কঙ্কাবতী

কঙ্কাবতী

প্রথম পরিচ্ছেদ–প্রাচীন কথা

কঙ্কাবতীকে সকলেই জানেন। ছেলেবেলায় কঙ্কাবতীর কথা সকলেই শুনিয়াছেন।

কঙ্কাবতীর ভাই একটি অব আনিয়াছিলেন। আঁটি ঘরে রাখিয়া সকলকে সাবধান করিয়া, দিলেন,—আমার আবটি যেন কেহ খায় না। যে খাইবে, আমি তাঁহাকে বিবাহ করিব।-কঙ্কাবতী সে কথা জানিতেন না। ছেলে মানুষ! অত বুঝিতে পারেন নাই, আঁবটি তিনি খাইয়াছিলেন।

সে জন্য ভাই বলিলেন,—আমি কঙ্কাবতীকে বিবাহ করিব।

মাতা পিতা সকলে বুঝাইলেন,—ভাই হইয়া কি ভগিনীকে বিবাহ করিতে আছে?

কিন্তু কাহারও কথা শুনিলেন না। তিনি বলিলেন, কঙ্কাবতী আমার আর খাইল কেন? আমি নিশ্চয় কঙ্কাবতীকে বিবাহ করিব।

কঙ্কাবতীর বড় লজ্জা হইল। মনে বড় ভয় হইল। নিরুপায় হইয়া তিনি একখানি নৌকা গড়িলেন। নৌকাখানিতে বসিয়া খিড়কী পুকুরের মাঝখানে ভাসিয়া যাইলেন। ভাই আর তাঁহাকে বিবাহ করিতে পারিলেন না।

কঙ্কাবতীর গল্প এইরূপে। এ কথা কিন্তু বিশ্বাস হয় না। একটি আঁবের জন্য কেহ কি আপনার ভগিনীকে বিবাহ করিতে চায়? কথা সম্ভব নয়। যাহা সম্ভব তাহা আমি বলিতেছি।

 

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ–কুসুমঘাটী

শহর অঞ্চলে নয়, বন্য প্রদেশে, কুসুমঘাটী বলিয়া একখানি গ্রাম আছে। গ্রামখানি বড়, অনেক লোকের বাস। গ্রামের নিকটে মাঠ। সেকালে এই মাঠ দিয়া অনেক লোক যাতায়াত করিত। সুবিধা পাইলে, নিকটস্থ গ্রামসমূহের দুষ্ট লোকেরা পথিকদিগকে মারিয়া ফেলিত ও তাহাদের নিকট হইতে যাহা কিছু টাকা-কড়ি পাইত, তাহা লইত। মাঠের মাঝখানে যে সব পুষ্করিণী আছে, তাঁহার ভিতর হইতে আজ পৰ্য্যন্ত মড়ার মাথা বাহির হয়। মানুষ মারিয়া দুষ্ট লোকেরা এই পুকুরের ভিতর লুকাইয়া রাখিত।

মৃতদেহ গোপন করিবার আর একটি উপায় ছিল। পথিককে মারিয়া, মড়াটি লইয়া, দুষ্ট লোকেরা এ গ্রাম হইতে সে গ্রামে ফেলিয়া আসিত। অপর গ্রামে মড়াটি রাখিয়া, এক প্রকার কুঃ শব্দ করিয়া তাঁহারা চলিয়া যাইত।।

সে গ্রামের চৌকিদার সেই কুঃ শব্দটি শুনিয়া বুঝিতে পারি যে, তাঁহার সীমানায় মড়া পড়িয়াছে। চৌকীদার ভাবিত,—যদি আমার সীমানায় মড়া পড়িয়া থাকে, তাহা হইলে, কাল প্রাতঃকালে আমাকে লইয়া টানা-টানি, হইবে।

এই কথা ভাবিয়া সেও আপনার বন্ধুবর্গের সহায়তায়, মৃত দেহটি অপর গ্রামে রাখিয়া সেইরূপ কুঃ শব্দ করিয়া আসিত।

এইরূপে রাতারাতি মড়াটি দশ বার ক্রোশ দূরে গিয়া পড়িত। কোথা হইতে লোকটি আসিতেছিল, কে তাঁহাকে মারিল, অত দূরে আর তাঁহার কোনও সন্ধান হইত না।

একে বন্য দেশ, তাহাতে আবার এইরূপ শত শত অপঘাত মৃত্যু! সে স্থানে ভূতের অভাব হইতে পারে না। অশ্বত্থ, বট, বেল প্রভৃতি নানা গাছে নানা প্রকার ভূত আছে, সেখানকার লোকের এইরূপ বিশ্বাস। সন্ধ্যা হইলে, ঘরে বসিয়া, লোকে নানারূপ ভূতের গল্প করে, সেই গল্প শুনিয়া বালক বালিকার শরীর শিহরিয়া উঠে।

গ্রামে ডাইনীরও অপ্রতুল নাই। পিতামহী-মাতামহীগণ বালক-বালিকাদিগকে সাবধান করিয়া দেন,—ডাইনীরা পথে কুটা হইয়া পড়িয়া থাকে, সে তৃণ যেন মাড়াইও না, তাহা হইলে ডাইনীতে খাইবে।

স্থলে, সেখানকার লোকের এইরূপ পদে পদে বিপদের ভয়। জলেও কম নয়। গ্রামের এক পার্শ্বে একটি নদী আছে। পাহাড় হইতে নামিয়া, কুল কুল করিয়া নদীটি সাগরের দিকে বহিয়া যাইতেছে। হাঙ্গর কুম্ভীর নাই সত্য, কিন্তু নদীটি অন্য ভয়ে পরিপূর্ণ। শিকল হাতে জটে-বুড়িত আছেই, তা ছাড়া নদীর ভিতর জীবন্ত পাথরও অনেক সুবিধা পাইলে এই পাথর মনুষ্যের বুকে চাপিয়া বসে। নদীর ভিতরও এইরূপ নানা বিপদের ভয়।

কুসুমঘাটীর অনতিদূরে পর্ব্বতশ্রেণী। পাহাড় বনে আবৃত। বনে বাঘ-ভাল্লুক আছে। বাঘে সৰ্ব্বদাই লোকের গরু-বাছুর লইয়া যায়। মাঝে মাঝে এক একটি বাঘ মনুষ্য খাইতে শিক্ষা করে। তখন সে বাঘ, মানুষ ভিন্ন আর কিছুই খায় না। লোকে উৎপীড়িত হইয়া নানা কৌশলে সে ব্যাঘ্রটিকে বধ করে।

এক একটি বাঘ কিন্তু এমনি চতুর যে, কেহ তাঁহাকে মারিতে পারে না। লোকে বলে যে, সে প্রকৃত বাঘ নয়–সে মনুষ্য! বনে এক প্রকার শিকড় আছে, তাহা মাথায় পরিলে মনুষ্য তৎক্ষণাৎ ব্যাঘ্রের রূপ ধরিতে পারে। কাহারও সহিত কাহারও বিবাদ থাকিলে, লোকে সেই শিকড়টি মাথায় পরিয়া বাঘ হয়, বাঘ হইয়া আপনার শত্রুকে বিনাশ করে। তাহার পর আবার শিকড় খুলিয়া মানুষ হয়। কেহ কেহ শিকড় খুলিয়া ফেলিতে পারে না। সে চিরকালই বাঘ থাকিয়া যায়। এই বাঘ লোকের প্রতি ভয়ানয় উপদ্রব করে।

কুসুমধাটীর লোকের মনে এইরূপ নানা প্রকার বিশ্বাস। কিন্তু আজ কাল সকলের মন হইতে এই সব ভয় ক্রমে দূর হইতেছে। এখানকার অনেকে এখন তসরের গুটি ও গালা লইয়া, কলিকাতায় আসিত। কেহ কেহ কলিকাতায় বাসা করিয়া থাকেন। কেহ কেহ অংরজীও পড়িয়াছেন। ভূত ডাইনীর কথা তাঁহারা বিশ্বাস করেন না। ভূতের কথা পাড়িলে, তাঁহারা উপহাস করেন,–পৃথিবীতে ভূত নাই। আর যদিও থাকে, তো আমাদের তাঁহারা কি করিতে পারে? তাঁহাদের দেখা-দেখি আজকালের ছেলে-মেয়েদের প্রাণেও কিছু কিছু সাহসের সঞ্চার হইতেছে।

 

তৃতীয় পরিচ্ছেদ–তনু রায়

শ্ৰীযুক্ত রামতনু রায় মহাশয়ের বাস কুসুমঘাটী। রামতনু রায় বলিয়া কেহ তাঁহাকে ডাকে না, সকলে তাঁহাকে তনু রায় বলে। ইনি ব্রাহ্মণ, বয়স হইয়াছে, ব্রাহ্মণের যাহা কিছু কৰ্ত্তব্য, তাহা ইনি যথাবিধি করিয়া থাকেন। ত্রিসন্ধ্যা করেন, পিতা-পিতামহ-আদির শ্রাদ্ধতপর্ণাদি করেন, দেবগুরুকে ভক্তি করেন, দলাদলি লইযা আন্দোলন করেন। এখনকার ললাকে ভাল করিয়া ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম করে না বলিয়া রায় মহাশয়ের মনে বড় রাগ।

তিনি বলেন,–আজ-কালের ছেলেরা সব নাস্তিক, ইহাদের হাতে জল খাইতে নাই।

তিনি নিজে সব মানেন, সব করেন। বিশেষতঃ কুলীন ও বংশজের যে রীতিগুলি, সেইগুলির প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ভক্তি।

তিনি নিজে বংশজ ব্রাহ্মণ। তাই তিনি বলেন-বিধাতা যখন আমাকে বংশজ করিয়াছেন, তখন বংশজের ধর্ম্মটি আমাকে রক্ষা করিতে হইবে। যদি না করি, তাহা হইলে বিধাতার অপমান করা হইবে, আমার পাপ হইবে, আমাকে নরকে যাইতে হইবে। যদি বল বংশজের ধর্ম্মটি কি? বংশজের ধর্ম্ম এই যে,—কন্যাদান করিয়া পাত্রের নিকট হইতে কিঞ্চিৎ ধন গ্রহণ করিবে। বংশজ হইয়া যিনি এ কাৰ্য্য না করেন, তাঁহার ধর্ম্মলোপ হয়, তিনি একেবারেই পতিত হন। শাস্ত্রে এইরূপ লেখা আছে। শাস্ত্র অনুসারে সকল কাজ করেন দেখিয়া তনু রায়ের প্রতি লোকের বড় ভক্তি। স্ত্রীলোকেরা ব্রত উপলক্ষে ইহাকেই প্রথম ব্রাহ্মণ বলিয়া থাকেন। সকলে বলেন যে, রায় মহাশয়ের মত নিষ্ঠাবান্ ব্রাহ্মণ পৃথিবীতে অতি বিরল। বিশেষতঃ শুদ্রমহলে ইহার খুব প্রতিপত্তি।

তনু রায় অতি উচ্চদরের বংশজ। কেহ কেহ পরিহাস করিয়া বলেন যে, ইহাদের কোনও পুরুষে বিবাহ হয় না। পিতা-পিতামহের বিবাহ হইয়াছিল কি না, তাও সন্দেহ।

ফল কথা, ইহার নিজের বিবাহের সময় কিছু গোলযোগ হইয়াছিল। পাঁচ শত টাকা পণ দিব বলিয়া একটি কন্যা স্থির করিলেন। পৈতৃক ভূমি বিক্রয় করিয়া সেই টাকা সংগ্রহ করিলেন। বিবাহের দিন উপস্থিত হইলে, সেই টাকাগুলি লইয়া বিবাহ করিতে যাইলেন। কন্যার পিতা, টাকাগুলি গণিয়া ও বাজাইয়া লইলেন। বিবাহের লুগ্ন উপস্থিত হইল, কিন্তু তবুও তিনি কন্যা-সম্প্রদান করিতে তৎপর হইলেন না। কেন বিলম্ব করিতেছেন, কেহ বুঝিতে পারে না।

অবশেষে তিনি নিজেই খুলিয়া বলিলেন,–পাত্রের এত অধিক বয়স হইয়াছে, তাহা আমি বিবেচনা করিতে পারি নাই। সেই জন্য পাঁচ শত টাকায় সম্মত হইয়াছিলাম। এক্ষণে আর এক শত টাকা না পাইলে কন্যাদান করিতে পারি না।

কন্যা-কৰ্ত্তার এই কথায় বিষম গোলযোগ উপস্থিতি হইল। সেই লগ্ন অতীত হইয়া গেল, রাত্রি প্রায় অবসান হইল। যখন প্রভাত হয় হয়, তখন পাঁচজনে মধ্যস্থ হইয়া এই মীমাংসা করিয়া দিলেন যে, রায় মহাশয়কে আর পঞ্চাশটি টাকা দিতে হইবে। খত লিখিয়া তনু রায় আর পঞ্চাশ টাকা ধার করিলেন ও কন্যার পিতাকে তাহা দিয়া বিবাহকাৰ্য্য সমাধা করিলেন।–বাসর-ঘরে গাহিবেন বলিয়া তনু রায় অনেকগুলি গান শিখিয়া গিয়াছিলেন। কিন্তু বৃথা হইল। বাসর হয় নাই, রাত্রি প্রভাত হইয়া গিয়াছিল। এ দুঃখ তনু রায়ের মনে চিরকাল ছিল।

এক্ষণে তনু রায়ের তিনটি কন্যা ও পুত্র-সন্তান। কুল-ধৰ্ম্ম রক্ষা করিয়া দুইটি কন্যাকে তিনি সুপাত্রে অৰ্পণ করিয়াছিলেন। জামাতারা তনু রায়ের সম্মান রাখিয়াছিলেন। কেহ পাঁচ শত, কেহ, হাজার, নগদ গণিয়া দিয়াছিলেন। কাজেই সুপাত্র বলিতে হইবে।

সম্মান কিছু অধিক পাইবেন বলিয়া, রায় মহাশয় কন্যা দুইটিকে বড় করিয়া বিবাহ দিয়াছিলেন। তিনি বলিতেন,—অল্প বয়সে বিবাহ দিলে, কন্যা যদি বিধবা হয়, তাহা হইলে সে পাপের দায়ী কে হইবে? কন্যা বড় করিয়া বিবাহ দিবে। কুলীন ও বংশজের তাহাতে কোন দোষ নাই। ইহা শাস্ত্রে লেখা আছে।

তাই, যখন ফুলশয্যার আইন পাশ হয় তখন তনু রায় বলিলেন,—পূৰ্ব্ব হইতেই আমি আইন মানিয়া আসিতেছি। তবে আবার নূতন আইন কেন? আইনের তিনি ঘোরতর বিরোধী হইলেন; সভা করিলেন, চাঁদা তুলিলেন, চাঁদার টাকাগুলি সব আপনি লইলেন।

তনু রায়ের জামাতা দুইটির বয়স নিতান্ত কচি ছিল না। ছেলে মানুষ বরকে তিনি দুটি চক্ষু পাড়িয়া দেখিতে পারেন না। তাঁহারা এক শত কি দুই শত টাকায় কাজ সারিতে চায়। তাই একটু বয়স্ক পাত্র দেখিয়া কন্যা দুইটি বিবাহ দিয়াছিলেন। এক জনের বয়স হইয়াছিল সত্তর আর এক জনের পঁচাত্তর। জামাতাদিগের বয়সের কথায় পাড়ায় মেয়েরা কিছু বলিলে, তনু রায় সকলকে বুঝাইতেন—ওগো! তোমরা জান না, জামাইয়ের বয়স একটু পাকা হইলে, মেয়ের আদর হয়। জামাতাদিগের বয়স কিছু অধিক পাকিয়াছিল। কারণ, বিবাহের পর, বৎসর ফিরিতে না ফিরিতে দুইটি কন্যাই বিধবা হয়।

তনু রায় জ্ঞানবান্ লোক। জামাতাদিগের শোকে একেবারে অধীর হন নাই। মনকে তিনি এই বলিয়া প্রবোধ দিয়া থাকেন,–বিধাতার ভবিতব্য! কে খণ্ডাতে পারে? কতলোক যে বার বৎসরের বালকের সহিত পাঁচ বৎসর বালিকার বিবাহ দেয়, তবে তাহাদের কন্যা বিধবা হয় কেন। যাহা কপালে থাকে তাহাই ঘটে। বিধাতার লেখা কেহ মুছিয়া ফেলিতে পারে না।

তনু রায়ের পুত্রটি ঠিক বাপের মত। এখন তিনি আর নিতান্ত শিশু নন, পঁচিশ পার হইয়াছেন। লেখা পড়া হয় নাই, তবে পিতার মত শাস্ত্রজ্ঞান আছে। পিতা কন্যাদান করিয়া অর্থসঞ্চয় করিতেছেন, সে জন্য তিনি আনন্দিত, নিরানন্দ নন। কারণ, পিতার তিনিই একমাত্র বংশধর। বিধবা কথাটা আর কে বল? তবে বিধবাদিগের গুণকীৰ্ত্তন তিনি সর্ব্বদাই করিয়া থাকেন।

তিনি বলেন, আমাদের বিধবাবা সাক্ষাৎ সরস্বতী। সদা ধৰ্ম্মে রত, পরোপকার ইহাদের চিরব্রত। কিসে আমি ভাল খাইব, কিসে বাবা ভাল খাইবেন, ভগিনী দুইটির সৰ্ব্বদাই এই চিন্তা। তিন দিন উপবাস করিয়াও আমাদের জন্য পাঁচ ব্যঞ্জন রন্ধন করেন।

ভগিনী দুইটি আমার—অহল্যা দ্রৌপদী কুন্তী তারা মন্দোদরীস্তথা। প্রাতঃস্মরণীয়া।

আজকাল আর সহমরণ প্রথা নাই বলিয়া ইনি মাঝে মাঝে খেদ করেন। কারণ, তাহা থাকিলে ভগিনী দুইটি নিমিষের মধ্যেই স্বর্গে যাইতে পারিতেন। বসিয়া বসিয়া মিছামিছি বাবার অনুধ্বংস করিতেন না। সাহেবেরা স্বর্গের দ্বারে এরূপ আগড় দিয়া দেন কেন?

তনু রায়ের স্ত্রী কিন্তু অন্য প্রকৃতির লোক। এক একটি কন্যার বিবাহ হয়, আর পাত্রের রূপ দেখিয়া তিনি কান্নাকাটি করেন। তনু রায় তখন তাঁহাকে অনেক ভৎর্সনা করেন, আর বলেন,—মনে করিয়া দেখ দেখি তোমার বাপ কি করিয়াছিলেন? এই রূপ নানা প্রকার খোঁটা দিয়া তবে তাঁহাকে সান্ত্বনা করেন। কন্যাদিগের বিবাহ লইয়া স্ত্রীপুরুষের চির বিবাদ। বিধবা কন্যা দুইটির মুখপানে চাহিয়া সদাই চক্ষের জলে মায়ের বুক ভাসিয়া যায়। মেয়েদের সঙ্গে মাও একপ্রকার একাদশীর দিন কিছুই খান না, তবে স্বামীর অকল্যাণ হইবার ভয়ে, কেবল একটু একটু জল পান করেন। প্রতিদিন পূজা করিয়া একে একে সকল দেবতাদিগের পায়ে তিনি মাথা খুঁড়েন, আর তাঁহাদের নিকট প্রার্থনা করেন যে,–হে মা কালি! হে মা দুর্গা। হে ঠাকুর! যেন আমার কঙ্কাবতীর বরটি মনের মত হয়।

কঙ্কাবতী তনু রায়ের ছোট কন্যা। এখনও নিতান্ত শিশু।

 

চতুর্থ পরিচ্ছেদ–খেতু

তনু রায়ের পাড়ায় একটি দুঃখিনী ব্রাহ্মণী বাস করেন। লোকে তাঁহাকে খেতুর মা খেতুর মা বলিয়া ডাকে। খেতুর মা আজ দুঃখিনী বটে, কিন্তু এক সময়ে তাঁহার অবস্থা ভাল ছিল। তাঁহার স্বামী শিবচন্দ্র মুখোপাধ্যায় লেখা পড়া জানিতেন, কলিকাতায় কৰ্ম্ম করিতেন, দুপয়সা উপার্জন করিতেন।

কিন্তু তিনি অর্থ রাখিতে জানিতেন না। পরদুঃখে তিনি নিতান্ত কাতর হইয়া পড়িতেন ও যথাসাধ্য পরের দুঃখ মোচন করিতেন। অনেক লোককে অন্ন দিতেন ও অনেকগুলি ছেলের তিনি লেখাপড়ার খরচ দিতেন। এরূপ লোকের হাতে পয়সা থাকে না।

অধিক বয়সে তাঁহার স্ত্রীর একটি পুত্রসন্তান হয়। ছেলেটির নাম ক্ষেত্ৰ রাখেন, সেই জন্য তাঁহার স্ত্রীকে সকলেই খেতুর মা বলে।

যখন পুত্র হইল, তখন শিবচন্দ্র মনে করিলেন—এইবার আমাকে বুঝিয়া খরচ করিতে হইবে। আমার অবর্তমানে স্ত্রী-পুত্র যাহাতে অল্পের জন্য লালায়িত না হয়, আমাকে সে বিলি করিতে হইবে।

মানস হইল বটে, কিন্তু কার্যে পরিণত হইল না। পৃথিবী অতি দুঃখময়, এ দুঃখ যিনি নিজ দুঃখ বলিয়া ভাবেন, চিরকাল তাঁহাকে দরিদ্র থাকিতে হয়।

খেতুর যখন চারি বৎসব বয়স, তখন হঠাৎ তাঁহার পিতার মৃত্যু হইল। স্ত্রী ও শিশু সন্তানটিকে একেবারে পথে দাঁড় করাইয়া গেলেন। খেতুর বাপ অনেকের উপকার করিয়াছিলেন। তাঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ এখন বড়লোক হইয়াছেন। কিন্তু এই বিপদের সময় কেহই একবার উকি মারিলেন না। কেহই একবার জিজ্ঞাসা করিলেন না যে, খেতুর মা! তোমার হবিষ্যের সংস্থান আছে কি না?

এই দুঃখের সময় কেবল রামহরি মুখোপাধ্যায় ইহাদের সহায় হইলেন।। রামহরি হঁহাদের জ্ঞাতি, কিন্তু দূর-সম্পর্ক। খেতুর বাপ, তাঁহার একটি সামান্য চাকরি করিয়া দিয়াছিলেন। দেশে অভিভাবক নাই, সে জন্য কলিকাতায় তাঁহাকে পরিবার লইয়া থাকিতে হইয়াছে। যে কয়টি টাকা পান, তাহাতেই কষ্টে সৃষ্টে দিনপাত করেন।

তিনি কোথায় পাইবেন? তবুও যাহা কিছু পারিলেন, বিধবাকে দিলেন ও চাঁদার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরিলেন। খেতুর বাপের খাইয়া যাহারা মানুষ, আজ তাঁহারা রামহরিকে কতই

ওজর আপত্তি অপমানের কথা বলিয়া দুই এক টাকা চাঁদা দিল। তাহাতেই খেতুর বাপের তিল-কাঞ্চন করিয়া শ্রাদ্ধ হইল। চাঁদার টাকা হইতে যাহা কিছু বাঁচিল, রামহরি তাহা দিয়া খেতুর মা ও খেতুকে দেশে পাঠাইয়া দিলেন।

দেশে পাঠাইয়া দুঃখিনী বিধবাকে তিনি চাউলের দামটি দিতেন; অধিক আর কিছু দিতে পারিতেন না। ব্রাহ্মণী পৈতা কাটিয়া কোনও মতে অকুলান কুলান করিতেন। দেশে বান্ধব কেহই ছিল না। নিরঞ্জন কবিরত্ন কেবল মাত্র ইহাদের দেখিতেন শুনিতেন; বিপদে আপদে তিনিই বুক দিয়া পড়িতেন।

খেতুর মার এইরূপ কষ্টে দিন কাটিতে লাগিল। ছেলেটি শান্ত সুবোধ, অথচ সাহসী ও বিক্রমশীল হইতে লাগিল। তাঁহার রূপ-গুণে, স্নেহ-মমতায়, মা সকল দুঃখ ভুলিতেন। ছেলেটি যখন সাত বৎসরের হইল তখন রামহরি দেশে আসিলেন।

খেতুর মাকে তিনি বলিলেন-খেতুর এখন লেখা-পড়া শিখিবার সময় হইল, আর ইহাকে এখানে রাখা হইবে না। আমি ইহাকে কলিকাতায় সইয়া যাইতে ইচ্ছা করি। আপনার কি মত?

খেতুর মা বলিলেন,–বাপ রে! তা কি কখন হয়? খেতুকে ছাড়িয়া আমি কি করিয়া থাকিব? নিমিষের নিমিত্তও খেতুকে চক্ষুর আড়াল করিয়া আমি জীবিত থাকিতে পারিব লো। না বাছা! এ প্রাণ থাকিতে আমি খেতুকে কোথাও পাঠাইতে পারিব না।

রামহরি বলিলেন,—দেখুন, এখানে থাকিলে খেতুর লেখাপড়া হইবে না। মধুর চক্রবর্তীর অবস্থা কি ছিল জানেন তো? গাজনের শিবপূজা করিয়া করিয়া অতি কষ্টে সংসার প্রতিপালন করিত। গাজুনে বামুন বলিয়া সকলে তাঁহাকে ঘৃণা করিত। তাঁহার ছেলে যারে আপনার বাসায় দিনকতক রাঁধুনী বামুন থাকে। অল্পবয়স্ক বালক দেখিয়া শিব কাকার দয়া হয়, তিনি তাঁহাকে স্কুলে দেন। এখন সে উকীল হইয়াছে। এখন সে একজন বড়লোক।

খেতুর মা উত্তর করিলেন,চুপ কর! কলিকাতায় লেখা-পড়া শিখিয়া যদি ষাঁড়েশ্বরের মত হয়, তাহা হইলে আমার খেতুর লেখা-পড়া শিখায় কাজ নাই।

রামহরি বলিলেন,–সন্ত বটে, ষাঁড়ের মদ খায়, আর মুসলমান সহিমের হাতে নানারূপ অখাদ্য মাংসও খায়, আবার এ দিকে প্রতিদিন হরি-সঙ্কীৰ্ত্তন করে। কিন্তু তা বলিয়া কি সকলেই সেইরূপ হয়? পুরুষ মানুষে লেখা-পড়া না শিখিলে কি চলে? পুরুষ মানুষের যেরূপ বাঁচিয়া থাকার প্রার্থনা, বিদ্যাশিক্ষারও সেইরূপ প্রার্থনা।

খেতুর মা বলিলেন,–হাঁ সত্য কথা। পুত্রের যেরূপ বাঁচিবার প্রার্থনা, বিদ্যার প্রার্থনাও তাঁহার চেয়ে অধিক। যে মাতা-পিতা ছেলেকে বিদ্যাশিক্ষা না দেন, সে মাতাপিতা ছেলের পরম শত্রু। তবে বুঝিয়া দেখ আমার মার প্রাণ, আমি অনাথিনী সহায়হীনা বিধবা পৃথবীতে আমার কেহ নাই, এই এক রতি ছেলেটিকে লইয়া সংসারে আছি। খেতুকে আমি নিমেষে হারাই। খেলা করিয়া ঘরে আসিতে খেতুর একটু বিলম্ব হইলে, আমি যে কত কি কু ভাবি, তাহা আর কি বলিব? ভাবি, খেতু বুঝি জলে ড়ুবিল, খেতু বুঝি আগুনে পুড়িল, খেতু গাছ হইতে পড়িয়া গেল, খেতুকে বুঝি পাড়ার ছেলেরা মারিল। খেতু যখন ঘুমায়, রাত্রিতে উঠিয়া উঠিয়া আমি খেতুর নাকে হাত দিয়া দেখি,–খেতুর নিশ্বাস পড়িতেছে কি না? ভাবিয়া দেখ দেখি, এ দুধের বাছাকে দূরে পাঠাইতে মার মহাপ্রাণী কি করে? তাই কাঁদি, তাই বলি—না। পুনরায় খেতুর মা বলিলেন,–রামহরি! খেতু আমার বড় গুণের ছেলে। কেবল দুই বৎসর পাঠশালা যাইতেছে, ইহর মধ্যেই তালপাতা শেষ করিয়াছে কলাপাতা ধরিয়াছে। গুরুমহাশয় বলেন—খেতু সকলের চেয়ে ভাল ছেলে।আর দেখ রামহরি! খেতু আমার অতি সুবোধ ছেলে। খেতুকে আমি যা করিতে বলি খেতু তাই করে। যেটি মানা করি সেটি আর খেতু করে না। একদিন দাসেদের মেয়ে আসিয়া বলিল,–ওগো তোমার খেতুকে পাড়ার ছেলে বড় মারিতেছে। আমি উৰ্দ্ধশ্বসে ছুটিলাম। দেখিলাম, ছয় জন ছেলে একা খেতুর উপর পড়িয়াছে। খেতুর মনে ভয় নাই, মুখে কান্না নাই। আমি দৌড়িয়া গিয়া খেতুকে কোলে লইলাম। খেতু তখন চক্ষু মুছিতে মুছিতে বলিল,–মা! আমি উহাদের সাক্ষাতে কাঁদি নাই, পাছে উহারা মনে করে যে, আমি ভয় পাইয়াছি। একা একা আমর সঙ্গে কেহই পারে না। উহারা ছয় জন, আমি একা, তা আমি মারিয়াছি। আবার যখন একা একা পাইব, তখন আমিও ছয়জনকে খুব মারিব। আমি বলিলাম—না বাছা! তা করিতে নাই, প্রতিদিন যদি সকলের সঙ্গে মারামারি করিবে তবে খেলা করিবে কার সঙ্গে? খেতু আমর কথা শুনিল। কত দিন সে ছেলেদের খেতু একলা পাইয়াছিল, মনে করিলে খুব মারিতে পারিত; কিন্তু আমি মানা করিয়াছিলাম বলিয়া কাহাকেও সে আর মারে নাই।

আর এক দিন আমি খেতুকে বলিলাম,–খেতু! তনু রায়ের অব গাছে ঢিল মারিও। তনু রায় খিটখিটে লোক, সে গালি দিবে। খেতু বলিল,–মা! ও গাছের আঁব বড় মিষ্ট গো! একটি অব পাকিয়া টুক টুক করিতেছিল। আমার হাতে একটি ঢিল ছিল। তাই মনে করিলাম, দেখি, পড়ে কি না? আমি বলিলাম,—বাছা ও গাছের আঁব বড় মিষ্ট হইলে কি হইবে, ও গাছটি তো আর আমাদের নয়? পরের গাছে ঢিল মারিলে, যাদের গাছ, তাঁহারা রাগ করে; যখন আপনা-আপনি তলায় পড়িবে, তখন কুড়াইয়া খাইও, তাহাতে কেহ কিছু বলিবে না।

তাহার পর, আর একদিন খেতু আমাকে আসিয়া বলিল,–মা! জেলেদের গাবগাছে খুব গাঁব পাকিয়াছে। পাড়ার ছেলেরা সকলে গাছে উঠিয়া গাব খাইতেছিল, আমাকে তাঁহারা বলিল,–খেতু! আয় না ভাই। দূরের গাব যে আমরা পাড়িতে পারি না! তা মা আমি গাছে উঠি নাই। গাব গাছটি তো, মা! আর আমাদের নয়, যে উঠিব? আমি তলায় দাঁড়াইয়া রহিলাম। ছেলেরা দুটি একটি গাব আমাকে ফেলিয়া দিল। মা। সে গাব কত যে গো মিষ্ট, তাহা আর তোমাকে কি বলিব! তোমার জন্য একটি গাব আনিয়াছি, তুমি বরং, মা। খাইয়া দেখ! আমাদের যদি একটি গাব গাছ থাকিত, তাহা হইলে বেশ হইত। আমি বলিলাম,–খেতু! বুড়ো মানুষে গাব খায় না, ও গাবটি তুমি খাও। আর পরের গাছে পাকা গাব পাড়িতে কোন দোষ নাই, তার জন্য জেলেরা তোমাকে বকিবে না। কিন্তু গাছের ডগায় গিয়া উঠিও না, সরু ডালে পা দিও না, ডাল ভাঙ্গিয়া পড়িয়া যাইবে। গাব খাইতে অনুমতি পাইয়া বাছার যে কত আনন্দ হইল, তাহা আর তোমাকে কি বলিব।

দেখ, এ গ্রামে একবার এক জন কোথা হইতে সন্দেশ বেচিতে আসিয়াছিল। পাড়ার ছেলেরা তাঁহাকে ঘিরিয়া দাঁড়াইল। তাদের বাপ-মা, যার যেরূপ ক্ষমতা, সন্দেশ কিনিয়া আপনার আপনার ছেলের হাতে দিল। মুখ চুণপনা করিয়া আমার খেতু সেইখানে দাঁড়াইল ছিল। তাড়াতাড়ি গিয়া আমি খেতুকে কোলে লইলাম, আমার বুক ফাটিয়া যাইল, চক্ষুর জল রাখিতে পারিলাম না। আঁচলে চক্ষু পুছিতে পুছিতে ছেলে নিয়ে বাটী আসিলাম। খেতু নীরব, খেতুর মুখে কথা নাই। তার শিশুমনে সে যে কি ভাবিতেছিল, তাহা বলিতে পারি না। কিছুক্ষণ পরে আমার মুখে হাত দিয়া সে জিজ্ঞাসা করিল,–মা! তুমি কাঁদ কেন? আমি বলিলাম,–বাছা! আমার ঘরে একদিন সন্দেশ ছড়া-ছড়ি যাইত, চাকরবাকরে পর্যন্ত খাইয়া আলিয়া যাইত। আজ যে তোমার হাতে এক পয়সার সন্দেশ কিনিয়া দিতে পারিলাম না, এদুঃখ কি আর রাখিতে স্থান আছে? এমন অভাগিনী মার পেটেও বাছা তুই জন্মেছিল! সাত বৎসরের শিশুর এবার কথা শুন! খেতু বলিল,–মা ও সন্দেশ ভাল নয়। দেখিতে পাও নাই, সব পচা! আর মা! তুমি তো জান? সন্দেশ খাইলে আমার অসুখ করে। সেই যে মা, চৌধুরীদের বাড়ীতে নিমন্ত্রণে গিয়াছিলাম, সেখানে সন্দেশ খাইয়াছিলাম, তার পরদিন আমার কত অসুখ করিয়াছিল! সন্দেশ খাইতে নাই, মুড়ি খাইতে আছে। ঘরে যদি মা! মুড়ি থাকে তো দাও আমি খাই।

খেতুর মার মুখে খেতুর কথা আর ফুরায় না। রামহরির কি নিকট কত যে কি পরিচয় দিলেন, তাহা আর কি বলিব?

অবশেষে রামহরি বলিলেন,—খুড়ী-মা! ভয় করিও না। আমার নিজের ছেলের চেয়েও আমি খেতুর যত্ন করিব। শিব কাকার আমি অনেক খাইয়াছি। তাঁহার অনুগ্রহে আজ পরিবারবর্গকে এক মুঠা অন্ন দিতেছি। আজ তাঁহার ছেলে যে মুখ হইয়া থাকিবে, তাহা প্রাণে সহ্য হবে না। খেতু কেমন আছে, কেমন লেখাপড়া করিতেছে, সে বিষয়ে আমি সৰ্ব্বদা আপনাকে পত্রে লিখিব। আবার, খেতু যখন চিঠি লিখিতে শিখিবে, তখন সে নিজে আপনাকে চিঠি লিখিবে। পূজার সময় ও গ্রীষ্মের ছুটীর সময় খেতুকে দেশে পাঠাইয়া দিব। বৎসরের মধ্যে দুই তিন মাস সে আপনার নিকট থাকিবে। আজ আমি এখন যাই। আজ শুক্রবার। বুধবার ভাল দিন। সেই দিন খেতুকে কলিকাতায় লইয়া যাইব।

 

পঞ্চম পরিচ্ছেদ–নিরঞ্জন

তনু রায়ের সহিত নিরঞ্জন কবিরত্নের ভাব নাই। নিরঞ্জন তনু রায়ের প্রতিবেশী।

নিরঞ্জন বলেন,—রায় মহাশয়! কন্যার বিবাহ দিয়া টাকা লইবেন না, টাকা লইলে ঘোর পাপ হয়।

তনু রায় তাই নিরঞ্জনকে দেখিতে পারেন না, নিরঞ্জনকে তিনি ঘৃণা করেন। যে দিন তনু রায়ের কন্যার বিবাহ হয়, নিরঞ্জন সেই দিন গ্রাম পরিত্যাগ করিয়া অপর গ্রামে গমন করেন। তিনি বলেন,কন্যা বিক্রয় চক্ষে দেখিলে, কি কর্ণে শুনিলেও পাপ হয়।

নিরঞ্জন অতি পণ্ডিত লোক! নানা শাস্ত্র তিনি অধ্যয়ন করিয়াছেন। বিদ্যা-শিক্ষার শেষ নাই, তাই রাত্রি দিন তিনি পুঁথি-পুস্তক সইয়া থাকেন। লোকের কাছে আপনার বিদ্যার পরিচয় দিতে ইনি ভালবাসেন না। তাই জগৎ জুড়িয়া ইহার নাম হয় নাই। পূর্ব্বে অনেকগুলি ছাত্র ইহার নিকট বিদ্যা শিক্ষা করিত। দিবারাত্রি তাহাদিগকে বিদ্যা-শিক্ষা দিয়া ইনি পরম পরিতোষ লাভ করিতেন। আহার পরিচ্ছদ দিয়া ছাত্রগুলিকে পুত্রের মত প্রতিপালন করিতেন। লোকের বাড়ী নিমন্ত্রণে গিয়া বিদায়ের জন্য ইনি মারামারি করিতেন না। কারণ, ইহার অবস্থা ভাল ছিল। পৈতৃক অনেক ব্রহ্মেত্তরভূমি ছিল।

গ্রামের জমিদার, জনার্দ্দন চৌধুরীর সহিত এই ভূমি লইয়া কিছু গোলমাল হয়। একদিন দুই প্রহরের সময় জমিদার এক জন পেয়াদা পাঠাইয়া দেন।

পেয়াদা আসিয়া নিরঞ্জনকে বলে,–ঠাকুর! চৌধুরী মহাশয় তোমাকে ডাকিতেছেন, চল। নিরঞ্জন বলিলেন,–আমার আহার প্রস্তুত, আমি আহার করিতে যাইতেছি। আহার হইলে জমিদার মহাশয়ের নিকট যাইব। তুমি এক্ষণে যাও।

পেয়াদা বলিল, তাহা হইবে না, তোমাকে এইক্ষণেই আমার সহিত যাইতে হইবে।

নিরঞ্জন বলিলেন,–বেলা দুই প্রহর অতীত গিয়াছে, ঠাঁই হইয়াছে, ভাত প্রস্তুত, ভাত দুইটি মুখে দিয়া, চল যাইতেছি। কারণ, আমি আহার না করিলে গৃহিণী আহার করিবেন না, ছাত্রগণের আহার হইবে না। সকলেই উপবাসী থাকিবে।

পেয়াদা বলিলেন,–তাহা হইবে না, তোমাকে এইক্ষণেই যাইতে হইবে।

নিরঞ্জন বলিলেন,–এইক্ষণেই যাইতে হইবে, বটে? আচ্ছা, তবে চল যাই। পেয়াদার সহিত নিরঞ্জন গিয়া জমিদার বাটীতে উপস্থিত হইলেন।।

জনার্দ্দন চৌধুরী বলিলেন,–কখন্ আপনাকে ডাকিতে পাঠাইয়াছি, আপনার যে আর আসিবার বার হয় না!

নিরঞ্জন বলিলেন,–আজ্ঞা হাঁ মহাশয়! আমার একটু বিলম্ব হইয়াছে।

জমিদার বলিলেন,–বামুনারীর মাঠে অপনার যে পঞ্চাশ বিঘা ব্রহ্মোত্তর ভূমি আছে, জরিপে তাহা পঞ্চান্ন বিঘা হইয়াছে। আপনার দলিল-পত্ৰ ভাল আছে, সে জন্য সবটুকু ভূমি আমি কাড়িয়া লইতে বাসনা করি না, তবে মাপে যেটুকু অধিক হইয়াছে, সেটুকু আমার প্রাপ্য।–নিরঞ্জন উত্তর করিলেন,–আজ্ঞা, হাঁ মহাশয়! দলিল-পত্র আমার ভাল আছে। দেখুন, দেখি; এই কাগজখানি কি না?

জনার্দ্দন চৌধুরী কাগজখানি হাতে লইয়া বলিলেন,–হাঁ, এই কাগজখানি বটে, ইহা আমি পূর্ব্বে দেখিয়াছি, এখন আর দেখিবার আবশ্যক নাই।

এই কথা বলিয়া নিরঞ্জনের হাতে তিনি কাগজখানি ফিরাইয়া দিলেন। নিরঞ্জন কাগজখানি তামাক খাইবার আগুনের মালসায় ফেলিয়া দিলেন। দেখিতে দেখিতে কাগজখানি জ্বলিয়া গেল। জমিদার বলিলেন,–হাঁ হাঁ করেন কি?

নিরঞ্জন বলিলেন,–কেবল পাঁচ বিঘা কেন? আজ হইতে আমার সমুদায় ব্রহ্মোত্তর ভূমি আপনার। যিনি জীব দিয়াছেন, নিরঞ্জনকে তিনি আহার দিবেন।

পাছে ব্রহ্মশাপে পড়েন, সেজন্য জনার্দ্দন চৌধুরীর ভয় হইল। তিনি বলিলেন, দলিল গিয়াছে গিয়াছে, তাহাতে কোনও ক্ষতি নাই। আপনি ভূমি ভোগ করুন, আপনাকে আমি কিছু বলিব না।

নিরঞ্জন উত্তর করিলেননা মহাশয়। জীব যিনি দিয়াছেন, আহার তিনি দিবেন। সেই দীন-বন্ধুকে ধ্যান করিয়া তাঁহার প্রতি জীবন সমর্পণ করিয়া কালাতিপাত করাই ভাল। বিষয় বৈভব চিন্তায় যদি ধৰ্ম্মানুষ্ঠানে বিঘ্ন ঘটে, চিত্ত যদি বিচলিত হয়, তাহা হইলে সে বিষয়-বিভব পরিত্যাগ করাই ভাল। আমার ভূমি ছিল বলিয়াই তো আজ দুই প্রহরের সময় আপনার যবন পেয়াদার নিষ্ঠুর বচন আমাকে শুনিতে হইল? সুতরাং সে ভূমিতে আমার আর কাজ নাই। স্পৃহাশুন্য ব্যক্তির নিকট রাজা, ধনী, নির্ধন, সবাই সমান। আপনি বিষয়ী লোক, আপনি আমার কথা বুঝিতে পারিবেন না। বুঝিতে পারিলেও আপনি সংসার-বন্ধনে নিতান্ত আবদ্ধন মরীচিকা-মায়াজালের অনুসরণ আপনাকে করিতেই হইবে। আতপ-তাপিত ভূষিত মরুপ্রান্তর হইতে আপনি মুক্ত হইতে পারিবেন না। এখন আশীৰ্ব্বাদ করুন, যেন কখনও কখনও কাহারও নিকট কোন বিষয়ের নিমিত্ত নিজের জন্য আমাকে প্রার্থী না হইতে হয়। এই কথা বলিয়া নিরঞ্জন প্রস্থান করিলেন।

নিরঞ্জলের সেই দিন হইতে মন্দ হইল। অতি কষ্টে তিনি দিনাতিপাত করিতে লাগিলেন। ছাত্রগণ একে একে তাঁহাকে ছাড়িয়া গোবর্ধন শিরোমণির চতুষ্পঠীতে যাইল।

গোবর্ধন শিরোমণি জনার্দ্দন চৌধুরীর সভাপণ্ডিত; অনেকগুলি ছাত্রকে তিনি অনুদান করেন। বিদ্যাদান করিবার তাঁহার অবকাশ নাই। চৌধুরী মহাশয়ের বাটীতে সকাল সন্ধ্যা উপস্থিত থাকিতে হয়, তাহা ব্যতীত অধ্যাপকের নিমন্ত্রণে সর্ব্বদা তাঁহাকে নানা স্থানে গমনাগমন করিতে হয়। সুতরাং ছাত্রগণ আপনা-আপনি বিদ্যা শিক্ষা করে।

সে জন্য কিন্তু কেহ দুঃখিত নয়। গোবর্ধন শিরোমণির উপর রাগ হয় না। অভিমানও হয় না। কারণ, তিনি অতি মধুরভাষী, বাক্যসুধা দান করিয়া সকলকেই পরিতুষ্ট করেন। বিশেষতঃ ধনবান লোক পাইলে শ্রাবণের বৃষ্টি ধারায় তিনি বাক্য-সুধা বর্ষণ করিতে থাকেন; তৃষিত চাতকের ন্যায় তাঁহারা সেই সুধা পান করেন।

একদিন জনার্দ্দন চৌধুরীর বাটীতে আসিয়া তনু রায় শাস্ত্ৰবিচার করিতেছিলেন। নিরঞ্জন, গোবর্ধন প্রভৃতি সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

তনু রায় বলিলেন,–কন্যাদান করিয়া বংশজ কিঞ্চিৎ সম্মান গ্রহণ করিবে। শাস্ত্রে একেবারেই নিষিদ্ধ।–গোবর্ধন চুপি চুপি বলিলেন,—বল না? মহাভারতে আছে।

তনু রায় তাহা শুনিতে পাইলেন না। ভাবিয়া চিন্তিয়া বলিলেন—দাতা-কর্ণে আছে।

এই কথা শুনিয়া নিরঞ্জন একটু হাসিলেন। নিরঞ্জনের হাসি দেখিয়া তনু রায়ের রাগ হইল।–নিরঞ্জন বলিলেন,–রায় মহাশয়! কন্যার বিবাহ দিয়া টাকা গ্রহণ করা মহাপাপ। পাপ করিতে ইচ্ছা হয়, করুন; কিন্তু শাস্ত্রের দোষ দিবেন না, শাস্ত্রকে কলঙ্কিত করিবেন না। শাস্ত্র আপনি জানেন না, শাস্ত্র আপনি পড়েন নাই।

তনু রায় আর রাগ সংবরণ করিতে পারিলেন না। নিরঞ্জনের প্রতি নানা কটু কথা প্রয়োগ করিয়া অবশেষে বলিলেন, আমিশা পড়ি নাই? ভাল? কিসের জন্য আমি পরের শাস্ত্র পড়িব? যদি মনে করি তো আমি নিজে কত শাস্ত্র করিতে পারি। যে নিজে শাস্ত্র করিতে পারে সে পরের শাস্ত্র কেন পড়িবে?

নিরঞ্জনকে এইবার পরাস্ত মানিতে হইল। তাঁকে স্বীকার করিতে হইল যে, যে লোক নিজে শাস্ত্র প্রণয়ন করিতে পারে, পরের শাস্ত্র তাঁহার পড়িবার আবশ্যক নাই।

 

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ–বিদায়

যে দিন রামহরির সহিত কথাবার্তা হইল, সে দিন রাত্রিতে মা, খেতুর গায়ে স্নেহের সহিত হাত রাখিয়া বলিলেন,—খেতু! বাবা! তোমাকে একটি কথা বলি।

খেতু জিজ্ঞাসা করিলেন,–কি মা?

মা উত্তর করিলেন,বাছা! তোমার রামহরি দাদার সহিত তোমাকে কলিকাতায় যাইতে হইবে।–খেতু জিজ্ঞাসা করিলেন,—সে কোথায় মা!।

মা বলিলেন,–তোমার মনে পড়ে না? সেই যে, যেখানে গাড়ী ঘোড়া আছে?

খেতু বলিলেন—সেই খানে? তুমি সঙ্গে যাবে তো মা?

মা উত্তর করিলেন,—না বাছা! আমি যাইব না, আমি এইখানেই থাকিব।

খেতু বলিলেন,–তবে মা! আমিও যাইব না!

মা বলিলেন,–না গেলে বাছা চলিবে না। আমি মেয়েমানুষ, আমাকে যাইতে নাই। রামহরি দাদার সঙ্গে যাইবে তাতে আর ভয় কি?

খেতু বলিলেন,—ভয়! ভয় মা! আমি কিছুতে ভয় করি না। তবে তোমার জন্য আমার মন কেমন করিবে, তাই মা বলিতেছি যে, যাব না।

মা বলিলেন,–খেতু! সাধ করিয়া কি তোমাকে আমি কোথাও পাঠাই? কি করি, বাছা? না পাঠালেই নয়, তাই পাঠাতেই চাই। তুমি এখন বড় হইয়াছে, এইবার তোমাকে স্কুলে পড়িতে হইবে। না পড়িলে শুনিলে মূখ হয়, মুখকে কেহ ভালবাসেনা, কেহ আদর করে না, তুমি যদি স্কুলে যাও আর মন দিয়া লেখা পড়া কর, তাহা হইলে সকলেই তোমাকে ভালবাসিবে; আর খেতু! তোমার এই দুঃখিনী মার দুঃখ ঘুচিবে। এই দেখ, আমি আর সরু পৈতা কাটিতে পারি না, চক্ষে দেখতে পাই না। আর কিছুদিন পরে হয় তো মোটা পৈতাও কাটিতে পারিব না। তখন বল, পয়সা কোথায় পাইব? লেখা-পড়া শিখিয়া তুমি টাকা আনিতে পারিলে, আমাকে আর পৈতা কাটিতে হইবে না। আমি তখন সুখেস্বচ্ছন্দে থাকিব, পূজা-আচ্চা করিব, আর ঠাকুরদের কাছে বলিব,—খেতু আমার বড় সুছেলে, খেতুকে তোমরা বাঁচাইয়া রাখ।

খেতু বলিলেন,–মা! আমি যদি যাই, তুমি কাঁদিবে না?

মা উত্তর করিলেন,–না বাছা, কাঁদিব না।

খেতু বলিলেন,—ঐ যে মা! কাঁদিতেছ!।

মা উত্তর করিলেন,–এখন কান্না পাইতেছে, ইহার পর আর কাঁদিব না। আর খেতু সেখানে তোমাকে বারমাস থাকিতে হইবে না, ছুটী পাইলে তুমি মাঝে মাঝে বাড়ী আসিবে। আমি পথপানে চাহিয়া থাকিব, আগে থাকিতে দত্তদের পুকুর ধারে গিয়া বসিয়া থাকিব, সেইখান হইতে তোমাকে কোলে করিয়া আনিব। মন দিয়া লেখা পড়া করিলে, তুমি আবার আমাকে চিঠি লিখিতে শিখিবে। তুমি আমাকে কত চিঠি লিখিবে আমি সে চিঠিগুলি তুলিয়া রাখিব, কাহাকেও খুলিতে দিব না, কাহাকেও পড়িতে দিব না। তুমি যখন বাড়ীতে আসিবে, তখন সেই চিঠিগুলি খুলিয়া আমাকে পড়িয়া পড়িয়া শুনাইবে।

খেতু জিজ্ঞাসা করিলেন,–মা! সেখানে মালা পাওয়া যায়?

মা বলিলেন,–মালা কি? খেতু বলিলেন,–সেই যে মা? তুমি একদিন বলিয়াছিলে যে, রাত্রিতে ঘুম হয় না, যদি একছড়া মালা পাই তো বসিয়া বসিয়া জপ করি।

মা উত্তর করিলেন—হ্যা বাছা! মালা সেখানে অনেক পাওয়া যায়।

খেতু বলিলেন,–আমি তোমার জন্য, মা! ভাল মালা কিনিয়া আনিব।

মা উত্তর করিলেন, তাই ভাল। আমার জন্য মালা আনিও।

মাতা-পুত্রে এইরূপ কথার পর, কলিকাতার বিষয় ভাবিতে ভাবিতে খেতু নিদ্রিত হইলেন। তাহার পরদিন সকালে উঠিয়া খেতু বলিলেন,–মা, এই কয়দিন আমি পাঠশালায় যাইব না, খেলা করিতেও যাইব না, সমস্ত দিন তোমার কাছে থাকিব।

মা উত্তর করিলেন,—-আচ্ছা, তাই ভাল, তবে তোমার নিরঞ্জন কাকাকে একবার নমস্কার করিতে যাইও।

খেতু বলিলেন,—তা যাব। আমি আর একটি কথা বলি। তোমার খাওয়া হইলে, এ কয়দিন আমি তোমার পাতে ভাত খাইব। পাতে ভাত রাখিতে মানা করি, কেন তা জান মা? যাহা তোমার মুখে ভাল লাগে, নিজে না খাইয়া আমার জন্য রাখ। তাই আমি বলি, দুপুর বেলা মা! আমার ক্ষুধা পায় না, আমার জন্য পাতে ভাত রাখিও না। ক্ষুধা, কিন্তু মা! খুব পায়। লোকের গাছতলায় কত কুল, কত বেল পড়িয়া থাকে, স্বচ্ছেন্দে কুড়াইয়া খাই। কিন্তু তোমার ক্ষুধা পাইলে তুমি তো মা, তা খাও না? তাই পাতে ভাত রাখিতে মানা করি, পাছে মা! তোমার পেট না ভরে!

ব্রাহ্মণী খেতুকে কোলে লইলেন, মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে কাঁদিতে লাগিলেন, আর বলিলেন,—বাবা! এ দুঃখের কান্না নয়! তোমা হেন চাঁদ ছেলে যে গর্ভে ধরিয়াছে, তার আবার দুঃখ কিসের? তোমার সুধামাখা কথা শুনিলে ভয় হয়, এ হতভাগিনীর কপালে তুমি কি বাঁচিবে?

সেই দিন আহারাদির পর খেতুর হেঁড়া খোঁড়া কাপড়গুলি মা সেলাই করিতে বসিলেন।

খেতু বলিলেন,—মা। আমি ছেড়ার দুই ধার এক করিয়া ধরি, তুমি ওদিক্‌ হইতে সেলাই কর, তাহা হইলে শীঘ্র হইবে। আর মা। যখন সূচ সূতা না থাকিবে, তখন আমি পরাইয়া দিব, তুমি ছিদ্রটি দেখিতে পাও না, সূততা পরাইতে তোমার অনেক বিলম্ব হয়।

এইরূপে মাতাপুত্রে কথা কহিতে কহিতে কাপড় সেলাই হইতে লাগিল। তাহার পর মা সেইগুলিকে ক্ষারে কাচিয়া পরিষ্কার করিয়া লইলেন। খেতু কলিকাতায় যাইবেন, তাঁহার আয়োজন এইরূপে হইতে লাগিল।–বৈকালবেলা খেতু নিরঞ্জনের বাটী যাইলেন। নিরঞ্জন ও নিরঞ্জনের স্ত্রীকে প্রণাম করিয়া পায়ের ধূলা লইয়া, কলিকাতায় যাইবার কথা তাহাদিগকে বলিলেন। রামহরির নিকট নিরঞ্জন পূৰ্বেই সমস্ত কথা শুনিয়াছিলেন।

এক্ষণে খেতুকে আশীর্বাদ করিয়া, নানারূপ উপদেশ দিয়া নিরঞ্জন বলিলেন,–খেতু! সর্ব্বদা সত্য কথা বলিবে, মিথ্যা কখনও বলিও না। নীচতা ও নিষ্ঠুরতা পরিত্যাগ করিবে। জীবে দয়া করিবে। যথাসাধ্য পরোপকার করিবে, ইহাই সনাতন ধর্ম্ম। সুখ-দুঃখের সকল কথা তোমার রামহরি দাদাকে বলিবে, কোনও কথা তাঁহার নিকট গোপন করিবে না। অনেক বালকের সহিত তোমাকে পড়িতে হইবে, তাঁহার মধ্যে কেহ দুষ্ট, কেহ শিষ্ট। সুতরাং বালকে বালকে বিবাদ হইবে। অন্যায় করিয়া কাহাকেও মারিও না, দুর্বলকে মারিও না, পাঁচজন পড়িয়া একজনকে মারিও না, দুর্বলকে কেহ মারিতে আসিলে তাঁহার পক্ষ হইও। দুর্বলের পক্ষ হইয়া যদি মার খাইতে হয় সেও ভাল। প্রতিদিন রাত্রিতে শুইবার সময় মনে করিয়া দেখিবে যে, সেদিন কি সুকার্য কি কুকাৰ্য্য করিয়াছ। যদি কোনও প্রকার কুকাৰ্য্য করিয়া থাক, তো মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিবে, আর এমন কাজ কখনও করিব না।

এইরূপে খেতু, নিরঞ্জন কাকার নিকট হইতে বিদায়গ্রহণ করিলেন।

মঙ্গলবার রাত্রিতে মাতা-পুত্রের নিদ্রা হইল না। দুই জনে কেবল কথা কহিতে লাগিলেন, কথা আর ফুরায় না। কতবার মা বলিলেন,–খেতু! ঘুমাও, না ঘুমাইলে অসুখ করিবে।

খেতু বলিলেন,–না মা! আজ রাত্রিতে ঘুম হইবে না। আর মা কাল রাত্রিতে তো আর তোমার সঙ্গে কথা কহিতে পাব না? কাল কতদূর চলিয়া যাব। সে কথা যখন মা! মনে করি, তখন আমার কান্না পায়। মা বলিলেন,—পূজার ছুটির আর অধিক দিন নাই, দেখিতে দেখিতে এ কয়মাস কাটিয়া যাইবে। তখন তুমি আবার বাড়ী আসিবে।

প্রাতঃকালে রামহরি আসিলেন। খেতুর মা, খেতুর কপালে দধির ফোটা করিয়া দিলেন, চাদরের খুঁটে বিল্বপত্র বাঁধিয়া দিলেন। নীরবে নিঃশব্দে রামহরির হাতের উপর খেতুর হাতটি দিলেন। চক্ষু ফুটিয়া জল আসিতেছিল, অনেক কষ্টে তাহা নিবারণ করিলেন।

অবশেষে ধীরে ধীরে কেবল এই কথাটি বলিলেন,–দুঃখিনীর ধন তোমাকে দিলাম।

রামহরি বলিলেন,—খেতু! মাকে প্রণাম কর।

খেতু প্রণাম করিলেন, রামহরি নিজেও প্রণাম করিয়া দুইজনে বিদায় হইলেন।

যতক্ষণ দেখা যাইল, ততক্ষণ খেতুর মা অনিমেষ নয়নে সেই পথপানে চাহিয়া রহিলেন। খেতুও মাঝে মাঝে পশ্চাৎদিকে চাহিয়া মাকে দেখিতে লাগিলেন। যখন আর দেখা গেল না, তখন খেতুর মা পথের ধূলায় শুইয়া পড়িলেন। ধূলায় লুণ্ঠিত হইয়া-অবিরল ধারায় চক্ষের জলে সেই ধূলা ভিজাইতে লাগিলেন।

 

সপ্তম পরিচ্ছেদ—কঙ্কাবতী

পথে পড়িয়া খেতুর মা কাঁদিতেছেন, এমন সময় তনু রায়ের স্ত্রী সেইখানে আসিলেন।

তাঁহার হাত ধরিয়া তুলিয়া ধীরে ধীরে তিনি বলিলেন,–দিদি! চুপ কর। চক্ষের জল ফেলিতে নাই। চক্ষের জল ফেলিলে ছেলের অমঙ্গল হয়।

খেতুর মা উত্তর করিলেন,–সব জানি বো! কিন্তু কি করি? চক্ষের জল যে রাখিতে পারি না, আপনা-আপনি বাহির হইয়া পড়ে। আমি যে আজ পৃথিবী শূন্য দেখিতেছি! কি করিয়া ঘরে যাই? আজ যে আমার আর কোন কাজ নাই। আজ তো আর খেতু পাঠশালা হইতে কালি ঝুলি মাখিয়া ক্ষুধা ক্ষুধা করিয়া আসিবে না? এতক্ষণ খেতু কতদূর চলিয়া গেল! আহা, বাছার কত না মন কেমন করিতেছে!

তনু রায়ের স্ত্রী বলিলেন,—চল দিদি! ঘরে চল। সেইখানে বসিয়া, চল, খেতুর গল্প করি। আহা! খেতু কি গুণের ছেলে! দেশে এমন ছেলে নাই। তোমার কপালে এখন বাঁচিয়া থাকে তবেই; তা না হইলে সব বৃথা।

এই বলিয়া তনু রায়ের স্ত্রী খেতুর-মার হাত ধরিয়া ঘরে লইয়া গেলেন। সেখানে অনেক্ষণ ধরিয়া দুইজনে খেতুর গল্প করিলেন।

খেতু খাইয়া গিয়াছিল, তনু রায়ের স্ত্রী সেই বাসনগুলি মাজিলেনও ঘর-দ্বার সব পরিষ্কার করিয়া দিলেন। বেলা হইলে খেতুর মা রাঁধিয়া খাইবেন, সে নিমিত্ত তরকারিগুলি কুটিয়া দিলেন, বাটনাটুকু বাটিয়া দিলেন।

খেতুর মা বলিলেন,—থাক বোন্ থাক! আজ আর আমার খাওয়া দাওয়া! আজ আর আমি কিছু খাইব না।

তনু রায়ের স্ত্রী বলিলেন,—না দিদি! উপবাসী কি থাকিতে আছে? খেতুর অকল্যাণ হয়, তা কি তিনি করিতে পারেন?-খেতুর অকল্যাণ হইবে। এই কথাটি বলিলেই খেতুর মা চুপ! যা করিলে খেতুর অকল্যাণ হয়, তা কি তিনি করিতে পারেন?

তনু রায়ের স্ত্রী পুনরায় বলিলেন,—এই সব ঠিক করিয়া দিলাম। বেলা হইলে রান্না চড়াইয়া দিও। কাজ-কর্ম সারা হইলে আমি আবার ও বেলা আসিব।অপরাহ্নে তনু রায়ের স্ত্রী পুনরায় আসিলেন। কোলের মেয়েটিকে সঙ্গে আনিয়াছিলেন।–খেতুর মা বলিলেন,–আহা! কি সুন্দর মেয়েটি বোন্ যেমন মুখ, তেমনি চুল, তেমনি রং।

তনু রায়ের স্ত্রী বলিলেন,–হা! সকলেই বলে, এ কন্যাটি তোমার গর্ভের সুন্দর। তা দিদি! এ পোড়া পেটে কেন যে এরা আসে? মেয়ে হইলে ঘরের মানুষটি আহ্লাদে আটখানা হন; কিন্তু আমার মনে হয় যে, আঁতুর ঘরেই মুখে নুন দিয়া মারি। গ্রীষ্মকালে একাদশীর দিন, মেয়ে দুইটির যখন মুখ শুকাইয়া যায়, যখন একটু জলের জন্য বাছাদের প্রাণ টা টা করে, বল দেখি, দিদি! মার প্রাণ তখন কিরূপ হয়? পোড়া নিয়ম। যে এ নিয়ম করিয়াছে, তাঁহাকে যদি একবার দেখিতে পাই, তো ঝাঁটা পেটা করি। মুখপোড়া যদি একটু জল খাবারও বিধান দিত, তাহা হইলে কিছু বলিতাম না।

খেতুর মা বলিলেন,–আর জন্মে যে যেমন করিয়াছে, এ জন্মে সে তার ফল পাইয়াছে; আবার এ জন্মে যে যেরূপ করিবে, ফিরে জন্মে সে তার ফল পাইবে।

তনু রায়ের স্ত্রী পুনরায় বলিলেন,–এক একবার মনে হয় যে, যদি বিদ্যাসাগরী মতটা চলে, তো ঠাকুরদের সিন্নি দিই।

খেতুর মা উত্তর করিলেন,— চুপ কর বোন্। ছি ছি! ও কথা মুখে আনিও না। বিদ্যাসাগরের কথা শুনিয়া সাহেবরা যদি বলেন যে, দেশে আর বিধবা থাকিতে পারে না, সকলকেই বিবাহ করিতে হইবে, ছি ছি! ও মা! কি ঘৃণার কথা! এই বৃদ্ধ বয়সে তাহা হইলে যাব কোথা? কাজেই তখন গলায় দড়ি দিয়া কি জলে ড়ুবিয়া মরিতে হইবে।

তনু রায়ের স্ত্রী হাসিয়া বলিলেন,–দিদি! এতদিন তুমি কলিকাতায় ছিলে, কিন্তু তুমি কিছুই জান না। বিদ্যাসাগর মহাশয় বুড়ো হাবড়া সকলকেই ধরিয়া বিবাহ দিতে চান নাই। অতি অল্প বয়সে যাহারা বিধবা হয়, কেবল সেই বালিকাদিগের বিবাহের কথা তিনি বলিয়াছিলেন। তাও যাহার ইচ্ছা হবে, সে দিবে; যাহার ইচ্ছা না হবে, না দিবে।

খেতুর মা বলিলেন,—কি জানি, ভাই। আমি অত শত জানি না।

তনু রায়ের স্ত্রীর দুইটি বিধবা মেয়ে, তাহাদের দুঃখে তিনি সদাই কাতর। সে জন্য বিধবা বিবাহের কথা পড়িলে তিনি কান দিয়া শুনিতেন। কলিকাতায় বাস করিয়া খেতুর মা যাহা না জানেন, তাহা ইনি জানেন।

তনু রায় পণ্ডিত লোক। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মতটি যেই বাহির হইল, আর ইনি লুফিয়া লইলেন। তিনি বলিলেন,–বিধবা বিবাহের বিধি যদি শাস্ত্রে আছে, তবে তোমরা মানিবে না কেন! শাস্ত্র অমান্য করা ঘোর পাপের কথা। দুইবার কেন? বিধবাদিগের দশ বার বিবাহ দিলেও কোন দোষ নাই, বরং পূণ্য আছে। কিন্তু এ হতভাগ্য দেশ ঘোর কুসংস্কারে পরিপূর্ণ, এ দেশের আর মঙ্গল নাই।

তনু রায়ের মত নিষ্ঠাবান্ লোক্রে মুখে এইরূপ কথা শুনিয়া প্রথম প্রথম সকলে কিছু আশ্চৰ্য্য হইয়াছিল। তার পর সকলে ভাবিল,—আহা! বাপের প্রাণ!, ঘরে দুইটি বিধবা মেয়ে, মনের খেদে উনি এইরূপ কথা বলিতেছেন। –কেল নিরঞ্জন বলিলেন,—হ্যা। বিধবা বিবাহটি প্রচলিত হইলে তনু রায়ের ব্যবসাটি চলে ভাল!

এই কথা শুনিয়া সকলে নিরঞ্জনকে ছি ছি করিতে লাগিল। সকলে বলিল,—নিরঞ্জনের মনটি হিংসায় পরিপূর্ণ। তা না হইলেই বা ওর এমন দশা হইবে কেন? যার দুই শত বিঘা ব্রােত্তর ভূমি ছিল, আজ সে পথের ভিখারী; কোনও দিন অন্ন হয়, কোনও দিন অন্ন হয় না।–খেতুর মাতে আর তনু রায়ের স্ত্রীতে নানারূপ কথাবার্তা হইতে লাগিল।

খেতুর মা জিজ্ঞাসা করিলেন,—তোমার এ মেয়েটি বুঝি এক বৎসর হইল?

তনু রায়ের স্ত্রী উত্তর করিলেন,–হ্যা! এই এক বৎসর পার হইয়া দুই বৎসরে পড়িবে?খেতুর মা বলিলেন,–কঙ্কাবতী। দিব্য নামটি তো? মেয়েটিও যেমন নরম নরম দেখিতে, নামটিও সেইরূপ নরম নরম শুনিতে।

এইরূপ খেতুর মাতে আর তনু রায়ের স্ত্রীতে ক্রমে ক্রমে বড়ই সদ্ভাব্য হইল। অবসর পাইলে তনু রায়ের স্ত্রী কঙ্কাবতীকে খেতুর মার কাছে ছাড়িয়া যান।

মেয়েটি এখনও হাঁটিতে শিখে নাই; হামাগুড়ি দিয়া চারিদিকে বেড়ায় কখনও বা বসিয়া খেলা করে কখনও বা কিছু ধরিয়া দাঁড়ায়। খেতুর মা আপনার কাজ করেন ও তাঁহার সহিত দুটি একটি কথা কন্। কথা কহিলে মেয়েটি ফিক ফিক্‌ করিয়া হাসে, মুখে হাসি ধরে না। মেয়েটি বড় শান্ত, কাঁদিতে একেবারে জানে না।

 

অষ্টম পরিচ্ছেদ—বালক-বালিকা

কলিকাতায় গিয়া খেতু ভালরূপে লেখা-পড়া করিতে লাগিলেন। শান্ত শিষ্ট, সুবুদ্ধি। খেতুর নানা গুণ দেখিয়া সকলে তাঁহাকে ভাল বাসিতেন।

রামহরির এক্ষণে কেবল একটি শিশু-পুত্র, তাঁহার নাম নরহরি। তিন বৎসর পরে একটি কন্যা হয়; তাঁহার নাম হইল সীতা।

রামহরি ও রামহরির স্ত্রী, খেতুকে আপনাদিগের ছেলের চেয়ে অধিক স্নেহ করিতেন। খেতুর প্রখর বুদ্ধি দেখিয়া স্কুলে সকলেই বিস্মিত হইলেন। খেতু সকল কথা বুঝিতে পারেন, সকল কথা মনে করিয়া রাখিতে পারেন। যখন যে শ্রেণীতে পড়েন, তখন সেই শ্রেণীর সর্বোত্তম বালক—খেতু; খেতুর উপর কেহ উঠিতে পারে না। যখন যে কয়খানি পুস্তক পড়ুন তাঁহার ভিতর হইতে প্রশ্ন করিয়া খেতুকে ঠকানো ভার। এইরূপে খেতু এক শ্রেণী হইতে অপর শ্রেণীতে উঠিতে লাগিলেন।

জল খাইবার নিমিত্ত রামহরি খেতুকে একটি করিয়া পয়সা দিতেন; খেতু কোনও দিন খাইতেন, কোনও দিন খাইতেন না। কি করিয়া রামহরি এই কথা জানিতে পারিলেন।

খেতুকে তিনি একদিন জিজ্ঞাসা করিলেন,–খেতু! তুমি জল খাওনা কেন? পয়সা লইয়া কি কর?

খেতু কিছু অপ্রতিভ হইলেন, একটুখানি চুপ করিয়া উত্তর করিলেন,–দাদা-মহাশয়। যে দিন বড় ক্ষুধা পায়, যে দিন আর থাকিতে পারি না, সেই দিন জল খাই; যে দিন না খাইয়া থাকিতে পাবি সেই দিন আর খাই না। যা পয়সা বাঁচিয়েছি, তাহা আমার কাছে আছে। যখন মার নিকট হইতে আসি, তখন মাকে বলিয়াছিলাম যে,! তোমার জন্য আমি এক ছড়া মালা কিনিয়া আনিব; সেই জন্য এই পয়সা রাখিতেছি।

যখন এই কথা হইতেছিল, তখন রামহরির নিকট খেতু দাঁড়াইয়া ছিলেন। রামহরি খেতুর মাথায় হাত দিয়া সম্মুখের চুলগুলি পশ্চাৎ দিকে ফিরাইতে লাগিলেন। খেতু বুঝিলেন দাদা রাগ করেন নাই আদর করিতেছেন।

কিয়ৎক্ষণ পরে রামহরি বলিলেন,–খেতু! যখন মালা কিনিবে আমাকে বলিও, আমি ভাল মালা কিনিয়া দিব।

পূজার ছুটি নিকট হইল। তখন খেতু বলিলেন,–দাদা মহাশয়! কৈ, এইবার মালা কিনিয়া দিন?-রামহরি বলিলেন,–তোমার কতগুলিয়সা হইয়াছে, নিয়ে এস, দেখি?

খেতু পয়সাগুলি আনিয়া দাদার হাতে দিলেন। রামহরি গণিয়া দেখিলেন যে, এক টাকারও অধিক পয়সা হইয়াছে। আট আনা দিয়া রামহরি একছড়া ভাল রুদ্রাক্ষের মালা কিনিয়া, বাকি পয়সাগুলি খেতুকে ফিরাইয়া দিলেন।

খেতু বলিলেন,–দাদা মহাশয়! আমি এ পয়সা লইয়া আর কি করিব? এ পয়সা আপনি নি। –রামহরি উত্তর করিলেন,—না খেতু। এ পয়সা আমার নয়, এ পয়সা তোমার, বাড়ী গিয়া মাকে দিও, তোমার মা কত অদ করিকেন।

বাড়ী যাইবার দিন নিকট হইল। এখানে খেতুর মনে, আর সেখানে মার মনে আনন্দ ধরে না। তসর ও গালার ব্যবসায়ীরা সকলে এখন দেশে যাইতেছিলেন। তাহাদের সহিত রামহরি খেতুকে পাঠাইয়া দিলেন, আর কবে কোন্ সময়ে দেশে পৌছবেন, সে সমাচার আগে থাকিতে খেতুর মাকে লিখিলেন।

দত্তদের পুকুরধারে কেন? খেতুর মা আরও অনেক দূরে গিয়া দাঁড়াইয়া ছিলেন। দূর হইতে খেতু মাকে দেখিতে পাইয়া ছুটিয়া গিয়া তাঁহাকে ধরিলেন। খেতুর মা, ছেলেকে বুকে করিয়া স্বর্গসুখ লাভ করিলেন।

খেতু বলিলেন,–ঐ যা! মা! আমি তোমাকে প্রণাম করিতে ভুলিয়া গিয়াছি।

মা উত্তর করিলেন,—থাক, আর প্রণামে কাজ নাই। অমনি তোমাকে আশীর্বাদ করি, তুমি চিরজীবী হও, তোমার সোনার দোয়াত কলম হউক।

খেতু বলিলেন,–মা। আমি মনে করিয়াছিলাম, তুমি দত্তদের পুকুর ধারে থাকিবে, এত দূরে আসিবে, তা জানিতাম না!–মা বলিলেন—বাছা! যদি উপায় থাকিত, তো আমি কলিকাতা পর্যন্ত যাইতাম। খেতু! তুমি রোগা হইয়া গিয়াছ।

খেতু উত্তর করিলেন,–না মা! রোগা হই নাই, পথে একটু কষ্ট হইয়াছে, তাই রোগা রোগা দেখাইতেছে। মা! এখন আমি হাঁটিয়া যাই এত দূর তুমি আমাকে লইয়া যাইতে পারিবে না।–মা বলিলেন,–না না, আমি তোমাকে কোলে করিয়া লইয়া যাইব।

কোলে যাইতে যাইতে খেতু পয়সাগুলি চুপি চুপি মার আঁচলে বাঁধিয়া দিলেন। বাড়ী যাইয়া যখন খেতু মার কোল হইতে নামিলেন, তখন মার আঁচল ভারি ঠেকিল।

মা বলিলেন,–এ আবার কি? খেতু! তুমি বুঝি আমার আঁচলে পয়সা বাঁধিয়া দিলে?

খেতু হাসিয়া উঠিলেন আর বলিলেন—মা! রও, তোমাকে আবার একটা তামাসা দেখাই। এই বলিয়া খেতু মালা ছড়াটি মার গলায় দিয়া দিলেন, আর বলিলেন-কেমন মা! মনে আছে তো?–মা খেতুর গালে ঈষৎ ঠোনা মারিয়া বলিলেন,—ভারি দুষ্ট ছেলে! খেতু হাসিয়া উঠিলেন, মাও হাসিলেন।

পর দিন খেতু দেখিলেন যে, তাহাদের বাটীতে কোথা হইতে একটি ছোট মেয়ে

আসিয়াছে। খেতু জিজ্ঞাসা করিলেন,—মা! ও মেয়েটি কাদের গা?

মা বলিলেন—জান না? ও যে তোমার তনু কাকার ছোট মেয়ে! ওর নাম কঙ্কাবতী। তনু রায়ের স্ত্রী এখন সৰ্ব্বদাই আমার নিকট আসেন। আমি পৈতা কাটি আর দুই জনে বসিয়া গল্পগাছা করি। মেয়েটিকে তিনি আমার কাছে মাঝে মাঝে ছাড়িয়া যান। মেয়েটি আপনার মনে খেলা করে, কোনওরূপ উপদ্রব করে না। আমার কাছে থাকিতে ভাল বাসে।–তনু রায়ের সহিত খেতুর কোন সম্পর্ক নাই, কেবল পাড়া প্রতিবাসী, সুবাদে কাকা কাকা বলিয়া ডাকেন। কঙ্কাবতীকে খেতু বলিলেন,—এস, এই দিকে এস।

কঙ্কাবতী সেই দিকে যাইতে লাগিল। খেতু বলিলেন,–দেখ দেখ, মা! কেমন এ ট টল করিয়া চলে!–খেতুর মা বলিলেন,–পা এখনও শক্ত হয় নাই।–একটি পাতা দেখাইয়া খেতু বলিলেন,–এই নাও।

-পাতাটি লইবার নিমিত্ত কঙ্কাবতী হাত বাড়াইল ও হাসিল।

খেতু বলিলেন,–মা! কেমন হাসে দেখ?–মা উত্তর করিলেন,–হাঁ বাছা! মেয়েটি খুব হাসে, কাঁদিতে একেবারে জানে না অতি শান্ত। খেতু বলিলেন মা! আগে যদি জানিতাম, তত ইহার জন্য একটি পুতুল কিনিয়া আনিতাম। মা বলিলেন-এইবার যখন আসিবে, তখন আনিও।

 

নবম পরিচ্ছেদ–মেনী

পূজার ছুটী ফুরাইলে, খেতু কলিকাতায় যাইলেন; সেখানে অতি মনোেযোগের সহিত লেখাপড়া করিতে লাগিলেন। বৎসরের মধ্যে দুইবার ছুটী হইলে তিনি বাটী আসেন। সেই সময় মার জন্য কোনও না কোনও দ্রব্য, আর কঙ্কাবতীর জন্য পুতুলটি খেলনাটি লইয়া আসেন। খেতুর মার নিকট কঙ্কাবতী সৰ্ব্বদাই থাকে, কঙ্কাবতীকে তিনি বড় ভালবাসেন।

খেতুর যখন বার বৎসর বয়স, তখন তিনি একটি বড় মানুষের ছেলেকে পড়াইতে লাগিলেন। বালকের পিতা খেতুকে মাসে পাঁচ টাকা করিয়া দিতেন।

প্রথম মাসের টাকা কয়টি খেতু, রামহরির হাতে দিয়া বলিলেন,দাদা মহাশয়! এ মাস হইতে মার চাউলের দাম আর আপনি নিবেন না, এই টাকা মাকে দিবেন। আমি শুনিয়াছি, আপনার ধার হইয়াছে, তাই যত্ন করিয়া আমি এই টাকা উপার্জন করিয়াছি।

রামহরি বলিলেন,–খেতু! তুমি উত্তম করিয়াছ। উদ্যম, উৎসাহ, পৌরুষ মনুষ্যের নিতান্ত প্রয়োজন। এ টাকা আমি তোমার মার নিকট পাঠাইয়া দিব। তাঁহাকে লিখিব যে, তুমি নিজে এ টাকা উপার্জন করিয়াছ। আর আমি সকলকে বলিব যে, দ্বাদশ বৎসরের শিশু আমাদের খেতু, তাঁহার মাকে প্রতিপালন করিতেছে।

এইবার যখন খেতু বাটী আসিলেন, তখন মার জন্য একখানি নামাবলী, আর কঙ্কাবতীর জন্য একখানি রাঙা কাপড় আনিলেন। রাঙা কাপড়খানি পাইয়া কঙ্কাবতীর আর আহ্লাদ ধরে না। ছুটিয়া তাঁহার মাকে দেখাইতে যাইলেন।

খেতু বলিলেন,–মা! কঙ্কাবতীকে লেখাপড়া শিখাইলে হয় না? মা বলিলেন,–কি জানি বাছা! তনু রায় এক প্রকার লোক। কি বলিতে কি বলিয়া বসিবে।

খেতু বলিলেন,–তাতে আর দোষ কি, মা? কলিকাতায় কত মেয়ে স্কুলে যায়; মা বলিলেন-কঙ্কাবতীর মাকে এ কথা জিজ্ঞাসা করিয়া দেখিব।

সেই দিন তনু রায়ের স্ত্রী আসিলে, খেতুর মা কথায় কথায় বলিলেন,–খেতু বলিতেছে,–এবার যখন বাটী আসিব, তখন কঙ্কাবতীর জন্য একখানি বই আনিব, কঙ্কাবতীকে একটু একটু পড়িতে শিখাই। আমি বলিলাম—না বাছা! তাতে আর কাজ নাই, তোমার তনু কাকা হয় তো রাগ করিবেন।

তনু রায়ের স্ত্রী উত্তর করিলেন,–তাতে আবার রাগ কি, আজ কাল তো ঐ সব হইয়াছে। জামা গায়ে দেওয়া, লেখা পড়া করা, আজ কাল তো সকল মেয়েই করে। তবে আমাদের পাড়া-গাঁ তাই, এখানে ও সব নাই।

বাটী গিয়া কঙ্কাবতীর মা স্বামীকে বলিলেন,–খেতু বাড়ী আসিয়াছে। কঙ্কাবতীর জন্য কেমন একখানি রাঙ্গা কাপড় আনিয়াছে?

তনু রায় বলিলেন,–খেতু ছেলেটি ভাল! লেখা পড়ায় মন আছে। দুপয়সা আনিয়া খাইতে পারিবে। তবে বাপের মত বোকা না হয়।

স্ত্রী বলিলেন,–খেতু বলিতেছিল যে, এইবার যখন বাটী আসিব, তখন একখানি বই আনিয়া কঙ্কাবতীকে একটু একটু পড়িতে শিখাইব।–তনু রায় বলিলেন,–স্ত্রী লোকের আবার লেখাপড়া কেন? লেখাপড়া শিখিয়া আর কাজ নাই।

না বুঝিয়া তনু রায় এই কথাটি বলিয়া ফেলিলেন। কিন্তু যখন তিনি স্থিরভাবে বিবেচনা করিয়া দেখিলেন, তখন বুঝিতে পারিলেন যে লেখাপড়ার অনেক গুণ আছে।

আজকালের বরেরা শিক্ষিতা কন্যাকে বিবাহ করিতে ভালবাসে। এরূপ কন্যার আদর হয়, মূলাও অধিক হয়।

তবে কথা এই কাজটি শাস্ত্রবিরুদ্ধ কি না? শাস্ত্র সম্মত না হইলে তনু রায় কখনই মেয়েকে লেখাপড়া শিখাইতে দিবেন না। মনে মনে তনু রায় শাস্তুবিচার করিতে লাগিলেন।

বিচার করিয়া দেখিলেন যে স্ত্রীলোকের বিদ্যাশিক্ষা শাস্ত্রে নিষিদ্ধ বটে, তবে—এ সত্য ত্রেতা দ্বাপর যুগের নিমিত্ত, কলিকালের জন্য নয়। পূৰ্ব্বকালে যাহা করিতে ছিল, এখন তাহা করিতে নাই। তাঁহার দৃষ্টান্ত, নরমেধ যজ্ঞ। এখন মানুষ বলি দিলে ফাসি যাইতে হয়। আর এক দৃষ্টান্ত,সমুদ্রযাত্রা এখন করিলে জাতি যায়। তাই তনুরায়ের মা যখন জীবিত ছিলেন, তখন তিনি একবার সাগর যাইতে ঢাহিয়াছিলেন। কিন্তু তনু রায় পাঠান নাই।

মাকে তিনি বুঝাইয়া বলিলেন,—মা! সাগর যাইতে নাই! সমুদ্র যাত্ৰ একে বারে নিষিদ্ধ। শাস্ত্রের সঙ্গে আর সমুদ্রের সঙ্গে ঘোরতর আড়ি। সমুদ্র দেখিলে পাপ, সমুদ্র ছুইলে পাপ। কেন মা পয়সা খরচ করিয়া পাপের ভরা কিনিয়া আনিবে? কেন মা জাতি কুল বিসর্জন দিয়া আসিবে?

এক্ষণে তনু রায় বিচার করিয়া দেখিলেন যে, পূৰ্ব্বকালে যাহা করিতে ছিল, এখন তাহা করিতে নাই। সুতরাং পূৰ্ব্বকালে যাহা করিতে মানা ছিল, এখন তাহা লোকে স্বচ্ছন্দে করিতে পারে। স্ত্রীলোকদিগের লেখা-পড়া শিক্ষা করা পূৰ্ব্বে মানা ছিল, তাই এখন তাহাতে কোনরূপ দোষ হইতে পারে না।

শাস্ত্রকে তনু রায় এইরূপ ভাঙ্গিয়া চুরিয়া গড়িলেন। শাস্ত্রটি যখন মনের মতন গড়া হইল, তখন তিনি স্ত্রীকে বলিলেন,–আচ্ছা! খেতু যদি কঙ্কাবতীকে একটু আধটু পড়িতে শিখায়, তাহাতে আমার বিশেষ কোনও আপত্তি নাই।

তনু, রায়ের স্ত্রী সেই কথা খেতুর মাকে বলিলেন। খেতুর মা সেই কথা খেতুকে বলিলেন। এবার যখন খেতু বাড়ী আসিলেন, তখন কঙ্কাবতীর জন্য একখানি প্রথমভাগ বর্ণপরিচয় আনিলেন। লেখা পড়া শিখিব, এই কথা মনে করিয়া প্রথম প্রথম কঙ্কাবতীর খুব আহ্লাদ হইল। কিন্তু দুই চারি দিন পরেই তিনি জানিতে পারিলেন যে লেখাপড়া শিক্ষা করা নিতান্ত আমোদর কথা নহে। কঙ্কাবতীর চক্ষে অক্ষরগুলি সব এক প্রকার দেখায়। কঙ্কাবতী এটি বলিতে সেটি বলিয়া ফেলেন।

খেতুর রাগ হইল। খেতু বলিলেন,—কঙ্কাবতী! তোমার লেখাপড়া হইবে না। চিরকাল তুমি মূখ হইয়া থাকিবে। কঙ্কাবতী অভিমানে কাঁদিয়া ফেলিলেন। তিনি বলিলেন,–আমি কি কবিব, আমার যে মনে থাকে না?

খেতুর মা বলিলেন,–ছেলেমানুষকে কি বকিতে আছে? মিষ্ট কথা বলিয়া শিখাইতে হয়। এস, মা! তুমি আমার কাছে এস। তোমার আর লেখাপড়া শিখিতে হইবে না।

খেতু বলিলেন,–মা! কঙ্কাবতী রাত্রি দিন মেনীকে লইয়া থাকে। তাতে কি আর লেখাপড়া হয়? মেনী কঙ্কাবতীর বিড়াল। অতি আদরের ধন মেনী।

কঙ্কাতী বলিলেন,—জেঠাই মা! আমি মেনীকে ক খ শিখাই; তা আমিও যেমনি বোকা, মেনীও তেমনি বোকা; কেমন মেনী, না? মেনীও পড়িতে পারে না, আমিও পড়িতে পারি না। আমিও ছেলে মানুষ, মেনীও ছেলে মানুষ। আমি বড় হইলে পড়িতে শিখিব, মেনীও বড় হইলে পড়িতে শিখিবে। না মেনী?

খেতু হাসিয়া উঠিলেন। খেতু বলিলেন,–কঙ্কাবতী! তুমি পাগল নাকি? যাহা হউক, ক্রমে কঙ্কাবতীর প্রথমভাগ বর্ণ-পরিচয় সারা হইল।

খেতু বলিলেন,—আমি শীঘ্ৰ কলিকাতায় যাইব। তাড়াতাড়ি করিয়া প্রথমভাগখানি শেষ করিলাম, কিন্তু ভাল করিয়া হইল না। এই কয় মাসে পুস্তকখানি একেবারে মুখস্থ করিয়া রাখিবে। এবার আমি দ্বিতীয়ভাগ লইয়া আসিব।

পুনরায় যখন খেতু বাটী আসিলেন, তখন কঙ্কাবতীর দ্বিতীয় ভাগ শেষ হইল। কঙ্কাবতীকে আর পড়াইতে হইল না! কঙ্কাবতী এখন আপনা-আপনি সব পড়িতে শিখিলেন। খেতু কঙ্কাবতীকে একখানি পাটিগণিত দিয়াছিলেন। তাহা দেখিয়া কঙ্কাবতী অঙ্ক শিখিলেন। মাঝে মাঝে খেতু কেবল একটু আধটু বসিয়া বলিয়া দিতেন।

কঙ্কাবতী পড়িতে বড় ভালবাসিতেন। কলিকাতা হইতে খেতু তাঁহাকে নানারূপ পুস্তক ও সংবাদপত্র পাঠাইয়া দিতেন। সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনগুলি পর্যন্ত কঙ্কাবতী পড়িতেন।

 

দশম পরিচ্ছেদ—বৌ-দিদি

তের বৎসর বয়সে খেতু ইংরাজীতে প্রথম পাসটি দিলেন। পাস দিয়া তিনি জলপানি পাইলেন। জলপানি পাইয়া মার নিকট তিনি একটি ঝি নিযুক্ত করিয়া দিলেন। মা বৃদ্ধ হইতেছেন, মার যেন কোনও কষ্ট না হয়। এটি সেটি আনিয়া, কাপড়খানি চোপড়খানি কিনিয়া, রামহরির সংসারেও তিনি সহায়তা করিতে লাগিলেন।।

পনের বৎসর বয়সে যেতু আর একটি পাশ দিলেন। জলপানি বাড়িল। সজ্ঞে বৎসর বয়সে আর একটি পাস দিলেন। জলপানি আরও বাড়িল।

খেতু টাকা পাইতে লাগিলেন, সেই টাকা দিয়া মার দুঃখ সম্পূর্ণরূপে ঘুচাইলেন। মা যখন যাহা চান, তৎক্ষণাৎ তাহা পান। তাঁহার আর কিছুমাত্র অভাব রহিল না।

শিবপূজা করিবেন বলিয়া খেতুর মা একদিন ফুল পান নাই। তাহা শুনিয়া খেতু বাড়ির নিকট একটি চমৎকার ফুলের বাগান করিলেন। কলিকাতা হইতে কত গাছ লইয়া সেই বাগানে পুতিলেন। নানা রঙের ফুলে বাগানটি বার মাস আলো করিয়া থাকিত।

রামহরির কন্যা সীতার এখন সাত বৎসর বয়স। মা একেলা থাকেন, সেই জন্য দাদাকে বলিয়া, খেতু সীতাকে মার নিকট পাঠাইয়া দিলেন। সীতাকে পাইয়া খেতুর মার আর আনন্দের অবধি নাই।

কঙ্কাবতীও সীতাকে খুব ভালবাসিতেন। বৈকাল বেলা দুইজনে গিয়া বাগানে বসিতেন। কঙ্কাবতী এখন খেতুর সম্মুখে বড় বাহির হন না! খেতুকে দেখিলে কঙ্কাবতীর এখন লজ্জা করে। তবে খেতুর গল্প করিতে, খেতুর গল্প শুনিতে তিনি ভাল বাসিতেন। অন্য লোকের সহিত খেতুর কথা শুনিতে, লজ্জা করিত। এ সব কথা সীতার সহিত হইত। বৈকালবেলা দুইজনে ফুলের বাগানে যাইতেন। নানা ফুলে মালা গাঁথিয়া কঙ্কাবতী সীতাকে সাজাইতেন। ফুল দিয়া নানারূপ গহনা গড়িতেন। গলায়, হাতে, মাথায়, যেখানে যাহা ধরিত, কঙ্কাবতী সীতাকে ফুলের গহনা পরাইতেন। তাহার পর সীতার মুখ হইতে বসিয়া বসিয়া খেতুর কথা শুনিতেন।

নিরঞ্জন কাকাকে খেতু ভুলিয়া যান নাই। যখন খেতু বাটী আসেন, তখন নিরঞ্জন কাকার জন্য কিছু না কিছু লইয়া আসেন। নিরঞ্জন ও নিরঞ্জনের স্ত্রী তাঁহাকে বিধিমতে আশীর্বাদ করেন।–কঙ্কাবতী বড় হইলে, খেতু তাঁহাকে পুস্তক ও সংবাদপত্র ব্যতীত আরও নানা দ্রব্য দিতেন। আজকাল বালিকাদিগের নিমিত্ত যেরূপ শেমিজ প্রভৃতি পরিচ্ছদ প্রচলিত হইয়াছে, কঙ্কাবতীর নিমিত্ত কলিকাতা হইতে খেতু তাহা লইয়া যাইতেন।

রামহরির সংসারের খেতু সহায়তা করিতে লাগিলেন বটে, কিন্তু রামহরি এ কথায় সহজে স্বীকার হন নাই। একবার খেতু নরহরির জন্য একজোড়া কাপড় কিনিয়াছিলেন। তাহা জানিতে পারিয়া রামহরি খেতুকে বকিয়াছিলেন। খেতুর তাহাতে অতিশয় অভিমান হইয়াছিল। দাদাকে কিছু না বলিয়া তিনি রামহরির স্ত্রীর নিকট গিয়া নানারূপ দুঃখ করিতে লাগিলেন। রামহরির স্ত্রীকে খেতু বৌ-দিদি বলিয়া ডাকিতেন।

খেতুর অভিমান দেখিয়া বৌ-দিদি বলিলেন,—তোমার দাদাকে কিছু বলিতে না পারিয়া, তুমি বুঝি আমার সঙ্গে ঝগড়া করিতে আসিয়াছ?

খেতু উত্তর করিলেন,–বৌ-দিদি! তোমরা আমাকে প্রতিপালন করিয়াছ। তোমাদের পুত্ৰ নরহরি যেরূপ, আমাকেও সেইরূপ দেখা উচিত। পুত্রের মত আমাকে যখন না দেখিলে, তখন আমি পর। আমি যখন পর, তখন আবার তোমাদের সঙ্গে আমার ঝগড়া কি? দাদা মহাশয় আমাকে পর মনে করিয়াছেন, এখন তুমিও তাই কর, তাহা হইলে সকল কথা ফুরাইয়া যায়।

বৌ-দিদি বলিলেন,—তাহা হইলে কি হয়, খেতু?

খে? উত্তর করিলেন,—কি হয়? হয় আর কি? তাহা হইলে আমি আর অর্থোপার্জন করিতে যত্ন করি না। তোমাদের সহিত আর কথা কই না। তোমাদের বাড়ীতে আর থাকি না। মনে করি, আমার মাকে ভিখারিণী দেখিয়া ঘঁহারা ভিক্ষা দিয়াছিলেন। আমার এই শরীর, আমার এই অস্থি, মাংস সমুদায় ভিক্ষায় গঠিত। ভদ্রসমাজে আর যাই না, ভদ্রসমাজে আর মুখ তুলিয়া কথা কহি না। দুঃখিনী ভিখারিণীর ছেলে, ভিক্ষায় যাহার দেহ গঠিত, কোন্ মুখে সে আবার ভদ্র-সমাজে দাঁড়াইবে?

বৌ-দিদি বলিলেন,–ছি খেতু! অমন বলিতে নাই। সম্পর্কে তুমি দেবর বটে, কিন্তু পুত্রের চেয়ে তোমাকে অধিক স্নেহ করি। তুমি উপযুক্ত সন্তান, তুমি যাহা করিবে, তাহাই হইবে; তাঁহার আবার অভিমান কি?

খেতু বলিলেন,–বৌ-দিদি! মাকে সুখে রাখিব, তোমাদিগকে সুখে রাখিব, চিরকাল আমার এই কামনা। এক্ষণে আমার ক্ষমতা হইয়াছে, এখন যদি তোমরা আমাকে সে কামনা পূর্ণ করিতে না দাও, তাহা হইলে আমার মনে বড় দুঃখ হইবে।

বৌ-দিদি উত্তর করিলেন,—সার্থক তোমার মা তোমাকে গর্ভে ধরিয়াছেন। এখন আশীৰ্ব্বাদ করি, খেতু! শীঘ্রই তোমার একটি রাঙা বউ হউক।

সেই দিন রামহরির স্ত্রী, রামহরিকে আনক বুঝাইয়া বলিলেন,–দেখ! আমাদের সংসারের কষ্ট দেখিয়া খেতু বড় কাতর হইয়াছে। খেতু এখন দু পয়সা আনিতেছে। সে বলে,—যখন ইহারা আমাকে পুত্রের মত প্রতিপালন করিয়াছেন, তখন আমিও পুত্রের মত কাৰ্য্য করিব। সংসার খরচে খেতু যদি কোনওরূপ সহায়তা করে, তাহা হইলে খেতুকে কিছু বলিও না! এ বিষয়ে খেতুকে কিছু বলিলে, তাঁহার মনে বড় দুঃখ হয়।

স্ত্রীর কাছে সকল কথা শুনিয়া, রামহরির খেতুকে ডাকিলেন। খেতু আসিলে রামহরি তাঁহাকে বলিলেন,—রাগ করিয়াছ, দাদা? পৃথিবী অতি ভয়ানক স্থান। আমার মত যখন বয়স হইবে তখন জানিতে পারিবে যে, টাকা টাকা করিয়া পৃথিবীর লোক কিরূপ পাগল। সেই জন্য, খেতু, তোমাকে আমার সংসারে টাকা খরচ করিতে মানা করিয়াছিলাম। আমাদের দুঃখ চিরকাল। আমাদের কখনও নাই নাই ঘুচিবে না।

সে দুঃখের ভাগী তোমাকে আমি কেন করিব? অনেক দিন হইতে আমি জলখাবার খাই। জ্বর হইলে উপবাস দিয়া ভাল করি। তুমি দুধের ছেলে, তোমাকে কেন এ দুঃখে পড়িতে দিব? এই মনে করিয়া তোমাকে সংসারে টাকা খরচ করিতে মানা করিয়াছিলাম। আমি তখন ভাবি নাই, তুমি কিরূপ পিতার পুত্র। খেতু! অধিক আর তোমাকে কি বলিব, এই পৃথিবীতে তিনি সাক্ষাৎ দেবতাস্বরূপ ছিলেন। তোমাকে আশীর্বাদ করি, ভাই। যেন তুমি সেই দেবতুল্য হও।–রামহরির চক্ষু দিয়া ফোটায় ফোটায় জল পড়িতে লাগিল। রামহরির স্ত্রীও চক্ষু মুছিতে লাগিলেন। খেতুরও চক্ষু ছল ছল করিয়া আসিল।

খেতু তিনটা পাস দিলেন, আর কন্যা ভারগ্রস্ত লোকেরা রামহরির নিকট আনাগোনা করিতে লাগিলেন। সকলের ইচ্ছা খেতুর সহিত কন্যার বিবাহ দেন। ইনি বলেন,—আমি এত সোনা দিব, এত টাকা দিব; তিনি বলেন, আমি এত দিব, তত দিব; এইরূপে সকলে নিলাম-ডাকা ডাকি করিতে লাগিলেন।

রামহরি সকলকে বুঝাইয়া বলিলেন যে, যত দিন না খেতুর লেখাপড়া সমাপ্ত হয়, যত দিন না খেতু দু-পয়সা উপার্জন করিতে পারে, তত দিন তিনি খেতুর বিবাহ দিবেন না।

কিন্তু কন্যভারগ্রস্ত লোকেরা সে কথা শুনিবেন কেন? রামহরির নিকট তাঁহারা নানারূপ মিনতি করিতে লাগিলেন। অবশেষে রামহরি মনে করিলেন,–দূর হউক! এক স্থানে কথা দিয়া রাখি। তাহা হইলে সকলে আর আমাকে এরূপ ব্যস্ত করিবে না।

এই মনে করিয়া তিনি অনেকগুলি কন্যা দেখিলেন। শেষে জন্মেজয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যাকে তিনি মনোনীত করিলেন। জন্মেজয় বাবু সঙ্গতিপন্ন লোক ও সদ্বংশ জাত। রামহরি কিন্তু তাঁহাকে সঠিক কথা দিতে পারিলেন না। খেতুর মার মত না লইয়া কি করিয়া তিনি কথা স্থির করেন?

 

একাদশ পরিচ্ছেদ–সম্বন্ধ

কঙ্কাবতীর যত বয়স হইতে লাগিল, ততই তাঁহার রূপ বাড়িতে লাগিল। কঙ্কাবতীর রূপে দশদিক্‌ আলো, কঙ্কাবতীর পানে চাওয়া যায় না। রংটি উজ্জ্বল ধবধবে, ভিতর হইতে যেন জ্যোতিঃ বাহির হইতেছে; জল খাইলে যেন জল দেখা যায়। শরীরটি স্কুলও নয়, কৃশও নয়, যেন পুতুলটি, কি ছবিখানি। মুখখানি যেন বিধাতা কুঁদে কাটিয়েছেন। নাকটি টিকালো টিকালো, চক্ষু দুটি টানা, চক্ষুর পাতা দীর্ঘ, ঘন ও ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। চক্ষু কিঞ্চিৎ নীচে করিলে পাতার উপর পাতা পড়িয়া এক অদ্ভুত শোভার আবির্ভাব হয়। এইরূপ চক্ষু দুইটির উপর যেরূপ সরু সরু কাল কাল, ঘন ভুরুতে মানায়, কঙ্কাবতীর তাহাই ছিল। গাল দুটি নিতান্ত পূর্ণ নহে, কিন্তু হাসিলে টোল পড়ে। তখন সেই হাসিমাখা টোল-খাওয়া মুখখানি দেখিলে শত্রুর মনও মুগ্ধ হয়। ঠোঁট দুটি পাতলা। পান খাইতে হয় না, আপনাআপনি সদাই টুকটু করে। কথা কহিবার সময় ঠোটের ভিতর দিয়া, সাদা দুধের মত দুই চারিটি দাঁত দেখিতে পাওয়া যায়, তখন দাঁতগুলি যেন ঝক্ঝক্ করিতে থাকে। কঙ্কাবতীর খুব চুল, ঘোর কাল, ছাড়িয়া দিলে, কোকড়া হইয়া পিঠের উপর গিয়া পড়ে। সম্মুখের সিথিটি কে যেন তুলি দিয়া ঈষৎ সাদা রেখা টানিয়া দিয়াছে। স্কুল কথা, কঙ্কাবতী একটি প্রকৃত সুন্দরী, পথের লোককে চাহিয়া দেখিতে হয়, বার বার দেখিয়াও আশা মিটে না। সমবয়স্কা বালিকাদিগের সহিত কঙ্কাবতী যখন দৌড়াদৌড়ি করিয়া খেলা করেন, তখন যথার্থই যেন বিজলী খেলিয়া বেড়ায়।

এখন কঙ্কাবতীর বয়স হইয়াছে। এখন কঙ্কাবতী সেরূপ আর দৌড়াদৌড়ি করিয়া খেলিয়া বেড়ান না। তবে কি জন্য একদিন একটু ছুটিয়া বাড়ী আসিয়াছিলেন। শ্রমে মুখ ঈষৎ রক্তবর্ণ হইয়াছে, গাল দিয়া সেই রক্তিমাআভা যেন ফুটিয়া বাহির হইতেছে, সমস্ত মুখ টন্ টন্ করিতেছে, জগতে কঙ্কাবতীর রূপ তখন আর ধরে না।

মা, তাহা, দেখিয়া, তনু রায়কে বলিলেন,–তোমার মেয়ের পানে একবার চাহিয়া দেখ! এ সোনার প্রতিমাকে তুমি জলাঞ্জলি দিও না। কঙ্কাবতী স্বয়ং লক্ষ্মী। এমন সুলক্ষণা মেয়ে জনমে কি কখনও দেখিয়াছ? মা যেরূপ লক্ষ্মী, সেইরূপ নারায়ণ দেখিয়া মার বিবাহ দিও। এবার আমার কথা শুনিও।।

তনু রায় কঙ্কাবতীর পানে একটু চাহিয়া দেখিলেন, দেখিয়া চকিত হইলেন। তনু রায়ের মন কখনও এরূপ চকিত হয় নাই। তনু রায় ভাবিলেন,—এ কি? একেই বুঝি লোকে অপত্যস্নেহ বলে?–স্ত্রীর কথায় তনু রায় কোনও উত্তর করিলেন না।

আর একদিন তনু রায়ের স্ত্রী স্বামীকে বলিলেন,—দেখ, কঙ্কাবতীর বিবাহের সময় উপস্থিত হইল। আমার একটি কথা তোমাকে রাখিতে হইবে। ভাল, মনুষ্যজীবনে তো আমার একটি সাধও পূর্ণ কর!–তনু রায় জিজ্ঞাসা করিলেন,–কি তোমার সাধ?

স্ত্রী উত্তর করিলেন,—আমার সাধ এই যে, ঝি-জামাই লইয়া আমোদ-আহ্লাদ করি। দুই মেয়ের তুমি বিবাহ দিলে, আমার সাধ পূর্ণ হইল না, দিবারাত্রি ঘোের দুঃখের কারণ হইল। যা হউক, সে যা হইবার তা হইয়াছে; এখন কঙ্কাবতীকে একটি ভাল বর দেখিয়া বিবাহ দাও। মেয়ে দুইটি বলে যে, আমাদের কপালে যা ছিল, তা হইয়াছে, এখন ছোট বোনটিকে সুখী দেখিলে আমরা সুখী হই।

স্ত্রী বল, পুত্র বল, কন্যা বল, টাকার চেয়ে তনু রায়ের কেহই প্রিয় নয়। তথাপি কঙ্কাবতীর কথা মনে পড়িলে, তাঁহার মন কিরূপ করে। সে কি মমতা, না আতঙ্ক? দেবীরূপী কঙ্কাবতীকে সহসা বিসর্জন দিতে তাঁহার সাহস হয় না। এদিকে দুরন্ত অর্থলোভও অজেয়। ত্রিভুবন-মমাহিনী কন্যাকে বেচিয়া তিনি বিপুল অর্থ লাভ করিবেন, চিরকাল এই আশা করিয়া আছেন। আজ সে আশা কি করিয়া সমূলে কাটিয়া ফেলেন? তনু রায়ের মনে আজ দুই ভাব। এরূপ সঙ্কটে তিনি আর কখনও পড়েন নাই।

কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া তনু রায় বলিলেন,—আচ্ছা। আমি না হয়, কঙ্কাবতীর বিবাহ দিয়া টাকা না লইলাম! কিন্তু ঘর হইতে টাকা তো আর দিতে পারিব না? আজ কাল

যেরূপ বাজার পড়িয়াছে, টাকা না দিলে সুপাত্র মিলে না। তা আর কি করিব?

স্ত্রী উত্তর করিলেন,–আচ্ছা! আমি যদি বিনা টাকায় সুপাত্রে সন্ধান করিয়া দিতে পারি, তুমি তাঁহার সহিত কঙ্কাবতীর বিবাহ দিবে কি না, তা আমাকে বল?

তনু রায় জিজ্ঞাসা করিলেন,—কোথায়? কে?

স্ত্রী বলিলেন,–বৃদ্ধ হইলে চক্ষুর দোষ হয়, বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ হয়। চক্ষুর উপর দেখিয়াও দেখিতে পাও না? তনু রায় বলিলেন,–কে বল না শুনি?

স্ত্রী উত্তর করিলেন,—কেন খেতু?

তনু রায় বলিলেন, তা কি কখনও হয়? বিষয় নাই, বন্ধু নাই, বান্ধব নাই; এরূপ পাত্রে আমি কঙ্কাবতীকে কি করিয়া দিই। ভাল, আমি না হয় কিছু না লইলাম, মেয়েটি যাহাতে সুখে থাকে, দুখানা গহনা-গাটি পরিতে পায়, তা তো আমাকে করিতে হইবে?

তনু রায়ের স্ত্রী উত্তর করিলেন,—খেতুর কি কখনও ভাল হইবে না? তুমি নিজেই বল না যে, খেতু ছেলেটি ভাল,খেতু দুপয়সা আনিতে পারিবে? যদি কপালে থাকে তখেতু হইতেই কঙ্কাবতী কত গহনা পরিবে। কিন্তু, গহনা হউক আর না হউক, ছেলেটি ভাল হয়, এই আমার মনের বাসনা। খেতুর মত ছেলে পৃথিবী খুঁজিয়া কোথায় পাইবে, বল দেখি? মা কঙ্কাবতী আমার যেমন লক্ষ্মী, খেতু তেমনি দুর্লভ সুপাত্র। এক বোঁটায় দুইটি ফুল সাধ করিয়া বিধাতা যেন গড়িয়াছেন।

তনু রায় বলিলেন,–ভাল, সে কথা তখন পরে বুঝা যাইবে। এখন তাড়াতাড়ি কিছু নাই।–আরও কিছুদিন গত হইল। কলিকাতা হইতে খেতুর মার নিকট একখানি চিঠি আসিল। সেই চিঠিখানি তিনি তনু রায়কে দিয়া পড়াইলেন। পত্র-খানি রামহরি লিখিয়াছিলেন। তাঁহার মর্ম এই–

খেতুর বিবাহের জন্য অনেক লোক আমার নিকট আসিতেছেন। আমাকে তাঁহারা বড়ই ব্যস্ত করিয়াছেন। আমার ইচ্ছা যে, লেখাপড়া সমাপ্ত হইলে, তাহার পর খেতুর বিবাহ দিই। কিন্তু কন্যাদায়গ্রস্ত ব্যক্তিগণ সে কথা শুনিবেন কেন? তাঁহারা বলেন, কথা স্থির হইয়া থাকুক, বিবাহ না হয় পরে হইবে। আমি অনেকগুলি কন্যা দেখিয়াছি। তাহাদিগের মধ্যে জন্মেজয় বাবুর কন্যা আমার মনোনীত হইয়াছে। কন্যাটি সুন্দরী, ধীর ও শান্ত। বংশ সৎ, কোন ও দোষ নাই। মাতা-পিতা, ভাই-ভগিনী বর্তমান। কন্যার পিতা সঙ্গতিপন্ন লোক। কন্যাকে নানা অলঙ্কারও জামাতাকে নানা ধন দিয়া বিবাহকাৰ্য্য সমাধা করিবেন। এক্ষণে আপনার কি মত জানিতে পারিলে কন্যার পিতাকে আমি সঠিক কথা দিব।

পত্রখানি পড়িয়া তনু রায় অবা। দুঃখী বলিয়া যে খেতুকে তিনি কন্যা দিতে অস্বীকার, আজ নানা ধন দিয়া সেই খেতুকে জামাতা করিবার নিমিত্ত লোকে আরাধনা করিতেছে।

খেতুর মা রামহরিকে উত্তর লিখিলেন,—আমি স্ত্রীলোক, আমাকে আবার জিজ্ঞাসা কর কেন? তুমি যাহা করিবে, তাহাই হইবে। তবে আমার মনে একটি বাসনা ছিল, যখন দেখিতেছি, সে বাসনা পূর্ণ হইবার নহে, তখন সে কথায় আর আবশ্যক নাই।

এই পত্র পাইয়া, রামহরি খেতুকে সকল কথা বলিলেন, আর এ বিষয়ে খেতুর কি মত, তাহা জিজ্ঞাসা করিলেন।

খেতু বলিলেন,–দাদা মহাশয়! মার মনে বাসনা কি, আমি বুঝিয়াছি। যতদিন মার সাধ পূর্ণ হইবার কিছুমাত্রও আশা থাকিবে, ততদিন কোনও স্থানে আপনি কথা দিবেননা।

রামহরি বলিলেন,হঁা, তাহাই উচিত। তোমার বিবাহ বিষয়ে আমি এক্ষণে কোনও স্থানে কথা দিব না।–খেতুর অন্য স্থানে বিবাহ হইবে, এই কথা শুনিয়া, কঙ্কাবতীর মা একেবারে শরীর ঢালিয়া দিলেন। স্বামীর নিকট রাত্রি-দিন কান্নাকাটি করিতে লাগিলেন।

এদিকে তনু রায়ও কিছু চিন্তিত হইলেন। তিনি ভাবিলেন, আমি বৃদ্ধ হইয়াছি। দুইটি বিধবা গলায়, পুত্রটি মূখ। এখন একটি অভিভাবকের প্রয়োজন। খেতু যেরূপ বিদ্যাশিক্ষা করিতেছে, খেতু যেরূপ সুবোধ, তাহাতে পরে তাঁহার নিশ্চয় ভাল হইবে। আমাকে সে একেবারে এখন কিছু না দিতে পারে, না পারুক; পরে, মাসে মাসে আমি তাঁহার নিকট হইতে কিছু কিছু লইব।

এইরূপ ভাবিয়া চিন্তিয়া তনু রায় স্ত্রীকে বলিলেন,—তুমি যদি খেতুর সহিত কঙ্কাবতীর বিবাহ স্থির করিতে পার তাহাতে আমার আপত্তি নাই। কিন্তু আমি খরচ পত্র কিছু করিতে পারিব না।-খেতুর মা বলিলেন,–কঙ্কাবতী আমার বৌ হইবে, চিরকাল আমার এই সাধ। কিন্তু বোন! দুই দিন আগে যদি বলিতে, অন্য স্থানে কথা স্থির করিতে আমি রামহরিকে চিঠি লিখিয়াছি। রামহরি যদি কোন স্থানে কথা দিয়া থাকে, তাহা হইলে সে কথা নড়িবার নয়। তাই আমার মনে বড় ভয় হইতেছে।

তনু রায়ের স্ত্রী বলিলেন,–দিদি! যখন তোমার মত আছে, তখন নিশ্চয় কঙ্কাবতীর সহিত খেতুর বিবাহ হইবে। তুমি একখানি চিঠি লিখিয়া রাখ। চিঠিখানি লোক দিয়া পাঠাইয়া দিব। –তাহার পরদিন খেতুর মা ও কঙ্কাবতীর মা দুই জনে মিলিয়া কলিকাতায় লোক পাঠাইলেন। খেতুর মা রামহরিকে একখানি পত্র লিখিলেন।

খেতুর মা লিখিলেন যে,—কঙ্কাবতীর সহিত খেতুর বিবাহ হয়, এই আমার মনের বাসনা। এক্ষণে তনু রায় ও তাঁহার স্ত্রী, সেই জন্য আমার নিকট আসিয়াছেন। অন্য কোনও স্থানে যদি খেতুর বিবাহের কথা স্থির না হইয়া থাকে, তাহা হইলে তোমরা কঙ্কাবতীর সহিত স্থির করিয়া তনু রায়কে পত্র লিখিবে।

এই চিঠি পাইয়া রামহরি, তাঁহার স্ত্রী ও খেতু, সকলেই আনন্দিত হইলেন।

খেতুর হাতে পত্রখানি দিয়া রামহরি বলিলেন,—তোমার মার আজ্ঞা, ইহার উপর আর কথা নাই।

খেতু বলিলেন—মার যেরূপ অনুমতি, সেইরূপ হইবে। তবে তাড়াতাড়ি কিছুই নাই। তনু কাকা তো মেয়েগুলিকে বড় করিয়া বিবাহ দেন। আর দুই তিন বৎসর তিনি অনায়াসেই রাখিতে পারিবেন। তত দিনে আমার সব পাসগুলিও হইয়া যাইবে।–তত দিনে আমিও দুপয়সা আনিতেও শিখিব। আপনি এই মর্মে তনু কাকাকে পত্র লিখুন।

রামহরি তনু রায়কে সেইরূপ পত্র লিখিবেন। তনু রায় সে কথা স্বীকার করিলেন। বিলম্ব হইল বলিয়া তাঁহার কিছুমাত্র দুঃখ হইল না, বরং তিনি আহ্লাদিত হইলেন।

তিনি মনে করিলেন,—স্ত্রীর কান্নাকাটিতে আপাততঃ এ কথা স্বীকার করিলাম। দেখি, খেতুর চেয়ে ভাল পাত্র পাই কি না? যদি পাই—আচ্ছা, সে কথা তখন পরে বুঝা যাইবে।–খেতুর মা, নিরঞ্জনকে সকল কথা বলিয়াছিলেন। নিরঞ্জন মনে করিলেন, বৃদ্ধ হইয়া তনু রায়ের ধৰ্ম্মে মতি হইতেছে।

কঙ্কাবতী আজ কয়দিন বিরসবদনে ছিলেন। সকলে আজ কঙ্কাবতীর হাসি-হাসি মুখ দেখিল। সেই দিন তিনি মেনীকে কোলে লইয়া বিরলে বসিয়া কত যে তাঁহাকে মনের কথা বলিলেন, তাহা আর কি বলিব! মেনী এখন আর শিশু নহে, বড় একটি বিড়াল। সুতরাং কঙ্কাবতী যে তাঁহাকে মনের কথা বলিবেন, তাঁহার আর আশ্চর্য কি?

 

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ–ষাঁড়েশ্বর

একবার পূজার ছুটীর কিছু পূৰ্ব্বে, কলিকাতার পথে, খেতুর সহিত ষাঁড়েশ্বরের সাক্ষাৎ হইল। ষাঁড়েশ্বর বলিলেন,–খেতু বাড়ী যাইবে কবে? আমি গাড়ী ঠিক করিয়াছি, যদি ইচ্ছা কর তো আমার গাড়ীতে তুমি যাইতে পার।

খেতু উত্তর করিলেন,—আমার এখনও কলেজের ছুটি হয় নাই। কবে যাইব, তাঁহার এখনও ঠিক নাই।–ষাঁড়ের জিজ্ঞাসা করিলেন,–খেতু! তোমার হাতেও কি?

খেতু উত্তর করিলেন,—এ একটি সিংহাসন। মা প্রতিদিন মাটীর শিব গড়িয়া পূজা করেন, তাই মার জন্য একটি পাথরের শিব কিনিয়াছি। সেই শিবের জন্য এই সিংহাসন।

ষাঁড়েশ্বর জিজ্ঞাসা করিলেন,—শিবটি তোমার কাছে আছে? কৈ দেখি?

খেতু শিবটি পকেট হইতে বাহির করিয়া ষাড়েশ্বরের হাতে দিলেন।

ষাঁড়েশ্বর বলিলেন, শিবটি পকেটে রাখিয়াছিলে? খুব ভক্তি তত তোমার?

খেতু উত্তর করিলেন,—শিবের তো এখনও পূজা হয় নাই। তাতে আর দোষ কি?

ষাঁড়েশ্বর বলিলেন,—তাই বলিতেছি!

এই কথা বলিয়া যাঁড়েশ্বর শিবটি পুনরায় খেতুর হাতে দিলেন।

এ-কথা সে-কথায় যাইতে যাইতে ষাঁড়েশ্বর বলিলেন, এই যে পাদ্‌রি সাহেবের বাড়ী! পাদরি সাহেবের সঙ্গে তোমার তো আলাপ আছে! এস না? একবার দেখা করিয়া যাই!

যাঁড়েশ্বর ও খেতু, দুই জনে পাদ্‌রি সাহেবের নিকট যাইলেন।

পাদ্‌রি সাহেবের সহিত নানারূপ কথাবার্ত্তার পর, ষাঁড়েশ্বর বলিলেন,–আর শুনিয়াছেন, মহাশয়? মা পূজা করিবেন বলিয়া খেতু একটি পাথরের শিব কিনিয়াছেন। সেই শিবটি খেতুর পকেটে রহিয়াছে।

পাদ্‌রি সাহেব বলিলেন,–অ্যাঁ! সে কি কথা! ছি ছি, খেতু! তুমি এমন কাজ করিবে, তা আমি স্বপ্নেও জানিতাম না। তোমাদের জন্য যে আমরা এত স্কুল করিলাম, সে সব বৃথা হইল। বড় এক জন লেখক লিখিয়াছেন যে, এই বাঙ্গালীজাতি মিথ্যাবাদী, ফেরেবী, জালিয়াত, ভীরু, দাসের জাতি।

খেতু বলিলেন,–আহা! কি মধুর ধর্মের কথা আজ শুনিলাম! সৰ্ব্বশরীর শীতল হইয়া গেল। ইচ্ছা করে, এখনি খৃষ্ঠান হই। যদি ঘরে জল থাকে তো নিয়ে আসুন, আর বিলম্ব করেন কেন? আমার মাথায় দিন, দিয়া আমাকে খৃষ্ঠান করুন। বাঙ্গালীদের উপর চারি দিক হইতে যেরূপ আপনারা সকলে মিলিয়া সুধা বর্ষণ করিতেছেন, তাতে বাঙ্গ লীদের মন খৃষ্ঠীয় ধৰ্মামৃতরসে একেবারে ভিজিয়া গিয়াছে। দেখেন কি আর? এই সব পট পট করিয়া খৃষ্ঠান হয় আর কি? আবার আমেরিকার কালা খৃষ্ঠানদিগের উপর আপনাদের যেরূপ ভ্ৰাতৃভাব, তা যখন লোকে শুনিবে, আর আফ্রিকার নিরস্ত্র কালা-আদমিদিগের প্রতি আপনাদের যেরূপ দয়া মায়া, তা যখন লোকে জানিবে, তখন এ দেশের জনপ্রাণীও আর বাকি থাকিবে না, সব খৃষ্ঠান হইয়া যাইবে। এখন সেলাম।

এই কথা বলিয়া খেতু সেখান হইতে প্রস্থান করিলেন। ষাঁড়েশ্বরও হাসিতে হাসিতে তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিলেন। পথে খেতু ষাঁড়েশ্বরকে জিজ্ঞাসা করিলেন,—শুনিতে পাই, আপনি প্রতিদিন হরিসঙ্কীৰ্ত্তন করেন। তবে পাদ্‌রি সাহেবের নিকট আমাকে ওরূপ উপহাস করিলেন কেন?

-ষাঁড়েশ্বর বলিলেন,—উপহাস আর তোমাকে কি করিলাম? সে যাহা হউক, সন্ধ্যা হইয়াছে, হরি-সঙ্কীৰ্ত্তনের সময় হইল। এস না, একটু দেখিবে? দেখিলেও পুণ্য আছে।

ষাঁড়েশ্বরের বাসা নিকটে ছিল। খেতু ও ষাঁড়েশ্বর দুই জনে সেইখানে গিয়া উপস্থিত হইলেন। খেতু দেখিলেন যে, ষাঁড়েশ্বরের দালানে হরি-সঙ্কীৰ্ত্তন আরম্ভ হইয়াছে। কিন্তু ষাঁড়েশ্বর সেখানে না যাইয়া, বরাবর উপরের বৈঠকখানায় যাইলেন। খেতুকে সেইখানে বসিতে গলিয়া যাড়েশ্বর বাটীর ভিতর গেলেন।

কিছুক্ষণ পরে ষাঁড়েশ্বর ফিরিয়া আসিলেন ও খেতুকে বলিলেন,–খে! চল, অন্য ঘরে যাই।–খেতু অন্য ঘরে গিয়া দেখিলেন যে, ষাঁড়েশ্বরের আর দুইটি বন্ধু সেখানে বসিয়া আছেন। সেখানে খানা খাইবার সব আয়োজন হইতেছে।

নীচে হরি সঙ্কীৰ্ত্তন চলিতেছে। ষাঁড়ের হিন্দুধৰ্ম্মের ও হিন্দুসমাজের এক জন চাই।

অল্পক্ষণ পরে খানা খাওয়া আরম্ভ হইল। দুই জন মুসলমান পরিবেশন করিতে লাগিল।

খেতু বলিলেন,–আপনারা তবে আহারাদি করুন, আমি এখন যাই।

ষাঁড়েশ্বর বলিলেন,—না না, একটু থাক না, দেখ না, দেখিলেও পুণ্য আছে। এখন যা আমরা খাইতেছি, ইহা মাংসের ঝোল, ইহার নাম সুপ; একটু সুপ্ খাইবে?

খেতু বলিলেন,–এ সব দ্রব্য আমি কখনও খাই নাই, আমার প্রবৃত্তি হয় না। আপনারা আহার করুন? আবার কিছুক্ষণ পরে যাঁড়েশ্বর বলিলেন,–খেতু! এখন যা খাইতেছি, ইহা ভেটকি মাছ। মাছ খাইতে দোষ কি? একটু খাও না?

খেতু বলিলেন,–মহাশয়! আমাকে অনুরোধ করিবেন না। আপনারা আহার করুন। আমি বসিয়া থাকি।–ষাঁড়েশ্বর বলিলেন,—তবে না হয়, এই একটু খাও। ইহা অতি উত্তম ব্র্যাণ্ডি। পাদ্‌রি সাহেবের কথায় মনে তোমার ক্লেশ হইয়া থাকিবে, একটু খাইলেই এখনি সব ভাল হইয়া যাইবে।–খেতু বলিলেন,—মহাশয়! যোড়হাত করিয়া বলি, আমাকে অনুরোধ করিবেন না। অনুমতি করুন, আমি বাড়ী যাই।

ষাঁড়েশ্বরের একটি বন্ধু বলিলেন,—তবে না হয় একটু হ্যাম আর মুরগী খাও। এ হ্যামবিলাতি শুকরের মাংস। ইহা বিলাত হইতে আসিয়াছে। অভক্ষ্য, গ্রাম্য শুকর। বিলাতী শুকর খাইতে কোনও দোষ নাই। আর এ মুরগীও মহা-কুকুট, রামপাখী-বিশেষ। হপ্ সাহেবের বাজার হইতে কেনা, যে সে মুরগী নয়।

যাঁড়েশ্বরের অপর বন্ধু বলিলেন,–এইবার ভি-র কটলেট আসিয়াছেন। খেতু বাবু নিশ্চয় এইবার একটু খাইবেন।

খানসামা এবার কি দ্রব্য আনিয়াছিল, সে কথা আর শুনিয়া কাজ নাই। নীচে হরিসঙ্কীর্তনের ধূম। তাহাই শ্রবণ করিয়া সকলে প্ৰাণ পরিতৃপ্ত করুন।

কিয়ৎক্ষণ পরে দুই বন্ধুতে চুপি চুপি কি পরামর্শ করিলেন। তখন এক বন্ধু উঠিয়া গিয়া খেতুকে ধরিলেন, অপর জন খেতুর মুখে ব্রাণ্ডি ঢালিয়া দিতে চেষ্টা করিলেন। যাঁড়েশ্বর বসিয়া বসিয়া হাসিতে লাগিলেন।–খেতুর শরীরে বিলক্ষণ বল ছিল। এক এক ধাক্কায় দুই জনকেই ভূতশালী করিলেন। তাহার পর মেজটি উলটাইয়া ফেলিলেন। কাচের বাসন, কাচের গেলাস, সম্মুখে যাহা কিছু পাইলেন, আছাড় মারিয়া ভাঙ্গিয়া ফেলিলেন। এইরূপ দক্ষযজ্ঞ করিয়া সেখান হইতে খেতু প্রস্থান করিলেন।

দেখিতে দেখিতে তিন বৎসর কাটিয়া গেল। খেতুর এক্ষণে কুড়ি বৎসর বয়স। যা কিছু পাশ ছিল, খেতু সব পাশগুলি দিলেন। বাহিরেরও দুই একটি পাশ দিলেন। শীঘ্র একটি উচ্চপদ পাইবেন, খেতু এরূপ আশা পাইলেন।

রামহরি ও রামহরির স্ত্রী ভাবিলেন যে, এক্ষণে খেতুর বিবাহ দিতে হইবে। দিন স্থির করিবার নিমিত্ত তাঁহারা খেতুর মাকে পত্র লিখিলেন।

পত্রের প্রত্যুত্তরে খেতুর মা অন্যান্য কথা বলিয়া অবশেষে লিখিলেন,–তনু রায়কে বিবাহের কথা কিছু বলিতে পারি নাই। আজকাল সে বড়ই ব্যস্ত, তাঁহার দেখা পাওয়া ভার। জনার্দ্দন চৌধুরীর স্ত্রীবিয়োগ হইয়াছে। জনার্দ্দন চৌধুরীর স্ত্রীর ধন্য কপাল পুত্র পৌত্র দৌহিত্র চারিদিকে জাজ্বল্যমান রাখিয়া, অশীতিপর স্বামীর কোলে তাঁহার মৃত্যু হইয়াছে। ইহার চেয়ে স্ত্রীলোকের পুণ্যবল আর কি হইতে পারে? যখন তাঁহাকে ঘাটে লইয়া যায়, তখন আমি দেখিতে গিয়াছিলাম। সকলে এক মাথা সিন্দুর দিয়া দিয়াছে, আর ভাল একখানি কস্তাপেড়ে কাপড় পরাইয়া দিয়াছে! আহা! তখন কি শোভা হইয়াছিল! যাহা হউক, তনু রায়ের একটু অবসর হইলে, আমি তাঁহাকে বিবাহের কথা বলিব।-কিছু দিন পরে খেতুর মা, রামহরিকে আর একখানি পত্র লিখিলেন। তাঁহার মর্ম এই,

বড় ভয়ানক কথা শুনিতেছি। তনু রায়ের কথার ঠিক নাই। তাঁহার দয়া-মায়া নাই, তাঁহার ধর্মাধর্ম্ম জ্ঞান নাই। শুনিতেছি, সে নাকি জনার্দ্দন চৌধুরীর সহিত কঙ্কাবতীর বিবাহ দিবে। কি ভয়ানক কথা! আর জনার্দ্দন চৌধুরীও পাগল হইয়াছেন না কি? পুত্র পৌত্র দৌহিত্র চারিদিকে বর্তমান। বয়সের গাছ পাথর নাই। চলিতে ঠক্ ঠক্ করিয়া কাঁপে। ঘাটের মড়া! আর আবার এ কুবুদ্ধি কেন? বিষয় থাকিলে, টাকা থাকিলে, এরূপ করিতে হয় না কি? তিনি বড় মানুষ জমীদার, না হয় রাজা! তা বলিয়া কি একেবারে বিবেচনাশূন্য হইতে হয়? বৃদ্ধ মনে ভাবে না যে, মৃত্যু সন্নিকট? যেরূপ তাঁহার অবস্থা, তাহাতে আর কয় দিন? লাঠি না ধরিয়া একটি পা চলিতে পারে না। কি ভয়ানক কথা! আর তনু রায় কি নিক! দুধের বাছা কঙ্কাবতীকে কি করিয়া এই অশীতিপর বৃদ্ধের হাতে সমর্পণ করিবে? কঙ্কাবতীর কপালে কি শেষে এই ছিল? সেই মধুমাখা মুখখানি মনে করিলে, বুক ফাটিয়া যায়। শুনিতে পাই, কঙ্কাবতীর মা না কি রাত্রি দিন কাঁদিতেছেন। আমি ডাকিতে পাঠাইয়াছিলাম, কিন্তু আসেন নাই। বলিয়া পাঠাইলেন যে, দিদির কাছে আর মুখ দেখাই না, এ কালা মুখ লোকের কাছে আর বাহির করিব না। এই বিবাহের কথা শুনিয়া আমার বুক ফাটিয়া যাইতেছে। আহা! তাঁহার মার প্রাণ! কতই না তিনি কাতর হইয়া থাকিবেন?

এই চিঠিখানি পাইয়া রামহরি খেতুকে দেখাইলেন।

খেতু বলিলেন,–দাদা মহাশয়! আমি এইক্ষণে দেশে যাইব। –রামহরি বলিলেন,–জনার্দ্দন চৌধুরী বড়লোক, তুমি সহায়হীন বালক তুমি দেশে গিয়া কি করিবে?

খেতু বলিলেন,–আমি কিছু করিতে পারিব না সত্য, তথাপি নিশ্চিন্ত থাকা উচিত নয়। কঙ্কাবতীকে এ বিপদ হইতে রক্ষা করিবার নিমিত্ত চেষ্টা করাও কৰ্ত্তব্য।

কৃতকাৰ্য্য না হই, কি করিব?

খেতু দেশে আসিলেন। মার নিকট ও পাড়া প্রতিবেশীর নিকট সকল কথা শুনিলেন। শুনিলেন যে, জনার্দ্দন চৌধুরী প্রথমে কিছুতেই বিবাহ করিতে সম্মত হন নাই। কেবল তাঁহার সভাপতি গোবর্ধন শিরোমণি তাঁহাকে অনেক বুঝাইয়া সম্মত করাইয়াছেন।

বৃদ্ধ হইলে কি হয়? জনার্দ্দন চৌধুরীর শ্রীচাঁদ আছে, প্রাণে সখও আছে। দুর্লভ পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষের মাল্য দ্বারা গলদেশ তাঁহার সর্ব্বদাই সুশোভিত থাকে। কফের ধাত বলিয়া শৈত্য নিবারণের জন্য চূড়াদার টুপি মস্তকে দিন-রাত্রি বিরাজ করে এইরূপ বেশ ভূষায় সুসজ্জিত হইয়া নিভৃতে বসিয়া যখন তিনি গোবন শিরোমণির সহিত বিবাহ-বিষয়ে পরামর্শ করেন, তখন তাঁহার রূপ দেখিয়া ইন্দ্র চন্দ্র বায়ু বরুণকেও লজ্জায় অধোমুখ হইতে হয়।

খেতু শুনিলেন যে, জনার্দ্দন চৌধুরী বিবাহ করিবার জন্য এখন একেবারে পাগল হইয়া উঠিয়াছেন। আর বিলম্ব সহে না। এই বৈশাখ মাসের ২৪শে তারিখে বিবাহ হইবে। জনার্দ্দন চৌধুরী এক্ষণে দিন গণিতেছেন। তাঁহার পুত্র-কন্যা সকলের ইচ্ছা, যাহাতে এ বিবাহ না হয়। কিন্তু কেহ কিছু বলিতে সাহস করেন না। তাঁহার বড় কন্যা এক দিন মুখ ফুটিয়া মানা করিয়াছিলেন। সেই অবধি বড় কন্যার সহিত তাঁহার আর কথা-বার্তা নাই।

জনার্দ্দন চৌধুরীকে কন্যা দিতে তনু রায়ও প্রথমে ইতস্ততঃ করিয়াছিলেন। কিন্তু যখন জনার্দ্দন চৌধুরী বলিলেন যে,—আমার নব-বিবাহিতা স্ত্রীকে আমি দশ হাজার টাকার কোম্পানীর কাগজ দিব, একখানি তালুক দিব, স্ত্রীর গা সোনা দিয়া মুড়িব, আর কন্যার পিতাকে দুই হাজার টাকা নগদ দিব। তখন তনু রায় আর লোভ সংবরণ করিতে পারিলেন না।–কঙ্কাবতীর মুখপানে চাহিয়া তবুও তনু রায় ইতস্ততঃ করিতেছিলেন। কিন্তু তাঁহার পুত্র টাকার কথা শুনিয়া, একেবারে উন্মত্ত হইয়া পড়িলেন। বকিয়া বকিয়া পিতাকে তিনি সম্মত করিলেন। টাকার লোভে এক্ষণে পিতাপুত্র দুই জনেই উম্মত্ত হইয়াছেন।

তবুও তনু রায় স্ত্রীর নিকট নিজে এ কথা বলিতে সাহস করেন নাই। তাঁহার পুত্র বলিলেন,–তোমাকে বলিতে হইল না, আমি গিয়া মাকে বলিতেছি।

এই কথা বলিয়া পুত্র মার নিকট যাইলেন। মাকে বলিলেন,–মা। জনার্দ্দন চৌধুরীর সহিত কঙ্কাবতীর বিবাহ হইবে। বাবা সব স্থির করিয়া আসিয়াছেন।

মার মাথায় যেন বজ্রাঘাত হইল। মা বলিলেন,–সে কি রে? ওরে, সে কি কথা! ওরে, জনার্দ্দন চৌধুরী যে তেকেলে বুড়ো! তার সে বয়সের গাছ পাথর নাই! তার সঙ্গে কঙ্কাবতীর বিবাহ হবে কি রে?

পুত্র উত্তর করিলেন,….. বুড়ো নয় তো কি যুবো? না সে খোকা? জনার্দ্দন চৌধুরী তুলো করিয়া দুধ খায় না কি? না ঝুমঝুমি নিয়ে খেলা করে? মা যেন ঠিক পাগল! মার বুদ্ধি সুদ্ধি একেবারে নাই। কঙ্কাবতীকে দশ হাজার টাকা দিবে, গায়ে যেখানে যা ধরে গহনা দিবে, তালুক মুলুক দিবে, বাবাকে দুই হাজার টাকা নগদ দিবে, আবার চাই কি? বুড়ো মরিয়া যাইলে, কঙ্কাবতীর টাকা গহনা সব আমাদের হইবে। থুড় খুঁড়ে বুড়ো বলিয়াই তো আহ্লাদের কথা। শক্তি সামর্থ্য থাকিলে এখন কত দিন বাঁচিত, তার ঠিক কি? মা! তোমার কিছুমাত্র বিবেচনা নাই।

এ কথার উপর আর কথা নাই! মা একেবারে বসিয়া পড়িলেন। অবিরল ধারায় তাঁহার চক্ষু হইতে অশ্রু বিগলিত হইতে লাগিল। মনে করিলেন, যে,….. পৃথিবী! তুমি দুই ফাঁক হও, তোমার ভিতর আমি প্রবেশ করি। মেয়ে দুইটিও অনেক কাঁদিলেন; কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। কঙ্কাবতী নীরব। প্রাণ যাহার ধূ ধূ করিযা পড়িতেছে, চক্ষে তাঁহার জল কোথা হইতে আসিবে?

মা ও প্রতিবেশীদিগের নিকট হইতে খেতু এই সকল কথা শুনিলেন।

খেতু প্রথম তনু রায়ের নিকট যাইলেন। তনু রায়কে অনেক বুঝাইলেন। খেতু বলিলেন,… মহাশয়। এরূপ অশীতিপর বৃদ্ধের সহিত কঙ্কাবতীর বিবাহ দিবেন না। আমার সহিত বিবাহ না হয় না দিবেন, কিন্তু একটি সুপাত্রের হাতে দিন। মহাশয় যদি সুপাত্রের অনুসন্ধান করিতে না পারেন, আমি করিয়া দিব।

এই কথা শুনিয়া তনু রায় ও তনু রায়ের পুত্র, খেতুর উপর অতিশয় রাগান্বিত হইলেন। নানারূপ ভৎসনা করিয়া তাঁহাকে বাটী হইতে তাড়াইয়া দিলেন।

নিরঞ্জনকে সঙ্গে করিয়া খেতু তাহার পর জনার্দ্দন চৌধুরীব নিকট গমন করিলেন। হাত ঘোড় করিয়া অতি বিনীতভাবে জনার্দ্দন চৌধুরীকে বিবাহ করিতে নিষেধ করিলেন। প্রথমতঃ জনার্দ্দন চৌধুরী সে কথা হাসিয়া উড়াইয়া দিলেন। তাহার পর খেতু যখন তাঁহাকে দুই একবার বৃদ্ধ বলিলেন তখন রাগে তাঁহার সর্ব্বশরীর কাঁপিতে লাগিল। তাঁহার শ্লেষ্মার ধাত, রাগে এমনি তাঁহার ভয়ানক কাসি আসিয়া উপস্থিত হইল যে, সকলে বোধ করিল দম আট্রাইয়া তিনি না মরিয়া যান!

কাসিতে কাসিতে তিনি বলিলেন,—গলাধাক্কা দিয়া এ ছোঁড়াকে আমার বাড়ী হইতে বাহির করিয়া দাও। অনুমতি পাইয়া পারিষদগণ খেতুর গলাধাক্কা দিতে আসিল।

খেতু জনার্দ্দন চৌধুরীর লাঠিগাছটি তুলিয়া লইলেন। পারিষদবর্গকে তিনি ধীরভাবে বলিলেন,–তোমরা কেহ আমার গায়ে হাত দিও না। যদি আমার গায়ে হাত দাও, তাহা হইলে এই দণ্ডে তোমাদের মুণ্ডুপাত করিব।

খেতুর তখন সেই রুদ্রমূৰ্ত্তি দেখিয়া, ভয়ে সকলেই আকুল হইল। গলাধাক্কা দিতে আর কেহ অগ্রসর হইল না।।

নিরঞ্জন উঠিয়া, উভয় পক্ষকে সান্ত্বনা করিয়া খেতুকে সেখান হইতে বিদায় করিলেন। খেতু চলিয়া গেলেন। তবুও জনার্দ্দন চৌধুরীর রাগও থামে না, কাসিও থামে না। রাগে থর থর করিয়া শরীর কাঁপিতে লাগিল, খক্‌ খক্ করিয়া ঘন ঘন কাশি আসিতে লাগিল।

গগাবর্ধন শিরোমণি বলিলেন,–না না! আপনি বৃদ্ধ কেন হইবেন? আপনাকে যে বুড়ো বলে, সে নিজে বুড়ো।

ষাঁড়েশ্বর সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ষাড়ের বলিলেন,–হয় তো ছোকরা মদ খাইয়া আসিয়াছিল! চক্ষু দুইটা যেন জবা ফুলের মত, দেখিতে পান নাই?

নিরঞ্জন বলিলেন,—ও কথা বলিও না! যারা মদ খায়, তারা খায়। কে মদ মুরগী খায়, তা সকলেই জানে। পরের নামে মিথ্যা অপবাদ দিও না।

ষাঁড়েশ্বর উত্তর করিলেন,—সকলে শুনিয়া থাকুন, ইনি বলিলেন,–যে, আমি মদমুরগী খাই আমি ইহার নামে মানহানির মকদ্দমা করিব। এর হাড় কয়খানা জেলে পচাইব।–গগাবদ্ধন শিরোমণি বলিলেন,—ক্ষেত্ৰচন্দ্র মদ খান, কি না খান, তাহা আমি জানি না। তবে তিনি যে যবনের জল খান, তাহা জানি। সেই যারে বলে বরখ, সাহেবেরা কলে যাহা প্রস্তুত করেন, ক্ষেত্ৰচন্দ্র সেই বরখ খান। গদাধর ঘোষ ইহা স্বচক্ষে দেখিয়াছে।

জনার্দ্দন চৌধুরী জিজ্ঞাসা করিলেন,—কি কি? কি বলিলে?

ষাঁড়েশ্বর বলিলেন,–সর্ব্বনাশ! বরফ খায়? গোরক্ত দিয়া সাহেবেরা যাহা প্রস্তুত করেন? এবার দেখিতেছি, সকলের ধর্ম্মটি একেবারে লোপ হইল। হায় হায়! পৃথিবীতে হিন্দুধৰ্ম্ম একেবারে লোপ হইল।

নিরঞ্জন বলিলেন,–ষাঁড়েশ্বর বাবু! একবার মনে করিয়া দেখ, খেতুর বাপ তোমার কত উপকার করিয়াছেন। খেতুর অপকার করিতে চেষ্টা করিও না।

জনার্দ্দন চৌধুরী বলিলেন,—ও সব বাজে কথা এখন তোমরা রাখ। গদাধর ঘোষকে ডাকিতে পাঠাও। গদাধর ঘোষকে ডাকিতে লোক দৌড়িল।

 

চতুর্দশ পরিচ্ছেদ–গদাধর সংবাদ

গদাধর ঘোষ আসিয়া উপস্থিত হইল। চৌধুরী মহাশয়কে কৃতাঞ্জলিপুটে নমস্কার করিয়া অতি দূরে সে মাটীতে বসিল।

চৌধুরী মহাশয় বলিলেন,—কেমন হে গদাধর। এ কি কথা শুনিতে পাই? শিবচন্দ্রের ছেলেটা, ঐ খেতা, কি খাইয়াছিল? তুমি কি দেখিয়াছিলে? কি শুনিয়াছিলে? তাঁহার সহিত তোমার কি কথাবার্তা হইয়াছিল? সমুদয় বল, কোনও বিষয় গোপন করিও না।

গদাধর বলিল,–মহাশয়! আমি মুখ মানুষ অত শত জানি না। যাহা হইয়াছিল, তাহা আমি বলিতেছি।

গদাধর বলিল,–তার বৎসর আমি কলিকাতার গিয়াছিলাম। কোথায় থাকি? তাই রামহরির বাসায় গিয়াছিলাম। সন্ধ্যাবেলা বাহিরের ঘরে বসিয়া আছি, এমন সময় এক মিষে হাঁড়ী মাথায় করিয়া পথ দিয়া কি শব্দ করিতে করিতে যাইতেছিল। সেই শব্দ শুনিয়া রামহরি বাবুর ছেলেটি বাটীর ভিতর হইতে ছুটিয়া আসিল, আর খেতুকে বলিল,–কাকা, কাকা! কুলফী যাইতেছে, আমাকে কিনিয়া দাও। খেতু তাঁহাকে দুই পয়সার কিনিয়া দিলেন। আমি বলিলাম, না দাদাঠাকুর! আমি কুলফী খাই না। রামহরি বাবুর ছেলে খেতুকে বলিল—কাকা! তুমি খাইবে না? খেতু বলিলেন,–না, আমার পিপাসা পাইয়াছে, ইহাতে পিপাসা ভাঙ্গে না, আমি কাঁচা বরফ খাইব। এই কথা বলিয়া খেতু বাহিরে যাইলেন। কিছুক্ষণ পরে একটি সাদা ধবধবে কাঁচের মত ঢিল গামছায় বাঁধিয়া বাটী আনিলেন। সেই ঢিলটি ভাঙ্গিয়া জলে দিলেন, সেই জল খাইতে লাগিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,–দাদা ঠাকুর! ও কি? খেতু বলিলেন,—ইহার নাম বরখ। এই গ্রীষ্ণকালের দিনে যখন বড় পিপাসা হয়, তখন ইহা জলে দিলে জল শীতল হয়। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,—দাদাঠাকুর। সকল কাচ কি জলে দিলে জল শীতল হয়? খেতু উত্তর করিলেন,–এ কাচ নয়, এ বরখ। জল জমিয়া ইহা প্রস্তুত হয়। ইহা জল। নদীতে যে জল দেখিতে পাও, ইহাও তাই, জমিয়া গিয়াছে এইমাত্র। আকাশ হইতে যে শিল পড়ে, বরখ তাহাই। সাহেবেরা বরখ কলে প্রস্তুত করেন। একটু হাতে করিয়া দেখ দেখি? এই বলিয়া আমার হাতে একটুখানি দিলেন। হাতে রাখিতে না রাখিতে আমার হাত যেন করাত দিয়া কাটিতে লাগিল। আমি হাতে রাখিতে পারিলাম না, আমি ফেলিয়া দিলাম। তাহার পর খেতু বলিলেন,–গদাধর! একটু খাইয়া দেখ না? ইহাতে কোনও দোষ নাই। আমি বলিলাম,–না দাদাঠাকুর! তোমরা ইংরেজি পড়িয়াছ, তোমাদের সব খাইতে আছে, তাহাতে কোনও দোষ হয় না। আমি ইংরেজী পড়ি নাই। সাহেবেরা যে দ্রব্য কলে প্রস্তুত করেন, যে দ্রব্য খাইলে আমাদের অধর্ম্ম হয়, আমাদের জাতি যায়।

চৌধুরী মহাশয়কে সম্বোধন করিয়া গদাধর বলিল,–ধর্ম্মাবতার! আমি যাহা দেখিয়াছিলাম, তাহা আপনাকে বলিলাম। তার পর খেতু আমাকে অনেক সেকালের কথা জিজ্ঞাসা করিলেন, অনেক সেকালের কথা-বার্তা হইল, সে বিষয় এখানে আর বলিবার আবশ্যক নাই।

জনার্দ্দন চৌধুরী বলিলেন,–না না, কি কথা হইয়াছিল, তুমি সমুদয় বল। কোনও কথা গোপন করিবে না।–গগাবর্ধন শিরোমণিকে সম্বোধন করিয়া গদাধর বলিল,–শিরোমণি মহাশয়। সেই গরদওয়ালা ব্রাহ্মণের কথা গো!

শিরোমণি বলিলেন,–সে বাজে কথা। সে কথা আর তোমাকে বলিতে হইবে না।

জনার্দ্দন চৌধুরী বলিলেন,–না না, খেতার সহিত তোমার কি কথা হইয়াছিল। আমি সকল কথা শুনিতে ইচ্ছা করি। গরদওয়ালা ব্রাহ্মণের কথা আমি অল্প-অল্প শুনিয়াছিলাম, গ্রামের সকলেই সে কথা জানে। তবে খেতা তোমাকে কি জিজ্ঞাসা করিল আর তুমি কি বলিলে, সে কথা আমি জানিতে ইচ্ছা করি।

গদাধর বলিতেছে,–তাহার পর খেতু আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,–গদাধর। আমাদের মাঠে সেকালে না কি মানুষ মারা হইত? আর তুমি না কি সেই কাজের এক জন সদ্দার ছিলে? আমি উত্তর করিলাম,–দাদাঠাকুর! উচা বয়সে কোথায় কি করিয়াছি, কি না করিয়াছি, সে কথায় এখন আর কাজ কি? এখন তো আর সে সব নাই? এখন কোম্পানীর কড়া হুকুম। খেতু বলিলেন,–তা বটে; তবে সে কালের ঠেঙ্গাড়েদের কথা আমার শুনিতে ইচ্ছা হয়। তুমি নিজে হাতে এ সব করিয়াছ, তাই তোমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি। তোমরা দুই চারি জন যা বৃদ্ধ আছ, মরিয়া গেলে, আর এ সব কথা শুনিতে পাইব না। আর দেখ, গ্রামের সকলেই তো জানে যে, তুমি এ কাজের এক জন সর্দার ছিলে? আমি বলিলাম,–না দাদাঠাকুর! আপনারা থাকিতে আমরা কি কোনও কাজের সদ্দার হইতে পারি? আপনারা ব্রাহ্মণ, আমাদের দেবতা! সকল কাজের সদ্দার আপনারা। তাহার পর খেতু জিজ্ঞাসা করিলেন, তবে তোমাদের দলের সদ্দার কে ছিলেন? আমি বলিলাম…আজ্ঞা! আমাদের দলের সর্দার ছিলেন, কমল ভট্টাচার্য্য মহাশয়। এক সঙ্গে কাজ করিতাম বলিয়া তাঁহাকে আমার কমল কমল বলিয়া ডাকিতাম। তিনি এক্ষণে মরিয়া গিয়াছেন। খেতু তাহার পর জিজ্ঞাসা করিলেন,—গদাধর! তোমরা কখনও ব্রাহ্মণ মারিয়াছ? আমি বলিলাম,–আজ্ঞা, মাঠের মাঝখানে যারে পাইতাম, তাঁহাকেই মারিতাম। তাহাতে কোনও দোষ নাই। পরিচয় লইয়া মাথার লাঠি মারিতে গেলে আর কাজ চলে না। পথিকের কাছে কি আছে না আছে, সে কথা জিজ্ঞাসা করিয়াও মারিতে গেলে চলে না। প্রথমে মারিয়া ফেলিতে হইত। তাহার পর গলায় পৈতা থাকিলে জানিতে পারিতাম যে, সে লোকটি ব্রাহ্মণ, না থাকিলে বুঝিতাম যে, সে শূদ্র। আর প্রাপ্তির বিষয় যে দিন যেরূপ অদৃষ্টে থাকিত, সেই দিন সেইরূপ হইত। কত হতভাগা পথিককে মারিয়া শেষে একটি পয়সাও পাই নাই। ট্যাঁকে, কাচায়, কোঁচায় খুঁজিয়া একটি পয়সাও বাহির হয় নাই। সে বেটারা জুয়াচোর, দুষ্ট, বজ্জাৎ! পথ চলিবে বাপু, টাকা-কড়ি সঙ্গে নিয়া চল। তা না শুধু হাতে! বেটাদের কি অন্যায় বলুন দেখি, দাদাঠাকুর? একটি মানুষ মারিতে কি কম পরিশ্রম হয়? খালি হাতে রাস্তা চলিয়া আমাদের সব পরিশ্রম বেটারা নষ্ট করিত। খেতু আমাকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, হাঁ, গদাধর! মানুষের প্রাণ কি সহজে বাহির হয় না? আমি বলিলাম,সকলের প্রাণ সমান নয়। কেহ বা লাঠি খাইতে না খাইতে উদ্দেশে মরিয়া যায়। কেহ বা ঠাশ করিয়া এক ঘা খাইয়াই মরিয়া যায়। আর কাহাকেও বা তিন চারি জনে পড়িয়া পঞ্চাশ লাঠিতেও মারিতে পারা যায় না। একবার এক জন ব্রাহ্মণকে মারিতে কষ্ট হইয়াছিল। খেতু জিজ্ঞাসা করিলেন,–কি হইয়াছিল?গগাবর্ধন বলিলেন,–চৌধুরী মহাশয়! আপনার আর ও সব পাপ কথা শুনিয়া কাজ নাই। এক্ষণে ক্ষেত্ৰচন্দ্রকে লইয়া কি করা যায়, আসুন, তাঁহার বিচার করি! সাহেবের জল পান করিয়া অবশ্যই তিনি সাহেবত্ব প্রাপ্ত হইয়াছেন, তাহাতে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই।

জনার্দ্দন চৌধুরী বলিলেন,—না না! খেতার সহিত গদাধরের কি কি কথা হইয়াছিল, আমি সমস্ত শুনিতে চাই। ছোঁড়া যে গদাধরকে এত কথা জিজ্ঞাসা করিল, তাঁহার অবশ্যই কোনও না কোনও দুরভিসন্ধি থাকিবে। গদাধর! তাহার পর কি হইল, বল।

গদাধর পুনরায় বলিতেছে,–খেতু আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, যে, ব্রাহ্মণ মারিতে কষ্ট হইয়াছিল কেন? আমি বলিলাম,–দাদাঠাকুর, কোথা হইতে একবার তিন জন ব্রাহ্মণ আমাদের গ্রামে গরদের কাপড় বেচিতে আসেন। গ্রামে তাঁহারা থাকিবার স্থান পাইতেছিলেন না। বাসার অন্বেষণে পথে পথে ফিরিতেছিলেন। আমার সঙ্গে পথে দেখা হইল। একটি পাতা হাতে করিয়া আমি তখন ব্রাহ্মণের পদধূলি আনিতে যাইতেছিলাম। প্রত্যহ ব্রাহ্মণের পদধূলি না খাইয়া আমি কখনও জলগ্রহণ করি। ব্রাহ্মণ দেখিয়া আমি সেই পাতায় তাহাদের পদধূলি লইলাম, আর বলিলাম,—আসুন আমার বাড়ীতে, আপনাদিগকে বাসা দিব। তাঁহারা আমার বাড়ীতে বাসা লইলেন। আমাদের গ্রামে তিন দিন রহিলেন, অনেকগুলি কাপড় বেচিলেন, অনেক টাকা পাইলেন! আমি সেই সন্ধান কমলকে দিলাম। কমলেতে আমাতে পরামর্শ করিলাম যে, তিনটিকে সাবাড় করিতে হইবে। দলস্থ অন্য কাহাকেও কিছু বলিলাম না, কারণ, তাহা হইলে ভাগ দিতে হইবে। কমলকে বলিলাম, তুমি আগে গিয়া মাঠের মাঝখানে লুকাইয়া থাকা অতি প্রয্যে ইহাদিগকে আমি সঙ্গে লইয়া যাইব। দুই জনেই সেইখানে কাৰ্য্য সমাধা করিব। তাহার পরদিন প্রতুষ্যে আমি সেই তিন জন ব্রাহ্মণকে পথ দেখাইবার জন্য লইয়া চলিলাম। ভগবানের এমনি কৃপা যে সে দিন ঘোর কোয়াসা হইয়াছিল, কোলের মানুষ দেখা যায় না। নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হইবামাত্র কমল বাহির হইয়া একজনের মাথায় লাঠি মারিলেন। আমিও সেই সময় আর এক জনের মাথায় লাঠি মারিলাম। তাঁরা দুই জনেই পড়িয়া গেলেন। আমরা সেই দুই জনকে শেষ করিতেছি, এমন সময় তৃতীয় ব্রাহ্মণটি পলাইলেন। কমল তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ দৌড়িলেন আমিও আমার কাজটি সমাধা করিয়া তাঁহাদিগের পশ্চাৎ দৌড়িলাম। ব্রাহ্মণ গ্রামের ভিতর প্রবেশ করিলেন। শিরোমণি মহাশয়ের বাটীতে গিয়া,—ব্রহ্মহত্যা হয়! ব্রাহ্মণের প্রাণ রক্ষা করুন,—এই বলিয়া আশ্রয় লইলেন। অতি স্নেহের সহিত শিরোমণি মহাশয় তাঁহাকে কোলে করিয়া লইলেন। শিরোমণি মহাশয় তাঁহাকে মধুর বচনে বলিলেন,–জীবন ক্ষণভঙ্গুর! পদ্মপত্রের উপর জলের ন্যায়। সে জীবনের জন্য এত কাতর কেন বাপু? এই বলিয়া ব্রাহ্মণকে পাঁজা করিয়া বাটীর বাহিরে দিয়া শিরোমণি মহাশয় ঝনাৎ করিয়া বাটীর দ্বারটি বন্ধ করিয়া দিলেন। কমল পুনরায় ব্রাহ্মণকে মাঠের দিকে তাড়াইয়া লইয়া চলিলেন। ব্রাহ্মণ যখন দেখিলেন যে, আর রক্ষা নাই, কমল তাঁহাকে ধরধর হইয়াছেন, তখন তিনি হঠাৎ ফিরিয়া কমলকে ধরিলেন। কিছুক্ষণের নিমিত্ত দুই জনে হুটাহুটি হইল। হাতীর মত কমলের শরীরে বল, কমলকে তিনি পারিবেন কেন? কমল তাঁহাকে মাটীতে ফেলিয়া দিলেন, তাঁহাকে মারিয়া ফেলিতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। কিন্তু সেই ব্রাহ্মণ-দেবতার এমনি কঠিন প্রাণ যে, তিনি অজ্ঞানও হয় না, মরেও না। ক্রমাগত কেবল এই বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিলেন,–হে মধুসূদন! আমাকে রক্ষা কর! হে মধুসূদন! আমাকে রক্ষা কর। আমি পশ্চাতে পড়িয়াছিলাম। কোন দিকে ব্রাহ্মণ পলাইয়াছেন আর কমল বা কোন দিকে গিয়াছেন, কোয়াসার জন্য তাহা আমি দেখিতে পাই নাই। এখন ব্রাহ্মণের চীৎকার শুনিয়া আমি সেই দিকে দৌড়িলাম। গিয়া দেখি, ব্রাহ্মণ মাটীতে পড়িয়া রইয়াছেন, কমল তাঁহার বুকের উপরে; কমল আপনার দুই হাত দিয়া ব্রাহ্মণের দুটি হাত ধরিয়া মাটীতে চাপিয়া রাখিয়াছেন, কমলের বাম পা মাটিতে রহিয়াছে, দক্ষিণ পা ব্রাহ্মণের উদরে, এই পায়ের বুড়ে আঙ্গুল ঘোরতর বলের সহিত ব্রাহ্মণের নাভির ভিতর প্রবেশ করাইতেছেন। পড়িয়া পড়িয়া ব্রাহ্মণ চীৎকার করিতেছেন। কমল আমাকে বলিলেন, এ বামুন বেটা কি বজ্জাৎ! বেটা যে মরে না হে! গদাধর! শীঘ্র একটা যা হয় কর। তা না হইলে বেটার চীৎকারে লোক আসিয়া পড়িবে। আমার হাতে তখন লাঠি ছিল না, নিকটে এ খানা পাথর পড়িয়া ছিল। সেই পাথরখানি লইয়া আমি ব্রাহ্মণের মাথাটি ছেঁচিয়ে দিলাম। তবে ব্রাহ্মণের প্রাণ বাহির হইল। যাহা হউক, এই ব্রাহ্মণকে মারিতে পরিশ্রম হইয়াছিল বটে, কিন্তু সেবার লাভও বিলক্ষণ হইয়াছিল। অনেকগুলি টাকা আর অনেক গরদের কাপড় আমরা পাইয়াছিলাম। কি করিয়া নশিরাম সদ্দার এই কথা শুনিতে পাইয়াছিলেন। নশিরাম ভাগ চাহিলেন। আমরা বলিলাম, এ কাজে তোমাকে কিছু করিতে হয় নাই, তোমাকে আমরা ভাগ দিব কেন? কথায় কথায় কমলের সহিত নশিরামের ঘোরতর বিবাদ করিয়া উঠিল; ক্রমে মারামারি হইবার উপক্রম হইল। কমল পৈতা ছিঁড়িয়া নশিরামকে শাপ দিলেন। কমল ভট্টাচাৰ্য্য ব্রাহ্মণ। সাক্ষাৎ অগ্নিরূপ। শিষ্য যজমান আছে। সেরূপ ব্রাহ্মণের অভিশাপ ব্যর্থ হইবার নহে। পাঁচ-সাত বৎসরের মধ্যেই মুখে রক্ত উঠিয়া নশিরাম মরিয়া গেল। যাহা হউক, সেই সব কাপড় হইতে এক জোড়া ভাল গরদের কাপড় আমরা শিরোমণি মহাশয়কে দিয়াছিলাম। যখন সেই গরদের কাপড়খানি পরিয়া, দোবজাটি কাঁধে ফেলিয়া, ফোঁটাটি কাটিয়া, শিরোমণি মহাশয় পথে যাইতেন, তখন সকলে বলিত,—আহা! যেন কন্দর্প পুরুষ বাহির হইয়াছেন! বয়সকালে শিরোমণি মহাশয়ের রূপ দেখে কে? না, শিয়োমণি মহাশয়?

শিরোমণি মহাশয় বলিলেন,–গদাধর! গদাধর! তোমার এরূপ বাক্য বলা উচিত নয়। তুমি যাহা বলিতেছ, তাঁহার আমি কিছু জানি না। পীড়া-শীড়ায় তোমার বুদ্ধি লোপ হইয়াছে, আমি তোমার জন্য নারায়ণকে তুলসী দিব। তাহা হইলে তোমার পাপক্ষয় হইবে।–নিরঞ্জন এই সমুদয় বৃত্তান্ত শুনিতেছিলেন, মাঝে মাঝে দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিতেছিলেন, আর বলিতেছিলেন,–হা মধুসূদন! হা দীনবন্ধু!–জনার্দ্দন চৌধুরী কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহার পর কি হইল গদাধর?

গদাধর উত্তর করিল,–তাহার পর আর কিছু হয় নাই। খেতু অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া, অন্যমনস্কভাবে আমাকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন,–একটু বরফ খাবে গদর? আমি বলিলাম,–না দাদাঠাকুর! আমি বরফ খাইব না, বরফ খাইলে আমার অধর্ম্ম হইবে, আমার জাতি যাইবে।

জনার্দ্দন চৌধুরী বলিলেন,—তবে তুমি নিশ্চয় বলিতেছ, যে খেতু বরফ খাইয়াছে?

গদাধর উত্তর করিল,–আজ্ঞা হাঁ ধর্ম্মাবতার! আমি তাহা স্বচক্ষে দেখিয়াছি। আপনি ব্রাহ্মণ! আপনার পায়ে হাত দিয়া আমি দিব্য করিতে পারি।

 

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ–বিকার

গদাধরের মুখে সকল কথা শুনিয়া, জনার্দ্দন চৌধুরী তখন তনু রায় প্রভৃতি গ্রামের ভদ্রলোকদিগকে ডাকিতে পাঠাইলেন।

সকলে আসিয়া উপস্থিত হইলে, জনার্দ্দন চৌধুরী বলিলেন,—আজ আমি ঘোর সর্ব্বনাশের কথা শুনিলাম। জাতি কুল, ধৰ্ম্ম-কর্ম, সর্ব্ব লোপ হইতে বসিল। পিতা পিতামহদিগকে যে এক গণ্ডুষ জল দিব, তাঁহারও উপায় রহিল না। ঘোর কলি উপস্থিত।

সকলে জিজ্ঞাসা করিলেন,—কি হইয়াছে, মহাশয়?

জনার্দ্দন চৌধুরী উত্তর করিলেন,—শিবচন্দ্রের পুত্র ঐ যে খেতা, কলিকাতায় রামহরির বাসায় থাকিয়া ইংরেজী পড়ে, সে বরফ খায়। বরফ সাহেবেরা প্রস্তুত করেন, সাহেবের জল। শিয়োমণি মহাশয় বিধান দিয়াছেন, যে বরফ খাইলে সাহেবত্ব প্রাপ্ত লোকের সহিত সংস্রব রাখিলে সেও সাহেব হইয়া যায়। তাই, এই খেতার সহিত সংস্রব রাখিয়া সকলেই আমরা সাহেব হইতে বসিয়াছি।

এই কথা শুনিয়া দেশ শুদ্ধ নোক একেবারে মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িলেন। সর্ব্বনাশ! বরফ খায়? যাঃ! এইবার ধর্ম্ম কর্ম্ম সব গেল।

সর্বের চেয়ে ভাবনা হইল ষাড়েশ্বরের। ডাক ছাড়িয়া তিনি কাঁদেন নাই সত্য, কিন্তু তাঁহার ধর্ম্মগত প্রাণে বড়ই আঘাত লাগিয়াছিল। কত যে তিনি হায়, হায়! করিলেন, তাঁহার কথা আর কি বলিব।

যাহা হউক, সৰ্ব্ববাদি-সম্মত হইয়া খেতুকে এক-ঘোরে করা স্থির হইল।

নিরঞ্জন কেবল ঐ কথায় সার দিলেন না। আমরা না হয় দুঘঘারে হইয়া থাকিব।

নিরঞ্জন আরও বলিলেন,—চৌধুরী মহাশয়! আজ প্রাতঃকাল হইতে যাহা দেখিলাম যাহা শুনিলাম, তাহাতে বুঝিতেছি যে, ঘোর কলি উপস্থিত। নিদারুণ নরহত্যার ব্রহ্মহত্যার কথা শুনিলাম। চৌধুরী মহাশয়! আপনি প্রাচীন, বিজ্ঞ, লক্ষ্মীর বরপুত্র; বিধাতা আপনার প্রতি সুপ্রসন্ন। এ কুচক্র আপনাকে শোভা পায় না; লোককে জাতিচ্যুত করায় কিছুমাত্র পৌরুষ নাই, পতিতকে উদ্ধার করাই মানুষের কাৰ্য্য। বিষ্ণু ভগবান্ পতিতকে উদ্ধার করেন বলিয়াই তাঁহার নাম পতিত-পাবন হইয়াছে। পৃথিবীতে সজ্জনকুল সেই পতিত-পাবনের প্রতিরূপ। এই ষাঁড়েশ্বরের মত সুরাপানে আর অভ্য-ভক্ষণে যাহারা উম্মত্ত, এই তনু রায়ের মত যাহাদিগের অপত্য-বিক্রয়-জনিত শুষ্ক গ্রহণে মানুষ কলুষিত, এই গোবর্ধনের মত যাহারা ব্রহ্মহত্যা মহাপাতকে পতিত, সেই গলিত নরককীটেরা ধর্মের মর্ম কি জানিবে? এই বলিয়া নিরঞ্জন সেখান হইতে প্রস্থান করিলেন!

নিরঞ্জন চলিয়া যাইলে, গোবর্ধন শিরোমণি বলিলেন,—যাঁড়েশ্বর বাবাজীকে ইনি গালি দিলেন ষাঁড়েশ্বর বাবাজী বীর পুরুষ। ষাঁড়েশ্বর বাবাজীকে অপমান করিয়া এ গ্রামে আবার কে বাস করিতে পারে?–খেতু যে একঘোরে হইয়াছেন,….নিয়মিতরূপে লোককে সেইটি দেখাইবার নিমিত্ত, স্ত্রী মাসিক শ্রাদ্ধ উপলক্ষ্যে জনার্দ্দন চৌধুরী সপ্তগ্রাম সমাজ নিমন্ত্রণ করিলেন। চারিদিকে হৈ হৈ পড়িয়া গেল যে, কুসুমবাটী নিবাসী শিবচন্দ্রের পুত্র, ক্ষেত্র, বরফ খাইয়া কৃস্তান হইয়াছে।

সেই দিন রাত্রিতে ষাঁড়েশ্বর চারি বোতল মহুয়ার মদ আনিলেন। তারীফ শেখের বাড়ী হইতে চুপি চুপি মুরগী রাঁধাইয়া আনিলেন। পাঁচ ইয়ার জুটিয়া পরম সুখে পান ভোজন হইল। একবার কেবল এই সুখে ব্যাঘাত হইবার উপক্রম হইয়াছিল। খাইতে খাইতে ষাঁড়েশ্বরের মনে উদয় হইল যে, তারীফ শেখ হয় তো মুরগীর সহিত বরফ মিশ্রিত করিয়াছে। তাই তিনি হাত তুলিয়া লইলেন, আর বলিলেন,…আমার খাওয়া হইল না। বরফ-মিশ্রিত মুরগী খাইয়া শেষে কি জাতিটি হারাইব? সকলে অনেক বুঝাইলেন যে, মুরগী বরফ দিয়া রান্না হয় নাই। তবে তিনি পুনরায আহারে প্রবৃত্ত হইলেন। পান ভোজনের পর নিরঞ্জনের বাটীতে সকলে গিয়া চিল ও গোহাড় ফেলিতে লাগিলেন। এইরূপ ক্রমাগত প্রতি রাত্রিতে নিরঞ্জনের বাটীতে ঢিল ও গোহাড় পড়িতে লাগিল। আর সহ্য করিতে না পারিয়া, নিরঞ্জন ও তাঁহার স্ত্রী কাঁদিতে কাঁদিতে পৈতৃক বাস্তুভূমি পরিত্যাগ করিয়া অন্য গ্রামে চলিয়া গেলেন।

খেতু বলিলেন,—কাকা মহাশয়! আপনি চলুন। আমিও এ গ্রাম হইতে শীঘ্র উঠিয়া যাইব। খেতুর মার নিকট যে ঝি ছিল, সে ঝিটি ছাড়িয়া গেল। সে বলিল—মা ঠাকুরাণি! আমি আর তোমার কাছে কি করিয়া থাকি? পাঁচজনে তাহা হইল আমার হাতে জল খাইবে না।

আরও নানা বিষয়ে খেতুর মা উৎপীড়িত হইলেন। খেতুর মা ঘাটে স্নান করিতে যাইলে, পাড়ার স্ত্রীলোকেরা দূরে দূরে থাকেন; পাছে খেতুর মা তাঁহাদিকে ছুঁইয়া ফেলেন।

যে কমল ভট্টাচার্যের কথা গদাধর ঘোষ বলিয়াছিল, একদিন সেই কমলের বিধবা স্ত্রী মুখ ফাটিয়া খেতুর মাকে বলিলেন,—বাছা! নিজে সবধান হইতে জানিলে কেহ আর কিছু বলে না! বসিতে জানিলে উঠিতে হয় না। তোমার ছেলে বরফ খাইয়াছে, তোমাদের এখন জাতিটি গিয়াছে। তা বলিয়া আমাদের সকলের জাতিটি মার কেন? আমাদের ধর্ম্মকর্ম নাশ কর কেন? তা তোমার বাছা দেখিতেছি, এ ঘাটটি না হইলে আর চলে না। সেদিন মেটে কলসটি যেই কাঁকে করিয়া উঠিয়াছি, আর তোমার গায়ের জলের ছিটা আমার গায়ে লাগিল, তিন পয়সার কলসীটি আমাকে ফেলিয়া দিতে হইল। আমাকে পুনরায় স্নান করিতে হইল। আমরা তোমার বাছা কি করিয়াছি? যে তুমি আমাদের সঙ্গে এত লাগিয়াছ?

খেতুর মা কোন উত্তর দিলেন না। কাঁদিতে কাঁদিতে বাড়ী আসিলেন।

খেতু বলিলেন,…মা! কাঁদিও না। এখানে আর আমরা অধিক দিন থাকব না। এ গ্রাম হইতে আমরা উঠিয়া যাইব।

খেতুর মা বলিলেন,–বাছা। অভাগীরা যাহা কিছু বলে, তাহাতে আমি দুঃখ করি না। কিন্তু তোমার মুখপানে চাহিয়া রাত্রি দিন আমার মনের ভিতর আগুন জ্বলিতেছে। তোমার আহার নাই, নিদ্ৰা নাই; একদণ্ড তুমি সুস্থির নও! শরীর তোমার শীর্ণ, মুখ তোমার মলিন। খেতু! আমার মুখপানে চাহিয়া একটু সুস্থির হও, বাছা!

খেতু বলিলেন,–মা! আর সাত দিন। আজ মাসের হইল ১৭ তারিখ। ২৪শে তারিখে কঙ্কাবতীর বিবাহ হইবে। সেই দিন আশাটি আমার সমূলে নির্মূল হইবে। সেই দিন আমরা জন্মের মতো এ দেশ হইতে চলিয়া যাইব।

খেতু বলিলেন,–দাসেদের মেয়ের কাছে শুনিলাম যে, কঙ্কাবতীকে আর চেনা যায়। সে রূপ নাই, সে রং নাই, সে হাসি নাই। আহা! তবুও বাছা মার দুঃখে কাতর! আপনার সকল দুঃখ ভুলিয়া, বাছা আমার মার দুঃখে দুঃখী। কঙ্কাবতীর মা রাত্রি দিন কাঁদিতেছেন, আর কঙ্কাবতী মাকে বুঝাইতেছেন।

শুনিলাম, সেদিন কঙ্কাবতী মাকে বলিয়াছেন যে, মা। তুমি কাঁদিও না। আমার এই কয়খানা হাড় বেচিয়া বাবা যদি টাকা পান, তাতে দুঃখ কি মা? এরূপ কত হাড় শ্মশানঘাটে পড়িয়া থাকে, তাঁহার জন্য কেহ একটি পয়সাও দেয় না। আমার এই হাড় ক খানার যদি অত মূল্য হয়, বাপ ভাই সেই টাকা পাইয়া যদি সুখী হন, তার জন্য আর আমরা দুঃখ কেন করি মা? তবে মা! আমি বড় দুর্বল হইয়াছি, শরীরে আমার সুখ নাই। পাছে এই কয়দিনের মধ্যে

আমি মরিয়া যাই, সেই ভয় হয়। টাকা না পাইতে পাইতে মরিয়া গেলে, বাবা আমার উপর বড় রাগ করিবেন। আমি তো ছাই হইয়া যাইব, কিন্তু আমাকে তিনি যখনি মনে করিবেন, আর তখনি কত গালি দিবেন।

খেতুর মা পুনরায় বলিলেন,–খেতু কঙ্কাবতীর কথা যা আমি শুনি, তা তোমাকে বলি না, পাছে তুমি অধৈৰ্য্য হইয়া পড়! কঙ্কাবতীর যেরূপ অবস্থা শুনিতে পাই, কঙ্কাবতী আর অধিক দিন বাঁচিবে না।

খেতু বলিলেন,–মা। আমি তনু রায়কে, বলিলাম যে, রায় মহাশয়! আপনাকে আমার সহিত কঙ্কাবতীর বিবাহ দিতে হইবে না, একটি সুপাত্রের সহিত দিন। রামহরি দাদা ও আমি ধনাঢ্য সুপাত্রের অনুসন্ধান করিয়া দিব। কিন্তু মা! তনু রায় আমার কথা শুনিলেন না, অনেক গালি দিয়া আমাকে তাড়াইয়া দিলেন। আমাদের কি মা? আমরা অন্য গ্রামে গিয়া বাস করিব। কিন্তু কঙ্কাবতী যে এখানে চিরদুঃখিনী হইয়া রহিল সেই মা দুঃখ! আমি কাপুরুষ, যে তাঁহার কোন উপায় করিতে পারিলাম না, সেই মা দুঃখ। আমি কাপুরুষ, যে তাঁহার কোন উপায় করিতে পারিলাম না, সেই মা দুঃখ! আর মা, যদি কঙ্কাবতীর বিষয়ে কোন কথা শুনিতে পাও, তো আমাকে বলিও। আমার নিকট কোনও কথা গোপন করিও না। আহা! সীতাকে এ সময়ে কলিকাতায় কেন পাঠাইয়া দিলাম। সীতা যদি এখানে থাকিত, তাহা হইলে প্রতিদিনের সঠিক সংবাদ পাইতাম।

খেতুর মা, তার পর দিন খেতুকে বলিলেন,—আজ শুনিলাম, কঙ্কাবতীর বড় জ্বর হইয়াছে। আহা! ভাবিয়া ভাবিয়া বাছার যে জ্বর হইবে, সে আর বিচিত্র কথা কি? বাছার এখন প্রাণরক্ষা হইলে হয়। জনার্দ্দন চৌধুরী কবিরাজ পাঠাইয়াছেন, আর বলিয়া দিয়াছেন যে, যেমন করিয়া হউক, চারি দিনের মধ্যে কঙ্কাবতীকে ভাল করিতে হইবে।

খেতু বলিলেন,—তাই তো মা! এখন কঙ্কাবতীর প্রাণটা রক্ষা হইলে হয়। মা! কঙ্কাবতীর বিড়াল আসিলে এ কয়দিন তাঁহাকে ভাল করিয়া দুধ-মাছ খাইতে দিবে। হাঁ মা! আমরা এখান হইতে চলিয়া যাইলে, কঙ্কাবতীর বিড়াল কি আমাদের বাড়ীতে আর আসিবে? না, বড়মানুষের বাড়ীতে গিয়া আমাদিগকে ভুলিয়া যাইবে?।

খেতুর মা কোনও উত্তর দিলেন না, আঁচলে চক্ষু মুছিতে লাগিলেন।

এইরূপ দিন দিন কঙ্কাবতীর পীড়া বাড়িতে লাগিল, কিছুই কমিল না। সাত দিন হইল। বিবাহের দিন উপস্থিত হইল।

সে দিন কঙ্কাবতীর গায়ের বড় জ্বালা, কঙ্কাবতীর বড় পিপাসা, কঙ্কাবতী একেবারে শয্যাধরা। কঙ্কাবতীর সমূহ রোগ। কঙ্কাবতীর ঘোর বিকার। কঙ্কাবতীর জ্ঞান নাই, সংজ্ঞা নাই। লোক চিনিতে পারেন না, কঙ্কাবতী এখন যা তখন যা!

 

দ্বিতীয় ভাগ
প্রথম পরিচ্ছেদ–নৌকা

বড় পিপাসা, বড় গায়ের জ্বালা!

কঙ্কাবতী মনে মনে করিলেন;–যাই নদীর ঘাটে যাই, সেইখানে বসিয়া এক পেট জল খাই, আর গায়ে জল মাখি, তাহা হইলে শান্তি পাইব।

নদীর ঘাটে বসিয়া কঙ্কাবতী জল মাখিতেছেন, এমন সময়ে কে বলিল,–কে ও কঙ্কাবতী? কঙ্কাবতী চারিদিকে চাহিয়া দেখিলেন, কাহাকেও দেখিতে পাইলেন না। কেহ কোথাও নাই! কে এ কথা বলিতেছে, কঙ্কাবতী তাহা স্থির করিতে পারিলেন না। নদীর জলে দূরে কেবল একটি কাতলা মাছ ভাসিতেছে, আর ড়ুবিতেছে, তাহাই দেখিতে পাইলেন। পুনরায় কে জিজ্ঞাসা করিল,—কেও, কঙ্কাবতী?

কঙ্কাবতী এইবার উত্তর করিলেন,—হাঁ গো, আমি কঙ্কাবতী।–পুনরায় কে জিজ্ঞাসা করিলেন,তোমার কি বড় গায়ের জ্বালা তোমার কি বড় পিপাসা?

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,—হাঁ গো আমার বড় জ্বালা, আমার বড় পিপাসা।

কে আবার বলিল,–তবে তুমি এক কাজ কর না কেন? নদীর মাঝখানে চল না কেন? নদীর ভিতর অতি সুশীতল ঘর আছে, সেখানে যাইলে তোমার পিপাসার শান্তি হইবে, তোমার শরীর জুড়াইবে। কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,—নদীর মাঝখান যে অনেক দুর! সেখানে আমি কি করিয়া যাইব?

সে বলিল,–কেন? ঐ যে জেলেদের নৌকা রহিয়াছে? ঐ নৌকার উপর বসিয়া কেন এস না? জেলেদের একখানি নৌকার উপর গিয়া কঙ্কাবতী বসিলেন। এমন সময় বাটীতে কঙ্কাবতীর অনুসন্ধান হইল। কঙ্কাবতী কোথায় গেল,কঙ্কাবতী কোথায় গেল? এই বলিয়া একটা গোল পড়িল। কে বলিল,–ও গো। তোমাদের কঙ্কাবতী ঐ ঘাটের দিকে গিয়াছে।

কঙ্কাবতীর বাড়ীর সকলে মনে করিলেন যে জনার্দ্দন চৌধুরীর সহিত বিবাহ হইবার ভয়ে কঙ্কাবতী পলায়ন করিতেছেন। তাই কঙ্কাবতীকে ডাকিয়া আনিবার জন্য প্রথমে বড় ভগ্নী ঘাটের দিকে দৌড়িলেন। ঘাটে আসিয়া দেখেন, না কঙ্কাবতী একখানি নৌকার উপর চড়িয়া নদীর মাঝখানে যাইতেছেন। কঙ্কাবতীর ভগ্নী বলিলেন,–

কঙ্কাবতী বোন্ আমার, ঘরি ফিরে এস না?
বড় দিদি হই আমি, ভাল কি আর বাস না?
তিন ভগ্নী আছি দিদি, দুইটি বিধবা তার।
কঙ্কাবতী তুমি ছোট বড় আদরের মা’র।

নৌকায় বসিয়া বসিয়া কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,–

শুনিয়াছি আছে না-কি জলের ভিতর।
শান্তিময় সুখময় সুশীতল ঘর।
সেই খানে যাই দিদি পুজি তোমার পা।
এই কঙ্কাবতীর নৌকাখানি হুথু যা।

এই কথা বলিতেই কঙ্কাবতীর নৌকাখানি আরও গভীর জলে ভাসিয়া গেল।

তখন, ভাই আসিয়া কঙ্কাবতীকে বলিলেন,–

কঙ্কাবতী ঘরে এস, কুলেতে দিও না কালি।
রেগেছেন বাবা বড়, দিবেন কতই গালি।
বালিকা অবুঝ তুমি, কি জান সংসার-কথা?
ঘরে ফিরে এস, দিও না, বাপের মনে ব্যথা।

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,–

কি বলিছ দাদা তুমি বুঝিতে না পারি।
জ্বলিছে আগুন দেহে নিবাইতে নারি।
যাও দাদা ঘরে যাও হও তুমি রাজা।
এই কঙ্কাবতীর নৌকাখানি হুথু যা।

এই কথা বলিতেই কঙ্কাবতীর নৌকাখানি আরও দূর জলে ভাসিয়া গেল। তখন কঙ্কাবতীর মা আসিয়া বলিলেন–

কঙ্কাবতী লক্ষ্মী আমার, ঘরে ফিরে এস না?
কাঁদিতেছে মায়ের প্রাণ, বিলম্ব আর করো না।
ভাত হল কড় কড়, ব্যঞ্জন হইল বাসি।
কঙ্কাবতী মা আমার সাত দিন উপবাসী।

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,–

বড়ই পিপাসা মাতা না পারি সহিতে।
তুষের আগুন সদা জ্বলিছে দেহেতে।
এই আগুন নিবাইতে যাইতেছি মা।
কঙ্কাবতীর নৌকা খানি এই হুথু যা।

এই বলিতে কঙ্কাবতীর নৌকাখানি আরও দূর জলে ভাসিয়া গেল। তখন বাপ আসিয়া বলিলেন,–

কঙ্কাবতী ঘরে এস, হইবে তোমার বিয়া।
কত যে হতেছে ঘটা দেখ তুমি ঘরে গিয়া।
গহনা পরিবে কত আর সাটিনের জামা।
কত যে পাইবে টাকা নাহিক তাঁহার সীমা।

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,–

টাকা কড়ি কাজ নাই বসন-ভূষণ।
আগুনে পুড়িছে পিতা শরীর এখন।
দারুণ যাতনা পিতা আর ত সহে না!
এই কঙ্কাবতীর নৌকাখানি ড়ুবে যা।

এই বলিতেই কঙ্কাবতীব নৌকাখানি নদীর জলে টুপ করিয়া ড়ুবিয়া গেল।

 

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ–জলে

নৌকার সহিত কঙ্কাবতীও ড়ুবিয়া গেলেন। কঙ্কাবতী জলের ভিতর ক্রমেই ড়ুবিতে লাগিলেন। নেমেই নীচে যাইতে লাগিলেন। যাইতে যাইতে অনেক দূর চলিয়া গেলেন। তখন নদীর যত মাছ সব একত্র হইল। নদীর ভিতর মহা-কোলাহল পড়িয়া গেল যে কঙ্কাবতী আসিতেছেন। কই বলে,–কঙ্কাবতী আসিতেছেন, পুঁটে বলে,–কঙ্কাবতী আসিতেছেন। সবাই বলে,–কঙ্কাবতী আসিতেছেন। পথ পানে এক দৃষ্টে চাহিয়া জলচর জীবজন্তু সব যেখানে দাঁড়াইয়াছিল, ক্রমে কঙ্কাবতী আসিয়া সেইখানে উপস্থিত হইলেন। সকলেই কঙ্কাবতীকে আদর করিল। সকলেই বলিল, এস এস, কঙ্কাবতী এস।

মাছেদের ছেলে-মেয়েরা বলিল,–আমরা কঙ্কাবতীর সঙ্গে খেলা করিব।

বৃদ্ধা কাতলা মাছ তাহাদিগকে ধমক দিয়া বলিলেন,কঙ্কাবতীর এ খেলা করিবার সময় নয়। বাছার বড় গায়ের জ্বালা দেখিয়া আমি কঙ্কাবতীকে ঘাট হইতে ডাকিয়া আনিলাম। আহা কত পথ আসিতে হইয়াছে। বাছার আমার মুখ শুকাইয়া গিয়াছে! এস মা তুমি আমার কাছে এস। একটু বিশ্রাম কর, তার পর তোমার একটা বিলি করা যাইবে।

কঙ্কাবতী আস্তে আস্তে কাতলা মাছের নিকট গিয়া বসিলেন।

এদিকে কঙ্কাবতী বিশ্রাম করিতে লাগিলেন, ওদিকে জলচর জীব-জন্তুগণ মহাসমারোহে একটি সভা করিলেন। তপস্বী মাছের দাড়ি আছে দেখিয়া, সকলে তাঁহাকে সভাপতিরূপে বরণ করিলেন। কঙ্কাবতীকে লইয়া কি করা যায়-সভায় এই কথা লইয়া বাদানুবাদ হইতে লাগিল। অনেক বক্তৃতার পর, চতুর বাটা মাছ প্রস্তাব করিলেন,–এস ভাই! কঙ্কাবতীকে আমরা আমাদের রাণী করি।

এই কথাটি সকলের মনোনীত হইল। চারিদিকে জয়ধ্বনী উঠিল।

মাছেদের আর আনন্দের পরিসীমা নাই। সকলেই বলাবলি করতে লাগিল যে,ভাই! কঙ্কাবতী আমাদের রাণী হইলে, আর আমাদের কোনও ভাবনা থাকিবে না। বঁড়শী দিয়া আমাদিগকে কেহ গাঁথিলে হাত দিয়া কঙ্কাবতী সূতাটি ছিঁড়িয়া দিবেন। জেলেরা জাল ফেলিলে ছুরি দিয়া কঙ্কাবতী জালটি কাটিয়া দিবেন। কঙ্কাবতী রাণী হইলে আর আমাদের কোনও ভয় থাকিবে না। এস, এখন সকলে কঙ্কাবতীর কাছে যাই, আর কঙ্কাবতীকে গিয়া বলি যে, কঙ্কাবতী তোমাকে আমাদের রাণী হইতে হইবে।

কঙ্কাবতী বলিলেন,—এখন আমি তোেমাদের রাণী হইতে পারিব না। আমার শরীরে সুখ নাই, আমার মনেও বড় অসুখ। তাই এখন আমি তোমাদের রাণী হইতে পারিব না।

তখন কাতলানী বলিলেন,—তোমরা রাজ-পোষাক প্রস্তুত করিয়াছ? রাজ-পোষাক পাইলে কঙ্কাবতী রাণী হইবে কেন?

এই কথা শুনিয়া মাছেরা সব বলিল,–ও হো বুঝেছি বুঝেছি। রাজ-পোষাক না পাইলে কঙ্কাবতী রাণী হইবে না। রাঙা কাপড় চাই, মেমের মত পোক চাই, তবে কঙ্কাবতী রাণী হইবে।

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,—না গো না! রাঙা কাপড়ের জন্য নয়। সাজিবার গুজিবার সাধ আমার নাই। একেলা বসিয়া কেবল কাঁদি, এখন আমার এই সাধ।

মাছেরা সে কথা শুনিল না। বিষম কোলাহল উপস্থিত করিল। তাহাদের কোলাহলে অস্থির হইয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,—ভাল। না হয় আমি তোমাদের রাণী হইলাম। এখন আমাকে করিতে হইবে কি?।

মাছেরা উত্তর করিল,—করিতে হইবে কি? কেন? দরজীর বাড়ী যাইতে হইবে, গায়ের মাপ দিতে হইবে, পোষাক পরিতে হইবে। সকলে তখন কাঁকড়াকে বলিলেন,–কাঁকড়া মহাশয়! আপনি জলেও চলিতে পারেন, স্থলেও চলিতে পারেন, আপনি বুদ্ধিমান লোক। চক্ষু দুইটী যখন আপনি পিট পিট করেন, বুদ্ধির আভা তখন তাঁহার ভিতর চিহ্ন চিক্ করিতে থাকে। কঙ্কাবতীকে সঙ্গে লইয়া আপনি দরজীর বাড়ী গমন করুন। ঠিক করিয়া কঙ্কাবতীর গায়ের মাপটি দিবেন, দামি কাপড়ের জামা করিতে বলিবেন। কচ্ছপের পিঠে বোঝাই দিয়া টাকা মোহর লইয়া যা। যত টাকা লাগে, তত টাকা দিয়া কঙ্কাবতীর ভাল কাপড় করিয়া দিবেন।

কাঁকড়া মহাশয় উত্তর করিলেন,—অবশ্যই আমি যাইব। কঙ্কাবতীর ভাল কাপড় হয়, ইহাতে কার না আহ্লাদ? আমাদের রাণীকে ভাল করিয়া না সাজাইলে গুজাইলে, আমাদের অখ্যাতি। তোমরা কচ্ছপের পিঠে টাকা মোহর বোঝাই দাও, আমি ততক্ষণ ঘর হইতে পোষাকি কাপড় পরিয়া আসি, আর মাথার মাঝে সিঁথি কাটিয়া আমার চুলগুলি বেশ ভাল করিয়া ফিরাইয়া আসি। কচ্ছপের পিঠে টাকা মোহর বোঝাই দেওয়া হইল। ততক্ষণ কাঁকড়া মহাশয় ভাল কাপড় পরিয়া, মাথা আঁচড়াইয়া, ফিট পিট হইয়া আসিয়া উপস্থিত হইলেন।

 

তৃতীয় পরিচ্ছেদ—রাজ-বেশ

কঙ্কাবতী করেন কি? সকলের অনুরোধে তাঁহাদের সঙ্গে চলিলেন। কাঁকড়া মহাশয় আগে, কঙ্কাবতী মাঝখানে, কচ্ছপ পশ্চাতে, এইরূপে তিন জনে যাইতে লাগিলেন।

প্রথম অনেক দূর জলপথে যাইলেন, তাহার পর অনেক দূর স্থলপথে যাইলেন। পাহাড়, পর্ব্বত, বন, জঙ্গল, অতিক্রম করিয়া অবশেষে বুড়ো দরজীর বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইলেন।

বুড়ো দরজী চশমা নাকে দিয়া কাঁচি হাতে করিয়া কাপড় সেলাই করিতেছিলেন। দূরে পাহাড় পানে চাহিয়া দেখিলেন যে, তিন জন কাহারা আসিতেছে। মনে মনে ভাবিলেন, ও কারা আসে? নিকটে আসিলে চিনিতে পারিলেন।

তখন বুড়ো দরজী বলিলেন,–কে ও কাঁকড়া ভায়া?

কাঁকড়া মহাশয় উত্তর করিলেন,—হাঁ দাদা! কেমন, ভাল আছ তো?

দরজী বলিলেন,—আর ভাই! আমাদের আর ভাল থাকা না থাকা! এখন গেলেই হয়। তোমরা সৌখীন পুরুষ; তোমাদের কথা স্বতন্ত্র। এখন কি মনে করিয়া আসিয়াছ বল দেখি? –কাঁকড়া উত্তর করিলেন,এই কঙ্কাবতীকে আমরা আমাদের দ্বাণী করিয়াছি। কঙ্কাবতীর জন্য ভাল জামা চাই, তাই তোমার নিকট আসিয়াছি।

দরজী বলিলেন,—বটে! তা আমার নিকট উক্ত জামা আছে। ভাল পাটনাই খেরোর জামা আছে। টকটকে লাল খেরো, রং উঠিতে জানে না, ছিড়িতে জানে না, আগা-গোড়া আমি বখেই দিয়া সেলাই করিয়াছি। তোমাদের রাণী কঙ্কাবতী যদি শিমূল তুলা হয়, তো পরাও, অতি উত্তম দেখাইবে। দামের জন্য আটক খাইবে না। এখন টিপিয়া দেখ দেখি? কঙ্কাবতী শিমূল তুলা কি না?

দাড়া দিয়া কাঁকড়া মহাশয় কঙ্কাবতীর গা টিপি টিপিয়া দেখিলেন। তাহার পর দরজীর পানে চাহিয়া বলিলেন,–কৈ না! সেরূপ নরম তো নয়।

কঙ্কাবতী বলিলেন,–খেরোর খোল পরাইয়া তোমরা আমাকে বালিশ করিবে না কি? এই সকলে মিলিয়া আমাকে রাণী করিলে, তবে আবার বালিশ করিবার পরামর্শ করিতেছ কেন?

দরজী উত্তর করিলেন,–ঈশ। মেয়ের যে আম্বা ভারি! বালিশ হবে না তো কি তাকিয়া হইতে চাও না কি?–দরজীর এইরূপ নিষ্ঠুর বচনে কঙ্কাবতীর মনে বড় দুঃখ হইল, কঙ্কাবতী কাঁদিতে লাগিলেন।।

কাঁকড়া মহাশয় বলিলেন,–তুমি ছেলে মানুষ! আমাদের কথায় কথা কও কেন বল দেখি! যা তোমার পক্ষে ভাল তাই আমরা করিতেছি, চুপ করিয়া দেখ। চুপ কর; কাঁদিতে নাই।–এইরূপ সান্ত্বনা-বাক্য বলিয়া কাঁকড়া মহাশয় আপনার বড় দাঁড়া দিয়া কঙ্কাবতীর মুখ মুছাইয়া দিলেন। তাহাতে কঙ্কাবতীর মুখ ছড়িয়া গেল।

বুড়ো দরজী বলিলেন,–তাই তো! তবে এর গায়ের জামা আমার কাছে নাই। এর জামা আমি কাটিতেও জানি না সেলাই করিতেও জানি না।

কাঁকড়া মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন,—তবে এখন উপায়? ভাল জামা কোথায় পাই?–বুড়ো দরজী বলিলেন, তুমি এক কাজ কর, তুমি খলীফা সাহেবের কাছে যাও। খলীফা সাহেব ভাল কারিগর; খলীফা সাহেবের মত কারিগর এ পৃথিবীতে নাই, তাঁহার কাছে নানাবিধ কাপড় আছে, সে কাপড় পরিলে খাঁদারও নাক হয়।

এই কথায় কাঁকড়া মহাশয়ের রাগ হইল। তিনি বলিলেন, তুমি কি আমাকে ঠাট্টা করিতেছ না কি? তোমার না হয় নাকটি একটু বড়, আমার না হয় নাকটি ছোট, তাতে আবার ঠাট্টা কিসের?

বুড়ো দরজী উত্তর করিলেন,—না না! তা কি কখনও হয়! তোমাকে আমি ঠাট্টা করিতে পারি? কেন? তোমার নাকটি মন্দ কি? কেবল দেখিতে পাওয়া যায় না, এই দুঃখের বিষয়।

বুড়ো দরজীর এইরূপ প্রিয় বচনে কাঁকড়া মহাশয়ের রাগ পড়িল। সন্তোষ লাভ করিয়া তিনি উত্তর করিলেন,—তা বটে! তা বটে! আমার নাকটি ভাল, তবে দোষের মধ্যে এই যে দেখিতে পাওয়া যায় না। কোথায় আছে, আমি নিজেই খুঁজিয়া পাই না। যদি দেখিতে পাওয়া যাইত, তাহা হইলে আমার নাক দেখিয়া সকলেই প্রশংসা করিত, সকলেই বলিত, আহা! কাঁকড়ার কি নাক! যেন বাঁশীর মত। আর যারা ছড়া বাঁধে তারা লিখিত,—তিল ফুল জিনি নাসা! কিম্বা শুকচথু মত নাসা! যা বল, যা কও, আমার অতি সুন্দর নাক।

কঙ্কাবতী ভাবিলেন,—ব্যাপারখানা কি? আমি দেখিতেছি সব পাগলের হাতে পড়িয়াছি। এ কাঁকড়াটা তো বন্ধ পাগল। এরে পাগলা গারদে রাখা উচিত।

মুখ ফুটিয়া কিন্তু কঙ্কাবতী কিছু বলিলেন না।।

সকলে পুনরায় সেখান হইতে চলিলেন। আগে কাঁকড়া মহাশয়, তাহার পর কঙ্কাবতী, শেষে কচ্ছপ। এইরূপে তিনজনে যাইতে লাগিলেন। যাইতে যাইতে অনেক দূর গিয়া অবশেষে উপস্থিত হইলেন তখন খলীফা অন্দরমহলে ছিলেন।

কাঁকড়া মহাশয় বাহির হইতে ডাকিলেন,—খলীফা সাহেব! খলীফা সাহেব।

ভিতর হইতে খলীফা উত্তর দিলেন,–কে হে! কে ডাকাডাকি করে?

কাঁকড়া মহাশয় উত্তর করিলেন,—আমি কাঁকড়াচন্দ্র। একবার বাহিরে আসুন, বিশেষ কাজ আছে। –খলীফা বাহিরে আসিলেন। কাঁকড়াচন্দ্রকে দেখিয়া অতি সমাদরে তাঁহাকে অভ্যর্থনা করিলেন। খলীফা বলিলেন,—আসুন কাঁকড়াবাবু আসুন। আর এই যে কচ্ছপবাবুকেও দেখিতেছি। কচ্ছপ বাবু। আপনি ঐ টুলটিতে বসুন, আর কাঁকড়া বাবু! আপনি ঐ চেয়ারখানি নি! এ মেয়েটিকে বসিতে দিই কোথায়? দিব্য মেয়েটি কাঁকড়া। এ কন্যাটি কি আপনার?

কাঁকড়াচন্দ্র উত্তর করিলেন,–না, এ কন্যাটি আমার নয় আমি বিবাহ করি নাই। ওঁর জন্য এখানে আসিয়াছি। ওঁরে আমরা আমাদের রাণী করিয়াছি। এক্ষণে রাজপরিচ্ছদের প্রয়োজন। তাই আপনার নিকট আসিয়াছি। এঁর জন্য অতি উত্তম রাজপরিচ্ছদ প্রস্তুত করিয়া দিতে হইবে।

খলীফা উত্তর করিলেন,—রাজ-পরিচ্ছদ প্রস্তুত করিতে পারি। আমার কাছে রেশম আছে পশম আছে সাটিন আছে, মায় বারাণসী কিংখাপ পৰ্য্যন্ত আছে। কিন্তু রাজ-পোষাক তো আর অমনি হয় না? তাতে হীরা বসাইতে হইবে মতি বসাইতে হইবে জরি-লেস্ প্রভৃতি ভাল ভাল দ্রব্য লাগাইতে হইবে। অনেক টাকা খরচ হইবে। টাকা দিতে পারিবেন তো?–কাঁকড়াচন্দ্র হাসিয়া বলিলেন, আমাদের টাকার অভাব কি? যত নৌকাজাহাজ ড়ুবি হয়, তাহাতে যে টাকা থাকে সে সব কোথায় যায়? সে সকল আমাদের প্রাপ্য। এক্ষণে আপনার কত টাকা চাই, তাই বলুন?

খলীকা উত্তর করিলেন,—যদি ই তোড়া টাকা দিতে পারেন, তাহা হইলে উত্তম রাজপোক প্রস্তুত করিয়া দিতে পারি।

কাঁকড়া তৎক্ষণাৎ কচ্ছপের পিঠ হইতে লইয়া দুই তোড়া মোহর খলীফার সম্মুখে ফেলিয়া দিলেন। খলীফা—অনেক রাজার পোষাক, অনেক বাবুর পোষাক অনেক বরের পোষাক প্রস্তুত করিয়াছিলেন। কিন্তু একেবারে দুই তোড়া মোহর কেহ কখনও তাঁহাকে দেয় নাই।–মোহর দেখিয়া কঙ্কাবতী ব্যাকুল হইয়া বলিলেন,–ও গো! তোমরা এ টাকাগুলি আমাকে দাও! আমি বাড়ী লইয়া যাই। আমার বাবা বড় টাকা ভালবাসেন, এত টাকা পাইলে বাবা কত আহ্লাদ করিবেন। এই ময়লা কাপড় পরিয়াই আমি না হয় তোমাদের রাণী হইব, ভাল কাপড়ে আমার কাজ নাই। তোমাদের পায়ে পড়ি, এই টাকাগুলি আমাকে দাও, আমি বাবাকে গিয়া দিই।

কাঁকড়া কঙ্কাবতীকে বকিয়া উঠিলেন। কাঁকড়া বলিলেন–তুমি বড় অবাধ্য মেয়ে দেখিতেছি। একবার তোমাকে মানা করিয়াছি যে, তুমি ছেলেমানুষ আমাদের কথায় কথা কহিও না। চুপ করিয়া দেখ, আমরা কি করি।

কি করিবেন? কঙ্কাবতী চুপ করিয়া রহিলেন। মোহর পাইয়া খলীফার আর আনন্দের পরিসীমা রহিল না। তিনি বলিলেন,—টাকাগুলি বাড়ীর ভিতর রাখিয়া আসি, আর ভাল ভাল কাপড় বাহির করিয়া আনি। এইক্ষণেই তোমাদের রাণীর রাজবস্ত্র করিয়া দিব।

বাটীর ভিতর খলীফা দুই তোড়া লইয়া যাইলেন। আহ্লাদে পুলকিত হইয়া দন্তপাতি বাহির করিয়া এক গাল হাসির সহিত সেই মোহর স্ত্রীকে দেখাইতে লাগিলেন।

স্ত্রী অবাক! কি আশ্চর্য্য! আজ সকাল বেলা আমরা কার মুখ দেখিয়া উঠিয়াছিলাম? খলীফানী এইরূপ ভাবিতে লাগিলেন। অবশেষে প্রকাশ্যে খলীফানী বলিলেন,—এবার কিন্তু আমাকে ডায়মনকাটা তাবীজ গড়াইয়া দিতে হইবে।

তাহার পর খলীফা কঙ্কাবতীকে বাটীর ভিতর লইয়া গেলেন। স্ত্রীকে বলিলেন—ইনি রাণী! এঁর নাম কঙ্কাবতী। এঁর জন্য রাজ-পরিচ্ছদ প্রস্তুত করিতে হইবে। অতি সাবধানে তুমি ইহার গায়ের মাপ লও!

খলীফানী কঙ্কাবতীর গায়ের মাপ লইলেন। অনেক লোক নিযুক্ত করিয়া অতি সত্বর খলীফা রাজবস্ত্র প্রস্তুত করিয়া ফেলিলেন। খলীফা-রমণী যত্নে সেই পোষাক কঙ্কাবতীকে পরাইয়া দিলেন। রাজপরিচ্ছদ পরিধান করিয়া কঙ্কাবতীর রূপ ফাটিয়া পড়িতে লাগিল।

খলীফা-রমণী বলিলেন,–আহা! মরি কি রূপ!

খলীফা বলিলেন,–মরি কি রূপ!

সকলেই বলিলেন,–মরি কি রূপ!

রাজ-পরিচ্ছদ পরা হইলে কাঁকড়া ও কচ্ছপ, কঙ্কাবতীকে লইয়া পুনরায় গৃহাভিমুখে চলিলেন। অনেক স্থল অতিক্রম করিয়া তিন জনে পুনরায় নদীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করিলেন। সেখানে উপস্থিত হইলে কঙ্কাবতীর মনোহর রূপ মনোহর পরিচ্ছদ দেখিয়া সকলেই চমৎকৃত হইল। সকলেই ধন্য-ধন্য করিতে লাগিল। সকলেই বলিল,–আমাদের পরম সৌভাগ্য যে, আমরা কঙ্কাবতী হেন রাণী পাইলাম।

এক্ষণে একটি মহা ভাবনার বিষয় উপস্থিত হইল। জলচর জীবগণের এখন এই ভাবনা হইল যে, রাণী থাকেন কোথায়? যে সে রাণী নয়, কঙ্কাবতী রাণী! যেরূপ জগৎসুশোভিনী মনোমমাহিনী কঙ্কাবতী রাণী, সেইরূপ সুসজ্জিত, অলঙ্কৃত, মনোমাহিত অট্টালিকা চাই। অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া অবশেষে সকলে স্থির করিলেন যে, রাণী কঙ্কাবতীর নিমিত্ত মতিমহলই উপযুক্ত স্থান। যাহাকে মতি বলে, তাঁহাকেই মুক্তা বলে। মুক্তার যথায় উৎপত্তি মুক্তার যথায় স্থিতি, সেই স্থানকে মতিমহল বলে।

রুই প্রভৃতি মৎস্যগণ বোড়হাত করিয়া কঙ্কাবতীকে বলিলেন,—রাণীধিরাণী মহারাণী। মতিমহল আপনার বাসের উপযুক্ত স্থান, আপনি ঐ মতিমহলে গিয়া বাস করুন।

এইরূপে সসম্রমে সম্ভাষণ করিয়া মাছেরা কঙ্কাবতীকে একটি ঝিনুক দেখাইয়া দিল। ঝিনুকের ভিতরে মুক্তা হয় বলিয়া ঝিনুকের নাম মতিমহল। কঙ্কাবতী সেই ঝিনুকের ভিতর প্রবেশ করিলেন। ঝিনুকের ভিতর বাস করিয়া কঙ্কাবতী মাছেদের রাণীগিরি করিতে লাগিলেন।

 

চতুর্থ পরিচ্ছেদ–গোয়ালিনী

এইরূপ কিছুদিন যায়। এখন, এক দিন এক গোয়ালিনী নদীতে স্নান করিতে আসিয়াছিল। স্নান করিতে করিতে তাঁহার পায়ে সেই ঝিনুটি ঠেকিল। ড়ুব দিয়া সে সেই ঝিনুকটি তুলিল। দেখিল যে, চমৎকার ঝিনুক। ঝিনুকটি সে বাড়ী লইয়া গেল;

আর আপনার চালের বাতায় গুঁজিয়া রাখিল।

বাহিরের দ্বারে কুলুপ দিয়া গোয়ালিনী প্রতিদিন লোকের বাড়ী দুধ দিতে যায়। কঙ্কাবতী সেই সময় ঝিনুকের ভিতর হইতে বাহির হন। প্রথম দিন ঝিনুকের ভিতর হইতে বাহির হইয়া যেমন তিনি মাটীতে পা দিলেন, তাঁহার রাজবেশ গিয়া একেবারে পুৰ্ব্ববৎ বেশ হইল। কঙ্কাবতী তাহা দেখিয়া বড়ই আশ্চর্য্য হইলেন। প্রতিদিন ঝিনুকের ভিতর হইতে বাহির হইয়া কঙ্কাবতী, গোয়ালিনীর সমুদয় কাজ-কর্ম সারিয়া রাখেন। ঘর-দ্বার পরিষ্কার করেন, বাসন-কোষণ মাজেন, ভাত ব্যঞ্জন রাঁধেন, আপনি খান আর গোয়ালিনীর জন্য ভাত বাড়িয়া রাখেন।

বাড়ী আসিয়া, সেই সব দেখিয়া, গোয়ালিনী বড়ই আশ্চর্য্য হয়। গোয়ালিনী মনে করে,—এমন করিয়া আমার সমুদয় কাজকর্ম কে করে দ্বারে যেরূপ চাবি দিয়া যাই সেইরূপ চাবি দেওয়াই থাকে। বাহির হইতে বাড়ীর ভিতর কেই আসে নাই। তবে এসব কাজকর্ম করে কে?

ভাবিয়া চিন্তিয়া গোয়ালিনী কিছুই স্থির করিতে পারে না। এইরূপ প্রতিদিন হইতে লাগিল। অবশেষে গোয়ালিনী ভাবিল,–আমাকে ধরিতে হইবে। প্রতিদিন যে আমার কাজ কৰ্ম্ম সারিয়া রাখে, তারে ধরিতে হইবে!

এইরূপ মনে মনে স্থির করিয়া, গোয়ালিনী তার পর দিন সকাল সকাল বাটী ফিরিয়া আসিল। নিঃশব্দে, অতি ধীরে ধীরে দ্বারটি খুলিয়া দেখে যে, বাটীর ভিতর এক পরমা সুন্দরী বালিকা বসিয়া বাসন মাজিতেছে।

গোয়ালিনীকে দেখিয়া তাড়াতাড়ি কঙ্কাবতী যেই ঝিনুকের ভিতর লুকাইতে গেলেন, আর সে গিয়া তৎক্ষণাৎ তাঁহাকে ধরিয়া ফেলিল। ধরিয়া দেখে না কঙ্কাবতী।।

আশ্চৰ্য্য হইয়া গোয়ালিনী জিজ্ঞাসা করিল,—কঙ্কাবতী! তুমি এখানে? তুমি এখানে কি করিয়া আসিলে? তুমি না নদীর জলে ড়ুবিয়া গিয়াছিলে?

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,—হাঁ মাসি! আমি কঙ্কাবতী। আমি নদীর জলে ড়ুবিয়া গিয়াছিলাম। নদীতে আমি ঐ ঝিনুকের ভিতর ছিলাম। ঝিনুকটি আনিয়া তুমি চালের বাতায় রাখিয়াছ। তাই মাসি! আমি তোমার বাড়ী আসিয়াছি।

গোয়ালিনী এখন সকল কথা বুঝিল। আশ্চর্য্য হইবার আর কোনও কারণ রহিল না।

কঙ্কাবতী পুনরায় বলিলেন,—মাসি! আমি যে এখানে আছি, সে কথা এখন তুমি আমার বাড়ীতে বলিও না! শুধু হাতে বাড়ী যাইলে বাবা হয় তো বকিবেন। জলের ভিতর আমি অনেক টাকা দেখিয়াছি। তাঁহারা দরজীকে দিল, কিন্তু আমাকে দিল না। আমি কত কাঁদিলাম, তবুও তাঁহারা আমাকে দিল না। দেখি, যদি তাঁহারা আমাকে কিছু দেয়, তাহা হইলে বাবাকে দিব, বাবা তাহা হইলে বকিবেন না, দাদা গালি দিবেন না।

গোয়ালিনী বলিল,–বাছা রে আমার। জনার্দ্দন চৌধুরীকে এই সোনার বাছা বেচিতে চায়! পোড়ার মুখো বাপ। রও, এইবার দেখা হইলে হয়! গালি দিয়া ভূত ছাড়াইব!

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,—না মাসি, বাবাকে গালি দিও না। জান তো, মাসি? বাবা দুঃখী মানুষ! ঘরে অনেকগুলি খাইতে। আমাকে না বেচিলে, বাবা, সংসার প্রতিপালন কি করিয়া করিবেন?–এইরূপ কথা বাত্তার পর স্থির হইল যে, কঙ্কাবতী এখন কিছুদিন গোয়ালিনীর ঘরে থাকিবেন। কঙ্কাবতী বলিলেন,—মাসি! প্রতিদিন তুমি পাড়ার যাও। গ্রামে যে দিন যে ঘটনা হয়, আমাকে আসিয়া বলিও।

গোয়ালিনীর ঘরে কঙ্কাবতী বাস করিতে লাগিলেন। গ্রামে যে দিন যেখানে যাহা হয়, গোয়ালিনী আসিয়া তাঁহাকে বলে। এক দিন গোয়ালিনী আসিয়া বলিল,–আহা! খেতুর মার বড় অসুখ! খেতুর মা এবার বাঁচেন কি না!

অতি কাতরভাবে, কাঁদ কাঁদ হইয়া, কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,—কি হইয়াছে, মাসি? তাঁর কি হইয়াছে?

গোয়ালিনী উত্তর করিল,—শুনিলাম, তাঁহার জুব-বিকার হইয়াছে। খেতু বৈদ্য ডাকিতে গিয়াছিলেন, কিন্তু বৈদ্য আসেন নাই। বৈদ্য বলিয়াছেন,—তোমার বাটীতে চিকিৎসা করিতে গিয়া, শেষে জাতিটি হারাইব না কি?

কঙ্কাবতী বলিলেন,–মাসি! তিনি আমাকে বড় ভালবাসেন। আমার আপনার মা যেরূপ, তিনিও আমার সেইরূপ। তাঁর অসময়ে আমি কিছু করিতে পারিলাম না, সে জন্য বড় দুঃখ মনে রহিল।–এই বলিয়া কঙ্কাবতী কাঁদিতে লাগিলেন।

তাহার পরদিন অতি প্রত্যুষে কঙ্কাবতী বলিলেন,—মাসি! আজ একটু সকাল সকাল তুমি পাড়ায় যাও। শীঘ্র ফিরিয়া আসিয়া আমাকে বল, তিনি কেমন আছেন।

গোয়ালিনী সকাল সকাল পাড়ায় যাইল, সকাল সকাল ফিরিয়া আসিয়া, কঙ্কাবতীকে বলিল,–আহা! বড় দুঃখের কথা! খেতুর মা নাই। খেতুর মা মারা গিয়াছেন। মাকে ঘাটে লইয়া যাইবার নিমিত্ত, খেতু দ্বার দ্বার ঘুরিতেছেন, কিন্তু কেহই আসিতেছে না। সকলেই বলিতেছে,—তুমি বরখ খাইয়াছ, তোমার জাতি গিয়াছে; তোমার মাকে ঘাটে লইয়া যাইলে আমাদের জাতি যাইবে। ষাঁড়েশ্বর চক্রবর্তী, গোবর্ধন শিরোমণি, আর কঙ্কাবতী! তোমার বাপ এই তিনজনে সকলকে মানা, করিয়া বেড়াইতেছেন, যেন কেহ না যায়।

এই সংবাদ শুনিয়া কঙ্কাবতী একেবারে শুইয়া পড়িলেন। অবিশ্রান্ত কাঁদিতে লাগিলেন। গোয়ালিনী তাঁহাকে কত বুঝাইল। গোয়ালিনী কত বলিল,–কঙ্কাবতী! চুপ কর। কঙ্কাবতী! উঠ, খাও। কঙ্কাবতী উঠিলেন না, সে দিন রাঁধিলেন না, খাইলেন না। মাটীতে পড়িয়া কেবল কাঁদিতে লাগিলেন।।

সন্ধ্যা বেলা কঙ্কাবতী বলিলেন,—মাসি! তুমি একবার পাড়ায় যাও। দেখ গিয়া সেখানে কি হইতেছে। শীঘ্র আসিয়া আমাকে বল।

গোয়ালিনী পুনরায় পাড়ায় যাইল। একটু রাত্রি হইল, তবুও গোয়ালিনী ফিরিল না। একপ্রহর রাত্রি হইল, তবুও গোয়ালিনী ফিরিল না। মাটিতে শুইয়া পথ পানে চাহিয়া, কঙ্কাবতী কেবল কাঁদিতে লাগিলেন।

এক প্রহর রাত্রির পর গোয়ালিনী ফিরিয়া আসিল।

গোয়ালিনী বলিল,–কঙ্কাবতী! বড়ই দুঃখের কথা শুনিয়া আসিলাম। খেতুর মাকে লইয়া যাইবার নিমিত্ত কেহই আসেন নাই। খেতু করেন কি? সন্ধ্যা হইলে কাঠ আলনি মাথায় করিয়া প্রথম ঘাটে রাখিয়া আসিলেন! আছা! একেবারে অতগুলি কাঠ লইয়া যাইতে পারিবেন কেন? তিন বার কাঠ লইয়া তাঁকে ঘাটে যাইতে হইয়াছে। এখন তিনি মাকে ঘাটে লইয়া যাইতেছেন। একেলা আপনি কোলে করিয়া মাকে লইয়া যাইতেছেন। মরিলে তোক ভারি হয়। তাতে শ্মশান ঘাট তো আর কম দূর নয়! খানিক দূর লইয়া যান, তারপর আর পারেন না মাকে মাটীতে শয়ন করান, একটু বিশ্রাম করিয়া পুনরায় লইয়া যান, এইরূপ করিয়া তিনি এখন মাকে ঘাটে লইয়া যাইতেছেন। অন্ধকার রাত্রি। একটু দূরে দূরে থাকি। আমি এই সব দেখিয়া আসিলাম।

এই কথা শুনিয়া কিয়ৎক্ষণের নিমিত্ত কঙ্কাবতী বসিয়া ভাবিতে লাগিলেন, তাহার পর ধীরে ধীরে উঠিলেন, ধীরে ধীরে গিয়া বাটার দ্বারটি খুলিলেন, বাটীর বাহিরে যাইয়া উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়িলেন।

গোয়ালিনী বলিল,–কঙ্কাবতী কোথায় যাও? কঙ্কাবতী, কোথায় যাও?

আর কোথায় যাও! আজ কঙ্কাবতী রাণীধিরাণী, মহারাণী নন—আজ কঙ্কাবতী পাগলিনী। মনোহর রাজবেশে আজ কঙ্কাবতী সুসজ্জিত নন, আজ কঙ্কাবতী গোয়ালিনীর একখানি সামান্য মলিন বসনপরিধৃতা। কঙ্কাবতীর মুখ আজ উজ্জ্বল প্রভাবসম্পন্ন নয়আজ কঙ্কাবতীর মুখ ঘনঘটায় আচ্ছাদিত।–বাটীর বাহির হইয়া, মলিন বেশে, আলুলায়িত কেশে, পাগলিনী সেই শ্মশানের দিকে ছুটিলেন। কঙ্কাবতী শুন, কঙ্কাবতী শুনা এই কথা বলিতে বলিতে কিয়দ্র গোয়ালিনী তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইল। কিন্তু কঙ্কাবতী তাঁহার কথায় কর্ণপাত করিলেন না, একবার ফিরিয়া দেখিলেন না।

রাহুগ্রস্ত পূর্ণশশী অবিলম্বেই নিশার তমোরাশিতে মিশিয়া যাইল। গোয়ালিনী আর তাঁহাকে দেখিতে পাইল না। কাঁদিতে কাঁদিতে গোয়ালিনী বাড়ী ফিরিয়া আসিল।

 

পঞ্চম পরিচ্ছেদ–শ্মশান

দিক্‌বিদিক্ জ্ঞানশূন্য হইয়া, পাগলিনী এখন শ্মশানের দিকে দৌড়িলেন। কিছুদূর যাইয়া দেখিতে পাইলেন, পথে খেতু মাতাকে রাখিয়াছেন, মার মস্তকটি আপনার কোলে লইয়াছেন; মার কাছে বসিয়া মার মুখ দেখিতেছেন আর কাঁদিতেছেন। অবিরলধারায় অশ্রুবারি তাঁহার নয়নদ্বয় হইতে বিগলিত হইতেছে।

কঙ্কাবতী নিঃশব্দে তাঁহার নিকটে গিয়া দাঁড়াইলেন। অন্ধকার রাত্রি, সেই জন্য খেতু তাঁহাকে দেখিতে পাইলেন না।

মার মুখপানে চাহিয়া খেতু বলিলেন,–মা! তুমিও চলিলে? যখন কঞ্চাবতী গেল, তখন-মনে করিয়াছিলাম, এ ছার জীবন আর রাখিব না। কেবল, মা, তোমার মুখ পানে চাহিয়া বাঁচিয়া ছিলাম। এখন, মা, তুমিও গেলে? তবে আর আমার এ প্রাণে কাজ কি? কিসের জন্য কার জন্য বাঁচিয়া থাকিব? এ সংসারে থাকা কিছু নয়। এখানে বড় পাপ, বড় দুঃখ? বেশ করিয়াছ, কঙ্কাবতী, এখান হইতে গিয়াছ। বেশ করিলে, মা! যে, এ পাপ সংসার হইতে তুমিও চলিলে! চল, মা! যেখানে কঙ্কাবতী, যেখানে তুমি, সেইখানে আমিও শীঘ্র যাইব। এই সসাগরা পৃথিবী আজ আমার পক্ষে শ্মশান ভূমি হইল। এ সংসারে আর আমার কেহ নাই। চল, মা, শীঘ্রই।

তোমাদিগের নিকট গিয়া প্রাণের এ দারুণ জ্বালা জুড়াইব। মা! কঙ্কাবতীকে বলিও, শীঘ্রই গিয়া আমি তাঁহার সহিত মিলিব। কঙ্কাবতী আসিয়া অধোমুখে খেতুর সম্মুখে দাঁড়াইলেন। খেতু চমকিত হইলেন, অন্ধকারে চিনিতে পারিলেন না।

কঙ্কাবতী মার পায়ের নিকট গিয়া বসিলেন। মার পা দুখানি আপনার কোলের উপর তুলিয়া লইলেন। সেই পায়ের উপর আপনার মাথা রাখিয়া নীরবে কাঁদিতে লাগিলেন। ঘোরতর বিস্মিত হইয়া, অনেকক্ষণ ধরিয়া, খেতু তাঁহার মুখপানে চাহিয়া রহিলেন।

অবশেষে খেতু বলিলেন,–কঙ্কাবতী! জ্ঞান হইয়া পৰ্য্যন্ত এ পৃথিবীতে কখনও কাহারও অনিষ্ট-চিন্তা করি নাই, সৰ্ব্বদা সকলের ইষ্টচিন্তাই করিয়াছি। জানিয়া শুনিয়া কখনও মিথ্যা কথা বলি নাই, প্রবঞ্চনা কখনও করি নাই, কোনওরূপ দুষ্কর্ম কখনও করি নাই। তবে কি মহাপাপের জন্য আজ আমার এ ভীষণ দণ্ড আজ এ ঘোর নরক! বিনা দোষে কত দুঃখ পাইয়াছি, তাহা সহিয়াছি। গ্রামে লোকে বিধিমত উৎপীড়ন করিল, তাহাও সহিলাম, প্রাণের পুতমি তুমি কঙ্কাবতী জলে ড়ুবিয়া মরিলে, তাহাও সহিলাম; প্রাণের অধিক মা আমার আজ মরিলেন, তাহাও সহিলাম; কিন্তু এই সঙ্কট সময়ে তুমি যে আমার শত্রুতা সাধিবে, স্বপ্নেও তাহা কখনও ভাবি নাই! মাতার মৃতদেহ একেলা আমি আর বহিতে পারিতেছি না। মাতার পীড়ার জন্য আজ তিন দিন আমার আহার নাই, নিদ্ৰা নাই। আজ তিন দিন এক বিন্দু জল পৰ্য্যন্ত আমি খাই নাই। শরীরে আমার শক্তি নাই, শরীর আমার অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছে। আর একটি পা-ও আমি মাকে লইয়া যাইতে পারিতেছি না। কি করি, ভাবিয়া আকুল হইয়াছি। এমন সময়ে কি না, তুমি কঙ্কাবতী, ভূত হইয়া আমাকে ভয় দেখাইতে আসিলে! দুঃখের এইবার আমার চারি পো হইল! এ দুঃখ আমি আর সহিতে পারি না।

কাঁদ কাঁদ স্বরে অধোমুখে, কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,—আমি ভূত হই নাই, আমি মরি নাই, আমি জীবিত আছি।

আশ্চৰ্য্য হইয়া ঋেতু জিজ্ঞাসা করিলেন,–তুমি জীবিত আছ? জলে ড়ুবিয়া গেলে, তোমায় আমরা কত অনুসন্ধান করিলাম। তোমাকে খুঁজিয়া পাইলাম না। মনে করিলাম, আমিও মরি। মরিবার নিমিত্ত জলে ঝাঁপ দিলাম। সাঁতার জানিয়াও দৃঢ়চ্ছতিজ্ঞ হইয়া জলের ভিতর রহিলাম, কিছুতেই উঠিলাম না। তাহার পর জ্ঞানশূন্য হইয়া পড়িলাম। অজ্ঞান অবস্থায় জেলেরা আমাকে তুলিল, তাঁহারা আমাকে বাঁচাইল। জ্ঞান হইয়া দেখিলাম, মা আমার কাঁদিতেছেন। মার মুখপানে চাহিয়া প্রাণ ধরিয়া রহিলাম। কঙ্কাবতী, তুমি কি করিয়া বাঁচিলে?

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,–সে অনেক কথা। সকল কথা পরে বলিব। আমি গোয়ালিনী মাসীর বাটীতে ছিলাম। এই ঘোর বিপদের কথা সেইখানে শুনিলাম। আমি থাকিতে পারিলাম না, আমি ছুটিয়া আসিলাম। এক্ষণে চল, মাতাকে ঘাটে লইয়া যাই। তুমি একদিক্‌ ধর, আমি একদিক্‌ ধরি।–এই প্রকারে কঙ্কাবতী ও খেতু মাকে ঘাটে লইয়া যাইলেন। সেখানে গিয়া দুই জনে চিতা সাজাইলেন। মাকে উত্তমরূপে স্নান করাইলেন। নুতন কাপড় পরাইলেন। তাহার পর চিতার উপর তুলিলেন। চিতার উপর তুলিয়া দুইজনে মায়ের পা ধরিয়া অনেকক্ষণ কাঁদিলেন।

খেতু বলিলেন,—মা! তুমি স্বর্গে চলিলে। দীনহীন তোমার এই পুত্রকে আশীর্বাদ কর, ধর্ম্মপৰ্থ হইতে যেন কখনও বিচলিত না হই। সত্য যেন আমার ধ্যান, সত্য যেন আমার জ্ঞান, সত্য যেন আমার ক্রিয়া হয়। ধনলালসায়, কি সুখ-লালসায়, কি যশোলালসায় যেন সত্যপথ, ধৰ্ম্মপথ কখনও পরিত্যাগ না করি। অজ্ঞান কপটচারী জনসমাজের একুটি-ভঙ্গিমায় ভীরু নরাধমদিগের মত কম্পিত হইয়া, যেন কৰ্ত্তব্যে কখনও পরাঙমুখ না হই। হে মা! প্রাণ যায় যাউক! পুরুষ হইয়া যেন কখনও কাপুরুষ না হই।

কঙ্কাবতী বলিলেন,—মা! তুমি স্বর্গে চলিলে, তোমার এই অনাথিনী কঙ্কাবতীর প্রতি একবার কৃপাদৃষ্টি কর। জাগরণে, শয়নে, স্বপনে, মা যেন ধৰ্ম্মে আমার মতি হয়, যেন ধর্মে আমার গতি হয়। অধিক আর, মা তোমাকে কি বলিব! কঙ্কাবতীর মনের কথা তুমি সকলি জান। কঙ্কাবতীর প্রাণ রক্ষা হউক না হউক, কঙ্কাবতীর ধর্ম্ম রক্ষা হইবে। যদি এ-দিকের সূৰ্য্য ও-দিকে উদয় হন, যদি মহাপলয় উপস্থিত হয়, তবুও কঙ্কাবতী যদি সতী হয়, কঙ্কাবতীকে কেহ ধৰ্ম্মচ্যুত করিতে পারিবে না। মনে মনে চিরকাল এই প্রতিজ্ঞা রহিয়াছে, আজ আবার, মা, তোমার পা ছুঁইয়া মুখ ফুটিয়া সেই প্রতিজ্ঞা করিলাম। হে মা! তোমার কঙ্কাবতী এখন পাগলিনী, তোমার কঙ্কাবতীর অপরাধ ক্ষমা কর।

খেতু বলিলেন,—কঙ্কাবতী! কি করিয়া চিতায় আগুন দিই? জনমের মত কি করিয়া মাকে বিদায় করি! আর মাকে দেখিতে পাইব না। এস কঙ্কাবতী! ভাল করিয়া আর একবার মার মুখখানি দেখিয়া লই!

মুখের নিকট দাঁড়াইয়া, অনেকক্ষণ ধরিয়া খেতু মার চুলগুলি নাড়িতে লাগিলেন। কঙ্কাবতী পাশে দাঁড়াইয়া কেবল কাঁদিতে লাগিলেন।

খেতু বলিলেন,—দেখ কঙ্কাবতী! কি স্থির শান্তিময়ী মুখশ্রী! মা যেন পরম সুখে নিদ্রা যাইতেছেন। তোমার কি মনে পড়ে, কঙ্কাবতী! ছেলে বেলা যখন তুমি বিড়াল লইয়া খেলা করিতে? প্রথম ভাগ বর্ণপরিচয় যখন তুমি পড়িতে পারিতে না? আমি তোমাকে কত বকিতাম, আর মা আমার উপর রাগ করিতেন। মা আমাকে যেরূপ ভালবাসিতেন, সেই রূপ তোমাকে ভালবাসিতেন। আহা! কঙ্কাবতী! কি মা আমরা হারাইলাম!

এই প্রকারে নানারূপ খেদ করিয়া, অবশেষে চিতা প্রদক্ষিণ করিয়া, খেতু অগ্নিকাৰ্য্য করিলেন। চিতা ধূধু করিয়া জ্বলিতে লাগিল।

কঙ্কাবতী ও খেতু নিকটে বসিয়া মাঝে মাঝে কাঁদেন, মাঝে মাঝে খেদ করেন, আর মাঝে মাঝে অন্যান্য কথাবার্তা কন। কি করিয়া জল হইতে রক্ষা পাইয়াছেন, কঙ্কাবতী সেই সমুদয় কথা খেতুকে বলিলেন। খেতু মনে করিলেন, নানা দুঃখে কঙ্কাবতীর চিত্ত বিকৃত হইয়াছে। দুঃখের উপর দুঃখ, এ আবার এক নুতন দুঃখ তাঁহার মনে উপস্থিত হইল। মনের কথা খেতু কিন্তু কিছু প্রকাশ করিলেন না।

মার সৎকার হইয়া যাইলে, দুই জনে নদীনে স্নান করিলেন।

তাহার পর খেতু বলিলেন,—কঙ্কাবতী! চল, তোমাকে বাড়ীতে রাখিয়া আসি।

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,—পুনরায় আমি কি করিয়া বাড়ী যাই? বাবা আমাকে তিরস্কার করিবেন, দাদা আমাকে গালি দিবেন! আমি জলের ভিতর গিয়া মাছেদের কাছে থাকি, না হয়, গোয়ালিনী মাসীর ঘরে যাই।

খেতু বলিলেন,–কঙ্কাবতী! সে কাজ করিতে নাই। তোমাকে বাড়ী যাইতে হইবে। যতই কেন দুঃখ পাও না, ঘরে থাকিয়া সহ্য করিতে হইবে। মনোেযোগ করিয়া আমার কথা শুন! আর এখন বালিকার মত কথা কহিলে চলিবে না। ভীষণ মহাসাগরবক্ষে উন্মত্ত তরঙ্গ–তাড়িত জীর্ণ-দেহ সামান্য দুইখানি তরণীর ন্যায়, আমরা দুই জনে এই সংসার কর্তৃক তাড়িত হইতেছি। তাই কঙ্কাবতী! বুদ্ধি বিবেচনার সহিত আমাদের কথা বলিতে হইবে, বুদ্ধি বিবেচনার সহিত আমাদের কাজ করিতে হইবে। মাতার পদযুগল ধরিয়া আজ রাত্রিতে যেরূপ ধীর জ্ঞান গম্ভীর বাক্য তোমার মুখ হইতে নিঃসৃত হইয়াছিল এখন হইতে সেইরূপ কথা আমি তোমার মুখে শুনিতে চাই। ভাবী ঘটনার উপর মনুষ্যদিগের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব না থাকুক, অনেক পরিমাণে আছে। তা না হইলে ভাবী ফলের প্রতীক্ষায় কৃষক কেন ক্ষেত্রে কৰ্ম্ম বীজ বপন করিবে? উদ্যম উৎসাহের সহিত মনুষ্য এই সংসারক্ষেত্রে কৰ্ম্ম-বীজ কেন রোপন করিবে? মনুষ্যের অজ্ঞানবশতঃ ভাবী ঘটনার উপর কর্তৃত্বের ইতর-বিশেষ হইয়া থাকে। এই ভাবী ফলপ্রতিক্ষাই মনুষ্যের আশা ভরসা। সেই আসা ভরসাকে সহায় করিয়া আজ আমি তোমার নিকট হইতে বিদায় হইতেছি। তুমি বাড়ী চল, তোমাকে বাড়ীতে রাখিয়া আসি। বাটীর বাহিরে তুমি পা রাখিয়াছ বলিয়া জনার্দ্দন চৌধুরী আর তোমাকে বিবাহ করিবেন না। লাঞ্ছনা করেন এক বৎসর কাল পৰ্য্যন্ত সহ্য করিয়া থাক, শুনিয়াছি পশ্চিম অঞ্চলে অধিক বেতনে কর্ম পাওয়া যায়। আমি এক্ষণে পশ্চিমে চলিলাম। কাশীতে মাতার শ্রাদ্ধাদি ক্রিয়া সমাধা করিয়া, কর্মের অনুসন্ধান করিব। এক বৎসরের মধ্যে যাহা কিছু অর্থসঞ্চয় করিতে পারি, তাহা অনিয়া তোমার পিতাকে দিব। আমি নিশ্চয় বলিতেছি, তখন তোমার পিতা আহাদের সহিত আমার প্রার্থনা পরিপূর্ণ করিবেন। কেবল এক বৎসর কঙ্কাবতী! দেখিতে দেখিতে যাইবে। দুঃখে হউক, সুখে হউক ঘরে থাকিয়া, কোনও রূপে এই এক বৎসর কাল অতিবাহিত কর।

তখন কঙ্কাবতী বলিলেন,–তুমি আমাকে যেরূপ আজ্ঞা করিবে, আমি সেইরূপ করিব। —দুই জনে ধীরে ধীরে গ্রামাভিমুখে চলিলেন। রাত্রি সম্পূর্ণ প্রভাত হয় নাই, এমন সময় দুই জনে তনু রায়ের দ্বারে গিয়া উপস্থিত হইলেন।।

খেতু বলিলেন,–কঙ্কাবতী! তবে এখন আমি যাই। সাবধানে থাকিবে।

যাই যাই করিয়াও খেতু যাইতে পারেন না। যাইতে খেতুর পা সরে না। দুই জনের চক্ষুর জলে তনু রায়ের দ্বার ভিজিয়া গেল।

একবার সাহসে ভর করিয়া খেতু কিছুদুর যাইলেন, কিন্তু ফিরিয়া আসিলেন, আর বলিলেন,–কঙ্কাবতী! একটি কথা তোমাকে ভাল করিয়া বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি। কথাটি এই যে, অতি সাবধানে থাকিও।

আবার কিছুক্ষণ ধরিয়া দুইজনে কথা কহিতে লাগিলেন। ক্রমে প্রভাত হইল, চারি দিকে লোকের সাড়া শব্দ হইতে লাগিল।

তখন খেতু বলিলেন,–কঙ্কাবতী! এইবার অতি নিশ্চয় যাই। অতি সাবধানে থাকিবে। কাঁদিও কাটিও না। যদি বাঁচিয়া থাকি, তো এক বৎসর পরে নিশ্চয় আমি আসিব। তখন আমাদের সকল দুঃখ ঘুচিবে! তোমার মাকে সকল কথা বলিও অন্য কাহাকেও কিছু বলিবার আবশ্যক নাই।

খেতু এইবার চলিয়া গেলেন। যতদূর দেখা যাইল, ততদূর কঙ্কাবতী সেই দিক্ পানে একদৃষ্টে চাহিয়া রহিলেন। তাহার পর, চক্ষুর জলে তিনি পৃথিবী অন্ধকারময় দেখিতে লাগিলেন। জ্ঞানশূন্য হইয়া ভূতলে পতিত হইবার ভয়ে, দ্বারের পাশে প্রাচীরে তিনি ঠেশ দিয়া দাঁড়াইলেন। খেতু ফিরিয়া দেখিলেন যে, চিত্রপুত্তলিকার ন্যায় কঙ্কাবতী দাঁড়াইয়া আছেন! তাহার পর আর দেখিতে পাইলেন না।

খেত ভাবিলেন,—হা জগদ্বীশ্বর! মনুষ্য হৃদয় তুমি কি পাষাণ দিয়াই নির্মাণ করিয়াছে! সে ঐ প্রভাবহীনা মলিনা কাঞ্চন-প্রতিমাকে ওখানে ছাড়িয়া এখানে আমার হৃদয় এখনও চূর্ণ বিচূর্ণ হয় নাই।

 

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ–বাঘ

খেতু চলিয়া যাইলে, দ্বারের পাশে প্রাচীরে ঠেশ দিয়া, অনেকক্ষণ ধরিয়া কঙ্কাবতী কাঁদিতে লাগিলেন। অনেকক্ষণ পর্যন্ত দ্বার ঠেলিতে তাঁহার সাহস হইল না। অবশেষে সাহসে বুক বাঁধিয়া আস্তে আস্তে তিনি দ্বার ঠেলিতে লাগিলেন।

শয্যা হইতে উঠিয়া বাটীর ভিতর বসিয়া তনু রায় তামাক খাইতেছিলেন। কে দ্বার ঠেলিতেছে দেখিবার নিমিত্ত তিনি দ্বার খুলিলেন। দেখিলেন, কঙ্কাবতী!

কঙ্কাবতীকে দেখিয়া তিনি বলিলেন,–এ কি? কঙ্কাবতী যে! তুমি মর নাই তাই বলি তোমার কি আর মৃত্যু আছে। এতদিন কোথায় ছিলে? আজ কোথা হইতে আসিলে? এতদিন যেখানে ছিলে, পুনরায় সেইখানে যাও। আমার ঘরে তোমার আর স্থান হইবে না।

কঙ্কাবতী বাটীর ভিতর প্রবেশ করিলেন না! সেই মলিন আবপরিহিতা থাকিয়া দ্বারের পাশে দাঁড়াইয়া কেবল কাঁদিতে লাগিলেন। পিতার কথায় কোনও উত্তর করিলেন। পিতার তর্জন-গর্জনের শব্দ পাইয়া পুত্রও সত্বর সেইখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন।

ভাই বলিলেন,–এই যে, পাপীয়সী কালামুখ নিয়ে ফের এখানে এসেছেন! যাবেন আর কোন্ চুলল! কিন্তু তা হবে না—এ বাড়ী হইতে তোমার অন্ন উঠিয়াছে। এখন আর মনে করিও না যে, জনার্দ্দন চৌধুরী তোমাকে বিবাহ করিবে! বাধা! পাড়ার লোক জানিতে

জানিতে কুলাঙ্গারী পাপীয়সীকে দূর করিয়া দাও।

বচসা শুনিয়া কঙ্কাবতীর দুই ভগিনী বাহিরে আসিলেন। অবশেষে মাও আসিলেন। মা দেখিলেন দুঃখিনী কঙ্কাবতী দীন দরিদ্র মলিন বেশে দ্বারের পাশে দাঁড়াইয়া কাঁদিতেছেন। স্বামী ও পুত্র তাঁহাকে বিধিমতে ভৎসনা করিয়া তাড়াইয়া দিতেছেন।

কঙ্কাবতীর মা কাহাকেও কিছু বলিলেন না স্বামী কি পুত্র কাহারও পানে একবার চাহিলেন না। কঙ্কাবতীর বক্ষঃস্থল একবার আপনার বক্ষঃস্থলে রাখিয়া গদগদ মৃদু ভাষে বলিলেন,–এস, আমার মা এস! দুঃখিনী মাকে ভুলিয়া এতদিন কোথা ছিলে মা?

মার বুকে মাথা রাখিয়া কঙ্কাবতীর প্রাণ জুড়াইল। অন্তরে অন্তরে যে খরতর অগ্নি তাঁহাকে দহন করিতেছিল, সে অগ্নি এখন অনেকটা নিবাণ হইল।

তাহার পর, মা, কঙ্কীবতীর একটি হাত ধরিলেন! অপর হাত দিয়া আর একটি মেয়ের হাত ধরিলেন। স্বামী ও পুত্রকে তখন সম্বোধন করিয়া বলিলেন,—তোমরা কঙ্কাবতীকে দূর করিয়া দিবে? কঙ্কাবতীকে ঘরে স্থান দিবে না? বটে! এ দুধের বাছা কি যেন দুষ্কৰ্ম্ম করিয়াছে যে, মা বাপের কাছে ইহা প্রদান হইবে না? মান সম্রম পুণ্য ধৰ্ম্ম লইয়া তোমরা এখানে সুখে স্বচ্ছন্দে থাক। আমরা চারি জন হতভাগিনী এখান হইতে বিদায় হই। এস, মা, আমরা সকলে এখান হইতে যাই। দ্বারে দ্বারে আমরা মুষ্টি ভিক্ষা করিয়া খাইব তবু এই মুনি-ঋষিদের অন্ন আর খাইব না!

তিন কন্যা ও মাতা, সত্য সত্যই বাটী হইতে প্রস্থান করিবার উপক্রম করিলেন। তখন তনু রায়ের মনে ভয় হইল।

তনু রায় বলিলেন,—গৃহিণী! কর কি! তুমিও যে পাগল হইলে দেখিতেছি? এখন এ মেয়ে লইয়া আমি করি কি? এ মেয়ের কি আর বিবাহ হইবে? সেই জন্য বলি ওর যেখানে দুই চক্ষু যায় সেইখানে ও যাক্ ওর কথায় আর আমাদের থাকিয়া কাজ নাই।

তনু রায়ের স্ত্রী বলিলেন,–কঙ্কাবতীর বিবাহ হইবে না? আচ্ছা সে ভাবনা তোমার ভাবিয়া কাজ নাই। সে ভাবনা আমি ভাবিব। কিন্তু তোমার তো প্রকৃত সে চিন্তা নয়? তোমার চিন্তা যে জনার্দ্দন চৌধুরীর টাকাগুলি হাতছাড়া হইল। যাহা হউক, তোমার গলগ্রহ হইয়া আমরা থাকিব না। যেখানে আমাদের দুচক্ষু যায়, আমরা চারিজনে সেইখানে যাইব। মেয়ে তিনটির হাত ধরিয়া দ্বারে দ্বারে আমি ভিক্ষা করিব।

স্ত্রীর এইরূপ উগ্ৰ মূৰ্ত্তি দেখিয়া তনু রায় ভাবিলেন,–ঘোর বিপদ! নানারূপ মিষ্ট বচন বলিয়া স্ত্রীকে সান্ত্বনা করিতে লাগিলেন। স্ত্রীর অনেকটা রাগ পড়িয়া আসিলে শেষে তনু রায় বলিলেন,–দেখ! পাগলের মত কথা বলিও না। যাও, বাড়ীর ভিতর যাও। যাও, মা, কঙ্কাবতী বাড়ীর ভিতর যাও!

মা কঙ্কাবতী ও ভগিনী দুইটি বাটীর ভিতর যাইলেন। কঙ্কাবতী পুনরায় বাপ মার নিকট রহিলেন। বাটী পরিত্যাগ করিয়া যাহা যাহা ঘটনা হইয়াছিল, আদ্যোপান্ত সমুদয় কথা কঙ্কাবতী মাকে বলিলেন,–কঙ্কাবতীর মা, এ সমুদয় কথা অন্য কাহাকেও কিছু বলিলেন না।–কঙ্কাবতীকে তনু রায় সৰ্ব্বদাই গঞ্জনা দেন। কঙ্কাবতী সে কথায় কোনও উত্তর করেন না, আধোবদনে চুপ করিয়া শুনেন।

তনু রায় বলেন,—এমন রাজা হেন পাত্রের সহিত তোমার বিবাহ স্থির করিলাম। তোমার কপালে সুখ নাই তা আমি কি করিব? জনার্দ্দন চৌধুরীকে কত বুঝাইয়া বলিলাম, কিন্তু তিনি আর বিবাহ করিবেন না। এখন এ কন্যা লইয়া আমি করি কি? পঞ্চাশ টাকা দিয়াও কেহ এখন ইহাকে বিবাহ করিতে চায় না।

স্ত্রী-পুরুষে মাঝে মাঝে এই কথা লইয়া বিবাদ হয়। স্ত্রী বলেন,—কঙ্কাবতীর বিবাহের জন্য তোমাকে কোনও চিন্তা করিতে হইবে না। এক বৎসর কাল চুপ করিয়া থাক। কঙ্কাবতীর বিবাহ আমি নিজে দিব। যদি আমার কথা না শুন যদি অধিক বাড়াবাড়ি কর তাহা হইলে মেয়ে তিনটির হাত ধরিয়া তোমার বাটী হইতে চলিয়া যাইব।

তনু রায় বৃদ্ধ হইয়াছেন। স্ত্রীকে এখন তিনি ভয় করেন, এখন স্ত্রীকে যা ইচ্ছা তাই বলিতে বড় সাহস করেন না। এইরূপে দেখিতে দেখিতে এক বৎসর কাটিয়া গেল। খেতুর দেখা নাই, খেতুর কোনও সংবাদ নেই, কঙ্কাবতীর মুখ মবিন হইতে মলিনতর হইতে লাগিল, কঙ্কাবতীর মার মনে ঘোর চিন্তার উদয় হইল। কঙ্কাবতীর বিবাহ বিষয়ে স্বামী কোনও কথা বলিলে, এখন আর তিনি পূর্ব্বের ন্যায় দম্ভের সহিত উত্তর করিতে সাহস করেন না। বৎসর শেষ হইয়া যতই দিন গত হইতে লাগিল, তনু রায়ের তিরস্কার ততই বাড়িতে লাগিল। কঙ্কাবতীর মা অপ্রতিভ হইয়া থাকেন, বিশেষ কোনও উত্তর দিতে পারেন না।–এক দিন সন্ধ্যার পর তনু রায় বলিলেন,—এত বড় মেয়ে হইল, এখন এ মেয়ে লইয়া আমি করি কি? সুপাত্র ছাড়িয়া কুপাত্র মিলাও দুর্ঘট হইল।।

কঙ্কাবতীর মা উত্তর করিলেন,—আজ এক বৎসর অপেক্ষা করিলে, আর অল্প দিন অপেক্ষা কর। সুপাত্র শীঘ্রই মিলিবে।

তনু রায় বলিলেন,—এক বৎসর ধরিয়া তুমি এই কথা বলিতেছ। কোথা হইতে তোমার সুপাত্র আসিবে, তাহা বুঝিতে পারি না। তোমার কথা শুনিয়া আমি এই বিপদে পড়িলাম। সে দিন যদি কুলাঙ্গারীকে দূর করিয়া দিতাম, তাহা হইলে আজ আর আমাকে এ বিপদে পড়িতে হইত না। এখন দেখিতেছি, সে কালের রাজারা যা করিতেন, আমাকেও তাই করিতে হইবে। ব্রাহ্মণ না হয়, চণ্ডালের সহিত কন্যার বিবাহ দিতে হইবে। মনুষ্য না হয় জন্তুর সহিত কন্যার বিবাহ দিতে হইবে। রাগে আমার সর্ব্ব শরীর জুলিয়া যাইতেছে। আমি সত্য বলিতেছি, যদি এই মুহূর্তে বনের বাঘ আসিয়া কঙ্কাবতীকে বিবাহ করিতে চায়, তো আমি তাঁহার সহিত কঙ্কাবতীর বিবাহ দিই। যদি এই মুহূর্তে, বাঘ আসিয়া বলে, রায় মহাশয়! দ্বার খুলিয়া দিন, তো আমি তৎক্ষণাৎ দ্বার খুলিয়া দিই।

এই কথা বলিতে না বলিতে, বাহিরে ভীষণ গর্জনের শব্দ হইল। গৰ্জ্জন করিয়া কে বলিল,–রায় মহাশয়! তবে কি দ্বার খুলিয়া দিবেন?

সেই শব্দ শুনিয়া তনু রায় ভয় পাইলেন! কিসে এরূপ গৰ্জন করিতেছে, কিছুই বুঝিতে পারিলেন না। দেখিবার নিমিত্ত আস্তে আস্তে দ্বার খুলিলেন। দ্বার খুলিয়া দেখেন না, কী সর্ব্বনাশ! এক প্রকাণ্ড ব্যাঘ্র বাহিরে দণ্ডায়মান।

ব্যাঘ্র বলিলেন,—রায় মহাশয়! এই মাত্র আপনি সত্য করলেন যে, ব্যাঘ্ৰ আসিয়া যদি কঙ্কাবতীকে বিবাহ করিতে চায়, তাহা হইলে ব্যাঘ্রের সহিত আপনি কঙ্কাবতীর বিবাহ দিবেন। তাই আমি আসিয়াছি, এক্ষণে আমার সহিত কঙ্কাবতীর বিবাহ দিন; না দিলে এই মুহূর্তে আপনাকে খাইয়া ফেলিব।

তনু রায় অতি ভীত হইয়াছিলেন সত্য ভয়ে এক প্রকার হতজ্ঞান হইয়াছিলেন সত্য কিন্তু তবুও আপনার ব্যবসায়টি বিস্মরণ হইতে পারেন নাই।।

তনু রায় বলিলেন,—যখন কথা দিয়াছি, তখন অবশ্যই আপনার সহিত কঙ্কাবতীর বিবাহ দিব। আমার কথার নড়-চড় নাই। মুখ হইতে একবার কথা বাহির করিলে সে কথা আর আমি কখনও অন্যথা করিও না। তবে আমার নিয়ম তো জানেন? আমার কুল-ধৰ্ম্ম রক্ষা করিয়া যদি আপনি বিবাহ করিতে পারেন তো করুন, তাহাতে আমার কিছুমাত্র আপত্তি নাই।

ব্যাঘ্র জিজ্ঞাসা করিলেন,—কত হইলে আপনার কুল ধর্ম্ম হয়?

তনু রায় বলিলেন,—আমি সদ্বংশজাত ব্রাহ্মণ। সন্ধ্যা-আহ্নিক না করিয়া জল খাই। এরূপ ব্রাহ্মণের জামাতা হওয়া পরম সৌভাগ্যের কথা। আমার জামাতা হইতে যদি মহাশয়ের অভিলাষ থাকে, তাহা হইলে আপনাকে আমার সম্মান রক্ষা করিতে হইবে। মহালয়কে কিঞ্চিৎ অর্থব্যয় করিতে হইবে!

ব্যাঘ্র উত্তর করিলেন,—তা বিলক্ষণ জানি! এখন কত টাকা পাইলে মেয়ে বেচিবেন তা বলুন।

তনু রায় বলিলেন,—এ গ্রামের জমিদার, মান্যবর শ্রীযুক্ত জনার্দ্দন চৌধুরী মহাশয়ের সহিত আমার কন্যার সম্বন্ধ হইয়াছিল; দৈব ঘটনাবশতঃ কাৰ্য্য সমাধা হয় নাই। চৌধুরী মহাশয় নগদ দুই সহস্র টাকা দিতে স্বীকার করিয়াছিলেন। তিনি মনুষ্য, ব্রাহ্মণ, স্বজাতি। আপনি তাঁহার কিছুই নন; সুতরাং আপনাকে কিছু অধিক দিতে হইবে।

ব্যাঘ্ৰ বলিলেন,–বাটীর ভিতর চলুন। আপনাকে আমি এত টাকা দিব যে, আপনি কখনও চক্ষে দেখেন নাই, জীবনে স্বপনে কখনও ভাবেন নাই।

এই কথা বলিয়া, তর্জন গর্জন করিতে করিতে ব্যাঘ্র বাটীর ভিতর প্রবেশ করিলেন! তনু রায়ের মনে তখন বড় ভয় হইল। তনু রায় ভাবিলেন, এইবার বুঝি সপরিবারে খাইয়া ফেলে। নিরুপায় হইয়া তিনিও ব্যাঘ্রের পশ্চাৎ পশ্চাৎ বাটীর ভিতর যাইলেন।

বাহিরে ব্যাঘ্রের গর্জন শুনিয়া, এতক্ষণ কঙ্কাবতী, কঙ্কাবতীর মাতা ও ভগিনীগণ ভয়ে মৃতপ্রায় হইয়াছিলেন। তনু রায়ের পুত্র তখন ঘরে ছিলেন না, বেড়াইতে গিয়াছিলেন। গুণবিশিষ্ট পুত্র,–তাই অনেক রাত্রি না হইলে তিনি বাটী ফিরিয়া আসেন না।

যেখানে কঙ্কাবতী প্রভৃতি বসিয়াছিলেন, ব্যাঘ্র গিয়া সেইখানে উপস্থিত হইলেন। সেইখানে সকলের সম্মুখে তিনি একটি বৃহৎ টাকার তোড়া ফেলিয়া দিলেন।

ব্যাঘ্র বলিলেন,–খুলিয়া দেখুন, ইহার ভিতর কি আছে!

তনু রায় তোড়াটি খুলিলেন; দেখিলেন, তাঁহার ভিতর কেবল মোহর! হাতে করিয়া, চশমা নাকে দিয়া, আলোর কাছে লইয়া, উত্তমরূপে পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন যে, মোহর নয়, প্রকৃত স্বর্ণমুদ্রা! সকলেই আশ্চর্য্য হইলেন যে, এত টাকা বাঘ কোথা হইতে আনিল? তনু রাবে মনে আনন্দ আর ধরে না।

তনু রায় ভাবিলেন,—এত দিন পরে এইবার আমি মনের মত জামাই পাইলাম।

প্রদীপের কাছে লইয়া তনু রায় মোহরগুলি গণিতে বসিলেন।

এই অবসরে, ব্যাঘ্ৰ ধীরে ধীরে কঙ্কাবতী ও কঙ্কাবতীর মাতার নিকট গিয়া বলিলেন,–কোনও ভয় নাই!–কঙ্কাবতী ও কঙ্কাবতীর মাতা চমকিত হইলেন। কার সে কণ্ঠস্বর, তাহা তাঁহারা সেই মুহূর্তেই বুঝিতে পারিলেন। সেই কণ্ঠস্বর শুনিয়া তাঁহাদের প্রাণে সাহস হইল। কেবল সাহস কেন? তাঁহাদের মনে অনির্বচনীয় আনন্দের উদয় হইল। কঙ্কাবতীর মাতা মৃদুভাবে বলিলেন,—হে ঠাকুর! যেন তাহাই হয়!

ব্যাঘ্র এই কথা বলিয়া, পুনরায় তনু রায়ের নিকটে গিয়া থাবা পাতিয়া বসিলেন। তোড়ার ভিতর হইতে তনু রায় তিন সহস্র স্বর্ণমুদ্রা গণিয়া পাইলেন।

ব্যাঘ্র জিজ্ঞাসা করিলেন,—তবে এখন?

তনু রায় উত্তর করিলেন,—এখন আর কি? যখন কথা দিয়াছি, তখন এই রাত্রিতেই আপনার সহিত কঙ্কাবতীর বিবাহ দিব। সে জন্য কোনও চিন্তা করিবেন না। আর মনে করিবেন না যে, ব্যাঘ্র বলিয়া আপনার প্রতি কিছুমাত্র অভক্তি হইয়াছে।না না! আমি সে প্রকৃতির লোক নই। কাহারে কিরূপ মান-সম্রম করিতে হয়, তাহা আমি ভালরূপ বুঝি। জনার্দ্দন চৌধুরী দূরে থাকুক, যদি জনার্দ্দন চৌধুরীর বাবা আসিয়া আজ আমার পায়ে ধরে, তবুও আপনাকে ফেলিয়া তাঁহার সহিত আমি কঙ্কাবতীর বিবাহ দিই না।

তাহার পর তনু রায় স্ত্রীকে বলিলেন,—তুমি আমার কথার উপর কথা কহিও না; তাহা হইলে অনর্থ ঘটিবে; আমি নিশ্চয় ইহাকে কন্যা সম্প্রদান করিব। ইহার মত সুপাত্র আর পৃথিবীতে পাইব না। এ বিষয়ে আমি কাহারও কথা শুনিব না। যদি তোমরা কান্নাকাটি কর, তাহা হইলে এই ব্যাঘ্র মহাশয়কে বলিয়া দিব, ইনি এখনি তোমাদিগকে খাইয়া ফেলিবেন।

তনু রায়ের স্ত্রী উত্তর করিলেন,—তোমার যা ইচ্ছা, তাহাই কর। আমি কোনও কথায় থাকিব না।

যাহার টাকা আছে, তাঁহার কিসের ভাবনা? সেই দণ্ডেই তনু রায় পুত্রকে ডাকিতে পাঠাইলেন, সেই দণ্ডেই প্রতিবাসী প্রতিবাসনীগণ আসিয়া উপস্থিত হইলেন; সেই দণ্ডেই নাপিত পুরোহিত আসিলেন; সেই দণ্ডেই বিবাহের সমস্ত আয়োজন হইল।

সেই রাত্রিতেই ব্যাঘ্রের সহিত কঙ্কাবতীর বিবাহকাৰ্য্য সমাধা হইল। প্রকাণ্ড বনের বাঘকে জামাই করিয়া কার না মনে আনন্দ হয়? আজ তনু রায়ের মনে তাই আনন্দ ধরে না। প্রতিবাসীদিগকে তিনি বলিলেন, আমার জামাইকে লইয়া তোমরা আমোদ-আহ্লাদ করিবে। আমার জামাই যেন মনে কোনরূপও দুঃখ না করেন!

জামাইকে তনু রায় বলিলেন,—বাবাজি! বাসর ঘরে গান গাহিতে হইবে। গান শিখিয়া আসিয়াছ তো? এখানে কেবল হালুম হালুম করিলে চলিবে না। শালী শালাজ তাহা হইলে কান মলিয়া দিবে। বাঘ বলিয়া তাঁহারা ছাড়িয়া কথা কবে না!

বর না চোর! ব্যাঘ্র ঘাড় হেঁট করিয়া রহিলেন। বাসর ঘরে গান গাহিয়াছিলেন কি না, সে কথা শালী-শালাজ ঠানদিদিরা বলিতে পারে। আমরা কি করিয়া জানিব?

প্রভাত হইবার পূর্ব্বে ব্যাঘ্র তনু রায়কে বলিলেন,–মহাশয়! রাত্রি থাকিতে থাকিতে জনসমাজ পরিত্যাগ করিয়া বনে আমাকে পুনরাগমন করিতে হইবে। অতএব আপনার কন্যাকে সুসজ্জিত করিয়া আমার সহিত পাঠাইয়া দিন আর বিলম্ব করিবেন না।

প্রতিবাসিনীগণ কঙ্কাবতীর চুল বাঁধিয়া দিলেন। কঙ্কাবতীর মাতা কঙ্কাবতীর ভাল কাপড়গুলি বাছিয়া বাহির করিলেন।

তাহা দেখিয়া তনু রায় রাগে আরক্ত-নয়নে স্ত্রীকে বলিলেন,–তোমরা মত নির্বোধ আর এ পৃথিবীতে নাই। যাহার ঘরে এরূপ লক্ষ্মীছাড়া স্ত্রী, তাঁহার কি কখনও ভাল হয়? ভাল বল দেখি? বাঘের কিসের অভাব? কাপড়ের দোকানে গিয়া হালুম করিয়া পড়িবে, দোকানী দোকান ফেলিয়া পলাইবে, আর বাঘ কাপড়ের গাঠরি লইয়া চলিয়া যাইবে। স্বর্ণকারের দোকানে গিয়া বাঘ হালুম করিয়া পড়িবে, প্রাণের দায়ে স্বর্ণকার পলাইবে, আর বাঘ গহনাগুলি লইয়া চলিয়া যাইবে। দেখিয়া শুনিয়া যখন এরূপ সুপাত্রের হাতে কন্যা দিলাম, তখন আবার কঙ্কাবতীর সঙ্গে ভাল কাপড়-চোপড় দেওয়া কেন? তাই বলি, তোমার মত বোকা আর এ ভূ-ভারতে নাই।

তনু রায় লক্ষ্মীমন্ত পুরুষ, বৃথা অপব্যয় একেবারে দেখিতে পারেন না। যখন তাঁহার মাতার ঈশ্বর প্রাপ্তি হয়, তখন মাতা বিছানায় শুইয়াছিলেন। নাভিশ্বাস উপস্থিত হইলে, মাকে তিনি কেবল মাত্র একখানি ছেড়া মাদুরে শয়ন করাইলেন। নিতান্ত পুরাতন নয়, এরূপ একখানি বস্ত্র তখন তাঁহার মাতা পরিয়াছিলেন। কণ্ঠশ্বাস উপস্থিত হইলে, সেই বস্ত্রখানি তনু রায় খুলিয়া লইলেন। আর একখানি জীর্ণ ছিন্ন গলিত নেকড়া পরাইয়া দিলেন। এইরূপ টানা হেঁচড়া করিতে ব্যস্ত থাকা প্রযুক্ত, মৃত্যু-সময়ে তিনি মাতার মুখে এক বিন্দু জল দিতে অবসর পান নাই। কাপড় ছাড়াইয়া, ভক্তিভাবে, যখন পুনরায় মাকে শয়ন করাইলেন, তখন দেখিলেন, যে মা অনেকক্ষণ হইয়া গিয়াছে।

স্বামীর তিরস্কারে, তনু রায়ের স্ত্রী, দুই একখানি ছেড়া খোঁড়া নেকড়া-চোপড়া লইয়া একটি পুঁটলি বাঁধিলেন। সেইটি কঙ্কাবতীর হাতে দিয়া, কাঁদিতে কাঁদিতে, ঠাকুরদের ডাকিতে ডাকিতে, কন্যাকে বিদায় করিলেন।

 

সপ্তম পরিচ্ছেদ – বনে

পুঁটলী হাতে করিয়া, কঙ্কাবতী ব্যাঘ্রের নিকট আসিয়া অধোবদনে দাঁড়াইলেন। ব্যাঘ্র মধুর ভাবে বলিলেন,–কঙ্কাবতী! তুমি বালিকা! পথ চলিতে পারিবে না। তুমি আমার পৃষ্ঠে আরোহণ কর, আমি তোমাকে লইয়া যাই। তাহাতে আমার কিছুমাত্র ক্লেশ হইবে না।

কঙ্কাবতী গাছ-কোমর বাঁধিয়া বাঘের পিঠের উপর চড়িয়া বসিলেন। ব্যাঘ্র বলিলেন,—কঙ্কাবতী! আমার পিঠের লোম তুমি দৃঢ়রূপে ধর। দেখিও, যেন পড়িয়া যাইও না। কঙ্কাবতী তাহাই করিলেন। ব্যাঘ্র বন্যাভিমুখে দ্রুতবেগে ছুটিলেন।

বিজন অরণ্যের মাঝখানে উপস্থিত হইয়া ব্যাঘ্র জিজ্ঞাসা করিলেন,—কঙ্কাবতী! তোমার কি ভয় করিতেছে?

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন, তোমার সহিত যাইব, তাতে আবার আমার ভয় কি?

কঙ্কাবতী এ কথা বলিলেন বটে, কিন্তু একেবারেই যে তাঁহার ভয় হয় নাই, তাহা নহে। বাঘের পিঠে তিনি আর কখনও চড়েন নাই, এই প্রথম। সুতরাং ভয় হইবার কথা।

ব্যাঘ্র বলিলেন,–কঙ্কাবতী! কেন আমি বাঘ হইয়াছি, সে কথা তোমাকে বলিব। এ দশা হইতে শীঘ্রই আমি মুক্ত হইব, সেজন্য তোমার কোন চিন্তা নাই। এখন কোনও কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করিও না?–এইরূপ কথা কহিতে কহিতে দুইজনে যাইতে লাগিলেন। অবশেষে বৃহৎ এক অতুচ্চ পৰ্ব্বতের নিকট গিয়া দুইজনে উপস্থিত হইলেন।

ব্যাঘ্র বলিলেন,—কঙ্কাবতী! কিছুক্ষণের নিমিত্ত তুমি চক্ষু বুজিয়া থাক। যতক্ষণ না আমি বলি, ততক্ষণ চক্ষু চাহিও না।

কঙ্কাবতী চক্ষু বুজিলেন। ব্যাঘ্র দ্রুতবেগে যাইতে লাগিলেন। অল্পক্ষণ পরে, খল খল করিয়া বিকট হাসির শব্দ কঙ্কাবতীর কর্ণকুহরে প্রবেশ করিল।–কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,—কি বিকট, কি ভয়ানক হাসি! ওরূপ করিয়া কে হাসিল?

বাঘ উত্তর করিলেন,—সে কথা সব তোমাকে পরে বলিব। এখন শুনিয়া কাজ নাই। এখন তুমি চক্ষু উন্মীলন কর,—আর কোনও ভয় নাই।

কঙ্কাবতী চক্ষু চাহিয়া দেখিলেন যে, এক মনোহর অট্টালিকায় আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন। শ্বেত প্রস্তরে নির্ম্মিত, বহুমূল্য মণি-মুক্তায় অলঙ্কৃত, অতি সুরম্য অট্টালিকা। ঘরগুলি সুন্দর, পরিস্কৃত, নানা ধনে পরিপূরিত, নানা সাজে সুসজ্জিত। রজত, কাঞ্চন, হীরা, মাণিক, মুকুতা, চারিদিকে রাশি রাশি স্থূপাকার রহিয়াছে দেখিয়া কঙ্কাবতী মনে মনে অত মানিলেন। অট্টালিকাটি কিন্তু পর্ব্বতের অভ্যন্তরে স্থিত। বাহির হইতে দেখা যায় না। পর্ব্বত-গাত্রে সামান্য একটি নিবিড় অন্ধকারময় সুড়ঙ্গ দ্বারা কেবল ভিতরে প্রবেশ করিতে পারা যায়! পর্ব্বতের শিখরদেশ হইতে অট্টালিকার ভিতর আলোক প্রবেশ করে। কিন্তু আলোক আসিবার পথও এরূপ কৌশলভাবে নিবেশিত ও লুকায়িত আছে যে, সে পথ দিয়া ভূচর খেচর কেহ অট্টালিকার ভিতর প্রবেশ করিতে পারে না; অট্টালিকার ভিতর হইতে কেহ যাইতেও পারে না। অট্টালিকার ভিতর, বসন, খাট, পালঙ্ক প্রভৃতি কোনও দ্রব্যের অভাব নাই। নাই কেবল আহারীয় সামগ্রী।

অট্টালিকা ভিতর উপস্থিত হইয়া ব্যাঘ্র বলিলেন,—কঙ্কাবতী! এখন তুমি পৃষ্ঠ হইতে অবতরণ কর। একটুখানি এইখানে বসিয়া থাক, আমি আসিতেছি। কিন্তু সবাধান। এখানকার কোনও দ্রব্যে হাত দিও না, কোন দ্রব্য লইও না। যাহা আমি হাতে করিয়া দিব, তাহাই তুমি লইবে, আপনা আপিনি কোনও দ্রব্য স্পর্শ করিবে না।

এইরূপ সতর্ক করিয়া ব্যাঘ্র সে স্থান হইতে চলিয়া গেলেন।

কিছুক্ষণ পরে খেতু আসিয়া কঙ্কাবতীর সম্মুখে দাঁড়াইলেন। খেতু জিজ্ঞাসা করিলেন,–কঙ্কাবতী! আমাকে চিনিতে পার? কঙ্কাবতী ঘাড় হেঁট করিয়া রহিলেন।

খেতু পুনরায় বলিলেন,–কঙ্কাবতী! এই বনের মাঝখানে আসিয়া তোমার কি ভয় করিতেছে? কঙ্কাবতী মৃদুস্বরে উত্তর করিলেন-না, আমার ভয় করে নাই। তোমাকে দেখিয়া আমার ঘোমটা দেওয়া উচিত, লজ্জা করা উচিত। তাহা পারিতেছি না। তাই আমি ভাবিতেছি। তুমি কি মনে করিবে।

খেতু বলিলেন,–না, কঙ্কাবতী! আমাকে দেখিয়া তোমার ঘোমটা দিতে হইবে না, লজ্জা করিতে হইবে না; আমি কিছু মনে করিব না, তাঁহার জন্য তোমার ভাবনা নাই। আর এখানে কেবল তুমি আর আমি, অন্য কেহ নাই, তাতে লজ্জা করিলে চলিবে কেন? তাও বটে, আবার এখানে আমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ নই। বিপদের আশঙ্কা বিলক্ষণ আছে।

কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,–কি বিপদ?

খেতু বলিলেন,—এখন সে কথা শুনিয়া তোমার কাজ নাই। তাহা হইলে তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করিও না। তবে, এখন তোমাকে এই মাত্র বলিতে পারি যে, যদি তুমি এখানকার দ্রব্য সামগ্রী স্পর্শ না কর, তাহা হইলে কোনও ভয় না; কোনও বিপদ হইবার সম্ভাবনা নাই। যেটি আমি হাতে তুলিয়া দিব, সেইটি লইবে; নিজ হাতে কোনও দ্রব্য লইবে না। এক বৎসর কাল আমাদিগকে এইখানে থাকিতে হইবে। তাহার পর, এ সমুদয় ধনসম্পত্তি আমাদের হইবে। এই সমুদয় ধন লইয়া তখন আমরা দেশে যাইব আচ্ছা। কঙ্কাবতী! যখন আমি তোমাকে বিবাহ করি, তখন তুমি আমাকে চিনিতে পারিয়াছিলে?

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন, তা আর পারিনি? এক বৎসর কাল তোমার জন্য পথপানে চাহিয়াছিলাম। যখন এক বৎসর গত হইয়া গেল, তখনও তুমি আসিলে না, তখন মা আর আমি, হতাশ হইয়া পড়িলাম। মা যে কত কাঁদিতেন, আমি যে কত কাঁদিতাম, তা আর তোমাকে কি বলিব! কাল রাত্রিতে বাবা যখন বলিলেন যে,–বাঘের সহিত আমি কঙ্কাবতীর বিবাহ দিব, আর সেই কথায় তুমি যখন বাহির হইতে বলিলে,–তবে কি মহাশয়! দ্বার খুলিয়া দিবেন? সেই গর্জনের ভিতর হইতেও একটু হেন বুঝিলাম যে, সে কাহার কণ্ঠস্বর। তার পর আবার, ঘরের ভিতর আসিয়া, যখন তুমি চুপি-চুপি মার কাণে বলিলে,—কোনও ভয় নাই, তখন তো নিশ্চয়ই বুঝিলাম যে, তুমি বাঘ নও।

খেতু বলিলেন,–অনেক দুঃখ গিয়াছে। কঙ্কাবতী! তুমিও অনেক দুঃখ পাইয়াছ, আমিও অনেক দুঃখ পাইয়াছি। আর এক বৎসর কাল দুঃখ সহিয়া এইখানে থাকিতে হইবে। তাহার পর ঈশ্বর যদি কৃপা করেন তো আমাদের সুখের দিন আসিবে। দেখিতে দেখিতে এক বৎসর কাল কাটিয়া যাইবে। তখন এই সমুদয় ঐশ্বৰ্য্য আমাদের হইবে। আহা! মা নাই এত ধন লইয়া যে কি করিব? তাই ভাবি মা যদি বাঁচিয়া থাকিতেন, তাহা হইলে পৃথিবীতে যাহা কিছু পুণ্য কৰ্ম্ম আছে, সমস্ত আমি মাকে করাইতাম। যাহা হউক, পৃথিবীতে অনেক দীন-দুঃখী আছে। কঙ্কাবতী! এখন কেবল তুমি আর আমি। যতদূর পারি, দুই জনে জগতের দুঃখ মোচন করিয়া জীবন অতিবাহিত কবিব।

কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,—মাতাব সকার কাৰ্য্য সমাপ্ত করিয়া আমাকে বাটীতে রাখিয়া তাহার পর তুমি কোথায় যাইলে? কি করিলে? ফিরিয়া আসিতে তোমার এক বৎসরের অধিক হইলে কেন? তুমি ব্যাঘ্রের আকার ধরিলে কেন? সে সব কথা তুমি আমাকে এখন বলিবে না?

খেতু বলিলেন,–না, কঙ্কাবতী! এখন নয়। এক বৎসর গত হইয়া যাক তাহার পর সব কথা তোমাকে বলিব। কঙ্কাবতী আর কোনও কথা জিজ্ঞাসা করিলেন না।

কঙ্কাবতী ও খেতু পৰ্বত অভ্যন্তরে সেই অট্টালিকায় বাস করিতে লাগিলেন। অট্টালিকার কোনও দ্রব্য কঙ্কাবতী স্পর্শ করেন না। কেবল খেতু যাহা হাতে করিয়া দেন, তাহাই গ্রহণ করেন।

অট্টালিকার ভিতর সমূদয় দ্রব্য ছিল, কেবল খাদ্যসামগ্রী ছিল না। প্রতিদিন বাহিরে যাইয়া খেতু বনের ফল-মূল লইয়া আসেন, তাহাই দুইজনে আহার করিয়া কালযাপন করেন। বাঘ না হইয়া খেতু ব্যাঘ্ররূপ ধারণ করেন। বাঘ না হইয়া খেতু কখনও বাহিরে যান না। আবার অট্টালিকার ভিতর আসিয়া খেতু পুনরায় মনুষ্য হন। কেন তিনি বাঘের রূপ না ধরিয়া বাহিরে যান না, কঙ্কাবতী তাহা বুঝিতে পাবেন না। খেতু মানা করিয়াছেন, সে জন্য জিজ্ঞাসা করিবারও যো নাই! এইরূপে দশ মাস কাটিয়া গেল।

একদিন কঙ্কাবতী বলিলেন,—অনেকদিন মাকে দেখি নাই। মাকে দেখিতে বড় ইচ্ছা হয় মাও আমাদের কোন সংবাদ পান নাই; মাও হয় তো চিন্তিত আছেন। আমরা কোথায় যাইলাম, কি করিলাম মা তাঁহার কিছুই জানেন না।

খেতু উত্তর করিলেন,—অল্প দিনের মধ্যে পুনরায় দেশে যাইব সে জন্য আর তাঁহাদিগকে কোনও সংবাদ দিই নাই। আর লোকালয়ে,ইতে হইলেই আমাকে বাঘ হইয়া যাইতে হইবে সেজন্য আর যাইতে বড় ইচ্ছা হয় না? কি জানি কখন কি বিপদ ঘটে বলিতে তো পারা যায় না। যাহা হউক মাকে দেখিতে যখন তোমার সাধ হইয়াছে, তখন কাল তোমার এ সাধ পূর্ণ করিব। কাল সন্ধ্যার সময় মার নিকট তোমাকে আমি লইয়া যাইব। কঙ্কাবতী! বৎসর পূর্ণ হইতে আর কেবল দুই মাস আছে; যদি তোমার ইচ্ছা হয় তাহা হইলে এই দুই মাস তুমি না হয়, বাপের বাড়ী থাকিও। কঙ্কাবতী বলিলেন,—না তা আমি থাকিতে চাই না! তুমি এই বনের ভিতর নানা বিপদের মধ্যে একেলা থাকিবে, তা কি কখনও হয়? মার জন্য মন উতলা হইয়াছে—কেবল একবার খানি মাকে দেখিতে চাই। দেখা-শুনা করিয়া আবার তখন ফিরিয়া আসিব।

 

অষ্টম পরিচ্ছেদ—শ্বশুরালয়

তাহার পরদিন সন্ধ্যাবেলা, খেতু ব্যাঘ্ররূপ ধরিয়া কঙ্কাবতীকে তাঁহার পিঠে চড়িতে বলিলেন। অট্টালিকা হইতে অনেকগুলি টাকা কড়ি লইয়া কঙ্কাবতীকে দিলেন, আর বলিলেন যে, এই টাকাগুলি তোমার মাতা, পিতা, ভাই ও ভগিনীদিগকে দিবে।

অট্টালিকা হইতে বাহির হইয়া, দুই জনে অন্ধকারময় সুড়ঙ্গের পথে চলিলেন। সুড়ঙ্গ হইতে বাহির হইবার সময় খেতু বলিলেন,—কঙ্কাবতী! চক্ষু মুদ্রিত কর। যতক্ষণ না বলি, ততক্ষণ চক্ষু চাহিও না।

কঙ্কাবতী চক্ষু বুজিলেন। পুনরায় সেই বিকট হাসি শুনিতে পাইলেন। সেই ভায়বহ হাসি শুনিয়া আতঙ্কে তাঁহার শরীর শিহরিয়া উঠিল।

সুড়ঙ্গের বাহিরে আসিয়া বনের ভিতর প্রবেশ করিয়া খেতু কঙ্কাবতীকে চক্ষু চাহিতে বলিলেন। ব্যাঘ্র দ্রুতবেগে গ্রামের দিকে ছুটিল। প্রায় এক প্রহর রাত্রির সময়, ঝি-জামাতা, তনু রায়ের বাটীতে উপস্থিত হইলেন।

কঙ্কাবতীকে পাইয়া, কঙ্কাবতীর মা যেন স্বর্গ হাত বাড়াইয়া পাইলেন। কঙ্কাবতীর ভগিনীগণও কঙ্কাবতীকে দেখিয়া পরম সুখী হইলেন। অনেক টাকা মোহর দিয়া ব্যাঘ্র, তনু রায়কে নমস্কার করিলেন। শ্যালককেও তিনি অনেক টাকা-কড়ি দিলেন। ব্যাঘ্রে আদর রাখিতে আর স্থান হয় না! মা, পঞ্চোপচারে কঙ্কাবতীকে আহারাদি করাইলেন। তনু রায়ের বাসনা হইল,–জামাতাকে কি আহার করিতে দিই?

অনেক ভাবিয়া-চিন্তিয়া, মনে মনে বিচার করিয়া, তনু রায় বলিলেন,—বাবাজি! এত পথ আসিয়াছ, ক্ষুধা অবশ্যই পাইয়াছে। কিন্তু আমাদের ঘরে কেবল ভাত ব্যঞ্জন আছে, আর কিছুই নাই। ভাত-ব্যঞ্জন কিছু তোমার খাদ্য নয়। তাই ভাবিতেছি, তোমাকে খাইতে দিই কি? তা, তুমি এক কৰ্ম্ম কর। আমার গোয়ালে একটি বৃদ্ধা গাভী আছে। সময়ে সে দুগ্ধবতী গাভী ছিল। এখন তাঁহার বৎস হয় না, এখন আর সে দুধ দেয় না। বৃথা কেবল বসিয়া খাইতেছে। তুমি সেই গাভীটিকে আহার কর। তাহা হইলে, তোমার উদর পূর্ণ হইবে; আমারও জামাতাকে আদর করা হইবে। মিছামিছি আমাকে খড় যোগাইতে হইবে না।

ব্যাঘ্র বলিলেন,—না মহাশয়! আজ দিনের বেলায় আমি উত্তমরূপে আহার করিয়াছি। এখন আমার আর ক্ষুধা নাই;—গাভীটি এখন আমি আহার করিতে পারিব না। তনু রায় বলিলেন,—আচ্ছা! যদি তুমি গাভীটি না খাও, তাহা হইলে না হয়, আর একটি কাজ কর। তুমি নিরঞ্জন কবিরত্নকে খাও। তাঁহার সহিত আমার চিরবিবাদ। সে শাস্ত্র জানে না, তবু আমার সহিত তর্ক করে। তাঁহাকে আমি দুটি চক্ষু পাড়িয়া দেখিতে পারি না। সে এ গ্রাম হইতে এখন উঠিয়া গিয়াছে। এখান হইতে ছয় ক্রোশ দূরে মামার বাড়ীতে গিয়া আছে। আমি তোমায় সব সন্ধান বলিয়া দিতেছি। তুমি স্বচ্ছন্দে গিয়া তাঁহাকে খাইয়া আইস।

ব্যাঘ্র উত্তর করিল,—না মহাশয় আজ রাত্রিতে আমার কিছু মাত্র ক্ষুধা নাই! আজ রাত্রিতে আমি নিরঞ্জন কবিরত্নকে খাইতে পারিব না।

তনু রায় পুনৰ্ব্বার বলিলেন,–আচ্ছা! ততদূর যদি না যাইতে পার, তবে এই গ্রামেই তোমার আমি খাবার ঠিক করিয়া দিতেছি। এই গ্রামে এক গোয়ালিনী আছে। মাগী বড় দুষ্ট। দুবেলা আসিয়া আমার সঙ্গে ঝগড়া করে। তোমাকে কন্যা দিয়াছি বলিয়া মাগী আমাকে বলে,—অল্পায়ু, বুড়ো, ডেরা। টাকা নিয়ে কি না বাঘকে মেয়ে বেচে খেলি! তুমি আমার জামাতা, ইহার একটা প্রতিকার তোমাকে করিতে হইবে। তুমি তার ঘাড়টি ভাঙ্গিয়া রক্ত খাও? তার রক্ত ভাল, খাইয়া তৃপ্তিলাভ করিবে।

ব্যাঘ্র বলিল,–না মহাশয় আজ আমি কিছু খাইতে পারিব না, আজ ক্ষুধা নাই।

তনু রায় ভাবিলেন,—জামাতারা কিছু লজ্জাশীল হন। বার বার খাও খাও বলিতে হয়, তবে কিছু খান। খাইতে বসিয়া এটি খাও, ওটি খাও, আর একটু খাও এইরূপে পাঁচজনে বার বার না বলিলে, জামাতারা পেট ভরিয়া আহার করেন না। পাতে সব ফেলিয়া যান। এদিকে জঠরানল উ দাউ করিয়া জ্বলিতে থাকে, ওদিকে মুখে বলেন, আর ক্ষুধা নাই, আর খাইতে পারি না। জামাতা দিগের রীতি এই।।

এইরূপ চিন্তা করিয়া, তনু রায় আবার বলিলেন,—শশুর বাড়ী আসিয়া কিছু না খাওয়া কি ভাল? লোকে আমার নিন্দা করিবে। পাড়ার লোকগুলির কথা তোমাকে আর কি পরিচয় দিব? পাড়ার মেয়েপুরুষগুলি এক একটি সব অবতার! তামাসা দেখিতে খুব প্রস্তুত। পরের ভাল একটু দেখিতে পারেন না। তুমি আমার জামাতা হইয়াছ, যাহা হউক, তোমার দুপয়সা সঙ্গতি আছে, এই হিংসায় সকলে ফাটিয়া মরিতেছেন। এখনি কাল সকালে বলিবেন যে, তনু রায়ের জামাতা আসিয়াছিল, তনু রায় জামাতার কিছুমাত্র আদর করে নাই, এক ফোটা জল পৰ্য্যন্ত খাইতে দেয় নাই। সেই জন্য কিছু খাইতে তোমাকে বার বার অনুরোধ করিতেছি। চল, গোয়ালিনীর ঘর তোমাকে দেখাইয়া দিই। সে দুধ ঘি খায়? মাংস তাঁহার কোমল। তাঁহার মাংস তোমার মুখে ভাল লাগিবে। খাইয়া তৃপ্তি লাভ করিবে। মন্দ দ্রব্য কি তোমাকে খাইতে বলিতে পারি?

ব্যাঘ্র উত্তর করিল,–এবার মহাশয় আমাকে ক্ষমা করুন। এইবার যখন আসিব, তখন দেখা যাইবে।–তনু রায় মনে মনে কিছু ক্ষুণ্ণ হইলেন। জামাতা আদরের সামগ্রী। প্রাণ ভরিয়া আদর করিতে না পারিলে শ্বশুর-শাশুড়ীর মনে ক্লেশ হয়। তিনি তিনটি সুখাদ্যের কথা বলিলেন, জামাতা কিন্তু একটিও খাইলেন না। তাহাতে ক্ষুণ্ণ হইবার কথা।

তনু রায় বলিলেন,–শ্বশুরবাড়ীতে এরূপ খাইয়া দাইয়া আসিতে নাই। শশুরশাশুড়ীর মন তাহাতে বুঝিবে কেন? জামাতা কিছু না খাইলে শ্বশুর-শাশুড়ীর মনে দুঃখ হয়। এই আজ তুমি কিছু খাইলে না, সে জন্য তোমার শাশুড়ীঠাকুরাণী আমাকে কত বকিবেন। তিনি বলিবেন,–তুমি জামাতাকে ভাল করিয়া বল নাই, তাই জামাতা আহার করিলেন না। আবার যখন আসিবে, তখন আহারাদি করিয়া এমু না। এইখানে আসিয়া আহার করিবে। তোমার জন্য এই তিনটি খাদ্য-সামগ্রী আমি ঠিক করিয়া রাখিলাম। এবার আসিয়া একেবারেই তিনটিকে খাইতে হইবে। যদি না খাও, তাহা হইলে বনে যাইতে দিব না, তোমার চাদর ও ছাতি লুকাইয়া রাখিব। না না! ও কথা নয়; তোমার যে আবার ছাতি কি চাদর নাই। যদি না খাও, তা হইলে তোমার উপর আমি রাগ করিব।

কঙ্কাবতী, সমস্ত রাত্রি মা ও ভগিনীদিগের সহিত কথাবার্তা কহিতে লাগিলেন। ব্যাঘ্র প্রকৃত কে, তাহা মাতাকে বলিলেন। আর দুই মাস পরে তাঁহারা যে বিপুল ঐশ্বৰ্য্য লইয়া দেশে আসিবেন, তাহাও মাতাকে বলিলেন।

তনু রায়, একবার কঙ্কাবতীকে ডাকিয়া চুপি চুপি বলিলেন,—কঙ্কাবতী! বোধ হইতেছে যে, জামাতা আমার প্রকৃত ব্যাঘ্র নন। বনের শিকড় মাথায় দিয়া মানুষে যে, সেই বাঘ হয়, ইনি বোধ হয় তাই! আমি ইহাকে নানারূপ সুখাদ্য খাইতে বলিলাম। আমার গোয়ালের বুড়ো গরুটিকে খাইতে বলিলাম, নিরঞ্জনকে খাইতে বলিলাম, গোয়ালিনীকে খাইতে বলিলাম, কিন্তু ইনি ইহার একটিকেও খাইলেন না। যথার্থ বাঘ হইলে কি এ সব লোভ সামলাইতে পারিতেন? তাই আমার বোধ হইতেছে, ইনি প্রকৃত বাঘ নন। তুমি দেখিও দেখি? ইহার মাথায় কোনও রূপ শিকড় আছে কি না? যদি শিকড পাও, তাহা হইলে সেই শিকড়টি দগ্ধ করিয়া ফেলিবে। যদি লোকে মন্দ করিয়া থাকে, তো শিকডটি পোড়াইলে ভাল হইয়া যাইবে। যে কারণেই কেন বাঘ হইয়া থাকুন না, শিকড়টি দগ্ধ করিয়া ফেলিলেই সব ভাল হইয়া যাইবে। তখন পুনরায় মানুষ হইয়া ইনি লোকালয়ে আসিবেন।

পিতার এই উপদেশ পাইয়া কঙ্কাবতী যখন পুনরায় মার নিকট আসিলেন, তখন মা জিজ্ঞাসা করিলেন,–উনি তোমাকে চুপি চুপি কি বলিলেন?

পিতা যেরূপ উপদেশ দিলেন, কঙ্কাবতী যে সমস্ত কথা মার নিকট ব্যক্ত করিলেন।

মা সেই কথা শুনিয়া বলিলেন,–কঙ্কাবতী! তুমি এ কাজ করিবে না। করিলে নিশ্চয় মন্দ হইবে। খেতু অতি ধীর ও সুবুদ্ধি। খেতু যাহা করিতেছেন, তাহা ভালর জন্যই করিতেছেন। খেতুর আজ্ঞা তুমি কোনমতেই অমান্য করিও না। সাবধান, কঙ্কাবতী! আমি যাহা বলিলাম, মনে যেন থাকে!

রাত্রি অবসান প্রায় হইলে খেতু ও কঙ্কাবতী পুনরায় বনে চলিলেন। পৰ্ব্বতের নিকট আসিয়া, খেতু পুর্বের মত কঙ্কাবতীকে চক্ষু বুজিতে বলিলেন। সুড়ঙ্গ-দ্বারে পুর্বের মত কঙ্কাবতী সেই বিকট হাসি শুনিলেন। অট্টালিকায় উপস্থিত হইয়া পুর্বের মত ইহারা দিন যাপন করিতে লাগিলেন।

 

নবম পরিচ্ছেদ–শিকড়

আর একমাস গত হইয়া গেল। খেতু বলিলেন, কঙ্কাবতী! কেবল আর এক মাস রহিল। এই এক মাস পরে আমরা স্বাধীন হইব। আর এক মাস গত হইয়া যাইলে, আমাদিগকে আর বনবাসী হইয়া থাকিতে হইবে না। এই বিপুল বিভব লইয়া আমরা তখন দেশে যাইব। এক একটি দিন যায়, আর খেতু বলেন,—কঙ্কাবতী! আর ঊনত্রিশ দিন রইল; কঙ্কাবতী! আর আটত্রিশ দিন রহিল; কঙ্কাবতী! আর সাতাইশ দিন রইল।

এইরূপ কুড়িদিন গত হইয়া গেল। কেবল আর দশ দিন রহিল। দশ দিন পরে কঙ্কাবতীকে লইয়া দেশে যাইবেন, সে জন্য খেতুর মনে অসীম আনন্দের উদয় হইল। খেতুর মুখে সদাই হাসি!

খেতু বলিলেন,—কঙ্কাবতী! তুমি এ কৰ্ম্ম কর। কয়লা দ্বারা এই প্রাচীরের গায়ে দশটি দাগ দিয়া রাখ। প্রতিদিন প্রাতঃকালে উঠিয়া একটি করিয়া দাগ পুঁছিয়া ফেলিব, তাহা হইলে সম্মুখে সৰ্ব্বদাই প্রত্যক্ষ দেখিব, কদিন আর বাকী রহিল।

কঙ্কাবতী ভাবিলেন যে,–দেশে যাইবার নিমিত্ত স্বামীর মন বড়ই আকুল হইয়াছে। প্রাচীরে তো দশটি দাগ দিলাম, যেমনি এক একটি দিন যাইবে, তেমনি এক একটি দাগ তো মুছিয়া ফেলিলাম; তা তো সব হইবে। কিন্তু এক দিনেই কি দশটি দিন মুছিয়া ফেলিতে পারি না? এক দিনেই কি স্বামীর উদ্ধার করিতে পারি না? বাবা যা বলিয়া দিয়াছেন, তাই করিয়া দেখিলে তো হয়! আজ কি কাল যদি দেশে যাইতে পান, তাহা হইলে আমার স্বামীর মনে কতই না আনন্দ হইবে!

এই দুই মাসের মধ্যে, পিতার কথা তাঁহার অনেক বার স্মরণ হইয়াছিল। মন্দ লোকে তাঁহার স্বামীকে গুণ করিয়াছে এই চিন্তা তাঁহার মনে বারবার উদয় হইয়াছিল। তবে মা বারণ করিয়া দিয়াছিলেন, সে জন্য এতদিন তিনি কোনও রূপ প্রতিকারের চেষ্টা করেন না। এক্ষণ দেশে যাইবার নিমিত্ত স্বামীর ঘোরতর ব্যগ্রতা দেখিয়া কঙ্কাবতীর মন নিতান্ত অস্থির হইয়া পড়িল।।

কঙ্কাবতী ভাবিলেন,–বাবা পুরুষ মানুষ! পাহাড়-পর্ব্বত, বন-জঙ্গল, বাঘ-ভাল্লুক, শিকড়-মাকড় তন্ত্র-মন্ত্র, এ সকলের কথা বাবা যত জানেন, মা তত কি করিয়া জানিবেন? মা, মেয়ে মানুষ ঘরের বাহিরের যান না। মা কি করিয়া জানিবেন যে, লোকে শিকড় দিয়া মন্দ করিলে, তাঁহার কি উপায় করিতে হয়? শিকড়টি দগ্ধ করিয়া ফেলিলেই সকল বিপদ কাটিয়া যায়, বাবা এই কথা বলিয়াছেন। এখনও দশ দিন আছে, স্বামী আমার দিন গণিতেছেন। যদি কাল তিনি বাড়ী যাইতে পান, তাহা হইলে তাঁর কত না আনন্দ হইবে।

এইরূপ কঙ্কাবতী সমস্ত দিন ভাবিতে লাগিলেন। একবার মনে ভাবেন,–কি জানি, পাছে ভাল করিতে গিয়া মন্দ হয়। কাজ নাই, এ দশটা দিন চক্ষু কর্ণ বুজিয়া চুপ করিয়া থাকি। বাবা যাহা করিতে বলিয়াছেন, মা তাহা বারণ করিয়াছেন।

আবার ভাবেন,–দুষ্টেরা আমার স্বামীর মন্দ করিয়াছে। দুষ্টদিগের দুরভিসন্ধি হইতে স্বামীকে আমি মুক্ত করিব। আমি যদি স্বামীকে মুক্ত করিতে পারি, তাহা হইলে তিনি কত না আমার উপর পরিতুষ্ট হইবেন। ভাবিতে ভাবিতে সমস্ত দিন চলিয়া গেল। কি করিবেন, কঙ্কাবতী কিছু স্থির করিতে পারিলেন না। রাত্রিতেও কঙ্কাবতী এই চিন্তা করিতে লাগিলেন। তিলক-সুন্দরী ও ভুশকুমডোর গল্প মনে পড়িল।

রাজপুত্র, তিলকসুন্দরীর রূপে মুগ্ধ হইয়াছিলেন। তিলকসুন্দরীকে বিবাহ করিবার নিমিত্ত তাঁহার মন হইয়াছিল। তিলকসুন্দরীর সৎ-মা তাঁহার মাথায় একটি শিকড় দিয়া দিলেন। শিকড়ের গুণে তিলকসুন্দরী পক্ষী হইয়া গেল। উড়িয়া গিয়া গাছের ডালে বসিল। সৎ-মা কৌশল করিয়া আপনার কন্যা ভুশকুমড়োর সহিত রাজপুত্রের বিবাহ দিলেন। ভুশকুমড়োকে রাজপুত্র আদর করিতে লাগিলেন। তাহা দেখিয়া তিলসুন্দরী গাছের ডাল হইতে বলিল,–ভুশকুমড়ো কোলে! তিলকসুন্দরী ডালে!! রাজপুত্র মনে করিলেন, পাখীটি কি বলে? রাজপুত্র সেই পাখীটিকে ডাকিলেন। পাখীটি আসিয়া রাজপুত্রের হাতে বসিল। হাত বুলাইতে মাথার শিকড়টি পড়িয়া গেল। পাখী তখন পুনরায় তিলকসুন্দরী হইল। রাজপুত্র তখন সৎ-মার দুষ্টাভিসন্ধি বুঝিতে পারিলেন। সৎ-মার কন্যা ভুশকুমড়োকে হেঁটে কাঁটা, উপরে কাঁটা দিয়া পুঁতিয়া ফেলিলেন। তিলকসুন্দরীকে লইয়া সুখে ঘরকন্না করিতে লাগিলেন।

কঙ্কাবতীর সেই তিলকসুন্দরীর কথা এখন মনে হইল। আরব্য উপন্যাসে এই ভাবের যে গল্প আছে, তাহাও তাঁর মনে পড়িল। তিনি ভাবিলেন,—দুষ্টগণ শিকড়ের দ্বারা এইরূপে লোকের মন্দ করে। আচ্ছা যাই দেখি, আমার স্বামীর মাথায় কোনরূপ শিকড় আছে কি না।–এই মনে করিয়া তিনি অন্য ঘরে গিয়া বাতি জ্বালিলেন। বাতিটি হাতে করিয়া, শয্যার পাশে দাঁড়াইয়া, খেতুর মাথায় শিকড়ের অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। খেতু ঘোর নিদ্রার অভিভূত। খেতু ইহার কিছুই জানেন না।

সৰ্ব্বনাশ! অনুসন্ধান করিতে করিতে কঙ্কাবতী খেতুর মাথায় একটি শিকড় দেখিতে পাইলেন। বাবা যা বলিয়াছিলেন, তাই! দুষ্টলোকদিগের একবার দুরভিসন্ধি দেখ। ভাগ্যক্রমে আজ আমি মাথাটি অনুসন্ধান করিয়া দেখিলাম; তা না হইলে কি হইত?

কঙ্কাবতী, শিকড়টি খেতুর মাথা হইতে খুলিতে চেষ্টা করিলেন। শিকড়টি মাথার চুলের সহিত দৃঢ়রূপে আবদ্ধ ছিল, খুলিয়া লইতে পারিলেন না! পাছে খেতু জাগিয়া উঠেন, এই ভয়ে আর অধিক বল প্রয়োগ করিলেন না। পুনরায় অপর ঘরে গিয়া, সে স্থান হইতে কাঁচি লইয়া আসিলেন। চুলের সহিত শিকড়টি খেতুর মাথা হইতে কাটিয়া লইলেন। শিকড়টি তৎক্ষণাৎ বাতির অগ্নিতে দগ্ধ করিয়া ফেলিলেন!

শিকড় পুড়িয়া ঘরের ভিতর অতি ভয়ানক তীব্র দুর্গন্ধ বাহির হইল। সেই গন্ধে কঙ্কাবতীর শ্বাসরোধ হইবার উপক্রম হইল। ভয়ে কঙ্কাবতী বিহুল হইয়া পড়িলেন। কঙ্কাবতীর সর্ব্বশরীর কাঁপিতে লাগিল।

চমকিয়া খেতু জাগরিত হইলেন। মাথায় হাত দিয়া দেখিলেন যে, শিকড় নাই। ভয়ে বিহুলা, কম্পিত কলেবা, জ্ঞানহীনা, কঙ্কাবতীকে সম্মুখে দণ্ডায়মান দেখিলেন। অচেতন হইয়া, কঙ্কাবতী ভূতলশায়িনী হন আর কি, এমন সময় খেতু উঠিয়া তাঁহাকে ধরিলেন। বাতিটি তাঁহার হাত হইতে লইয়া, কঙ্কাবতীকে আস্তে আস্তে বসাইলেন। কঙ্কাবতীর মুখে জল দিয়া, কঙ্কাবতীর মুখে জল দিয়া, কঙ্কাবতীকে সুস্থ করিবার নিমিত্ত চেষ্টা করিতে লাগিলেন।

সুস্থ হইয়া কঙ্কাবতী বলিলেন,—আমি যে, ঘোর কু-কৰ্ম্ম করিয়াছি, তাহা আমি এখন বুঝিতে পারিতেছি। আমাকে তুমি ক্ষমা কর!

এই কথা বলিয়া, কঙ্কাবতী অবোবদনে বসিয়া কাঁদিতে লাগিলেন।

খেতু বলিলেন,—কঙ্কাবতী! ইহাতে তোমার কোনও দোষ নাই। প্রথম তো অদৃষ্টের দোষ। তা না হইলে এতদিন গিয়া আজ এ দুর্ঘটনা ঘটিবে কেন? তাহার পর আমার দোষ। আমি যদি আদ্যোন্ত সকল কথা তোমাকে প্রকাশ করিয়া বলিতাম, যদি তোমার নিকট কিছু গোপন না করিতাম, তাহা হইলে এ কাজ তুমি কখনও করিতে না আজ এ দুর্ঘটনা ঘটিত না। শিকড়টি কি বাতির আগুনে পোড়াইয়া ফেলিয়াছ? কঙ্কাবতী ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন,—হাঁ! শিকড়টি দগ্ধ করিয়া ফেলিয়াছি।

খেতু বলিলেন,–তবে এখন তোমাকে বুকে সাহস বাঁধিতে হইবে। স্ত্রীলোক, বালিকার মত এখন আর কাঁদিলে চলিবে না। এই জনশূন্য অরণ্যের মধ্যে তুমি একাকিনী! তোমার জন্য প্রাণ আমার নিতান্ত আকল হইয়াছে। কঙ্কাবতী প্রকৃত যাহারা পুরুষ হয়, মরিতে তাঁহারা ভয় করে না। ভয় করে না তবে অনাথিনী স্ত্রী প্রভৃতি পোষ্যদিগের জন্যই তাঁহারা কাতর হয়।–ব্যস্ত হইয়া কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,–কেন? কি? আমাদের কি বিপদ হইবে? কি বিপদের আশঙ্কা তুমি করিতেছ?

খেতু উত্তর করিলেন,—কঙ্কাবতী! যদি গোপন করিবার সময় থাকিত, তাহা হইলে আমি গোপন করিতাম। কিন্তু গোপন করিবার আর সময় নাই। তোমাকে একাকিনী এ স্থান হইতে বাটী ফিরিয়া যাইতে হইবে। সুড়ঙ্গের ভিতর হইতে বাহির হইয়া ঠিক উত্তর মুখে যাইবে। প্রাতঃকাল হইলে সূৰ্য্য উদয় হইবে, সূৰ্য্যকে দক্ষিণদিকে রাখিয়া চলিলেই তুমি গ্রামে গিয়া পৈাঁছিবে। কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন, আর তুমি?

খেতু বলিলেন,—আমাকে এই খানেই থাকিতে হইবে। আমি এ স্থানের দ্রব্য ছুইয়াছি, এখান হইতে আমি টাকাকড়ি লইয়াছি, সুতরাং এখান হইতে আমি আর যাইতে পারিব না। আমাকে এইখানেই থাকিতে হইবে। সেইজন্য এখানকার কোনও দ্রব্য স্পর্শ করিতে তোমাকে মানা করিয়াছিলাম। এক্ষণে তুমি আর বিলম্ব করিও না। অট্টালিকা হইতে বাহির হইয়া সুড়ঙ্গপথে গমন করিবে। পর্ব্বতের ভিতর হইতে বাহির হইয়া কোনও গাছতলায় রাত্রিটি যাপন করিবে। যখন প্রাতঃকাল হইবে, সূর্য উদয় হইবে, তখন কোন্ দিক উত্তর, অনায়াসেই জানিতে পারিবে। উত্তর মুখে যাইলেই গ্রামে গিয়া উপস্থিত হইবে। কঙ্কাবতী! আর বিলম্ব করিও না।

কঙ্কাবতী বলিলেন,–এ স্থান হইতে আমি যাইব? তোমাকে এইখানে রাখিয়া আমি এখান হইতে যাইব? এমন কথা তুমি কি করিয়া বলিলে? আমি ঘোরতর কুকৰ্ম্ম করিয়াছি সত্য, আমি অপরাধিনী সত্য, আমি হতভাগিনী। কিন্তু তা বলিয়া কি আমাকে দূর করিতে হয়? আমি বালিকা, আমি অজ্ঞান, আমি জানি না; না জানিয়া এ কাজ করিয়াছি, ভালভাবিয়া মন্দ করিয়াছি। আমার কি আর ক্ষমা নাই।

খেতু উত্তর করিলেন,—কঙ্কাবতী! তোমার উপর আমি রাগ করি নাই। রাগ করিয়া তোমাকে বলি নাই যে, তুমি এখান হইতে যাও। বড় বিপদের কথা, বড় নিদারুণ কথা, কি করিয়া তোমাকে বলি। এখান হইতে তোমাকে যাইতে হইবে, কঙ্কাবতী! নিশ্চয় তোমাকে এখান হইতে যাইতে হইবে, আর এখনি যাইতে হইবে; বিলম্ব করিলে চলিবে না। এখন তুমি পিতার বাটীতে গিয়া থাক, লোকজন সঙ্গে করিয়া দশ দিন পরে পুনৰ্ব্বার এই বনের ভিতর আসিও। এই অট্টালিকার ভিতর যাহা কিছু ধন-সম্পত্তি আছে, তাহা লইয়া যাইও। দশ দিন পরে লইলে কোনও ভয় নাই, তখন তোমাকে কেহ কিছু বলিবে না। এই ধন-সম্পত্তি চারিভাগ করিবে। একভাগ তোমার পিতাকে দিবে, এক ভাগ রামহরি দাদা মহাশয়কে দিবে, এক ভাগ নিরঞ্জন কাকাকে দিবে, আর এক ভাগ তুমি লইবে। ব্রত-নিয়ম ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম দানধ্যান করিয়া জীবন যাপন করিবে। মনুষ্য-জীবন কয় দিন? কঙ্কাবতী! দেখিতে দেখিতে কাটিয়া যাইবে। তাহার পর এখন আমি যেখানে যাইতেছি, সেইখানে তুমিও যাইবে; দুই জনে পুনরায় সাক্ষাৎ হইবে।

কঙ্কাবতী বলিলেন,—তোমার কথা শুনিয়া আমার বুক ফাটিয়া যাইতেছে, প্রাণে বড় ভয় হইতেছে। হায়! আমি কি করিলাম। কি বিপদের কথা? কি নিদারুণ কথা? এখন কোথায় তুমি যাইবে? আমাকে ভাল করিয়া সকল কথা তুমি বল।

খেতু বলিলেন,–তবে শুন। এই অট্টালিকার যা ধন দেখিতেছ, ইহার প্রহরিণীস্বরূপ নাকেশ্বরী নামধারিণী এক ভয়ঙ্করী ভূতিনী আছে। সুড়ঙ্গের দ্বারে সর্ব্বদা সে বসিয়া থাকে। যে কেহু তাঁহার এই ধন স্পর্শ করিবে, মুহূর্তের মধ্যে সে তাঁহাকে খাইয়া ফেলিবে। আমি এই ধন লইয়াছি। কিন্তু যে শিকড়টি তুমি দগ্ধ করিয়া ফেলিয়াছ, সেই শিকড়ের দ্বারা এতদিন আমি রক্ষিত হইতেছিলাম। তা না হইলে এতদিন কোন্ কালে নাকেশ্বরী আমাকে খাইয়া ফেলিত! শিকড় নাই, এ কথা নাকেশ্বরী এখনও বোধ হয় জানিতে পারে নাই। কিন্তু শীঘ্র সে জানিতে পারিবে। জানিতে পারিলেই সে এখানে আসিয়া আমাকে মারিয়া ফেলিবে। নাকেশ্বরীর হাত হইতে নিস্তার পাইবার উপায় বা এখান হইতে বাহিরে যাইবার অন্য উপায় নাই। তা থাকিলেও কোনও লাভ নাই। বনে যাই কি জলে যাই, গ্রামে যাই কি নগরে যাই, যেখানে যাইব, নাকেশ্বরী সেইখানে গিয়া আমাকে মারিয়া ফেলিবে।

এই কথা শুনিয়া, কঙ্কাবতী খেতুর পা-দুটি ধরিয়া সেইখানে শুইয়া পড়িলেন।

খেতু বলিলেন,–কঙ্কাবতী! কাঁদিও না। কাঁদিলে আর কি হইবে? যাহা অদৃষ্টে ছিল, তাহা ঘটিল। সকলি তাঁর ইচ্ছা। উঠ, যাও, আস্তে আস্তে সুড়ঙ্গ দিয়া বাহিরে যাও। এখনি নাকেশ্বরী এখানে আসিবে। তাঁহাকে দেখিলে তুমি ভয় পাইবে। যাও, বাড়ী যাও; মার কাছে যাইলে, তবু তোমার প্রাণ অনেকটা সুস্থ হইবে।

কঙ্কাবতী বলিলেন, আমি তোমাকে এইখানে ছাড়িয়া যাইব? তোমাকে এইখানে ছাড়িয়া নাকেশ্বরীর ভয়ে প্রাণ লইয়া আমি পলাইব? তা যদি করি, তত ধিক্ আমার প্রাণে, ধিক্ আমার বাঁচনে। শত ধিক্ আমার প্রাণে! শত ধিক্ আমার বাঁচনে! তোমার কঙ্কাবতী অল্পবুদ্ধি বালিকা বটে, সেইজন্য সে তোমার আজ্ঞা অবজ্ঞা করিয়াছে। তা বলিয়া কঙ্কাবতী নরকের কীট নয়। নাকেশ্বরী হাত হইতে তোমাকে উদ্ধার করিতে পারি ভাল; না পারি তোমারও যে গতি, আমারও সেই গতি। যদি তোমার মৃত্যু, তো আমারও মৃত্যু। কঙ্কাবতী মরিতে ভয় করে না। তোমাকে ছাড়িয়া কঙ্কাবতী ও পৃথিবীতে থাকিতেও চায় না। কঙ্কাবতীর এই প্রতিজ্ঞা। কঙ্কাবতী নিশ্চয় আপনার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিবে।

খেতু, কঙ্কাবতীর মুখপানে চাহিয়া দেখিলেন। কঙ্কাবতীর মুখ দেখিয়া বুঝিতে পারিলেন যে, তাঁর প্রতিজ্ঞা অটল, অচল। কঙ্কাবতীর চক্ষে আর জল নাই, কঙ্কাবতীর মুখে ভয়ের চিহ্নমাত্র নাই। খেতু ভাবিলেন,–কঙ্কাবতীকে আর যাইতে অনুরোধ করা বৃথা।

 

দশম পরিচ্ছেদ—চুরি

খেতু বলিলেন,—কঙ্কাবতী! যদি নিতান্ত তুমি এখান হইতে পলাইবে না, তবে তোমাকে সকল কথা বলি,—শুন। তুমি বালিকা, তাতে জনশূন্য এই নির্জন অরণ্যের মধ্যে আমাদের বাস। ঘরের দ্বারে ভয়ঙ্করী নাকেশ্বরী। পাছে তুমি ভয় পাও, তাই এতদিন সকল কথা তোমাকে বলি নাই। এখন বলি,–শুন। কিন্তু কথা আমার শেষ হইলে হয়। শিকড় পোড়ার গন্ধ পাইলেই বোধ হয় নাকেশ্বরী জানিতে পারিবে যে, আমার কাছে আর শিকড় নাই। তখনি সে ভিতরে আসিয়া আমার প্রাণবধ করিবে। আমার কথা শেষ হইতে না হইতে পাছে আসিয়া পড়ে, সেই ভয়।

মাতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমাপ্ত করিয়া, আমি কাশী অভিমুখে যাত্রা করিলাম। কলিকাতায় না গিয়া কি জন্য পশ্চিমাঞ্চলে যাত্রা করিলাম, সে কথা তোমাকে আমি পুর্বেই বলিয়াছি। কাশীতে উপস্থিত হইয়া মাতার শ্রাদ্ধাদি ক্রিয়া সমাপ্ত করিলাম। তাহার পর কর্ম-কাজের অনুসন্ধান করিতে লাগিলাম। সৌভাগ্যক্রমে অবিলম্বেই একটি উত্তম কাজ পাইলাম। অতিশয় পরিশ্রম করিতে হইত সত্য, কিন্তু বেতন অধিক ছিল। এক বৎসরের মধ্যে অনেক গুলি টাকা সঞ্চয় করিতে পারিব,এরূপ আশা হইল। কেবল মাত্র শরীরে প্রাণ রাখিতে যাহা কিছু আবশ্যক, সেইরূপ যৎসামান্য ব্যয় করিয়া, অবশিষ্ট টাকা আমি তোমার বাপের জন্য রাখিতে লাগিলাম।

সমস্ত দিন পরিশ্রম করিয়া এক এক দিন সন্ধ্যা বেলা, এরূপ ক্ষুধা পাইত যে, ক্ষুধায় দাঁড়াইতে পারিতাম না, মাথা ঘুরিয়া, পড়িয়া যাইবার উপক্রম হইত। কিন্তু রাত্রিতে আর কিছু খাইতাম না। জল-খাবার নয়, কেবল খালি জল, তাই পান করিয়া উদর পূর্ণ করিতাম। তাহাতে শরীর অনেকটা সুস্থ হইত; কিছুক্ষণের নিমিত্ত ক্ষুধার জ্বালাও নিবৃত হইত। তাহার পর শয়ন করিলে নিদ্রায় অভিভূত হইয়া পড়িতাম, ক্ষুধার জ্বালা আর জানিতে পারিতাম না। জল আনিবার জন্য কাহাকেও একটি পয়সা দিতাম না। একটি বড় লোটা কিনিয়াছিলাম। সন্ধ্যার পর, যখন কেহ আমাকে চিনিতে পারিবে না, সেই সময়ে আপনি গিয়া গঙ্গার ঘাট হইতে জল আনিতাম। কাশীতে গঙ্গার ঘাট বড় উচ্চ। জল আনিতে গিয়া একদিন অন্ধকার রাত্রিতে আমি পড়িয়া গিয়াছিলাম। হাতে ও পায়ে অতিশয় আঘাত লাগিয়াছিল। কোনও মতে উঠিয়া সেই ঘাটের একটি সোপানে বসিলাম। কঙ্কাবতী! সেইখানে বসিয়া কত যে কাঁদিলাম, তাহা আর তোমাকে কি বলিব!

মনে মনে করিলাম যে, হে ঈশ্বর! আমি কি পাপ করিয়াছি? যে, তাঁহার জন্য আমার এ ঘোর শান্তি? কেন লোকে সংসার পরিত্যাগ করিয়া সন্ন্যাস ধৰ্ম্ম অবলম্বন করে, তাহা বুঝিলাম। নিজের সুখ-দুঃখ যিনি কেবল নিজের উপর নির্ভর করেন, এ জগতে শান্তির আসা কেবল তিনিই করিতে পারেন। যাঁহারা পাঁচটা লইয়া থাকেন, পাঁচটার ভালমন্দের উপর যাঁহারা আপনাদিগের সুখ-দুঃখ নির্ভর করেন, তাঁহাদের আবার এ জগতে শান্তি কোথায়? যারে আমি ভালবাসি, যার জীবনের সহিত আমার জীবন জড়িত করিয়া রাখিয়াছি, যার মঙ্গল কামনা সতত করিয়া থাকি, সে কি অকৰ্ম্ম-দুষ্কর্ম করিবে, তাহা আমি কি করিয়া জানিব? তাঁহার কর্মের উপর আমার কোনও অধিকার নাই, অথচ তাঁহার অসুখ,তাঁহার ক্লেশ দেখিলে হৃদয় আমার ঘোরতর ব্যথিত হয়।

আবার সে নিজে যদিও কোনও দুষ্কর্ম না করে, কি নিজে নিজের অসুখের কারণ না হয়, পরের অত্যাচারে সে প্রপীড়িত হইতে পারে। আমি হয়ত ত পরের অত্যাচার হইতে তাঁহাকে রক্ষা করিতে অসমর্থ। নিরুপায় হইয়া প্রাণসম সেই প্রিয় বস্তুর যাতনা আমাকে দেখিতে হয়। এই ধর,—যেমন তোমার প্রতি পিতা মাতার পীড়ন; তাঁহার আমি কি করিতে পারিয়াছিলাম? চারিদিকে সাধুদিগের ধূনী দেখিয়া তখন আমার মনে এইরূপ ভাবের উদয় হইয়াছিল। আবার ভাবিলাম,—এই সংসার-ক্ষেত্র প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্র! নানা পাপ, নানা দুঃখ, এই সংসারে অহরহ বিচরণ করিতেছে। কোটি কোটি প্রাণী সেই পাপে, সেই তাপে তাপিত হইয়া সংসার-যাতনা ভোগ করিতেছে।

আমি-যার জ্ঞান-চক্ষু তাহাদের চেয়ে অনেক পরিমাণে উন্মীলিত হইয়াছে, পাপতাপের সহিত যুদ্ধ করিতে যে অধিকতর সুসজ্জিত হইয়াছে, আমি কি সে যুদ্ধে পরাঙ্মুখ হইব? জগতের হিতের নিমিত্ত অহিতের সহিত যুদ্ধ না করিয়া কাপুরুষের ন্যায় পরাজয় মানিয়া, নির্জন গভীর কাননে গিয়া বসিয়া থাকিব? কঙ্কাবতী! এইরূপ কত কি যে ভাবিলাম, তাহা আর তোমাকে কি বলিব!

আস্তে আস্তে পুনরায় জল লইয়া বাটী প্রত্যাগমন করিলাম। এইরূপে এক বৎসর গত হইল। এই সময়ের মধ্যে প্রায় দুই সহস্র টাকা সঞ্চয় করিয়াছিলাম। মনে করিলাম,—এই টাকা পাইলে, তোমার পিতা পরিতোষ লাভ করিবেন। তোমাকে আমি পাইব। টাকাগুলি লইয়া দেশাভিমুখে যাত্রা করিলাম। সমুদয় নগদ টাকা ছিল, নোট লই নাই; কারণ, নোটের প্রতি আমাদের গ্রামের লোকের আস্থা নাই।

একটি ব্যাগের ভিতর টাকাগুলি লইয়া রেলগাড়িতে চড়িলাম। ব্যাগটি আপনার কাছে অতি যত্নে অতি সাবধানে রাখিলাম। পাছে কেহ চুরি করে, পাছে কেহ লয়, এই ভয়ে একবারও গাড়ী হইতে নামি নাই। যখন সন্ধ্যা হইল, তখন বড় একটি স্টেশনে আসিয়া গাড়ী থামিল। সেখানে অনেকক্ষণ পর্যন্ত গাড়ী দাঁড়াইবে। আমার বড় ক্ষুধা পাইয়াছিল। তবুও জলখাবার কিনিবার জন্য গাড়ী হইতে আমি নামিলাম না। সে গাড়ীতে আর একটি অপরিচিত লোক ছিল,—অন্য আর কেহ ছিল না। সে লোকটি নিজের জন্য জল-খাবার আনিতে গেল। যাইবার সময় সে আমাকে জিজ্ঞাসা করিল,—মহাশয়! আপনার যদি কিছু প্রয়োজন থাকে তো বলুন, আমি আনিয়া দিই। আমি উত্তর করিলাম,—যদি তুমি আনিয়া দাও, তাহা হইলে আমি উপকৃত হইব। এই বলিয়া, জল-খাবার কিনিবার নিমিত্ত তাঁহাকে আমি পয়সা দিলাম, সে আমাকে জল-খাবার আনিয়া দিল। আমি তাহা খাইলাম। অল্পক্ষণ পরে আমার মাথা ঘুরিতে লাগিল! মনে করিলাম,—গাড়ীর উত্তাপে এইরূপ হইয়াছে। একটু শুইলাম। শুইতে না না শুইতে ঘোর নিদ্রায় অভিভূত হইয়া পড়িলাম। চৈতন্য কিছু মাত্র রহিল না।

প্রাতঃকাল হইলে অল্পে অল্পে জ্ঞানের উদয় হইল। কিন্তু মাথা বড় ব্যথা করিতে লাগিল, মাথা যেন তুলিতে পারি না। যাহা হউক, জ্ঞান হইলে দেখি যে, শিয়রে আমার ব্যাগ নাই। চারিদিকে চাহিয়া দেখি যে, গাড়ীতে সে লোকটা নাই। আমার মাথায় যেন বজ্রাঘাত পড়িল। আস্তে-আস্তে উঠিয়া গাড়ীর চারিদি তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিলাম। ব্যাগ নাই। ব্যাগ দেখিতে পাইলাম না। আমার যে ঘোর সর্ব্বনাশ হইয়াছে, এখন তাহা নিশ্চয় বুঝিলাম। এক বৎসর ধরিয়া, এত কষ্ট পাইয়া, জল খাইয়া, যে টাকা আমি সঞ্চয় করিয়াছিলাম, আজ সে টাকা আমার নাই।

কিরূপ মৰ্ম্মভেদী অসহ্য যাতনা অমার মনের ভিতর তখন হইল, একবারও বুঝিয়া দেখ! কঙ্কাবতী! মানুষের মনে এরূপ নিষ্ঠুরতা কোথা হইতে আসিল? যদি এ নিষ্ঠুরতা নরক না হয়, তবে নরক আবার কি? কঙ্কাবতী! মানুষ মানুষকে এরূপ যাতনা দেয় কেন? পরকে যাতনা দিতে, তাদের কি ক্লেশ হয় না?

অনেকক্ষণ পরে কঙ্কাবতীর চক্ষুতে জল আসিল, কঙ্কাবতী কাঁদিতে লাগিলেন। কঙ্কাবতী বলিলেন,—ভাল হইয়াছে। কাজ নাই আর এ জগতে থাকিয়া। চল আমরা এ জগৎ হইতে যাই। নাকেশ্বরী আমাদের শত্রু নয়,নাকেশ্বরী আমাদের পরম মিত্র।

খেতু বলিলেন,–কান পাতিয়া শুন দেখি! নাকেশ্বরীর কোনও সাড়া-শব্দ পাও কি?কঙ্কাবতী একটু কান পাতিয়া শুনিলেন, তাহার পর বলিলেন,–না—কোনরূপ সাড়া-শব্দ নাই।–খেতু পুনরায় বলিলেন,–তবে শুন, তাহার পর কি হইল। নাকেশ্বরী আসিতে আসিতে সকল কথা বলিয়া লই।

যখন বুঝিলাম যে, আমার টাকাগুলি চুরি গিয়াছে, তখন মনে করিলাম,–আজ আমার সকল আশা নির্মুল হইল! যে লোকটি আমার সঙ্গে গাড়ীতে ছিল সে চোর। জলখাবারের সঙ্গে সে কোনও প্রকার মাদক দ্রব্য মিশাইয়া দিয়াছিল। সেই জল-খাবার খাইয়া যখন আমি অজ্ঞান হইয়া পড়ি, তখন সে আমার টাকাগুলি লইয়া পলাইয়াছে। কখন কোন্ ষ্টেশনে নামিয়া গিয়াছে, তাহা আমি কি করিয়া জানিব? সুতরাং চোর ধরা পড়িবার কিছুমাত্র সম্ভাবনা নাই। তবু, রেলের কর্মচারীদিগকে সকল কথা জানাইলাম। আমাকে সঙ্গে লইয়া, সমস্ত গাড়ী তাঁহারা অনুসন্ধান করিলেন।

কোনও গাড়ীতে সে লোকটিকে দেখিতে পাইলাম না। তখন আমি পৃথিবী শূন্য দেখিতে লাগিলাম! কঙ্কাবতী! এই যে মনুষ্যজীবন দেখিতেছ, কেবল কতকগুলি আশা ও হতাশা, এই লইয়াই মনুষ্যজীবন। কি করিব আর, কঙ্কাবতী! চুপ করিয়া রহিলাম। ভাবিতে লাগিলাম—এখন করি কি? যাই কোথায়? কলিকাতা যাই, কি কাশী ফিরিয়া যাই, কি দেশে যাই। তারপর মনে পড়িল যে রাণীগঞ্জের টিকিটখানি, আর গুটিকত পয়সা ভিন্ন হাতে আর কিছুই নাই যাহা হউক, হাতে পয়সা থাকুক আর নাই থাকুক, দেশে আসাই যুক্তিসিদ্ধ বিবেচনা করিলাম। কারণ তোমাকে বলিয়াছিলাম যে, এক বৎসর পরে ফিরিয়া আসিব। তুমি পথ পানে চাহিয়া থাকিবে।

হয় তো কত তাড়না, কত গঞ্জনা, কত লাঞ্ছনা তোমাকে সহ্য করিতে হইতেছে। মনে করিলাম,—তোমার বাপের পায়ে গিয়া ধরি, তাঁহাকে দুই হাজার টাকার-খত লিখিয়া দিই, মাসে মাসে টাকা দিয়া ঋণ-পরিশোধ করিব। কঙ্কাবতী! বার-বার তোমার বাপের কথা মুখে আনিতে মনে বড় ক্লেশ হয়। তিনি কেন যাই হউন না, তোমার পিতা তো বটে! তাঁর কথা বলিতে গেলেই যেন নিন্দা হইয়া পড়ে।

মনে করিয়াছিলাম, এখান হইতে প্রচুর ধন দিয়া, ধনের উপর তাঁহার বিতৃষ্ণা করিয়া দিব! পৃথিবীর আর একটি রোগ দেখ, কঙ্কাবতী। ধনের জন্য সবাই উন্মক্ত, ধনের জন্য সবাই লালায়িত। পেটে কত-কটি খাই, কঙ্কাবতী!

গায়ে কি পরি? যে ধন-পিপাসায় এক তৃষিত হইব! হা! ধন উপার্জনের আবশ্যক কেন না, ইহা দ্বারা আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবের উপকার করিতে পারা যায়, নিরাশ্রয়কে আশ্রয় প্রদান করিতে পারা যায়, ক্ষুধার্তকে অন্ন দিকে পারা যায়, দায়গ্রস্তকে দায় হইতে মুক্ত করতে পারা যায়, অনেক পরিমাণে দুঃখময় জগতের দুঃখ মোচন করিতে পারা যায়।

যাঁহার দ্বারা অনেকের-উপকার হয়, যিনি আমোদ-প্রমোদে বিরত হইয়া, ভোগ-বিলাস পরিহার করিয়া, জগতের হিতের নিমিত্ত অথোপার্জনের যা জ্ঞানো-পাৰ্জ্জনে সময় অতিবাহিত করেন, তিমিরাবৃত এই সংসারে তিনি দেবতাস্বরূপ। কিন্তু তা বলিয়া কঙ্কাবতী! ধনোপাৰ্জনে তোক যেন উন্মত্ত না হয়।

জ্ঞানোপাৰ্জনে ও ধনোপাৰ্জনে লোক উন্মত্ত হয় হউক। মেঘের বর্ষণ, প্রবল প্রভঞ্জনের গভীর গর্জন, পৃথিবীর নিম্ন প্রদেশেই ঘটিয়া থাকে। উর্দ্ধপ্রদেশে সেই মহা আকাশে সব স্থির, সব শান্ত।

সেইরূপ মানবের এই কর্মক্ষেত্রেও উচ্চতা নীচতা আছে। ধন মান জাত ধৰ্ম্ম লইয়া যত কিছু কোলাহল শুনিতে পাও, অজ্ঞানতাময় নাচ-পথাশ্রিত মানব মন হইতেই সে সমুদয় উত্থিত হয়। এই মৃত্যু-সময়ে পাও, মোহান্ধ, নিম্ন-পথাবলম্বী মানব কুলের বৃথাবিসংবাদ প্রত্যক্ষ দেখিয়া, কঙ্কাবতী! আমি আর হাস্য-সংবরণ করিতে পারিতেছি না।

কলিকাতা কি কাশী না গিয়া বাড়ী যাইব, এইরূপ মনে মনে স্থির করিয়া রাণীগঞ্জে নামিলাম। রাণীগঞ্জ হইতে আমাদের গ্রামে আসিতে দুইটি পথ আছে। একটি রাজপথ, যাহা দিয়া অনেক লোক গতি-বিধি করে, দ্বিতীয়টি বনপথ, যাহাতে বাঘ-ভাল্লুকের ভয় আছে, সেজন্য সে পথ দিয়া লোকে বড় যাতায়াত করে না। বনপথটি কিন্তু নিকট। সে পথটি দিয়া আসিলে পাঁচ দিনে আমাদের গ্রামে উপস্থিত হইতে পারা যায়, রাজপথ দিয়া যাইলে ছয় দিন লাগে। রাণীগঞ্জে যখন নামিলাম, তখন আমার হাতে কেবল চারিটি পয়সা ছিল। শীঘ্র গ্রামে পৌঁছিব, সে নিমিত্ত আমি বন-পথটি অবলম্বন করিলাম।

প্রথম দিনেই পয়সা কয়টি খরচ হইয়া গেল। পাহাড় পর্ব্বত, বন-উপবন, নদীনির অতিক্রম করিয়া চলিতে লাগিলাম। বনের ফল-মূল যাহা কিছু পাই, তাহাই খাই। রাত্রিতে যে দিন গ্রাম পাই, সে দিন কাহারও দ্বারে পড়িয়া থাকি। যে দিন গ্রাম না পাই সে দিন গাছতলায় শুইয়া থাকি। মনে করিলাম আমাকে বাঘ-ভাল্লুকে কিছু বলিবে না, তার জন্য কোন চিন্তা নাই। আমাকে যদি বাঘ ভাল্লুকে খাইবে, তবে পৃথিবীতে এমন হতভাগ্য আর কে আছে যে, এ দুঃখ সব ভোগ করিবে।

এই চারিদিন কাটিয়া গেল। আমাদের গ্রাম হইতে যে উচ্চ পর্ব্বতটি দেখিতে পাওয়া যায় সন্ধ্যাবেলা আমি সেই পৰ্ব্বতের নিম্নদেশে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। সেই পৰ্বতটি এই; যাহার ভিতর এক্ষণে আমরা রহিয়াছি। এখান হইতে আমাদিগের গ্রাম প্রায় এক দিনের পথ। কয় দিন অনাহারে ক্রমেই দুৰ্বল হইয়া পড়িয়াছিলাম। মনে করিলাম, প্রাতঃকালে আরও অধিক দুর্বল হইয়া পড়িব, তাঁহার চেয়ে সমস্ত রাত্রি চলি, সকাল বেলা গ্রামে গিয়া পৌঁছিব। এইরূপ ভাবিয়া, সে রাত্রিতে আর বিশ্রাম না করিয়া, ক্রমাগত চলিতে লাগিলাম!–রাত্রি এক প্রহরের পর চন্দ্র অস্ত যাইলেন, ঘোরতর অন্ধকারে বন আচ্ছন্ন হইল, আমি পথ হাবাইলাম। নিবিড় বনের মধ্যে গিয়া পড়িলাম, কোনও দিকে আর পথ পাই না। একবার অগ্রে যাই, একবার পশ্চাতে যাই, একবার দক্ষিণে যাই, একবার বামদিকে যাই, পথ আর কোনও দিকে পাই না। অনেকক্ষণ ধরিয়া অতি কষ্টে বনের ভিতর ঘুরিয়া বেড়াইলাম, পথ কিন্তু কিছুতেই পাইলাম না।

অবশেষে নিতান্ত ক্লান্ত হইয়া পড়িলাম। এমন সময়, সম্মুখে একটি মন্দির দেখিতে পাইলাম। মন্দিরটি দেখিয়া আমার মৃতপ্রায় দেহে পুনরায় প্রাণের সঞ্চার হইল।

ভাবিলাম, অবশ্য এই স্থানে লোক আছে। আর কিছু পাই না পাই, এখন একটু জল পাইলে প্রাণ রক্ষা হয়। এই ভাবিয়া,তৃষিত চাতকের ন্যায় ব্যগ্রতার সহিত মন্দিরের দিকে যাইলাম।

হা অদৃষ্ট। গিয়া দেখিলাম, মন্দিরে দেবী নাই, মন্দিরটি অতি প্রাচীন, ভগ্ন; ভিতর ও বাহির বন্য বৃক্ষলতায় আচ্ছাদিত! বহুকাল হইতে জনমানবের সেখানে পদার্পণ হয় না। হা ভগবান! তোমার মনে আর ও কত কি আছে। এই বলিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া সেইখানে আমি শুইয়া পড়িলাম।

 

একাদশ পরিচ্ছদ – ভূত-কোম্পানী

খেতু বলিলেন,–রাত্রি প্রায় দুই প্রহর হইয়াছে, অতিশয় ভ্রান্তি বশতঃ আমার একটু নিদ্রার আবেশ হইয়া আসিতেছে, এমন সময় মন্দিরের সোপানে কি ঠক্ ঠক্ করিয়া শৰু হইতে লাগিল। চাহিয়া দেখি না, ভীষণাকার শ্বেতবর্ণ এক মড়ার মাথা। একটি পৈটা হৈতে অন্য পৈটার উপর লাফাইয়া উঠিতেছে। কঙ্কাবতী! ভয় আমার শরীরে কখনও, নাই, তবুও এই মড়ার মাথার কাণ্ড দেখিয়া আমার শরীর কেমন একটু রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল। আমি উঠিয়া বসিলাম। মড়ার মাথাটি লাফাইয়া সমস্ত পৈটাগুলি উঠিল, তারপর ভাঁটার মত গড়াইতে গড়াইতে আমার নিকট আসিয়া উপস্থিত হইল। আমার নিকট আসিয়া একটি লাফ মারিল, লাফ মারিয়া আমার ঠিক মুখের সম্মুখে শূণ্যেতে কিছুক্ষণের নিমিত্ত আমার দিকে চাহিয়া রহিল। সেইখানে থাকিয়া আকর্ষণ হাঁ করিয়া দন্তপাঁতি বাহির করিল।

এইরূপ বিকটাকার হাঁ করিয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করিল,—বাবু! তুমি না কি ভূত মানো না? আমি উত্তর করিলাম,—রক্ষা করুন, মহাশয়! আপনারা পর্যন্ত আর আমার সহিত লাগিবেন না। নানা কষ্টে, নানা দুঃখে আমি বড়ই উৎপীড়িন হইয়াছি। যান, ঘরে যান! আমাকে আর জ্বালাতন করিবেন না।

আমার কথায় মুণ্ডুটির আরও ক্রোধ হইল। চীৎকার করিয়া সে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিল,—বাবু! তুমি নাকি ভূত মানো না? ইংরেজী পড়িয়া তুমি নাকি ভূত মানো না?

আমি বলিলাম,–ইংরেজি-পড়া বাবুরা ভূত মানেন না বলিয়া কি আপনার রাগ হইয়াছে? লোকে ভূত না মানিলে কি আপনাদের অপমান বোধ হয়?

মড়ার মুণ্ডু উত্তর করিল,—রাগ হইবে না তো কি, সৰ্ব্বশরীর শীতল হইবে? ভূত না মানিলে ভূতদিগের অপমান হয় না তো কি আর ময্যাদা বাড়ে? কেন লোকে বলিবে যে, পৃথিবীতে ভূত নাই? ইংরেজী-পড়া বাবুদের আমরা কি করিয়াছি যে, তাঁহারা আমাদিগকে পৃথিবী হইতে একেবারে উড়াইয়া দিবে। দেবতাদিগকে তোমরা উড়াইয়া দিয়াছ, এখন এই উপদেবতা কয়টাকে শেষ করিতে পারিলেই হয়। বটে!

দুঃখের সময়ও হাসি পায়! দেবতাদিগকে না মানিলে না পূজা দিলে, দেবতাদিগের রাগ হয়, দেবতারা মুখ হাঁড়ি করিয়া বসিয়া থাকেন, এ কথা পূর্ব্বে জানিতাম; কিন্তু লোকে ভূত না মানিলে, ভূতের রাগ হয়, ভূতের অপমান হয়, এ কথা কখনও শুনি নাই। আমার তাই হসি পাইল। আমি বলিলাম,–হাঁ মহাশয়! ইংরেজী-পড়া বাবুদের এটি অন্যায় বটে।

আমার কথায় মড়ায় মাথা কিছু সন্তুষ্ট হইল, অনেকটা তাঁহার রাগ পড়িল। মুণ্ডু বলিল,–তুমি ছোকরা দেখিতেছি ভাল। ইংরেজী-পড়া বাবুদের মত ত্রিপশু নাস্তিক নও! তোমার মাথায় টিকি আছে? আমি বলিলাম,–না মহাশয়! আমার মাথায় টিকি নেই।

মুণ্ডু বলিল,এইবার ঘরে গিয়া টিকি রাখিও। আর শুন, ইংরেজী-পড়া বাবুদের আমরা সহজে ছাড়িব না। যাহাতে পুনরায় ভূতের উপর তাহাদিগের বিশ্বাস জন্মে, আমরা সে সমুদয় আয়োজন করিয়াছি। আমরা তাহাদিগকে ভজাইব। যেখানে সেখানে গিয়া বক্তৃতা করিব, পুস্তক ছাপাইব, সংবাদপত্র বাহির করিব। এই সকল কায্যের নিমিত্ত আমরা কোম্পানী খুলিয়াছি। কোম্পানীর নাম রাখিয়াছি, স্কল, স্কেলিটন এণ্ড কোং!

কঙ্কাবতী! তোমার বোধ হয়, মনে থাকিতে পারে যে, স্কল মানে মনুষ্যের মাথার খুলি, কেলিটন মানে কঙ্কাল, অথাৎ অস্থি-নিম্মিত মনুষা-শরীরের কাঠামো। মুণ্ডু যাহা বলিল, তাঁহার অর্থ এই যে, ইংরেজী-পড়া লোকেরা যাহাতে ভূতের অস্তিত্ব স্বীকার করেন, তাঁহাদের মনে যাহাতে ভূতের উপর বিশ্বাস হয়, ভূতের প্রতি ভক্তি হয়, এইরূপ শিক্ষা দিবার নিমিত্ত খুলি, কঙ্কাল প্রভৃতি ভূতগণ দলবদ্ধ হইয়াছেন।

স্কল অথাৎ সেই মড়ার মাথাটি আমাকে পুনরায় বলিলেন, আমরা কোম্পানী খুলিয়াছি। কোম্পানীর নাম রাখিয়াছি, স্কুল স্কেলিটন এণ্ড কোং। ইংরেজী নাম রাখিয়াছি কেন, তা জান? তাহা হইলে পসার বাড়িবে, মান হইবে, লোকের মনে বিশ্বাস জন্মিবে। যদি নাম রাখিতাম খুলি, কঙ্কাল এবং কোম্পানী তাহা হইলে কেহই আমাদিগকে বিশ্বাস করিত না। সকলে মনে করিত, ইহারা জুয়াচোর। দেখিতে পাও না? যে, যখন মুখোপাধ্যায়, বন্দ্যোপাধ্যায়ও চট্টোপাধ্যায় মহাশয়েরা জুতা কি শরাপ কি হ্যাম বা শুকরের মাংসের দোকান করেন, তখন সে দোকানের নাম দেন, লংম্যান এণ্ড কোং। অথবা গুডম্যান এণ্ড কোং। দেখিয়া শুনিয়া শত-সহস্র বার ঠকিয়া দেশী লোককে আর কেহ বিশ্বাস করে না। বরং ইংপ্রুজ পিজ দোকানীর কথা লোকে বিশ্বাস করে, তবু দেশী দোকানীর কথা লোকে বিশ্বাস করে না। আবার দেখ, বেদের কথা বল, শাস্ত্রের কথা বল, বিলাতী সাহেবেরা যদি ভাল বলেন, তবেই বেদ পুরাণ ভাল হয়। দেশী পণ্ডিতদের কথা কেহ গ্রাহ্য করে না। এই সকল ভাবিয়া চিন্তিয়া আমাদের কোম্পানীর নাম দিয়াছি স্কল স্কেলিটন এণ্ড কোং। স্কেলিটন ভায়া ঐখানে দাঁড়াইয়া আছেন। এস তো, স্কেলিটন ভায়া, একটু এদিকে এসে তো।

হাড় ঝম্ ঝম্ করিতে করিতে স্কেলিটন আমার নিকটে আসিলেন। সৰ্ব্বশরীরের অস্থিকে স্কেলিটন বলে, কিন্তু এক্ষণে আমার সম্মুখে যিনি আসিয়া উপস্থিত হইলেন, তিনি দেখিলাম মুণ্ডুহীন স্কেলিটন।–তখন স্কল আমাকে পুনরায় বলিলেন,–কেমন! ভূতের উপর এখন তোমার সম্পূর্ণরূপ বিশ্বাস হইয়াছে তো?

আমি উত্তর করিলাম,—পূৰ্ব্ব হইতেই আমার বিশ্বাস আছে। কারণ, ভূতের ষড়যন্ত্রেই আমি এত দিন ধরিয়া ক্লেশ ভোগ করিতেছি, কিন্তু সে অন্য প্রকার ভূত। এখন হইতে আপনাদিগের মত ভূতকে মানিয়া লইলাম। প্রত্যক্ষ চক্ষের উপর দেখিয়া আর কি করিয়া না মানি? তার জন্য আর আপনারা কোনও চিন্তা করিবেন না; যান, এক্ষনে ঘরে যান। রাত্রি অধিক হইয়াছে। আপনাদিগের ঘরের লোক ভাবিবে। আর আমাকে একটু নিদ্রা যাইতে হইবে। কারণ, কাল প্রাতঃকালে আবার আমাকে পথ চলিতে হইবে।

স্কল তখন স্কেলিটনকে বলিলেন,–দেখিলে, স্কেলিটন ভায়া কোম্পানী খুলিলে কত উপকার হয়। ইংরেজী পড়িয়া এই বাবুটির মতিগতি একেবারে বিকৃত হইয়া গিয়াছিল। দুকথাতেই পুনরায় ইহাকে স্বধর্মে আনয়ন করিলাম। এক্ষণে চল, অন্যান্য বিকৃতমতি বাবুদিগকে অন্বেষণ করি। ভূতবর্গের প্রতি যাহাতে তাঁহাদের শ্রদ্ধা-ভক্তি হয়, চল, সেইরূপ উপায় করি।

স্কেলিটন হাড়ঝম্ ঝম্ করিলেন। আমি একটু কান পাতিয়া শুনিলাম যে, সে কেবল হাড় ঝম্ ঝম্ নয়। তাঁহার মুণ্ডু নাই, সুতরাং মুখ দিয়া কথা কহিবার তাঁহার উপায় নাই। সে জন্য গায়ের হাড় নাড়িয়া হাড় ঝম ঝম্ করিয়া তিনি কথাবার্তা কহিয়া থাকেন। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, সে কথা আমি অনায়াসে বুঝিতে পারিলাম।

স্কেলিটন বলিলেন,–যদি ইনি ভূতভক্ত হইলেন, তবে ইহাকে পুরস্কার দেওয়া উচিত। লোককে ভক্ত করিতে হইলে অর্থদান একটি তাঁহার প্রধান উপায়। অর্থ পাইলে লোকে অতি ধৰ্ম্মবান্, অতি ভক্তিমান্ মহাপুরুষ হয়। অএব তুমি ইহাকে ধন দান কর। যখন দেশে গিয়া, ইনি গল্প করিবেন, তখন শত শত লোক অর্থলোভে ভূতভক্ত হইবে।

আমি বলিলাম,–সম্প্রতি আমার অর্থের নিতান্ত প্রয়োজন আছে বটে কিন্তু আমি অর্থলোভী নই। ধন দিয়া আমাকে ভূতভক্ত করিতে হইবে না। আপনাদের অর্থ লইব না।

এই কথা শুনিয়া স্কুল আরও প্রসন্নমূৰ্ত্তি ধারণ করিলেন। তিনি বলিলেন,–এস, আমাদের সঙ্গে এস। আমাদের সঞ্চিত ধন তোমাকে দিলে ধনের সাফল্য হইবে, ধন সুপাত্রে অর্পিত হইবে, সে ধন দ্বারা মঙ্গল সাধিত হইবে সেই জন্য তোমাকে আমাদের সঞ্চিত ধন দিব। জীবিত থাকিতে আমরা ধনের সদ্ব্যবহার করি নাই। এক্ষণে তোমা কর্তৃক সে ধনের সদ্ব্যবহার হইলে, আমাদের উপকার হইবে।

স্কেলিটনও আমাকে সেইরূপ অনেক অনুরোধ করিলেন। দুই ভূতের অনুরোধে আমি তাঁহাদিগের সঙ্গে চলিলাম। স্কেলিটন হাঁটিয়া চলিলেন, আর স্কুল স্থানবিশেষে লাফাইয়া বা গড়াইয়া যাইতে লাগিলেন। প্রথমে তাঁহারা আমাকে অনেকগুলি-বৃক্ষের নিকট লইয়া যাইলেন। আ, কদলী পনস, কেন্দু পিয়াল নানা ফল সেইখানে সুপ হইয়াছিল। সেই ফল আমাকে তাঁহারা আহার করিতে বলিলেন। আমি আহার করিলাম। তাহার পর তাহাঁরা আমাকে সুশীতল স্কটিকসদৃশ নিঝর দেখাইয়া দিলেন। জলপান করিয়া পিপাসা দূর করিলাম। সেখান হইতে আমরা পুনরায় চলিলাম। অল্পক্ষণ পরে এই পর্ব্বতের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইলাম। পর্ব্বতের এক স্থানে আসিয়া স্কুল বলিলেন,–এই খানকার বন আমাদিগকে একটু পরিষ্কার করিতে হইবে। আজ সহস্র বৎসর ধরিয়া এখানে জনমানব পদাপর্ণ করে নাই। আমরা তিন জনে অনেকক্ষণ ধরিয়া সেই বন পরিষ্কার করিতে লাগিলেন। পরিষ্কৃত হইলে পৰ্ব্বতের গাঁথুনির ঈষৎ একটু রেখা বাহির হইয়া পড়িল। সুড়ঙ্গ দ্বারে ভয়ঙ্করী নাকেশ্বরী দেখিলাম। নাকেশ্বরী খল খল করিয়া হাসিল। কিন্তু যেই স্কল চক্ষু-কোটর বিস্তৃত করিয়া তাঁহার দিকে কোপ কটাক্ষ করিলেন, আর সে চুপ করিল। সুড়ঙ্গের পথ দিয়া আমরা এই অট্টালিকার ভিতরে প্রবেশ করিলাম। এই বিপুল ধনরাশি দেখিয়া আমি চমৎকৃত হইলাম।

স্কল বলিলেন,—সহস্র বৎসর পূর্ব্বে এই অঞ্চলের আমরা রাজা ছিলাম। প্রতিবেশী রাজগণের সহিত যুদ্ধ করিয়া এই অপরিমিত ধন অৰ্জন করি। জীবিত থাকিতে ধম্মকৰ্ম্ম কিছুই করি নাই, কেবল যুদ্ধ ও ধনসঞ্চয় করিয়া জীবন অতিবাহিত করিয়াছিলাম। আমাদের সন্তান সন্ততি ছিল না। সে জন্য কিন্তু আমরা দুঃখিত ছিলাম না, বরং আনন্দিত ছিলাম। যেহেতু সন্তান-সন্ততি দ্বারা ধনের ব্যায় হইবার সম্ভাবনা। টাকা গণিয়া, টাকা নাড়িয়া চাড়িয়া, আমরা স্বর্গসুখ উপভোগ কবিতাম। আমাদের অবর্তমানে পাছে কেহ এই ধন লয়, সে জন্য আমরা ইহার উপর, যক্‌ দিলাম, অর্থাৎ ইহার উপর এক ভূতিনীকে প্রহরিণী-স্বরূপ নিযুক্ত করিলাম, এ কাৰ্যে যক্ষ বা যক্ষিণী নিযুক্ত করি নাই। কথায় বলেন বটে, কিন্তু ধনের উপরে যক্ষ বা যক্ষণী কেহ নিযুক্ত করিতে পারে না। যাহা হউক আমাদিগের ধন ঐশ্চয্যের উপর যক্ দিবার উদ্দেশ্য প্রথমে পৰ্বত অভ্যন্তরে এই সুরম্য অট্টালিকা নিৰ্মান করিলাম। রাজবাড়ী হইতে সমুদয় টাকাকড়ি মণি-মুক্তা বসন-ভূষণ ইহার ভিতর লইয়া আসিলাম। যথাবধি যাগ-যজ্ঞাদি ক্রিয়া করিয়া নবমবর্ষীয়া সুলক্ষণা একটি বালিকাকে উৎসর্গ করিয়া, তাঁহাকে বলিয়া দিলাম যে এক সহস্র বৎসর পর্যন্ত তুমি এই ধনের প্রহরিণীস্বরূপ নিযুক্ত থাকিবে এক সহস্র বৎসরের মধ্যে যদি কেহ এই ধনের এক কণা মাত্রও লয় তাহা হইলে তৎক্ষণাৎ তুমি তাঁহার প্রাণবধ করিবে। এক সহস্র বৎসর পরে তুমি যেখানে ইচ্ছা সেইখানে যাইও, তখন যাহার অদৃষ্টে থাকিবে, সে এই ধনের অধিকারী হইবে। বালিকাকে এইরূপ আদেশ করিয়া, অট্টালিকার ভিতর একটি প্রদীপ জ্বালিয়া, আমরা সুড়ঙ্গের দ্বার রুদ্ধ করিয়া দিলাম! প্রদীপটি যেই নিব্বাণ হইল, আর বালিকার মৃত্যু হইল, মরিয়া সে ভীষণাকৃতি অতি দীর্ঘ নাসিকা-ধারিণী ভূতিনী হইল। ভূতসমাজে সে জন্য সে নাকেশ্বরী নামে পরিচিত। দ্বারে যে এই প্রহরিণী-স্বরূপ রহিয়াছে, সে সেই বিকৃত আকৃতি ভুতিনী, যাহার বিকট হাসি তুমি এই মাত্র শুনিলে। বালিকা না রাখিয়া ধনের উপর অনেকে বালক প্রহরী নিযুক্ত করিয়া থাকে। বালক মরিয়া ভূত হয়। কিছুদিন পরে যুদ্ধে আমরা হত হইয়া শত্রুর তরবারি-আঘাতে দেহ হইতে মরিয়া ভূত হয়। কিছুদিন পরে যুদ্ধে আমরা হত হইয়া শত্রুর তরবারি-আঘাতে দেহ হইতে মুণ্ডু বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়। জীবিত থাকিতে ছিলাম এক জন মনুষ্য; মরিয়া হইলাম দুই জন ভূত। মুণ্ডুটি হইলাম আমি স্কুল আর ধড়টি হইলেন ইনি স্কেলিটন ভায়া। ৯৯৯ বৎসর পূর্ব্বে আমরা এই ধনের উপর ষক্‌ দিয়াছি। আর এক বৎসর গত হইলেই সহস্র বৎসর পূর্ণ হয়। তখন নাকেরী এখন ছাড়িয়া দিবে। গত পৌষ মাসে নাকেশ্বরীর সহিত ঘ্যাঁঘোঁ নামক ভূতের শুভবিবাহ হইয়াছে। নাকেশ্বরী আপনার শ্বশুরালয়ে চলিয়া যাইবে। তখন এ ধন লইলে আর তোমার কোনও বিপদ ঘটিবে না। কিন্তু এই এক বৎসরের ভিতর কোনও মতে এ ধনের কণামাত্র স্পর্শ করিবে না, করিলেই অবিলম্বে নাকেশ্বরী তোমাকে খাইয়া ফেলিবে, অবিলম্বে তোমার মৃত্যু ঘটিবে। এই ধনসম্পত্তির প্রকৃত স্বামী আমরা দুই জন। এই ধন আমরা তোমাকে প্রদান করিলাম। কিন্তু সাবধান, এই এক বৎসরের ভিতর এ ধন স্পর্শ করিবে না।–আমি উত্তর করিলাম,–মহাশয়! আপনাদের কৃপায় আমি অতিশয় অনুগৃহীত হইলাম। যদি আমাকে এ সম্পত্তি দিলেন তবে এরূপ কোন একটা উপায় করুন, যাহাতে এ ধন হইতে এখন আমি কিছু লইতে পারি। সম্প্রত্তি আমার অর্থের নিতান্ত প্রয়োজন। এখন যদি পাই, তবে আমার বিশেষ উপকার হয়, এমন কি, আমার প্রাণরক্ষা হয়। এখন না পাইলে, এক বৎসর পরে জীবিত থাকি কিনা তাই সন্দেহ।

এই কথা শুনিয়া অনেকক্ষণ ধরিয়া স্কুল ও স্কেলিটন পরামর্শ করিতে লাগিলেন। তাঁহারা কি বলাবলি করিলেন, আমি তাহা বুঝিতে পারিলাম না।

স্কল বলিলেন,–এ, আমাদের সঙ্গে পুনরায় বাহিরে এস, সকলে পুনরায় যাইলাম, বনের ভিতর পুনরায় আমরা ভ্রমণ করিতে লাগিলাম। স্কুল বন খুঁজিতে লাগিলেন। অবশেষে সামান্য একটি ওষুধির গাছ দেখাইয়া তিনি আমাকে বলিলেন,–এই গাছটির তুমি মূল উত্তোলন কর! আমি সেই গাছটির শিকড় তুলিলাম। স্কুলের আদেশে অপর একটি গাছের আঠা দিয়া সেই শিকড়টি আমার চুলের সহিত জুড়িয়া দিলাম। তাহার পর সকলে পুনরায় আবার এই অট্টালিকায় ফিরিয়া আসিলাম।

এইখানে উপস্থিত হইয়া স্কুল বলিলেন,–যে সকল কথা তোমাকে আমি এখন বলি অতি মনোযোগের সহিত শুন। আপাততঃ যথা প্রয়োজন টাকা লইয়া তুমি তোমার কাৰ্য্য সমাধা করিবে। যে শিকড় তোমাকে আমরা দিলাম, তাঁহার গুণ এই যে, ইহা মাথায় থাকিলে, যতক্ষণ তুমি অট্টালিকার ভিতর থাকিবে, ততক্ষণ নাকেশ্বরী তোমার প্রাণবধ করিতে পারিবে না। অট্টালিকার বাহিরে শিকড় তোমাকে রক্ষা করিতে পারিবে না শিকড়ের কিন্তু আর একটি গুণ এই যে, ইহা মাথায় থাকিলে যে জন্তুর আকার ধরিতে ইচ্ছা করিবে, তৎক্ষণাৎ সেই জন্তু হইতে পারিবে! ব্যাঘ্র হইতেছেন নাকেশ্বরীর ইষ্ট দেবতা। সেজন্য যখন তুমি অট্টালিকার বাহিরে যাইবে, তখন ব্যাঘ্ররূপ ধরিয়া যাইবে। তাহা হইলে নাকেশ্বরী তোমাকে কিছু বলিতে পারিবে না। তাহার পর অট্টালিকার ভিতর প্রত্যাগমন করিয়া ইচ্ছা করিলেই মানুষের মূৰ্ত্তি ধরিতে পারিবে। অতএব দুইটি কথা স্মরণ রাখিও, কোনও মতেই ভুলিবে না। প্রথম এ এক বত্সর শিকড়টি যেন কিছুতেই তোমার মাথা হইতে না যায় যাইলেই মৃত্যু। তুমি যেখানে থাক না কেন, সেইখানেই মৃত্যু। দ্বিতীয়, ব্যাঘ্ররূপ না ধরিয়া বাহিরে যাইবে না, এক মূহুৰ্ত্ত কালের নিমিত্তও নিজরূপে বাহিরে থাকিবে না, থাকিলেও মৃত্যু সেই দণ্ডেই মৃত্যু। এক বৎসর পরে শিকড়টি দগ্ধ করিয়া সমুদয় ধনসম্পত্তি লইয়া দেশে চলিয়া যাইবে। এ এক বৎসরের ভিতর যদি তুমি ধন না লইতে, তাহা হইলে এ সব কিছুই করিতে হইত না। কারণ নাকেশ্বরী রক্ষিত ধন না লইলে, নাকেশ্বরী কাহাকেও কিছু বলে না, বলিতেও পারে না। যাহা হউক, এক বৎসর পরে ধন ছাড়িয়া নাকেশ্বরী আপনার শ্বশুরালয়ে চলিয়া যাইবে। এ্যাঘ্যোঁ ভূতের সহিত যখন তাঁহার বিবাহের কথা হয়, তখন লোকে কত না ভ্যাচি দিয়াছিল!

আমি জিজ্ঞাস করিলাম,–ভ্যাঙ্‌চি কেন দিয়াছিল, মহাশয়?

স্কল বলিলেন,–তুমি জান না, তাই পাগলের মত কথা জিজ্ঞাসা কর। বিবাহের ভাঙচি দিলে যেমন আমোদটি হয়, এমন আমোদ আর কিছুতে হয় না তুমি একটি পাত্র কি পাত্রী স্থির করিয়া বন্ধুবান্ধব আত্মীয়-স্বজনের মত জিজ্ঞাসা কব; তাঁরা বলিলেন,–দিবে দাও! কিন্তু ঐ যে কিন্তু কথাটি, উহার ভিতর এক জাহাজ মানে থাকে। যাহা হউক, যা বলি আর যাহা কই, ঘ্যাঁঘোঁর বিবাহে অতি চমৎকার ভাঙচি দিয়াছিল। প্রশংসা করিতে হয়! আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,–ভাঙচি আবার চমৎকার কি মহাশয়?

স্কল উত্তর করিলেন,–সাতকাণ্ড,—সেই আমাদের নাম করিতে নাই, তা পড়িয়া থাকিবে, কিন্তু ভূতের কাণ্ড তুমি কিছুই জান না। কি হইয়াছিল বলিতেছি,শুন। ঘ্যাঁঘোঁর সহিত বিবাহের কথা উপস্থিত হইলে, নাকেশ্বরী মাসী পাত্র দেখিতে একটি ভূত পাঠাইয়া দিলেন। ঘ্যাঁঘোঁর বাটীতে সেই ভূত উপস্থিত হইলে, ঘ্যাঁঘোঁ তাঁহার বিশেষ সমাদর করিলেন। আহারাদি প্রস্তুত হইলে, তিনি নিকটস্থ একটি বিলের জলে স্নান করিতে যাইলেন। সেইখানে প্রতিবেশী ভূতগণও পরামর্শ করিয়া স্নান করিতে যাইলেন। তাঁহাদের মধ্যে এক জন আগন্তুক ভূতকে জিজ্ঞাসা করিলেন,—আমার নিবাস একঠেঙো মুল্লুকের ওধারে, বোঁ-ভুলুনি নামক অব গাছে। ঘ্যাঁঘোঁর প্রতিবেশী ভূত পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন,—এখানে কি মনে করিযা আগমন হইয়াছে? আগন্তুক ভূত উত্তর করিলেন, আমি ঘ্যাঁঘোঁকে দেখিতে আসিয়াছি। প্রতিবেশী ভূতগণ তখন জিজ্ঞাসা করিলেন,–মহাশয়, তবে কি বৈদ্য? আগন্তুক ভূত বলিলেন,—কেন? বৈদ্য কেন হইব? ঘ্যাঁঘোঁর কি কোনও পীড়া-শীড়া আছে না-কি? প্রতিবেশী ভূতগণ একটু যেন অপ্রতিভ হইয়া উত্তর করিলেন,—না না! এমন কিছু নয়! তবে একটু একটু খুক খুক করিয়া কাসি আছে, তাঁহার সহিত অল্প অল্প আলকাতরার ছিট থাকে, আর বৈকাল বেলা যৎসামান্য ঘুষঘুষে জ্বর হয়। তা সে কিছু নয়, গরমে হইয়াছে, নাইতে নাইতে ভাল হইয়া যাইবে। এই কথা শুনিয়া আগন্তুক ভূতের তো চক্ষুস্থির! আর তিনি ঘ্যাঁঘোঁর কাছে ফিরিয়া যাইলেন না। সেই বিল হইতে একেবারে একঠেঙা মুল্লুকের ও-ধারে গিয়া উপস্থিত হইলেন। নাকেশ্বরী মাসীকে সকল কথা বলিলেন। সম্বন্ধ ভাঙ্গিয়া গেল। নাকেশ্বরী একটি সুন্দরী ভূতিনী। তাঁহার রূপে ঘাঘো একেবারে মুগ্ধ হইয়াছিল। কত দিন ধরিয়া পাগলের মত সে গাছে গাছে কাঁদিয়া বেড়াইয়াছিল! তারপর মৌনব্রত অবলম্বন করিয়া অন্ধকুপের ভিতর বসিয়াছিল। যাহা হউক, অবশেষে বিবাহ যে হইয়া গিয়াছে, তাহাই সুখের কথা।

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,–শ্লেষ্মার সহিত আলকাতরা কি?

স্কুল বলিলেন,–তোমাদের যেরূপ রক্ত, আমাদের সেইরূপ আলকাতরা। কাসরোগে আমাদের বক্ষঃস্থল হইতে আলকাতরা বাহির হয়।

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,–যদি আমাদের মত ভূতদিগের রোগ হয়, তাহা হইলে ভূতেরাও তো মরিয়া যায়? আচ্ছা! মানুষ মরিয়া তো ভূত হয়, ভূত মরিয়া কি হয়?

স্কল উত্তর করিলেন,—কেন? ভূত মরিয়া মারবেল হয়? সেই যে ছোট ছোট গোল গোল ভাঁটার মত মারবেল, যাহা লইয়া ছেলেরা সব খেলা করে!

আমি বলিলাম,–মারবেল হয়! পৃথিবীতে এত বস্তু থাবিতে মারবেল হয় কেন?

স্কল আমার এই কথায় কিছু রাগতঃ হইয়া বলিলেন,–ভুল হইয়াছে। তোমার সহিত পরামর্শ করিয়া তারপর আমাদের মরা উচিত। এখন হইতে না হয় তাই কবা যাইবে।

আমি বলিলাম,—মহাশয়! আমার অপরাধ ক্ষমা করুন। আমি জানি না, তাই জিজ্ঞাসা করিতেছি! যদি অনুমতি করেন তো আর একটি কথা জিজ্ঞাসা করি,ভূত মরিয়া যদি মারবেল হয়, তাহা হইলে মারবেল লইয়া খেলা করা তো বড় বিপদের কথা?

স্কুল উত্তর করিলেন,—মরা ভূত লইয়া খেলা করিতে আবার দোষ কি? হাঁ! জীবন্ত ভূত হইত! তাহা হইলে তাঁহার সহিত খেলা করা বিপদের কথা বটে!

স্কুল পুনরায় বলিলেন,—তোমার সহিত আর আমাদের মিছামিছি বকিবার সময় নাই। আমরা কোম্পানী খুলিয়াছি, এখন গিয়া কোম্পানীর কাজ করি। আমরা স্কল স্কেলিটন এণ্ড কোম্পানী। আমরা কম ভূত নই। যে সব কথা বলিয়া দিয়াছি, সাবধানে মনে করিয়া রাখিবে। তা না হইলে বিপদে পড়িবে। এখন আমরা চলিলাম। আর তোমার সহিত আমাদের সাক্ষাৎ হইবে না!

এই বলিয়া স্কুল ও স্কেলিটন সেখান হইতে প্রস্থান করিলেন। অট্টালিকার ভিতর আমি একেলা বসিয়া রহিলাম। তাহার পর কি করিলাম, তাহা তুমি জান, বলিবার আর অবশ্যক নাই। কঙ্কাবতী! কথা এই! এখন সকল কথা তোমাকে বলিলাম।–কঙ্কাবতী বলিলেন,–তবে আমিও যাই, গিয়া নাকেশ্বরীর টাকা লই, তাহা হইলে আমাদের দুই জনকে সে এক সঙ্গে মারিয়া ফেলিবে। পতিপরায়ণ সতীর ইহার চেয়ে আর সৌভাগ্য কি?

এই কথা বলিয়া কঙ্কাবতী উঠিবার উপক্রম করিতেছেন, এমন সময় এক অতীথি ভয়াবহ চীৎকারে সে স্থান পরিপুরিত হইল। অট্টালিকা কাঁপিতে লাগিল। দ্বার গবাক্ষ পরস্পরে আঘাতিত হইয়া ঝন ঝন করিয়া শব্দ হইতে লাগিল। অট্টালিকা ঘোর অন্ধকারে আচ্ছাদিত হইল। প্রজ্বলিত বাতিটি নির্বাণ হইল না বটে, কিন্তু অন্ধকারে আবৃত হইয়া গেল। খেতু বলিলেন,–কঙ্কাবতী! ঐ নাকেশ্বরী আসিতেছে।

কঙ্কাবতী এতক্ষণ শয্যার ধারে বসিয়াছিলেন। এখন তাড়াতাড়ি উঠিয়া ঘরের দ্বারটি উত্তমরূপে বন্ধ করিয়া দিলেন, আর দ্বারের উপর সমুদয় শরীরের বলের সহিত ঠেশ দিয়া দাঁড়াইলেন। নাকেশ্বরীকে তিনি ভিতরে আসিতে দিবেন না!

অতি দুর্গন্ধে, নিবিড় অন্ধকারে, ঘন ঘন ঘোর গভীর শব্দে, ঘর পরিপূরিত হইল।

ক্রমে শব্দ থামিল, অন্ধকার দূর হইল, বাতির আলোকে পুনরায় ঘর আলোকিত হইল। তখন কঙ্কাবতী দেখিতে পাইলেন যে, মৃতপ্রায় অচেতন হইয়া চক্ষু মুদ্রিত করিয়া, খেতু বিছানায় পড়িয়া আছেন। ভীমরূপা নাকেশ্বরী পার্শ্বে দণ্ডায়মানা, কঙ্কাবতী দৌড়িয়া গিয়া নাকেশ্বরীর পায়ে পড়িলেন।

কঙ্কাবতী বলিলেন,–ওগো! তুমি আমার স্বামীকে মারিও না। আমি বড় দুঃখিনী, আমি কাঙ্গালিনী কঙ্কাবতী। কত দুঃখ পাইয়া আমি এই প্রাণসম পতিকে পাইয়াছি। পৃথিবীতে এই পতি ভিন্ন আমার কেহ নাই। ওগো! আমার স্বামীকে না মারিয়া তুমি আমার প্রাণবধ কর। তোমার পায়ে পড়ি, তুমি আমার স্বামীকে মারিও না। আমরা তোমার এ ধন চাহি না, কিছু চাহি না আমার পতিকে তুমি দাও, আমার পতিকে লইয়া আমি ঘরে যাই। তোমার যাহা কিছু টাকা লইয়াছি, সব ফিরিয়া দিব। মানুষ, খাইতে যদি তোমার সাধ হইয়া থাকে তুমি আমাকে খাও, তুমি আমার রক্ত পান কর। আমার স্বামীকে তুমি কিছু বলিও না, স্বামীকে আমার ফিরিয়া যাইতে দাও।

নাকেশ্বরী পা ধরিয়া কঙ্কাবতী এইরূপে কাঁদিতে লাগিলেন, নানা মতে কাকুতি মিনতি করিতে লাগিলেন। সে খেদের কথা শুনিলে পাষাণও দ্রব্য হইয়া যায়। নাকেশ্বরীর মনে কিন্তু কিছুমাত্র দয়া হইল না, নাকেশ্বরী সে কথায় কর্ণপাতও করিল না। কঙ্কাবতী যত কাঁদেন, আর নাকেশ্বরী বাম হস্ত উত্তোলন করিয়া কেবল বলে—দূর! দূর।

কঙ্কাবতী বলিলেন,—ও গো! আমার স্বামীকে ছাড়িয়া আমি এখান হইতে দূর হইব না। আমার স্বামীকে দাও আমি এখান হইতে এখুনি দূর হইতেছি স্বামী স্বামী! উঠ। চল আমরা এখান হইতে যাই; স্বামী উঠ!–কঙ্কাবতী যত কাঁদেন, যত বলেন, হাত উত্তোলন করিয়া নাকেশ্বরী তত বলে,–দূর, দূর! কঙ্কাবতী উঠিয়া দাঁড়াইলেন। চক্ষু মুছিলেন। তাহার পর আরক্ত নয়নে দৰ্পের সহিত নাকেশ্বরীকে বলিলেন,—আমার স্বামীকে দিবে না? আমাকেও খাইবে না? কেবল—দূর দূর! মুখে অন্য কথা নাই? বটে! তা নাকেশ্বরী হও, আর যাই হও, আজ তোমার একদিন, কি আমার একদিন!

এই কথা বলিয়া পাগলিনী উন্মদিনীর ন্যায়, কঙ্কাবতী নাকেশ্বরীকে ধরিতে যাইলেন। কোনও উত্তর না করিয়া নাকেশ্বরী কেবলমাত্র একটি নিশ্বাস পরিত্যাগ করিল। সেই নিশ্বাসের প্রবল বেগে কঙ্কাবতী একেবারে দ্বারের নিকট গিয়া পড়িলেন।–কঙ্কাবতী পুনরায় উঠিলেন, পুনরায় উঠিয়া নাকেশ্বরীকে ধরিতে দৌড়িলেন। নাকেশ্বরী আর একটি নিশ্বাস ত্যাগ করিল, আর কঙ্কাবতী একেবারে অট্টালিকার বাহিরে গিয়া পড়িলেন।

তখন কঙ্কাবতী আস্তে-আস্তে পুনরায় উঠিয়া নাকেশ্বরীকে বলিলেন,–ওগো! তোমাকে আমি আর ধরিতে যাইব না, তোমাকে আমি মারিব না। আমি আমার স্বামীকে আর ফিরিয়া চাই না। এখন কেবল এই চাই যে, স্বামী হইতে তুমি আমাকে পৃথক করিও না। স্বামীর পদ-যুগল ধরিয়া আমাকে মরিতে দাও। যদি মারিবে তো আমাদের দুই জনকেই এক সঙ্গে মার, খাইবে তো আমাদের দুই জনকেই এক সঙ্গে খাও। আর তোমার কাছে আমি কিছু চাই না। তোমার নিকট এখন কেবল এই প্রার্থনাটি করি। ইহা হইতে তুমি আমাকে বঞ্চিত করিও না।–এই বলিয়া কঙ্কাবতী পুনরায় ঘরের দিকে দৌড়িলেন। কোনও কথা না বলিয়া নাকেশ্বরী আর একটি নিশ্বাস ছাড়িল, আর কঙ্কাবতী একেবারে পর্ব্বতের বাহিরে বনের মাঝখানে গিয়া পড়িলেন।

 

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ—ব্যাঙ-সাহেব

বনের মাঝে কঙ্কাবতী একেবারে নির্জীব হইয়া পড়িলেন। বার বার উঠিয়া-পড়িয়া শরীর তাঁহার ক্ষতবিক্ষত হইয়া গিয়াছিল। শরীরের নানা স্থান হইতে শশাণিতধারা বহিতেছিল। কঙ্কাবতীর এখন আর উঠিবার শক্তি নাই। উঠিয়াই বা কি করিবেন? স্বামীর নিকট যাইতে গেলেই নাকেশ্বরী আবার তাঁহাকে নিশ্বাসের দ্বারা দূরীকৃত করিবে। বনের মাঝে পড়িয়া কঙ্কাবতী অবিরাম কাঁদিতে লাগিলেন। স্বামীর পদপ্রান্তে পড়িয়া তিনি যে প্রাণ পরিত্যাগ করিতে পাইলেন না, এখন কেবল এই দুঃখ তাঁহার মনে অত্যন্ত প্রবল হইল। কাঁদিয়া শরীর তাঁহার অবসন্ন হইয়া পড়িল। তখন তিনি মনে মনে স্থির করিলেন, আচ্ছা! তাই ভাল! স্বামী ভিতরে থাকুন আমি এই বাহিরে পড়িয়া থাকি। তাঁহার পদযুগল ধ্যান করিতে করিতে এই বাহিরেই আমি প্রাণ পরিত্যাগ করিব। করুণাময় জগদীশ্বর আমার প্রতি কৃপা করিবেন। মরিয়া আমি তাঁহাকে পাইব।

এইরূপ চিন্তা করিয়া, কঙ্কাবতী স্বামীর পা দুটি মনে মনে প্রত্যক্ষ দেখিতে লাগিলেন,–উজ্জল শুভ্রবর্ণ অল্প আয়তন চম্পককলি সদৃশ অঙ্গুলি বিশিষ্ট সেই পা দুখানি মনে মনে ধ্যান করিতে লাগিলেন।

একাবিষ্ট চিত্তে এইরূপ ধ্যান করিতেছেন এমন সময় কঙ্কাবতীর মনে একটি নূতন ভাবের উদয় হইল। তিনি ভাবিলেন—ভূতিনী প্রেতিনী ডাকিনীতে মনুষ্যের মন্দ করিলে তাঁহারতো উপায় আছে। পৃথিবীতে অনেক গুণী মানুষ আছেন, তাঁহারা মন্ত্র জানেন তাঁহারা তো ইহার চিকিৎসা করিতে পারেন। কেন বা আমার স্বামীকে তাঁহারা রক্ষা করিতে না পারিবেন? আর যদি একান্তই আমার স্বামীর প্রাণরক্ষা না হয় তাঁহার মৃতদেহ তো আমি পাইব। তাহা লইয়া পুড়িয়া মরিতে পারিলেও আমি কথঞ্চিৎ শান্তি লাভ করিব। যাহা হউক, আমি আমার স্বামীকে নাকেশ্বরীর হাত হইতে রক্ষা করিতে যত্ন করিব নিশ্চিন্ত হইয়া থাকিব না। হই না কেন স্ত্রীলোক? আমি কি মানুষ নই? পতির হিতকামনায় আমি সমুদয় জগৎকে তৃণ জ্ঞান করি-কাহাকেও আমি ভয় করি না।

মনে মনে, এইরূপ কল্পনা করিয়া কঙ্কাবতী চক্ষু মুছিলেন উঠিয়া বসিলেন। এখন লোকালয়ে যাইতে হইবে, এই উদ্দেশে উঠিয়া দাঁড়াইলেন।

কিন্তু লোকালয় কোন্ দিকে, তাহা তো তিনি জানেন না! উত্তরমুখে যাইতে খেতু বলিয়াছিলেন, কিন্তু কোন্ দিক? বিস্তীর্ণ তমোময় সেই বনকান্তরে দিক্‌ নিৰ্ণয় করা তো সহজ কথা নহে! রাত্রি এখনও প্রভাত হয় নাই সূর্য এখনও উদয় হন নাই তবে কোন্ দিক উত্তর কোন দিক দক্ষিণ কিরূপে তিনি জানিবেন?

তাই তিনি ভাবিলেন—যে দিকে হয় যাই একটানা একটা গ্রামে গিয়া উপস্থিত হইব। লোকালয়ে গিয়া সুচিকিৎসকের অনুসন্ধান করিব। কালবিলম্ব করা উচিত নয়। কালবিলম্ব করিলে আমার আশা হয় তো ফলবতী হইবে না।

বন-জঙ্গল গিরি-গুহা অতিক্রম করিয়া উন্মাদিনীর ন্যায় কঙ্কাবতী চলিলেন। কত পথ যাইলেন, কতদূর চলিয়া গেলেন কিন্তু গ্রাম দেখিতে পাইলেন না। রাত্রি প্রভাত হইল সূয্য উদয় হইল, দিন বাড়িতে লাগিল তবুও জন-মনিবের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হইল না।

কি করি কোন দিকে যাই কাহাকে জিজ্ঞাসা করি, কঙ্কাবতী এইরূপ চিন্তা করিতেছেন এমন সময় সম্মুখে একটি ব্যাঙ দেখিতে পাইলেন। ব্যাঙের অপূৰ্ব্ব মূত্তি দেখিয়া কঙ্কাবতী বিস্মিত হইলেন। ব্যাঙের মাথায় হাট গায়ে কোট কোমরে পেলেন ব্যাঙ সাহেবের পোষাক পরিয়াছেন। ব্যাঙকে আর চেনা যায় না। রংটি কেবল ব্যাঙেব মত আছে, সাবান মাখিয়া রংটি সাহেবের মত হয় নাই। আর পায়ের জুতা এখনও কেনা হয় নাই। ইহারপর তখন কিনিয়া পরিবেন। আপাততঃ সাহেবের সাজ সাজিয়া দুই পকেটে হাত রাখিয়া সদর্পে ব্যাঙ চলিয়া যাইতেছেন।

এই অপূৰ্ব্ব মূত্তি দেখিয়া এই ঘোর দুঃখের সময়ও কঙ্কাবতীর মুখে ঈষৎ একটু হাসি দেখা দিল। কঙ্কাবতী মনে করিলেন—ইহাকে আমি পথ জিজ্ঞাসা করি।

কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,—ব্যাঙ মহাশয়! গ্রাম কোন্ দিকে? কোন্ দিক দিয়া যাইলে লোকালয়ে পৌঁছিব? কঙ্কাবতী বলিলেন—ব্যাঙ মহাশয়! আপনি কি বলিলেন, তাহা আমি বুঝিতে পারিলাম না ভাল করিয়া বলুন। আমি জিজ্ঞাসা করিতেছি—কোন দিক্‌ দিয়া যাইলে গ্রামে গিয়া উপস্থিত হইতে পারা যায়?

ব্যাঙ বলিলেন,  হিশ ফিশ ড্যা। কঙ্কাবতী বলিলেন,—ব্যাঙ মহাশয়! আমি দেখিতেছি,আপনি ইংরেজী কথা কহিতেছেন। আমি ইংরেজী পড়ি নাই, আপনি কি বলিতেছেন, তাহা আমি বুঝিতে পারিতেছি না, অনুগ্রহ করিয়া যদি বাঙ্গালা করিয়া বলেন, তাহা হইলে আমি বুঝিতে পারি।–ব্যাঙ এদিক ওদিক্ চাহিয়া দেখিলেন। দেখিলেন যে, কেহ কোথাও নাই। কারণ, লোকে যদি শুনে যে, তিনি বাঙ্গালা কথা কহিয়াছেন, তাহা হইলে তাঁহার জাতি যাইবে, সকলে তাঁহাকে নেটিভ মনে করিবে। যখন দেখিলেন, – কেহ কোথাও নাই, তখন বাঙ্গালা কথা বলিতে তাঁহার সাহস হইল।

কঙ্কাবতীর দিকে কোপ দৃষ্টিতে চাহিয়া, অতিশয় ক্রুদ্ধভাবে ব্যাঙ বলিলেন,–কোথাকার ছুঁড়ী রে তুই! আ গেল যা! দেখিতেছিস, আমি সাহেব! তবু বলে, ব্যাঙ মশাই, কেন? সাহেব বলিতে তোর কি হয়?

কঙ্কাবতী বলিলেন,–ব্যাঙ সাহবে। আমার অপরাধ হইয়াছে, আমাকে ক্ষমা করুন। এক্ষণে গ্রামে যাইব কোন্ দিক্ দিয়া, অনুগ্রহ করিয়া আমাকে বলিয়া দিন।

এই কথা শুনিয়া ব্যাঙ আরও জুলিয়া উঠিলেন, আরও ক্রোধাবিষ্ট হইয়া বলিলেন,–মোলো যা! এ হতভাগা ছুঁড়ীর রকম দেখ! মানা করিলেও শুনে না কথা গ্রাহ্য হয় না। কেবল বলিবে, ব্যাঙ, ব্যাঙ! কেন? আমার নাম ধরিয়া ডাকিতে কি মুখে ব্যাথা হয় না কি? আমার, নাম মিষ্টার গামিশ।

কঙ্কাবতী বলিলেন,—মহাশয়! আমার অপরাধ হইয়াছে। না জানিয়া অপরাধ করিয়াছি, আমাকে ক্ষমা করুন। এক্ষণে মিষ্টার গামিশ? আমি লোকালয়ে যাইব কোন্ দিক্‌ দিয়া তাহা আমাকে বলিয়া দিন। আমার নাম কঙ্কাবতী। বড় বিপদে আমি পড়িয়াছি। প্রাণের পতিকে আমি হারাইয়াছি! পতির চিকিৎসার নিমিত্ত আমি অনুসন্ধান করিতেছি। রতিমাত্র বিলম্ব আর করিতে পারি না। এই হতভাগীনির প্রতি দয়া করিয়া বলিয়া দিন— কোন্ দিক্ দিয়া আমি গ্রামে যাই!

কঙ্কাবতী তাঁহাকে সাহেব বলিলেন, কঙ্কাবতী তাঁহাকে মিষ্টার গামিশ বলিয়া ডাকিলেন, সে জন্য ব্যাঙের শরীর শীতল হইল, রাগ একেবারে পড়িয়া গেল।কঙ্কাবতীর প্রতি হৃষ্ট হইয়া ব্যাঙ জিজ্ঞাসা করিলেন—আমি সাহেব হইয়াছি কেন তা জান?

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,—আজ্ঞা না! তা আমি জানি না! মহাশয়! গ্রামে কোন দিক দিয়া যাইতে হয়? গ্রাম এখান হইতে কত দূর?

ব্যাঙ বলিলেন,–দেখ লঙ্কাবতী! তোমার নাম লঙ্কাবতী বলিলে বুঝি? দেখ লঙ্কাবতী! এক দিন আমি এই বনের ভিতর বসিয়াছিলাম। হাতী সেই পথ দিয়া আসিতেছিল। আমি মনে করিলাম আমার মান-মৰ্য্যাদা রাখিয়া অনেক ভয় করিয়া, হাতী অবশ্যই পাশ দিয়া যাইবে। একবার আস্পর্ধার কথা শুন! দুষ্ট হাতী পাশ দিয়া না গিয়া আমাকে ডিঙাইয়া গেল। রাগে আমার সর্ব্ব শরীর কাপিতে লাগিল। রাগ হইলে আর জ্ঞান থাকে না। আমার ভয়ে তাই সবাই সদাই সশঙ্কিত। আমি ভাবিলাম, হাতীকে একবার উত্তমরূপে শিক্ষা দিতে হইবে। তাই আমি হাতীকে বলিলাম,–উট-কপালী চিরুণ-দাঁতী বড় যে ডিঙুলি মোরে? কেমন, বেশ ভাল বলি নাই, লঙ্কাবতী?

কঙ্কাবতী বলিলেন,—আমার নাম কঙ্কাবতী; লঙ্কাবতী নয়। আপনি উত্তম বলিয়াছেন। গ্রামে যাইবার পথ আপনি বলিয়া দিলেন না? তবে আমি যাই, আর আমি এখানে অপেক্ষা করিতে পারি না।

ব্যাঙ বলিলেন,—শুন না। অত তাড়াতাড়ি কর কেন? দুষ্ট হাতীর একবার কথা শুন। আমি রাগিয়াছি দেখিয়া তাঁহার প্রাণে ভয় হইল না। হাতীটি উত্তর করিল,–থাক থাক্‌ থাক্ থ্যাবড়া নাকী ধৰ্ম্মে রেখেছে তোরে! হাঁ কঙ্কাবতী! আমার কি থ্যাবড়া নাক?

কঙ্কাবতী ভাবিলেন যে, এই নাক লইয়া কাঁকড়ার অভিমান হইয়াছিল, আবার দেখিতেছি এই ভেকটিরও সেই অভিমান।কঙ্কাবতী বলিলেন,—না, না। কে বলে আপনার থ্যাবড়া নাক? আপনার চমৎকার নাক। এই দিক দিয়া কি গ্রামে যাইতে হয়?

কিছুক্ষণের নিমিত্ত ব্যাঙ একটু চিন্তায় মগ্ন হইলেন। কঙ্কাবতী মনে করিলেন, ভাবিয়া চিন্তিায়া ইনি আমাকে পথ বলিয়া দিবেন। কখন পথ বলিয়া দেন, সেই প্রতীক্ষায় একাগ্রচিত্তে কঙ্কাবতী ব্যাঙের মুখ পানে চাহিয়া রহিলেন।

স্থির-গম্ভীর ভাবে অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া অবশেষে ব্যাঙ বলিলেন,–তবে বোধ হয় কথার মিলি করিবার নিমিত্ত হাতী আমাকে থ্যাবড়া-নাকী বলিয়াছে। কারণ, এই দেখ না? আমার কথায় আর হাতীর কথায় মিল হয়–

উট-কপালী চিরুণ-দাঁতী বড় যে ডিঙুলি মোরে।

থাক্ থাক্ থাক্ থ্যাবড়া-নাকী ধৰ্ম্মে রেখেছে তোরে?

কঙ্কাবতী! কবিতাটি খবরের কাগজে ছাপাইলে হয় না? কিন্তু ইহাতে আমার নিন্দা আছে, থ্যাবড়া নাকের কথা আছে। তাই খবরের কাগজে ছাপাইব না। শুনলে তো এখন? হাতীর একবার আস্পর্ধার কথা! তাই আমি ভাবিলাম, সাহেব না হইলে লোকে মান্য করে না। সেই জন্য এই সাহেবের পোষাক পরিয়াছি। কেমন? আমাকে ঠিক সাহেবের মত দেখাইতেছে তো? এখন হইতে আমাকে সকলে সেলাম করিবে, সকলে ভয় করিবে। যখন রেলগাড়ীর তৃতীয় শ্রেণীতে গিয়া চড়িব, তখন সে গাড়ীতে অন্য লোক উঠিবে না। টুপি মাথায় দিয়া আমি দ্বারের নিকট গিয়া দাঁড়াইব। সকলে উকি মারিয়া দেখিবে, আর ফিরিয়া যাইবে,–আর বলিবে—ও গাড়ীতে সাহেব রহিয়াছে। কেমন কঙ্কাবতী? এ পরামর্শ ভাল নয়?–কঙ্কাবতী বলিলেন,–উত্তম পরামর্শ! এক্ষণে অনুগ্রহ করিয়া পথ বলিয়া দিন! আর যদি না দেন, তো বলুন আমি চলিয়া যাই!

কানে হাত দিয়া ব্যাঙ জিজ্ঞাসা করিলেন,—কি বলিলে?

কঙ্কাবতী বলিলেন,–আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, কোন্ পথ দিয়া গ্রামে যাইব? গ্রাম এখান হইতে কত দূর! কতক্ষণে সেখানে গিয়া পৌঁছিব?।

ব্যাঙ বলিলেন,–আমার একটা হিসাব করিয়া দাও। পথ দেখাইয়া দিব কি, আমি এখন ঘোর বিপদে পড়িয়াছি। আমার একটি আধুলি ছিল; একজনকে তাহা আমি ধার দিয়াছি। তাঁহার সহিত নিময় হইয়াছে যে, যাহা বাকী থাকিবে, প্রতিদিন তাঁহার অর্ধেক দিয়া সে ঋণ পরিশোধ করিবে। প্রথম দিন সে আমাকে চারি আনা দিবে, দ্বিতীয় দিন দুই আনা দিবে, তৃতীয় দিন এক আনা, চতুর্থ দিন দুই পয়সা পঞ্চম দিন সে এক পয়সা দিবে। এক পয়সায় হয় পাঁচ কড়া দিবে। তার পরদিন আড়াই কড়া, তার পরদিন স-কড়, তার অর্ধেক, পরদিন তার অর্ধেক, পরদিন তার অর্ধেক–

অতি চমৎকার সুমিষ্ট কান্না-সুরে ব্যাঙ এইবার গলা ছাড়িয়া কাঁদিতে লাগিলেন,–ওগো! মা গো! এ যে আর কখনও শোধ হবে না গো! আমার আধুলিটি যে, আর কখন পুরাপুরিহবে না গো! ওগো আমি যাব গোয় জুয়াচোরের হাতে পড়িয়া আমার যে সর্ব্বস্ব গেল গো! ওগো আমার যে ঐ আধুলিটি বৈ পৃথিবীতে আর কিছু নাই গো! ওগো তা লইয়া মানুষে যে ঠাণ্টা করে গো! ওগো মা গো! আমার কি হল গো!

ব্যাঙ পুনরায় আধ-কায়া সুরে ফুঁপিয়া ফুঁপিয়া বলিলেন,–ওগো! আমি যে মনে করিয়াছিলাম,দুই দণ্ড বসিয়া তোমার সঙ্গে গল্পগাছা করিব গো। আমি তা যে আর হইল না গো! ওগো আমার যে শোকসিন্ধু উথলিয়া উঠিল গো! ওগো তুমি ঐ দিক দিয়া যাও পো? তাহা হইলে লোকালয়ে পৌঁছুতে পারিবে গো! ওগো সে যে অনেক দূর গোয় ওগো আজ সেখানে যাইতে পারিব না গো! ওগো তোমরা যে আমাদের মত লাফাইতে পার না গো! ওগো তোমরা যে গুটি-গুটি চলিয়া যাও গো। ওগো তোমাদের চলন দেখিয়া, আমার যে হাসি পায় গো! ওগো তোমাদের চলন দেখিয়া, আমার যে কান্না পায় না গো! ওগো তুমি যে লোক ভাল গো! ওগো লেখাপড়া শিখিয়া তুমি যে মদ্দা মেয়েমানুষ হওনি গো! ওগো তুমি যে ধীর শান্ত, লজ্জাশীলা পতিপরায়ণা গো! ওগো! তুমি মেয়েজ্যাটা নও গো! আমার যে আধুলিটি এইবার জন্মের মত গেল গো! ওগো! আমার কি হইল গো! ওগো মা গো!

 

ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ—পচাজল

কঙ্কাবতী ভাবিলেন,–একে আপনার দুঃখে মরি, তাঁহার উপর এ আবার এক জ্বালা। যাহা হউক, ব্যাঙের কান্না একটু থামিয়াছে, এইবারে আমি যাই।

ব্যাঙ যেরূপ বলিয়া দিলেন, কঙ্কাবতী সেই পথ দিয়া চলিলেন। চলিতে চলিতে সন্ধ্যা হইয়া গেল, তবুও বন পার হইতে পারিলেন না। যখন সন্ধ্যা হইয়া গেল, তখন তিনি অতিশয় শ্রান্ত হইয়া পড়িলেন; আর চলিতে পারিলেন না। বনের মাঝখানে একখানি পাথরের উপর বসিয়া কাঁদিতে লাগিলেন।

পাথরের উপর বসিয়া কঙ্কাবতী কাঁদিতেছেন, এমন সময় মৃদু মধুর তানে গুগুন করিয়া কে তাঁহার কানে বলিল,–তোমরা কারা গা? তুমি কাদের মেয়ে গা?

কঙ্কাবতী এদিক ওদিক চারিদিকে চাহিয়া দেখিলেন। অবশেষে দেখিতে পাইলেন যে, একটি অতি ক্ষুদ্র মশা তাঁহার কানে এই কথা বলিতেছে। মশাটিকে ভাল করিয়া নিরীক্ষণ করিয়া দেখিলেন যে, সেটি নিতান্ত বালিকা-মশা।।

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,—আমি মানুষের মেয়ে গোয় আমার নাম কঙ্কাবতী!

মশা-বালিকা বলিলেন,—মানুষের মেয়ে! আমাদের খাবার? বাবা যাদের রক্ত নিয়ে আসেন? খাই বটে, কিন্তু মানুষ কখনও দেখি নাই। আমরা ভদ্র মশা কিনা? তাই আমরা ওসব কথা জানি না। আমি কখনও মানুষ দেখি নাই। কিরূপ গাছে মানুষ হয়, তাহাও আমি জানি না না। কৈ? দেখি দেখি। মানুষ আবার কিরূপ হয়!

এই বলিয়া মশা-বালিকা, কঙ্কাবতীর চারিদিকে উড়িয়া উড়িয়া দেখিতে লাগিলেন।

ভাল করিয়া দেখিয়া, শেষে মশা-বালিকা জিজ্ঞাসা করিলেন,–তুমি ধাড়ি মানুষ নও, বাছা মানুষ;–না? কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,—নিতান্ত ছেলেমানুষ নই, তবে এখনও লোকে আমাকে বালিকা বলে।–মশা-বালিকা পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন,–তোমার নাম কি বলিলে? কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,—আমার নাম কঙ্কাবতী!

মশা-বালিকা বলিলেন,–ভাল হইয়াছে। আমার নাম রক্তবতী। ছেলেবেলায় রক্ত খাইয়া পেটটি আমার টুপ টুপে হইয়া থাকিত, বাবা তাই আমার নাম রাখিয়াছেন,–রক্তবতী। আমাদের দুই জনের নামে নামে বেশ মিল হইয়াছে, রক্তবর্ণ আর কঙ্কাবতী।

এস ভাই! আমরা দুইজনে কিছু একটা পাতাই।

কঙ্কাবতী বলিলেন,—আমি এখন বড় শোক পাইয়াছি, এখন ঘোর মনোদুঃখে আছি। কিছু পাতাইয়া আহ্লাদ-আমোদ করি, এখন আমার সে সময় নয়।

রক্তবতী বলিলেন,–তুমি পতিহারা সতী! তার জন্য আর ভাবনা কি? বাবা আসুন, বাবাকে আমি বলিব। বাবা তোমার কত পতি আনিয়া দিবেন। এখন এস ভাই! কিছু একটা পাতাই। কি পাতাই বল দেখি? আমি পচা-জল বড় ভালবাসি। যেখানে পচা-জল থাকে, মনের সুখে আমি সেইখানে উড়িয়া বেড়াই,—পচাজলের ধারে উড়িয়া উড়িয়া আমি কত খেলা করি। তোমার সহিত আমি পচাজল পাতাইব তুমি আমার পচাজল, আমি তোমার পচাজল! কেমন! এখন মনের মতন হইয়াছে তো?

কঙ্কাবতী ভাবিলেন,ইহাদের সহিত তর্ক করা বৃথা। বুড়ো মিসে ব্যাঙ, তারেই বড় বুঝাইয়া পারিলাম না, তা এ তো একটা সামান্য বালিকা-মশা। ইহার এখনও জ্ঞান হয় নাই। ইহাদের যাহা ইচ্ছা হয়, করুক; আর আমি কোনও কথা কহিব না।

কঙ্কাবতী দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া বলিলেন,–আচ্ছা তাহাই ভাল। আমি তোমার পচাজল, তুমি আমার পচাজল। হা জগদীশ্বর। হে হৃদয়-দেবতা। তুমি কোথায়, আর আমি কোথায়! সেখানে তোমার কি দশা, আর এখানে আমার কি দশা।

এই কথা বলিয়া কঙ্কাবতী বার বার নিশ্বাস ফেলিতে লাগিলেন, আর কাঁদিতে লাগিলেন!–রক্তবতী বলিলেন,—পচাজল! তোমার ভাই! আর দুটি পা কোথায় গেল? ভাঙ্গিয়া গিয়াছে বুঝি? ওঃ। সেই জন্য তুমি কাঁদিতেছ? তার আবার কান্না কি, পচাজল? খেলা করিতে করিতে আমারও একটি পা ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল। এই দেখ, সে পা-টি পুনরায় গজাইতেছে। তোমারও পা সেইরপ গজাইবে, চুপ কর কাঁদিও না!

কঙ্কাবতী বলিলেন,–আমার পা ভাঙ্গিয়া যায় নাই। তোমাদের মত আমাদের পা নয়; আমাদের পা এইরূপ। পায়ের জন্য কাঁদি নাই।

মশা-বালিকা পুনরায় গুনগুন্ করিয়া উড়িতে লাগিলেন। চারিদিকে ঘুরিয়া কঙ্কাবতীর শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমুদয় নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতে লাগিলেন। অবশেষে কঙ্কাবতীর নাকের কাছে গিয়া বলিলেন,–একি ভাই, পচাজল! সর্ব্বনাশ! তোমার নাম কোথায় গেল? তোমার নাকটিকে কে কাটিয়া নিল? আহা! তোমার নাক নাই তো খাবে কি দিয়া? মশা-বালিকা কি বলিতেছে, কঙ্কাবতী তাহা প্রথম বুঝিতে পারলেন না। পরে বুঝিলেন যে, সে শুড়ের কথা বলিতেছে। কঙ্কাবতী মনে করিলেন, যে, এ মশা-বালিকাটি নিতান্ত শিশু এখনও ইহার কিছুমাত্র জ্ঞান হয় নাই।

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন, আমাদের নাক এইরূপ। তোমাদের নাক যেরূপ দীর্ঘ আমাদের নাক সেরূপ লম্বা নয়। আমরা নাক দিয়া খাই না, আমরা মুখ দিয়া খাই।

রক্তবতী বলিলেন,–আহা! তবে পচাজল! তোমার কি দুরদৃষ্ট যে, আমার মত তোমার নাক নয়। এই বড় নাকে আমাকে কেমন দেখায় দেখ দেখি। জলের উপর গিয়া আমি আমার মুখখানি দেখি, আর মনে মনে কত আহ্লাদ করি। মা বলেন যে, বড় হইলে আমার রক্তবতী একটি সাক্ষাৎ সুন্দরী হইবে। তা ভাই পচাজল! তোমাকেও আমি সুন্দরী করিব। বাবা বাড়ী আসিলে বাবাকে বলিব, তিনি তোমার নাকটি টানিয়া বড় করিয়া দিবেন। তখন তোমাকে বেশ দেখাইবে।

কঙ্কাবতী ভাবিলেন,—আবার সেই নাকের কথা! নাক নাক করিয়া ইহারা সব সারা হইয়া গেল। কাকড়া নাকের কথা বলিয়াছিল ব্যাঙ বলিয়াছিল; এই মশা-বালিকাও সেই কথা বলিয়াছিল; তার পর সেই নাকেশ্বরীর নাক! উঃ! কি ভয়ানক।

কঙ্কাবতী আরও ভাবিতে লাগিলেন,—এই ঘোর দুঃখের সময় আমি বড় বিপদেই পড়িলাম। কোথায় তাড়াতাড়ি গ্রামে গিয়া চিকিৎসক আনিয়া স্বামীর প্রাণরক্ষা করিব; না,–ওখানে ব্যাঙ, এখানে মশা,—সকলে মিলিয়া আমাকে বিষম জ্বালাতনে ফেলিল। ব্যাঙের হাত এড়াইতে না-এড়াইতে মশার হাতে পড়িলাম। মশার একরতি মেয়েটি তো এই রঙ্গ করতেছেন; আবার ইহার বাপ বাড়ী আসিয়া যে কি রঙ্গ করিবেন, তা তো বলিতে পারি না!–রক্তবতী বলিলেন,–ঐ যে পাতাটি দেখিতেছ, পচাজল! যার কোণটি কুঁকড়ে রহিয়াছে? উহার ভিতর আমাদের ঘর! আমার মারা উহার ভিতরে আছেন। আমার তিন মা। বাবা চরিতে গিয়াছেন, বাবা এখনি কত খাবার আনিবেন। যাই, মাদের বলিয়া আসি যে, আমার পচাজল আসিয়াছে। এই বলিয়া রক্তবতী উড়িয়া গেলেন।

অল্পক্ষণ পরে রক্তবতী পুনরায় ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন,—পচাজল! মা তোমাকে ডাকিতেছেন। উঠ, চল, আমার মার সঙ্গে দেখা করিবে।

কঙ্কাবতী করেন কি? ধীরে ধীরে উঠিলেন। মশাদের ঘর, সেই কোকড়ানো পাতাটির কাছে যাইলেন।–একটি নবীনা মশানী কুঞ্চিত পত্রকোণ হইতে ঈষৎ মুখ বাড়াইয়া বলিলেন,…হ্যা গা বাছা! তুমি আমার রক্তবতীর সহিত পচাজল পাতাইয়াছ? তা বেশ করিয়াছ। রক্তবতী আমাদের বড় আদরের মেয়ে। কৰ্ত্তার এত বিষয়-বৈভব, তা আমার এই রক্তবতীই তার একমাত্র সন্তান। তা, হাঁ গা বাছা! রক্তবতী কি তোমার পতির কথা বলিতেছিল? কি হইয়াছে?

কঙ্কাবতী কাঁদিতে কাঁদিতে বলিলেন,—ওগো আমি বড় দুঃখিনী। আমি বড় শোক পাইয়াছি। পৃথিবী আমি অন্ধকার দেখিতেছি। যদি আমার পতিকে আমি না পাই, তবে এ ছার প্রাণ আমি কিছুতেই রাখিব না। আমার পতিকে নাকেশ্বরী খাইয়াছে। পতিকে বাঁচাইবার নিমিত্ত লোকালয়ে যাইতেছি। সেখান হইতে ভাল চিকিৎসক আনিব, আমার স্বামীকে দেখাইব। তাই আমি বিলম্ব করিতে পারি না। পুনরায় আমি এই রাত্রিতেই পথ চলিব। কিন্তু আমি পথ জানি না, অন্ধকারে আমি পথ দেখিতে পাই না। তোমরা আমাকে যদি একটু পথ দেখাইয়া দাও, তাহা হইলে আমার বড় উপকার হয়।

মশানী বলিলেন,–ছেলে মানুষ, বালিকা তুমি তোমার কোন জ্ঞান নাই। একে আমরা ফ্রীলোক, যে-সে মশার স্ত্রী নই, গণ্যমান্য সম্রান্ত মশার স্ত্রী; তাতে আমরা পর্দ্দানশীন, কুলবধু। আমাদিগের কি ঘরের বাহিরে যাইতে আছে, বাছা? না,–আমরা পথ-ঘাট জানি? তুমি কাঁদিও না। কৰ্ত্তা বাড়ী আসুন কৰ্ত্তাকে আমি ভাল করিয়া বলিব। তুমি এখন আমাদের কুটুম্ব,রক্তবতী, পচাজল। যাহা ভাল হয়, তোমাদের জন্য কৰ্ত্তা অবশ্যই করিবেন। তুমি একটু অপেক্ষা কর।–কঙ্কাবতীর সহিত যিনি এতক্ষণ কথা কহিতেছিলেন তিনি রক্তবতীর মা;–মশার ছোট-রাণী। এইবার মশার বড় রাণী পাশ দিয়া একটু মুখ বাড়াইলেন।

বড় মশানী বলিলেন,–ওটা একটা মানুষের ছানা বুঝি? আমি ওরে পুষিব। আমার ছেলে-পিলে নাই; অনেক দিন ধরিয়া আমার মনে সাধ আছে যে, জীব-জন্তু কিছু একটা পুষি! তা ভাল হইয়াছে, ঐ মানুষের ছানাটা এখানে আসিয়াছে; ওটাকে আমি পুষিব। কিছু বড় হইয়া গিয়াছে সত্যতা যাই হউক, এখনও পোষ মানিবার সময় আছে। মানুষে শুনিয়াছি মেষ, ছাগল, পায়রা এই সব খায়, আবার সাধ করিয়া তাদের পোষে। এই মানুষে ছানাটাকে পুষিলে, ইহার উপর আমার মায়া পড়িবে। ইহাকে খাইতে তখন আর আমার ইচ্ছা হইবে না।

মেজ-মশানী আর এক পাশ দিয়া উঁকি মারিয়া বলিলেন,–দিদি! তোমার এক কথা! মানুষের ছানাটাকে যদি পুষিবে তো যাতে কাজে লাগে, এরূপ পুষিয়া রাখ। মানুষের যেরূপ দুধের জন্য গরু পোষে, সেইরূপ করিয়া ইহাকে ঘরে পুষিয়া রাখ। কৰ্ত্তা কতদূর হইতে রক্ত লইয়া আসেন। আনিতে আনিতে রক্ত বাসি হইয়া যায়। মানুষ একটি ঘরে থাকিলে, যখন ইচ্ছা হইবে তখন টাটকা রক্ত খাইতে পাইব।

রক্তবতীর মা বলিলেন,—তোমাদের সব এক কথা। সব তাতেই তোমাদের প্রয়োজন ছেলেমানুষ, রক্তবতী, মানুষের ছানাটিকে পথে কুড়াইয়া পাইয়াছে; পুষিতে কি খাইতে সে তোমাদিগকে দিবে কেন? ছেলের হাতের জিনিষটি তোমরা কাড়িয়া লইতে চাও! তোদের কিরূপ বিবেচনা বল দেখি? আসুন, আ কৰ্ত্তা আসুন, তাঁহাকে সকল কথা বলিব। এ সংসারে আর আমি থাকতে চাই না। আমকে তিনি বাপের বাড়ী পাঠাইয়া দিন। আমার বাপ ভাই বাঁচিয়া থাকতে, আমার ভাবনা কিসের? আমি ছন্নছাড়া আঁটকুড়োদের মেয়ে নই। আমার চারিদিকে সব জাজ্বল্যমান!–বড় মশানী বলিলেন,–আঃ মর, ঘুড়ির কথা শুন! বাপ-ভাইয়ের গরবে ওঁর মাটীতে পা পড়ে না। বাপ-ভাইয়ের মাথা খাও!

এইরূপে তিন সপত্নীতে ধুন্ধুমার ঝগড়া বাধিয়া গেল। কঙ্কাবতী অবা। কঙ্কাবতী মনে করিলে,—ভাল কথা! জীব-জন্তুর মত ইহারা আমাকে পুষিতে চায়!

তিন সতীনে ঝগড়া ক্ৰমে একটু থামিল। কখন মশা ঘরে আসিবেন, সেই প্রতীক্ষায় কঙ্কাবতী সেইখানে বসিয়া রহিলেন; অনেক বিলম্ব হইতে লাগিল, তবু, মশা ফিরিলেন না।

কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,–হ গা তোমাদের কার এত বিলম্ব হইতেছে কেন?

ছোট রাণী বলিলেন,—বাঁশ কাটছেন, ভার বাঁধছেন রক্ত নিয়ে আসছেন তারা!

অর্থাৎ কিনা, কৰ্ত্তা হয় তো আজ অনেক রক্ত পাইয়াছেন। একেলা বহিয়া আর্নিতে পারিতেছেন না। তাই বাঁশ কাটিয়া, ভার বাঁধিয়া মুটে করিয়া রক্ত আনিতেছেন। বিলম্ব সেইজন্য হইতেছে। কঙ্কাবতী আরও কিছুক্ষণ বসিয়া রহিলেন, তবুও মশা ঘরে ফিরলেন না! কঙ্কাবতী পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন,—তোমাদের কর্তা কখন আসিবেন গা? বড় যে বিল হইতেছে! এবার মধ্যম-মশানী উত্তর দিলেন,—তুষের ধোঁ, কুলোর বাতাস, কোণ নিয়েছেন পারা।

অর্থাৎ কিনা,–চরিবার নিমিত্ত কৰ্ত্তা হয় তো কোনও লোকের ঘরের ভিতর প্রবেশ করিয়াছেন। সে লোক তুষের অগ্নি করিয়া তাঁহার উপর সূর্পের বাতাস দিয়া ঘর ধুম পূর্ণ করিয়াছে।কর্ত্তাগিয়া ঘরের এককোনে লুয়িত হইয়াছেন, বাহির হইতে পারিতেছেন না। সেই জন্য বিলম্ব হইতেছে। একটু ধুম কমিলে বাহির হইয়া আসিবেন।

কঙ্কাবতী আবার অনেকক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন। তাহার পর পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন,—কৈ গা। তিনি তো এখনও এলেন না! আর কত বিলম্ব হইবে?

এইবার বড়-মশানী উত্তর করিলেন,—কটা কামড়, চটাস্ চাপড়, মরে গিয়াছেন পারা! অর্থাৎ কিনা,–কৰ্ত্তা হয় তো কোনও লোকের গায়ে বসিয়াছিলেন। গায়ে বসিয়া যেমন কটাস্ করিয়া কামড় মারিয়াছেন, আর অমনি সে লোকটি একটি চটাস্ করিয়া চাপড় মারিয়াছে। সেই চাপড়ে কৰ্ত্তা হয় তো মরিয়াছেন।

কর্ত্তা মরিয়া গিয়াছেন, এইরূপ অকল্যাণের কথা শুনিয়া ছোট রাণী ফেস্ করিয়া উঠিলেন। তিনি বলিলেন,—তোমার যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা। আসুন কৰ্ত্তা! তারে বলি, তুমি মরিয়া গেলে, তোমার বড় রাণীর হাড়ে বাতাস লাগে। তোমার মুখে চুণ-কালি দিয়া তোমার মাথা মুড়াইয়া, তোমার মাথায় ঘোল ঢালিয়া, তোমাকে এখনি বিদায় করিবেন।

 

চতুর্দশ পরিচ্ছেদ–মশা প্রভু

তিন সতীনে পুনরায় ঘোরতর বিবাদ বাধিল। রক্তবতী চীৎকার করিয়া কাঁদিতে লাগিলেন। মশার ঘরে কোলাহলের রোল উঠিল। এমন সময় মশা বাড়ী আসিলেন ঘরে কলহ-কচকচির কোলাহল শুনিয়া, মশার সর্ব্বশরীর জুলিয়া গেল।

মশা বলিলেন,–এ যন্ত্রণা আর আমার সহ্য হয় না। তোমাদের ঝগড়ার জ্বালায়, আমাদের ঘরের কাছে গাছের ডালে কাক-চিল বসিতে পারে না। যেখানে এরূপ বিবাদ হয়, সেখানে লক্ষ্মী থাকেন না,তালুকে মনুষ্যদিগের শরীরে শোণিত শুষ্ক হইয়া মায়; ইচ্ছা হয় যে, গলায় দড়ি দিয়া মরি, কি বিষ খাইয়া মরি! আত্মহত্যা করিয়া আমাকে মরিতে হইবে। এই সেদিন ধৰ্ম্মে ধৰ্ম্মে আমার প্রাণটি রক্ষা হইয়াছে। আমি একজন আফিমখোরের গায়ে বসিয়াছিলাম। তাঁহার রক্ত কি তিক্ত! এক শুঁড় রক্ত সব ফেলিয়া দিলাম। বার বার কুলকুচা করিয়া তবে প্রাণ রক্ষা হইল। মনে করিলাম,—অপঘাত মৃত্যুতে মরিব। তাই এত কাণ্ড করিয়া প্রাণ বাঁচাইলাম। কিন্তু তোমাদের জ্বালায় এত জ্বালাতন হইয়াছি যে, বাঁচিতে আর আমার তিলমাত্র সাধ নাই!

এইরূপে মশা স্ত্রীগণকে অনেক ভসনা করিতে লাগিলেন। অবশেষে তাঁহার রাগ পড়িলে, তিনি একটু সুস্থির হইলে, রক্তবতী গিয়া তাঁহার কোলে বসলেন।

রক্তবতী বলিলেন,–বাবা! আমার পচাজল আসিয়াছে।

মশা জিজ্ঞাসা করিলেন,—সে আবার কে? পচাজল আবার কি?

রক্তবতীর মা উত্তর করিলেন,—ওগো! একটি মানুষের কন্যা! সন্ধ্যা হইতে এখানে বসিয়া আছে। রক্তবতী তাঁহার সহিত পচাজল পাতাইয়াছে। আহা! বালিকা এখানে আসিয়া পৰ্যন্ত কেবল কাঁদিতেছে। বলে, আমি পতিহারা সতী! পতিকে নাকেশ্বরী খাইয়াছে। আমি লোকালয়ে যাইব, সেখান হইতে বৈদ্য আনিয়া আমার পতিকে ভাল করিব। আমি তাকে বলিলাম,–বাছা! একটু অপেক্ষা কর। কৰ্ত্তাটি বাড়ী আসুন, তাঁহার সহিত পরামর্শ করিয়া তোমার একটা উপায় করা যাইবে। তুমি যখন রক্তবতীর পচাজল হইয়াছে, তখন তোমার দুঃখ মোচন করিতে আমরা যথাসাধ্য যত্ন করিব! রক্তবতীর পচাজল হইবে, রক্তবতী পচাজলকে লইয়া সাধ আহ্লাদ করিবে, তোমার আর দুইটি রাণীর প্রাণে সহিবে কেন? তাঁদের আবার ঐ মানুষের ছানাটিকে পুষিতে সাধ হইল। সেই কথা লইয়া আমাকে তারা যা-না-তাই বলিলেন। তা, আমার আর এখানে থাকিয়া আবশ্যক নাই, তুমি আমাকে বাপের বাড়ী পাঠাইয়া দাও। দিয়া, দুই রাণী নিয়ে সুখে স্বচ্ছন্দে ঘরকন্না কর। আমি তোমার কণ্টক হইয়াছি, আমি এখান হইতে যাই।

মশা জিজ্ঞাসা করিলেন,—সে মানুষের কন্যাটি কোথায়? রক্তবতীর মা বলিলেন,—ঐ বাহিরে বসিয়া আছে! —রক্তবতী বলিলেন,–বাবা! তুমি আমার সঙ্গে এস। আমার পচাজল কোথায়, আমি এখনি দেখাইয়া দিব।

মশা ও রক্তবতী দুই জনে উডিলেন! বিষণ্ণ-বদনে অশ্রুপূরিতনয়নে, যেখানে কঙ্কাবতী বসিয়াছিলেন, গুগুন্ করিয়া দুই জনে সেইখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন।

রক্তবতী বলিলেন,—পচাজল। এই দেখ, বাবা আসিয়াছেন।

কঙ্কাবতী সসম্ভমে গাত্রোত্থান করিয়া মশাকে নমস্কার করিলেন। কঙ্কাবতীকে ভাল করিয়া দেখিতে পাইবেন বলিয়া, মশা গিয়া একটি ঘাসের ডগার উপর বসিলেন। তাঁহার পাশে আর একটি ঘাসের ডগার উপব রক্তবতী বসিলেন। মশার সম্মুখে হাত যোড় করিয়া কঙ্কাবতী দণ্ডায়মান রহিলেন।

অতি বিনীতভাবে কঙ্কাবতী বলিলেন,–মহাশয়। বিপন্না অনাথা বালিকা আমি। জনশূন্য এই গহন কাননে আমি একাকিনী, আমি পতিহারা সতী। আমি দুঃখিনী কঙ্কাবতী! প্রাণসম পতি আমার ভূতিনীর হস্তগত হইয়াছে। আমার পতিকে উদ্ধার করিয়া দিন। আমি আপনার শরণ লইলাম।–মশা জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কাহার সম্পত্তি?

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন, মহাশয়! পূর্ব্বে আমি পিতার সম্পত্তি ছিলাম। বাল্যকালে মনুষ্য-বালিকারা পিতার সম্পত্তি থাকে। দানবিক্রয়ের অধিকার পিতার থাকে। অন্ধ, আতুর, বৃদ্ধ, ব্যাধিগ্রস্ত যাহাতে ইচ্ছা তাঁহাকেই তিনি দান-বিক্রয় করিতে পারেন। জ্ঞান না হইতে হইতে মাতা পিতা আপন আপন বালিকাদিগকে দানবিক্রয় করিয়া নিশ্চিত হন। আমাদের মধ্যে এই রীতি প্রচলিত। আমার পিতা, তিন সহস্র স্বর্ণমুদ্রা পাইয়া, আমাকে আমার পতির নিকট বিক্রয় করিয়াছেন। এক্ষণে আমি আমার পতির সম্পত্তি, যে পতিকে হারাইয়া অনাথা হইয়া আজ আমি বনে বনে কাঁদিয়া বেড়াইতেছি। পূর্ব্বে পিতার সম্পত্তি ছিলাম, এক্ষণে আমি আমার পতির সম্পত্তি।

মশা বলিলেন,–উঁহু! সে কথা জিজ্ঞাসা করিতেছি না। তুমি কোন মশার সম্পত্তি?

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,—কোন্ মশার সম্পত্তি। সে কথা ত আমি কিছু জানি না। কৈ আমি কোন মশার সম্পত্তি নই।–মশা বলিলেন,—রক্তবতি। তোমার পচাজল দেখিতেছি পাগলিনী, উন্মত্তা; ইহার কোনও জ্ঞান নাই। সঠিক সত্য সত্য কথায় উত্তর না পাইলে তোমার পচাজলের কি করিয়া আমি উপকার করি?

রক্তবতী বলিলেন,–ভাই পচাজল! বাবা যে কথা জিজ্ঞাসা করেন, সত্য সত্য তাঁহার উত্তর দাও!

মশা বলিলেন,–শুন, মনুষ্য-শাবক! এই ভারতে যত নর-নারী দেখিতে পাও, ইহারা সকলেই মশাদিগেব সম্পত্তি। যে মশা মহাশয় তোমার অধিকারী, তাঁহার নিকট হইতে বোধ হয়, তুমি পলাইয়া আসিয়াছ। সেই ভয়ে তুমি আমার নিকট সত্য কথা বলিতেছ না, আমার নিকট কথা গোপন করিতেছ! তোমার ভয় নাই, তুমি সত্য সত্য আমার কথার উত্তর দাও। আমি জিজ্ঞাসা করিতেছি, তুমি কোন্ মশার সম্পত্তি, কোন্ মশা তোমাব গায়ে উপবিষ্ট হইয়া বক্ত পান করেন? তাঁহার নাম কি? তাঁহার নিবাস কোথায়? তাঁহার কয় স্ত্রী? কয় পুত্র? ক্য কন্যা? পৌত্র, দৌহিত্র আছে কি না? তাঁহার জ্ঞাতি-বন্ধুদিগের তোমার উপর কোনও অধিকারী আছে কি না? তাঁহারা তোমাকে এজমালিতে রাখিয়াছেন, কি তোমার হস্তপদাদি বন্টন করিয়া লইয়াছে? যদি তুমি বন্টিত হইয়া থাক, তাহা হইলে সে বিভাগের কাগজ কোথায়? মধ্যস্থ দ্বারা তুমি বন্টিত হইয়াছ, কি আদালত হইতে আমীন আসিয়া তোমাকে বিভাগ করিয়া দিয়াছে? এই সব কথার তুমি আমাকে সঠিক উত্তর দাও! কারণ, আমি তোমাকে কিনিয়া লইবার বাসনা করি। আমার তালুকে অনেক মানুষ আছে, মানুষের অভাব নাই। আমার সম্পত্তি নরনারীগণের দেহে যা রক্ত আছে, তাহাই খায় কে? তবে তুমি রক্তবতীর সহিত পচাজল পাতাইয়াছ, সেই জন্য তোমাকে আমি একেবারে কিনিয়া লইতে বাসনা করি। তাহা যদি না করি, তাহা হইলে তোমার অধিকার মশাগণ আমার নামে আদালতে অভিযোগ উপস্থিত করিতে পারেন। তোমাকে এখান হইতে তাঁহারা পুনরায় লইয়া যাইতে পারেন। আমার রক্তবতী তাহা হইলে কাদিবে। আমি আর একটি কথা বলি, এরূপ করিয়া এক গ্রাম হইতে আর এক গ্রামে ভারতবাসীদিগের যাওয়া উচিত নয়। ভারত-বাসীদিগের উচিত, আপন আপন গ্রামে বসিয়া থাকা। তাহা করিলে, মশাদিগের মধ্যে সম্পত্তি লইয়া আর বিবাদ হয় না। মশাগণ আপন আপন সম্পত্তি সুখে স্বচ্ছন্দে সম্ভোগ করিতে পারেন। শীঘ্রই আমরা ইহার একটা উপায় করিব। এক্ষণে আমার কথার উত্তর দাও। এখন বল তোমার মশা-প্রভুর নাম কি?

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,—মহাশয়! আমি আপনাকে সত্য বলিতেছি, আমার মাপ্রভুর নাম আমি জানি না। মনুষ্যেরা যে মশাদিগের সম্পত্তি, তাহাও আমি এত দিন জানিতাম না। মশাদিগের মধ্যে যে মনুষ্যেরা বিতরিত, বিক্রীত ও বন্টিত হইয়া থাকে, তাহাও আমি জানিতাম না। মশাদিগের যে আবার নাম থাকে, তাহাও আমি জানি না। তা আমি কি করিয়া বলি যে, আমি কোন্ মশার সম্পত্তি।

ক্রোধে মশা প্রজ্বলিত হইয়া উঠিলেন। রাগে তাঁহার নয়ন আরক্ত হইয়া উঠিল। মশা বলিলেন,–না, তুমি কিছুই জান না! তুমি কচি খুকীটি! গায়ে কখনও মশা বসিতে দেখ নাই! সে মশাগুলিকে তুমি চেন না! তাহাদের তুমি নাম জান না! তুমি ন্যাকা। পতিহারা সতী হইয়া কেবল পথে পথে কাঁদিতে জান!

মশার এইরূপ তাড়নায় কঙ্কাবতী কাঁদিতে লাগিলেন। কঙ্কাবতীর পানে চাহিয়া রক্তবতী চক্ষু টিপিলেন। সে চক্ষু টিপুনীর অর্থ এই যে,–পচাজল! তুমি কাঁদিও না। বাবা বড় রাগী মশা! একে রাগিয়াছেন, তাতে তুমি কাঁদিলে আরও রাগিয়া যাইবেন।

রক্তবতী যা বলিলেন, তাহা হইল। কঙ্কাবতীর কান্না দেখিয়া মশা আরও রাগিয়া উঠিলেন। মশা বলিলেন,–এ কোথাকার প্যাপেনে মেয়েটা র্যা। ভ্যানোর ভ্যানোর করিয়া কাঁদে দেখ। আচ্ছা! যে সব কথা এতক্ষণ ধরিয়া জিজ্ঞাসা-পড়া করিলাম, তার তুমি কিছুই জান না, বলিলে! এখন এ কথাটার উত্তর দিতে পারিবে কি না? ভাল এই যে সব মানুষ হইয়াছে, এই যে কোটি কোটি মানুষ ভারতে রহিয়াছে, এ সব মানুষ কেন? কিসের জন্য সৃজিত হইয়াছে? এ কথার এখন আমাকে উত্তর দাও।

কঙ্কাবতী বলিলেন,–মানুষ কেন, কিসের জন্য সৃজিত হইয়াছে? তা, আমি জানি না। মশা বলিলেন,—এ? মেয়েটা নিতান্ত বোকা! একেবারে বদ্ধ পাগল! কিছু জানে না! এই ভারতের মানুষগুলো বড় বোকা! কাণ্ডজ্ঞান-বিজ্জিত। রক্তবতী শিশু বটে, কিন্তু এর চেয়ে আমার রক্তবতীর লক্ষগুণে বুদ্ধিশুদ্ধি আছে। তুমি বল তো মা, রক্তবতি, ভারতের মানুষ কিসের জন্য সৃজিত হইয়াছে?

রক্তবতী বলিলেন,–কেন বাবা! আমরা খাব বলিয়া তাই হইয়াছে।

মশা বলিলেন,–এখন শুনিলে? ভারতের মানুষ কিসের জন্য হইয়াছে তা বুঝিলে?

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,–আজ্ঞা হাঁ, এখন বুঝিলাম। মশারা আহার করিবেন বলিয়া তাই মানুষের সৃজন হইয়াছে।–রক্তবতী বলিলেন,–আমার পচাজল মানুষের ছানা বই তো নয়! মানুষদের বুদ্ধি শুদ্ধি নাই, তা সকল মশাই জানে। নির্বোধ মশাকে সকলে মানুষ বলিয়া গালি দেয়। সকলে বলে, অমুক মশা ত মশা নয়—ওটা মানুষ। তা আমাদের মত পচাজলের বোধ-শোধ কেমন করিয়া হইবে? আমার পচাজলকে বাবা, তুমি আর বকিও না?–মশা ভাবিলেন,–সত্য কথা। মানুষের ছানাটাকে আর কোন কথা জিজ্ঞাসা করা বৃথা। আমাকে নিজেই সকল সন্ধান লইতে হইবে।

মশা জিজ্ঞাসা করিলেন,—বলি হাগো মেয়ে। এখন তোমার বাড়ী কোন গ্রামে বল দেখি? তা বলিতে পারিবে তো?

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন যে, তাহাদের গ্রামের নাম কুসুমঘাটী। মশা তৎক্ষণাৎ আপন অনুচরদিগকে কুসুমঘাটী পাঠাইলেন ও কঙ্কাবতীর প্রভুগণকে ডাকিয়া আনিতে আদেশ করিলেন। দূতগণ কুসুমঘাটীতে উপস্থিত হইয়া, অনেক সন্ধানের পর জানিতে পারিলেন যে, কঙ্কাবতীর অধিকারী তিনটি মশা। তাঁহাদের নাম, গজগণ্ড, বৃহস্যুণ্ড ও বিকৃততুণ্ড। রক্তবতীর পিতার নাম দীর্ঘশুণ্ড। দূতগণ শুনিলেন যে কঙ্কাবতীর অধিকারিগণের বাস আকাশমুখ নামকশালবৃক্ষ। সেইখানে যাইয়া কঙ্কাবতীর অধিকাগণকে সকল কথা তাঁহারা বলিলেন। তাঁহারা দূতগণের সহিত আসিয়া অবলিম্বে দীর্ঘশুণ্ডের নিকট উপস্থিত হইলেন। অনেক বাদানুবাদ, অনেক কষাকষির পর, তিন ছটাক নররক্ত দিয়া, কঙ্কাবতীকে দীর্ঘ-শুণ্ড কিনিয়া লইলেন! কঙ্কাবতীকে ক্রয় করিয়া তিনি কন্যাকে বলিলেন,–রক্তবতী এই নাও, তোমার পচাজল নাও! এ মানুষের ছানাটি এখন আমাদের নিজস্ব, ইহা এখন আমাদের সম্পত্তি।

দীর্ঘ-শুগু, তাহার পর, গজগৎ, বৃহমুণ্ডু, বিকৃততুণ্ড প্রভৃতি মশাগণকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন,–মহোদয়গণ! আমি দেখিতেছি, আমাদের ঘোর বিপদ উপস্থিত। ভারতবাসিগণের রক্ত পান করিয়া পৃথিবীর যাবতীয় মশা এতদিন সুখে-স্বাচ্ছন্দে সংসারযাত্রা নির্বাহ করিতেছিলেন। ভারতের তিন দিকে কালাপানি, এক দিকে অত্যুচ্চ পর্ব্বতশ্রেণী। জীবজন্তুগণকে লোকে যেরূপ বেড়া দিয়া রাখে, ভারতবাসিগণকে এত দিন আমরা সেইরূপ আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলাম। ভারতের লোক ভারতে থাকিয়া এতদিন আমাদিগের সেবা করিতেছিল, বিনীতভাবে শোণিত-দান করিয়া আমাদের দেহ পরিপোষণ করিতেছিল। এক্ষণে কেহ কেহ মহাসাগর ও মহাপৰ্বত উল্লঙঘন করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছে। এরূপ কাৰ্য্য করিয়া আমাদিগকে রক্ত হইতে বঞ্চিত করিলে যে তাহাদের মহাপাতক হয়, তাহা আপনারা সকলেই জানেন। যেমন করিয়া হউক, ভাবতবাসীদিগের এক গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে গমনাগমন আজকাল কিছু অধিক হইয়াছে। এই দেখুন, আজ সন্ধ্যাবেলা কুসুমাঘাটী হইতে একটি মনুষ্য শাবক আমার দ্বারে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল। সে মনুষ্যশাবকটি আপনাদের সম্পত্তি। আজ আপনার সম্পত্তি পলাইবে, কাল আমার সম্পত্তি পলাইবে। এই প্রকারে মনুষ্যেরা যদি এক গ্রাম হইতে অপর গ্রামে যায়, তাহা হইলে সম্পত্তি লইয়া আমাদের মধ্যে মহা গোলযোগ উপস্থিত হইবে। তাহার পর আবার বুঝিয়া দেখুন, দেশভ্রমণের কি ফল! দেশভ্রমণ করিলে মনুষ্যেরা নানা নূতন বিষয় শিক্ষা করিতে পারে, মনুষ্যদিগের জ্ঞানের উদয় হয়। দেশভ্রমণ করিয়া ভারতবাসীদিগের যদি চক্ষু উন্মীলিত হয়, তাহা হইলে, মনুষ্যগণ আর আমাদের বশ্যতাপন্ন হইয়া থাকিবে না। আবার বাণিজ্যাদি ক্রিয়া দ্বারা ক্রমে তাঁহারা ধনবান্ হইয়া উঠিবে! তখন মশারি প্রভৃতি নানা উপায় করিয়া, রক্তপান হইতে আমাদিগকে বঞ্চিত করিবে। অতএব, যাহাতে ভারতবাসীরা বিদেশে গমনাগমন না করিতে পারে, যাহাতে এক গ্রামের লোক অপর গ্রামে যাইতে না পারে, এরূপ উপায় সত্বর আমাদিগকে করিতে হইবে।

দীর্ঘ-শুতের বক্তৃতা শুনিয়া সকলেই তাঁহাকে ধন্য ধন্য করিতে লাগিলেন। সকলেই বলিলেন, দীর্ঘ-শুণ্ড অতি বিচক্ষণ মশা, দীর্ঘ শুণ্ডের অতি দূর-দৃষ্টি, এরূপ বিজ্ঞ বুদ্ধিমান্ মশা পৃথিবীতে আর নাই। ভারতবাসীরা যাহাতে ভবিষ্যতে এক গ্রাম হইতে অন্য গ্রামে যাইতে না পারে, এরূপ উপায় করা অবশ্য-কৰ্ত্তব্য, তাহা সকলেই স্বীকার করিলেন। মশাগণ অনেক অনুধাবনা—অনেক বিবেচনা করিয়া অবশেষে স্থির করিলেন যে, পণ্ডিতদিগকে আহ্বান করিয়া একটি ভাল বিধি প্রচলিত করিতে হইবে, তবে লোকে সে বিধি প্রতিপালন করিবে; তা না হইলে লোকে মানিবে না। এইরূপ পরামর্শ করিয়া সমাগত মশাবৃন্দ ভারতের মহামহা পণ্ডিতদিগকে নিমন্ত্রণ করিয়া পাঠাইলেন। পণ্ডিতগণ উপস্থিত হইলে, দীর্ঘশুণ্ড তাহাদিগকে মশাকূল-অনুমোদিত শাস্ত্রীয় বচন বাহির করিতে অনুরোধ করিলেন। শাস্ত্রাদি পৰ্যালোচনা করিয়া পণ্ডিতগণ অবিলম্বে বিধি বাহির করিলেন যে, এ কলিকালে ভারতবানীদিগের পক্ষে গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে গমন করা একেবারে নিষিদ্ধ। গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে গমন করিলে অতি মহাপাতক হয়। সে পাপের প্রায়শ্চিত্ত নাই। তবে কলিকালে ভারতবাসিগণ করিবে কি? কলিকালে ভারতবাসীদিগের নিমিত্ত এই বিধি আছে–

সদা কৃতাঞ্জলিপুটা ব্যাংশুকাঃ পিহিতেক্ষণাঃ!
ঘোরান্ধতমসে কৃপে সন্তু ভারতবাসিনঃ।।
পিবস্তু রুধিরঞ্চৈং যাবন্তো মশকা ভুবি।
অদ্যপ্রভৃতি বৈ লোকে বিধিরেষ প্ৰবৰ্ত্তিতঃ।।

ইহার স্থূল অর্থ এই যে,–কলিকালে ভারতবাসিগণ চক্ষে ঠুলি দিয়া, হাত সোড় করিয়া, অন্ধকূপের ভিতর বসিয়া থাকবে, আর পৃথিবীর যাবতীয় মশা আসিয়া তাহাদিগের রক্ত শোষণ করিবে। এইরূপ মনের মত ব্যবস্থা পাইয়া মশাগণ পরম পরিতোষ লাভ করিলেন। পণ্ডিতগণ যথাবিধি বিদায় গ্রহণ করিয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। অন্যান্য মশাগণও আপন আপন দেশে প্রতিগমন করিলেন।

 

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ – খর্ব্বুর

দীর্ঘ শুণ্ড মশা বলিলেন,—রক্তবতি! এক্ষণে মনুষ্য-শাবকটি তোমার। ইহাকে লইয়া তুমি যাহা ইচ্ছা হয় কর।

রক্তবতী বলিলেন,–পিতা! ইনি আমার ভগিনী! ইহার সহিত আমি পচাজল পাতাইয়াছি। আমার পচাজল বিপদে পড়িয়াছে। পচাজলের পতিকে নাকেশ্বরী খাইয়াছে। কাঁদিয়া কাঁদিয়া পচাজল আমার সারা হইয়া গেল। যাহাতে আমার পচাজল আপনার পতি পায়, বাবা, তুমি তাহাই কর। কি করিয়া কঙ্কাবতীর পতিকে নাকেশ্বরী খাইয়াছে, মশা আদ্যোপান্ত সমুদয় বিবরণ শুনিতে ইচ্ছা করিলেন। আগা-গোড়া সকল কথা কঙ্কাবতী তাঁহাকে বলিলেন।

ভাবিয়া চিন্তিয়া মশা শেষে বলিলেন,—তুমি আমার রক্তবতীর পচাজল, সে নিমিত্ত তোমার প্রতি আমার স্নেহের উদয় হইয়াছে। তোমাকে আমরা কেহ আর খাইব না। স্নেহের সহিত তোমাকে আমরা প্রতিপালন করিব। যাহাতে তুমি তোমার পতি পাও, সে জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করি। আমার তালুকে খর্ব্বুর মহারাজ বলিয়া একটি মনুষ্য আছে। শুনিয়াছি, সে নানারূপ ঔষধ, নানারূপ মন্ত্র-তন্ত্র জানে। আকাশে বৃষ্টি না হইলে, মন্ত্র পড়িয়া মেঘে সে ছিদ্র করিয়া দিতে পারে। শিলাবৃষ্টি পড় পড় হইলে সে নিবারণ করিতে পারে। বৃদ্ধা স্ত্রী দেখিলেই সে বলিতে পারে,—এ ডাইনী কি ডাইনী নয়! তাঁহাকে দেখিবামাত্র ভূতগণ পলায়ণ করে। তাঁহার মত গুণী মনুষ্য পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় নাই। নাকেশ্বরীর হাত হইতে তোমার পতিকে সেই উদ্ধার করিতে পারিবে।

কঙ্কাবতী বলিলেন,–তবে মহাশয় আর বিলম্ব করিবেন না। চলুন, এখনি তাঁহার নিকট যাই। মহাশয়! স্বামী-শোকে শরীর আমার প্রতিনিয়তই দগ্ধ হইতেছে, সংসার আমি শূন্য দেখিতেছি। তাঁহার প্রাণ রক্ষা হইবে, কেবল এই প্রত্যাশায় জীবিত আছি। তা না হইলে, কোন্ কালে এ পাপ প্রাণ বিসর্জন দিতাম।

মশা বলিলেন,—অধিক রাত্রি হইয়াছে, তুমি পরিশ্রান্ত হইয়াছ। আমার তালুক নিতান্ত নিকট নয়। তবে রও! আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে ডাকিতে পাঠাই। তাঁহার পিঠে চড়িয়া আমরা সকলে এখনি খর্ব্বুর মহারাজের নিকট গমন করিব।

মশা এই বলিয়া আপনার কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে ডাকিতে পাঠাইলেন। কিছুক্ষণ বিলম্বে মশার ছোট ভাই আসিয়া উপস্থিত হইলেন; মশানীগণ তাঁহাকে হাতি-ঠাকুর-পো, হাতি-ঠাকুর পো বলিয়া অনেক সমাদর ও নানারূপ পবিহাস করিতে লাগিলেন।

রক্তবতী তাঁহাকে বলিলেন,–কাকা! আমি একটি মানুষের ছানা পাইয়াছি। তাঁহার সঙ্গে আমি পচাজল পাতাইয়াছি। আমি পচাজলকে বড় ভালবাসি, আমার পচাজলও আমাকে বড় ভালবাসে।

কঙ্কাবতী আশ্চর্য্য হইলেন! মশার ছোট ভাই, হাতী! প্রকাণ্ড হস্তী! বনের সকলে তাঁহাকে হাতি-ঠাকুর-পো বলিয়া ডাকে।

রক্তবতীর পিতা হস্তীকে বলিলেন,–ভায়া! আমি বড় বিপদে পড়িয়াছি। রক্তবতী একটি মানুষের মেয়ের সহিত পচাজল পাতাইয়াছে। মেয়েটির পতিকে নাকেশ্বরী খাইয়াছে। মেয়েটি পথে পথে কাঁদিয়া বেড়াইতেছে। রক্তবতীর দয়ার শরীর। রক্তবতী তার দুঃখে বড় দুঃখী। আমি তাই মনে করিয়াছি, যদি কোনও মতে পারি তো তার স্বামীকে উদ্ধার করিয়া দিই। খর্ব্বুর মহারাজের দ্বারাই এ কাৰ্য্য সাধিত হইতে পারিবে। তাই আমার ইচ্ছা যে, এখনি খর্ব্বুরের নিকট যাই। কিন্তু মানুষের মেয়েটি পথ হাঁটিয়া ও কাঁদিয়া কাঁদিয়া অতিশয় শ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছে। এত পথ সে চলিতে পারিবে না। এখন ভায়া, তুমি যদি কৃপা কর, তবেই হয়। আমাদিগকে যদিপিঠে করিয়া লইয়া যাও তো বড় উপকার হয়।–হাতি-ঠাকুর-পো সে কথায় সম্মত হইলেন। কঙ্কাবতী মশানীদিগকে নমস্কার করিয়া, তাহাদিগের নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিলেন।

রক্তবতীর গলা ধরিয়া কঙ্কাবতী বলিলেন,–ভাই পচাজল, তুমি আমার অনেক উপকার করিলে। তোমার দয়া, তোমার ভালবাসা, কখনও ভুলিতে পারিব না। যদি ভাই পতি পাই, তবেই পুনরায় দেখা হইবে। তা না হইলে, ভাই, এ জনমের মত তোমার পচাজল এই বিদায় হইল। রক্তবতীর চক্ষু ছল ছল করিয়া আসিল, রক্তবতীর চক্ষু হইতে অশ্রুবিন্দু ফোটায় ফোঁটায় ভূতলে পতিত হইতে লাগিল।

মশা ও কঙ্কাবতী দুই জনে হাতীর পৃষ্ঠে আরোহণ করলেন। হাতি-ঠাকুর-পো মৃদুমন্দ গতিতে চলিতে লাগিলেন। যাইতে যাইতে সমস্ত রাত্রি গত হইয়া গেল। অতি প্রত্যুষে খর্ব্বুরের বাটীতে গিয়া সকলে উপস্থিত হইলেন। তাঁহারা দেখিলেন যে, খপ্পুর শয্যা হইতে উঠিয়াছেন। অতি বিষণ্ণ-বদনে আপনার দ্বারদেশে বসিয়া আছেন। একটু একটু তখনও অন্ধকার রহিয়াছে। আকাশে কৃষ্ণপক্ষীর প্রতিপদের চন্দ্র তখনও অস্ত যান নাই। খর্ব্বুরের বিষণ্ণ মূর্তি দেখিয়া আকাশের চাঁদ অতি প্রসন্ন মূর্তি ধারণ করিয়াছেন। চাঁদের মুখে আর হাসি ধরে না। চাঁদের হাসি দেখিয়া খর্ব্বুরের রাগ হইতেছে। খৰ্বর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলেন, এই চাঁদের এক দিন আমি দণ্ড করিব। চাঁদকে যদি উচিত মত দণ্ড না দিতে পারি, তা হইলে, খর্ব্বুরের গুণ-জ্ঞান, তুকতু মন্ত্র-তন্ত্র, শিকড়-মাকড়, সবই বৃথা। মশা, কঙ্কাবতী ও হস্তী খুৰ্ব্বরের দ্বারে উপস্থিত হইলেন। মশাকে দেখিয়া খর্ব্বুর শশব্যস্ত হইয়া উঠিলেন।–হাত সোড় করিয়া খর্ব্বুর বলিলেন,–মহাশয়। আজ প্রাতঃকালে কি মনে করিয়া? প্রতিদিন তো সন্ধ্যার সময় আপনার শুভাগমন হয়। আজ দিনের বেলা কেন? ঘরে কুটুম্ব-সাক্ষাৎ আসিয়াছেন না কি? তাই কনিষ্ঠকে সঙ্গে করিয়া আনিয়াছেন যে, তাঁহার পিঠে বোঝাই দিয়া প্রচুর পরিমাণে রক্ত লইয়া যাইবেন?

মশা উত্তর করিলেন,—না, তা নয়। সে জন্য আমি আসি নাই; কি জন্য আসিয়াছি, তাহা বলিতেছি। আপাততঃ জিজ্ঞাসা করি, তুমি বিষণ্ণ-মুখে বসিয়া আছ কেন? এরূপ বিষণ্ণ-বদনে থাকা তো উচিত নয়! মনোদুঃখে থাকিতে তোমাদিগকে আমি বার বার নিষেধ করিয়াছি। মনের সুখে না থাকিলে, শরীরে রক্ত হয় না, সে রক্ত সুস্বাদ হয় না। মনের সুখে যদি তোমরা না থাকিবে, পুষ্টিকর তেজস্কর দ্রব্যসামগ্রী যদি আহার না করিবে, তবে তোমাদের রক্তহীন দেহে বসিয়া আমাদের ফল কি? তোমরা সব যদি নিয়ত এরূপ অন্যায় কাৰ্য্য করিবে, তবে আমরা পরিবারবর্গকে কি করিয়া প্রতিপালন করিব? তোমাদের মনে কি একটু ত্রাস হয় না যে, আমাদের গায়ে বসিযা মশা-প্রভু যদি সুচারুরূপে রক্তপান করিতে না পান, তাহা হইলে, তিনি আমাদিগের উপর রাগ করিবেন?

খর্ব্বুর বলিলেন,–প্রভু! শীর্ণ হইয়া যাইতেছি সত্য। আমার শরীরে ভালরূপ সুস্বাদ রক্ত না পাইলে, মহাশয় যে রাগ করিবেন, তাহাও জানি। কিন্তু কি করিব, স্ত্রীর তাড়নায় আমার এই দশা ঘটিয়াছে।–মশা জিজ্ঞাসা করিলেন,—কেন? কি হইয়াছে। তোমার স্ত্রী তোমার প্রতি কিরূপ অত্যাচার করেন?

খর্ব্বুর উত্তর করিলেন,–প্রভু! আমাদের স্ত্রী-পুরুষে সর্ব্বদা বিবাদ হয়। দিনের মধ্যে দুই তিন বার মারামারি পর্যন্ত হইয়া থাকে। কিন্তু দুঃখের কথা আর মহাশয়কে কি বলিব। আমি হইলাম, তিন হাত লম্বা, আমার স্ত্রী হইলেন, সাত হাত লম্বা। যখন আমাদের মারামারি হয়, তখন আমার স্ত্রী নাগরা জুতা লইয়া ঠণ্ঠ করিয়া আমার মস্তকে প্রহার করেন। আমি ততদূর নাগাল পাই না; আমি যা মারি, তা আমার প্রহারে স্ত্রীর কিন্তু কিছুই হয় না; সুতরাং স্ত্রীর নিকটে আমি সর্ব্বদাই হারিয়া যাই। একে মার খাইয়া, তাতে মনঃক্লেশে শরীর আমার শীর্ণ হইয়া যাইতেছে; দেহে আমার রক্ত নাই। সে জন্য মহাশয় রাগ করিতে পারেন, তাহাতে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। কিন্তু আমি কি করিব? আমার অপরাধ নাই।–মশা বলিলেন,–বটে! আচ্ছা, তুমি এক কৰ্ম্ম কর। আজ হাতী ভায়ার পিঠে চড়িয়া তুমি স্ত্রীর সহিত মারামারি কর।

এই বলিয়া মশা খর্ব্বুরকে হাতীটি দিলেন। খর্ব্বুর হাতীর পিঠে চড়িয়া বাড়ীর ভিতর গিয়া স্ত্রীর সহিত বিবাদ করিতে লাগিলেন। কথায় কথায় ক্রমে মারামারি আরম্ভ হইল। খর্ব্বুর আজ হাতীর উপর বসিয়া মনের সুখে ঠ ঠন্‌ করিয়া স্ত্রীর মাথায় নাগরা জুতা মারিতে লাগিলেন। আজ স্ত্রী যাহা মারেন, খর্ব্বুরের গায়ে কেবল সামান্য ভাবে লাগে। যখন তুমুল যুদ্ধ বাঁধিয়া উঠিল, মশার তখন আর আনন্দের পরিসীমা রহিল না। মশার হাত নাই যে, হাততালি দিবেন, নখ নাই যে নখে নখে ঘর্ষণ করিবেন! তাই তিনি কখনও এক পা তুলিয়া নৃত্য করিতে লাগিলেন, কখনও দুই পা তুলিয়া নৃত্য করিতে লাগিলেন ও গুগুন্ করিয়ানারদ নারদ বলিতে লাগিলেন। অবিলম্বেই আজ খর্ব্বুরের স্ত্রীকে পরাভব মানিতে হইল। খর্ব্বুরের মন আজ আনন্দে পরিপূর্ণ হইল। খর্ব্বুরের ধমনী ও শিরায় প্রবলবেগে আজ শোণিত সঞ্চালিত হইতে লাগিল। মশা, সেই রক্ত একটু চাখিয়া

দেখিলেন, দেখিয়া বলিলেন,—বাঃ! অতি সুমিষ্ট, অতি সুস্বাদু!

মশা মহাশয়কে খৰ্বর শত শত ধন্যবাদ দিলেন ও কি জন্য তাঁহাদের শুভাগমন হইয়াছে, সে কথা জিজ্ঞাসা করিলেন। কঙ্কাবতী ও নাকেশ্বরীর বিবরণ মশা মহাশয় আদ্যোপান্ত তাঁহাকে শুনাইলেন।

সমস্ত বিবরণ শুনিয়া খর্ব্বুর বলিলেন,–আপনাদের কোনও চিন্তা নাই। নাকেশ্বরীর হাত হইতে আমি ইহার পতিকে উদ্ধার করিয়া দিব। ভূত, প্রেতিনী, ডাকিনী, সকলেই আমাকে ভয় করে। চলুন, আমাকে সেই নাকেশ্বরীর ঘরে লইয়া চলুন, দেখি সে কেমন নাকেরী!–মশা বলিলেন-এবার চল! কিন্তু তোমাদের চলা-চলি সব শেষ হইল। বড় সব জাহাজে চড়িয়া, কোথায় রেঙ্গুন, কোথায় বিলাত, এখানে ওখানে সেখানে যাইতে আরম্ভ করিয়াছে। বড় সব রেল-গাড়ী করিয়া এ-দেশ ও-দেশ করিতেছে। রও এবারকার শাস্ত্র একবার জারি হইতে দাও, তাহা হইলে টের পাবে।

খর জিজ্ঞাসা করিলেন,—এবার শাস্ত্রে আমাদের গমনাগমন একেবারেই নিষিদ্ধ হইল না কি? গাছগাছড়া আনিতে যাইতেও পাইব না?

মশা উত্তর করিলেন,–না! এবারকার শাস্ত্রে লেখা আছে যে, ঘর হইতে তোমরা আর একেবারেই বাহির হইতে পারিবে না। সকলকে অন্ধকূপ খনন করিতে হইবে, চক্ষে ইলি দিয়া সকলকে সেই অন্ধকূপে বসিয়া থাকিতে হইবে। অন্ধকূপ হইতে বাহির হইলে, কি চক্ষুর ঠুলিটি খুলিলে, পাপ হইবে, জাতি যাইবে, আর এক-ঘোরে হইয়া থাকিতে হইবে। যেমন তেমন পাপ নয়, সেই যারে বলে পাতক। কেবল পতাকা নয়, যারে বলে মহাপাতক। শুধু মহাপাতক নয়, সেই যারে বলে অতি মহাপাতক! কেমন! বড় যে সব জাহাজ চড়া, রেল চড়া, লেখা-পড়া শেখা, মশারি করা! এইবার?

খর্ব্বুর বলিলেন,–আপনারা মহাপ্রভু! যেরূপ শাস্ত্র করিয়া দিবেন, আমাদিগকে মানিতে হইবে। আপনারা আমাদিগের হর্তা-কৰ্ত্তা বিধাতা। আপনারা সব করিতে পারেন।

মশা, কঙ্কাবতী ও খর্ব্বুর হস্তীর পৃষ্ঠে আরোহণ করিয়া বনাভিমুখে যাত্রা করিলেন। প্রায় দুই প্রহরের সময় পৰ্ব্বতের নিকট উপস্থিত হইলেন।

 

ষোড়শ পরিচ্ছেদ–খোক্কোশ

নাকেশ্বরী যখন খেতুকে পাইল, তখন খেতু একেবারে মৃতপ্রায় হইয়া পড়িলেন। জ্ঞানগোচর আর তাঁহার কিছু মাত্র রহিল না। নিশ্বাস দ্বারা নাকেশ্বরী কঙ্কাবতীকে দূরীভূত করিল, খেতু তাঁহার কিছুই জানেন না।

খেতুকে মৃতপ্রায় করিয়া নাকেশ্বরী মনে মনে ভাবিল—বহুকাল ধরিয়া অনাহারে আছি ইষ্ট দেবতা ব্যাঘ্রের প্রসাদে আজ যদি এরূপ উপাদেয় খাদ্য মিলিল, তবে ইহাকে ভালরূপে রন্ধন করিয়া খাইতে হইবে। এমন সুখাদ্য একেলা খাইয়া তৃপ্তি হইবে না, যাই, মাসীকে গিয়া নিমন্ত্রণ করিয়া আনি।–মাসী আসিতে আসিতে পাছে খাদ্য পচিয়া যায়, সেজন্য নাকেশ্বরী তখন খেতুকে একেবারে মারিয়া ফেলিল না, মৃত্যুপ্রায় অজ্ঞান করিয়া রাখিল।

নাকেশ্বরী মাসীকে নিমন্ত্রণ করিতে যাই। নাকেশ্বরীর মাসীর বাড়ী অনেক দূর, সাত সমুদ্র তের নদী পার, সেই এক-ঠেঙো মুল্লুকের ওধারে। সেখান যাইতে, আবার মাসীকে লইয়া আসিতে অনেক বিলম্ব হইল।।

মাসী বুড়ো মানুষ। মাসীর দাঁত নাই। খেতুর কোমল মাংস দেখিয়া মাসীর আর আহ্লাদের সীমা নাই। মাসীর মুখ দিয়া নাল পড়িতে লগিল।

খেতুব গা টিপিয়া টিপিয়া মাসী বলিলেন,–আহা! কি নরম মাংস। বুড়ো হইয়াছি, একঠেঙো মানুষের দড়িপানা শক্ত মাংস দাগা দাগা করিয়া কাটিয়া ভাজা হউক, আঙুলগুলির চড়চড়ি হউক, অন্যান্য মাংস অম্বল করিয়ায় বাঁধা থাকুক, দুই দিন আহার করা যাইবে, গন্ধ হইয়া যাইবে না।

মাসী বোনঝীতে এইরূপ পরামর্শ হইতেছে, এমন সময় বাহিরে এক গোল উঠিল। হাতীর বংশীধ্বনি, মশার গুন্ গুড় মানুষের কণ্ঠস্বর, পর্ব্বতের বাহির হইতে অট্টালিকার ভিতর প্রবেশ করিল। নাকেশ্বরী ব্যস্ত হইয়া বলিল,–মাসি! সর্ব্বনাশ হইল। মুখের গ্রাস বুঝি কাড়িয়া লয়! ছুঁড়ী বুঝি ওঝা আনিয়াছে।

মাসী বলিলেন,–চল চল চল! দ্বারের উপর দুই জনে পা ফাঁক করিয়া দাঁড়াইল।

অট্টালিকা দ্বারের উপর নাকেশ্বরী ও নাকেশ্বরীর মাসী পদপ্রসারণ করিয়া দাঁড়াই।

পর্ব্বতের ধারে সুড়ঙ্গের দ্বারে উপস্থিত মশা, কঙ্কাবতী ও খর্ব্বুর হস্তীর পৃষ্ঠ হইতে অবতরণ করিলেন। হাতি-ঠাকুর-পো বাহিরে দণ্ডায়মান থাকিয়া গাছের ডাল ভাঙিয়া মাছি তাড়াইতে লাগিলেন। কখনও বা গুঁড়ে করিয়া ধুলারাশি লইয়া আপনার গায়ে পাউডার মাখিতে লাগিলেন। দোল খাইতে ইচ্ছা হইলে কখনও মনের সাথে শরীর দোলাইতে লাগিলেন।–মশা, কঙ্কাবতী ও খৰ্বর সুড়ঙ্গের ভিতর প্রবেশ করিলেন। সুড়ঙ্গের পথ দিয়ে অট্টালিকার ভিতর প্রবেশ করিবার সময় দ্বারে নাকেশ্বরীর মাসীর পদতল দিয়া সকলকে যাইতে হইল।

ভিতরে প্রবেশ করিয়া, খেতুর নিকট সকলে যাইয়া দেখিলেন যে, খেতু মৃতপ্রায় হইয়া পড়িয়া রহিয়াছেন। অজ্ঞান অচৈতন্য। শরীরে প্রাণ আছে কি না সন্দেহ। নিশ্বাস-প্রশ্বাস বহিতেছে কি না সন্দেহ। কঙ্কাবতী তাঁহার পদপ্রান্তে পড়িয়া পা দুটি বুকে লইয়া নানারূপ বিলাপ করিতে লাগিলেন খর্ব্বুর খেতুকে নানা প্রকারে পরীক্ষা করিয়া দেখিতে লাগিলেন।

অবশেষে খর্ব্বুর বলিলেন,—কঙ্কাবতী! তুমি কাঁদিও না। তোমার পতি এখন জীবিত আছেন। সত্বর আরোগ্য লাভ করিবেন। আমি এইক্ষণেই এ রোগের প্রতীকার করিতেছি।এই খর্ব্বুর মন্ত্র পড়িতে লাগিলেন খেতুর শরীরে শত শত ফুৎকার বর্ষণ করিতে লাগিলেন নানারূপ ঔষধ প্রয়োগ করিলেন। কিন্তু কোনও ফল হইল না। সংজ্ঞাশূন্য হইয়া খেতু যেভাবে পড়িয়াছিলেন, সেইভাবেই পড়িয়া রহিলেন। তিলমাত্র নড়িলেন চড়িলেন না। খর্ব্বুর বিস্মিত হইয়া বলিলেন,–এ কি হইল! আমার মন্ত্র-তন্ত্র এরূপ কখন তো বিফল হয় না! রোগী পুনর্জীবিত হউক, মন্ত্রের ফল অল্পাধিক অবশ্যই প্রকাশিত হইয়া থাকে। আজ যে আমার মন্ত্র-তন্ত্র শিকড়-মাকড় একেবারেই নিরর্থক হইতেছে ইহার কারণ কি?–খর্ব্বুর সাতিশয় চিন্তিত হইলেন। ভাবিয়া কারণ কিছু স্থির করিতে পারেন না।

অবশেষে তিনি বলিলেন,—মহা-প্রভু! আসুন দেখি সকলে পুনৰ্ব্বার বাহিরে যাই! বাহিরে গিয়া দেখি, ব্যাপারখানা কি?

অট্টালিকা হইতে পুনর্বার বাহির হইলেন। কঙ্কাবতী একেবারে হতাশ হইয়া পড়িলেন। কঙ্কাবতী ভাবিলেন যে অভাগিনীর কপালে পতি যদি বাঁচিবেন, তবে এত কাণ্ড হবেই বা কেন? তবে এখন তিনি পতিদেহ পাইবেন, পতিপাদপদ্মে প্রাণ বিসৰ্জন করিতে পারিবেন, অসীম শোকসাগরে ভাসমান থাকিয়াও সে চিন্তাটি কঞ্চিৎ তাঁহার শান্তির কারণ হইল।

একবার বাহিরে যাইয়া সুড়ঙ্গের পথ দিয়া সকলে পুনরায় ফিরিয়া আসিতে লাগিলেন। অতি তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে, আশ-পাশ, অগ্র-পশ্চাৎ, উর্দ্ধ-নিম্ন দশ দিক্ সূক্ষ্মানুসূক্ষ্ম রূপে পরীক্ষা করিতে করিতে খর্ব্বুর আসিতে লাগিলেন। অট্টালিকার নিকট আসিয়া উৰ্দ্ধদিকে চাহিয়া দেখেন যে, ভূতিনীদ্বয় পদপ্রসারণ করিয়া দ্বারের উপর দাঁড়াইয়া আছে। খর্ব্বুর ঈষৎ হাসিলেন; আর মনে মনে করিলেন,–বটে। তোমাদের চাতুরী তো কম নয়!

এবার বাহির হইতে খৰ্বর মন্ত্র পড়িতে লাগিলেন। মন্ত্রের প্রভাবে ভূতিনীদ্বয় পদ উত্তোলন করিয়া সেখান হইতে পলায়ন করিল। ঘরের ভিতর প্রবেশ করিয়া খৰ্বর পুনরায় ঝাড়ান কাড়ান আরম্ভ করিলেন। ক্রমে মন্ত্রবলে নাকেশ্বরী আসিয়া খেতুর শরীরে আবির্ভূত হইল। খেতু বক্তা, হইলেন, অর্থাৎ কি না খেতুর মুখ দিয়া ভূতিনী কথা কহিতে লাগিল। নানারূপ ঔষধ প্রয়োগ করিয়া, নানারূপ মন্ত্র পড়িয়া খর্ব্বুর নাকেশ্বরীকে ছাড়িয়া যাইতে বলিলেন! নাকেশ্বরী কিছুতেই ছাড়িবে না। নাকেশ্বরী বলিল যে,—এ মনুষ্য ঘোরতর অপরাধে অপরাধী হইয়াছে, আমা-রক্ষিত সঞ্চিত ধন অপহরণ করিয়াছে। সে জন্য আমি ইহাকে কখনই ছাড়িতে পারি না, আমি ইহাকে নিশ্চয় ভক্ষণ করিব। খর্ব্বুর পুনরায় নানারূপ মন্ত্রাদি দ্বারা নাকেশ্বরীকে অবশেষে যন্ত্রণা দিতে লাগিলেন। যন্ত্রনা-ভোগ নিতান্ত অসমর্থ হইয়া অবশেষে নাকেশ্বরী খেতুকে ছাড়িয়া যাইতে সম্মত হইল। কিন্তু যাই যাই বলে, তবু কিন্তু যায় না। নাকেশ্বরীর শঠতা দেখিয়া খর্ব্বুর অতিশয় বিরক্ত হইলেন। ক্রোধে তাঁহার ওষ্ঠদ্বয় কপিতে লাগিল। ক্রোধে চক্ষুদ্বয় রক্ত বর্ণ হইয়া উঠিল। খর্ব্বুর বলিলেন, যাবে না? বটে! আচ্ছা দেখি এইবার যাও কি না! এই বলিয়া তিনি একটা কুম্মাণ্ড আনয়ন করিলেন, মন্ত্র পূত করিয়া তাঁহার উপর সিন্দুরের ফেঁটা দিয়া কুমড়াটিকে বলিদান দিবার উদ্যোগ করিলেন। খপরে কুমড়াটি রাখিয়া খর্ব্বুর খঙ্গ উত্তোলন করিলেন। কোপ মারেন আর কি! এমন সময় নাকেশ্বরী অতি কাতর স্বরে চীকার করিয়া বলিল,–রক্ষা করুন, রক্ষা করুন! কোপ মারিবেন না, আমাকে কাটিয়া ফেলিবেন না। আমি এখন সত্য সত্য সকল কথা বলিতেছি।

খর্ব্বুর জিজ্ঞাসা করিলেন,—কি বলিবে বল? সত্য বল, কেন তুমি ছাড়িয়া যাইতেছ? সত্য সত্য না বলিলে, এখনি তোমাকে কাটিয়া ফেলিব।

নাকেশ্বরী বলিল,—আমি ছাড়িয়া গেলে কোনও ফল হইবে না। রোগী এখনি মরিয়া যাইবে। রোগীর পরমায়ুটুকু লইয়ো কচুপাতে বাঁধিয়া আমি তাল গাছের মাথায় রাখিয়াছিলাম, মনে করিয়াছিলাম, মাসী আসিলে পরমায়ুটুকু বাটিয়া চাটনী করিয়া দুই জনে খাইব। তা, পরমায়ু-সহিত কচুপাতটি বাতাসে তালগাছ হইতে পড়িয়া গিয়াছে। ক্ষুদ্র পিপীলিকাতে পরমায়ুটুকু খাইয়া ফেলিয়াছে। এখন আর আমি পরমায়ু কোথায় পাইব যে, রোগীকে আনিয়া দিব? সেই জন্য বলিতেছি যে, আমি ছাড়িয়া যাইলেই রোগী মরিয়া যাইবে।

খর্ব্বুর গুণিয়া গাঁথিয়া দেখিলেন যে, নাকেশ্বরী যাহা বলিতেছে, তাহা সত্য কথা,–মিথ্যা নয়। খর্ব্বুর মনে মনে ভাবিলেন যে,–এইবার প্রমাদ হইল। ইহার এখন উপায় কি করা যায়? পরমায়ু না থাকিলে পরমায়ু তো আর কেহ দিতে পারে না?–অনেক চিন্তা করিয়া, খর্ব্বুর নাকেশ্বরীকে আদেশ করিলেন,—যে ক্ষুদ্র পিপীলিকা ইহার পরমায়ু ভক্ষণ করিয়াছে, তুমি অনুসন্ধান করিয়া দেখ, সে খুদে পিঁপিড়েরা এখন কোথায়?

নাকেশ্বরী গিয়া, তালতলীয়, পাথরের ফাটলে, মাটীর গর্তে, কাঠের কোঠরে, সকল স্থানে সেই ক্ষুদ্র পিপীলিকাদিগের অন্বেষণ করিতে লাগিল। কোথাও আর তাহাদিগকে দেখিতে পাইল না। ডেওপিঁপড়ে, কাঠ-পিঁপড়ে শুশ শুড়ে-পিঁপড়ে, টোপ-পিঁপড়ে, যত প্রকার পিঁপড়ের সহিত সাক্ষাৎ হয়, সকলেই নাকেশ্বরী ও নাকেশ্বরীর মাসী জিজ্ঞাসা করে,–হাগা! খুদে-পিঁপড়েরা কোথায় গেল, তোমরা দেখিয়াছ? খুদে-পিঁপড়ের তত্ত্ব কেহই বলিতে পারে না। বোনঝীর বিপদে মাসীও ব্যথিত হইয়া চারিদিকে অন্বেষণ করিতে লাগিল। কিন্তু শীঘ্রই বুড়ী হাঁপ লাগিল, চলিতে চলিতে নাকেরীর মাসীর পায়ে ব্যথা হইল। তখন নাকেশ্বরীর মাসী মনে করিল,ভাল দু ঠেঙো মানুষের মাংস খাইতে আসিয়াছিলাম বটে! এখন আমার প্রাণ নিয়ে টানাটানি!

অনুসন্ধান করিতে করিতে অবশেষে কাণা-পিঁপড়ের সহিত নাকেশ্বরীর সাক্ষাৎ হইল! কাণপিঁপড়েকে নাকেশ্বরী খুদে-পিঁপড়ের কথা জিজ্ঞাসা করিল। কাণা-পিঁপড়ে বলিল— আমি খুদে পিঁপড়ের কথা জানি। তালতলায়, কচুপাতা হইতে মানুষের সুমিষ্ট পরমায়ুটুকু চাটিয়া খাইয়া, হাত মুখ পুঁছিয়া খুদে-পিঁপড়েরা গৃহে গমন করিতেছিল। এমন সময় সাহেবের পোষাক পরা একটি ব্যাঙ তাহাদিগকে কুপ কুপ করিয়া খাইয়া ফেলিল।

অট্টালিকায় প্রত্যাগমন করিয়া নাকেশ্বরী এই সংবাদটি খর্ব্বুরকে দিল। ভেকের অনুসন্ধান করিবার নিমিত্ত খর্ব্বুর পুনরায় নাকেশ্বরীকে পাঠাইলেন। নাকেরী মনে করিল,–ভাল কথা? আমার মুখের গ্রাস কাড়িয়া লইবে, আবার সেই কাজে আমাকেই খাটাইবে। কিন্তু নাকেশ্বরী করে কি? কথা না শুনিলেই খর্ব্বুর সেই কুমড়াটি বলিদান দিবেন। এ দিকে তিনি কুমড়াটি কাটিবেন, আর ও-দিকে নাকেশ্বরীর গলাটি দুইখানা হইয়া যাইবে। বনে বনে, পথে পথে পৰ্বতে পর্ব্বতে, খানায় ডোবায়, নাকেশ্বরীর মাসী ভেকের অনুসন্ধান করিয়া ফিরিতে লাগিলেন। কোথায় কোন্ গর্তের ভিতর ব্যাঙ খাইয়া দাইয়া বসিয়া আছেন, তাঁহার সন্ধান ভূতিনীরা কি করিয়া পাইবে? ব্যাঙের কোন সন্ধান হইল না। নাকেশ্বরী ফিরিয়া খর্ব্বুরকে বলিল,–আমাকে মারুন আর কাটুন, ব্যাঙের সন্ধান আমি কিছুতেই করিতে পারিলাম না।

নাকেশ্বরীর কথা শুনিয়া খর্ব্বুর পুনরায় ঘোর চিন্তায় নিমগ্ন হইলেন। অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া জবশেষে তিনি এক মুষ্টি সর্ষপ হাতে লইলেন। মন্ত্রপূত করিয়া সরিষাগুলিকে হইয়া ফেলিলেন। পড়া সরিষারা নক্ষত্রযোগে পৃথিবীর চারিদিকে ছুটিল, দেশে বিদেশে, গ্রাম নগর, উপত্যকা, সাগর মহাসাগর, চারিদিকে খর্ব্বুরের সরিষা-পড়া ছুটিল। পর্ণপূর্ণ, পুরাতন, পঙ্কিল পুষ্করিণীর পার্শ্বে, সুশীতল গর্তে ব্যাঙ মহাশয় মনের সুখে নিদ্রা যাইতেছিলেন। সরিষাগণ সেইখানে গিয়া উপস্থিত হইল। সূচের সূক্ষ্ম ধারে চর্ম-মাংস ভেদ করিয়া মস্তকে চাপিয়া বসিল। ভেকের মাথা হইতে সাহেবি টুপিটি খসিয়া পড়িল। যাতনায় ব্যাঙ মহাশয় ঘোরতর চীৎকার করিতে লাগিলেন। ঠেলিয়া সরিষারা তাঁহাকে গর্ত্তের ভিতর হইতে বাহির করিল। ঠেলিয়া ঠেলিয়া তাঁহাকে অট্টালিকায় দিকে লইয়া চলিল। ঠেলিয়া ঠেলিয়া তাঁহাকে সুড়ঙ্গের পথে প্রবিষ্ট করিল। অট্টালিকার সম্মুখে আসিয়া ব্যাঙ মহাশয় হস্ত দ্বারা দ্বারে আঘাত করিলেন।

মশা দ্বার খুলিয়া দিলেন, ভেক মহাশয় অট্টালিকার ভিতর প্রবেশ করিয়া যেখানে কঙ্কাবতী ও খর্ব্বুর বসিয়া ছিলেন, সেইখানে গিয়া উপস্থিত হইলেন। কঙ্কাবতী চিনিলেন যে, এ সেই ব্যাঙ! ব্যাঙ চিনিলেন যে, এ সেই কঙ্কাবতী।

ব্যাঙ বলিলেন,–ওগো ফুটফুটে মেয়েটি! তোমার সহিত এত আলাপ পরিচয় করিলাম, আর তুমি আসিয়া সকলকে আমার আধুলিটির সন্ধান বলিয়া দিলে গা! ছি! বাছা! তুমি এ ভাল কাজ কর নাই। ধনের গল্প গাঁট-কাটাদের কাছে কি করিতে আছে? বিশেষতঃ ঐ চেপ্টা গাঁটকাটার কাছে। আমার আধুলির যাহা কিছু বাকী আছে, সকলে ভাগ করিয়া লও, লইয়া আমাকে এখন ছাড়িয়া দাও। চেপ্টা মহাশয়! আমি দেখিতেছি, এ সরিষাগুলি আপনার চেলা। এখন কৃপা করিয়া সরিষাগুলিকে আমার মাথাটি ছাড়িয়া দিতে বলুন। ইহাদের যন্ত্রণায় আমার প্রাণ বাহির হইতেছে!

খর্ব্বুর বলিলেন,—তোমার আধুলিতে আমাদের প্রয়োজন কি। এ বালিকাটি তোমার পরিচিত। বালিকাটি কি ঘোর বিপদে পতিত হইয়াছে, তাহাও বোধ হয় তুমি জান। ঐ যে মৃতবৎ যুবকটিকে দেখিতেছ, উনিই ইহার পতি। নাকেশ্বরী দ্বারা উনি আক্রান্ত হইয়াছেন। নাকেশ্বরী ওর পরমায়ু লইয়া তালবৃক্ষের মস্তকে লুকাইয়া রাখিয়াছিল। বাতাসে সেই পরমায়ুটুকু তলায় পড়িয়া গিয়াছিল। ক্ষুদ্র পিপীলিকাদিগের উদর হইতে পরমায়ুটুকু বাহির করিয়া কঙ্কাবতীর পতির প্রাণরক্ষা করি। পিপীলিকাগুলিকে বাহির করিয়া দিলেই সরিষাগণ তোমাকে ছাড়িয়া দিবে।

ব্যাঙ উত্তর করিলেন,—এই বালিকাটি আমার পরিচিত বটে, যাহাতে ইহার মঙ্গল হয়, তাহা করিতে আমি প্রস্তুত আছি। এই বলিয়া ব্যাঙ গলায় আঙ্গুলি দিয়া উদিগরণ করিতে যত্ন করিলেন, কিন্তু বমন কিছুতেই হইল না। অবশেষে খৰ্বর তাঁহাকে নানাবিধ বমনকারক ঔষধ সেবন করাইতে লাগিলেন, কিন্তু ব্যাঙের মন আর কিছুতেই হইল না।

খর্ব্বুর ভাবিলেন,–এ আবার এক নূতন বিপদ। ইহার উপায় কি করা যায়?

খর্ব্বুর ব্যাঙের নাড়ী ধরিয়া উত্তমরূপ পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন। তিনি ভাবিলেন, ~~ এইবার চাঁদকে আমি পতনে পাইয়াছি। চাঁদের কথা তাঁহার মনে পড়িল। তাঁদের স্কুল শিকড় এ রোগের অব্যর্থ মহৌষধ সেবন করাইলে এখনি ভেকের বমন হইবে।

মশাকে সম্বোধন করিয়া খর্ব্বুল কহিলেন,–মহাশয়। এ ব্যাঙের মন হয়, এরূপ ঔষধ পৃথিবীতে নাই। জগতে ইহার কেবল একমাত্র ঔষধ আছে। ঐ যে আকাশে চাঁদ দেখিতে পান, ঐ চাঁদের মূল-শিকড়ের ছাল এক তোলা, সাতটি মরিচ দিয়া বাটিয়া খাইলে, তবেই ব্যাঙের বমন হইবে, নতুবা আর কিছুতেই হইবে না।—এই কথা শুনিয়া মশা বিমর্ষ হইয়া রহিলেন। কঙ্কাবতী একেবারে হতাশ হইয়া পড়িলেন।

কঙ্কাবতী বলিলেন,–মশা মহাশয়! খর্ব্বুর মহারাজ! এই হতভাগিনীর জন্য আপনারা অনেক পরিশ্রম করিলেন। কিন্তু আপনারা কি করিবেন? এ হতভানিগীর কপাল নিতান্তই পুড়িয়াছে। আকাশে গিয়া চাঁদের মুল শিকড় কে কাটিয়া আনিতে পারে? চাঁদের মুলশিকড়ও সংগ্রহ হইবে না, পতিও আমার প্রাণ পাইবেন না। আপনারা সকলে গৃহে প্রত্যাগমন করুন, আমার জন্য বৃথা আর ক্লেশ পাইবেন না। আপনাদিগের অনুগ্রহে আমি যে, আমার পতির মৃতদেহটি পাইলাম, তাহাই যথেষ্ট। পতির পদ আশ্রয় করিয়া আমি এক্ষণে প্রাণ পরিত্যাগ করি। আপনারা সকলে গৃহে প্রত্যাগমন করুন।

মশা বলিলেন,—আমি অনেক দূর উড়িতে পারি সত্য। কিন্তু চাঁদ পৰ্য্যন্ত যে উড়িয়া যাই, অরূপ শক্তি আমার নাই। সে জন্য আমি দেখিতেছি যে, আমাদের সমুদয় পরিশ্রম বিফল হইল। আহা! রক্তবতী মা আমার পথপানে চাহিয়া আছেন! রক্তবতীকে গিয়া কি বলিব?–খর্ব্বুর বলিলেন,–আপনারা নিতান্ত হতাশ হইবেন না। একটি খোঙ্কোশের বাচ্ছার সন্ধান হয়? তাহা হইলে, তাঁহার পিঠে চড়িয়া অনায়াসেই আকাশে উঠিতে পারা যায়। ধাড়ী খোকেশ পাইলে, কাজ হইবে না, ধাড়ী খোক্কোশ বাগ মানিবে না। বাচ্ছা খোক্কোশ আবশ্যক।

ব্যাঙ বলিলেন,—এক স্থানে খোক্কোশের বাচ্ছা হইয়াছে, তাঁহার সন্ধান আমি জানি। কিন্তু খোক্কোশের বাচ্ছা তোমরা ধরিবে কি করিয়া? ধাড়ী খোক্রোশ যে তোমাদিগকে এক গালে খাইয়া ফেলিবে? আচ্ছা, যেন পাকে-প্রকারে তাঁহাকে ধরিলে। তাঁহার পিঠে চড়িয়া আকাশের উপর যায় কে? প্রাণটি হাতে করিয়া আকাশে যাইতে হইবে। আকাশে ভয়নাক সিপাহী আছে, আকাশের সে চৌকিদার। কর্ণে সে বধির! কানে ভাল শুনিতে পায় না বটে, কিন্তু অন্য দিকে সে বড়ই দুর্দান্ত সিপাহী। আকাশের লোক তাঁহার ভয়ে সব জড়সড়। আকশের চারিদিকে সে পাহারা দিয়া বেড়ায়, তাঁহার হাতে পড়িলে আর রক্ষা নাই। তাই ভাবিতেছি, চাঁদের মূলশিকড় কাটিয়া আনিতে আকাশে যায় কে?।

কঙ্কাবতী বলিলেন,—সে জন্য আপনাদিগের কোনও চিন্তা নাই। যদি খোক্কোশের বাচ্ছা পাই, তাহা হইলে তাঁহার পিঠে চড়িয়া আমি আকাশে যাইব। আমার আর ভয় কিসের? যদি আকাশের সিপাহীর হাতে পড়ি, সে না হয় আমাকে মারিয়া ফেলিবে, আর আমার সে কি করিতে পারে? পতি বিহনে আমি তো এ প্রাণ রাখিব না, এ তো আমার একান্ত প্রতিজ্ঞা! তবে প্রাণের ভয় আর কি জন্য করিব?

এখন খোক্কোশের বাচ্ছা ধরাই স্থির হইল! যে পাহাড়ের ধারে, গর্তের ভিতর খোক্কোশের বাচ্ছা হইয়াছে, ব্যাঙ তাঁহার সন্ধান বলিয়া দিলেন। মশা বলিলেন,–কৌশল করিয়া খোক্কোশের বাচ্ছা ধরিতে হইবে।

এইরূপ স্থির হইল যে, ব্যাঙ ও খর্ব্বুর অট্টালিকায় খেতুকে চৌকি দিয়া বসিয়া থাকিবেন, আর মশা, কঙ্কাবতী ও হাতি ঠাকুর-পো খোক্কোশকে ধরিতে যাইবেন।

যাত্রা করিবার সময় কঙ্কাবতী, খেতুর পদধূলি লইয়া আপনার মস্তকে রাখিলেন।

মশা, কঙ্কাবতীকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন,–কেমন কঙ্কাবতী। তুমি আকাশে উঠিতে পারিবি তো? তোমার ভয় তো করিবে না?

কঙ্কাবতী বলিলেন,–ভয়? আমার আবার কিসের? যদি আকাশে একবার উঠিতে পারি, তাহা হইলে দেখি, কি করিয়া চাঁদ আপনার মূল-শিকড় রক্ষা করেন। আর দেখি, আকাশের সেই বধির সিপাহীর কত ঢাল-খাঁড়া আছে; পতিপরায়ণা সতীর পরাক্রম আজ আকাশের লোককে দেখাইব।

 

সপ্তদশ পরিচ্ছেদ–নক্ষত্রদের বৌ

খোক্কোশের বাচ্ছা ধরিয়া আকাশে উঠিবার কথা নাকেশ্বরী ও নাকেশ্বরীর মাসী বসিয়া শুনিল। তাঁহারা দুইজনে পরামর্শ করিতে লাগিল যে,—যদি এই কাজটি নিবারণ করিতে পারা যায়, তাহা হইলে খর্ব্বুর আর আমাদের দোষ দিতে পারিবে না, অথচ খাদ্যটিও আমাদের হাত ছাড়া হইবে না।

মাসী বলিল,–বৃদ্ধা হইয়াছি। এখন পৃথিবীর অর্ধেক দ্রব্যে অরুচি। এইরূপ কোমল রসাল মাংস খাইতে এখন সাধ হয়। যদি ভাগ্যক্রমে একটি মিলিল, তাও বুঝি যায়?

নাকেশ্বরী বলিল,–মাসি, তুমি এক কৰ্ম্ম কর! তোমার ঝুড়িতে বসিয়া তুমি গিয়া আকাশে উঠ। সমস্ত আকাশ তুমি একেবারে চুণ-খাম করিয়া দাও। ভাল করিয়া দেখিয়া শুনিয়া চুনখাম করিবে, কোথাও যেন একটু ফাঁক না রহিয়া যায়! তুমি তোমার চশমা নাকে দিয়া যাও, তাহা হইলে ভাল করিয়া দেখিতে পাইবে। ছুণখাম করিয়া দিলে ছুঁড়ি আকাশের ভিতর যাইতে পথ পাইবে না, চাঁদও দেখিতে পাইবে না, চাঁদের মূল শিকড়ও কাটিয়া আনিতে পারিবে না।–দুই জনে এইরূপ পরামর্শ করিয়া মাসী গিয়া ঝুড়িতে বসিল। ঝুড়ি হুহু আকাশে উঠিয়া সমস্ত আকাশে নাকেশ্বরীর মাসী চুণখাম করিয়া দিল।

অট্টালিকা হইতে বাহির হইবার সময়ে মশা দেখিলেন যে, সেখানে একটি ঢাক পড়িয়া রহিয়াছে। মশা সেই ঢাকটি সঙ্গে লইলেন। বাহিরে আসিয়া কঙ্কাবতী ও মশা, হস্তীর পৃষ্ঠে আরোহণ করিলেন। যে বনে খোঙ্কোশের বাচ্ছা হইয়াছে, সেই বনে সকলে চলিলেন। সন্ধ্যার পর খোক্কোশের গর্তের নিকট উপস্থিত হইলেন।

একবার আকাশ পানে চাহিয়া মশা বলিলেন,—কি হইল? আজ দ্বিতীয়বার রাত্রি, চাঁদ এখনও উঠিলেন না কেন? মেঘ করে নাই, তবে নক্ষত্র সব কোথায় গেল? আকাশ এরূপ শুভ্রবর্ণ ধারণ করিল কেন?

ধাড়ী খোক্কোশ আপনার বাচ্ছা চৌকী দিয়া গত্তে বসিয়া আছ! একে রাত্রি, তাতে নিবিড় অন্ধকার বন। দূর হইতে ধাড়ী খোক্কোশ কঙ্কাবতীর গন্ধ পাইল।।

ভয়ঙ্কর চীৎকার করিয়া ধাড়ী খোক্কোশ বলিল,–হাউ মাউ খাঁউরে, মনুষ্যের গন্ধ পাউরে! কেরে তোরা, এদিকে আসিস? মশা চীৎকার করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,–তুই কে? খোক্কোশ বলিল,—আমি আবার কে! আমি খোক্কোশ!

মশা বলিলেন,–আমরা আবার কে? আমরা ঘোক্কোশ। এই উত্তর শুনিয়া খোক্কোশের ভয় হইল। খোক্কোশ বলিল,–বাপ রে! তবে তো তোরা কম নয়? ক, খ, গ, ঘ আমি খ-য়ে তোরা ঘ-য়ে, আমার চেয়ে তোরা দুই পৈঠা উঁচু! আচ্ছা, কেমন তোরা ঘোক্কোশ, একবার কাস দেখি, শুনি?

মশা তখন সেই ঢাকটি ঢং ঢং করিয়া বাজাইলেন।

সেই শব্দ শুনিয়া খোক্কোশ বলিল,–ওরে বাপ রে! তোদের কাসির শব্দ। শুনলে ভয় হয়, কানে তালা লাগে! তোরা ঘোক্কোশ বটে!

খোক্কোশ কিন্তু সন্দিগ্ধ চিত্ত। এরূপ অকাট্য প্রমাণ পাইয়াও তবু তাঁহার মনে সম্পূর্ণ বিশ্বাস হইল না। তাই সে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিল,–আচ্ছা তোরা কেমন ঘোক্কোশ, তোদের মাথার একগাছা চুল ফেলিয়া দে দেখি?

এই কথা বলিতে, মশা হাতীর কাছি গাছটি ফেলিয়া দিলেন। খোক্কোশ তাহা হাতে করিয়া দেখিতে লাগিল। অনেকক্ষণ দেখিয়া শেষে বলিল,–ওরে বাপ রে! এই কি তোদের মাথার চুল! তোদের চুল যখন এত বড়, এত মোটা, তখন তোরা না জানি কত বড়, কত মোটা। তোদের সঙ্গে পারা ভার!

তবুও কিন্তু খোক্কোশের মনে সম্পূর্ণ বিশ্বাস হইল না। ভাবিয়া চিন্তিয়া খোক্কোশ পুনরায় বলিল,–আচ্ছা, তোরা যদি ঘোক্কোশ, তবে তোদের মাথার একটা উকুন ফেলিয়া দে দেখি?–মশা বলিলেন,–কঙ্কাবতী! শীঘ্ৰ হাতীর পিঠ হইতে নামো।

তাহার পর মশা হাতীকে বলিলেন,—হাতী ভায়া! এইবার!

এই কথা বলিয়া মশা, হাতীটিকে ধরিয়া, খোক্কোশের গর্তে ফেলিয়া দিলেন। গর্তে পড়িয়া হাতী শুঁড় দিয়া খোক্কোশের বাচ্ছাটিকে ধরিলেন। খোক্কোশের বাচ্ছা চা, চা শব্দে ডাকিয়া, স্বর্গ মর্ত্য পাতাল তোল পাড় করিয়া ফেলিল। শুড়-বিশিষ্ট পৰ্ব্বতাকার উকুন দেখিয়া, ত্রাসে খোক্কোশের প্রাণ উড়িয়া গেল। খোক্কোশ ভাবিল,–তোদের মাথার উকুন আসিয়া তো আমার বাচ্ছাটিকে ধরিল, ঘোক্কোশেরা নিজে আসিয়া আমাকে না ধরে! এই মনে করিয়া খোক্কোশ বাচ্ছা ফেলিয়া উড়িয়া পলাইল।

মশা ও কঙ্কাবতী তখন সেই গর্তের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইলেন।

মশা বলিলেন,—কঙ্কাবতী! তুমি এখন ইহার পৃষ্ঠে আরোহণ কর। খোক্কোশ-শাবকের পিঠে চড়িয়া তুমি এখন আকাশে গিয়া উঠ; চাঁদের শিকড় লইয়া পুনরায় আসিলে, আমরা খোক্কোশের বাচ্ছাটীকে ফিরিয়া দিব। কারণ এখনও এ স্তন্য পান করে, অতি শিশু; ইহাকে লইয়া আমরা কি করিব? যাই হউক, তুমি এখন আকাশের দুর্দণ্ড সিপাহীর হাত হইতে রক্ষা পাইলে হয়। শুনিয়াছি, সে অতি ভয়ঙ্কর দোর্দণ্ডপ্রতাপান্বিত সিপাহী! সাবধানে আকশে উঠিবে।

আকাশ পানে চাহিয়া মশা পুনরায় বলিলেন,–কঙ্কাবতী! আমার কিছু আশ্চর্য্য বোধ হইতেছে। আজ দ্বিতীয়ার রাত্রি, চাঁদ উঠিবার সময় অনেকক্ষণ উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে। কিন্তু চাঁদও দেখিতে পাই না, নক্ষত্রও দেখিতে পাই না। অথচ মেঘ করে নাই। কালো মেঘে ঢাকিয়া সমস্ত আকাশ বরং শুভবর্ণ হইয়াছে; ইহার অর্থ আমি কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। ইহার কারণ কি? আকাশে উঠিলে হয় তো তুমি বুঝিতে পারিবে। অতি সাবধানে আপনার কাৰ্য্য উদ্ধার করিবে।–কঙ্কাবতী খোক্কোশ-শাবকের পিঠে চড়িয়া আকাশের দিকে তাঁহাকে পরিচালিত করিলে দ্রুতবেগে খোক্কোশ-শাবক উড়িতে লাগিল। কঙ্কাবতী অবিলম্বে আকাশের নিকট গিয়া উপস্থিত হইলেন।

আকাশের কাছে গিয়া কঙ্কাবতী দেখিলেন যে, সমুদয় আকাশে চূণ-খাম করা। কঙ্কাবতী ভাবিলেন,—এ কি প্রকার কথা। আকাশের উপর এরূপ চুণ-খাম করিয়া কে দিল?

আকাশের উপর উঠিতে কঙ্কাবতী আর পথ পান না। যে দিকে যান, সেই দিকেই দেখেন চুণ-খাম। আকাশের একধার হইতে অন্যধার পর্যন্ত ঘুরিয়া বেড়াইলেন, পথ কিছুতেই পাইলেন না! সব চুণ-খাম। কঙ্কাবতী ভাবিলেন,—ঘোর বিপদ! আকাশের উপর এখন উঠি কি করিয়া?

হতাশ হইয়া, আকাশের চারি ধারে কঙ্কাবতী পথ খুজিতে লাগিলেন। অনেক অন্বেষণ করিয়া, সহসা এক স্থানে একটি সামান্য ছিদ্র দেখিতে পাইলেন। সেই ছিদ্রটি দিয়া নক্ষত্রদের বৌ উঁকি মারিতেছিল। কঙ্কাবতী সেই ছিদ্রটির নিকট যাইলেন। কঙ্কাবতীকে দেখিয়া নক্ষত্রদের বৌ একবার লুকাইল, পুনরায় আবাব ভয়ে ভয়ে উঁকি মারিতে লাগিল।

কঙ্কাবতী বলিলেন,–ওগো নক্ষত্রদের বৌ! তোমার কোন ভয় নাই! আমিও মেয়ে মানুষ আমাকে দেখিয়া আবার লজ্জা কেন বাছা!

নক্ষত্রদের বৌ উত্তর করিল,–কে গা মেয়েটি তুমি? তোমার কথাগুলি বড় মিষ্ট। অনেকক্ষণ ধরিয়া দেখিতেছি, তুমি চারিদিকে ঘুরিয়া বেড়াইতেছ। তাই মনে করিলাম তোমাকে জিজ্ঞাসা করি, কি তুমি খুঁজিতেছ? কিন্তু হাজার হউক, আমি বৌ মানুষ সহসা কি কাহারও সঙ্গে কথা কহিতে পারি? তাতে রাত্রি কাল! একটু আস্তে কথা কও, বাছা। আমার ছেলে-পিলেরা সব শুয়েছে, এখনি জাগিয়া উঠিবে, কাচা ঘুম ভাঙ্গিলে কাঁদিয়া জ্বালাতন করিবে।

কঙ্কাবতী বলিলেন,—ওগো। নক্ষত্রদের বৌ। আমার নাম কঙ্কাবতী! আমি পতিহারা সতী। আমি বড় অভাগিনী। আকাশের ভিতর যাইবার নিমিত্ত পথ অন্বেষণ করিতেছি। তা আজ এ কি হইয়াছে, বাছা, পথ কেন পাই না? একবার আকাশের ভিতর উঠিতে পারিলে আমার পতির প্রাণ রক্ষা হয়! বাছা। তুমি যদি পথটি বলিয়া দাও, তো আমার বড় উপকার হয়।–নক্ষত্রদের বৌ উত্তর করিল, পথ আর বাছা, তুমি কি করিয়া পাইবে? এ সন্ধ্যা বেলা এক বেটী, ভূতিনী-বুড়ী আসিয়া আকাশের উপর সব চূণখাম করিয়া দিয়াছে। ও যাই হউক, আমি চুপি চুপি তোমাকে আকাশের খিড়কি-দ্বারাটি খুলিয়া দিই। সেই পথ দিয়া তুমি আকাশের ভিতর প্রবেশ কর। এই কথা বলিয়া নক্ষত্রদের বৌ চুপি চুপি আকাশের খিড়কি-দ্বারটি খুলিয়া দিল। সেই পথ দিয়া কঙ্কাবতী আকাশের উপর উঠিলেন।

 

অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ–দুর্দান্ত সিপাহী

আকাশের ভিতর গিয়া কঙ্কাবতী খোক্কোশ শাবককে একটি মেঘের ডালে বাঁধিয়া দিলেন। তাহার পর পদব্রজে আকাশের মাঠ দিয়া চলিতে লাগিলেন। চারিদিকে দেখিলেন, নানা বর্ণের নক্ষত্র সব ফুটিয়া রহিয়াছে। নক্ষত্র ফুটিয়া আকাশকে আলো করিয়া রাখিয়াছে। অতি দূরে চাঁদ, চাকার মত আকাশের উপর বসিয়া আছেন।

কঙ্কাবতী আকাশের ভিতর প্রবেশ করিলে চাঁদ সংবাদ পাইলেন যে, তাঁহার মূল-শিকড় কাটিতে মানুষ আসিতেছে। খন্তা কুড়ুল লইয়া এক মানবী উন্মত্তার ন্যায় ছুটিয়া আসিতেছে। এই দুঃসংবাদ শুনিয়া চাঁদের মনে ত্রাস হইল। আর চাঁদ কাঁপিতে লাগিলেন।

চাঁদ মনে করে,—কেন যে মরিতে সুন্দর হইয়াছিলাম? তাই তো আমার প্রতি সকলের আক্রোশ। যদি সুন্দর না হইতাম, তাহা হইলে কেহ আর আমার মুল শিকড় কাটিতে আসিত না। একে তো রাহুর জ্বালায় মরি তাঁহার উপর আবার যদি মানুষের উপদ্রব হয় তাহা হইলে আর কি করিয়া বাঁচি। যদি আমার গলা থাকিত, তো আমি গলায় দড়ি দিয়া মরিতাম। তা যে ছাই, এ পোড়া শরীর কেবল চাকার মত। গলা নাই তা আমি কি করিব? দড়ি দিই কোথা?

নানারূপ খেদ করিয়া, অতিশয় ভীত হইয়া চাঁদ আকাশের সিপাহীকে ডাকিতে পাঠাইলেন। আকাশের সিপাহী সকল দিকে বীরপুরুষ বটে, কেবল কর্ণে কিছু হীনবল— একটু কালা। অতিশয় চীৎকার করিয়া কোনও কথা না বলিলে তিনি শুনিতে পান না।

সিপাহী আসিয়া উপস্থিত হইলে অতি চীৎকার করিয়া চাঁদ তাঁহাকে সকল কথা বলিলেন। চাঁদ তাঁহাকে বলিলেন,—আমার মূল শিকড় কাটিতে মানুষ আসিতেছে।

সিপাহী ভাবিলেন যে, চাঁদ তাঁহাকে কালা মনে করিয়া এত হাঁ করিয়া কথা কহিতেছেন। সিপাহীর তাই রাগ হইল। সিপাহী বলিলেন,—নাও। আর, অত হাঁ করিতে হবে না। শেষকালে চিড় খাইয়া, চারিদি ফাটিয়া দুইখানা হইয়া যাবে?

এইবার একটু হাঁ কম করিয়া, চাঁদ পুনরায় বলিলেন,–আমার মূল শিকড় কাটিতে মানুষ আসিতেছে।–সিপাহী বলিলেন,–অত আর চুপি চুপি কথা কহিতে হইবে না। কোথাও ডাকাতি করিবে না কি যে অত চুপি চুপি কথা। যদি কোথাও ডাকাতি কর, তো আমায় কিন্তু ভাগ দিতে হইবে।

চাঁদ ভাবিলেন,—সিপাহী লোকের সঙ্গে কথা কওয়া দায়। কথায় কথায় রাগিয়া উঠে। চাঁদ পুনরায় বলিলেন,–না ডাকাতি করিবার কথা বলি নাই। আমি কোথাও ডাকাতি করিতে যাইব না। আমি বলিতেছি যে, আমার মূল-শিকড় কাটিতে মানুষ আসিতেছে। সিপাহী এতক্ষণে চাঁদের কথা শুনিতে পাইলেন।

সিপাহী বলিলেন,—তোমার মুল শিকড় কাটিতে মানুষ আসিতেছে? তা বেশ কাটিয়া লইয়া যাইবে। তার আর কি?

চাঁদ বলিলেন,—তুমি আকাশের চৌকিদার, তুমি আমাকে রক্ষা করিবে না?

সিপাহী উত্তর করিলেন, তোমাকে রক্ষা করিতে গিয়া যদি আমার মুল শিকড়টি কাটা যায়? তখন?

চাঁদ বলিলেন,–যদি তুমি এরূপ সমূহ বিপদ হইতে আমাকে রক্ষা না করিবে, তবে তুমি আকাশের মাহিনা খাও কি জন্য?

সিপাহী উত্তর করিলেন,–রেখে দাও তোমার মাহিনা! না হয় কৰ্ম্ম ছাড়িয়া দিব? পৃথিবীতে গিয়া কনেষ্টেবিলি করিয়া খাইব। আমা হেন প্রসিদ্ধ দুর্দান্ত সিপাহী পাইলে, সেখানে তাঁহারা লুফিয়া লইবে। সেখানে এমন মূল শিকড় কাটাকাটি নাই। সেখানে দাঙ্গ–হাঙ্গামা সব হইয়া যাইলে দাঙ্গাবাজেরা আপনার আপনার ঘরে চলিয়া গেলে, তখন আমি রাস্তার দু চারি জন ভাল মানুষ ধরিয়া কাছারিতে নিয়া হাজির করিব। তবে এখন আমি যাই। কারণ, মানুষটি যদি আসিয়া পড়ে? শেষে যদি আমাকে পৰ্য্যন্ত ধরিয়া টানাটানি করে? এই কথা বলিয়া, দুর্দান্ত সিপাহী সেখান হইতে অতি দ্রুতবেগে প্রস্থান করিলেন। নিরুপায় হইয়া যা থাকে কপালে, এই মনে করিয়া, চাঁদ আকাশে গা ঢালিয়া দিলেন।

মেঘের ডালে খোক্কোশ বাঁধিয়া আকাশের মাঠ দিয়া কঙ্কাবতী অতি দ্রুতবেগে চাঁদের দিকে ধাবমান হইলেন। চারিদিকে জনরব উঠিল যে, আকাশবাসী আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার সকলের মূল শিকড় কাটিতে পৃথিবী হইতে মনুষ্য আসিয়াছে। আকাশবাসীরা সকলে আপনার আপনার ছেলেপিলে সাবধান করিয়া, ঘবে খিল দিয়া বসিয়া রহিল। নক্ষত্রগণের পলাইবার যো নাই, তাই নক্ষত্রগণ বন-উপবনে, ক্ষেত্ৰ-উদ্যানে ফুটিয়াছিল, সে সেইখানে বসিয়া মিটমিট করিয়া জ্বলিতে লাগিল। চাঁদের পালাইবার যো নাই, কারণ, জগতে আলো না দিয়া পালাইলে জারিমানা হইবে, চাঁদ তাই বিরসমনে ম্লানবদনে ধীরে ধীরে আকাশের পথে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। ক্রমে কঙ্কাবতী চাঁদের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইলেন।

চাঁদ ভাবিলেন,—এইবার তো দেখিতেছি, আমার মূল শিকড়টি কাটা যায়। এখন আমি-শুদ্ধ না যাই, তবেই রক্ষা। এরে বিশ্বাস কি? যদি বলিয়া বসে যে,বাঃ! দিব্য চাদটি, কাপড়ে বাঁধিয়া লইয়া যাই! তাহা হইলে আমি কি করিতে পাবি? কাজ নাই বাপু! আমি চক্ষু বুজিয়া থাকি, নিশ্বাস বন্ধ করি, মড়াব মত কাঠ হইয়া থাকি। মানুষটা মনে করিবে যে, এ মরা চাঁদ লইয়া আমি কি করিব? আমাকে সে আর ধরিয়া লইয়া যাইবে না।–বুদ্ধিমন্ত চাঁদ এইরূপ মনে মনে পরামর্শ করিয়া চক্ষু বুজিলেন, নিশ্বাস বন্ধ করিয় রহিলেন।

চাদকে বিবর্ণ, বিষণ্ণ মৃত্যু-ভাবাপন্ন দেখিয়া কঙ্কাবতী ভাবিলেন,—বাঃ, চাদটি বা মরিয়া গেল? মূল শিকড়টি কাটিয়া লইব, সেই ভয়ে চাঁদের বা প্রাণত্যাগ হইল। আহা, কেমন সুন্দর চাদটি ছিল। কেমন চমৎকার জ্যোত্মা হইত, কেমন পূর্ণিমা হইত। সে সকল আর হইবে না। চিরকাল অমাবস্যার রাত্রি থাকিবে। লোকে আমায় কত গালি দিবে।

একটু ভাল করিয়া দেখিয়া কঙ্কাবতী পুনরায় মনে মনে বলিলেন, না, চাদটি মরে নাই। বোধ হয় মূর্চ্ছা গিয়াছে। তা ভালই হইয়াছে। কাটিতে হইলে, ডাক্তারেরা প্রথম ঔষধ শুকাইয়া অজ্ঞান করেন, তার পর করাত দিয়া হাত-পা কাটেন। ভালই হইয়াছে যে, চাঁদ আপনা-আপনি অজ্ঞান হইয়াছে। মূল শিকড় কাটিতে ইহাকে আর লাগবে না। কিন্তু শিকড়টি একেবারে দুইখণ্ড করিয়া কাটা হইবে না। তাহা হইলে চাঁদ মরিয়া যাইবে। আমার কেবল এক ভোলা শিকড়ের ছালের প্রয়োজন ততটুকু আমি কাটিয়া লই।

এইরূপ ভাবিয়া চারিদিক ঘুরিয়া, কঙ্কাবতী অবশেষে চাঁদের মূল শিকড়টি দেখিতে পাইলেন। ছুরি দিয়া উপর মূল শিকড়ের ছাল চাচিয়া তুলিতে লাগিলেন।।।

অল্পক্ষণের নিমিত্ত চাঁদ অতি কষ্টে যাতনা সহ্য করিলেন, তার পর আর সহিতে পারিলেন না। চাঁদ বলিলেন,–উঃ। লাগে যে।

কঙ্কাবতী বলিলেন,—ভয় নাই। এই হইয়া গেল। তাড়াতাড়ি কঙ্কাবতী চাঁদের মূল শিকড় হইতে এক তোলা পরিমাণ ছাল তুলিয়া লইলেন।

তখন চাঁদ জিজ্ঞাসা করিলেন,—আমার শিকড় পুনরায় গজাইবে তো?

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,—গজাইবে বৈ কি। চিরকাল কি আর এমন থাকিবে। ইহার উপর একটু কাদা দিয়া দিও, মন্দ লোকের দৃষ্টি পড়িয়া বিষিয়ে উঠিবে না।

চাঁদ জিজ্ঞাসা করিলেন,—যদি ঘা হয়? কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,—যদি ঘা হয়, তাহা হইলে ইহার উপর একটু লুচি-ভাজা ঘি দিও।

চাঁদ জিজ্ঞাসা করিলেন,—তুমি বুঝি মেয়ে-ডাক্তার? দাঁত্রে গোড়ার ঔষধ জান? আমার দাঁরে গোড়া বড় কন্ কন্ করে।

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,—আমি মেয়ে-ডাক্তার নই। তবে এই বয়সে আমি অনেক দেখিলাম, অনেক শুনিলাম, তাই দুটা একটা ঔষধ শিখিয়া রাখিয়াছি। তোমার দাঁতের গোড়া আর ভাল হইবে না। লোকের দাঁত কি চিরকাল সমান থাকে? তুমি কত কালের চাঁদ হইলে, মনে করিয়া দেখ দেখি। কবে সেই সমুদ্রের ভিতর হইতে বাহির হইয়াছ। এখন আর ছেলে চাঁদ হইতে সাধ করিলে চলিবে কেন।

চাঁদ বলিলেন,–ছেলে চাঁদ হইতে চাই না। ঘরে আমার অনেকগুলি ছেলে-চাঁদ আছে। আশীৰ্বাদ কর, তাঁহারা বাঁচিয়া থাকুক, তাহা হইলে এর পর দেখিতে পাইবে, আকাশে কত চাঁদ হয়। আকাশের চারিদিকে তখন চাঁদ উঠিবে। এখনি আমার ছেলে মেয়েগুলি বলে,—বাবা। অমাবস্যার রাত্রিতে তুমি শ্রান্ত হইয়া পড়, সন্ধ্যা বেলা বিছানা হইতে আর উঠিতে পার না। তাই যাই না? আমরা গিয়া আকাশেতে উঠি না? আমি তাদের মানা করি। আকাশের এক ধার হইতে অন্য ধার পর্যন্ত, পথটুকু তো আর কম নয়? তারা ছেলে মানুষ, অত পথ গড়াইতে পারিবে কেন?

কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,–তোমার ছেলে-মেয়েগুলি কত বড় হইয়াছে?

চাঁদ উত্তর করিলেন,—বড় মেয়েটি একখানি কাঁসির মত হইয়াছে। কেমন চক্ চকে কাসি। তেঁতুল দিয়া মাজিলেও তোমাদের কাসির সেরূপ রং হয় না। মেজ-ছেলেটি একখানি খত্তালের-মত হইয়াছে। মাঝে আরও অনেকগুলি ছেলে মেয়ে আছে। কোলের মেয়েটি একটু কালো। তোমরা যে সেকালে পাথুরে পোকার টিপ পরিতে, সেই ততবড় হইয়াছে। কিন্তু কালো হউক, মেয়েটির শ্ৰী আছে। বড় হইলে, এর পর সেই যখন আকাশে কালো চাঁদ উঠিবে, তখন তোমরা বলিবে, হাঁ চটক-সুন্দরী অন্ধকার হইবে, সমুদয় জগৎ যেন বারনিশ চামড়ায় মুড়িয়া যাইবে। তা, যাই হইক, এখন দাঁতের গোড়ার কি হইবে। কিছু যে খাইতে পরি না। উঁটা চিবাইতে যে বড় লাগে। ভাল যদি কোনও ঔষধ থাকে, তো আমাকে দিয়া যাও।–কঙ্কাবতী বলিলেন,–চাদ। তুমি এক কাজ কর। আমার সঙ্গে তুমি চল। তোমার শিকড় পাইয়াছি, পতি আমার এখন ভাল হইবেন।। পতি আমার কলিকাতায় থাকেন। কলিকাতায় দন্তকারেরা আছে। তোমার পোকা-ধরা পচা দাতগুলি সাঁড়াশি দিয়া তাঁহারা তুলিয়া দিবে, নূতন কৃত্রিম দন্ত পরাইয়া দিবে।

এই কথা শুনিয়া চাঁদের ভয় হইল। চাঁদ বলিলেন, আমার মূল শিকড়ে ব্যাথা হইয়াছে, আমি এখন গড়াইতে পারিব না, তত দূর আমি যাইতে পারিব না।

কঙ্কাবতী বলিলেন,—তার ভাবনা কি? আমি তোমাকে কাপড়ে বাঁধিয়া লইয়া যাইব। চাঁদের প্রাণ উড়িয়া গেল। চাঁদ ভাবিলেন,–যা ভয় করিয়াছিলাম তাই। কেন মরিতে ইহার সহিত কথা কহিয়াছিলাম। চক্ষু বুজিয়া, চুপ করিয়া থাকিলেই হইত।

চাঁদ বলিলেন,–আমার দাঁরে গোড়া ভাল হইয়া গিয়াছে, আর ব্যাথা নাই। সে জন্য তোমাকে আর কষ্ট করিতে হইবে না, আমি বড় ভারি, আমাকে তুমি লইয়া যাইতে পারিবে না। এখন যাও। বিলম্ব করিলে তোমার বাড়ীর লোকে ভাবিবে।

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,–কি বলিলে? তুমি ভারি। বাপের বাড়ী থাকিতে তোমার চেয়ে বড় বড় বগী-থালা আমি ঘাটে লইয়া মাজিতাম। এই দেখ, তোমাকে লইয়া যাইতে পারি কি না।–এই কথা বলিয়া কঙ্কাবতী আকাশের উপর আঁচলটি পাতিলেন! চাদটিকে ধরিয়া আঁচলে বাঁধেন আর কি। এমন সময় চাঁদের স্ত্রী চাঁদের ছানা-পোনা লইয়া উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিতে দিতে আছাড়ি-পিছাড়ি খাইতে-খাইতে, সেইখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন।–চাঁদনীর কান্নায় আকাশ ফাটিয়া যাইতে লাগিল। চাঁদের ছানা-পোনার কান্নায় কঙ্কাবতীর কানে তালা লাগিল।

চাঁদনী কাঁদিতে লাগিলেন,–ওগো আমি দুর্দান্ত সিপাহীর মুখে শুনিলাম যে, মানুষে তোমার মূল শিকড় কাটিবে; ওগো, আমি সে পোড়ারমুখী মানুষীর কি বুকে ধান ভানিয়াছি যে, সে আমার সহিত এরূপ শত্রুতা সাধিবে। আমাকে যদি বিধবা হইতে হয়, তাহা হইলে তারও আমার মত হাত হইবে। সে বাপ ভাইয়ের মাথা খাইবে।

চাঁদের ছানা-পানাগুলি কঙ্কাবতীর কাপড় ধরিয়া টানিতে লাগিল, আর বলিতে লাগিল,—ওগো, তোমার পায়ে পড়ি। বাবার তুমি মূল শিকড় কাটিও না, বাবাকে ধরিয়া লইয়া যাইও না।–চাঁদের ছোট মেয়েটি—যেটি পাথুরের পোকার টিপের মত, সেই মেয়েটি মাঝে মাঝে কাঁদে, মাঝে মাঝে রাগে, আর কঙ্কাবতীকে গালি দিয়া বলে, অভাগী, পোড়ারমুখী, শালী। আবার সে কঙ্কাবতীকে গায়েব চারিদিকে আঁচড়ায় আর চিমটি কাটে। তার চিটির জ্বালায় কঙ্কাবতী ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িলেন।

কঙ্কাবতী বলিলেন,—ওগো ও চাঁদনী। তোমার মেয়ে সামলাও বাছা; তোমার এ ছোট মেয়েটি চিটি কাটিয়া আমার গায়ের ছাল-চামড়া তুলিয়া লইতেছে।

চাঁদনী উত্তর করিলে—হাঁ, মেয়ে সামলাবো বৈ কি? তুমি আমার সর্ব্বনাশ করিবে, আর আমি মেয়ে সামলাবো। কেন, বাছা? তোমার আমি কি করিয়াছি যে, তুমি আমার সৰ্ব্বনাশ করিবে? মূল শিকড়টি কাটিয়া তুমি আমার পতির প্রাণবধ করিবে?

কঙ্কাবতী বলিলেন,—না গো না। আমি তোমার পতির প্রাণবধ করি নাই। একটুখানি শিকড়ের আমার আবশ্যক ছিল, তা আমি উপর উপর চাচিয়া লইয়াছি। অধিক রক্তও পড়ে নাই, কিছুই হয় নাই। তুমি বরং চাঁদকে জিজ্ঞাসা করিয়া দেখ? তার পর, তোমার স্বামী বলিলেন, যে তার দাঁত নড়িতেছে। তাই মনে করিম যে, কলিকাতায় লইয়া যাই, দাঁত ভাল করিয়া পুনরায় তোমার স্বামীকে আকাশে পাঠাইয়া দিব। তাতে আর কাজ নাই বাছা, এখন তোমরা সব, আমায় যেন আর চিটি না কাটো।

এই কথা শুনিয়া চাঁদনী আশ্বস্ত হইলেন। চাঁদের ছেলে-পুলেরও কান্না থামিল।

চাঁদনী বলিলেন,—তোমার যদি বাছা, কাজ সারা হইয়া থাকে, তবে তুমি এখন বাড়ী যাও! তোমার ভয়ে আকাশ একেবারে লণ্ড ভণ্ড হইয়া গিয়াছে। আকাশবাসীরা সব ঘরে খিল দিয়া বসিয়া আছে। সবাই সশঙ্কিত।

কঙ্কাবতী বলিলেন,–আমার কাজ সারা হইয়াছে সত্য, কিন্তু কতকগুলি নক্ষত্র চাই। আমাদের সেখানে নক্ষত্র নাই। আহা এখানে কেমন চারিদিকে সুন্দর সুন্দর নক্ষত্র ফুটিয়া রহিয়াছে। আমি মনে করিয়াছি, কতকগুলি নক্ষত্র এখান হইতে তুলিয়া লইয়া যাইব। এখান হইতে অনেক দূরে আমার খোক্কোশ বাঁধা আছে। কি করিয়া নক্ষত্রগুলি তত দূর লইয়া যাই? একটি মুটে কোথায় পাই?

চাঁদনী বলিলেন,—আর বাছা তোমার ভয়ে ঘর হইতে আর কি লোক বাহির হইয়াছে, তুমি মুটে পাইবে? দোকানী-পসারী সব দোকান বন্ধ করিয়াছে, আকাশের বাজার-হাট আজ সব বন্ধ। পথে জনপ্রাণী নাই। আমি কেবল প্রাণের দায়ে ঘর হইতে বাহির হইয়াছি।

এইরূপ কথাবার্তা হইতেছে, এমন সময় কঙ্কাবতী দেখিতে পাইলেন যে, মেঘের পাশে লুকাইয়া কে একটি লোক উঁকিঝুকি মারিতেছে। কঙ্কাবতী ভাবিলেন,—ঐ লোকটিকে বলি, খোক্রোশের বাচ্ছার কাছ পৰ্য্যন্ত নক্ষত্রগুলি দিয়া আসে। এইরূপ চিন্তা করিয়া কঙ্কাবতী তাহাতে ডাকিলেন। কঙ্কাবতী বলিলেন,–ওগো শুন। একটা কথা শুন।

কঙ্কাবতী যেই এই কথা বলিয়াছেন আর পশ্চাৎ পশ্চাৎ যান, আর লোকটি ততই প্রাণপণে দৌড়িতে থাকে। কঙ্কাবতী মনে করিলেন—লোকটি কি দৌড়িতে পারে। বাতাসের মত যেন উড়িয়া যায়।

কঙ্কাবতী তাঁহাকে কিছুতেই ধরিতে পারিলেন না, কিন্তু দৈবক্রমে এক ঢিপি মেঘ তাঁহার পায়ে লাগিয়া সে হোঁচোট খাইয়া পড়িয়া গেল। পড়িয়াও পুনরায় উঠিতে কত চেষ্টা করিল, কিন্তু উঠিতে না উঠিতে কঙ্কাবতী গিয়া তাঁহাকে ধরিয়া ফেলিলেন।।

কঙ্কাবতী তাঁহার গায়ে হাত দিয়া দেখেন যে, তাঁহার গায়ে হাড়, মাংস কিছুই নাই! দেহ তার অতি লঘু। দুইটি অঙ্গুলিদ্বারা কঙ্কাবতী তাঁহাকে ধরিয়া তুলিলেন। চক্ষুর নিকট আনিয়া নিরীক্ষণ করিয়া দেখিলেন যে, কেবল দুই চারটি তালপাতা দিয়া তাঁহার শরীর নির্ম্মিত। তালপাতের হাত, তালপাতের নাক-মুখ। সেই তালপাতের উপর জামা জোড়া পরা। তাঁহার শরীর দেখিয়া কঙ্কাবতী অতিশয় বিস্মিত হইলেন।

কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,–তুমি কে?

লোকটি উত্তর করিল,–আমি আকাশের দুর্দান্ত সিপাহী। আবার কে? এখন ছাড়িয়া দাও, বাড়ী যাই। আঙ্গুল দিয়া অমন করিয়া টিপিও না।

কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,—তোমার শরীর তালপাতা দিয়া গড়া?

দুর্দান্ত সিপাহী বলিলেন,তালপাতা দিয়ে গড়া হইবে না তো কি দিয়া গড়া হইবে? ইট পাথর চূণ সুরকি দিয়া রেজার গাঁথুনি করিয়া আমার শরীর গড়া হবে না কি? এত দেশ বেড়াইলে, এত কাণ্ড করিলে আর তালপাতার সিপাহীর নাম কখনও শুননি? এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আমাকে কে না জানে? বীর-পুরুষ দেখিলেই লোকে আমার সহিত উপমা দেয়। এখ ছাড়িয়া দাও, বাড়ী যাই। ভাল এক মূল শিকড় কাটাকাটি হইয়াছে বটে!

কঙ্কাবতী এখন বুঝিলেন যে, ছেলে-বেলা তিনি যে সেই তালপাতার সিপাহীর কথা শুনিয়াছিলেন, তাঁহার বাস আকাশে পৃথিবীতে নয়। আর সেই-ই আকাশের দুর্দান্ত সিপাহী।

কঙ্কাবতী বলিলেন,–দেখ দুর্দান্ত সিপাই তোমাকে আর একটি কাজ করিতে হইবে। তা না করিলে তোমাকে আমি কিছুতেই ছাড়িব না এখান হইতে নক্ষত্র এক বোঝা আমি তুলিয়া লইয়া যাইব। কিছু দূর মোটটি তোমাকে লইয়া যাইতে হইবে।

সিপাহী আর করেন কি? কাজেই সম্মত হইলেন। কঙ্কাবতীর আঁচলে আর কতটি নক্ষত্র ধরিবে? তাই কঙ্কাবতী ভাবিতে লাগিলেন—কি দিয়া নক্ষত্রগুলি, বাঁধিয়া লই?

সিপাহী বলিলেন,–অত আর ভাবনা-চিন্তা কেন? চল, আমরা আকাশ বুড়ীর কাছে যাই। কদমতলায় বসিয়া চরকা কাটিয়া সে কত কাপড় করিয়াছে। তাঁহার কাছে হইতে একখানি গামছা চাহিয়া লই?

কঙ্কাবতী ও সিপাহী আকাশ-বুড়ীর নিকট গিয়া একখানি গামছা চাহিলেন। অনেক বকিয়া ঝকিয়া আকাশবুড়ী একখানি গামছা দিলেন। তখন কঙ্কাবতী আকাশের মাঠে নক্ষত্র তুলিতে লাগিলেন। বাছিয়া বাছিয়া ফুটন্ত আধ-কুঁড়ি আধ-ফুটন্ত, নানাবর্ণের নক্ষত্র তুলিলেন। সেইগুলি গামছায় বাঁধিয়া, মোটটি সিপাহীর মাথায় দিলেন।

সিপাহী ভাবিলেন,—একাল আকাশে চাকরি করিলাম, কিন্তু মুটেগিরি কখনও করিতে হয় নাই। ভাগ্যক্রমে আকাশের লোক সব আজ দ্বারে খিল দিয়া বসিয়া আছে। কেহ যদি আমার এ দুর্দশা দেখিত, তাহা হইলে আজ আমি মরমে মরিয়া যাইতাম।

মোটটি মাথায় করিয়া সিপাহী আগে আগে যাইতে লাগিলেন। কঙ্কাবতী তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ যাইতে লাগিলেন। কিছুক্ষণে খোলকাশের বাচ্চার নিকট আসিয়া দুজন উপস্থিত হইলেন। সিপাহীর মাথা হইতে নক্ষত্রের বোঝাটি লইয়া তখন কঙ্কাবতী বলিলেন,—এখন তুমি যাইলে যাইতে পার তোমাকে আমার আর প্রয়োজন নাই। এই কথা বলিতে না বলিতে সিপাহী এমনি ছুট মারিলেন যে, মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হইয়া গেলেন। কঙ্কাবতী ভাবিলেন,—তালপাতার সিপাহী কি না। তাই এত দ্রুতবেগে ছুটিতে পারে।

মোটটি লইয়া কঙ্কাবতী খোলকাশের বাচ্ছার পিঠে চড়িলেন। খোক্কোশের পিঠে চড়িয়া আকাশ হইতে পৃথিবীর দিকে পুনরায় অবতরণ করিতে লাগিলেন।

 

উনবিংশ পরিচ্ছেদ–সতী

যেখানে মশা ও হাতী কঙ্কাবতীর প্রতীক্ষায় অবিস্থিতি করিতেছিলেন অবিলম্বে কঙ্কাবতী আসিয়া সেইখানে উপস্থিতি হইলেন। শিকড় লাভে কৃতকার্য হইয়াছে শুনিয়া মশা ও হাতীর আনন্দের আর অবধি রহিল না। খোক্কোশের বাচ্ছাটিষক পনুরায় তাঁহার গর্তে ছাড়িয়া মশা ও কঙ্কাবতী হস্তীর পৃষ্ঠে আরোহণ করিলেন ও পর্ব্বত অভ্যন্তর স্থিত সেই অট্টালিকার দিকে যাত্রা করিলেন।

অট্টালিকায় উপস্থিত হইয়া কঙ্কাবতী চাঁদের মুল শিকড়টুকু খর্ব্বুরের হস্তে অর্পণ করিলেন। খর্ব্বুর তাঁহার এক তোলা ওজন করিয়া সাতটি গোলমরিচের সহিত অতি সাবধানে শিলে বাটিলেন। ঔষধটুকু বাটা হইলে ব্যাঙকে তাহা সেবন করাইলেন। ঔষধ সেবন করিয়া ব্যাঙের হুড় হুড় করিয়া বমন আরম্ভ হইল। পেটে যাহা কিছু ছিল সমুদয় বাহির হইয়া পড়িল। ব্যাঙ বলিলেন,—ব্যাঙাচি-অবস্থায় জলে কিকিল করিতে করিতে আমি যাহা কিছু খাইয়াছিলাম তাহা পৰ্য্যন্ত বাহির হইয়া গিয়াছে উদরে আর আমার কিছুই নাই।

বমনের সহিত সেই ক্ষুদ্র পিপীলিকাগুলি বাহির হইয়া পড়িল। খর্ব্বুর অতি যত্নে তাহাদিগকে বমনের ভিতর হইতে বাছিয়া লইলেন। তাহার পর একটি পিপীলিকা লইয়া, তাঁহার উদর হইতে অতি সুক্ষ্ম সোপ্পা-দ্বারা খেতুর পরমায়ুটুকু বাহির করিতে লাগলেন। এইরূপে খুঁটিয়া খুঁটিয়া সমস্ত পিপীলিকাগুলি হইতে পরমায়ু বাহির করা হইলে, খর্ব্বুর বলিলেন,—এ কি হইল? পরমায়ু তো অধিক বাহির হইল না! এ যৎসামান্য পরমায়ুটুকু লইয়া কি হইবে? ইহাতে তো কোনও ফল হইবে না?

খর্ব্বুর বিষণ্ণচিত্ত হইলেন, মশা হতাশ হইলেন, ব্যাঙের চক্ষু দিয়া জল পড়িতে লাগিল, কঙ্কাবতী নীরবে বসিয়া রহিলেন। অদৃশ্যভাবে অবস্থিত নাকেশ্বরী ও তাঁহার মাসী পরিতোষ লাভ করিল।–যাহা হউক, সেই যৎসামান্য পরমায়ুটুকু লইয়া খর্ব্বুর খেতুর নাকে নাস দিয়া দিলেন। খেতু চমকিত হইয়া উঠিয়া বসিলেন।

খেতু বলিলেন,–কি অঘোর নিদ্রায় আমি অভিভূত হইয়াছিলাম। কঙ্কাবতী! তুমি আমাকে জাগাইতে পার নাই? দেখ দেখি, কত বেলা হইয়া গিয়াছে?

কঙ্কাবতী বলিলেন,—সাধ্য থাকিলে আর জাগাইতাম না?

খেতু তাহার পর চারিদিকে চাহিয়া দেখিলেন। দেখিলেন, কঙ্কাবতীর চক্ষু দিয়া জল পড়িতেছে। খর্ব্বুর, মশা ও ব্যাও বিষণ্ণ বদনে বসিয়া আছেন।–খেতু জিজ্ঞাসা করিলেন,—কঙ্কাবতী! কাঁদিতেছ কেন?এঁরা কারা? কঙ্কাবতী কোন উত্তর করিলেন না।

খেতু একটু চিন্তা করিয়া পুনরায় বলিলেন,—আমার সকল কথা এখন মনে পড়িতেছে। আমার মাথায় শিকড় ছিল না বলিয়া আমাকে নাকেশ্বরী খাইয়াছিল। কঙ্কাবতী। তুমি বুঝি ইহাদিগকে ডাকিয়া আনিয়া আমাকে সুস্থ করিয়াছ? তবে আর কান্না কেন। আমি তো এখন ভাল আছি। কেবল আমার মাথা অল্প অল্প ব্যাথা করিতেছে! আমি আর একবার শুই। কঙ্কাবতী! তুমি আমার মাথাটি একটু টিপিয়া দাও। আমার মাথা বড় বেদনা করিতেছে। প্রাণ বুঝি আমার বাহির হয়! ওগো! তোমরা সকলে আমরা কঙ্কাবতীকে দেখিও! আমার কঙ্কাবতীকে তার মার কাছে দিয়া আসিও। হা-ঈশ্বর।

খেতুর মৃত্যু হইল।–ঘাড় হেঁট করিয়া সকলে নীরবে বসিয়া রহিলেন। কাহারও মুখে বাক্য নাই। সকলের চক্ষু দিয়া জলধারা পড়িতে লাগিল। কেবল কঙ্কাবতী স্থির হইয়া রহিলেন। অনেকক্ষণ পরে খর্ব্বুর বলিলেন,–এইবার সব ফুরাইল। আমাদের সমুদয় পরিশ্রম বিফল হইল। এখন আর কোনও উপায় নাই। তালগাছ হইতে পতনের সময় পরমায়ুর অধিকাংশ ভাগ বাতাসে উড়িয়া গিয়াছিল, কেবল অতি সামান্য ভাগ পিপীলিকাতে খাইয়াছিল। সে পরমায়ুটুকুতে মনুষ্য আর কতক্ষণ বাঁচিতে পারে?

এই বলিয়া খর্ব্বুর কাঁদিতে লাগিলেন, মশা কাঁদিলেন, ব্যাঙ রুমাল দিয়া চক্ষু মুছিতে লাগিলেন, বাহিরে হাতী শুঁড় দিয়া ধূলা উড়াইতে লাগিলেন। কেবল কঙ্কাবতী নীরব, কঙ্কাবতীর কান্না নাই।–অবশেষে মশা বলিলেন,—মা, উঠ। বিলাপে আর কোনও ফল নাই। তোমার পতির এক্ষণে আমরা যথাবিধি সঙ্কার করি। তাহার পর তুমি আমার সহিত রক্তবতীর নিকট যাইবে। রক্তবতীকে দেখিলে তোমার মন অনেক শান্ত হইবে।

মশা, খর্ব্বুর ও ব্যাঙ কঙ্কাবতীকে বুঝাইতে লাগিলেন।

খর্ব্বুর বলিলেন—সংসার অনিত্য। জীবনের কিছুই স্থিরতা নাই। কখন কে নাই। উঠ, মা, উঠ। তোমার পতির যথাবিধি সৎকার হইলে, কিছুদিন তুমি রক্তবতীর নিকটে গিয়া থাক। তাহার পর তোমার মার নিকট গিয়া রাখিয়া আসিব।

কঙ্কাবতী বলিলেন,–মহাশয়গণ। আপনারা আমার অনেক উপকার করিলেন। আমার জন্য আপনারা অনেক পরিশ্রম করিলেন। আপনাদিগের পরিশ্রম যে সফল হইল না, সে কেবল আমার অদৃষ্টের দোষ। ঈশ্বর আপনাদিগের মঙ্গল করিবেন। আপনারা যখন এত পরিশ্রম করিলেন, তখন এক্ষণে আমার একটি যৎসামান্য উপকার করুন। সেইটি করিয়া আপনারা স্ব স্ব গৃহে প্রতিগমন করুন। পতিপদে আমি আমার প্রাণ সমর্পণ করিয়াছি। এই যে আমার শরীর দেখিতেছেন, এ প্রাণহীন জড় দেহ। এক্ষণে আমি পতিদেহের সহিত আমার এই জড়দেহ ভস্ম করিব। সে নিমিত্ত যাহা কিছু প্রয়োজন, আপনারা সেই সমস্ত উপকরণের আয়োজন করিয়া দিন।

মশা বলিলেন,—ছি মা। ও কথা কি মুখে আনিতে আছে? পতিহারা হইয়া শত শত সতী এ পৃথিবীতে জীবিত থাকে। ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করিয়া পরোপকারে জীবন অতিবাহিত করে। –খর ও ব্যাঙ সকলেই কঙ্কাবতীকে সেইরূপ নানা প্রকারে বুঝাইতে লাগিলেন।

নাকেশ্বরী বলিল,–মাসী। মাসী বলিল,–উ। নাকেশ্বরী বলিল,–মানুষটাকে সৎকার করিবে যে। তাহা হইলে আর আমরা কি ছাই খাইব?

মাসী বলিল,–হুঁ। নাকেশ্বরী বলিল,–এই ছুড়ীঁর জন্যই যত বিপত্তি। এখন ছুঁড়ীও যাতে মরে, এস তাই করি।

এই কথা বলিয়া নাকেশ্বরী, খর্ব্বুর প্রভৃতির নিকট আসিয়া আবির্ভূত হইল। নাকেশ্বরী বলিল,–পরামর্শ করিতেছ? কঙ্কাবতীকে দেশে লইয়া যাইবে? লইয়া যাও, তাহাতে আমাদের কোনও ক্ষতি নাই। কিন্তু এ ধৰ্ম্মভূমি ভারতভূমির নিয়ম তোমরা জান না। লোকের এখানে ধর্ম্মগত প্রাণ। শোকেই হউক আর তাপেই হউক, সহসা যদি কেহ মুখে একবার বলিয়া ফেলে যে, আমি পতির সঙ্গে যাইব, তাহা হইলে তাঁহাকে যাইতেই হইবে, সতী হইতেই হইবে। না হইলে পতিকুল, পিতৃকুল, মাতৃকুল, সকল কুল ঘোর কলঙ্কে কলঙ্কিত হইবে। পিতা, মাতা, ভ্রাতা, আত্মীয়বর্গের মস্তক অবনত হইবে। সে কলঙ্কিনী একেবারেই পতিত হইবে। তাঁহার সহিত যিনি আচার-ব্যবহার করিবেন, তিনিও পতিত হইবেন। তাই বলিতেছি, তোমরা ইহাকে ঘরে লইয়া যাও, তাহাতে আমাদের কিছু ক্ষতি নাই; কিন্তু শুন মশা মহাশয়। শুন খর্ব্বুর মহারাজ। আমি একথা তোমাদিগের আত্মীয়-স্বজনকে বলিয়া দিব। তোমাদের আত্মীয়-স্বজনেরা কিন্তু তোমাদিগের মত নাস্তিক নন্। তারা নিশ্চয় ইহার যথাশাস্ত্র বিচার করিবেন। তখন দেখিব, পুত্র-কন্যার বিবাহ দাও কোথায়?–নাকেশ্বরীর কথা শুনিয়া মশার ভয় হইল। আজ বাদে কাল তার রক্তবতীর বিবাহ দিতে হইবে। পাত্র না মিলিলে তাকে ঘোর বিপদে পড়িতে হইবে। মশা তাই খর্ব্বুরকে জিজ্ঞাসা করিলেন,—সত্য সত্য কি ভারতের এই নিয়ম?

খর্ব্বুর উত্তর করিলেন—পূৰ্ব্বে এইরূপ নিয়ম ছিল সত্য। কিন্তু এক্ষণে সহমরণ উঠিয়া গিয়াছে। সাহেবেরা ইহা বন্ধ করিয়া দিয়াছেন। নাকেশ্বরী বলিল, উঠিয়া গেছে সত্য। কিন্তু আজ-কাল শিক্ষিত পুরুষদিগের মত কি জান? পূৰ্ব্বপ্রথা সমুদয় পুনঃপ্রচলিত করিবার নিমিত্ত তাঁহারা যথোচিত প্রয়াস পাইতেছেন। শোক-বিহুলা ক্ষিপ্তপ্রায় জননীভগিনীদিগকে জ্বলন্ত অনলে পোড়াইবার নিমিত্ত আজ-কালের শিক্ষিত পুরুষেরা নাচিয়া উঠিয়াছেন! এইরূপ ধৰ্ম্মের আমরা সম্পূর্ণভাবে পোষকতা করিয়া থাকি।

খর্ব্বুর বলিলেন-আমার যাই থাকুক কপালে, আমি কঙ্কাবতীর সহিত আচারব্যবহার করিব। তাঁহাকে আমাকে পতিত হইতে হয় সেও স্বীকার। আত্মীয়-স্বজন আমাকে পরিত্যাগ করেন করুক, তাহাতে আমি ভয় করিব না। তা বলিয়া অনাথা বালিকাটি যে অসহনীয় শোকে ক্ষিপ্ত-প্রায়া হইয়া পড়িয়া মরিবে, তাহা আমি চক্ষে দেখিতে পারিব না।

মশা বলিলেন,—আমারও ঐ মত, ভীরু কাপুরুষের মত কাৰ্য্য করিতে পারিব না। আমি কঙ্কাবতীকে ঘরে লইয়া যাইব।।

ব্যাঙ বলিলেন,–আমারও ঐ মত। কাপুরুষ হয়, মানুষেরা হউক। আমি হইব না।  নাকেশ্বরী বলিল,–ধৰ্ম্মের তোমরা কিছুই জান না। ঘোর অধর্মে যে তোমরা পতিত হইবে, সে জ্ঞান তোমাদের নাই। ইনি যদি সতী না হয়, তাহা হইলে ইহাকে প্রাজাপত্য প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইবে তবুও ইনি ঘরে যাইতে পারিবেন না। মুদ্দাফরাশের রমণী হইয়া ইহাকে চিরকাল থাকিতে হইবে।

কঙ্কাবতী বলিলেন,–এই কথা লইয়া আপনারা বৃথা তর্ক-বিতর্ক করিতেছেন। আমি নিশ্চয় সতী হইব, আমি কাহারও কথা শুনিব না। আমি নিশ্চয় প্রাণত্যাগ করিব। বাঁচিয়া থাকিতে আর আপনারা আমাকে অনুরোধ করিবেন না, যেহেতু আপনাদিগের কথা আমি রক্ষা করিতে পারিব না। এক্ষণে আমার প্রার্থনা এই যে সতী হইতে যাহা কিছু আবশ্যক সেই সমুদয় দ্রব্যের আয়োজন করিয়া দিন। আমার আর একটি কথা আছে। আমাদিগের যে ঘাট আছে, সেইখানে আমার শাশুড়ী-ঠাকুরাণীর চিতা হইয়াছিল, সেই স্থানে চিতা করিয়া আমি আমার পতির সঙ্গে পড়িযা মরিব।

কঙ্কাবতীর দৃঢ়প্রতিজ্ঞা দেখিয়া অতি দুঃখের সহিত, অগত্যা এ কাৰ্যে সকলকে সম্মত হইতে হইল। মশা বলিলেন,—কঙ্কাবতী! যদি তুমি নিতান্তই এই দুষ্কর কাৰ্য্য করিবে, তবে আমি আমার বাড়ীতে সংবাদ দিই, আমার স্ত্রীগণ ও রক্তবতী আসিয়া তোমার সহিত সাক্ষাৎ করুন।–খর্ব্বুর বলিলেন,—আমিও তবে আমার স্ত্রীকে সংবাদ দিই। আমার আত্মীয়-স্বজনকে সঙ্গে লইয়া তিনিও আসুন। সহমরণের উপকরণ আনয়ন করুন ও নাপিত, পুরোহিত, ঢাকি-টুলির নিকট সংবাদ পাঠাইয়া দিই।

ব্যাঙ বলিলেন—আমিও আমার জ্ঞাতি বন্ধুদিগকে ডাকিতে পাঠাই।

নাকেশ্বরী বলিল,–মাসী! তবে আমরা আর বাকী থাকি কেন? তুমি তোমার ঝুড়িতে গিয়া চড়। পৃথিবীতে যত ভূতিনী প্রেতিনী আছে, সহমরণ দেখিবার জন্য তাহাদিগকে নিমন্ত্রণ কর। আজকাল সহমরণ কিন্তু আর প্রতিদিন হয় না। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, যুবক-যুবতী, বালক-বালিকা সকল ভূতিনীই-প্রেতিনীই সহমরণ দেখিয়া পরম পরিতোষ উপভোগ করিবে।–এইরূপে সকলেই আপন র আত্মীয়-স্বজনকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। তাহার পর, খেতু ও কঙ্কাবতীকে লইয়া, সকলে হস্তীর পৃষ্ঠে আরোহণ করিলেন। রাত্রে এক প্রহরের সময় সকলে কুসুমঘাটীর ঘাটে গিয়া উপস্থিত হইলেন।

কঙ্কাবতী যে স্থান নির্দেশ করিয়া দিলেন, সেই স্থানে চিতা সুসজ্জিত হইল।।

এই সময় রক্তবতী ও রক্তবতীর মাতাগণ সেই শশ্মানঘাটে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সহমরণের সমুদয় উপকরণ লইয়া নাপিত পুরোহিত ঢাকী চুলি সঙ্গে করিয়া খর্ব্বুরের সপ্তহস্ত-পরিমিত স্ত্রী ও তাঁহার আত্মীয়-স্বজন আপন আপন বালক-বালিকাগণকে লইয়া সেইখানে আসিলেন। ব্যাঙ ও হস্তীর আত্মীয়বর্গও আসিয়া উপস্থিত হইলেন। নানাদি হইতে অসংখ্য ভূতিনীগণও আগমন করিল। সেই শশ্মান-ঘাটে সে রাত্রিতে মনুষ্য ও ভূতভূতিনী ভিন্ন, অপরাপর নানা প্রকার জীবজন্তু সমাগম হইল! সে রাত্রিতে কুসুমঘাটীর শশ্মান-ঘাট জনাকীর্ণ হইয়া পড়িল। রক্তাবতী কঙ্কাবতীর গলা জড়াইয়া ধরিলেন। কাঁদিতে কাঁদিতে রক্তাবতী বলিলেন,—পচাজল! তুমি কোথায় যাও? আমাকে ছাড়িয়া তুমি কোথায় যাইবে? আমি কখনই তোমাকে যাইতে দিব না।

কঙ্কাবতী বলিলেন,–পচাজল! তুমি কাঁদিও না। সতী হইয়া পতি-সঙ্গে আমি স্বর্গে চলিলাম। সে কার্যে তুমি আমাকে বাধা দিও না। কি করিব পচাজল। মন্দ অদৃষ্ট করিয়া এ পৃথিবীতে আসিয়াছিলাম; এ পৃথিবীতে সুখ হইল না! পতির সহিত এখন স্বর্গে যাই। আশীৰ্বাদ করি, রাজপুত্র মশা তোমার বর হউক। পতি লইয়া তুমি সুখে ঘরকন্না কর। আমার মত হতভাগিনী যেন শত্রুও না হয়।

এই বলিয়া কঙ্কাবতী, মশা-কন্যাকে নক্ষত্রের পুটুলিটি বাহির করিয়া দিলেন। কঙ্কাবতী বলিলেন,—ভাই পচাজল! এই নক্ষত্রগুলি দিয়া তিন ছড়া মালা গাঁথ। এক ছড়া তুমি লও, আর দুই ছাড়া আমার জন্য রাখ, প্রয়োজন আছে।।

সকলে তখন খেতুকে চিতার উপর রাখিলেন। প্রেত পিণ্ডাদি যথাবিধি প্রদত্ত হইল। নাপিত আসিয়া কঙ্কাবতীর নখ কাটিয়া দিল। তাঁহার চুড়ি ভাঙ্গিয়া ফেলিলেন। সেই ভাঙ্গ। চুড়ি লোকে হুড়াহুড়ি কাড়াকাড়ি করিয়া কুড়াইতে লাগিল। কেন না, কাহাকেও ভূতপ্রেতিনীতে পাইলে, এই চুড়ি রোগীর গলায় পরাইয়া দিলে, ভূত-প্রেতিনী ছাড়িয়া যায়।

কঙ্কাবতী হাতের নোয়া খুলিয়া স্নান করিয়া আসিলেন। খর্ব্বুরপত্নী তখন তাঁহাকে রক্তবর্ণের চেলির কাপড় পরাইয়া দিলেন। রাঙাসূতা দিয়া হাতে আলতা বাঁধিয়া দিলেন। চুলের উপর থরে থরে চিরুণি সাজাইয়া দিলেন। কপাল জুড়িয়া সিন্দুর ঢালিয়া দিলেন।

এইরূপ বেশ-ভূষা হইলে, কঙ্কাবতী আচমন করিয়া তিল জল কুশ হস্তে পৰ্ব্বমুখে বসিলেন। পুরোহিত তাঁহাকে মন্ত্র পড়াইয়া এইরূপ সঙ্কল্প করাইলেন।

অদ্য ভাদ্রামাসে, কৃষ্ণপক্ষে, তৃতীয়া তিথিতে ভরদ্বাজ গোত্রের আমি শ্ৰীমতী কঙ্কাবতী দেবী,—বশিষ্ঠকে লইয়া অরুন্ধতী যেরূপ স্বর্গে মহামান্য হইয়াছিলেন,—আমিও যেন সেইরূপ, মানুষের শরীরে যত লোক আছে, তত বৎসর স্বর্গে পতিকে লইয়া সুখে থাকিতে পারি। আমার মাতৃ-পিতৃ ও শ্বশুর যেন পবিত্র হয়। যতদিন চতুর্দশ ইন্দ্রের অধিকার থাকিবে, ততকাল পর্যন্ত যেন অপ্সরাগণ, আমাদিগের স্তব করিতে থাকে। পতির সঙ্গে যেন সুখে থাকি। ব্রহ্মহত্যা ও কৃতঘ্নতাজন্য যদি পতির পাপ হইয়া থাকে, আমার স্বামী যেন সে পাপ হইতে মুক্ত হন। এই সকল কামনা করিয়া আমি পতির জ্বলন্ত চিতায় আরোহণ করিতেছি।–এইরূপে পুরোহিত কঙ্কাবতীকে সঙ্কল্প করাইলেন। তাহার পর সূৰ্য্যার্ঘ দিয়া দিপালগণকে সাক্ষী করিলেন। সে মন্ত্রের অর্থ এই;–

অষ্ট-লোকপাল, আদিত্য, চন্দ্র, বায়ু, অগ্নি, আকাশ, ভূমি, জল, হৃদয়স্থিত অন্তর্যামী পুরুষ, যম, দিন, রাত্রি, সন্ধ্যা, ধৰ্ম্ম, তোমরা সকলে সাক্ষী থাক, আমি জ্বলন্ত চিতারোহণ করিয়া স্বামীর অনুগমন করিতেছি।–লোকপালদিগকে সাক্ষী মানা হইলে, কঙ্কাবতী আঁচলে খই, খণ্ডের পরিবর্তে বাতাসা ও কড়ি লইয়া, সাত বার চিতাকে প্রদক্ষিণ করিতে লাগিলেন, আর সেই খই-কড়ি ছড়াইতে লাগিলেন। বালক-বালিকাগণ হুড়াহুড়ি করিয়া খই-কড়ি কুড়াইতে লাগিল। কেন না, এই খই বিছানায় রাখিলে ছারপোকা হয় না।

উপস্থিত রমণীদিগের মধ্যে এক জন সতীর নিকট হইতে তাঁহার কপালের একটু সিন্দুর চাহিয়া লইলেন। তাঁহার কপালে এই সিন্দুর পরাইয়া দিলে সে অবিলম্বে পতিপরায়ণা হইবে। চিতা প্রদক্ষিণ করা হইলে, পুরোহিত কঙ্কাবতীকে ঋগ্‌মন্ত্র পড়াইলেন। শেষে কঙ্কাবতী রক্তবতীর নিকট হইতে নক্ষত্রের মালা দুই ছড়া চাহিয়া লইলেন। চিতার উপর আরোহণ করিয়া এক ছড়া মালা খেতুর গলায় দিলেন, এক ছড়া মালা আপনি পরিলেন। তাহার পর, চিতার উপর স্বামীর বাম পার্শ্বে শয়ন করিলেন।

গাছের কাঁচা ছাল, দিয়া, সকলে তাঁহাকে সেই চিতার সহিত বাঁধিয়া দিলেন। তাহার পর চিতার চারিদিকে সকলে আগুন দিয়া দিলেন। আগুন দিয়া, বড় বড় কঞ্চির বোঝা, বড় বড় শবের বোঝা, বড় বড় পাকাটির বোঝা, চারিদিক, হইতে সকলে ঝুপ ঝাঁপ করিয়া চিতার উপর ফেলিতে লাগিলেন! বাদ্যকরদিগের ঢাক-ঢোলের কোলাহলে সকলের কর্ণে তালি লাগিল। চিতা ধূ ধূ করিয় জ্বলিয়া উঠিল। আকাশপ্রমাণ হইয়া অগ্নিশিখা উঠিল।

কঙ্কাবতী অঘোর নিদ্রায় অভিভূত হইলেন! অতি সুখ-নিদ্রা! অতি শান্তিদায়িনী নিদ্রা!!

পরিশেষ – অতি সুখনিদ্রা! অতি শান্তি-দায়িনী নিদ্রা!

বৈদ্য বলিলেন,–এই যে নিদ্রাটি দেখিতেছেন, ইহা সুনিদ্রা। বিকারের ঘোর নহে। বিকার কাটিয়া গিয়াছে। নাড়ী পরিষ্কার হইয়াছে। এক্ষণে বাড়িতে যেন শব্দ হয় না! নিদ্রাটি যেন ভঙ্গ হয় না।–বৈদ্য প্রস্থান করিলেন। অঘোর অচৈতন্য হইয়া রোগী নিদ্রা যাইতে লাগিলেন। বাড়ীতে সকলেই চুপি চুপি কথা কহিতে লাগিলেন। বাড়ীতে পিপীলিকার পদশব্দটি পৰ্য্যন্ত নাই। মাতা কাছে বসিয়া রহিলেন। এক একবার কেবল কন্যার নাসিকার নিকট হাত রাখিয়া দেখিতে লাগিলেন, রীতিমত নিশ্বাস-প্রশ্বাস বহিতেছে কি না?

আহার-নিদ্রা পরিত্যাগ করিয়া, মা আজ বাইশ দিন কন্যার নিকট এইরূপে বসিয়া আছেন। প্রাণসম কন্যাকে লইয়া যমের সহিত তুমুল যুদ্ধ করিতেছেন। প্রবল বিকারের উত্তেজনায় কন্যা যখন উঠিয়া বসেন, মা তখন আস্তে আস্তে পুনরায় তাঁহাকে চুপ করিতে বলেন। সুধাময় মার বাক্য শুনিয়া বিকারের আগুনও কিছুক্ষণের নিমিত্ত নির্ম্মাণ হয়।

কন্যা নিদ্রিত! চক্ষু মুদ্রিত করিয়া আছেন। বহুদিন অনাহারে, প্রবল দুরন্ত জুরে, ঘোরতর বিকারে, দেহ এখন তার শীর্ণ, মুখ এখন মলিন। তবুও তার মধুর রূপ দেখিলে সংসার সুন্দর বলিয়া প্রতীতি হয়। মা সেই অপূর্ব্ব রূপরাশি অবলোকন করিতেছেন।

রাত্রি প্রভাত হইল। বেলা হইল। তবুও রোগীর নিদ্রাভঙ্গ হইল না। মা কাছে বসিয়া রহিলেন। নিঃশব্দে ভগিনী আসিয়া মার কাছে বসিলেন।

রোগীর ওষ্ঠদ্বয় একবার ঈষৎ নড়িল। অপরিস্ফুট স্বরে কি বলিলেন। শুনিবার নিমিত্ত ভগিনী মস্তক অবনত করিলেন। শুনিতে পাইলেন না, বুঝিতে পারিলেন না। আবার ওষ্ঠ নড়িল, রোগী আবার কি বলিলেন। মা এইবার সে কথা বুঝিতে পারিলেন।

মা বলিলেন,—খেতু খেতু করিয়াই বাছা আমার সারা হইলেন, আজ কয়দিন মুখে কেবল ঐ নাম। এখন যদি চারি হাত এক করিতে পারি, তবেই মনের কালি যায়।

মার সুমধুর কণ্ঠস্বর কন্যার কর্ণকুহরে প্রবেশ করিল। সম্পূর্ণরূপে জাগরিত হইয়া, মাকে জিজ্ঞাসা করিলে কঙ্কাবতী বলিলেনও প্রলাপ রহিয়াছে, ধীরে ধীরে তিনি চক্ষু উন্মীলন করিলেন। বিস্মিত-বদনে চারি দিক্‌ নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। মা বলিলেন,–বিকার সম্পূর্ণরূপে এখনও কাটে নাই। চক্ষুতে এখনও সুদৃষ্টি হয় নাই। আজ উনিশ দিন মা আমার কাহাকেও চিনিতে পারেন নাই।

ভগিনী জিজ্ঞাসা করিলেন,—কঙ্কাবতী! তুমি আমাকে চিনিতে পার?

কঙ্কাবতী অতি মৃদুস্বরে উত্তর করিলেন,—পারি, তুমি বড় দিদি।

ভগিনী পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন,—ইনি কে বল দেখি? কঙ্কাবতী বলিলেন,–মা। তনু রায় ঘরের ভিতর আসিলেন। তনু রায় জিজ্ঞাসা করিলেন,–কঙ্কাবতী! আজ কেমন আছ মা? কঙ্কাবতী বলিলেন,–ভাল আছি, বাবা।

তনু রায় একটু কাছে বসিলেন। স্নেহের সহিত কন্যার গায় মাথায় একটু হাত বুলাইলেন। তাহার পর বাহিরে চলিয়া গেলেন।

কঙ্কাবতী ভাবিলেন,—মা, ভগিনী পিতা সকলকেই দেখিতেছি আমার সহিত স্বর্গে আসিয়াছেন। পৃথিবীতে পিতার স্নেহ কখনও পাই নাই। আজ স্বর্গে আসিয়া পাইলাম। পৃথিবীতে আমাদের যেরূপ বাড়ী, আমার যেরূপ ঘর ছিল, স্বর্গেও দেখিতেছি সেইরূপ। কিন্তু যাঁহার সহিত সহমরণ যাইলাম, তিনি কোথায়?

অনেকক্ষণ কঙ্কাবতী তার প্রতীক্ষা করিয়া রহিলেন। তিনি আসিলেন না।

অবশেষে কঙ্কাবতী মাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,—মা, তিনি কোথায়?

মা জিজ্ঞাসা করিলেন,—তিনি কে?–কঙ্কাবতী বলিলেন,—সেই যিনি বাঘ হইয়াছিলেন। মা বলিলেন,–এখনও ঘোর বিকার রহিয়াছে, এখনও প্রলাপ রহিয়াছে।

মার কথা শুনিয়া কঙ্কাবতী চিন্তায় নিমগ্ন হইলেন। শরীর তাঁহার নিতান্ত দুৰ্ব্বল, তাহা তিনি বুঝিতে পারিলেন। অল্প অল্প করিয়া তাঁহার পূৰ্ব্ব কথা সব স্মরণপথে আসিতে লাগিল।–কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,–মা। আমার কি অতিশয় পীড়া হইয়াছিল?

মা বলিলেন,—হাঁ বাছা। আজ বাইশ দিন তুমি শয্যাগত। তোমার কিছুমাত্র জ্ঞান ছিল না। এবার যে তুমি বাঁচিবে, সে আশা ছিল না।

কঙ্কাবতী বলিলেন,—মা। আমি আশ্বৰ্য্য স্বপ্ন দেখিয়াছি। স্বপ্নটি আমার মনে এরূপ গাঁথা রহিয়াছে যে, প্রকৃত ঘটনা বলিয়া আমার বিশ্বাস হইতেছে। এখন আমার মনে নানা কথা আসিতেছে। তাঁহার ভিতর আবার কোনটি স্বপ্ন, তাহা আমি স্থির করিতে পারিতেছি না। তাই মা তোমাকে গুটিকতক কথা জিজ্ঞাসা করি। আচ্ছা মা জনার্দ্দন চৌধুরীর স্ত্রীযিয়োগ হইয়াছে, সে কথা সত্য?

মা বলিলেন,–সে কথা সত্য। তাই লইয়াই তো আমাদের যত বিপদ। কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,–মা। বরফ লইয়া কি দলাদলি হইয়াছিল, সে কথা কি সত্য? মা উত্তর করিলেন,—হাঁ বাছা। সে কথাও সত্য। সেই কথা লইয়া পাড়ার লোকে খেতুর মাকে অপমান করিয়াছিল। কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,–তিনি এখন কোথায় মা।

মা বলিলেন,—তিনি আসেন এই সমস্ত দিন এইখানেই থাকেন। আমার চেয়ে তিনি তোমাকে ভালবাসেন। তার হাতে তোমাকে একবার সঁপিয়া দিতে পারিলেই, এখন আমার সকল দুঃখ যায়। কৰ্ত্তার মত হইয়াছে, সকলের মত হইয়াছে, এখন তুমি ভাল হইলেই হয়। কঙ্কাবতী বুঝিলেন যে, তবে খেতুর মার মৃত্যু হয় নাই, সে কথাটি স্বপ্ন।

কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,–এই দলাদলির পর আমার জ্বর হয়, না মা?

তাহার পর, মা, আমি নদীর ঘাটে গিয়া একখানি নৌকার উপর চড়ি, না মা?

মা বলিলেন,–বালাই! তুমি নৌকায় চড়িবে কেন মা? সেই অবধি তুমি শয্যাগত।

কঙ্কাবতী বলিলেন,–মা! কত যে কি আশ্চর্য্য স্বপ্ন দেখিয়াছি, তাহা আর তোমায় কি বলিব; সে সব কথা মনে হইলে হাসিও পায় কান্নাও পায়। স্বপ্নে দেখিলাম কি মা, যে, গায়ের জ্বালায় আমি নদীর ঘাটে গিয়া জল মাখিতে লাগিলাম। তাহার পর একখানি নৌকাতে চড়িয়া নদীর মাঝখানে যাইলাম। নৌকখানি আমার ড়ুবিয়া গেল! মাছেরা আমাকে তাদের রাণী করিল। তাহার পর কিছুদিন গোয়ালিনী মাসীর বাড়ীতে রহিলাম। সেখান হইতে শশ্মানঘাটে যাইলাম! তাহার পর পুনরায় বাড়ী আসিলাম। এক বৎসর পরে আমাদের বাটীতে একটি বাঘ আসিল। সেই বাঘের সহিত আমি বনে যাইলাম। তার পর ভূতিনী, ব্যাঙ, মশা কত কি দেখিলাম। তার পর মা আকাশে উঠিলাম, কত কি করিলাম, কত কি দেখিলাম, স্বপ্নটি যেন আমার ঠিক সত্য বলিয়া বোধ হইতেছে। হাঁ মা! সে দলাদলির কি হইল?–মা উত্তর করিলেন,—যে দলাদলি সব মিটিয়া গিয়াছে। যখন তোমার সমূহ পীড়া, যখন তুমি অজ্ঞান অভিভূত হইয়া পড়িয়া আছ, আজ আট নয় দিনের কথা আমি বলিতেছি, সেই সময় জনার্দ্দন চৌধুরীর একটি পৌত্রেব হঠাৎ মৃত্যু হইল। জনার্দ্দন চৌধূরী সেই পৌত্রটিকে অতিশয় ভালবাসিতেন।

তিনি শোকে অধীর হইয়া পড়িলেন। সেই সময় গোবর্ধন শিরোমণিরও সঙ্কটাপন্ন পীড়া হইল। আর আমাদের বাটীতে তো তোমাকে লইয়া সমূহ বিপদ। জনার্দ্দন চৌধুরীর সুমুতি হইল। তিনি রামহরিকে আনিতে পাঠাইলেন। রামহরি সপরিবারে কলিকাতা হইতে দেশে আসিলেন। রামহরি জনার্দ্দন চৌধুরী অনেকক্ষণ পরামর্শ করিলেন। তাহার পর রামহরি নিরঞ্জনকে ডাকিয়া আনিলেন।

রামহরি, নিরঞ্জন, আমাদের কর্ত্তাটি ও খেতু সকলে মিলিযা জনার্দ্দন চৌধুরীর বাটীতে যাইলেন। জনার্দ্দন চৌধুরী বলিলেন,–আমি পাগল হইয়াছিলাম যে, এই বৃদ্ধ বয়সে আমি পুনরায় বিবাহ করিতে ইচ্ছা করিয়াছিলাম! নিরঞ্জনকে আমি দেশত্যাগী করিয়াছি, খেতু বালক, তাঁহার প্রতি আমি ঘোরতর অত্যাচার করিয়াছি। সেই অবধি নানাদিকে আমাদের অনিষ্ট ঘটিতেছে। লোকের টাকা আত্মসাৎ করিয়া ষাঁড়েশ্বব কয়েদ হইয়াছে! গোবর্ধন শিরোমণি পক্ষাঘাত রোগে মরণাপন্ন হইয়া আছেন।

বৃদ্ধ বয়সে আমাকে এক দারুণ শোক পাইতে হইল। এঁর কন্যাটিও রক্ষা পাওয়া ভার। এই কথা বলিয়া তিনি নিরঞ্জনকে অনেক অনুনয়-বিনয় করিয়া তাঁহার ভূমি ফিরিয়া দিলেন। নিরঞ্জন এখন আপনার বাটীতে বাস করিতেছেন। খেতুকে অনেক আশীর্বাদ করিয়া জনার্দ্দন চৌধুরী সান্ত্বনা করিলেন।

আমাদের কর্তাটি আর সে মানুষ নাই। এক্ষণে তাঁহার মনে স্নেহ-মায়া দয়া-ধৰ্ম্ম হইয়াছে। বিপদে পড়িলে লোকের এইরূপ সুমতি হয়। তোমার দাদাও এখন আর সেরূপ নাই। মাকে যেরূপ আস্থা-ভক্তি করিতে হয় সুপুত্রের, তোমার দাদাও এক্ষণে আমাকে আস্থা-ভক্তি করে। তোমার পীড়ার সময় খেতু, খেতুর মা, রামহরি, সীতা প্রভৃতি সকলেই প্রাণপণে পরিশ্রম করিয়াছেন। এক্ষণে সকল কথা শুনিলে এখন আর অধিক কথা কহিয়া কাজ নাই। এখনও তুমি অতিশয় দুর্বল। পুনরায় অসুখ হইতে পারে।

কঙ্কাবতী অনেক দিন দুৰ্বল রহিলেন। ভাল হইয়া সারিতে তাঁহার অনেক বিলম্ব হইল। সীতা তাঁহার নিকট আসিয়া সৰ্ব্বদা বসিতেন। স্বপ্ন-কথা তিনি সীতার নিকট সমুদয় গল্প করিলেন। সীতা মাকে বলিলেন, বৌদিদি খেতুকে বলিলেন, এইরূপে কঙ্কাবতীর আশ্চৰ্য্য স্বপ্ন-কথা পাড়ার স্ত্রী-পুরুষ সকলেই শুনিলেন! স্বপ্ন-কথা আদ্যোপাপ্ত শুনিয়া কঙ্কাবতীর উপর সীতার বড় অভিমান হইল।

সীতা বলিলেন,—সমুদয় নক্ষত্রগুলি তুমি নিজে পরিলে, আর আপনার পচাজলকে দিলে। আমার জন্য একটিও রাখিলে না। আমাকে তুমি ভালবাস না, তুমি তোমার পচাজলকে ভালবাস। আমি তোমার সহিত কথা কহিব না।

কঙ্কাবতী সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য লাভ করিলেন। পূর্ব্বের ন্যায় পুনরায় সবল হইলেন। পীড়া হইতে উঠিয়া তিনি খেতুর সম্মুখে একটু-আধটু বাহির হইতেন। একদিন খেতু কঙ্কাবতীদের বাটীতে গিয়াছিলেন। সেইখানে একটি মশা উড়িতেছিল খেতু সেই মশাটিকে ধরিয়া কঙ্কাবতীতে জিজ্ঞাসা করিলেন,—দেখ দেখি কঙ্কাবতী এই মশাটি তো তোমার পচাজল নয়? আহা! রক্তবতী আজ অনেক দিন তাঁহার পচাজলকে দেখিতে পায় নাই। তাঁহার মন কেমন করিতেছে। তাই সে হয় তত তোমাকে খুঁজিতে আসিয়াছে।

লজ্জায় কঙ্কাবতী গিয়া ঘরে লুকাইলেন। সেই অবধি আর খেতুর সম্মুখে বাহির হইতেন না।

নিরঞ্জন একদিন খেতুকে বলিলেন,—খেতু! কঙ্কাবতীর অদ্ভুত স্বপ্নকথা আমি শুনিয়াছি। কি আশ্চর্য্য স্বপ্ন! কিন্তু স্বপ্ন বা বিকারের প্রলাপ বলিয়া তুমি উপহাস করিও না। স্বপ্ন,—কি নয়? তাহাই বুঝিতে পারি না। এই আমাদের জীবন, আমাদের আশাভরসা, সুখ-দুঃখ সকলই স্বপ্নবৎ বলিয়া বোধ হয়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এই অপূৰ্ব্ব মায়া কিছুই বুঝিতে পারি না। সামান্য একটি পদার্থের কথাই আমরা ভালরূপ অবগত নহি।

এই দেখ, আমার হাতে এখন যে পুস্তকখানি রহিয়াছে, প্রকৃত ইহা কি, তাঁহার কিছুই জানি না। আমাদের ইন্দ্রিয় দ্বারা কেবল কতকগুলি গুণ অনুভব হয়। চক্ষু দ্বারা দেখিতে পাই যে, ইহার দৈর্ঘ্য প্রস্থ সুলতা ও বর্ণ আছে ত্বকের দ্বারা জানিতে পারি যে, ইহার কাঠিমা আছে নাসিকা দ্বারা ইহার ঘ্রাণ জিহ্বার দ্বারা ইহার স্বাদ অনুভব করি। প্রকৃত পুস্তকখানি আমরা দেখিতে পাই না, যাহাকে পুস্তকের গুণ বলি তাহাই আমরা অনুভব করিতে পারি। কিন্তু সে গুণগুলি পুস্তকের কি আমাদের ইন্দ্রিয়ের? আমাদের চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক প্রভৃতি এখন যে ভাবে গঠিত, সেই ভাবে আমরা গুণাদি অনুভব করি। যদি আমাদের ইন্দ্রিয় সমুদয় অন্যরূপে গঠিত হইত, তাহা হইলে পৃথিবীস্থ সমস্ত পদার্থ আবার অন্যরূপ ধারণ করিত।এই পুস্তকের পত্রগুলি এখন শুভ্র ও কৃষ্ণবর্ণ দেখাইতেছে। যদি পাণ্ডুরোগে আক্রান্ত হইয়া কিঞ্চিত্মাত্র আমার চক্ষুর গঠন পরিবর্তিত হয় তাহা হইলে এই পুস্তকখানিই আবার আমার চক্ষে পীতবর্ণ দেখাইবে।

তাই দেখ, প্রথম তো পুস্তকখানি দেখিতে পাই না, কতকগুলি গুণ কেবল অনুভব করি। আবার বলিতে গেলে সেইগুণগুলি পুস্তকের নয়, আমাদের ইন্দ্রিয়ের। তবে পুস্তক রহিল কোথা? কোনও বিষয়ের প্রকৃত তত্ত্ব জানিতে না পরিয়া স্বপ্ন সৃজিত কাল্পনিক জীবের ন্যায় আমরা সকলেই এই সংসারে যেন বিচরণ করিতেছি।

সে জন্য কঙ্কাবতীর স্বপ্নকে আমরা সকলে উপহাস করিব কেন? সমুদয় বাহ্যজগৎ যেরূপ আমাদের জাগরিত ইন্দ্রিয়-কল্পিত, কঙ্কাবতীর স্বপ্নজগৎও সেইরূপ কঙ্কাবতীর সুযুপ্ত ইন্দ্রিয় নির্ম্মিত হইয়াছিল। স্বপ্নের আদি হইতে অন্ত পর্যন্ত সকল স্থানেই কঙ্কাবতী বর্তমান। কঙ্কাবতী দেখিতেছে, কি শুনিতেছে, কি বলিতেছে, তা ছাড়া স্বপ্নে আর কিছুই নাই। কঙ্কাবতীর যেরূপ ভ্রম হওয়া সম্ভব, স্থানে স্থানে সেইরূপ নাও দেখিতে পাই। হাতীদিগের মন মশাদিগের নাক পরিবর্ধিত হইয়া হইয়া শুড়া হয় না, আবার অন্য স্থানে, যেমন আকাশে, কল্পনা-দেবী কঙ্কাবতীর সহিত কিছু ক্রীড়া কবিয়াছেন। যাহা হউক, স্বপ্নটি অদ্ভুত বলিয়া মানিতে হইবে। আমি আশ্চর্য্য হই, কঙ্কাবতী সেই মশাদিগের সংস্কৃত শ্লোকটি কি করিয়া বচনটি রচনা করিযাছিল। এ অনেক দিনের কথা। একখানি কাগজে ইহা লিখিয়া রাখিয়াছিলাম। কিছু দিন পবে কাগজখানি ফেলিয়া দিই। কঙ্কাবতী বোধ হয় সেই কাগজখানি দেখিয়া থাকিবে।

কঙ্কাবতী উত্তরমরূপে আরোগ্য লাভ করিলে, শুভ দিনে শুভ লগ্নে খেতু ও কঙ্কাবতীর শুভ বিবাহ কাৰ্য্য সম্পন্ন হইল। ঘোরতর দুঃখের পর এই কাৰ্য্য সুসম্পন্ন হইল, সে জন্য সপ্তগ্রাম সমাজের লোক সকলেই আনন্দিত হইলেন। বিশেষতঃ জনার্দ্দন চৌধুরী পরম প্রীতিলাভ করিলেন।

তাঁহার বৃদ্ধ বয়স ও কফের ধাত, কিন্তু সে জন্য তিনি কিছু মাত্র উপেক্ষা করেন নাই। বিবাহের দিন সমস্ত রাত্রি তিনি তনু রায়ের বাটীতে উপস্থিত ছিলেন। চুপি চুপি তিনি কলিকাতা হইতে প্রচুর পরিমাণে বরফ আনয়ন করিয়াছিলেন। ব্রাহ্মণ-ভোজনের সময় পরিহাসচ্ছলে সকলকে তিনি বলিলেন, বর যে একেলা বরফ খাইয়া শরীর সুশীতল করিবে, তাহা হইবে না, আমরাও আমাদের শরীর যৎসামান্য স্নিগ্ধ করিব।

দেশের লোক, যাঁহারা কখনও বরফ দেখেন নাই, আজ বরফ দেখিয়া সকলেই চমৎকৃত হইলেন। আগ্রহের সহিত অল্প কাঁচা বরফ লইয়াগেলেন।

শুদ্রভোজনের সময় গদাধর ঘোষ তিন লোটা বরফজল পান করিলেন। আর প্রায় এক সের সেই করাতের মত কৰ্ত্তনশীল বরফ দন্ত দ্বার চিবাইয়া খাইলেন।

কঙ্কাবতীর মা যখন কঙ্কাবতীকে খেতুর মার হাতে সঁপিয়া দিয়া বলিলেন,–দিদি। এই নাও, তোমার কঙ্কাবতী নাও তখন দুই জনের আহ্লাদ রাখিতে পৃথিবীতে কি আর স্থান হইল? মনের আনন্দে তখন খেতুর মা কি পুত্র ও পুত্রবধুকে বরণ করিয়া ঘরে লন নাই? বরণের সময় লজ্জায় খেতুকে কি ঘাড় হেঁট করিয়াছিলেন না? কলাবৌয়ের মত কঙ্কাবতীর কি তখন এক হাত ঘোমটা ছিল না? তা দেখিয়া পাড়ার একটি শিশু ছেলে কি সেই ঘোমটার ভিতর মুখ দিয়া টুঃ দেয় নাই? এ সব কথার আর উত্তর দিবার আবশ্যক নাই।–যে সময় বরণ হইতে ছিল, সেই সময় রামহরির স্ত্রী খেতুর বৌ-দিদি কি করিয়াছিলেন, তা জানেন? অতি উত্তম করিয়া খেতুর কানটি তিনি অল্প মলিয়া দিয়াছিলেন।–কান-মলা খাইয়া খেতু কি বলিলেন, তা জানেন? খেতু বলিলেন,–যাও বৌ-দিদি ছি!

পাড়ার স্ত্রীগণ তখন কি করিলেন, তা শুনিয়াছেন? কমলের স্ত্রী ঠান্‌দিদি বলিলেন,–শালা বরখ খায়। ও সীতার মা, ওলো, শালার কান দুইটা একেবারে ছিঁড়িয়া দে! ছিঁডিয়া দে?–তাহার পর কি হইল? তাহার পর খেতুর অনেক টাকা হইল। সকলে সুখ-স্বাচ্ছন্দে ঘরকন্না করিতে লাগিলেন। খেতুর অনেকগুলি ছেলেপিলে হইল। তনু রায় তাহাদিগের সহিত খেলা করিতে ভালবাসিতেন। পাড়ার বালক-বালিকারা তাব দৌহিত্রদিগকে মারিলে তাহাদের ঠাকুরমার সহিত তনু রায় হাত নাড়িয়া ঝগড়া করিতেন।–তাহার পর? বার বার তাহার পর তাহার পর করিলে চলিবে না। দেখিতে দেখিতে পুস্তকখানি বৃহৎ হইয়া পড়িয়াছে। ইহার মূল্য দেয় কে? তাঁহার ঠিক নাই, কাজেই তাড়াতাড়ি শেষ করিতে বাধ্য হলাম।–তাহার পর কি হইল? তাহার পর আমার গল্পটি ফুরাইল। নোটে গাছটির কপালে যাহা লেখা ছিল, তাহা ঘটিল! সেই ঘটনা লইয়া কত অভিযোগ উপস্থিত হইল।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত