অবিনাশ বাবু

অবিনাশ বাবু

আবার একটা রবিবারের আসর। আমরা সব ভাই- বোনেরা অর্থাৎ আমাদের কাজিন গ্রুপ জড়ো হয়েছি মেজদার কাছে গল্প শুনব বলে। মেজদা শুরু করল, আজ যে গল্পটা বলব সেটা আমার নিজের জীবনেই ঘটেছিল।
স্টপ স্টপ ইট। বড়দা চেঁচিয়ে উঠল। একটা লোকের জীবনে এত্ত ঘটনা ঘটতে পারে না। আর কত মিথ্যে বলবি!

আমি মিথ্যে বলি না। সবই সত্যি। একশো ভাগ সত্যি। তোমার নিজের জীবনে তো রোমহর্ষক কিছুই ঘটে না তাই আমাকে দেখে হিংসেয় জ্বলে যাচ্ছ।
ভারি রে আমার! তোকে দেখে হিংসে করতে আমার বয়েই গেছে। আমার জীবনেও অনেক রকম ঘটনা ঘটেছে বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলে না।
মেজদা হাহা করে হেসে উঠল। মেজদাকে হাসতে দেখে বড়দা আরও চটে গেল। কিন্তু বিট্টু ঝগড়াটা হতে দিল না। নাটকীয় মুহুর্তটাকে নষ্ট করে দিল। বলল, তোমাদের কি ঝগড়া করার বয়স আছে? তোমাদের দেখে আমরা কী শিখব? আজ বরং আমি একটা গল্প শোনাই। প্রত্যেক রবিবার এক একজন তাদের নিজেদের গল্প বলবে তাহলেই আর ঝগড়া হয় না।

মেজদা শুধু বলতেই ভালবাসে শুনতে নয়। তবু চোখ মুখ কুঁচকে বসল আসরে। বড়দা শুনতে ভালবাসে বলতে নয়। মেজদার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বসল। চোখে চোখ পড়তেই দুজনেই চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। যেন কত দিনের শত্রু! কে বলবে একজন বৈজ্ঞানিক,
আরেকজন সাংবাদিক।

আমরা ভাই বোনরা দেখছি। দিভাই, টুকাইদি, বড়দি, মেজদি, ইন্দুদি বিন্দুদি। পাপাইদা, তাতাইদা,
বাপ্পাদা, বিট্টু। বিট্টু সবার ছোট।
আজকের গল্প ওই বলবে। এত কান্ড হয়ে গেল আরেকজন বসে বসে ঘুমোচ্ছে। আমাদের ছোড়দা। গল্প শুনতে বসলেই তার নাকি ভীষণ ঘুম পায়। বিট্টু শুরু করতে গিয়েও থেমে গেল।

একটু চা হলে বেশ জমে যেত।
চা করা খুব সামান্য কাজ। কিন্তু এই সামান্য কাজটা করতেই সবাই বিরক্ত হয়। অগত্যা মাসিকে ধরতে হল। ব্যাজার মুখ করে মাসি চা নিয়ে এল।
বিট্টু পকেট থেকে একটা ছেঁড়া খোঁড়া ডায়েরি বার করে পড়তে শুরু করল।

“অবিনাশবাবুকে আর বরদাস্ত করা যাচ্ছে না। উনি কি খুবই খারাপ মানুষ? মোটেই না, বরং অনেকের তুলনায় বেশ ভালমানুষ। একটু বোকা
সোকা একটু সিধে সাধা। সব মিলিয়ে মানুষ বেশ ভাল। তবে তাকে খারাপ বলছি কেন? এমনি এমনি কি আর বলছি! যথেষ্ট কারণ আছে বলার। প্রথমত, উনি গল্প উপন্যাস ইত্যাদি লেখেন। যা লিখবেন সব আমাকে পড়ে শোনানো চাই! উনি ছবিটাও ভালই আঁকেন। যখনই যা আঁকেন, আমাকে না দেখালে ওনার শান্তি হয় না। অফিস বেরুবার সময় প্রত্যেকবার পিছু ডাকবেন। আমার অফিস থেকে ফেরার সময় নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে হাওয়া খান ভদ্রলোক। প্রতিদিনই। একদিনও তার অন্যথা হবার উপায় নেই। আমাকে দেখতে পেলেই একগাল হাসি হেসে বলবেন, ‘এই যে আসুন আসুন অজয়বাবু, আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। দারুণ সুন্দর একটা প্লট ভেবেছি।

আপনাকে শোনাবো বলেই অপেক্ষা করছি’। তারপর আমাকে বগলদাবা করে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাবেন। আমার শত আপত্তি থাকলেও উনি কানে তুলবেন না। একটি করে গল্প কবিতা (উপন্যাস হলে তো আরওই গেছি!) পাঠ হবে, আর আমাকে বাহবা দিতে হবে অথবা সমালোচনা করে ত্রুটি বার করতে হবে। এক কাপ দুধ ছাড়া লিকার চা আর দুটো ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুট দিয়ে যাবেন অবিনাশ বাবুর অল টাইম হেল্পার রাধাকান্ত।

গল্পই যদি শোনাবেন তাহলে একটু দুধ দেওয়া চা খাওয়াতে পারেন। আর বিস্কুটটাও একটু ভাল দিলে কী ক্ষতি! ক্রিম ক্র্যাকারে ক্রিমের লেশমাত্র নেই। বিস্কুটদের মধ্যে ৪২০। চায়ের পর এক ধামা মুড়ি আর আলুর চপ অথবা পরটা আলুর ছেঁচকি। চা বিস্কুট -এর চেয়ে এটা বেশ ভাল তবু। যত কিপ্টেমি চায়ের ওপর। গল্প আর কবিতার সাথে সাথে ছবি আঁকা দেখাবেন। দিব্যি আছেন ভদ্রলোক। বিয়ে করেননি। বেশ বড় মানুষের ছেলে ছিলেন। তাই রুজি রোজগারের চিন্তা করতে হয় না। আমার পাশের বাড়িতেই থাকেন। আমি তখন এই শহরে নতুন এসেছি আমার বাবা মা থাকেন অনেক দূরে এক আধা গ্রাম আধা শহরে। বসন্তপুরে। প্রথম যখন এখানে এসেছিলাম অবিনাশ বাবুকে বড় আপন মনে হয়েছিল। তখনও উনি গল্প শোনাতে আসতেন। আমি সব গুলোই ভাল বলতাম ভদ্রলোককে খুশি করার জন্য। তবে ওনার লেখার হাত খারাপ নয়। আমার বাহবা দেওয়াতে অবিনাশ বাবুর উৎসাহ বেড়ে গেল। সকাল সন্ধে কবিতা আর গল্প শুনতে শুনতে মনে একটা বদবুদ্ধি গজালো। তারপর থেকে সব লেখায় একটা করে খুঁত ধরতে লাগলাম। মনে একটা আশা ছিল যে ভদ্রলোক হয়ত দুঃখ পাবেন। তার ফলে আমাকে গল্প-কবিতা শোনাবার আর চেষ্টা করবেন না। কিন্তু বিধি বাম। বললেন, ‘আপনার সমালোচনা শুনে আমার অনেকটা উন্নতি হয়েছে। আজ একজন পাঠকের চিঠি পেয়েছি। এই দেখুন সে কী লিখেছে’। তারপর পকেট থেকে চিঠি বের করে পড়তে শুরু করে দিলেন। গল্প কবিতা উপন্যাস ছবি আঁকার সাথে এবার যোগ হল পাঠকের চিঠিও।’’

এই পর্যন্ত বিট্টু পড়ার পর বড়দা বাধা দিল। হ্যাঁ র্যা, এইসব কাগজে লিখে এনেছিস কেন? তুই কি আজকাল মিষ্টুর মতো গল্প লিখছিস?

না গো বড়দা। আমার পড়া হয়ে যাওয়ার পর সব বলছি।
বিট্টু আবার পড়ায় মন দিল,
“অবিনাশ বাবু আমাকে আপনি-ই বলেন। যদিও ওনার বয়স পঞ্চাশ,
আমার থেকে প্রায় কুড়ি বছরের বড়। বেশির ভাগ সময় আমি তাঁকে নিজের বাড়ির বাগানে অথবা ছাদে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। রাস্তা দিয়ে যে লোকই যায় উনি ডেকে ডেকে কথা বলেন। আমাকে বাইরে বেরুতে দেখলে ডাকেন। আমি দেখতে না পাওয়ার ভান করি মাঝে মাঝে। তাও কি নিস্তার আছে? ‘ও মশাই একটু শুনে যান তো’! এই হাঁক একবার শুনলে আসতেই হয়। না হলে অভদ্রতা হয়। কালা হলেও বা একটা কথা ছিল। তা যখন নই তখন তো যেতেই হবে।
মাঝে মাঝেই বলেন, আমার কাছে একটা দামি জিনিস আছে। আপনাকে একদিন দেখাবো।
মনে মনে ভাবি, আপনার দামি জিনিসে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।

অবিনাশ বাবুর ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট আছে তবে তিনি মুখোমুখি বসে আড্ডা মারতেই বেশি পছন্দ করেন। পাড়ার লোকজনদের সাথেও বেশ ভাব। পুজোর সময় মোটা টাকা চাঁদাও দেন। তবে গল্প কবিতা শোনাতে আমাকেই বেশি ভালবাসেন। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেকের সাথেই কথা বলেন। কেউ কথা বলেন, কেউ এড়িয়ে যান। একদিন সন্ধে নাগাদ আমার বাড়ি এলেন। বেশির ভাগ দিন উনি ফোন করে অথবা রাধাকান্ত কে দিয়ে আমাকে ডেকে পাঠান। আজ নিজেই এলেন। হাতে করে বেশ কিছু গল্পের বই। অবিনাশ বাবুর লেখা। আমাকে উপহার দিলেন। তারপর আর যাবার নাম করেন না। বললেন, রাধাকান্ত আজ দেশের বাড়ি গেছে। আপনাকে সেই জিনিসটা দেখাই।
ভদ্রলোক পকেট থেকে একটা গোল কৌটো বার করলেন। সেটার ভেতর থেকে যেটা বেরুল তার দুত্যিতে আমার চোখে ধাঁধাঁ লেগে গেল। অবিনাশ বাবু বললেন এক রকমের হীরে। উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন।
বললাম, পকেটে এমন একটা জিনিস নিয়ে ঘুরছেন! ধন্য লোক আপনি!

– আজ থেকে এটা আপনার কাছে থাকবে।

– মানে?

– আমি কিছুদিনের জন্য দার্জিলিং যাচ্ছি। এসে ব্যাঙ্কে রাখব। ততদিন আপনার কাছে থাকবে। এটা আমি কখনো কাছ ছাড়া করিনা। তবে দার্জিলিং নিয়ে যেতে ভয় পাচ্ছি।

– আমাকে আপনার এত বিশ্বাস!

– আমি মানুষ চিনতে পারি। বলেই হেসে ফেললেন।
আমি অনেক আপত্তি করলাম কিন্তু উনি কিছুই শুনলেন না।

পরের দিন দার্জিলিং যাবার কথা।
বেশ অনেকদিন হয়ে গেল অফিস থেকে ফেরার সময় অবিনাশ বাবুকে আর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম না। প্রথমে খুশি হয়েছিলাম কিন্তু পরে মনে হল ভদ্রলোকের একবার খোঁজ নেওয়া উচিত। এই নির্বান্ধব শহরে আমার বন্ধুর অভাব মিটিয়েছেন অবিনাশ বাবুই। তিনিই আমাকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন অনেক সাহায্যও করেছেন। এখনও ঘরের চাবি আমি ওনাকে দিয়েই বসন্তপুর যাই। অবিনাশবাবু আমার একদিকে বন্ধু এবং অন্যদিকে আত্মীয়ের অভাব পূরণ করেছেন।
আমার ফোন করা উচিত ছিল অনেক আগেই। বড় বেশি স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছি। বড় শহরের হয়তো এটাই নিয়ম। জামা কাপড় বদলিয়ে ঘরে তালা দিয়ে অবিনাশবাবুর বাড়িতে গেলাম। অবিনাশ বাবুর বাড়ির গেটে বিশাল একটা তালা ঝুলছে। এত দিন লক্ষ্যই করিনি। কত বদলে গেছি আমি! পকেট থেকে ফোন বার করে অবিনাশ বাবুর নম্বর টিপতে লাগলাম। রিং হয়ে হয়ে কেটে গেল। আবার কল ব্যাক করলাম,
কিন্তু কেউ ধরল না।

মনের মধ্যে একরাশ চিন্তা। এই প্রথম আমার মনে পড়ল অবিনাশ বাবু বলেছিলেন যে তিনি দার্জিলিং যাচ্ছেন। সত্যি আমার কী ভুলো মন! কিন্তু এতদিনে তো ফেরার কথা। দু সপ্তাহ হয়ে গেল! রাধাকান্তকেও দেখিনি ক’দিন। আবিনাশবাবু
বলেছিলেন, এক সপ্তাহের জন্য যাচ্ছেন। সেই হিরের কৌটো আমি খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছি।

দার্জিলিং গেছেন খুব ভাল কথা কিন্তু ফোন কেন ধরছেন না? নেটওয়ার্ক পাচ্ছেন না? নাকি অন্য কিছু হয়েছে।
এই প্রথম বুঝতে পারলাম অবিনাশ বাবুকে আমিও অনেক ভালবাসি। এই বিরক্ত হবার পেছনেও এক ধরণের ভালবাসা আছে। এই শহরে আমার আর কেই বা আছে?

দেখতে দেখতে আরো প্রায় দু সপ্তাহ পেরিয়ে গেল। অবিনাশ বাবু আর ফিরলেন না। লোকমুখে শুনলাম অবিনাশবাবু অ্যাক্সিডেণ্টে শেষ হয়ে গেছেন। সন্ধেবেলা পথ চলতে গিয়ে খাদে পড়ে যান। অবিনাশ বাবুর ভাইপো ওখানেই থাকে। সেই কাকার শেষ কাজ করেছে। রাধাকান্ত কয়েকদিন খুব কান্নাকাটি করল।
তারপর একদিন কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
খুব খারাপ হয়ে গেল। সব সময় অবিনাশ বাবুর মুখটাই চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

প্রায় তিনমাস কেটে গেছে। শোক ভুলে একটু স্বাভাবিক হয়েছি। অবিনাশ বাবুর বাড়ির দিকে তাকালে এখনও অবশ্য বুকটা হু হু করে ওঠে। একদিন এই বাড়িতেই কত গল্প হত! আজ সেখানে শুধুই শূণ্যতা আর অন্ধকার। দিন কারোর জন্য বসে থাকে না। একদিন অফিস থেকে ফিরে দেখি অবিনাশ বাবুর বাড়িতে আলো জ্বলছে। হয়তো ভাইপো এসেছে। কাল সকালে একবার গিয়ে দেখতে হবে। রাত্তিরে ঘুমোবার আগে কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। সামনেই অবিনাশ বাবুর বাড়ি দেখা যাচ্ছে। আজ আর অন্ধকার নেই আলো জ্বলছে সারা বাড়িতে। হঠাৎ করেই লোডশেডিং হয়ে গেল।

অন্ধকারের মধ্যেই আমার মনে হল অবিনাশ বাবুদের গেটের সামনে সাদা মত একটা আবছা মূর্তি। অবিনাশ বাবু যে ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকতেন,
অবিকল সেই ভঙ্গিমা। ঠিক সেই মুহূর্তেই আলো চলে এল। আলোতে সেই আবছা মূর্তি ভ্যানিশ হয়ে গেছে। সবটাই আমার দেখার ভুল নিশ্চয়। সারা দিন আজ অনেক খাটাখাটুনি গেছে এবার ঘুমোতে হবে।
আমি শুয়ে পড়লাম এবং গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। হঠাৎ মনে হল মাথার ওপর পাখা বন্ধ হয়ে গেছে। বেশ গরম লাগছে। আবার লোডশেডিং নাকি! উফ আর পারা যায় না।

‘এই যে মশাই ঘুমোলেন নাকি?’ আচমকা কেউ ঘরের ভেতর কথা বলে উঠল। ঠিক অবিনাশ বাবুর মত গলা। আমি কি স্বপ্ন দেখছি?
‘না মশাই আপনি স্বপ্ন দেখেননি। বলুন কেমন আছেন? আমি বেশ ভাল আছি। মরার পর দেখলাম অনেক শান্তি। মরতেই যা কষ্ট’।

অন্ধকার ঘরের মধ্যে আবছা একটা সাদা রঙের মূর্তি ভেসে বেড়াচ্ছে। বললাম, ‘আপনি কি আর কাউকে পেলেন না? আমাকেই জ্বালাতে এলেন?’ নিজের সাহস দেখে নিজেই অবাক হয়ে গেলাম।

হিহি! অবিনাশ বাবু হেসে উঠলেন।
যেমন হাসতেন আর আমার গা জ্বলে যেত। এখনও দেখলাম গা জ্বলে উঠল।
‘আপনাকে আমি খুব মিস করি। আমার লেখাপত্র আপনি ঠিক করে দিতেন’।

‘আপনার এটা ভুল ধারণা। আপনি ভালই লিখতেন। আমাকে কিছুই করতে হয়নি’।

‘তা জানি না। তবে আপনি খুব সুন্দর ভুল গুলো ধরিয়ে দিতেন। আপনার সমালোচনার পর আমার লেখা অনেক ভাল হয়েছে। খুশির হাটে আমার লেখা বেরিয়েছে। সব থেকে নামি পত্রিকা ছোটোদের।’

‘ওটা কাকতালীয় ব্যাপার। ঘরের পাখা বন্ধ করলেন কেন? আমার যে গরম লাগছে!’

‘আমি বন্ধ করিনি। কারেন্ট চলে গেছে। তবে ঘর ঠাণ্ডা হয়ে যাবে এখনই।’

অবিনাশ বাবু বলা মাত্র বুঝতে পারলাম ঘরের তাপমাত্রা কমতে শুরু করেছে। ভীষণ শীত করছে আমার। বললাম, ‘খুব ঠাণ্ডা লাগছে যে মশাই।’

‘মনে করুন এসি চলছে।’ হা হা করে খুব একচোট হেসে নিলেন অবিনাশ বাবু।

আমি কাঁপতে কাঁপতে একটা বিছানার চাদর গায়ে জড়ালাম। বললাম, ‘আমি এবার ঘুমিয়ে পড়ি? অফিস যেতে হবে আবার।’

‘এই অফিস অফিস করেই বাঙালীর কিছু হল না। সারাক্ষণ গোলামের মত খাটো! উফ।’

‘আপনার মত সবাই কি হতে পারে? না সে সুযোগ পায়?’
আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম অবিনাশ বাবুর বকবকানি শুনতে শুনতে। বলছিলেন, ‘ও মশাই ঘুমোলেন নাকি! এই দেখুন একটা গল্প লিখেছি শুনুন কেমন হয়েছে।’

আমি অবাক হয়েছিলাম। ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও তাহলে ধান ভাঙ্গে।
‘হাহা! আপানাকে এত সহজে ছাড়ব না মশাই!’

অবিনাশ বাবুর বকবকানি শুনতে শুনতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি। সকাল সাতটার সময় ঘুম ভেঙ্গে গেল প্রচণ্ড গরমে। ইস কী করেছি! গরমের মধ্যে একটা বড় চাদর গায়ে দিয়ে ঘুমিয়েছি সারা রাত। মাথার ওপর পাখা ঘুরছে। সারা রাত অবিনাশ বাবুর স্বপ্নই দেখেছি।
বাজার যাবার আগে একবার অবিনাশ বাবুর বাড়ি যেতে হবে। তৈরি হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বাড়ি ঢুকে বেল বাজালাম। দরজা খুললেন একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। এক গাল হাসি নিয়েই ভদ্রলোক দরজা খুললেন। বললেন, ‘জানতাম আপনি আসবেন। আমি অক্ষয় ব্যানার্জি। ছোটোদের জন্য গল্প লিখি। এই সবে কাল এসেছি। এই বাড়ি আমি কিনেছি। নিজের লেখার সুবিধার জন্য এরকম একটা বাড়ি বহুদিন ধরেই খুঁজছিলাম।’ আমি না জিজ্ঞাসা করতেই এত কথা ভদ্রলোক বলে দিলেন।
বললাম, ‘আপনিও গল্প লেখেন?’

‘শুধু গল্প কেন, ছড়া, কবিতা,
উপন্যাস, বড় গল্প, ভ্রমণ সবই লিখি। মানে চেষ্টা করি আর কী। তেমন ভাল নয়। বেশির ভাগই অমনোনীত হয়ে যায়। আপনাকে পেয়েছি যখন আর ছাড়ছি না! লিখে প্রথমে আপনাকেই শোনাব। হা হা!’

অক্ষয়বাবুকে খুব চেনা মনে হচ্ছিল। কথা বলার ভঙ্গি এবং তাঁর চোখ দুটো। তাঁর বানানো কালো চা আর ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুট এই দুটো জিনিসও খুব ভাল করেই চিনি।

অবিনাশ বাবুর সাথে অক্ষয় বাবুর মিল চোখে পড়ার মতো। তবে অক্ষয়বাবু লেখার জগতে সবে পা রেখেছেন। আশ্চর্যের বিষয় অক্ষয়বাবু তেমন গল্প কবিতা উপন্যাস পড়েননি। আবার কিছু কিছু পড়েছেনও। না পড়েও তো অনেকেই ভাল লিখছেন তাই এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
একদিন কথায় কথায় অক্ষয় বাবুকে অবিনাশ বাবুর কথা বললাম। কিন্তু অক্ষয় বাবু জানালেন, অবিনাশ বাবুর সঙ্গে তাঁর মোটেই তেমন আলাপ ছিল না। লেখা পড়েছেন কিছু, তাও ভাল মনে নেই। অক্ষয় বাবু আমাকে পছন্দ করলেও গল্প উপন্যাস পড়ে শোনান না কখনওই বা পড়তে অনুরোধও করেন না। সাহিত্য সংক্রান্ত বিষয় ছাড়া অন্য সব বিষয়েই আড্ডা দিতে স্বছন্দ। আর তাতে আমার সুবিধাই হয়েছে।

এক মাস কেটে গেল বেশ ভালভাবেই।
অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটল। আজ দুপুরে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরলাম অফিস থেকে। শরীরটা একটু খারাপ লাগছিল। বাইরের সদর দরজায় তালা দিইনি দেখছি। ইস কি ভুলো মন আমার! ঘরে ঢুকেই মনে হল কেউ সারাবাড়ি
তল্লাশি করে গেছে। তালা আমি ঠিকই দিয়েছিলাম, কেউ পরে খুলেছে। সব কেমন যেন ছড়ানো। আমি বরাবর পরিষ্কার রাখি। বইয়ের র্যাকে একটা খালি সাবানের বাক্সের মধ্যে হিরেটা রেখেছিলাম। বাক্সটা খালি। অর্থাৎ অবিনাশবাবুর হিরে চুরি গেছে! কী করব কিছুই বুঝতে পারলাম না। পুলিশে রিপোর্ট লেখাতে যাবার সাহসও হল না।

সেইদিন রাত্রেই অবিনাশ বাবুর সাথে আবার দেখা। উনি খুব রেগে গেছেন আমার ওপর। দুই চোখ থেকে যেন আগুন ঠিকরে বেরুচ্ছে। বুঝতে পারলাম হিরে চুরি যাওয়াতে উনি আমার ওপর খুব রেগে আছেন। তবে ওনারও দোষ আছে যথেষ্টই। আমার ফাঁকা ঘর পাহারা দিতে পারতেন।

আমি কিছু বলার আগেই অবিনাশবাবু বলে উঠলেন, ‘আমি হীরের কথা জানতে চাইনি। ওটা মোটেও হীরে নয়। একটুকরো কাচ। গল্প ফাঁদতে ভালবাসতাম! আর তার জন্যই জীবনটা গেল!’

আমি চুপ করে অবিনাশবাবুর আক্ষেপ শুনছি। অবিনাশবাবু আমাকে ধমকাতে শুরু করলেন।
‘অক্ষয় বাবুর সাথে বেশ বন্ধুত্ব দেখছি। অথচ আমি যখন আপনাকে গল্প শোনাবার জন্য ডাকতাম আপনি বিরক্ত হতেন। ওর ওই কালো চা কেমন তারিয়ে তারিয়ে খান যেন অমৃত খাচ্ছেন।’

‘হ্যাঁ তাতে আপনার কি অসুবিধা হচ্ছে? আপনার মত জোর জবরদস্তি করে গল্প শোনান না কখনোই।’ হিরেটা নকল শুনে বেশ আনন্দ হচ্ছিল আমার। তাই অবিনাশবাবুর বকুনিকে পাত্তা দিলাম না।

‘হাহা! লিখতে পারলে তো শোনাবে!’

‘মানে?’

‘মানে ওই চা খেয়েও আপনি কিচ্ছু বুঝতে পারেননি? তাই তো?’

‘বাহ! চা খেয়ে আবার কী বুঝব? অতীব জঘন্য চা। একবার মুখে দিলে আর দ্বিতীয় বার মুখে দেওয়া যাবে না। লোকে মাঝে মাঝে একটু আদাও দেয়। কিন্তু…। আপনার রাধাকান্ত ঠিক এই রকম চা করত।’

‘হুম। অনেক বলেও রাধাকান্তকে ঠিক করতে পারিনি। আপনার মনে আছে দেখে ভাল লাগল। আপনি একটা জিনিস ভালই বুঝতে পেরেছেন কিন্তু আপনার মন পবিত্র তাই জিনিসটা ধরে ফেলেও বুঝতে পারছেন না।’
‘কী বুঝতে পারছি না?’

‘চা’। বলেই টুক করে অবিনাশ বাবু আমাকে চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
এর মধ্যে অনেকবার অক্ষয় বাবুর বাড়ি গেছি। বাড়ি প্রায় তালা বন্ধই থাকে। এক একদিন ভদ্রলোকের দেখা পাওয়া যায়। জানিনা কোথায় যান। আমার আবার অনেক কিছুই মনে থাকে না। যেমন কে কোথায় চাকরি করে, কার ছেলের কোথায় বিয়ে হল, কার মেয়ে বিয়েতে কী কী গয়না পেল ইত্যাদি। অক্ষয় বাবু কি চাকরি করেন এবং চাকরি করেন অল্পদিনেই ভুলে গেলাম। সম্ভবত তিনি কোন একটা বিমা কোম্পানিতে কাজ করতেন।
মনের মধ্যে একটা অশান্তি ধরিয়ে দিয়ে গেলেন অবিনাশ বাবুর আত্মা।’’

এই পর্যন্ত বলে বিট্টু থামল।

ইন্দুদি – তারপর কী হল?
তারপর কি হতে পারে বলে তোমাদের মনে হয়?
এখন এসব খেলা ভাল লাগছে না। তাড়াতাড়ি শেষ কর।

বড়দা – আমার মনে হয় অক্ষয় বাবুও ভূত।

মেজদা – হ্যাঁ ভূত ছাড়া আর কিছু তো তুমি দেখতেই পাও না।

‘বল না বিট্টু’। মেজদি তাড়া দেয়।

‘এর পরের ঘটনা খুবই ঘোরালো। খাতা এখানেই শেষ হয়েছে।’

‘খাতা শেষ মানে!’ হাহাকার করে ওঠে প্রত্যেকেই।

‘শেষ মানে শেষ। এই খাতাটা বেশ কিছুদিন আগে আমি বাসে একটা সিটে কুড়িয়ে পাই। কয়েকটা হিজিবিজি গল্প লেখা আছে। এর মধ্যে থেকে একটা আমি পড়ে শোনালাম। যার শেষ নেই।’ বিট্টু নিজের হাত থেকে ছেঁড়া ডায়েরীটা তুলে সবাইকে দেখায়।
‘লেখককে খাতা ফিরিয়ে দেওয়া উচিৎ। নাম ঠিকানা লেখা নেই?’

ইন্দুদি জানতে চায়।
‘সেটা থাকলে তো কবেই ফিরিয়ে দিতে পারতাম। যাই হোক শেষটা বলো দেখি’?

‘আমি বলছি।’ আমি উঠে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করি।

‘আমার মনে হয় অজয় খুব সাধাসিধে লোক। তাই সে ব্যাপারটা ধরতে পারছে না। অক্ষয়বাবু আর কেউই নয়। রাধাকান্ত নিজেই। অক্ষয় বাবু সেজে আবার আসে সেই বাড়িতে। তার হাতের বানানো চা-ই তাকে চিনিয়ে দিতে সাহায্য করে। অজয় নিজেও বুঝতে পারে যে সে এইরকম বিচ্ছিরি কালো চা আগেও খেয়েছে। হিরে নিয়ে যে গল্প ফেঁদেছিলেন অবিনাশবাবু, তার জন্যই তাঁকে খুন হতে হল। তিনি রাধাকান্তের কাছেও গল্প করেছিলেন নকল হিরের। রাধাকান্তর মনে লোভ জাগে। দার্জিলিঙে অবিনাশবাবুকে খুন করে এমন ভাবে, যাতে লোকে মনে করে অন্ধকারে পথ চলতে গিয়ে খাদে পড়ে তিনি মারা যান। সন্ধের পর চোখে বয়স্ক লোকেরা কমই দেখে।

রাধাকান্ত সেখানে থেকে কিছুদিন কান্নাকাটি করল। লোকে ভাবল সে মনিবকে খুব ভালবাসে। পুলিশ তাকে ক্লিন চিট দিল। তারপর সে অক্ষয় হিসেবে ফিরে এসে নিজের খেলা দেখাতে শুরু করল। অজয়ের বাড়িতে ঢুকে একদিন তল্লাশি করে এবং হিরেটা পেয়েও যায় লাকিলি। একটা সাবানের খালি বাক্সের মধ্যে হীরেটা লুকিয়ে রেখেছিল অজয়। আর অক্ষয় অবিনাশবাবুকেই নকল করার চেষ্টা করে মারাত্মক ভুল করে ফেলেছে। এমনকি নামটাও নকল করেছে। অবিনাশ আর অক্ষয় মানে একই। যা ক্ষয় হয় না বা বিনাশ হয় না। এটা না করলে আমি কখনওই তাকে সন্দেহ করতাম না। তার অপরাধী মনই তাকে ধরিয়ে দিল। আর সে লেখক বলে নিজেকে পরিচয় দিলেও অবিনাশবাবুরই খাতা গুলোই নিশ্চয়ই ব্যবহার করতো।’

মেজদা ছাড়া বাকি সবাই হাততালি দিয়ে উঠল আমার সমাধান শুনে।

…………………………………….(সমাপ্ত)…………………………………

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত