুখের দিকে চেয়ে ভারী খনখনে গলায় বললে, কি চাও তুমি?

এই সুড়ঙ্গ থেকে প্রথমে বের হতে চাই। লক্ষ্মী ছেলের মত এখন আমায় বের হবার পথ দেখিয়ে দাও দেখি সোনার চাঁদ!

বেশ, চল। লোকটি অগ্রসর হল।

লোকটার পিছু পিছু সুব্রতও অগ্রসর হল।

প্রায় পাঁচ মিনিট চলার পর দেখা গেল আবার একটা সিঁড়ি।

সুব্রত অগ্রগামী লোকটাকে অনুসরণ করে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল।

সিঁড়িটা গিয়ে শেষ হয়েছে একটা টানা বারান্দায়। বারান্দা দিয়ে খানিকটা এগুবার পর। সামনে দেখা গেল দুটো দরজা। একটা ভোলা, অন্যটা বন্ধ। লোকটা খোলা দরজাটার দিকে না গিয়ে বন্ধ দরজাটা দিকে এগিয়ে চলল।

সুব্রত হঠাৎ থামল। বললে, ঐ খোলা দরজাটা দিয়ে চল।

লোকটা ফিরে দাঁড়িয়ে আগের মতই খনখনে গলায় বললে, না।

সুব্রত ভ্রূ দুটো কুঁচকে সন্দিগ্ধ স্বরে বললে, কেন, না?

লোকটা বললে, এইটাই বাইরে যাবার রাস্তা। বলে সে বন্ধ দরজাটার দিকে আঙুল তুলে দেখাল।

খোলা দরজাটা দিয়ে তাহলে কোথায় যাওয়া যায়?

লোকটা ভারী গলায় জবাব দিলে, অত খোঁজে তোমার দরকার কী? এ বাড়ির বাইরে যেতে চাও—চল বাইরে নিয়ে যাচ্ছি।

উঁহু, আগে আমাকে বলতে হবে ঐ দরজাটা দিয়ে কোথায় যাওয়া যায়! সুব্রত কঠোর স্বরে প্রশ্ন করলে।

বলতে পারব না। লোকটা সমান গলায় জবাব দিলে।

সুব্রত পিস্তলটা উচিয়ে লোকটার দিকে আরও একটু এগিয়ে এল। তারপর তীক্ষ্ণ আদেশের। স্বরে বললে, দেখ সোনার চাঁদ, গোলমাল করে লাভ হবে না। পাশার দান উলটে গেছে। আমার হাতের মুঠোর মধ্যে তোমার মরণ-বাঁচন। আমার কথা না শুনলে মুহূর্তে তোমাকে কুকুরের মত গুলি করে মারতে পারি, তা জান? এসো, ভাল চাও তো লক্ষ্মী ছেলের মত দরজাটা খুলে এগোও।

না।

কিন্তু আমি বলছি, হ্যাঁ। তোমাকে খুলতেই হবে।

খুলব না। তোমার হাতের পিস্তলকে আমি ডরাই না। তাছাড়া মরার থেকে আমরা বেশী ডরাই নেকড়ের থাবা-কে।

সুব্রত ক্ষণকাল যেন কি ভাবলে। হঠাৎ মনে হল, তার মাথার ওপরে কার যেন পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।

এমনি করে প্রতি মুহূর্তে অনিশ্চিত ভাবে আসন্ন বিপদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সময়ক্ষেপ করা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে সুব্রত বললে, বেশ চল, যে রাস্তা দিয়ে যেতে চাও।

লোকটা তখন অগ্রসর হয়ে পকেট থেকে একটা চাবির গোছা বার করে একটা চাবি দিয়ে দরজাটা খট্‌ করে খুলে ফেললে।

দরজাটা খুলতেই একটা ঠাণ্ডা শীতল হাওয়ার ঝলক এসে সুব্রতর চোখেমুখে যেন শান্তি ও আরামের ঝাপটা দিল।

আঃ! সুব্রত একটা আরামের নিঃশ্বাস নিল।

লোকটা দরজা খুলে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে বললে, চলে যাও—সামনেই রাস্তা।

সুব্রত একটু মৃদু হেসে বললে, ধন্যবাদ। কিন্তু বন্ধু, একা একা যেতে আমি রাজী নই। তোমাকেও আমার সঙ্গে কিছুটা পথ যেতে হবে।

আমি আর এক পাও যেতে পারব না। লোকটা দৃঢ়কণ্ঠে জবাব দিল।

কিন্তু আমার হুকুম, তোমাকে আমার সঙ্গে যেতেই হবে।

যদি না যাই?

তবে যাতে যেতে বাধ্য হও সেই চেষ্টাই করা হবে।

লোকটা সুব্রতর কথায় সহসা বাজখাই গলায় হো হো করে হেসে উঠল। তারপর হাসতে হাসতে বললে, কোথায় যেতে হবে কর্তা?

এই খানিকটা রাস্তা—

নিশ্চয়ই থানায়?

খুব সম্ভব।

যাঃ, তুমি কিন্তু ঠাট্টা করছ।

তাহলে তুমি যাবে না?

না।

সহসা আর বাক্যব্যয় না করে সুব্রত বাঘের মত লোকটার ওপরে লাফিয়ে জাপানী যুযুৎসু প্যাচ দিয়ে চেপে ধরল—এইবার।

উঃ, ছাড়ছাড় লাগে। কী ইয়ারকি করছ।

সুব্রত ততক্ষণে পকেট থেকে একটা সিল্কের কর্ড বের করে বেশ করে লোকটার হাত দুটো বেঁধে ফেললে। তারপর উঠে দাঁড়াল—এইবার লক্ষ্মী ছেলের মত চল চাঁদ!

লোকটা সুব্রতর নির্দেশমতো উঠে দাঁড়াল। লোকটা উঠে দাঁড়াতেই সুব্রত লোকটার কোমর থেকে চাবির গোছাটা কেড়ে নিয়ে পকেটে রাখল।

তরপর লোকটার ঘাড়ে জোরে জোরে দুটো ঘুষি মেরে বললে, চল বেটা।

লোকটাকে ধাক্কা দিতে দিতে সুব্রত এগিয়ে নিয়ে চলল।

সামনেই রাস্তা, কিন্তু অন্ধকার।

চারিদিকে একবার চোখ বুলোতেই ও বুঝতে পারলে, এটা চিৎপুর রোড।

তবে যেখান দিয়ে ও ঐ বাড়িতে প্রবেশ করেছিল, এটা সে অংশ নয়। অন্য একটা অংশ।

রাত্রি তখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। পূর্বাশার প্রান্ত ঘেঁষে রাত্রির বিলীয়মান অন্ধকার। প্রথম ভোরের উদীয়মান অস্পষ্ট আলোর চাপা আভাস দিচ্ছে।

রাস্তাঘাট এখনও নির্জন। লোকজনের চলাচল এখনও শুরু হয়নি।

সুব্রত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকাতে তাকাতে লোকটাকে নিয়ে এগুতে লাগল। এমন সময় হঠাৎ ও পিছন ফিরতেই দেখতে পেলে একটু আগে যে দরজাপথে ওরা বের হয়ে এসেছে, সেই দরজার সামনে চারজন লোক অস্পষ্ট ছায়ামূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে।

ও বুঝতে পারলে না যে, লোকগুলো ওদেরই অনুসরণকারী কিনা? কেননা লোকগুলো সহসা অদৃশ্য হয়ে গেল বাড়ির মধ্যে অন্ধকারে।

সুব্রত বোধ হয় সেখান থেকে দশ পাও এগোয়নি, সে আবার কি ভেবে লোকটাকে নিয়ে ফিরে এসে সেই চাবিটা দিয়ে দরজায় তালা বন্ধ করে আবার অগ্রসর হল।

সুব্রতর এখন প্রধান লক্ষ্য আশেপাশে কোন পুলিশ দেখা যায় কিনা। কিন্তু কাউকেই ও দেখতে পেল না।

এমন সময় হঠাৎ একটা ট্যাক্সি ঐদিকে আসছে দেখা গেল। সুব্রত হাতের ইশারায় ট্যাক্সিটাকে দাঁড় করালে।

ট্যাক্সিটা দাঁড়াতেই সুব্রত লোকটাকে নিয়ে ট্যাক্সিতে বসল এবং ড্রাইভারকে লালবাজার থানার দিকে চালাতে বললে।

ট্যাক্সি তীব্রগতিতে ছুটল লালবাজারের দিকে।

কিন্তু হঠাৎ সুব্রতর নজরে পড়ল, ট্যাক্সিটা লালবাজার থানার দিকে না গিয়ে উল্টোপথে ছুটছে!

ব্যাপার কি! ড্রাইভারটা কোথায় গাড়ি নিয়ে চলেছে।

সুব্রত একবার বন্দীর দিকে তাকাল। লোকটা নিঝুমভাবে গাড়ির সীটে হেলান দিয়ে বসে আছে। সম্পূর্ণ নির্বিকার সে।

লোকটাকে কোথাও দেখেছে বলে সুব্রতর মনে হয় না।

আবার সুব্রত রাস্তার দিকে তাকাল। বুঝলে, গাড়ি আবার চিৎপুর রোডের দিকেই চলেছে।

ও তাড়াতাড়ি ড্রাইভারের দিকে ঝুঁকে বললে, এই, কোথায় গাড়ি নিয়ে যাচ্ছিস্? তোকে না লালবাজার থানার দিকে যেতে বলেছিলাম!

ড্রাইভার গাড়ির স্পিড় আরও বাড়িয়ে দিল, সুব্রতর কথায় সে কানই দিল না।

সুব্রত ক্ষিপ্রগতিতে পকেট থেকে পিস্তল বার করে ড্রাইভারের মুখের কাছে নিয়ে বললে, এই ভাল চাস তো গাড়ি থামা। নাহলে তোকে কুকুরের মত গুলি করে মারব শয়তান!

ড্রাইভার গাড়ির গতি আরও দ্রুত করে দিল। কী করবে এখন সুব্রত? এই স্পীডের ওপর। যদি সত্যি সত্যিই ও ড্রাইভারকে গুলি করে, তবে গাড়ি উলটে ওরা সবাই এখুনি মারা যাবে।

এমন সময় হঠাৎ গাড়িটা আবার ধীরে ধীরে থেমে গেল।

সুব্রত গাড়ির ব্যাট থেকে নেমে পিস্তল হাতে ড্রাইভারের সামনে এসে দাঁড়াল।–বেটা শয়তান! এখন তুই যদি আমার কথামত গাড়ি না চালা তো তোকে গুলি করে তোর মাথার খুলি উড়িয়ে দেব!

এমন সময় হঠাৎ সুব্রত দেখলে চারজন যা-যা লোক গাড়ির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সুব্রত দেখলে, আর দেরি করা উচিত নয়। এক লাফে গাড়ির সামনের সীটে ড্রাইভারের পাশে উঠে বসে, হাতের পিস্তলটা ড্রাইভারের কপালে চুঁইয়ে বললে, শিগগির চল লালবাজারের দিকে।

ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিল।

গাড়ি আবার তীব্রগতিতে ছুটে চলল।

এবারে আর ড্রাইভার উলটোপথে না গিয়ে সোজা লালবাজার থানার দিকেই চলল।

গাড়ি যখন লালবাজার থানার গেটের মধ্যে এসে ঢুকল, সুব্রত গাড়ি থেকে নেমে পিছনের দিকের দরজা খুলতে গিয়ে বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গেল। সিট খালি! বন্দী নেই!

গভীর উত্তেজনায় ও গাড়ির মধ্যে উপবিষ্ট বন্দীর দিকে তাকাবারও এতক্ষণ অবকাশ পায়নি।

ও বুঝতে পারলে গাড়ি যখন একটুক্ষণের জন্য থেমেছিল, সেই লোকগুলোই বন্দীকে নিয়ে পালিয়েছে।

রাগে সুব্রতর সর্বশরীর তখন ফুলছে। ড্রাইভারের দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে বললে, চল্ বেটা থানায় চল, আজ তোর শয়তানির আমি শেষ করব।

ড্রাইভারকে নিয়ে সুব্রত সোজা তার অফিসঘরে এসে ঢুকল। চেয়ারের ওপরে বসে ও লোকটার মুখের দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকাল। লোকটার বয়স ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে হবে। জাতিতে শিখ। লম্বা দোহারা চেহারা। মাথায় পাগড়ি। ঢিলে পায়জামা ও পাঞ্জাবি পরনে।

কি নাম তোর?

বলবন্ত সিং।

লোকটা কি করে পালাল?

আমি কি করে বলব সাহেব! আমি তো সামনের সীটে বসেছিলাম!

শোন, এখন আমি তোকে যা-যা জিজ্ঞাসা করব, তার ঠিক ঠিক জবাব যদি না দিস, তবে তোকে এখুনি হাজতে বন্দী করব। আর যাতে দশ বছর তোর শ্রীঘর-বাস হয় তার ব্যবস্থা করব।

সাহেব, আমি কিছু জানি না–গরিব লোক।

এখন বল, ঐ লোকগুলোকে আগে থাকতে তুই চিনতিস কিনা?

আজ্ঞে না সাহেব।

তুই উলটোপথে গাড়ি চালিয়েছিলি কেন?

সাহেব, আমার কোন কসুর নেই। আমি ঐ পথে গাড়ি নিয়ে আসছিলাম, এমন সময় সেই বাড়ি থেকে চারজন লোক বের হয়ে এসে আমাকে দশটা টাকা দিয়ে বললে, এখুনি একজন লোক একটা বন্দীকে নিয়ে ওই পথে আসবে। ওদের নিয়ে উলটোপথে আবার এখানে আসবি। আমি ভেবেছিলাম আপনি ওদেরই লোক। সেই ভেবে আমি গাড়ি উলটোপথে নিয়ে গেছি। আমার কোন কসুর নেই সাহেব।

লোকগুলো দেখে তোর মনে কোন সন্দেহ হয়নি?

না।

ওদের কাউকেই তুই কোনদিন দেখিসনি? চিনতিস্‌ও না?

না, সাহেব। যে লোকটা আমার সঙ্গে গাড়িতে ছিল তাকেও না?

না, সাহেব।

বেশ, আজ সন্ধ্যাবেলা আবার তোকে আমাকে সেখানে নিয়ে যেতে হবে, পারবি?

কেন পারব না সাহেব—খুব পারব!

তোর গাড়ির নং, লাইসেন্স নং, ঠিকানা সব আমাকে দিয়ে হ্যাঁ। আর আজ সারাদিন তুই হাজতে থাকবি। ওখানে আমাকে পৌঁছে দিলে তোর ছুটি।

সুব্রত কলিংবেল টিপল। একজন সার্জেন্ট এসে স্যালুট দিয়ে দাঁড়াল।

এই লোকটাকে হাজতে বন্দী করে রাখ। আর এই গাড়ির লাইসেন্সের নাম্বার আমাকে দিয়ে যাও।

সার্জেন্ট লোকটাকে নিয়ে ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল।

***

সুব্রত যখন আমহার্স্ট স্ট্রীটের বাসায় ফিরে এল, বেলা তখন প্রায় সাতটা।

ভৃত্যকে ডেকে এক কাপ চায়ের আদেশ দিয়ে সুব্রত সোজা গিয়ে তার শয়ন-ঘরে প্রবেশ করল।

বড় ক্লান্ত সে। পরিশ্রমের ক্লান্তিতে সর্বশরীর তখন তার নেতিয়ে পড়েছে।

প্রথমেই সে কাপড়-জামা ছেড়ে স্নানঘরে গিয়ে বেশ ভাল করে মান-পর্ব শেষ করল। তারপর এক কাপ চা খেয়ে সোজা গিয়ে সে শয্যায় আশ্রয় নিল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ঘুমিয়ে পড়ল।

সন্ধ্যা অনেকক্ষণ উতরে গেছে। রাত্রি তখন প্রায় সাড়ে আটটা হবে।

সুব্রত তালুকদারকে কতকগুলো আবশ্যকীয় উপদেশ দিয়ে লালবাজার থানা থেকে বের হল।

আগের রাত্রের ট্যাক্সিতে উঠে ও ড্রাইভারকে গাড়ি চালাতে বললে। ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিল।

সুব্রত আগে থেকেই তার প্ল্যান ঠিক করে রেখেছিল। চিৎপুর রোড ও বিডন স্ট্রীট যেখানে এসে মিশেছে, সেখানে এসে সুব্রত ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললে। গাড়ি থেকে নেমে সুব্রত ড্রাইভারকে বললে, তুমি এখন যেতে পার।

ড্রাইভার সুব্রত দিকে তাকিয়ে বিস্মিতভাবে বললে, সেখানে যাবেন না সাহেব?

না, তুমি যাও।

ড্রাইভার সুব্রতর মুখের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত কি যেন ভাবলে। পরক্ষণেই সুব্রতকে একটা সেলাম দিয়ে গাড়িতে এসে উঠে বসে গাড়ি ছেড়ে দিল উলটোপথে।

গাড়িটা হাত দশ-পনেরো যেতে না যেতেই অন্য একটা ট্যাক্সি এসে সুব্রতর সামনে দাঁড়াল। সুব্রত চকিতে গাড়ির মধ্যে উঠে বসে ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে বললে, পীতাম্বর, quick—ওই আগের ট্যাক্সিটাকে অনুসরণ কর।

পীতাম্বর সুব্রতর নির্দেশমত গাড়ি নিয়ে ওখানে এসে সুব্রতর জন্য অপেক্ষা করছিল। সে সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ছেড়ে দিল।

আগের গাড়িটা সোজা চিৎপুর রোড ধরে গিয়ে মেছুয়াবাজারের মধ্যে দিয়ে নয়া রাস্তার দিকে তখন ছুটছে।

সুব্রতর গাড়ি আগের গাড়িটার পিছু পিছু চলতে লাগল।

সুব্রত দেখতে লাগল, আগের গাড়িটা নয়া রাস্তা ধরে সোজা গিয়ে আবার বিডন স্ট্রীটে। ঢুকল। তারপর বিডন স্ট্রীট দিয়ে চিৎপুর রোডে এসে পড়ল।

চিৎপুর রোডে পড়ে বরাবর সেই বাড়িটার দিকেই এগুতে লাগল। বাগবাজারের কাছাকাছি এসে সহসা গাড়িটা আনন্দ চ্যাটার্জি লেনের মুখে এসে দাঁড়িয়ে গেল।

পীতাম্বরও গাড়ি থামালে।

সুব্রত পীতাম্বরকে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করতে বলে গলির দিকে এগিয়ে গেল। কেননা আগের ট্যাক্সির ড্রাইভার তখন গাড়ি থেকে নেমে গলির মধ্যেই অদৃশ্য হয়েছে।

সুব্রত গলির মধ্যে প্রবেশ করে দেখলে, গলিটা বেশ প্রশস্ত। গলির মাথায় একটা মস্ত বড় পুরাতন বাড়ি। তারই একটি নীচের ঘরে আলো জ্বলছে এবং অনেক লোকের গোলমাল শোনা যাচ্ছে। খোলা দরজার ওপরে একটা সাইন বোর্ড ঝুলছে, চাচার হোটেল।

সুব্রত ইতিমধ্যেই গাড়ির মধ্যে বসে বসে তার বেশভূষার কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে নিয়েছিল। এখন কেউ তাকে দেখলে একজন সাধারণ কুলি শ্রেণীর লোক ছাড়া অন্য কিছু ভাববে না।

সুব্রত গিয়ে চাচার হোটেলে প্রবেশ করল।

ঘরের মধ্যে উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে। মাংস ও পরটার গন্ধ নাকে ভেসে আসে। বেশ প্রশস্ত ঘরখানি। মাঝে মাঝে চেয়ার পাতা। দশ-বারো জন কুলী শ্রেণীর লোক বসে চা ও নানা জাতীয় খাবার খাচ্ছে।

সুব্রত আশেপাশে একটু নজর দিতেই দেখতে পেলে, সেই শিখ ড্রাইভারটা কাউন্টারে উপবিষ্ট একজন মাঝারি বয়সের নাদুসনুদুস লোকের সঙ্গে ফিসফাঁস করে কি সব বলছে।

কাউন্টারের যে খালি চেয়ারটা ছিল, সেটার ওপরে উপবেশন করে সুব্রত এক কাপ চায়ের অর্ডার দিল এবং সঙ্গে সঙ্গে কান খাড়া করে শোনবার চেষ্টা করতে লাগল ওরা কী বলাবলি করছে।

সুব্রত শুনতে পেলে কাউন্টারের লোকটা বলছে, তোর পিছু কেউ নেয়নি তো রে?

না! টিকটিকি ব্যাটা মাঝরাস্তায় নেমে গেল! উঃ, খুব বেঁচে গেছি। শালা আমার সব ভুল নম্বরগুলো নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু কর্তা আজ এখানে আসছে নাকি?

তা বলতে পারি না, তবে তোর প্রাপ্য কুলীর কাছে আছে–চাইলেই পাবি।

একটা ছোকরা এসে এক কাপ চা সুব্রতর সামনে টেবিলের ওপর রেখে গেল।

সুব্রত এতক্ষণে স্পষ্টই বুঝতে পারলে, লোকটা ঐ দলেরই একজন। তাকে ধাপ্পা দিয়েছে। বেমালুম। কিন্তু এখন সে কী করবে? যেমন করে তোক বাড়িটার মধ্যে তাকে আবার ঢুকতে হবে। হাত দিয়ে পকেট অনুভব করে দেখলে চাবির গোছা ঠিক আছে। সুব্রত তাড়াতাড়ি চায়ের দাম মিটিয়ে দিয়ে হোটেল থেকে অন্ধকার গলিপথে বের হয়ে এল।

অন্ধকারে অলক্ষ্যে গলিপথে দাঁড়িয়ে সুব্রত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার বেশ ভাল করে বাড়িটা দেখে নিল।

বাড়িটা অনেকখানি লম্বা। কিন্তু আগাগোড়া বাড়িটার সবটাই অন্ধকার। কোথাও কোন আলোর আভাস পর্যন্ত নেই।

সুব্রত গলিপথ ধরে এগুতে লাগল।

খানিকটা এগুবার পর ও আবার প্রশস্ত চিৎপুর রোডের ওপরে এসে পড়ল। হঠাৎ ও লক্ষ্য করলে, সেই বাড়িটা যার মধ্যে গতকাল রাত্রে প্রবেশ করে ও বন্দী হয়েছিল এবং সামনেই সেই দরজাটা, যেটায় গতকাল রাত্রে নিজহাতে সেই চাবি লাগিয়েছিল।

সুব্রত আর চিন্তামাত্র না করে তখুনি পকেট থেকে গতরাত্রের সেই চাবির গোছাটা বের করে একটু চেষ্টার পরই দরজা খুলে ফেললে।

নিঃশব্দে বাড়িটার মধ্যে প্রবেশ করলে সুব্রত।

অন্ধকার। একটা চাপা ভ্যাপসা দুর্গন্ধে নাক জ্বালা করে। পকেট থেকে টর্চটা বের করে ও। আলো জ্বালালে এবং টর্চের আলোয় ও নিঃশব্দে অগ্রসর হল।

গতরাত্রের সেই বন্ধ দরজাটার কাছে এসে ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেল।

টর্চ হাতে করে সুব্রত সেই দরজাপথে প্রবেশ করে দেখলে একটা খালি আবর্জনাপূর্ণ মাঝারি গাছের ঘর।

আলো ফেলে সুব্রত ঘরের চারপাশ ভাল করে দেখে নিল। আর একটা বন্ধ দরজা ওর নজরে পড়ল—সে দরজাটাও খোলাই ছিল, ঠেলতেই ফাঁক হয়ে গেল।

সামনেই একটা বারান্দা। বারান্দার এক কোণে প্রশস্ত সিঁড়ি ওর নজরে পড়ল। শিকারী বিড়ালের মত নিঃশব্দ পদসঞ্চারে সিঁড়ি বেয়ে ও উঠতে লাগল। সিঁড়ি দিয়ে উঠে সামনেই দেখলে নীচের তলার মতই আর একটি বারান্দা। কোন একটা ঘরের ঈষৎ ভেজানো দরজার ফাঁকে খানিকটা আলোর রশ্মি এসে বারান্দার ওপরে লুটিয়ে পড়ছে।

সুব্রত ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে লাগল পা টিপে টিপে।

যে ঘর থেকে আলো আসছিল তারই পাশের ঘরের দরজাটা খোলাই আছে। কিন্তু ঘরের ভিতর প্রবেশ করে দেখল ঘরটা অন্ধকার। নিঃশব্দে ও ঘরের মধ্যে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

পাশের ঘরে যেন কাদের মৃদু কথাবার্তার শব্দ শোনা যাচ্ছে।

দুই ঘরের মধ্যবর্তী দরজার মাঝে একটা ভারী পর্দা ঝুলছে।

সুব্রত পা টিপে টিপে সেই পর্দার সামনে এসে দাঁড়াল।

ও দেখলে মাঝারি গোছের একখানি ঘর। ঘরের মাঝখানে একটা লম্বা টেবিল পাতা, টেবিলের চারপাশে পাঁচ-ছয়জন লোক বসে। প্রথমেই ও লক্ষ্য করল, গতরাত্রের সেই সুবেশধারী বলিষ্ঠ ঢ্যাঙা লোকটা মাঝখানে বসে আছে। মানকে ও গোবরাও দলে আছে। বাকি দুজনকে ও চিনতে পরলে না। হঠাৎ ও দেখলে একটা ট্রেতে করে ধূমায়িত চায়ের কাপ নিয়ে একটি দশএগারো বছরের মেয়ে ঘরে প্রবেশ করল অন্য দিককার একটি পর্দা সরিয়ে।

মেয়েটার চেহারা অত্যন্ত রু। মুখখানি মলিন বিষণ্ণ। টানা-টানা ছলছল দুটি চোখ। চোখের কোণে কালি পড়ে গেছে। একমাথা রুক্ষ চুল এলোমেলো। দুহাতে একগাছি করে কাঁচের চুড়ি। পরিধানে ময়লা ঘেঁড়া একটি তাঁতের ড়ুরেশাড়ি।– মেয়েটি ট্রে হাতে করে টেবিলের সামনে দাঁড়াতেই সকলে এক এক করে হাত বাড়িয়ে এক একটি চায়ের কাপ তুলে নিতে লাগল!

ঢ্যাঙা লোকটি চায়ের কাপটা ট্রের ওপর থেকে তুলতে গিয়ে মেয়েটি একটু নড়ায় খানিকটা চা চকে লোকটার প্যান্টের ওপর পড়ে গেল। পরক্ষণেই লোকটা চায়ের কাপটা টেবিলের ওপরে নামিয়ে রেখে গর্জন করে উঠলে, হারামদামী, চোখের মাথা খেয়েছিস?

মেয়েটি ভীত-চকিত করুণ দৃষ্টি মেলে ঢ্যাঙা লোকটার মুখের দিকে তাকাল।

একজন মোটা লোক ঢ্যাঙা লোকটার পাশেই বসেছিল, সে উঠে দাঁড়াল। তার মুখখানা তখন রাগে ফুলছে, সে খিটখিটে গলায় বললে, ফের তুই অসাবধান হয়ে কাজ করবি! কতদিন না তোকে সাবধান করেছি, সতর্ক হয়ে কাজ করতে! বলতে বলতে লোকটা এসে মেয়েটির চুলের মুঠি চেপে ধরল—আজ তোরই একদিন কি আমারই একদিন।

ওগো আমায় আর মেরো না গো আমায় আর মেরো না, আর অসাবধান হব না। তোমার। দুটি পায়ে পড়ি। করুণ কান্নায় মিনতিতে মেয়েটির কণ্ঠস্বর গুড়িয়ে গেল।

না, আজ আর তোর রক্ষে নেই। চল বলতে বলতে লোকটা মেয়েটির চুলের মুঠি চেপে ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে সুব্রত সতর্ক হবার পূর্বেই এ ঘরে এসে ঢুকল।

মেয়েটির পিঠে দুম্ করে একটা কিল মারতেই মেয়েটি আর্তস্বরে কেঁদে উঠল।

সুব্রতর সর্বশরীর তখন রাগে ফুলছে। পাশের ঘরের লোকগুলি মেয়েটির করুণ চীৎকার শুনে হা হা করে হাসতে লাগল। আর নয়-সুব্রত বাঘের মতই লাফিয়ে পড়ে লোকটার নাকের ওপরে অন্ধকারেই লক্ষ্য করে এক ঘুষি বসালে। লোকটা অতর্কিতে ঘুষি খেয়ে প্রথমটায় ভয়ানক হকচকিয়ে গেল। কিন্তু সে সতর্ক হবার পূর্বেই সুব্রত একটা প্রচণ্ড লাথি বসাল লোকটার পেটে। একটা গ্যাক করে শব্দ করে লোকটা মুহূর্তে ধরাশায়ী হল।

এ ঘরে ততক্ষণে আলো জ্বলে উঠেছে। লোকগুলো পাশের ঘর থেকে দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সুব্রত এক লাফ দিয়ে মেয়েটিকে নিজের পিছনে টেনে এনে দাঁড়াল তাকে আড়াল করে।

লোকগুলো যেন সুব্রতকে ঐ সময় ঐ ঘরে দেখে বিস্ময়ে একেবারে থ বনে গেছে।

ঢ্যাঙা লোকটাই সর্বপ্রথম কথা বললে, কী করছিস্ তোরা দাঁড়িয়ে! ধর ব্যাটাকে!

মানকে সুব্রতর দিকে এগিয়ে এল, সুব্রতর কঠিন একটা ঘুষি দুম করে লোকটার নাকের ডগায় এসে পড়তেই লোকটা চোখে সর্ষেফুল দেখে। সে বসে পড়ল।

বাকি তিনজন তখন এগিয়ে এসেছে। সুব্রত সমানে ঘুষি চালাতে লাগল আর বিদ্যুৎগতিতে চারপাশে চারকির মত ঘুরতে লাগল। আর একজন ধরাশয়ী হল।

ঢ্যাঙা লোকটা তখন পিছন থেকে এসে সুব্রতকে জড়িয়ে ধরেছে। যুযুৎসুর প্যাচে সে-ও কাবু হল। বাকি ছিল একজন। সে এক লাফে ঘর থেকে বের হয়ে পালাল। সুব্রত তখন চকিতে মেয়েটির হাত ধরে এক হেঁচকা টান দিয়ে সোজা ঘরের বাইরের এসে এপাশ থেকে শিকল তুলে দিল এবং তাড়াতাড়ি বারান্দায় এসে অন্য দরজাটায়ও শিকল তুলে দিল। লোক চারটিকে বন্দী করে সুব্রত সোজা মেয়েটির হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ছুটতে লাগল। এ বারান্দা ও বারান্দা দিয়ে ঘুরে অবশেষে সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। রাস্তায় নামতে ও দেখতে পেলে ওর নির্দেশমত কয়েকজন পুলিস তখন রাস্তার ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের যথাযথ উপদেশ দিয়ে সে পীতাম্বরের ট্যাক্সিতে মেয়েটিকে নিয়ে বসল।

কোথায় যাব, হুজুর?

তাই তো! এখন কোথায় যাওয়া যায়? হোটেলেই প্রথমে যাওয়া যাক, তারপর ভেবে দেখা। যাবে কোথায় যাওয়া যায়। সুব্রত বললে, মমতাজ হোটেল!

গাড়ি মমতাজ হোটেলের দিকে তীব্রগতিতে ছুটল।

এতক্ষণে সুব্রত মেয়েটির দিকে তাকাল।

গাড়ির এক কোণে অত্যন্ত সংকোচে জড়সড় হয়ে মেয়েটি বসে আছে।

দরদভরা কণ্ঠে সুব্রত জিজ্ঞাসা করল, তোমার নাম কী খুকী?

ওরা আমায় ক্ষেন্তী বলে ডাকে। কিন্তু আপনি আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন বাবু? একরাশ উৎকণ্ঠা মেয়েটির কণ্ঠ হতে ঝরে পড়ল।

আমি তোমাকে খুব ভাল জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি, যেখানে কেউ আর তোমাকে কষ্ট দেবে না, কেউ মারবে না।

কিন্তু ওরা, মানকে-গোবরা?

কোন ভয় নেই, তারা তোমার নাগাল পেলে তো!

না না, আমাকে সেখানে রেখে আসুন। আমি আপনার সঙ্গে যাব না। না যাব না—ওরা আমাকে মেরে ফেলবে, কেটে গঙ্গায় ফেলে দেবে!

কেন তুমি ভয় করছ খুকী? ওরা তোমাকে পেলে তো। ওরা টেরই পাবে না কোথায় তুমি আছ।

না না, আপনি জানেন না ওদের—ওরা সব পারে! ওরা আমাকে আবার খুঁজে বের করবেই। সর্দারকে আপনি চেনেন না।

দেখলে না, তাদের আমি ঘরে বন্ধ করে রেখে এলাম! এতক্ষণে তাদের জেলে ধরে নিয়ে গেছে আমার লোকেরা। তারা সব জেলে বন্ধ হয়ে থাকবে, কেমন করে তারা তোমাকে খুঁজে পাবে!

না না, তারা ধরা পড়বে না। সর্দারকে কেউ কোনদিন ধরতে পারেনি। কতবার সে জেলে গেল, আবার পালিয়ে এসেছে যেন কেমন করে। সর্দার বলে, জেলে তাকে কেউ আটকে রাখতে পারে না।

সুব্রত নানাভাবে মেয়েটিকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। এমনসময় গাড়ি এসে মমতাজ হোেটলের সামনে এসে দাঁড়াল।

সুব্রত মেয়েটির হাত ধরে সোজা নিজের ফ্ল্যাটে গিয়ে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।

মেয়েটি সুব্রতর দরদপূর্ণ সাদর ব্যবহারে বিস্ময়ে একেবারে হকচকিয়ে গেছে। এ শুধু অজানিতই নয়, অভাবিতও।

সে তো কোনদিনই কারও কাছে এতখানি মধুর ব্যবহার পায়নি। তার শিশুচিত্তের ব্যথা বেদনাতে কেউই তোদরদের সোনার কাঠি ছোঁয়ায়নি।

যেদিন থেকে তার সামান্য জ্ঞান হয়েছে, ও পেয়ে এসেছে শুধু নিষ্ঠুর কঠিন ব্যবহার। পেয়েছে শুধু উঠতে-বসতে, খেতে-শুতে তিরস্কার আর তিরস্কার। নিত্য প্রহার আর শত লাঞ্ছনার অশ্রুজলে তার প্রতিটি দিনরাত্রির কাব্যখানি ভরা।

তার অন্ধকারময় জীবনযাত্রাপথে কেউ তো মণিদীপ জ্বেলে সান্ত্বনার প্রলেপ বুলোয়নি।

তাই তো আজ সুব্রতর ব্যবহারে ওর সদা-শঙ্কিত শিশুচিত্ত বিস্ময়ে কেমন আত্মহারা হয়ে গেছে।

ঐ চেয়ারটায় বসো খুকী!

মেয়েটি কিন্তু চেয়ারে বসল না। তার মলিন ছিন্ন বেশভূষার দৈন্য যেন এই সুখ-ঐশ্বর্যের– মণিকোঠায় তাকে আরও বেশি কুণ্ঠিত করে ফেলেছে। সে নীরবে মাথা হেলিয়ে বসতে অস্বীকার করে বললে, আমার নাম ক্ষেন্তী। ওরা মাঝে মাছে আমাকে পেত্নী বলেও ডাকত।

সুব্রত এবারে হাত ধরে এনে মেয়েটিকে একখানা সোফার ওপরে বসিয়ে দিল।

মেয়েটি যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও অত্যন্ত সংকোচের সঙ্গে জড়োসডো হয়ে বসল। কুণ্ঠাতে যেন তার রুগণ দেহখানি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে যেতে চায়।.চিরকাল সে দাঁড়িয়ে থেকেছে।

রাত্রে স্যাতস্যাতে অন্ধকার ঠাণ্ডা ঘরের মেঝেতে আরশোলা ও ইদুরের সঙ্গে মিতালি পাতিয়ে একটা ছেড়া চটের ওপরে শুয়ে শুয়ে রাতের পর রাত কাটিয়েছে।

এই বিলাস-ঐশ্বর্যের প্রাচুর্য তার স্বপ্নের অগোচরে ছিল চিরদিন। চোখের কোল দুটি তার অকারণেই যেন জলে ভরে আসতে চায়।

কেন যেন খালি কান্না পাচ্ছে। একটা অহেতুক ভয়, একটা অজানিত আশঙ্কা যেন তার সমগ্র শিশুচিত্তটিকে সন্দেহের দোলায় দোলাচ্ছে।

কী করবে ও? উঠে পালিয়ে যাবে?

ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে না তো ও? যেমন করে মাঝে মাঝে রাত্রে সেই ছেড়া ময়লা চটের ওপরে একা একা শুয়ে স্বপ্ন দেখেছে কী সুন্দর তার চেহারা। লালপেড়ে শাড়ি পরা, মাথায় ঘোমটা, ঘোমটার আড়ালে মমতাভরা দুটি চোখের সকরুণ চাউনি। ধীরে ধীরে তিনি এসে ওর শয্যার পাশটিতে বসেছেন। তার নরম ঠাণ্ডা হাতখানি ওর আতপ্ত কপালের ওপরে গভীর স্নেহে ন্যস্ত করেছেন। মা-মাগো! তোমায় যে কেবলি মা বলে ডাকতে ইচ্ছে করে মা। কেবলই আসো তুমি ঘুমের ঘোরে। জেগে উঠলে কেন তোমাকে দেখতে পাই না? কেন পাই না তোমাকে খুঁজে? কোথায় তুমি লুকিয়ে থাক? কোন্ রহস্যের পরপারে? কোন স্বপ্নের সোনার পালঙ্কে থাক তুমি ঘুমিয়ে? সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে ঐ দুর্দান্ত লোকগুলোর কথা। তাদের নিষ্ঠুর ব্যবহার, তাদের গালাগালি, তাদের চিৎকার। মার খেয়ে খেয়ে ওর সমস্ত দেহে ব্যথা হয়ে গেছে। শিউরে উঠে ও চোখ বুজে ফেলল। ও যেন শুনতে পাচ্ছে তারা চিৎকার করে বলছে, ক্ষেন্তী হারামজাদী, আজ তোকে মেরে খুন করবো!

সুব্রত কলিং বেল বাজিয়ে বেয়ারাকে ডাকল।

বেয়ারা এসে সেলাম জানাল।

দুজনের খাবার নিয়ে এসো–কী খাবে তুমি খুকী?

মেয়েটি কাতর দৃষ্টি তুলে সুব্রতর মুখের দিকে তাকাল।

কী খাবে? রসগোল্লা? সন্দেশ?

রসগোল্লা। সেটা কী?–মেয়েটা বোকার মতই যেন প্রশ্ন করলে।

সুব্রত বেয়ারাকে দোকান থেকে কিছু ভাল ভাল খাবার আনতে বললে। আরও বললে, ঘণ্টাখানেক বাদে ম্যানেজারকে ডেকে দিতে।

বেয়ারা সেলাম দিয়ে চলে গেল।

শোন খুকী, ক্ষেন্তী ছাড়া তোমার আর কোন নাম নেই?

মেয়েটি সুব্রতর প্রশ্নে আবার মুখ তুলে তাকাল।অনেকদিন আগে আমার একটা পুরোনো নাম ছিল।

কী নাম তোমার মনে নেই?

আছে। বাবলু।

বাবলু! বাঃ কী সুন্দর নাম।

কিন্তু ওরা তো আমাকে ও নামে ডাকত না। মেয়েটি ভয়ে ভয়ে বললে।

তা হোক, এখন থেকে তোমাকে সবাই ও-নামেই ডাকবে।

কেউ আমাকে ও নামে ডাকে না, ও নামটা আমি ভুলেই গেছি। কিন্তু মাঝে মাঝে রাত্রে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখেছি, কে যেন ঐ নামে চুপি চুপি কেবলই ডাকছে-বাবলু, সোনামণি! মেয়েটির চোখের কোল দুটি ছলছলিয়ে এল।

কতদিন তুমি ওদের ওখানে আছ, বাবলু? মনে পড়ে তোমার?

না—তা অনেক দিন। অনেকদিন আগে একদিন আমার মনে পড়ে আমি ঘুমিয়েছিলাম মার কাছে। জেগে উঠে দেখি ওদের বাসায় আমি কখন এসে গেছি। কত কাঁদলাম মা-মা করে, কিন্তু মা আর এল না, আর মাকে খুঁজে পেলাম না। ওই মোটা লোকটা—যে আমাকে মারছিল না, ওর নাম অবু সর্দার, ওকে অবু বলে ডাকে। অবু বললে : আমি একটা পেত্নী, পেত্নীর মা থাকে না। আমার মা কোনদিনই ছিল না।

অবু মিথ্যা কথা বলেছে বাবলু। তোমার মা নিশ্চয়ই আছেন। আমরা তাঁকে খুঁজে বের করবো। তুমি কিছু ভেবো না, কেমন?

সহসা বাবলুর মলিন মুখখানা যেন একটু আনন্দের খুশিতে ঝলমল করে ওঠে। সে ব্যগ্রকণ্ঠে বললে, সত্যি পারবেন? সত্যি আমার স্বপ্নের মাকে খুঁজে দেবেন? আপনাকে তাহলে আমি খুব ভালবাসব। আপনার সব কথা শুনবো। আপনার সব কাজ করে দেবো।

না, বাবলু। আমার জন্য তোমায় কিছু করতে হবে না। তুমি শুধু আমাকে ভালবেসো। আমি তোমার মাকে নিশ্চয়ই খুঁজে দেবে। কিন্তু যখন তুমি তোমার মাকে পাবে, আমাকে ভুলে যাবে না তো?

আপনাকে ভুলে যাব! না, কোনদিনও না। আপনি এত ভাল! আপনাকে আমি কি বলে ডাকব, বাবু?

জানো বাবলু, আমার ছোট বোন নেই তুমি আমার বোন হবে? আমাকে দাদা বলে ডাকবে?

হ্যাঁ, আপনি আমার দাদা।

দাদাকে তুমি ভালবাসবে তো বাবলু?

হ্যাঁ, খুব ভালবাসবো।

জানো বাবলু, আমার মা নেই।

আহা, আপনার নিশ্চয়ই তাহলে আমার মতই কষ্ট।

হ্যাঁ, কিন্তু আমার নিজের মা না থাকলেও আর একজন মা আছেন।

এমন সময় বেয়ারা ট্রেতে করে নানাপ্রকারের লোভনীয় খাবার নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল!

বাবলু, তোমার নিশ্চয়ই খুব ক্ষিদে পেয়েছে! তুমি তো কিছু খাওনি এস দুজনে খাওয়া যাক।

সুব্রতর কথায় বাবলু যেন সহসা অত্যন্ত সস্ত্রস্ত ও বিব্রত হয়ে উঠলো, না না, আমার এখন ক্ষিদে পায়নি দাদা। তাছাড়া রোজ রাত্রে তো আমি খেতাম না! আপনি খান দাদা।

তা কি হয় ভাই, এসো, আমরা দুজনে একসঙ্গে বসে খাব।

সুব্রত সস্নেহে বাবলুকে নিজের পাশে সোফার ওপরে এনে বসাল।

আমার কাপড়জামা ময়লা, দাদা। আপনার সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

তুমি কিছু ভেবো না বাবলু। আমার অনেক আছে। এস এখন খাওয়া যাক।

সুব্রত একটা রসগোল্লা বাবলুর ত্রস্ত কুণ্ঠিত হাতখানার ওপরে তুলে দিল, নাও, খাও। ধীরে। ধীরে অতি সংকোচের সঙ্গে বাবলু খেতে শুরু করে।

কেমন লাগছে খেতে বাবলু?

খুব ভাল।

সুব্রত ধীরে ধীরে বাবলুর সংকুচিত ভীত শিশুচিত্তকে নিজের সস্নেহে ব্যবহারে নিজের দিকে টেনে নিতে লাগল। একটু একটু করে তার মনের বিশ্বাস আনতে লাগল। সুব্রত স্পষ্টই বুঝতে পারছিল, বাবলুর শিশুচিত্তের মধ্যে এমন একটা সংকোচ ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে যেটা দূরীভূত করতে সময়ের প্রয়োজন। আজ তার কাছ থেকে ও যা ব্যবহার পাচ্ছে, এ শুধু তার কাছে অসম্ভবই নয়, অভাবিত। স্নেহ ও দরদ দিয়ে ওর শিশুচিত্তকে জয় করতে হবে। অল্পে অল্পে বাবলু যে তার স্নেহের সিঞ্চনে পুনর্জীবিত হয়ে উঠেছে তাতেও কোন সন্দেহ নেই।

খাওয়া হয়ে গেল। সুব্রত বাথরুমে হাতমুখ ধুতে গেল।

হাতমুখ ধুয়ে ফিরে এসে ও দেখে বাবলু সযত্নে উচ্ছিষ্ট প্লেটগুলো নিয়ে বাথরুমের দিকে চলেছে।

ও কি! বাবলু ওসব এঁটো প্লেট নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?

এগুলো ধুতে হবে না দাদা। ধুতে নিয়ে যাচ্ছি।

ছি ছি, ওসব নোংরা কাজ তোমার না রেখে দাও, রেখে দাও, এখুনি বেয়ারা এসে নিয়ে যাবে।

ভয়চকিত দৃষ্টিতে বাবলু সুব্রতর মুখের দিকে তাকাল, কেন দাদা? আপনি কি আমার উপরে কোন রাগ করেছেন? ওদের ওখানে সব বাসনপত্র তো আমিই ধুয়ে রাখতাম। তাড়াতাড়ি না ধুলে তারা মারত। তবু খেতে দিত না আমাকে।

বাবলুর কথা শুনে সুব্রতর চোখে জল এসে যায়, সে কোনমতে অশ্রু গোপন করে মৃদু সস্নেহ কণ্ঠে বললে, না ভাই, এখন তো আর তুমি তাদের ওখানে নেই। আমার এখানে ওসব নোংরা কাজ একেবারেই করতে হবে না। রেখে দাও এগুলো নামিয়ে। যাও, হাত-মুখ ধুয়ে এস।

বাবলু একবার কাতর দৃষ্টিতে সুব্রতর মুখের দিকে চেয়ে বাথরুমের দিকে চলে গেল, ট্রেটা আবার মাটিতে নামিয়ে রেখে।

সুব্রত এসে আবার সোফায় বসে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজলো।

এই মেয়েটি কে? কার মেয়ে? কেমন করে মেয়েটি ঐ গুণ্ডার দলে জড়িয়ে গেল? মেয়েটির আসল পরিচয় কী? কোথায় বাড়ি? নানা চিন্তা একসঙ্গে ওর মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল।

হঠাৎ একটা কথা ওর মাথায় বিদ্যুৎ-চমকের মত এসে উদয় হয়। অদ্ভুত চিঠিটার অনুসন্ধান করতে লোকগুলো তার ফ্ল্যাটে হানা দিয়েছিল এবং তাদেরই অনুসরণ করতে গিয়ে ও শেষ পর্যন্ত ঐ গুণ্ডার দলে গিয়ে পড়ে। সেইখানেই আশ্চর্যভাবে মেয়েটিকে পাওয়া গেল। তবে কি মিঃ সরকারের হত্যার সঙ্গে মেয়েটির জীবনের কোন সূত্র পাক খেয়ে আছে?

প্রথম থেকে আগাগোড়া ব্যাপারটা সমালোচনা করলে স্পষ্টই এখন বোঝা যায়, মিঃ সরকারের মৃত্যুর সঙ্গে প্রকাণ্ড একটা জটিল রহস্য পাকিয়ে আছে। ব্যাপারটা যতখানি ও সহজ ভেবেছিল ঠিক ততখানি সহজ তো নয়ই, বরং বেশ কিছু গোলমেলে ও জটিল।

পর পর দুটো দিন ও নানাভাবে এত ব্যস্ত রয়েছে যে কিরীটীর সঙ্গে গিয়ে বর্তমান কেসটা সম্পর্কে যে একটা ভোলাখুলি আলোচনা করবে তার সময় পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না। তারপর যে চারজন লোককে ও সেই বাড়িতে বন্দী করে পুলিসের হেফাজতে তুলে দিয়ে এসেছে, কাল সর্বাগ্রে তাদের নাড়াচাড়া করে দেখতে হবে। হয়তো বা সেদিক থেকেও কোন সূত্রের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।

কিন্তু তার সন্দেহ যদি সত্যই অমূলক হয়, তবে সর্বাগ্রে যেমন করেই হোক বাবলুকে একটি বিশেষ নিরাপদ স্থানে রেখে আসা দরকার। কিন্তু কোথায় সে বাবলুকে রাখতে পারে? হোটেল তো সে বর্তমানে ছেড়েই দেবে। কেননা গত রাতের ব্যাপারে ও স্পষ্টই বুঝতে পেরেছে। হোটেলের ম্যানেজারকে ওরা হাত করেছে। ম্যানেজারকে আর বিশ্বাস করা চলে না। নিজের আমহার্স্ট স্ট্রীটের বাসায় নিয়ে যাবে? বাড়িতে এক রাজুর মা। বাকি সব বেশির ভাগ সময় বাইরে বাইরে থাকে। গুণ্ডার দলের কিছুই অসাধ্য নেই। মেয়েটিকে সত্যিই যদি তাদের প্রয়োজন থাকে, তবে যে কোন সময় চুরি করে নিয়ে যেতে পারে। কিরীটীর ওখানে রাখবে? না, তাও সম্ভব নয়। তবে কোথায় রাখা যেতে পারে? কোথায় মেয়েটি নিরাপদে থাকবে? হা ঠিক মনে পড়েছে। নিশীথের বোন অমিয়াদি শ্যামবাজারে থাকেন। তারও দুটি-তিনটি ছেলেমেয়ে আছে। ঠিক, অমিয়াদির বাসাতেই আপাতত এখন বাবলুকে কিছুদিন রাখাই সর্বাপেক্ষা যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। তাছাড়া বাবলুকে যদি অমিয়াদির বাসাতেই রাখা যায়, তবে গুণ্ডার দল হয়তো ওর সন্ধান সহজে নাও পেতে পারে। সুব্রতর আঙ্গুলো তো ওদের জানা থাকাই বেশী সম্ভব। বাবলুকে অমিয়াদির ওখানে কিছুদিন রাখতে হবে।

চিন্তার স্রোতে সুব্রত ভেসে চলেছিল, বাবলুর কথা ওর মনেই ছিল না। হঠাৎ চোখ মেলে চাইতেই দেখলে সামনে দাঁড়িয়ে বাবলু ভীরু দৃষ্টি মেলে এই দিকে তাকিয়ে আছে।

সুব্রত ব্যস্ত হয়ে উঠল।—এ কি বাবলু তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন? বোসো।

আপনি তো আমাকে বসতে বলেননি দাদা!

বোসো, বোসো।

বাবলু এবার সোফাটায় বসল সংকুচিতভাবে।

শোন বাবলু, আমি তোমাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করব। যতটা তুমি জান, সব জবাব তুমি আমাকে দেবে, কেমন?

বলুন।

আচ্ছা বাবলু, তোমার মনে পড়ে কতদিন তুমি ওদের সঙ্গে আছ?

কার—অবুর কাছে?

হ্যাঁ।

অনেক দিন। ঠিক কতদিন তা আমার মনে নেই দাদা, তবে অনেক দিন।

আচ্ছা ঐ যে ঢ্যাঙা লম্বা লোকটা, যার গায়ে তুমি রাত্রে চা ফেলে দিয়েছিলে, তার নাম কী জান?

ওকে সবাই সর্দার বলে ডাকে। তবে মাঝে মাঝে সিংহ যখন আসত, ওকে বঙ্কা বলে ডাকতে দুএকবার শুনেছিলাম।

সিংহ! সে আবার কে?

সিংহ—তাকে আপনি চেনেন না? সবাই তাকে খুব ভয় করে। জানেন, সর্দারও তাকে ভয় করে। সিংহ তো কারও সঙ্গে কথা বলে না। যখন সক্কলে বাড়ি থেকে চলে যায়, অনেক রাত্রে সিংহ তখন আসে। তখন কেউ বাড়িতে থাকে না। আমি দুদিন লুকিয়ে লুকিয়ে সিংহকে দেখেছি। আমি নীচে যে ঘরটাতে থাকতাম, রাত্রে সিংহ তার পাশের ছোট ঘরটায় এসে সর্দারের সঙ্গে কি সব কথাবার্তা বলতো।

বাবলুর কথা শুনে সুব্রতর কৌতূহল যেন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল। সে গভীর আগ্রহে বাবলুর কথা শুনতে লাগল।

তুমি সিংহকে দেখেছ বাবলু? সে কেমন দেখতে? আবার দেখলে তাকে তুমি চিনতে পারবে?

না, যে দুবার তাকে দেখেছি, তার মুখে একটা কালো রংয়ের মুখোশ ছিল। লোকটা দেখতে কিন্তু জোয়ান আর খুব লম্বা।

তাদের কথাবার্তা কিছু তোমার মনে আছে বাবলু?

সব কথা তো ওদের শুনতে পারিনি। সর্দারকে আমার বড্ড ভয় করে। একদিন শুধু…

হঠাৎ বাবলু যেন সন্ত্রস্তভাবে সুব্রতর মুখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল।

কি, থামলে কেন? বল কি শুনেছিলে—বল!

আপনি কাউকে বলে দেবেন না তো দাদা? সর্দার শুনতে পেলে কিন্তু ঠিক আমাকে মেরে ফেলবে! কেটে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেবে।

তোমার কোন ভয় নেই ভাই, তুমি বল কাউকে আমি বলবো না। তাছাড়া তোমাকে এমন জায়গায় আমি রেখে আসব, কেউ তোমার সন্ধান পাবে না।

কয়েকদিন আগে আমি আমার ঘরে শুয়ে ঘুমিয়ে আছি। হঠাৎ পাশের ঘরে কথাবার্তার শব্দ শুনে আমার ঘুম ভেঙে গেল। তাড়াতাড়ি পা টিপেটিপে উঠে দুই ঘরের মাঝখানে যে জানালাটা বন্ধ থাকত, সেখানে গিয়ে কান পেতে দাঁড়ালাম। জানালাটার একটা কপাট ফাটা। সেই ফাটা দিয়ে পাশের ঘরের সব কিছু দেখা যেত। দেখলাম ঘরের মধ্যে তিনজন আছে, সর্দার, সিংহ, আর একজন ভদ্রলোক। ভদ্রলোককে কোনদিনও আমি দেখিনি, তাই চিনতে পারলাম না। তাছাড়া ভদ্রলোক জানালার দিকে পিছন ফিরে বসে ছিল। তাদের দুএকটা কথা শুনে বুঝলাম, তারা আমার কথা নিয়েই আলোচনা করছে। শুনলাম সিংহ ভদ্রলোকটিকে বলছে, তোমার কোন ভয় নেই, কেউ ও মেয়ের সন্ধান পাবে না। কেউ জানবে না যে, এইখানে এ বাড়িতে বষ্কার কাছে লুকানো আছে। কিন্তু টাকা ত্রিশ হাজার চাই। ভদ্রলোক তার উত্তরে বললেন, বেশ, ত্রিশ হাজারই পাবে। মেয়েটার কোন অযত্ন হচ্ছে না তো? সর্দার বললে, আপনি পাগল হয়েছেন! ভদ্রলোক বললেন, উঃ, ঐ মেয়েটাই আমার কাল।

তারপর?

তারপর তারা টাকা সম্পর্কে আরও কী বলাবলি করলে। তারপর সবাই চলে গেল।

ভদ্রলোকের নাম কিছু শোননি?

না।

সুব্রত এতক্ষণে বুঝলে, তার সন্দেহ একেবারে অমূলক নয়। এই হতভাগ্য মেয়েটির জীবনের সঙ্গে একটা জটিল রহস্য জড়িয়ে আছে। এবং খুব সম্ভব সেই রহস্যের সঙ্গে হয়ত মিঃ সরকারের হত্যারও কোন যোগাযোগ আছে।

এমন সময় বন্ধ দরজার গায়ে নক শোনা গেল।

কে?

আমি কামতাপ্রসাদ।

ভিতরে আসুন।

কামতাপ্রসাদ ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে সুব্রতকে নমস্কার জানাল।

সুব্রত বললে, আপনাকে ডেকেছিলাম ম্যানেজার সাহেব। আমি কাল থেকে আপনার হোটেলের ফ্ল্যাট ছেড়ে দেব। আপনার বিলটা পাঠিয়ে দেবেন।

ম্যানেজার সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন। কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, হঠাৎ ফ্ল্যাট ছেড়ে দেবেন কেন মিঃ রায়? কোনরকম অসুবিধা…

না, ধন্যবাদ। এখানে থাকার আর আমার দরকার নেই, তাই ছেড়ে দিচ্ছি।

আচ্ছা আপনি যেতে পারেন। বিলটা পাঠিয়ে দেবেন। নমস্কার।

অগত্যা ম্যানেজারকে নমস্কার জানিয়ে বিদায় নিতে হল।

সুব্রত উঠে দরজাটায় খিল দিয়ে আবার সোফায় এসে বসল।

সুব্রত ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখলে, রাত্রি প্রায় সাড়ে এগারোটা। এবারে শোওয়া দরকার। কাল সকালে অনেক কাজ। এখন কিছু বিশ্রামের একান্ত প্রয়োজন।

বাবলু, তোমার ঘুম পায়নি?

না, দাদা। আজ কেন যেন আমার একটুও ঘুম পাচ্ছে না। আপনার মত কেউ আগে আমার সঙ্গে এত ভাল করে কথা তো বলেনি। কেউ তো আগে আমাকে এত আদর করেনি, এত ভালবাসেনি।

তুমি যে আমার ছোট বোন। তোমাকে কি আমি ভাল না বেসে থাকতে পারি ভাই।

আমাকে আপনি কখনও বকবেন না, দাদা?

না, তুমি আমার লক্ষ্মী বোন। রাত্রি অনেক হল, এবার আমরা ঘুমাব। এই ঘরে ঐ বিছানায় তুমি শোও। আমি এই সোফাটার ওপরে শোব।

না, না, দাদা আপনি খাটের ওপরে বিছানাটায় শোন। আমি মাটিতেই ঐ পাশের ঘরে শোব।

দূর পাগলী, তা কি হয়! মাটিতে কি কেউ শোয় নাকি! অসুখ করবে ঠাণ্ডা লেগে।

কেন দাদা, আমি তো রোজ মাটিতেই শুতাম। কখনও আমার অসুখ করেনি। কখনও আমি খাটের বিছানায় শুইনি।

তবে আর কি, আজ প্রথম শোও। এবার থেকে তো তুমি খাটেই শোবে। যাও, লক্ষ্মী মেয়ের মত এবার গিয়ে শুয়ে পড়।

তবু যেন বাবলুর সংকোচ যায় না। সে ইতস্তত করে।

কই যাও, শুয়ে পড়! রাত অনেক হয়েছে–যাও।

আমার ময়লা কাপড়জামা। আপনার সুন্দর বিছানা একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে দাদা।

আরে পাগলী, তাতে কী হয়েছে। আবার বোপর বাড়ি দিয়ে কাচিয়ে নিলেই হবে, যাও।

এবারে আর বাক্যব্যয় না করে ধীরে ধীরে বাবলু গিয়ে সুব্রতর শয্যায় শুয়ে পড়ল।

সুব্রত কিন্তু তখনও ঘরের মধ্যে অস্থিরভাবে পায়চারি করে বেড়াচ্ছে। অসংখ্য চিন্তা। একটার পর একটা কেবলই যেন তার মাথার মধ্যে এসে জট পাকাচ্ছে।

একসময় সুব্রতর ঘরের উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে নীল আলোটা জ্বেলে দিল।

ধীরে ধীরে সুব্রত শয্যার পাশে এসে দাঁড়াল।

নিভাঁজ নিখুঁত পরিষ্কার শয্যার ওপরে বাবলু ঘুমিয়ে পড়েছে। বেচারী একান্ত সংকোচের সঙ্গে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে।

নীল মৃদু আলোয় ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে দুঃখ-তাপক্লিষ্ট অভাগা মেয়েটির মুখখানি। রুক্ষ মলিন চুলগুলি স্তি, এলোমেলো ভাবে উপাধানের ওপরে বিক্ষিপ্ত।

ছিন্ন মলিন শাড়িখানি দিয়ে সর্বাঙ্গ ঢেকে নিয়েছে।

ধীরে ধীরে গভীর স্নেহে সুব্রত তার হাতখানি বাবলুর কপালের ওপরে রাখল। আহা বেচারী, কার স্নেহের দুলালী—ভাগ্যের স্রোতে বিড়ম্বিতা!

সুব্রতর চোখে জল এসে গেল।

অনেক রাত্রে সুব্রত ঘুমিয়েছিল। ঘুম ভাঙল যখন, প্রভাতের রৌদ্র খোলা জানালাপথে ঘরে এসে ঢুকেছে।

হঠাৎ ওর নজরে পড়ল, বাবলু সুব্রতর জুতোজোড়ায় একমনে কালি দিচ্ছে।

ও কি হচ্ছে বাবলু?

দাদা, আপনার জুতোটা ময়লা হয়ে গিয়েছিল। তাই পরিষ্কার করে রাখছি।

আরে পাগলী মেয়ে, থাক্ থাক্‌—তুমি এদিকে আমার কাছে এস তো।

সসংকোচে বাবলু এসে সুব্রতর পাশটিতে দাঁড়াল। সুব্রত সস্নেহে হাত দিয়ে জড়িয়ে বাবলুকে আরও কাছে টেনে আনল। কাল রাত্রে খুব ঘুমিয়েছ, না বাবলু?

হ্যাঁ।

তোমার খিদে পায়নি? চা খাবে না?

চা তো আমি খাই না, দাদা। তাছাড়া, সকালে কিছুই খাই না আমি।

কিন্তু এবার থেকে রোজ সকালে তোমাকে কিছু খেতে হবে।

বেশ, আপনি যখন বলছেন খাব।

সুব্রত কলিং বেল টিপে বেয়ারাকে ডেকে জলখাবার ও চা আনতে বলে বাথরুমে গিয়ে প্রবেশ করল। প্রত্যহ ভোরে স্নান তার বহুদিনের অভ্যাস।

স্নান সেরে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে সুব্রত ঘরে ঢুকে দেখল, রেডিওটার সামনে দাঁড়িয়ে বাবলু কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যন্ত্রটার দিকে।

সুব্রত এগিয়ে এল, এটা কি জান, বাবলু?

না তো!

এটা রেডিও, বেতার যন্ত্র। এতে গান শোনা যায়। শুনবে গান?

আমি গান খুব ভালবাসি দাদা। আমি যখন খুব ছোট ছিলাম, রোজ রাত্রে মা আমাকে গান গেয়ে ঘুম পাড়াতেন। বাবলুর চোখ দুটি ছলছলিয়ে এল।

সুব্রত সুইচ টিপে রেডিওটা চালিয়ে দিল!

রেডিওতে কল্পনা গুপ্তার গান হচ্ছে–রবীন্দ্র সংগীত।

বেয়ারা ট্রেতে করে চা ও খাবার নিয়ে এল।

খেতে খেতে সুব্রত বললে, প্রথমে আমরা দোকানে যাব বাবলু। সেখান থেকে তোমার জামাকাপড় কিনে তারপর তোমাকে এক দিদির বাড়িতে নিয়ে যাব। এখন কিছুদিন সেখানেই তুমি থাকবে, যতদিন না তোমার মাকে খুঁজে পাই, কেমন?

থাকব!

বেয়ারা ডিকাপগুলো নিয়ে গেল। সুব্রত ম্যানেজারকে পাঠিয়ে দিতে ও একটা ট্যাক্সি ডেকে আনতে বললে।

কিছুক্ষণ পরে ম্যানেজার ঘরে এসে প্রবেশ করলেন, হাতে তার বিল।

সুব্রত বিলের টাকা মিটিয়ে দিয়ে বললে, দুপুরের দিকে আমার নোক এসে আমার জিনিসপত্র নিয়ে যাবে।

ম্যানেজার টাকা নিয়ে চলে গেল।

ট্যাক্সি হোটেলের নীচেই অপেক্ষা করছিল। সুব্রত বাবলুকে নিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে বসল। কমলালয়ের সামনে ট্যাক্সি থামিয়ে বাবলুকে সঙ্গে করে দোকানের মধ্যে গিয়ে প্রবেশ করল সে।

সুব্রত একজন সেলারকে ডেকে বলল, এর গায়ের মাপে বেশ ভাল ফ্রক ও জামা দিন। একে ঘরের ভিতরে নিয়ে গিয়ে জামা পরিয়ে দিন। আরও তিন-চার সেট ভাল ভাল জামাকাপড় দেবেন।

বাবলু যখন আবার সুব্রতর সামনে এসে দাঁড়াল, তখন তাকে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছিল। মলিন শতচ্ছিন্ন বেশভূষার দৈন্যে তার যে স্বাভাবিক রূপ ঢাকা পড়ে ছিল, এখন সুন্দর বেশভূষায় তা যেন শতদলের মতই বিকশিত হয়ে উঠল।

ফিকে নীল রংয়ের সুন্দর একখানা ফ্রক। পায়ে সাদা মোজা, সাদা জুতো, মাথায় লাল রিবন। বাবলু সলজ্জ কুণ্ঠিত হাসিতে সুব্রতর মুখের দিকে তাকাল।

সুব্রত বললে, বাঃ, এই তো আমাদের বাবলুরাণী! এইবার চল দিদির বাসায় যাই।

অন্যান্য কাপড়গুলি কাগজের বাক্সে দোকানদার সুব্রতর সামনে এনে রাখলে।

দাম মিটিয়ে দিয়ে সুব্রত বাবলুর হাত ধরে ট্যাক্সিতে এসে উঠে বসল, চল শ্যামবাজার।

ট্যাক্সি শ্যামবাজারের দিকে ছুটে চলল।

***

অমিয়াদির স্বামী ডাঃ অচিন্ত্য বোস কলকাতার মধ্যে একজন বিশেষ নামকরা ডাক্তার। শ্যামবাজারে দেশবন্ধু পার্কের উত্তর কোণে ডাঃ বোসের আধুনিক কেতায় তৈরি কংক্রিটের ত্রিতল বাড়ি।

বাড়ির সামনের দিকে পার্ক। পিছনের দিকে একটা সরু রাস্তা। রাস্তার হাত পাঁচ-ছয়েকের মধ্যেই বেলগাছিয়া ক্যানেল বয়ে গেছে।

অমিয়াদির তিনটি মেয়ে, ছেলে নেই। প্রথম মেয়েটির বয়স দশ-এগারোর মধ্যেসাম রাণু। রোগা লিলিকে চেহারা। প্রায়ই অসুখে ভোগে। দ্বিতীয়-তৃতীয় যথাক্রমে নয় বছর ও পাঁচ বছরের।

ডাঃ বোস অত্যন্ত নিরীহ গোবেচারা গোছর মানুষ। দিন ও রাত্রির প্রায় বেশির ভাগ সময়ই তার কলে রুগীদের নিয়ে বাড়ির বাইরে বাইরেই কাটে।

বাড়ির সর্বময়ী কর্ত্রী অমিয়াদি।

অমিয়াদিকে সুব্রতর খুবই ভাল লাগে। মোটাসোটা গড়ন। সমগ্র মুখখানি জুড়ে যেন একটা মাতৃত্বের প্রশান্তি। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। অর্থশালী লোকের স্ত্রী হয়েও হাবভাব অত্যন্ত সাদাসিধে। চালচলনে, কথাবার্তায় এতটুকু বড়মানুষী ভাব নেই।

সুব্রত গাড়ি থেকে নেমে ট্যাক্সিওয়ালাকে অপেক্ষা করতে বলে বাবলুর হাত ধরে সোজা। গিয়ে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করল।

বেলা তখন প্রায় নটা হবে। একধামা তরিতরকারী নিয়ে বঁটি পেতে অমিয়াদি থালার ওপরে সকলের রান্নার জন্য তরকারী কুটছেন। পরিধানে একখানা চওড়া লালপাড় গরদের শাড়ি। সদ্য স্নানের ওপর ভিজে চুলগুলি ঘোমটার ফাঁক দিয়ে বুকের ওপরে এলানো। সামনেই বসে ঘোট মেয়ে টুলটুল একটা হাসিখুশি বই নিয়ে পড়ছে–

ইঁদুর ছানা ভয়ে মরে
ঈগল পাখি পাছে ধরে।

সুব্রত এসে ডাকল, অমিয়াদি!

কে রে? ওমা, সুব্রত! কী খবর ভাই? কতদিন পরে এলে ভাই—ওটি কে? সুন্দর মেয়েটি তো!

সামনেই একটা বেতের মোড়া ছিল। সেটার ওপরে বসতে বসতে সুব্রত বললে, তোমায় একটা কাজের ভার দিতে এলাম অমিয়াদি। এই মেয়েটি আমার একটি বোন-বাবলু। বলতে বলতে সুব্রত সস্নেহে বাবলুকে হাতের বেড় দিয়ে নিজের কাছে টেনে নিল।

টুলটুল ততক্ষণে পড়া থামিয়ে তার শিশুসুলভ কৌতূহলী দৃষ্টিতে বাবলুর দিকে পিট-পিট করে তাকাচ্ছে।

চা খেয়ে এসেছ ভাই?

খেয়ে এসেছি। কিন্তু আর এক কাপেও বাধা নেই।

অমিয়াদি ভৃত্য মাধবকে চা করে আনবার জন্য আদেশ দিলেন।

বেশ মেয়েটি। এখানে এস বাবলু। অমিয়াদি সস্নেহে বাবলুকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, ঠিক যেন প্রতিমার মত মুখখানি। কোথায় পেলে একে সুব্রত?

সুব্রত সংক্ষেপে বাবলুর সব কথা অমিয়াদিকে খুলে বললে। বাবলুর কাহিনী শুনতে শুনতে ততক্ষণে একান্ত স্নেহশীলা অমিয়াদির দুচক্ষু বেয়ে অশ্রু গড়াচ্ছে। দুহাতে গভীর স্নেহে অমিয়াদি বাবলুকে বুকের ওপরে টেনে নিলেন, আহা বাছা রে!

সুব্রত বলল, ওর মাকে যতদিন না খুঁজে পাই ততদিন ওকে আপনার কাছে রাখতে হবে, অমিয়াদি। আপনার বাড়িতে ওর সমবয়সী আছে—কোন কষ্ট হবে না বেচারার। আপনার কোন আপত্তি হবে না তো দিদি?

আপত্তি! তুমি কি যে বল সুব্রত? যতদিন খুশি ও আমার বাড়িতে থাকুক।

সহসা সুব্রত ও অমিয়াদি দুজনেই লক্ষ্য করলেন, মেয়েটি অমিয়াদির বুকের মধ্যে মাথা খুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করেছে।

অমিয়াদি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, কি হল মা, কাদছ কেন? বাবলু অশ্রুসজল মুখখানি সুব্রতর মুখের ওপরে তুলে ধরে বলল, দাদা আপনারা এত ভাল! আপনারা আমাকে এত ভালবাসেন। আমি জানি আবার আমাকে অবুর হাতে যেতে হবে। কেন যেন কেবলই আমার মনে হচ্ছে, এসব সত্যি নয়, এ আমি স্বপ্ন দেখছি। আমি শুনতে পাচ্ছি কেবলই অবু আমাকে ডাকছে। আমাকে সে একবার পেলে আর রক্ষে রাখবে না। খুব মারবে কেটে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেবে।

অমিয়াদি গভীর স্নেহে বাবলুর পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, না, না বাবলু। তোমার কোন ভয় নেই। কেউ তোমাকে আর আমাদের কাছ থেকে নিয়ে যেতে পারবে না।

ভৃত্য এমন সময় ডিশে করে কিছু ভাল খাবার ও চা নিয়ে এসে সামনে রাখল।

অমিয়াদি বাবলুকে কোলে বসিয়ে ডিশ থেকে একটা রসগোল্লা তার হাতে তুলে দিলেন।

আমি সকালবেলা অনেক খেয়েছি দাদার সঙ্গে। এখন আর খাব না।

তাতে কী হয়েছে। লক্ষ্মী মেয়ে, আর একটা খাও।

বাবলু রসগোল্লাটা মুখে পুরে দিল।

তুমি আমার কাছে থাকবে তো বাবলু? কাঁদবে না? অমিয়াদি জিজ্ঞেস করলেন।

থাকব। কাঁদব কেন? আপনারা আমাকে কত ভালবাসেন। আমাকে কেউ কোনদিন এত ভালবাসেনি।

তারপর তোমার মাকে যখন তোমার দাদা খুঁজে দেবেন, তখন তুমি তার কাছে আমাদের ছেড়ে চলে যাবে তো?

না, আপনাদের ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। আপনাদের কাছে চিরকালই আমি থাকব। আপনারা আমাকে আর অবুর কাছে পাঠিয়ে দেবেন না তো?

না না, তুমি আমাদের কাছেই থাকবে।

আপনাকে আমার কি বলে ডাকতে ইচ্ছে করছে জানেন? বাবলু অমিয়াদির বুকে মাথা গুজে মৃদুস্বরে বললে।

কী?

মা—আপনাকে আমি মা বলে ডাকব।

বেশ, আমাকে তুমি মা বলেই ডেকো। আমি তোমার মা।

বাবলুকে অমিয়াদির বাসায় নিরাপদে রেখে সুব্রত চলে গেল।

স্নেহান্ধ জননীর প্রাণ মুহূর্তেই চিরদুঃখিনী মেয়েটিকে তার হৃদয়ের স্নেহ দিয়ে আপনার করে টেনে নিল।

টুলটুলের কাছে বাবলুর সংবাদ পেয়ে রাণু পড়া ফেলে বাবলুকে দেখতে এল।

একটু বেশি বয়সে রাণু হওয়ায় মা বাপের স্নেহ সে একটু বেশি করেই পেয়েছিল।

তাছাড়া ছোট বয়স থেকেই চিররুগণা থাকায় অমিয়াদি তার অন্য দুটি সন্তানের চেয়ে রাণুকে বেশি ভালবাসতেন।

ক্রমে যখন আরও দুটি ছোট ছোট বোন এসে রাণুর মায়ের স্নেহের একাধিপত্যে ভাগ বসালে, রাণু সেটা মোটেই সুনজরে দেখেনি।

মা যদি কখনও তার অন্য সন্তানদের কোলে নিয়ে আদর করতেন, রাণু সেটা মোটেই সহ্য করতে পারত না। কান্নাকাটি বাধিয়ে দিত। বাধ্য হয়েই মাকে ফিরে রাণুর দিকেই নজর দিতে হত। এক কথায় রাণুর মনটা ছিল একটু বেশি রকম একলসেঁড়ে ও হিংসুক প্রকৃতির।

তার মায়ের আদরে কেউ ভাগ বসাচ্ছে, এটা সে আদপেই সহ্য করতে পারত না।

মাও মেয়েকে বেশি কিছু বলতেন না। একে সে চিররুণা, তার উপর বিশেষ খেয়ালী।

সেই রাণু যখন টুলটুলের মুখে শুনল, কে একজন উড়ে এসে তার মায়ের কোল জুড়ে বসেছে, হিংসায় রাগে সে ফুলতে ফুলতে বই ছড়িয়ে ফেলে নীচে ছুটে এল।

বাবলু তখন তার মায়ের কোলে বসে গল্প করছে।

দূর থেকে বাবলুকে তার মায়ের কোলে বসে থাকতে দেখে রাগে রাণু ফুলতে লাগল। তারপর হঠাৎ চিৎকার করে বললে, মা, ও কে?

মা মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন।

রাণুর চাইতে বাবলু অনেক বেশি সুন্দর দেখতে। হাজার অযত্ন ও দুঃখকষ্টের মধ্যে মানুষ হলেও, তার স্বাভাবিক একটা সৌন্দর্যের দ্যুতি ছিল—যা তাকে করে তুলেছিল রমণীয়তায় ঢলঢল। তার ওপর আবার সদ্য ক্রীত নতুন পোশাকে যেন আরও সুন্দর দেখাচ্ছিল।

রাণুর চেহারা রোগা লিলিকে। গায়ের রং কালো, মাথার চুল ব করে কাটা। তাছাড়া, তার সহজাত হিংসার প্রবৃত্তি তার মুখের সমস্ত শিশুসুলভ কমনীয়তাটুকু যেন নিঃশেষে শুষে নিয়ে তাকে করে তুলেছিল রুক্ষ ও কঠিন।

মানুষের মনটাই হচ্ছে তার আসল রূপ? সেই আসল রূপ যার যেমন, বাইরের চেহারায়, বিশেষ করে মুখের ভাবে, সেইটাই ফুটে উঠে।

মেয়ের চিৎকারে মা মুহূর্তে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নিমেষে বুঝে নিলেন মেয়ের চিৎকারের কারণটা কী?

তিনি সস্নেহে রাণুর দিকে তাকিয়ে বললেন, আয় রাণু! এই দেখ কেমন সুন্দর তোের একজন খেলার সাথী এসেছে। এর নাম বাবলু।

রাণু তীব্ৰদৃষ্টিতে একবার মার মুখের দিকে, পরক্ষণেই অগ্নিগর্ভ দৃষ্টিতে বাবলুর মুখের দিকে তাকিয়ে দুমদুম করে আবার তখুনি উপরে উঠে গেল সিঁড়ি বেয়ে।

অমিয়াদি বললেন, পাগলী মেয়ে! ওর ধারণা—ওর মার স্নেহ ও ভালবাসা সবটুকু অন্যে ছিনিয়ে নিল, ওর ভাগে কিছুই আর অবশিষ্ট রইল না!

***

সন্ধ্যা হওয়ার আর তখন খুব বেশী দেরি নেই। বাবলু ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে চেয়েছিল। বিলীয়মান সূর্যের অস্তরাগে আকাশ রাঙা হয়ে আছে। সামনের দেশবন্ধু পার্কে কত ছেলেমেয়ে খেলে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ কার মৃদু স্পর্শে বাবলু চমকে ফিরে তাকাল। দেখল ঠিক তার পিছনেই দাঁড়িয়ে রাণু।

চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠেছে তার একটা ঘোর বিতৃষ্ণার ভাবশ

একটা অবরুদ্ধ ক্রোধ ও হিংসা যেন আগুনের শিখার মতই তার সমগ্র মুখখানি ব্যেপে আছে—

বাবলু সহসা যেন অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে ছাদের প্রাচীর ঘেঁষে সরে দাঁড়াল। রাণু তীব্র ঘৃণার দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ বাবলুর মুখের দিকে চেয়ে রইল। তারপর বললে, তোমার নাম বাবলু?

হ্যাঁ। ঢোক গিলে কোনমতে বাবলু সভয়ে শব্দটা উচ্চারণ করলে।

তুমিই বুঝি আমার জায়গা দখল করতে এসেছ? আমার মার ভালবাসার ভাগীদার হতে এসেছ?

না, না। তুমি ভুল বুঝছ রাণু। আ—আমি…

থাম্‌। চুপ কর রাক্ষসী! আমি জানি, কেন তুই এসেছিস? কিন্তু শোন বাবলু হবে না। কখনই তা হতে দেব না আমি। তোর মা থাকে ভাল, তারই কাছে চলে যাবি। আর না থাকে তো যেখানে খুশী তুই চলে হ্যাঁ। এখানে তোর থাকা হবে না। শুনতে পাচ্ছিস কালামুখী, পেত্নী! এ বাড়িতে তোর থাকা হবে না। আর যদি তুই আমার কথা না শুনিস, তবে তোকে খুন করে ফেলব। আমার মাকে তুই ভালবাসতে পারবি নে—পারবি নে!

বলতে বলতে ঝড়ের মতই একপ্রকারে দৌড়ে রাণু নীচে নেমে গেল। আর বাবলু! তার। দুই চোখের কোল বেয়ে তখন দরদরধারায় অশ্রু নেমে এসেছে। সহসা সে ছাদের ওপরে লুটিয়ে

পড়ল।

কেন—কেন তাকে দাদা এখানে রেখে গেল? সে এখন কী করবে?

ক্রমে একটু একটু রাত্রি ঘনিয়ে আসতে লাগল। কিন্তু বাবলুর কান্না যেন আর শেষই হয় না। অভিমানে ব্যথায় তার ছোট্ট কচি বুকখানা যেন ভেঙে গুড়িয়ে যাচ্ছে।

তখন চারিদিকে অন্ধকার হয়ে এসেছে। মাথার উপরে কালো আকাশটার বুকে তারাগুলো সোনার প্রদীপের মত পিটুপি করে জ্বলছে।… মা গো কোথায় তুমি? কোন্ দূর দেশে? ঐ আকাশের তারাগুলোয় মাঝখানে কি তুমি লুকিয়ে আছ মা-মণি! এত তোমাকে ডাকি, সাড়া দাও না কেন? তোমার বাবলু যে এত তোমাকে ডাকছে তা কি শুনতে পাও না–মণি!

কাঁদতে কাঁদতে কখন একসময় সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ কার মৃদু সস্নেহ স্পর্শে ও চোখ মেলে তাকাল। চোখের কোলে তখন তার অশ্রুর ভিজা আভাস।

বাবলু–বাবলু সোনা! এখানে এমনি করে ঘুমিয়ে কেন মা? অমিয়াদি বাবলুকে দুহাত বাড়িয়ে বুকের মধ্যে টেনে নিলেন।

বাবলু অমিয়াদিকে দুহাতে আঁকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল—মা!

কি হয়েছে সোনা? কাদছ কেন কাঁদছ কেন? চল খাবে চল। আমি তোমাকে সারা বাড়ি খুঁজে হয়রান!

বাবলুকে অমিয়াদির কাছে রেখে একপ্রকার নিশ্চিন্ত হয়েই সুব্রত এসে ট্যাক্সিতে উঠে বসল এবং ট্যাক্সিওয়ালাকে লালবাজার থানার দিকে গাড়ি ছোটাতে বললে। থানায় এসে যখন ও পৌছাল বেলা তখন প্রায় এগারোটা। নিজের বসবার ঘরে ঢুকে প্রথমেই তালুকদারকে ডেকে পাঠাল। একটু পরেই তালুকদার এসে ঘরে প্রবেশ করল।

এই যে তালুকদার! কালকের সেই আসামীরা ধরা পড়ে ছিল তো?

া, তারা চারজনেই হাজত ঘরে বন্দী আছে।

তাদের এই ঘরে আনাও তো। লোকগুলোকে একবার জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাই।

তালুকদার ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে একজন সার্জেন্টকে আসামীদের সুব্রতর ঘরে হাজির করতে বলে এল।

মিনিট পনেরোর মধ্যেই দুজন পুলিস আসামী চারজনকে নিয়ে ঘরে এসে প্রবেশ করল।

সুব্রত তখন একটা কাগজের ওপরে কী যেন লিখছিল। কলমটা টেবিলের ওপরে একপাশে নামিয়ে রেখে চোখ তুলে তাকাতেই বিস্ময়ে সে যেন হাঁ হয়ে গেল। এ কি! এরা কে? এদের কোথা থেকে ধরে আনলে?

চারজন কুলীমজুর লোক, অতি মলিন ছিন্ন বসন পরিধানে।

তালুকদার বললে, কেন, এদেরই কাল ধরে আনা হয়েছে!

হেড কনেস্টবল রমজান কোথায়? তাকে ডাক। সে-ই কাল সেখানে ছিল।

রমজানকে ডেকে আনা হল। রমজান বললে, এই চারজন লোককেই গতকাল রাত্রে চীৎপুরের বাড়িতে বন্দী অবস্থায় পাওয়া গেছে। লোকগুলোকে নানাভাবে প্রশ্ন করেও সুব্রত। কিছুই বুঝতে পারলে না। সে স্পষ্টই বুঝতে পারল সত্যিকারের আসল আসামীরা কোন গুপ্ত উপায়ে সরে গিয়ে প্রকাণ্ড চাল চেলেছে সুব্রতকে জব্দ করবার জন্য। নিশ্চয়ই ঘরের মধ্যে কোথাও গুপ্তদ্বার ছিল, যার সাহায্যে ওরা সরে পড়ে এই লোকগুলোকে তাদের জায়গায় রেখে গেছে। উঃ, কী শয়তান! কী ধড়িবাজ! কী জব্দই না করেছে তাকে!

সুব্রত লোকগুলোকে আপাতত হাজতেই বন্দী করে রাখতে বললে। সার্জেন্ট বন্দীদের নিয়ে চলে গেল।

কী করবে এখন সে? কোন্ পথ ধরে এগুবে?

আজই আর একবার সে বাড়িটা গোপনে তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখতে হবে। বাড়িটার কোথায় কোন্ রহস্য গোপন হয়ে আছে, তার সব সন্ধান তাকে খুঁজে বের করতেই হবে।

দ্বিপ্রহরের দিকে সুব্রত রাজলক্ষ্মী মিলের অফিসে সুবিমল চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে গেল।

সুবিমলবাবু তার অফিসঘরে বসে কতকগুলো কাগজপত্র সই করছিলেন। সুব্রত ডোর-স্ক্রিন ঠেলে অফিসঘরে ঢুকতেই কাগজপত্র থেকে মুখ না তুলেই বললেন, আসুন!

সুব্রত একখানা চেয়ার অধিকার করে বসল। এক মিনিট—এই কাগজপত্রগুলো সই করে নিই, তারপর আপনার সঙ্গে কথা বলব।

মিনিট দশেকের মধ্যেই সুবিমলবাবুর কাজ শেষ হয়ে গেল। ঘন্টি বাজালেন। বেয়ারা এসে সেলাম দিয়ে দাঁড়াল।

বেয়ারার হাতে কাগজপত্রগুলো তুলে দিয়ে সুবিমলবাবু বললেন, এগুলো ডেসপ্যাচ ক্লার্ককে দিয়ে এস।

বেয়ারা কাগজপত্রগুলো নিয়ে সেলাম জানিয়ে চলে গেল।

তারপর কী সংবাদ বলুন? আপনার তদন্ত কত দূর এগুলো?

এগুচ্ছে ধীরে ধীরে। মৃদুভাবে সুব্রত জবাব দিল।

কেষ্টার একটা কিনারা হবে বলে আপনার মনে হয় সুব্রতবাবু?

নিশ্চয়ই।

সেদিন আপনি সরকারবাড়ির সকলেরই জবানবন্দী নিয়েছিলেন সুব্রতবাবু?

হ্যাঁ।

সৌরীনকে কী রকম মনে হল?

সাধারণ। একটু বেশীরকম নার্ভাস। দোষী বলে তাকে একটুকুও আমার সন্দেহ হয় না।

হয় না? কেন?

ক্ষমা করবেন মিঃ চৌধুরী, কেন তা আপনাকে আমি বর্তমানে বলতে পারব না।

তাহলে নিশ্চয়ই আপনি অন্য কাউকে দোষী বলে সন্দেহ করেন!

হয়তো তাই।

আমাকে কী?

এমন কথা আমি নিশ্চয়ই আপনাকে বলিনি, মিঃ চৌধুরী!

মিঃ চৌধুরী হঠাৎ হেসে ফেললেন, যাক্, কতকটা তবু নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। তারপর এখন বলুন দেখি, হঠাৎ আমার কাছে আপনার কী বিশেষ প্রয়োজন হল?

শুনুন মিঃ চৌধুরী, আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন আমি করতে চাই। আশা করি সোজা ভাবেই জবাবগুলো দেবেন।

মৃদু হেসে মিঃ চৌধুরী বললেন, শোনাই যা!

শুনুন মিঃ চৌধুরী, সেদিন আপনার দেওয়া ঠিকানামত আপনার আর্টিস্ট বন্ধু মিঃ সুবোধ দত্তর সঙ্গে গিয়ে দেখা করেছিলাম।

তাই নাকি? তারপর? বেশ লোকটি, না?

হ্যাঁ, বেশই বটে। তবে মনে হল, গভীর জলের মাছ। সহজে ধরা দিতে চান না।

হ্যাঁ, আর্টিস্ট মানুষ কিনা! একটু খেয়ালী চিরদিনই। তারপর কী সে বললে?

অনেক কিছুই বললেন—যাতে বেশ আশ্চর্যই হতে হয়েছে আমাকে। প্রথমেই তো তিনি বললেন, তিনি জীবনে কোন দিনই আপনাকে ও ধরনের ডি ভায়োলেট কালি উপহার দেননি! জীবনে কোনদিনই তিনি চীনে যাননি!

এতে আশ্চর্য হচ্ছি না আমি এতটুকুও সুব্রতবাবু!

কেন? লোকটা ভয়ানক মিথ্যেবাদী না কী?

না, সে মিথ্যুক কিনা তা আমি জানি না।

কিন্তু একথা আপনি নিশ্চয়ই অস্বীকার করতে পারেন না মিঃ চৌধুরী যে, আপনি বলেছিলেন সেদিন আপনারই জবানবন্দীতে, মিঃ দত্তই আপনাকে কালিটা দিয়েছিলেন!

সত্যি কথাই সেদিন আমি আপনাকে বলেছিলাম, সুব্রতবাবু। সেদিন আপনাকে যখন ও কথাগুলো বলি, তখন সব কথা আপনাকে খুলে বলা প্রয়োজন মনে করিনি।

শুনতে পারি কি, কেন প্রয়োজন মনে করেননি? তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সুব্রত সুবিমলবাবুর মুখের দিকে তাকাল।

সুবিমলবাবু কিছুক্ষণ মৌন হয়ে বসে রইলেন। তারপর ধীর সংযত কণ্ঠে বললেন, বলিনি তার কারণ ব্যাপারটা অতি সামান্য। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, ঘটনাটাকে কেন্দ্র করে আপনার মনে সন্দেহ জেগেছে। সুবোধের এক বন্ধু চীন থেকে কালিটা নিয়ে আসে এবং সে সুবোধকে কালিটা দেয়। তাকে ঐ কালিতে কয়েকটা জাপানী স্কেচ করে দেবার জন্য। সুবোধের সেই বন্ধুটি একজন খেয়ালী জমিদার। সুবোধ বন্ধুর প্রস্তাবে রাজী হয়। কিছুদিন বাদে তার প্রতিশ্রুতিমত। কয়েকখানা ছবি ঐ কালিতে এঁকে দেয়। সুবোধের বন্ধুর মতলব ছিল আলাদা। সে সেই। ছবিগুলো চীনের কোন শিল্পীর কাছে চড়া দামে বিক্রি করে এবং চীনের সেই শিল্পীটি আরও কতকগুলো ছবি চেয়ে পাঠায় সুবোধের বন্ধুর কাছে।

সুবোধ কিন্তু ব্যাপারটা কোন রকমে আগাগোড়া জানতে পারে। এইখানে একটা কথা আছে। একটা বেদনার্ত ইতিহাস। আসলে যার জন্য ব্যাপারটা আপনাকে বলিনি। কোন এক সময় সুবোধের ঐ জমিদার বন্ধুটি সুবোধকে অর্থ দিয়ে নানাভাবে সাহায্য করেছিল। সুবোধরা দুটি ভাইবোন। ওর বোন নমিতার বয়স যখন পাঁচ, ওর বয়েস আঠারো, ওদের মা-বাবা মারা যান। এক ঘণ্টার ব্যবধানে এসিয়াটিক কলেরায়। সুবোধের পিতা হারাধনবাবু কলকাতা কর্পোরেশনের সামান্য পঁয়ত্রিশ টাকা মাইনের কেরানী ছিলেন। কাজে কাজেই যা তিনি উপায় করতেন তা ডাইনে আনতে বাঁয়ে কুলোতো না।

পিতার মৃত্যুর পর সুবোধকে এক প্রকার বাধ্য হয়েই ছোট বোনটির হাত ধরে পথের ওপর এসে দাঁড়াতে হল। কেননা তার ধনী আত্মীয়-স্বজনরা সকলেই ওই হতভাগ্য পিতৃ-মাতৃহারা ভাইবোন দুটিকে এতটুকু কৃপাদৃষ্টি থেকেও বঞ্চিত করলেন।

দুটো বসর সুবোধ বহু কষ্টে বোনটিকে নিয়ে একটি ভোলার ঘরে কাটায়। ঐ সময় সুবোধের ঐ ধনী জমিদার খেয়ালী বন্ধুটির সঙ্গে পরিচয় হয় এবং ঐ ধনী বন্ধুটির সাহায্যেই সুবোধ আর্ট স্কুলে প্রবেশাধিকার পায়। ক্রমে নিজের সাধনার দ্বারা সুবোধ যখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, ওর বোন নমিতার খুব একটা বড় রকম অসুখ হয়। বোন একটু সুস্থ হলে ও বোনকে নিয়ে শিমূলতলায় বেড়াতে যায়।

মাসতিনেক বাদে ও যখন বোনকে নিয়ে ফিরে এল, দেখলাম, ওর বোনের সিঁথিতে সিন্দুর। কিন্তু শিমুলতলা থেকে ফেরা অবধি সুবোধ যেন কেমন হয়ে গেল। আমার সঙ্গে পর্যন্ত ও সমস্ত সম্পর্ক ছিঁড়ে ফেললে।

কানাঘুষায় একদিন সংবাদ পেলাম সুবোধের বোনের একটি মেয়ে হয়েছে হাসপাতালে। সেই মেয়েটির যখন বছর ছয়েক বয়েস, হঠাৎ মেয়েটিকে কারা চুরি করে নিয়ে গেল। সেই থেকে সুবোধ আরও গম্ভীর হয়ে গেল। কারও সঙ্গে দেখা হলেও কথা বলে না।

যাই হোক, ঐ সময় বছরখানেক সুবোধের অবস্থা আবার খুব খারাপ হয়ে যায়। আবার সুবোধের জমিদার বন্ধুটি এগিয়ে আসে এবং একটি গার্লস স্কুলে নমিতাকে চাকরি দেয়। আজও নমিতা সেই স্কুলেই চাকরি করছে। এখন ঐ সব কারণেই সুবোধ বন্ধুর ছবি বিক্রির কথা জেনেও চুপ করে থাকতে বাধ্য হয়।

আরও একটা মজার কথা, সুবোধের বন্ধুটি সুবোধের আঁকা ছবিগুলি নিজের নামে আঁকা বলে বিক্রি করেছিল। তাতে সুবোধ খুব বেশী মর্মাহত হয় এবং জগতে তার যত বন্ধু ছিল সকলের উপর চটে যায়। অথচ সেই বন্ধুটি যখন আবার ছবির জন্য বললে, ও ভেবে পেলে না যে কি করবে। একদিকে নিজের বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা, অন্যদিকে বন্ধুর বন্ধুত্বের দাবিতে বিশ্বাসঘাতকতা—দুয়ে বাধল সংঘর্ষ।

এমন সময় হঠাৎ একদিন তার বাড়িতে আমি যাই। কথায় কথায় ও বলে, সুবিমল, তুই কালিটা নিয়ে হ্যাঁ। তাকে বলবো, কালি ফুরিয়ে গেছে, তাই ছবি আঁকতে পারলাম না। আমি কালির শিশিটা নিয়ে আসি।

এরই দিন দুই পরে ওর বোনের চাকরিটা যায়। আমাদের অফিসে একজন লেডি ক্লার্কের পদ খালি ছিল। সুবোধের অবস্থা আমি জানি, তাই তাকে বলেছিলাম তার বোনকে আমাদের অফিসে ঢুকিয়ে দিতে। তাতে সে ভয়ানক চটে উঠল এবং বললে, আর বন্ধুদের পরামর্শ নয়— একজন বন্ধুত্বের মুখোশ পরে এসে অভাগিনী বোনটিকে বিবাহ করে গা-ঢাকা দিল। একটা মেয়ে ছিল, তবু বোনটার সান্ত্বনা, সেও চুরি গেল। তারপর আর এক ধনী বন্ধু আমার আঁকা ছবি নিজের নামে বিক্রি করল। আর বন্ধুদের সাহায্য আমি চাই না। যথেষ্ট হয়েছে। বেরিয়ে যাও তুমি আমার বাড়ি থেকে!

তার ঐ অভদ্র ব্যবহারে আমি গেলাম চটে। দুজনে রাগারাগি হল। আমি চলে এলাম। এসব ব্যাপার ঘটেছে আজ প্রায় মাস-সাতেক আগে। ঐ ঘটনার পর আর আমাদের পরস্পরের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই। কেউ কারও সঙ্গে দেখা হলেও কথা বলি না।

সুবিমলবাবু চুপ করলেন।

সুব্রত সুবিমলবাবুর কথা শুনতে শুনতে ভিতরে ভিতরে ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল। একটা অন্ধকার রহস্যের যবনিকা যেন একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। একটা সন্দেহ মনের কোণে জট-পাকানো ছিল—তবে কি বাবলুই সেই হারানো মেয়ে? তাই যদি হবে, তবে বাবলুর সঙ্গে মিঃ সরকারের খুনের সম্পর্ক কী?

হঠাৎ একটা আলোর রেখা যেন অন্ধকারের বুকখানাকে ঝলসে দিয়ে গেল—পেয়েছি,

পেয়েছি!

এমন সময় সুবিমলবাবু আবার প্রশ্ন করলেন, কী ভাবছেন সুব্রতবাবু?

ভাবছি আপনার কথা যদি সত্যিই হয়, তবে কে চিঠিটা লিখল আমাকে?

তা যদি জানতাম, তবে সেকথা সেদিনই আপনাকে আমি বলতাম সুব্রতবাবু!

সুব্রত যখন সুবিমলবাবুরর কাছে থেকে বিদায় নিল, বেলা তখন প্রায় সাড়ে চারটে। অফিসের সর্বে ছুটি হতে শুরু করেছে।

সুবিমলবাবুর ওখান থেকে অফিসে ফিরে আসতেই কতকগুলো কাজে সুব্রত দিন দুই এমনভাবে আটকা পড়ে গেল যে কোনদিকে আর সে নজর দেবারও ফুরসত পেল না।

ইতিমধ্যে একবার সে কিরীটীকে ফোন করেছিল। শুনলে কিরীটী কলকাতার বাইরে কোথায় গেছে দুদিনের জন্য। অমিয়াদিকে বলাই ছিল, অন্ততপক্ষে সকালে ও রাত্রে শুতে যাওয়ার আগে দুবার সুব্রতকে ফোন করে নিয়মিতভাবে বাবলুর সংবাদ দেওয়ার জন্য। কেননা সুব্রতর একপ্রকার স্থির বিশ্বাসই ছিল, বিপক্ষ দল সহজে সুব্রতকে নিষ্কৃতি দেবে না। তাছাড়া মিঃ সরকারের খুনের ব্যাপারের সঙ্গে বাবলুর জীবন-রহস্যের যোগাযোগ সত্যিই যদি তার সন্দেহমত থেকে থাকে, তবে তারা বাবলুকে সরাবার চেষ্টা করবেই।

এই সব নানা কারণে সুব্রত ইন্টেলিজেন্স বিভাগের দুজন তরুণ যুবক শিশির ও সমরকে বাবলুর প্রহরায় নিযুক্ত করেছিল।

শিশির ও সমর দুজনে পর্যায়ক্রমে দিবারাত্র এক একসময় এক একজন অমিয়াদির বাড়ির পাশে পাহারা দিত।

বাবলু এ বাড়িতে আসার তৃতীয় দিন বিকালের দিকে হঠাৎ একসময় রাণু এসে বাবলুর সামনে দাঁড়াল। বাবলু দোতলার রাস্তার উপরে ঝুলন্ত বারান্দার রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে নীচের পার্কের ছেলেমেয়েদের দৌড়াদৌড়ি খেলাধূলা দেখছিল।

রাণু মৃদুস্বরে এসে বললে, বাবলু, তুমি আমার ওপরে সেদিনের ব্যবহারে নিশ্চয়ই রাগ করেছ, না?

হঠাৎ রাণুকে এত কাছাকাছি দেখে বাবলু বেশ যেন একটু থতমতই খেয়ে গিয়েছিল। সে অবাক হয়ে ভীত কাতর দৃষ্টি মেলে রাণুর মুখের দিকে তাকাল।

আমার উপরে রাগ কোরো না বাবলু। চল আমরা পার্কে বেড়িয়ে আসি। যাবে?

তার ভয়ে কোনমতে সেঁক গিলে বাবলু বললে, যাব।

রাণুর পিছনে পিছনে বাবলু পার্কে বেড়াতে গেল। পার্কে খানিকটা ঘুরে এদিক ওদিক বেড়াবার পর রাণু এক সময় বাবলুকে বললে, খুব বেশি লোকজন এখন পার্কে, তাই এত গোলমাল। খাওয়াদাওয়ার পর রাত্রে অনেক দিন আমি লুকিয়ে পার্কে বেড়াতে এসেছি। রাত্রে ঐ মোড়ে রামদিনের কুলপি মালাই পাওয়া যায়। খুব সুন্দর খেতে। আজ রাত্রে এসে খাওয়া যাবেখন, কেমন?

বাবলু বললে, কিন্তু রাত্রে বাড়ি থেকে বের হলে মা যদি বকেন!

দূর, মা জানতে পারবে কেমন করে? লুকিয়ে আসব না! বাবলু চুপ করে রইলো। কোন জবাব দিল না।

রাণুর বাবা ডাঃ বোস সাধারণত একটু বেশী রাত্রি করেই বাড়ি ফেরেন। কাজে কাজেই অমিয়াদির, সমস্ত কাজ করে শুতে যেতে রাত্রি সাড়ে এগারোটা বেজে যায়।

খাওয়াদাওয়ার পর রাত্রি নটার সময় রাণু এসে বাবলুকে বিছানা থেকে ডেকে তুলল। বাবলু আলাদা ঘরে একাই শুতে। রাণুর পাশের ঘরে। ঘুম ভেঙে বাবলু রাণুর মুখের দিকে তাকাল। বারান্দার ঢাকনি দেওয়া ইলেকট্রিক বাতির রশ্মিটা রাণুর মুখের উপরে এসে পড়েছে। চোখ দুটো যেন তার কী এক উত্তেজনায় চক্ করছে। ও সভয়ে চোখ বুজে ফেলল।

রাণু অধীর হয়ে বাবলুকে আবার ধাক্কা দিল, কই চল, যাবে না। দেরি হয়ে যাচ্ছে!

বাবলু উঠে বসল।

দুজনে পা টিপে টিপে এসে সিঁড়ির সামনে দাঁড়াল।

চাপা গলায় বাবলু বললে, আমার বড্ড ভয় করছে রাণুদি। মা যদি বকেন!

চল, চল বোকা মেয়ে! মা জানতে পারবে কী করে? আমরা তো একটুক্ষণ পরেই এসে আবার শুয়ে থাকবো। কেউ টের পাবে না।

আমার কিন্তু বড্ড ভয় করছে।

আয়, দেরি করিস নে। ফিরতে আবার দেরি হয়ে যাবে।

দুজনে এসে রাস্তার ওপারে দাঁড়াল।

অন্ধকার রাত্রি। তার উপর আবার ব্ল্যাক-আউটের মহড়া। ঘেরাটোপে ঢাকা গ্যাসের ম্লান আলো রাস্তার ওপর একটা যেন স্তিমিত আলোছায়ার সৃষ্টি করেছে।

বাড়ির সামনেকার অপ্রশস্ত জনহীন রাস্তাটা পার হয়ে রাণুর পিছু পিছু বাবলু এসে দেশবন্ধু পার্কের মধ্যে প্রবেশ করল।

পার্কটাও জনহীন। কেউ কোথাও নেই।

ময়দানের মাঝখান দিয়ে লাল সুরকির অপ্রশস্ত রাস্তা ধরে দুজনে এগিয়ে চলে।

অদূরে একটা বেঞ্চির ওপরে বসে কে যেন গান গাইছে।

ও আমার নীলমণি!
তোর জ্বালায় আর পারিনে নীলমণি!
ও আমার কেলে সোনা,
তুমি পাড়ায় যেও না;
পাড়ায় গেলে ধুলো দেবে
গায়ে সবে না।।

কে গাইছে রাণুদি? বাবলু চলতে চলতে থেমে গিয়ে প্রশ্ন করল।

ও বিশু পাগলা। এই পাড়াতেই থাকে। চল, আবার থামলে কেন? ওই গেটের মুখে কুলপী বরফওয়ালা থাকে। তাড়াতাড়ি চল। দুজনে এসে যখন ওদিককার গেটের সামনে দাঁড়াল, জায়গাটা খালি-খালি, জনমনিষ্যিও সেখানে নেই।

কই তোমার বরফওয়ালা, রাণুদি?

এখানে আজ নেই দেখছি। বোধ হয় ওই রাস্তার মাথায় বসেছে, চল দেখি!

বাবলু বাধা দিল, না না, রাণুদি, আজ থাক। চল আমরা বাড়িতে ফিরে যাই। আমার বড্ড ঘুম পাচ্ছে। আর একদিন এসে মালাই খাব। মা যদি আমাদের খোঁজেন, ব্যস্ত হবেন।

রাস্তার পাশের ঢাকনা দেওয়া গ্যাসের আলোয় খানিকটা রশ্মি এসে রাণুর মুখের ওপরে পড়েছে। সহসা রাণুর মুখের দিকে তাকিয়ে বাবলুর মনের মধ্যে যেন একটা অজানিত আশঙ্কা শিউরে উঠল। সমগ্ৰ মুখখানার মধ্যে যেন একটা হিংসা কুটিল জাকুটি। চোখের তারা দুটি কী এক উত্তেজনায় যেন জ্বলজ্বল করছে।

দুজনে চোখাচোখি হতেই একটু পরেই রাণু মুখের ওপরে একটা হাসি টেনে আনলে, হাসতে হাসতে বললে, কী ভীতু মেয়ে তুই বাবলু! আয় আয়। দুজনে আছি, ভয় কী? ওই তো রাস্তার মোড় দেখা যাচ্ছে! কতক্ষণই বা লাগবে। যাব আর আসব, চল।

সহসা বাবলু যেন বেঁকে দাঁড়াল। আবার রাণুর মুখের ওপরে একটু আগেকার হিংস্র কুটিল ভাবটা ফুটে উঠল। চট্ করে এগিয়ে এসে সে বাবলুর একখানা হাত দৃঢ় মুষ্টিতে চেপে ধরল এবং তীক্ষ্ণ রাগত স্বরে বললে, কী বললি পেত্নী, যাবিনে? তোকে যেতেই হবে। কোন কথা তোর আমি শুনব না। না যদি যাস, তবে তোকে খুন করে ফেলব।

সে রাত্রে পাহারা দেবার কথা ছিল শিশিরের। বাবলু আর রাণু যখন বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তায় এসে নামে, শিশিরের সদা সতর্ক দৃষ্টি তারা এড়াতে পারেনি।

রাত্রি নটার সময় ওদের দুজনকে বাড়ি থেকে বের হতে দেখে ও বেশ একটু আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ রাত্রে কেন ওরা বাড়ির বাইরে এল। দূর থেকে আড়ালে আড়ালে থেকে শিশির ওদের দুজনকে অনুসরণ করতে লাগল। ওদের দুজনেরই অজ্ঞাতে এবং ওদের অনুসরণ করতে করতে ওদের দুএকটা কথা ওর কানে আসতেই ও আরও বেশী সতর্ক হয়ে গেল।

ও স্পষ্টই বুঝল, বাবলুর অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাণু তাকে সকলের অজ্ঞাতে বাড়ির বাইরে নিয়ে এসেছে!

কিন্তু কেন? এতটুকু মেয়ে রাণু!

বাবলু কিন্তু সহসা রাণুর পরিবর্তনে চমকে গেল। রাণু যেন রাগে তখন ফুলছে। ও বলতে লাগল, পেত্নী, রাক্ষুসী! কেন তুই আমাদের বাসায় এলি? কেন মা তোকে ভালবাসবে? কেন তোকে আদর করবে? কেন তুই মরিস না? কেউ তোকে চায় না!

রাণুদি। রাণুদি! ওকথা বলল না—বোলো না। আমি তো তোমার কিছু করিনি ভাই! আমি তোমাকে কত ভালবাসি। বাবলু কেঁদে ফেলল।

ভালবাসি। কে তোকে ভালবাসতে বলেছে? কে চায় তোর ভালবাসা! তুই আর আমাদের বাড়িতে ফিরে যেতে পারবি না। আর তোকে আমাদের বাড়িতে যেতে দেব না। তুই যদি আবার আমাদের বাড়িতে যাস, তবে তুই ঘুমালে রাত্রে চুপি চুপি উঠে বাবার অপারেশনের ছুরি দিয়ে তোর গলা কেটে ফেলব।

রাণুদি! রাণুদি! ওগো তোমার দুটি-পায়ে পড়ি, আমাকে মেরো না। আমি কোথায় যাব?

তা আমি জানি না। তোর যেখানে খুশী তুই মরগে যা।

ঠিক এমনি সময় একটা কালো রঙের দ্রুতগামী সিডনবডি মোটরগাড়ি সহসা এসে ওদের সামনে ব্রেক কষে দাঁড়াল। গাড়িটা আসার সঙ্গে সঙ্গেই দুজন লোক গাড়ির দরজা খুলে নেমে ওদের সামনে এসে দাঁড়াল।

শিশির ততক্ষণে চট করে বুঝে ফেলল, একটা প্রকাণ্ড ষড়যন্ত্র আছে এর মধ্যে। আর অপেক্ষা করা নয়, সে চট করে ওদের সামনে এসে দাঁড়াল।

সহসা অন্ধকার থেকে শিশিরকে ওদের সামনে আবির্ভূত হতে দেখে তোক দুটো চমকে ফিরে দাঁড়াল। একজন কর্কশ গলায় বললে, কে তুই? কী চাস্?

শিশিরও সমানে জবাব দিলে, তোরা কী চাস্?

সহসা এমন সময় দলের একজন এগিয়ে এসে শিশিরের নাকের ওপরে অতর্কিতে ঘুষি বসালে।

অতর্কিতে আঘাত পেয়ে শিশির ঘুরে পড়ল।

দলের অন্যজন ব্যগ্রকণ্ঠে বললে, মানকে, আর দেরি নয়, শিগগির ছুঁড়িকে গাড়িতে তোল।

শিশির কিন্তু ততক্ষণে সামলে নিয়ে আবার এগিয়ে এসেছে।

তিনজনে মারামারি শুরু হয়ে গেল।

ঐ ফাঁকে বাবলু বললে, শিগগির পালিয়ে চল রাণুদি।

রাণু তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জবাব দিল, কোথায় যাবি তুই রাক্ষুসী! আমি যাব না।

বাবলু পালাতে চায়। রাণু তাকে জাপটে ধরল, না, তোকে যেতে দেব না।

এমন সময় আর একটা লোক গাড়ি থেকে নেমে এল।

বাবলু রাণুর ধত হাতখানা এক মোচড় দিয়ে ছাড়িয়ে অন্ধকারে অন্যদিকে লাফিয়ে পড়ল। ঠিক সেই সময় রাণুকে কে যেন একটা ভারী চাদর দিয়ে ঢেকে ফেললে। রাণু হাত-পা ছুঁড়ে চীৎকার করতে লাগল। কিন্তু বৃথা, লোকটা রাণুকে চাদরসমেত পোঁটলার মত তুলে নিয়ে গাড়ির মধ্যে গিয়ে ফেলে দিয়ে দরজা আটকে দিল এবং চীৎকার করে বললে, মানকে, গোবরা শিগগির আয়!

লোকটার চীৎকার শুনে মানকে-গোবরা, তাড়াতাড়ি শিশিরকে এক প্রবল ধাক্কায় ফেলে দিয়ে ছুটে গাড়ির মধ্যে গিয়ে উঠে বসল। রাস্তার একটা ইটে প্রচণ্ড আঘাত লাগায় শিশিরের মাথা তখন কেটে গিয়ে রক্ত ঝরছে। সে উঠে যাবার আগেই গাড়িটা অদৃশ্য হয়ে গেল।

ঘটনার আকস্মিকতায় বাবলু হতচকিত হয়ে গিয়েছিল। তারপর যখন দেখলে গাড়িটা চলে গেল, ও পায়ে পায়ে শিশিরের কাছে এসে দাঁড়াল। শিশির এক হাতে মাথাটা চেপে ধরে যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে বললে, কে?

আমি বাবলু।

বাবলু! শিশির চকিতে উঠে দাঁড়াল, তবে তোমাকে ওরা নিতে পারেনি?

একটু একটু করে তখন বাবলুর মনে সাহস ফিরে আসছে। সে শিশিরের কাছে আরও একটু এগিয়ে এল, কিন্তু ওরা যে রাণুদিকে নিয়ে গেল! কী হবে? আপনি কে?

আমার নাম শিশির। চল এখনি তোমাদের বাড়িতে যাই। সুব্রতবাবুকে ফোন করতে হবে।

বাবলুর সঙ্গে শিশির যখন ডাঃ বোসের বাড়িতে এসে প্রবেশ করল, ঠিক তখনই ডাঃ বোসও ফিরে এসে গাড়ি থেকে নামছেন। বাবলু ও শিশির গিয়ে বাড়িতে ঢুকতেই ডাঃ বোসও তাদের পিছু পিছু এসে বাইরের ঘরে প্রবেশ করলেন, কে আপনি? কাকে চান? এ কি বাবলু! এত রাত্রে

কোথায় গিয়েছিলে?

শিশির তখন সংক্ষেপে আগাগোড়া সমগ্র ব্যাপারটি ডাঃ বোসকে বলে বললে, আমি এখুনি সুব্রতবাবুকে ফোন করতে চাই। আপনার ফোন কোথায়?

ডাঃ বোস শিশিরের মুখে সমস্ত ঘটনা শুনে যেন হতবাক হয়ে গেছেন। কোন মতে হাত তুলে ঘরের কোণে ফোনটা দেখিয়ে দেন।

ওদিকে সুব্রত শিশিরের মুখে ফোনে সংবাদ পেয়ে অতিমাত্রায় চঞ্চল হয়ে বললে, আমি এখনি আসছি। তুমি অপেক্ষা কর।

বাড়ির মধ্যে সংবাদ পৌছাল। হন্তদন্ত হয়ে অমিয়াদি বাইরের ঘরে এসে ঢুকলেন, এসব কি শুনছি! রাণুকে নাকি কারা ধরে নিয়ে গেছে?

ডাঃ বোস তার মেয়ে রাণুর হিংসাপরায়ণ স্বভাবের সঙ্গে যথেষ্ট পরিচিত ছিলেন। শিশিরের মুখে সমস্ত ব্যাপার শুনে মেয়ের জন্য যেমন তিনি ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন, মেয়ের কুৎসিত ব্যবহারে লজ্জাও পেয়েছিলেন ঠিক ততোধিক।

বাবলু তখন একটা সোফার ওপরে বসে হাতে মুখ ঢেকে ফুলে ফুলে কাঁদছিল।

স্ত্রীকে সংক্ষেপে সমগ্র ব্যাপারটা খুলে বলে ডাঃ বোস বললেন, রাণু যে আমাদের এতখানি খারাপ হয়েছে তা কোনদিনই ভাবিনি, অমিয়া!

অমিয়াদি স্বামীর মুখে সমগ্র ব্যাপার শুনে বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। তার মেয়ের চিন্তার চেয়েও সুব্রতর কাছে মুখ দেখাবেন কী করে, সেই আসন্ন লজ্জাকর পরিস্থিতির চিন্তায় মূক হয়ে গেলেন।

অল্পক্ষণ পরেই সুব্রতর গাড়ি এসে বাইরে দাঁড়াল। ঝড়ের মতই দ্রুতপদে এসে সুব্রত ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল। সুব্রতকে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করতে দেখেই বাবলু ছুটে এসে সুব্রতকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললে। বললে, রাণুদিকে ধরে দিয়ে গেছে দাদা মানকে, গোবরা! কী হবে?

কেঁদো না বাবলু, এখুনি রাণুকে আমরা ফিরিয়ে নিয়ে আসব।

আমিও আপনার সঙ্গে যাব দাদা। আমি তাদের সবকিছু জানি। কোথায় তারা রাণুদিকে ধরে নিয়ে গিয়ে রাখবে তা আমি জানি। হয় উত্তরের ঘরে, নয়তো পুরাতন বাড়ির নীচে তলায়। কয়েকদিন আমাকে তারা সে-বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল। মিঞা সেখানে থাকে নিশ্চয়ই। মিঞার ঘরেই রাণুদিকে তারা আটকে রাখবে।

বাবলুর কথা শুনে সুব্রত চিন্তিত হয়ে উঠল। যে উপায়ে তোক রাণুকে শত্রুর কবল থেকে উদ্ধার করতে হবে। কিন্তু তাড়াতাড়ি করলে কোন কাজই হবে না। ভেবেচিন্তে অগ্রসর হতে হবে। বাবলুর কথাগুলো ভেবে দেখবার মত। যদি সেই কথা অনুসারেই কাজ করতে হয় তবে বাবলুর নির্দিষ্ট পথ ধরেই অগ্রসর হতে হবে। বাবলুকে সঙ্গে নিয়ে গেলে হয়তো সহজেই সব জায়গাগুলো খুঁজে দেখতে পারবে। সুব্রত বাবলুর দিকে তাকিয়ে বললে, সেই ভাল বাবলু, চল তুমি আমার সঙ্গে। তুমি ওদের আড্ডার সব গলি-খুঁজি জানো।

বাবলু চটপট প্রস্তুত হয়ে নিল।

শিশিরের কপাল অনেকখানি কেটে গিয়েছিল। ডাঃ বোসের হাতে শিশিরের শুশ্রুষার ভার তুলে দিয়ে এবং অমিয়াদি ও ডাঃ বোসকে রাণুর সম্বন্ধে চিন্তা না করতে বলে সুব্রত বাবলুর হাত ধরে ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল।

রাস্তার ওপরই সুব্রতর ডিমলার গাড়িখানা অপেক্ষা করছিল। বাবলুর হাত ধরে গাড়িতে উঠে বসে ড্রাইভারকে চিৎপুরের দিকে দ্রুত গাড়ি চালাতে বললে সুব্রত।

গাড়ি ছুটে চলল।

চিৎপুর রোডে অবস্থিত সেই বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভারকে সতর্ক করে সুব্রত বাবলুর হাত ধরে গাড়ি থেকে নামল। রাত্রি তখন বোধ করি প্রায় বারোটা। চিৎপুরের রাস্তাটা তখন একেবারে নির্জন হয়ে যায়নি। মানুষের চলাচল তখনও বেশ আছে। দুএকটা খালি। মোষের গাড়ি পিচের সড়কের ওপর দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দ করতে করতে চলে গেল।

বাবলু সুব্রতর হাত ধরে এগুচ্ছিল। বাড়িটার কাছাকাছি এসে চাপা স্বরে বললে, দাদা, এ দরজা দিয়ে ঢুকবো না। ওদিককার সরু একটা গলির মধ্যে দিয়ে গেলে বাড়িতে ঢুকবার আরও একটা দরজা আছে। সেটা দিয়েই বাড়িতে ঢুকব।

বেশ তাই চল। আমি তো চিনি না, তুমি রাস্তাটা দেখিয়ে নিয়ে চল।

বাবলু চাপা গলায় আবার বললে, আমার সঙ্গে আসুন।

ফুটপাতের উপর দিয়ে বাড়িটার গা ঘেঁষে ঘেঁষে কিছুদূর এগিয়ে যেতেই হঠাৎ সংকীর্ণ সরু অন্ধকার গলিপথের মধ্যে বাবলু প্রবেশ করল। সুব্রত পিছু পিছু এগিয়ে চলল।

আলো-বাতাসহীন দুর্গন্ধময় দুটো বাড়ির মধ্যবর্তী সংকীর্ণ পথ।

সুব্রত জিজ্ঞাসা করল, আলো জ্বালব বাবলু?

না। আমার পিছনে পিছনে আসুন। এ পথ একমাত্র দলের লোক ছাড়া কেউ জানে না। নিকষ কালো অন্ধকারে যেন চোখের দৃষ্টি অন্ধ হয়ে যায়।

অতি কষ্টে অন্ধকারে ঠাহর করে করে বাবলুর পায়ের শব্দ অনুসরণ করে সুব্রত এগিয়ে চলে।

হঠাৎ একসময় চলতে চলতে বাবলু থেমে গেল, দাদা?

এই যে আমি!

একবার আলোটা জালুন তো!

সুব্রত পকেট থেকে টর্চ বের করে বোতাম টিপে আলো জ্বালাল।

সামনেই একটা জানালা। জানালার কপাট দুটো বন্ধ।

কতকালের কাঠের পুরাতন কপাট। মসীবর্ণ, জীর্ণ।

বাবলু উঁচু হয়ে জানালার বন্ধ কপাটের গায়ে হঠাৎ একটা ধাক্কা দিতেই কপাট দুটো ক্যাচ করে মৃদু একটা শব্দ করে খুলে গেল। জানালার গায়ে শিক বসান। মাঝখানের দুটো শিক নেই। বাকিগুলো আছে।

এই জানালা-পথে বাড়ির মধ্যে ঢুকতে হবে দাদা। দাঁড়ান, আগে আমি ভিতরে দেখে আসি, তারপর আপনি আসবেন।

বাবলু জানালার একটা শিক দুহাতে ধরে ঝুলে উঠে পড়ল। এবং পরমুহূর্তে জানালাপথে শিকের মধ্যবর্তী রাস্তা দিয়ে গলে অন্ধকার ঘরের মধ্যে ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেল।

সুব্রত হাতের টর্চ-বাতি নিভিয়ে নিঃশব্দে অন্ধকারে বাবলুর প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল। কতকাল আগে কলকাতার এই শহরের উপরে এইসব বাড়ির তৈরি হয়েছিল কে জানে!

বড় বড় সব বাড়ি। বেশির ভাগই দোতলা-তেতলা। খালি পড়ে আছে। একতলাগুলো গুদামঘর হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

অন্ধকারে কয়েকটা মশা কানের কাছে ভন করছে। হঠাৎ পায়ের উপর দিয়ে প্রকাণ্ড একটা ইদুর সড়সড় করে চলে গেল।

সুব্রত শশব্যস্ত সরে দাঁড়াল একটু। অতি আধুনিক শহরের সঙ্গে এই সংকীর্ণ অন্ধকার গলিপথের যেন কোন সম্পর্কই নেই।

সুব্রতর মনের মধ্যে অনেক কথাই একসঙ্গে ঘুরপাক খেয়ে খেয়ে ফিরছিল। মাত্র চারদিনের মধ্যে ঘটনার সংঘাতে কোথায় ভেসে এসেছে।

মিঃ সরকারের মৃত্যু তদন্তের ব্যাপারে সব কাজই এখনও বাকি। সমস্ত ব্যাপারটা ভেবে দেখবারও এখনও পর্যন্ত সময় পায়নি। কিরীটাই বা কতদূর কী করল কে জানে?

আজ এই কদিনে যেসব ঘটনাগুলো ঘটে গেল, এগুলো কিরীটী জানতে পারলে হয়ত তদন্তের ব্যাপারে অনেকখানি আলোর সন্ধান দিতে পারত। তারপর এই মেয়েটি। দুঃখ ধান্ধার মধ্যে এই অল্প বয়সে কী টানাপোড়েনই বেচারীর চলেছে! আশ্চর্য স্বভাব। যে রাণু তাকে অনায়াসেই বিপদের মুখে ঠেলে দিতে এতটুকুও পশ্চাৎপদ হয়নি, তারই জন্য ও কতখানি ব্যাকুল হয়েই না এই বিপদের মধ্যে ছুটে এল। এতটুকু দ্বিধাবোধও করলে না।

হঠাৎ এমন সময় ও বাবলুর ডাকে চমকে উঠল।

দাদা!

উঁ? সুব্রত জবাব দিল।

দাদা, সমস্ত বাড়িটাই আমি ঘুরে দেখে এলাম। কিন্তু ওরা কেউ নেই। একমাত্র অবু আর বঙ্কা একটা ঘরের মধ্যে বসে বসে কথা বলছে। এখানে নিশ্চয়ই ওরা রাণুদিকে নিয়ে আসেনি।

তবে?

মিঞার ওখানে এখন যেতে হবে আমাদের। আমার মনে হয়, ওরা নিশ্চয়ই রাণুদিকে ধরে সেখানে নিয়ে গেছে।

বাবলু আবার জানালাপথে নীচে লাফিয়ে পড়ল, চলুন মিঞার ওখানে যাওয়া যাক।

সে কোথায়?

বড় রাস্তার ওপরেই, অল্প দূরে।

চল।

ওরা দুজনে আবার গলিপথ থেকে বের হয়ে বড় রাস্তার উপরে এসে পড়ল। বড় রাস্তার উপর দিয়ে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে আর একটা সরু গলির মধ্যে প্রবেশ করল।

এ গলিপথটা আগেকার চাইতে সামান্য একটু প্রশস্ত বটে, তবে এখানে আলোর কোন সংস্পর্শ নেই। অন্ধকার।

কিছুটা পথ এগিয়ে গিয়ে বাবলু একটা দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।

দাদা, এই বাড়িতে মিঞা থাকে। আলো জ্বেলে দেখুন, সামনে একটা ছোট পাঁচিল।

সুব্রত বাবলুর কথামত টর্চবাতি জ্বেলে দেখলে, সামনেই প্রায় হাত আড়াই উঁচু একটা পুরাতন প্রাচীর। প্রাচীরের গায়েই একতলার ছাদ। ছাদের ওপরে একটা গঙ্গাজলের ট্যাঙ্ক দেখা যাচ্ছে।

আলোটা নিভিয়ে ফেলুন দাদা। ঐ পাঁচিলের ওপরে উঠে জলের ট্যাঙ্কটার ওপর দাঁড়ালেই দেখতে পাবেন বারান্দা। বারান্দাটায় লাফিয়ে পড়বেন। সেটা দোতলার বারান্দা। বারান্দা দিয়ে একটু এগোলেই দেখবেন নীচে নামবার কাঠের সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এসে আগে দরজাটা খুলে দিন।

সুব্রত নিমেষে প্রস্তুত হয়ে নিল মালকোচা এঁটে। তারপর অন্ধকারে বার দুই লাফিয়ে চেষ্টা করতেই তৃতীয়বারে ও পাঁচিল ধরে ফেলল। নিমেষে ও হাতের ওপর ব্যালেন্স করে পাঁচিলের ওপর উঠে বসল। পাঁচিলের ওপর থেকে ট্যাঙ্কের ওপর উঠতে বেশি বেগ পেতে হল না।

হ্যাঁ, ঠিক সামনেই সরু একটা ফালিমত বারান্দা দেখা যাচ্ছে বটে।

অতি সন্তর্পণে লাফিয়ে সুব্রত বারান্দায় গিয়ে পড়ল।

বারান্দায় কোন আলো নেই, অন্ধকার। একটা খালি ঘর, তার দরজা খোলা হাঁ-হাঁ করছে। সুব্রত কিছুক্ষণ কান পেতে শোনবার চেষ্টা করল। কিন্তু কোথাও কোন সাড়াশব্দ নেই। হঠাৎ যেন মনে হল অন্ধকারে কোথা থেকে একটা চাপা কান্নার শব্দ আসছে। সুব্রত থমকে দাঁড়াল, কে কাঁদে না! হ্যাঁ, তাই তো। কার কান্নার শব্দ? এমন সময় একটা চাপা গর্জন শোনা গেল, এই থাম হুঁড়ি!

সুব্রত চমকে উঠল। কিন্তু ঠিক ঠাহর করে এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারপাশ দেখেও বুঝতে পারল কোথা থেকে শব্দটা আসছে।

আর দেরি নয়। বাবলু একা গলিপথে নীচে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ছেলেমানুষ।

ও বারান্দা দিয়ে আর একটু এগিয়ে গেল। আকাশের বুকে তখন সরু এক ফালি চাঁদ উঠেছে।

চাঁদের ক্ষীণ আলোয় এই ভাঙা পুরাতন বাড়ির খানিকটা যেন ফ্যাকাসে করুণ দেখায়।

সেই মৃদু আলোয় সুব্রত দেখতে পেল, সামনেই একটা ভাঙা পুরাতন কাঠের সিঁড়ি। নীচে, একটা সংকীর্ণ উঠান।

উঠানটাও ক্ষীণ চালোকে অস্পষ্ট দেখা যায়।

সুব্রত আর দেরি না করে সিঁড়ি বেয়ে সন্তর্পণে নেমে এল। উঠানের ওপাশে একটা মাত্র ঘর। ঘরের দরজাটা খোলা। আলো হাতে ঘরের মধ্যে ঢুকতেই ও দেখলে, ঘরের মধ্যে একটা খিল আঁটা দরজা। আন্দাজেই ও বুঝতে পারল, এটাই ও-বাড়ি থেকে বাইরে বেরুবার রাস্তা।

সুব্রত খিলটা খুলে ফেলতেই দরজাটা ঠেলে বাবলু ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল। সুব্রত চাপা গলায় বাবলুকে বললে, কার যেন চাপা কান্না শুনতে পেলাম বাবলু।

বাবলু জবাব দিল চাপা গলায়, ঠিক, তাহলে তারা এখানেই রাণুদিকে নিয়ে এসেছে। এবারে আমার পিছনে পিছনে আসুন। বাবলু এগিয়ে চলল। উঠানটা পার হতেই আর একটা দরজা। এ দরজাটা ভেজানোই ছিল, ঠেলা দিতেই খুলে গেল। সামনেই একটা ঘর। ঘরের মাঝখানে একটা কাঠের টেবিলের ওপরে একটা ধূম্রমলিন হ্যারিকেনবাতি জ্বলছে।

সেই টেবিলের সামনে একটা টুলের ওপরে পিছন ফিরে বসে একটা লম্বা-চওড়া লোক আপন মনে বিড়ি ফুঁকছে।

লোকটার পরিধানে একটা লুঙ্গি, গায়ে একটা কোর্তা। মাথায় একটা মুসলমানী টুপি।

সুব্রত মুহূর্তে সমস্ত পরিস্থিতিটা মনে মনে একবার পর্যালোচনা করে নিল। সুব্রত তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে একবার চারিধারে পরীক্ষা করে নিল। আশেপাশে আর কোন দ্বিতীয় প্রাণী নজরে পড়ে না। লোকটা চোখ মেলে বসে থাকলেও সজাগ নয়। এক্ষেত্রে একমাত্র উপায় চকিতে লোকটাকে পশ্চাৎ থেকে আক্রমণ করে ঘায়েল করা।

মনে মনে তাই ও ঠিক করে ফেললে। লোকটাকে আক্রমণই করবে-ও।

বাবলু চাপা গলায় বলল, ওই মিঞা বসে আছে দাদা। আপনি ওকে যদি ধরতে পারেন, তবে সেই ফাঁকে আমি ঘরের ভিতর থেকে রাণুদিকে খুঁজে আনতে পারি।

সুব্রত মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানালো, তাই হবে।

সুব্রত চকিতে গিয়ে মিঞাকে পশ্চাৎ থেকে দুহাতে জাপটে ধরল সজোরে। অতর্কিতে সহসা এমনভাবে আক্রান্ত হয়ে লোকটা ভয়ানক চমকে গিয়েছিল এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। কিন্তু সে ক্ষণমাত্র। পরক্ষণেই লোকটা প্রবল এক ঝাপটা দিয়ে গায়ের সমগ্র শক্তি প্রয়োগ করে নিজেকে সুব্রতর দৃঢ় আলিঙ্গন থেকে মুক্ত করে নেওয়ার চেষ্টা করল। লোকটার গায়ে প্রচণ্ড শক্তি। বাবলু ততক্ষণে এক দৌড়ে সামনের ঘরের ভেজানো দরজাটা ঠেলে ঘরের মধ্যে গিয়ে প্রবেশ করল।

ছোট অপরিসর ঘরটা।

ঘরের এক কোণে একটা কাঠের বাক্সের ওপরে একটা ধূম্রমলিন হ্যারিকেনবাতি টিটি করে আলোর চাইতে বেশি ধূমোদগীরণ করছে। ঘরের মাঝখানে একটা দড়ির খাটিয়ার ওপর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় রাণু পড়ে আছে। ঘরের ম্লান আলোকে বাবলু এসে রাণুর সামনে দাঁড়ালো। রাণু বাবলুকে দেখে উঠে বসতে চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। বাঁধা হাত পা নিয়ে আবার হেলে পড়ে গেল।

বাবলু চকিতে রাণুর ওপর ঝুঁকে পড়ে তাড়াতাড়ি রাণুর হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিতে লাগল।

রাণু বাবলুর ব্যবহারে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। সে বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে বাবলুর দিকে চেয়ে দেখছিল।

বাঁধন খোলা হয়ে গেলে রাণু খাটিয়ার ওপর উঠে বসল।

বাবলু ডাকল, রাণুদি, শীঘ্র পালিয়ে চল!

রাণু খাটিয়ার ওপর থেকে নীচে নেমে দাঁড়াল।

ওদিকে ততক্ষণ সুব্রত লোকটাকে ঘায়েল করে তার বুকের ওপরে চেপে বসেছে। লোকটা সুব্রতকে তার নিজের শরীরের উপর থেকে ফেলে দেওয়ার জন্য প্রবল চেষ্টা করছে।

রাণুর হাত ধরে একপ্রকার টানতে টানতে বাবলু ওই ঘরে এসে প্রবেশ করল।

সুব্রত লোকটাকে কায়দা করে আনলেও নিজে তখন প্রবলভাবে হাঁপাচ্ছে। বাবলু রাণুর হাত ধরে থমকে যুদ্ধরত সুব্রতর দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ঘরের চারপাশ একবার চকিতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে দেখে নিল। সহসা ওর নজরে পড়ল ঘরের এক কোণে একটা লোহার ডাণ্ডা পড়ে। আছে। ছুটে গিয়ে বাবলু ডাণ্ডাটা হাতে তুলে নিল এবং ডাণ্ডাটা দিয়ে বসাল এক আঘাত। লোকটা একটা আর্তনাদ করে উঠল এবং দেখতে দেখতে মুষ্টি তার শিথিল হয়ে গেল।

লোকটা জ্ঞান হারাল।

সুব্রত উঠে দাঁড়াল এবং অদূরে দণ্ডায়মান বাবলুর মুখের দিকে তাকাল। অজস্র কৃতজ্ঞতায় সুব্রতর চোখের দৃষ্টি তখন অশ্রুসজল হয়ে উঠেছে। সুব্রত দুহাত বাড়িয়ে গভীর স্নেহে বাবলুকে বুকের ওপরে টেনে নিল। কৃতজ্ঞতায় তার কণ্ঠস্বরও বুঝি তখন রুদ্ধ হয়ে গেছে।

কিন্তু বাবলু বাধা দিল, দাদা, শীঘ্র এখান থেকে পালিয়ে চলুন! কেউ এসে পড়তে পারে!

বুকভরা উৎকণ্ঠায় অমিয়াদি ও ডাঃ বোস তখনও বাইরের ঘরের দুখানা সোফায় মুখোমুখি হয়ে জেগে বসেছিলেন।

রাত্রি তখন সাড়ে তিনটে বেজে গেছে।

সুব্রত দুহাতে রাণু ও বাবলু দুজনকে ধরে ঘরের মধ্যে এসে প্রবেশ করল, অমিয়াদি!

কে? একসঙ্গে দুজনেই চমকে সামনের দিকে চোখ তুলে তাকালো।

এই নিন অমিয়াদি, আপনাদের রাণু!

অমিয়াদি আকুলভাবে মেয়ের দিকে দুহাত প্রসারিত করে দিলেন। রাণু একপ্রকার ছুটে এসেই মায়ের বুকের ওপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ল। মা, মা-মণি! অমিয়াদির চোখের কোল দুটি অশ্রুসজল হয়ে উঠল।

ডাঃ বোস প্রশ্ন করলেন, কেমন করে কোথায় ওকে খুঁজে পেলেন সুব্রতবাবু? আপনাকে ধন্যবাদ দিয়ে আজ আর ছোট করবো না!

ধন্যবাদ যদি দিতেই হয় ডাঃ বোস, তবে আমার বোন বাবলুকে দিন। বাবলু না থাকলে আজ রাণুকে উদ্ধার করা কোনমতেই সম্ভব হত না।

ডাঃ বোস এগিয়ে এসে বাবলুর মাথার ওপরে শুধু গভীর স্নেহে একখানা হাত রাখলেন, কী আর বলবেন তিনি! সকল ভাষা আজ যেন তার কৃতজ্ঞতার বন্যায় ভেসে গেছে।

অনেক রাত হয়েছে। ওদের শুতে নিয়ে যান অমিয়াদি। সুব্রত বললে, এখন আমি যাই, কাল সকালে এসে সব কথা খুলে বলব। হাতে আমার অনেক কাজ বাকি।

ডাঃ বোস বললেন, এই শেষরাত্রে আর আপনি নাই বা গেলেন সুব্রতবাবু। আপনার শরীরের ওপর দিয়ে তো কম ধকল যায়নি। বাকি রাতটুকু এখানে শুয়েই বিশ্রাম করে নিন।

অমিয়াদিও বললেন, সেই ভাল সুব্রত। আজ রাত্রে কোথায় যেও না।

গুরু পরিশ্রমে সুব্রতর শরীরও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। আপাতত খানিকটা বিশ্রামের বিশেষ প্রয়োজন। তাই সে রাজী হয়ে গেল।

বাবলু আর রাণুকে শুইয়ে সুব্রতর বিছানা পেতে দিয়ে গেলেন অমিয়াদি। সুব্রত শয্যার ওপরে গা এলিয়ে দিল।

***

সকালবেলা হাত-মুখ ধুয়ে চা খেয়ে সুব্রত বের হতে যাবে, সহসা বাবলু পিছন থেকে সুব্রতকে ডাকল, দাদা!

সুব্রত ফিরে দাঁড়াল। সামনেই একান্ত কুণ্ঠিতভাবে বাবলু দাঁড়িয়ে।

কে, বাবলু? আমাকে কিছু বলবে ভাই?

হ্যাঁ! আমাকে আপনি সঙ্গে নিয়ে চলুন দাদা!

সুব্রত আশ্চর্য হয়ে গেল, কেন? তোমার কি এখানে থাকতে কোন কষ্ট হচ্ছে মণি?

না, মা আমাকে খুব ভালবাসেন।

তবে তুমি যেতে চাইছ কেন ভাই?

বাবলু কুণ্ঠিতভাবে ইতস্তত করতে লাগল।

বল, তোমার কি কোন কষ্ট হচ্ছে?

না দাদা, এঁরা সবাই আমাকে খুব ভালবাসেন। রাণুদি বোধ হয় চায় না যে, তাদের বাসায় আমি থাকি। রাণুদির কোন দোষই নেই দাদা। সে হয়তো চায় না, তার মা-বাবার স্নেহে অন্য কেউ ভাগ বসাক। আমিও হয়তো চাইতাম না। আমারও খুব ইচ্ছা ছিল না, যতক্ষণ না আপনি আমার মাকে খুঁজে দেন, এখান হতে অন্য কোথাও যাই। কিন্তু গতরাত্রের সমস্ত ব্যাপারই তো আপনি দেখেছেন দাদা, তবু আমি চাই না যে আপনি রাণুদির মা-বাবাকে রাদি সম্বন্ধে কোন কথা বলেন। সব কথা শুনলে হয়তো রাণুদিকে তারা বকাবকি করবেন। আমার মাকে যদি সত্যি খুঁজে দিতে পারেন, তবে আমি তার কাছেই যাব। আর যদি তাকে খুঁজে নাই পাওয়া যায়, আমি অন্য কোথাও চলে যাব। আমি এখান থেকে চলে গেলেই আর রাণুদির কোন দুঃখ থাকবে না। আর সে কষ্টও পাবে না মনে। সে সুখী হবে।

বাবলুর কথাগুলি শুনে সুব্রত বিস্ময়ে ও শ্রদ্ধায় যেন থ হয়ে গেল। এতটুকু মেয়ের এতখানি ঔদার্য! এ শুধু অভাবনীয় নয়, অপূর্ব!

সস্নেহে সুব্রত বাবলুকে কোলের কাছে টেনে নিল। তারপর তার রুক্ষ চুলগুলিতে গভীর স্নেহে হাত বুলোত বুলোতে বলল, আমি সব বুঝেছি বাবলু। আজকের দিনটা তুমি এখানে থাক। কাল সকালে এসে তোমাকে আমি এ বাড়ি থেকে নিয়ে যাব।

বাবলু ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।

বাবলুর মাথায় নীচু হয়ে একটা গভীর স্নেহে চুম্বন করে মুখ তুলতেই সুব্রত দেখল, কখন একসময় রাণু এসে দরজার ওপরে দাঁড়িয়েছে। ওরা দুজনে কেউই তা লক্ষ্য করেনি।

সুব্রত মুখটা বাবলুর দিক থেকে ফিরিয়ে নিল। তারপর বাবলুর দিকে চেয়ে বলল, বাড়ি থেকে কোথাও কার সঙ্গে কিন্তু বেরিও না বাবলু। আমি বিকেলে এসে তোমাকে নিয়ে যাব।

***

সেইদিন দ্বিপ্রহরে সুব্রত কয়েকজন লালপাগড়ী ও তালুকদারকে নিয়ে চিৎপুরের বাড়িটায় হানা দিল।

কিন্তু সমস্ত শূন্য বাড়িটা খাঁ-খাঁ করছে। কোথাও জনপ্রাণীর চিহ্নমাত্র নেই। সন্ধ্যার দিকে সুব্রত কিরীটীর সঙ্গে দেখা করতে গেল।

কিরীটী নিজের শয়নঘরে একটা সোফার ওপরে কাত হয়ে শুয়ে একখানা কেমিস্ট্রি বই পড়ছিল। সুব্রতর পায়ের শব্দে মুখ তুলে তাকাল, সু যে!

সুব্রত ক্লান্তভাবে একটা সোফার উপরে গা এলিয়ে দিয়ে বললে, হ্যাঁ।

তারপর এতদিন ড়ুব দিয়েছিলি কোথায়? ফোন করে করেও তোর পাত্তা পাই না! ব্যাপার কী?

গিয়েছিলাম অতীতের অন্ধকারে ড়ুব দিয়ে অতীতের ইতিহাস মন্থন করতে। …কিন্তু সে অনেক কথা, তার আগে শুনতে চাই তুমি কতদূর এগুলে।

শরীরটা আজ কয়েকদিন খারাপ। ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়েছে। কোথাও বের হতে পারিনি। তবে মনে মনে কদিন ছ কেটেছি।

কোন suggestion?

কিরীটী মৃদু হাসলে, হ্যাঁ, কিছু আছে। কিন্তু একটা জায়গায় এসে আমার সমস্ত সূত্রগুলি যেন কেবল জট পাকিয়ে যাচ্ছে। খুনী কে আমি তা জানি সুব্রত।

জানো?

হ্যাঁ।

কে? সুব্রতর কণ্ঠস্বরে একরাশ উৎকণ্ঠা ঝরে পড়ে। উত্তেজনায় ও অধীর হয়ে ওঠে।

কিরীটী ধীর সংযত কষ্ঠে আশ্বাস দেয়, দাঁড়া, ব্যস্ত হোসনে। খুনী কে, সেটা তো শুধু জানলেই হবে না! একটা হাইপথেসিস মাত্র। সমগ্র থিওরিটা শূন্যে একটা নেবুলার মত পাক খেয়ে ফিরছে মাত্র।মোটিভটা যেন কোনমতেই খাপ খাওয়াতে পারছি না। দ্যাখ, একটা কাজ করতে পারি?

কী? সুব্রত উৎসুক ভাবে কিরীটীর মুখের দিকে তাকায়।

সরকার ফ্যামিলির কোন অতীত ইতিহাস আছে কিনা তলে তলে একটা খোঁজ নিতে পারিস? আমার মনে হয় পুকুরের তলায় অনেক পচা কাদা জমে আছে!

তবে শোন! সুব্রত ধীরে ধীরে এই কদিনের সমগ্র ব্যাপারটা আগাগোড়া কিরীটীর কাছে খুলে বলে গেল।

সুব্রতর কথা শুনতে শুনতে কিরীটীর মুখের ওপরে নানা ভাব-বৈচিত্র্যের রঙ খেলে বেড়াতে লাগল।

সুব্রতর কাহিনী শেষ হলে কিরীটী চাপা উত্তেজিত কণ্ঠে বললে, হয়েছে! পেয়েছি। প্রায় সমস্ত সমস্যারই মীমাংসা হয়ে গেল সু। কেবল সামান্য দুচারটে তথ্য আবিষ্কার করতে পারলেই খুনীকে আমরা হাতেনাতে ধরে ফেলবো! খাচ্ছিল তাঁতী তাঁত বুনে, কাল হল তার এঁড়ে গরু কিনে।

কিন্তু কথা বলতে বলতে সহসা যেন কিরীটীর ভাব-পরিবর্তনে সুব্রতও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। ব্যাকুলভাবে প্রশ্ন করলে, কী হল?

কিরীটী তখন গম্ভীরভাবে হাত দুটো পশ্চাতের দিকে পরস্পর মুষ্টিবদ্ধ করে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে শুরু করেছে। সুব্রতর কথার কোন জবাবই দিল না সে।

সুব্রত বুঝলে, কিরীটী কোন বিশেষ কারণেই বিশেষ চিন্তান্বিত হয়ে উঠেছে। হঠাৎ আপন মনেই যেন কিরীটী বিড়বিড় করে বলতে লাগল, শেষ পর্যন্ত—শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা তাহলে এই দাঁড়াল! কিন্তু… কিন্তু….

অনেকক্ষণ বাদে আবার কিরীটী এক সময় সুব্রতর দিকে তাকিয়ে বললে, বাবলুকে না-হয় আজই আমার বাড়িতে রেখে যা সু। সাবধানের মার নেই। আর কাল সকালে সর্বাগ্রে আমাদের মিঃ সরকারের অ্যাটর্নীর কাছে যেতে হবে। হ্যাঁ ভাল কথা, মিঃ সরকারের ঘর দুটো লক আপ করা আছে তো?

হ্যাঁ।

কাল রাত্রে ছোট্ট একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে।

কোথায়?

মিঃ সরকারের বাড়িতে।

বেশ।

তুই বাবলুকে নিয়ে আয় এখুনি।

সুব্রত উঠে দাঁড়াল।

সন্ধ্যা তখন সবে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে।

রাত্রির কালো ছায়া পৃথিবীর বুকের ওপরে ঘন হয়ে চেপে বসেছে।

সুব্রত এসে ডাঃ বোসের বাড়িতে প্রবেশ করল। অমিয়াদি রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে বামুনঠাকুরকে রাত্রির রান্নার আয়োজন সম্পর্কে উপদেশ দিচ্ছিলেন, সুব্রত এসে ডাকল, অমিয়াদি!

কে? সুব্রত, এস ভাই।

বাবলু কোথায় অমিয়াদি? তাকে নিতে এসেছি।

অমিয়াদি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে সুব্রতর মুখের দিকে তাকালেন।

আমি কিরীটীর ওখান থেকে আসছি অমিয়াদি। কিরীটী বলে দিল, বাবলুকে তার ওখানে নিয়ে যেতে।

তুমি কি রাণুর ব্যবহারে দুঃখিত হয়েছ ভাই? অবিশ্যি যে ব্যাপার ঘটে গেছে তার জন্য তোমার জামাইবাবু ও আমার লজ্জার অবধি নেই। ক্ষমা চাইবার মত মুখও আমাদের নেই। তোমার কাছে। তবু সে ছেলেমানুষ, তার ছেলেমানুষী বুদ্ধিতে…

সুব্রত বাধা দিল, ছি ছি। দিদি, আপনি ওসব কথা মনে করছেন কেন? রাণু ছেলেমানুষ, ছেলে-বুদ্ধিতে যদি সে কিছু করেই থাকে তাই বলে আমরাও তো সেই সঙ্গে ছেলেমানুষ হতে পারি না অমিয়াদি! ওসব কথা ভুলে যান। নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য নিয়ে কিরীটী বাবলুকে তার ওখানে নিয়ে যেতে বলেছে। বাবলুর জীবনের সব কথাই তো আপনি জানেন অমিয়াদি। আমাদের বিশ্বাস বাবলুর মা-বাবা এখনও বেঁচে আছেন। একটা গভীর রহস্য আবৃত হয়ে আছে। ওর জীবনটায়। সেই রহস্যের জটগুলো খুলে ওকে আমরা ওর মা-বাবার হাতে আবার তুলে। দিতে চাই। ওর যাওয়াতে আপনি দুঃখিত হবেন না।

বেশ, তবে নিয়ে যাও ভাই।

বাবলু কোথায় অমিয়াদি?

ওপরে রাস্তার দিকের ব্যালকনিতে বসে আছে দেখে এসেছি একটু আগে।

বেশ, আমি নিজেই যাচ্ছি। সুব্রত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।

ব্যালকনির অনুজ্জ্বল বৈদ্যুতিক আলোয় বাবলু চুপটি করে গালে হাত দিয়ে বসে ছিল।

সুব্রত ডাকলে, বাবলুমণি?

কে, দাদামণি? বাবলু চমকে মুখ তুলে সামনের দিকে তাকাল।

সুব্রতকে সামনে দেখে বাবলু আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে দুহাতে সুব্রতকে জড়িয়ে ধরল, ভালো আছ দাদামণি?

হ্যাঁ, তুমি কেমন আছ ভাই?

ভাল।

জান বাবলু, তোমাকে আজ আমি নিয়ে যেতে এসেছি!

কোথায় যাব দাদা?

আমার এক বন্ধুর বাড়িতে। তুমি যাবে তো সেখানে?

নিশ্চয়ই। যেখানে আপনি আমাকে নিয়ে যাবেন সেইখানেই যাব।

লক্ষ্মী মেয়ে বাবলু আমাদের। যাও জামাকাপড় পরে চটপট তৈরি হয়ে নাও। আমরা এখনি যাব।

বাবলু ধীর মন্থরপদে ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল।

জামাকাপড় পরে তৈরি হয়ে বাবলু সুব্রতর সামনে এসে দাঁড়াল।

বাবলুর গায়ের রং এই কদিনের সেবা-যত্নে অনেকটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। দুগালে গোলাপী আভা দেখা দিয়েছে যেন।

আকাশ-নীল রংয়ের একটি ফ্রক, মাথায় লাল রংয়ের একটা চওড়া ফিতে বাঁধা। কোঁকড়া কেঁকড়া চুলগুলো অমিয়াদি সযত্নে আঁচড়িয়ে দিয়েছেন। আগাগোড়া সবকিছু মিলে যেন সুন্দর একটি ফোটা ফুলের মতই বাবলুকে মনে হচ্ছিল।

বাবলুর পিছনে পিছনে অমিয়াদি একটা চামড়ার সুটকেস হাতে এসে দাঁড়ালেন, বাবলু, এই তোমার সুটকেস! এতে তোমার জামাকাপড়, খেলনা, বই সব গুছিয়ে দিয়েছি।

বাবলুর মুখখানা যেন একটু বিষণ্ণ। অমিয়াদিকে প্রণাম করে সুব্রতর পিছু পিছু সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে হঠাৎ সে থেমে গেল।

সুব্রত পিছনে ফিরে ডাকল, কী, থামলে যে?

আপনি একটু দাঁড়ান দাদা, আমি এখুনি আসছি।

বাবলু ত্রস্তপদে উপরে উঠে গেল। যে ঘরে রাণু থাকে সেই ঘরে এসে ঢুকল।

একটা সোফার ওপরে হেলান দিয়ে রাণু একটা ছবির বই দেখছিল। বাবলু সোফার পিছনে এসে মৃদুস্বরে ডাকলে, রাণুদি!

রাণু চমকে বাবলুর মুখের দিকে তাকাল।

সেদিন রাত্রের ঘটনার পর বাবলুর সঙ্গে রাণুর একটি কথাও হয়নি। বাবলু ভয়ে সংকোচে এড়িয়ে চলছিল রাণুকে।

দুজনের মধ্যে একটা সম্রমের দূরত্ব বাঁচিয়ে রেখে বাবলু নিজেকে একেবারে সংকুচিত করে নিয়েছিল রাণুর দৃষ্টির সামনে থেকে। আর রাণু! সে রাত্রের সেই আকস্মিক ঘটনা-বিপর্যয়ে তার মনের মধ্যে যেন একটা প্রবল ঝড় বয়ে গেছে।

বাবলু যখন এ বাড়িতে প্রথম পা দেয়, একটা প্রচণ্ড হিংসার ঢেউ রাণুর সমগ্র শিশুচিত্তকে বাবলুর প্রতি একান্ত বিরূপ করে তুলেছিল। বাবলু যে তার মায়ের সমস্ত স্নেহটাকে বেদখল করে লুটে নিতে এসেছে, এটাই বড় হয়ে তার মনে জেগে উঠেছিল।

এমন সময় দুশমনদের দলের একজন, যে সদাসর্বদা ডাঃ বোসের বাড়িতে বাবলুর প্রতি নজর রেখে সুযোগের অপেক্ষায় ঘুরছিল, রাণুকে একদিন সন্ধ্যায় পার্কে পাকড়াও করলে। রাণুর সঙ্গে সে বাবলু সম্পর্কে দুএকটা কথা বলতেই বুঝতে পারলে, তীব্র হিংসার হলাহলে বাবলুর প্রতি রাণুর মনটা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। তখুনি সে মনে মনে মতলব করলে, কণ্টক দিয়েই কণ্টকের উদ্ধার করতে হবে। সহজেই সে রাণুকে নিজের দলে ভিড়িয়ে নিয়ে মতলব ঠিক করে ফেললে। রাণু বাবলুর সহজে একটা ব্যবস্থা করতে পারায় সন্তুষ্ট হয়ে বাড়ি ফিরে এল।

তারপর ঘটনার আকস্মিকতায় যখন সব ওলটপালট হয়ে গেল, বাবলুর বদলে সে নিজেই শয়তানদের খপ্পরে গিয়ে পড়ল, তখন সে ভয়ে-ভাবনায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।

তারপর তারা রাণুকে নিজেদের আড্ডায় নিয়ে গিয়ে বন্দী করে রাখলে এবং তাকে বললে, বাবলুকে না ধরে আনা পর্যন্ত তার মুক্তি নেই। এমন কি বাবলুকে না পেলে তারা তাকে কেটে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেবে, কেউ তার সংবাদ পাবে না। বন্দী রাণু খাটের ওপরে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় শুয়ে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে সে যখন প্রায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, এমন সময় বাবলুই সুব্রতকে নিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করলে। আবার সে হতভম্ব হয়ে গেল।

উদ্ধার করে আনবার পর সে ভেবেছিল, মাবাবা নিশ্চয়ই তাকে খুব বকবেন। কিন্তু কেউ যখন তাকে একটা কথাও বললেন না, তখন সত্যিই সে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। বাকি রাত্রিটুকু সে একবারও চোখের পাতা দুটো বুজতে পারলে না। চোখ বুজলেই সেই ভীষণ-দর্শন শয়তান লোকগুলোর মুখ মনের পাতায় ভেসে ওঠে।

সহসা রাণুর নিজের কাছে নিজেকে যেন একান্ত ছোট ও হীন বলে মনে হতে লাগল। কতবার সে ভাবলে, বাবলুর কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইবে, কিন্তু লজ্জা ও সংকোচে সে এক পাও এগুতে পারলে না।

এমনি মনের বিপর্যয়ের মধ্যে সহসা বাবলুই যখন এসে তাকে ডাক দিল, তখন ও চমকে উঠল।

বাবলু ধীরে সংকোচের সঙ্গে বললে, রাণুদি, আমি চলে যাচ্ছি। আর তোমাকে বিরক্ত করতে আসব না।

কথা কটি বলে বাবলু ধীরপদে ঘর থেকে বের হবার জন্য দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

বাবলু! সহসা রাণুর ডাকে ও চমকে দাঁড়িয়ে গেল।

রাণু এগিয়ে এল বাবলুর একেবারে কাছটিতে, কোথায় তুমি যাচ্ছ বাবলু?

দাদার সঙ্গে চলে যাচ্ছি।

রাণু বাবলুর একখানা হাত চেপে ধরল, কেন যাবে ভাই? এবার থেকে তোমাকে আমি খুব। ভালবাসব। যেও না তুমি, এখানেই আমাদের বাড়িতে থাক।

রাণুর চোখের কোল দুটি সহসা অশ্রুসজল হয়ে উঠে।

বাবলুরও চোখে জল এসে গেল। বাইরে সুব্রতর ডাক শোনা গেল, বাবলু এস, দেরি হয়ে যাচ্ছে!

যাই দাদা।

পরের দিন সকাল।

কিরীটী ফোনে সুব্রতকে যথাযথ উপদেশ দিয়ে বাবলুকে সঙ্গে নিয়ে বের হল।

আমহার্স্ট স্ট্রীটে আর্টিস্ট সুবোধ দত্তের বাড়িতে যখন কিরীটী ও বাবলু এসে দাঁড়াল, বেলা তখন প্রায় সোয়া দশটা হবে।

দরজার কড়া নাড়তেই সুবোধবাবু এসে দরজা খুলে দিলেন।

কিরীটীর দিকে তাকিয়ে বললেন, কাকে চান? কে আপনি?

কিরীটী হাসতে হাসতে সুবোধবাবুর মুখের দিকে চেয়ে বললে, আপনিই শিল্পী মিঃ দত্ত?

হ্যাঁ।

আমার নাম কিরীটী রায়।

আমার কাছে আপনার কী প্রয়োজন? মিঃ দত্তর গলার স্বরটা যেন একটু রূঢ়।

প্রয়োজন একটা আছে নিশ্চয়ই, কিন্তু সেটা আপনার সঙ্গে নয়!

তবে কার সঙ্গে?

কিন্তু কথাটা তো ছোট্ট নয়, একটু সময় নেবে। তাছাড়া আমার যা বলবার তা এই দরজার উপরে দাঁড়িয়ে বলা যায় না—ঘরের মধ্যে যেতে পারি কি?

ভ্রূ দুটো কুঁচকে সুবোধবাবু যেন এক মুহূর্ত কি ভাবলেন, তারপর বিরক্তিমিশ্রিত স্বরে বললেন, বেশ আসুন। কিন্তু সময় আমার খুব অল্প।

কিরীটী বাবলুকে সঙ্গে করে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললে, সময়ের দাম আমারও আছে মিঃ দত্ত! ঠিক কাজের কথাটুকু বলা হলেই আমি চলে যাব, এক মুহূর্তও বেশি থাকব না বা আপনাকে বিরক্ত করব না।

একটা সোফা অধিকার করে কিরীটী বসল।

বলুন কি প্রয়োজন আপনার?

আমার প্রয়োজন আপনার বোন নমিতা দেবীর সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে একবার দেখা হতে পারে কি?

সুবোধবাবু দারুণ বিরক্তিতে বললেন, কি প্রয়োজন আপনার আমার বোনের সঙ্গে?

সেকথা আমি তার কাছেই বলতে চাই, আপনার কাছে নয়। তবে আজ যে কথা আমি বলতে এসেছি তার সঙ্গে, তার উপরে আপনার মান সম্রম অনেক কিছুই নির্ভর করছে।

না, তার সঙ্গে আপনার দেখা হবে না। আপনার যা বলবার আমার কাছেই বলতে পারেন।

বলেছি তো মিঃ দত্ত, তা বলতে পারব না। বৃথা সময় নষ্ট করে দুদুটো নির্দোষ জীবন ধ্বংসের পথে এগিয়ে দেবেন না!

না, আমি কোন কথাই শুনতে চাই না, আপনি চলে যেতে পারেন। আমার বোনের সঙ্গে কারও দেখা হবে না। মিঃ দত্ত চিৎকার করে উঠলেন।

সুবোধবাবু, আপনি অনেক দাগা পেয়েছেন, আমি জানি। কিন্তু আজ যদি আপনি আপনার বোনের সঙ্গে আমায় দেখা করতে না দেন, তবে যে দাগা পাবেন তার সান্ত্বনা আপনার কোনদিন মিলবে না।

এমন সময় নমিতা দেবী নিজেই এসে ঘরে প্রবেশ করলেন, কী হয়েছে দাদা?

নমস্কার। আপনার নাম কী নমিতা দেবী?

হ্যাঁ, নমস্কার। কিন্তু আপনি!

আমার নাম পরে শুনবেন। কোন একটা বিশেষ কাজে আপনার কাছে আমি এসেছি, কিন্তু আপনার দাদা কিছুতেই আপনার সঙ্গে আমায় দেখা হতে দেবেন না!

কী দরকার আমার কাছে আপনার, বলুন?

মিঃ দত্ত গজগজ করতে করতে ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেলেন।

বসুন নমিতা দেবী।

নমিতা সামনেই একখানা সোফা অধিকার করলেন।

বলুন।

ইতিমধ্যে কিরীটী বাবলুকে নমিতা দেবীর দৃষ্টির আড়ালে নিজের পিছনের একখানা চেয়ারে বসিয়ে রেখেছিল। আরও একটু ভাল করে বাবলুকে নমিতা দেবীর দৃষ্টি থেকে আড়াল করে কিরীটী মৃদুস্বরে বলতে লাগল, বছর নয়েক আগে শিমুলতলায় আপনার দাদার কোন এক ধনী বন্ধুর সঙ্গে আপনার রেজেস্ট্রি ম্যারেজ হয়?

হ্যাঁ।

আপনার স্বামীর নামটি জানতে পারি কী?

না, কেননা আমিও তার সত্যিকারের নাম জানি না। পরিচয়ের গোড়া থেকেই তিনি নাম ভড়িয়েছিলেন আমাদের কাছে। কোনদিনই আমরা জানতে পারিনি তার দেশ ঘর বাড়ি কোথায়। কিন্তু এসব কথা আপনি জিজ্ঞাসা করছেন কেন?

আমি আজ এমন একটা সংবাদ নিয়ে আপনার কাছে এসেছি, যার উপর আপনার ও আপনার হারিয়ে যাওয়া একমাত্র সন্তানের শুভাশুভ সবকিছু নির্ভর করছে।

কে-কে আপনি? আমার কথা আপনি জানলেন কী করে?

ব্যস্ত হবেন না নমিতা দেবী, সব কথাই ক্ৰমে প্রকাশ হবে। পরিচয়ও আমার পাবেন। তবে এইটুকু জেনে রাখুন, আমি আপনার ভাইয়ের মত আপনার শুভাকাঙ্ক্ষীই, শত্রু নয়!

কিন্তু…

আগে আমার কথাগুলোর জবাব দিন নমিতা দেবী। আপনার স্বামীর নাম ছদ্মনাম কী ছিল?

জ্ঞানেন্দ্র চৌধুরী?

ঐ নামেই বিবাহ হয়েছিল?

হ্যাঁ।

ও নামটা যে তার ছদ্মনাম, কবে আপনি জানতে পারেন?

আমার সন্তানের জন্মের মাস দুই আগে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কোন একটা বিশেষ সাংসারিক গোলযোগে তিনি আমাকে তখন তাদের বাড়িতে নিয়ে যেতে পারছিলেন না, পরে সব মিটে গেলে আমাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যাবেন বলেছিলেন। তবে প্রত্যেক মাসে আমাকে দেড়শত টাকা করে ভরণপোষণ বাবদ দেবেন বলেছিলেন। শিমুলতলাতেই তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয় এবং বিবাহের কুড়ি দিন বাদেই তিনি হঠাৎ আমাদের কাউকে কোন কিছু না বলে কোথায় চলে যান। তার ঠিকানা আমার কাছে ছিল। মাস পাঁচেক নিয়মিত টাকাও পেয়েছি। কিন্তু। দশ-বারাখানা চিঠি লিখে একখানারও জবাব পাইনি। ঠিকানায় খোঁজ নিয়ে পরে জেনেছিলাম সেখানে উনি থাকেন না। সেটা একটা মনোহারী দোকান। তারপর হঠাৎ তার টাকা আসাও বন্ধ হয়ে গেল।

তারপর?

তারপর আর তার কোন খোঁজই আজ পর্যন্ত পাইনি।

না।

দাদার এক জমিদার বন্ধু ছিলেন— তার নাম বিনয়েন্দ্র সরকার। তারই দয়ায় আমি চাকরি পাই। নমিতা দেবী একে একে তার এ কয় বৎসরের জীবন কাহিনী বলে গেলেন।

আপনার মেয়েটির আর কোন সন্ধান পাননি?

না।

আপনার মেয়েটি যখন চুরি হয়, তখন তার বয়স কত ছিল?

ছয় বছর হবে।

আজ চার বছর সে চুরি গেছে?

হ্যাঁ, প্রায় পাঁচ বছর হবে।

আপনার মেয়ের নাম কি ছিল?

বাবলু। নমিতা দেবীর চোখের কোল দুটি অতীত স্মৃতির দোলায় ঝাপসা হয়ে ওঠে।

এমন সময় সহসা কিরীটী বাবলুকে সামনে টেনে এনে নমিতা দেবীর দিকে তাকিয়ে বলে, দেখুন তো, এই মেয়েটিকে আপনি চিনতে পারেন কিনা?

কে—কে? কে এই মেয়েটি? নমিতা দেবী অধীর আগ্রহে বাবলুকে বুকের ওপরে দু হাত বাড়িয়ে টেনে নিলেন।

পাগলের মতই তিনি মেয়েটির মুখের দিকে চেয়ে হঠাৎ হাসি-কান্নায় যেন দুলে উঠলেন, এই তো, এই তো আমার মেয়ে। কোথায় পেলেন একে? বাবলুবাবলু সোনা।

মা–মা-মণি!

কিছুক্ষণ বাদে কিরীটী উঠে দাঁড়াল, আজ তাহলে আসি, নমিতা দেবী। আপনার স্বামীর পরিচয় শীঘ্রই আমি আনব। কিন্তু তার আগে, আপনাকে লেখা আপনার স্বামীর কোন চিঠি যদি আপনার কাছে থাকে, তবে সেটা দিলে আমার খুব সুবিধা হয়।

আছে—প্রথম দুখানা চিঠি এখনও আমার কাছে আছে। এখুনি এনে দিচ্ছি।

আমহার্স্ট স্ট্রীট থেকে বের হয়ে কিরীটী ক্লাইভ স্ট্রীটে মিঃ সরকারের অ্যাটর্নীর অফিসে গিয়ে প্রবেশ করল এবং কিছুক্ষণ ধরে অ্যাটর্নীর সঙ্গে কথাবার্তা বলে যখন সে অ্যাটর্নী-অফিস থেকে। বের হয়ে এল, বেলা তখন প্রায় দুটো। অ্যাটর্নী কলকাতায় ছিলেন না, তাই এর আগে কিরীটী তার সঙ্গে দেখা করতে পারেনি।

টালিগঞ্জের বাড়িতে ফিরে এসে কিরীটী দেখলে, বাইরের ঘরে একটা সোফার ওপরে হেলান দিয়ে চোখ বুজে পড়ে আছে সুব্রত।

কিরীটীর পায়ের শব্দে সুব্রত চোখ মেলে তাকাল, এত দেরি হল যে?

সব কাজ সেরে এলাম। তুই কতক্ষণ এসেছিস?

প্রায় ঘন্টাখানেক।

মিঃ বি. সরকারের শয়নঘর ও লাইব্রেরিঘর যা চাবি দেওয়া ছিল—সেটা নিয়ে এসেছিস তো?

হ্যাঁ।

সকলকেই আড়ালে ডেকে আলাদা আলাদা করে বলে এসেছিস তো যে ও-ঘরের মধ্যে যেন কেউ না ঢোকে?

হ্যাঁ। তারপর তোমার কাজ কতদূর এগুলো?

প্রায় কমপ্লিট। শুধু সামান্য একটু একত্সপেরিমেন্ট আজ রাত্রে যা বাকি। ব্যস, তারপরই খুনী ধরা পড়বে। তুই বোস, চট্র করে আমি স্নানটা সেরে আসছি—অনেক আলোচনা করবার আছে।

কিরীটী বাড়ির ভিতরে চলে গেল।

***

সামনে ধূমায়িত চায়ের দুটো কাপ।

কিরীটী বলছিল, প্রথম দর্শনে কেসটা আমার বেশ জটিল বলেই মনে হয়েছিল। তার অবিশ্যি কারণ ছিল তিনটি ১নং মৃত ব্যক্তি চেয়ারে বসে ছিল কেন? মানে ঐ চেয়ারে বসা অবস্থায় ছিল কেন? ২নং, মিঃ সরকারের হাতঘড়িটা ভাঙল কি করে? আর ৩নং কারণ, সহজ দৃষ্টিতে বিচার করে দেখতে গেলে খুন করবার যে মোটিভ মিঃ সরকারের উইলের দ্বারা লাভবান হওয়া, তা ওবাড়ির প্রত্যেকের পক্ষে সম্ভব ছিল। কেন আমি একথা বলছি, কারণ ও বাড়ির প্রত্যেকের পক্ষে সম্ভব ছিল খুন করা!

কারণ প্রথম দর্শনেই আমি স্থিরনিশ্চিত হয়েছিলাম, মিঃ গজেন্দ্র সরকারকে খুন করেছে ও-বাড়িরই কেউ। বাইরের লোকের দ্বারা ওভাবে মিঃ সরকারের খুন হওয়া একেবারেই সম্ভব ছিল না। সেকথাটা সর্বাগ্রে না বলে নিলে বাকি কথাগুলো তোমার কাছে খোলসা হবে না। সব কিছু বিচার করবার আরল আগে যে কথাটা সকলের মনেই সন্দেহের দোলা জাগাতে পারে, সেটা হচ্ছে মিঃ সরকারের মৃত্যু কী করে ঘটেছিল! ডাক্তারের ময়নাতদন্তের বিবরণ থেকে যা প্রকাশ হয়েছে, তা থেকে আমরা জানি বা জানতে পেরেছি, মিঃ সরকারের মৃত্যু ঘটেছে আনুমানিক মধ্যরাত্রিতে অর্থাৎ বারোটা-একটার মধ্যে। এবং তীক্ষ্ণ হাইড্রোসায়নিক অ্যাসি বিষে তার মৃত্যু ঘটানো হয়েছে। অ্যানালিসিস করে তাই পাওয়া গেছে।

তার বক্ষের ফিফথ ইনটারকস্টাল স্পেসে যে পাংচার-উন্ড দৃষ্ট হয়, সেটার তাৎপর্য মৃত্যুর কারণের পরে কিছুই নেই। অন্য লোককে বিপথে নিয়ে যাওয়ার জন্য ওটা স্রেফ একটা ধোঁকা মাত্র এবং হয়েছিলও তাই। তুমি তদন্ত করতে গিয়ে সেই ক্ষতচিহ্নটিকে নিয়েই বেশি মাথা ঘামাতে শুরু করেছিলে। সিরিঞ্জের ইতিহাস ও তার গুঢ় তত্ত্ব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলে। আসলে ঐ সিরিঞ্জটাও খুনীর ইচ্ছাকৃত আর একটা চাল এবং নিজের ঘাড় থেকে অন্য এক নির্দোষীর ঘাড়ে খুনের দায়টা চাপিয়ে দেবার জন্য একটা উৎকৃষ্ট উদ্ভাবিত পন্থা মাত্র।

কিন্তু কেমন করে সেকথাটা আমার মনে পরিষ্কার হয়ে যায়?

খুনী একটা ভুল করেছিল—সেটা বড় মারাত্মক ভুল। খুন করবার পর ঐভাবে সেটাকে সাজাবার জন্য মৃতের বক্ষে ফিফথ ইন্টারকস্টাল স্পেসে পাংচার করা ও সিরিঞ্জটা অশোকের ঘরে রেখে যাওয়া। ঐ কাণ্ড দুটো করে সে নিজের পরিচয় নিজেই দিয়ে গেছে।

ব্যাপারটার মধ্যে যে এতটুকু সত্যি নেই, আগাগোড়াই সাজানো, তা আমি কেমন করে বুঝলাম? প্রথমত, ঐভাবে কোন নিল দিয়ে হার্টকে পাংচার করে কোন মানুষকেই মারা যায় না। দ্বিতীয়ত, ঐভাবে মারাটাও একপ্রকার অসম্ভব। ধরে নিচ্ছি মিঃ সরকারের কোন একান্ত পরিচিত লোকই মিঃ সরকারের হার্টে পাংচার করে কোন বিষ প্রয়োগের দ্বারা মেরেছে। কিন্তু মরবার সময় তিনি নিশ্চয়ই চীৎকার করে উঠতেন। কেউই ওভাবে অন্যের হাতে প্রাণ দিতে। প্রস্তুত নন। আর যদি ঘুমিয়েই থাকতেন, তবে ঐ সময় হার্ট পাংচার করবার সময় নিশ্চয়ই জেগে উঠতেন ও একটা গোলমাল হত। এই দুটো ব্যাপারেই আমার মনে হয়েছিল ফিফথ ইনটারকস্টাল স্পেসের পাংচার-উন্ড ও সিরিঞ্জটা খুনীর একটা চাতুরী মাত্র! অন্যের বিচার-পদ্ধতিকে ভুলপথে নিয়ে যাওয়া! তাহলে মীমাংসিত হল, মিঃ সরকার বিষ প্রয়োগের দ্বারাই খুন হয়েছেন এবং তাই যদি হয়ে থাকেন তবে সে বিষপ্রয়োগে কী ভাবে সম্ভব হল? এইখানেই খুনী চরম বুদ্ধির বিকাশ দেখিয়েছে।

তোমার হয়তো মনে থাকতে পারে সুব্রত, খুনের পরদিন সকালে যখন, তুমি সবার জবানবন্দী নাও, তখন কয়েকটা কথা যা আমার মনে খটকা লাগিয়েছিল। ১নং হচ্ছে, মিঃ সরকারের হাতঘড়িটা ভাঙল কী করে? বলেছিলাম, ভাঙার তো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু কেন ছিল না। তার কারণ তোমাদের মনে স্বতঃই একটা প্রশ্ন উঠেছিল, মিঃ সরকার নিশ্চয়ই চেয়ারে যখন অধ্যয়ন করছিলেন, এমন সময় খুনী এসে তাকে হার্টে সিরিঞ্জের দ্বারা বিষপ্রয়োগ করে খুন করেছে। তোমাদের হাইপথেসিসই যদি সত্যি বলে মানো, তবে হাতঘড়িটা তার ভাঙবে কেন? এমন নিশ্চয়ই হতে পারে না যে, খুনী খুন করবার পর ইচ্ছা করেই মিঃ সরকারের হাতঘড়িটা ভেঙে রেখে গেছে! তবে?

দ্বিতীয় কথা, রাত্রি দেড়টার সময় রামচরণের হঠাৎ একটা শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু সে ঘরের মধ্যে উঁকি মেরে দেখে, মিঃ সরকার চেয়ারেই বসে আছেন। এখন কথা হচ্ছে, শব্দটা কিসের? শব্দটা আর কিছুই নয়, মিঃ সরকার মৃত্যুযন্ত্রণায় খাটের উপর থেকে পড়ে যাওয়ায় ঐ শব্দ হয়।

সুব্রত বিস্মিত কণ্ঠে বললে, খাটের উপর থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। তার মানে?

হ্যাঁ, খাটের উপর থেকেই তিনি মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলেন। এবং পড়বার সময় তার হাতঘড়িটা ভেঙে যায়। রামচরণের জবানবন্দীর একটা কথা তোমার মনে আছে কিনা জানি না, সে বলেছিল, মিঃ সরকার অনেক রাত্রি পর্যন্ত জেগে পড়াশুনা করতেন লাইব্রেরি ঘরে বসে। যতক্ষণ না শুতে যেতেন, ঘড়িটা তার হাতেই বাঁধা থাকত। অনেক সময় ঘড়ি হাতে বাঁধাই থাকত—শুয়ে পড়তেন। এর থেকেই প্রমাণ হয়, সে রাত্রে ঘড়িটা তার হাতেই বাঁধা ছিল এবং হয়তো মন খারাপ ছিল বলেই রাত্রে যখন শুতে যান ঘড়িটা হাত থেকে খুলে রাখতে ভুলে গিয়েছিলেন। ঐ দুটি কারণ থেকে আমি বুঝেছিলাম, মিঃ সরকার রাত্রে পড়াশুনা সেরে শয্যায় শোবার পর খুনী তাকে বিষপ্রয়োগ করে।

কথা হচ্ছে কী ভাবে খুনী বিষপ্রয়োগ করলে? একটা জিনিস তোমার মনে আছে? মৃত ব্যক্তির বাঁ হাতের কড়েআঙুলে একটা পট্টি জড়ানো ছিল! মৃত্যুর দিন সকালে ভাঙা গেলাসের কাঁচের টুকরো তুলতে গিয়ে আঙুলটা কেটে যায়! আঙুলটার ঐ ক্ষতস্থান দিয়েই খুনী বিষপ্রয়োগ করে। বিষের ক্রিয়া শুরু হতেই মিঃ সরকারের ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু তীক্ষ্ণ বিষ হাইড্রোসায়নিক অ্যাসিডের ক্রিয়া এত দ্রুত যে, কিছু বুঝবার আগে তাঁর মৃত্যু হয় এবং ঘুম ভাঙার সঙ্গেসঙ্গেই হয়তো বিষের যাতনায় তিনি ছটফট করতে গিয়ে খাট থেকে মাটিতে পড়ে যান। খুনীর মানসিক বল অত্যন্ত বেশী। মুহূর্তে সে মৃতদেহ মাটি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দেয়। কিন্তু সে পালাতে পারে না, পাশের ঘরেই আত্মগোপন করে। কেননা ঠিক সেই সময় শব্দ শুনে রামচরণ ঘরে এসে ডাক দেয়। এবং রামচরণও মিঃ সরকারকে চেয়ারে বসে থাকতে দেখে কোন কিছু সন্দেহ না করে শব্দটা শোনবার ভুল ভেবে চলে যায়।

রামচরণ চলে যাবার পর খুনী তার প্ল্যান কাজে লাগায়। পাশেই ছিল অশোকের ঘর। সমস্ত প্ল্যান সে আগেই ঠিক করে রেখেছিল। ব্যালকনি দিয়ে অশোকের ঘরে প্রবেশ করে সেখান থেকে সিরিঞ্জটা চুরি করে এনে মৃতের হার্টে পাংচার করে। তারপর ঐ পথেই ফিরে গিয়ে অশোকের ঘরে আবার সিরিঞ্জটা রেখে আসে। অশোক তখন ঘুমচ্ছে।

এই সব কাজ শেষ হবার পর তার উর্বর মস্তিষ্কে আর একটা চাল উদয় হয়। সে সব ঘড়িগুলো দুটো বাজিয়ে বন্ধ করে দেয়! যাতে সকলের মনে হয়, রাত্রি দুটোর সময় মিঃ সরকারকে খুন করা হয়েছে!

কিন্তু কেন, ঘড়িগুলোকে দুটো বাজিয়ে রাখবার কারণ কি?

খুনী ঐ সময়টা একটা alibi তৈরি করে রাখে। সে দেখাতে চায়, ঐ সময় সে অন্য জায়গায় ছিল। মৃতব্যক্তির আশেপাশে কোথাও ছিল না। কিন্তু সেটা পরের কথা। পরে ভেবে দেখলেই হবে।

খুন করবার পর সমস্ত প্ল্যান মত সাজিয়ে রেখে খুনী পালিয়ে গেল কোন পথে? এবার সেই আললাচনাই করব। কিন্তু তারও আগে আমাদের একটা কথা ভেবে দেখতে হবে, খুনী এল কোন্ পথে?

তাহলে তুমি বলতে চাও, খুনী বাইরে থেকে এসেছিল? ঠিক যতটুকু বলেছি তার বেশী কিছুই আমি বলতে চাই না সুব্রত! বাকিটা তোমাকে ভেবে দেখতে হবে। বিচার করে দেখতে হবে কার পক্ষে খুন করা সম্ভব! আগেই তোমাকে একটা কথা বলেছি, যে খুন করেছে সে মিঃ সরকারের পরিচিত এবং সে ঐ বাড়ির সব কিছুর সঙ্গে একান্ত পরিচিত। কিন্তু সেকথা বলবার আগে আমি একটা ছোটখাটো experiment করতে চাই। আজ রাত্রে মিঃ সরকারের ঘরে সেই experiment হবে। বলতে বলতে কিরীটী চক্ষু মুদ্রিত করে সোফায় হেলান দিয়ে নীরব হল।

মিঃ সরকারের শয়নকক্ষ। রাত্রি দুটো বাজতে আর মাত্র মিনিট পনের-যোল বাকি। মিঃ সরকারের শয়নকক্ষে সকলেই এসে জমায়েত হয়েছেন। কিরীটী, সুব্রত, তালুকদার, সুবিমল চৌধুরী—মৃত মিঃ সরকারের জ্যেষ্ঠপুত্র গণেন্দ্র, কনিষ্ঠপুত্র সৌরীন্দ্র, ভাই বিনয়ে, ভাগ্নে অশোক, ভৃত্য রামচরণ আর গোপাল।

ঘরের মধ্যে উপস্থিত সকলের মুখেই একটা গভীর উত্তেজনার কালো ছায়া যেন থমথম করছে। কিরীটী তার হস্তধৃত জ্বলন্ত সিগারে একটা টান দিয়ে বললে, ভদ্রমহোদয়গণ, কেন আজ এই গভীর রাত্রে আপনাদের এখানে সমবেত করেছি তার জবাব এখনি পাবেন। আপনারা সকলেই মৃত মিঃ সরকারের আত্মীয়। পুলিসের লোকদের ধারণা, মিঃ সরকার খুন হয়েছেন। আপনারা প্রত্যেকেই হয়ত হিতাকাঙ্ক্ষী। সেক্ষেত্রে নিশ্চয়ই আপনারা সকলেই চান যে হত্যাকারী ধরা পড়ুক। আমি হত্যাকারীকে ধরিয়ে দেব।

কিন্তু তার আগে একটা জিনিস আপনাদের দেখাতে চাই। আপনাদের ধারণা, মিঃ সরকার যখন চেয়ারে বসে এই লাইব্রেরি ঘরে অধ্যয়নে রত ছিলেন, সেই সময় কেউ তাকে সিরিঞ্জের সাহায্যে হার্টে বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করেছে। কিন্তু আমার ধারণা, আসলে ব্যাপারটা তা নয়। বলতে বলতে কিরীটী তালুকদারকে ডাকলে। তালুকদার সঙ্গে সঙ্গে পাশের ঘর থেকে এসে ঐ ঘরে প্রবেশ করলেন। তালুকদারের দিকে তাকিয়ে ঘরের সব কটি প্রাণীই বিস্ময়ে যেন হতবাক হয়ে গেল। তালুকদার একেবারে নিখুঁতভাবে মৃত মিঃ সরকারের ছদ্মবেশে সুসজ্জিত হয়ে এসেছেন।

কিরীটী তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে সকলের মুখের দিকে চোখ বুলিয়ে নিল। তালুকদারকে চোখ টিপে ইসারা করতেই তিনি গিয়ে মিঃ সরকারের শয্যার ওপরে শুয়ে পড়লেন। তাঁর বাঁহাতের কড়েআঙুলে একটা পট্টি বাঁধা।

তালুকদার ঘুমের ভান করে চোখ বুজে পড়ে রইলেন শয্যার ওপরে। এমন সময় পা টিপে টিপে সুব্রত শয্যার কাছে এগিয়ে গিয়ে চটপটু তালুকদারের আঙুলের পট্টিটা খুলে পকেট থেকে একটা শিশি বের করে কী একটা জলীয় পদার্থ সেখানে ঢেলে দিল।

সঙ্গে সঙ্গে তালুকদার হঠাৎ যেন চমকে উঠে প্রবল মোড়ামুড়ি দিয়ে ধপ করে খাট থেকে মাটিতে পড়ে স্থির হয়ে গেলেন।

তখন সুব্রত চকিতে তালুকদারকে মাটি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে লাইব্রেরি ঘরে চেয়ারের ওপরে বসিয়ে দিল। পরে পকেট থেকে সিরিঞ্জটা বের করে যেমন তার বুকে বিধতে যাবে, সহসা ঘরের মধ্যে যারা উপস্থিত ছিল তাদের মধ্যে একজন আর্তস্বরে চীৎকার করে উঠল, আমি-আমিই খুনী! আমাকে গ্রেপ্তার করুন! কিন্তু আমাকে খুন করতে বাধ্য করেছিল কে— নেকড়ের থারা! হ্যাঁ, নেকড়ের থাবা! বলতে বলতে বক্তা উঠে দাঁড়াল।

ঘরের সব কটি প্রাণীর ব্যাকুল দৃষ্টি তখন যেন তীক্ষ্ণ শরের মতই বক্তার উপরে গিয়ে পড়েছে।

কিরীটী কঠিন আদেশের সুরে বললে, বসুন, ছটফট করবেন না! অধীরও হবেন না। আপনি যে খুনী, তা আমি প্রথম দিনেই টের পেয়েছিলাম। কিন্তু প্রমাণের অভাব এবং উদ্দেশ্য বা মোটিভ খুব স্ট্রং মনে না হওয়ায় আপনাকে সেদিন আমি ধরিনি। দিগেনবাবু, আসুন ঘরের মধ্যে! আসামীর হাতে হাতকড়া লাগান।

দরজায় অপেক্ষমাণ পুলিশের দারোগা দিগেনবাবু ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে অপরাধীর হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিলেন।

ঘরের সব কটি প্রাণী যেন বিস্ময়ে একেবারে বোবা বনে গেছে। কারও মুখে টু-শব্দটি পর্যন্ত নেই। একটা অখণ্ড নিস্তব্ধতা যেন সমগ্র ঘরখানির মধ্যে মৃত্যুর মতই থমথম করছে।
কিরীটী এবারে সকলকে ধীর গম্ভীর স্বরে সম্বোধন করে বললে, এবার আমি আপনাদের সকলকে বলবো, কেমন করে আমি খুনের কিনারা করলাম! এই খুনের ব্যাপারে একটা কুশ্রী চক্রান্ত জট পাকিয়ে আছে। এবং সেই চক্রান্তের জের টেনে আমাকে অতীত ইতিহাসের মধ্যে যেতে হবে। কিন্তু তারও আগে আমি বিশ্লেষণ করে বলব, প্রথম দিনই কেমন করে আমার চোখে ধরা পড়েছিল খুন করা কার পক্ষে বেশী সম্ভব! এক্ষেত্রে আপনারা প্রত্যেকেই মিঃ সরকারের খুনের ব্যাপারে সন্দেহের পাত্র হয়ে উঠেছিলেন, কেননা মিঃ সরকারের মৃত্যুতে আপনারা প্রত্যেকেই টাকার দিক থেকে লাভবান হন!

প্রথমেই ধরা যাক, সেরাত্রে এই বাড়িতে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন—সৌরীন্দ্রবাবু, অশোকবাবু, রামচরণ—সর্বপ্রথমেই ধরা যাক অশোকবাবুর কথা। অশোকবাবু একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট। তার পক্ষে বিষপ্রয়োগ করে মিঃ সরকারকে খুন করা এতটুকু অসম্ভব ছিল না। উইল অনুসারে তিনি মিঃ সরকারের মৃত্যুতে লাভবান। অশোকবাবু অনায়াসেই নিজের ঘরের ব্যালকনি দিয়ে সৌরীন্দ্রবাবুর ব্যালকনিতে এসে, তারপর সেখান দিয়ে মিঃ সরকারের ব্যালকনিতে এসে মিঃ সরকারকে খুন করতে পারতেন। কিন্তু তার জীবনী আলোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, চিরকাল তিনি মামার অনুগ্রহেই লালিত-পালিত। তাই মামার মৃত্যুতে তিনি লাভবান হলেও তাঁর পক্ষে এ ধরনের কাজ করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু কেন?

অশোকবাবু তার মামাকে যথেষ্ট ভালবাসতেন ও শ্রদ্ধা করতেন। তিনি জানতেন মামার সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ তিনি পাবেন। এক্ষেত্রে তিনি মামাকে খুন করতে যাবেনই বা কেন? অন্তত কোন বিবেচক বুদ্ধিমান ব্যক্তি তা করে না এবং মানুষের সাধারণ সাইকোলজিও তা বলে না। তার উপর প্রত্যেকেরই জবানবন্দীতে প্রকাশ পেয়েছে, অশোকবাবুর স্বভাব ধীর স্থির ও শান্ত। কিন্তু সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমাণ হচ্ছে, রাত্রে গোপাল এসে তার ঘর থেকে যে সময় থালা নিয়ে যায়, ঠিক সেই সময়েরই কিছু পরে মিঃ সরকার খুন হন। যে লোক একটু পরে খুন করতে যাবে, সে ঐভাবে নিশ্চিন্তে খেতে পারে না। কিন্তু তবু তার প্রতি সন্দেহ একটু থেকে যায়। এখানে আমি বেনিফিট্‌ অব্ ডাউট-এর পক্ষ নিয়েছি। যা হোক, অশোকবাবুকে বাদ দিলে এরপর যাঁর কথা মনে পড়ে–তিনি হচ্ছেন সৌরীন্দ্রবাবু।

সৌরীন্দ্রবাবুর নিজস্ব জবানবন্দীতে ও অন্যান্য সকলের জবানবন্দী থেকে যতটুকু আমরা জেনেছি, তা থেকে কী প্রমাণ হয়? সৌরীন্দ্রবাবুর পক্ষে তার পিতাকে খুন করা এতটুকুও সম্ভব ছিল না। তার কারণ অনেকগুলো। এবারে সেগুলোই একটার পর একটা আলোচনা করব। প্রথমত, সৌরীন্দ্রবাবু ছিলেন অত্যন্ত খেয়ালী ও উদ্ধৃঙ্খল প্রকৃতির। যে টাকা মাসোহারা হিসাবে তার বাপের কাছ থেকে তিনি পেতেন, তা দিয়ে তার হাতখরচ কুলাতো না। উচ্চুঙ্খল জীবনের অভিশাপ ঐখানেই। কোন উপায়েই কোথাও শান্তি নেই। টাকার জন্য তিনি জুয়া খেলতেন, রেসে যেতেন পর্যন্ত। দিনের পর দিন অধঃপতনের পথে নেমেই চলেছিলেন। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ এগারো বৎসর আগে একবার তিনি শিমুলতলায় বেড়াতে গিয়ে এক বন্ধুর বোনকে বাড়ির সকলের অজান্তে রেজেস্ট্রি করে বিবাহ করেন। বিবাহ করবার ২০২২ দিন বাদেই তিনি অকস্মাৎ গা-ঢাকা দিয়ে সরে পড়েন। শিমুলতলায় উনি ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন। কিছু দিন পরে উনি ওঁর স্ত্রীর এক চিঠিতে জানতে পারেন যে ওঁর স্ত্রীর সন্তান হবে, তখন উনি স্ত্রীকে নিয়মিত যে মাসোহারা দিতেন, তাও বন্ধ করে দেন। ওঁর একটি কন্যাসন্তান জন্মায়।

সহসা এমন সময় গণেনবাবু বলে উঠলেন, সে কি সৌরীন্দ্র, তুই বিয়ে করেছিস, এ কথা তো কাউকে বলিস্ নি! আর বিয়ে যখন করেছিলি, তখন বৌমাকে ঘরে আনিস নি কেন?

সৌরীন্দ্রবাবু একেবারে নিশূপ। একটি কথাও মুখে নেই।

কিরীটী এবারে সোজাসুজি সৌরীন্দ্রবাবুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলে, কী সৌরীন্দ্রবাবু, আমার কথা ঠিক না?

হ্যাঁ।

এ কথা এতদিন গোপন করে রেখেছিলেন কেন?

বাবার বকুনির ভয়ে। তাছাড়া আমি নাম ও জাত দুটোই গোপন করে বিবাহ করেছিলাম।

সে যা হোক, আপনি জানেন আপনার স্ত্রী ও কন্যা কোথায়?

স্ত্রী কোথায় আছে তা জানি, কিন্তু ছয় বৎসর হল কন্যার কোন সংবাদ জানি না।

কন্যার সংবাদ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন?

করেছি, কিন্তু কোন সন্ধানই পাইনি। শুনেছি ছয় বৎসর আগে কে বা কারা তাকে চুরি করে নিয়ে গেছে।

আপনার এ বিবাহের কথা আর কেউ জানত?

না।

না সৌরীন্দ্রবাবু, আপনি ঠিক জানেন না, আরো একজন এ সংবাদ জানত।

কে সে?

আপনার কাকা বিনয়েন্দ্রবাবু! কী বিনয়েন্দ্রবাবু, আপনি জানতেন না?

বিনয়েন্দ্রবাবু কোন জবাব দিলেন না। নিঃশব্দে বসে রইলেন।

আপনার বাবার মৃত্যুর দিন রাত্রে কী ব্যাপার নিয়ে আপনার সঙ্গে আপনার বাবার ঝগড়া। হয়েছিল সৌরীন্দ্রবাবু?

বাবাকে আমি আমার বিবাহের কথা বলেছিলাম বলে সেই কথারই জের টেনে তার সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়। বাবাকে ঐ কথা বলায় বাবা একটা নতুন উইল করেন এবং সে উইলের লেখাপড়া ঐদিনই শেষ হয়। বিকালে বাবা বলেন, সে উইলে আমার ভাগের সমস্ত সম্পত্তির চার ভাগের তিন ভাগ কাকার নামে ও বাকি এক ভাগ আমার স্ত্রীর নামে লিখে দিয়েছেন।

এতদিন সেকথা গোপন করে রেখেছিলেন, হঠাৎ আবার সে কথা বলতে গেলেন কেন?

নেকড়ের থাবা আমাকে ব্ল্যাকমেল করে আমার জীবন্ত করে তুলেছিল। তার খাই মেটাতে গিয়ে আমাকে রেস খেলতে হত, জুয়া খেলতে হত। অবশেষে আর না পেরে বাবার কাছে সব কথা স্বীকার করেছিলাম।

হুঁ, ব্যাপারটা এতক্ষণে পরিষ্কার হয়ে গেল। তাই বলছিলাম, সৌরীন্দ্রবাবুর পক্ষে তাঁর পিতাকে খুন করা খুবই সম্ভব ছিল। তিনি থাকতেন পাশের ঘরে। অনায়াসেই যে কোন সময়ে। এসে তার বাবাকে খুন করে আবার তিনি চলে যেতে পারতেন। কিন্তু খুন করবার পদ্ধতি দেখে বোঝা যায়, যে খুন করেছে সে বিজ্ঞানে যথেষ্ট জ্ঞান রাখে। কিন্তু সৌরীন্দ্রবাবুর পক্ষে ওভাবে খুন করা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া সৌরীন্দ্রবাবু ও অশোকবাবুর মধ্যে কেউ একজন যদি ঐ ব্যালকনি-পথে এসে খুন করতেন, তবে দুজনের একজন জানতে পারতেনই। কথাটা চাপা থাকত না। সৌরীন্দ্রবাবু তার বাবাকে খুন করলে ক্ষতিগ্রস্তই হতেন, মিঃ সরকার থাকলে হয়তো কোনও একদিন তার মত বদলাত—ব্যাপারটা সহজ হয়ে আসত। সেক্ষেত্রে উনি তার বাবাকে খুন করে সব দিক নষ্ট করতে যাবেন কেন?

এরপর আসা যাক্ রামচরণের কথায়। রামচরণকে এক কথায় আমি বিশ্বাস করেছিলাম। সে বলেছিল, রাত্রি দেড়টার সময় শব্দ শুনে সে ঘরে এসে উঁকি দেয়। সত্যিই যদি সে খুনী হতো, তবে সে অত সহজে ও কথাটা বলতে পারতো না। তাছাড়া মিঃ সরকারের মৃত্যুতে তার যা লাভ, বেঁচে থাকলেও তাই। তবে সে পুরাতন মনিবের প্রাণ নিতে যাবে কেন?

এরপর যাঁরা বাইরে ছিলেন, তাদের মধ্যে সুবিমলবাবু, গগনবাবু ও বিনয়েন্দ্রবাবু। সুবিমলবাবুর মুভমেন্ট সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, রাত্রি দেড়টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত তিনি Rainbow Cub থেকে বের হয়ে পার্ক সার্কাসে এক বিখ্যাত জুয়ার আড্ডায় ছিলেন। গণেনবাবু সিনেমা থেকে ফিরে তার বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তার কারণ তিনি জেনেছিলেন, তার বাবা আর একটা নতুন উইল করেছেন। সেই সম্পর্কে জানতে, অন্য কোন কারণে নয়। আর রাত্রি সাড়ে বারোটায় তিনি বাড়ি ফিরে যান।—খুন হয়েছে তার পরে সেকথা ময়নাতদন্তেই প্রকাশ হয়েছে। বাকি থাকলেন আমাদের বিনয়েবাবু। বিনয়েন্দ্রবাবুই খুনী—সেকথা প্রমাণিত হয়েছে। গোড়া থেকেই আমি বিনয়েন্দ্রবাবুকে সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু কেন?

বিনয়েবাবুর একটা চমৎকার অ্যালিবাই ছিল। সেটা হচ্ছে ঐ রাত্রে তিনি বরাহনগরে বন্ধুর বাসায় বিবাহ-উৎসবে মেতেছিলেন। রাত্রি বারোটা পর্যন্ত তিনি সেখানে ছিলেন। আগে থেকেই তার প্ল্যান ঠিক করা ছিল। প্ল্যান অনুযায়ী তিনি ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এসে বাথরুমের বাইরে অপেক্ষা করেন। রাত্রি সাড়ে বারোটার পর তিনি বাথরুম দিয়ে এসে দাদার লাইব্রেরি ঘরে প্রবেশ করেন। তার দাদা তখন লাইব্রেরি ঘরে বসে পড়ছেন। তিনি পর্দার আড়ালে আত্মগোপন করে থাকেন। গজেনবাবু শয্যায় শুয়ে ঘুমোবার পর বিনয়েন্দ্রবাবু তার দাদাকে বিষপ্রয়োগ করেন। তিনি কিছুদিন ডাক্তারি পড়েছিলেন, ও বি.এস-সি পাস ছিলেন। কোন্ বিষের কেমন ক্রিয়া তার পক্ষে জানা খুবই সম্ভব। তাই খুন হবার পর মিঃ সরকার যখন শয্যা থেকে মাটিতে পড়ে যান, তাড়াতাড়ি তখন তিনি মৃতদেহ তুলে নিয়ে লাইব্রেরি ঘরে চেয়ারের উপরে বসিয়ে দেন। রামচরণের আসতে একটু দেরি হয়েছিল, তার মধ্যেই বিনয়েন্দ্রবাবু কাজ হাসিল করে আত্মগোপন করেন। রামচরণ ঘরের মধ্যে খুঁজলেই বিনয়েন্দ্রবাবুকে দেখতে পেত।

যা হোক, তারপর বিনয়েন্দ্রবাবু সোজা বারান্দা দিয়েই নিজের ঘরে গিয়ে অপেক্ষা করেন। অশোকবাবু ঘুমিয়ে পড়লে তার সিরিঞ্জটা চুরি করে নিয়ে আবার দাদার ঘরে এসে প্রবেশ করেন এবং মৃতদেহের হার্টে পাংচার করে আবার নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে দুই ঘরের মধ্যবর্তী দরজা দিয়ে অশোকবাবুর ঘরে যান এবং সিরিঞ্জটা রেখে আসেন। সকলকে একটা ধোঁকা দেবার জন্য। সমস্ত ঘড়িগুলো রাত্রি দুটোর সময় বন্ধ করে নীচের সিঁড়ি দিয়ে যখন পালাতে যান, তখন গোপালের চোখে পড়ে যান। তাড়াতাড়ি আবার উপরে চলে আসেন। বাধ্য হয়েই তাকে তখন। যে পথে তিনি এসেছিলেন, সেই পথেই আবার পালাতে হয়। যদিও এতখানি দায়িত্ব নেওয়া তার পক্ষে খুবই দুঃসাহসের কাজ হয়েছিল তার উচিত ছিল লাইব্রেরি ঘরের দরজা দিয়েই বের হয়ে যাওয়া। তাই আমার মনে হয়েছিল, দরজা কেন বন্ধ? ওটা বন্ধ থাকা তো উচিত ছিল না?

আবার তিনি ট্যাক্সিতে করে বরাহনগরে বিবাহ-বাড়িতে ফিরে যান ও সকালে ফিরে আসেন। দুটো কারণে তাকে আমি সন্দেহ করি। এক নম্বর, খুনের পদ্ধতি ও দুনম্বর, তিনি নিজে একজন আর্টিস্ট। তার পক্ষে সুবিমলবাবুর হাতের লেখাটা নকল করে একটা চিঠি লেখা অসম্ভব কিছুই ছিল না। এবং করেও ছিলেন তাই। যাতে সুবিমলের ওপর সন্দেহটা পড়ে। কিন্তু কেন তিনি খুন করলেন? টাকার লোভে! সৌরীনের বিবাহের সংবাদে নিজে আত্মগোপন করে নেকড়ের থাবাকে দিয়ে তার সাহায্যে নিজের ভাইপোকে তিনি শোষণ করছিলেন এবং তিনিই ষড়যন্ত্র করে সৌরীন্দ্রবাবুর মেয়েকে চুরি করেন। ইচ্ছা ছিল সময়মত সৌরীনের কাছ থেকে ঐ মেয়েকে দিয়ে আরও কিছু শোষণ করবেন। কিন্তু ভাগ্যচক্র ঘুরে গেল—সব ভেস্তে গেল। অতি লোভে তাঁতী নষ্ট হল। তাই আমি সেদিন বলেছিলাম, খাচ্ছিল তাঁতী তাঁত বুনে, কাল হল তার এঁড়ে গরু কিনে!

আমার কাজ শেষ হয়েছে। বিনয়েন্দ্রবাবুকে সুব্রতর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সুব্রত ওঁকে দেবে ধর্মাকিরণের হাতে তুলে। সেখানে হবে ওঁর বিচার। আর সৌরীনবাবু, আপনার মেয়েটিকে সুব্রত নেকড়ের থাবার কবল থেকে উদ্ধার করেছে। সে এখন তার মার কাছে। কালই সকালে তাঁদের সঙ্গে দেখা করবেন। আচ্ছা আসি, নমস্কার। চল রে, সুব্রত, তালুকদার রইলেন, উনি ওঁর অতিথির সংবর্ধনা করবেন! বন্ধু, বড় চাল চেলেছিলে কিন্তু একটা কথা তুমি ভুলে গিয়েছিলে যে আমি কিরীটী রায়!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত