হঠাত্‍ সেদিন দেখার পর

হঠাত্‍ সেদিন দেখার পর

সি এম এইচ এ তোমাকে যেদিন প্রথম দেখেছিলাম..সেদিন মনে হয়েছিল..ইসসস..একটা মানুষ এতটা অহংকারী কিভাবে হতে পারে…!!! কি মনে করে নিজেকে ছেলেটা..!!! ডাক্তার ই তো হয়েছে..কি এমন হয়েছে তাতে..!!!

আমি ও তো মেডিকেল এ পড়ি..কই আমার তো কোন সময় এত ভাব আসেনা..!! মাথা ঝিমঝিম করছিল ব্যাথায়.. তোমার এটিটিউড দেখে আরো মেজাজ খারাপ লাগছিল.. ব্যান্ডেজ এর ভারে মাথা নাড়াইতে পারছিলাম না.. তুমি ছিলে ডিউটি ডক্টর.. “এই যে মিস!! একটু সাবধানে চলা ফেরা করবেন..মেয়ে দের এত্ত লাফালাফি করা ঠিক না..”

আমি বললাম,”আপনার কি তাতে?? শুনেন,আমি একজন টিম লিডার..হ্যান্ডবল আমার প্যাশন.. একটু আধটু চোট আসতেই পারে..এ জন্য মেয়ে বলে আন্ডারস্টিমেট করা ঠিক না..” তুমি কিছু না বলে চলে গেছিলে… হসপিটাল এ থাকা অবস্থাতেই খোজ পেয়েছিলাম তোমার.. ক্যাপ্টেন ডাঃ সাহাদ মুনতাসির.. কেন জানি বাসায় ফিরে তোমার কথা মনে পড়ছিল হঠাত.. সেলাই কাটার জন্য আবার যেদিন হস্পিটাল এ গেলাম..সেদিন ও তোমাকে খুঁজেছিলাম..পাইনি.. মন খারাপ লাগলো..পরে আবার অকারনেই গেছি কতবার সি এম এইচ এ.. শুধু তোমার খোঁজে.. প্রথমবার এর মত বুঝতে পারলাম.. ডানপিটে এই মেয়েটা প্রেমে পড়ে গেছে..

“এই যে শুনেন…আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিল..”

তুমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে বললে,”আমাকে বলছেন??”

“জী আপনাকেই বলছি..আপনার কি গার্লফ্রেন্ড আছে??”

তুমি ভ্রু কুচকে বললে,”এটা কি ধরনের প্রশ্ন..??”

“শুনেন,আমি আপনাকে পছন্দ করি..আপনার গার্লফ্রেন্ড না থাকলে আমি আপনাকেই বিয়ে করব..”

তুমি হেসে উঠলে,”পিচ্চি মেয়ে..কোন ইয়ারে পড় তুমি??তোমার সাহস দেখে ভালো লাগলো..যাও বাসায় যাও..” আমি রেগে কেঁদে ফেললাম..

“শুনেন আমি পিচ্চি না..থার্ড ইয়ারে পড়ি..আমার প্রশ্নের উত্তর দেন.

” তুমি কিছু না বলে চলে গেছিলে.. এই প্রথম রিজেক্টেড হলাম কারো দ্বারা.. সারা রাত কেঁদেছিলাম.. রাগে, কষ্টে, জিদে…. তোমাকে আবার খুঁজে নিয়েছিলাম… ছায়ার মত লেগেছিলাম তোমার জন্য.. কিন্তু পাথর তুমি!!

একটুও গললেনা..কোন কথার উত্তর দিলেনা.. তোমাকে লিখে পাঠিয়েছিলাম..

“শুনেছি আমারে ভালোই লাগেনা.. নাই বা লাগিলো তোর.. কঠিন বাধনে চরণ বেড়িয়া.. চিরকাল তোরে রব আকড়িয়া..” মেসেজ এর রিপ্লে পেয়েছিলাম..

“বিকালে মাঠের পাশে এসো..” ওই একলাইন এর মেসেজ যে কত টা খুশির ছিল..বোঝাতে পারবোনা তোমাকে..!!

বিকালে আমার প্রিয় লাল শাড়ি টা পরে ছুটে গেছিলাম তোমার ডাকে.. “প্রিয়তি..তুমি অনেক বাচ্চা একটা মেয়ে..তোমার আবেগ অনেক বেশি..আজ তোমাকে কিছু কথা বলব.. আমার বাবা মা নাই..ছোট্ট বেলা থেকে মামার কাছে মানুষ..অনেক ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম আর মামা অনেক ভালোবাসতেন বলেই আলোর মুখ দেখতে পেয়েছিলাম একটু..

পৃথিবীতে মামাই আপন বলতে ছিলেন শুধু..ক্যাডেট কলেজ এ যখন প্যারেন্টস ডে তে সবার বাবা মা যেত আমি শুধু তাকিয়ে দেখতাম.. মামা আসতেন মাঝে মাঝে..মামি রাগারাগি করতেন বলে আমি ই না করতাম..ভ্যাকেশান এ সবাই বাড়ি যেত..আমি মামাবাড়ি যেতাম কিন্তু থাকতাম না..মামার সাথে দেখা করে চলে আসতাম..এতিম খানা তে এতিম বাচ্চা দের সাথে…

মডিকেল এ ফার্স্ট ইয়ার এ পড়ি তখন মামা ও মারা যান… প্রিয়তি,আমি আর কাউকে আঁকড়ে ধরতে চাইনা..আমার আপন সব হারিয়ে যায়.. তুমি চলে যাও..

” আমি শক্ত করে তোমাকে জাপটে ধরছিলাম.. কেঁদে বলছিলাম..

“ছেড়ে যাবোনা কোথাও..কথা দিলাম..” সেই থেকে পথ চলা…

তুমি প্রায় রাত এ আমার হাত ধরে কেঁদে বলতে,”প্রিয়তি ধন্যবাদ তোমাকে..ধন্যবাদ আল্লাহকে..আমার জীবন টা সুন্দর করে দেওয়ার জন্য…

“তোমার খুব শখ ছিল আমাদের একটা মেয়ে বাচ্চার.. ভালোই কাটছিল সব.. হঠাত তোমার মিশন এ যাওয়ার ডাক এলো.. আমি যেতে দিতে চাইছিলাম না তোমাকে.. চোখ ফেটে কান্না এলেও কাদিনি.. কারন আমি জানতাম.. আমার চোখের জল তোমার সবচে বড় দূর্বলতা.. আমি তোমার সাহস হতে চেয়েছিলাম… দূর্বলতা না….

যাওয়ার আগে এয়ারপোর্ট এ আমার হাত ধরে বলেছিলে,”ভালো লাগেনা তোমায় ছাড়া..চলে আসবো তাতাড়ি..যেদিন ফিরে আসবো..সেদিন তুমি লাল জামদানী টা পরে নিতে আসবা আমাকে…

” তুমি যাওয়ার ৪ মাস পর আমি অনুভব করলাম.. আমার ভিতর আরেকটা সত্ত্বা.. হ্যা..আমাদের সন্তান.. তুমি পাশে নাই..কেঁদেছিলাম ..ভয়ে,অজানা মিশ্র অনুভূতিতে.. তোমাকে জানাতে যেয়ে দেখি তোমার ফোন অফ.. ২ দিন খোজ নাই তোমার.. আমি ভয়ে কুকড়ে গেলাম.. টিভি খুলে দেখি…

“কংগো তে চরমপন্থি দের হামলায় বাংলাদেশ এর মেডিকেল ক্যাম্প ভস্মীভূত….

” বাকি টুক শোনার আগেই জ্ঞান হারিয়েছিলাম… তোমাকে দেশে আনা হয়েছিল রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়..লাল সবুজের পতাকায় মুড়ে… আমি তোমাকে আনতে গেছিলাম ঠিক ই সেদিন… কিন্তু লাল শাড়ি পরিনি.. আর কখনো লাল শাড়ি ও পরিনি… আমি চেয়েছিলাম তুমি অনেক সম্মানিত হও.. কিন্তু এভাবে না..বিশ্বাস কর.. তোমার মেয়ে টা আধো আধো বোলে কথা বলতে শিখেছে জানো..!!!

দেওয়ালে টানানো তোমার ছবি টার দিকে তাকিয়ে ডাকে..”বা..বা.. ই” তুমি কি শুনতে পাও ওর ডাক??? তোমার তো কত্ত শখ ছিল..মেয়ের মুখে বাবা ডাক শোনার!!!মেয়ের হাত ধরে হাটতে শেখানোর… তাহলে কেন চুপ করে আকাশের তারা হয়ে আছো??? ফিরে আসো প্লিজ…

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত